পরদিন কমলা যখন ঘুম থেকে জেগে উঠল, তখন ভোররাত। চারদিকে তাকিয়ে দেখল, ঘরে কেউ নেই। মনে পড়ে গেল, সে জাহাজে আছে। আস্তে আস্তে উঠে দরজা ফাঁক করে দেখল, নিস্তব্ধ জলের ওপর সূক্ষ্ম একটুখানি সাদা কুয়াশার আচ্ছাদন পড়েছে, অন্ধকার ফ্যাকাশে হয়ে এসেছে এবং পূর্বদিকে গাছের সারির পেছনের আকাশে সোনালি আভা ফুটে উঠছে। দেখতে দেখতে নদীর ফ্যাকাশে নীল ধারা জেলেডিঙির সাদা সাদা পালগুলোতে খচিত হয়ে উঠল।
কমলা কোনোভাবেই ভেবে পেল না, তার মনের মধ্যে কী একটা গভীর বেদনা পীড়া দিচ্ছে। শরৎকালের এই শিশিরভেজা উষা কেন আজ তার আনন্দময় রূপ প্রকাশ করছে না? কেন একটা অশ্রুর আবেগ বালিকার বুকের ভেতর থেকে গলা বেয়ে চোখের কাছে বারবার আকুল হয়ে উঠছে? তার শ্বশুর নেই, শাশুড়ি নেই, সঙ্গিনী নেই, স্বজন-পরিজন কেউই নেই, এ কথা কাল তো তার মনে ছিল না– এর মধ্যে কী ঘটেছে যার ফলে আজ তার মনে হচ্ছে, একলা রমেশমাত্র তার সম্পূর্ণ নির্ভরস্থল নয়? কেন মনে হচ্ছে, এই বিশ্বভুবন অত্যন্ত বৃহৎ এবং সে বালিকা, অত্যন্ত ক্ষুদ্র?
কমলা অনেকক্ষণ দরজা ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। নদীর জলপ্রবাহ তরল সোনার স্রোতের মতো জ্বলতে লাগল। খালাসিরা তখন কাজে লেগেছে, ইঞ্জিন ধকধক করতে শুরু করেছে, নোঙর তোলা ও জাহাজ ঠেলাঠেলির শব্দে অকালে-জাগা শিশুর দল নদীর তীরে ছুটে এসেছে।
এমন সময় রমেশ এই গোলমালে জেগে উঠে কমলার খবর নেওয়ার জন্য তার দরজার সামনে এসে উপস্থিত হল। কমলা চমকে উঠে, আঁচল যথাস্থানে থাকা সত্ত্বেও তা আরেকটু টেনে নিজেকে যেন বিশেষভাবে আচ্ছাদনের চেষ্টা করল।
রমেশ বলল, “কমলা, তোমার মুখ-হাত ধোয়া হয়েছে?”
এই প্রশ্নে কেন যে কমলার রাগ হতে পারে, তা তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে কিছুতেই বলতে পারত না। কিন্তু হঠাৎ রাগ হল। সে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে কেবল মাথা নাড়ল মাত্র।
রমেশ বলল, “বেলা হলে লোকজন উঠে পড়বে, এইবেলা তৈরি হয়ে নাও না।”
কমলা তার কোনো উত্তর না করে কোঁচানো শাড়ি, গামছা ও একটা জামা চৌকির ওপর থেকে তুলে নিয়ে দ্রুতপদে রমেশের পাশ দিয়ে স্নানের ঘরে চলে গেল।
রমেশ যে ভোরে উঠে কমলাকে এই যত্নটুকু করতে এসেছে, তা কমলার কাছে কেবল যে অত্যন্ত অনাবশ্যক বোধ হল তা নয়, তা যেন তাকে অপমান করল। রমেশের আত্মীয়তার সীমা যে কেবল খানিকটা দূর পর্যন্ত, এক জায়গায় এসে তা যে বাধা পায়, তা হঠাৎ কমলা অনুভব করতে পারল। শ্বশুরবাড়ির কোনো গুরুজন তাকে লজ্জা করতে শেখায়নি, মাথায় কোন অবস্থায় ঘোমটার পরিমাণ কতখানি হওয়া উচিত তাও তার অভ্যস্ত হয়নি– কিন্তু রমেশ সামনে আসতেই আজ কেন অকারণে তার বুকের ভেতরটা লজ্জায় কুণ্ঠিত হতে লাগল।
স্নান সেরে কমলা যখন তার কামরায় এসে বসল তখন তার দিনের কর্ম তার সামনে উপস্থিত হল। কাঁধের ওপর থেকে আঁচলে-বাঁধা চাবির গোছা নিয়ে কাপড়ের পোর্টম্যান্টো খুলতেই তার মধ্যে ছোটো ক্যাশবাক্সটা চোখে পড়ল। এই ক্যাশবাক্সটা পেয়ে কাল কমলা একটা নতুন গৌরব লাভ করেছিল। তার হাতে একটা স্বাধীন শক্তি এসেছিল। তাই সে বহু যত্ন করে বাক্সটা তার কাপড়ের তোরঙ্গের মধ্যে চাবি বন্ধ করে রেখেছিল। আজ কমলা সে বাক্স হাতে তুলে নিয়ে উল্লাস বোধ করল না। আজ এ বাক্সকে ঠিক নিজের বাক্স মনে হল না, এটা রমেশেরই বাক্স। এ বাক্সের মধ্যে কমলার পূর্ণ স্বাধীনতা নেই। সুতরাং এ টাকার বাক্স কমলার পক্ষে একটা ভারমাত্র।
রমেশ ঘরে ঢুকে বলল, “খোলা বাক্সের মধ্যে কী হেঁয়ালির সন্ধান পেয়েছ? চুপচাপ বসে যে?”
কমলা ক্যাশবাক্স তুলে ধরে বলল, “এই তোমার বাক্স।”
রমেশ বলল, “ও আমি নিয়ে কী করব?”
কমলা বলল, “তোমার যেমন দরকার সেই বুঝে আমাকে জিনিসপত্র এনে দাও।”
রমেশ। তোমার বুঝি কিছুই দরকার নেই?
কমলা ঘাড় সামান্য বেঁকিয়ে বলল, “টাকায় আমার কীসের দরকার?”
রমেশ হেসে বলল, “এতবড়ো কথাটা কয়জন লোক বলতে পারে! যা হোক, যেটা তোমার এত অনাদরের জিনিস সেটাই কি পরকে দিতে হয়? আমি ও নেব কেন?”
কমলা কোনো উত্তর না করে মেঝের ওপর ক্যাশবাক্স রেখে দিল।
রমেশ বলল, “আচ্ছা কমলা, সত্যি করে বলো, আমি আমার গল্প শেষ করিনি বলে তুমি আমার ওপর রাগ করেছ?”
কমলা মুখ নিচু করে বলল, “রাগ কে করেছে?”
রমেশ। রাগ যে করেনি সে ঐ ক্যাশবাক্সটা রাখুক; তাহলেই বুঝব, তার কথা সত্যি।
কমলা। রাগ না করলেই বুঝি ক্যাশবাক্স রাখতে হবে? তোমার জিনিস তুমি রাখো না কেন?
রমেশ। আমার জিনিস তো নয়; দিয়ে কেড়ে নিলে যে মরে ব্রহ্মদৈত্য হতে হবে। আমার বুঝি সে ভয় নেই?
রমেশের ব্রহ্মদৈত্য হওয়ার আশঙ্কায় কমলার হঠাৎ হাসি পেয়ে গেল। সে হাসতে হাসতে বলল, “কখনো না। দিয়ে কেড়ে নিলে বুঝি ব্রহ্মদৈত্য হতে হয়? আমি তো কখনো শুনিনি।”
এই অকস্মাৎ হাসি থেকে সন্ধির সূত্রপাত হল। রমেশ বলল, “অন্যের কাছে কেমন করে শুনবে? যদি কখনো কোনো ব্রহ্মদৈত্যের দেখা পাও, তাকে জিজ্ঞাসা করলেই সত্যি-মিথ্যে জানতে পারবে।”
কমলা হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে উঠে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা, ঠাট্টা নয়, তুমি কখনো সত্যিকারের ব্রহ্মদৈত্য দেখেছ?”
