Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পঞ্চাশটি গল্প – বিমল কর

    বিমল কর এক পাতা গল্প1346 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    অশ্বত্থ

    যতক্ষণ না অফিসে যায় নবনী—তারপর রেণু একা, এ বাড়িতে। রোদ-তেতে-ওঠা বেলা এবং দুপুর—সারাটা দুপুর, বিকেলের ছায়া ঘন হওয়া পর্যন্ত একা-একাই কাটে ওর। নবনী তখন ফেরে।

    এই সময়টা, সারা দিনই বলা যায়, এ বাড়ি চুপ—রিভারসাইড রোডের এই নিরিবিলি বাড়ি একরকম নিঝুম। রেণুর চলাফেরা, বিছানা ঝাড়া, ঘরদোর আবার করে ঝাঁট দেওয়া, আর টুকিটাকি কাজ সারায় যতটুকু শব্দ—সে আর কতটুকু—রিভারসাইড রোডের গাছপালা কাঁপানো হু হু বাতাসে ডুবে যায়। পাখিদের কিচিরমিচিরও তো আছে! তবু থেকে থেকে আশ্চর্য রকম আরও কিছু শব্দ ফোটে। কুয়া থেকে জল তোলার সময় হুইলের কেমন একটানা সুর, স্নানের সময় রেণুর গা থেকে পায়ের কাছে মেঝেতে জল আছড়ে পড়ার ছর্‌ছর্‌, কিংবা ওর সেমিজ-ব্লাউজ কাচার, নবনীর গেঞ্জি-রুমালে সাবান দিয়ে আছড়ানোর থপথপ-থুপথুপ। আর এরই মাঝে মাঝে আচম্‌কা বা খুব মিহি চিকন গলার মিষ্টি সুর, গানের গুন্‌গুন্।

    এইসব শব্দ, এমন নয়, এত কিছু বেশি নয়, যাতে রিভারসাইড রোডের এই ছোট্ট বাড়ির নিস্তব্ধতা নষ্ট হতে পারে। বাস্তবিক তা হয় না। তবু নবনী অফিস না বেরুনো পর্যন্ত এই ছোট্ট সংসারের কিছু মুখরতা আছে। কোন্ সকালে উনুন ধরিয়ে দেয় রেণু, রোদ তখনও উঠোনে এসে পড়েনি, গাছের পাতাতেই আটকে রয়েছে। বাসি কাপড় ধুয়ে-টুয়ে চায়ের পাট সারতে বসে। রান্নাঘর থেকে নবনীকে ডেকে ডেকে হাল ছেড়ে দেয়। তারপর ঘরে গিয়ে ঠেলেঠুলে ঘুম ভাঙায় তার। চায়ের কাপ এগিয়ে দেয়। ঘরের সব ক’টা জানলা খুলে দেয়। জানলা খুলে দিয়ে বলে, “এত বেলা করে উঠলে আর বাজারে যাবে কখন!”

    নবীন জানলা দিয়ে বাইরে রোদের দিকে একটু তাকিয়ে জবাব দেয়, “এমন কি বেলা হয়েছে। তোমার ভাত হতে হতে আমি ফিরে আসব।”

    রেণু বাধা দেয়, “থাক! এখন আর সাইকেল্‌ ঘাড়ে করে বাজারে ছুটে যাবার দরকার নেই। যা আছে, হয়ে যাবে।”

    নবনী কথাটা কানে তোলে না। সে তো আর পাঁচ মাইল দূরে বাজারে যাচ্ছে না—খানিকটা এগিয়ে বি, এন, আর ব্রিজের চড়াই এর মুখে যে ছুটকো বাজার বসে দেহাতিদের, সেখান থেকেই আলুটা মাছটা নিয়ে আসবে!

    “আসবে যদি, তবে যাও।” রেণু ভাতের আগে ডালের ব্যবস্থাটা চট করে সেরে এসে ফর্দ দেয় মুখে মুখে, আর টাকা। থলেটা পর্যন্ত এগিয়ে দেয়।

     

    আরও দেখুন
    বাংলা হস্তলিপি কুইল
    কৌতুক সংগ্রহ
    Books
    ডিজিটাল বই
    ই-বই সাবস্ক্রিপশন
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    নতুন বই
    স্বাস্থ্য টিপস
    বাংলা ডিকশনারি অ্যাপ
    বাংলা গানের লিরিক্স বই

     

    নবনী সাইকল্‌ নিয়ে বেরিয়ে যায়।

    দেখতে দেখতে নবনী ফিরে আসে। ততক্ষণে বাসি বিছানা তোলা শেষ হয়ে গেছে, এক দফা ঝাঁটপাট পড়ে গেছে ঘরে। বারান্দা-উঠোনও বাদ পড়েনি। কুয়া থেকে জল তুলে রান্নাঘরের কাছাকাছি একটা জায়গায় রেখে দিয়েছে রেণু! বাটনা পর্যন্ত বাটা শেষ। নবনী ফিরতেই আর এক দফা চা, সকালের একটু কিছু খাবার। তারপর রেণু দ্রুত ছন্দে কাজ করে যায়। তরকারি-মাছ কোটাকুটি, ধোয়াধুয়ি। রান্নাঘরে হাতা-খুন্তির শব্দ আর থামে না।

    নবনী বেতের মোড়াটা টেনে নিয়ে রান্নাঘরের সামনে উঠোনে বসে। সামনে জলচৌকিতে আয়না, দাড়ি কামানোর সাবান, ব্রাশ, সেফটিরেজর, ব্লেড। রেণু এরই মধ্যে কখন একটু জল গরম করে নিয়েছে। নবনীর সামনে জলচৌকিতে দাড়ি-কামানোর আংটা-ভাঙা কাপটায় জলটুকু ঢেলে দেয়। জলটুকু ঠাণ্ডা হতে দিয়ে নবনী বলে, “আমাদের জ্যোতিষ কি বলছিল, জান?”

    রেণু কড়াই-এ তেল দিয়ে মাছ ছাড়ছে তখন। বেশ শব্দ উঠছিল। সেই শব্দকে কি করে যেন আয়ত্তে এনে বললে, “কি?”

     

    আরও দেখুন
    Books
    মিউজিক
    ট্রেন টু পাকিস্তান
    পোর্টেবল স্পিকার
    গল্প, কবিতা
    বাংলা বইয়ের আলোচনা ফোরাম
    বাংলা বই
    বইয়ের
    বাংলা বইয়ের প্রিন্ট কপি
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই

     

    “বলছিল, ওদের নিউ কলোনিতে বাচ্চা মেয়েদের একটা স্কুল করেছে—খুব অল্পই মেয়ে, নিজেদের বাড়ির বউ-বোনরা গিয়ে পড়িয়ে আসে। আমায় বলছিল তোমার কথা।” নবনী আঙুল দিয়ে জলের উত্তাপটা পরখ করে ব্রাশ ডুবিয়ে দিল।

    “আমি তো বাচ্চা নই, আমায় ভরতি করবে কেন?” রেণু রান্নাঘরের আড়াল থেকে বললে; ঠোঁট টিপে হাসি চেপে।

    “পড়তে বলেনি, পড়াতে বলেছে।” নবনী হেসে তার কথাটা আরও প্রাঞ্জল করে। দাড়িতে সাবান লাগাতে লাগাতে আবার বললে, “কথাটা কিন্তু মন্দ বলেনি। বলছিল ও, আমিও ভেবে দেখলুম—সত্যি, সারাটা দিনই তোমার একা-একা কাটে। এই আমি বেরিয়ে যাব, তারপর সন্ধে পর্যন্ত একেবারেই একা! কথা বলার মতনও একটা লোক নেই। সময় কাটে কি করে তোমার, কে জানে। আমি হলে পাগল হয়ে যেতাম।”

    মাছের ঝোলটা চড়িয়ে রেণু এইবার বাইরে বেরিয়ে এসেছে। নবনীর সামনেই দাঁড়িয়ে। জল-হাতটা মুছতে মুছতে রেণু বললেন, “তোমরা হচ্ছ শহরের হৈ-হট্টগোল ভিড়-টিড়ের লোক। আমি বাপু গেঁয়ো-টেঁয়ো, ফাঁকা-টাঁকার মানুষ—মধুপুরের মেয়ে। আমার কই একটুও খারাপ লাগে না—পাগলও হচ্ছি না!”

     

    আরও দেখুন
    ই-বই সাবস্ক্রিপশন
    বাংলা ফন্ট সাবস্ক্রিপশন
    সংগীত
    বই
    ই-বই পড়ুন
    গ্রন্থাগার
    পিডিএফ
    অনলাইন বুকস্টোর
    গল্প, কবিতা
    বাংলা হস্তলিপি কুইল

     

    গালের একটা পাশ শেষ করে নবনী স্ত্রীর দিকে মুখ তুলে তাকাল। দেখল একটুক্ষণ। তারপর হেসে ফেলল। “ভাল না লাগলেও এখন আর তোমার সে কথা বলার জো নেই।” নবনী আয়নার দিকে তাকিয়ে অন্য গালে ক্ষুর তুলল।

    “কেন?”

