প্রায় প্রতি বছর শরৎকালে পূজার টিকিট বের হলে হেমনলিনীকে নিয়ে অন্নদাবাবু জব্বলপুরে তাঁর বোনের স্বামীর কর্মস্থানে বেড়াতে যেতেন। হজমশক্তির উন্নতির জন্য তাঁর এই বার্ষিক চেষ্টা।
ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি হয়ে এসেছে, এবার পূজার ছুটির আর খুব বেশি দেরি নেই। অন্নদাবাবু এখন থেকেই তাঁর যাত্রার আয়োজনে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন।
আসন্ন বিচ্ছেদের সম্ভাবনায় রমেশ আজকাল খুব বেশি করে হারমোনিয়ম শিখতে মেতে উঠেছে। একদিন কথায় কথায় হেমনলিনী বলল, “রমেশবাবু, আমার মনে হয়, আপনার অন্তত কিছুদিন বায়ুপরিবর্তন দরকার। না বাবা?”
অন্নদাবাবু ভাবলেন কথাটা যুক্তিসঙ্গত, কারণ এরই মধ্যে রমেশের উপর দিয়ে শোক-দুঃখের দুর্যোগ গেছে। বললেন, “অন্তত কিছুদিনের জন্য কোথাও বেড়িয়ে আসা ভালো। বুঝেছ রমেশ, পশ্চিমই বল আর যে দেশই বল, আমি দেখেছি, শুধু কিছুদিনের জন্য একটু ফল পাওয়া যায়। প্রথম কয়েকদিন বেশ ক্ষুধা বাড়ে, বেশ খাওয়া যায়, তার পর আবার সেই আগের অবস্থা। পেট ভার হয়ে আসে, বুকে জ্বালা করতে থাকে, যা খাওয়া যায় তাই–”
হেমনলিনী: “রমেশবাবু, আপনি নর্মদা-ঝরনা দেখেছেন?”
রমেশ: “না, দেখিনি।”
হেমনলিনী: “এ আপনার দেখা উচিত, না বাবা?”
অন্নদা: “তা বেশ তো, রমেশ আমাদের সঙ্গেই আসুন-না কেন? হাওয়া-বদলও হবে, মার্বল পাহাড়ও দেখবে।”
হাওয়া-বদল করা এবং মার্বল পাহাড় দেখা, এই দুটি যেন রমেশের পক্ষে সম্প্রতি সবচেয়ে প্রয়োজনীয়– সুতরাং রমেশকেও রাজি হতে হল।
সেদিন রমেশের শরীর-মন যেন হাওয়ার উপরে ভাসতে লাগল। অশান্ত হৃদয়ের আবেগকে কোনো একটা রাস্তায় ছাড়া দেবার জন্য সে তার বাসার ঘরের মধ্যে দরজা বন্ধ করে হারমোনিয়ামটা নিয়ে বসল। আজ আর তার সুর-বেসুরের বোধ রইল না– যন্ত্রটার উপর তার পাগলাটে আঙুলগুলো তাল-বেতালের নাচ বাধিয়ে দিল। হেমনলিনীর দূরে যাওয়ার সম্ভাবনায় কয়েক দিন তার হৃদয়টা ভারাক্রান্ত ছিল– আজ উল্লাসের বেগে সংগীতবিদ্যা সম্বন্ধে সব রকমের ন্যায়-অন্যায়-বোধ একেবারে বিসর্জন দিল।
এমন সময় দরজায় শব্দ হল, “আহা সর্বনাশ! থামুন, থামুন রমেশবাবু, করছেন কী?”
রমেশ অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে লাল মুখে দরজা খুলে দিল। অক্ষয় ঘরের মধ্যে ঢুকে বলল, “রমেশবাবু, গোপনে বসে এই যে কাণ্ড করছেন, আপনাদের দণ্ডবিধির কোনো আইনের মধ্যে কি এটা পড়ে না?”
রমেশ হাসতে লাগল; বলল, “অপরাধ স্বীকার করছি।”
অক্ষয় বলল, “রমেশবাবু, আপনি যদি কিছু মনে না করেন, আপনার সঙ্গে আমার একটা কথা আলোচনা করার আছে।”
রমেশ উৎকণ্ঠিত হয়ে নীরবে আলোচ্য বিষয়ের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
অক্ষয়: “আপনি এতদিনে এটুকু বুঝেছেন, হেমনলিনীর ভালোমন্দের প্রতি আমি উদাসীন নই।”
রমেশ হ্যাঁ-না কিছু না বলে চুপ করে শুনতে লাগল।
অক্ষয়: “তাঁর সম্বন্ধে আপনার মতামত কী, তা জিজ্ঞাসা করার অধিকার আমার আছে– আমি অন্নদাবাবুর বন্ধু।”
কথাটা এবং কথার ভঙ্গিটা রমেশের খুব খারাপ লাগল। কিন্তু কড়া জবাব দেবার অভ্যাস ও ক্ষমতা রমেশের নেই। সে মৃদুস্বরে বলল, “তাঁর সম্বন্ধে আমার কোনো মন্দ অভিপ্রায় আছে, এ আশঙ্কা আপনার মনে আসার কি কোনো কারণ ঘটেছে?”
