Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পঞ্চাশটি গল্প – বিমল কর

    বিমল কর এক পাতা গল্প1346 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ওরা

    টেলিফোনটা আবার বেজে উঠতে গোপীমোহন ফুলেশ্বরের দিকে তাকাল। ফুলেশ্বর মুখটা সামান্য বাঁদিকে সরিয়ে নিল যাতে গোপীমোহনের সঙ্গে চোখাচুখি না হয়। ফুলেশ্বরের বাঁদিকে কেষ্ট গুপ্ত। কেষ্ট গুপ্ত মুখ হাঁ করে ওষুধ নিচ্ছিল। ফুলেশ্বর তাকে দেখছে এটা বুঝতে পেরে কেষ্ট গুপ্ত ঘাড় মাথা আরও হেলিয়ে ছাদের দিকে মুখ করে স্প্রে নিতে লাগল। কেষ্টর হাতকয়েক তফাতে আমি। হাঁপানির ওষুধের বিশ্রী গন্ধটা অনেকক্ষণ থেকে আমার নাকে লাগছিল। শ্বাসকষ্ট যে কী যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে তা বোঝাবার জন্যে কেষ্ট স্প্রে-এর মুখটা তার গলার মধ্যে প্রায় ঢুকিয়ে দেবার ভাব করে চোখ বুজে ফেলল। ঘরের একটা জানালাও খোলা নেই, আঁট করে খড়খড়ি লাগানো, পাখাটা না চলার মতন চলছে রেগুলেটারের এক দাঁড়িতে, ফলে বল বিয়ারিং-টিয়ারিং-এর একটা একঘেঁয়ে ঘ-ট্‌…ঘ-ট্‌ শব্দ হচ্ছিল, থেমে থেমে, নিয়মিত বিরতির পর। কোণের দিকে সেড্‌ দেওয়া টেবল, ল্যাম্পটা ঘাড় নিচু করে ঘোলাটেভাবে জ্বলছে। ঘরটা একেবারেই ঝাপসা দেখাচ্ছিল, গোপীমোহন যে সোফাটার ওপর বসে আছে, আলোর অভাবে তার রেক্সিনের খয়েরী রঙ কালো দেখাচ্ছিল। ফুলেশ্বর তার মাথার চুল ঘাঁটছিল; সামনের অ্যাশট্রেতে সিগারেটের টুকরো আর ছাই জমে জমে পেতলের ছাইদানটা কদাকার হয়ে উঠেছে। কেষ্ট গুপ্ত সোফা-কাম বেডের পিঠে একেবারে হেলে পড়েছে, তার ওষুধের গন্ধ ঘরটাকে আরো গুমোট করে তুলছিল। আমার অনেকক্ষণ থেকেই বমি বমি লাগছে। কেষ্ট গুপ্তর জন্যে পাখা জোর করার উপায় নেই, উত্তেজনায় এবং পাখার বাতাসে তার টান আরও বেড়ে যায়।

    টেলিফোনটা বাজতে বাজতে শেষে থেমে গেল। যতক্ষণ বাজল, ততক্ষণ আমরা চার জনে কেউ নড়াচড়া করলাম না, কথা বললাম না; পরস্পর পরস্পরের দিকে এমনভাবে তাকালাম যেন প্রত্যেকেই বোঝাতে চাইলাম— আমায় কেউ ডাকছে না। গোপীমোহন ফুলেশ্বরকে, ফুলেশ্বর কেষ্ট গুপ্তকে, কেষ্ট গুপ্ত আমাকে, আর আমি গোপীমোহনকে নীরবে এই কথাটা বেঝাতে চাইলাম, ডাকটা আমার নয়, আমার নয়।

    টেলিফোন থেমে যাবার পর এমন একটা স্তব্ধতা এল, মনে হল: চীনে পাড়ার কোনো নিষিদ্ধ নেশা ঘরে আমরা চার জন কোনো শয়তানের হাতে খুন হতে হতে বেঁচে গিয়ে আস্তে আস্তে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করেছি। আমাদের তিন জনের নিঃশ্বাস, আর কেষ্ট গুপ্তর মুখ খুলে সাঁ সাঁ করে শ্বাস টানার শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ হচ্ছিল না ঘরে। এমন কি পাখার সেই ঘ…ট্‌ ঘ…ট্‌ শব্দটাও কয়েক মুহূর্ত আমার কানে গেল না।

    শেষে গোপীমোহন তার নিবন্ত চুরুট ধরাবার জন্যে দেশলাইটা ফুলেশ্বরের সামনে থেকে তুলে নিতে নিতে বলল, ‘এ তো আর পারা যায় না; পুলিসে একটা ইনফরমেশান দিতে হয়।’

     

     

    ফুলেশ্বর তার পাঞ্জাবির শেষ বোতামটাও খুলে ফেলল, গলা মুখ কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল, “তাতে আরও বেশি রিস্ক নেওয়া হবে।”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “আমি আর পারছি না। বুক ফেটে যাচ্ছে।”

    আমি বললাম, “আমার বমি বমি লাগছে। একটা জানলাটালনাও খোলা নেই, সব বন্ধ, ওষুধের খানিকটা আমার গলাতেও ঢুকে গেছে…।”

    গোপীমোহন বলল, “কেষ্ট, তুমি ঘরটাকে আরও স্টাফি করে তুলছ। ওষুধটা আর নিও না। তোমার জন্যে আমরাও মরছি।”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “আমার জন্যে মরছ না। আমরাই তোমার জন্যে মরছি।”

    “আমার জন্যে?”

     

     

    “ওই পান্নাটাকে’ তুমিই তৈরি করেছ। একটা চোর গুণ্ডা ওয়াগান ব্রেকারকে তুমি তোমাদের হাতে টেনে বেটাকে মাথায় তুলে দিলে। সেই বাস্টার্ডটা এবার বুঝিয়ে দিচ্ছে…”

    “তুমি বড় বাজে কথা বলো”, গোপীমোহন বিরক্ত হয়ে বলল, “পান্না আমার তৈরি নয়। ফুলেশ্বররা আর কিছু না পারলেও ওটা ভাল পেরেছে।”

    ফুলেশ্বর খুব ঘৃণার সঙ্গে বলল, “গোপী, তুমি এখন ডালভাতের মতন এসব বলে যাচ্ছ। বলে যাও। মজাটা কি জানো, জামা পালটালে লাল হলুদ বোঝা যায়, কিন্তু গায়ের চামড়া যে একই রকম থাকে। পান্নাটা যে মর্গে পড়ে আছে; তার গায়ের কালো চামড়া দিয়ে বোঝানো যাবে না সে কবে তোমার ছিল, কবে কেষ্টদের, আবার কবে প্রমথদের।”

    আমার নাম প্রমথ। আমি ফুলেশ্বরের কথায় উত্তেজনা বোধ করলেও মাথা গরম করলাম না। মাথা গরম করার সময় এটা নয়, পরে ফুলেশ্বরকে উচিত জবাব দেওয়া যাবে। রুমালটা মুখের ওপর চেপে গা গুলোনো ভাবটা কাটাবার চেষ্টা করতে করতে আমি বললাম, “পান্নাকে মর্গ থেকে তাহলে ছাড়ছে কখন?”

     

     

    গোপীমোহন বলল, “চব্বিশ ঘণ্টার বেশি হয়ে গেছে। আজ দুপুরেই বডি দেবার কথা ছিল। দেয় নি।”

    ফুলেশ্বর বলল, “সন্ধেতেও পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। আরও রাত করে ছাড়বে।”

    কেষ্ট গুপ্তর গলা ভেঙে গিয়েছিল। চেরা ভাঙা গলায় কেষ্ট বলল, “যে রকম টেনশান তাতে মাঝ রাতের আগে দেবে বলে মনে হচ্ছে না।”

    আমি বললাম, “এত দেরি হবে জানলে আমিও একটা ট্রাক পাঠিয়ে আসতে পারতুম।”

    গোপীমোহন দাঁতে চুরুট কামড়ে ধরে বসে থাকল। তার কালো রঙের মোটা চশমাটা সোফার হাতলের ওপর। গায়ে হাত-কাটা বেঁটে পাঞ্জাবি।

    ফুলেশ্বর বলল, “আমি একবার বাথরুম যাব; চোখ মুখটা ধুয়ে আসি। এই ঘরে দম বন্ধ হয়ে আসছে।”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “একটু জলটল পাওয়া যায় না? সেই লোকটাকে একবার ডাকতে পার প্রমথ?”

     

     

    ফুলেশ্বর উঠে পড়েছিল; বলল, “আমি দেখছি। বাড়িটা সুশীল সেনের বলেই আমার মনে হচ্ছে। লোকটা বোধহয় এ বাড়িতে কাজ করে।”

    ফুলেশ্বর খুব ক্লান্তভাবে দরজার দিকে গেল। ছিটকিনি খুলল।

    গোপীমোহন বলল, “ঘরের পাশেই বাথরুম। তুমি আবার বাতিটাতি জ্বেলে রেখো না। জানলাটা দেখে নিও।”

    ফুলেশ্বর দরজা খুলল আস্তে আস্তে। প্যাসেজের দিকটা অন্ধকার। পা টিপে টিপে ফুলেশ্বর বাইরে গেল। আশ্বিন মাসের ঠাণ্ডা একটু বাতাস এল ঘরে। আমি দরজার দিকে মুখ করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলাম।

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “ক’ ঘণ্টা হল?”

    “এখন ক’টা বাজল?” গোপীমোহন জিজ্ঞেস করল।

    “প্রায় আট্‌” আমি ঘড়ি দেখে বললাম।

     

     

    “আমি চারটের সময় এসেছি। …আমি প্রথম, তারপর ফুলেশ্বর এল, মিনিট পনেরো কুড়ি পরে।”

    “আমারও ওই সাড়ে চারটা নাগাদ”, আমি বললাম, “কেষ্টটাই সবচেয়ে শেষে এসেছে।”

    কেষ্ট গুপ্ত দুবার কাশল, বলল, “কাল থেকেই আমার ব্রিদিং ট্রাবলটা চলছে। পান্নার কেস্‌টা শোনার পর থেকেই বুঝেছিলাম একটা কেলেঙ্কারি হবে। হলোও তাই।”

    গোপীমোহন বিদ্রূপ করে বলল, “তুমি তো সকালেই কাজ গুছিয়ে ফেলেছিলে?”