    “এ বাড়ি নিজেই তুমি পছন্দ করেছ।”

    “করেছি তো! এখনও করছি!” রেণু এ পাশ ও পাশ তাকিয়ে উঠোন, বারান্দা, পাঁচিল, ঘরের দেওয়াল—সব যেন একবার চোখ বুলিয়ে দেখে নিল। হ্যাঁ, তার পছন্দ-করা মনোমতন বাড়ির ঝক্‌ঝকে সুন্দর চেহারাটা। সদ্য চুনকাম-করা বাড়িটার গন্ধও যেন তার নাকে এসে লাগল। পিঠের ওপর খুলে-যাওয়া খোঁপার কাঁটাগুলো খুলতে খুলতে ওপর পানে তাকাল রেণু। খোঁপার পাক খুলতে বিনুনিটা পিঠের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। হাতের মুঠোয় তেল তেল কাঁটাগুলো নিয়ে রেণু একটু অন্যমনস্ক হয়ে তাকিয়ে থাকল। মাথার ওপর অশ্বথ গাছের একটা পাতা-ভরা ঝাঁকড়া ডালের আগাটা তখন হাওয়ায় দুলছে, পাতাগুলো নড়ছে, রোদের খানিকটা সেই পাতায় পাতায়, খানিকটা রেণুর বুকের ওপর শাড়ি ছুঁয়ে গড়িয়ে পড়ছে। শুধু বাড়ি নয়, এই গাছ, পাঁচিল টপকে অশ্বথের একটি শাখা তার প্রশাখাপল্লব নিয়ে উঠোনের মাথার ওপর ঢলে পড়েছে, ঢেকে ফেলেছে—এইটুকুও বড় ভাল লেগেছিল রেণুর। প্রথম দিন উঠোনে পা দিতেই এ বাড়ির এই আশ্চর্য সম্পদটুকুই আগে চোখে পড়েছিল রেণুর। আর রেণু অবাক হয়ে গিয়েছিল, মুগ্ধ হয়ে পড়েছিল। তখন পড়ন্ত বিকেল। স্তিমিত, শান্ত, অনুত্তাপ, সোনা-গলার মত সুন্দর রোদ পাতার জাফরিতে উপচে পড়েছে। আশ্চর্য সেই রং, অপূর্ব সেই ছায়া-বোনা-বোনা পাতার চাঁদোয়া! শীর্ণ ডগাটা একটু-একটু নড়ছিল, পাখি আসছিল উড়ে উড়ে—ডানার শব্দে, ডাকে ডাকে সমস্ত গাছটাই যেন হঠাৎ খুশিতে চঞ্চল হয়ে উঠল। রেণু এত তন্ময় হয়ে পড়েছিল যে, তার মনে হল, রেণুর পায়ের শব্দে গাছটা যেন কতকাল পরে কল্‌কল্‌ করে কথা বলে উঠল। কাছে পেয়ে যেন খুশি দিয়ে আগলে ধরল।

     

    আরও দেখুন
    অনলাইনে বই
    বাংলা কৌতুক বই
    বইয়ের
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    Library
    রেসিপি বই
    কৌতুক সংগ্রহ
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    গান

     

    বাড়িতে এসে উঠতে নয়, বাড়ি তখন দেখতে এসেছিল রেণু এসেই মুগ্ধ হল।

    ফেরার পথে নবনী শুধাল, “কেমন দেখলে গো, বাড়ি?”

    “সুন্দর—খুব সুন্দর!” রেণু তখনও অভিভূত হয়ে ছিল।

    রেণুর পছন্দ বড় খুঁটিনাটি মেনে চলে। নবনী একটু অবাক হয়ে বলল, “বল কি। তোমার মতন লোকের এক নজরেই এত পছন্দ হয়ে গেল!”

    আশপাশে লোক ছিল না। ধুলোর রাস্তা দিয়ে ওরা হাঁটছিল। সন্ধে হয়ে আসছে। প্রায়—ফাঁকা মাঠ দিয়ে হাওয়া বয়ে আসছিল, মেঠো গন্ধ, পাকুড়গাছের ঝোপের ওপর একটা পাখি ডাকছিল। রেণু হঠাৎ বললে, “আজ্ঞে হ্যাঁ, মশাই! হয়েছে, পছন্দই হয়েছে, খুব পছন্দ! যেমন তোমার হয়েছিল এক নজর দেখেই!” কথাটা বলে ফেলে রেণু হাসল। এবং নবনীর একটা হাত আঁকড়ে ধরে ঘন হয়ে গেল আরও। আর ভাবল, এই তুলনাটা তার হঠাৎ কি করে মনে এল, মুখেও এসে গেল, কে জানে!

     

    আরও দেখুন
    গ্রন্থাগার
    গান
    অনলাইন বুকস্টোর
    সংগীত
    বাংলা সাহিত্য ভ্রমণ
    বই ডাউনলোড
    PDF
    বাইশে শ্রাবণ
    বাংলা রান্নার রেসিপি বই
    ট্রেন টু পাকিস্তান

     

    রিভারসাইডের এই রাস্তাটা বড় ফাঁকা, আর বাড়িটা একরকম লোকালয়ের বাইরে বলে নবনীর একটু আপত্তি ছিল। অসুবিধের কথাও তুলেছে নবনী। কলের জল নেই বাড়িটায়, কুয়া থেকে জল টানতে হবে—লণ্ঠন অবশ্য এখানেও জ্বালাতে হচ্ছে, সেখানেও জ্বালাতে হবে। ভাল করে ভেবে দেখ।

    রেণু ভাল করে ভেবে দেখেছে। ফাঁকাই তো সে চায়। এই ফাঁকার জন্যে পুরনো বাজারের বাড়িতে সে ছট্‌ফট্‌ করছে। আর, লোকালয় নেই—এই কথা বল না। সামান্য একটু দূরেই তো পার্সি সাহেবদের বাংলো, তার পাশেই হলদে মতন দোতলা একটা বাড়ি! দু-চার ঘর আরও আছে ছিটিয়েছড়িয়ে। ভয় নেই, তোমার বউকে কেউ চুরি করে নিয়ে যাবে না দিনদুপুরে! এছাড়া আর আপত্তি কিসে! কলের জল নেই, না থাকুক; তোমাদের এই শহরের কষ্টা ময়লা জলের চেয়ে কুয়ার জল অনেক ভাল। আমাদের মধুপুরে আমরা কুয়ার জল খেয়েই মানুষ।

    নবনী ইচ্ছে করেই যে কথা এড়িয়ে গেছে, শেষ পর্যন্ত সেই কথাটা বললে, “একদম নিঃসঙ্গ হয়ে পড়বে রেণু, ও বাড়িতে! কথা বলার মতন লোক পাবে না একটা। আমি কোন্‌ সকালে বেরিয়ে যাব, ফিরতে বিকেল শের্ষ। অতক্ষণ একা একা তুমি থাকবে, কি করে, কাকে নিয়ে?”

     

    আরও দেখুন
    স্বাস্থ্য টিপস
    বাংলা স্বাস্থ্য টিপস বই
    বাংলা বইয়ের প্রিন্ট কপি
    PDF
    বাংলা হস্তলিপি কুইল
    বাংলা ক্যালিগ্রাফি কালি
    গীতবিতান
    বাংলা বইয়ের উপহার কার্ড
    নতুন বই
    অনলাইন বুকস্টোর

     

    কথাটা বুঝতে পারে রেণু। সহজেই ধরতে পারে। মুখটা হঠাৎ বিষণ্ণ, একটু বা কালো হয়ে আসে। অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে রেণু একটু ক্ষণ। তারপর খুব আস্তে আস্তে বলে, “তা কি করব, কাউকে নিয়ে থাকার কপাল যখন হচ্ছে না!” একটু থেমে আবার, “একা আমি বেশ থাকতে পারব—সে আমার ভাল লাগবে। বরং এই এখানে। পাঁচ পড়শীর সব তাতে কান-পাতা, হাসি তামাশা মজলিসী আমার ভাল লাগে না। একেবারেই নয়।” রেণু বুক ভরা নিশ্বাস ফেলে চুপ করে গিয়েছিল। তারপর মুখ নিচু করে আঁচল খুঁটতে খুঁটতে আনমনে একটা গিট বেঁধে ফেলল। “তোমারও সুবিধে হবে, ও বাড়িতে গায়ে গতরের এই কষ্টটা বাঁচবে। আমি সব ভেবে দেখেছি।”

    নবনীর সুবিধে সত্যিই হবে। রিভারসাইড রোডের বাড়ি থেকে সাইকেলে মেঠো পথ দিয়ে গেলে রেললাইন টপকে তাদের স্টিল ওয়ার্কসে যেতে মিনিট দশেক লাগে।। মাত্র মাইলটাক পথ। আর এখন পাঁচ মাইল রাস্তা সাইকেল ঠেঙাতে হচ্ছে যেতে আবার আসতে। গ্রীষ্ম-বর্ষা নেই, নিত্য দশ মাইল সাইকেল ঠেলা। নবনী তার কষ্টের কথা কদাচ বলেছে, কিন্তু রেণু নিয়ত তা অনুভব করেছে।

    এরপর আর কোনো কথা ছিল না। পুরনো ঘিঞ্জি বাজারের সেই এঁদো গলির ঘিনজি আর নর্দমার গন্ধ-ঘিন ঘিন বাতাস থেকে নবনী-রেণু—দুটি প্রাণীর ক্ষুদ্র সংসার রিভারসাইড রোডের এই ফাঁকা ছিমছাম ছোট্ট সুন্দর বাড়িতে উঠে এল। যে বাড়ির সামনে দিয়ে লালচে ধুলোর কাঁচা সড়ক এঁকে বেঁকে চলে গেছে দামোদরের দিকে, এ-পাশ ও-পাশ মাঠ, উঁচু-নিচু ক্ষেত, আলের গোলকধাঁধা, ধুলোয়-ঢাকা পলাশঝোপ, বনতুলসী, কাঁটা বেগুন। পাকুড়-বট-অশ্বথের কিছু মিশেল এখান ওখান। বাড়ির সদরের কাছে ছোট কুয়া, সিমেন্ট দিয়ে ধার-বাঁধানো, হুইল ঝোলান।

     

    আরও দেখুন
    সংগীত
    বাংলা ই-বুক রিডার
    PDF বই
    মিউজিক
    বাংলা ক্যালিগ্রাফি কাগজ
    পোর্টেবল স্পিকার
    বই পড়ুন
    পিডিএফ
    অনলাইন বুকস্টোর
    বাংলা লেখকদের সাক্ষাৎকার

     

    আর এ বাড়ির বাইরে সেই অশ্বত্থাগাছ—যার একটা বিরাট শাখা প্রশাখাপল্লবে পাতার জাফরি বুনে উঠোনের আধখানা ঢেকে ফেলেছে। আলো, আর আকাশ, আর মেঘ এবং পাখি ও তারা সেই জাফরির বুননি আলগা করে করে রেণুকে হাতছানি দিচ্ছে সব সময়।