অক্ষয়: “দেখুন, আপনি হিন্দুপরিবারে আছেন, আপনার বাবা হিন্দু ছিলেন। আমি জানি, পাছে আপনি ব্রাহ্ম-ঘরে বিয়ে করেন, এই আশঙ্কায় তিনি আপনাকে অন্যত্র বিয়ে দেবার জন্য দেশে নিয়ে গিয়েছিলেন।”
এই সংবাদটি অক্ষয়ের জানার বিশেষ কারণ ছিল। কারণ অক্ষয়ই রমেশের বাবার মনে এই আশঙ্কা জন্মিয়ে দিয়েছিল। রমেশ মুহূর্তের জন্য অক্ষয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারল না।
অক্ষয় বলল, “হঠাৎ আপনার বাবার মৃত্যু ঘটল বলেই কি আপনি নিজেকে স্বাধীন মনে করছেন? তাঁর ইচ্ছা কি–”
রমেশ আর সহ্য করতে না পেরে বলল, “দেখুন অক্ষয়বাবু, অন্যের সম্বন্ধে আমাকে উপদেশ দেবার অধিকার যদি আপনার থাকে, তবে দিন, আমি শুনে যাব– কিন্তু আমার বাবার সঙ্গে আমার যে সম্পর্ক তাতে আপনার কোনো কথা বলার নেই।”
অক্ষয় বলল, “আচ্ছা বেশ, সে কথা তবে থাক। কিন্তু হেমনলিনীকে বিয়ে করার ইচ্ছা এবং সামর্থ্য আপনার আছে কিনা, সে কথা আপনাকে বলতে হবে।”
রমেশ আঘাতের পর আঘাত খেয়ে ক্রমশই উত্তেজিত হয়ে উঠছিল; বলল, “দেখুন অক্ষয়বাবু, আপনি অন্নদাবাবুর বন্ধু হতে পারেন, কিন্তু আমার সঙ্গে আপনার তেমন বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়নি। দয়া করে আপনি এ-সব প্রসঙ্গ বন্ধ করুন।”
অক্ষয়: “আমি বন্ধ করলেই যদি সব কথা বন্ধ থাকে এবং আপনি এখন যেমন পরিণামের দিকে নজর না রেখে বেশ আরামে দিন কাটাচ্ছেন, এমনিই বরাবর কাটাতে পারতেন, তাহলে কোনো কথা ছিল না। কিন্তু সমাজ আপনাদের মতো নিশ্চিন্তপ্রকৃতি লোকের পক্ষে সুখের জায়গা নয়। যদিও আপনারা খুব উঁচুদরের লোক, পৃথিবীর কথা খুব বেশি ভাবেন না, তবু চেষ্টা করলে হয়তো এটুকুও বুঝতে পারবেন যে, ভদ্রলোকের মেয়ের সঙ্গে আপনি যে রকম ব্যবহার করছেন, এমন করে আপনি বাইরের লোকের জবাবদিহি থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারেন না– এবং যাঁদের আপনি শ্রদ্ধা করেন তাঁদের লোকসমাজে অশ্রদ্ধাভাজন করার এটাই উপায়।”
রমেশ: “আপনার উপদেশ আমি কৃতজ্ঞতার সাথে গ্রহণ করলাম। আমার যা কর্তব্য তা আমি শিগগিরই স্থির করব এবং পালন করব, এ বিষয়ে আপনি নিশ্চিন্ত হবেন– এ সম্বন্ধে আর বেশি আলোচনা করার প্রয়োজন নেই।”
অক্ষয়: “আমাকে বাঁচালেন রমেশবাবু। এত দীর্ঘকাল পরে আপনি যে কর্তব্য স্থির করবেন এবং পালন করবেন বলছেন, এতেই আমি নিশ্চিন্ত হলাম– আপনার সঙ্গে আলোচনা করার শখ আমার নেই। আপনার সংগীতচর্চায় বাধা দিয়ে অপরাধী হয়েছি– মাফ করবেন। আপনি আবার শুরু করুন, আমি বিদায় হলাম।”
এই বলে অক্ষয় দ্রুতবেগে বাইরে চলে গেল।
এর পরে খুব বেসুরো সংগীতচর্চাও আর চলে না। রমেশ মাথার নীচে দুহাত রেখে বিছানার উপর চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। অনেকক্ষণ এভাবেই কাটল। হঠাৎ ঘড়িতে টং টং করে পাঁচটা বেজে যাওয়া শুনেই সে দ্রুত উঠে পড়ল। কী কর্তব্য স্থির করল তা অন্তর্যামীই জানেন– কিন্তু ততক্ষণে প্রতিবেশীর বাড়ি গিয়ে যে এক-দুই পেয়ালা চা খাওয়া কর্তব্য, সে সম্বন্ধে তার মনে দ্বিধামাত্র রইল না।
হেমনলিনী চমকে বলে উঠল, “রমেশবাবু, আপনার কি অসুখ করেছে?”
রমেশ বলল, “বিশেষ কিছু না।”
অন্নদাবাবু বললেন, “আর কিছুই নয়, হজমের গোল হয়েছে– পিত্তাধিক্য। আমি যে বড়ি ব্যবহার করে থাকি তার একটা খেয়ে দেখো দেখি–”
হেমনলিনী হেসে বলল, “বাবা, ঐ বড়ি খাওয়াওনি, তোমার এমন আলাপী কেউ দেখি না– কিন্তু তাদের এমন কী উপকার হয়েছে?”
অন্নদা: “অনিষ্ট তো হয়নি। আমি যে নিজে পরীক্ষা করে দেখেছি– এ পর্যন্ত যত রকম বড়ি খেয়েছি, এইটেই সব চেয়ে উপকারী।”
হেমনলিনী: “বাবা, যখন তুমি একটা নতুন বড়ি খেতে শুরু কর, তখনি কিছুদিন তার অশেষ গুণ দেখতে পাও–”
অন্নদা: “তোমরা কিছুই বিশ্বাস কর না– আচ্ছা, অক্ষয়কে জিজ্ঞেস করো দেখি, আমার চিকিৎসায় সে উপকার পেয়েছে কি না।”
সেই প্রমাণিক সাক্ষীকে ডাকার ভয়ে হেমনলিনীকে চুপ করতে হল। কিন্তু সাক্ষী আপনি এসে হাজির হল। এসেই অন্নদাবাবুকে বলল, “অন্নদাবাবু, আপনার সেই বড়ি আমাকে আরেকটা দিতে হবে। খুব উপকার হয়েছে। আজ শরীর এমনি হালকা বোধ হচ্ছে!”