    কেষ্ট গুপ্ত গোপীমোহনের দিকে তাকাল। “তুমি সকাল হবারও অপেক্ষা রাখোনি গোপী, কাল রাত থেকেই কাজ গোছাতে লেগেছিলে।”

    “খবর পেয়েছি।’

    তা“ পেয়েছি বই কি! খবর দেবার লোক তোমার একার রয়েছে?”

     

     

    “না না, তোমাদেরও আছে। …আমরা পোস্ট অফিসে চিঠি ফেলতে পাঠালেও তোমাদের কানে খবর আসে।”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “তোমাদের জ্বালায় আমরা যে ভাই-ভায়রার বাড়িতেও যেতে পারতাম না গো, এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেলে?”

    ফুলেশ্বর ফিরে এল। তার চোখ মুখ মাথা ভিজে ভিজে। বাথরুমে মাথা চুবিয়ে এসেছে কি না বোঝা গেল না। গায়ের পাঞ্জাবি খুলে ফেলেছে।

    ফুলেশ্বর বলল, “বাড়িটা সুশীল সেনের নয় হে, পাশের বাড়িটা তার হতে পারে। সুশীলরা চলে গেছে; এখানে কোন্ রায়টায় থাকে। ভদ্রলোক কলকাতার বাইরে। লোকটা তার বামুনঠাকুর! জল, চা পাঠিয়ে দিচ্ছে বলল।”

    গোপীমোহন বলল, “তুমি কি চারপাশ দেখলে?”

    ফুলেশ্বর পাঞ্জাবিটা ছুঁড়ে দিল, সোফার ওপর। “দেখলাম যতটা পারলাম।”

     

     

    “কী দেখলে? অবস্থা কেমন?”

    “রাস্তাঘাট অন্ধকার। মানুষ জন চলছে বলে মনে হল না। জানলা দিয়ে কতটা আর দেখা যাবে। তবে আমার মনে হল, লোকে বাড়িঘরের জানলা দরজাও বন্ধ করে দিয়েছে।”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “অবস্থাটা তা হলে খুবই ভয়ঙ্কর বলছ?”

    “খুবই।”

    গোপীমোহন জিজ্ঞেস করল, “এ বাড়িতে কি বাতিটাতি জ্বলছে?”

    “না, দু-একটা। প্রায় অন্ধকারই বলতে পার।”

    “কী রকম সিকিউরিটি?”

     

     

    “তা জানি না। …তবে তুমি তো বলছ তোমার দলের চেনা ছোকরাই তোমাকে এ বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে।”

    “চেনা মানে মুখটা দেখা দেখা মনে হল: তখন এমন একটা অবস্থার মধ্যে চলে এলাম, মানে পাজল্‌ড্‌ কনডিশানের মধ্যে। তা ফুলেশ্বর, তোমাকেও তো…”

    “আমারও সেই অবস্থা। ছেলেটাকে আমারও মুখ চেনা মনে হল…; আমাদের দলে দেখেছি…। আমিও খানিকটা নাভার্স হয়ে ছুটতে ছুটতে চলে এসেছি।”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “আমায় যে ছেলেটা আনল সে একটা জিপ নিয়ে গিয়েছিল। এই বাড়িটায় নামিয়ে দিয়ে চলে গেল।”

    “চেনো ছেলেটাকে?”

    “মুখ দেখেছি, আমাদের দলের ছেলেদের সঙ্গে ঘোরাফেরা করত বলেই মনে হল।”

    গোপীমোহন, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত যেভাবে এসেছে আমিও সেইভাবে এই বাড়িতে এসেছি। একটা ছেলে আমায় নিয়ে এসেছে। আমি তার নাম জানি না, কোন বাড়িতে থাকে জানি না। ছেলেটাকে আমি এই পাড়ায় দেখেছি, আমাদের দলের ছেলেদের সঙ্গেই থাকত। এ বাড়িতে পা দেবার পর অবশ্য আমার ঘোরতর সন্দেহ হতে লাগল ছেলেটার ওপর। গোপীমোহন, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত আর আমি একই বাড়িতে বসার ঘরে এসে বসব এ প্রায় অবিশ্বাস্য। আমরা পরস্পরের বন্ধু নয়, শত্রু: আমরা পরস্পরকে ঘৃণা করি, একজন অন্যজনকে গালাগাল দি: গোপী, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্তর নামে আমি কেচ্ছা করি, তারা আমার কেচ্ছা করে: আবার তারা পরস্পরের কেচ্ছা করে বেড়ায়। বলতে বাধা নেই, এই বাড়িতে এসে পড়ার পর বসার ঘরে গোপীমোহন এবং ফুলেশ্বরকে দেখে আমি চমকে উঠেছিলাম, আমার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, হাত পায়ে ঘাম জমে যাচ্ছিল। তখনই আমার সন্দেহ হয়, আমি ভীষণ ভুল করেছি, যে ছেলেটা আমাকে নিয়ে এসেছে সে আমার দলের নয়, কিংবা গোপী বা ফুলেশ্বরের দল থেকে এসে আমার দলে গা ঢাকা দিয়ে থাকত, আজ বাগে পেয়ে আমাকে গোপীদের কাছে দিয়ে গেল। অথচ ছেলেটাকে দেখে কিছুই সন্দেহ হয় না। তার চোখমুখ আচরণে এত সততা ও বিশ্বস্ত ভাব যে দ্বিধার কারণ থাকে না। আমি ভুল করেছিলাম। আমার খুবই ভয় হয়েছিল। গোপীরা আমাকে তাদের মুঠোয় পেয়েছে, অনায়াসে মেরে ফেলতে পারে। কিন্তু গোপী আর ফুলেশ্বর দু দলের সম্পর্ক সাপে-নেউলে। তারা একসঙ্গে বসে আছে কী করে— এটা আমার মাথায় ঢুকছিল না। তাহলে কি ওরা দুজনে ভদ্রলোকের চুক্তি করে— যা ওদের পক্ষে সম্ভব— হয়ত আমার পক্ষেও— আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এনে খুন করতে চায়? …এসব সন্দেহ এবং ভয় নিয়ে আমায় ওদের সঙ্গে বসতে হল। কেননা, এ বাড়ি থেকে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করার আর কোনো মানে হয় না। যারা এনেছে তারা নিশ্চয় আমার পালাবার পথ বন্ধ করে রেখেছে। …পরে, কিছুক্ষণ পরে অবশ্য আমি বুঝতে পারলাম, গোপীমোহন আর ফুলেশ্বরের অবস্থাটাও আমার মতন। ওরাও আমাকে দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কেষ্ট গুপ্ত এল সবার শেষে।

     

     

    ফুলেশ্বরকে দেখে আমার মনে হল, একবার বাথরুম যাওয়াটা আমারও দরকার। ওষুধের গন্ধে, গুমোটে আমার গা অনবরতই গুলিয়ে উঠছে। চোখ টেনে যাচ্ছিল। মাথা ঝিম ঝিম করছে। অসম্ভব শুকনো খসখসে লাগছিল চোখ মুখ ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছে।

    আমি উঠতেই কেষ্ট গুপ্ত বলল, “উঠছ?”

    “বাথরুম থেকে আসছি।”

    “তোমারও বাথরুম?”

    “তুমি এই ওষুধটা আর গিলো না। আমি তিষ্ঠোতে পারছি না। …এই রকম একটা সময়ে তুমি ওটা ঠিক পকেটে করে বেরিয়েছ? ধন্য লোক বাপু তুমি!”

    “ওটা নেব না? ওটাই তো আমার সব। ওর জোরেই বেঁচে আছি। ..আজ যে খেলা তোমরা খেলছ ওটা না থাকলে কখন দম আটকে মরে যেতুম।”

     

     

    দরজার বাইরে এসে দাঁড়ালাম। সরু প্যাসেজ। বাঁ দিকে বাথরুম। বাথরুমটা আগে আমাদের ব্যবহার করতে হয়েছে বলে ওটা চিনেছি। এ-বাড়ির আর সব কিছু আমার অচেনা; গোপীরাও চেনে না। আজকালকার ফ্ল্যাট বাড়ি যেমন হয় সেই ধরনের ফ্ল্যাট বলেই মনে হয় বাড়িটাকে। অবশ্য ভাল করে কিছুই দেখা হয়নি, হবেও না। প্যাসেজ অন্ধকার। ঘরটরও বন্ধ। কিচেনের দিকে টিমটিমে একটা বাতি জ্বলছিল। এ বাড়ির গায়ে পাশের বাড়ির পিঠ; মনে হল কোনো নতুন বাড়ি উঠছে, অন্ধকার, ভারি বাঁধা, সিমেন্ট সুরকির গন্ধ। …প্যাসেজে দাঁড়িয়ে কেষ্ট গুপ্তর মতন আমি হাঁ করে খানিকটা বাতাস নিলাম। ঘরের গুমোট গন্ধ, গোপীদের সান্নিধ্য আমায় অসম্ভব বিরক্ত করে তুললেও তার চেয়ে শত গুণে একটা চাপ আমার স্নায়বিক এবং মানসিক স্বাভাবিকতা নষ্ট করে ফেলছিল। ব্যাপারটা কেমন করে হল, কী উদ্দেশ্য, এবং এর পেছনে কার হাত আছে আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

    বাথরুমের দরজা খোলাই ছিল। বাতি জ্বালব কি জ্বালব না করে হাতড়ে হাতড়ে বাতি জ্বালতেই দেখলাম, বাথরুমের জানলা বন্ধ, আলোটাও ঘোলাটে। ফুলেশ্বর বাথরুমটাকে জলে জলাকার করে গেছে। পেচ্ছাবের ঝাঁঝালো গন্ধ উঠছিল। উঠতেই পারে। গোপীমোহন আর কেষ্ট গুপ্ত অন্তত বার তিন চার করে বাথরুম ঘুরে গেছে, ফুলেশ্বর আর আমার এই নিয়ে দুবার চলছে।

     

     

