এবার আলিপুরে ওকালতির কাজ শুরু করে দেবে, রমেশের এইরকম ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তার মন ভেঙে গেছে। মন স্থির করে কাজে হাত দেবার এবং প্রথম কাজ শুরু করার নানা বাধা অতিক্রম করার মতো উৎসাহ তার ছিল না। সে এখন কিছুদিন গঙ্গার পুলের উপর এবং গোলদিঘিতে অকারণ ঘুরে বেড়াতে লাগল। একবার মনে করল ‘কিছুদিন পশ্চিমে বেড়িয়ে আসি’, এমন সময় অন্নদাবাবুর কাছ থেকে একখানা চিঠি পেল।
অন্নদাবাবু লিখেছেন, “গেজেটে দেখলাম, তুমি পাস হয়েছ–কিন্তু সে খবর তোমার কাছ থেকে না পেয়ে দুঃখিত হলাম। বহুকাল তোমার কোনো সংবাদ পাইনি। তুমি কেমন আছ এবং কবে কলকাতায় আসবে, জানিয়ে আমাকে নিশ্চিন্ত ও সুখী করবে।”
এখানে বলা প্রয়োজন যে, অন্নদাবাবু যে বিলাতফেরত ছেলেটির উপর তাঁর নজর রেখেছিলেন, সে ব্যারিস্টার হয়ে ফিরে এসেছে এবং এক ধনীকন্যার সাথে তার বিয়ের আয়োজন চলছে।
ইতিমধ্যে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে, তার পর হেমনলিনীর সাথে আগের মতো সাক্ষাৎ করা তার উচিত হবে কিনা, তা রমেশ কোনোভাবেই স্থির করতে পারল না। সম্প্রতি কমলার সাথে তার যে সম্পর্ক দাঁড়িয়েছে, সে কথা কাউকে বলা সে কর্তব্য মনে করে না। নিরপরাধ কমলাকে সে সংসারের কাছে অপমানিত করতে পারে না। অথচ সব কথা স্পষ্ট না বলে হেমনলিনীর কাছ সে তার আগের অধিকার ফিরে পাবে কী করে?
কিন্তু অন্নদাবাবুর চিঠির উত্তর দিতে দেরি করা আর তো উচিত নয়। সে লিখল, “গুরুতর কারণবশত আপনাদের সাথে সাক্ষাৎ করতে অক্ষম হয়েছি, আমাকে ক্ষমা করবেন।” নিজের নতুন ঠিকানা চিঠিতে দিল না।
এই চিঠিখানা ডাকে ফেলার পরদিনই রমেশ শামলা মাথায় দিয়ে আলিপুরের আদালতে হাজিরা দিতে বের হল।
একদিন সে আদালত থেকে ফেরার সময় কিছু পথ হেঁটে একটি ঠিকাগাড়ির গাড়োয়ানের সাথে ভাড়ার বন্দোবস্ত করছে, এমন সময় একটি পরিচিত ব্যস্ত কণ্ঠের স্বরে শুনতে পেল, “বাবা, এই যে রমেশবাবু!”
“গাড়োয়ান, থামো, থামো!”
গাড়ি রমেশের পাশে এসে দাঁড়াল। সেদিন আলিপুরের চিড়িয়াখানায় একটি পিকনিকের নিমন্ত্রণ সেরে অন্নদাবাবু ও তাঁর কন্যা বাড়ি ফিরছিলেন–এমন সময় হঠাৎ এই দেখা।
গাড়িতে হেমনলিনীর সেই কোমল-গম্ভীর মুখ, তার বিশেষ ধরনের সেই শাড়ি পরা, তার চুল বাঁধার পরিচিত ভঙ্গি, তার হাতের সেই সাধারণ বালা এবং তারাকাটা দুটি করে সোনার চুড়ি দেখামাত্র রমেশের বুকের মধ্যে একটা ঢেউ যেন একেবারে গলা পর্যন্ত উথলে উঠল।
অন্নদাবাবু বললেন, “এই যে রমেশ, ভাগ্যে পথে দেখা হল! আজকাল চিঠি লেখাই বন্ধ করেছ, যদি-বা লেখ, তবু ঠিকানা দাও না। এখন যাচ্ছ কোথায়? বিশেষ কোনো কাজ আছে?”
রমেশ বলল, “না, আদালত থেকে ফিরছি।”
অন্নদা: “তবে চলো, আমাদের ওখানে চা খেতে চলো।”
রমেশের হৃদয় ভরে উঠেছিল–সেখানে আর দ্বিধা করার স্থান ছিল না।
সে গাড়িতে চড়ে বসল। একান্ত চেষ্টায় সংকোচ কাটিয়ে হেমনলিনীকে জিজ্ঞাসা করল, “আপনি ভালো আছেন?”