অন্নদাবাবু গর্বিতভাবে তাঁর মেয়ের মুখের দিকে তাকালেন।
বড়ি খাওয়ার পর অন্নদাবাবু অক্ষয়কে তাড়াতাড়ি ছাড়তে চাইলেন না। অক্ষয়ও যাবার জন্য বিশেষ তাড়া প্রকাশ না করে মধ্যে মধ্যে রমেশের মুখের দিকে কটাক্ষ করতে লাগল। রমেশের চোখে সহজে কিছু পড়ে না– কিন্তু আজ অক্ষয়ের এই কটাক্ষগুলো তার চোখ এড়াল না। তাতে তাকে বার বার অস্থির করে তুলতে লাগল।
পশ্চিমে বেড়াতে যাওয়ার সময় নিকটবর্তী হয়ে উঠেছে– মনে মনে তারই আলোচনায় হেমনলিনীর চিত্ত আজ বিশেষ প্রফুল্ল ছিল। সে ঠিক করে রেখেছিল, আজ রমেশবাবু এলে ছুটি কাটানো নিয়ে তাঁর সঙ্গে নানা রকম পরামর্শ করবে। সেখানে নির্জনে কী কী বই পড়ে শেষ করতে হবে, দুজনে মিলে তার একটা তালিকা করার কথা ছিল। স্থির ছিল, রমেশ আজ সকাল-সকাল আসবে, কারণ, চায়ের সময় অক্ষয় বা কেউ না কেউ এসে পড়ে, তখন মন্ত্রণা করার সময় পাওয়া যায় না।
কিন্তু আজ রমেশ অন্য দিনের চেয়েও দেরি করে এসেছে। মুখের ভাবও তার অত্যন্ত চিন্তাযুক্ত। তাতে হেমনলিনীর উৎসাহে অনেকটা আঘাত লাগল। কোনো এক সুযোগে সে রমেশকে আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করল, “আপনি আজ বড়ো যে দেরি করে এলেন?”
রমেশ অন্যমনস্কভাবে একটু চুপ থেকে বলল, “হাঁ, আজ একটু দেরি হয়ে গেছে বটে।”
হেমনলিনী আজ তাড়াতাড়ি করে কত সকাল-সকাল চুল বেঁধে নিয়েছে। চুল-বাঁধা কাপড়-ছাড়ার পর সে আজ কতবার ঘড়ির দিকে তাকিয়েছে– অনেকক্ষণ পর্যন্ত মনে করেছে তার ঘড়িটা ভুল চলছে, এখনো বেশি দেরি হয়নি। যখন এই বিশ্বাস রাখা একেবারেই অসম্ভব হয়ে উঠল তখন সে জানলার কাছে বসে একটা সেলাই নিয়ে কোনোমতে মনের অধৈর্য শান্ত রাখার চেষ্টা করেছে। তার পরে রমেশ মুখ গম্ভীর করে এল– কী কারণে দেরি হয়েছে, তার কোনো রকম জবাবদিহি করল না– আজ সকাল-সকাল আসার যেন কোনো শর্তই ছিল না।
হেমনলিনী কোনোমতে চা-খাওয়া শেষ করে নিল। ঘরের কোণে একটা টিপাইয়ের উপরে কতকগুলো বই ছিল– হেমনলিনী কিছু বিশেষ উদ্যমের সাথে রমেশের মনোযোগ আকর্ষণ করে সেই বইগুলো তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরোবার উপক্রম করল। তখন হঠাৎ রমেশের চেতনা হল; সে তাড়াতাড়ি কাছে এসে বলল, “ওগুলো কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আজ একবার বইগুলো বেছে নেবেন না?”
হেমনলিনীর ঠোঁট কাঁপছিল। সে উথলে আসা অশ্রুজলের উচ্ছ্বাস অনেক কষ্টে সংবরণ করে কাঁপা গলায় বলল, “থাক-না, বই বেছে কী আর হবে।”
এই বলে সে দ্রুতবেগে চলে গেল। উপরের শোয়ার ঘরে গিয়ে বইগুলো মেঝের উপর ফেলে দিল।
রমেশের মনটা আরও বিগড়ে গেল। অক্ষয় মনে মনে হেসে বলল, “রমেশবাবু, আপনার বোধ হয় শরীরটা আজ তেমন ভালো নেই?”
রমেশ এর উত্তরে অস্পষ্ট কণ্ঠে কী বলল, ভালো বোঝা গেল না। শরীরের কথায় অন্নদাবাবু উৎসাহিত হয়ে বললেন, “সে তো রমেশকে দেখেই আমি বলেছি।”
অক্ষয় মুখ টিপে হাসতে হাসতে বলল, “শরীরের প্রতি মনোযোগ করা রমেশবাবুর মতো লোকেরা বোধ হয় খুব তুচ্ছ মনে করেন। উঁহারা ভাবরাজ্যের মানুষ– খাওয়া হজম না হলে তা নিয়ে চেষ্টা করাটাকে অসভ্যতা বলে মনে করেন।”
অন্নদাবাবু কথাটাকে গম্ভীরভাবে নিয়ে বিস্তারিতভাবে প্রমাণ করতে বসলেন যে, ভাবুক হলেও হজম করাটা তো চাইই।
রমেশ নীরবে বসে মনে মনে দগ্ধ হতে লাগল।
অক্ষয় বলল, “রমেশবাবু, আমার পরামর্শ শুনুন– অন্নদাবাবুর বড়ি খেয়ে একটু সকাল-সকাল শুতে যান।”
রমেশ বলল, “অন্নদাবাবুর সঙ্গে আজ আমার একটু বিশেষ কথা আছে সেইজন্য আমি অপেক্ষা করে আছি।”
অক্ষয় চৌকি ছেড়ে উঠে বলল, “এই দেখুন, এ কথা আগে বললেই হত। রমেশবাবু সব কথা পেটে রেখে দেন, শেষকালে সময় যখন প্রায় শেষ হয়ে যায় তখন ব্যস্ত হয়ে উঠেন।”
অক্ষয় চলে গেলে রমেশ নিজের জুতোজোড়াটির প্রতি দুচোখ নিচু করে রেখে বলতে লাগল, “অন্নদাবাবু, আপনি আমাকে আত্মীয়ের মতো আপনার ঘরের মধ্যে যাতায়াত করার অধিকার দিয়েছেন, এ আমি যে কত সৌভাগ্যের বিষয় বলে মনে করি তা আপনাকে মুখে বলে শেষ করতে পারব না।”
অন্নদাবাবু বললেন, “বিলক্ষণ! তুমি আমাদের যোগেনের বন্ধু, তোমাকে ঘরের ছেলে বলে মনে করব না তো কী করব?”