    বেসিনের কলটা খুলে দিতে জলটা বেশ ঠাণ্ডাই লাগল। জলে হাত দিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকলাম। হাতের চেটোটা যে এত গরম হয়ে গেছে আগে যেন খেয়াল করতে পারিনি। চোখে মুখে জল দিয়ে আশ্চর্য আরাম লাগছিল। মনে পড়ল, আমি যখন প্রথম জেলে যাই, ছেচল্লিশের দিকে তখন কোর্ট হয়ে জেলের গেটে পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে হয়ে যায়। আমরা কোনোরকম খাবার দাবার পাইনি। জেলের মধ্যে বড় একটা ব্যারাক ঘরে আমাদের গরু-ছাগলের মতন ঢুকিয়ে দেবার পর বারান্দায় একটা কল পেয়েছিলাম। অফুরন্ত জল ছিল কলে। সেদিন ওই জলে সারাদিনের তৃষ্ণা, দেড় দিনের মালিন্য, উত্তেজনা যেভাবে নিবারণ করেছিলাম তার তুল্য তৃপ্তি জীবনে আর পাইনি। আজ এখন জেলের সেই স্মৃতি মনে এল।

    চোখ মুখ ঘাড় গলা জলে ভিজিয়ে নিতে নিতে মনে হল, আরাম লাগছে। হ্যাঁ, অনেকটা আরাম পাওয়া গেল। কেষ্ট গুপ্তর হাঁপানির ওষুধের উৎকট গন্ধ আপাতত আর নাকে লাগছে না। অবশ্য পেটের মধ্যে বায়ুর একটা অস্বস্তি হচ্ছিল।

    বাথরুমের আলো নিবিয়ে প্যাসেজে আসতেই কানে গেল, ঘরের মধ্যে টেলিফোনটা আবার বাজছে। অন্ধকারে থমকে গিয়ে আমি দাঁড়িয়ে থাকলাম। টেলিফোনটা বাজছে; বেজেই চলেছে। যদিও আমি বাইরে, তবু বেশ বুঝতে পারলাম— গোপীমোহন হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলছে না, ফুলেশ্বরের দিকে তাকিয়ে আছে, ফুলেশ্বর গোপীমোহনের দৃষ্টি অগ্রাহ্য করে কেষ্ট গুপ্তর দিকে চেয়ে রয়েছে, আর কেষ্ট গুপ্ত ছাদের দিকে মাথা তুলে মুখ হাঁ করে হাঁপানির ওষুধ নিচ্ছে। মানে গোপীমোহন ফুলেশ্বরকে, ফুলেশ্বর কেষ্ট গুপ্তকে বোঝাতে চাইছে ফোনটা তার নয়, তাকে ডাকছে না। আমি ঘরে না থাকায় কেষ্ট গুপ্ত আমায় কোনোরকম ইশারা করে বোঝাতে পারছে না যে ফোনটা আমার তার নয়। এই রকমই চলছে অনেক— অনেকক্ষণ ধরে। গোপীমোহন ফোন ধরছে না, ফুলেশ্বর ধরছে না, কেষ্ট গুপ্ত ফোনের দিকে তাকাচ্ছে না পর্যন্ত, আর আমি প্রতিবার ফোন বাজলেই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে উঠছি। আমরা চারজনেই এখন আতঙ্কগ্রস্ত। চার জনেরই বুদ্ধি বিবেচনা লোপ পেয়েছে। আমরা এতই সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছি যে, ঘরের জানলা বন্ধ রেখেছি, নিতান্ত একটা টিমটিমে আলো জ্বালাচ্ছি, গোপীমোহন ক্রমাগত ঘামছে তার ব্লাডপ্রেসার চড়ে যাচ্ছে, ডায়বেটিস বেড়ে যাচ্ছে। ফুলেশ্বর এই সাংঘাতিক অবস্থাটা সহ্য করতে না পেরে ধুঁকতে শুরু করেছে তার চোখমুখ বসে গেছে, মাথার চুল ঝোড়ো হয়ে উঠেছে। কেষ্ট গুপ্তর শ্বাসকষ্ট তার রোগা হাড় হাড় শরীরটাকে ধুনুরীর সেই ধনুকের মতন কাঁপিয়ে দিচ্ছিল। ভীত, আতঙ্কিত, সন্ত্রস্ত আমরা চারজন টেলিফোনের প্রত্যেকটি ডাককে বিষাক্ত সাপের ছোবলের মতন পরিহার করে একে অন্যকে ঠেলে দিতে চাইছিলাম। কিন্তু গোপী, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত বা আমি— আমরা কেউই অত নির্বোধ নই যে ছোবলটা খাবার জন্যে হাত বাড়াব।

    অথচ আমরা প্রথম প্রথম, এ বাড়িতে এবং ওই ঘরে আসার পর টেলিফোনটা ধরেছি। খুবই মজার কথা, কেষ্ট গুপ্ত, মানে আমাদের শেষ জন এসে না পৌঁছনো পর্যন্ত ও ঘরে ফোন আছে এটা যেন আমাদের জানাই ছিল না। গোপীমোহন ফোনটা দেখেছিল, ফুলেশ্বর বলেছিল ছ’টা নাগাদ সে তাদের সেক্রেটারিকে একটা ফোন করবে, আমি বলেছিলাম— বাড়িতে একটা জরুরী খবর দেবার আছে, আর কেষ্ট গুপ্ত এসে ঘরে ঢোকার পর তেমন কোনো কথা বলবার আগেই ফোনটা বেজে উঠল।

    পরের বাড়ি, পরের ফোন। তবু গোপীমোহন হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলে নিল। তুলে নেবার কারণ, আমরা চারজন, পরস্পরের পরিচিত হয়েও একে যখন অন্যের ঘোরতর শত্রু, তখন কে, কী কারণে, কোন্ ফাঁদ পেতে আমাদের চারজনকে ধরে ফেলল— তার কী উদ্দেশ্য এটা সে জানবার জন্যে ছটফট করছিল। আমরা চারজনেই বুঝতে পারছিলাম— এই অসম্ভব, অস্বাভাবিক ঘটনার পেছনে কোনো চক্রান্ত খেলা করছিল। চক্রান্তটা শুধু ভয়ংকর নয়, তার কৌশল এবং উদ্দেশ্যটাও নিশ্চয় ভয়ংকর। কে এই চক্রান্ত করেছে? কেন? কী উদ্দেশ্য?

    গোপীমোহন ফোনটা তুলেছিল ভীষণ উত্তেজিত মুখে। তার ‘হালো হ্যালো’ প্রচণ্ড রুক্ষ, গম্ভীর, এমন কি শাসানির মতন শুনিয়েছিল। কিন্তু ক্রমশই আমরা গোপীমোহনের ভাবান্তর লক্ষ্য করতে লাগলাম। ক্ষণে ক্ষণে গোপীর মুখের ভাব বদলে যেতে লাগল: তার চড়া রুক্ষ ‘হ্যালো হ্যালো’ বিস্ময়সূচক ‘কে কে’ হল, তারপর বিরক্ত অধৈর্য হয়ে ‘কে তুমি? কোথ্‌ থেকে কথা বলছ?’ বলে চেঁচাতে চেঁচাতে কেমন বিমূঢ় ও শঙ্কিত হয়ে গোপী বলল, ‘তুমি কি তামাশা করছ নাকি? কি নাম তোমার? তোমার কথার মাথামুণ্ডু আমি বুঝতে পারছি না।’ বলতে বলতে গোপীমোহন থেমে গেল। তার চোখমুখ দেখে মনে হল, লাইন কেটে গেছে। বিরক্ত হয়ে গোপীমোহন ফোনটা নামিয়ে রাখল।

    ফুলেশ্বর জিজ্ঞেস করল, “কে?”

    “কে জানে! গলা শুনে মনে হল কোনো ছোকরাটোকরা হবে।”

    “কী বলল তোমায়?”

    “সেটাই তো বুঝতে পারলাম না। “…রগড় করল কিনা কে জানে! আজকাল ছেলেছোকরাদের সব ব্যাপারই রগড় তো।”

    “তুমি এখানে আছ এটা তা হলে জানে ছোকরা।”

    “তাই তো দেখছি।”

    “তবে তোমার দলের ছেলে হতে পারে।”

    “আমার দলের ছেলে কেন হবে। তোমাদের কারও দলের হবে।”

    ফুলেশ্বর গোপীমোহনকে সন্দেহের চোখে দেখতে লাগল, গোপীমোহন আমাদের তিনজনকে, আমরা তাকে। সন্দেহ হবার মতনই ঘটনা।

    প্রথম ফোন বাজার পর আমরা পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস এবং সন্দেহ সত্ত্বেও কিছু কথাবার্তা বলতে লাগলাম। এ বাড়ির একটি লোক আমাদের জল, চা দিয়ে আতিথ্য করে গেল। ফুলেশ্বর তাকে জিজ্ঞেস করল, দু এক প্যাকেট সিগারেট এনে দিতে পারবে কি না? লোকটা মাথা নাড়লে ফুলেশ্বর একটা পাঁচ টাকার নোট বের করে দিল। আমার কাছে টাকা ছিল না, মানে বেরুবার সময় টাকা নিতে ভুলে গিয়েছিলাম, ফুলেশ্বরকে বললাম, আমায় একটা প্যাকেট দিও হে।

    ফুলেশ্বর এ-সময় আমার সঙ্গে একটু হাল্কা রসিকতা করল। এ-কথা ঠিক, এক সময় আমার এবং ফুলেশ্বরের মধ্যে একটা আত্মীয়তা হতে পারত, মানে ফুলেশ্বর আমার বোনের সঙ্গে প্রেমাদি ব্যাপারে লিপ্ত হয়েছিল, কিন্তু সেটা স্থায়ী হয়নি।

    চা মুখে দেবার সময় আবার ফোন বাজল। ফোনটা বাজতেই ফুলেশ্বর লাফ মেরে উঠে ফোন ধরতে গেল। তার ভাব দেখে মনে হল সে গোপীমোহনকে হাত বাড়াবার সুযোগ দিতে চায় না। আমাদেরও নয়। ফুলেশ্বর বেশ সন্ধিগ্ধ হয়ে উঠেছে। আমরাও।

    ফোন তুলে ফুলেশ্বর চট্‌ করে কোনোরকম সাড়া শব্দ করল না, যেন সে অন্য পক্ষকে ধরতে চায়। শেষে ফুলেশ্বর ফোনে মুখ রেখে আমাদের নজর করতে করতে সাড়া দিল।

    “কাকে চাই? না, আমি কেষ্টবাবু নই, ফুলেশ্বর। কেষ্টবাবু এখানে আছেন।” বলে ফুলেশ্বর কেষ্ট গুপ্তর দিকে তাকাল।

    কেষ্ট গুপ্ত উঠে গিয়ে ফোন ধরল। গোপীমোহনের মুখ গোল বলে তার চোখে মুখে যেসব ভাবান্তর দেখা গিয়েছিল তা মোটা মোটা, কেষ্ট গুপ্ত রোগা, তার মুখ লম্বাটে এবং প্রায় মাংসহীন, চোখ দুটো খুব তীব্র। কেষ্ট গুপ্ত ফোন নেবার পর তার মুখে উত্তেজনা, বিস্ময়, অবিশ্বাস, ভয় এবং শেষে একেবারে স্তম্ভিত হয়ে যাবার ভাব লক্ষ্য করলাম।

    কেষ্ট গুপ্ত ফিরে এল। গোপীমোহন চা খাচ্ছিল। আমরা কেষ্ট গুপ্তর দিকে তাকালাম।

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “আমাদের নিয়ে কোনো বেটা শয়তানি করছে। …গোপী ঠিকই বলেছে, এ কোনো হারামজাদা ছোঁড়ার গলা। বেটা সব জানে। আমাদের চারজনকে এ ঘরে আটকানো হয়েছে এ-বেটা তা জানে। হয়ত ওই বেটাই আটকেছে…”

    “কিন্তু ও কে?”