হেমনলিনী কুশলপ্রশ্নের উত্তর না দিয়েই বলল, “আপনি পাস হয়ে আমাদের যে একবার খবর দিলেন না বড়ো?”
রমেশ এই প্রশ্নের কোনো জবাব খুঁজে না পেয়ে বলল, “আপনিও পাস হয়েছেন দেখলাম।”
হেমনলিনী হেসে বলল, “তবু ভালো, আমাদের খবর রাখেন!”
অন্নদাবাবু বললেন, “তুমি এখন বাসা কোথায় করেছ?”
রমেশ বলল, “দরজিপাড়ায়।”
অন্নদাবাবু বললেন, “কেন, কলুটোলায় তোমার সাবেক বাসা তো মন্দ ছিল না।”
উত্তরের অপেক্ষায় হেমনলিনী বিশেষ কৌতূহলের সাথে রমেশের দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টি রমেশকে আঘাত করল–সে তৎক্ষণাৎ বলে ফেলল, “হাঁ, সেই বাসাতেই ফিরব স্থির করেছি।”
তার এই বাসা-বদল করার অপরাধ যে হেমনলিনী গ্রহণ করেছে, তা রমেশ ভালই বুঝল–সাফাই করার কোনো উপায় না জানায় সে মনে মনে পীড়িত হতে লাগল। অন্য পক্ষ থেকে আর কোনো প্রশ্ন উঠল না। হেমনলিনী গাড়ির বাইরে পথের দিকে তাকিয়ে রইল। রমেশ আর থাকতে না পেরে অকারণে নিজেই বলে উঠল, “আমার একটি আত্মীয় হেদুয়ার কাছে থাকেন, তাঁর খবর নেওয়ার জন্য দরজিপাড়ায় বাসা করেছি।”
রমেশ একদম মিথ্যা বলল না, কিন্তু কথাটা কেমন অসংগত শোনাল। মধ্যে মধ্যে আত্মীয়ের খবর নেওয়ার পক্ষে কলুটোলা হেদুয়া থেকে এতই কি দূর? হেমনলিনীর দুচোখ গাড়ির বাইরে পথের দিকেই নিবদ্ধ হয়ে রইল। হতভাগ্য রমেশ এর পরে কী বলবে, কিছুই ভেবে পেল না। একবার শুধু জিজ্ঞাসা করল, “যোগেনের খবর কী?” অন্নদাবাবু বললেন, “সে আইন-পরীক্ষায় ফেল করে পশ্চিমে হাওয়া খেতে গেছে।”
গাড়ি যথাস্থানে পৌঁছলে পর পরিচিত ঘর ও গৃহসজ্জাগুলি রমেশের উপর মন্ত্রজাল বিস্তার করে দিল। রমেশের বুকের মধ্য থেকে গভীর দীর্ঘশ্বাস উঠল।
রমেশ কিছু না বলেই চা খেতে লাগল। অন্নদাবাবু হঠাৎ জিজ্ঞাসা করলেন, “এবার তো তুমি অনেকদিন বাড়িতে ছিলে, কাজ ছিল বুঝি?”
রমেশ বলল, “বাবার মৃত্যু হয়েছে।”
অন্নদা: “অ্যাঁ, বল কী! সে কী কথা! কেমন করে হল?”
