রাত নয়টার সময় রমেশ কমলাকে নিয়ে শিয়ালদহ স্টেশনে রওনা হল। যাওয়ার সময় একটু ঘুরপথ দিয়ে গেল। গাড়োয়ানকে অপ্রয়োজনীয় কয়েকটা গলি ঘুরিয়ে নিল। কলুটোলায় একটা বাড়ির কাছে এসে আগ্রহসহকারে মুখ বাড়িয়ে দেখল। পরিচিত বাড়ির তো কোনো বদল হয়নি।
রমেশ এমন একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল যে, ঘুমে ঢলে পড়া কমলা চমকে উঠল। জিজ্ঞেস করল, “তোমার কী হয়েছে?”
রমেশ উত্তর করল, “কিছুই না।” আর কিছুই বলল না; গাড়ির অন্ধকারে চুপ করে বসে রইল। দেখতে দেখতে গাড়ির কোণে মাথা রেখে কমলা আবার ঘুমিয়ে পড়ল। মুহূর্তের জন্য কমলার অস্তিত্ব রমেশের যেন অসহ্য মনে হল।
গাড়ি সময়মতো স্টেশনে পৌঁছল। একটি সেকেন্ড-ক্লাস গাড়ি আগে থেকেই বুক করা ছিল; রমেশ ও কমলা তাতে উঠল। একদিকের বেঞ্চে কমলার জন্য বিছানা পেতে গাড়ির বাতির নিচে পর্দা টেনে অন্ধকার করে দিয়ে রমেশ কমলাকে বলল, “অনেকক্ষণ তোমার শোবার সময় হয়ে গেছে, এইখানে তুমি ঘুমাও।”
কমলা বলল, “গাড়ি ছাড়লে আমি ঘুমোব, ততক্ষণ আমি এই জানালার ধারে বসে একটু দেখব?”
রমেশ রাজি হল। কমলা মাথায় কাপড় টেনে প্ল্যাটফর্মের দিকের সিটের ধারে বসে লোকজনের যাতায়াত দেখতে লাগল। রমেশ মাঝের সিটে বসে অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে রইল। গাড়ি যখন সবে ছেড়েছে এমন সময় রমেশ চমকে উঠল– হঠাৎ মনে হল, তার একজন চেনা লোক গাড়ির দিকে দৌড়াচ্ছে।
পরক্ষণেই কমলা খিলখিল করে হেসে উঠল। রমেশ জানলা থেকে মুখ বাড়িয়ে দেখল– রেলওয়ে-কর্মচারীর বাধা কাটিয়ে একজন লোক কোনোক্রমে চলন্ত গাড়িতে উঠেছে এবং টানাটানিতে তার চাদর কর্মচারীর হাতেই থেকে গেছে। চাদর নেবার জন্য সে লোকটি যখন জানলা থেকে ঝুঁকে পড়ে হাত বাড়াল তখন রমেশ স্পষ্ট চিনতে পারল, সে আর কেউ নয়, অক্ষয়।
এই চাদর-কাড়াকাড়ির দৃশ্যে অনেকক্ষণ পর্যন্ত কমলার হাসি থামতে চাইল না।
রমেশ বলল, “সাড়ে দশটা বেজে গেছে, গাড়ি ছেড়েছে, এবার তুমি ঘুমাও।”
বালিকা বিছানায় শুয়ে যতক্ষণ না ঘুম এল, মধ্যে মধ্যে খিলখিল করে হেসে উঠল।
কিন্তু এই ব্যাপারে রমেশের বিশেষ কৌতুক বোধ হল না। রমেশ জানত, কোনো গ্রামের সাথে অক্ষয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না; সে পুরুষানুক্রমে কলকাতাবাসী; আজ রাতে এমন হাঁফতে হাঁফতে সে কলকাতা ছেড়ে কোথায় যাচ্ছে? রমেশ নিশ্চয় বুঝল, অক্ষয় তারই পিছনে চলেছে।
অক্ষয় যদি তাদের গ্রামে গিয়ে খোঁজখবর শুরু করে এবং সেখানে রমেশের পক্ষে-বিপক্ষের লোকের মধ্যে এ নিয়ে একটা জটলা তৈরি হয়, তবে সমস্ত ব্যাপারটা কিরূপ জঘন্য হয়ে উঠবে, তাই কল্পনা করে রমেশের হৃদয় অশান্ত হয়ে উঠল। তাদের পাড়ায় কে কী বলবে, কিরূপ গুজব ছড়াবে, তা রমেশ যেন স্পষ্ট দেখতে লাগল। কলকাতার মতো শহরে সব অবস্থাতেই আড়াল খুঁজে পাওয়া যায়, কিন্তু ছোটো গ্রামের গভীরতা কম বলেই অল্প আঘাতেই তার আন্দোলনের ঢেউ তীব্র হয়ে ওঠে। সেই কথা যতই চিন্তা করতে লাগল রমেশের মন ততই সংকুচিত হতে লাগল।
বারাকপুরে যখন গাড়ি থামল রমেশ মুখ বাড়িয়ে দেখতে লাগল, অক্ষয় নামল না। নৈহাটিতে অনেক লোক উঠানামা করতে লাগল, তাদের মধ্যে অক্ষয়কে দেখা গেল না। একবার বৃথা আশায় বগুলা স্টেশনেও রমেশ ব্যস্ত হয়ে মুখ বাড়াল– নেমে যাওয়া লোকদের মধ্যে অক্ষয়ের চিহ্ন নেই। তার পরের আর কোনো স্টেশনে অক্ষয়ের নামার কোনো সম্ভাবনা সে কল্পনা করতে পারল না।
অনেক রাতে ক্লান্ত হয়ে রমেশ ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন সকালে গোয়ালন্দে গাড়ি পৌঁছলে রমেশ দেখল, অক্ষয় মাথায় মুখে চাদর জড়িয়ে একটা হাতব্যাগ নিয়ে তাড়াতাড়ি স্টিমারের দিকে ছুটে চলেছে।
যে স্টিমারে রমেশের উঠবার কথা সে স্টিমার ছাড়বার এখনো দেরি আছে। কিন্তু অন্য ঘাটে আরেকটা স্টিমার ছাড়বার জন্য তৈরি অবস্থায় বারবার বাঁশি বাজাচ্ছে। রমেশ জিজ্ঞেস করল, “এ স্টিমার কোথায় যাবে?”
উত্তর পেল, “পশ্চিমে।”
“কতদূর পর্যন্ত যাবে?”
“জল না কমলে কাশী পর্যন্ত যায়।”
শুনে রমেশ তৎক্ষণাৎ সেই স্টিমারে উঠে কমলাকে একটা কামরায় বসাল এবং তাড়াতাড়ি কিছু দুধ চাল ডাল আর একছড়া কলা কিনে নিল।
এদিকে অক্ষয় অন্য স্টিমারে সব আরোহীর আগে উঠে কুঁকড়ে এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল, যেখান থেকে অন্যান্য যাত্রীদের গতিবিধি দেখা যায়। যাত্রীদের বিশেষ তাড়া ছিল না। জাহাজ ছাড়তে দেরি আছে– তারা এই সময়ে মুখ হাত ধুয়ে, স্নান করে, কেউ কেউ বা তীরে রান্নাবান্না করে খেয়ে নিতে লাগল। অক্ষয়ের কাছে গোয়ালন্দ পরিচিত নয়। সে ভাবল কাছেই কোথাও হোটেল বা কিছু আছে, সেইখানে রমেশ কমলাকে খাওয়াচ্ছে।
শেষে স্টিমারে বাঁশি দিতে লাগল। তখনও রমেশের দেখা নেই; কাঁপা তক্তার উপর দিয়ে যাত্রীর দল জাহাজে উঠতে শুরু করল। ঘন ঘন বাঁশির ফুঁয়ে লোকের তাড়া ক্রমেই বাড়তে লাগল। কিন্তু আগত ও আসমানো লোকদের মধ্যে রমেশের কোনো চিহ্ন নেই। যখন আরোহীর সংখ্যা শেষ হয়ে এল, তক্তা টেনে নেওয়া হল এবং সারেং নোঙর তুলবার হুকুম করল, তখন অক্ষয় ব্যস্ত হয়ে বলল, “আমি নেমে যাব।” কিন্তু খালাসিরা তার কথায় কান দিল না। ডাঙা দূরে ছিল না, অক্ষয় স্টিমার থেকে লাফ দিয়ে পড়ল।
তীরে উঠে রমেশের কোনো খবর পাওয়া গেল না। অল্পক্ষণ হল, গোয়ালন্দ থেকে সকালবেলাকার প্যাসেঞ্জার ট্রেন কলকাতার দিকে চলে গেছে। অক্ষয় মনে মনে ভাবল, কাল রাতে গাড়িতে উঠবার সময়কার টানাটানিতে নিশ্চয় সে রমেশের দৃষ্টিতে পড়েছে এবং রমেশ তার কোনো বিরুদ্ধ অভিসন্ধি অনুমান করে দেশে না গিয়ে আবার সকালের গাড়িতেই কলকাতায় ফিরে গেছে। কলকাতায় যদি কেউ লুকোতে চেষ্টা করে, তবে তো তাকে খুঁজে বের করাই কঠিন হবে।
অক্ষয় সমস্তদিন গোয়ালন্দে অস্থির হয়ে কাটিয়ে সন্ধ্যার ডাকগাড়িতে উঠে পড়ল। পরদিন ভোরে কলকাতায় পৌঁছে প্রথমেই সে রমেশের দরজিপাড়ার বাসায় এসে দেখল, তার দরজা বন্ধ; খবর নিয়ে জানল, সেখানে কেউই আসেনি।
কলুটোলায় এসে দেখল, রমেশের বাসা খালি। অন্নদাবাবুর বাসায় এসে যোগেনকে বলল, “পালিয়েছে, ধরতে পারলাম না।”
যোগেন বলল, “সে কী কথা?”