    “কী জানি নামটাম বলল না।”

    “কী বলতে চায়?”

    “সেটা তো বুঝলাম না।”

    কেষ্ট গুপ্ত জল খেল প্রথমে। তারপর চায়ের পেয়ালা তুলে নিল।

    খেলাটা আস্তে আস্তে এই ভাবে জমে উঠতে লাগল। ফুলেশ্বরেরও ডাক পড়ল টেলিফোনে। তারপর আমার।

    আমাদের কারও বিন্দুমাত্র সন্দেহ থাকল না, সমস্ত ব্যাপারটাই খুব সাবধানে, আটঘাঁট বেঁধে, পাকাপাকি ছক সাজিয়ে ঘটানো হয়েছে। এই ফাঁকা বাড়িতে একে একে চারজনকে এনে তোলা, এবং মোটামুটি বাড়িতে সবরকম ব্যবস্থা রাখা, মায় টেলিফোন পর্যন্ত…বেশ পাকা মাথার কাজ। পাকা মাথা না হলে, গোপীমোহন, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত-কে আনা যেত না। আমাকেও নয়। আমাদের চারজনকে এখানে আনার ব্যবস্থা যতটা পাকা, আমরা যাতে পালাতে না পারি তার ব্যবস্থাও ততটা পাকা। আসার সময় দেখেছি সদরে কোলাপসিবল্‌ গেট, বোধ হয় নীচে কুকুর-টুকুরও আছে, কেননা সিঁড়ির মুখে চামড়া লাগানো মজবুত কুকুরের গলার চেনও পড়ে থাকতে দেখেছি। অ্যালসেসিয়ান জাতের কুকুরদের গলায় এই রকম চেন সাধারণত দেখা যায়। তবে এখন পর্যন্ত বাড়ির মধ্যে কোনো ডাক শুনিনি।

    সবই হল, দেখাই যাচ্ছে আমরা চারজন ফাঁদে জড়িয়ে এখানে এসে গেছি। আর এখন আমরা চারদিক থেকে আটকে। কিন্তু কেন, কী উদ্দেশ্যে আমাদের আনা হয়েছে, কে আমাদের এনেছে তা বোঝা যাচ্ছিল না। সবই বড় রহস্যময়, গভীর উদ্দেশ্যপূর্ণ মনে হচ্ছিল।

    ক্রমে ক্রমে শেষ বেলাটুকু ফুরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে গেল। পনেরো বিশ মিনিট অন্তর টেলিফোন বেজে উঠছিল। কখনো গোপীমোহন, কখনো ফুলেশ্বর, কখনো আমি উঠে গিয়ে ফোন ধরছিলাম। কেষ্ট গুপ্ত আর ফোন ধরছিল না, দু তিনবার ধরেই ছেড়ে দিয়েছে। তার হাঁপানির টান উঠতেই সে ওষুধ আর স্প্রে নিয়ে বসল।

    ঘরের জানলা আগেই বন্ধ হয়েছিল। গোপীমোহন ঘরে কোনোরকম জোরালো আলো জ্বালাতে বারণ করলে। টেবিল ল্যাম্পটাই সে জ্বালিয়ে দিল।

    বার কয়েক ফোনের পর আমরা সন্দেহ করলাম, এটা পান্নার দলের কীর্তি। পান্না গতকাল ভোর রাতে বোমায় ঘায়েল হয়ে মারা গেছে। তার মুখ থ্যাতলানো, কান উড়ে যাওয়া হাত চ্যাপটানো বীভৎস দেহটা এখন পুলিসের জিম্মায় মর্গে। পান্নার সেই চেহারা আমরা দেখিনি, কিন্তু লোকমুখে শুনেছি। পান্নার এই ভয়ংকর মৃত্যুর সংবাদ সকালের দিকে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই আমাদের গোটা অঞ্চলটা— মানে রেল লাইনের একপার থেকে কোথাকার সেই ব্যাটারী ফ্যাক্টরি দেশলাই কল পর্যন্ত, আবার ওদিকে গঙ্গার ঘাট থেকে এদিকে থানা পর্যন্ত একেবারে থমকে গেল। বাজার ঘাট দেখতে দেখতে উঠে গেল, দোকানে ঝাঁপ পড়তে লাগল, বাসটাস আর এদিকের পথ মাড়াল না, ট্যাক্সি রিকশা উঠে গেল। থানার কালো কালো গাড়িগুলো ঘুরতে লাগল। কাল বিকেল থেকেই থমথমে অবস্থা আরও দমচাপা হয়ে এল। তামাম এলাকার রাস্তাঘাটের বাতি জ্বলল না সারা রাত। প্রচণ্ড ধরনের কিছু বোমার আওয়াজও রাত্রে পুব পশ্চিমে উত্তর দক্ষিণে পান্নার মৃত্যুর বদলা ঘোষণা করতে লাগল। বলতে আপত্তি নেই, পান্নার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর থেকেই আমরা খুব সতর্ক হয়ে গিয়েছিলাম। সামান্য বেলায় খবর এল, বদলা হবে, বদলার তোড়জোড় চলছে। কার ওপর বদলা নেওয়া হবে সেটা অবশ্য বোঝা গেল না। গোপীর দলের ওপর হতে পারে, ফুলেশ্বরের দলের ওপর হতে পারে, কেষ্ট গুপ্তর দল বা আমার দলও বাদ যাবার কথা নয়। আমরা যে যার মতন তৈরি হতে লাগলাম। কে কেমন তৈরি হচ্ছে সে খবর আমরা পাই, আমি লক্ষ্মীর মুখে কাল বিকেলেই জানতে পেরেছিলাম গোপীমোহন তার দলের তিনটে ছেলেকে লাইনের দিকটা দেখতে বলেছে। ফুলেশ্বর আর কেষ্ট গুপ্তও নিজের নিজের ব্যবস্থা পাকা করে নিচ্ছিল। কিন্তু মজাটা একটু অন্য রকম দাঁড়াল, পান্নার চেলারা কাকে— কোন দলকে সন্দেহ করছে— এটা জানতে না পারার জন্যে আমরা খুব গোপনে পান্নার চেলাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করতে লাগলাম। অথাৎ পান্না মারা যাওয়ায় তার চেলাদের হাতে আমার একটা খেলা খুব গোপনে শুরু হয়ে গেল। আমি একটু দেরি করে ফেলায় জানতে পারলাম, গোপীমোহন ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত সবাই আগে আগে দূত পাঠিয়েছে। আমার দূত গেল শেষে।

    আজ সকালে শোনা গেল, পান্নার বডি দুপুর বা বিকেলে ছেড়ে দেওয়া হবে। পান্নার দলকে হাতে টানতে হলে ঠিক এই মুহূর্তে যা দরকার ছিল তা হলে পুলিসের সঙ্গে বলা-কওয়া, একটা অন্তত ট্রাক, কিছু ফুল তাড়াতাড়ি তার দলের হাতে তুলে দেওয়া। পুলিসের সঙ্গে বলাকওয়া মানে যাতে তাড়াতাড়ি বা যতটা সম্ভব আগে পান্নার ডেড্‌ বডি পাওয়া যায় তার চেষ্টা। গোপীমোহনের লোক আছে পুলিস মহলে, ফুলেশ্বরের আছে, কেষ্ট গুপ্ত এবং আমারও আছে। যে যার লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে করতে বেলা বেড়ে গেল, ততক্ষণে আমার লক্ষ্মী এসে খবর দিয়ে গেল, গোপীমোহন বউবাজারের কোন ছানার মালিকের একটা লরি গোপনে পাঠিয়ে দিয়েছে। লরি যে দিতে পারে তার পক্ষে ফুল দেওয়া আর বড় কথা কি! দুপুরে খবর এল, ফুলেশ্বর মানিকতলার শা-দের কারখানার লরি রেডী করে ফেলেছে। কেষ্ট গুপ্ত তার শালা কাশীনাথের কন্‌ট্রাক্টারির লরির জন্যে হন্যে হয়ে বেড়াচ্ছে, এবং শালাকে গালাগাল দিচ্ছে। এসব খুব গোপনে গোপনে হচ্ছিল। আমি দত্তদাকে তিনবার ফোন করেও তার পাত্তা না পাওয়ায় মাথার চুল ছিঁড়ছিলাম। স্ত্রীকে বললাম, একটা লরিঅলা ভাইও যোগাড় করতে পারনি? তোমায় যে কেন বিয়ে করেছিলাম।