রমেশ: “তিনি পদ্মা বেয়ে নৌকা করে বাড়ি আসছিলেন, হঠাৎ ঝড়ে নৌকা ডুবে তাঁর মৃত্যু হয়।”
একটা প্রবল হাওয়া উঠলে যেমন হঠাৎ করে ঘন মেঘ কেটে আকাশ পরিষ্কার হয়ে যায়, তেমনি এই শোকের সংবাদে রমেশ ও হেমনলিনীর মাঝখানের গ্লানি মুহূর্তের মধ্যে কেটে গেল। হেম অনুতাপসহকারে মনে মনে বলল, ‘রমেশবাবুকে ভুল বুঝেছিলাম–তিনি পিতৃবিয়োগের শোকে এবং গোলমালে বিচলিত হয়ে ছিলেন। এখনো হয়তো তাই নিয়ে উতলা হয়ে আছেন। উনার সাংসারিক কী সংকট ঘটেছে, উনার মনের মধ্যে কী ভার চেপেছে, তা কিছুই না জানিয়েই আমরা উনাকে দোষী করছিলাম।’
হেমনলিনী এই পিতৃহীনকে বেশি করে যত্ন করতে লাগল। রমেশের খাওয়ায় রুচি ছিল না, হেমনলিনী তাকে বিশেষ পীড়াপীড়ি করে খাওয়াল। বলল, “আপনি বড়ো রোগা হয়ে গেছেন, শরীরের অযত্ন করবেন না।” অন্নদাবাবুকে বলল, “বাবা, রমেশবাবু আজ রাতেও এইখানেই খেয়ে যান-না।”
অন্নদাবাবু বললেন, “বেশ তো।”
এমন সময় অক্ষয় এসে উপস্থিত। অন্নদাবাবুর চায়ের টেবিলে কিছুকাল অক্ষয় একাধিপত্য করে আসছে। আজ হঠাৎ রমেশকে দেখে সে থমকে গেল। আত্মসংবরণ করে হেসে বলল, “এ কী! এ যে রমেশবাবু! আমি বলি, আমাদের বুঝি একেবারেই ভুলে গেলেন।”
রমেশ কোনো উত্তর না দিয়ে একটুখানি হাসল। অক্ষয় বলল, “আপনার বাবা আপনাকে যে-রকম তাড়াতাড়ি ধরে নিয়ে গেলেন, আমি ভাবলাম, তিনি এবার আপনার বিয়ে না দিয়ে কিছুতেই ছাড়বেন না–ফাঁড়া কাটিয়ে এসেছেন তো?”
হেমনলিনী অক্ষয়কে বিরক্ত দৃষ্টিতে বিদ্ধ করল।
অন্নদাবাবু বললেন, “অক্ষয়, রমেশের পিতৃবিয়োগ হয়েছে।”
রমেশ বিবর্ণ মুখ নিচু করে বসে রইল। তাকে বেদনার উপর ব্যথা দিল বলে হেমনলিনী অক্ষয়ের প্রতি মনে মনে ভারি রাগ করল। রমেশকে তাড়াতাড়ি বলল, “রমেশবাবু, আপনাকে আমাদের নতুন অ্যালবামখানা দেখানো হয়নি।” বলে অ্যালবাম এনে রমেশের টেবিলের এক প্রান্তে নিয়ে গিয়ে ছবি নিয়ে আলোচনা করতে লাগল এবং এক সময়ে আস্তে আস্তে বলল, “রমেশবাবু, আপনি বোধ হয় নতুন বাসায় একলা থাকেন?”
রমেশ বলল, “হাঁ।” হেমনলিনী: “আমাদের পাশের বাড়িতে আসতে আপনি দেরি করবেন না।” রমেশ বলল, “না, আমি এই সোমবারেই নিশ্চয় আসব।” হেমনলিনী: “মনে করছি, আমাদের বি.এ.-র ফিলজফি আপনার কাছে মধ্যে মধ্যে বুঝিয়ে নেব।” রমেশ তাতে বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করল।
রমেশ আগের বাসায় আসতে দেরি করল না।
এর আগে হেমনলিনীর সঙ্গে রমেশের যতটুকু দূরত্ব ছিল, এবারে তা আর রইল না। রমেশ যেন একেবারে ঘরের লোক হয়ে গেল। হাসি-তামাশা, নিমন্ত্রণ-আমন্ত্রণ খুব জমে উঠল।
অনেক কাল অনেক পড়া মুখস্থ করে ইতিপূর্বে হেমনলিনীর চেহারা একপ্রকার নাজুক ধরনের ছিল। মনে হত, যেন একটু জোরে হাওয়া লাগলেই শরীরটা কোমর থেকে হেলে ভেঙে পড়তে পারে। তখন তার কথা কম ছিল, এবং তার সঙ্গে কথা বলতেই ভয় হত–পাছে সামান্য কিছুতেই সে রাগ করে।
অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই তার আশ্চর্য পরিবর্তন হয়েছে। তার ফ্যাকাশে গালে লাবণ্যের মসৃণতা দেখা দিল। তার চোখ এখন কথায় কথায় হাসির ঝিলিকে নেচে উঠে। আগে সে পোশাক-পরিচ্ছদে মনোযোগ দেওয়াকে হালকামি, এমনকি, অন্যায় মনে করত। এখন কারো সঙ্গে কোনো তর্ক না করে কীভাবে যে তার মত বদলে আসছে, তা অন্তর্যামী ছাড়া আর কেউ বলতে পারে না।
কর্তব্যবোধে ভারাক্রান্ত রমেশও কম গম্ভীর ছিল না। বিচারশক্তির প্রাবল্যে তার শরীর-মন যেন নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। আকাশের জ্যোতির্ময় গ্রহ-তারা চলাফেরা করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, কিন্তু মানমন্দির আপনার যন্ত্রনিয়ে অত্যন্ত সতর্কভাবে নিশ্চল হয়ে বসে থাকে–রমেশ সেইরকম এই চলমান জগৎসংসারের মাঝখানে আপনার বই-পত্র, যুক্তি-তর্কের আয়োজনের ভারে আটকে ছিল, তাকেও আজ এতটা হালকা করে দিল কীভাবে? সেও আজকাল সব সময়ে রসিকতার সদুত্তর দিতে না পারলে হো হো করে হেসে উঠে। তার চুলে এখনো চিরুনি ওঠেনি বটে, কিন্তু তার চাদর আর আগের মতো ময়লা নেই। তার দেহে-মনে এখন যেন একপ্রকার গতিশীলতার আবির্ভাব হয়েছে।
প্রেমীদের জন্য কাব্যে যে সব আয়োজনের ব্যবস্থা আছে, কলকাতা শহরে তা মেলে না। কোথায় প্রফুল্ল অশোক-বকুলের বীথিকা, কোথায় ফুটে থাকা মাধবীলতার আড়াল, কোথায় আম্রমঞ্জরীর গন্ধে মত্ত কোকিলের কুহুধ্বনি? তবু এই শুষ্ক কঠিন সৌন্দর্যহীন আধুনিক শহরে ভালোবাসার জাদুবিদ্যা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায় না। এই গাড়িঘোড়ার ভয়ানক ভিড়ে, এই লোহার শিকলে বাঁধা ট্রামের রাস্তায় এক চিরতরুণ প্রাচীন দেবতা তাঁর ধনুকটি লুকিয়ে রেখে লালপাগড়ি পুলিশের চোখের সামনে দিয়ে কত রাতে কত দিনে কত বার কত ঠিকানায় যে আসা-যাওয়া করছেন, তা কে বলতে পারে।
রমেশ ও হেমনলিনী চামড়ার দোকানের সামনে, মুদির দোকানের পাশে, কলুটোলার ভাড়াটে বাড়িতে বাস করত বলে প্রেমের বিকাশ সংক্রান্তে বাগানবাড়ির বাসিন্দাদের চেয়ে তারা যে একটুও পিছিয়ে ছিল, এমন কথা কেউ বলতে পারে না। অন্নদাবাবুদের চায়ের দাগে মলিন ছোট টেবিলটি পদ্মসরোবর না হলেও রমেশ একটুও অভাব বোধ করে নি। হেমনলিনীর পোষা বিড়ালটি কৃষ্ণসার হরিণশিশু না হলেও রমেশ পরিপূর্ণ স্নেহে তার গলা চুলকিয়ে দিত–এবং সেটি যখন ধনুকের মতো পিঠ ফুলিয়ে আলস্য ত্যাগ করে নিজের গা চেটে সাজগোজে মগ্ন হত, তখন রমেশের মুগ্ধ দৃষ্টিতে এই প্রাণীটি গৌরবে অন্য কোনো চতুষ্পদ প্রাণীর চেয়ে কম মনে হত না।