রমেশ বলল, “সত্যিকারের নয় এমন অনেক ব্রহ্মদৈত্য দেখেছি। ঠিক খাঁটি জিনিসটা সংসারে দুর্লভ।”
কমলা। কেন, উমেশ যে বলে–
রমেশ। উমেশ? উমেশ ব্যক্তিটি কে?
কমলা। আঃ, ঐ-যে ছেলেটি আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে, ও নিজে ব্রহ্মদৈত্য দেখেছে।
রমেশ। এ-সমস্ত বিষয়ে আমি উমেশের সমকক্ষ নই, এ কথা আমাকে স্বীকার করতেই হবে।
এদিকে বহু চেষ্টায় খালাসির দল জাহাজ ভাসিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। অল্প দূর গেছে, এমন সময় মাথায় একটা ঝুড়ি নিয়ে একটা লোক তীর দিয়ে ছুটতে ছুটতে হাত তুলে জাহাজ থামানোর জন্য অনুনয় করতে লাগল। সারেং তার ব্যাকুলতায় দৃষ্টিপাত করল না। তখন সে লোকটা রমেশের দিকে লক্ষ করে “বাবু বাবু” করে চেঁচাতে শুরু করে দিল। রমেশ বলল, “আমাকে লোকটা স্টিমারের টিকিটবাবু বলে মনে করেছে।” রমেশ তাকে দু-হাত ঘুরিয়ে জানিয়ে দিল, স্টিমার থামানোর ক্ষমতা তার নেই।
হঠাৎ কমলা বলে উঠল, “ঐ তো উমেশ! না না, ওকে ফেলে যেয়ো না– ওকে তুলে নাও।”
রমেশ বলল, “আমার কথায় স্টিমার থামাবে কেন–”
কমলা কাতর হয়ে বলল, “না, তুমি থামাতে বলো– বলো না তুমি– ডাঙা তো বেশি দূর নয়।”
রমেশ তখন সারেংকে গিয়ে স্টিমার থামাতে অনুরোধ করল; সারেং বলল, “বাবু, কোম্পানির নিয়ম নেই।”
কমলা বাইরে এসে বলল, “ওকে ফেলে যেতে পারবে না– একটু থামাও। ও আমাদের উমেশ।”
রমেশ তখন নিয়মলঙ্ঘন ও আপত্তি ভাঙার সহজ উপায় অবলম্বন করল। পুরস্কারের আশ্বাসে সারেং জাহাজ থামিয়ে উমেশকে তুলে নিয়ে তার প্রতি বহু ভর্ৎসনা করতে লাগল। সে তাতে ভ্রূক্ষেপমাত্র না করে কমলার পায়ের কাছে ঝুড়িটা নামিয়ে, যেন কিছুই হয়নি এমনি ভাবে হাসতে লাগল।
কমলার তখনো বুকের ক্ষোভ দূর হয়নি। সে বলল, “হাসছিস যে! জাহাজ যদি না থামত তবে তোর কী হত?”
উমেশ তার স্পষ্ট উত্তর না করে ঝুড়িটা উজাড় করে দিল। এক কাঁদি কাঁচকলা, কয়েক রকম শাক, কুমড়োর ফুল ও বেগুন বেরিয়ে পড়ল।
কমলা জিজ্ঞাসা করল, “এ-সমস্ত কোথা থেকে এনেছিস?”
উমেশ সংগ্রহের যা ইতিহাস দিল তা কিছুমাত্র সন্তোষজনক নয়। গতকাল বাজার থেকে দই প্রভৃতি কিনতে যাওয়ার সময় সে গ্রামের কারও চালে বা কারও খেতে এইসব ভোজ্যপদার্থ লক্ষ করেছিল। আজ ভোরে জাহাজ ছাড়ার আগে তীরে নেমে এগুলো যথাস্থান থেকে বেছে নিয়ে এসেছে, কারও সম্মতির অপেক্ষা রাখেনি।
রমেশ অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলে উঠল, “পরের খেত থেকে তুই এইসব চুরি করে এনেছিস?”
উমেশ বলল, “চুরি করব কেন? খেতে কত ছিল, আমি অল্প এই কটি এনেছি বৈ তো নয়, এতে ক্ষতি কী হয়েছে?”
রমেশ। অল্প এনেছে বলে চুরি হয় না? লক্ষ্মীছাড়া! যা, এসব এখান থেকে নিয়ে যা।
উমেশ করুণ চোখে একবার কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মা, এগুলোকে আমাদের দেশে পিড়িং শাক বলে, এর চচ্চড়ি বড়ো সরেস হয়। আর এগুলো বেতো শাক–”
রমেশ দ্বিগুণ বিরক্ত হয়ে বলল, “নিয়ে যা তোর পিড়িং শাক। নইলে আমি সমস্ত নদীর জলে ফেলে দেব।”
এ বিষয়ে কর্তব্য নির্ধারণের জন্য সে কমলার মুখের দিকে তাকাল। কমলা নিয়ে যাওয়ার জন্য সংকেত করল। সেই সংকেতের মধ্যে করুণামিশ্রিত গোপন প্রসন্নতা দেখে উমেশ শাকসবজিগুলো কুড়িয়ে ঝুড়ির মধ্যে নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল।
রমেশ বলল, “এ ভারি অন্যায়। ছেলেটাকে তুমি প্রশ্রয় দিয়ো না।”
রমেশ চিঠিপত্র লেখার জন্য তার কামরায় চলে গেল। কমলা মুখ বাড়িয়ে দেখল, সেকেন্ডক্লাসের ডেক পার হয়ে জাহাজের হালের দিকে যেখানে তাদের দরমা-ঢাকা রান্নার জায়গা নির্দিষ্ট হয়েছে সেখানে উমেশ চুপ করে বসে আছে।
সেকেন্ডক্লাসে যাত্রী কেউ ছিল না। কমলা মাথায় গায়ে একটা রেপার জড়িয়ে উমেশের কাছে গিয়ে বলল, “সেগুলো সব ফেলে দিয়েছিস নাকি?”
উমেশ বলল, “ফেলতে যাব কেন? এই ঘরের মধ্যেই সব রেখেছি।”
কমলা রাগার চেষ্টা করে বলল, “কিন্তু তুই ভারি অন্যায় করেছিস। আর কখনো এমন কাজ করিসনে। দেখ দেখি স্টিমার যদি চলে যেত!”
এই বলে ঘরের মধ্যে গিয়ে কমলা উদ্ধতস্বরে বলল, “আন, বঁটি আন।”
উমেশ বঁটি এনে দিল। কমলা আগে উমেশের আনা তরকারি কুটতে শুরু করল।
উমেশ। মা, এই শাকগুলোর সঙ্গে সর্ষের বাটা খুব চমৎকার হয়।
কমলা ক্রুদ্ধস্বরে বলল, “আচ্ছা, তবে সর্ষে বাট।”
এমনি করে উমেশ যাতে প্রশ্রয় না পায়, কমলা সেই সতর্কতা অবলম্বন করল। বিশেষ গম্ভীরমুখে তার শাক, তার তরকারি, তার বেগুন কেটে রান্না চড়িয়ে দিল।
হায়, এই গৃহচ্যুত ছেলেটাকে প্রশ্রয় না দিয়ে কমলা থাকে কী করে? শাক-চুরির গুরুত্ব যে কতখানি তা কমলা ঠিক বোঝে না; কিন্তু নিরাশ্রয় ছেলের নির্ভরলালসা যে কত একান্ত তা তো সে বোঝে। ঐ-যে কমলাকে একটুখানি খুশি করার জন্য এই লক্ষ্মীছাড়া বালক কাল থেকে এই কয়েকটা শাক-সংগ্রহের অবসর খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আরেকটু হলেই স্টিমার থেকে ভ্রষ্ট হয়েছিল, এর করুণা কি কমলাকে স্পর্শ না করে থাকতে পারে?