    মুশকিল হল, সরাসরি আমাদের করার কিছু ছিল না। কেননা, পান্নাকে আজ আমরা প্রকাশ্যে কেউ দাবি করতে পারি না। সে গোপী, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত এবং আমার দলের হয়ে বরাবর থাকেনি। কখনও গোপীর টাকা খেয়েছে, কখনও ফুলেশ্বরের কখনও আমাদের। তারপর পান্না— হালে আমাদের অবস্থা দেখে, টানটানি দেখে, এবং কোন পক্ষের হয়ে থাকলে নিরাপদ তা বুঝতে না পেরে সম্পর্ক একেবারেই কাটিয়ে ফেলেছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, আমরা পরস্পরের এতই শত্রু যে, যে-কোনো এক পক্ষের হয়ে বসে থাকলে তিন পক্ষের শত্রুতা তাকে সহ্য করতে হবে। তার চেয়ে এই চার মাথার মোড় থেকে সরে পড়াই ভাল। পান্না ইদানীং। আমাদের কারও ছিল না। সে স্বাধীন ছিল। তার রাজত্বে সে মালগাড়ি ভেঙে, থানা পুলিসকে প্রাপ্য চুকিয়ে দিব্যি দিন কাটাচ্ছিল। আমি পান্নাকে শেষ দেখেছি গত বর্ষায়। একটা ট্যাক্সিতে আমি উঠতে যাচ্ছি— দেখি সামনের সিট থেকে পান্না নামছে। প্রচণ্ড মদ্যপান করেছে, তার প্যান্টের হিপ পকেটে হাত ঢুকিয়ে অন্তত তিন চারশো টাকা বের করল, একশো টাকার নোটও ছিল, দশ কুড়িরই বেশি; একটা দশ টাকার নোট ড্রাইভারের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বৃষ্টির মধ্যে একটা গ্যারেজের মধ্যে চলে গেল। তার টেরিটের প্যান্ট, টেরিলিনের জামা, পায়ের জুতো, মাথার কোঁকড়ানো চুল— এবং সটান চেহারা দেখতে দেখতে আমি তাকে বাহবা দিলাম। সংসারে এরাই বেঁচে থাকবে। এরাই স্থায়ী, আমরা অস্থায়ী।

    সেই পান্না, যেহেতু আমাদের কারও হাতে আর নেই— আমাদের ক্ষতিই হচ্ছিল। পান্নার বদলে যারা আছে তারা কাজ চলা গোছের, কিন্তু তেমন একজনকে পেলে অন্যপক্ষের একশোটাও কিছু নয়। পান্না যখন গোপীর ছিল তখন রেল লাইন, বস্তি, রাজপাড়া, দেশলাই কারখানা সব তার দখলে চলে গিয়েছিল। যখন ফুলেশ্বরের হাতে এল— ফুলেশ্বর প্রায় তামাম এলাকা একচেটে করে ফেলল। এই রকমই হয়েছে। কেষ্ট গুপ্ত কিংবা আমি পান্নাকে তেমন যোগান দিতে পারি নি। আমরা যে আধিপত্য ভোগ করেছি তা ক্ষণস্থায়ী। কাজেই এখন পান্নার মৃত্যুর পর আমাদের দুটো উদ্দেশ্য ছিল। প্রথম উদ্দেশ্য পান্নার দলকে বোঝানো যে বেচারীর এমন শোচনীয় মৃত্যুর জন্যে আমরা দায়ী নই। আমাদের ওপর বদলা নেবার চেষ্টা করা যেন না হয়। শত্রুপক্ষ নিশ্চয় কান ভাঙিয়ে এই সুযোগে আমাদের শেষ করে দিতে এবং পান্নার দলকে হাতে পাবার চেষ্টা করছে। এখন একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে গোপনে গোপনে, কে কত তাড়াতাড়ি পান্নার দলের ডান হাত বাঁ হাতকে বাগিয়ে, ট্রাক ফুল পাঠিয়ে, শ্মশানে যাবার আগে সারা পাড়া ঘুরিয়ে এই খেলায় জিতে যায় যে জিতবে সে পান্নাকে শহীদ করবে। শহীদ হবার জন্যেই পান্নাদের জগতে আসা, শুধু সে কার পক্ষের শহীদ হল— গোপীমোহনের, ফুলেশ্বরের, কেষ্ট গুপ্তর না আমার—সেটাই আমাদের বিবেচনার কথা।

    এমন একটা অবস্থা যখন, মানে আমাদের আহার নিদ্রা নেই, স্নান নেই, হাজার দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, অতি গোপনে খবরাখবর নেওয়া হচ্ছে, খবর পাঠানো হচ্ছে, ট্রাক, ফুল সংগ্রহ চলেছে, পুলিশ মহলে গোপনে ফোনে ধরা করা চলছে তখন শোনা গেল, পান্নার বডি পুলিশ অন্ধকার না হলে ছাড়বে না। সারা অঞ্চলে টেনশান রয়েছে। বডি আনলে টেনশান বেড়ে যাবে।

    কথাটা অস্বীকার করা যায় না। পাড়াটা কাল থেকে একেবারে নির্জীব হয়ে গিয়েছে। দোকান পশার বন্ধ, গাড়িঘোড়া নেই, ইস্কুলটিস্কুল খোলেনি, লোকজন ভয়ে ভয়ে অফিস কাছারি গেল এল, সকলের মুখে ওই পান্নার কথা, পান্নার গল্প, দু চারটে কাঁচা পোস্টারও দেওয়ালে কে সেঁটে দিল। সন্ধ্যে থেকে থমথমে। সারা তল্লাট অন্ধকার। পুলিশের কালো গাড়ি ঘুরে যাচ্ছে। আজও প্রায় সেই অবস্থা, নমো নমো করে বাজার ঘাট খুলেছে, দু একটা গাড়ি ঘোড়াও চলেছে, তবে ডেড্‌বড়ি পাড়ায় এলেই কী হবে এটা কেউ বুঝতে না পেরে দুপুর থেকেই সাবধান হয়ে যাচ্ছিল। মানে বিকেল থেকে এই পাড়া শ্মশানের মত খাঁ খাঁ করবে, রাত্রে অন্ধকারে কী হবে কেউ জানে না।

    যতক্ষণ না মর্গ থেকে পান্নার ডেড্‌ বডি ছাড়া হচ্ছে ততক্ষণ সময়। ততক্ষণ আমাদের প্রাণপণে চেষ্টা করতে হবে পান্নার ডান বা বাঁ হাতকে বাগাবার, দলে টানবার। এই সুযোগ হাতছাড়া হলেই সর্বনাশ!

    ওই সুযোগ নিতে আমরা এমন মরিয়া ও বোকা হয়ে গিয়েছিলাম যে আমাদের সাধারণ বোধবুদ্ধি লোপ পেয়েছিল। এমন মারাত্মক ভুল করা উচিত হয়নি। কিন্তু খুব প্রাজ্ঞ, অত্যন্ত বুদ্ধিমান লোকেও ভুল করে। মতিভ্রম মুনিদেরও হয় বলে সেই যে কথা আছে— সেটা আর মিথ্যে কি! তা ছাড়া ভুলটা ঘটেছে এমন বিপদের সময় যখন মাথা ঠিক রাখা মুশকিল। বদলার ভয়ে তখন আমাদের অন্তরাত্মা কাঁপছে, নিজেদের অস্তিত্ব পাছে প্রচণ্ড ঘা খায় সেই দুশ্চিন্তায় এবং তাড়নায় সবদিক খেয়াল করার অবস্থাই ছিল না। কাজেই আমাদের দলের সেই ছেলেটা— যাকে মুখে চিনি অথচ নামে ঠিক চিনি না— সে যখন উসকো খুসকো ঝোড়ো চেহারা, ভীষণ ব্যস্ত ভাব এবং পাকা গুপ্তচরের ভাবভঙ্গি করে গিয়ে বলল, ভৃগু খবর দিয়েছে আমায় এক্ষুনি এক জায়গায় যেতে হবে, সেখানে বাপ্পাকে পাওয়া যাবে— তখন আমি তাকে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করিনি। ভৃগু আমার লোক, বিশ্বাসী লোক, আমার স্কোয়াডের এক নম্বর। সে পান্নার দলের ডান হাত বাঁ হাতের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালিয়েছিল। আর বাপ্পা পান্নার দু নম্বর। বাপ্পার সঙ্গে মুখোমুখি হবার এবং কথা বলার জন্যে ভৃগুর এই ব্যবস্থা হাত ছাড়া করার কথাই ওঠে না। সঙ্গে সঙ্গে আমি ছেলেটার ডেকে আনা রিকশায় উঠে পড়লাম। সে আমায় এ রাস্তা সে রাস্তা ঘুরিয়ে গলিঘুঁড়ি দিয়ে এই বাড়িটায় পৌঁছে দিল। বলল, আপনি ওপরে চলে যান, ভৃগুদা একটু পরে আসবে। … আমি তার ফাঁদে পা দিলাম।

    গোপীমোহন, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত— সকলেই একই ভাবে ফাঁদে পা দিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কেউ এখানে আসার আসল উদ্দেশ্যটা বলছে না। সেটা তো আর মুখ ফুটে বলা যায় না। গোপী কি বলবে, আমি পান্নার দলের ডান হাত জহর কিংবা বাঁ হাত বাপ্পার সঙ্গে গোপনে একটা কথাবার্তা বলতে এসেছিলাম? নাকি ফুলেশ্বর তা বলবে? কেষ্ট গুপ্তও বলবে না। আমিও বলি নি। কিন্তু চারজনে চমৎকার বুঝতে পেরেছি, আমাদের এখানে— আসার উদ্দেশ্য একই এবং সেই উদ্দেশ্য সাধন করতে এসে ফাঁদে পড়ে গিয়েছি।

    কিন্তু কে কেন এবং কী উদ্দেশ্যে আমাদের চারজনকে এমন ফাঁদে জড়িয়েছে তা আমরা এখনও বুঝতে পারছিলাম না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমন অবস্থায় বসে থাকাই ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়, তার ওপর আমরা চারজন, একে যখন অন্যের ঘোরতর শত্রু, পরস্পরকে ক্রমাগত সন্দেহ অবিশ্বাস করে চলেছি, একে অন্যকে কথায় বিদ্ধ করছি, বিদ্রূপ করছি চাপা কলহ কটূক্তি চলছে, এবং কারও পক্ষে বোঝা সম্ভব হচ্ছে না এর পর কী হবে, কী হতে পারে— তখন আমাদের মানসিক অবস্থা কোন অবস্থায় পৌঁচেছে বোঝা অসম্ভব নয়। ওই ফোনটা আমাদের প্রথম থেকেই খেলাতে শুরু করেছে। পনেরো বিশ মিনিট অন্তর ডাকছে আর খেলাচ্ছে, খেলাতে খেলাতে এখন যে অবস্থায় এনে ফেলেছে সেখানে আমরা আর দম টানতে পারছি না, ঘামছি গলগল করে, গায়ে তাপ জমছে, ভয়ে আতঙ্কে বুক কাঁপছে, উদ্বেগে স্নায়ুর টান ছিঁড়ে যাচ্ছিল।

    বারান্দা থেকে আস্তে আস্তে ঘরে এলাম। ফোনটা তখন আর বাজছে না। ঘর স্তব্ধ। এ বাড়ির লোকটা জল চা দিয়ে গেল। কেষ্ট গুপ্ত এক নিঃশ্বাসে জলটা খেয়ে ফেলল । গোপীমোহনও তেষ্টা মেটালো। আমরাও।

    চুরুটটা রেখে দিয়ে গোপীমোহন চায়ের কাপ হাতে নিল। বলল, “কেষ্ট, আমার মনে হচ্ছে, এভাবে বসে থাকলে আমাদের সারা রাত বসে থাকতে হবে। এখন বোধ হয় সাড়ে আট বাজল, আর দেরি না করে কিছু একটা ব্যবস্থা করা দরকার। পাড়াটাও তো ইন্‌সিকিওরড্‌ রয়েছে। এতক্ষণে পান্নার বডি যদি এসে গিয়ে থাকে— কী হচ্ছে ঈশ্বরই জানেন।”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, “তোমার মাথার খুব নাম আছে, তুমিই বলো কী করা যেতে পারে?”

