অন্নদাবাবু রমেশকে আবার ঘরে ঢুকতে দেখে উদ্বিগ্নভাবে তার মুখের দিকে তাকালেন।
রমেশ বলল, “নিমন্ত্রণের তালিকাটা যদি আমার হাতে দেন, তবে দিন-বদলের চিঠিগুলো আজই রওনা করে দিতে পারি।”
অন্নদাবাবু বললেন, “তবে দিন-বদলই স্থির রইল?”
রমেশ বলল, “হাঁ, অন্য উপায় আর কিছুই দেখি না।”
অন্নদাবাবু বললেন, “দেখো বাপু, তবে আমি এর মধ্যে নেই। যা-কিছু বন্দোবস্ত করবার, সে তুমিই করো। আমি লোক হাসাতে পারব না। বিয়ে-ব্যাপারটাকে যদি নিজের মর্জি অনুসারে খেলাধুলা করে তোল, তবে আমার মতো বয়সের লোকের এর মধ্যে না থাকাই ভালো। এই নাও তোমার নিমন্ত্রণের তালিকা। ইতিমধ্যে আমি কিছু টাকা খরচ করে ফেলেছি, তার অনেকটাই নষ্ট হবে। এমন করে বার বার টাকা জলে ফেলে দিতে পারি এমন সঙ্গতি আমার নেই।”
রমেশ সমস্ত খরচ ও ব্যবস্থার ভার নিজের কাঁধে নিতেই প্রস্তুত হল। সে উঠবার উপক্রম করছে, এমন সময় অন্নদাবাবু বললেন, “রমেশ, বিয়ের পরে তুমি কোথায় প্র্যাকটিস করবে, কিছু স্থির করেছ? কলকাতায় নয়?”
রমেশ বলল, “না। পশ্চিমে একটা ভালো জায়গার খোঁজ করছি।”
অন্নদা: “সেই ভালো, পশ্চিমই ভালো। এটাওয়া তো খারাপ জায়গা নয়। সেখানকার জল হজমের জন্য খুব ভালো– আমি সেখানে মাসখানেক ছিলাম– সেই এক মাসে আমার খাওয়ার পরিমাণ দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছিল। দেখো বাপু, সংসারে আমার ঐ একটিমাত্র মেয়ে– আমি সর্বদা তার কাছাকাছি না থাকলে সেও সুখী হবে না, আমিও নিশ্চিন্ত হতে পারব না। তাই আমার ইচ্ছা– তোমাকে একটা স্বাস্থ্যকর জায়গা বেছে নিতে হবে।”
অন্নদাবাবু রমেশের একটা অপরাধের সুযোগ পেয়ে সেই সুযোগে নিজের বড়ো বড়ো দাবিগুলো উপস্থিত করতে শুরু করলেন। সে সময় রমেশকে তিনি যদি এটাওয়া না বলে গারো বা চেরাপুঞ্জির কথা বলতেন, তবে তৎক্ষণাৎ সে রাজি হত। সে বলল, “যে আদেশ, আমি এটাওয়াতেই প্র্যাকটিস করব।” এই বলে রমেশ নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের কাজের ভার নিয়ে চলে গেল।
অল্পক্ষণ পরে অক্ষয় ঘরে ঢুকতেই অন্নদাবাবু বললেন, “রমেশ তার বিয়ের দিন এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিয়েছে।”
অক্ষয়: “না না, আপনি বলেন কী! সে কি কখনো হতে পারে? পরশু যে বিয়ে।”
অন্নদা: “হতে তো না পারাই উচিত ছিল– সাধারণ লোকের তো এমন হয় না। কিন্তু আজকাল তোমাদের যে রকম কাণ্ড দেখছি, সবই সম্ভব।”
অক্ষয় অত্যন্ত মুখ গম্ভীর করে ভান সহকারে চিন্তা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে বলল, “আপনারা যাকে একবার ভালো পাত্র বলে ঠাওরেছেন, তাঁর সম্পর্কে দুটি চোখ বুজে থাকেন। মেয়েটিকে যার হাতে চিরদিনের জন্য সমর্পণ করতে যাচ্ছেন, ভালো করে তাঁর সম্পর্কে খোঁজখবর রাখা উচিত। হোক-না কেন সে স্বর্গের দেবতা, তবু সাবধানের বিনাশ নেই।”
অন্নদা: “রমেশের মতো ছেলেকেও যদি সন্দেহ করে চলতে হয়, তবে তো সংসারে কারো সঙ্গে কোনো সম্পর্ক রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।”
অক্ষয়: “আচ্ছা, এই-যে দিন পিছিয়ে দিচ্ছেন, রমেশবাবু তার কারণ কিছু বলেছেন?”
অন্নদাবাবু মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, “না, কারণ তো কিছুই বলল না– জিজ্ঞেস করলে বলে বিশেষ দরকার আছে।”
অক্ষয় মুখ ফিরিয়ে একটু হাসল মাত্র। তার পরে বলল, “বোধ হয় আপনার মেয়ের কাছে রমেশবাবু একটা কারণ নিশ্চয় কিছু বলেছেন।”
অন্নদা: “সম্ভব বটে।”
অক্ষয়: “তাকে একবার ডেকে জিজ্ঞেস করে দেখলে ভালো হয় না?”
“ঠিক বলেছ” বলে অন্নদাবাবু জোরে হেমনলিনীকে ডাক দিলেন। হেমনলিনী ঘরে ঢুকে অক্ষয়কে দেখে তার বাবার পাশে এমন করে দাঁড়াল যাতে অক্ষয় তার মুখ না দেখতে পায়।
অন্নদাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “বিয়ের দিন যে হঠাৎ পিছিয়ে গেল, রমেশ তার কারণ তোমাকে কিছু বলেছে?”
হেমনলিনী ঘাড় নেড়ে বলল, “না।”
অন্নদা: “তুমি তাকে কারণ জিজ্ঞাসা করনি?”
হেমনলিনী: “না।”
অন্নদা: “আশ্চর্য ব্যাপার। যেমন রমেশ, তুমিও দেখি তেমনি। তিনি এসে বললেন, ‘আমার বিয়েতে সময় হচ্ছে না’– তুমিও বললে, ‘বেশ, ভালো, আরেক দিন হবে!’ ব্যস্, আর কোনো কথাবার্তা নেই!”
অক্ষয় হেমনলিনীর পক্ষ নিয়ে বলল, “একজন লোক যখন স্পষ্টই কারণ গোপন করছে তখন সে কথা নিয়ে তাকে কি কোনো প্রশ্ন করা ভালো দেখায়? যদি বলার মতো কিছু হত, তবে তো রমেশবাবু নিজেই বলতেন।”
হেমনলিনীর মুখ লাল হয়ে উঠল। সে বলল, “এই বিষয় নিয়ে আমি বাইরের লোকের কাছে কোনো কথাই শুনতে চাই না। যা ঘটেছে তাতে আমার মনে কোনো ক্ষোভ নেই।”
এই বলে হেমনলিনী দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অক্ষয় ফ্যাকাশে মুখে হাসি টেনে এনে বলল, “সংসারে বন্ধুর কাজটাতেই সব চেয়ে অপমান বেশি। সেইজন্যই আমি বন্ধুত্বের গৌরব বেশি অনুভব করি। আপনারা আমাকে ঘৃণা করুন আর গালি দিন, রমেশকে সন্দেহ করাই আমি বন্ধুর কর্তব্য বলে মনে করি। আপনাদের যেখানে কোনো বিপদের সম্ভাবনা দেখি সেখানে আমি নিশ্চিন্ত থাকতে পারি না– আমার এই একটা বড় দুর্বলতা আছে, এ কথা আমাকে স্বীকার করতেই হবে। যাই হোক, যোগেন তো কালই আসছে, সেও যদি সব দেখে-শুনে নিজের বোনের সম্পর্কে নিশ্চিন্ত থাকে তবে এ বিষয়ে আমি আর কোনো কথা বলব না।”
রমেশের ব্যবহার সম্পর্কে প্রশ্ন করার সময় এসেছে, অন্নদাবাবু এ কথা একেবারে বোঝেন না তা নয়– কিন্তু যা অগোচরে আছে তাকে জোর করে নাড়াচাড়া করে তার মধ্য থেকে হঠাৎ একটা ঝড় আবিষ্কারের সম্ভাবনায়, তিনি স্বভাবত তাতে একটুও আগ্রহ বোধ করেন না।
অক্ষয়ের উপর তার রাগ হল। তিনি বললেন, “অক্ষয়, তোমার স্বভাবটা বড় সন্দেহপ্রবণ। প্রমাণ না পেয়ে কেন তুমি–”