অক্ষয় তার ভ্রমণবৃত্তান্ত বর্ণনা করে বলল।
অক্ষয়কে দেখে পেয়ে রমেশ কমলাকে নিয়ে পালিয়েছে, এই খবরে রমেশের বিরুদ্ধে যোগেনের সব সন্দেহ নিশ্চিত বিশ্বাসে পরিণত হল।
যোগেন বলল, “কিন্তু অক্ষয়, এ-সব যুক্তি কোনো কাজেই লাগবে না। শুধু হেমনলিনী কেন, বাবা-সুদ্ধ ঐ এক কথা ধরেছেন– তিনি বলেন, রমেশের নিজের মুখে শেষ কথা না শুনে তিনি রমেশকে অবিশ্বাস করতে পারবেন না। এমনকি, রমেশ আজও এসে যদি বলে ‘আমি এখন কিছুই বলব না’, তবু নিশ্চয় বাবা তার সঙ্গে হেমের বিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হন না। এদের নিয়ে আমি এমনি মুশকিলে পড়েছি। বাবা হেমনলিনীর একটুও কষ্ট সহ্য করতে পারেন না; হেম যদি আজ জেদ করে বসে ‘রমেশের অন্য স্ত্রী থাকুক– আমি তাকেই বিয়ে করব’, তবে বাবা বোধ হয় তাতেই রাজি হন। যেভাবে হোক এবং যত শিগগির হোক, রমেশকে দিয়ে স্বীকার করাতেই হবে। তোমার হতাশ হলে চলবে না। আমিই এ কাজে লাগতে পারতাম, কিন্তু কোনো রকম ফন্দি আমার মাথায় আসে না, আমি হয়তো রমেশের সঙ্গে একটা মারামারি বাধিয়ে দেব। এখনো বুঝি তোমার মুখধোওয়া চা-খাওয়া হয়নি?”
অক্ষয় মুখ ধুয়ে চা খেতে খেতে ভাবতে লাগল। এমন সময়ে অন্নদাবাবু হেমনলিনীর হাত ধরে চা খাবার ঘরে এসে হাজির হলেন। অক্ষয়কে দেখামাত্র হেমনলিনী ফিরে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
যোগেন রেগে বলল, “হেমের এ ভয়ানক অন্যায়। বাবা, তুমি উনার এইসব অভদ্রতায় প্রশ্রয় দিয়ো না। উনাকে জোর করে এখানে আনা উচিত। হেম! হেম!”
হেমনলিনী তখন উপরে চলে গেছে। অক্ষয় বলল, “যোগেন, তুমি আমার কেস আরও খারাপ করে দেবে দেখছি। উঁহার কাছে আমার সম্পর্কে কোনো কথাটি কইয়ো না। সময়ে এর প্রতিকার হবে, জবরদস্তি করতে গেলে সব মাটি হয়ে যাবে।”
এই বলে অক্ষয় চা খেয়ে চলে গেল। অক্ষয়ের ধৈর্যের অভাব ছিল না। যখন সব লক্ষণ তার প্রতিকূলে তখনও সে লেগে থাকতে জানে। তার ভাবেরও কোনো পরিবর্তন হয় না। অভিমান করে সে মুখ গম্ভীর করে না বা দূরে চলে যায় না। অনাদর-অবমাননায় সে অটল থাকে। লোকটা টেকসই। তার প্রতি যার ব্যবহার যাই হোক, সে টিকে থাকে।
অক্ষয় চলে গেলে আবার অন্নদাবাবু হেমনলিনীকে ধরে চায়ের টেবিলে উপস্থিত করলেন। আজ তার গাল ফ্যাকাশে, তার চোখের নিচে কালি পড়ে গেছে। ঘরে ঢুকে সে চোখ নিচু করল, যোগেনের মুখের দিকে তাকাতে পারল না। সে জানত, যোগেন তার ও রমেশের উপর রাগ করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠিন বিচার করছে। এইজন্য যোগেনের সঙ্গে মুখোমুখি-চোখোচোখি হওয়া তার পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছে।
ভালোবাসা যদিও হেমনলিনীর বিশ্বাসকে আগলে রেখেছিল, তবু যুক্তিকে একেবারেই ঠেকিয়ে রাখা চলে না। যোগেনের সামনে হেমনলিনী কাল তার বিশ্বাসের দৃঢ়তা দেখিয়ে চলে গেল। কিন্তু রাতের অন্ধকারে শোবার ঘরের মধ্যে একলা সেই বল সম্পূর্ণ থাকে না। বাস্তবিকই প্রথম থেকেই রমেশের ব্যবহারের কোনো অর্থ পাওয়া যায় না। সন্দেহের কারণগুলোকে হেমনলিনী যত প্রাণপণ বলে তার বিশ্বাসের দুর্গের মধ্যে ঢুকতে দেয় না– তারা বাইরে দাঁড়িয়ে ততই জোর করে আঘাত করতে থাকে। মারাত্মক আঘাত থেকে মা যেমন ছেলেকে বুকে দুহাতে চেপে ধরে রক্ষা করে, রমেশের প্রতি বিশ্বাসকে হেমনলিনী সব প্রমাণের বিরুদ্ধে তেমনি জোর করে হৃদয়ে আঁকড়ে রাখল। কিন্তু হায়, জোর কি সব সময় সমান থাকে?
হেমনলিনীর পাশের ঘরেই রাতে অন্নদাবাবু শুয়েছিলেন। হেম যে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করছিল, তা তিনি বুঝতে পারছিলেন। এক-এক বার তার ঘরে গিয়ে তাকে বলছিলেন, “মা, তোমার ঘুম হচ্ছে না?” হেমনলিনী উত্তর দিচ্ছিল, “বাবা, তুমি কেন জেগে আছ? আমার ঘুম আসছে, আমি এখনি ঘুমিয়ে পড়ব।”
পরের দিন ভোরে উঠে হেমনলিনী ছাদের উপর বেড়াচ্ছিল। রমেশের বাসার একটি দরজা একটি জানলাও খোলা নেই।
সূর্য ক্রমে পূর্বদিকের বাড়িগুলির উপরে উঠে পড়ল। হেমনলিনীর কাছে আজকের এই নতুন-উঠা দিনটি এমনই শুষ্ক শূন্য, এমনই আশাহীন আনন্দহীন মনে হল যে, সে সেই ছাদের এক কোণে বসে পড়ে দুহাতে মুখ ঢেকে কেঁদে উঠল। আজ সমস্তদিন কেউই আসবে না, চায়ের সময় কাউকে আশা করবার নেই, পাশের বাড়িতে কেউ একজন আছে, এই কল্পনা করবার সুখটুকু পর্যন্ত ঘুচে গেছে।
“হেম! হেম!”
হেমনলিনী তাড়াতাড়ি উঠে চোখ মুছে ফেলে সাড়া দিল, “কী বাবা!”
অন্নদাবাবু ছাদে উঠে এসে হেমনলিনীর পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন, “আমার আজ উঠতে দেরি হয়ে গেছে।”
অন্নদাবাবু উদ্বেগে রাতে ঘুমোতে পারেননি, ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। আলো চোখে লাগতেই উঠে পড়ে তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে হেমনলিনীর খবর নিতে গেলেন। দেখলেন ঘরে কেউ নেই। সকালে তাকে একলা বেড়াতে দেখে তার বুকে আঘাত লাগল। বললেন, “চলো মা, চা খাবে চলো।”
চায়ের টেবিলে যোগেনের সামনে বসে চা খাওয়ার ইচ্ছা হেমনলিনীর ছিল না। কিন্তু সে জানত, কোনো রকম নিয়মের অন্যথা তার বাবাকে পীড়া দেয়। তাছাড়া, প্রতিদিন সে নিজের হাতে তার বাবার পেয়ালায় চা ঢেলে দেয়, এই সেবাটুকু থেকে সে নিজেকে বঞ্চিত করতে চাইল না।
নিচে গিয়ে ঘরে পৌঁছানোর আগে যখন সে বাইরে থেকে শুনল যোগেন কারো সঙ্গে কথা বলছে, তখন তার বুক কেঁপে উঠল– হঠাৎ মনে হল, বুঝি রমেশ এসেছে! এত সকালে আর কে আসবে?