    “আমি বলছি পুলিশকে ইনফর্ম করা ছাড়া উপায় নেই। তোমার এক মাসতুতো ভাই লালবাজারে আছে না?”

    “আমার যে আছে, তার চেয়েও উঁচুদরের লোক তোমার আছে, গোপী। তুমিই তো লালবাজারে ফোন করতে পার।”

    “আমার লোককে পাওয়া যাবে না; ছুটিতে রয়েছে। ফুলেশ্বর একবার দেখুক, তার ডাকে গোটা লালবাজার ছুটে আদবে।” গোপীমোহন একটু খোঁচা মারল।

    ফলেশ্বর তার ধুতির কোঁচা গলার কাছে নেড়ে হাওয়া লাগাচ্ছিল। বলল, “পুলিশ ডাকা রিস্কি, ভেরি রিস্কি। …তাছাড়া কোথায় ডাকবে? এ গলির নাম কি? বাড়ির নম্বর কত? জানো কেউ?”

    “না”, আমি চা খেতে খেতে মাথা নাড়লাম।

    গোপীমোহন বলল, “কেষ্ট এদিকটা চেনে। চেনো না কেষ্ট?”

    “এত গলিখুঁজি কে চিনবে? আগের মতন সব আছে নাকি? দু-চার মাস অন্তর পালটে যাচ্ছে। আমি চিনি না।”

    “বাঃ, বেশ বললে! এটা তোমার এরিয়া ছিল না একসময়ে?”

    “গোপী, এখানে তুমি একসময়ে মস্ত পকেট করেছিলে। তোমারও চেনা উচিত।”

    আমরা চার জন এই বিরাট তল্লাটের পুব পশ্চিম উত্তর দক্ষিণ চারদিকে যে যার মতন কম বেশি এলাকা এবং পকেট করে থাকলেও সব জায়গায় ঘোরা ফেরা, বাড়ি বাড়ি চেনাশোনা করিনি। সেটা কি আমাদের পক্ষে সম্ভব! দলের ছেলেরা হলে বলে দিতে পারত।

    গোপীমোহন ফুলেশ্বরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ফুলেশ্বর, তুমি তো বলছিলে কোন সুশীল সেনের বাড়ি। তুমি জায়গাটা নিশ্চয় চেনো। পুলিশকে বলল সুশীল সেনের বাড়ির কাছে— ওরা খুঁজে নেবে।”

    ফুলেশ্বর বলল, “সুশীল সেনকে আমি চিনি। তার বাড়িতে একবার এসেছি। কিন্তু এই গলি কে চিনে রাখতে গেছে। বাড়ির নম্বরও বা কে জানবে! …অত কথার অবশ্য দরকার নেই। ওই বামুনঠাকুরটাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে গলির নাম বাড়ির নম্বর এখুনি পাওয়া যাবে। কিন্তু গোপী, পুলিশ ডাকার পর কী হবে তুমি বুঝতে পারছ না। যারা আমাদের এনেছে তারা আশেপাশে কোথাও নেই, এ বাড়ির ওপর চোখ রাখছে না— এটা তোমায় কে বলল। পুলিশের গাড়ি ঢোকার আগেই আমাদের কী অবস্থা হবে বুঝতে পারছ না?”

    কেষ্ট গুপ্ত বিদ্রূপ করে বলল “গোপীরা পুলিশের ওপর খুব বিশ্বাস করে তো!”

    গোপীমোহন বিদ্রূপটা ফিরিয়ে দিয়ে বলল, “তোমরা যে করোনি তার প্রমাণ দিতে পার?”

    আমি বললাম, “পুলিশ ডাকা সত্যিই বোকামি হবে। তা ছাড়া এখানকার পলিশকে বিশ্বাস করা যায় না। ওরা যেমন কেউ কেউ আমার কিংবা তোমাদের সেইরকম আবার পান্নার। তা ছাড়া আমাদের এলাকায় পুলিশটুলিশ আজ খুব ব্যস্ত। ডাকলেই পাওয়া যাবে তার কোনো মানে নেই।”

    ফুলেশ্বর বলল, “আমারও মনে হয় পুলিশকে না জানানোই ভাল।”

    এ-সময় আবার ফোনটা বেজে উঠল । ফোন বাজার সঙ্গে সঙ্গে গোপীমোহন এমন করে চমকে গেল যে, তার হাতের চায়ের কাপ কাত হয়ে থাকল। সেদিকে নজর করল না গোপীমোহন, ফুলেশ্বরের দিকে তাকাল। ফুলেশ্বরের গলার নালিটা ফুলে গেল, চোখ ঘোলাটে, হতাশভাবে সে কেষ্ট গুপ্তকে কি বলবার চেষ্টা করতে গিয়ে বোবা হয়ে গেল। কেষ্ট গুপ্ত জোরে জোরে মাথা নেড়ে, বুকে চাপড় মারল, তারপর তার স্প্রে-যন্ত্রটা হাতে উঠিয়ে নিয়ে মুখ হাঁ করে রবারের বলটা পাম্প করতে লাগল। আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলাম কেষ্ট গুপ্তর স্প্রেতে ওষুধ নেই। না থাকুক, তবু কেষ্ট গুপ্ত পাম্প করে যাচ্ছে। আমি নড়লাম না, ফোন তুলতে উঠে গেলাম না। জলে ধোয়া চোখমুখের ঠাণ্ডা যেন সাঁ-সাঁ করে উবে গিয়ে আবার খসখসে গরম ভাবটা ফুটতে লাগল। বুকের মধ্যে দপদপ করছিল।

    ফোন বাজল…বাজল…বেজেই চলল; আর আমরা চার জনে পাথরের মতন অনড়, নির্বাক, সন্ত্রস্ত ও অসহায়ের মতন বসে থাকলাম। গোপীমোহন তার তরফ থেকে বোঝাতে চাইল, এ ডাক তার নয়, তাকে কেউ ডাকছে না— কাজেই সে নির্বিকার বসে থাকবে। ফুলেশ্বরও ফোন ধরবে না, কেন না সে অনেকক্ষণ থেকেই বুঝিয়ে দিতে চাইছে— ডাকটা তার নয়, তাকে কেউ ডাকছে না। কেষ্ট গুপ্ত এবং আমিও তো সেই একই কথা ববাঝাতে চাইছি। …তবে ডাকটা কার? কার জন্যে টেলিফোন বাজছে?

    টেলিফোনটা অবশেষে থামল। যখন বাজে তখন মনে হয় আমরা যেন যে কোনো মুহূর্তে দেখব— ওই কৃষ্ণকায় বস্তুটার আড়াল এবং অন্ধকার থেকে কোনো আততায়ী ঝকঝকে বিশাল এক ছোরা হাতে করে আমাদের ওপর লাফিয়ে পড়ার জন্যে অপেক্ষা করছে। যে কোনো মুহূর্তে সে লাফ মারবে, ফোনের শব্দটা তার ডাক— তার আগমন বার্তা। যতক্ষণ বাজে ততক্ষণ আমরা ভয়ার্ত হয়ে অসহায়ের মতন বসে থাকি, ঘর্মাক্ত হই এবং স্নায়ুর ওপর অসহ্য এক পীড়ন অনুভব করি। টেলিফোন থেমে যাবার পর খানিকটা সময় যায় নিশ্বাস প্রশ্বাস সামান্য স্বাভাবিক করে নিতে, এবং বাকশক্তি ফিরে পেতে।

    টেলিফোন থেমে যাবার কিছু পরে গোপীমোহন বলল, “ফুলেশ্বর, তুমি অন্তত, এই ভূতুড়ে ডাকটা বন্ধ কর। আমার আর সহ্য হচ্ছে না।”

    ফুলেশ্বর খোঁচা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বলল, “কী করে করব?”

    ফুলেশ্বর এ সময়ও যেন হাসল, একটু, বলল, “তোমাকে তো আগেই বলেছি, এ বাড়ির ফোন নম্বর আমরা জানি না, ফোনের গায়ে ডায়েলে কিছু নম্বর লেখা নেই। এক্সচেঞ্জকে কী বলব? কোন ফোন লাইন আউট করে রাখতে বলব? তা ছাড়া এখন তো অটোমেটিক…”

    “এ বাড়ির লোকটা বলতে পারে না?” কেষ্ট গুপ্ত জিজ্ঞেস করল।

    “চাকর বামুন ফোন নম্বর জানবে কী? তুমি ডেকে জিজ্ঞেস করো না হয়!”