    বড়জোর দিন পর হল এসেছে রেণু এই নতুন বাড়িতে। কিন্তু পনের মাসের ভালবাসা পড়ে গেছে এর মধ্যেই। রেণু বেশ আছে, খুশি হয়েই আছে। নিঃসঙ্গতা বাস্তবিক সে অনুভব করছে না নতুন করে কিছু! এই নিঝুম নিস্তব্ধতা তার মনের মধ্যে টন্‌টন্‌ করে ওঠে না। বরং রেণু একা-একা, এই চুপ এবং এই শান্ত জায়গায়, নিরিবিলিতে, খানিক বেলায় এবং রোদ্দুরে, ঘুঘু-ডাকা অলস দুপুরে, ছায়া-নামো নামো। বিকেলে নিজেকে যেন খুলেমেলে, ছড়িয়ে টুকরো-টুকরো সুখ, সুখের স্বপ্ন দিয়ে ভরিয়ে সুন্দর করে তার মন নিকিয়ে নেয়। তারপর নবনী ফিরে এলে অবসরের সেই শান্ত, আনমনা, স্বপ্নবিভোর রেণুকে রেখে দিয়ে অন্য এক রেণু যেন ঘুম ভেঙে আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে। আবার কথা, ডাকাডাকি, হুটহাট, কাপ-প্লেটের ঠুনঠান, বেলুন-চাকির খটখট, হাতা-খুন্তির শব্দ। মনে হয়, দুপুরের গাঢ় ঘুম থেকে আবার যেন বাড়িটাকে জাগিয়ে দিল রেণু। রেণু এবং নবনী।

     

    আরও দেখুন
    গান
    বাংলা অডিওবুক
    বই
    গল্প, কবিতা
    বাংলা ডিকশনারি অ্যাপ
    অনলাইনে বই
    নতুন বই
    বাংলা ক্যালিগ্রাফি কাগজ
    বাংলা বইয়ের উপহার কার্ড
    বই পড়ুন

     

    ওরা এ বাড়িতে এসেছিল পুজোর পর পরই। —আশ্বিনের শেষ তখন। কুয়াতলার কাছে শিউলি ঝাড়ে সন্ধেয় আকুল করা গন্ধ ফুটত তখনও। তারপর কার্তিক পড়ল। রোদ এবং আকাশ আরও কিছুদিন বেশ উজ্জ্বল আর নীল হয়ে ছিল। শরৎ যেন গিয়েও যাচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত গেল—হেমন্তের ভোরে একটু-একটু হিম পড়ছিল, ঘাসে শিশির ঝরছিল এবং রাত্রে আকাশের নিচে কুয়াশার খুব পাতলা একটা পরদা যেন ঝুলত। একদিন—হ্যাঁ, তেমনি এক হেমন্তের সন্ধেয় একদিন—নবনীর খানিকটা দেরি হয়ে গেল বাড়ি ফিরতে। সদরটা খোলাই ছিল—নবনী সাইকেল্‌ নিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে গেল। সারাটা বাড়ি নিঝুম হয়ে আছে ; কোথাও এক ফোঁটা আলো জ্বলছে না। রেণুর কোনো সাড়াশব্দ নেই। নবনী চমকে উঠেছিল এবং আর একটু হলেই হয়ত চিৎকার করে ডেকে বসত। কিন্তু রেণুর চেহারাটা চোখে পড়ে গিয়েছিল বলে নবনী বোকা বেরসিকের মতন আর চিৎকার করে উঠল না। বরং দেখল, দেখতে লাগল, বারান্দার ধার ঘেঁষে বসে গালে হাত দিয়ে রেণু তন্ময় হয়ে যা দেখছিল। উঠোনের ওপর এলিয়ে-পড়া অশ্বত্থের ডালপালায় নীলের রং মেশানো অপরূপ জ্যোৎস্না ঝরে পড়ছে। যেন রুপোর জলে একরাশ ডুবানো পাতা ভাসছে। ভিজে-ভিজে, নরম এবং মসৃণ! সেই পাতার জাফরি গলিয়ে উঠোনের সিমেন্টে কেমন এক ছায়া-বোনা চাঁদের আলো লুটিয়ে রয়েছে। হ্যাঁ, রেণুর গায়ে এবং পায়ে এই ছায়ার নক্‌শা-কাটা আলো সুন্দর হয়ে ছড়িয়ে ছিল। মনে হচ্ছিল, কিসের এক সুন্দর চাদর যেন ঘন করে জড়িয়ে রয়েছে রেণু। আর, সেই ঘন স্পর্শের মধ্যে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে—ঘুমিয়ে রয়েছে।

     

     

    নবনী আস্তে করে রেণুর ঘোর ভাঙিয়ে দিল। চমকে উঠে রেণু চাইল।

    “কি ব্যাপার? বাতিটাতি জ্বালনি আজ—এমন করে বসে আছ?”

    কোনো জবাব দিল না রেণু সে কথার। আস্তে আস্তে ঘরে এসে ঢুকল। বাতি জ্বেলেছিল রেণু ; বাতিগুলো সবই জ্বলছিল—মিটমিট করে, পলতের আগায় এক-নখ পরিমাণ আলো নিয়ে। পলতে বাড়িয়ে দিতে দিতে রেণু এতক্ষণ পরে নিজেকে ফিরে পেল!

    “এত দেরি?” নবনীর হাত থেকে ছাড়া জামা নিতে নিতে রেণু আলনার কাছে এগিয়ে গেল। দু’পাট করা ধুতিটা নিয়ে আবার কাছে এসে দাঁড়াল।

    “আর বল কেন! ফালতু ক’টা কাজ ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছিল—শেষ করে তবে উঠলাম।”

    রেণুর হাত থেকে কাপড় নিয়ে নবনী একটু থেমে বললে আবার, “যাই বল, বাড়িতে পা দিয়ে আজ আমার বুক চমকে উঠেছিল।” একটু হাসল ও, “একেবারে ভোঁ-ভোঁ, অন্ধকার—তোমায় দেখতে পাচ্ছিলাম না ; ভাবলাম, সীতাহরণ বুঝি হয়ে গেছে।”

     

     

    রেণুও ঠোঁটে হাসল। নবনীর দিকে চেয়ে বললে, “কি করব! তুমি ফিরছ না—বাইরে বসেছিলাম।”

    “একেবারে তন্ময় হয়ে গিয়েছিলে। কি দেখছিলে অত একমনে—চাঁদের আলো, না গাছ?”

    কথাটার কোনো জবাব দিল না রেণু। ঘর ছেড়ে যেতে যেতে বললে, “এস তাড়াতাড়ি-চায়ের জল হতে বেশিক্ষণ লাগবে না।”

    চা খেতে খেতে নবনী বললে, “একটা ঝি রাখবে সারাদিনের?”

    “ঝি! কেন?”

    “তোমার কাজকর্ম করে দেবে। তাছাড়া, সারাদিন একটা মানুষ থাকবে বাড়িতে! দুটো কথাও বলতে পারবে?” নবনী রেণুর দিকে চেয়ে থাকল।

    রেণু মাথা নাড়ল। পায়ের ওপর কাপড়টা একটু উঠে গিয়েছিল, টেনে দিতে দিতে বললে—মুখ নিচু করেই, “দুজনের এক ফোঁটা সংসারের জন্যে আবার ঝি কি হবে? আমি তাহলে করব কি?”

     

     

    নবনী যে এ কথাটা না বোঝে, তা নয়। সবই বোঝে! সংসারের ছোট-বড় দশটা কাজ নিয়েই রেণু আছে। তাদের দুটি প্রাণীর সংসার এত ছোট এবং কাজ সত্যি-সত্যি এত কম যে, একটা কাজ একবার সেরে রেণু সময় ফুরোতে পারে না। দরকার নেই, তবু একই কাজে বারে বারে ঘুরে-ফিরে হাত লাগাবে রেণু। কি মানে হয়! তবু একফোঁটা এই ঘর দিনে দশবার ঝেড়ে-মুছে সাজাচ্ছে। বিছানা টেনে টেনে রোদে দিচ্ছে রোজ, বালিশের ফরসা ওয়াড় আবার করে কাচছে, টেবল গুছোচ্ছে, সোড়া-সাবান দিয়ে বারে বারে কাপ-প্লেট ধুচ্ছে। এইরকম সব।

    রেণুর হাত থেকে এ কাজ কেড়ে নেওয়া যায় না। নবনী তা চায় না। আসলে, ঝি রাখার কথা তুলেছিল অন্য কারণে ; রেণুর সারাদিনের এক সঙ্গী যদি এইভাবে জুটিয়ে দেওয়া যায়, তাই ভেবে।

    নবনী খানিকটা চুপ করে থেকে বললে, “একটা রেডিও কিনবে—ব্যাটারি সেট। বেশ সস্তায় পাওয়া যাবে।”

    রেণু মুখ তুলে ভাল করে চেয়ে চেয়ে দেখল নবনীকে। “কি ব্যাপার বল তো? মাইনে-টাইনে হঠাৎ বেড়ে গেছে নাকি তোমার?”

    নবনী হাসল। “আরে না, মাইনে আর কোথায় বাড়ল! বলছিলাম এমনি ; রেডিও থাকলে বেশ সময় কাটত তোমার—গান-টান শুনতে।”

    “আমার সময় কাটানো নিয়ে তুমি দেখছি খুব সমস্যায় পড়েছ!”

    নবনী যদিও কিছু বললে না, মাথাও নাড়লে না, তবু তার মুখ দেখেই মনে হচ্ছিল, সত্যিই এটা তার কাছে সমস্যাই এবং যথেষ্টভাবে ব্যাপারটা নিয়ে বিশেষ করে এ বাড়িতে আসার পর আরও যেন বেশি করে ভাবছে।

    কদিন পর নবনী হঠাৎ এক মজার প্রস্তাব করে বসল।

    “আমি ভাবছি, তোমায় এবার থেকে একটা টাস্ক দিয়ে যাব।”

    “নাকি! হোম্ টাস্ক?” হাতের বইটা মুখের কাছ থেকে সরিয়ে স্বামীর দিকে চাইল রেণু। এবং হাসল।

    “হ্যাঁ। কাজটা প্রথম-প্রথম ভাল না লাগলেও শেষে দেখবে, নেশা ধরে গেছে।”

    নবনী হেসে হেসে বলছিল, “তাছাড়া, একবার যদি লাগাতে পার, আর দেখতে হবে। না—ক্যাশ চল্লিশ কি পঞ্চাশ হাজার টাকা!”