ভূমিকা তো হল, তার পরে কী বলতে হবে, রমেশ কিছুতেই ভেবে পায় না। অন্নদাবাবু রমেশের পথ সহজ করে দেবার জন্য বললেন, “রমেশ, তোমার মতো ছেলেকে ঘরের ছেলে করতে পারা আমারই তো কম সৌভাগ্য!”
এর পরেও রমেশের কথা জোগাল না।
অন্নদাবাবু বললেন, “দেখো-না, তোমাদের সম্পর্কে বাইরের লোক অনেক কথা বলতে শুরু করেছে। তারা বলে, হেমনলিনীর বিয়ের বয়স হয়েছে, এখন তার সঙ্গী নির্বাচন সম্বন্ধে বিশেষ সতর্ক হওয়া দরকার। আমি তাদের বলি, রমেশকে আমি খুব বিশ্বাস করি– সে আমাদের উপরে কখনোই অন্যায় ব্যবহার করতে পারবে না।”
রমেশ: “অন্নদাবাবু, আমার সম্পর্কে আপনি সবই তো জানেন, আপনি যদি আমাকে যোগ্য পাত্র বলে মনে করেন, তবে–”
অন্নদা: “সে কথা বলাই বাহুল্য। আমরা তো একরকম ঠিক করেই রেখেছি– শুধু তোমার সাংসারিক দুর্ঘটনার ঘটনায় দিন স্থির করতে পারিনি। কিন্তু বাপু, আর দেরি করা উচিত হয় না। সমাজে এ নিয়ে ক্রমেই নানা কথা তৈরি হচ্ছে– সেটা যত শিগগির হয় বন্ধ করে দেওয়া উচিত। কী বল?”
রমেশ: “আপনি যেরকম আদেশ করবেন তাই হবে। অবশ্য সবচেয়ে আগে আপনার মেয়ের মত জানা দরকার।”
অন্নদা: “সে তো ঠিক কথা। কিন্তু সে একরকম জানাই আছে। তবু কাল সকালেই সে কথাটা পাকাপাকি করে নেব।”
রমেশ: “আপনার শুতে যেতে দেরি হচ্ছে, আজ তবে আসি।”
অন্নদা: “একটু দাঁড়াও। আমি বলি কী, আমরা জব্বলপুরে যাওয়ার আগেই তোমাদের বিয়েটা হয়ে গেলে ভালো হয়।”
রমেশ: “সে তো আর বেশি দেরি নেই।”
অন্নদা: “না, এখনো দিন-দশেক আছে। আগামী রবিবারে যদি তোমাদের বিয়ে হয়ে যায় তাহলে তার পরেও যাত্রার আয়োজনের জন্য দু-তিন দিন সময় পাওয়া যাবে। বুঝেছ রমেশ, এত তাড়া করতাম না, কিন্তু আমার শরীরের জন্যই ভাবনা।”
রমেশ সম্মত হল এবং আর একটা বড়ি গিলে বাড়ি চলে গেল।
বিদ্যালয়ের ছুটি নিকটবর্তী। ছুটির সময়ে কমলাকে বিদ্যালয়েই রাখার জন্য রমেশ কর্ত্রীর সঙ্গে আগেই ঠিক করেছিল।
রমেশ ভোরবেলা উঠে ময়দানের নির্জন রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে স্থির করল, বিয়ের পর সে কমলা সম্পর্কে হেমনলিনীকে সমস্ত ঘটনা আগাগোড়া বিশদ করে বলবে। তার পরে কমলাকেও সমস্ত কথা বলার সুযোগ হবে। এভাবে সব পক্ষের বোঝাপড়া হয়ে গেলে কমলা স্বচ্ছন্দে বন্ধুর মতো হেমনলিনীর সঙ্গেই বাস করতে পারবে। দেশে এ নিয়ে নানা কথা উঠতে পারে, এই ভেবে সে হাজারিবাগে গিয়ে প্র্যাকটিস করবে স্থির করেছে।
ময়দান থেকে ফিরে এসে রমেশ অন্নদাবাবুর বাড়ি গেল। সিঁড়িতে হঠাৎ হেমনলিনীর সঙ্গে দেখা হল। অন্য দিন হলে এমন সাক্ষাতে একটু কিছু আলাপ হত। আজ হেমনলিনীর মুখ লাল হয়ে উঠল, সেই লালিমার মধ্য দিয়ে একটা হাসির আভা ভোরের আলোর মতো উজ্জ্বল হল– হেমনলিনী মুখ ফিরিয়ে চোখ নিচু করে দ্রুতবেগে চলে গেল।
রমেশ যে সুরটা হেমনলিনীর কাছ থেকে হারমোনিয়মে শিখেছিল, বাসায় গিয়ে সেটাই খুব করে বাজাতে লাগল। কিন্তু একটি মাত্র সুর সারাদিন বাজানো চলে না। কবিতার বই পড়তে চেষ্টা করল– মনে হল, তার ভালোবাসার সুর যে সুদূর উচ্চে উঠছে কোনো কবিতা সে পর্যন্ত পৌঁছতে পারছে না।
আর হেমনলিনী নিরলস আনন্দের সাথে তার গৃহকর্ম সব সেরে নির্জন দুপুরে শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে তার সেলাইটি নিয়ে বসল। মুখের উপরে একটি পরিপূর্ণ প্রসন্নতার শান্তি। একটি সর্বাঙ্গীণ সার্থকতা তাকে ঘিরে রইল।
চায়ের সময়ের আগেই কবিতার বই আর হারমোনিয়ম ফেলে রমেশ অন্নদাবাবুর বাসায় এসে হাজির হল। অন্য দিন হেমনলিনীর সঙ্গে দেখা হতে বেশি দেরি হত না। কিন্তু আজ চায়ের ঘরে দেখল সে ঘর খালি, দোতলায় বসবার ঘরে দেখল সে ঘরও খালি, হেমনলিনী এখনো তার শয়নঘর ছেড়ে নামেনি।
অন্নদাবাবু সময়মতো এসে টেবিল দখল করে বসলেন। রমেশ ক্ষণে ক্ষণে চমকে দরজার দিকে তাকাতে লাগল।