কমলা বলল, “উমেশ, তোর জন্য কালকের সেই দই কিছু বাকি আছে, তোকে আজ আবার দই খাওয়াব, কিন্তু খবরদার, এমন কাজ আর কখনো করিসনে।”
উমেশ অত্যন্ত দুঃখিত হয়ে বলল, “মা, তবে সে দই তুমি কাল খাওনি?”
কমলা বলল, “তোর মতো দইয়ের ওপর আমার অত লোভ নেই। কিন্তু উমেশ, সব তো হল, মাছের জোগাড় কী হবে? মাছ না পেলে বাবুকে খাওয়াব কী?”
উমেশ। মাছের জোগাড় করতে পারি মা, কিন্তু সেটা তো মিনি পয়সায় হওয়ার জো নেই।
কমলা পুনরায় শাসনকার্যে প্রবৃত্ত হল। তার সুন্দর দুটি ভ্রূ কুঞ্চিত করার চেষ্টা করে বলল, “উমেশ, তোর মতো নির্বোধ আমি তো দেখিনি। আমি কি তোকে মিনি পয়সায় জিনিস সংগ্রহ করতে বলেছি?”
গতকাল উমেশের মনে কী করে একটা ধারণা হয়ে গেছে যে, কমলা রমেশের কাছ থেকে টাকা আদায় করাটা সহজ মনে করে না। তা ছাড়া, সব মিলিয়ে রমেশকে তার ভালো লাগেনি। এইজন্য রমেশের অপেক্ষা না রেখে, কেবল সে এবং কমলা, এই দুই নিরুপায় মিলে কী উপায়ে সংসার চালাতে পারে তার গুটিকয়েক সহজ কৌশল সে মনে মনে উদ্ভাবন করছিল। শাক-বেগুন-কাঁচকলা সম্পর্কে সে এক প্রকার নিশ্চিন্ত হয়েছিল, কিন্তু মাছটার বিষয়ে এখনো সে যুক্তি স্থির করতে পারেনি। পৃথিবীতে নিঃস্বার্থ ভক্তির জোরে সামান্য দই-মাছ পর্যন্ত জোটানো যায় না, পয়সা চাই; সুতরাং কমলার এই অকিঞ্চন ভক্ত-বালকটার পক্ষে পৃথিবী সহজ জায়গা নয়।
উমেশ কিছু কাতর হয়ে বলল, “মা, যদি বাবুকে বলে কোনোমতে গণ্ডা-পাঁচেক পয়সা জোগাড় করতে পার, তবে একটা বড়ো রুই আনতে পারি।”
কমলা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, “না না, তোকে আর স্টিমার থেকে নামতে দেব না, এবার তুই ভাঙায় পড়ে থাকলে তোকে কেউ আর তুলে নেবে না।”
উমেশ বলল, “ডাঙায় নামব কেন? আজ ভোরে খালাসিদের জালে খুব বড়ো মাছ পড়েছে; এক-আধটা বেচতেও পারে।”
শুনে দ্রুতবেগে কমলা একটা টাকা এনে উমেশের হাতে দিল; বলল, “যা লাগে দিয়ে বাকি ফিরিয়ে আনিস।”
উমেশ মাছ আনল, কিন্তু কিছু ফিরিয়ে আনল না; বলল, “এক টাকার কমে কিছুতেই দিল না।”
কথাটা যে খাঁটি সত্য নয় তা কমলা বুঝল; একটু হেসে বলল, “এবার স্টিমার থামলে টাকা ভাঙিয়ে রাখতে হবে।”
উমেশ গম্ভীরমুখে বলল, “সেটা খুব দরকার। আস্ত টাকা একবার বের হলে ফেরানো শক্ত।”
খেতে বসে রমেশ বলল, “বড়ো চমৎকার হয়েছে। কিন্তু এসব জোগাড় করলে কোথা থেকে? এ যে রুইমাছের মুড়ো।” বলে মুড়োটা সযত্নে তুলে ধরে বলল, “এ তো স্বপ্ন নয়, মায়া নয়, মতিভ্রম নয়– এ যে সত্যিই মুড়ো– যাকে বলে রোহিত মৎস্য তারই উত্তমাঙ্গ।”
এইভাবে সেদিনকার মধ্যাহ্নভোজন বেশ সমারোহের সঙ্গে সম্পন্ন হল। রমেশ ডেকে আরাম-কেদারায় গিয়ে পরিপাক-ক্রিয়ায় মনোযোগ দিল। কমলা তখন উমেশকে খাওয়াতে বসল। মাছের চচ্চড়িটা উমেশের এত ভালো লাগল যে, খাওয়ার উৎসাহটা কৌতুকাবহ না হয়ে ক্রমে আশঙ্কাজনক হয়ে উঠল। উৎকণ্ঠিত কমলা বলল, “উমেশ, আর খাসনে। তোর জন্য চচ্চড়িটা রেখে দিলাম, আবার রাতে খাবি।”
এইভাবে দিবসের কর্মে ও হাস্যকৌতুকে সকালের হৃদয়ভারটা কখন যে দূর হয়ে গেল, তা কমলা জানতে পারল না।
ক্রমে দিন শেষ হয়ে এল। সূর্যের আলো বেঁকে দীর্ঘতর ছটায় পশ্চিমদিক থেকে জাহাজের ছাদ অধিকার করে নিল। স্পন্দমান জলের ওপর বৈকালের মন্দীভূত রোদ ঝিকমিক করছে। নদীর দু-তীরে নবীন শ্যামল শারদ শস্যক্ষেত্রের মাঝখানকার সংকীর্ণ পথ দিয়ে গ্রামের মেয়েরা গা ধোয়ার জন্য ঘটি কক্ষে করে চলে আসছে।
কমলা পান সেজে শেষ করে, চুল বেঁধে, মুখ-হাত ধুয়ে, কাপড় ছেড়ে সন্ধ্যার জন্য যখন প্রস্তুত হয়ে নিল, সূর্য তখন গ্রামের বাঁশবনগুলোর পেছনে অস্ত গেছে। জাহাজ সেদিনকার মতো স্টেশন-ঘাটে নোঙর ফেলেছে।
আজ কমলার রাতের রান্নার ব্যাপার তেমন বেশি নয়। সকালের অনেক তরকারি এবেলা কাজে লাগবে। এমন সময় রমেশ এসে বলল, মধ্যাহ্নে আজ গুরুভোজন হয়েছে, এবেলা সে খাবে না।
কমলা বিমর্ষ হয়ে বলল, “কিছু খাবে না? শুধু কেবল মাছ-ভাজা দিয়ে–”
রমেশ সংক্ষেপে বলল, “না, মাছ-ভাজা থাক।” বলে চলে গেল।
কমলা তখন উমেশের পাতে সমস্ত মাছ-ভাজা ও চচ্চড়ি উজাড় করে ঢেলে দিল। উমেশ বলল, “তোমার জন্য কিছু রাখলে না?”
সে বলল, “আমার খাওয়া হয়ে গেছে।”
এইভাবে কমলার এই ভাসমান ক্ষুদ্র সংসারের একদিনের সমস্ত কর্তব্য সম্পন্ন হয়ে গেল।
জ্যোৎস্না তখন জলে স্থলে ফুটে উঠেছে। তীরে গ্রাম নেই, ধানের খেতের ঘন-কোমল সুবিস্তীর্ণ সবুজ জনশূন্যতার ওপর নিঃশব্দ সাদা রাত্রি বিরহিণীর মতো জেগে আছে।
তীরে টিনের-ছাদ-দেওয়া যে ক্ষুদ্র কুটিরে স্টিমার-অফিস সেখানে একটি শীর্ণদেহ কেরানি টুলের ওপর বসে ডেস্কের ওপর ছোটো কেরোসিনের বাতি নিয়ে খাতা লিখছিল। খোলা দরজার ভেতর দিয়ে রমেশ সেই কেরানিটিকে দেখতে পাচ্ছিল। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে রমেশ ভাবছিল, “আমার ভাগ্য যদি আমাকে ঐ কেরানিটির মতো একটি সংকীর্ণ অথচ সুস্পষ্ট জীবনযাত্রার মধ্যে বেঁধে দিত– হিসাব লিখতাম, কাজ করতাম, কাজে ত্রুটি হলে প্রভুর বকুনি খেতাম, কাজ সেরে রাতে বাসায় যেতাম– তবে আমি বাঁচতাম, আমি বাঁচতাম।”
ক্রমে অফিস-ঘরের আলো নিভে গেল। কেরানি ঘরে তালা বন্ধ করে হিমের ভয়ে মাথায় রেপার মুড়ি দিয়ে নির্জন শস্যক্ষেত্রের মাঝখান দিয়ে ধীরে ধীরে কোন দিকে চলে গেল, আর দেখা গেল না।
কমলা যে অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে জাহাজের রেল ধরে পেছনে দাঁড়িয়ে ছিল, রমেশ তা জানতে পারেনি। কমলা মনে করেছিল, সন্ধ্যাবেলায় রমেশ তাকে ডেকে নেবে। এইজন্য কাজকর্ম সেরে যখন দেখল রমেশ তার খোঁজ নিতে এল না, তখন সে নিজে ধীরে ধীরে জাহাজের ছাদে এসে উপস্থিত হল। কিন্তু তাকে হঠাৎ থমকে দাঁড়াতে হল, সে রমেশের কাছে যেতে পারল না। চাঁদের আলো রমেশের মুখের ওপর পড়েছিল– সে মুখ যেন দূরে, বহুদূরে; কমলার সঙ্গে তার সংস্রব নেই। ধ্যানমগ্ন রমেশ এবং এই সঙ্গিবিহীনা বালিকার মাঝখানে যেন জ্যোৎস্না-উত্তরীয়ে আপাদমস্তক আচ্ছন্ন একটি বিরাট রাত্রি ওষ্ঠাধরের ওপর তর্জনী রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে।
রমেশ যখন দু-হাতের মধ্যে মুখ ঢেকে টেবিলের ওপর মুখ রাখল তখন কমলা ধীরে ধীরে তার কামরার দিকে গেল। পায়ের শব্দ করল না, পাছে রমেশ টের পায় যে কমলা তার সন্ধান নিতে এসেছিল।
কিন্তু তার শোয়ার কামরা নির্জন, অন্ধকার– ঢুকে তার বুকের ভেতর কেঁপে উঠল, নিজেকে একান্তই পরিত্যক্ত এবং একাকিনী মনে হল; সেই ক্ষুদ্র কাঠের ঘরটা একটা কোনো নিষ্ঠুর অপরিচিত জন্তুর হাঁ-করা মুখের মতো তার কাছে তার অন্ধকার মেলে দিল। কোথায় সে যাবে? কোনখানে নিজের ক্ষুদ্র শরীরটি পেতে দিয়ে সে চোখ বুজে বলতে পারবে “এই আমার আপনার স্থান?”
ঘরের মধ্যে উঁকি মেরেই কমলা আবার বাইরে এল। বাইরে আসার সময় রমেশের ছাতাটা টিনের তোরঙ্গের ওপর পড়ে গিয়ে একটা শব্দ হল। সেই শব্দে চমকে রমেশ মুখ তুলল এবং চৌকি ছেড়ে উঠে দেখল, কমলা তার শোয়ার কামরার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। বলল, “একি কমলা! আমি মনে করেছিলাম, তুমি এতক্ষণে শুয়েছ। তোমার কি ভয় করছে নাকি? আচ্ছা, আমি আর বাইরে বসব না– আমি এই পাশের ঘরেই শুতে গেলাম, মাঝের দরজাটা বরং খুলে রাখছি।”
কমলা উদ্ধতস্বরে বলল, “ভয় আমি করি না।” বলে সবেগে অন্ধকার ঘরের মধ্যে ঢুকল এবং যে দরজা রমেশ খোলা রেখেছিল তা সে বন্ধ করে দিল। বিছানার ওপর নিজেকে ছুড়ে দিয়ে মুখের ওপর একটা চাদর ঢাকল; সে যেন জগতে আর কাউকে না পেয়ে কেবল নিজেকে দিয়ে নিজেকে নিবিড়ভাবে বেষ্টন করল। তার সমস্ত হৃদয় বিদ্রোহী হয়ে উঠল। যেখানে নির্ভরতাও নেই, স্বাধীনতাও নেই, সেখানে প্রাণ বাঁচে কী করে?
রাত আর কাটে না। পাশের ঘরে রমেশ এতক্ষণে ঘুমিয়ে পড়েছে। বিছানায় কমলা আর থাকতে পারল না। আস্তে আস্তে বাইরে চলে এল। জাহাজের রেলিং ধরে তীরের দিকে তাকিয়ে রইল। কোথাও জনপ্রাণীর সাড়াশব্দ নেই– চাঁদ পশ্চিমের দিকে নেমে পড়ছে। দু-ধারের শস্যক্ষেত্রের মাঝখান দিয়া যে সংকীর্ণ পথ অদৃশ্য হয়ে গেছে, সেই দিকে তাকিয়ে কমলা ভাবতে লাগল– এই পথ দিয়ে কত মেয়ে জল নিয়ে প্রত্যহ নিজের ঘরে যায়। ঘর! ঘর বলতেই তার প্রাণ যেন বুকের বাইরে ছুটে আসতে চাইল। একটুখানি মাত্র ঘর– কিন্তু সে ঘর কোথায়! শূন্য তীর ধুধু করছে, প্রকাণ্ড আকাশ দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত স্তব্ধ। অনাবশ্যক আকাশ, অনাবশ্যক পৃথিবী– ক্ষুদ্র বালিকার পক্ষে এই অন্তহীন বিশালতা অপরিসীম অনাবশ্যক– কেবল তার একটিমাত্র ঘরের প্রয়োজন ছিল।
এমন সময় হঠাৎ কমলা চমকে উঠল– কে একজন তার অনতিদূরে দাঁড়িয়ে আছে।
“ভয় নেই মা, আমি উমেশ। রাত যে অনেক হয়েছে, ঘুম নেই কেন?”
এতক্ষণ যে অশ্রু পড়েনি, দেখতে দেখতে দু-চোখ দিয়া সেই অশ্রু উছলে পড়ল। বড়ো বড়ো ফোঁটা কিছুতে বাধা মানল না, কেবলই ঝরে পড়তে লাগল। ঘাড় বেঁকিয়ে কমলা উমেশের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। জলভার বয়ে মেঘ ভেসে যাচ্ছে– যেমনি তারই মতো আরেকটা গৃহহারা হাওয়ার স্পর্শ লাগে অমনি সমস্ত জলের বোঝা ঝরে পড়ে; এই গৃহহীন দরিদ্র বালকটার কাছ থেকে একটা যত্নের কথা শোনামাত্র কমলা নিজের বুক-ভরা অশ্রুর ভার আর রাখতে পারল না। একটা-কোনো কথা বলার চেষ্টা করল, কিন্তু রুদ্ধ কণ্ঠ দিয়ে কথা বের হল না।
পীড়িতচিত্ত উমেশ কেমন করে সান্ত্বনা দিতে হয় ভেবে পেল না। অবশেষে অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ এক সময় বলে উঠল, “মা, তুমি যে সেই টাকাটা দিয়েছিলে, তার থেকে সাত আনা বেঁচেছে।”
তখন কমলার অশ্রুর ভার লঘু হয়েছে। উমেশের এই খাপছাড়া সংবাদে সে একটুখানি স্নেহমিশ্রিত হাসি হেসে বলল, “আচ্ছা, বেশ, সে তোর কাছে রেখে দে। যা, এখন শুতে যা।”
চাঁদ গাছের আড়ালে নেমে পড়ল। এবার কমলা বিছানায় এসে যেমন শুল অমনি তার দু-শ্রান্ত চোখ ঘুমে বুজে এল। প্রভাতের রোদ যখন তার ঘরের দ্বারে করাঘাত করল তখনো সে নিদ্রায় মগ্ন।
শ্রান্তির মধ্যে পরের দিন কমলার দিন শুরু হল। সেদিন তার চোখে সূর্যের আলো ক্লান্ত, নদীর ধারা ক্লান্ত, তীরের গাছগুলো বহুদূরপথের পথিকের মতো ক্লান্ত।
উমেশ যখন তার কাজে সাহায্য করতে এল কমলা শ্রান্ত কণ্ঠে বলল, “যা উমেশ, আমাকে আজ আর বিরক্ত করিসনে।”
উমেশ অল্পে ক্ষান্ত হওয়ার ছেলে নয়। সে বলল, “বিরক্ত করব কেন মা, বাটনা বাটতে এসেছি।”
সকালবেলা রমেশ কমলার চোখমুখের ভাব দেখে জিজ্ঞাসা করেছিল, “কমলা, তোমার কি অসুখ করেছে?”
এরকম প্রশ্ন যে কতখানি অনাবশ্যক ও অসংগত, কমলা কেবল তা একবার প্রবলভাবে ঘাড় নেড়ে নিরুত্তরে প্রকাশ করে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
রমেশ বুঝল, সমস্যা ক্রমশ প্রতিদিনই কঠিন হয়ে উঠছে। অতিশীঘ্রই এর একটা শেষ মীমাংসা হওয়া আবশ্যক। হেমনলিনীর সঙ্গে একবার স্পষ্ট বোঝাপড়া হয়ে গেলে কর্তব্য নির্ধারণ সহজ হবে, এটা রমেশ মনে মনে আলোচনা করে দেখল।
অনেক চিন্তার পর হেমকে চিঠি লিখতে বসল। একবার লিখছে, একবার কাটছে, এমন সময় “মহাশয়, আপনার নাম?” শুনে চমকে মুখ তুলল। দেখল, একটি প্রৌঢ়বয়স্ক ভদ্রলোক পাকা গোঁফ ও মাথার সামনের দিকে পাতলা চুলে টাকের আভাস নিয়ে সামনে উপস্থিত। রমেশের একান্ত নিবিষ্ট চিত্তের মনোযোগ চিঠির চিন্তা থেকে অকস্মাৎ উৎপাটিত হয়ে ক্ষণকালের জন্য বিভ্রান্ত হয়ে রইল।
“আপনি ব্রাহ্মণ? নমস্কার। আপনার নাম রমেশবাবু, সে আমি পূর্বেই খবর নিয়েছি– তবু দেখুন আমাদের দেশে নাম-জিজ্ঞাসাটা পরিচয়ের একটা প্রণালী। ওটা ভদ্রতা। আজকাল কেউ কেউ এতে রাগ করেন। আপনি যদি রাগ করে থাকেন তো শোধ তুলুন। আমাকে জিজ্ঞাসা করুন, আমি নিজের নাম বলব, বাবার নাম বলব, পিতামহের নাম বলতে আপত্তি করব না।”
রমেশ হেসে বলল, “আমার রাগ এত বেশি ভয়ংকর নয়, আপনার একলার নাম পেলেই আমি খুশি হব।”
“আমার নাম ত্রৈলোক্য চক্রবর্তী। পশ্চিমে সকলেই আমাকে ‘খুড়ো’ বলে জানে। আপনি তো হিস্ট্রি পড়েছেন? ভারতবর্ষে ভরত ছিলেন চক্রবর্তী রাজা, আমি তেমনি সমস্ত পশ্চিম-মুলুকের চক্রবর্তী-খুড়ো। যখন পশ্চিমে যাচ্ছেন তখন আমার পরিচয় আপনার অগোচর থাকবে না। কিন্তু মহাশয়ের কোথায় যাওয়া হচ্ছে?”
রমেশ বলল, “এখনো ঠিক করে উঠতে পারিনি।”
ত্রৈলোক্য। আপনার ঠিক করে উঠতে বিলম্ব হয়, কিন্তু জাহাজে উঠতে তো দেরি সহে নি।
রমেশ বলল, “একদিন গোয়ালন্দে নেমে দেখলাম, জাহাজে বাঁশি দিয়েছে। তখন এটা বেশ বোঝা গেল, আমার মন স্থির করতে যদি বা দেরি থাকে কিন্তু জাহাজ ছাড়তে দেরি নেই। সুতরাং যেটা তাড়াতাড়ির কাজ সেটাই তাড়াতাড়ি সেরে ফেললাম।”
ত্রৈলোক্য। নমস্কার মহাশয়। আপনার প্রতি আমার ভক্তি হচ্ছে। আমাদের সঙ্গে আপনার অনেক প্রভেদ। আমরা আগে মত স্থির করি, তারপর জাহাজে চড়ি– কারণ আমরা অত্যন্ত ভীরুস্বভাব। আপনি যাবেন এটা স্থির করেছেন, অথচ কোথায় যাবেন কিছুই স্থির করেননি, এ কি কম কথা! পরিবার সঙ্গেই আছেন?
“হ্যাঁ” বলে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে রমেশের মুহূর্তকালের জন্য খটকা লাগল। তাকে নীরব দেখে চক্রবর্তী বললেন, “আমাকে মাপ করবেন– পরিবার সঙ্গে আছেন, সে খবরটা আমি বিশ্বস্তসূত্রে পূর্বেই জেনেছি। বউমা ঐ ঘরটাতে রাঁধছেন, আমিও পেটের দায়ে রান্নাঘরের সন্ধানে সেখানে গিয়ে উপস্থিত। বউমাকে বললাম, “মা, আমাকে দেখে সংকোচ করো না, আমি পশ্চিম-মুলুকের একমাত্র চক্রবর্তী-খুড়ো।” আহা, মা যেন সাক্ষাৎ অন্নপূর্ণা! আমি আবার বললাম, “মা, রান্নাঘরটি যখন দখল করেছ তখন অন্ন থেকে বঞ্চিত করলে চলবে না, আমি নিরুপায়।” মা একটুখানি মধুর হাসলেন, বুঝলাম প্রসন্ন হয়েছেন, আজ আর আমার ভাবনা নেই। পাঁজিতে শুভক্ষণ দেখে প্রতিবারই তো বের হই, কিন্তু এমন সৌভাগ্য ফি বারে ঘটে না। আপনি কাজে আছেন, আপনাকে আর বিরক্ত করব না– যদি অনুমতি করেন তো বউমাকে একটু সাহায্য করি। আমরা উপস্থিত থাকতে তিনি পদ্মহস্তে বেড়ি ধরবেন কেন? না না, আপনি লিখুন, আপনাকে উঠতে হবে না– আমি পরিচয় করে নিতে জানি।”
এই বলে চক্রবর্তী-খুড়ো বিদায় নিয়ে রান্নাঘরের দিকে গেলেন। গিয়েই বললেন, “চমৎকার গন্ধ বের হচ্ছে, ঘণ্টা যা হবে তা মুখে তোলার আগেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু অম্বলটা আমি রাঁধব মা; পশ্চিমের গরমে যারা বাস না করে অম্বলটা তারা ঠিক দরদ দিয়ে রাঁধতে পারে না। তুমি ভাবছ, বুড়োটা বলে কী– তেঁতুল নেই, অম্বল রাঁধব কী দিয়ে? কিন্তু আমি উপস্থিত থাকতে তেঁতুলের ভাবনা তোমাকে ভাবতে হবে না। একটু সবুর করো, আমি সমস্ত জোগাড় করে আনছি।”
বলে চক্রবর্তী কাগজে-মোড়া একটা ভাঁড়ে কাসুন্দি এনে উপস্থিত করলেন। বললেন, “আমি অম্বল যা রাঁধব তা আজকের মতো খেয়ে বাকিটা তুলে রাখতে হবে, মজতে ঠিক চার দিন লাগবে। তারপর একটুখানি মুখে তুলে দিলেই বুঝতে পারবে, চক্রবর্তী-খুড়ো দেমাকও করে বটে, কিন্তু অম্বলও রাঁধে। যাও মা, এবার যাও, মুখ-হাত ধুয়ে নাও গে। বেলা অনেক হয়েছে। রান্না বাকি যা আছে আমি শেষ করে দিচ্ছি। কিছু সংকোচ করো না, আমার এসব অভ্যাস আছে মা; আমার পরিবারের শরীর বরাবর কাহিল, তাঁরই অরুচি সারানোর জন্য অম্বল রেঁধে আমার হাত পাকিয়ে গেছে। বুড়ার কথা শুনে হাসছ। কিন্তু ঠাট্টা নয় মা, এ সত্যি কথা।”
কমলা হাসিমুখে বলল, “আমি আপনার কাছ থেকে অম্বল-রাঁধা শিখব।”
চক্রবর্তী। ওরে বাস রে! বিদ্যা কি এত সহজে দেওয়া যায়? এক দিনেই শিখিয়ে বিদ্যার গুমর যদি নষ্ট করি তবে বীণাপাণি অপ্রসন্ন হবেন। দু-চার দিন এ বৃদ্ধকে খোশামোদ করতে হবে। আমাকে কী করে খুশি করতে হয় সে তোমাকে ভেবে বার করতে হবে না; আমি নিজে সমস্ত বিস্তারিত বলে দেব। প্রথম দফায়, আমি পানটা কিছু বেশি খাই, কিন্তু সুপারি গোটা-গোটা থাকলে চলবে না। আমাকে বশীভূত করা সহজ ব্যাপার না; কিন্তু মার ঐ হাসি-মুখখানিতে কাজ অনেকটা অগ্রসর হয়েছে। ওরে, তোর নাম কী রে?
উমেশ উত্তর দিল না। সে রেগে ছিল; তার মনে হচ্ছিল, কমলার স্নেহ-রাজ্যে বৃদ্ধ তার শরিক হয়ে এসে উপস্থিত হয়েছে। কমলা তাকে মৌন দেখে বলল, “ওর নাম উমেশ।”
বৃদ্ধ বললেন, “এ ছোকরাটি বেশ ভালো। এক দমে এর মন পাওয়া যায় না তা স্পষ্ট দেখছি, কিন্তু দেখো মা, এর সঙ্গে আমার বনবে। কিন্তু আর বেলা করো না, আমার রান্না থেকে কিছুমাত্র বিলম্ব হবে না।”
কমলা যে একটা শূন্যতা অনুভব করছিল এই বৃদ্ধকে পেয়ে তা ভুলে গেল।
রমেশও এই বৃদ্ধের আগমনে এখনকার মতো কিছুটা নিশ্চিন্ত হল। প্রথম কয় মাস যখন রমেশ কমলাকে নিজের স্ত্রী বলেই জানত তখন তার আচরণ, তখন পরস্পরের বাধাবিহীন নিকটবর্তিতা, এখনকার থেকে এতই তফাত যে, এই হঠাৎ-প্রভেদ বালিকার মনকে আঘাত না করে থাকতে পারে না। এমন সময়ে এই চক্রবর্তী এসে রমেশের দিক থেকে কমলার চিন্তাকে যদি খানিকটা বিক্ষিপ্ত করতে পারে তবে রমেশ নিজের হৃদয়ের ক্ষতবেদনায় অখণ্ড মনোযোগ দিয়ে বাঁচে।
অদূরে তার কামরার দরজার কাছে এসে কমলা দাঁড়াল। তার মনের ইচ্ছা, কর্মহীন দীর্ঘ মধ্যাহ্নটা সে চক্রবর্তীকে একাকী দখল করে বসে। চক্রবর্তী তাকে দেখে বলে উঠলেন, “না না মা, এটা ভালো হল না। এটা কিছুতেই চলবে না।”
কমলা, কী ভালো হল না কিছু বুঝতে না পেরে আশ্চর্য ও কুণ্ঠিত হয়ে উঠল। বৃদ্ধ বললেন, “ঐ-যে, ঐ জুতোটা। রমেশবাবু, এটা আপনা কর্তৃকই হয়েছে। যা বলেন, এটা আপনারা অধর্ম করছেন– দেশের মাটিকে এইসকল চরণস্পর্শ থেকে বঞ্চিত করবেন না, তাহলে দেশ মাটি হবে। রামচন্দ্র যদি সীতাকে ডসনের বুট পরাতেন তবে লক্ষ্মণ কি চোদ্দ বছর বনে ঘুরে বেড়াতে পারতেন মনে করেন? কখনোই না। আমার কথা শুনে রমেশবাবু হাসছেন, মনে মনে ঠিক পছন্দ করছেন না। না করারই কথা। আপনারা জাহাজের বাঁশি শুনলেই আর থাকতে পারেন না, একেবারে চড়ে বসেন, কিন্তু কোথায় যে যাচ্ছেন তা একবারও ভাবেন না।”
রমেশ বলল, “খুড়ো, আপনিই নাহয় আমাদের গম্যস্থানটা ঠিক করে দিন না। জাহাজের বাঁশিটার চেয়ে আপনার পরামর্শ পাকা হবে।”
চক্রবর্তী বললেন, “এই দেখুন, আপনার বিবেচনাশক্তি এরই মধ্যে উন্নতি লাভ করেছে– অথচ অল্পক্ষণের পরিচয়। তবে আসুন, গাজিপুরে আসুন। যাবে মা, গাজিপুরে? সেখানে গোলাপের খেত আছে, আর সেখানে তোমার এ বৃদ্ধ ভক্তটাও থাকে।”
রমেশও কমলার মুখের দিকে তাকাল। কমলা তৎক্ষণাৎ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানাল।
এরপর উমেশ এবং চক্রবর্তীতে মিলে লজ্জিত কমলার কামরায় সভা স্থাপন করল। রমেশ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বাইরেই রয়ে গেল। মধ্যাহ্নে জাহাজ ধকধক করে চলছে। শারদ রোদে রঞ্জিত দু-তীরের শান্তিময় বৈচিত্র্য স্বপ্নের মতো চোখের ওপর দিয়ে পরিবর্তিত হয়ে চলেছে। কোথাও বা ধানের খেত, কোথাও বা নৌকা-লাগানো ঘাট, কোথাও বা বালুর তীর, কোথাও বা গ্রামের গোয়াল, কোথাও বা গঞ্জের টিনের ছাদ, কোথাও বা প্রাচীন ছায়াবটের তলে খেয়াতরীর-অপেক্ষী দু-চারটে পারের যাত্রী। এই শরৎমধ্যাহ্নের সুমধুর স্তব্ধতার মধ্যে অদূরে কামরার ভেতর থেকে যখন ক্ষণে ক্ষণে কমলার স্নিগ্ধ কৌতুকহাস্য রমেশের কানে এসে প্রবেশ করল তখন তার বুকে বাজতে লাগল। সমস্তই কী সুন্দর, অথচ কী সুদূর। রমেশের আর্ত জীবনের সঙ্গে কী নিদারুণ আঘাতে বিচ্ছিন্ন।
কমলার এখনো অল্প বয়স– কোনো সংশয়, আশঙ্কা বা বেদনা স্থায়ী হয়ে তার মনের মধ্যে টিকে থাকতে পারে না।
রমেশের ব্যবহার সম্পর্কে এ কয়দিন সে আর কোনো চিন্তা করার অবকাশ পায়নি। স্রোত যেখানে বাধা পায় সেখানে যত আবর্জনা এসে জমে– কমলার চিত্তস্রোতের সহজ প্রবাহ রমেশের আচরণে হঠাৎ একটা জায়গায় বাধা পেয়েছিল, সেখানে আবর্ত রচিত হয়ে নানা কথা বারবার একই জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছিল। বৃদ্ধ চক্রবর্তীকে নিয়ে হেসে, বকে, রেঁধে, খাওয়িয়ে কমলার হৃদয়স্রোত আবার সমস্ত বাধা অতিক্রম করে চলে গেল; আবর্ত কেটে গেল; যা-কিছু জমছিল এবং ঘুরছিল তা সমস্ত ভেসে গেল। সে নিজের কথা আর কিছুই ভাবল না।
আশ্বিনের সুন্দর দিনগুলো নদীপথের বিচিত্র দৃশ্যগুলোকে রমণীয় করে তারই মাঝখানে কমলার এই প্রতিদিনের আনন্দিত গৃহিণীপনাকে যেন সোনার জলের ছবির মাঝখানে এক-একটি সরল কবিতার পৃষ্ঠার মতো উল্টে যেতে লাগল।
কর্মের উৎসাহে দিন শুরু হত। উমেশ আজকাল আর স্টিমার ফেল করে না, কিন্তু তার ঝুড়ি ভর্তি হয়ে আসে। ক্ষুদ্র ঘরকন্নার মধ্যে উমেশের এই সকালবেলাকার ঝুড়িটা পরম কৌতূহলের বিষয়। “এ কী রে, এ যে লাউডগা! ওমা, শজনের খাড়া তুই কোথা থেকে জোগাড় করে এনেছিস? এই দেখো দেখো, খুড়োমশায়, টক-পালং যে এই খোট্টার দেশে পাওয়া যায় তা তো আমি জানতাম না।” ঝুড়ি নিয়ে রোজ সকালে এরকম একটা কলরব উঠে। যেদিন রমেশ উপস্থিত থাকে সেদিন এর মধ্যে একটু বেসুর লাগে– সে চৌর্য সন্দেহ না করে থাকতে পারে না। কমলা উত্তেজিত হয়ে বলে, “বাঃ, আমি নিজের হাতে ওকে পয়সা গুনে দিয়েছি।”
রমেশ বলে, “তাতে ওর চুরির সুবিধা ঠিক দ্বিগুণ বেড়ে যায়। পয়সাটাও চুরি করে, শাকও চুরি করে।”
এই বলে রমেশ উমেশকে ডেকে বলে, “আচ্ছা, হিসাব দে দেখি।”
তাতে তার এক বারের হিসাবের সঙ্গে আরেক বারের হিসাব মেলে না। ঠিক দিতে গেলে জমার চেয়ে খরচের অঙ্ক বেশি হয়ে ওঠে। এতে উমেশ লেশমাত্র কুণ্ঠিত হয় না। সে বলে, “আমি যদি হিসাব ঠিক রাখতে পারি তবে আমার এমন দশা হবে কেন? আমি তো গোমস্তা হতে পারতাম, কী বলেন দাদাঠাকুর?”
চক্রবর্তী বলেন, “রমেশবাবু, আহারের পর আপনি ওর বিচার করবেন, তাহলে সুবিচার করতে পারবেন। আপাতত আমি এই ছোঁড়াটাকে উৎসাহ না দিয়ে থাকতে পারছি না। উমেশ, বাবা, সংগ্রহ করার বিদ্যা কম বিদ্যা নয়; অল্প লোকেই পারে। চেষ্টা সকলেই করে; কৃতকার্য কয়জনে হয়? রমেশবাবু, গুণীর মর্যাদা আমি বুঝি। শজনে-খাড়ার সময় এ নয়, তবু এত ভোরে বিদেশে শজনের খাড়া কয়জন ছেলে জোগাড় করে আনতে পারে বলুন দেখি। মশায়, সন্দেহ করতে অনেকেই পারে; কিন্তু সংগ্রহ করতে হাজারে একজন পারে।”
রমেশ। খুড়ো, এটা ভালো হচ্ছে না, উৎসাহ দিয়ে অন্যায় করছেন।
চক্রবর্তী। ছেলেটার বিদ্যে বেশি নেই, যেটাও আছে সেটাও যদি উৎসাহের অভাবে নষ্ট হয়ে যায় তো বড়ো আক্ষেপের বিষয় হবে– অন্তত যে কয়দিন আমরা স্টিমারে আছি। ওরে উমেশ, কাল কিছু নিমপাতা জোগাড় করে আনিস; যদি উচ্ছে পাস আরো ভালো হয়– মা, সুক্তুনিটা নিতান্তই চাই। আমাদের আয়ুর্বেদে বলে– থাক, আয়ুর্বেদের কথা থাক, এ দিকে বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে। উমেশ, শাকগুলো বেশ করে ধুয়ে নিয়ে আয়।
রমেশ এরকমভাবে উমেশকে নিয়ে যতই সন্দেহ করে, খিটখিট করে, উমেশ ততই যেন কমলার বেশি করে নিজের হয়ে ওঠে। এদিকে চক্রবর্তী তার পক্ষ নেওয়াতে রমেশের সঙ্গে কমলার দলটি যেন বেশ একটু স্বতন্ত্র হয়ে এল। রমেশ তার সূক্ষ্ম বিচারশক্তি নিয়ে এক দিকে একা; অন্য দিকে কমলা, উমেশ এবং চক্রবর্তী তাদের কর্মসূত্রে, স্নেহসূত্রে, আমোদ-আহ্লাদের সূত্রে ঘনিষ্ঠভাবে এক। চক্রবর্তী এসে অবধি তার উৎসাহের সংক্রামক উত্তাপে রমেশ কমলাকে পূর্বাপেক্ষা বিশেষ ঔৎসুক্যের সঙ্গে দেখছে, কিন্তু তবু দলে মিশতে পারছে না। বড়ো জাহাজ যেমন ডাঙায় ভিড়তে চায়, কিন্তু জল কম বলে তাকে তফাতে নোঙর ফেলে দূর থেকে তাকিয়ে থাকতে হয়, এদিকে ছোটো ছোটো ডিঙি-পানসিগুলো অনায়াসেই তীরে গিয়ে ভিড়ে, রমেশের সেই দশা হয়েছে।
পূর্ণিমার কাছাকাছি একদিন সকালে উঠে দেখা গেল, রাশি রাশি কালো মেঘ দলে দলে আকাশ পূর্ণ করে ফেলেছে। বাতাস এলোমেলো বইছে। বৃষ্টি এক-এক বার আসছে, আবার এক-এক বার ধরে গিয়ে রোদের আভাসও দেখা যাচ্ছে। মাঝগঙ্গায় আজ আর নৌকা নেই, দু-একখানা যা দেখা যাচ্ছে তাদের উৎকণ্ঠিত ভাব স্পষ্টই বোঝা যায়। জলার্থিনী মেয়েরা আজ ঘাটে অধিক বিলম্ব করছে না। জলের ওপর মেঘবিচ্ছুরিত একটা রুদ্র আলোক পড়েছে এবং ক্ষণে ক্ষণে নদীনীর এক তীর থেকে আরেক তীর পর্যন্ত শিহরে উঠছে।
স্টিমার যথানিয়মে চলছে। দুর্যোগের নানা অসুবিধার মধ্যে কোনোমতে কমলার রাঁধাবাড়া চলতে লাগল। চক্রবর্তী আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মা, ওবেলা যাতে রাঁধতে না হয় তার ব্যবস্থা করতে হবে। তুমি খিচুড়ি চড়িয়ে দাও, আমি এদিকে রুটি গড়ে রাখি।”
খাওয়াদাওয়া শেষ হতে আজ অনেক বেলা হল। দমকা হাওয়ার জোর ক্রমে বেড়ে উঠল। নদী ফেনিয়ে ফেনিয়ে ফুলতে লাগল। সূর্য অস্ত গেছে কি না বোঝা গেল না। সকাল-সকাল স্টিমার নোঙর ফেলল।
সন্ধ্যা উত্তীর্ণ হয়ে গেল। ছিন্নবিচ্ছিন্ন মেঘের মধ্য থেকে বিকারের পাংশুবর্ণ হাসির মতো একবার জ্যোৎস্নার আলো বের হতে লাগল। তুমুলবেগে বাতাস এবং মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হল।
কমলা একবার জলে ডুবেছে– ঝড়ের ঝাপটাকে সে অগ্রাহ্য করতে পারে না। রমেশ এসে তাকে আশ্বাস দিল, “স্টিমারে কোনো ভয় নেই কমলা। তুমি নিশ্চিন্ত হয়ে ঘুমোতে পার, আমি পাশের ঘরেই জেগে আছি।”
দরজার কাছে এসে চক্রবর্তী বললেন, “মা লক্ষ্মী, ভয় নেই, ঝড়ের বাপের সাধ্য কী তোমাকে স্পর্শ করে।”
ঝড়ের বাপের সাধ্য কতদূর তা নিশ্চয় বলা কঠিন, কিন্তু ঝড়ের সাধ্য যে কী তা কমলার অগোচর নয়; সে তাড়াতাড়ি দরজার কাছে গিয়ে ব্যগ্রস্বরে বলল, “খুড়োমশায়, তুমি ঘরে এসে বোসো।”
চক্রবর্তী সসংকোচে বললেন, “তোমাদের যে এখন শোয়ার সময় হল মা, আমি এখন–”
ঘরে ঢুকে দেখলেন রমেশ সেখানে নেই; আশ্চর্য হয়ে বললেন, “রমেশবাবু এই ঝড়ে গেলেন কোথায়? শাক-চুরি তো তাঁর অভ্যাস নয়।”
“কে ও, খুড়ো নাকি? এই-যে, আমি পাশের ঘরেই আছি।”
পাশের ঘরে চক্রবর্তী উঁকি মেরে দেখলেন, রমেশ বিছানায় অর্ধশয়ান অবস্থায় আলো জ্বালিয়ে বই পড়ছে।
চক্রবর্তী বললেন, “বউমা যে একলা ভয়ে সারা হলেন। আপনার বই তো ঝড়কে ডরায় না, ওটা এখন রেখে দিলে অন্যায় হয় না। আসুন এ ঘরে।”
কমলা একটা দুর্নিবার আবেগবশে আত্মবিস্মৃত হয়ে তাড়াতাড়ি চক্রবর্তীর হাত দৃঢ়ভাবে চেপে রুদ্ধকণ্ঠে বলল, “না, না খুড়োমশায়! না, না।” ঝড়ের কোলাহলে কমলার এ কথা রমেশের কানে গেল না, কিন্তু চক্রবর্তী বিস্মিত হয়ে ফিরে এলেন।
রমেশ বই রেখে এ ঘরে উঠে এল। জিজ্ঞাসা করল, “কী চক্রবর্তী-খুড়ো, ব্যাপার কী? কমলা বুঝি আপনাকে–”
কমলা রমেশের মুখের দিকে না তাকিয়ে তাড়াতাড়ি বলে উঠল, “না, না, আমি ওঁকে কেবল গল্প বলার জন্য ডেকেছিলাম।”
কীসের প্রতিবাদে যে কমলা “না না” বলল তা তাকে জিজ্ঞাসা করলে সে বলতে পারত না। এই “না”র অর্থ এই যে, যদি মনে কর আমার ভয় ভাঙানোর দরকার আছে– না, দরকার নেই। যদি মনে কর আমাকে সঙ্গ দেওয়ার প্রয়োজন– না, প্রয়োজন নেই।
পরক্ষণেই কমলা বলল, “খুড়োমশায়, রাত হয়ে যাচ্ছে, আপনি শুতে যান। একবার উমেশের খবর নেবেন, সে হয়তো ভয় পাচ্ছে।”
দরজার কাছ থেকে একটা আওয়াজ এল “মা, আমি কাউকেই ভয় করি না।”
উমেশ মুড়ি সুড়ি দিয়ে কমলার দরজার কাছে বসে আছে। কমলার হৃদয় বিগলিত হয়ে গেল; সে তাড়াতাড়ি বাইরে গিয়ে বলল, “হ্যাঁ রে উমেশ, তুই ঝড়-জলে ভিজছিস কেন? লক্ষ্মীছাড়া কোথাকার, যা খুড়োমশায়ের সঙ্গে শুতে যা।”
কমলার মুখে লক্ষ্মীছাড়া-সম্বোধনে উমেশ বিশেষ পরিতৃপ্ত হয়ে চক্রবর্তী-খুড়ার সঙ্গে শুতে গেল।
রমেশ জিজ্ঞাসা করল, “যতক্ষণ না ঘুম আসে আমি বসে গল্প করব কি?”
কমলা বলল, “না, আমার ভারি ঘুম পেয়েছে।”
রমেশ কমলার মনের ভাব যে না বুঝল তা নয়, কিন্তু সে আর দ্বিরুক্তি করল না; কমলার অভিমানক্ষুণ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে সে ধীরে ধীরে নিজের কক্ষে চলে গেল।
বিছানায় স্থির হয়ে ঘুমের অপেক্ষায় পড়ে থাকতে পারে, এমন শান্তি কমলার মনে ছিল না। তবু সে জোর করে শুল। ঝড়ের বেগের সঙ্গে জলের কোলাহল ক্রমে বেড়ে উঠল। খালাসিদের গোলমাল শোনা যেতে লাগল। মাঝে মাঝে ইঞ্জিন-ঘরে সারেংয়ের আদেশসূচক ঘণ্টা বেজে উঠল। প্রবল বায়ুবেগের বিরুদ্ধে জাহাজকে স্থির রাখার জন্য নোঙর-বাঁধা অবস্থাতেও ইঞ্জিন ধীরে ধীরে চলতে থাকল।
কমলা বিছানা ছেড়ে কামরার বাইরে এসে দাঁড়াল। ক্ষণকালের জন্য বৃষ্টির বিশ্রাম হয়েছে, কিন্তু ঝড়ের বাতাস শরবিদ্ধ জন্তুর মতো চেঁচিয়ে দিগ্বিদিকে ছুটে বেড়াচ্ছে। মেঘসত্ত্বেও শুক্লচতুর্দশীর আকাশ ক্ষীণ আলোকে অশান্ত সংহারমূর্তি অস্পষ্টভাবে প্রকাশ করছে। তীর স্পষ্ট লক্ষ্য হচ্ছে না; নদী ঝাপসা দেখা যাচ্ছে; কিন্তু ওপরে নীচে, দূরে কাছে, দৃশ্যে অদৃশ্যে একটা মূঢ় উন্মত্ততা, একটা অন্ধ আন্দোলন যেন অদ্ভুত মূর্তি পরিগ্রহ করে যমরাজের উদ্যতশৃঙ্গ কালো মহিষটার মতো মাথা ঝাঁকা দিয়ে দিয়ে উঠছে।
এই পাগল রাত্রি, এই আকুল আকাশের দিকে তাকিয়ে, কমলার বুকের ভেতরটা যে দুলতে লাগল তা ভয়ে কি আনন্দে নিশ্চয় করে বলা যায় না। এই প্রলয়ের মধ্যে যে একটা বাধাহীন শক্তি, একটা বন্ধনহীন স্বাধীনতা আছে, তা যেন কমলার হৃদয়ের মধ্যে একটা সুপ্ত সঙ্গিনীকে জাগিয়ে তুলল। এই বিশ্বব্যাপী বিদ্রোহের বেগ কমলার চিত্তকে বিচলিত করল। কীসের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, তার উত্তর কি এই ঝড়ের গর্জনের মধ্যে পাওয়া যায়? না, তা কমলার হৃদয়াবেগেরই মতো অব্যক্ত। একটা কোন অনির্দিষ্ট অমূর্ত মিথ্যার, স্বপ্নের, অন্ধকারের জাল ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে বাইরে বেরিয়ে আসার জন্য আকাশপাতালে এই মাতামাতি, এই রোষগর্জিত ক্রন্দন। পথহীন প্রান্তরের প্রান্ত থেকে বাতাস কেবল “না না” বলে চেঁচিয়ে নিশীথরাত্রে ছুটে আসছে– একটা কেবল প্রচণ্ড অস্বীকার। কীসের অস্বীকার? তা নিশ্চয় বলা যায় না– কিন্তু না– কিছুতেই না, না, না, না।