    “ক্রসওয়ার্ড বুঝি!” রেণু হাসছিল।

    “হ্যাঁ। তুমি শুধু সুটেবল ওআর্ডগুলো বেছে রাখবে ডিক্‌শনারি ঘেঁটে—বাকিটা আমি করব।” নবনী উৎসাহিত হয়ে উঠল।

    রেণু এবার খিলখিল করে হেসে ফেলল। “তার চেয়ে একটা দাবার ছক্‌ কিনে নিয়ে এস। যাবার আগে তোমার শেষ চাল দিয়ে যেও—আমি সারাদিন গজ-নৌকো সামলাতে মত্ত থাকব।” হাসি থামলে বললে, “যদি বল—আমি স্বয়ং রোজ দুপুরে দশ পাতা করে হাতের লেখা লিখতে পারি, গোটা কুড়ি করে যোগ-বিয়োগ-লসাগু!” কথাটা শেষ করে আবার হাসল রেণু।

    নবনী চোখ কুঁচকে মিষ্টি করে যেন ধমক দিল বউকে। “হ্যাত, খালি ইয়ারকি! যা বলব, তাতেই হাসি-তামাশা। আমার কি—কচু, আমার তো আর সারাদিন-দুপুর ভূতের মতন একা-একা বাড়ি আগলে বসে থাকতে হয় না। কষ্ট তোমারই—তুমিই বোঝ!”

    রেণু স্বামীর মুখের দিকে আরও খানিক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিল। বেশ একটু আন্‌মনা হয়ে পড়েছিল রেণু ; বই-এর পাতা যদিও একটুক্ষণ চোখের সামনে খুলে বসে থাকল, কিন্তু আর মন বসছিল না। বালিশের পাশে বই রেখে, হাঁটু মুড়ে কুঁকড়ে দেওয়াল-মুখো হয়ে শুয়ে পড়ল। লণ্ঠনের আলো দেওয়ালের যেখানটায় আসেনি, আসতে পারেনি সেই অন্ধকারের দিকে আধ-বোজা চোখে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকল।

    এখন রেণু ভাবছিল—সারাদিন আর দুপুর, আর বিকেলের ছায়া ঘন না হওয়া পর্যন্ত আমার সময় কি করে কাটে, নবনী তাই ভেবে ভেবে আকুল হয়ে পড়েছে। ওর ধারণা—এই দীর্ঘ সময় আমি একা-একা ভূতের মতন কাটাই এ বাড়িতে, কথা বলতে না পেয়ে আমার বুক শুকিয়ে ওঠে, আমি হাঁসফাঁস করি।

    কিন্তু আমার সময় কেমন করে কাটে, নবনী যদি তা জানত, আর বুঝত! সে জানে না; তার বোঝার জিনিসও এ নয়।

    তুমিও বুঝবে না! রেণু চোখের পাতা পুরো বুজে ফেলল এবং স্বামীকে মনে মনে বললে, আমি মধুপুরের মেয়ে—এখানে কোন্ মধু নিয়ে কেমন করে আছি, কত সুখে!

    কিন্তু, রেণু কি করে সেই সকাল ন’টা সওয়া ন’টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময় এক-একা কাটায়, এই রিভারসাইড রোডের ফাঁকা বাড়িতে! নবনী চলে যাবার পর আর কি থাকে—কোন্ আকর্ষণ?

    থাকে। আকর্ষণ থাকে। এবং সুখও আছে।

    নবনী চলে গেল। সদরে খোলা কপাটে হাত দিয়ে, কোনোদিন বা কুয়ার সামনে দাঁড়িয়ে রেণু দেখল, সাইকেলে চেপে নবনী এঁকেবেঁকে দেখতে দেখতে দূরে চলে গেল ; তারপর ধুলো-ভরা পলাশের ঝোপের আড়ালে হারিয়ে গেল।

    সঙ্গে-সঙ্গেই যে রেণু সদর বন্ধ করে ঘরে ঢুকল, তা নয়। দাঁড়িয়ে থাকল সামনে চেয়ে। কিংবা একমনে শিউলি গাছের ঝোপটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল। এখানে দুটো তিতির রোজ নেমে আসে। চড়ুইদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ঘাসে, ছাই-এর গাদায় কি যেন খুঁটে খুঁটে খায় ; ঝটপট করে ; উড়ে যায়। আবার ডেকে ডেকে রেণুর পায়ের কাছে টুপ করে নেমে আসে। বাড়ির মধ্যে হুট করে ঢুকে পড়ে রেণু। উঠোনে নামানো নবনীর এঁটো থালার ভাতটাতগুলো এনে ছাইগাদার কাছে ছড়িয়ে দেয়। আর, দেখতে দেখতে কাক-চড়ুই শালিক ঝাঁক বেঁধে নেমে আসে।

    খানিকটা সময় এইভাবে কাটল। তারপর সদর ভেজিয়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল রেণু। এতক্ষণে মাথার ওপর অশ্বথের ডালপাতার পাশ কাটিয়ে প্রথম-শীতের সুন্দর রোদ্দুর ছড়িয়ে পড়েছে আধখানা উঠোন জুড়ে। মুখ তুলে তাকায় রেণু। আগায় একটি-দুটি কচি পাতা নিয়ে অশ্বত্থের একটি সরু ডাল পতপত করে মাথা নাড়ছে। যেন কত খুশি! আর, এক পাশে পাতায়-পাতায় আলুথালু, লম্বা মতন, রোগা একটা ডাল দোল খাচ্ছে। উড়ে-আসা কাকের পায়ের চাপে, গায়ের ভারে। কোথাও বা একটুও কাঁপন নেই ; পাতাগুলো সব আঁকা ছবির মতন নিথর হয়ে আছে।

    এরই মধ্যে টুপটাপ ক’টা পাতা উঠোনে এসে পড়ল ; আঙুলের মত শুকনো ছোট ডাল ফেলে উড়ে গেল কাক। আড়াল থেকে দুষ্টু কোনও পায়রা হয়ত মল ফেলে গেল। আরও কত কি—কুটোকাটা, মাছের কাঁটা, সাপের খোলস!

    গাছটার দিকে তাকিয়ে রেণু একটু চোখ কোঁচকাল। মনে মনে বললে, দাঁড়াও, এখনই আমি ঝাঁটা হাতে করছি না! আগে একটু চা খাই, চুল খুলি—তারপর।

    তারপর সময় হলে কোমরে আঁচল জড়িয়ে, পিঠে চুল এলিয়ে রেণু উঠোনটা একবার ঝাঁটা দিয়ে নিল। ঢাকা বারান্দাটুকুও। নারকেল ঝাঁটা দিয়ে উঠোন ঝাঁট দেয় না রেণু দিতে পারে না। ফুলঝাঁটার নরম গা দিয়ে সুন্দর করে পাতা, ডাল, কাঁটা, খড়কুটো—সব টেনে নিয়ে উঠোনের এক পাশে করে।

    এবার রোদে মোড়া টেনে নিয়ে বসল খানিক। কি কি করবে, করতে হবে—ভাবল গাছের দিকে চোখ তুলে। হয়ত প্রথমেই নরুন দিয়ে বসে বসে নখগুলো কাটল হাতের। তারপর পায়ের। গায়ের ব্লাউজটা খুলে ফেলল। রোদের তাতে গরম লাগছে। চিরুনি দিয়ে চুলের জট ছাড়াল বসে বসেই।

    ঘরে ঢুকল এবার রেণু। ঘরদোর পরিষ্কার করে ঝেড়ে-মুছে বেরুতে খানিকটা সময় লাগে। আবার উঠোনে এসে নামল যখন, হাতে হয়ত বালিশের ওয়াড় কিংবা তোয়ালে, নবনীর গেঞ্জি-রুমাল—এমনি কত কি! উঠোনের এক পাশে নামিয়ে রাখল সব। জল আনল কুয়া থেকে। কাচতে বসল। গাছের পাতা কেমন করে যেন ঠিক তার মাথার ওপর ছায়া এনে ফেলেছে—ততক্ষণে।

    কাচাকুচি শুকোতে দিয়ে আবার একবার উঠোন ঝাঁট দিল রেণু। এরই মধ্যে আবার ক’টা পাতা, খড়কুটো ছিটিয়ে পড়েছে। জল দিয়ে উঠোনটা ধুয়ে ফেলল। তারপর ওর স্নান। স্নানের আগে জল তোলা, এঁটোকাঁটা বাসনগুলো মেজে নেওয়া, রান্নাঘর ধোয়া।

    তারপর স্নান। সদর বন্ধ। পাঁচিলে আড়াল এক পাশে, অন্য পাশে রান্নাঘরের গা লাগিয়ে টানা উঁচু দেয়াল। মাথার ওপর অশ্বত্থপাতার জাফরি। রেণুর ভাল লাগে এই উঠোনে নেমে রোদে অনেকখানি সময় নিয়ে স্নান করতে। একটু-একটু করে সাবান ঘষতে, অযথাই জল কুলকুচো করে ফেলতে, এবং হঠাৎ চুপ করে হাঁটুর মধ্যে মাথা রেখে পায়ের কাছে সাবানের ফেনা জমা দেখতে! আঙুল দিয়ে সেই ফেনা কাটে রেণু অন্যমনস্ক হয়ে, বিভোর হয়ে। হঠাৎ একটা কাক হয়ত ডেকে ওঠে, একটি অশ্বত্থের পাতা উড়ে উড়ে এসে ওর খোলা কাঁধের ওপর টপ করে পড়েই বুক গড়িয়ে কোলের ওপর থেমে যায়। কখনও বা পিঠের পাশে পড়ে—পিঁড়ির ধারে-কাছে। এই পাতা রেণু সহজে ফেলে না, ফেলতে পারে না। তার সাবান-গন্ধ সুন্দর লম্বাগড়ন হাতে আলতো করে তুলে নিয়ে কেমন করে যেন দেখে।