পায়ের শব্দ হল, কিন্তু ঘরে ঢুকল অক্ষয়। যথেষ্ট হৃদ্যতা দেখিয়ে বলল, “এই-যে রমেশবাবু, আমি আপনার বাসাতেই গিয়েছিলাম।”
শুনেই রমেশের মুখে উদ্বেগের ছায়া পড়ল।
অক্ষয় হেসে বলল, “ভয় কিসের রমেশবাবু? আপনাকে আক্রমণ করতে যাইনি। শুভসংবাদে অভিনন্দন জানানো বন্ধুবান্ধবের কর্তব্য– তাই পালন করতে গিয়েছিলাম।”
এই কথায় অন্নদাবাবুর মনে পড়ল হেমনলিনী উপস্থিত নেই। হেমনলিনীকে ডাক দিলেন– উত্তর না পেয়ে তিনি নিজে উপরে গিয়ে বললেন, “হেম, এ কী, এখনো সেলাই নিয়ে বসে আছ! চা তৈরি যে। রমেশ-অক্ষয় এসেছে।”
হেমনলিনী মুখ একটু লাল করে বলল, “বাবা, আমার চা উপরে পাঠিয়ে দাও, আজ আমি সেলাইটা শেষ করতে চাই।”
অন্নদা: “ওই তোমার দোষ হেম! যখন যেটা নিয়ে পড়, তখন আর-কিছুই খেয়াল কর না। যখন পড়া নিয়ে ছিলে তখন বই কোল থেকে নামত না– এখন সেলাই নিয়ে পড়েছ, এখন আর-সবই বন্ধ। না না, সেটা হবে না– চলো, নিচে গিয়ে চা খাবে চলো।”
এই বলে অন্নদাবাবু জোর করেই হেমনলিনীকে নিচে নিয়ে এলেন। সে এসেই কারো দিকে দৃষ্টি না করে তাড়াতাড়ি চা ঢালার ব্যাপারে খুব ব্যস্ত হয়ে উঠল।
অন্নদাবাবু অধীর হয়ে বললেন, “হেম, ও কী করছ? আমার পেয়ালায় চিনি দিচ্ছ কেন? আমি তো কোনোদিনই চিনি দিয়ে চা খাই না।”
অক্ষয় টিপটিপ হেসে বলল, “আজ উনি উদারতা সংবরণ করতে পারছেন না– আজ সবাইকে মিষ্টি বিতরণ করবেন।”
হেমনলিনীর প্রতি এই প্রচ্ছন্ন বিদ্রূপ রমেশের মনে মনে অসহ্য হল। সে তৎক্ষণাৎ স্থির করল, আর যাই হোক, বিয়ের পরে অক্ষয়ের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা হবে না।
অক্ষয় বলল, “রমেশবাবু, আপনার নামটা বদলে ফেলুন।”
রমেশ এই রসিকতার চেষ্টায় আরও বিরক্ত হয়ে বলল, “কেন বলুন তো।”
অক্ষয় খবরের কাগজ খুলে বলল, “এই দেখুন, আপনার নামের একজন ছাত্র অন্য লোককে নিজের নামে চালিয়ে পরীক্ষা দিয়ে পাস হয়েছিল– হঠাৎ ধরা পড়েছে।”
হেমনলিনী জানে, রমেশ মুখের উপর উত্তর দিতে পারে না– সেইজন্য এতকাল অক্ষয় রমেশকে যে আঘাত করেছে তার প্রতিঘাত দিয়ে এসেছে। আজও থাকতে পারল না। লুকানো রাগের লক্ষণ চেপে একটু হেসে বলল, “অক্ষয় বলে ঢের লোক বোধ হয় জেলখানায় আছে।”
অক্ষয় বলল, “ওই দেখুন, বন্ধুভাবে ভালো পরামর্শ দিতে গেলে আপনারা রাগ করেন। তবে সমস্ত ইতিহাসটা বলি। আপনি তো জানেন, আমার ছোটো বোন শরৎ বালিকা-বিদ্যালয়ে পড়তে যায়। সে কাল সন্ধ্যার সময় এসে বলল, ‘দাদা, তোমাদের রমেশবাবুর স্ত্রী আমাদের ইস্কুলে পড়েন।’ আমি বললাম, ‘দূর পাগলি! আমাদের রমেশবাবু ছাড়া কি আর দ্বিতীয় রমেশবাবু জগতে নেই?’ শরৎ বলল, ‘তা যেই হোন, তিনি তাঁর স্ত্রীর উপর ভয়ানক অন্যায় করছেন। ছুটিতে প্রায় সব মেয়েই বাড়ি যাচ্ছে, তিনি তাঁর স্ত্রীকে বোর্ডিঙে রাখার বন্দোবস্ত করেছেন। সে বেচারা কাঁদতে কাটতে নানাভাবে জেদ করছে।’ আমি তখনি মনে মনে বললাম, এ তো ভালো কথা নয়, শরৎ যেমন ভুল করেছিল, এমন ভুল আরও তো কেউ কেউ করতে পারে!”
অন্নদাবাবু হেসে উঠে বললেন, “অক্ষয়, তুমি কী পাগলের মতো কথা বলছ! কোন্ রমেশের স্ত্রী ইস্কুলে পড়ে কাঁদছে বলে আমাদের রমেশ নাম বদলাবে নাকি?”
এমন সময়ে হঠাৎ ফ্যাকাশে মুখে রমেশ ঘর থেকে উঠে চলে গেল। অক্ষয় বলে উঠল, “ও কী রমেশবাবু, আপনি রাগ করে চলে গেলেন নাকি? দেখুন দেখি, আপনি কি মনে করেন আপনাকে আমি সন্দেহ করছি?” বলে রমেশের পিছন পিছন বাইরে চলে গেল।
অন্নদাবাবু বললেন, “এ কী কাণ্ড!”
হেমনলিনী কেঁদে ফেলল। অন্নদাবাবু ব্যস্ত হয়ে বললেন, “ও কী হেম, কাঁদিস কেন?”
সে ফেটে পড়া কান্নার মধ্যে আটকা গলায় বলল, “বাবা, অক্ষয়বাবুর ভয়ানক অন্যায়। কেন উনি আমাদের বাড়িতে ভদ্রলোককে এমন করে অপমান করেন?”
অন্নদাবাবু বললেন, “অক্ষয় ঠাট্টা করে একটা কী বলেছে, এত অস্থির হবার কী দরকার ছিল?”