কাঁপা পায়ে ঘরে ঢুকে যেই দেখল অক্ষয়, অমনি সে আর কোনোভাবে আত্মসংবরণ করতে পারল না– তৎক্ষণাৎ ছুটে বাইরে চলে এল।
দ্বিতীয়বার অন্নদাবাবু যখন তাকে ঘরের মধ্যে নিয়ে এলেন, তখন সে তার বাবার চৌকির পাশে ঘেঁষে দাঁড়িয়ে নতমুখে তার চা তৈরি করে দিতে লাগল।
যোগেন হেমনলিনীর ব্যবহারে খুব বিরক্ত হয়েছিল। হেম যে রমেশের জন্য এমন করে শোক অনুভব করবে, এটা তার অসহ্য মনে হচ্ছিল। তার পরে যখন দেখল, অন্নদাবাবু তার এই শোকের সঙ্গী হয়েছেন এবং সেও যেন সংসারের আর-সবার কাছ থেকে অন্নদাবাবুর স্নেহচ্ছায়ায় নিজেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করছে, তখন তার অধৈর্য আরও বেড়ে উঠল।– “আমরা যেন সবাই অন্যায়কারী! আমরা যে স্নেহের খাতিরেই কর্তব্যপালনে চেষ্টা করছি, আমরাই যে যথার্থভাবে উনার মঙ্গলসাধনে লিপ্ত, তার জন্য একটুও কৃতজ্ঞতা দূরের কথা, মনে মনে আমাদের দোষী করছে। বাবার তো কোনো বিষয়ে কাণ্ডজ্ঞান নেই। এখন সান্ত্বনা দেবার সময় নয়, এখন আঘাত দেবারই সময়। তা না করে তিনি ক্রমাগতই অপ্রিয় সত্যকে উনার কাছ থেকে দূরে তাড়িয়ে রাখছেন।’
যোগেন অন্নদাবাবুকে সম্বোধন করে বলল, “জান বাবা, কী হয়েছে?”
অন্নদাবাবু উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে বললেন, “না, কী হয়েছে?”
যোগেন: “রমেশ কাল তার স্ত্রীকে নিয়ে গোয়ালন্দ মেলে দেশে যাচ্ছিল, অক্ষয়কে সেই গাড়িতে উঠতে দেখে দেশে না গিয়ে আবার সে কলকাতায় পালিয়ে এসেছে।”
হেমনলিনীর হাত কাঁপে উঠল, চা ঢালতে চা পড়ে গেল। সে চৌকিতে বসে পড়ল।
যোগেন তার মুখের দিকে একবার কটাক্ষ করে বলতে লাগল, “পালাবার কী দরকার ছিল, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। অক্ষয়ের কাছে তো আগেই সব প্রকাশ হয়ে গিয়েছিল। একে তো তার আগের ব্যবহার যথেষ্ট নিন্দনীয়, তার পরে এই ভীরুতা, এই চোরের মতো ক্রমাগত পালিয়ে বেড়ানো আমার কাছে খুব জঘন্য মনে হয়। জানি না হেম কী মনে করে, কিন্তু এইরকম পলায়নেই তার অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ হচ্ছে।”
হেমনলিনী কাঁপতে কাঁপতে চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়াল; বলল, “দাদা, আমি প্রমাণের কোনো অপেক্ষা রাখি না। তোমরা তাঁর বিচার করতে চাও করো, আমি তাঁর বিচারক নই।”
যোগেন: “তোমার সঙ্গে যার বিয়ের সম্পর্ক হচ্ছিল সে কি আমাদের নিঃসম্পর্ক?”
হেমনলিনী: “বিয়ের কথা কে বলছে? তোমরা ভেঙে দিতে চাও ভেঙে দাও– সে তোমাদের ইচ্ছা। কিন্তু আমার মন ভাঙানোর জন্য মিথ্যা চেষ্টা করছ।”
বলতে বলতে হেমনলিনী গলায় আটকে এসে কেঁদে উঠল। অন্নদাবাবু তাড়াতাড়ি উঠে তার অশ্রুসিক্ত মুখ বুকে চেপে ধরে বললেন, “চলো হেম, আমরা উপরে যাই।”
স্টীমার ছেড়ে দিল। প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণীর কামরায় কেউই ছিল না। রমেশ একটি কামরা বেছে নিয়ে বিছানা পেতে দিল। সকালবেলা দুধ খেয়ে সেই কামরার দরজা খুলে কমলা নদী ও নদীতীর দেখতে লাগল।
রমেশ বলল, “জান, কমলা, আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
কমলা বলল, “দেশে যাচ্ছি।”
রমেশ: “দেশ তো তোমার ভালো লাগে না– আমরা দেশে যাব না।”
কমলা: “আমার জন্যে তুমি দেশে যাওয়া বন্ধ করেছ?”
রমেশ: “হাঁ, তোমারই জন্যে।”
কমলা মুখ ভার করে বলল, “কেন তা করলে? আমি একদিন কথায় কথায় কী বলেছিলাম, সেটা বুঝি এমন করে মনে নিতে আছে? তুমি কিন্তু ভারি অল্পেতেই রাগ কর।”
রমেশ হেসে বলল, “আমি একটুও রাগ করিনি। দেশে যাওয়ার ইচ্ছা আমারও নেই।”
কমলা তখন আগ্রহ করে জিজ্ঞেস করল, “তবে আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
রমেশ: “পশ্চিমে।”
‘পশ্চিমে’ শুনে কমলার চোখ বিস্ফারিত হয়ে উঠল। পশ্চিমে! যে লোক চিরদিন ঘরের মধ্যে কাটিয়েছে এক ‘পশ্চিম’ বলতে তার কাছে কতখানি বোঝায়! পশ্চিমে তীর্থ, পশ্চিমে স্বাস্থ্য, পশ্চিমে নতুন নতুন দেশ, নতুন নতুন দৃশ্য, কত রাজা ও সম্রাটের পুরনো কীর্তি, কত কারুখচিত দেবালয়, কত প্রাচীন কাহিনী, কত বীরত্বের ইতিহাস!
কমলা উৎফুল্ল হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পশ্চিমে আমরা কোথায় যাচ্ছি?”
রমেশ বলল, “কিছুই ঠিক নেই। মুঙ্গের, পাটনা, দানাপুর, বক্সার, গাজিপুর, কাশী, যেখানে হোক এক জায়গায় গিয়ে উঠা যাবে।”
এই-সব কিছু-জানা এবং না-জানা শহরের নাম শুনে কমলার কল্পনাশক্তি আরও উত্তেজিত হয়ে উঠল। সে হাততালি দিয়ে বলল, “ভারি মজা হবে।”
রমেশ বলল, “মজা তো পরে হবে, কিন্তু এ কয়দিন খাওয়াদাওয়ার কী করা যাবে? তুমি খালাসিদের হাতের রান্না খেতে পারবে?”
কমলা ঘৃণায় মুখ বিকৃত করে বলল, “মা গো! সে আমি পারব না।”
রমেশ: “তাহলে কী উপায় করবে?”
কমলা: “কেন, আমি নিজে রেঁধে নেব।”
রমেশ: “তুমি রাঁধতে পার?”
কমলা হেসে উঠে বলল, “তুমি আমাকে কী যে ভাব জানি না। রাঁধতে পারি না তো কী? আমি কি কচি খুকি? মামার বাড়িতে আমি তো সবসময় রেঁধে এসেছি।”
রমেশ তৎক্ষণাৎ অনুতাপ প্রকাশ করে বলল, “তাই তো, তোমাকে এই প্রশ্নটা করা ঠিক সংগত হয়নি। তাহলে এখন থেকে রাঁধবার জোগাড় করা যাক– কী বল?”
এই বলে রমেশ চলে গেল এবং খুঁজে এক লোহার উনুন সংগ্রহ করল। শুধু তাই নয়, কাশী পৌঁছে দেওয়ার খরচ ও বেতনের প্রলোভনে উমেশ নামে এক কায়স্থ বালককে জল-তোলা বাসন-মাজা ইত্যাদি কাজের জন্য নিযুক্ত করল।
রমেশ বলল, “কমলা, আজ কী রান্না হবে?”