    স্নান শেষ হলে রান্নাঘরেই খেতে বসে রেণু। খেতে খেতে গাছটার দিকে তাকায়। তাকায়, আর আনমনা হয়ে যায়।

    তারপর শীতের দুপুরে রেণু বারান্দায় মাদুর পেতে ফেলে। লেপটা তোষকটা রোদ্দুরে দেয়। তারই এক পাশে পানের লালে ঠোঁট রাঙিয়ে একটা বই-টই হাতে নিয়ে একটু গড়াগড়ি দেয় কি দেয় না, হুসহাস করে পাখি তাড়ায়, গাছের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অস্ফুট কণ্ঠে ধমক দেয়, উঁহু, আর না—বিছানা নোংরা হবে।

    এরপর সারাটা দুপুর সেই নিঝুম, বিভোর ঘুম-ঘুম, খড়-রং রোদে, এলোমেলো হাওয়ায় রেণু বসে গাছের দিকে চোখ তুলে তুলে উলকাঁটা নিয়ে নবনীর সোয়েটার বোনে। তখন এই গাছ—গাছের পাতা তার সব। তাদের সঙ্গে যত মনের চুপ-চাপ অস্ফুট কথা, তাদের জন্যে একটু বা ঘাড় কাত করে হাসি, মাঝে মাঝে মিষ্টি মিহি গলায় গানের গুনগুন।

    দেখতে দেখতে দুপুর কেটে যায়। অশ্বত্থের পাতা থেকে রোদ সরে যায়। একটু পরেই ছায়া জড়িয়ে আসতে থাকে ডালে-পাতায়। পাখিরা ফিরে আসে। গাছটা যেন ঝটপট করে ওঠে, শব্দে ভরে যায়, হাওয়া বয়ে যায়—ঠাণ্ডা হাওয়া ; একটা মেঘ এসে খানিক দাঁড়ায় গাছের মাথায়—আকাশে, তারপর আস্তে আস্তে কখন সরে যায়। নবনীর সাইকেলের ঘণ্টি বেজে ওঠে বাড়ির কাছে।

    সারাদিন, আর দুপুর, আর এই প্রথম-বিকেলের আশ্চর্য এক স্বপ্ন, তন্দ্রাবিভোর নিস্তদ্ধতা থেকে রিভারসাইড রোডের বাড়ি চমকে জেগে ওঠে।

    রেণু আবার নবনীর—নবনীকান্ত রায়ের—সুন্দরী স্ত্রী হয়ে ওঠে। সুপটু ঘরনী।

    হ্যাঁ, এই আশ্চর্য সুখ এবং এই গাছ-গাছ, নরম কেমন এক অদ্ভুত মন নিয়ে মধুপুরের মেয়ে রেণু এমন ফাঁকা নির্জন বাড়িতে দিব্যি ছিল। বেশ শান্তিতেই। তারপর পাতা-ঝরার দিন এল।

    শীত তখন যেন একটু কমেছে—একদিন কোথা থেকে এক দমকা হাওয়া এল ; আর সাত-সকালে রেণু যখন রাতের বাসি কাপড় ছেড়ে উঠোন দিয়ে আসছে রান্নাঘরে, একমুঠো রোদ তার গায়—তখন ঠিক তখনই—কতকগুলো পাতা ঝরে এসে পড়ল। রেণুর গায়ে, পায়ে উঠোনে। রেণু থমকে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তাকাল। অশ্বত্থের ডালপালা কাঁপছে, হলুদ রোদ-পোড়া কটা পাতা দুলছে।

    ঝরা পাতা ক’টা উঠোনের এক পাশে সরিয়ে দিতে গিয়ে রেণু দেখল, তার কতক শুকনো, কতকের আধখানা গা হলদে, কাঠ-রং খড়খড়ে হয়ে গেছে।

    সেই শুরু। এরপর প্রথম কয়েক দিন মাঝে মাঝে পাতা ঝরেছে। দেখতে দেখতে কি যে হয়ে গেল, রেণু ভাল করে বুঝতেও হয়তো পারল না, পাতা ঝরার খেলা শুরু হল।

    হ্যাঁ, খেলা! খেলা বইকি। থেকে থেকে হাওয়া দিচ্ছে—দমকা হাওয়া, অশ্বত্থের ঝাঁকড়া ডালের পাতাগুলো গা হেলিয়ে মাথা দুলিয়ে কেমন এক পট্‌পট্‌ শব্দ করছে, তারপর ঝরঝর করে ঝরে পড়ছে সারা উঠোন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে। রোদ একটু তেতে উঠলেই যেন খেলাটা জমে ওঠে। নবনী তখন অফিসে বেরিয়ে গেছে। এই একরাশ পাতা ডাঁই করল রেণু ঝাঁট দিয়ে, তারপর হয়ত লণ্ঠনের চিমনিগুলো পরিষ্কার করছে কিংবা টেবলটা গুছচ্ছে ঘরে গিয়ে—শুনতে পেল, টুপটাপ করে পাতা ঝরছে, খস্‌খস্‌ করে ঘষটে যাচ্ছে। রেণুর কানে এই মৃদু শব্দও আজকাল ধরা পড়ে যায়! বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে রেণু, ঠিক তাই আবার উঠোন ভরে শুকনো, হলুদ, আধ-হলুদ পাতা ঝরে পড়েছে। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে রেণু কোমরে আঁচল জড়িয়ে আবার পাতা কুড়োতে বসে। পাতাই শুধু নয়—ছোট ছোট ডালপালা, খড়-কুটোও! ডাঁই করে একটা জায়গায় রাখে সব। আন্দাজে বোঝে, এক-আঁচল পাতা আবার ঝরেছে।

    খেলাটা নতুন। কিন্তু রেণুর এই খেলাই সবচেয়ে ভাল লেগে গেল—সারা দুপুর ভরে এই ঝরা পাতা কুড়োনোর খেলা। সব অবসর যেন তারা কেড়ে নিল। ঘুরতে-ফিরতে, বাসন ধুতে জল তুলতে, স্নান করতে রেণু বারবার উঠোনের মধ্যে থমকে দাঁড়ায়, আর অশ্বত্থ গাছটার এই শয়তানি দেখে। হ্যাঁ, শয়তানি বইকি! রেণু ভেবে দেখেছে এবং একা-একা বেশ জোরের সঙ্গেই বলেছে, গাছটাকে শুনিয়ে শুনিয়ে, দাঁড়াও—দেখছি! তোমার এই ঘর নোংরা করার ফন্দিফিকির আমি এবার বন্ধ করব!

    বাস্তবিক, গাছটা যেন রেণুর কাজ বাড়াবার জন্যে দুষ্টুমি করে একটা ফন্দি এঁটেছে।

    শুধু তোমায় নিয়ে থাকলেই আমার সব হবে না! রেণু একদিন সত্যি-সত্যি সেই ফাঁকায় চোখ পাকিয়ে গাছটাকে ধমকে উঠেছিল : খালি নোংরামি!

    আর একদিন যখন রান্নাঘরে খেতে বসেছে, আর একটা ময়লা পাতা উড়ে এসে পাতে পড়ল। রেণু একটু অবাক চোখে গাছটার দিকে তাকিয়ে আধবোজা গলায় বলে ফেলল, শান্তি করে দুটো ভাত খেতেও দিবি না।

    মুখে যাই বলুক, রেণু কিন্তু এই যেন ভালবাসত। সারাটা দিন, দুপুর, বিকেল এই যে একটা দেখ-দেখ ভাব, ঝালাপালা হাওয়া, ঝঞ্ঝাট পোহানো—এর কি যেন এক গাঢ় সুখে ভরে গিয়েছিল ও।

    একদিন আচমকা বলল নবনীকে, কথায় কথায়, “কচি ছেলে থাকারও অধম হয়ে উঠেছে বাড়িটা! কি যে জ্বালা জ্বালায় বাপু এই অশ্বত্থগাছটা, কি বলব। আর পারি না!”

    নবনী হেসে জবাব দিল, “তোমারই তো গাছ! একটু জ্বল।”

    কথাটা রেণুর কেমন যেন লেগেছিল কানে। অদ্ভুত-অদ্ভুত। মনে মনে কয়েকবারই নবনীর গলা দিয়ে কথাটা আবৃত্তি করেছে। আর কি আশ্চর্য, রেণু হঠাৎ ভেবেছে, এ গাছটা যদিও তার নয়, তবু তার যদি নিজের রক্ত-মাংস থেকে একটা সেই গাছ হত—এমনি করেই জ্বালাত!

    পাতা-ঝরার খেলাও ফুরল। সব পাতা ঝরে ঝরে সেই অশ্বত্থ একদিন শূন্য হয়ে গেল। তার শাখা-প্রশাখা নিষ্পত্র হয়ে আকাশ, আর রোদ, আর মেঘকে মুক্ত করে দিলে। রেণু সেদিন অশ্বত্থের এই রিক্ততা করুণ চোখ নিয়ে দেখেছে। তার বুক টন টন করছিল, জল আসছিল চোখে। উদাস হয়ে কতক্ষণ যে তাকিয়ে থেকেছে। তারপর হঠাৎ উত্তরের কোণ ঘেঁষে লিকলিকে সরু একটা ডালে দুটি কচি পাতার মাথা দুলনো দেখে নিশ্বাস ফেলেছে। এবার নতুন পাতার পালা! রেণু প্রথমটায় একটু খুশি হলেও যখন ভেবে দেখল, তার অফুরন্ত অবসরে আর কেউ ভাগ বসাতে আসবে না এখন, অনেক—অনেকদিন, তখন আবার বুক ঠেলে ভারি একটা নিশ্বাস উঠে এল। সেদিনটা কিছু আর ভাল লাগেনি রেণুর।

    পরের দিন আরও কটি নতুন পাতা দেখল গাছে। রেণু বেশিক্ষণ সেদিকে চাইল না। পরের দিন আরও কিছু নতুন পাতা। রেণু এবার চাইল। তারপর এই নতুন পাতার খুশিকে আর সে না মেনে নিয়ে পারল না। মনে মনে যেন সব বোঝাপড়া করে নিয়ে হেসে বললে, আর আদিখ্যেতায় কাজ নেই—এসেছ, বেশ হয়েছে! নিজের মতন থাক—আমায় জ্বালিও না!