“এ-রকম ঠাট্টা অসহ্য।” বলে দ্রুত পায়ে হেমনলিনী উপরে চলে গেল।
এইবার কলকাতায় আসার পর রমেশ বিশেষ যত্নের সাথে কমলার স্বামীর খোঁজ করছিল। অনেক কষ্টে ধোবাপুকুরটা কোন জায়গায়, তা বের করে কমলার মামা তারিণীচরণকে এক চিঠি লিখেছিল।
উক্ত ঘটনার পরদিন সকালে রমেশ সেই চিঠির জবাব পেল। তারিণীচরণ লিখছেন, দুর্ঘটনার পরে তাঁর জামাতা শ্রীমান নলিনাক্ষের কোনো সংবাদই পাওয়া যায়নি। রংপুরে তিনি ডাক্তারি করতেন– সেখানে চিঠি লিখে তারিণীচরণ জেনেছেন, সেখানেও কেউ আজ পর্যন্ত তাঁর কোনো খবর পায়নি। তাঁর জন্মস্থান কোথায়, তা তারিণীচরণের জানা নেই।
কমলার স্বামী নলিনাক্ষ যে বেঁচে আছেন, এ আশা আজ রমেশের মন থেকে একেবারে দূর হল।
সকালে রমেশের হাতে আরও অনেকগুলো চিঠি এসে পড়ল। বিয়ের সংবাদ পেয়ে তার আলাপী পরিচিত অনেকে তাকে অভিনন্দন-পত্র লিখেছে। কেউ বা আহারের দাবি জানিয়েছে, কেউ বা এত দিন সমস্ত ব্যাপারটা সে গোপন রেখেছে বলে রমেশকে হাসি-তামাশা করে তিরস্কার করেছে।
এমন সময়ে অন্নদাবাবুর বাড়ি থেকে চাকর একখানা চিঠি নিয়ে রমেশের হাতে দিল। হাতের লেখা দেখে রমেশের বুকের ভিতরটা দুলে উঠল।
হেমনলিনীর চিঠি। রমেশ মনে করল, অক্ষয়ের কথা শুনে হেমনলিনীর মনে সন্দেহ জন্মেছে এবং তাই দূর করার জন্য সে রমেশকে পত্র লিখেছে।
চিঠি খুলে দেখল, তাতে কেবল এই ক’টি কথা লেখা আছে–
“অক্ষয়বাবু কাল আপনার উপর ভারি অন্যায় করেছেন। মনে করেছিলাম আজ সকালেই আপনি আসবেন, কেন আসলেন না? অক্ষয়বাবুর কথা কেন আপনি এত করে মনে নিচ্ছেন? আপনি তো জানেন, আমি তাঁর কথা গ্রাহ্যই করি না। আপনি আজ সকাল-সকাল আসবেন– আমি আজ সেলাই ফেলে রাখব।”
এই ক’টি কথার মধ্যে হেমনলিনীর সান্ত্বনা-সুধাপূর্ণ কোমল হৃদয়ের ব্যথা অনুভব করে রমেশের চোখে জল এল। রমেশ বুঝল, কাল থেকেই হেমনলিনী রমেশের বেদনা শান্ত করার জন্য ব্যাকুল হৃদয়ে অপেক্ষা করে আছে। এমনি করে রাত গেছে, এমনি করে সকালটা কেটেছে, শেষে আর থাকতে না পেরে এই চিঠিখানা লিখেছে।
রমেশ কাল থেকে ভাবছে, আর দেরি না করে এইবার হেমনলিনীকে সব কথা খুলে বলা দরকার হয়েছে। কিন্তু গতকালের ব্যাপারের পর বলা কঠিন হয়ে উঠেছে। এখন ঠিক শোনাবে যেন অপরাধ ধরা পড়ে জবাবদিহির চেষ্টা হচ্ছে। শুধু তা নয়, অক্ষয়ের যে কিছুটা জয় হবে, সেও অসহ্য।
রমেশ ভাবতে লাগল, কমলার স্বামী যে আর কোনো রমেশ নিশ্চয়ই অক্ষয়ের মনে সেই ধারণাই আছে– নয়লে সে এতক্ষণে শুধু ইঙ্গিত করে থেমে থাকত না, পাড়াসুদ্ধ গোল করে বেড়াত। অতএব এই বেলা যাই-হোক একটা উপায় অবলম্বন করা দরকার।
এমন সময় আর একটা ডাকের চিঠি এল। রমেশ খুলে দেখল, সে চিঠি মেয়েদের বিদ্যালয়ের কর্ত্রীর কাছ থেকে এসেছে। তিনি লিখেছেন, কমলা অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়েছে, তাকে এ অবস্থায় ছুটির সময় বিদ্যালয়ের বোর্ডিঙে রাখা তিনি সংগত মনে করেন না। আগামী শনিবারে স্কুল থেকে ছুটি হবে, সেই সময়ে তাকে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা একেবারে জরুরি।
আগামী শনিবারে কমলাকে বিদ্যালয় থেকে নিয়ে আসতে হবে! আগামী রবিবারে রমেশের বিয়ে!