কমলা বলল, “তোমার তো ভারি জোগাড় আছে! এক ডাল আর চাল– আজ খিচুড়ি হবে।”
রমেশ খালাসিদের কাছ থেকে কমলার নির্দেশমত মসলা সংগ্রহ করে আনল।
রমেশের অনভিজ্ঞতায় কমলা হেসে উঠল; বলল, “শুধু মসলা নিয়ে কী করব? শিল-নোড়া না হলে বাটব কী করে? তুমি তো বেশ!”
বালিকার এই অবজ্ঞা সহ্য করে রমেশ শিল-নোড়ার খোঁজে ছুটল। শিল-নোড়া না পেয়ে খালাসিদের কাছ থেকে এক লোহার হামানদিস্তা ধার করে আনল।
হামানদিস্তায় মসলা কুটো কমলার অভ্যাস ছিল না। তাই সে তা নিয়েই বসতে হল। রমেশ বলল, “মসলা নাহয় আর কাউকে দিয়ে পিষিয়ে আনছি।”
কমলার তা মনঃপূত হল না। সে নিজেই উৎসাহসহকারে কাজ শুরু করল। এই অনভ্যস্ত পদ্ধতির অসুবিধায় তার কৌতুকবোধ হল। মসলা লাফিয়ে উঠে চারিদিকে ছিটকে পড়ে, আর সে হাসি রাখতে পারে না। তার এই হাসি দেখে রমেশেরও হাসি পায়।
এইভাবে মসলা কুটোর অধ্যায় শেষ করে কোমরে আঁচল জড়িয়ে একটা দরমা দিয়ে ঘেরা জায়গায় কমলা রান্না চড়িয়ে দিল। কলকাতা থেকে একটা হাঁড়িতে করে সন্দেশ আনা হয়েছিল, সেই হাঁড়িতেই কাজ চালিয়ে নিতে হল।
রান্না চড়িয়ে দিয়ে কমলা রমেশকে বলল, “তুমি যাও, শিগগির স্নান করে নাও, আমার রান্না হতে বেশি দেরি হবে না।”
রান্নাও হল, রমেশও স্নান করে এল। এখন প্রশ্ন উঠল, থালা তো নেই, কিসে খাওয়া যায়?
রমেশ খুব ভয়ে ভয়ে বলল, “খালাসিদের কাছ থেকে সানকি ধার করে আনা যেতে পারে।”
কমলা বলল, “ছি!”
রমেশ মৃদুস্বরে জানাল, এমন অশোভন কাজ আগেও তার দ্বারা হয়ে গেছে।
কমলা বলল, “আগে যা হয়েছে তা হয়েছে, এখন থেকে হবে না– আমি তা দেখতে পারব না।”
এই বলে সে নিজেই সন্দেশের মুখে যে সরা ছিল, তা-ই ভালো করে ধুয়ে এনে উপস্থিত করল। বলল, “আজকের মতো তুমি ইহাতেই খাও, পরে দেখা যাবে।”
জল দিয়ে ধুয়ে আহারের জায়গা তৈরি হলে রমেশ পবিত্রভাবে খেতে বসল। দুই-এক গ্রাস মুখে তুলে বলল, “বাঃ, চমৎকার হয়েছে।”
কমলা লজ্জিত হয়ে বলল, “যাও, ঠাট্টা করতে হবে না।”
রমেশ বলল, “ঠাট্টা নয় তা এখনই দেখতে পাবে।” বলে থালার ভাত দেখতে দেখতে শেষ করে আবার চাইল। কমলা এবার অনেক বেশি করে দিল। রমেশ ব্যস্ত হয়ে বলল, “ও কী করছ? তোমার নিজের জন্য কিছু আছে তো?”
“ঢের আছে– সেজন্যে তোমার ভাবতে হবে না।”
রমেশের তৃপ্তি সহকারে আহারে কমলা ভারি খুশি হল। রমেশ বলল, “তুমি কিসে খাবে?”
কমলা বলল, “কেন, ঐ সরাতেই হবে।”
রমেশ অস্থির হয়ে উঠল। বলল, “না, সে হতে পারে না।”
কমলা আশ্চর্য হয়ে বলল, “কেন, হবে না কেন?”
রমেশ বলল, “না না, সেটা কি হয়!”
কমলা বলল, “খুব হবে– আমি সব ঠিক করে নিচ্ছি। উমেশ, তুই কিসে খাবি?”
উমেশ বলল, “মাঠাকরুন, নিচে ময়রা খাবার বেচছে তার কাছ থেকে শালপাতা চেয়ে আনছি।”
রমেশ বলল, “তুমি যদি ঐ সরাতেই খাবে তবে আমাকে দাও, আমি ভালো করে ধুয়ে আনছি।”
কমলা শুধু সংক্ষেপে বলল, “পাগল হয়েছ!” ক্ষণকাল পরে সে বলে উঠল, “কিন্তু পান তৈরি করতে পারিনি, তুমি আমাকে পান আনিয়ে দাওনি।”
রমেশ বলল, “নিচে পানওয়ালা পান বেচছে।”
এমনি করে খুব সহজেই ঘরকন্না শুরু হল। রমেশ মনে মনে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল। সে ভাবতে লাগল– দাম্পত্যের ভাবকে কীভাবে ঠেকিয়ে রাখা যায়।
গৃহিণীর পদ দখল করে নেবার জন্য কমলা বাইরের কোনো সাহায্য বা শিক্ষার প্রত্যাশা রাখে না। সে যতদিন তার মামার বাড়িতে ছিল, রেঁধেছে-বেড়েছে, ছেলেমেয়ে মানুষ করেছে, ঘরের কাজ চালিয়েছে। তার নৈপুণ্য, তৎপরতা ও কাজের আনন্দ দেখে রমেশের ভারি সুন্দর লাগল; কিন্তু সেইসঙ্গে এ কথাও সে ভাবতে লাগল, “ভবিষ্যতে একে নিয়ে কীভাবে চলা যাবে? একে কীভাবে কাছে রাখব, অথচ দূরে রাখব? দুজনের মাঝখানে সীমারেখাটা কোন্ জায়গায় টানা উচিত?’ উভয়ের মধ্যে যদি হেমনলিনী থাকত তাহলে সবই সুন্দর হয়ে উঠত। কিন্তু সে আশা যদি ত্যাগ করতেই হয়, তবে একা কমলাকে নিয়ে সমস্ত সমস্যার সমাধান যে কীভাবে হতে পারে তা ভেবে পাওয়া কঠিন। রমেশ স্থির করল– আসল কথাটা কমলাকে খুলে বলাই উচিত, এর পর আর চেপে রাখা চলে না।
তখনো দুপুর কাটেনি, এমন সময় স্টীমার চরে আটকে গেল। সেদিন অনেক ঠেলাঠেলিতেও স্টীমার ভাসল না। উঁচু পাড়ের নিচে জলচর পাখিদের পায়ের ছাপখচিত এক স্তর বালুকাময় নিচু তট কিছুদূর থেকে বিস্তৃত হয়ে নদীতে নেমে এসেছে। সেখানে গ্রামের বউরা তখন দিনের শেষ জল নেবার জন্য কলসি নিয়ে এসেছিল। তাদের মধ্যে কোনো কোনো অপ্রতিহতপ্রায়া বিনা ঘোমটায় এবং কোনো কোনো ভীতু ঘোমটার আড়াল থেকে স্টীমারের দিকে তাকিয়ে কৌতূহল মিটাচ্ছিল। উদ্ধত অহংকারী জলযানটার বিপদে গ্রামের ছেলেগুলো পাড়ের উপরে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ব্যঙ্গ করতে করতে নাচছিল।
ওপারের জনশূন্য চরের মধ্যে সূর্য অস্ত গেল। রমেশ জাহাজের রেলিং ধরে সন্ধ্যার আভায় দীপ্যমান পশ্চিম দিগন্তের দিকে চুপ করে তাকিয়ে ছিল। কমলা তার বেড়া-দেওয়া রাঁধার জায়গা থেকে এসে কামরার দরজার পাশে দাঁড়াল। রমেশ তাড়াতাড়ি পেছনে মুখ ফিরাবে এমন সম্ভাবনা না দেখে সে মৃদুভাবে একটু-আধটু কাশল, তাতেও কোনো ফল হল না; শেষে তার চাবির গোছা দিয়ে দরজায় ঠকঠক করতে লাগল। শব্দ যখন জোরালো হল তখন রমেশ মুখ ফিরাল। কমলাকে দেখে তার কাছে এসে বলল, “এ তোমার কিরকম ডাকবার পদ্ধতি?”
কমলা বলল, “তা, কিরকম করে ডাকব?”