    নতুন পাতায় দেখতে দেখতে যখন গাছ ভরেছে, তখন একদিন এক দুপুরে রেণুর মনে কেমন এক খট্‌কা লাগল।

    ক’দিন যেতে রেণু আর এক দুপুরে মনে মনে হিসেব করলে। একই হিসেব—সোজা ; কিন্তু সারাটা দুপুর সেই হিসেবে কাটল।

    আরও ক’টা দিন গেল। রেণু কেমন যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার ভয় হচ্ছিল ; রাত্রে ঘুমুতে পারছিল না। স্বপ্ন দেখছিল হিজিবিজি।

    তারপর একদিন অশ্বত্থের সেই ঝাঁকড়া-মাথা ডাল যখন নতুন পাতায় পাতায় ছেয়ে গেছে, বাড়িটা ভরে অদ্ভুত এক বুনো গন্ধ—রেণু বুঝতে পারল, যার আশা ছেড়েই দিয়েছিল ওরা, বিয়ের তিনটি বছর পরে সেই আশা যেন দানা বেঁধে উঠেছে। এখন মনে হচ্ছে, নবনী-রেণুর মধ্যেও একটি নতুন পাতা এইবার ফুটছে।

    শেষ পর্যন্ত আর কিছু অবিশ্বাসের থাকল না। কোনও সন্দেহ রেণুর মনে ‘কি জানি’ হয়ে খচখচ করতে লাগল না। রেণু বুঝল, স্পষ্ট করেই বুঝতে পারল, তার রক্ত-মাংস এবার এক নতুন প্রাণ গড়ছে।

    নবনী বললে, “চল, ডাক্তারের কাছে। প্রথম থেকেই কেয়ার নেওয়া ভাল।”

    রেণু একটুও আপত্তি করলে না।

    আর কিছুদিন পর নবনী প্রস্তাব করলে, “একটা ঠিকে ঝি পাওয়া গেছে, সকালে-বিকেলে কাজ করে দিয়ে যাবে। আসতে বলে দি, কেমন? বেশি খাটাখুটি এ সময়ে তোমার উচিত নয়।”

    আশ্চর্য, রেণু এবারও আপত্তি করলে না।

    ঝি এল। সকালেই আসত—রোদ উঠে গেলে। কাজকর্ম সেরে চলে যেত। আবার আসত দুপুর গড়িয়ে গেলে। ঝটপট কাজ চুকিয়ে চলে যেত। কতটুকু সময়ই বা থাকত; কিন্তু রেণুর কত কাজ যেন কেড়ে নিল! অবসর আরও দীর্ঘ হল। অঢেল, অফুরন্ত সময় হাতে নিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন, শান্ত স্থির হয়ে গেল।

    তারপর বৈশাখের প্রখর তাপ এবং সেই নদীর চর থেকে ঝাঁপিয়ে আসা ঝড় থেমে গেল। আকাশ কালো হচ্ছিল, মাঝে মাঝে চাতক ডাকছিল, মাটি-ভেজা গন্ধ আসছিল ভেসে ভেসে। বৃষ্টিও নামল। এই ফাঁকা বাড়ির নীরবতাকে আরও নিবিড় করে। কতদিন, সারারাত ভরে শ্রাবণের জল ঝরে গেল। অশ্বত্থের পাতায় কত সব বিচিত্র শব্দ তুলে। এবং শেষে আবার নীল আকাশ জেগে উঠল, রোদ ঝমক করে উঠল!

    রেণু তার একান্ত একাকিত্ব, নবীনশূন্য সময় কি করে কাটিয়েছে? চুপচাপ গালে হাত দিয়ে বসে! ভেবে ভেবে, সাত-পাঁচ কল্পনায় এবং স্বপ্নে বিভোর থেকে কি!

    হ্যাঁ, তাই! রেণু যখন একা, নিঃসঙ্গ কোনো কাজ নেই আর আলস্যে তাঁর গা-হাত সব—সমস্ত যখন একটুও নড়তে চাইত না, রেণু বারান্দার ছায়ায় কি কাছাকাছি কোথাও বসে পাখির ডাক শুনতে শুনতে এলোমেলো মনে তাকিয়ে সেই ঝাঁকড়া-ডাল-অশ্বত্থকেই দেখেছে, তাদের পাতার শব্দ শুনেছে, আর পাতার জাফরিতে মধ্যাহ্নের আলো-ঝিলমিল ছায়া দেখেছে। বর্ষার দিনে এই গাছের ফাঁক দিয়ে মেঘ, এদের পাতায় হাওয়ার পতপত বৃষ্টির শব্দ। আবার যখন শরৎ ফুটল, আকাশের নীল থেকে সুন্দর রোদ ঝরে পড়তে লাগল, রেণু তখনও এই গাছের পাতা আর ডালপালা দেখে তার দুপুর কাটাল। এবং শুধু সকালের গড়িয়ে-আসা রোদ-ভরা দুপুর নয়, রেণুর তিল তিল করে গড়ে তোলা স্বপ্নের সুন্দর দুপুর, তার প্রতিটি মুহূর্ত।

    এই দুপুর গড়িয়ে গেল। রেণুকে একটু আগেভাগেই হাসপাতাল রেখে এল নবনী।

    এক বিকেলে ফিরল রেণু। হেমন্তের কুয়াশা তখন এখানে এই ফাঁকায় গাঢ় হয়ে নামছে। হাসি-খুশি মুখ। তবু একটু যেন ফ্যাকাশে, চুলগুলো রুক্ষ-রুক্ষ। কিন্তু বড় সুন্দর লাগছিল রেণুকে। আর, রেণুর বুকের মধ্যে, হাতের নিবিড় বন্ধনী থেকে একটি শিশুর দুর্বল কান্না উঠে এখানের হাওয়ায় মিশছিল। মাথার ওপর অশ্বত্থের ডালপালা হঠাৎ কেমন এক উদ্ভট হাওয়ায় ঝটপট করে নড়ে উঠল। পাখিরা ডাকল, ডানা ঝাপটে স্তব্ধতা ভেঙে দিল, শিশুর কান্না ডুবে গেল। রেণু একটিবার ওপর পানে চেয়ে তাড়াতাড়ি বারান্দায় এসে উঠল।

    রিভারসাইড রোডের বাড়িতে কথা এবং কাজের খুটখাট শব্দের ফাঁকে ফাঁকে এখন এক দুর্বল কান্না শোনা যায়। ককিয়ে ককিয়ে একটি শিশু কাঁদে। রেণু হাতের কাজ ফেলে ধড়মড় করে ছুটে যায়।

    সব সময়ে অত কাঁদলে কি চলে, খোকন! রেণু ছেলেকে আদর ক’রে দুধ দিতে দিতে গালে-মুখে কতকগুলো চুমু খেয়ে বেশ জোরে জোরে বলে, “এবার তুমি বারান্দায় শোবে। রোদে। তোমায় অলিভ অয়েল মাখাব। চুপটি করে শুয়ে থাকবে। তেল-গায়ে রোদ খেলে কেমন সুন্দর শরীর হবে তোমার—নধর-নধর, ননী-ননী!”

    বারান্দার চেয়ে উঠোনটায় রোদ আসে আগে। উঠোনে শোয়াতে পারলেই ভাল হত—একটু বেশিক্ষণ রোদ পেত। কিন্তু রেণু খুবই বিরক্ত হয় ; উঠোনে শোয়ানোর জো আছে নাকি! কোথা থেকে একটা কাঠির মত ডাল হয়তো ছেলেটার কচি গায়ে এসে পড়বে, নাকের ওপর পাতা উড়ে এসে আঁচড় কেটে যাবে, পাখিতে হেগে দিয়ে যাবে! যত রাজ্যের ময়লা সব! একদিন ছেলেকে শুইয়ে দেখেছে রেণু। দশটা মিনিটও বেচারিকে রাখা যায়নি! ভীষণ বিরক্ত হয়েছিল রেণু। তারপর থেকেই বারান্দাতেই শোয়ায়। তাতেও রক্ষে নেই। কখন যে কি উড়ে আসে—পাখি টাখি, পাতা-টাতা! ছেলেকে শুইয়ে রেণু নিজে বসে বসে আগলায়। আর ভীষণ বিরক্ত হয় এই গাছটার ওপর। ওর জন্যেই যত পাখি-টাখি, নোংরা-টোংরা।

    কিন্তু তবু একদিন একটা হাড় এনে ফেললে কাকে—খোকনের গায়ের পাশেই। আর একদিন একটা বিঘত-খানেকের মরা সাপ একেবারে খোকনের গায়ের ওপর। রেণু আঁতকে উঠল। হাউমাউ করে ডুকরে উঠল।

    “শুনছ, এ বাড়িতে থাকা চলবে না!” রেণু সেইদিনই নবনীকে বললে, “কোনদিন একটা অঘটন ঘটে যাবে।”

    নবনী কানেই তুলল না কথাটা।

    ক’দিন বাদেই আবার এক কাণ্ড। হাত-পরিমাণ একটা ডাল ভেঙে পড়ল একেবারে রেণুর মাথায়! রেণু ছেলেটাকে কোলে করে উঠোন বেয়ে রান্নাঘরে যাচ্ছিল। কপালে লেগেছিল তার। তা লাগুক—কিন্তু রেণু খপ্‌ করে রান্নাঘরে ঢুকে ভয়ে নীল হয়ে গিয়ে ভাবল, ডালটা যদি তার মাথায় না পড়ে খোকনের মাথায় পড়ত! তুলতুলে মাথা, রক্তের ডেলা—এক্ষুনি রক্তারক্তি হত। কিছুতেই বাঁচত না ছেলেটা!

    গাছটার দিকে বিষাক্ত ঘৃণার চোখে চেয়ে চেয়ে রেণু দাঁত চেপে খানিকটা দাঁড়িয়ে থাকল।

    নবনীকে এবার সোজাসুজি বললে রেণু, “এ বাড়িতে আর একটা হপ্তাও নয়! আজই শেষ হয়ে গিয়েছিল ছেলেটা! বাব্বা, কি সর্বনেশে গাছ!”