“রমেশবাবু, আমাকে মাফ করতে হবে” এই বলে অক্ষয় ঘরের মধ্যে ঢুকল। বলল, “এমন একটা সামান্য ঠাট্টায় আপনি যে এত রাগ করবেন, তা আগে জানলে আমি ও কথা তুলতাম না। ঠাট্টার মধ্যে কিছু সত্য থাকলেই লোকে চটে ওঠে, কিন্তু যা একেবারেই অমূলক তা নিয়ে আপনি সবার সামনে এত রাগারাগি করলেন কেন? অন্নদাবাবু তো কাল থেকেই আমাকে ভর্ৎসনা করছেন– হেমনলিনী আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করেছেন। আজ সকালে তাঁদের ওখানে গিয়েছিলাম, তিনি ঘর ছেড়ে চলে গেলেন। আমি এমন কী অপরাধ করেছিলাম বলুন দেখি।”
রমেশ বলল, “এ-সব বিচার যথাসময়ে হবে। এখন আমাকে মাফ করবেন– আমার বিশেষ একটা প্রয়োজন আছে।”
অক্ষয়: “রোশনচৌকির বায়না দিতে যাচ্ছেন বুঝি? এ দিকে সময় কম। আমি আপনার শুভকর্মে বাধা দেব না, চললাম।”
অক্ষয় চলে গেলে রমেশ অন্নদাবাবুর বাসায় গিয়ে হাজির হল। ঘরে ঢুকতেই হেমনলিনীর সঙ্গে তার দেখা হল। আজ রমেশ সকাল-সকাল আসবে, এটা হেমনলিনী নিশ্চয় ঠিক করে প্রস্তুত হয়ে বসে ছিল। তার সেলাইয়ের জিনিসটা ভাঁজ করে রুমালে বেঁধে টেবিলের উপরে রেখে দিয়েছিল। পাশে হারমোনিয়ম-যন্ত্রটি ছিল। আজ খানিকটা সংগীত-আলোচনা হতে পারবে এইরকম তার আশা ছিল, তা ছাড়া অব্যক্ত সংগীত তো আছেই।
রমেশ ঘরে ঢুকতেই হেমনলিনীর মুখে একটি উজ্জ্বল-কোমল আভা পড়ল। কিন্তু সে আভা মুহূর্তেই ম্লান হয়ে গেল যখন রমেশ আর কোনো কথা না বলে প্রথমেই জিজ্ঞেস করল, “অন্নদাবাবু কোথায়?”
হেমনলিনী উত্তর করল, “বাবা তাঁর বসবার ঘরে আছেন। কেন? তাঁকে কি এখনই দরকার আছে? তিনি তো সেই চা খাবার সময় নেমে আসবেন।”
রমেশ: “না, আমার বিশেষ প্রয়োজন আছে। আর দেরি করা উচিত হবে না।”
হেমনলিনী: “তবে যান, তিনি ঘরেই আছেন।”
রমেশ চলে গেল। প্রয়োজন আছে! সংসারে প্রয়োজনেরই কেবল সবুর সয় না! আর ভালোবাসাকেই দরজার বাইরে সুযোগের জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকতে হয়।
শরতের এই নির্মল দিন যেন নিঃশ্বাস ফেলে নিজের আনন্দ-ভাণ্ডারের সোনার সিংহদ্বারটি বন্ধ করে দিল। হেমনলিনী হারমোনিয়মের কাছ থেকে চৌকি সরিয়ে নিয়ে টেবিলের কাছে বসে একমনে সেলাই করতে শুরু করল। সুঁচ ফুটতে লাগল শুধু বাইরে নয়, ভিতরেও। রমেশের প্রয়োজনও শিগগির শেষ হল না। প্রয়োজন রাজার মতো নিজের পুরো সময় নেয়– আর ভালোবাসা ভিখারি!
রমেশ অন্নদাবাবুর ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল। তখন অন্নদাবাবু মুখের উপরে খবরের কাগজ চাপা দিয়ে কেদারায় শুয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। রমেশ ঘরে ঢুকে কাশতেই তিনি চমকে উঠে খবরের কাগজটা তুলে ধরে বললেন, “দেখেছ রমেশ, এবার ওলাউঠায় কত লোক মরেছে?”
রমেশ বলল, “বিয়ে এখন কিছুদিন স্থগিত রাখতে হবে– আমার বিশেষ কাজ আছে।”
অন্নদাবাবুর মাথা থেকে শহরের মৃত্যুতালিকার বিবরণ একেবারে মিলিয়ে গেল। ক্ষণকাল রমেশের মুখের দিকে তাকিয়ে বললেন, “সে কী কথা রমেশ! নিমন্ত্রণ তো হয়ে গেছে।”
রমেশ বলল, “এই রবিবারের পরের রবিবারে দিন পিছিয়ে দিয়ে আজই চিঠি বিলি করে দেওয়া যেতে পারে।”
অন্নদা: “রমেশ, তুমি আমাকে অবাক করলে। এ কি মামলা যে, তোমার সুবিধামত তুমি দিন পিছিয়ে মুলতুবি করতে থাকবে? তোমার প্রয়োজনটা কী, শুনি।”
রমেশ: “সে অত্যন্ত বিশেষ প্রয়োজন, দেরি করলে চলবে না।”
অন্নদাবাবু ঝড়ে নুয়ে পড়া কলাগাছের মতো কেদারার উপর হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লেন– বললেন, “দেরি করলে চলবে না! ভালো কথা, খুব ভালো কথা! এখন তোমার যাই ইচ্ছে হয় করো। নিমন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা তোমার বুদ্ধিতে যাই আসে, তাই হোক। লোক যখন আমাকে জিজ্ঞেস করবে আমি বলব, ‘আমি ও-সব কিছুই জানি না– উনার কী দরকার সে তিনিই জানেন, আর কবে উনার সুবিধা হবে সে তিনিই বলতে পারেন।'”
রমেশ উত্তর না করে নতমুখে বসে রইল। অন্নদাবাবু বললেন, “হেমনলিনীকে সব কথা বলা হয়েছে?”
রমেশ: “না, তিনি এখনো জানেন না।”
অন্নদা: “তাঁর তো জানা দরকার। তোমার তো একার বিয়ে নয়।”
রমেশ: “আপনাকে আগে জানিয়ে তাঁকে জানাব স্থির করেছি।”
অন্নদাবাবু ডেকে উঠলেন, “হেম! হেম!”
হেমনলিনী ঘরের মধ্যে ঢুকে বলল, “কী বাবা?”
অন্নদা: “রমেশ বলছেন, উনার কী-একটা বিশেষ কাজ পড়েছে, এখন উনার বিয়ে করার সময় হবে না।”
হেমনলিনী একবার ফ্যাকাশে মুখে রমেশের মুখের দিকে তাকাল। রমেশ অপরাধীর মতো চুপ করে বসে রইল।
হেমনলিনীর কাছে এ খবরটা যে এমন করে দেওয়া হবে, রমেশ তা আশা করে নি। অপ্রিয় সংবাদ হঠাৎ এইরকম একেবারে রূঢ়ভাবে হেমনলিনীকে যে কীভাবে গভীরভাবে আঘাত করল, রমেশ তা নিজের ব্যথিত অন্তরের মধ্যেই সম্পূর্ণ অনুভব করতে পারল। কিন্তু যে তীর একবার ছোড়া হয়, তা আর ফেরে না– রমেশ যেন স্পষ্ট দেখতে পেল এই নির্দয় তীর হেমনলিনীর হৃদয়ের ঠিক মাঝখানে গিয়ে বিঁধে রইল।
এখন কথাটা আর কোনোমতে নরম করে নেওয়ার উপায় নেই। সবই সত্য– বিয়ে এখন স্থগিত রাখতে হবে, রমেশের বিশেষ প্রয়োজন আছে, কী প্রয়োজন তা-ও সে বলতে চায় না। এর উপরে এখন আর নতুন ব্যাখ্যা কী হতে পারে?