হেমনলিনী পরীক্ষা পাস করার আগ্রহে সেলাই শিক্ষায় বিশেষ দক্ষতা অর্জন করতে পারে নি, কিছুদিন থেকে তার এক সেলাই-পটু বান্ধবীর কাছে একাগ্রচিত্তে সে সেলাই শিখতে শুরু করেছে। সেলাই-ব্যাপারটাকে রমেশ অত্যন্ত অনাবশ্যক ও তুচ্ছ বলে মনে করে। সাহিত্যে দর্শনে হেমনলিনীর সঙ্গে তার দেনা-পাওনা চলে–কিন্তু সেলাই-ব্যাপারে রমেশকে দূরে থাকতে হয়। এইজন্য সে প্রায়ই কিছুটা অধীর হয়ে বলত, “আজকাল সেলাইয়ের কাজ কেন আপনার এত ভালো লাগে? যাদের সময় কাটানোর আর কোনো ভালো উপায় নেই, তাদের জন্যই এটা ভালো।” হেমনলিনী কোনো উত্তর না দিয়ে একটু হাসিমুখে সূচে রেশম পরাতে থাকে। অক্ষয় তীক্ষ্ণস্বরে বলে, “যে সব কাজ সংসারের কোনো প্রয়োজনে লাগে, রমেশবাবুর মতে সেগুলো সব তুচ্ছ। মশায় যত বড়ই তত্ত্বজ্ঞানী এবং কবি হোন না কেন, তুচ্ছকে বাদ দিয়ে একদিনও চলে না।” রমেশ উত্তেজিত হয়ে এর বিরুদ্ধে তর্ক করতে কোমর বেঁধে বসে; হেমনলিনী বাধা দিয়ে বলে, “রমেশবাবু, আপনি সব কথারই উত্তর দিতে এত ব্যস্ত হন কেন? এতে সংসারে অপ্রয়োজনীয় কথা যে কত বেড়ে যায়, তার ঠিক নেই।” এই বলে সে মাথা নিচু করে গুণতে গুণতে সাবধানে রেশমসূত্র চালাতে শুরু করে।
একদিন সকালে রমেশ তার পড়ার ঘরে এসে দেখে, টেবিলের উপর রেশমের ফুল-তোলা মখমলে মোড়া একটি ব্লটিং-বই সাজানো আছে। তার একটি কোণে ‘র’ অক্ষর লেখা আছে, আরেক কোণে সোনালি জরির সুতো দিয়ে একটি পদ্ম আঁকা। বইটির ইতিহাস ও অর্থ বুঝতে রমেশের এক মুহূর্তও দেরি হল না। তার বুক নেচে উঠল। সেলাই জিনিসটা তুচ্ছ নয়, তা তার অন্তরাত্মা বিনা তর্কে, বিনা প্রতিবাদে মেনে নিল। ব্লটিং-বইটি বুকে চেপে ধরে সে অক্ষয়ের কাছেও হার মানতে রাজি হয়ে গেল। সেই ব্লটিংবই খুলে তখনই তার উপরে একখানা চিঠির কাগজ রেখে সে লিখল–
“আমি যদি কবি হতাম, তবে কবিতা লিখিয়ে প্রতিদান দিতাম, কিন্তু প্রতিভা থেকে আমি বঞ্চিত। ঈশ্বর আমাকে দেবার ক্ষমতা দেন নি, কিন্তু নেবার ক্ষমতাও একটা ক্ষমতা। আশার চেয়ে বেশি উপহার আমি যে কেমন করে গ্রহণ করলাম, অন্তর্যামী ছাড়া তা আর কেউ জানতে পারবে না। দান চোখে দেখা যায়, কিন্তু গ্রহণ করা থাকে হৃদয়ের গভীরে লুকানো। ইতি। চিরঋণী।”
এই লেখাটুকু হেমনলিনীর হাতে পড়ল। তার পরে এ বিষয়ে দুজনের মধ্যে আর কোনো কথাই হল না।
বর্ষাকাল ঘনিয়ে এল। বর্ষাঋতুটা মোটের উপর শহুরে মানুষের সমাজের পক্ষে তেমন সুখকর নয়–ওটা বরং বন-প্রকৃতিরই বিশেষ উপযোগী; শহরের বাড়িগুলো তার বন্ধ জানালা ও ছাদ নিয়ে, পথিক তার ছাতা নিয়ে, ট্রামগাড়ি তার পর্দা নিয়ে বর্ষাকে শুধু নিষেধ করার চেষ্টায় কর্দমাক্ত হয়ে উঠছে। নদী-পাহাড়-জঙ্গল-মাঠ বর্ষাকে সাদর কলরবে বন্ধু বলে ডাকে। সেখানেই বর্ষার যথার্থ সমারোহ–সেখানে শ্রাবণে আকাশ-মাটির আনন্দমিলনের মাঝখানে কোনো বিরোধ নেই।