    “একটু সাবধানে থাকলেই পার।” নবনী জবাব দিলে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে।

    “আবার কি সাবধান হবে! এর চেয়ে কত সাবধান হতে মানুষ পারে!” রেণু রেগে উঠল, “সারাটা দিন ছেলেটাকে ঘরের মধ্যে ঠাণ্ডায় অন্ধকারে পুরে রাখব নাকি! ওর আলো হাওয়ার দরকার নেই? কি রকম শীতটা পড়েছে, দেখছ না!”

    “তা, বেশ তো! রোদই খাওয়াও ছেলেকে—একটা আড়াল-টাড়াল দিয়ে নিয়ে!” নবনীর সহজ জবাব।

    “আড়ালে কি হবে? আড়ালটা মানছে কে?” রেণু উত্তেজিত হয়ে পড়ে, “ওই গাছের কুটো-পাতা, নোংরা, পাখির গু-মুত কতরকমের নোংরা, জার্‌মস্‌—। ওই তো কচি ছেলে—ওর কি ইমিউনিটি আছে নাকি কিছু! ঝপ্‌ করে একটা রোগ হবে, সামলাতে পারবে না!”

    নবনী স্ত্রীর আশঙ্কার বাড়াবাড়ি দেখে না হেসে পারে না। বলে, “তুমি যে সেই রূপকথার ছোটরানীর মতন শুরু করলে। ছেলে পেটে আসতে না-আসতেই ভয়ে জড়সড়। রাজপ্রাসাদের পদ্মপুকুর ভরাট করে দাও, ছেলে যদি বেড়াতে গিয়ে ডুবে যায় ; সব কাঁটা গাছ তুলে ফেল, যদি পায়ে কাঁটা ফুটে যায় তার।” একটু থামে নবনী। হাসির দমকটা থামিয়ে আবার বলে, “ওসব বাজে ভয় করোনা তো! তাছাড়া, ওই গাছটাই না তোমার খুব আদরের ছিল।”

    “ছাই ছিল!” রেণু কোল থেকে ছেলেকে তুলে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে, “যেদিন থেকে ছেলে কোলে এসেছে, ওটা যেন আমার সঙ্গে শত্রুতা করছে! ওই শত্রু একদিন আমার সব নেবে! আমি বলছি! তখন দেখব, তোমার কত হাসি থাকে!”

    নবনী আর কিছু বললে না। রেণু সত্যিই ভীষণ চটে গেছে! স্ত্রীর আশঙ্কা-কালো মুখের দিকে চেয়ে নবনী হয়তো অবাক হয়ে কিছু ভাবছিল।

    অশ্বত্থগাছটা সত্যিই শত্রুতা করছে রেণুর সঙ্গে। আবার তার পাতাঝরার দিন এল। আর উঠোন-বারান্দা থইথই করে তার পাতা ঝরতে লাগল দফায় দফায়। খোকনের জন্যে একটু জায়গাও সে দেবে না এই উঠোন কিংবা বারান্দায় ; এই রোদ, এবং আলো, ও হাওয়ার কোনো কিছুই। রেণুকে পর্যন্ত না। বারবার ব্যতিব্যস্ত, উদ্বিগ্ন ভীত করে রাখবে।

    রেণু কেমন একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিল। অদ্ভুত ভয়। তার মনে শান্তি ছিল না, স্বস্তি ছিল না। শেষ পর্যন্ত বলতে হবে, ভগবান খুবই সদয়—তাই একদিন আচমকা পার্সি সাহেবদের সেই বাংলোর পাশের দু-পাঁচখানা ছিটনো-ছড়ানো বাড়ির একটা থেকে আরতি আর আরতির ননদ এ বাড়িতে বেড়াতে এসে হাজির।

    দুজনেই অবাক—রেণু এবং আরতি। রেণু কি স্বপ্নেও ভাবতে পেরেছিল, মধুপুরের আর এক মেয়ে আরতি এখানে হাজির হয়েছে! আরতিও ভাবতে পারেনি। দেখাসাক্ষাৎ হতে আহ্লাদে খুশিতে-দুজন গলে গেল। তারপর বাড়ির কথা উঠল। আরতি বলছিল, “তোর বাড়িটা খুব সুন্দর রে! ফাঁকা—কত জায়গা! দুখানা বড় ঘর, ঢাকা বারান্দা, উঠোন, ভাঁড়ারও আছে। সুন্দর গাছও। আমাদেরটা বড্ড ছোট! আর, গাছপালার একবিন্দু ছায়া নেই ধারে-কাছে। গরমে যা কষ্ট হবে!”

    “নিবি, এই বাড়িটা?” রেণু আচমকা শুধাল।

    “ঠাট্টা করছিস?” আরতি হাসছিল।

    “না, না—ঠাট্টা নয়? সত্যি বলছি। এ বাড়ি আমরা ছেড়ে দেব।” রেণু গম্ভীর হয়ে বললে।

    “কোথায় যাবি?”

    “যদি তোরা নিস এ বাড়ি, তোদেরটায় যাব। করবি পালটা-পালটি?”

    আরতি তবু বিশ্বাস করতে পারছিল না। এমন সুন্দর বাড়ি, কত জায়গা, গাছের ছায়া—

    “তা, এ বাড়ি ছাড়ছিস কেন?” আরতি শুধাল।

    রেণু টপ্‌ করে জবাব দিতে পারল না। একটু ভাবল। বললে, “ওর অসুবিধে হয়। ভাড়াটাও একটু বেশি ভাই, আমাদের পক্ষে। চল্লিশ টাকা। দিতে বেশ কষ্টই হয়!”

    আরতি রাজী হয়ে গেল। তার আপত্তির কোনো কারণ থাকতে পারে না।

    নবনী কথাটা শুনে বোকার মতন শুধু বললে, “সত্যিই তুমি বাড়ি পালটা-পালটিতে রাজী হয়ে গেলে?”

    রেণু কথা না বলে মাথা নাড়ল। আর খানিক পরে চাপা গলায় যেন নিজেকে শুনিয়েই বলল, “আমার ছেলে আগে। তার কথা, তার ভাল মন্দ ভেবে তারপর অন্য সব।”

    পরের হপ্তাতেই বাড়ি-বদল শেষ হল। নতুন বাড়িতে গিয়ে রেণু শান্তি পেল। তার উদ্বিগ্নতা ধুয়ে গেল। হাসি ফুটল মুখে। এখানে অশ্বত্থ নেই, পাতা-ঝরা নেই, খড়কুটো, ময়লা, সাপের খোলসে উঠোন নোংরা নেই। রেণু নিশ্চিন্ত। ছেলেকে প্রাণভরে অলিভ অয়েল মাখাচ্ছে রেণু, রোদ আর হাওয়া খাওয়াচ্ছে—আর সারাদিন, আর দুপুর, আর বিকেল সেই একফোঁটা অবোধ শিশুকে নিয়ে, তার কাজ নিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছে।

    হ্যাঁ, মাসখানেক বড়জোর—তারপর সকালে নবনী যখন দাড়ি কামাচ্ছে রেণুর কোলে ছেলেটা ঘুমোচ্ছে, আর রান্না করতে করতে গুন্‌গুন্‌ করে ছড়া গাইছে ও, ছেলেটা হঠাৎ চোখ চেয়ে কেঁদে উঠে ক’বার হিক্কা তুলল, চোখের পাতা বুজল। গলায় ঘড়ঘড় শব্দ হল একট, তারপর থামল। ওর শব্দ থামল গলার, নিশ্বাস থেমে গেল, একটু যেন কেমন নীলচে হয়ে গেল মুখটা।

    বিশ্বাস করতে খানিকটা সময় লাগল রেণুর। কিন্তু বিশ্বাস না করে উপায় ছিল। কেননা, সেদিন আর দুপুর-বিকেল-রাত একটি দুর্বল অসহায় গলার কান্না এ বাড়িতে আর একবারও শোনা গেল না।

    কোনো সাড়াশব্দ না দিয়ে, কোন কারণ না দেখিয়ে ছেলেটা যে কি করে চলে গেল, হঠাৎ—রেণু তারপর থেকে শুধু তাই ভেবেছে, ভাবছে।

    এ বাড়ি আরও চুপ হয়ে গেল। নবনীও যেন কথা বলতে হাসি-তামাশা করতে ভুলে গেল। আরও যেন সকাল-সকাল সে অফিস চলে যায়, ফিরতে আরও দেরি করে। রেণু একা। ঝিটা আসে ; কাজকর্ম সেরে দিয়ে চলে যায়। রেণু কথা বলে না—যেখানে বসে, বসেই থাকে ; শুয়ে থাকল তো থাকলই ; কোথাও থমকে দাঁড়াল তো পাথর হয়ে গেল যেন।

    এক-একটা দিন যে কি দীর্ঘ এবং দুঃসহ, আর কি ভীষণ কষ্ট এই সময়ের ঢিলেঢালা চলনে, রেণু আস্তে আস্তে তা বুঝতে পারছিল। তার সময় ফুরোয় না; তার বুকের ওপর চাপ-হয়ে-থাকা ভারটা একটুও সরে না। বরং নবনী চলে গেলে, একা হয়েছে কি, রেণুর বুকের হাড়গুলোয় যেন কেউ নরুন দিয়ে কুরতে থাকে, বুকটা অসহ্য ব্যথায় টন্‌টন্‌ করে, রেণু নিশ্বাস বন্ধ করে বসে থাকে হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে। সারা দুপুর—সারা দুপুর। আর, থেকে থেকে ফুঁপিয়ে ওঠে। যদিও সে ফোঁপানোয় গলা ভিজে-যাওয়া কান্না নেই, শুধু দলাপাকানো পাক-খাওয়া বাতাসের থরথর ঝাঁকুনি আছে।

    কেন এমন হল—এই কথা ভাবতে ভাবতে রেণু সব সময়েই সেই ডালপালা ছড়ানো ঝাঁকড়া-মাথা থমথমে অশ্বত্থগাছটাকে চোখের সামনে না এনে পারে না। চোখ বুজলেই গাছটা শকুনির পাখার মতন বিশ্রী এক ভয় নিয়ে যেন ওর মনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। রেণু বুঝতে পারে, ওই—ওই হিংসুক নিষ্ঠুর গাছটা খোকনকে সহ্য করতে পারেনি। তারপর বিষ-নিশ্বাস হওয়া এখানে ছড়িয়ে দিয়েছে। তারপর যেন রেণুকে ঠিকমতন জব্দ করতে, উচিত শিক্ষা দিতে ছোঁ মেরে খোকনকে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেছে ভরা কোল থেকে। কি হিংস্র আর হৃদয়হীন ওই তরু, কি নিষ্ঠুর!