রমেশ বলল, “কেন, বাপ-মায়ে আমার নামকরণ করেছিলেন কিসের জন্য, যদি কোনো ব্যবহারেই না লাগবে? দরকারের সময় আমাকে রমেশবাবু বলে ডাকলে ক্ষতি কী?”
আবার সেই একই রকম তামাশা! কমলার গালে এবং কানের গোড়ায় সন্ধ্যার আভার উপরে আরও একটুখানি লাল আভা যোগ দিল; সে মাথা বাঁকিয়ে বলল, “তুমি কী যে বল তার ঠিক নেই। শোনো, তোমার খাবার তৈরি, একটু সকাল-সকাল খেয়ে নাও। আজ দুপুরে ভালো করে খাওয়া হয়নি।”
নদীর বাতাসে রমেশের ক্ষুধাবোধ হচ্ছিল। আয়োজনের অভাবে পাছে কমলা ব্যস্ত হয়ে পড়ে সেইজন্য কিছুই বলে নি; এমন সময়ে অনায়াসে পাওয়া খাবারের সংবাদে তার মনে যে একটা সুখের আন্দোলন তুলল তার মধ্যে একটু ভিন্নতা ছিল। শুধু ক্ষুধানিবৃত্তির আসন্ন সম্ভাবনার সুখ নয়; কিন্তু সে যখন জানছে না তখনও যে তার জন্য একটি চিন্তা জাগ্রত আছে, একটি চেষ্টা ব্যাপৃত রয়েছে, তার সম্বন্ধে একটি কল্যাণের বিধান আপনিই কাজ করে চলেছে, এর মাহাত্ম্য সে হৃদয়ের মধ্যে অনুভব না করে থাকতে পারল না। কিন্তু এটা তার প্রাপ্য নয়, এত বড়ো জিনিসটা শুধু ভুলের উপরেই প্রতিষ্ঠিত এই চিন্তার নিষ্ঠুর আঘাতও সে এড়াতে পারল না– সে মাথা নিচু করে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের মধ্যে ঢুকল।
কমলা তার মুখের ভাব দেখে আশ্চর্য হয়ে বলল, “তোমার বুঝি খেতে ইচ্ছা নেই? ক্ষুধা পায়নি? আমি কি তোমাকে জোর করে খেতে বলছি?”
রমেশ তাড়াতাড়ি প্রফুল্লতার ভান করে বলল, “তোমাকে জোর করতে হবে কেন, আমার পেটের মধ্যেই জোর করছে। এখন তো খুব চাবি ঠকঠক করে ডেকে এনলে, শেষকালে পরিবেশনের সময় যেন অহংকারী মধুসূদন দেখা না দেন।”
এই বলে রমেশ চারিদিকে তাকিয়ে বলল, “কই, খাদ্যদ্রব্য তো কিছু দেখছি না। খুব ক্ষুধার জোর থাকলেও এই আসবাবগুলো আমার হজম হবে না; ছেলেবেলা থেকে আমার অন্যরকম অভ্যাস।”
রমেশ কামরার বিছানা ইত্যাদি আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল।
কমলা খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসির বেগ থামলে বলল, “এখন বুঝি আর সবুর সয় না? যখন আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিলে তখন বুঝি ক্ষুধাতৃষ্ণা ছিল না? আর যেমনি আমি ডাকলাম অমনি মনে পড়ে গেল, ভারি ক্ষুধা পেয়েছে। আচ্ছা তুমি এক মিনিট বসো, আমি এনে দিচ্ছি।”
রমেশ বলল, “কিন্তু দেরি হলে এই বিছানাপত্র কিছুই দেখতে পাবে না– তখন আমার দোষ দিয়ো না।”
রসিকতার এই পুনরাবৃত্তিতে কমলার কম আমোদ বোধ হল না। তার আবার ভারি হাসি পেল। সরল হাস্যোচ্ছ্বাসে ঘরকে সুধাময় করে দিয়ে কমলা দ্রুতপদে খাবার আনতে গেল। রমেশের কৃত্রিম প্রফুল্লতার ছদ্মদীপ্তি মুহূর্তের মধ্যে কালিমায় ঢেকে গেল।
উপরে শালপাতা-ঢাকা একটা চাঙারি নিয়ে অল্পক্ষণ পরেই কমলা কামরায় ঢুকল। বিছানার উপরে চাঙারি রেখে আঁচল দিয়ে ঘরের মেঝে মুছতে লাগল।
রমেশ ব্যস্ত হয়ে বলল, “ও কী করছ?”
কমলা বলল, “আমি তো এখনি কাপড় ছেড়ে ফেলব।” এই বলে শালপাতা তুলে পাতিল ও তার উপরে লুচি ও তরকারি নিপুণ হাতে সাজিয়ে দিল।
রমেশ বলল, “কী আশ্চর্য! লুচির জোগাড় করলে কী করে?’
কমলা সহজে রহস্য ফাঁস না করে অত্যন্ত গোপনীয় ভাব ধরে বলল, “কেমন করে বলো দেখি।”
রমেশ কঠিন চিন্তার ভাব করে বলল, “নিশ্চয়ই খালাসিদের জলখাবার থেকে ভাগ বসিয়েছ।”
কমলা অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে বলল, “কখখনো না। রাম বলো!”
রমেশ খেতে খেতে লুচির প্রথম কারণ সম্বন্ধে যত রাজ্যের অসম্ভব কল্পনা করে কমলাকে রাগিয়ে তুলল। যখন বলল “আরব্য উপন্যাসের প্রদীপওয়ালা আলাদীন বেলুচিস্থান থেকে গরম-গরম ভেজে তার দৈত্যকে দিয়ে উপহার পাঠিয়েছে’ তখন কমলার আর ধৈর্য কিছুতেই রইল না; সে মুখ ফিরিয়ে বলল, “তবে যাও আমি বলব না।”
রমেশ ব্যস্ত হয়ে বলল, “না, না, আমি হার মানছি। মাঝনদীতে লুচি, এ যে কেমন করে সম্ভব হতে পারে, আমি তো ভেবে পাচ্ছি না, কিন্তু তবু খেতে চমৎকার লাগছে।”
এই বলে রমেশ তত্ত্বনির্ণয়ের চেয়ে ক্ষুধানিবৃত্তির শ্রেষ্ঠতা সবেগে প্রমাণ করতে লাগল।
স্টীমার চরে আটকে গেলে, খালি ভাণ্ডার ভরাবার চেষ্টায় কমলা উমেশকে গ্রামে পাঠিয়েছিল। স্কুলে থাকতে জলখাবার-স্বরূপে রমেশ কমলাকে যে কয়টি টাকা দিয়েছিল, তারই মধ্যে থেকে অল্প কিছু বেঁচেছিল, তা দিয়ে কিছু ঘি-ময়দা সংগ্রহ হল। উমেশকে কমলা জিজ্ঞেস করল, “উমেশ, তুই কী খাবি বল দেখি।”
উমেশ বলল, “মাঠাকরুন, দয়া কর যদি, গ্রামে গোয়ালার বাড়িতে বড়ো সরেস দই দেখে এলাম। কলা তো ঘরেই আছে, আর পয়সা-দুয়েকের চিঁড়ে-মুড়কি হলেই পেট ভরে আজ ফলার করে নিই।”
লোলুপ বালকের ফলারের উৎসাহে কমলাও উৎসাহিত হয়ে উঠল; বলল, “পয়সা কিছু বেঁচেছে উমেশ?”
উমেশ বলল, “কিছু না মা।”
কমলা মুশকিলে পড়ে গেল। রমেশের কাছে কেমন করে মুখ ফুটে টাকা চাইবে, তাই ভাবতে লাগল। একটু পরে বলল, “তোর ভাগ্যে আজ যদি ফলারই না জোটে, তবে লুচি আছে– তোর ভাবনা নেই। চল, ময়দা মাখবি চল।”
উমেশ বলল, “কিন্তু মা, দই যা দেখে এলাম সে আর কী বলব।”
কমলা বলল, “দেখ উমেশ, বাবু যখন খেতে বসবেন তখন তুই তোর বাজারের পয়সা চাইতে আসিস।”
রমেশের আহার কিছুটা এগিয়ে গেলে, উমেশ এসে দাঁড়াল লজ্জিতভাবে মাথা চুলকাতে লাগল। রমেশ তার মুখের দিকে তাকাল। সে অর্ধেক বলল, “মা, বাজারের পয়সা–”
তখন রমেশের হঠাৎ চেতনা হল যে, আহারের আয়োজন করতে হলে টাকার প্রয়োজন হয়, আলাদীনের প্রদীপের অপেক্ষা করে চলে না। ব্যস্ত হয়ে বলল, “কমলা, তোমার কাছে তো টাকা কিছুই নেই। আমাকে মনে করিয়ে দাওনি কেন?”
কমলা নীরবে অপরাধ স্বীকার করে নিল। খাওয়ার পর রমেশ কমলার হাতে একটি ছোটো ক্যাশব্যাক্স দিয়ে বলল, “এখনকার মতো তোমার ধনরত্ন সব এইটেতেই রইল।”
এইভাবে গৃহিণীপনার সব ভারই আপনাআপনিই কমলার হাতে গিয়ে পড়ছে, রমেশ তা প্রত্যক্ষ করে আবার একবার জাহাজের রেলিং ধরে পশ্চিম আকাশের দিকে তাকাল। পশ্চিম আকাশ দেখতে দেখতে তার চোখের উপরে সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে এল।
উমেশ আজ পেট ভরে চিঁড়ে দই কলা মাখিয়ে ফলার করল। কমলা সামনে দাঁড়িয়ে তার জীবনবৃত্তান্ত বিস্তারিতভাবে আয়ত্ত করে নিল।
সৎমা-শাসিত গৃহের অবহেলিত উমেশ কাশীতে তার মামির কাছে পালিয়ে যাচ্ছিল; সে বলল, “মা, যদি তোমাদের কাছেই রাখো তবে আমি আর কোথাও যাই না।”
মাতৃহীন বালকের মুখে মা-সম্বোধন শুনে বালিকার কোমল হৃদয়ের কোন্ এক গভীরদেশ থেকে মা সাড়া দিল; কমলা কোমলস্বরে বলল, “বেশ তো উমেশ, তুই আমাদের সঙ্গেই চল।
তীরের বনরাজি অবিচ্ছিন্ন কালো রেখায় সন্ধ্যার সোনার আঁচলের কালো পাড় টেনে দিল। গ্রামের বাইরের বিলের মধ্যে সারাদিন চরে বন্য হাঁসের দল আকাশের ম্লান হয়ে আসা সূর্যাস্তের আলোর মধ্য দিয়ে ওপারের গাছহীন বালুচরে নির্জন জলাশয়গুলিতে রাত কাটাবার জন্য চলেছে। কাকদের বাসায় আসার কলরব থেমে গেছে। নদীতে তখন নৌকা ছিল না; একটি মাত্র বড়ো ডিঙি ঘন সোনালি-সবুজ নিস্তরঙ্গ জলের উপর দিয়ে নিজের কালো ছায়া বয়ে নিঃশব্দে গুণ টেনে চলছিল।
রমেশ জাহাজের ছাদের সামনের দিকে উঠতি শুক্লপক্ষের কচি চাঁদের আলোয় বেতের চেয়ার টেনে নিয়ে বসে ছিল।
পশ্চিম আকাশ থেকে সন্ধ্যার শেষ সোনালি আভা মিলিয়ে গেল; চাঁদের আলোর জাদুতে কঠিন জগৎ যেন গলে আসছিল। রমেশ আপনাআপনি মৃদুস্বরে বলতে লাগল “হেম, হেম!” সেই নামের শব্দমাত্র যেন মধুর স্পর্শরূপে তার সমস্ত হৃদয়কে বারবার ঘিরে প্রদক্ষিণ করে ফিরল, সেই নামের শব্দমাত্র যেন অপরিমেয় করুণারসে ভেজা দুটি চোখরূপে তার মুখের উপর বেদনা ছড়িয়ে তাকিয়ে রইল। রমেশের গা রোমাঞ্চিত এবং দুচোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে এল।
তার গত দুই বছরের জীবনের সমস্ত ইতিহাস তার মনের সামনে ছড়িয়ে গেল; হেমনলিনীর সাথে তার প্রথম পরিচয়ের দিন মনে পড়ে গেল। সেই দিনকে রমেশ তার জীবনের একটি বিশেষ দিন বলে চিনতে পারেনি। যোগেন যখন তাকে তাদের চায়ের টেবিলে নিয়ে গেল, সেখানে হেমনলিনীকে বসে থাকতে দেখে লাজুক রমেশ নিজেকে একেবারে বিপন্ন বোধ করেছিল। আস্তে আস্তে লজ্জা ভাঙল, হেমনলিনীর সঙ্গ অভ্যস্ত হয়ে এল, ধীরে ধীরে সেই অভ্যাসের বন্ধন রমেশকে বন্দী করে তুলল। কাব্যসাহিত্যে রমেশ প্রেমের কথা যা-কিছু পড়েছিল সবই সে হেমনলিনীর প্রতি আরোপ করতে শুরু করল। “আমি ভালোবাসছি’ ভেবে সে মনে মনে একটা অহংকার অনুভব করল। তার সহপাঠীরা পরীক্ষায় পাস করার জন্য ভালোবাসার কবিতার অর্থ মুখস্থ করে মরে, আর রমেশ সত্যিই ভালোবাসে, এটা ভেবে অন্য ছাত্রদের সে কৃপার পাত্র মনে করত। রমেশ আজ আলোচনা করে দেখল, সেদিনও সে ভালোবাসার বাইরের দরজাতেই ছিল। কিন্তু যখন হঠাৎ কমলা এসে তার জীবন-সমস্যাকে জটিল করে তুলল তখনই নানা বিরুদ্ধ ঘাতপ্রতিঘাতে দেখতে দেখতে হেমনলিনীর প্রতি তার প্রেম আকার ধারণ করে, জীবন নিয়ে, জেগে উঠল।
রমেশ তার দু হাতের তালুর উপরে মাথা রেখে ভাবতে লাগল, সামনে সমস্ত জীবনই তো পড়ে রয়েছে, তার ক্ষুধিত উপবাসী জীবন–দুঃসাধ্য সংকটজালে জড়ানো। এ জাল কি সে জোরে দুহাতে ছিঁড়ে ফেলবে না?
এই বলে সে দৃঢ়সংকল্পের আবেগে হঠাৎ মুখ তুলে দেখল, কাছেই আরেকটা বেতের চেয়ারের পিঠের উপরে হাত রেখে কমলা দাঁড়িয়ে আছে। কমলা চমকে বলে উঠল, “তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে, আমি বুঝি তোমাকে জাগিয়ে দিলাম?”
অনুতপ্ত কমলাকে চলে যেতে উদ্যত দেখে রমেশ তাড়াতাড়ি বলল, “না না কমলা, আমি ঘুমাইনি– তুমি বসো, তোমাকে একটা গল্প বলি।”
গল্পের কথা শুনে কমলা উৎসাহিত হয়ে চেয়ার টেনে নিয়ে বসল। রমেশ স্থির করেছিল, কমলাকে সব কথা প্রকাশ করে বলা একেবারে দরকার হয়েছে। কিন্তু এত বড়ো একটা আঘাত হঠাৎ সে দিতে পারল না– তাই বলল, “বসো, তোমাকে একটা গল্প বলি।”
রমেশ বলল, “প্রাচীনকালে এক জাতি ক্ষত্রিয় ছিল, তারা–”
কমলা জিজ্ঞেস করল, “আগেকার কালে? অনেক–ক কাল আগে?”
রমেশ বলল, “হাঁ, সে অনেক কাল আগে। তখন তোমার জন্ম হয়নি।”
কমলা: “তোমারই নাকি জন্ম হয়েছিল! তুমি নাকি বহুকালের লোক!– তার পরে?”
রমেশ: “সেই ক্ষত্রিয়দের নিয়ম ছিল, তারা নিজে বিয়ে করতে না গিয়ে তলোয়ার পাঠিয়ে দিত। সেই তলোয়ারের সাথে বধূর বিয়ে হয়ে গেলে তাকে বাড়িতে এনে আবার বিয়ে করত।”
কমলা: “না না, ছিঃ! ও কী রকম বিয়ে!”
রমেশ: “আমিও ও রকম বিয়ে পছন্দ করি না,কিন্তু কী করব, যে ক্ষত্রিয়দের কথা বলছি তারা শ্বশুরবাড়ি নিজে গিয়ে বিয়ে করতে অপমান বোধ করত। আমি যে রাজার গল্প বলছি সে ঐ জাতের ক্ষত্রিয় ছিল। একদিন সে–”
কমলা: “তুমি তো বললে না, সে কোথাকার রাজা?”
রমেশ বলে দিল, “মদ্রদেশের রাজা। একদিন সেই রাজা–”
কমলা: “রাজার নাম কী আগে বলো।”
কমলা সব কথা পরিষ্কার করে নিতে চায়, তার কাছে কিছুই উহ্য রাখলে চলবে না। রমেশ এতটুকু জানলে আগে থেকে আরও বেশি প্রস্তুত হয়ে থাকত; এখন দেখল, কমলার গল্প শুনতে যতই আগ্রহ থাকুক, গল্পের কোনো জায়গায় তার ফাঁকি সইবে না।
রমেশ হঠাৎ প্রশ্নে একটু থেমে বলল, “রাজার নাম রণজিৎ সিং।”
কমলা একবার আওড়ে নিল, “রণজিৎ সিং, মদ্রদেশের রাজা। তার পরে?”
রমেশ: “তার পরে একদিন রাজা ভাটের মুখে শুনলেন, তাঁরই জাতের আরেক রাজার এক পরমাসুন্দরী মেয়ে আছে।”
কমলা: “সে আবার কোথাকার রাজা?”
রমেশ: “মনে করো, সে কাঞ্চীর রাজা।”
কমলা: “মনে করব কী! তবে সত্যি কি সে কাঞ্চীর রাজা নয়?”
রমেশ: “কাঞ্চীরই রাজা বটে। তুমি তার নাম জানতে চাও? তার নাম অমর সিং।”
কমলা: “সেই মেয়ের নাম তো বললে না?– সেই পরমাসুন্দরী কন্যা!”
রমেশ: “হাঁ হাঁ, ভুল হয়েছে বটে। সেই মেয়ের নাম– তার নাম– ওঃ, তার নাম চন্দ্রা–”
কমলা: “আশ্চর্য! তুমি এমন ভুলে যাও! তুমি তো আমারই নাম ভুলে গিয়েছিলে।”
রমেশ: “কোশলের রাজা ভাটের মুখে এই কথা শুনে–”
কমলা: “কোশলের রাজা কোথা থেকে এল? তুমি যে বললে মদ্রদেশের রাজা–”
রমেশ: “সে কি এক জায়গার রাজা ছিল মনে কর? সে কোশলেরও রাজা, মদ্রেরও রাজা।”
কমলা: “দুই রাজ্য বুঝি পাশাপাশি?”
রমেশ: “একেবারে গায়ে গায়ে লাগাও।”
এইভাবে বারবার ভুল করতে করতে ও সতর্ক কমলার প্রশ্নের সাহায্যে সেইসব ভুল কোনোমতে সংশোধন করতে করতে রমেশ এভাবে গল্পটি বলে গেল–
মদ্ররাজ রণজিৎ সিং কাঞ্চীরাজের কাছে রাজকন্যাকে বিয়ে করার প্রস্তাব জানিয়ে দূত পাঠিয়ে দিলেন। কাঞ্চীর রাজা অমর সিং খুশি হয়ে সম্মত হলেন।
তখন রণজিৎ সিংহের ছোটো ভাই ইন্দ্রজিৎ সিং সৈন্যসামন্ত নিয়ে নিশান উড়িয়ে কাড়া-নাকাড়া দুন্দুভি-দামামা বাজিয়ে কাঞ্চীর রাজোদ্যানে গিয়ে তাঁবু ফেললেন। কাঞ্চীনগরে উৎসবের সমারোহ পড়ে গেল।
রাজার জ্যোতিষী গণনা করে শুভ দিনক্ষণ স্থির করে দিল। কৃষ্ণা দ্বাদশীতিথিতে রাত আড়াই প্রহরের পর লগ্ন। রাতে নগরের ঘরে ঘরে ফুলের মালা দুলল এবং আলোর মালা জ্বলে উঠল। আজ রাতে রাজকুমারী চন্দ্রার বিয়ে।
কিন্তু কার সঙ্গে বিয়ে রাজকন্যা চন্দ্রা সে কথা জানেন না। তাঁর জন্মকালে পরমহংস পরমানন্দস্বামী রাজাকে বলেছিলেন, “তোমার এই মেয়ের প্রতি অশুভগ্রহের দৃষ্টি আছে, বিয়ের সময় পাত্রের নাম যেন এ মেয়ে জানতে না পারে।’
যথাকালে তরবারির সাথে রাজকন্যার গ্রন্থিবন্ধন হয়ে গেল। ইন্দ্রজিৎ সিং যৌতুক এনে তাঁর ভ্রাতৃবধূকে প্রণাম করলেন। মদ্ররাজ্যের রণজিৎ এবং ইন্দ্রজিৎ যেন দ্বিতীয় রামলক্ষ্মণ ছিলেন। ইন্দ্রজিৎ আর্যা চন্দ্রার ঘোমটা-ঢাকা লজ্জায় লাল মুখের দিকে তাকালেন না; তিনি শুধু তাঁর নূপুরবেষ্টিত কোমল চরণযুগলের অলক্তরেখাটুকুমাত্র দেখেছিলেন।
যথারীতি বিয়ের পরদিনেই মুক্তামালার-ঝালর-দেওয়া পালঙ্কে বধূকে নিয়ে ইন্দ্রজিৎ নিজের দেশের দিকে রওনা হলেন। অশুভগ্রহের কথা মনে করে শঙ্কিত হৃদয়ে কাঞ্চীরাজ মেয়ের মাথার উপরে দক্ষিণ হাত রেখে আশীর্বাদ করলেন, মা মেয়ের মুখচুম্বন করে অশ্রুজল আটকে রাখতে পারলেন না– দেবমন্দিরে সহস্র ব্রাহ্মণ স্বস্ত্যয়নে নিযুক্ত হল।
কাঞ্চী থেকে মদ্র অনেক দূর, প্রায় এক মাসের পথ। দ্বিতীয় রাতে যখন বেতসা-নদীর তীরে শিবির রাখা হল ইন্দ্রজিতের দলবল বিশ্রামের আয়োজন করছে, এমন সময় বনের মধ্যে মশালের আলো দেখা গেল। ব্যাপারখানা কী জানতে ইন্দ্রজিৎ সৈন্য পাঠিয়ে দিলেন।
সৈনিক এসে বলল, “কুমার, এঁরাও আরেকটি বিয়ের যাত্রিদল। এঁরাও আমাদের স্বশ্রেণীর ক্ষত্রিয়, অস্ত্রোদ্বাহ সমাধা করে বধূকে স্বামীগৃহে নিয়ে চলেছে। পথে নানা বিঘ্নভয় আছে, তাই এঁরা কুমারের শরণ প্রার্থনা করছে; আদেশ পেলে কিছুদূর পথ এঁরা আমাদের আশ্রয়ে যাত্রা করে।”
কুমার ইন্দ্রজিৎ বললেন, “শরণাপন্নকে আশ্রয় দেওয়া আমাদের ধর্ম। যত্ন করে এঁদের রক্ষা করবে।”
এইভাবে দুই শিবির একত্র মিলিত হল।
তৃতীয় রাত অমাবস্যা। সামনে ছোটো ছোটো পাহাড়, পেছনে জঙ্গল। ক্লান্ত সৈনিকেরা ঝিঁঝির শব্দে ও কাছের ঝর্নার কলধ্বনিতে গভীর ঘুমে মগ্ন।
এমন সময়ে হঠাৎ কলরবে সকলে জেগে উঠে দেখল, মদ্র-শিবিরের ঘোড়াগুলো পাগলের মতো ছুটাছুটি করছে– কে তাদের দড়ি কেটে দিয়েছে– এবং মধ্যে মধ্যে এক-একটা তাঁবুতে আগুন লেগেছে ও তার আলোয় অমাবস্যার রাত লালবর্ণ হয়ে উঠেছে।
বোঝা গেল, ডাকাত আক্রমণ করেছে। মারামারি-কাটাকাটি বেধে গেল– অন্ধকারে শত্রু-মিত্র ভেদ করা কঠিন; সব অগোছালো হয়ে উঠল। ডাকাতরা সেই সুযোগে লুটপাট করে জঙ্গলে-পাহাড়ে অন্তর্ধান করল।
যুদ্ধ শেষে রাজকুমারীকে আর দেখা গেল না। তিনি ভয়ে শিবির থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন এবং একদল পালানোরত লোককে নিজের দল ভেবে তাদের সাথে মিশে গিয়েছিলেন।
তারা অন্য বিয়ের দল। গোলমালে তাদের বধূকে ডাকাতরা হরণ করে নিয়ে গেছে। রাজকন্যা চন্দ্রাকেই তারা নিজেদের বধূ জেনে দ্রুতবেগে নিজের দেশে রওনা হল।
তারা দরিদ্র ক্ষত্রিয়; কলিঙ্গে সমুদ্রতীরে তাদের বাস। সেখানে রাজকন্যার সাথে অন্য পক্ষের বরের মিলন হল। বরের নাম চেৎসিং।
চেৎসিংহের মা এসে বরণ করে বধূকে ঘরে তুলে নিলেন। আত্মীয়স্বজন সবাই এসে বলল, “আহা, এমন রূপ তো দেখা যায় না।”
মুগ্ধ চেৎসিং নববধূকে ঘরের কল্যাণলক্ষ্মী বলে মনে মনে পূজা করতে লাগল। রাজকন্যাও সতীধর্মের মর্যাদা বুঝতেন; তিনি চেৎসিংকে নিজের স্বামী বলে জেনে তার কাছে মনে মনে জীবন উৎসর্গ করে দিলেন।
নবপরিণয়ের লজ্জা ভাঙতে কিছুদিন গেল। যখন লজ্জা ভাঙল তখন কথায় কথায় চেৎসিং জানতে পারল যে, যাকে সে বধূ বলে ঘরে নিয়েছে, সে রাজকন্যা চন্দ্রা।
কমলা আটকে আসা নিঃশ্বাসে একান্ত আগ্রহের সাথে জিজ্ঞেস করল, “তার পরে?”
রমেশ বলল, “এই পর্যন্তই জানি, তার পরে আর জানি না। তুমিই বলো দেখি, তার পরে কী।”
কমলা: “না না, সেটা হবে না, তার পরে কী আমাকে বলো।”
রমেশ: “সত্যি বলছি, যে বই থেকে এই গল্প পেয়েছি তা এখনো সম্পূর্ণ প্রকাশিত হয়নি– শেষের অধ্যায়গুলো কবে বের হবে কে জানে।”
কমলা খুব রেগে বলল, “যাও, তুমি ভারি দুষ্ট! তোমার ভারি অন্যায়।”
রমেশ: “যিনি বই লিখছেন তাঁর সঙ্গে রাগারাগি করো। তোমাকে আমি শুধু এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছি, চন্দ্রাকে নিয়ে চেৎসিং কী করবে?”
কমলা তখন নদীর দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগল; অনেকক্ষণ পরে বলল, “আমি জানি না, সে কী করবে– আমি তো ভেবে উঠতে পারছি না।”
রমেশ কিছুক্ষণ নিঃশব্দে রইল; বলল, “চেৎসিং কি সব কথা চন্দ্রাকে প্রকাশ করে বলবে?”
কমলা বলল, “তুমি বেশ যা হোক, না বলে বুঝি সব গোলমাল করে রাখবে? সেটা যে বড়ো বিশ্রী। সব স্পষ্ট হওয়া চাই তো।”
রমেশ যন্ত্রের মতো বলল, “তা তো চাই।”
রমেশ কিছুক্ষণ পরে বলল, “আচ্ছা কমলা, যদি–”
কমলা: “যদি কী?”
রমেশ: “মনে করো, আমিই যদি সত্যি চেৎসিং হই, আর তুমি যদি চন্দ্রা হও–”
কমলা বলে উঠল, “তুমি ওমন কথা আমাকে বলিয়ো না; সত্যি বলছি, আমার ভালো লাগে না।”
রমেশ: “না, তোমাকে বলতেই হবে, তাহলে আমারই বা কী কর্তব্য আর তোমারই বা কর্তব্য কী?”
কমলা এ কথার কোনো উত্তর না করে চৌকি ছেড়ে দ্রুতপদে চলে গেল। দেখল, উমেশ তাদের কামরার বাইরে চুপ করে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে। জিজ্ঞেস করল, “উমেশ, তুই কখনো ভূত দেখেছিস?”
উমেশ বলল, “দেখেছি মা।”
শুনে কমলা কাছ থেকে একটা বেতের মোড়া টেনে নিয়ে বসল; বলল, “কিরকম ভূত দেখেছিলি বল।”
কমলা বিরক্ত হয়ে চলে গেলে রমেশ তাকে ফিরে ডাকল না। চাঁদ তার চোখের সামনে ঘন বাঁশবনের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল। ডেকের উপরের আলো নিভিয়ে দিয়ে তখন সারেং-খালাসিরা জাহাজের নিচের তলায় খাওয়া ও বিশ্রামের চেষ্টায় গেছে। প্রথম-দ্বিতীয় শ্রেণীতে যাত্রী কেউই ছিল না। তৃতীয় শ্রেণীর বেশিরভাগ যাত্রী রান্নাবান্নার ব্যবস্থা করতে জল ভেঙে ডাঙায় নেমে গেছে। তীরে অন্ধকারে ঢাকা ঝোপঝাপ-গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে কাছের বাজারের আলো দেখা যাচ্ছে। পরিপূর্ণ নদীর খরস্রোত নোঙরের লোহার শিকলে ঝংকার দিয়ে চলেছে এবং থেমে থেমে জাহ্নবীর ফোলা শিরার কম্প স্টীমারকে কাঁপিয়ে তুলছে।
এই অস্পষ্ট বিশালতা, এই অন্ধকারের নিবিড়তা, এই অচেনা দৃশ্যের প্রকাণ্ড অপূর্বতার মধ্যে নিমজ্জিত হয়ে রমেশ তার কর্তব্য-সমস্যা উদ্ঘাটন করার চেষ্টা করল। রমেশ বুঝল যে, হেমনলিনী কিংবা কমলা দুজনের মধ্যে একজনকে ত্যাগ করতেই হবে। দুজনকেই বাঁচিয়ে চলার কোনো মধ্য পথ নেই। তবু হেমনলিনীর আশ্রয় আছে– এখনও হেমনলিনী রমেশকে ভুলতে পারে, সে আর কাউকে বিয়ে করতে পারে, কিন্তু কমলাকে ছেড়ে দিলে এ জীবনে তার আর কোনো উপায় নেই।
মানুষের স্বার্থপরতার শেষ নেই। হেমনলিনীর যে রমেশকে ভুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে, তার রক্ষার উপায় আছে, রমেশের সম্পর্কে সে যে একমাত্র পথ নয়, এতে রমেশ কোনো সান্ত্বনা পেল না; তার আগ্রহের অধীরতা দ্বিগুণ বেড়ে উঠল। মনে হল এখনই হেমনলিনী তারার সামনে দিয়ে যেন পিছলে চিরদিনের মতো অনায়ত্ত হয়ে চলে যাচ্ছে, এখনও যেন হাত বাড়িয়ে তাকে ধরে ফেলা যায়।
দুই হাতের তালুর উপরে সে মুখ রেখে ভাবতে লাগল। দূরে শিয়াল ডাকল, গ্রামে দুই-একটা অস্থির কুকুর খেউখেউ করে উঠল। রমেশ তখন হাতের তালু থেকে মুখ তুলে দেখল, কমলা জনশূন্য অন্ধকার ডেকের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রমেশ চৌকি ছেড়ে উঠে গিয়ে বলল, “কমলা, তুমি এখনো শুতে যাওনি? রাত তো কম হয়নি?
কমলা বলল, “তুমি শুতে যাবে না?”
রমেশ বলল, “আমি এখনি যাব, পূর্বদিকের কামরায় আমার বিছানা হয়েছে। তুমি আর দেরি করো না।”
কমলা আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে তার নির্দিষ্ট কামরায় ঢুকল। সে আর রমেশকে বলতে পারল না যে, কিছুক্ষণ আগেই সে ভূতের গল্প শুনেছে এবং তার কামরা নির্জন।
রমেশ কমলার অনিচ্ছুক ধীর পায়ে অন্তরে আঘাত পেল; বলল, “ভয় করো না কমলা; তোমার কামরার পাশেই আমার কামরা– মাঝের দরজা খুলে রাখব।”
কমলা স্পর্ধাভরে তার মাথা একটুখানি উঁচু করে বলল, “আমি ভয় করব কিসের?”
রমেশ তার কামরায় ঢুকে বাতি নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল; মনে মনে বলল, কমলাকে ত্যাগ করার কোনো পথ নেই, অতএব হেমনলিনীকে বিদায়। আজ এটাই স্থির হল, আর দ্বিধা করা চলে না।
হেমনলিনীকে বিদায় বলতে যে জীবন থেকে কতখানি বিদায় তা অন্ধকারের মধ্যে শুয়ে রমেশ অনুভব করতে লাগল। রমেশ আর বিছানায় চুপ করে থাকতে পারল না, উঠে বাইরে এল; মধ্যরাত্রির অন্ধকারে একবার অনুভব করে নিল যে, তারই লজ্জা, তারই বেদনা অনন্ত দেশ ও অনন্ত কালকে ঢেকে রাখেনি। আকাশ ভরে চিরকালের জ্যোতির্লোক সব স্তব্ধ হয়ে আছে; রমেশ ও হেমনলিনীর ছোট্ট ইতিহাসটুকু তাদের স্পর্শও করছে না; এই আশ্বিনের নদী তার নির্জন বালুতটে প্রফুল্ল কাশবনের তলদেশ দিয়ে এমন কত নক্ষত্রালোকিত রাতে ঘুমন্ত গ্রামগুলির বনপ্রান্তের ছায়ায় বয়ে চলবে, যখন রমেশের জীবনের সব ধিক্কার শ্মশানের ছাইমুষ্টির মধ্যে চিরধৈর্যময়ী পৃথিবীতে মিশে চিরদিনের জন্য নীরব হয়ে গেছে।