কিন্তু নতুন ভালোবাসা মানুষকে বন-পাহাড়ের সঙ্গেই এক শ্রেণীতে ফেলে দেয়। অবিরাম বর্ষায় অন্নদাবাবুর হজমশক্তি দ্বিগুণ বিগড়ে গেল, কিন্তু রমেশ-হেমনলিনীর মনোরঞ্জনে কোনো বিঘ্ন দেখা গেল না। মেঘের ছায়া, বজ্রের গর্জন, বৃষ্টির অবিরাম শব্দ তাদের দুজনের মনকে যেন আরও ঘনিষ্ঠ করে তুলল। বৃষ্টির অজুহাতে রমেশের আদালত যাওয়া প্রায়ই বাধাপ্রাপ্ত হতে লাগল। এক-এক দিন সকালে এমন জোরিয়ে বৃষ্টি আসে যে, হেমনলিনী উদ্বিগ্ন হয়ে বলে, “রমেশবাবু, এ বৃষ্টিতে আপনি বাড়ি যাবেন কী করে?” রমেশ নিতান্ত লজ্জার খাতিরে বলে, “এইটুকু তো, কোনো রকম করে যেতে পারব।” হেমনলিনী বলে, “কেন ভিজে সর্দি করবেন? এখানেই খেয়ে যান-না।” সর্দির জন্য উৎকণ্ঠা রমেশের একটুও ছিল না, অল্পতেই যে তার সর্দি হয়, এমন কোনো লক্ষণও তার আত্মীয়-বন্ধুরা দেখে নি; কিন্তু বৃষ্টির দিনে হেমনলিনীর সেবাশুশ্রূষার মধ্যেই তাকে কাটাতে হত–মাত্র দুই পা হেঁটে বাসায় যাওয়াও অন্যায় দুঃসাহসিকতা বলে গণ্য হত। কোনো দিন বৃষ্টির একটু বিশেষ আভাস পেলেই হেমনলিনীদের বাড়িতে সকালে রমেশের খিচুড়ি এবং বিকেলে নাশতা খাওয়ার নিমন্ত্রণ জুটত। স্পষ্ট বোঝা যেত, হঠাৎ সর্দি লাগার ব্যাপারে তাদের আশঙ্কা যতটা অতিরিক্ত প্রবল ছিল, হজমের গোলমাল সম্বন্ধে ততটা ছিল না।
এভাবেই দিন কাটতে লাগল। এই আত্মবিস্মৃত হৃদয়াবেগের পরিণতি কোথায়, রমেশ স্পষ্ট করে ভাবেনি। কিন্তু অন্নদাবাবু ভাবছিলেন, এবং তাদের সমাজের আরও পাঁচজন আলোচনা করছিল। একদিকে রমেশের পাণ্ডিত্য যতটা, সাধারণ বুদ্ধি ততটা নেই, তাতে তার বর্তমান মোহগ্রস্ত অবস্থায় তার সাংসারিক বুদ্ধি আরও অস্পষ্ট হয়ে গেছে। অন্নদাবাবু প্রতিদিনই বিশেষ প্রত্যাশা নিয়ে তার মুখের দিকে তাকান, কিন্তু কোনো জবাবই পান না।
অক্ষয়ের গলা বিশেষ ভালো ছিল না, কিন্তু সে যখন নিজে বেহালা বাজিয়ে গান গাইত তখন খুব কড়া সমঝদার ছাড়া সাধারণ শ্রোতারা আপত্তি করত না, বরং আরও গাইতে অনুরোধ করত। অন্নদাবাবুর সংগীতে বিশেষ আকর্ষণ ছিল না, কিন্তু সে কথা তিনি স্বীকার করতে পারতেন না– তবু তিনি আত্মরক্ষার কিছু চেষ্টা করতেন। কেউ অক্ষয়কে গান গাইতে অনুরোধ করলে তিনি বলতেন, “ওই তোমাদের দোষ, বেচারা গাইতে পারে বলেই কি ওর ‘পরে অত্যাচার করতে হবে?”
অক্ষয় বিনয় করে বলত, “না না অন্নদাবাবু, সেজন্য ভাববেন না– অত্যাচারটা কার ‘পরে হবে সেটাই তো বিচার্য।”
অনুরোধের তরফ থেকে জবাব আসত, “তবে পরীক্ষা হোক।”
সেদিন বিকেলে খুব ঘনঘোর করে মেঘ এসেছিল। প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসল, তবু বৃষ্টির বিরাম নেই। অক্ষয় আটকা পড়ে গেল। হেমনলিনী বলল, “অক্ষয়বাবু, একটা গান করুন।”
এই বলে হেমনলিনী হারমোনিয়ামে সুর দিল।
অক্ষয় বেহালা মিলিয়ে নিয়ে হিন্দুস্থানি গান ধরল–
“বায়ু বহীঁ পুরবৈঞা, নীদ নহিঁ বিন সৈঞা।”
গানের সব কথার স্পষ্ট অর্থ বোঝা যায় না– কিন্তু একেবারে প্রত্যেক কথায় কথায় বোঝার কোনো প্রয়োজন নেই। মনের মধ্যে যখন বিরহ-মিলনের বেদনা জমে আছে, তখন একটু আভাসই যথেষ্ট। এটুকু বোঝা গেল যে, বাদল ঝরছে, ময়ূর ডাকছে এবং একজনের জন্য আরেকজনের ব্যাকুলতার শেষ নেই।
অক্ষয় সুরের ভাষায় নিজের অব্যক্ত কথা বলার চেষ্টা করছিল– কিন্তু সে ভাষা কাজে লাগছিল আরো দুজনের। দুজনের হৃদয় সেই সুরলহরীকে আশ্রয় করে পরস্পরকে আঘাত-প্রতিঘাত করছিল। জগতে কিছুই তুচ্ছ রইল না। সব যেন মনোরম হয়ে গেল। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত যত মানুষ যত ভালোবেসেছে, সব যেন দুটিমাত্র হৃদয়ে বিভক্ত হয়ে অনির্বচনীয় সুখে-দুঃখে-আকাঙ্ক্ষায়-ব্যাকুলতায় কেঁপে উঠতে লাগল।
সেদিন মেঘের মধ্যে যেমন ফাঁক ছিল না, গানের মধ্যেও তেমনই হয়ে উঠল। হেমনলিনী কেবল অনুরোধ করে বলতে লাগল, “অক্ষয়বাবু, থামবেন না, আরেকটা গান, আরেকটা গান।”
উৎসাহে এবং আবেগে অক্ষয়ের গান অবাধে উৎসারিত হতে লাগল। গানের সুর স্তরে স্তরে পুঞ্জীভূত হল, যেন তা সুচিভেদ্য হয়ে উঠল, যেন তার মধ্যে থেমে থেমে বিদ্যুৎ খেলতে লাগল– বেদনাতুর হৃদয় তার মধ্যে আচ্ছন্ন-আবদ্ধ হয়ে রইল।
সেদিন অনেক রাতে অক্ষয় চলে গেল। রমেশ বিদায় নেওয়ার সময় যেন গানের সুরের ভিতর দিয়ে নিঃশব্দে হেমনলিনীর মুখের দিকে একবার তাকাল। হেমনলিনীও চমকের মতো একবার তাকাল, তার দৃষ্টির উপরেও গানের ছায়া।
রমেশ বাড়ি গেল। বৃষ্টি ক্ষণকালের জন্য থেমেছিল, আবার ঝুপ্ঝুপ শব্দে বৃষ্টি পড়তে লাগল। রমেশ সে রাতে ঘুমোতে পারল না। হেমনলিনীও অনেকক্ষণ চুপ করে বসে গভীর অন্ধকারের মধ্যে বৃষ্টিপতনের অবিরাম শব্দ শুনছিল। তার কানে বাজছিল–
“বায়ু বহীঁ পুরবৈঞা, নীদ নহিঁ বিন সৈঞা।”
পরদিন সকালে রমেশ দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবল, “আমি যদি কেবল গান গাইতে পারতাম, তবে তার বদলে আমার অন্য অনেক বিদ্যা দান করতে কুণ্ঠিত হতাম না।’
কিন্তু কোনো উপায়ে এবং কোনো কালেই সে যে গান গাইতে পারবে, এ ভরসা রমেশের ছিল না। সে স্থির করল, “আমি বাজাতে শিখব।” ইতিপূর্বে একদিন নির্জন অবসরে সে অন্নদাবাবুর ঘরে বেহালাখানা নিয়ে ছড়ির টান দিয়েছিল– সেই ছড়ির একটিমাত্র আঘাতে সরস্বতী এমনি আর্তনাদ করে উঠেছিলেন যে, তার পক্ষে বেহালার চর্চা নিতান্ত নিষ্ঠুরতা হবে বলে সে আশা সে ত্যাগ করে। আজ সে ছোটো দেখে একটা হারমোনিয়াম কিনে আনল। ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে খুব সাবধানে আঙুল চালিয়ে এটুকু বুঝল যে, আর যাই হোক, এ যন্ত্রের সহনশীলতা বেহালার চেয়ে বেশি।
পরদিন অন্নদাবাবুর বাড়ি যেতেই হেমনলিনী রমেশকে বলল, “আপনার ঘর থেকে কাল যে হারমোনিয়ামের শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল!”