অন্নদাবাবু হেমনলিনীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “তোমাদেরই কাজ, এখন তোমরাই এর যা হয় একটা মীমাংসা করে নাও।”
হেমনলিনী মুখ নিচু করে বলল, “বাবা, আমি এর কিছুই জানি না।” এই বলে, ঝড়ের মেঘের মুখে সূর্যাস্তের ম্লান আভাটুকু যেমন মিলিয়ে যায় তেমনি করে সে চলে গেল।
অন্নদাবাবু খবরের কাগজ মুখের উপর তুলে পড়ার ভান করে ভাবতে লাগলেন। রমেশ নিঃশব্দে বসে রইল।
হঠাৎ রমেশ একসময় চমকে উঠে চলে গেল। বসবার বড়ো ঘরে গিয়ে দেখল হেমনলিনী জানালার কাছে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার দৃষ্টির সামনে আসন্ন পূজার ছুটির কলকাতা জোয়ারের নদীর মতো তার সমস্ত রাস্তা ও গলির মধ্যে ফুলে উঠা জনপ্রবাহে অস্থির-কোলাহলময় হয়ে উঠেছে।
রমেশ একেবারে তার পাশে যেতে সংকোচ বোধ করল। পেছন থেকে কিছুক্ষণের জন্য স্থির দৃষ্টিতে তাকে দেখতে লাগল। শরতের বিকেলের আলোয় জানালার পাশের এই স্তব্ধ মূর্তিটি রমেশের মনের মধ্যে একটি চিরস্থায়ী ছবি আঁকে দিল। ঐ কোমল গালের একটি অংশ, ঐ সযত্নবাঁধা চুলের ভঙ্গি, ঐ ঘাড়ের উপরে কোমল ও পাতলা চুলগুলো, তারই নিচে সোনার হারের একটুখানি আভাস, বাম কাঁধ থেকে ঝুলে থাকা শাড়ির আঁকাবাঁকা প্রান্ত, সমস্তই রেখায় রেখায় তার পীড়িত চিত্তের মধ্যে যেন কেটে কেটে বসে গেল।
রমেশ আস্তে আস্তে হেমনলিনীর কাছে এসে দাঁড়াল। হেমনলিনী রমেশের চেয়ে রাস্তার লোকদের জন্য যেন বেশি কৌতূহল বোধ করতে লাগল। রমেশ আটকে আসা গলায় বলল, “আপনার কাছে আমার একটি প্রার্থনা আছে।”
রমেশের গলার স্বরে উথলে ওঠা বেদনার আঘাত অনুভব করে মুহূর্তের মধ্যে হেমনলিনীর মুখ ফিরে এল। রমেশ বলে উঠল, “তুমি আমাকে অবিশ্বাস করো না।”– রমেশ এই প্রথম হেমনলিনীকে “তুমি” বলল।– “এই কথা আমাকে বলো যে, তুমি আমাকে কখনো অবিশ্বাস করবে না। আমিও অন্তর্যামীকে অন্তরে সাক্ষী রেখে বলছি তোমার কাছে আমি কখনো অবিশ্বাসী হব না।”
রমেশের আর কথা বেরোল না, তার চোখের কোণে জল দেখা দিল। তখন হেমনলিনী তার কোমল-করুণ দুচোখ তুলে রমেশের মুখের দিকে স্থির করে রাখল। তার পরে হঠাৎ গলে পড়া অশ্রুধারা হেমনলিনীর দুগাল বেয়ে ঝরে পড়তে লাগল। দেখতে দেখতে সেই নির্জন জানালার নিচে দুজনের মধ্যে একটি বাক্যহীন শান্তি ও সান্ত্বনার স্বর্গরাজ্য সৃষ্টি হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ এই অশ্রুজলপ্লাবিত গভীর নীরবতার মধ্যে হৃদয়-মন নিমজ্জিত রেখে একটি আরামের দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রমেশ বলল, “কেন আমি এখন সপ্তাহের জন্য বিয়ে স্থগিত রাখার প্রস্তাব করেছি, তার কারণ কি তুমি জানতে চাও?”
হেমনলিনী নীরবে মাথা নাড়ল– সে জানতে চায় না।
রমেশ বলল, “বিয়ের পরে আমি তোমাকে সব কথা খুলে বলব।”
এই কথায় হেমনলিনীর গালের পাশটা একটু লাল হয়ে উঠল।
আজ খাওয়ার পর হেমনলিনী যখন রমেশের সাথে মিলনের প্রত্যাশায় উৎসুকচিত্তে সাজ করছিল, তখন সে অনেক হাসি-তামাশা, অনেক নির্জন পরামর্শ, অনেক ছোটোখাটো সুখের ছবি কল্পনায় তৈরি করে নিচ্ছিল। কিন্তু এই যে অল্প কয় মুহূর্তে দুহৃদয়ের মধ্যে বিশ্বাসের বিনিময় হয়ে গেল– এই যে চোখের জল ঝরে পড়ল, কথাবার্তা কিছুই হল না, কিছুক্ষণের জন্য দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইল– এর নিবিড় আনন্দ, এর গভীর শান্তি, এর পরম আশ্বাস সে কল্পনাও করতে পারেনি।
হেমনলিনী বলল, “তুমি একবার বাবার কাছে যাও, তিনি বিরক্ত হয়ে আছেন।”
রমেশ প্রফুল্লচিত্তে সংসারের ছোটো-বড়ো আঘাত-সংঘাত বুক পাতিয়ে নেওয়ার জন্য চলে গেল।