    কেষ্ট গুপ্তর এতক্ষণে খেয়াল হল তার হাঁপানির ওষুধ ফুরিয়ে গেছে। ওষুধ ফুরিয়ে গেছে দেখে কেষ্ট গুপ্ত যেন আর্তনাদ করে উঠল। তার চোখ-মুখ ফাঁসির দড়ি লাগানো কয়েদীর মতন দেখাচ্ছিল। আমার ভয় হচ্ছিল, কেষ্ট গুপ্ত যেমন করছে— হয়ত হার্ট ফেল করে যাবে। নিজের বুক সম্পর্কেও আমার আর কোনো ভরসা ছিল না।

    ক্রমশ ঘড়ির কাঁটা ন’টা ছুঁয়ে গেল। সমস্ত এলাকা কেমন অস্বাভাবিক, রাস্তার কুকুরের ডাকও শোনা যাচ্ছে না। ঘরে বসেও আমরা বুঝতে পারছিলাম—পাড়াটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে ভরে আছে, থমথম করছে, লোকজন রাস্তায় নেই, যে যার বাড়ির সদর বন্ধ করে জানালা দিয়ে বসে আছে। পুলিশের গাড়ি বড় রাস্তায় ঘুরছে বোধহয়। কে জানে—এতক্ষণে পান্নার ডেড বডি আসছে কি না। ভূতুড়ে ফোনটা আবার বেজেছে, থেমেছে; নিয়মিত ব্যবধানের পর আবার বাজল এবং থামল। আমি পাখাটাকে আর একটু না বাড়িয়ে পারলাম না। ফুলেশ্বর অ্যাসট্রে হাতড়ে ফেলে দেওয়া সিগারেটের টুকরো কুড়িয়ে ফস্ করে দেশলাই জ্বালল, দুটো টান দিয়ে নিল পোড়া সিগারেটে।

    গোপীমোহন বলল, “প্রমথ, এই ভূতুড়ে ফোনটা কে করতে পারে তোমার কিছু মনে হয়?’

    আমি মাথা নাড়লাম। “না, বুঝতে পারছি না।”

    “পান্নার কোনো লোক?”

    ফুলেশ্বর মাথা নাড়ল, বলল, “পান্নার দলের কেউ হলে কিছু তো একটা বলত। এ যে কিছুই বলছে না।”

    কেষ্ট গুপ্ত সোফা-কাম্‌-বেডে শুয়ে পড়েছিল। বলল, “আমাদের এইভাবে ভয় দেখানোর কী মানে! ব্ল্যাকমেল করতে চায়? কিসের ব্ল্যাকমেল?”

    গোপীমোহন যেন অনেক ভেবে একটা বুদ্ধি বের করেছে, ফুলেশ্বরের দিকে তাকিয়ে বলল, “ফুলেশ্বর—এটা যদি পান্নাদের কোনো প্রেসার হয়—মানে তারা যদি এই প্রেসার দিয়ে কিছু আদায় করতে চায়…”

    “কী…চাইবে?”

    কপালের ঘাম মুছতে মুছতে গোপীমোহন বলল, “জানি না কী চাইবে!”

    কেষ্ট গুপ্ত বলল, তোমার কাছে একটা স্টেটমেন্ট চাইতে পারে, গোপী। হারামজাদা, শালা, শুয়ারের বাচ্চাটাকে ‘শহীদ’ করার জন্যে তোমাকে বলবে। তোমরা তো হরবখত গুণ্ডা, বাট্‌পাড়, সোস্যাল ক্লিমিন্যালদের ‘শহীদ’ বানিয়ে দিচ্ছ। এবারও…”

    “তোমরা করো না—” গোপীমোহন রুক্ষ গলায় বলল, “তোমরা কে করো না? ফুলেশ্বরেরা করে না, প্রমথরা করে না? তুমি কেষ্ট গুপ্ত, আমার সঙ্গে চালাকি করতে এস না। আমি তোমায় হাড়ে হাড়ে চিনি। তুমি জেলে আমাদের ছেলেদের হাঙ্গার স্ট্রাইক করিয়ে মার খাইয়েছিলে, রক্ত পেচ্ছাপ করতে করতে শাস্তি বেচারা মারা যায়…কেন, ক’মাস আগে একটা লুমপেন্‌কে তোমরা কী করেছ? স্কুল থেকে মেয়ে ভাগিয়ে নিয়ে পালাচ্ছিল— পুলিশ তাকে ধরে পেটায়। তোমরা সেই লুমপেনের জন্যে থানা ঘেরাও করো নি?”

    “থাক গোপী, থাক—” কেষ্ট গুপ্ত বলল, ‘মেয়েদের শালীনতা রাখার কত বড় কনট্রাক্ট তোমরা নিয়েছ তা আমার জানা আছে। অল ইন্ডিয়া স্ট্রাইকের সময় তোমার দলের লোক অফিসে মেয়েদের শাড়ি সায়া খুলে কালির দোয়াত গায়ে মাথায় ঢেলেছিল। তোমরা জন্তু।”

    “তুমি জন্তুর চেয়ে কম নও। তুমি নও, ফুলেশ্বর নয়, প্রমথ নয়।”

    ফুলেশ্বর বলল, “বেশ বেশ গোপী, তোমার কথাই মেনে নেওয়া গেল, আমরা সবাই জন্তু। কিন্তু এখন খেয়োখেয়ি করে কোনো লাভ হবে কি! সাড়ে ন’টা বাজতে চলল— এ টরচার আর তো সহ্য হচ্ছে না। একটা উপায় টুপায় ভাবতে পারছ না?”

    “তুমি ভাবতে পারছ না? তোমার মাথায় কিছু আসছে না?”

    “না। …আমি তো বরাবরের মাথা মোটা, ফুলেশ্বর যেন ম্লান হেসে গোপীকে কিংবা নিজের ভাগ্যকে বিদ্রূপ করল। দু মুহূর্ত থেকে বলল, “ধরো যদি এমন হয়, পান্নার ছেলেরা এখন বলে, সে বেটাকে চার জনে মিলে শহীদ সার্টিফিকেট দিতে হবে— আমি তাতেও রাজি; তবু এই ঘর এই টেলিফোন বেজে ওঠা আমার আর সহ্য হচ্ছে না। বুকটা ব্যথাই করছে।” ফুলেশ্বর কেমন যেন একেবারে হতাশ নিরুপায় অক্ষমের মতন বলল। গত বছর ফুলেশ্বরের একটা ছোটখাট হার্ট অ্যাটাকের মতন হয়েছিল। আজকের চাপ তার হৃৎপিন্ডকে নিশ্চয় খুব ক্ষতিগ্রস্ত করছিল।

    গোপীমোহন কোনো কথা বলল না । কেষ্ট গুপ্ত সোফার ওপর শুয়ে মুখ হাঁ করে থাকল। তার চোখ বোজা। আমি মাথা ঘাড় পিছন দিকে হেলিয়ে বসে থাকলাম।

    আবার একবার যথারীতি ফোন বাজল এবং থামল। গোপীমোহন, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্ত এবং আমি অচেতনের মতন বসে থাকলাম।

    দশটা প্রায় বাজতে চলল। কলকাতায় পেঁচা ডাকে বলে জানতাম না— মনে হল অন্ধকারে কোথাও পেঁচা ডাকছে। সেই স্তব্ধতার মধ্যে রেল লাইনের একটা আওয়াজ দূর থেকে ভেসে এল। নিঃসাড়, নিস্তব্ধ আবহাওয়ার মধ্যে আচমকা মনে হল, অনেক দূরে কোথাও যেন অদ্ভুত একটা গুমগুম আওয়াজ হচ্ছে। শব্দটা শুনলে মনে হয় অনেক লোক মিলে কিসের একটা বাজনা বাজাতে বাজাতে হেঁটে আসছে। একেবারেই অস্পষ্ট সেই ধ্বনি, এত অস্পষ্ট যে আমার মনে হল এই শব্দ আমি কতকাল আগে দাঙ্গার সময় শুনেছি। কান পেতে শব্দটা কোন দিক দিয়ে আসছে এবং যথার্থভাবে শব্দটা কিসের বোঝার চেষ্টা করছিলাম। পান্নার ডেড্‌ বডি নিয়ে মিছিল বেরিয়েছে নাকি।

    গোপীমোহন হঠাৎ বলল, “ফুলেশ্বর, আমি একটা কথা ভাবছি।”

    “কী ভাবছ?”

    “ফোনটা যে পান্নার দলের কেউ করছে এটা আমরা ভেবে নিচ্ছি কেন?”

    “কই, আমরা তো তা ভাবছি না। আমরা সন্দেহ করছি পান্নার দলের কেউ হতে পারে। কেন করছি তা তো তুমি আমি কেষ্ট প্রমথ সকলেই জানি। কি জানি না?”

    গোপীমোহন সে কথার কোনো স্পষ্ট জবাব না দিয়ে বলল, “পান্নার দল ছাড়াও অন্য কেউ ফোনটা করতে পারে।”

    ‘পারে’, ফুলেশ্বর বলল, ‘সেই অন্যটা কে তাই তো ধরতে পারছি না।”

    “একবার ধরার চেষ্টা করো না।”

    “কী করে করব! তুমি তো নিজের কানেই শুনেছ— ফোনে কী বলছে। ও থেকে কিছুই বোঝা যায় না।”

    আমি বললাম, “আমার মনে হচ্ছে পান্নার ডেড্‌ বডি বেরিয়েছে।”

    গোপীমোহন চমকে আমার দিকে তাকাল, কেষ্ট গুপ্ত উঠে বসছিল, ফুলেশ্বর আমার দিকে তাকিয়ে থাকল।

    “কী করে বুঝলে?” ফুলেশ্বর বলল।

    “একটা শব্দ অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে যেন।”

    “কেমন শব্দ?”

    “গুম গুম শব্দ…”

    গোপীমোহনরা শব্দটা শোনার জন্যে কান পেতে থাকল।

    ফলেশ্বর শেষে বলল, ‘প্রথম, তোমার মাথায় কোনো বুদ্ধি আসছে না? কে ফোন করছে, কেন করছে, আমাদের টেররাইজ করার কী দরকার তার? কী সে চায়?”

    আমি বললাম, “আমার মাথায় কিছু আসছে না ফুলেশ্বর। আমিও তোমাদের মতন কখনও ভাবছি পান্নার লোক, কখনও ভাবছি অন্য কেউ। আমারও আর সহ্য হচ্ছে না। এখন একেবারে রেকিং পয়েন্টে রিচ্ করে গেছি।”

    “তুমি খুব ভয় পেয়ে গেছ।”

    “তোমরা পাও নি?”