অক্ষয় নিজেকে দমন করতে জানে, কিন্তু ক্রমাগত আঘাতে আজ তার ধৈর্য ভেঙে গেল। সে উত্তেজিত হয়ে বলল, “দেখুন অন্নদাবাবু, আমার অনেক দোষ আছে। আমি ভালো পাত্রের প্রতি ঈর্ষা করি, আমি সাধু লোককে সন্দেহ করি। ভদ্রলোকের মেয়েদের ফিলজফি পড়ানোর মতো বিদ্যা আমার নেই এবং তাদের সঙ্গে কাব্য আলোচনা করার সাহসও আমি রাখি না– আমি সাধারণ দশ জনের মধ্যেই গণ্য– কিন্তু চিরদিন আমি আপনাদের প্রতি অনুরক্ত, আপনাদের অনুগত। রমেশবাবুর সঙ্গে আর-কোনো বিষয়ে আমার তুলনা হতে পারে না– কিন্তু এইটুকুমাত্র অহংকার আমার আছে, আপনাদের কাছে কোনোদিন আমার কিছু লুকানোর নেই। আপনাদের কাছে আমার সমস্ত দৈন্য প্রকাশ করে আমি ভিক্ষা চাইতে পারি, কিন্তু তালা ভেঙে চুরি করা আমার স্বভাব নয়। এ কথার কী অর্থ, তা কালই আপনারা বুঝতে পারবেন।”
চিঠি বিলি করে দিতে রাত হয়ে গেল। রমেশ শুতে গেল, কিন্তু ঘুম হল না। তার মনের ভিতরে গঙ্গা-যমুনার মতো সাদা-কালো দুই রঙের চিন্তাধারা প্রবাহিত হচ্ছিল। দুটোর কলরব একসাথে মিশে তার বিশ্রামের সময়টাকে কোলাহলময় করে তুলছিল।
বার কয়েক পাশ ফিরে সে উঠে পড়ল। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে দেখল তাদের জনশূন্য গলির এক পাশে বাড়িগুলির ছায়া, আর এক পাশে সাদা জ্যোৎস্নার রেখা।
রমেশ নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। যা চিরন্তন, যা শান্ত, যা বিশ্বব্যাপী, যার মধ্যে দ্বন্দ্ব নেই, দ্বিধা নেই, রমেশের সমস্ত অন্তঃপ্রকৃতি গলে তার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে গেল। যে শব্দহীন সীমাহীন মহালোকের আড়াল থেকে চিরকাল ধরে জন্ম আর মৃত্যু, কাজ আর বিশ্রাম, শুরু আর শেষ, কোন্ অশ্রুত সংগীতের অদ্ভুত তালে বিশ্বরঙ্গভূমির মধ্যে প্রবেশ করছে– রমেশ সেই আলো-অন্ধকারের অতীত দেশ থেকে নর-নারীর যুগল প্রেমকে এই নক্ষত্রদীপালোকিত বিশ্বের মধ্যে প্রকাশিত হতে দেখল।
রমেশ তখন ধীরে ধীরে ছাদের উপরে উঠল। অন্নদাবাবুর বাড়ির দিকে তাকাল। সব নিস্তব্ধ। বাড়ির দেয়ালের উপরে, কার্নিশের নীচে, জানলা-দরজার খাঁজের মধ্যে, চুন-বালি খসে যাওয়া ভিত্তির গায়ে জ্যোৎস্না আর ছায়া বিচিত্র আকারের রেখা ফেলেছে।
এ কী বিস্ময়! এই জনপূর্ণ শহরের মধ্যে ওই সাধারণ বাড়ির ভিতরে একটি মানবীর বেশে এ কী বিস্ময়! এই রাজধানীতে কত ছাত্র, কত উকিল, কত প্রবাসী ও স্থানীয় মানুষ আছে, তাদের মধ্যে রমেশের মতো একজন সাধারণ লোক কোথা থেকে একদিন আশ্বিনের হলদে রোদে ওই জানলার পাশে একটি বালিকার পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে জীবনকে ও জগৎকে এক অপরিসীম-আনন্দময় রহস্যের মাঝখানে ভাসমান দেখল– এ কী বিস্ময়! হৃদয়ের ভিতরে আজ এ কী বিস্ময়, হৃদয়ের বাইরে আজ এ কী বিস্ময়!
অনেক রাত পর্যন্ত রমেশ ছাদে ঘুরল। ধীরে ধীরে কখন একসময় খণ্ড-চাঁদ সামনের বাড়ির আড়ালে নেমে গেল। পৃথিবীতলে রাতের অন্ধকার ঘন হল– আকাশ তখনও বিদায়োন্মুখ আলোর আলিঙ্গনে ফ্যাকাশে।
রমেশের ক্লান্ত শরীর শীতে শিহরিয়ে উঠল। হঠাৎ একটা আশঙ্কা থেকে থেকে তার হৃদয়কে চেপে ধরতে লাগল। মনে পড়ে গেল জীবনের রণক্ষেত্রে কাল আবার সংগ্রাম করতে বের হতে হবে। ওই আকাশে যদিও চিন্তার রেখা নেই, জ্যোৎস্নার মধ্যে চেষ্টার চাঞ্চল্য নেই, রাত যদিও নিস্তব্ধ শান্ত, বিশ্বপ্রকৃতি ওই অগণ্য নক্ষত্রলোকের চিরকর্মের মধ্যে চিরবিশ্রামে বিলীন– তবু মানুষের আনাগোনা লড়াই-ঝগড়ার শেষ নেই, সুখে-দুঃখে বাধায়-বিঘ্নে সমস্ত জনসমাজ তরঙ্গিত। একদিকে অনন্তের ওই নিত্য শান্তি, আর একদিকে সংসারের এই নিত্য সংগ্রাম– দুটো একই সময়ে একসাথে কীভাবে থাকতে পারে, দুশ্চিন্তার মধ্যেও রমেশের মনে এই প্রশ্নের উদয় হল। কিছুক্ষণ আগে রমেশ বিশ্বলোকের অন্তঃপুরের মধ্যে প্রেমের যে একটি শাশ্বত সম্পূর্ণ শান্ত মূর্তি দেখেছিল, সেই প্রেমকেই ক্ষণকাল পরে সংসারের সংঘর্ষে, জীবনের জটিলতায়, পদে-পদে বিচলিত হতাশ দেখতে লাগল। এর মধ্যে কোনটা সত্য, কোনটা মায়া?
পরদিন সকালের ট্রেনে যোগেন পশ্চিম থেকে ফিরে এল। আজ শনিবার, কাল রবিবারে হেমনলিনীর বিয়ে হবে। কিন্তু যোগেন তাদের বাসার দরজার কাছে এসে উৎসবের ছাপ কিছুই পেল না। যোগেন ভেবেছিল এতক্ষণে তাদের বাসার বারান্দার উপরে দেবদারু পাতার মালা ঝোলানো শুরু হয়েছে– কাছে এসে দেখল, সাজসজ্জাহীন মলিনতায় পাশের বাড়ির সঙ্গে তাদের বাড়ির কোনো তফাত নেই।
ভয় হল পাছে কারো অসুখ-বিসুখ করে থাকে। বাড়িতে ঢুকে দেখল চায়ের টেবিলে তার জন্য খাবারদাবার তৈরি আছে এবং অন্নদাবাবু অর্ধেক খাওয়া চায়ের পেয়ালা সামনে রেখে খবরের কাগজ পড়ছেন।
যোগেন ঘরে ঢুকেই জিজ্ঞেস করল, “হেম কেমন আছে?”
অন্নদা: “ভালো।”
যোগেন: “বিয়ের কী হল?”
অন্নদা: “কাল রবিবারের পরের রবিবারে হবে।”
যোগেন: “কেন?”
অন্নদা: “কেন, তা তোমার বন্ধুকে জিজ্ঞেস করো। রমেশ আমাদের শুধু এটুকু জানিয়েছে যে, তার বিশেষ দরকার আছে, এ রবিবারে বিয়ে বন্ধ রাখতে হবে।”
যোগেন তার অক্ষম বাবার উপরে মনে মনে বিরক্ত হয়ে বলল, “বাবা, আমি না থাকলে তোমাদের নানা গোলমাল ঘটে। রমেশের আবার দরকার কী? সে স্বাধীন। তার আত্মীয় বলতে কেউ নেই বললেই হয়। যদি তার বৈষয়িক বিশেষ কোনো জটিলতা ঘটে থাকে, সে কথা খুলে বলার কোনো বাধা দেখি না। রমেশকে তুমি এত সহজে ছেড়ে দিলে কেন?”
অন্নদা: “আচ্ছা, বেশ তো, সে তো এখনো পালায়নি– তুমিই তাকে প্রশ্ন করে দেখো-না।”
যোগেন শুনে তৎক্ষণাৎ এক পেয়ালা গরম চা তাড়াতাড়ি শেষ করে বাইরে চলে গেল।
অন্নদাবাবু বললেন, “আহা যোগেন, এত তাড়াতাড়ি কিসের? তোমার তো খাওয়া হল না।”
সে কথা যোগেনের কানে পৌঁছল না। সে রমেশের বাসায় ঢুকে শব্দ সহকারে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল।– “রমেশ! রমেশ!”– রমেশের কোনো সাড়া নেই। ঘরে ঘরে খুঁজে দেখল– রমেশ শোবার ঘরে নেই, বসবার ঘরে নেই, ছাদে নেই, নিচতলায় নেই। অনেক ডাকাডাকির পরে চাকরটাকে খুঁজে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবু কোথায়?”
চাকর বলল, “বাবু তো ভোরে বাইরে চলে গেছেন।”
যোগেন: “কখন আসবেন?”
চাকর জানাল– বাবু তার কিছু কাপড়-চোপড় নিয়ে চলে গেছেন। বলে গেছেন ফিরে আসতে তার চার-পাঁচ দিন দেরি হতে পারে। কোথায় গেছেন তা চাকর জানে না।
যোগেন গম্ভীর হয়ে চায়ের টেবিলে ফিরে এল। অন্নদাবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “কী হল?”
যোগেন বিরক্ত হয়ে বলল, “হবে আর কী, যার সঙ্গে আজ-কাল মেয়ের বিয়ে দেবে তার কী কাজ পড়েছে, সে কখন কোথায় থাকে, তার খোঁজখবর তোমরা কিছুই রাখ না। অথচ তোমার বাড়ির পাশেই তার বাসা।”
অন্নদাবাবু বললেন, “কেন, কাল রাতেও তো রমেশ ওই বাসাতেই ছিল।”
যোগেন উত্তেজিত হয়ে বলল, “তোমরা জান না সে কোথায় যাবে, তার চাকর জানে না সে কোথায় গেছে, এ কেমন লুকোচুরি ব্যাপার চলছে? আমার কাছে এ তো কিছুই ভালো ঠেকছে না। বাবা, তুমি এমন নিশ্চিন্ত আছ কী করে?”
অন্নদাবাবু এই ভর্ৎসনায় হঠাৎ খুব চিন্তিত হওয়ার চেষ্টা করলেন। গম্ভীর মুখ করে বললেন, “তাই তো, এ-সব কী?”
কাণ্ডজ্ঞানহীন রমেশ সহজেই কাল রাতে অন্নদাবাবুর কাছে বিদায় নিয়ে যেতে পারত। কিন্তু সে কথা তার মনে উদয়ও হয়নি। ওই যে সে “বিশেষ দরকার আছে’ বলে রেখেছে, তার মধ্যেই তার সব কথা বলা হয়ে গেছে এই রকম রমেশের ধারণা। ওই এক কথাতেই আপাতত সব রকমের ছুটি পেয়েছে জানতে পেরে সে তার জরুরি কর্তব্যসাধনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘুরছে।
যোগেন: “হেমনলিনী কোথায়?”
অন্নদা: “সে আজ সকাল-সকাল চা খেয়ে উপরে গেছে।”
যোগেন বলল, “রমেশের এই-সমস্ত অদ্ভুত আচরণে বেচারা বোধ হয় খুব লজ্জিত হয়ে আছে– সেইজন্য সে আমার সঙ্গে দেখা হওয়ার ভয়ে পালিয়ে রয়েছে।”
সংকুচিত ও ব্যথিত হেমনলিনীকে আশ্বাস দেবার জন্য যোগেন উপরে গেল। হেমনলিনী তাদের বড়ো ঘরে চৌকির উপরে চুপ করে একা বসে ছিল। যোগেনের পায়ের শব্দ শুনেই সে তাড়াতাড়ি একটা বই টেনে নিয়ে পড়ার ভান করল। যোগেন ঘরে আসতেই বই রেখে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলল, “এই-যে দাদা, কখন এলে? তোমাকে তো তেমন বিশেষ ভালো দেখাচ্ছে না।”
যোগেন চৌকিতে বসে-পড়ে বলল, “ভালো দেখানোর তো কথা নয়। আমি সব কথা শুনেছি হেম! কিন্তু এ সম্পর্কে তুমি কোনো চিন্তা করো না। আমি ছিলাম না বলেই এইরকম গোলমাল ঘটতে পেরেছে। আমি সব ঠিক করে দেব। আচ্ছা হেম, রমেশ তোমাকে কোনো কারণ বলে নি?”
হেমনলিনী মুশকিলে পড়ল। রমেশ সম্পর্কে এই-সকল সন্দেহজনক আলোচনা তার পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠেছে। রমেশ তাকে বিয়ের দিন পিছিয়ে দেওয়ার কোনো কারণ বলে নি, এ কথা যোগেনকে বলতে তার ইচ্ছা নেই, অথচ মিথ্যা বলাও তার পক্ষে অসম্ভব। হেমনলিনী বলল, “তিনি আমাকে কারণ বলতে প্রস্তুত ছিলেন, আমি শোনা দরকার মনে করি নি।”
যোগেন মনে করল, এটা গুরুতর অভিমানের কথা এবং এরকম অভিমান সম্পূর্ণ স্বাভাবিক। বলল, “আচ্ছা, তুমি কিছুই ভয় করো না, ‘কারণ’ আমি আজই বের করে আনব।”
হেমনলিনী কোলের বইয়ের পাতা অপ্রয়োজনীয় উল্টাতে উল্টাতে বলল, “দাদা, আমি ভয় কিছুই করি না। ‘কারণ’ বের করার জন্য তুমি তাঁকে জিদ কর, এমন আমার ইচ্ছা নয়।”
যোগেন ভাবল, এটাও অভিমানের কথা। বলল, “আচ্ছা, সে তোমাকে কিছুই ভাবতে হবে না।” বলে তখনই চলে যেতে উদ্যত হল।
হেমনলিনী তখনই চৌকি ছেড়ে উঠে বলল, “না দাদা, এ কথা নিয়ে তুমি তাঁর সঙ্গে আলোচনা করতে যেতে পারবে না। তোমরা তাঁকে যাই মনে কর-না কেন, আমি তাঁকে একটুও সন্দেহ করি না।”
তখন যোগেনের হঠাৎ মনে হল, এ তো অভিমানের মতো শোনাচ্ছে না। তখন স্নেহমিশ্রিত করুণায় তার মনে মনে হাসি পেল। ভাবল, এদের সংসারের জ্ঞান কিছুই নেই; এদিকে পড়াশোনা এত করেছে, পৃথিবীর খোঁজখবরও অনেক রাখে, কিন্তু কোন্ জায়গায় সন্দেহ করতে হবে সেই অভিজ্ঞতাটুকুও এর হয়নি। এই নিঃসংশয় নির্ভরতার সাথে রমেশের ছলনাময় আচরণের তুলনা করে যোগেন মনে মনে রমেশের উপর আরও চটে উঠল। ‘কারণ’ বের করার প্রতিজ্ঞা তার মনে আরও দৃঢ় হল। যোগেন দ্বিতীয়বার চলে যাওয়ার উপক্রম করলে হেমনলিনী কাছে গিয়ে তার হাত ধরে বলল, “দাদা, তুমি প্রতিজ্ঞা করো যে, তাঁর কাছে এ-সব কথা একেবারে তোলবারই চেষ্টা করবে না।”
যোগেন বলল, “সে দেখা যাবে।”
হেমনলিনী: “না দাদা, দেখা যাবে না। আমার কাছে কথা দিয়ে যাও। আমি তোমাদের নিশ্চয় বলছি তোমাদের কোনো চিন্তার বিষয় নেই। একবার আমার এই একটি কথা রাখো।”
হেমনলিনীর এইরকম দৃঢ়তা দেখে যোগেন ভাবল তবে নিশ্চয় রমেশ হেমের কাছে সব কথা বলেছে, কিন্তু হেমকে যা-তা বলে ভোলানো তো শক্ত নয়। বলল, “দেখো হেম, অবিশ্বাসের কথা হচ্ছে না। কন্যাপক্ষের অভিভাবকদের যা কর্তব্য তা করতে হবে তো। তোমার সঙ্গে তার যদি কিছু বোঝাপড়া হয়ে থাকে সে তোমারই জান, কিন্তু সেই হলেই তো যথেষ্ট হল না– আমাদের সঙ্গেও তার বোঝাপড়া করবার আছে। সত্যি কথা বলতে কি হেম, এখন তোমার চেয়ে আমাদেরই সঙ্গেই তার বোঝাপড়ার সম্পর্ক বেশি– বিয়ে হয়ে গেলে তখন আমাদের বেশি কথা বলার থাকবে না।”
এই বলে যোগেন তাড়াতাড়ি চলে গেল। ভালোবাসা যে আড়াল, যে আবরণ খোঁজে, সে আর রইল না। হেমনলিনী ও রমেশের যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ হয়ে দুজনকে কেবল দুজনই করে দেবে, আজ তারই উপরে দশজনের সন্দেহের কঠিন স্পর্শ এসে বারবার আঘাত করছে। চারিদিকের এই-সকল তোলপাড়ের ধাক্কায় হেমনলিনী এমনই ব্যথিত হয়ে আছে যে, আত্মীয়-বন্ধুদের সাথে সাক্ষাৎমাত্রই তাকে সংকুচিত করে তুলছে। যোগেন চলে গেলে হেমনলিনী চৌকিতে চুপ করে বসে রইল।
যোগেন বাইরে যেতেই অক্ষয় এসে বলল, “এই-যে, যোগেন এসেছ। সব কথা শুনেছ তো? এখন তোমার কী মনে হচ্ছে?”
যোগেন: “মনে তো অনেক রকম হচ্ছে, সে-সমস্ত অনুমান নিয়ে মিথ্যা বাদানুবাদ করে কী হবে? এখন কি চায়ের টেবিলে বসে মনস্তত্ত্বের সূক্ষ্ম আলোচনার সময়?”
অক্ষয়: “তুমি তো জানই সূক্ষ্ম আলোচনাটা আমার স্বভাব নয়, তা মনস্তত্ত্বই বল, দর্শনই বল, আর কাব্যই বল। আমি কাজের কথাই বুঝি ভালো– তোমার সঙ্গে সেই কথাই বলতে এসেছি।”
অধীরস্বভাব যোগেন বলল, “আচ্ছা, কাজের কথা হবে। এখন বলতে পারো রমেশ কোথায় গেছে?”
অক্ষয় বলল, “পারি।”
যোগেন প্রশ্ন করল, “কোথায়?”
অক্ষয় বলল, “এখন সে আমি তোমাকে বলব না– আজ তিনটার সময় একেবারে তোমাকে রমেশের সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব।”
যোগেন বলল, “কাণ্ডখানা কী বলো দেখি। তোমরা সবাই যে মূর্তিমান ধাঁধা হয়ে উঠলে। আমি এই ক’দিন মাত্র বেড়াতে গেছি, সেই সুযোগে পৃথিবীটা এমন ভয়ানক রহস্যময় হয়ে উঠল! না না অক্ষয়, ওমন ঢাকাঢাকি করলে চলবে না।”
অক্ষয়: “শুনে খুশি হলাম। ঢাকাঢাকি করি নি বলে আমার পক্ষে একরকম চলা বন্ধ হয়ে গেছে– তোমার বোন তো আমার মুখ দেখা বন্ধ করেছেন, তোমার বাবা আমাকে সন্দিগ্ধপ্রকৃতি বলে গালি দেন, আর রমেশবাবুও আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে আনন্দে শিহরিত হয়ে উঠেন না। এখন কেবল তুমিই বাকি আছ। তোমাকে আমি ভয় করি– তুমি সূক্ষ্ম আলোচনার লোক নও, মোটা কাজটাই তোমার সহজে আসে– আমি দুর্বল মানুষ, তোমার ঘা আমার সহ্য হবে না।”
যোগেন: “দেখো অক্ষয়, তোমার ঐ-সকল প্যাঁচালো চাল আমার ভালো লাগে না। বেশ বুঝছি একটা কী খবর তোমার বলার আছে, সেটাকে আড়াল করে ওমন দর-বৃদ্ধি করার চেষ্টা করছ কেন? সরলভাবে বলে ফেলো, চুকিয়ে দাও।”
অক্ষয়: “আচ্ছা বেশ, তাহলে গোড়া থেকেই বলি– তুমি অনেক কথাই জান না।”
রমেশ দরজিপাড়ায় যে বাসায় ছিল, সে বাসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়নি, তা আর কাউকে ভাড়া দেওয়া সম্পর্কে রমেশ ভাববার সুযোগ পায়নি। সে এই কয়েক মাস সংসারের বাইরে উড়ন্ত অবস্থায় ছিল, লাভ-ক্ষতিকে বিচারের মধ্যেই আনে নি।
আজ সে ভোরে সেই বাসায় গিয়ে ঘর-দরজা পরিষ্কার করিয়ে নিয়েছে, তক্তপোশের উপরে বিছানা পেতে দিয়েছে এবং খাওয়াদাওয়ারও বন্দোবস্ত করে রেখেছে। আজ স্কুলে ছুটির পর কমলাকে আনতে হবে।
সে এখনো দেরি আছে। ইতিমধ্যে রমেশ তক্তপোশের উপর চিত হয়ে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে লাগল। এটাওয়া সে কখনো দেখেনি– কিন্তু পশ্চিমের দৃশ্য কল্পনা করা কঠিন নয়। শহরের প্রান্তে তার বাড়ি– গাছের সারি দ্বারা ছায়াখচিত বড়ো রাস্তা তার বাগানের ধার দিয়ে চলে গেছে– রাস্তার ওপারে বিশাল মাঠ, তার মধ্যে মধ্যে কুয়া, মধ্যে মধ্যে পশুপাখি তাড়ানোর জন্য মাচা বাঁধা। ক্ষেত্র সেচনের জন্য গরু দিয়ে জল তোলা হচ্ছে, সমস্ত দুপুরে তার করুণ শব্দ শোনা যায়– রাস্তা দিয়ে প্রচুর ধুলো উড়িয়ে মধ্যে মধ্যে এক্কাগাড়ি ছুটছে, তার ঝনঝন শব্দে রৌদ্রদগ্ধ আকাশ জেগে উঠছে। এই সুদূর প্রবাসের প্রচণ্ড তাপ, উদাস মধ্যাহ্ন ও শূন্য নির্জনতার মধ্যে সে তার বন্ধ দরজার বাংলা ঘরে সমস্ত দিন হেমনলিনীকে একা কল্পনা করতে গেলে কষ্ট অনুভব করত। তার পাশে চিরসখীরূপে কমলাকে দেখে সে আরাম বোধ করল।
রমেশ ঠিক করেছে, এখন সে কমলাকে কিছু বলবে না। বিয়ের পর হেমনলিনী তাকে বুকের উপর টেনে নিয়ে সুযোগ বুঝে কোমল স্নেহের সাথে ধীরে ধীরে তাকে তার প্রকৃত ইতিহাস জানাবে, যত কম বেদনা দিয়ে সম্ভব কমলার জীবনের এই জটিল রহস্যজাল ধীরে ধীরে খুলে দেবে। তার পরে সেই দূর বিদেশে তাদের পরিচিত সমাজের বাইরে, কোনো রকম আঘাত না পেয়ে কমলা খুব সহজেই তাদের সঙ্গে মিশে আপনার হয়ে যাবে।
তখন দুপুর গলি নিস্তব্ধ; যারা আফিসে যাওয়ার, তারা আফিসে গেছে, যারা না যাওয়ার, তারা দুপুরের ঘুমের আয়োজন করছে। অল্পতপ্ত আশ্বিনের মধ্যাহ্নটি মধুর হয়ে উঠেছে– আগামী ছুটির উল্লাস এখনই যেন আকাশকে আনন্দের আভাস দিয়ে মাখিয়ে রেখেছে। রমেশ তার নির্জন বাসায় নিস্তব্ধ দুপুরে সুখের ছবি ক্রমশ বড়ো করে আঁকতে লাগল।
এমন সময়ে খুব একটা ভারী গাড়ির শব্দ শোনা গেল। সে গাড়ি রমেশের বাসার দরজার কাছে এসে থামল। রমেশ বুঝল, স্কুলের গাড়ি কমলাকে পৌঁছে দিতে আসছে। তার বুকের ভিতরটা অস্থির হয়ে উঠল। কমলাকে কেমন দেখবে, তার সঙ্গে কীভাবে কথাবার্তা হবে, কমলাই বা রমেশকে কেমনভাবে গ্রহণ করবে, হঠাৎ এই চিন্তা তাকে আলোড়িত করে তুলল।
নিচে তার দুজন চাকর ছিল– প্রথমে তারা ধরাধরি করে কমলার সিন্দুক নিয়ে এসে বারান্দায় রাখল– তার পেছনে কমলা ঘরের দরজার সামনে পর্যন্ত এসে থমকে দাঁড়াল, ভিতরে ঢুকল না।
রমেশ বলল, “কমলা, ঘরে এসো।”
কমলা একটা সংকোচের আক্রমণ কাটিয়ে নিয়ে ঘরের মধ্যে ঢুকল। ছুটির সময়ে রমেশ তাকে বিদ্যালয়ে ফেলে রাখতে চেয়েছিল, সে কান্নাকাটি করে চলে এসেছে, এই ঘটনায় এবং কয়েক মাসের বিচ্ছেদে রমেশের সঙ্গে তার যেন একটু মনের দূরত্ব হয়ে গেছে। তাই কমলা ঘরের মধ্যে ঢুকে রমেশের মুখের দিকে না তাকিয়ে একটুখানি ঘাড় বাঁকিয়ে খোলা দরজার বাইরে তাকিয়ে রইল।
রমেশ কমলাকে দেখামাত্র বিস্মিত হয়ে উঠল। যেন তাকে আরেকবার নতুন করে দেখল। এই কয় মাসে তার আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটেছে। কম পাতা-ওয়ালা লতার মতো সে অনেকটা বেড়ে উঠেছে। গ্রাম্য মেয়েটির অপরিস্ফুট সর্বাঙ্গে প্রচুর স্বাস্থ্যের যে একটি পরিপুষ্টতা ছিল, সে কোথায় গেল? তার গোলগাল মুখটি ঝরে লম্বা হয়ে একটি বিশেষত্ব লাভ করেছে, তার গাল দুটি আগের শ্যামাভ চিকনতা ত্যাগ করে কোমল ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে, এখন তার চলাফেরা-ভাবভঙ্গিতে কোনো রকমের জড়তা নেই। আজ ঘরের মধ্যে ঢুকে যখন সে সোজা দেহে একটু বাঁকানো মুখে খোলা জানালার সামনে দাঁড়াল, তার মুখের উপরে শরৎ-দুপুরের আলো এসে পড়ল, তার মাথায় কাপড় নেই, সামনের দিকে লাল ফিতে দিয়ে বাঁধা চুলের বেণীটি পিঠের উপরে পড়েছে, হালকা হলদে রঙের মেরিনো শাড়ি তার ফুটতে থাকা শরীরকে আঁট করে ঘিরে রয়েছে– তখন রমেশ তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চুপ করে রইল।
কমলার সৌন্দর্য এই কয় মাসে রমেশের মনে অস্পষ্ট ছবির মতো হয়ে এসেছিল, আজ সেই সৌন্দর্য নতুন বিকাশ লাভ করে হঠাৎ তাকে চমকে দিল। সে যেন এর জন্য প্রস্তুত ছিল না।
রমেশ বলল, “কমলা, বসো।”
কমলা একটা চৌকিতে বসল। রমেশ বলল, “স্কুলে তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?”
কমলা অত্যন্ত সংক্ষেপে বলল, “ভালো।”
রমেশ ভাবতে লাগল এবার কী বলা যাবে। হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ে গেল; বলল, “বোধ হয় অনেকক্ষণ খাওনি। তোমার খাবার তৈরি আছে। এইখানেই আনতে বলি?”
কমলা বলল, “খাব না, আমি খেয়ে এসেছি।”
রমেশ বলল, “একটু কিছু খাবে না? মিষ্টি না খাও তো ফল আছে– আতা, আপেল, বেদানা–”
কমলা কোনো কথা না বলে ঘাড় নাড়ল।
রমেশ আরেকবার কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল। কমলা তখন একটু মুখ নিচু করে তার ইংরেজি শিক্ষার বই থেকে ছবি দেখছিল। সুন্দর মুখ সোনার কাঠির মতো নিজের চারিদিকের ঘুমন্ত সৌন্দর্যকে জাগিয়ে তোলে। শরতের আলো হঠাৎ যেন প্রাণ পেল, আশ্বিনের দিন যেন আকার ধারণ করল। কেন্দ্র যেমন তার পরিধিকে নিয়ন্ত্রণ করে– তেমনি এই মেয়েটি আকাশকে, বাতাসকে, আলোকে নিজের চারিদিকে যেন বিশেষভাবে আকর্ষণ করে আনল– অথচ সে নিজে এটার কিছুই না জেনে চুপ করে বসে তার পড়ার বইয়ের ছবি দেখছিল।
রমেশ তাড়াতাড়ি উঠে গিয়ে একটা থালায় কিছু আপেল, নাসপাতি, বেদানা নিয়ে উপস্থিত করল। বলল, “কমলা, তুমি তো খাবে না দেখছি, কিন্তু আমার ক্ষুধা পেয়েছে, আমি তো আর অপেক্ষা করতে পারি না।”
শুনে কমলা একটুখানি হাসল। এই হঠাৎ হাসির আলোকে উভয়ের ভিতরের কুয়াশা যেন অনেকখানি কেটে গেল।
রমেশ ছুরি নিয়ে আপেল কাটতে লাগল। কিন্তু কোনো রকমের হাতের কাজে রমেশের একটুও দক্ষতা নেই। তার একদিকে ক্ষুধার আগ্রহ, অন্য দিকে এলোমেলো কাটার ভঙ্গি দেখে বালিকার ভারি হাসি পেল– সে খিলখিল করে হেসে উঠল।
রমেশ এই হাস্যোচ্ছ্বাসে খুশি হয়ে বলল, “আমি বুঝি ভালো কাটতে পারি না, তাই হাসছ? আচ্ছা, তুমি কেটে দাও দেখি, তোমার কেমন বিদ্যা।”
কমলা বলল, “বটি হলে আমি কেটে দিতে পারি, ছুরিতে পারি না।”
রমেশ বলল, “তুমি মনে করছ বটি এখানে নেই?” চাকরকে ডেকে জিজ্ঞেস করল, “বটি আছে?”
সে বলল, “আছে– রাতের খাবারের জন্য সব আনা হয়েছে।”
রমেশ বলল, “ভালো করে ধুয়ে একটা বটি নিয়ে আয়।”
চাকর বটি নিয়ে এল। কমলা জুতো খুলে বটি পাতা নিচে বসল এবং হাসিমুখে নিপুণ হাতে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফলের খোসা ছাড়িয়ে টুকরো টুকরো করে কাটতে লাগল। রমেশ তার সামনে মাটিতে বসে ফলের টুকরোগুলো থালায় ধরে নিল।
রমেশ বলল, “তোমাকেও খেতে হবে।”
কমলা বলল, “না।”
রমেশ বলল, “তবে আমিও খাব না।”
কমলা রমেশের মুখের উপরে দুচোখ তুলে বলল, “আচ্ছা, তুমি আগে খাও, তার পরে আমি খাব।”
রমেশ বলল, “দেখো, শেষকালে ফাঁকি দিয়ো না।”
কমলা গম্ভীরভাবে ঘাড় নাড়ে বলল, “না, সত্যি বলছি, ফাঁকি দেব না।”
বালিকার এই সত্যপ্রতিজ্ঞায় আশ্বস্ত হয়ে রমেশ থালা থেকে এক টুকরো ফল নিয়ে মুখে পুরে দিল।
হঠাৎ তার চিবানো বন্ধ হয়ে গেল। হঠাৎ দেখল, তার সামনেই দরজার বাইরে যোগেন আর অক্ষয় এসে হাজির।
অক্ষয় বলল, “রমেশবাবু, মাফ করবেন– আমি ভেবেছিলাম, আপনি এখানে বুঝি একলাই আছেন। যোগেন, খবর না দিয়ে হঠাৎ এমন করে এসে পড়াটা ভালো হয়নি। চলো, আমরা নিচে বসি গিয়ে।”
বটি ফেলে কমলা তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। ঘর থেকে পালানোর পথেই দুজন দাঁড়িয়ে ছিল। যোগেন একটুখানি সরিয়ে পথ ছেড়ে দিল, কিন্তু কমলার মুখের উপর থেকে চোখ ফেরাল না– তাকে তীব্র দৃষ্টিতে ভালো করে দেখে নিল। কমলা সংকুচিত হয়ে পাশের ঘরে চলে গেল।
যোগেন বলল, “রমেশ, এই মেয়েটি কে?”
রমেশ বলল, “আমার একটি আত্মীয়।”
যোগেন বলল, “কী রকমের আত্মীয়? বোধ হয় গুরুজন কেউ হবেন না, স্নেহের সম্পর্কও বোধ হল না। তোমার সব আত্মীয়ের কথাই তো তোমার কাছ থেকে শুনেছি– এ আত্মীয়ের তো কোনো বিবরণ শুনিনি।”
অক্ষয় বলল, “যোগেন, এ তোমার অন্যায়– মানুষের কি এমন কোনো কথা থাকতে পারে না যা বন্ধুর কাছেও গোপনীয়?”
যোগেন: “কী রমেশ, অত্যন্ত গোপনীয় নাকি?”
রমেশের মুখ লাল হয়ে উঠল; সে বলল, “হাঁ গোপনীয়। এই মেয়েটির সম্পর্কে আমি তোমাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করতে ইচ্ছা করি না।”
যোগেন: “কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে বিশেষ ইচ্ছা করি। হেমের সাথে যদি তোমার বিয়ের প্রস্তাব না হত, তবে কার সঙ্গে তোমার কতটা দূরের আত্মীয়তা গড়িয়েছে তা নিয়ে এত তোলপাড় করবার কোনো প্রয়োজন হত না– যা গোপনীয় তা গোপনেই থাকত।”
রমেশ বলল, “এইটুকু পর্যন্ত আমি তোমাদের বলতে পারি– পৃথিবীতে কারো সাথে আমার এমন সম্পর্ক নেই যাতে হেমনলিনীর সাথে পবিত্র সম্পর্কে বাঁধতে আমার কোনো বাধা থাকতে পারে।”
যোগেন: “তোমার হয়তো কিছুতেই বাধা না থাকতে পারে, কিন্তু হেমনলিনীর আত্মীয়দের থাকতে পারে। একটা কথা আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করি, যার সঙ্গে তোমার যে রকম আত্মীয়তা থাকুক না কেন তা গোপনে রাখার কী কারণ আছে?”
রমেশ: “সেই কারণটি যদি বলি, তবে গোপনে রাখা আর চলে না। তুমি আমাকে ছেলেবেলা থেকে জান– কোনো কারণ জিজ্ঞেস না করে শুধু আমার কথার উপরে তোমাদের বিশ্বাস রাখতে হবে।”
যোগেন: “এই মেয়ের নাম কমলা কি না?”
রমেশ: “হাঁ।”
যোগেন: “একে তোমার স্ত্রী বলে পরিচয় দিয়েছ কি না?”
রমেশ: “হাঁ, দিয়েছি।”
যোগেন: “তবু তোমার উপর বিশ্বাস রাখতে হবে? তুমি আমাদের জানাতে চাও এই মেয়েটি তোমার স্ত্রী নয়, অন্য সবাইকে জানিয়েছ এই তোমার স্ত্রী– এটা ঠিক সত্যপরায়ণতার দৃষ্টান্ত নয়।”
অক্ষয়: “অর্থাৎ বিদ্যালয়ের নীতিবোধে এ দৃষ্টান্ত ব্যবহার করা চলে না, কিন্তু ভাই যোগেন, সংসারে দুই পক্ষের কাছে দুইরকম কথা বলা হয়তো অবস্থাবিশেষে দরকার হতে পারে। অন্তত তার মধ্যে একটা সত্য হওয়াই সম্ভব। হয়তো রমেশবাবু তোমাদের যেটা বলছেন সেইটেই সত্য।”
রমেশ: “আমি তোমাদের কোনো কথাই বলছি না। আমি শুধু এই কথা বলছি, হেমনলিনীর সাথে বিয়ে আমার কর্তব্যের বিরুদ্ধ নয়। কমলা সম্পর্কে তোমাদের সঙ্গে সব কথা আলোচনা করার গুরুতর বাধা আছে– তোমরা আমাকে সন্দেহ করলেও সে অন্যায় আমি কোনোভাবেই করতে পারব না। আমার নিজের সুখ-দুঃখ মান-অপমানের বিষয় হলে আমি তোমাদের কাছে গোপন করতাম না, কিন্তু অন্যের প্রতি অন্যায় করতে পারি না।”
যোগেন: “হেমনলিনীকে সব কথা বলেছ?”
রমেশ: “না। বিয়ের পরে তাকে বলব এইরকম কথা আছে– যদি তিনি ইচ্ছা করেন, এখনো তাকে বলতে পারি।”
যোগেন: “আচ্ছা, কমলাকে এ সম্পর্কে এক-দুইটা প্রশ্ন করতে পারি?”
রমেশ: “না, কোনোভাবেই না। আমাকে যদি অপরাধী বলে মনে কর তবে আমার সম্পর্কে যথাযথ ব্যবস্থা করতে পার, কিন্তু তোমাদের সামনে প্রশ্নোত্তর করার জন্য নির্দোষী কমলাকে দাঁড় করাতে পারব না।”
যোগেন: “কাউকে প্রশ্নোত্তর করার কোনো প্রয়োজন নেই। যা জানবার জেনেছি। প্রমাণ যথেষ্ট হয়েছে। এখন তোমাকে আমি স্পষ্টই বলছি– এর পরে আমাদের বাড়িতে যদি ঢোকার চেষ্টা কর, তবে তোমাকে অপমানিত হতে হবে।”
রমেশ ফ্যাকাশে মুখে নিঃশব্দে বসে রইল।
যোগেন বলল, “আর একটা কথা আছে, হেমকে তুমি চিঠি লিখতে পারবে না– তার সঙ্গে প্রকাশ্যে বা গোপনে তোমার দূর সম্পর্কও থাকবে না। যদি চিঠি লেখ, তবে যে কথা তুমি গোপন রাখতে চাইছ সেই কথা আমি সব প্রমাণ সহিত সর্বসাধারণের কাছে প্রকাশ করব। এখন যদি কেউ আমাদের জিজ্ঞেস করে তোমার সঙ্গে হেমের বিয়ে কেন ভেঙে গেল, আমি বলব এ বিয়েতে আমার সম্মতি নেই বলে ভেঙে দিয়েছি– ভিতরের কথাটা বলব না। কিন্তু তুমি যদি সাবধান না হও, তবে সব কথা বেরিয়ে যাবে। তুমি এমন পাষণ্ডের মতো ব্যবহার করেছ, তবু যে আমি নিজেকে সংযত করে রেখেছি সে তোমার উপরে দয়া করে নয়– এর মধ্যে আমার বোন হেমের সংশ্রব আছে বলেই তুমি এত সহজে নিষ্কৃতি পেলে। এখন তোমার কাছে আমার এই শেষ বক্তব্য যে, কোনোকালে হেমের সঙ্গে তোমার যে কোনো পরিচয় ছিল, তোমার কথায়-বার্তায় বা ব্যবহারে যেন তার কোনো প্রমাণ না পাওয়া যায়। এ সম্পর্কে তোমাকে সত্য করিয়ে নিতে পারলাম না, কারণ, এত মিথ্যার পরে সত্য তোমার মুখে মানাবে না। তবে এখনো যদি লজ্জা থাকে, অপমানের ভয় থাকে, তবে আমার এই কথাটা ভুলেও অবহেলা করো না।”
অক্ষয়: “আহা, যোগেন, আর কেন? রমেশবাবু নিঃশব্দে আছেন, তবু তোমার মনে একটু দয়া হচ্ছে না? এবার চলো। রমেশবাবু, কিছু মনে করবেন না, আমরা এখন আসি।”
যোগেন-অক্ষয় চলে গেল। রমেশ কাঠের মূর্তির মতো শক্ত হয়ে বসে রইল। হতবুদ্ধি ভাবটা কেটে গেলে তার ইচ্ছা করতে লাগল, বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়ে দ্রুতবেগে হাঁটতে হাঁটতে সমস্ত অবস্থাটা একবার ভেবে নেয়। কিন্তু তার মনে পড়ে গেল কমলা আছে, তাকে বাসায় একলা ফেলে রেখে যাওয়া যায় না।
রমেশ পাশের ঘরে গিয়ে দেখল, কমলা রাস্তার দিকের জানালার একটা খড়খড়ি খুলে চুপ করে বসে আছে। রমেশের পায়ের শব্দ শুনে সে খড়খড়ি বন্ধ করে মুখ ফিরাল। রমেশ মেঝের উপরে বসল।
কমলা জিজ্ঞেস করল, “ওরা দুজন কে? আজ সকালে আমাদের স্কুলে গিয়েছিল।”
রমেশ আশ্চর্য হয়ে বলল, “স্কুলে গিয়েছিল?”
কমলা বলল, “হাঁ। ওরা তোমাকে কী বলছিল?”
রমেশ বলল, “আমাকে জিজ্ঞেস করছিল তুমি আমার কে হও?”
কমলা যদিও শ্বশুরবাড়ির শাসনের অভাব এখনো লজ্জা করতে শেখেনি, তবু ছোটবেলা থেকে শেখা সংস্কারের বশে রমেশের এই কথায় তার মুখ লাল হয়ে উঠল।
রমেশ বলল, “আমি ওদের উত্তর করেছি, তুমি আমার কেউ হও না।”
কমলা ভাবল, রমেশ তাকে অন্যায় লজ্জা দিয়ে উৎপীড়ন করছে। সে মুখ ফিরিয়ে রাগত স্বরে বলল, “যাও!”
রমেশ ভাবতে লাগল, “কমলার কাছে সব কথা কীভাবে খুলে বলব।’
কমলা হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে উঠল। বলল, “ওই যা, তোমার ফল কে নিয়ে যাচ্ছে।” বলে সে তাড়াতাড়ি পাশের ঘরে গিয়ে কাক তাড়িয়ে ফলের থালা নিয়ে এল।
রমেশের সামনে থালা রেখে বলল, “তুমি খাবে না?”
রমেশের আর খাওয়ার উৎসাহ ছিল না, কিন্তু কমলার এই যত্নটুকু তার হৃদয় স্পর্শ করল। সে বলল, “কমলা, তুমি খাবে না?”
কমলা বলল, “তুমি আগে খাও!”
এইটুকু ব্যাপার, বেশি কিছু নয়, কিন্তু রমেশের বর্তমান অবস্থায় এই হৃদয়ের কোমল আভাসটুকু তার বুকের ভিতরের অশ্রু-উৎসে যেন আঘাত করল। রমেশ কোনো কথা না বলে জোর করে ফল খেতে লাগল।
খাওয়ার পালা শেষ হলে রমেশ বলল, “কমলা, আজ রাতে আমরা দেশে যাব।”
কমলা চোখ নিচু, মুখ বিষণ্ন করে বলল, “সেখানে আমার ভালো লাগে না।”
রমেশ: “স্কুলে থাকতে তোমার ভালো লাগে?”
কমলা: “না, আমাকে স্কুলে পাঠিয়ো না। আমার লজ্জা করে। মেয়েরা আমাকে শুধু তোমার কথা জিজ্ঞেস করে।”
রমেশ: “তুমি কী বল?”
কমলা: “আমি কিছুই বলতে পারি না। তারা জিজ্ঞেস করত, তুমি কেন আমাকে ছুটির সময়ে স্কুলে রাখতে চাও– আমি–”
কমলা কথা শেষ করতে পারল না। তার হৃদয়ের ক্ষতস্থানে আবার ব্যথা বেজে উঠল।
রমেশ: “তুমি কেন বললে না, তিনি আমার কেউই হন না।”
কমলা রাগ করে রমেশের মুখের দিকে কুটিল কটাক্ষে তাকাল– বলল, “যাও!”
আবার রমেশ মনে মনে ভাবতে লাগল কী করা যাবে? এদিকে রমেশের বুকের ভিতরে সবসময় একটা চাপা বেদনা পোকার মতো যেন গর্ত খুঁড়ে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছিল। এতক্ষণে যোগেন হেমনলিনীকে কী বলল, হেমনলিনী কী ভাবছে, প্রকৃত অবস্থা কীভাবে হেমনলিনীকে বোঝাবে, হেমনলিনীর সঙ্গে চিরকালের জন্য যদি তাকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়, তবে জীবন বহন করবে কী করে– এইসব জ্বালাময় প্রশ্ন ভিতরে ভিতরে জমে উঠছিল, অথচ ভালো করে তা আলোচনা করার সুযোগ রমেশ পাচ্ছিল না। রমেশ এটুকু বুঝেছিল যে, কমলার সাথে রমেশের সম্পর্ক কলকাতায় তার বন্ধু ও শত্রুমণ্ডলীতে তীব্র আলোচনার বিষয় হয়ে উঠল। রমেশ যে কমলার স্বামী, এই গোলমালে সেই জনশ্রুতি যথেষ্ট ছড়িয়ে পড়তে থাকবে। এ সময়ে রমেশের পক্ষে কমলাকে নিয়ে আর এক দিনও কলকাতায় থাকা সংগত হবে না।
অন্যমনস্ক রমেশের এই চিন্তার মাঝখানে হঠাৎ কমলা তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমি কী ভাবছ? তুমি যদি দেশে থাকতে চাও, আমি সেইখানেই থাকব।”
বালিকার মুখে এই আত্মসংযমের কথা শুনে রমেশের বুকে আবার আঘাত লাগল; আবার সে ভাবল কী করা যাবে? পুনরায় সে অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে ভাবতে নিরুত্তরে কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
কমলা মুখ গম্ভীর করে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, আমি ছুটির সময়ে স্কুলে থাকতে চাইনি বলে তুমি রাগ করেছ? সত্যি করে বলো।”
রমেশ বলল, “সত্যি করেই বলছি, তোমার উপর রাগ করিনি, আমি নিজের উপরেই রাগ করেছি।”
রমেশ ভাবনার জাল থেকে নিজেকে জোর করে ছাড়িয়ে নিয়ে কমলার সাথে আলাপ করতে শুরু করল। তাকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, কমলা, স্কুলে এতদিন কী শিখলে বলো দেখি।”
কমলা খুব উৎসাহের সাথে নিজের শিক্ষার হিসাব দিতে লাগল। সম্প্রতি পৃথিবীর গোলাকার কথাটা তার অগোচর নেই জানিয়ে যখন সে রমেশকে চমৎকৃত করে দেবার চেষ্টা করল, রমেশ গম্ভীরমুখে পৃথিবীর গোলত্বে সন্দেহ প্রকাশ করল। বলল, “এ কি কখনো সম্ভব হতে পারে?”
কমলা চোখ বিস্ফারিত করে বলল, “বাঃ, আমাদের বইয়ে লেখা আছে– আমরা পড়েছি।”
রমেশ আশ্চর্য জানিয়ে বলল, “বল কী! বইয়ে লেখা আছে? কত বড়ো বই?”
এই প্রশ্নে কমলা কিছু কুণ্ঠিত হয়ে বলল, “বেশি বড়ো বই নয়, কিন্তু ছাপার বই। তাতে ছবিও দেওয়া আছে।”
এত বড়ো প্রমাণের পর রমেশকে হার মানতে হল। তার পরে কমলা শিক্ষার বিবরণ শেষ করে বিদ্যালয়ের ছাত্রী ও শিক্ষকদের কথা, সেখানকার দৈনিক কার্যধারা নিয়ে বকতে লাগল। রমেশ অন্যমনস্ক হয়ে ভাবতে ভাবতে মধ্যে মধ্যে সাড়া দিয়ে গেল। কখনো-বা কথার শেষ সূত্র ধরে এক-আধটা প্রশ্নও করল। এক সময়ে কমলা বলে উঠল, “তুমি আমার কথা কিছুই শুনছ না।” বলে সে রাগ করে তখনই উঠে পড়ল।
রমেশ ব্যস্ত হয়ে বলল, “না না, কমলা, রাগ করো না– আমি আজ ভালো নেই।”
ভালো নেই শুনে তখনই কমলা ফিরে এসে বলল, “তোমার অসুখ করেছে? কী হয়েছে?”
রমেশ বলল, “ঠিক অসুখ নয়– ও কিছুই নয়– আমার মধ্যে মধ্যে ওমন হয়ে থাকে– আবার এখনই চলে যাবে।”
কমলা রমেশকে শিক্ষার সাথে আমোদ দেবার জন্য বলল, “আমার ভূগোল-প্রবেশে পৃথিবীর যে ছবি আছে, দেখবে?”
রমেশ আগ্রহ প্রকাশ করে দেখতে চাইল। কমলা তাড়াতাড়ি তার বই এনে রমেশের সামনে খুলে ধরল। বলল, “এই-যে দুটো গোল দেখছ, এ আসলে একটা। গোল জিনিসের দুটো পিঠ কি কখনো একসাথে দেখা যায়?”
রমেশ একটু ভাববার ভান করে বলল, “চ্যাপ্টা জিনিসেরও দেখা যায় না।”
কমলা বলল, “সেইজন্য এই ছবিতে পৃথিবীর দুই পিঠ আলাদা করে আঁকিয়েছে।”
এমনি করে সন্ধ্যাটা কেটে গেল।
অন্নদাবাবু একান্তমনে আশা করছিলেন– যোগেন ভালো খবর নিয়ে আসবে, সব গোলমাল খুব সহজে পরিষ্কার হয়ে যাবে। যোগেন ও অক্ষয় যখন ঘরে এসে ঢুকল, অন্নদাবাবু ভীতভাবে তাদের মুখের দিকে তাকালেন।
যোগেন বলল, “বাবা, তুমি যে রমেশকে এতদূর পর্যন্ত বাড়াবাড়ি করতে দেবে, তা কে জানত। এমন জানলে আমি তোমাদের সঙ্গে তার আলাপ করিয়ে দিতাম না।”
অন্নদাবাবু: “রমেশের সঙ্গে হেমনলিনীর বিয়ে তোমার ইচ্ছা, এ কথা তুমি তো আমাকে অনেকবার বলেছ। বাধা দেবার ইচ্ছা যদি তোমার ছিল, তবে আমাকে–”
যোগেন: “অবশ্য একেবারে বাধা দেবার কথা আমার মনে আসেনি, কিন্তু তাই বলে–”
অন্নদাবাবু: “ওই দেখো, ওর মধ্যে ‘তাই বলে’ কোথায় থাকতে পারে? হয় এগোতে দেবে, না হয় বাধা দেবে, এর মাঝখানে আর কী আছে?”
যোগেন: “তাই বলে একেবারে এতটা এগিয়ে–”
অক্ষয় হেসে বলল, “কতকগুলো জিনিস আছে, যা আপনার ঝোঁকেই এগিয়ে পড়ে, তাকে আর প্রশ্রয় দিতে হয় না– বাড়তে বাড়তে আপনিই বাড়াবাড়িতে গিয়ে পৌঁছায়। কিন্তু যা হয়ে গেছে তা নিয়ে তর্ক করে লাভ কী? এখন, যা করা উচিত তাই আলোচনা করো।”
অন্নদাবাবু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “রমেশের সঙ্গে তোমাদের দেখা হয়েছে?”
যোগেন: “খুব দেখা হয়েছে– এত দেখা আশা করিনি। এমনকি, তার স্ত্রীর সাথেও পরিচয় হয়ে গেল।”
অন্নদাবাবু নিঃশব্দ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করলেন, “কার স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় হল?”
যোগেন: “রমেশের স্ত্রী।”
অন্নদাবাবু: “তুমি কী বলছ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কোন্ রমেশের স্ত্রী?”
যোগেন: “আমাদের রমেশের। পাঁচ-ছয় মাস আগে যখন সে দেশে গিয়েছিল, তখন সে বিয়ে করতেই গিয়েছিল।”
অন্নদাবাবু: “কিন্তু তার বাবার মৃত্যু হল বলে বিয়ে ঘটতে পারেনি।”
যোগেন: “মৃত্যুর আগেই বিয়ে হয়ে গেছে।”
অন্নদাবাবু স্তব্ধ হয়ে বসে মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, “তবে তো আমাদের হেমের সঙ্গে তার বিয়েই হতে পারে না।”
যোগেন: “আমরা তো তাই বলছি–”
অন্নদাবাবু: “তোমরা তো তাই বললে, এ দিকে যে বিয়ের আয়োজন সবই প্রায় ঠিক হয়ে গেছে– এ রবিবারে হল না বলে পরের রবিবারে দিন স্থির করে চিঠি বিলি হয়ে গেছে– আবার সেটা বন্ধ করে ফের চিঠি লিখতে হবে?”
যোগেন বলল, “একেবারে বন্ধ করবার দরকার কী– কিছু পরিবর্তন করে কাজ চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে।”
অন্নদাবাবু আশ্চর্য হয়ে বললেন, “ওর মধ্যে পরিবর্তন কোন্ জায়গায় করবে?”
যোগেন: “যেখানে পরিবর্তন করা সম্ভব সেইখানেই করতে হবে। রমেশের বদলে আর কোনো পাত্র স্থির করে আসছে রবিবারেই যেভাবে হোক কাজ শেষ করতে হবে। নইলে লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারব না।”
বলে যোগেন একবার অক্ষয়ের মুখের দিকে তাকাল। অক্ষয় বিনয়ে মুখ নিচু করল।
অন্নদাবাবু: “পাত্র এত শিগগির পাওয়া যাবে?”
যোগেন: “সে তুমি নিশ্চিন্ত থাকো।”
অন্নদাবাবু: “কিন্তু হেমকে তো রাজি করাতে হবে।”
যোগেন: “রমেশের সমস্ত ব্যাপার শুনলে সে নিশ্চয় রাজি হবে।”
অন্নদাবাবু: “তবে যা তুমি ভালো মনে কর তাই করো। কিন্তু রমেশের বেশ সংগতিও ছিল, আবার উপার্জনের মতো বিদ্যাবুদ্ধিও ছিল। এই পরশু আমার সঙ্গে কথা ঠিক হয়ে গেল, সে এটাওয়ায় গিয়ে প্র্যাকটিস করবে, এর মধ্যে দেখো দেখি কী কাণ্ড!”
যোগেন: “সেজন্য কেন চিন্তা করছ বাবা, এটাওয়াতে রমেশ এখনো প্র্যাকটিস করতে পারবে। একবার হেমকে ডাকিয়ে আনি, আর তো বেশি সময় নেই।”
কিছুক্ষণ পরে যোগেন হেমনলিনীকে নিয়ে ঘরে ঢুকল। অক্ষয় ঘরের এক কোণে বইয়ের আলমারির আড়ালে বসে রইল।
যোগেন বলল, “হেম, বসো, তোমার সঙ্গে একটু কথা আছে।”
হেমনলিনী স্তব্ধ হয়ে চৌকিতে বসল। সে জানত তার একটা পরীক্ষা আসছে।
যোগেন ভূমিকা করে জিজ্ঞেস করল, “রমেশের ব্যবহারে সন্দেহের কারণ তুমি কিছুই দেখতে পাও না?”
হেমনলিনী কোনো কথা না বলে শুধু ঘাড় নাড়ল।
যোগেন: “সে যে বিয়ের দিন এক সপ্তাহ পিছিয়ে দিল, তার এমন কি কারণ থাকতে পারে যা আমাদের কারো কাছে বলা চলে না!”
হেমনলিনী চোখ নিচু করে বলল, “কারণ অবশ্যই কিছু আছে।”
যোগেন: “সে তো ঠিক কথা। কারণ তো আছেই, কিন্তু সে কি সন্দেহজনক না?”