রমেশ ভেবেছিল, দরজা বন্ধ থাকলেই ধরা পড়ার আশঙ্কা নেই। কিন্তু এমন কান আছে যেখানে রমেশের বদ্ধ ঘরের শব্দও সংবাদ নিয়ে আসে। রমেশকে একটু লজ্জিত হয়ে স্বীকার করতে হল যে সে একটা হারমোনিয়াম কিনে এনেছে এবং বাজাতে শেখাই তার ইচ্ছা।
হেমনলিনী বলল, “ঘরে দরজা বন্ধ করে নিজে কেন মিথ্যা চেষ্টা করবেন। তার চেয়ে আপনি আমাদের এখানে অভ্যাস করুন– আমি যতটুকু জানি, সাহায্য করতে পারব।”
রমেশ বলল, “আমি কিন্তু একদম新手, আমাকে নিয়ে আপনার অনেক কষ্ট করতে হবে।”
হেমনলিনী বলল, “আমার যেটুকু বিদ্যা, তাতে কেই শেখানো কোনোমতে চলে।”
ক্রমেই প্রমাণ হতে লাগল, রমেশ যে নিজেকে বলে পরিচয় দিয়েছিল, তা একদম বিনয় নয়। এমন শিক্ষকের এত অযাচিত সহায়তা সত্ত্বেও সুরের জ্ঞান রমেশের মস্তিষ্কের মধ্যে প্রবেশ করার কোনো পথ খুঁজে পেল না। সাঁতার না জানা লোক জলের মধ্যে পড়ে যেমন পাগলের মতো হাত-পা ছোঁড়াছুড়ি করে, রমেশ সংগীতের হাঁটুজলে তেমনই ব্যবহার করতে লাগল। তার কোন আঙুল কখন কোথায় গিয়ে পড়ে তার ঠিকানা নেই– পদে পদে ভুল সুর বাজে, কিন্তু রমেশের কানে তা বাজে না, সুর-বেসুরের মধ্যে সে কোনো রকম পক্ষপাত না করে খুব নিশ্চিন্তমনে রাগরাগিণীকে সর্বত্র লঙ্ঘন করে যায়। হেমনলিনী যেই বলে, “ও কী করছেন, ভুল হয়ে গেল যে–” অমনি খুব তাড়াতাড়ি দ্বিতীয় ভুল দিয়ে প্রথম ভুলটা সংশোধন করে দেয়। গম্ভীরপ্রকৃতি অধ্যবসায়ী রমেশ হাল ছেড়ে দেবার লোক নয়। রাস্তা-তৈরির স্টীমরোলার যেমন ধীরগতিতে চলতে থাকে, তার তলায় কী যে দলিত-পিষ্ট হচ্ছে তার প্রতি ভ্রুক্ষেপমাত্র করে না, হতভাগ্য স্বরলিপি এবং হারমোনিয়ামের চাবিগুলোর উপর দিয়ে রমেশ সেইরকম অনিবার্য অন্ধতার সাথে বার বার যাওয়া-আসা করতে লাগল।
রমেশের এই মূর্খতায় হেমনলিনী হাসে, রমেশও হাসে। রমেশের ভুল করার অসাধারণ শক্তিতে হেমনলিনীর খুব আমোদ বোধ হয়। ভুল থেকে, বেসুর থেকে, অক্ষমতা থেকে আনন্দ পাবার শক্তি ভালোবাসারই আছে। শিশু হাঁটতে শুরু করে বার বার ভুল পা ফেলে, তাতেই মায়ের স্নেহ উথলে উঠে। বাজনা সম্বন্ধে রমেশ যে অদ্ভুত রকমের অনভিজ্ঞতা প্রকাশ করে, হেমনলিনীর এ এক বড়ো কৌতুক।
রমেশ এক-এক বার বলে, “আচ্ছা, আপনি যে এত হাসছেন, আপনি যখন প্রথম বাজাতে শিখছিলেন তখন ভুল করেননি?”
হেমনলিনী বলে, “ভুল নিশ্চয়ই করতাম, কিন্তু সত্যি বলছি রমেশবাবু, আপনার সঙ্গে তুলনাই হয় না।”
রমেশ এতে দমে না গিয়ে, হেসে আবার শুরু থেকে শুরু করত। অন্নদাবাবু সংগীতের ভালোমন্দ কিছুই বুঝতেন না, তিনি এক-এক বার গম্ভীর হয়ে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে বলতেন, “তাই তো, রমেশের ক্রমেই হাত বেশ পাকছে।”
হেমনলিনী বলত, “হাত বেসুরোয় পাকছে।”
অন্নদা: “না না, প্রথমে যেমন শুনেছিলাম, এখন তার চেয়ে অনেকটা অভ্যাস হয়ে এসেছে। আমার তো বোধ হয়, রমেশ যদি লেগে থাকে তাহলে ওর হাত একদম খারাপ হবে না। গানবাজনায় আর কিছু নয়, খুব অভ্যাস করা চাই। একবার সারেগামার বোধটা জন্মিয়ে গেলেই তার পরে সব সহজ হয়ে আসে।”
এ-সব কথার উপর প্রতিবাদ চলে না। সবাইকে নিঃশব্দে শুনতে হয়।