    “এই অবস্থাটা কার না ভয় পাবার মতন। আমার বুকটা ব্যথা করছে অনেকক্ষণ ধরে। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না। ভগবান যা করেন তাই হবে…”

    কেষ্ট গুপ্ত ছটফট করতে করতে বলল, আমার বুক ফেটে যাচ্ছে, প্রমথ। দরজাটা খুলে দাও, একটু বাতাস নি।’

    গোপীমোহন বলল, “প্রমথ, তুমি এখনও খানিকটা নার্ভ রেখেছ। কিছু একটা করো— ডু সামথিং।”

    ফুলেশ্বর বলল, “তুমি এবার ফোনটা ধরো, আমায় বলল না— আমি পারছি না। পারব না। তুমি ধরো…।”

    কেষ্ট গুপ্ত এতই ছটফট করছিল যে দরজাটা খুলে দিলাম। সেই বিশাল অন্ধকার— চারপাশ কালো হয়ে আছে। আশ্বিনের ঠাণ্ডা বাতাস এল রাত্রের। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই। একটা খেঁকি কুকুর কোথায় যেন কাঁদছে, কোথায়— কোন দূর থেকে সেই গুমগুম ভীতিকর শব্দটা ভেসে আসছিল। কারা যেন রণবাদ্য বাজাতে বাজাতে ওই অন্ধকার থেকে— দূর থেকে হেঁটে আসছে।

    ফোনটা আবার বাজল। আমি চমকে উঠলাম। গোপীরা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার পা কাঁপছিল, হাতের তালু ঘামছিল, বুক ধকধক করছিল। কাঁপতে কাঁপতে আমি পা পা করে এগিয়ে গেলাম। গোপীদের চোখ আমার ওপর যে স্থির হয়ে আছে তা অনুভব করতে আমার অসুবিধে হল না। ফোনটা বেজেই চলেছে। গোপীরা অপেক্ষা করছে।

    ফোনের কাছে গিয়ে দু মুহূর্ত আমি দাঁড়ালাম। জামার কাপড়ে হাতের ঘাম মুছে হঠাৎ যেন বেপরোয়া হয়ে ফোনটা ধরে ফেললাম। একটা ফোন ধরতে যে মানষের এতখানি শক্তি লাগে আগে কোনদিন অনুভব করিনি।

    কানের কাছে ফোনটা রাখার পর এ-ঘরের পাখার সেই শব্দটা কানে এল। ওপার থেকে কোনো সাড়া শব্দ নেই।

    “হ্যালো…হ্যালো…” আমার গলায় শব্দ উঠছিল না। চাপা গলায় জড়িয়ে জড়িয়ে বললাম।

    ও পক্ষ থেকে কোনো সাড়া নেই।

    “হ্যালো…হ্যালো…, কে ফোন করছে? কাকে চাই?”

    “আপনাদের—” এবার ওপক্ষ থেকে সাড়া এল। সেই একই গালর স্বর। ছেলেছোকরার গলা, অথচ গম্ভীর। সেই আশ্চর্য প্রশ্ন, কিংবা হেঁয়ালি। এ পক্ষ গম্ভীর অথচ বড় নির্মমভাবে শুধলো, “আপনাদের ডাকছি। …এর পর কী? কোন খেলা? হোয়াট্ নেক্সট্‌?”

    আমি গোপীমোহনের দিকে তাকালাম, সে পাণ্ডুর মুখে বিস্ফারিত চোখে বসে আছে; আমি ফুলেশ্বরের দিকে তাকালাম, তার মাথার চুল ঝোড়ো হয়ে আছে, বুকে হাত বুলোচ্ছে জোরে জোরে, মুখ বিবর্ণ; আমি কেষ্ট গুপ্তর দিকে তাকালাম, কেষ্ট গুপ্ত তার গলা উটপাখির মতন তুলে হাঁ করে শ্বাস টানছে। …আমরা এখানে আসার পর, প্রথমটায় ফোনে আমাদের নামে নামে ডাক পড়েছিল, তারপর ওই একই কথা— একটি মাত্র কথা— ‘এর পর কী ? হোয়াট নেকসট।’

    “তুমি কোথা থেকে কথা বলছ?” আমি বিড়বিড় করে শুধোলাম।

    ফোনের ওপার থেকে কোনো হাসির শব্দ কোনো রকম এলোমেলো কথা ভেসে এল না। কোনো জবাব দিল না কেউ।

    “আমাকে এখানে কে এনেছে ? তুমি?”

    “হ্যাঁ।”

    “তোমায় আমি ঠিক চিনতে পারছি না।”

    ও পাশে আবার নীরবতা।

    “গোপীমোহন, ফুলেশ্বর, কেষ্টদাকে কে এনেছে, তুমি?”

    “আমরা।”

    “তোমরা। তোমরা কে?”

    কোনো জবাব এল না।

    ‘তোমরা কী পান্নার দল?”

    ‘আপনারা কি শুধু পান্নার দলই দেখেছেন?”

    “তাহলে তোমরা কে?”

    “চেনেন না?”

    প্রশ্নটা বড় কঠিন। হয়ত মনে হয়, চিনি; কিন্তু চিনতে পারি না। আমি গোপীমোহনের দিকে তাকালাম। সে কী চেনে না? গোপীমোহনের কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে, রগ দুটো ফুলে আছে, মনে হচ্ছে তার মাথার শিরা বুঝি ছিঁড়ে এল। গোপীমোহন যার সঙ্গে এসেছিল তাকে সে চেনাচেনা মনে করেছিল, অথচ চেনে না। একটা ছেলেই তাকে নিয়ে এসেছিল। ফুলেশ্বরের দিকে তাকালাম। ফুলেশ্বর ব্যাঙের লাফ দেওয়ার মতন করে শ্বাস নিচ্ছে, তার সারা মুখ নীলচে, বুকের ওপর হাত ঘষছে ভীষণ ভাবে। ফুলেশ্বরকে যে নিয়ে এসেছিল সেও একটা ছোকরা, ফুলেশ্বর তার নামধাম জানে না, অথচ নিজের দলের ছেলে বলেই জানে। সত্যি কী ফুলেশ্বর এদের চেনে না? দেখেনি কখনও? কেষ্ট গুপ্ত সোফা থেকে মাটিতে নেমে দাঁড়িয়েছে, দরজার দিকে মুখ করে হাঁ করে শ্বাস টানছে, তার সমস্ত শরীরটা দুলছে কাঁপছে। কেষ্ট গুপ্তও একই ভাবে এসেছে। সে কি এদের চেনে না, দেখে নি কোনোদিন?

    “হ্যালো…হ্যালো…, শোনো তোমরা আমাদের এখানে কেন এনেছ?’ আমি যেন মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

    ও পক্ষ প্রথমে সাড়া দিল না; পরে বলল, যেন সামান্য বিদ্রূপ ছিল গলায়, ‘কে কাকে এনেছে?’

    আচমকা আমার সেই ছেলেটির কথা মনে পড়ল, আমায় যে নিয়ে এসেছে। তামাটে রঙ, রুক্ষ চুল, চোখ মুখ বিবর্ণ, মলিন বেশ দুঃখময় বিষণ্ণ মুখ, অথচ কী নরম। মনে হল, ওই মুখ কত সজীব, সরল, নিষ্পাপ ছিল, কত আশায় ভরে সে এসেছিল। অথচ সেই মুখ আজ কত বিষণ্ণ, ব্যর্থ হতশ্রী। এমন মুখ আমরা কত দেখেছি। অথচ চিনিনি। নামও জানি না। পান্না, বাপ্পা, ভৃগু, লক্ষ্মীকেই আমরা চিনেছি, নাম জেনেছি। আর ওরা? হায় হায়, ওদের তো চেনা হল না।

    গোপীকে হয়ত কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দেখি গোপীমোহন তার চশমাটা নিতে গিয়ে হাত ফসকে মাটিতে ফেলে দিল। শব্দ হল। গোপী মুখ থুবড়ে তার ভাঙা চশমা দেখছিল। ফুলেশ্বর তার হাতটা সামনের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে যন্ত্রণায় যেন কাঁদছিল— বাঁচাও বাঁচাও আমাকে। কেষ্ট গুপ্ত যেন সামনে কারও বুকে ছুরি বিঁধলো দেখে ছুটে পালাতে গিয়ে অন্ধকারে দরজায় ধাক্কা খেয়ে ছিটকে পড়ল। শব্দ হল প্রচণ্ড।

    সেই গুমগুম শব্দটা আশ্বিনের এই রাত্রের বাতাসকে ভয়ংকর ভারী এবং গুমোট করে ঘরে ঢুকছিল। মনে হচ্ছিল, কোন্ এক অন্ধকার থেকে, দূরত্ব থেকে কারা যেন রণবাদ্য বাজাতে বাজাতে এগিয়ে আসছে। আমরা চারটি সন্ত্রস্ত, শঙ্কিত, ভীত, মৃতপ্রায় লুব্ধ প্রবীণ এই ভয়ংকর ফাঁদে আটকা পড়ে প্রাণপণ চেষ্টা করছি শ্বাসপ্রশ্বাস নেবার। আমাদের পরমায়ু ভিক্ষার কী আকুতি!

    ফোনে সেই অচেনা গলার স্বর আবার আমায় ডাকল। বলল, “শুনছেন!”

    আমি নীরব থাকলুম।

    ও পাশ থেকে আবার প্রশ্ন হল, “কিছু বলছেন না? বলুন, হোয়াট্‌ নেক্সট? আপনাদের আর কী খেলা বাকি থাকল?”

    আমি নিরুত্তর। গোপীমোহনরা অসাড়। মনে হল, ফোনটা ওদের কানে কানে তুলে ধরি। এ ডাক তো শুধু আমাকে নয়? গোপীমোহন, ফুলেশ্বর, কেষ্ট গুপ্তকেও।

    আমার হাত এতই ঘেমে গিয়েছিল যে, ফোনটা হাত পিছলে মাটিতে ঠাক্‌ করে পড়ে গেল।

    আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48 49 50 51 52 53 54 55 56
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleখোয়াই – বিমল করভ
    Next Article খড় কুটো – বিমল কর

    Related Articles

    বিমল কর

    কাপালিকরা এখনও আছে – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    রাজবাড়ির ছোরা – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    ঘোড়া সাহেবের কুঠি – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    সেই অদৃশ্য লোকটি – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    শুদ্ধানন্দ প্রেতসিদ্ধ ও কিকিরা – বিমল কর

    October 30, 2025
    বিমল কর

    কিকিরা সমগ্র ১ – বিমল কর

    October 30, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }