পরদিন সকালে ঝড়ের বেগ কিছু কমেছে, কিন্তু একেবারে থামেনি। নোঙর তুলবে কি না এখনো তা সারেং ঠিক করতে পারেনি, উদ্বিগ্নমুখে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
সকালেই চক্রবর্তী রমেশের সন্ধানে কমলার পাশের কামরায় ঢুকলেন। দেখলেন, রমেশ তখনো বিছানায় পড়ে আছে, চক্রবর্তীকে দেখে সে তাড়াতাড়ি উঠে বসল। এই ঘরে রমেশের শয়নাবস্থা দেখে চক্রবর্তী গতরাত্রির ঘটনার সঙ্গে মনে মনে সমস্তটা মিলিয়ে নিলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, “কাল রাতে বুঝি এই ঘরেই শোয়া হয়েছিল?”
রমেশ এই প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে বলল, “এ কী দুর্যোগ শুরু হয়েছে! কাল রাতে খুড়োর ঘুম কেমন হল?”
চক্রবর্তী বললেন, “আমাকে নির্বোধের মতো দেখতে, আমার কথাবার্তাও সেই প্রকারের, তবু এই বয়সে আমাকে অনেক দুরূহ বিষয়ের চিন্তা করতে হয়েছে এবং তার অনেকগুলোর মীমাংসাও পেয়েছি– কিন্তু আপনাকে সবচেয়ে দুরূহ বলে ঠেকছে।”
মুহূর্তের জন্য রমেশের মুখ সামান্য লাল হয়ে উঠল, পরক্ষণেই আত্মসংবরণ করে একটুখানি হেসে বলল, “দুরূহ হওয়াটাই যে সবসময়ে অপরাধের তা নয় খুড়ো। তেলেগু ভাষার শিশুপাঠও দুরূহ, কিন্তু ত্রৈলঙ্গের বালকের কাছে তা জলের মতো সহজ। যাকে না বুঝবেন তাকে তাড়াতাড়ি দোষ দেবেন না এবং যে অক্ষর না বোঝেন কেবলমাত্র তার ওপর অনিমেষ চোখ রাখলেই যে তা কোনোকালে বুঝতে পারবেন এমন আশা করবেন না।”
বৃদ্ধ বললেন, “আমাকে মাপ করবেন রমেশবাবু। আমার সঙ্গে যার বোঝাপড়ার কোনো সম্পর্ক নেই তাকে বুঝতে চেষ্টা করাই ধৃষ্টতা। কিন্তু পৃথিবীতে দৈবাৎ এমন এক-একটি মানুষ মেলে, দৃষ্টিপাতমাত্রই যার সঙ্গে সম্বন্ধ স্থির হয়ে যায়। তার সাক্ষী, আপনি ঐ দেড়ে সারেংটাকে জিজ্ঞাসা করুন– বউমার সঙ্গে ওর আত্মীয়সম্বন্ধ ওকে এখনি স্বীকার করতে হবে; ওর ঘাড় করবে; না করে তো ওকে আমি মুসলমান বলব না। এমন অবস্থায় হঠাৎ মাঝখানে তেলেগু ভাষা এসে পড়লে ভারি মুশকিলে পড়তে হয়। শুধু শুধু রাগ করলে চলবে না রমেশবাবু, কথাটা ভেবে দেখবেন।”
রমেশ বলল, “ভেবে দেখছি বলেই তো রাগ করতে পারছি না; কিন্তু আমি রাগ করি আর না করি, আপনি দুঃখ পান আর না পান, তেলেগু ভাষা তেলেগুই থেকে যাবে– প্রকৃতির এরকম নিষ্ঠুর নিয়ম।”
এই বলে রমেশ একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলল।
এদিকে রমেশ চিন্তা করতে লাগল, গাজিপুরে যাওয়া উচিত কি না। প্রথমে সে ভেবেছিল, অপরিচিত স্থানে বাসস্থাপন করার পক্ষে বৃদ্ধের সঙ্গে পরিচয় তার কাজে লাগবে। কিন্তু এখন মনে হল, পরিচয়ের অসুবিধাও আছে। কমলার সঙ্গে তার সম্বন্ধ আলোচনা ও অনুসন্ধানের বিষয় হয়ে উঠলে একদিন তা কমলার পক্ষে নিদারুণ হয়ে দাঁড়াবে। তার চেয়ে যেখানে সকলেই অপরিচিত, যেখানে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার কেউ নেই, সেখানে আশ্রয় নেওয়াই ভালো।
গাজিপুরে পৌঁছানোর আগের দিনে রমেশ চক্রবর্তীকে বলল, “খুড়ো, গাজিপুর আমার প্র্যাকটিসের পক্ষে অনুকূল বলে বুঝছি না, আপাতত কাশীতে যাওয়াই আমি স্থির করেছি।”
রমেশের কথার মধ্যে নিঃসংশয়ের সুর শুনে বৃদ্ধ হেসে বললেন, “বারবার ভিন্ন ভিন্ন রকম স্থির করাকে স্থির করা বলে না– সে তো অস্থির করা। যা হোক, এই কাশী যাওয়াটা এখনকার মতো আপনার শেষ স্থির?”
রমেশ সংক্ষেপে বলল, “হ্যাঁ।”
বৃদ্ধ কোনো উত্তর না করে চলে গেলেন এবং জিনিসপত্র বাঁধতে প্রবৃত্ত হলেন।
কমলা এসে বলল, “খুড়োমশায়, আজ কি আমার সঙ্গে আড়ি?”
বৃদ্ধ বললেন, “ঝগড়া তো দু-বেলাই হয়, কিন্তু একদিনও তো জিততে পারলাম না।”
কমলা। আজ যে সকাল থেকে তুমি পালিয়ে বেড়াচ্ছ?
চক্রবর্তী। তোমরা যে মা, আমার চেয়ে বড়ো রকমের পলায়নের চেষ্টায় আছ, আর আমাকে পলাতক বলে অপবাদ দিচ্ছ?
কমলা কথাটা না বুঝে তাকিয়ে রইল। বৃদ্ধ বললেন, “রমেশবাবু তবে কি এখনো বলেননি? তোমাদের যে কাশী যাওয়া স্থির হয়েছে।”
শুনে কমলা হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। কিছুক্ষণ পরে বলল, “খুড়োমশায়, তুমি পারবে না; দাও, তোমার বাক্স আমি সাজিয়ে দিই।”
কাশী যাওয়া সম্পর্কে কমলার এই ঔদাসীন্যে চক্রবর্তী হৃদয়ের মধ্যে একটা গভীর আঘাত পেলেন। মনে মনে ভাবলেন, “ভালোই হচ্ছে, আমার মতো বয়সে আবার নতুন জাল জড়ানো কেন?”
এদিকে কাশী যাওয়ার কথা কমলাকে জানানোর জন্য রমেশ এসে উপস্থিত হল। বলল, “আমি তোমাকে খুঁজছিলাম।”
কমলা চক্রবর্তীর কাপড়চোপড় ভাঁজ করে গুছাতে লাগল। রমেশ বলল, “কমলা, এবার আমাদের গাজিপুরে যাওয়া হল না; আমি স্থির করেছি, কাশীতে গিয়ে প্র্যাকটিস করব। তুমি কী বল?”
কমলা চক্রবর্তীর বাক্স থেকে চোখ না তুলে বলল, “না, আমি গাজিপুরেই যাব। আমি সমস্ত জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়েছি।”
কমলার এই দ্বিধাহীন উত্তরে রমেশ কিছু আশ্চর্য হয়ে গেল; বলল, “তুমি কি একলাই যাবে নাকি!”
কমলা চক্রবর্তীর মুখের দিকে তার স্নিগ্ধ চোখ তুলে বলল, “কেন, সেখানে তো খুড়োমশায় আছেন।”
কমলার এই কথায় চক্রবর্তী কুণ্ঠিত হয়ে পড়লেন; বললেন, “মা, তুমি যদি সন্তানের প্রতি এতদূর পক্ষপাত দেখাও, তাহলে রমেশবাবু আমাকে দু-চোখে দেখতে পারবেন না।”
এর উত্তরে কমলা কেবল বলল, “আমি গাজিপুরে যাব।”
এ সম্পর্কে যে কারও কোনো সম্মতির অপেক্ষা আছে, কমলার কণ্ঠস্বরে এরকম প্রকাশ পেল না।
রমেশ বলল, “খুড়ো, তবে গাজিপুরই স্থির।”
ঝড়জলের পর সেদিন রাতে জ্যোৎস্না পরিষ্কার হয়ে ফুটেছে। রমেশ ডেকের কেদারায় বসে ভাবতে লাগল, “এমন করে আর চলবে না। ক্রমেই বিদ্রোহী কমলাকে নিয়ে জীবনের সমস্যা অত্যন্ত দুরূহ হয়ে উঠবে। এমন করে কাছে থেকে দূরত্ব রক্ষা করা দুরূহ। এবারে হাল ছেড়ে দেব। কমলাই আমার স্ত্রী– আমি তো ওকে স্ত্রী বলেই গ্রহণ করেছিলাম। মন্ত্র পড়া হয়নি বলেই কোনো সংকোচ করা অন্যায়। যমরাজ সেদিন কমলাকে বধূরূপে আমার পার্শ্বে এনে দিয়ে সেই নির্জন সৈকতদ্বীপে স্বয়ং গ্রন্থিবন্ধন করে দিয়েছেন– তাঁর মতো এমন পুরোহিত জগতে কোথায় আছে!”
হেমনলিনী এবং রমেশের মাঝখানে একটা যুদ্ধক্ষেত্র পড়ে আছে। বাধা-অপমান-অবিশ্বাস কেটে যদি রমেশ জয়ী হতে পারে তবেই সে মাথা তুলে হেমনলিনীর পার্শ্বে গিয়ে দাঁড়াতে পারবে। সেই যুদ্ধের কথা মনে হলে তার ভয় হয়; জিতবার কোনো আশা থাকে না। কেমন করে প্রমাণ করবে? এবং প্রমাণ করতে হলে সমস্ত ব্যাপারটা লোকসাধারণের কাছে এমন কদর্য এবং কমলার পক্ষে এমন সাংঘাতিক আঘাতকর হয়ে উঠবে যে, সে সংকল্প মনে স্থান দেওয়া কঠিন।
অতএব দুর্বলের মতো আর দ্বিধা না করে কমলাকে স্ত্রী বলে গ্রহণ করলেই সকল দিকে শ্রেয় হবে। হেমনলিনী তো রমেশকে ঘৃণা করছে– এই ঘৃণাই তাকে উপযুক্ত সৎপাত্রে চিত্তসমর্পণ করতে আনুকূল্য করবে। এই ভেবে রমেশ একটা দীর্ঘনিশ্বাসের দ্বারা সেইদিককার আশাটাকে ভূমিসাৎ করে দিল।
রমেশ জিজ্ঞাসা করল, “কী রে, তুই কোথায় চলেছিস?”
উমেশ বলল, “আমি মাঠাকরুনের সঙ্গে যাচ্ছি।”
রমেশ। আমি যে তোর কাশী পর্যন্ত টিকিট করে দিয়েছি। ও-যে গাজিপুরের ঘাট। আমরা তো কাশী যাব না।
উমেশ। আমিও যাব না।
উমেশ যে তাদের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্যে পড়বে এরকম আশঙ্কা রমেশের মনে ছিল না; কিন্তু ছোঁড়াটার অবিচলিত দৃঢ়তা দেখে রমেশ স্তম্ভিত হল। কমলাকে জিজ্ঞাসা করল, “কমলা, উমেশকেও নিতে হবে নাকি?”
কমলা বলল, “না নিলে ও কোথায় যাবে?”
রমেশ। কেন, কাশীতে ওর আত্মীয় আছে।
কমলা। না, ও আমাদেরই সঙ্গে যাবে বলেছে। উমেশ, দেখিস, তুই খুড়োমশায়ের সঙ্গে সঙ্গে থাকিস, নইলে বিদেশে ভিড়ের মধ্যে কোথায় হারিয়ে যাবি।
কোন দেশে যেতে হবে, কাকে সঙ্গে নিতে হবে, এসব মীমাংসার ভার কমলা একলাই নিয়েছে। রমেশের ইচ্ছা-অনিচ্ছার বন্ধন পূর্বে কমলা নম্রভাবে স্বীকার করত, হঠাৎ এই শেষ কয়দিনের মধ্যে তা যেন সে কেটে উঠেছে।
অতএব উমেশও তার ক্ষুদ্র একটা কাপড়ের পুঁটুলি কক্ষে নিয়ে চলল, এ সম্পর্কে আর অধিক আলোচনা হল না।
শহর এবং সাহেবপাড়ার মাঝামাঝি একটা জায়গায় খুড়োমশায়ের একটা ছোটো বাংলো। তার পেছনে আমবাগান, সামনে বাঁধানো কূপ, সামনের দিকে অনুচ্চ প্রাচীরের বেষ্টন– কূপের সেচের জলে কপি-কড়াইশুঁটির খেত শ্রীবৃদ্ধি লাভ করেছে।
প্রথম দিনে কমলা ও রমেশ এই বাংলাতে গিয়েই উঠল।
চক্রবর্তী-খুড়ার স্ত্রী হরিভাবিনীর শরীর কাহিল বলে খুড়ো লোকসমাজে প্রচার করেন, কিন্তু তার দৌর্বল্যের বাহ্যলক্ষণ কিছুই দেখতে পাওয়া যায় না। তার বয়স নিতান্ত অল্প নয়, কিন্তু শক্তসমর্থ চেহারা। সামনের কিছু কিছু চুল পেকেছে, কিন্তু কাঁচার অংশই বেশি। তার সম্পর্কে জরা যেন কেবলমাত্র ডিক্রি পেয়েছে, কিন্তু দখল পাচ্ছে না।
আসল কথা, এই দম্পতি যখন তরুণ ছিলেন তখন হরিভাবিনীকে ম্যালেরিয়ায় খুব শক্ত করে ধরে। বায়ুপরিবর্তন ছাড়া আর কোনো উপায় না দেখে চক্রবর্তী গাজিপুর স্কুলের মাস্টারি জোগাড় করে এখানে এসে বাস করেন। স্ত্রী সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তার স্বাস্থ্যের প্রতি চক্রবর্তীর কিছুমাত্র আস্থা জন্মায়নি।
অতিথিদের বাইরের ঘরে বসিয়ে চক্রবর্তী অন্তঃপুরে ঢুকে ডাকলেন, “সেজবউ!”
সেজবউ তখন প্রাচীরবেষ্টিত প্রাঙ্গণে রামকৌলিকে দিয়ে গম ভাঙাচ্ছিলেন এবং ছোটোবড়ো নানাপ্রকার ভাঁড়ে ও হাঁড়িতে নানাজাতীয় চাটনি রোদে সাজাচ্ছিলেন।
চক্রবর্তী এসেই বললেন, “এই বুঝি! ঠাণ্ডা পড়েছে– গায়ে একখানা রেপার দিতে নেই?”
হরিভাবিনী। তোমার সকল অনাসৃষ্টি। ঠাণ্ডা আবার কোথায়– রোদে পিঠ পুড়ছে।
চক্রবর্তী। সেটাই কি ভালো? ছায়া জিনিসটা তো দুর্মূল্য নয়।
হরিভাবিনী। আচ্ছা, সে হবে, তুমি আসতে এত দেরি করলে কেন?
চক্রবর্তী। সে অনেক কথা। আপাতত ঘরে অতিথি উপস্থিত, সেবার আয়োজন করতে হবে।
এই বলে চক্রবর্তী অভ্যাগতদের পরিচয় দিলেন। চক্রবর্তীর ঘরে হঠাৎ এরকম বিদেশী অতিথির সমাগম প্রায়ই ঘটে, কিন্তু সস্ত্রীক অতিথির জন্য হরিভাবিনী প্রস্তুত ছিলেন না; তিনি বললেন, “ওমা, তোমার এখানে ঘর কোথায়?”
চক্রবর্তী বললেন, “আগে তো পরিচয় হোক, তারপর ঘরের কথা পরে হবে। আমাদের শৈল কোথায়?”
হরিভাবিনী। সে তার ছেলেকে স্নান করাচ্ছে।
চক্রবর্তী তাড়াতাড়ি কমলাকে অন্তঃপুরে ডেকে আনলেন। কমলা হরিভাবিনীকে প্রণাম করে দাঁড়াতেই তিনি দক্ষিণ করপুটে কমলার চিবুক স্পর্শ করে নিজের আঙুল চুম্বন করলেন এবং স্বামীকে বললেন, “দেখেছ, মুখখানি অনেকটা আমাদের বিধুর মতো।”
বিধু তাদের বড়ো মেয়ে, কানপুরে স্বামিগৃহে থাকে। চক্রবর্তী মনে মনে হাসলেন। তিনি জানতেন কমলার সঙ্গে বিধুর কোনো সাদৃশ্য নেই, কিন্তু হরিভাবিনী রূপগুণে বাইরের মেয়ের জয় স্বীকার করতে পারেন না। শৈলজা তাঁর ঘরেই থাকে, পাছে তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ তুলনায় বিচারে হার হয়, এইজন্য অনুপস্থিতকে উপমাস্থলে রেখে জয়পতাকা গৃহিণী নিজের গৃহের মধ্যেই অচল করলেন।
হরিভাবিনী। তাঁরা এসেছেন, তা বেশ হয়েছে, কিন্তু আমাদের নতুন বাড়ির তো মেরামত শেষ হয়নি– এখানে আমরা কোনোমতে মাথা গুঁজে আছি– তাঁদের যে কষ্ট হবে।
বাজারে চক্রবর্তীর একটা ছোটো বাড়ি মেরামত হচ্ছে বটে, কিন্তু সেটা একটা দোকান; সেখানে বাস করার কোনো সুবিধাও নেই, সংকল্পও নেই।
চক্রবর্তী এই মিথ্যার কোনো প্রতিবাদ না করে একটু হেসে বললেন, “মা যদি কষ্টকে কষ্ট জ্ঞান করবেন তবে কি তাঁকে এ ঘরে আনি? (স্ত্রীর প্রতি) যাই হোক, তুমি আর বাইরে দাঁড়িয়ো না– শরৎকালের রোদটা বড়ো খারাপ।”
এই বলে চক্রবর্তী রমেশের কাছে বাইরে চলে গেলেন।
হরিভাবিনী কমলার বিস্তারিত পরিচয় নিতে লাগলেন। “তোমার স্বামী বুঝি উকিল? তিনি কতদিন কাজ করছেন? তিনি কত রোজগার করেন? এখনো বুঝি ব্যাবসা শুরু করেননি? তবে চলে কী করে? তোমার শ্বশুরের বুঝি সম্পত্তি আছে? জান না? ওমা, কেমন মেয়ে গো! শ্বশুরবাড়ির খবর রাখ না? সংসার-খরচের জন্য স্বামী তোমাকে মাসে কত করে দেন? শাশুড়ি যখন নেই তখন তো সংসারের ভার নিজের হাতেই নিতে হবে। তুমি তো নেহাত কচি মেয়েটি নও– আমার বড়ো জামাই যা-কিছু রোজগার করে সমস্তই বিধুর হাতে গুনে দেয়” ইত্যাদি প্রশ্ন ও মন্তব্যের দ্বারা অতি অল্পকালের মধ্যেই কমলাকে অর্বাচীন প্রতিপন্ন করে দিলেন। কমলাও যে রমেশের অবস্থা ও ইতিবৃত্ত সম্পর্কে কত অল্প জানে এবং তাদের সম্বন্ধ বিচার করলে এই অল্পজ্ঞান যে কত অসংগত ও লোকসমাজে লজ্জাকর, হরিভাবিনীর প্রশ্নমালায় তা তার মনে স্পষ্ট উদয় হল। সে ভেবে দেখল, আজ পর্যন্ত রমেশের সঙ্গে ভালো করে কোনো কথা আলোচনা করার অবকাশমাত্র সে পায়নি– সে রমেশের স্ত্রী হয়ে রমেশের সম্পর্কে কিছুই জানে না। আজ এটা তার নিজের কাছে অদ্ভুত বোধ হল এবং নিজের এই অকিঞ্চিৎকরত্বের লজ্জা তাকে পীড়িত করে তুলল।
হরিভাবিনী আবার শুরু করলেন, “বউমা, দেখি তোমার বালা। এ সোনা তো তেমন ভালো নয়। বাপের বাড়ি থেকে কিছু গহনা আননি? বাপ নেই? তাই বলে কি এমন করে গা খালি রাখে? তোমার স্বামী বুঝি কিছু দেননি? আমার বড়ো জামাই দু-মাস অন্তর আমার বিধুকে একখানা করে গহনা গড়িয়ে দেয়।”
এসব সওয়াল-জবাবের মধ্যে শৈলজা তার দু-বছর বয়সের কন্যার হাত ধরে এসে উপস্থিত হল। শৈলজা শ্যামবর্ণ, তার মুখখানি ছোটোখাটো, মুষ্টিমেয়, চোখ-দুটি উজ্জ্বল, ললাট প্রশস্ত– মুখ দেখলেই স্থির বুদ্ধি এবং একটি শান্ত পরিতৃপ্তির ভাব চোখে পড়ে।
শৈলজার ছোটো মেয়েটি কমলার সামনে দাঁড়িয়ে মুহূর্তকাল পর্যবেক্ষণের পর বলে উঠল “মাসি”– বিধুর সঙ্গে সাদৃশ্য বিচার করে যে বলল তা নয়, একটা বিশেষ বয়সের যেকোনো মেয়েকে তার অপ্রিয় বোধ না হলেই তাকেই সে নির্বিচারে মাসি নামে অভিহিত করে। কমলা তৎক্ষণাৎ তাকে কোলে তুলে নিল।
হরিভাবিনী শৈলজার কাছে কমলার পরিচয় দিয়ে বললেন, “তাঁর স্বামী উকিল, নতুন রোজগার করতে বাইরে হয়েছেন। পথে কর্তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তিনি তাঁদের গাজিপুরে এনেছেন।”
শৈলজা কমলার মুখের দিকে তাকাল, কমলাও শৈলজার মুখের দিকে তাকাল, এবং সেই দৃষ্টিপাতেই এক মুহূর্তে উভয়ের সখ্যবন্ধন বেঁধে গেল। হরিভাবিনী আতিথ্যের আয়োজনে চলে গেলেন; শৈলজা কমলার হাত ধরে বলল, “এসো ভাই, আমার ঘরে এসো।”
অল্পক্ষণের মধ্যেই দুজনে ঘনিষ্ঠভাবে কথা শুরু হল। শৈলজার সঙ্গে কমলার বয়সের যে প্রভেদ ছিল তা চোখে দেখে সহসা বোঝা যায় না। শৈলজার সবসুদ্ধ একটু ছোটোখাটো সংক্ষিপ্ত রকমের ভাব, কমলার ঠিক তার উল্টো– আয়তনে ও ভাবে ভঙ্গিতে সে নিজের বয়সকে অনেকটা ছাড়িয়ে গেছে। বিবাহের পর থেকে তার মাথার ওপর শ্বশুরবাড়ির কোনো রকমের চাপ না থাকাতেই হোক বা যে কারণেই হোক, দেখতে দেখতে সে অসংকোচে বেড়ে উঠেছে। তার মুখের ভাবের মধ্যে একটা স্বাধীনতার তেজ ছিল। তার সামনে যা-কিছু উপস্থিত হয়, তাকে অন্তত মনে মনেও সে প্রশ্ন না করে ক্ষান্ত হয় না। “চুপ করো” “যা বলি তাই করে যাও” “বউমানুষের অত ‘নেই’ করা শোভা পায় না”– এসব কথা তাকে আজ পর্যন্ত শুনতে হয়নি। তাই সে যেন মাথা তুলে সোজা হয়ে উঠেছে, তার সরলতার মধ্যে সবলতা আছে।
শৈলজার মেয়ে উমি উভয়ের মনোযোগ নিজের প্রতি সম্পূর্ণ একচেটে করে নেওয়ার বিধিমতো চেষ্টা করলেও দু-নতুন সখীর মধ্যে কথাবার্তা জমে উঠল। এই কথোপকথন-ব্যাপারে কমলা নিজের তরফের দৈন্য সহজেই বুঝতে পারল। শৈলজার বলার ঢের কথা আছে, কিন্তু কমলার বলার কিছুই নেই। কমলার জীবনের চিত্রপটে তার দাম্পত্যের যে একটা ছবি উঠেছে তা একটি পেনসিলের ক্ষীণ রেখা মাত্র; তার সকল জায়গা পরিস্ফুট সুসংলগ্ন নয়, তাতে আজও একটুও রঙ ফলানো হয়নি। কমলা এতদিন এই শূন্যতা স্পষ্ট করে বোঝার অবকাশ পায়নি; হৃদয়ের মধ্যে অভাব অনুভব করেছে, মাঝে মাঝে বিদ্রোহ-ভাবও উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু এর চেহারাটা তার চোখে ফুটে ওঠেনি। বন্ধুত্বের প্রথম শুরুতেই শৈলজা যখন তার স্বামীর কথা বলতে শুরু করল– যে সুরে শৈলজার হৃদয়ের সব তারগুলি বাঁধা আছে, আঙুল পড়ামাত্র যখন সেই সুর বেজে উঠল, তখন কমলা দেখল, কমলার হৃদয় থেকে এ সুরের কোনো ঝংকার দেওয়ার নেই; স্বামীর কথা সে কী বলবে, বলার বিষয়ই বা কী আছে। বলার আগ্রহই বা কোথায়! সুখের বোঝাই নিয়ে শৈলজার ইতিহাস যেখানে হু হু করে স্রোতে ভেসে চলেছে কমলার শূন্য নৌকাটা সেখানে মাটিতে ঠেকে অচল হয়ে আছে।
শৈলজার স্বামী বিপিন গাজিপুরে অহিফেন-বিভাগে কাজ করে। চক্রবর্তীর দুটিমাত্র মেয়ে। বড়ো মেয়ে তো শ্বশুরবাড়ি গেছে। ছোটোটিকে প্রাণ ধরে বিদায় দিতে না পেরে চক্রবর্তী একটি নিঃস্ব জামাই বেছে আনলেন এবং সাহেব-সুবাকে ধরে এখানেই তার একটা কাজ জুটিয়ে দিলেন। বিপিন তাদের বাড়িতেই থাকে।
কথা বলতে বলতে হঠাৎ এক সময় শৈল বলল, “তুমি একটু বোসো ভাই, আমি এখনি আসছি।” পরক্ষণেই একটু হেসে কারণ দর্শিয়ে বলল, “উনি স্নান করে ভেতরে এসেছেন, খেয়ে অফিসে যাবেন।”
কমলা সরল বিস্ময়ের সঙ্গে প্রশ্ন করল, “তিনি এসেছেন তুমি কেমন করে জানতে পারলে?”
শৈলজা। আর ঠাট্টা করতে হবে না। সকলেই যেমন করে জানতে পারে আমিও তেমনি করে জানি। তুমি নাকি তোমার কর্তার পায়ের শব্দ চেন না?
এই বলে হেসে কমলার চিবুক ধরে একটু নাড়া দিয়ে আঁচলে-বদ্ধ চাবির গোছা ঝনাৎ করে পিঠের ওপর ফেলে মেয়ে কোলে নিয়ে শৈলজা চলে গেল। পদশব্দের ভাষা যে এতই সহজ তা কমলা আজও জানতে পারেনি। সে চুপ করে বসে জানলার বাইরে চোখ রেখে তাই ভাবতে লাগল। জানলার বাইরে একটা পেয়ারা-গাছে ডাল ছেয়ে পেয়ারার ফুল ধরেছে, সেইসব ফুলের কেশরের মধ্যে মৌমাছির দল তখন লুটোপুটি করছিল।
একটু ফাঁকা জায়গায় গঙ্গার ধারে একটা আলাদা বাড়ি নেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। রমেশ গাজিপুর-আদালতের বিধি-অনুসারে প্রবেশ লাভ করার জন্য ও জিনিসপত্র আনতে একবার কলকাতায় যেতে হবে স্থির করেছে, কিন্তু কলকাতায় যেতে তার সাহস হচ্ছে না। কলকাতার একটা বিশেষ গলির ছবি মনে উঠলেই রমেশের বুকের ভেতরটা এখনো যেন কিসে চেপে ধরে। এখনো জাল ছেঁড়েনি, অথচ কমলার সঙ্গে স্বামী-স্ত্রীর সম্বন্ধ সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে নিতে বিলম্ব করলে আর চলে না। এসব দ্বিধায় কলকাতায় যাত্রার দিন পিছিয়ে যেতে লাগল।
কমলা চক্রবর্তীর অন্তঃপুরেই থাকে। এ বাংলোয় ঘর নিতান্ত কম বলে রমেশকে বাইরের ঘরেই থাকতে হয়; কমলার সঙ্গে তার সাক্ষাতের সুযোগ হয় না।
এই অনিবার্য বিচ্ছেদব্যাপার নিয়ে শৈলজা কেবলই কমলার কাছে দুঃখপ্রকাশ করতে লাগল। কমলা বলল, “কেন ভাই, তুমি এত হাহুতাশ করছ? এমনি কী ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটেছে!”
শৈলজা হেসে বলল, “ইস, তাই তো! একেবারে যে পাষাণের মতো কঠিন মন! ওসব ছলনায় আমাকে ভোলাতে পারবে না। তোমার মনের মধ্যে যে কী হচ্ছে সে কি আর আমি জানি না!”
কমলা জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা ভাই, সত্যি করে বলো, দু-দিন যদি বিপিনবাবু তোমাকে দেখা না দেন তাহলে কি অমনি–”
শৈলজা সগর্বে বলল, “ইস, দু-দিন দেখা না দিয়ে তাঁর নাকি থাকার জো আছে!”
এই বলে বিপিনবাবুর অধৈর্য সম্পর্কে শৈলজা গল্প করতে লাগল। প্রথম-প্রথম বিবাহের পর বালক বিপিন গুরুজনের ব্যূহভেদ করে তার বালিকাবধূর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য কবে কতপ্রকার কৌশল উদ্ভাবন করেছিল, কবে ব্যর্থ হয়েছিল, কবে ধরা পড়েছিল, দিবাসাক্ষাৎকারের নিষেধদুঃখ-লাঘবের জন্য বিপিনের মধ্যাহ্নভোজন-কালে একটা আয়নার মধ্যে গুরুজনদের অজ্ঞাতে উভয়ের কিরকম দৃষ্টিবিনিময় চলত, তা বলতে বলতে পুরাতন স্মৃতির আনন্দকৌতুকে শৈলজার মুখখানি হাস্যে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তারপর যখন অফিসে যাওয়ার পালা শুরু হল, তখন উভয়ের বেদনা এবং বিপিনের যখন-তখন অফিস-পলায়ন, সেও অনেক কথা। তারপর একবার শ্বশুরের ব্যবসায়ের খাতিরে কিছুদিনের জন্য বিপিনের পাটনায় যাওয়ার কথা হয়, তখন শৈলজা তার স্বামীকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “তুমি পাটনায় গিয়ে থাকতে পারবে?” বিপিন স্পর্ধা করে বলেছিল, “কেন পারব না, খুব পারব।” সেই স্পর্ধাবাক্যে শৈলজার মনে খুব অভিমান হয়েছিল; সে প্রাণপণে প্রতিজ্ঞা করেছিল, বিদায়ের পূর্বরাত্রে সে কোনোমতে লেশমাত্র শোকপ্রকাশ করবে না; কেমন করে সে প্রতিজ্ঞা হঠাৎ চোখের জলের প্লাবনে ভেসে গেল এবং পরদিন যখন যাত্রার আয়োজন সমস্তই স্থির তখন বিপিনের অকস্মাৎ এমনি মাথা ধরে কী-এক-রকমের অসুখ করতে লাগল যে যাত্রা বন্ধ করতে হল, তারপর ডাক্তার যখন ওষুধ দিয়ে গেল, তখন সে ওষুধের শিশি গোপনে নর্দমার মধ্যে শূন্য করে অপূর্ব উপায়ে কী করে ব্যাধির অবসান হল– এসব কাহিনী বলতে বলতে কখন যে বেলা অবসান হয়ে আসে, শৈলজার তাতে হুঁশ থাকে না– অথচ এমন সময় হঠাৎ দূরে বাইর-দরজায় একটা কিসের শব্দ হয়-কি-না-হয় অমনি শৈল ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ে। বিপিনবাবু অফিস থেকে ফিরেছেন। সমস্ত গল্পহাসির অন্তরালে একটি উৎকণ্ঠিত হৃদয় সেই পথের ধারের বাইর-দরজার দিকেই কান পেতে বসে ছিল।
কমলার কাছে এসব কথা যে একেবারেই আকাশকুসুমের মতো তা নয়; এর আভাস সে কিছু-কিছু পেয়েছে। প্রথম কয়েক মাস রমেশের সঙ্গে প্রথম-পরিচয়ের রহস্যের মধ্যে যেন এরকমেরই একটা রাগিণী বেজে উঠছিল। তারপরেও স্কুল থেকে উদ্ধারলাভ করে কমলা যখন রমেশের কাছে ফিরে এল তখনো মাঝে মাঝে এমনসকল ঢেউ অপূর্ব সংগীতে ও অপরূপ নৃত্যে তার হৃদয়কে আঘাত করেছে– যার ঠিক অর্থটি সে আজ শৈলজার এসব গল্পের মধ্য থেকে বুঝতে পারছে। কিন্তু তার এসবই ভাঙাচোরা, এর ধারাবাহিকতা কিছুই নেই। তাকে যেন কোনো-একটা পরিণাম পর্যন্ত পৌঁছতে দেওয়া হয়নি। শৈলজা ও বিপিনের মধ্যে যে-একটা আগ্রহের টান সেটা রমেশ ও তার মধ্যে কোথায়? এই-যে কয়েক দিন তাদের দেখাশোনা বন্ধ হয়ে আছে তাতে তার মনের মধ্যে এমনি কি অস্থিরতা উপস্থিত হয়েছে– এবং রমেশও তাকে দেখার জন্য বাইরে বসে বসে কোনো প্রকার কৌশল উদ্ভাবন করছে তা কোনোমতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এদিকে যেদিন রবিবার এল সেদিন শৈলজা কিছু মুশকিলে পড়ল। তার নতুন সখীকে দীর্ঘকাল একেবারে একলা পরিত্যাগ করতে তার লজ্জা করতে লাগল, অথচ আজ ছুটির দিন একেবারে ব্যর্থ করবে এতবড়ো ত্যাগশীলতাও তার নেই। এদিকে রমেশবাবু কাছেই থেকেও কমলা যখন মিলনে বঞ্চিত হয়ে আছে তখন ছুটির উৎসবে নিজের বরাদ্দ পুরো ভোগ করতে তার ব্যথাও বোধ হল। আহা, যদি কোনোমতে রমেশের সঙ্গে কমলার সাক্ষাৎ ঘটিয়ে দেওয়া যায়।
এসব বিষয় নিয়ে গুরুজনদের সঙ্গে পরামর্শ চলে না। কিন্তু চক্রবর্তী পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করার লোক নন– তিনি বাড়িতে প্রচার করে দিলেন আজ তিনি বিশেষ কাজে শহরের বাইরে যাচ্ছেন। রমেশকে বুঝিয়ে গেলেন যে, বাইরের লোক আজ কেউ তার বাড়িতে আসছে না, সদর-দরজা বন্ধ করে তিনি চলে যাচ্ছেন। এ খবর তার কন্যাকেও বিশেষ করে শোনিয়ে দিলেন– নিশ্চয় জানতেন, কোন ইঙ্গিতের কী অর্থ, তা বুঝতে শৈলজার বিলম্ব হয় না।
স্নানের পর শৈলজা কমলাকে বলল, “এসো ভাই, তোমার চুল শুকিয়ে দিই।”
কমলা বলল, “কেন, আজ এত তাড়াতাড়ি কীসের?”
শৈলজা। সে কথা পরে হবে, তোমার চুলটা আগে বেঁধে দিই।– বলে কমলার মাথা নিয়ে পড়ল। আজ বিনুনির সংখ্যা অনেক বেশি, খোঁপা একটা বৃহৎ ব্যাপার হয়ে উঠল।
তারপর কাপড় নিয়ে উভয়ের মধ্যে একটা বিষম তর্ক বেধে গেল। শৈলজা তাকে যে রঙিন কাপড় পরাতে চায় কমলা তা পরার কারণ খুঁজে পেল না। অবশেষে শৈলজাকে সন্তুষ্ট করার জন্য পরতে হল।
মধ্যাহ্নে আহারের পর শৈলজা তার স্বামীকে কানে-কানে কী একটা বলে ক্ষণকালের জন্য ছুটি নিয়ে এল। তারপর কমলাকে বাইরের ঘরে পাঠানোর জন্য পীড়াপীড়ি পড়ে গেল।
রমেশের কাছে কমলা ইতিপূর্বে অনেকবার অসংকোচে গেছে। এ সম্পর্কে সমাজে লজ্জাপ্রকাশের যে কোনো বিধান আছে তা জানার সে কোনো অবসর পায়নি। পরিচয়ের শুরুতেই রমেশ সংকোচ ভেঙে দিয়েছিল। নির্লজ্জতার অপবাদ দিয়ে ধিক্কার দেওয়ার সঙ্গিনীও তার কাছে কেউ ছিল না।
কিন্তু আজ শৈলজার অনুরোধ পালন করা তার পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে উঠল। স্বামীর কাছে শৈলজা যে-অধিকারে যায় তা সে জেনেছে; কমলা সেই অধিকারের গৌরব যখন অনুভব করছে না তখন দীনভাবে সে আজ কেমন করে যাবে!
কমলাকে যখন কিছুতেই রাজি করা গেল না তখন শৈল মনে করল, রমেশের ওপর সে অভিমান করেছে। অভিমান করার কথাই বটে। কয়টা দিন কেটে গেল, অথচ রমেশবাবু কোনো ছুতো করে একবার দেখাসাক্ষাতের চেষ্টাও করলেন না।
বাড়ির গৃহিণী তখন আহারান্তে ঘরে দুয়ার দিয়ে ঘুমোচ্ছিলেন। শৈলজা বিপিনকে এসে বলল, “রমেশবাবুকে তুমি আজ কমলার নাম করে বাড়ির মধ্যেই ডেকে আনো। বাবা কিছু মনে করবেন না, মা কিছু জানতেই পারবেন না।”
বিপিনের মতো চুপচাপ মুখচোরা লোকের পক্ষে এরকম দৌত্য কোনোমতেই রুচিকর নয়, তথাপি ছুটির দিনে এই অনুরোধ লঙ্ঘন করতে সে সাহস করল না।
রমেশ তখন বাইরের ঘরের জাজিম-পাতা মেঝের ওপর চিত হয়ে শুয়ে এক পায়ের উঁচু হাঁটুর ওপর আরেক পা তুলে দিয়ে “পায়োনিয়র” পড়ছিল। পাঠ্য অংশ শেষ করে যখন কাজের অভাবে তার বিজ্ঞাপনের প্রতি মনোযোগ দেওয়ার উপক্রম করছে, এমন সময় বিপিনকে ঘরে আসতে দেখে সে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সঙ্গী হিসাবে বিপিন যে খুব প্রথমশ্রেণীর পদার্থ তা না হলেও বিদেশে মধ্যাহ্নযাপনের পক্ষে রমেশ তাকে পরম লাভ বলে গণ্য করল এবং বলে উঠল, “আসুন বিপিনবাবু, আসুন, বসুন।”
বিপিন না বসেই একটুখানি মাথা চুলকে বলল, “আপনাকে একবার ইনি ভেতরে ডাকছেন।”
রমেশ জিজ্ঞাসা করল, “কে, কমলা?”
বিপিন বলল, “হ্যাঁ।”
রমেশ কিছু আশ্চর্য হল। রমেশ পূর্বেই স্থির করেছে কমলাকে সে স্ত্রী বলেই গ্রহণ করবে, কিন্তু তার স্বাভাবিক-দ্বিধা-গ্রস্ত মন তৎপূর্বে এই কয়দিন অবকাশ পেয়ে বিশ্রাম করছে। কল্পনায় কমলাকে গৃহিণীপদে অভিষিক্ত করে সে মনকে নানাপ্রকার ভাবী সুখের আশ্বাসে উত্তেজিত করেও তুলেছে, কিন্তু প্রথম শুরুটাই দুরূহ। কিছুদিন থেকে কমলার প্রতি যেটুকু দূরত্ব রক্ষা করা তার অভ্যস্ত হয়ে গেছে হঠাৎ একদিন কেমন করে সেটা ভেঙে ফেলবে, তা সে ভেবে পাচ্ছিল না; এইজন্যই বাড়িভাড়া করার দিকে তার তেমন সত্বরতা ছিল না।
কমলা ডেকেছে শুনে রমেশের মনে হল, নিশ্চয় বিশেষ কোনো একটা প্রয়োজন পড়েছে। তবু প্রয়োজনের ডাক হলেও তার মনের মধ্যে একটা হিল্লোল উঠল। বিপিনের অনুবর্তী হয়ে “পায়োনিয়র”টা ফেলে রেখে যখন সে অন্তঃপুরে যাত্রা করল তখন এই মধুকরগুঞ্জরিত কার্তিকের আলস্যদীর্ঘ জনহীন মধ্যাহ্নে একটা অভিসারের আভাস তার চিত্তকে একটুখানি চঞ্চল করল।
বিপিন কিছুদূর থেকে ঘর দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল। কমলা মনে করেছিল, শৈলজা তার সম্পর্কে হাল ছেড়ে দিয়ে বিপিনের কাছে চলে গেছে। তাই সে খোলা দরজার চৌকাঠের ওপর বসে সামনের বাগানের দিকে তাকিয়ে ছিল। শৈল কেমন করে কমলার অন্তরে-বাহিরে একটা ভালোবাসার সুর বেঁধে দিয়েছিল। ঈষৎতপ্ত বাতাসে বাইরে গাছের পল্লবগুলো যেমন মর্মরশব্দে কাঁপছে, কমলার বুকের ভেতরেও মাঝে মাঝে তেমনি একটা দীর্ঘনিশ্বাসের হাওয়া উঠে অব্যক্ত বেদনায় একটি অপরূপ স্পন্দনের সঞ্চার করছিল।
এমন সময়ে রমেশ ঘরে ঢুকে যখন তার পেছন থেকে ডাকল– “কমলা”, তখন সে চমকে উঠে পড়ল; তার হৃৎপিণ্ডের মধ্যে রক্ত তরঙ্গিত হতে লাগল, যে কমলা ইতিপূর্বে কখনো রমেশের কাছে বিশেষ লজ্জা অনুভব করেনি সে আজ ভালো করে মুখ তুলে তাকাতে পারল না। তার কর্ণমূল আরক্তিম হয়ে উঠল।
আজকের সাজসজ্জায় ও ভাবে-আভাসে রমেশ কমলাকে নতুন মূর্তিতে দেখল। হঠাৎ কমলার এই বিকাশ তাকে আশ্চর্য এবং অভিভূত করল। সে আস্তে আস্তে কমলার কাছে এসে ক্ষণকালের জন্য চুপ করে দাঁড়িয়ে মৃদুস্বরে বলল, “কমলা, তুমি আমাকে ডেকেছ?”
কমলা চমকে উঠে অনাবশ্যক উত্তেজনার সঙ্গে বলে উঠল, “না না না, আমি ডাকিনি– আমি কেন ডাকতে যাব?”
রমেশ বলল, “ডাকলেই বা দোষ কী কমলা?”
কমলা দ্বিগুণ প্রবলতার সঙ্গে বলল, “না, আমি ডাকিনি।”
রমেশ বলল, “তা, বেশ কথা। তুমি না ডাকলেই আমি এসেছি। তাই বলে কি অনাদরে ফিরে যেতে হবে?”
কমলা। তুমি এখানে এসেছ, সকলে জানতে পারলে রাগ করবেন– তুমি যাও। আমি তোমাকে ডাকিনি।
রমেশ কমলার হাত চেপে ধরে বলল, “আচ্ছা, তুমি আমার ঘরে এসো– সেখানে বাইরের লোক কেউ নেই।”
কমলা কম্পিতকলেবরে তাড়াতাড়ি রমেশের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে পাশের ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
রমেশ বুঝল, এসবই বাড়ির কোনো মেয়ের ষড়যন্ত্র– এই বুঝে পুলকিতদেহে বাইরের ঘরে গেল। চিত হয়ে পড়ে আরেকবার “পায়োনিয়র”টা টেনে নিয়ে তার বিজ্ঞাপনশ্রেণীর ওপর চোখ বোলাতে লাগল, কিন্তু কিছুই অর্থগ্রহ হল না। তার হৃদয়াকাশে নানারঙের ভাবের মেঘ উড়ো-বাতাসে ভেসে বেড়াতে লাগল।
শৈল রুদ্ধঘরে ঘা দিল; কেউ দরজা খুলল না। তখন সে দরজার খড়খড়ি খুলে বাইরে থেকে হাত গলিয়ে দিয়ে ছিটকিনি খুলে ফেলল। ঘরে ঢুকে দেখে কমলা মেঝের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে দু-হাতের ভেতর মুখ লুকিয়ে কাঁদছে।
শৈল আশ্চর্য হয়ে গেল। এমনি কী ঘটনা ঘটতে পারে যার জন্য কমলা এত আঘাত পায়! তাড়াতাড়ি তার পাশে বসে তার কানের কাছে মুখ রেখে স্নিগ্ধস্বরে বলতে লাগল, “কেন ভাই, তোমার কী হয়েছে, তুমি কেন কাঁদছ?”
কমলা বলল, “তুমি কেন ওঁকে ডেকে এনেছ? তোমার ভারি অন্যায়।”
কমলার এসকল আকস্মিক আবেগের প্রবলতা তার নিজের পক্ষে এবং অন্যের পক্ষে বোঝা ভারি শক্ত। এর মধ্যে যে তার কতদিনের গুপ্তবেদনার সঞ্চয় আছে তা কেউই জানে না।
কমলা আজ একটা কল্পনালোক অধিকার করে বেশ গুছিয়ে বসে ছিল। রমেশ যদি বেশ সহজে তার মধ্যে প্রবেশ করত তবে সুখেরই হত। কিন্তু তাকে ডেকে এনে সমস্ত ছারখার করে ফেলা হল। কমলাকে ছুটির সময়ে স্কুলে বন্দী করে রাখার চেষ্টা, স্টিমারে রমেশের ঔদাসীন্য, এসবই মনের তলদেশে আলোড়িত হয়ে উঠল। কাছে পেলেই যে পাওয়া হল, ডেকে এনেই যে আসা হল, তা নয়– আসল জিনিসটা যে কী তা গাজিপুরে আসার পরে কমলা অতি অল্প দিনেই যেন স্পষ্ট বুঝতে পেরেছে।
কিন্তু শৈলের পক্ষে এসব কথা বোঝা শক্ত। কমলা এবং রমেশের মাঝখানে যে কোনো প্রকারের সত্যকার ব্যবধান থাকতে পারে তা সে কল্পনাও করতে পারে না। সে বহুযত্নে কমলার মাথা নিজের কোলের ওপর তুলে জিজ্ঞাসা করল, “আচ্ছা ভাই, রমেশবাবু কি তোমাকে কোনো কঠিন কথা বলেছেন? হয়তো ইনি তাঁকে ডাকতে গিয়েছিলেন বলে তিনি রাগ করেছেন। তুমি বললে না কেন যে, এসব আমার কাজ।”
কমলা বলল, “না না, তিনি কিছুই বলেননি। কিন্তু কেন তুমি তাঁকে ডেকে এনেছ?”
শৈল ক্ষুণ্ণ হয়ে বলল, “আচ্ছা ভাই, দোষ হয়েছে, মাপ করো।”
কমলা তাড়াতাড়ি উঠে বসে শৈলের গলা জড়িয়ে ধরল; বলল, “যাও ভাই, যাও তুমি, বিপিনবাবু রাগ করছেন।”
বাইরে নির্জন ঘরে রমেশ “পায়োনিয়র”-এর ওপর অনেকক্ষণ বৃথা চোখ বুলিয়ে এক সময় সবলে সেটা ছুড়ে ফেলে দিল। তারপর উঠে বসে বলল, “না, আর না। কালই কলকাতায় গিয়ে প্রস্তুত হয়ে আসব। কমলাকে আমার স্ত্রী বলে গ্রহণ করতে যতদিন বিলম্ব হচ্ছে ততই আমার অন্যায় বাড়ছে।”
রমেশের কর্তব্যবুদ্ধি হঠাৎ আজ পূর্ণভাবে জাগ্রত হয়ে সমস্ত দ্বিধা-সংশয় একলাফে অতিক্রম করল।
রমেশ ঠিক করেছিল কলকাতায় সে কেবল কাজ সেরে চলে আসবে, কলুটোলার সেই গলির ধার দিয়েও যাবে না।
রমেশ দরজিপাড়ার বাসায় এসে উঠল। দিনের মধ্যে অতি অল্প সময়ই কাজকর্মে কাটে, বাকি সময়টা ফুরোতে চায় না। রমেশ কলকাতায় যে দলের সঙ্গে মিশত, এবার এসে তাদের সঙ্গে দেখা করতে পারল না। পাছে পথে কারও সঙ্গে দৈবাৎ দেখা হয়ে পড়ে, এই ভয়ে সে যথাসাধ্য সাবধানে থাকত।
কিন্তু রমেশ কলকাতায় আসতেই একটা পরিবর্তন অনুভব করল। যে নির্জন অবকাশের মাঝখানে, যে নির্মল শান্তির পরিবেষ্টনে, কমলা তার নবকৈশোরের প্রথম আবির্ভাব নিয়ে রমেশের কাছে রমণীয় হয়ে দেখা দিয়েছিল কলকাতায় তার মোহ অনেকটা ছুটে গেল। দরজিপাড়ার বাসায় রমেশ কমলাকে কল্পনাক্ষেত্রে এনে ভালোবাসার মুগ্ধনেত্রে দেখার চেষ্টা করল, কিন্তু এখানে তার মন কোনোমতেই সাড়া দিল না; আজ কমলা তার কাছে অপরিণতা অশিক্ষিতা বালিকার রূপে প্রতিভাত হল।
জোর যতই অতিরিক্তমাত্রায় প্রয়োগ করা যায় জোর ততই কমে আসতে থাকে। হেমনলিনীকে কোনোমতেই মনের মধ্যে আমল দেবে না, এই পণ করতে করতেই অহোরাত্র হেমনলিনীর কথা রমেশের মনে জাগরূক থাকে। ভোলার কঠিন সংকল্পই স্মরণে রাখার প্রবল সহায় হয়ে উঠল।
রমেশের যদি কিছুমাত্র তাড়া থাকত তবে বহু পূর্বেই কলকাতার কাজ শেষ করে সে ফিরতে পারত। কিন্তু সামান্য কাজ গড়াতে গড়াতে বেড়ে চলল। অবশেষে তাও নিঃশেষিত হয়ে গেল।
কাল রমেশ প্রথমে কার্যানুরোধে এলাহাবাদে যাত্রা করে সেখান থেকে গাজিপুরে ফিরবে। এতদিন সে ধৈর্যরক্ষা করে এসেছে, কিন্তু সে ধৈর্যের কি কোনো পুরস্কার নেই? বিদায়ের আগে গোপনে একবার কলুটোলার খবর নিয়ে এলে ক্ষতি কী?
আজ কলুটোলায় সেই গলিতে যাওয়া স্থির করে সে একখানা চিঠি লিখতে বসল। তাতে কমলার সঙ্গে তার সম্বন্ধ আদ্যোপান্ত বিস্তারিত করে লিখল। এবার গাজিপুরে ফিরে গিয়ে সে অগত্যা হতভাগিনী কমলাকে নিজের পরিণীত-পত্নীরূপে গ্রহণ করবে তাও জ্ঞাপন করল। এইভাবে হেমনলিনীর সঙ্গে তার সর্বতোভাবে বিচ্ছেদ ঘটার পূর্বে সত্য ঘটনা সম্পূর্ণভাবে জানিয়ে এই পত্র-দ্বারা সে বিদায় গ্রহণ করল।
চিঠি লিখে লেফাফার মধ্যে পুরে ওপরে কারও নাম লিখল না, ভেতরেও কাউকে সম্বোধন করল না। অন্নদাবাবুর ভৃত্যেরা রমেশের প্রতি অনুরক্ত ছিল–কারণ রমেশ হেমনলিনীর সম্পর্কীয় স্বজন-পরিজন সকলকে একটা বিশেষ মমতার সঙ্গে দেখত। এইজন্য সেই বাড়ির চাকর-বাকরেরা রমেশের কাছ থেকে নানা উপলক্ষে কাপড়চোপড় পার্বণী থেকে বঞ্চিত হত না। রমেশ ঠিক করেছিল, সন্ধ্যার অন্ধকারে কলুটোলার বাড়িতে গিয়ে একবার সে দূর থেকে হেমনলিনীকে দেখে আসবে এবং কোনো একজন চাকরকে দিয়ে এই চিঠি গোপনে হেমনলিনীর হাতে পৌঁছিয়ে দিয়ে সে চিরকালের মতো তার পূর্ববন্ধন বিচ্ছিন্ন করে চলে যাবে।
সন্ধ্যার সময় রমেশ চিঠিখানি হাতে নিয়ে সেই চিরপরিচিত গলির মধ্যে স্পন্দিত-বক্ষে কম্পিতপদে প্রবেশ করল। দরজার কাছে এসে দেখল দরজা রুদ্ধ; ওপরে তাকিয়ে দেখল সমস্ত জানালা বন্ধ, বাড়ি শূন্য, অন্ধকার।
তবু রমেশ দরজায় ঘা দিল। দু-চারবার আঘাত করতে করতে ভেতর থেকে একজন বেহারা দরজা খুলে বাইরে এল। রমেশ জিজ্ঞাসা করল, “কে ও, সুখন নাকি?”
বেহারা বলল, “হ্যাঁ বাবু, আমি সুখন।”
রমেশ। বাবু কোথায় গেছেন?
বেহারা। দিদিঠাকরুনকে নিয়ে পশ্চিমে হাওয়া খেতে গিয়েছেন।
রমেশ। কোথায় গেছেন?
বেহারা। তা তো বলতে পারি না।
রমেশ। আর কে সঙ্গে গেছেন?
বেহারা। নলিনবাবু সঙ্গে গেছেন।
রমেশ। নলিনবাবুটি কে?
বেহারা। তা তো বলতে পারি না।
রমেশ প্রশ্ন করে করে জানল নলিনবাবু যুবাপুরুষ, কিছুকাল থেকে এই বাড়িতে যাতায়াত করছেন। যদিও রমেশ হেমনলিনীর আশা ত্যাগ করেই যাচ্ছিল, তথাপি নলিনবাবুটির প্রতি তার সদ্ভাব আকৃষ্ট হল না।
রমেশ। তোর দিদিঠাকরুনের শরীর কেমন আছে?
বেহারা বলল, “তাঁর শরীর তো ভালোই আছে।”
সুখন-বেহারাটা ভেবেছিল, এই সুসংবাদে রমেশবাবু নিশ্চিন্ত ও সুখী হবেন। অন্তর্যামী জানেন, সুখন-বেহারা ভুল বুঝেছিল।
রমেশ বলল, “আমি একবার ওপরের ঘরে যাব।”
বেহারা তার ধোঁয়াচ্ছন্ন কেরোসিনের ডিপা নিয়ে রমেশকে ওপরে নিয়ে গেল। রমেশ ভূতের মতো ঘরে ঘরে একবার ঘুরে বেড়াল, দু-একটা চৌকি ও সোফা বেছে নিয়ে তার ওপর বসল। জিনিসপত্র গৃহসজ্জা সমস্তই ঠিক পূর্বের মতোই আছে, মাঝে থেকে নলিনবাবুটি কে এল? পৃথিবীতে কারও অভাবে অধিক দিন কিছুই শূন্য থাকে না। যে বাতায়নে রমেশ একদিন হেমনলিনীর পাশে দাঁড়িয়ে ক্ষান্তবর্ষণ শ্রাবণদিনের সূর্যাস্ত-আভায় দু-টি হৃদয়ের নিঃশব্দ মিলনকে মণ্ডিত করে নিয়েছিল, সেই বাতায়নে আর কি সূর্যাস্তের আভা পড়ে না? সেই বাতায়নে আর-কেউ এসে আরেকদিন যুগলমূর্তি রচনা করতে চাইবে তখন পূর্ব-ইতিহাস এসে কি তাদের স্থান রোধ করে দাঁড়াবে, নিঃশব্দে তর্জনী তুলে তাদের দূরে সরিয়ে দেবে? ক্ষুণ্ণ অভিমানে রমেশের হৃদয় স্ফীত হয়ে উঠতে লাগল।
পরদিন রমেশ এলাহাবাদে না গিয়ে একেবারে গাজিপুরে চলে গেল।
কলকাতায় রমেশ মাসখানেক কাটিয়ে এসেছে। এই এক মাস কমলার পক্ষে অল্পদিন নয়। কমলার জীবনে একটা পরিণতির স্রোত হঠাৎ অত্যন্ত দ্রুতবেগে বইছে। উষার আলো যেমন দেখতে দেখতে প্রভাতের রোদে ফুটে পড়ে, কমলার নারীপ্রকৃতি তেমনি অতি অল্পকালের মধ্যেই সুপ্তি থেকে জাগরণের মধ্যে সচেতন হয়ে উঠল। শৈলজার সঙ্গে যদি তার ঘনিষ্ঠ পরিচয় না হত, শৈলজার জীবন থেকে প্রেমালোকের ছটা ও উত্তাপ যদি প্রতিফলিত হয়ে তার হৃদয়ের ওপর না পড়ত, তবে কতকাল তাকে অপেক্ষা করতে হত বলা যায় না।
এদিকে রমেশের আসার দেরি দেখে শৈলজার বিশেষ অনুরোধে খুড়ো কলমাদের বাসের জন্য শহরের বাইরে গঙ্গার ধারে একটা বাংলো ঠিক করেছেন। অল্পস্বল্প আসবাব সংগ্রহ করে বাড়িটা বাসযোগ্য করে তোলার আয়োজন করছেন এবং নতুন ঘরকন্নার জন্য আবশ্যকমতো চাকরদাসীও ঠিক করে রেখেছেন।
অনেকদিন দেরি করে রমেশ যখন গাজিপুরে ফিরে এল তখন খুড়োর বাড়িতে পড়ে থাকার আর কোনো ছুতো রইল না। এতদিন পরে কমলা নিজের স্বাধীন ঘরকন্নার মধ্যে প্রবেশ করল।
বাংলোটির চারদিকে বাগান করার মতো জমি যথেষ্ট আছে। দু-সারি সুদীর্ঘ সিসু গাছের ভেতর দিয়ে একটা ছায়াময় রাস্তা গেছে। শীতের শীর্ণ গঙ্গা বহুদূরে সরে গিয়ে বাড়ি এবং গঙ্গার মাঝখানে একটা নিচু চর পড়েছে– সেই চরে চাষারা স্থানে স্থানে গোধূম চাষ করেছে এবং স্থানে স্থানে তরমুজ ও খরমুজা লাগাচ্ছে। বাড়ির দক্ষিণ-সীমানায় গঙ্গার একটা বৃহৎ বৃদ্ধ নিমগাছ আছে, তার তলা বাঁধানো।
বহুদিন ভাড়াটের অভাবে বাড়ি ও জমি অনাদৃত অবস্থায় থাকাতে বাগানে গাছপালা প্রায় কিছুই ছিল না এবং ঘরগুলোও অপরিচ্ছন্ন হয়ে ছিল। কিন্তু কমলার কাছে এসবই অত্যন্ত ভালো লাগল। গৃহিণীপদলাভের আনন্দ-আভায় তার চোখে সমস্তই সুন্দর হয়ে উঠল। কোন ঘর কী কাজে ব্যবহার করতে হবে, জমির কোথায় কিরকম গাছপালা লাগাতে হবে, তা সে মনে মনে ঠিক করে নিল। খুড়োর সঙ্গে পরামর্শ করে কমলা সমস্ত জমিতে চাষ দেওয়ার ব্যবস্থা করল। নিজে উপস্থিত থেকে রান্নাঘরের চুলা বানিয়ে নিল এবং তার পার্শ্ববর্তী ভাঁড়ার-ঘরে যেখানে যেরকম পরিবর্তন আবশ্যক তা সাধন করল। সমস্ত দিন ধোওয়া-মাজা, গোছানো-গাছানো– কাজকর্মের আর অন্ত নেই। চারদিকেই কমলার মমত্ব আকৃষ্ট হতে লাগল।
গৃহকর্মের মধ্যে রমণীর সৌন্দর্য যেমন বিচিত্র, যেমন মধুর, এমন আর কোথাও নয়। রমেশ আজ কমলাকে সেই কর্মের মাঝখানে দেখল; সে যেন পাখিকে খাঁচার বাইরে আকাশে উড়তে দেখল। তার প্রফুল্ল মুখ, তার সুনিপুণ পটুত্ব রমেশের মনে এক নতুন বিস্ময় ও আনন্দের উদ্রেক করে দিল।
এতদিন কমলাকে রমেশ তার স্বস্থানে দেখেনি; আজ তাকে নিজের নতুন সংসারের শিখরদেশে যখন দেখল তখন তার সৌন্দর্যের সঙ্গে একটা মহিমা দেখতে পেল।
কমলার কাছে এসে রমেশ বলল, “কমলা, করছ কী? শ্রান্ত হয়ে পড়বে যে।”
কমলা তার কাজের মাঝখানে একটুখানি থেমে রমেশের দিকে মুখ তুলে তার মিষ্টমুখের হাসি হাসল; বলল, “না, আমার কিছু হবে না।”
রমেশ যে তার তত্ত্ব নিতে এসেছে, এটুকু সে পুরস্কারস্বরূপ গ্রহণ করে তৎক্ষণাৎ আবার কাজের মধ্যে নিবিষ্ট হয়ে গেল।
মুগ্ধ রমেশ ছুতো করে আবার তার কাছে গিয়ে বলল, “তোমার খাওয়া হয়েছে তো কমলা?”
কমলা বলল, “বেশ, খাওয়া হয়নি তো কী? কোনকালে খেয়েছি।”
রমেশ এ খবর জানত, তবু এই প্রশ্নের ছলে কমলাকে একটুখানি আদর না জানিয়ে থাকতে পারল না; কমলাও রমেশের এই অনাবশ্যক প্রশ্নে যে একটুখানি খুশি হয়নি তা নয়।
রমেশ আবার একটুখানি কথাবার্তার সূত্রপাত করার জন্য বলল, “কমলা, তুমি নিজের হাতে কত করবে, আমাকে একটু খাটিয়ে নাও না।”
কর্মিষ্ঠ লোকের দোষ এই, অন্য লোকের কর্মপটুতার ওপর তাদের বড়ো একটা বিশ্বাস থাকে না। তাদের ভয় হয়, যে কাজ তারা নিজে না করবে সেই কাজ অন্য করলেই পাছে সমস্ত নষ্ট করে দেয়। কমলা হেসে বলল, “না, এসব কাজ তোমাদের নয়।”
রমেশ বলল, “পুরুষরা নিতান্তই সহিষ্ণু বলে পুরুষজাতির প্রতি তোমাদের এই অবজ্ঞা আমরা সহ্য করে থাকি, বিদ্রোহ করি না, তোমাদের মতো যদি স্ত্রীলোক হতাম তবে তুমুল ঝগড়া বাধিয়ে দিতাম। আচ্ছা, খুড়োকে তো তুমি খাটাতে ত্রুটি কর না, আমি এতই কি অকর্মণ্য?”
কমলা বলল, “তা জানি না, কিন্তু তুমি রান্নাঘরের ঝুল ঝাড়াচ্ছ তা মনে করলেই আমার হাসি পায়। তুমি এখান থেকে সরো, এখানে ভারি ধুলো উড়ছে।”
রমেশ কমলার সঙ্গে কথা চালানোর জন্য বলল, “ধুলো তো লোক-বিচার করে না, ধুলো আমাকেও যে চোখে দেখে তোমাকেও সেই চোখে দেখে।”
কমলা। আমার কাজ আছে বলে ধুলো সহ্য করছি; তোমার কাজ নেই, তুমি কেন ধুলো সহ্য করবে?–
রমেশ ভৃত্যদের কান বাঁচিয়ে মৃদুস্বরে বলল, “কাজ থাক বা না থাক, তুমি যা সহ্য করবে আমি তার অংশ নেব।”
কমলার কর্ণমূল একটুখানি লাল হয়ে উঠল; রমেশের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে কমলা একটু সরে গিয়ে বলল, “উমেশ, এইখানটায় আরেক ঘড়া জল ঢাল না– দেখছিস নে কত কাদা জমে আছে? ঝাঁটাটা আমার হাতে দে দেখি।”
বলে ঝাঁটা নিয়ে খুব বেগে মার্জনকার্যে নিযুক্ত হল।
রমেশ কমলাকে ঝাঁটা দিতে দেখে হঠাৎ অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে উঠে বলল, “আহা কমলা, ও কী করছ?”
পেছন থেকে শুনতে পেল, “কেন রমেশবাবু, অন্যায় কাজটা কী হচ্ছে? এদিকে ইংরেজি পড়ে আপনারা মুখে সাম্য প্রচার করেন; ঝাঁটা দেওয়া কাজটা যদি এত হেয় মনে হয় তবে চাকরের হাতেই বা ঝাঁটা দেন কেন? আমি মূর্খ, আমার কথা যদি জিজ্ঞাসা করেন, সতী মায়ের হাতের ঐ ঝাঁটার প্রত্যেক কাঠি সূর্যের রশ্মিছটার মতো আমার কাছে উজ্জ্বল ঠেকে। মা, তোমার জঙ্গল আমি একরকম প্রায় শেষ করে এলাম, কোনখানে তরকারির খেত করবে আমাকে একবার দেখিয়ে দিতে হবে।”
কমলা বলল, “খুড়ামশায়, একটুখানি সবুর করো, আমার এ ঘর সারা হল বলে।”
এই বলে কমলা ঘর-পরিষ্কার শেষ করে কোমরে-জড়ানো আঁচল মাথায় তুলে বাইরে এসে খুড়োর সঙ্গে তরকারির খেত নিয়ে গভীর আলোচনায় প্রবৃত্ত হল।
এমনি করে দেখতে দেখতে দিন শেষ হয়ে গেল, কিন্তু ঘর-গোছানো এখনো ঠিকমতো হয়ে উঠল না। বাংলোঘর অনেকদিন অব্যবহৃত ও রুদ্ধ ছিল, আরো দু-চারদিন ঘরগুলো ধোওয়া-মাজা করে জানালা-দরজা খুলে না রাখলে তা বাসযোগ্য হবে না দেখা গেল।
কাজেই আবার আজ সন্ধ্যার পরে খুড়োর বাড়িতেই আশ্রয় নিতে হল। আজ তাতে রমেশের মনটা কিছু দমে গেল। আজ তাদের নিজের নিভৃত ঘরটিতে সন্ধ্যাপ্রদীপটি জ্বলবে এবং কমলার সলজ্জ স্মিতহাস্যের সামনে রমেশ নিজের পরিপূর্ণ হৃদয় নিবেদন করে দেবে, এটা সে সমস্ত দিন থেকে থেকে কল্পনা করছিল। আরো দু-চারদিন বিলম্বের সম্ভাবনা দেখে রমেশ তার আদালত-প্রবেশ-সম্পর্কিত কাজে পরদিন এলাহাবাদে চলে গেল।
পরদিন কমলার নতুন বাসায় শৈলের চড়িভাতির নিমন্ত্রণ হল। বিপিন আহারান্তে অফিসে গেলে পর শৈল নিমন্ত্রণরক্ষা করতে গেল। কমলার অনুরোধে খুড়ো সেদিন সোমবারের স্কুল কামাই করেছিলেন। দুজনে মিলে নিমগাছ-তলায় রান্না চড়িয়ে দিয়েছেন, উমেশ সহায়কার্যে ব্যস্ত হয়ে রয়েছে।
রান্না ও আহার হয়ে গেলে পর খুড়ো ঘরের মধ্যে গিয়ে মধ্যাহ্ননিদ্রায় প্রবৃত্ত হলেন এবং দু-সখী নিমগাছের ছায়ায় বসে তাদের সেই চিরদিনের আলোচনায় নিবিষ্ট হল। এই গল্পগুলির সঙ্গে মিশে কমলার কাছে এই নদীর তীর, এই শীতের রোদ, এই গাছের ছায়া বড়ো অপরূপ হয়ে উঠল; ঐ মেঘশূন্য নীল আকাশের যত সুদূর উঁচুতে রেখার মতো হয়ে চিল ভাসছে কমলার বক্ষোবাসী একটা উদ্দেশ্যহারা আকাঙ্ক্ষা তত দূরেই উধাও হয়ে উড়ে গেল।
বেলা যেতে না যেতেই শৈল ব্যস্ত হয়ে উঠল। তার স্বামী অফিস থেকে আসবে। কমলা বলল, “একদিনও কি ভাই, তোমার নিয়ম ভাঙার জো নেই?”
শৈল তার কোনো উত্তর না দিয়ে একটুখানি হেসে কমলার চিবুক ধরে নাড়া দিল, এবং বাংলোয় ঢুকে তার পিতার ঘুম ভাঙিয়ে বলল, “বাবা, আমি বাড়ি যাচ্ছি।”
কমলাকে খুড়ো বললেন, “মা, তুমিও চলো।”
কমলা বলল, “না, আমার কাজ বাকি আছে, আমি সন্ধ্যার পরে যাব।”
খুড়ো তার পুরাতন চাকরকে ও উমেশকে কমলার কাছে রেখে শৈলকে বাড়ি পৌঁছে দিতে গেলেন, সেখানে তার কিছু কাজ ছিল; বললেন, “আমার ফিরতে বেশি বিলম্ব হবে না।”
কমলা যখন তার ঘর-গোছানোর কাজ শেষ করল তখনো সূর্য অস্ত যায়নি। সে মাথায়-গায়ে একটা রেপার জড়িয়ে নিমগাছের তলায় এসে বসল। দূরে, ওপারে যেখানে বড়ো বড়ো গোটা দু-তিন নৌকার মাস্তুল অগ্নিবর্ণ আকাশের গায়ে কালো আঁচড় কেটে দাঁড়িয়ে ছিল তারই পেছনের উঁচু পাড়ির আড়ালে সূর্য নেমে গেল।
এমন সময় উমেশটা একটা ছুতো করে তার কাছে এসে দাঁড়াল। বলল, “মা, অনেকক্ষণ তুমি পান খাওনি– ও বাড়ি থেকে আসার সময় আমি পান জোগাড় করে এনেছি।” বলে একটা কাগজে মোড়া কয়েকটা পান কমলার হাতে দিল।
কমলার তখন চৈতন্য হল সন্ধ্যা হয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি উঠে পড়ল। উমেশ বলল, “চক্রবর্তীমশায় গাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন।”
কমলা গাড়িতে উঠার আগে বাংলোয় ঢুকে ঘরগুলো আরেকবার দেখে নেওয়ার জন্য প্রবেশ করল।
বড়ো ঘরে শীতের সময় আগুন জ্বালানোর জন্য বিলাতি ছাঁদের একটা চুল্লি ছিল। তারই সংলগ্ন থাকের ওপর কেরোসিনের আলো জ্বলছিল। সেই থাকের ওপর কমলা পানের মোড়ক রেখে কী একটা পর্যবেক্ষণ করতে যাচ্ছিল। এমন সময় হঠাৎ কাগজের মোড়কে রমেশের হাতের লেখায় তার নিজের নাম কমলার চোখে পড়ল।
উমেশকে কমলা জিজ্ঞাসা করল, “এ কাগজ তুই কোথায় পেলি?”
উমেশ বলল, “বাবুর ঘরের কোণে পড়ে ছিল, ঝাঁট দেওয়ার সময় তুলে এনেছি।”
কমলা সেই কাগজখানা মেলে ধরে পড়তে লাগল।
হেমনলিনীকে রমেশ সেদিন যে বিস্তারিত চিঠি লিখেছিল এটা সেই চিঠি। স্বভাবশিথিল রমেশের হাত থেকে কখন সেটা কোথায় পড়ে গড়াচ্ছিল, তা তার হুঁশ ছিল না।
কমলার পড়া হয়ে গেল। উমেশ বলল, “মা, অমন করে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলে যে! রাত হয়ে যাচ্ছে।”
ঘর নিস্তব্ধ হয়ে রইল। কমলার মুখের দিকে তাকিয়ে উমেশ ভীত হয়ে উঠল। বলল, “মা, আমার কথা শুনছ মা? ঘরে চলো, রাত হল।”
কিছুক্ষণ পরে খুড়োর চাকর এসে বলল, “মায়ীজি, গাড়ি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে আছে। চলো আমরা যাই।”