হেমনলিনী আবার নীরবে ঘাড় নেড়ে জানাল, “না।”
তাদের সবার চেয়ে রমেশের উপরেই এমন নিঃসংশয় বিশ্বাসে যোগেন রেগে গেল। সাবধানে ভূমিকা করে কথা তোলা আর চলল না।
যোগেন কঠিনভাবে বলতে লাগল, “তোমার তো মনে আছে, রমেশ মাস-ছয়েক আগে তার বাবার সাথে দেশে চলে গিয়েছিল। তার পরে অনেক দিন তার কোনো চিঠিপত্র না পেয়ে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। এটাও তুমি জান যে, যে রমেশ দুবেলা আমাদের এখানে আসত, যে সবসময় আমাদের পাশের বাড়িতে বাসা নিয়ে ছিল, সে কলকাতায় এসে আমাদের সঙ্গে একবারও দেখা করল না, অন্য বাসায় গিয়ে লুকিয়ে রইল– এত সত্ত্বেও তোমরা সবাই আগের মতো বিশ্বাসেই তাকে ঘরে ডেকে আনলে! আমি থাকলে এমন কি কখনো ঘটতে পারত?”
হেমনলিনী চুপ করে রইল।
যোগেন: “রমেশের এইরকম ব্যবহারের কোনো অর্থ তোমরা খুঁজে পেয়েছ? এ সম্পর্কে একটা প্রশ্নও কি তোমাদের মনে উদয় হয়নি? রমেশের ‘পরে এত গভীর বিশ্বাস!”
হেমনলিনী নিরুত্তর।
যোগেন: “আচ্ছা, বেশ কথা– তোমরা সরল স্বভাব, কাউকে সন্দেহ কর না– আশা করি, আমার উপরেও তোমার কিছুটা বিশ্বাস আছে। আমি নিজে স্কুলে গিয়ে খবর নিয়েছি, রমেশ তার স্ত্রী কমলাকে সেখানে বোর্ডার রেখে পড়াত। ছুটির সময়েও তাকে সেখানে রাখার বন্দোবস্ত করেছিল। হঠাৎ দুই-তিন দিন হল, স্কুলের কর্ত্রীর কাছ থেকে রমেশ চিঠি পেয়েছে যে, ছুটির সময়ে কমলাকে স্কুলে রাখা হবে না। আজ তাদের ছুটি শেষ হয়েছে– কমলাকে স্কুলের গাড়ি দরজিপাড়ায় তাদের আগের বাসায় পৌঁছে দিয়েছে। সেই বাসায় আমি নিজে গিয়েছি। গিয়ে দেখলাম, কমলা বটিতে আপেলের খোসা ছাড়িয়ে কেটে দিচ্ছে, রমেশ তার সামনে মাটিতে বসে এক-এক টুকরো নিয়ে মুখে পুরছে। রমেশকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ব্যাপারখানা কী?’ রমেশ বলল, সে এখন আমাদের কাছে কিছুই বলবে না। যদি রমেশ একটা কথাও বলত যে, কমলা তার স্ত্রী নয়, তা হলেও না হয় সেই কথাটুকুর উপর নির্ভর করে কোনোমতে সন্দেহকে শান্ত করে রাখার চেষ্টা করা যেত। কিন্তু সে হ্যাঁ-না কিছুই বলতে চায় না। এখন, এর পরেও কি রমেশের উপর বিশ্বাস রাখতে চাও?”
প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় যোগেন হেমনলিনীর মুখের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল তার মুখ অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, এবং তার যতটা জোর আছে দুহাতে চৌকির হাতল চেপে ধরার চেষ্টা করছে। মুহূর্তকাল পরেই সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ে অচেতন হয়ে চৌকি থেকে সে নিচে পড়ে গেল।
অন্নদাবাবু ব্যাকুল হয়ে পড়লেন। তিনি মাটিতে পড়ে থাকা হেমনলিনীর মাথা দুহাতে বুকের কাছে তুলে নিয়ে বললেন, “মা, কী হল মা! ওদের কথা তুমি কিছুই বিশ্বাস করো না– সব মিথ্যা।”
যোগেন তার বাবাকে সরিয়ে তাড়াতাড়ি হেমনলিনীকে একটা সোফার উপরে তুলল; কাছে কুঁজায় জল ছিল, সেই জল নিয়ে তার মুখে-চোখে বারবার ছিটিয়ে দিল, এবং অক্ষয় একখানা হাতপাখা নিয়ে তাকে জোরে বাতাস করতে লাগল।
হেমনলিনী অল্পক্ষণ পরেই চোখ খুলেই চমকে উঠল; অন্নদাবাবুর দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল, “বাবা, বাবা, অক্ষয়বাবুকে এখান থেকে সরিয়ে যেতে বলো।”
অক্ষয় পাখা রেখে ঘরের বাইরে দরজার আড়ালে গিয়ে দাঁড়াল। অন্নদাবাবু সোফার উপরে হেমনলিনীর পাশে বসে তার মুখে-গায়ে হাত বুলাতে লাগলেন, এবং গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুধু একবার বললেন, “মা!”
দেখতে দেখতে হেমনলিনীর দুচোখ দিয়ে জল ঝরতে লাগল; তার বুক ফুলে ফুলে উঠল; বাবার হাঁটুর উপরে বুক চেপে ধরে তার অসহ্য কান্নার বেগ সংবরণ করার চেষ্টা করল। অন্নদাবাবু অশ্রুভারাক্রান্ত গলায় বলতে লাগলেন, “মা, তুমি নিশ্চিন্ত থাকো মা! রমেশকে আমি খুব জানি– সে কখনোই অবিশ্বাসী নয়, যোগেন নিশ্চয়ই ভুল করেছে।”
যোগেন আর থাকতে পারল না; বলল, “বাবা, মিথ্যা আশ্বাস দিয়ো না। এখোনকার মতো কষ্ট বাঁচাতে গিয়ে ওকে দ্বিগুণ কষ্টে ফেলা হবে। বাবা, হেমকে এখন কিছুক্ষণ ভাববার সময় দাও।”
হেমনলিনী তখনই বাবার হাঁটু ছেড়ে উঠে বসল, এবং যোগেনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার যা ভাববার, সব ভেবেছি। যতক্ষণ তাঁর নিজের মুখ থেকে না শুনব, ততক্ষণ আমি কোনোমতেই বিশ্বাস করব না এটা নিশ্চয় জেনো।”
এই কথা বলে সে উঠে পড়ল। অন্নদাবাবু ব্যস্ত হয়ে তাকে ধরলেন; বললেন, “পড়ে যাবে।”
হেমনলিনী অন্নদাবাবুর হাত ধরে তার শোবার ঘরে গেল। বিছানায় শুয়ে বলল, “বাবা, আমাকে একটুখানি একলা রেখে যাও, আমি ঘুমোব।”
অন্নদাবাবু বললেন, “হরির মাকে ডেকে দেব? বাতাস করবে?”
হেমনলিনী বলল, “বাতাসের দরকার নেই বাবা!”
অন্নদাবাবু পাশের ঘরে গিয়ে বসলেন। এই মেয়েটিকে ছয় মাসের শিশু-অবস্থায় রেখে এর মা মারা যায়, সেই হেমের মার কথা তিনি ভাবতে লাগলেন। সেই সেবা, সেই ধৈর্য, সেই চিরপ্রসন্নতা মনে পড়ল। সেই গৃহলক্ষ্মীরই প্রতিমার মতো যে মেয়েটি এতদিন ধরে তার কোলের উপর বেড়ে উঠেছে তার অনিষ্ট-আশঙ্কায় তার হৃদয় ব্যাকুল হয়ে উঠল। পাশের ঘরে বসে বসে তিনি মনে মনে তাকে সম্বোধন করে বলতে লাগলেন, “মা, তোমার সব বাধা দূর হোক, চিরদিন তুমি সুখে থাকো। তোমাকে সুখী দেখে, সুস্থ দেখে, যাকে ভালোবাস তার ঘরের মধ্যে লক্ষ্মীর মতো প্রতিষ্ঠিত দেখে, আমি যেন তোমার মার কাছ যেতে পারি।’ এই বলে জামার প্রান্তে ভেজা চোখ মুছলেন।
মেয়েদের বুদ্ধির প্রতি যোগেনের আগে থেকেই যথেষ্ট অবজ্ঞা ছিল, আজ তা আরও দৃঢ় হল। এরা প্রত্যক্ষ প্রমাণও বিশ্বাস করে না– এদের নিয়ে কী করা যাবে? দুইয়ে দুইয়ে যে চারই হবে, তাতে মানুষের সুখই হোক আর দুঃখই হোক, তা এরা জায়গাবিশেষে অনায়াসেই অস্বীকার করতে পারে। যুক্তি যদি কালোকে কালোই বলে, আর এদের ভালোবাসা তাকে বলে সাদা, তবে যুক্তি-বেচারার উপরে এরা ভীষণ রাগান্বিত হয়ে উঠবে। এদের নিয়ে যে কী করে সংসার চলে তা যোগেন কিছুতেই ভেবে পেল না।
যোগেন ডাকল, “অক্ষয়!”
অক্ষয় ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকল। যোগেন বলল, “সব তো শুনেছ, এখন এর উপায় কী?”
অক্ষয় বলল, “আমাকে এ-সব কথার মধ্যে কেন ফেলো ভাই? আমি এতদিন কোনো কথাই বলিনি, তুমি এসেই আমাকে এই মুশকিলে ফেলেছ।”
যোগেন: “আচ্ছা, সে-সব অভিযোগের কথা পরে হবে। এখন হেমনলিনীর কাছে রমেশকে নিজের মুখে সব কথা স্বীকার না করালে উপায় দেখি না।”
অক্ষয়: “পাগল হয়েছ! মানুষ নিজের মুখে–”
যোগেন: “অথবা যদি একটা চিঠি লেখে, তাহলে আরও ভালো হয়। তোমাকে এই ভার নিতেই হবে। কিন্তু আর দেরি করলে চলবে না।”
অক্ষয় বলল, “দেখি, কতদূর কী করতে পারি।”