    রেণু যতক্ষণ ভাবে, ভাবতে পারে, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সেইসব ঘটনা মনে করে, যেসব ঘটনায় ওই অশ্বত্থের আড়াআড়ি ভাবটা ফুটে উঠেছে—হ্যাঁ, খোকনের সঙ্গে আড়াআড়ির, রেষারেষির। বলতে কি, খোকনকে নিয়ে সে বাড়িতে পা দেবার সঙ্গে-সঙ্গেই ওই গাছ শত্রুতা করতে শুরু করেছিল। খোকনের সঙ্গেই। গাছটা যেন হিংসে আর বিদ্বেষে জ্বলত। জ্বলছিল। ওই বোবা কিন্তু ভয়ঙ্কর জীবনটা—রেণুর মনে হত—সব সময়ে চাইছে, রেণু আগের মতন তাকে নিয়ে মত্ত থাকুক। হাঁ, রেণু তা বুঝতে পারত। তার হুঙ্কারের ভাষা তো রেণুর না জানা নয়—তার মট্‌মট্‌ আছাড়িপিছাড়ি, গোঁ গোঁ গর্জন! এই অন্যায্য, অন্যায় আব্দার রেণু কি করে সহ্য করতে পারে। তুমি কে, কি আমার! শুকনো কর্কশ গা, আর বাউণ্ডুলে পাতার ঝুপড়ি নিয়ে বসে আছ! আমার জীবনের সঙ্গে, রক্তের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কিসের! আমার মাটি ধুলোকাদার নয়, আমার শিরা তোমার রুক্ষ কুৎসিত শিকড় নয় এবং আমার রক্ত তোমার গায়ের আঠা-আঠা জল নয়।

    রেণুর এই সরাসরি উপেক্ষা-অবহেলা গাছটার যেন সহ্য হচ্ছিল না। সে দিন-দিন ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছিল, রেণু তা বুঝতে পারছিল ; আর হ্যাঁ, ভয়—ভীষণ ভয় এবং ভাবনায় পড়েছিল। খোকনকে ওই রাক্ষুসে গাছটা কিছুতেই সহ্য করবে না—রেণু এ বিষয় নিঃসন্দেহ হয়েছিল!

    ও বাড়ি তাই ছেড়ে এল। কিন্তু সে ছাড়লেও ওই রাক্ষসটা ছাড়ল না। শোধ নিল। প্রতিশোধই বলা যায়।

    মনে মনে গাছটাকে কুটিকুটি করেও রেণুর আক্রোশ মেটে না। আবেগ চাপতে গলার শিরা নীল হয়ে গেলেও এইসব আবেগ রেণু রোধ করতে পারে না। তার সাধ্যে কুলোয় না।

    এমনি করেই কাটছিল দিন। অবয়বেই যেন বেঁচে আছে রেণু ; তার মন মরে গেছে, তার জীবন থেমে গেছে। কোনো বোধ নেই—অন্তত সুখের বা সান্ত্বনার।

    হ্যাঁ, তারপর সেদিন আবার এত দুপুরে যখন আকাশ মেঘলা, মাঠ ঘাট খাঁখাঁ করছিল, বেশ একটা তাপ ফুটছিল—রেণু যেন কখন সদর খুলে বাইরে এসে দাঁড়িয়ে এই থম্‌থমে রিক্ততা দেখছিল চারপাশের! কতক্ষণ যে, রেণু জানে না। হঠাৎ তার মনে হল কোথা থেকে যেন একটু অন্যরকম হাওয়া এল। পরক্ষণেই এক ঘূর্ণি উড়ে এল, একটা পাক-খাওয়া বাতাসের ঢেউ উড়ছিল। আর, হঠাৎ সেই ধুলোর সঙ্গে মিশে একটা শুকনো অশ্বত্থপাতা এসে পড়ল রেণুর বুকে, একেবারে বুকের মাঝটিতে—শাড়ির ভাঁজে আটকে গিয়ে থেমে থাকল। রেণু হাত দিয়ে ফেলতে গিয়ে চমকে উঠল। অশ্বত্থের পাতা, শুকনো পাতা। পাতা! সারা গা ঘিনঘিন করে উঠল রেণুর। নোংরা পাতাটা ঝেড়ে ফেলে দিতে গিয়েও হঠাৎ যেন কি হয়ে গেল তার। পাতাটা মুঠোয় ধরে দাঁড়িয়ে থাকল।

    এখান থেকে আগের বাড়ির সেই অশ্বত্থগাছটা দেখা যায়—খুবই অস্পষ্ট ভাবে। একখণ্ড মেঘের মতন। কিন্তু আশ্চর্য, রেণু আজ এখানে দাঁড়িয়ে অত দূরের এমন অস্পষ্ট অশ্বত্থকেও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল।

    সব যেন তাকে টানছিল—এই মেঘলা দুপুর, এই ঘূর্ণি, এই খাঁখাঁ মাঠ-ঘাট এবং ওই দূর অশ্বত্থের শাখা, প্রশাখা-পল্লব। তাকিয়ে থাকতে থাকতে রেণু সব ভুলে গেল। শুধু গাছ—শুধু ওই অশ্বত্থই হাওয়ায় হাওয়ায় অদ্ভুত এক চুপ শিস্ শিস্ শব্দে তাকে ডাকছিল। রেণুর চেতনা ছিল না ; রেণুর পা, রেণুর মন চোখ—সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে কেউ যেন যাদু করে অসাড় করে দিয়েছে।

    অদ্ভুত এক ঘোরে, নিশিতে-পাওয়া মানুষের মত ঘুমের আচ্ছন্নতায় রেণু পা-পা করে টলে টলে হেঁটে চলল। তারপর এক সময়ে সেই অশ্বত্থের সামনে। গাছটার তলায়! মাটিতে, পাথরে, ঢিবিতে, শিকড়ে একটা অদ্ভুত অন্ধকারে স্তূপীকৃত হয়ে রয়েছে এখানে। মাথার ওপর অসংখ্য শাখা-প্রশাখা স্তব্ধ, শত সহস্র পল্লব নিস্তব্ধ।

    রেণুর চোখে অন্য এক অপরিচিত জগৎ অস্পষ্টভাবে কেউ মেলে দিচ্ছিল। অশ্বত্থের সেই ভারি কালো গুঁড়ির ফাটা ঠুকরানো কঠিন দেহ কেমন এক যাদুতে খুলে গিয়ে খুব নরম এক হৃদ্‌পিণ্ড স্পন্দিত হচ্ছিল আর মৃত্তিকার অন্ধকার থেকে এক ঘ্রাণ উঠছিল। অতি নিস্তব্ধ, নির্বাক, সংগোপন এক প্রাণ যেন গুমরে উঠছে। গুমরে গুমরে।

    রেণু জানে না, তার খেয়ালই নেই, কখন সে ধীরে ধীরে তরুতলে বসে পড়েছে, হাত দিয়ে গা ছুঁয়েছে—সেই তরুর, ঝুরি ধরে থেকেছে মুঠো করে। তারপর কখন অচেতনে বুক উপুড় করে আঁকড়ে ধরেছে সেই বিশাল তরুর একটু।

    অনেক—অনেকক্ষণ পরে কার যেন ঠেলায় চমকে উঠল রেণু। চমকে উঠল, উঠে বসল, চাইল। চিনতে পারল না। ঘোর কাটছিল না চোখের।

    যখন ঘোর কাটল, তখন রেণু উঠে দাঁড়াল। চিনতে পারল। সামনে অবাক, ভীত মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে আরতি। আর সে অশ্বত্থের তলায়।

    রেণুর দিকে তাকিয়ে এবার আরতি ভীষণ অবাক গলায় বললে, “কি রে, তুই হঠাৎ এখানে—গাছতলায় উপুড় হয়ে পড়ে? কি হয়েছে তোর?” আরতির চোখ হঠাৎ রেণুর বুকে আটকে গেল। আরও অবাক হয়ে বললে আরতি, “ইস, সারা বুকখানা ভিজে গেছে যে! এত ঘেমেছিস?”

    ঘাম? রেণু চমকে উঠে বুকের দিকে চাইল। ভিজেই গেছে—সারাটা বুক, ব্লাউজ। তবে ঘামে নয়। তাড়াতাড়ি গায়ের আঁচলটা বুকে টেনে নিয়ে রেণু কিছু না বলে সোজা বাড়ির পথে ফিরে চলল।

    আরতি ডাকছিল। রেণু শুনছিল না। হন্‌হন্‌ করে হেঁটে যাচ্ছিল। আর মনে হচ্ছিল এতদিন বুকের যে টন্‌টন্‌ ব্যথা তার অসহ্য—অসহ্য ছিল, আজ এখন সে ব্যথা যেন অনেক কমেছে।

    সত্যি অনেক কমেছে।

    দুধ খাইয়ে, আর এক অবোধ শিশুকে ঘুম পাড়িয়ে রেণু খুব নিশ্চিন্ত মনে এবার ফিরেই যাচ্ছিল। তার সংসারের কাজেই যেন।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleখোয়াই – বিমল করভ
    Next Article খড় কুটো – বিমল কর

    Related Articles

    বিমল কর

    কাপালিকরা এখনও আছে – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    রাজবাড়ির ছোরা – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    ঘোড়া সাহেবের কুঠি – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    সেই অদৃশ্য লোকটি – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ ও কিকিরা – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    কিকিরা সমগ্র ১ – বিমল কর

    October 30, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }