Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পদ্মজা – ইলমা বেহরোজ

    ইলমা বেহরোজ এক পাতা গল্প509 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    পদ্মজা – ৩০

    ৩০

    নুরজাহান শক্ত করে পদ্মজার হাত চেপে ধরে ক্ষীণ স্বরে বললেন, ‘ঘরে আহো, পরে কইতাছি।’

    কান্নার শব্দ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। নুরজাহান পদ্মজাকে নিয়ে নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন। আমির চেয়ার টেনে বসার জন্য প্রস্তুত হতেই নুরজাহান হইহই করে উঠলেন, ‘তুই বইতাছস ক্যান?’

    আমির হকচকিয়ে গিয়ে বলল, ‘মানে?’

    ‘বউয়ের ধারে আর থাহন যাইবো না। আইজ কাইলরাত্রি।’

    ‘মুসলমানদের কালরাত্রি পালন করতে নেই। গুনাহগার হবেন,’ বলল পদ্মজা। তার মাথা নত। প্রথম দিন এসেই কথা বলা ঠিক হলো নাকি ভাবছে।

    মুখের ওপর কথা শুনে নুরজাহান কড়া চোখে তাকালেন। পদ্মজা দেখার আগেই, কয়েকের সেকেন্ড মধ্যে চোখের দৃষ্টি শীতল রূপে নিয়ে এলেন। পদ্মজাকে প্রশ্ন করলেন, ‘গেরামের রেওয়াজ ফালাইয়া দেওন যাইব?’

    নুরজাহানের কণ্ঠ স্বাভাবিক। পদ্মজা নির্ভয়ে চোখ তুলে তাকাল। বলল, যা পাপ তা করতে নেই দাদু। জেনেশুনে ভুল রেওয়াজ সারাজীবন টেনে নেওয়া উচিত না। আমার কথা শুনে রাগ করবেন না।’

    তুমি কী আইজ জামাইয়ের লগে থাকতে চাইতাছ?’ নুরজাহানের কণ্ঠ গম্ভীর। এমন প্রশ্নে পদ্মজা লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠে। আমতা আমতা করে বলল, ‘ন…ন…না! তে…তেমন কিছু না।’

    পদ্মজা আড়চোখে আমিরকে দেখে আবার চোখের দৃষ্টি নত করে ফেলল। আমির নুরজাহানকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আমি যাচ্ছি বুড়ি।’ এরপর পদ্মজার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে কোমল কণ্ঠে বিদায় জানাল, ‘আল্লাহ হাফেজ পদ্মবতী।’

    পদ্মজা নতজানু অবস্থায় মাথা নাড়াল। আমির বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। পদ্মজা ধীরে ধীরে মাথা উঁচু করে নুরজাহানকে দেখল।

    ঢোক গিলে বলল, ‘রাগ করেছেন দাদু?’

    নুরজাহান হাসলেন। পদ্মজার এক হাত ধরে বিছানার কাছে নিয়ে বললেন, ‘আমার বইনে তো ঠিক কথাই কইছে। গুসা করতাম কেরে?’

    পদ্মজা স্বস্তির নিশ্বাস নিলো। নুরজাহান বললেন, তুমি বও। আমি লতুরে ভাত দেওনের কথা কইয়া আইতাছি।’

    ‘আমি খেয়েছি দাদু। তখন খাওয়ালেন আম্মা।’

    ‘ব্যাগডা কই? শাড়িডা খুইলা আরেকটা পরো। সিঁদুর রঙেরডা পরবা।’ বলতে বলতে নুরজাহান ব্যাগ থেকে সিঁদুর রঙের শাড়ি বের করে এগিয়ে দিলে, পদ্মজা হাত বাড়িয়ে শাড়িটা নিলো। জানতে চাইল, ‘কোথায় পালটাব?’

    ‘খাড়াও দরজা লাগায়া দেই। ঘরেই পাল্ডাও। আমারে শরমাইয়ো না, বইন। তোমার যা আমারও তা।’

    পদ্মজা শাড়ি হাতে নিয়ে চারপাশে চোখ বুলিয়ে শাড়ি পালটানোর মতো উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে থাকল। পালঙ্কের পেছনে চোখ পড়ায় সেদিকে গিয়ে শাড়ি পালটে নিলো। এরপর নুরজাহানের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, ‘দাদু তখন কাঁদছিল কে?’

    নুরজাহান বিছানায় বসতে বসতে জবাব দিলেন, ‘আমার খলিলের বড়ো ছেড়ার বউ।’

    পদ্মজা দুই কদম এগিয়ে আসে।

    আগ্রহভরে জানতে চায়, ‘কেন কাঁদছিল? উনাকে কি ঘরে আটকে রাখা হয়েছে?’

    ‘বও। আমার ধারে বও।’

    পদ্মজা নুরজাহানের সামনে ঝুঁকে বসে। নুরজাহান বললেন, ‘তোমার চাচা হউরের (শ্বশুর) বড়ো ছেড়ার বউ রুম্পার গত বৈশাখো আচম্বিক মাথা খারাপ হইয়া যায়। এরে-ওরে মারতে আহে। কেউরে চিনে না। নিজের সোয়ামিরেও না। আলমগীর তো এহন ঢাহাত থাহে। আমির তো গেরামে আইছে অনেকদিন হইলো। আলমগীর শহরে আমিরের কামডা করতাছে। এর লাইগগাই তো আলমগীর বিয়াতে আছিল না। রুম্পা তোমার হউরিরে দা নিয়া মারতে গেছিল।

    ‘এজন্য আপনারা ঘরে আটকে রাখেন উনাকে? হুট করে কেন এমন হলেন?’ পদ্মজা আঁতকে উঠে জিজ্ঞাসা করল।

    নুরজাহান এদিক-ওদিক তাকিয়ে কী যেন দেখলেন! এরপর সতর্কতার সঙ্গে ফিসফিসিয়ে বললেন, ‘বাড়ির পিছে বড়ো জঙলা আছে। দোষী জায়গা। ভুলেও ওইহানে যাইয়ো না। রুম্পা শনিবার ভরদুপুরে গেছিল, এর পরেরদিন জ্বর উডে। আর এমন পাগল হইয়া যায়। এগুলো তেনাদের কাজ! রাতে নাম লওন নাই। তুমি মাশাল্লাহ চান্দের টুকরা। ভুলেও ওইদিকে যাইয়ো না। ক্ষতি হইব।’

    নুরজাহানের কথা শুনে পদ্মজার গায়ের পশম দাঁড়িয়ে পড়ে। মনে মনে ভাবে, অবিশ্বাস্য! ভয় পেয়ে কারো মাথা খারাপ হয়ে যায়?

    পদ্মজা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘উনাকে ডাক্তার দেখানো হয়েছে?’

    ‘হ। দেহানি হইছে। শহরে দুইবার লইয়া গেছে। কবিরাজ আইল। কেউই ভালা কইরা দিতে পারে নাই। আইচ্ছা এসব কথা বাদ দেও এহন। এই বাড়িত যহন বউ হইয়া আইছো সবই জানবা। খালি বাইরে কইয়ো না এই খবর। গেরামের কেউ জানে না। রাইত অইছে ঘুমাও।’ নুরজাহান শুতে শুতে বললেন, ‘হুনো জামাইয়ের কাছে কইলাম যাইবা না।’

    ‘না, না…যাব না।’

    ‘বুঝলা বইন, তোমার দাদা হউরে বিয়ার প্রত্তম রাইতে লুকাইয়া আমারে তুইলা নিজের ঘরে লইয়া গেছিল। আদর-সোহাগ কইরা ভোর রাইতে পাড়াইয়া দিছিল। আমি ছুডু আছিলাম। তাই ডরে কইলজা শুকায়া গেছিল।’

    বলতে বলতে নুরজাহান জোরে হেসে উঠলেন। পদ্মজা মৃদু করে হাসে। নুরজাহান ডান দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়েন। পদ্মজা ধীরে ধীরে এক কোণে কাঁচুমাচু হয়ে শুয়ে পড়ে।

    কী অদ্ভুত সব! সাধারণত বিয়ের রাতে নতুন বউরা ঘুমানোর সুযোগ পায় না। জামাইয়ের বাড়ির মানুষেরা সারাক্ষণ ঘেঁষে থাকে। পদ্মজা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। হারিকেনের আগুন নিভু নিভু করে জ্বলছে, নিভে যাবে যেকোনো মুহূর্তে। কেটে গেল অনেকক্ষণ। ঘুম আসছে না। দেহ এক তীব্র অনুভূতিতে ছেয়ে যাচ্ছে। আচমকা পদ্মজা ভ্রু কুঁচকে ফেলে। কান খাড়া করে ভালো করে শোনার চেষ্টা করে। আবার কাঁদছে! রুম্পা মিনমিনিয়ে কাঁদছে। পদ্মজা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, সে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। সঙ্গে সঙ্গে নুরজাহান পদ্মজার দিকে ফেরেন। জানতে চান, ‘ডরাইতাছো?’

    ‘উনি আবার কাঁদছেন।’

    ‘সারাবেলাই কান্দে। এইসবে কান দিয়ো না। ঘুমাইয়া পড়ো।’

    পদ্মজা উসখুস করতে করতে শুয়ে পড়ল, নিভে গেল হারিকেন। নুরজাহান নাক ডাকছেন, ঘুমিয়ে পড়েছেন। নাক ডাকার তীব্রতা অনেক, যা পদ্মজার বিরক্তি বাড়িয়ে তুলছে। পদ্মজা ঘুমানোর চেষ্টা করল, হাজার ভাবনার ভিড়ে একসময় ঘুমিয়েও পড়ল। শেষ রাতে ঘুমের ঘোরে অনুভব করল, হাঁটুতে কারো হাতের ছোঁয়া। পদ্মজা চটজলদি চোখ খুলে ফেলল। মুখের সামনে কেউ ঝুঁকে রয়েছে। পদ্মজা ধড়ফড়িয়ে উঠে চিৎকার করে উঠল, ‘কে?’

    সঙ্গে সঙ্গে পুরুষ অবয়বটি ছুটে বেরিয়ে যায়। পদ্মজার শরীর কাঁপছে, শরীর বেয়ে ছুটছে ঘাম। ভয়ে ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।

    সে নুরজাহানকে ভয়ার্ত স্বরে ডাকল, ‘দাদু… দাদু।’

    নুরজাহান একটু নড়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লেন। পদ্মজা আর ডাকল না। সে ঘন ঘন নিশ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল, চোখের দৃষ্টি দরজার বাইরে। দরজা তো লাগানো ছিল। বাইরে থেকে কেউ কীভাবে ঢুকল? নাকি এর মাঝে দাদু টয়লেটে গিয়েছিলেন? পদ্মজার বুক হাঁপড়ের মতো ওঠানামা করছে। সে জিহ্বা দিয়ে শুকনা ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো। একটু ভয় ভয় করছে। কে এসেছিল! এভাবে গায়ে হাত দিচ্ছিল কেন?

    পদ্মজা চোখ-মুখ খিঁচে ছি বলে আগন্তুকের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে। বাকি রাতটুকু আর ঘুম হলো না তার। ভয়টা কমেছে। এই জায়গায় পূর্ণা থাকলে হয়তো পুরো বাড়ি চেঁচিয়ে মাথায় তুলে ফেলত। পদ্মজা মনে মনে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে, এরকম ঘটনা পূর্ণার জীবনে যেন না আসে। একদম গুঁড়িয়ে যাবে। উঠে দাঁড়াতে পারবে না। পূর্ণার কথা মনে পড়তেই পদ্মজার বুকটা হু হু করে উঠল। ভীষণ কান্না পাচ্ছে। অন্যদিন পাশে পূর্ণা থাকে। আজ নেই!

    ফজরের আজান পড়তেই নুরজাহান চোখ খুললেন। বিছানা থেকে নেমে দেখেন, পদ্মজা জায়নামাজে দাঁড়িয়েছে মাত্র। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘ওজু করলা কই?’

    ‘কলপাড়ে।’

    ‘চিনছো কেমনে?’

    পদ্মজা হাসল। বলল, ‘খুঁজে বের করেছি।’

    নুরজাহান চোখ-মুখ শক্ত করে বললেন, ‘নতুন বউ রাইতের বেলা একলা ঘুরাঘুরি কইরা কল খোঁজার কী দরকার আছিল? আমারে ডাকতে পারতা।’

    পদ্মজার মাথা নত করে অপরাধী স্বরে বলল, ‘ক্ষমা করবেন, দাদু।’

    ‘কি কাল আইল। আইচ্ছা, পড়ো এহন। নামাজ পড়ো।’

    নুরজাহান অসন্তুষ্ট ভাব নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।

    পদ্মজার দুই চোখ ছলছল করে উঠে। যখন টের পেল এখুনি কেঁদে দিবে, দ্রুত ডান হাতের উলটোপাশ দিয়ে চোখের জল মুছে ফেলল।

    .

    পদ্মজাকে কাতান শাড়ি পরানো হয়েছে। বউভাতের অনুষ্ঠান চলছে। সে এক বিশাল আয়োজন। বিয়ের চেয়েও বড়ো করে বউভাতের অনুষ্ঠান হচ্ছে। অলন্দপুরের বাইরে থেকেও মানুষ আসছে পদ্মজাকে দেখার জন্য। আটপাড়ার প্রতিটি ঘরের মানুষ তো আছেই। পদ্মজার চারপাশে মানুষ গিজগিজ করছে। রাতে ঘুম হয়নি। পরনে ভারি শাড়ি-গহনা। এত মানুষ চারিদিকে। সব মিলিয়ে পদ্মজার নাজেহাল অবস্থা। মাথা নত করে বসে আছে সে।

    ‘আপা।’

    পূর্ণার কণ্ঠ শুনে মুহূর্তে পদ্মজার ক্লান্তি উড়ে গেল, চোখ তুলে তাকাল চকিতে। পূর্ণা-প্রেমা-প্রান্ত ঝাঁপিয়ে পড়ল পদ্মজার ওপর। পূর্ণা আওয়াজ করে কেঁদে উঠে বলল, ‘রাতে আমার ঘুম হয়নি আপা।

    পদ্মজার গলা জ্বলছে। প্রেমা-পূর্ণা-প্রান্তকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে চাপা কণ্ঠে বলল, ‘আমারো ঘুম হয়নি বোন।’

    ‘আপা, বাড়ি চল।’

    পেছন থেকে লাবণ্য বলল, ‘কাইল যাইব। আইজ না। এহন পদ্মজা আমরার বাড়ির ছেড়ি।’

    সে পদ্মজার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। পূর্ণা রাগ নিয়ে বলল, ‘আমার বোন আমি নিয়ে যাব।’

    ‘আমাদের আপা আমরা নিয়ে যেতে এসেছি।’ বলল প্রান্ত।

    রানি প্রান্তর কান টেনে ধরে বলল, ‘পেকে গেছিস তাই না?’

    ‘উ! ছাড়ো, রানি আপা। ব্যথা পাচ্ছি।’

    ‘ওরেম্মা! তুই শুদ্ধ ভাষাও কইতে পারস?’

    রানি অবাক হয়ে জানতে চাইল।

    প্রান্ত অভিজ্ঞদের মতো হেসে ইংরেজিতে বলল, ‘ইয়েস।’

    যারা যারা প্রান্তকে চিনে সবার চোখ কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইল। প্রান্ত ইংরেজি বলেনি, যেন মাত্রই এখানে বজ্রপাত ঘটাল। রানি চোখেমুখে বিস্ময়ভাব রেখে বলল, ‘এইটা মুন্না না অন্য কেউ।

    ‘আমি মুন্না না আমি প্রান্ত, প্রান্ত মোড়ল।’ প্রান্তের বলার ভঙ্গী দেখে সবাই হেসে উঠল। পদ্মজা হাসতে হাসতে রানিকে বলল, ‘প্রান্ত অনেকগুলো ইংরেজি শব্দ শিখেছে।’

    ‘বউ মানুষ কেমনে দাঁত বাইর কইরা হাসতাছে দেখছ? বেহায়া বউছেড়া।’ কথাটি দরজার পাশ থেকে কেউ বলল। অন্য কেউ শুনতে না পেলেও পদ্মজা শুনতে পেল। সে সেদিকে তাকাল। অল্পবয়সি দুজন মহিলা এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পদ্মজাকে চোখ দিয়ে গিলে খাবে। তাদের উদ্দেশ্যে কেবল হাসল পদ্মজা।

    পদ্মজার হাসি দেখে থতমত খেয়ে গেল মহিলা দুজন। একে-অন্যেও দিকে চাওয়াচাওয়ি করে, আবার পদ্মজার দিকে তাকাল। পদ্মজা ততক্ষণে চোখ সরিয়ে নিয়েছে।

    অতিথি আপ্যায়ন চলছে ধুমধামে। রমিজ আলী, কামরুল, রজব সবাই উপস্থিত হয়েছে। খাওয়া শেষে তারা আড্ডা শুরু করে।

    রমিজ বললেন, ‘মনজুর ছেড়া, জলিল, ছইদ এরা কি আইছে?’

    কামরুল দাঁতের ফাঁক থেকে যত্ন করে গরু মাংস বের করে উত্তর দিলেন, ‘না আহে নাই। হেদিন ছইদের বাপে আমার কাছে গেছিল।’

    ‘কেরে গেছিল?’

    ‘ছইদরে যাতে মাতব্বরের হাত থাইকা বাঁচায়া দেই।’

    ‘হেরা এহন কই আছে?’

    ‘আছে কোনহানে। কয়দিন পরপরই তো উধাও হইয়া যায়। এহনের ছেড়াদের দায়-দায়িত্ব নাই বুঝলা। আমার যহন দশ বছর তহন খেতে কাজ করতে যাইতাম।’

    কামরুলের কথা উপেক্ষা করে রমিজ অন্য প্রসঙ্গ তুললেন, ‘ক্ষমতা যার বেশি হের সুখ বেশি। আমার মাইয়াডা নির্দোষ আছিল। তবুও কেমনডা করছিল সবাই? আইজ মাতব্বরের ছেড়া বলে কিছুই হইল না। বদলা আমরা বিয়া খাইতে আইছি।’

    রমিজের অসহায় মুখখানা দেখে কামরুল, রজব, মালেক হো হো করে হেসে উঠলেন। রমিজের দৃষ্টি অস্থির। পেট ভরে খাওয়ার লোভে এসেছে সে, নয়তো আসার এক ফোঁটাও ইচ্ছে ছিল না।

    .

    পদ্মজা কিছুতেই খেতে পারছে না। অথচ পেট চোঁ চোঁ করছে ক্ষুধায়। চোখের সামনে এত মানুষ থাকলে কী খাওয়া যায়? পূর্ণা ব্যাপারটা ধরতে পেরে লাবণ্যকে বলল। লাবণ্য সবাইকে বেরিয়ে যেতে বলল বটে, তবে কেউই তার কথা গ্রাহ্য করল না। তাই সে ফরিনা বেগমকে নিয়ে এলো। ফরিনা বেগম সবাইকে বের করে, দরজা ভিজিয়ে দিয়ে যান।

    ঘরে শুধু রানি, লাবণ্য, পদ্মজা, প্রেমা, পূর্ণা এবং প্রান্ত। খাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো পদ্মজা।

    পূর্ণা উচ্ছ্বাস নিয়ে বলল, ‘আপা আমি খাইয়ে দেই?’

    পদ্মজা মায়াময় দৃষ্টি নিয়ে তাকাল। ঠোঁটে ফুটে মিষ্টি হাসি। পূৰ্ণা অনুমতির অপেক্ষা না করে বাড়িয়ে দিল এক লোকমা ভাত। ছলছল করে উঠল পদ্মজার দুই চোখ। পূর্ণা কখনো খাইয়ে দেয়নি। এই প্রথম খাওয়াতে চাইছে। হাঁ করল পদ্মজা। লাবণ্য হেসে বলল, ‘আমার এমন একটা বইন যদি ত

    ‘আমি তোর বইন না?’ বলল রানি।

    লাবণ্য চোখ-মুখ শক্ত করে বলল, ‘জীবনে খাইয়ে দিছস? আবার বইন কইতে আইছস যে।’

    ‘তুই খাইয়ে দিছস? পূর্ণা তো ছুটু। তুইও তো ছুটু।’

    ‘আগে পদ্মজা খাওয়াইছে। এরপর পূর্ণা।’

    ‘আইচ্ছা ভাত লইয়া আয়। খাওয়াই দিমু।’ রানি বলল।

    ‘এহন পেট ভরা।’

    ‘হ, এহন তো তোর পেট, নাক, মাথা সবই ভরা থাকব।’

    দুই বোনের ঝগড়া দেখে পূর্ণা, পদ্মজা হাসল। কী মিষ্টি দুজন। ঝগড়াতেও ভালোবাসা রয়েছে। লাবণ্যের চেয়ে রানি বেশি সুন্দর। তবে লাবণ্যকে দেখলে বেশি মায়া লাগে। লাবণ্য যে রাগী দেখলেই বোঝা যায়। গতকাল কী রাগটাই না দেখাল! ঘরে ঢুকল আমির। আমিরকে দেখেই পদ্মজা সংকুচিত হয়ে গেল। রানি প্রশ্ন করল, ‘এইহানে কী দাভাই?’

    ‘পদ্মজাকে নিয়ে যেতে হবে। ওহ খাচ্ছে। আচ্ছা, খাওয়া শেষ হলে নিয়ে যাব।’ বলতে বলতে আমির পদ্মজার সামনে বসল। লাবণ্য জিজ্ঞাসা করল, ‘কই নিয়ে যাবা?’

    ‘আম্মার ঘরে।’

    ‘কেন?’

    ‘আম্মা বলছে নিয়ে যেতে।’

    ‘আম্মা একটু আগেই দেইখা গেল।’

    আমির হকচকিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, ‘ওহ তাই নাকি?’ রানি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমিরকে পরখ করে নিয়ে বলল, ‘দাভাই, মিথ্যে বলছ কেন?’

    ‘মি…মিথ্যে আমি? অসম্ভব। আম্মা না দাদু বলছে নিয়ে যেতে। এই তোরা যা তো। তোদের বান্ধবিরা আসছে। যা। হুদাই ঘ্যানঘ্যান শুরু করেছিস।’

    লাবণ্য কথা বাড়াতে চাচ্ছিল। রানি টেনে নিয়ে যায়। প্রেমা-প্ৰান্তও বেরিয়ে যায়। তারা বাড়ি থেকে পরিকল্পনা করে এসেছে, একসঙ্গে পুরো হাওলাদার বাড়ি ঘুরে দেখবে। পূর্ণা খাইয়ে দিচ্ছে। পদ্মজা আমিরের উপস্থিতিতে বিব্রত হয়ে উঠেছে। খাবার চিবোতে পারছে না। আমির পদ্মজাকে বলল, ‘বড়ো ভাবি বলল রাতে নাকি ঘুমাওনি।

    ‘না… হ্যাঁ। আসলে ঘুম আসেনি।’

    ‘ঘুমাবে এখন?’

    ‘না, না। কী বলছেন? বাড়ি ভরতি মানুষ।’

    আমিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল পদ্মজা। আমিরের পলকহীন দৃষ্টি দেখে চোখ নামিয়ে নিলো।

    আমির বলল, ‘আচ্ছা খাও। আমি আসছি।’

    ‘আপনি কি রাতে দাদুর ঘরে এসেছিলেন?’

    আমির চলে যাওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছিল। এই কথা শুনে চমকে তাকাল পদ্মজার দিকে ঝুঁকে জানতে চাইল, ‘কেন? কেউ কি তোমার ঘরে এসেছিল?’

    আমিরের এমন ছটফটানি দেখে পদ্মজা খুব অবাক হলো। সে অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘হ্যাঁ, এসেছিল। শেষ রাতে।’

    ‘আচ্ছা,’ বলেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেল আমির। পদ্মজা পেছনে ডাকল, শুনল না আমির। হুট করে লোকটার পরিবর্তন পদ্মজাকে ভাবাতে লাগল।

    ৩১

    পদ্মজাকে নতুন করে পুনরায় সাজানো হয়েছে। বাসর রাত নিয়েও হাওলাদার বাড়ির হাজারটা রীতি। সেসব পালিত হচ্ছে। পদ্মজা নিয়ম-রীতি পূরণ করছে ঠিকই, তবে মন অন্য জায়গায়। বিকেলে সে দেখেছে, আমির রিদওয়ানের পাঞ্জাবির কলার দুই হাতে ধরে কিছু বলছে। খুব রেগে ছিল। তবে কি রিদওয়ানই এসেছিল রাতে?

    ‘ও বউ উডো। এহন ঘরে গিয়া খালি দুইজনে মিললা দুই রাকাত নফল নামাজ পইড়া লইবা। আনিসা যাও লইয়া যাও। দিয়া আও ঘরে,’ বললেন ফরিনা। পদ্মজা কল্পনার জগত থেকে বেরিয়ে বাস্তবে ফিরে আসে। খলিল হাওলাদারের দুই মেয়ে শাহানা, শিরিন এবং আনিসা পদ্মজাকে নিয়ে দ্বিতীয় তলায় ওঠে। আমিরের ঘরে ঢুকতে আর কয়েক কদম বাকি। পদ্মজা ঘোমটার আড়াল থেকে চোখ তুলে তাকাল। দরজা গোলাপ ফুল দিয়ে সাজানো, টকটকে লাল গোলাপ; হাওলাদার বাড়ির গোলাপ বাগান অলন্দপুরে খুবই জনপ্রিয়। পদ্মজার শুভ্র, শীতল অনুভূতি হয়। ঘরে ঢুকতেই তাজা গোলাপ ফুলের ঘ্রাণে শরীর-মন অবশ হয়ে আসে।

    শুধু বিছানা নয়, পুরো ঘর লাল গোলাপ দিয়ে সাজানো।

    শাহানা পদ্মজাকে বিছানায় বসিয়ে দিল। এরপর বলল, ‘ডরাইবা না। রাইতটা উপভোগ করবা। এমন রাইত জীবনে একবারই আহে।’

    পদ্মজার লজ্জায় মরিমরি অবস্থা! সারা দেহ থেকে যেন গরম ধোঁয়া বের হচ্ছে। আনিসা সবকিছু ঘুরে ঘুরে দেখছে। একসময় বলল, ‘আমার বাসর রাতটাও হুবুহু এই রকম ছিল। চারিদিকে গোলাপের ঘ্রাণ। ফুলের ঘ্রাণে ভালোবাসা আরো জমে উঠেছিল।’

    ‘এই বাড়ির বউদেরই কপাল। আমরা এই বাড়ির ছেড়ি হইয়াও জামাইর বাড়িত গিয়া কাগজের ফুলের বাসর পাইছি,’ বলল শিরিন।

    আনিসা দেমাগি স্বরে বলল, ‘এসব পেতে যোগ্যতা লাগে। যোগ্যতা ছাড়া ভালো কিছু পাওয়া যায় না। আমি উচ্চশিক্ষিত এবং সুন্দরী ছিলাম। ভালো কিছু পাওয়ার যোগ্য ছিলাম তাই পেয়েছি। আর পদ্মজা যথেষ্ট সুন্দরী, গ্রামে থেকেও পড়ালেখায় খুব ভালো। তাই সেও যোগ্য। তোমাদের না আছে পড়াশোনা না আছে কোনো ভালো গুণ। গায়ের রঙও ময়লা। কাগজের ফুলই তোমাদের জন্য ঠিক ছিল।’

    আনিসার কথাগুলো শুনতে পদ্মজার খুব খারাপ লাগে। কোনো মানুষকে এভাবে বলা ঠিক নয়। শিরিন হইহই করে উঠল, ‘এই রূপ বেশিদিন থাকব না ভাবি। এত দেমাগ ভালা না। বিয়ার এতদিন হইছে একটাও বাচ্চা দিতে পারছ? পারো নাই। তাইলে এই গরিমা দিয়া কী হইব? সন্তান ছাড়া নারীর শোভা নাই।’

    আনিসা রেগেমেগে ফুঁসে উঠে গলা উঁচু করে বলল, ‘সমস্যা আমার নাকি তোমাদের পেয়ারের ভাইয়ের সেটা খোঁজ নাও আগে। আমি এখনই জাফরকে সব বলছি। এতদিন পর বাড়িতে এসেছি এসব নোংরা কথা সহ্য করতে? অপমান সহ্য করতে? কালই চলে যাব আমি।’

    আনিসা রাগে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে যায়। পদ্মজা হতবাক। শাহানা শিরিনকে ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘এত কিছু কেন কইতে গেলি? জানস না, এই ছেড়ি কেমন? আমি হের বড়ো হইয়াও হেরে কিছু কই না। এহন আরেক ভেজাল হইব।’

    ‘যা হওয়ার হইয়া যাক। আমরারে কেমনে পায়ে ঠেলতাছিল দেহো নাই? এইডা তো আমরার বাপের বাড়ি। এত কথা কেন হুনতে হইব?’ শিরিনের কণ্ঠ কঠিন। সে আজ এর শেষ দেখেই ছাড়বে।

    ‘নতুন বউডার সামনে এমনডা না করলেও হইত! ও পদ্ম তুমি বেজার হইয়ো না। এরা সবসময় এমনেই লাইগা থাহে।’

    পদ্মজা হাসার চেষ্টা করে। শাহানা দরজার বাইরে তাকিয়ে দেখে আমির আসছে কি না! রাত তো কম হলো না। শাহানা আরো অনেকক্ষণ সময় নিয়ে পদ্মজাকে বুঝাল, কী কী করতে হবে, কীভাবে স্বামীকে আঁচলে বেঁধে রাখতে হয়।

    পদ্মজা সব মনোযোগ সহকারে শুনে নিলো।

    আমির ঘরে ঢুকতেই শাহানা-শিরিন বেরিয়ে গেল। দরজা লাগিয়ে পালঙ্কের পাশে এসে দাঁড়াল আমির। পদ্মজা পালঙ্ক থেকে নেমে আমিরের পা ছুঁয়ে সালাম করে, আমির দুই হাতে পদ্মজাকে আঁকড়ে ধরে দাঁড় করায়। অনুভব করে—পদ্মজা কাঁপছে; প্রচণ্ড শীতে মানুষ যেভাবে কাঁপে, ঠিক সেভাবে। আমির দ্রুত ছেড়ে দিল তাকে। বলল, ‘পানি খাবে?’

    পদ্মজা মাথা নাড়িয়ে জানাল, খাবে। আমির এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিল। এক নিশ্বাসে ঢকঢক করে পানি শেষ করল পদ্মজা। সারা শরীর কাঁপছে। শাহানা, শিরিন বের হতেই বুকে হাতুড়ি পেটা শুরু হয়েছে। ঘরে চারটা হারিকেন জ্বালানো। যেদিকে চোখ যায় সেখানেই গোলাপ ফুল। ফুলের ঘ্রাণে চারিদিক মউ মউ করছে। এমন পরিবেশে বিয়ের প্রথম রাতে পরপুরুষকে স্বামী রূপে দেখা কোনো সহজ অনুভূতি নয়। আমির গ্লাস নিতে এগিয়ে আসলে পদ্মজা আঁতকে উঠে এক কদম পিছিয়ে গেল। তা দেখে আমির একটু শব্দ করেই হাসল। ভীতু ভীতু চোখে সেদিকে তাকাল পদ্মজা। আমির বলল, ‘হাতে গ্লাস নিয়ে সারারাত কাটাবে নাকি? দাও আমার কাছে।

    গ্লাসটি পদ্মজার হাত থেকে নিয়ে টেবিলের ওপর রেখে এলো আমির। পদ্মজা পালঙ্কের এক কোণে চুপটি করে বসে আছে, অনবরত কাঁপছে তার ডান পা। মনে মনে দোয়া করছে—মাটি যেন ফাঁক হয়ে যায়। আর সে তার ভেতর ঝাঁপ দিয়ে পাতালে হারিয়ে যেতে চায়। নয়তো লজ্জা, আড়ষ্টতায় প্রাণ এখনি গেল বুঝি! আমির দূরত্ব রেখে পদ্মজার সোজাসুজি বসে। পদ্মজার এক পা যে কাঁপছে সেটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। তার দৃষ্টিও অস্থির। বার বার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আমির মজা করে জানতে চাইল, ‘পালানোর পথ খুঁজছো নাকি?’

    ‘না…না তো,’ বলল পদ্মজা।

    ‘তাহলে কী খুঁজছ?’

    পদ্মজা নিরুত্তর রইল। আমির পদ্মজার আরো কাছে এসে বসে। পদ্মজার এক হাত ছুঁতেই ‘ও মাগো!’ বলে চিৎকার করে ওঠে। আমির পদ্মজার আকস্মিক চিৎকারে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। ভয়ে ঢোক গিলল পদ্মজা, সময়টা যাচ্ছেই না। সে যদি পারত পালিয়ে যেতে…চারিদিকে ভয়ংকর অনুভূতিদের খেলা! আমির হাঁ করে পদ্মজার দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল, এরপর দূরে সরে বসে পদ্মজাকে বলল, ‘আমার সঙ্গে সহজ হওয়ার চেষ্টা করো। আমার দিকে ফিরে বসো। গল্প করি।’

    পদ্মজা আমিরের দিকে ফিরে বসল, দৃষ্টি বিছানার চাদরে নিবদ্ধ।

    আমির প্রশ্ন করল, ‘আমার সম্পর্কে কতটুকু জানো?’

    ‘খুব কম,’ মিনমিনিয়ে বলল পদ্মজা।

    ‘আমি তোমার চেয়ে বারো বছরের বড়ো। জানো?’

    ‘এখন জানলাম। তবে আপনার আচরণ ছোটোদের মতো।’ পদ্মজা মৃদু হেসে আমিরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল। আমির বলল, ‘আমার চরিত্রের আরো বৈশিষ্ট্য আছে।’

    ‘বুঝতে পেরেছি। আপনার কথাবার্তা এখন বড়োদের মতো মনে হচ্ছে। ‘ঢাকা আমার ব্যাবসা আছে।’

    ‘শুনেছি।’

    ‘আমার সঙ্গে তোমাকেও ঢাকা যেতে হবে।’

    ‘আচ্ছা।’

    ‘এই বাড়ির চেয়েও বিশাল বড়ো বাড়িতে আমি একা থাকি। যতক্ষণ বাইরে থাকব তোমাকে একা থাকতে হবে। ভয় পাওয়া যাবে না।’

    ‘আমি ভয় পাই না।’

    ‘আমাকে তো ভয় পাচ্ছো।’ আমির হেসে বলল। পদ্মজা নিরুত্তর। ‘কথা বলো।’

    ‘কী বলব?’

    ‘আচ্ছা, আসো একটা মজার খেলা খেলি।’

    পদ্মজা উৎসুক হয়ে তাকাল। আমির বলল, ‘দুজন দুজনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকব। যার চোখের পলক আগে পড়বে সে হেরে যাবে।’

    পদ্মজা খেলতে রাজি। এই খেলাটা সে পূর্ণার সঙ্গেও খেলেছে। পদ্মজা অনেকক্ষণ এক ধ্যানে তাকিয়ে থাকতে পারে। তাই তার আত্মবিশ্বাস আছে, সেই জিতবে। বরাবরই জিতে এসেছে। আমির এক-দুই-তিন বলে খেলা শুরু করে দিল। একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে রইল একধ্যানে। পদ্মজা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আমিরকে পরখ করে। আমিরের চুল খাড়া করে উলটো দিকে আছড়ে রাখা, থুতনির নিচে কাটা দাগ। গালে হালকা দাড়ি, শ্যামলা গায়ের রং। ঘন ভ্রু, চোখের পাঁপড়ি। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। এত বেশি ভালো লাগছে দেখতে। আমির পদ্মজার রূপে আগে থেকেই দিওয়ানা। তার ওপর এতক্ষণ তাকিয়ে থেকে অনুভূতির দফারফা অবস্থা। সে মুগ্ধ হওয়া কণ্ঠে বলল, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নারী আমার বউ। কী ভাগ্য আমার!’

    ‘আপনিও সুন্দর,’ কথাটা মুখ ফসকে বলে উঠল পদ্মজা। যখন বুঝতে পারল লজ্জায় মাথা নত করে ফেলল। আমির খুশিতে বাকবাকুম হয়ে বলল, ‘তোমার পলক পড়েছে। আমি জিতে গেছি।’

    পদ্মজা লজ্জায় নখ খুঁটতে থাকে। আমির নিজের চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলল, ‘আমি জানি আমি কতটা সুন্দর! রংটা একটু কালো হতে পারে। তবে আমি সুন্দর। তোমার মুখে শোনার পর থেকে ধরে নিলাম, পৃথিবীর সেরা সুন্দর পুরুষের নাম আমির হাওলাদার।’

    পদ্মজার দুই ঠোঁট নিজেদের শক্তিতে আলগা হয়ে গেল। সে আমিরের দিকে তাকিয়ে ভাবছে, মানুষ এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের প্রশংসা নিজে কীভাবে করতে পারে? আমিরের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, সে সত্যিই পৃথিবীর সেরা সুন্দর পুরুষ। পদ্মজা ফিক করে হেসে দিল। আমির তাকাল। বলল, ‘হাসছো কেন?’

    পদ্মজা হাসি চেপে বলল, ‘কোথায়? না তো। আপনার আম্মা বলেছিলেন, দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করতে।’

    ‘আমার আম্মা তোমার আম্মা না?’

    ‘হুম।’

    ‘এখন থেকে আপনার আম্মা না শুধু আম্মা বলবে। গয়নাগাটি নিয়েই নামাজ পড়বে? অস্বস্তি হবে না? খোলো এবার।’

    পদ্মজা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘শিরিন আপা বললেন, গয়নাগাটি নাকি স্বামি খুলে দেয়। তাহলে?’

    আমির তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে বলল, ‘তাই নাকি? দাও খুলে দেই।’

    পদ্মজা দ্রুত দৃষ্টি অন্যদিকে ফিরিয়ে নিয়ে আমতা আমতা করে বলল, ‘এ…এটা বোধহয় নিয়ম না। তাই আপনি জানতেন না। আমি…আমি পারব।’

    দুই রাকাত নফল নামাজের সঙ্গে তাহাজ্জুদের নামাজও আদায় করে নিয়েছে দুজন। আমির তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম জানে না। পদ্মজা হাতে কলমে শিখিয়েছে। আমিরও মন দিয়ে শিখেছে এবং নামাজ পড়েছে। এরপর পদ্মজা জানালার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

    জানালার সামনে বিশাল বড়ো জঙ্গল। সে আমিরকে প্রশ্ন করল, ‘এই জঙ্গলে নাকি কী একটা আছে?’

    আমির পদ্মজার প্রশ্ন শোনেনি। সে পেছন থেকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে নিজের বধূর দিকে। পদ্মজার গায়ে কোনো অলংকার নেই। খোলা চুল কোমর অবধি এসে থেমেছে। মধ্য রাতের বাতাসে তার চুল মৃদু দুলছে। আমির অনুভূতিকে প্রশ্রয় দিল। পদ্মজার কোমর পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল দুই হাতে, পদ্মজার কেঁপে ওঠে বড়ো করে নেয়া নিশ্বাস অনুভব করে গভীরভাবে। পদ্মজার হৃৎপিণ্ড থমকে গেল, শিরশির করে উঠল পায়ের তলার মাটি। তবে, অদ্ভুত বিষয় হলো…শুরুর মতো আমিরের স্পর্শ অস্বস্তি দিচ্ছে না তাকে। বরং ধারাল কোনো অজানা অনুভূতিতে তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমির পদ্মজার ঘাড়ে থুতনি রেখে বলল, ‘প্রথম যেদিন তোমাকে দেখি সেদিনই মনে মনে পণ করি তোমাকেই বিয়ে করব। তবে ভাবিনি প্রথম দিনই আমার কারণে এতটা অপদস্থ হতে হবে তোমাকে। অনেক চেষ্টা করেছি সব আটকানোর, পারিনি। সেদিনই বাড়ি ফিরে আব্বাকে বলি, আমি বিয়ে করতে চাই পদ্মজাকে। প্রথম প্রথম কেউ রাজি হচ্ছিল না। পরে রাজি হয়ে যায়। মনে হচ্ছে, চোখের পলকে তোমাকে পেয়ে গেছি।’

    পদ্মজা নিশ্চুপ। ভাবছে—অবাধ্য, অজানা অনুভূতিদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে…নাকি সখ্যতা করবে? আমির পদ্মজাকে ঘুরিয়ে নিজের দিকে ফেরাল। মেয়েটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। আমির বলল, ‘তোমায় আমি পদ্ম ফুল দিয়ে একদিন সাজাব। নিজের হাতে।

    পদ্মজা কিছুই যেন শুনছে না। সে কাঁপছে। আমির বলল, ‘কথা বলো। আল্লাহ, আবার কাঁপছো! আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরো, স্থির হতে পারবে। এই কী হলো?’

    পদ্মজা শরীরের ভার ছেড়ে দিয়েছে আমিরের ওপর। আমির দুই হাতে শক্ত করে ধরে রাখে তাকে। সেদিন রাতে জান্নাতের সুবাস এসেছিল ঘরে। পদ্মজা নিজের অস্তিত্বের পুরো অংশ জুড়ে স্বামীরূপে একজন পুরুষকে অনুভব করে। ভালোবাসাটা শুরু হয় সেখান থেকেই। মন মাতানো ছন্দ এবং সুর দিয়ে শুরু হয় জীবনের প্রথম প্রেম…

    …প্রথম ভালোবাসা।

    ৩২

    সকাল থেকে বাতাস বইছে। কাছাকাছি কোথাও বৃষ্টি হয়ে গেছে, এমন আমেজ সেই বাতাসে। একটু শীতল চারপাশ। গরু গাড়ি চড়ে পদ্মজা যাচ্ছে বাপের বাড়ি। পাশে আছে আমির এবং লাবণ্য। পদ্মজার পরনে সবুজ শাড়ি, ভারি সুতার কাজ; গা ভরতি গহনা। এসব পরে থাকতে অস্বস্তি হচ্ছে। ফরিনা বেগমের কড়া নিষেধ, কিছুতেই গহনা খোলা যাবে না। আমির পদ্মজার এক হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে, ছেড়ে দিলেই যেন হারিয়ে যাবে। আমিরের এহেন পাগলামি পদ্মজাকে বেশ আনন্দ দিচ্ছে।

    সে চাপা স্বরে বলল, ‘কোথাও চলে যাচ্ছি না, আস্তে ধরুন।’

    আমির নরম স্পর্শে পদ্মজার হাত ধরল। পদ্মজা বলল, ‘মনে আছে তো কী বলেছিলাম?’

    ‘কী?’

    সঙ্গে সঙ্গে পদ্মজা হায় হায় করে উঠল, ‘ও মা! ভুলে গেছেন?’

    আমির শূন্যে তাকিয়ে মনে করার চেষ্টা করল। সকালে ঘুম ভাঙার পর দেখে ছিল পদ্মজা নতুন শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে। আমির মিষ্টি করে হেসে ডেকেছিল, ‘এদিকে আসো।’

    পদ্মজা ছোটো ছোটো করে পা ফেলে আমিরের পাশে দাঁড়াল। আমির খপ করে পদ্মজার হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘কখন উঠেছ?’

    ‘যেভাবে টান দিলেন। ভয় পেয়েছি তো।’

    ‘এত ভীতু?’

    ‘কখনোই না।

    ‘তা অবশ্য ঠিক।’

    ‘উঠুন। আম্মা আপনাকে ডেকে নিয়ে যেতে বলেছেন।’

    ‘কেন? জরুরি দরকার নাকি?’

    ‘আমি জানি না। উঠুন আপনি।’

    ‘এই তুমি তো কম লজ্জা পাচ্ছো।’

    পদ্মজার মুখ লাল হয়ে উঠে। সে বিছানা থেকে দূরে সরে দাঁড়াল। মাথা নত করে বলল, ‘আপনি লজ্জা দিতে খুব ভালোবাসেন।’

    আমির হাসতে হাসতে বিছানা থেকে নামল। বলল, ‘তোমার চেয়ে কম ভালোবাসি। আচ্ছা, তুমি কবে ভালোবাসবে বলো তো?’

    পদ্মজা পূর্ণ-দৃষ্টিতে আমিরকে দেখল। আমির আবার হাসল। পদ্মজার দিকে এগিয়ে এসে বলল, ‘যেদিন মনে হবে তুমিও আমাকে ভালোবাসো, বলবে কিন্তু। সেদিনটা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় হবে।’

    পদ্মজা তখনো একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। আমির হাত নাড়িয়ে পদ্মজার পলক অস্থির করে বলল, ‘কী ভাবছো?’

    ‘কিছু না।’

    ‘কিছু বলবে?’

    ‘আমরা আজ ওই বাড়ি যাব।’

    ‘এটাই তো নিয়ম।’

    ‘আপনি একটু বেশরম।’

    আমির আড়চোখে তাকাল। পদ্মজা ঠোঁট টিপে হেসে দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। আমির আমতা আমতা করে বলল, ‘তা..তাতে কী হয়েছে?’

    ‘কিছু না।’

    ‘কী বলতে চাও, বলো তো।’

    ‘বড়োদের সামনে আমাকে নিয়ে এত কথা বলবেন না। মানুষ কানাকানি করে। আপনাকে বেলাজা, বেশরম বলে। শুনতে ভালো লাগে না আমার।’

    ‘আমার বউ নিয়ে আমি কী করব, আমার ব্যাপার।

    ‘কিন্তু আমাকে অস্বস্তি দেয়।’ পদ্মজা করুণ স্বরে বলল।

    আমির নিভল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করব।’

    সত্যি? আমার আম্মার সামনে ভুলেও পদ্মজা, পদ্মজা করবেন না।’

    ‘ইশারা দিতেই চলে আসবে। তাহলে ডাকাডাকি করব না।’

    পদ্মজা হাসল। আমির ইষৎ হতচকিত। বলল, ‘হাসছো কেন?

    ‘এমনি। মনে রাখবেন কিন্তু।’

    ‘তুমিও মনে রাখবে।’

    সকালের দৃশ্য থেকে বেরিয়ে আমির বলল, মনে আছে। তোমার অস্বস্তি হয় এমন কিছুই করব না।’

    আমিরের কথায় পদ্মজা সন্তুষ্ট হলো। নিজেকে আজ পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে। উত্তেজনায় কাঁপছেও। দুই দিন পর মা-বাবা, ভাইবোনকে দেখবে। দুই দিনে কী কিছু পালটেছে? পদ্মজা মনে মনে ভাবছে, আম্মা বোধহয় শুকিয়েছে। আমাকে ছাড়া আম্মা নিশ্চয় ভালো নেই।

    পদ্মজার খারাপ লাগা কাজ করতে থাকে। ছটফটানি মুহূর্তে বেড়ে যায়। আমির জানতে চাইল, ‘পদ্মজা, শরীর খারাপ করছে?’

    ‘না।’

    ‘অস্বাভাবিক লাগছে।’

    ‘আম্মাকে অনেকদিন পর দেখব।’

    ‘অনেকদিন কোথায়? দুই দিন মাত্র।’

    ‘অনেকদিন মনে হচ্ছে।’

    ‘এই তো চলে এসেছি। ওইযে দেখো, তোমাদের বাড়ির পথ।’

    আমির ইশারা করে দেখাল। আমিরের ইশারা অনুসরণ করে সেদিকে তাকাল পদ্মজা। ওই তো তাদের বাড়ির সামনের পুকুর দেখা যাচ্ছে। আর কিছু সময়, এরপরই সে তার মাকে দেখবে। পদ্মজা অনুভব করে তার নিশ্বাসের গতি বেড়ে গেছে। হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। সে আমিরের এক হাত শক্ত করে ধরে বাড়ির দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে রইল।

    হেমলতা নদীর ঘাটে মোর্শেদের সঙ্গে কথা বলছিলেন, সকালে মোর্শেদকে বাজারে পাঠিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মোর্শেদ কিছু জিনিস ভুলক্রমে আনেননি। তা নিয়েই আলোচনা চলছে। ঠিক আলোচনা নয়। হেমলতা বকছেন আর মোর্শেদ নৌকায় বসে শুনছেন। তিনি কথা বলার সুযোগই পাচ্ছেন না। হেমলতা নিশ্বাস নেয়ার জন্য থামতেই মোর্শেদ বললেন, ‘অহনি যাইতাছি। সব লইয়া হেরপর আইয়াম।’

    ‘এখন গিয়ে হবেটা কী? হঠাৎ ওরা চলে আসবে।’

    ‘আমি যাইয়াম আর আইয়াম,’ বলতে বলতে মোর্শেদ নৌকা ভাসিয়ে দূরে চলে যান। হেমলতা ক্লান্তি ভরা দৃষ্টি নিয়ে স্বচ্ছ জলের দিকে তাকিয়ে রইলেন অনেকক্ষণ। আচমকা পূর্ণার চিৎকার ভেসে এলো কানে। তিনি চমকে ঘুরে তাকালেন। আপা আপা বলে চেঁচাচ্ছে পূর্ণা। হেমলতা বিড়বিড় করলেন, ‘পদ্ম এসে গেছে!’

    ব্যস্ত পায়ে হেঁটে বাড়ির উঠোনে চলে এলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে ফুলের মতো সুন্দর মেয়েটি হামলে পড়ে বুকের ওপর। আম্মা, আম্মা বলে জান ছেড়ে দিল। হেমলতার এত বেশি আনন্দ হচ্ছে যে, হাত দুটো তোলার শক্তি পাচ্ছেন না। চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি দুই হাতে শক্ত করে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরলেন। শূন্য বুকটা চোখের পলকে পূর্ণ হয়ে উঠেছে। পদ্মজা নিশ্চয় বুঝে যাবে, দুই রাত তার আম্মা ঘুমায়নি, চোখদ্বয় নিশ্চিন্তে আরাম করতে পারেনি। বুঝতেই হবে পদ্মজাকে। পদ্মজা ঘন ঘন লম্বা করে নিশ্বাস টানছে। স্পষ্ট একটা ঘ্রাণ পাচ্ছে সে, মায়ের শরীরের ঘ্রাণ! পারলে পুরো মাকেই এক নিশ্বাসে নিজের মধ্যে নিয়ে নিত।

    হেমলতা পদ্মজার মাথায় আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বললেন, আর কাঁদিস না। এই তো, আম্মা আছি তো।’

    ‘তোমাকে খুব মনে পড়েছে, আম্মা।’

    ‘আমারও মনে পড়েছে,’ হেমলতার চোখের জল ঠোঁট গড়িয়ে গলা অবধি পৌঁছেছে। তিনি অশ্রুমিশ্রিত ঠোঁটে পদ্মজার কপালে চুমু দেন। আমির হেমলতার পা ছুঁয়ে সালাম করতে নেয়। হেমলতা ধরে ফেলেন। আমিরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘লাগবে না, বাবা।’

    আমির বিনীত কণ্ঠে বলল, ‘ভালো আছেন, আম্মা?’

    ‘ভালো আছি। তুমি ভালো আছো তো? আমার মেয়েটা কান্নাকাটি করে জ্বালিয়েছে খুব?’

    ‘ভালো আছি আম্মা। একটু-আধটু তো জ্বালিয়েছেই।’ কথা শেষ করে আমির আড়চোখে পদ্মজার দিকে তাকাল।

    ফোঁপাচ্ছে পদ্মজা। হেমলতা অনেকক্ষণ চেষ্টা করে পদ্মজাকে নিয়ন্ত্রণে আনেন। বাড়িতে মনজুরা, হানিসহ হানির শ্বশুরবাড়ির অনেকেই ছিল। তারা আগামীকাল ঢাকা ফিরবে। জামাই স্বাগতমের বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। পূর্ণা পদ্মজা ও লাবণ্যকে টেনে নিয়ে গেল ঘরে। হানির স্বামী আমিরকে নিয়ে গল্পের আসর জমালেন। আমির আসার সময় গরুগাড়ি ভরে বাজার করে নিয়ে এসেছে। হেমলতা সেসব গোছাচ্ছেন। তিনি বার বার করে মজিদ মাতব্বরকে বলে দিয়েছিলেন, ফের যাত্রায় বাজার না পাঠাতে। তবুও পাঠিয়েছেন। ফেলে তো দেওয়া যায় না।

    .

    রাতের খাবার শেষ হয়েছে অনেকক্ষণ। পূর্ণাকে আমির ছোটো আপা বলে ডাকছে, শালির চোখে একদমই দেখছে না। তেমন রসিকতাও করছে না। আমিরের ব্যবহারে পূর্ণা ধীরে ধীরে ওকে বোনজামাই হিসেবে পছন্দ করে নিচ্ছে। না হোক নায়কের মতো সুন্দর, মন তো ভালো। লাবণ্য, আমির আর পূর্ণার সঙ্গে লুডু খেলছে হানির বড়ো ছেলে। পদ্মজা কিছুক্ষণ খেলে উঠে এসেছে। হেমলতা, মোর্শেদ বারান্দার বেঞ্চিতে বসে ছিলেন। পদ্মজা দরজার পাশে এসে দাঁড়াল। মোর্শেদ দেখতে পেয়ে ডাকলেন, ‘কী রে মা? আয়।’ পদ্মজাকে টেনে এনে দুজনের মাঝখানে বসিয়ে দিয়ে প্রশ্ন করলেন, হউরবাড়ির মানুষেরা ভালা তো?’

    পদ্মজা নতজানু হয়ে জবাব দিল, ‘সবাই ভালো।

    ‘একটু আধটু সমস্যা থাকবেই, মানিয়ে নিস। জয় করে নিস। সব কিছুই অর্জন করে নিতে হয়।’ বললেন হেমলতা। পদ্মজা হেমলতার দিকে তাকিয়ে মৃদু করে হাসল। হেমলতা আবার বললেন, ‘তোর শাশুড়ি একটু কঠিন তাই না? চিন্তা করিস না। যা বলে করবি। পছন্দ-অপছন্দ জানবি সেই মতো কাজ করবি। দেখবি, ঠিক মাথায় তুলে রেখেছে।

    ‘আচ্ছা, আম্মা।’ বলল পদ্মজা।

    ‘সব শাশুড়ি ভালো হয় না লতা। আমার শাশুড়িরে আজীবন তেল দিলাম। কোনো পরিবর্তন হয়েছে? হয়নি।’ বললেন হানি। তিনি ঘর থেকে সব শুনছিলেন। কথা না বলে পারলেন না।

    হেমলতা এক হাতে পদ্মজাকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর হানির উদ্দেশ্যে বললেন, ‘আমার পদ্মর কপাল এত খারাপ নিশ্চয় হবে না।’

    ‘পদ্মর অবস্থা আমার মতো হয়েছে যদি শুনি, ওরে তুলে নিয়ে যাব আমার কাছে। তুই মিলিয়ে নিস।’

    ‘আহ! থামো তো আপা। আমির-লাবণ্য শুনবে। কী ভাববে?’

    হানি আর কিছু বললেন না। চারজন মানুষ নিশ্চুপে বসে রইল একসময় হেমলতা রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। রান্নাঘর গুছানো হয়নি। নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালেন মোর্শেদ, সারাদিন অনেক ধকল গেছে। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে। হানি পদ্মজার পাশে বসে বললেন, ‘শোন মা, শাশুড়িরে বেশি তেল দিতে গিয়ে নিজের জীবন নষ্ট করবি না। তোর মায়ের অনেক জ্ঞান, অভিজ্ঞতা মানি। কিন্তু লতাকে শাশুড়ি নিয়ে সংসার করতে হয়নি তাই সে জানে না। আমি জানি শাশুড়িরা কেমন কালসাপ হয়। এরা সেবা নিবে দিনরাত। বেলাশেষে ভুলে যাবে। নিজের কথা আগে ভাববি। শাশুড়ি ভুল বললে জবাব দিবি সঙ্গে সঙ্গে। নিজের জায়গাটা বুঝে নিবি। পড়াশোনা থামাবি না। পড়বি আর আরামে থাকবি। আমরা বান্দি পাঠাইনি। সাক্ষাৎ পরি পাঠাইছি। শুনছি, আমিরের টাকাপয়সা, জমিজমা অনেক আছে। তাহলে তোর আর চিন্তা কীসের? জামাই হাতে রাখবি। তাহলে পুরো সংসার তোর হাতে থাকবে। আমার কপালে এসব ঠেকেনি। বিয়ের পর থেকে শ্বশুরবাড়ির মানুষের মন রাখতে রাখতে কখন বুড়ি হয়ে গেছি বুঝিনি। বুঝছিস তো?’

    পদ্মজা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানাল। প্রসঙ্গ পালটাতে বলল, ‘মেজো আপা আসেনি কেন? বিয়ে কবে আপার?’

    ‘ওর তো পরীক্ষা সামনে। পড়াশোনা শেষ করুক। এরপর বিয়ে দেব।’

    ‘বিয়ে না ঠিক হওয়ার কথা ছিল। হয়নি?’

    ‘কবে?’ আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন হানি। পদ্মজা হানির প্রশ্নে অবাক হলো। কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘আম্মা না কয়দিন আগে তোমাদের বাড়ি গেল। বড়ো আপার বিয়ে ঠিক করতে।’

    হানি হাঁ হয়ে চেয়ে রইলেন পদ্মজার দিকে। তিনি কিছুই বুঝছেন না। তার মেয়ের বিয়ে আবার কবে ঠিক হওয়ার কথা ছিল? পদ্মজা বিয়ে করে কী আবোলতাবোল বকছে! তিনি বললেন, ‘কী বলিস?’

    হানির সহজ সরল মুখখানার দিকে পদ্মজা একদৃষ্টে চেয়ে রইল। সে ছে: আম্মা রাজধানীতে তাহলে কেন গিয়েছিল? মিথ্যে কেন বলেছে? সেদিন রাজধানীতে গিয়েছিল বলেই এত বড়ো অঘটন ঘটেছিল। না! অঘটন ভাগ্যেই লেখা ছিল। কিন্তু মিথ্যে কেন বলল আম্মা?

    ৩৩

    মাদিনী নদীর বুকে কুন্দ ফুলের মতো জোনাকি ফুটে রয়েছে। পদ্মজা তা এক মনে চেয়ে দেখছে। রাত অনেকটা। আমির ঘুমাচ্ছে। তিন দিনে আমিরের সঙ্গে পূর্ণা-প্রেমার খুব ভাব হয়েছে। সারাক্ষণ আড্ডা, লুডু খেলা। পদ্মজা যত দেখছে তত আমিরের প্রেমে পড়ছে। আমিরের ঘুমন্ত মুখের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে পদ্মজার মনে পড়ল, আগামীকাল ফিরে যেতে হবে শ্বশুরবাড়ি। মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে ছেড়ে আবার চলে যেতে হবে—ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে আসে। মন ভালো করতে চলে আসে নদীর ঘাটে। জোনাকিদের কুরুক্ষেত্র দেখতে দেখতে কেটে যায় অনেকক্ষণ। আঁধার ভেদ করে একটা আলোর ছোঁয়া লাগে চারপাশে। এসময় কে এলো? পদ্মজা ঘাড় ঘুরে তাকাল, মাকে দেখে হাসল একগাল। হেমলতা হারিকেন হাতে নিয়ে এগিয়ে আসেন। কিঞ্চিৎ রাগ নিয়ে বললেন, ‘এত রাতে একা ঘাটে এসেছিস কেন? মার খাসনি অনেকদিন। বিয়ে হয়েছে বলে আমি মারব না নাকি?’

    হেমলতার ধমকে পদ্মজা মেরুদণ্ড সোজা করে থতমত হয়ে দাঁড়াল। মা শেষ কবে মেরেছেন, পদ্মজা মনে করতে পারছে না। তিনি যেভাবে বললেন মনে হলো, না জানি কত মেরেছেন। তাই পদ্মজাও ভয় পাওয়ার ভান ধরল। বলল, ‘যাচ্ছি ঘরে।’

    ‘কী জন্য এসেছিলি? ঘুম আসছে না?’ হেমলতার কণ্ঠটা নরম শোনাল।

    ‘কাল চলে যেতে হবে তাই মন খারাপ হচ্ছিল।’

    হেমলতা হারিকেন মাটিতে রাখেন। তারপর দুহাতে পদ্মজাকে বুকে টেনে নেন। বাঁধন ছেঁড়া হলো পদ্মজার কান্নারা। মায়ের বুকে মুখ চেপে পিঠটা বারংবার ফুলে ফুলে উঠতে লাগল। কিছুক্ষণ পার হলো এভাবেই। ‘এত সহজে কাঁদিস কেন? মা-বাবার কাছে সারাজীবন মেয়েরা থাকে না রে মা।’

    ‘তুমি সঙ্গে চলো।’

    ‘পাগল মেয়ে! বলে কী! কান্না থেমেছে?’

    পদ্মজা দুহাতের উলটো পাশ দিয়ে চোখের জল মুছে বলল, ‘হুঁ।’

    আমির তো ঘুমে। তুইও ঘুমিয়ে পর গিয়ে।’

    পদ্মজা মাথা নাড়াল। দুই কদম এগিয়ে আবার চটজলদি পিছিয়ে আসে। মাকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি ঘুমাবে না আম্মা?’

    ‘ঘুমাব, চল।’

    ‘আম্মা?’

    হেমলতা হারিকেন হাতে নিয়ে পদ্মজার চোখের দিকে তাকালেন। পদ্মজা বলল, ‘তোমার জীবনের সবটা আমাকে বলেছো। কিছু আড়ালে থাকলে সেটাও বোলো, আম্মা।’

    ‘কেন মনে হলো, আরো কিছু আছে?’ হেমলতার কণ্ঠটা অন্যরকম শোনাল।

    ‘মনে হয়নি। এমনি বলে রাখলাম।’

    পদ্মজা নতজানু হয়ে নিজের নখ খুঁটছে। হেমলতা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। কেটে গেল অনেকটা সময়। তিনি ঢোক গিলে গলা ভিজিয়ে বললেন, ‘তাই হবে।

    পদ্মজা খুশিতে তাকাল। নিশ্চয় এখন সব বলবে আম্মা। হানি খালামনির বাড়ির কথা বলে সেদিন কোথায় গিয়েছিলেন? এখনই জানা যাবে।

    হেমলতা আশায় পানি ঢেলে দিলেন, ‘এখন ঘুমাতে যা। অনেক রাত হয়েছে।’

    পদ্মজার চোখমুখের উজ্জ্বলতা নিভে গেল। মা কাঙ্ক্ষিত প্রসঙ্গটি কেন এড়িয়ে যাচ্ছেন? পদ্মজা সরাসরি জিজ্ঞাসা করার অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু পারছে না। জড়তা ঘিরে রেখেছে তাকে। মা সবসময় নিজ থেকে সব বলেন। নিশ্চয় কোনো কারণে এই বিষয়ে চুপ আছেন। পদ্মজা মনে মনে নিজেকে সান্ত্বনা দিল, ‘একদিন আম্মা বলবে।’

    কালো মেঘে ঢাকা আকাশ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। লাহাড়ি ঘরের বারান্দায় হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছেন হেমলতা। সন্ধ্যার আজান পড়বে। চারপাশে এক মায়াবী ঘনছায়া। মন বিষাদময়। পদ্মজা দুপুরে মোড়ল বাড়ি ছেড়েছে। বিদায় মুহূর্তটা একটুও স্বস্তির ছিল না। মেয়েটা এত কাঁদতে পারে! তবে হেমলতার চোখ শুকনো ছিল। মায়ের চোখ শুকনো দেখে কি পদ্মজা কষ্ট পেয়েছিল? কে জানে! হেমলতা বারান্দা ছেড়ে উঠতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন শক্তির অবস্থান শূন্যে। তিনি আবার বসে পড়লেন। হেসে ফেললেন, পদ্মজা ছাড়া এত দুর্বল তিনি! এটা ভাবতে অবশ্য ভালো লাগে। হেমলতা আকাশের দিকে তাকালেন। চোখ দুটি জ্বলছে। জলভরা চোখ নিয়ে আবার হাসলেন। কী যন্ত্রণাময় সেই হাসি! মাটিতে হাতের ভর ফেলে উঠে দাঁড়ান তিনি। এলোমেলো পায়ে লাহাড়ি ঘর ছাড়েন। উঠোনে এসে থমকে দাঁড়ান। বাড়ির গেট খোলা ছিল। পাতলা অন্ধকার ভেদ করে একটি নারী অবয়ব এগিয়ে আসছে বাড়ির দিকে। হেমলতা নারী ছায়াটির স্পষ্ট মুখ দেখার জন্য অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকেন। গেটের কাছাকাছি আসতেই হেমলতা আন্দাজ করতে পারেন কে এই নারী! তিনি মৃদু হেসে এগিয়ে যান।

    ‘অনেক দেরি করলেন আসতে।’

    বাসন্তী উঠোনে পা রেখে বললেন, ‘আপনি আমাকে চিনেন?’

    হেমলতা জবাব না দিয়ে বাসন্তীর ব্যাগ নিতে হাত বাড়ালেন। বাসন্তী ব্যাগ আড়াল করে ফেললেন, তিনি খুব অবাক হচ্ছেন। মনে যত সাহস নিয়ে এসেছিলেন, সব ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। হেমলতা বললেন, ‘আপনি এই বাড়িতে নির্দ্বিধায় থাকতে পারেন। আমি বা আমার সন্তানদের পক্ষ থেকে আপত্তি নেই।’

    ‘আ…আপনি আমাকে চিনলেন কীভাবে?’

    ‘সে যেভাবেই চিনি। জেনে কি লাভ আছে? আপনি প্রথম দিনই একা আসতে পারতেন। লোকজন না নিয়ে।’

    বাসন্তীর এবার ভয় করছে। শরীর দিয়ে ঘাম ছুটছে। একটা মানুষ সতিন দেখে এত স্বাভাবিক কী করে হতে পারে? তিনি তো ভেবেছিলেন যুদ্ধ করে স্বামীর বাড়িতে বাঁচতে হবে। বাসন্তীর ধবধবে সাদা চামড়া লাল বর্ণ ধারণ করেছে। হেমলতার কথা, দৃষ্টি এত ধারাল মনে হচ্ছে তার! হেমলতা বাসন্তীকে চুপ দেখে বললেন, ‘আপনি বিব্রত হবেন না। এটা আপনারও সংসার। আসুন।’

    হেমলতা আগে আগে এগিয়ে যান। বারান্দা অবধি এসে পেছনে ফিরে দেখেন, বাসন্তী ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন। হেমলতা কথা বলার জন্য প্রস্তুত হোন, তখনই একটা পুরুষালি হুংকার ভেসে এলো, ‘তুমি এইহানে আইছো কেন?’

    মোর্শেদের কণ্ঠ শুনে বাসন্তী কেঁপে উঠলেন। মোর্শেদকে এড়িয়ে একজন বনেদি লোকের প্রতি ক্ষণিকের জন্য আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন বাসন্তী। এরপর থেকেই মোর্শেদ এবং তার সম্পর্কে ফাটল ধরে। মোর্শেদ ত্যাগ করেন তাকে। কিন্তু তিনি এক সময় বুঝতে পারেন, কোনটা ভুল কোনটা সঠিক। সংসারের প্রতি টান অনুভব করে ফিরে আসতে চান। মোর্শেদ জায়গা দিলেন না। ততদিনে মোর্শেদ দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা উপলব্ধি করেন, মোহ ছেড়ে ফিরে আসেন সংসারে হেমলতার কাছে।

    ‘বাইর হইয়া যাও কইতাছি। বাইর হও আমার বাড়ি থাইকা।’

    মোর্শেদ বাসন্তীকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে যেতে বললেন। বাসন্তী হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলেন। চোখ গরম করে মোর্শেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘এইটা আমারও ছংছার। আমি যাব না।’

    ‘বাসন্তী, ভালাই ভালাই কইতাছি যাও এন থাইকা। নইলে তোমার লাশ ফালায়া দিয়াম আমি।’

    বাসন্তী কিছু কঠিন কথা শোনাতে গিয়েও শুনালেন না। হেমলতা উঠোনে নেমে আসেন, ‘যখন বিয়ে করেছো তখন হুঁশ ছিল না! এখন সংসার দিতে আপত্তি?’

    ‘তুমি জানো না লতা, এই মহিলা কত্তডা খারাপ। এই মহিলা লোভী। লোভখোরের বাচ্চা। মাদারির বাচ্চা।’

    ‘কী সব বলছো? মুখ সামলাও।’

    মোর্শেদের কপালের রগ দপদপ করছে। নিশ্বাস ঘন হয়ে এসেছে। বাসন্তীকে পেটাতে হাত নিশপিশ করছে। তবুও হেমলতার কথায় তিনি থামলেন। কিন্তু তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইলেন বাসন্তীর দিকে। হেমলতা বললেন, ‘আপনি ঘরে যান। এই ঘর আপনারও। উনার কথা মনে নিবেন না।’

    ‘আমার ঘরে এই মহিলায় ঢুকলে খারাপি হইয়া যাইব।’

    হেমলতা মোর্শেদের চোখের দিকে তাকিয়ে ইশারায় কিছু একটা বললেন। এরপর বাসন্তীকে বললেন, ‘আপনি যান। সদর ঘরের ভেতরের দরজার বাঁদিকে যে ঘরটা সেখানেই যান। দেখিয়ে দিতে হবে?’

    বাসন্তী কিছু না বলে গটগট আওয়াজ তুলে বারান্দা পেরিয়ে সদর ঘরে ঢুকে পড়েন। হাত-পা কাঁপছে তার। হেমলতার ব্যবহার স্বাভাবিক হলেও অস্বাভাবিক ঠেকছে। সেদিন বৃষ্টিতে ভিজে ফেরার জন্য জ্বরে বিছানায় পড়ে যান। গত কয়দিন জ্বরে এতই নেতিয়ে গিয়েছিলেন যে, ওঠার শক্তিও ছিল না। শরীরটা একটু চাঙ্গা হতেই আবার চলে এসেছেন। এত সহজে সব পেয়ে যাবেন জানলে জ্বর নিয়েই চলে আসতেন। মোর্শেদ অসহায় চোখে তাকালেন হেমলতার দিকে। বললেন, ‘কেন এমনডা করলা? আমি বাসন্তীর লগে থাকবার চাই না।’

    ‘ঠান্ডা হও তুমি। তুমি কিছুই জানো না, যেদিন আমরা ঢাকা থেকে ফিরি সেদিন উনি এসেছিলেন। লোকজন নিয়ে এসেছিলেন। এরপরই আমার মেয়েদের জীবনে অন্ধকার নেমে আসে। পরিস্থিতি হাতের নাগালে চলে যাওয়াতে উনি সেদিন ফিরে গিয়েছিলেন। বিয়ের দিন বেয়াই সব বললেন। বেয়াইয়ের কাছে কামরুল মিয়া অভিযোগ করেছিলেন। বেয়াই কামরুল ভাইকে বলেন, ব্যাপারটা এখন ছড়াছড়ি না করতে। এতে উনার সম্মান নষ্ট হবে। যে বাড়িতে ছেলের বিয়ে দিচ্ছেন সেই বাড়ির কর্তার প্রথম বউ আছে, বউ আবার একজন পরনারীর মেয়ে। অধিকার নিতে লোকজন নিয়ে বৈঠক বসাবে—এসব সত্যিই অসম্মানজনক। তিনি আমাকে অনুরোধ করেছেন, ব্যাপারটা যেন নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নেই। আর বাসন্তী আপার তো দোষ নেই। সবচেয়ে বড়ো কথা, আমার সংসারের হাল ধরার জন্য একজন দরকার। খুব দরকার।’ হেমলতার শেষ কথাগুলো করুণ শোনাল। মোর্শেদ বিস্ময়ে তাকিয়ে আছেন। বাসন্তী এত কিছু করেছে তা ভাবতে পারছেন না। মোর্শেদ কণ্ঠ খাদে নামিয়ে বললেন, ‘তারে আমি মানতে পারতাছি না। বুঝায়া শুনায়া বাইর কইরা দেও।’

    ‘তুমি আমার কথাগুলো শোনো, থাকতে দাও উনাকে। ক্ষমা করে দাও। আমি জানি না সে কী করেছে। যাই করুক, ক্ষমা করে দাও।’

    মোর্শেদের মাথায় খুন চেপেছে। তিনি কী করবেন, কী বলবেন ভেবে পাচ্ছেন না। ক্রোধে-আক্রোশে ফুলতে ফুলতে বাড়ির পেছনে চলে যান। নৌকা নিয়ে বের হবেন। রাতে বোধহয় ফিরবেন না আজ। আজান পড়ছে, বৃষ্টির বেগ বেড়েছে। হেমলতা ব্যস্ত পায়ে হেঁটে যান বারান্দায়। গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। বুক মুচড়ে একটা কান্না ছিটকে এলো গলায়, সেইসঙ্গে চোখ ছাপিয়ে জল। কোন নারী সতিন মানতে পারে? বাধ্য হয়ে মানতে হচ্ছে, ভাগ্য বাধ্য করছে। নয়তো তিনি এত উদার নন। কখনোই অন্যকে নিজের সংসারের ভাগ দিতেন না। সেই প্রথম থেকে মনে পুষে রেখেছেন, কখনো মোর্শেদের স্ত্রী এই সংসার চাইলে মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেবেন। যার জন্য তিনি একাকীত্বে ধুঁকেছেন, যার জন্য মোর্শেদের ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যার জন্য মোর্শেদের মার খেয়েছেন—তাকে কখনোই এত সহজে সুখ দিতেন না। কখনোই না। হেমলতার শরীরে কাঁটা ফুটছে। তিনি কোনমতে কান্নাটাকে গিলতে চাইলেন। বাসন্তীর গলা কানে এলো, ‘আপনি কাঁদতাছেন?’

    হেমলতা চমকে তাকালেন। লজ্জায় চোখের জল মোছার সাহস পেলেন না। চোখে জল নিয়েই হাসলেন। বাসন্তী হতবাক! কী অসাধারণ নারী!

    বাসন্তী প্রসঙ্গ পালটে জানতে চাইলেন, ‘ছেলেমেয়েরা কই?’

    ‘বড়ো মেয়েটার বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়িতে আছে। আজই ফের যাত্রা শেষ করে শ্বশুর বাড়ি গেল। মেজো আর ছোটোটা তাদের নানাবাড়ি গেছে। বড়োটার জন্য কান্নাকাটি করছিল তাই আম্মা নিয়ে গেছে।’

    ‘ঘরে একটা ছোটু ছেড়া ঘুমাইতাছে। কে ছে?’

    ‘প্রান্ত। আমারই ছেলে।’

    ‘চুনছিলাম তিন মেয়ে ছুধু ‘

    হেমলতা আর কথা বাড়ালেন না। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন, ‘আপনি কলপাড়ে যান। কাপড় পালটে নেন। আমি খাবার বাড়ছি।’

    .

    পদ্মজা মুখ ভার করে বসে আছে। রাতের খাবারের সময় ফরিনা বেগম কথা শুনিয়েছেন। কঠিন স্বরে বলেছেন, ‘বাপের বাড়ির আহ্লাদ মিটায়া আইছো তো? আর কোনোদিন যাইতে কইবা না। এইডাই তোমার বাপের বাড়ি, স্বামীর বাড়ি। আর তোমার ভাই-বইনদের কইবা সবসময় আনাগোনা না করতে। বাড়ির কাছে বইলা সবসময় আইতে হইব এইডা কথা না। চোক্ষে লাগে।

    পদ্মজা বুঝতে পারছে না, তার ভাই বোন তো শুধু বৌভাতের দিন এসেছে। দাওয়াতের আমন্ত্রণ রক্ষার্থে। এজন্য এভাবে কেন বলতে হবে। কান্না পাচ্ছে খুব। আম্মার কথা মনে পড়ছে। পূর্ণা কী করছে? আসতে তো নিষেধ দিয়ে দিল। তাহলে কীভাবে দেখা হবে? আমির ঘরে ঢুকতেই পদ্মজা দ্রুত চোখের জল মুছল। পদ্মজার ফ্যাকাসে মুখ দেখে আমির প্রশ্ন করল, ‘আম্মা কিছু বলছে?’

    পদ্মজা দ্রুত বলল, ‘না, না।’

    ‘তাহলে কাঁদছ কেন?’

    ‘আম্মার কথা মনে পড়ছে।’

    ‘যেতে চাও? চলো।’

    ‘ওমা কী কথা! এত রাতে। আর দুপুরেই না আসলাম।’

    ‘তাহলে মন খারাপ করো না। আমরা আবার যাব। কয়দিনের মধ্যে।’ বাইরে অনেক হাওয়া বইছে। পদ্মজা জানালা লাগাতে গেল। তখন একটা চিৎকার শুনতে পেল। আমির তা লক্ষ করে বলল, ‘বড়ো ভাবির চিৎকার। রুম্পা ভাবি। পাগলের মতো আচরণ তার। পাগলই বলে সবাই।

    পদ্মজা কৌতূহল নিয়ে আমিরের সামনে এসে দাঁড়াল, ‘আপনার মনে হয় কেউ ভয় পেয়ে মানসিক ভারসাম্য হারাতে পারে?’

    ‘অসম্ভবের কী আছে?’

    ‘আমার কাছে খটকা লাগছে। উনার সঙ্গে অন্য কিছু হয়েছে?’

    ‘আমি তো এতটুকুই জানি,’ আমির চিন্তিত হয়ে বলল।

    পদ্মজা বলল, ‘উনার সঙ্গে আমার দেখা করিয়ে দিবেন?’

    আমির উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘ভাবি তোমাকে আঘাত করবে।’

    ‘বাঁধাই তো থাকে। অনুরোধ করছি।’

    পদ্মজাকে হাতজোড় করে অনুরোধ করতে দেখে আমির সায় দিল, ‘আচ্ছা, ভোরে নিয়ে যাব। তখন সবাই ঘুমে থাকে।’

    ‘আপনাদের এই বাড়িটা খুব রহস্যজনক।’

    ‘সত্যি নাকি? আমার তেমন কিছু মনে হয় না।’

    ‘আপনি তো কয়দিনের জন্য গ্রামে আসেন। আর এসব সবাই বুঝে না।’

    ‘ওরে আমার বুঝদার। তবে জিন আছে শুনেছি। আমার এক ফুফু বাড়ির পেছনের পুকুরে ডুবে মরেছিলেন। এছাড়া চাচিকে মাঝেমধ্যেই জিনে ধরে।’

    ‘সে কী!’

    ‘তবে আমি বিশ্বাস করি না এসব। তুমি বিশ্বাস করো?’

    ‘না। আচ্ছা…’

    পদ্মজা কথা শেষ করতে পারল না। আমির পদ্মজাকে টেনে বিছানায় নিয়ে এলো। আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘আর কথা না। ঘুমাও।’

    ‘আমি ভর্তা হয়ে যাচ্ছি।’

    ‘এই যে আস্তে ধরলাম।’

    ‘শুনুন না?’

    ‘কী?’

    ‘আমি পড়তে চাই।’

    ‘পড়বে।’

    ‘আম্মাকে অসন্তুষ্ট রেখে জোর করে পড়তে মন মানবে না।’

    ‘আম্মাকে রাজি করাব।’

    পদ্মজা খুশিতে গদগদ হয়ে উঠল।

    সে ও আমিরকে এক হাতে জড়িয়ে ধরল।

    ৩৪

    আজানের ধ্বনিতে জেগে ওঠে পৃথিবী, জেগে ওঠে পদ্মজা। বিছানা থেকে উঠতে গিয়েও উঠতে পারল না। আমির দুই হাতে জাপটে ধরে রেখেছে তাকে। পদ্মজা আমিরকে মৃদু কণ্ঠে ডাকল, ‘এই যে, শুনছেন?’

    আমির সাড়া দিল না। আবার ডাকল পদ্মজা। আমির ঘুমের ঘোরে কিছু একটা বিড়বিড় করে পুনরায় ঘুমে তলিয়ে যায়। এবার পদ্মজা উঁচু স্বরে ডাকল, ‘আরে উঠুন না। ফজরের নামাজ পড়বেন। এই যে…’

    আমির পিটপিট করে চোখ খুলে তাকাল। দুই হাতের বাঁধন আগলা করতেই পদ্মজা আমিরকে ঠেলে দ্রুত উঠে বসে। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলল, ‘অজু করতে আসুন। আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন আজ থেকে নামাজ পড়বেন।

    পদ্মজা দ্রুত কলপাড়ের দিকে যেতে থাকে। সে সবসময় আলো ফোটার আগে ফজরের নামাজ আদায় করার চেষ্টা করে। কলপাড় থেকে অজু করে এসে দেখে, আমির বালিশ জড়িয়ে ধরে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। সে মৃদু হেসে কপাল চাপড়ায়। আমিরের পাশে গিয়ে তার চুলে বিলি কেটে দিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল, ‘উঠুন না। নামাজ পড়ে আবার ঘুমাবেন। মসজিদে যেতে হবে না, আমার সঙ্গেই পড়ুন। এই যে, শুনছেন? এই যে, বাবু…’

    পদ্মজা দ্রুত জিভ কাটল। মুখ ফসকে আমিরের ডাক নাম ধরে ডেকে ফেলল! পদ্মজা সাবধানে পরখ করে দেখল, আমির শুনল কি না! না শোনেনি। পদ্মজা হাঁফ ছেড়ে আরো এক দফা ডাকার পর আমির উঠে বসে। কাঁদো কাঁদো হয়ে অনুরোধ করে, ‘কাল থেকে পড়ব। দয়া করে, আজ ঘুমাতে দাও।’

    পদ্মজা তার কথা শুনল না। বরং স্ত্রীর অনুনয়ের কাছে হেরে গেল আমির। সহধর্মিণী যদি এত সুন্দরী হয় তার অনুরোধ কি ফেলা যায়? আমির অনিচ্ছা সত্ত্বেও কলপাড় থেকে অজু করে আসে। পাশাপাশি জায়নামাজে বসে নামাজ আদায় করল দুজন।

    নামাজ শেষ হতেই পদ্মজা তাড়া দিয়ে বলল, ‘এবার চলুন।’

    আমির টুপি বিছানার ওপর রেখে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কোথায়?’

    অভিমান হলো পদ্মজার, ‘এমনভাবে বলছেন যেন জানেন না!’

    আমিরের সত্যি কিছু মনে পড়ছে না। চোখে এখনো ঘুম ঘুম ভাব। সে শুধু ঘুমাতে চায়। পদ্মজার অভিমানী মুখ দেখে মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়তেই বলল, ‘ওহ! দাঁড়াও, চাবি নিয়ে আসছি।’

    আমির ঘরের বাইরে চলে যায়। পদ্মজা প্রবল উত্তেজনা নিয়ে অপেক্ষা করছে। জানালার পাশে দাঁড়াতেই ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে সর্বাঙ্গ চাঙ্গা হয়ে উঠে। বাইরে সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। পদ্মজা মুগ্ধ নয়নে দেখছে বাড়ির পেছনের জঙ্গল। কী সুন্দর সবকিছু! এত এত গাছ। অযত্নে গড়ে ওঠা বন-জঙ্গল বোধহয় একটু বেশি আকর্ষণীয় হয়।

    প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে আচমকা চোখের তারায় দৃশ্যমান হয় রানি। রানির পরনে আকাশি রঙের সালোয়ার-কামিজ। সে জঙ্গলের ভেতরে যাচ্ছে। চোর চুরি করার সময় যেভাবে চারপাশ দেখে দেখে এগোয় ঠিক সেভাবে চারপাশ দেখে দেখে এগোচ্ছে রানি। পদ্মজা নিশ্বাস বন্ধ করে পুরো দৃশ্যটা দেখল। রানি জঙ্গলের ভেতরে চলে যায়।

    পেছন থেকে আমির ডাকল, ‘পদ্মবতী?’

    হঠাৎ ডাক শুনে পদ্মজা মৃদু কেঁপে উঠল।

    আমির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল, ‘কিছু কী হয়েছে?’

    ‘না! কী হবে? চলুন আমরা যাই।’ পদ্মজা হাসার চেষ্টা করল।

    পদ্মজা যে কিছু একটা এড়িয়ে যাচ্ছে তা বেশ বুঝতে পারছে আমির। তবে প্রশ্ন করল না। রানির কথা তুলতে গিয়েও তুলল না পদ্মজা। সে ভাবছে, ‘আগে রানি আপাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। এখনই উনাকে বলা ঠিক হবে না। কী ভাবেন আবার!’

    রুম্পার ঘরের দরজা খুলতেই ক্যাচক্যাচ আওয়াজ হলো। ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে নাকে দুর্গন্ধ ঠেকে। পদ্মজা প্রথমে জানালা খুলে দিল। পালঙ্কের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল, সেটি শূন্য। আমিরের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালে, আমির ইশারা করল পালঙ্কের নিচে দেখতে। পদ্মজা ঝুঁকে পালঙ্কের নিচে দেখে কেউ একজন নিথরের মতো শুয়ে আছে, যেন মৃত লাশ। জট লাগা চুল দিয়ে মুখ ঢাকা, হাতে-পায়ে বেড়ি।

    আমির পদ্মজার পাশে বসে জানাল, ‘উনিই রুম্পা ভাবি।’

    পদ্মজা ধীর কণ্ঠে অনুরোধ করে, ‘উনাকে একটু ডাকবেন?’

    ‘রেগে যায় যদি?’

    ‘তবুও ডাকুন।’

    আমির লম্বা করে নিশ্বাস নিয়ে ডাকল, ‘ভাবি? ভাবি? শুনছেন ভাবি?’

    রুম্পা নড়েচড়ে চোখ খুলে। দেখতে পায়, দুই হাত দূরে একটা ছেলে ও মেয়ে বসে আছে। তাদের মুখ স্পষ্ট নয়। আলো তখনো ভালো করে ঘরে ঢোকেনি। রুম্পা শান্ত চোখে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। পদ্মজা হাত বাড়িয়ে বলল, ‘আমার হাতে ধরে বেরিয়ে আসুন।’

    রুম্পা বাঁধা দুই হাতে পদ্মজার হাত ধরার চেষ্টা করে, পারল না। পদ্মজা নত হয়ে রুম্পার দুই হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলো। রুম্পা কাছে পৌঁছাতেই দুর্গন্ধে বমি চলে আসে পদ্মজার। গলা অবধি এসে বমি আটকে গেছে। না জানি রূম্পা ভাবি কতদিন গোসল করেনি, দাঁত মাজেনি। এই বাড়ির কেউ কী একটু পরিষ্কার করে রাখতে পারে না? প্রস্রাবের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ঘরেই পায়খানা-প্রস্রাব করে, নয়তো এত বিশ্রী গন্ধ হতো না।

    রুম্পা মলিন মুখে চেয়ে আছে পদ্মজার দিকে। শান্ত, স্থির দৃষ্টি। আমি গর্ব করে রুম্পাকে বলল, ‘আমার বউ। বলছিলাম না, সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা আমার বউ হবে। দেখিয়ে দিলাম তো?’

    রুম্পা হাসল। আশ্চর্য মায়া সেই হাসিতে! পদ্মজা মুগ্ধ হয়ে দেখল। ময়লাটে মলিন মুখের হাসি বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি। অনেকদিন গোসল না করার কারণে চেহারা-হাত-পা ময়লাটে হয়ে গেছে। নখগুলোও বড়ো বড়ো। নখের ভেতর ময়লার স্তূপ। ঠোঁট ফেটে চৌচির। টলমল করা চোখ। দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি চোখ দিয়ে বর্ষণ বইবে।

    রুম্পা পদ্মজাকে শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘এ তো ম্যালা সুন্দর ছেড়ি। তোমার নাম কী গো?’

    পদ্মজা এক পলক আমিরকে দেখে জবাব দিল, ‘উম্মে পদ্মজা।’

    ‘ছুডু ভাই, এত সুন্দর ছেড়ি কই পাইলেন? এ…এ যে চান্দের লাকান মুখ।’

    রুম্পার আরো কাছে গিয়ে বসে পদ্মজা। দুর্গন্ধটা আর নাকে লাগছে না। মানুষটাকে তার বেশ লাগছে। রুম্পার কুচকুচে কালো, লম্বা চুল। মাটিতে পাঁচ-ছয় ইঞ্চি চুল লুটিয়ে আছে। অনেকদিন না ধোয়ার কারণে জট লেগে আছে, কিন্তু সৌন্দর্যের অস্তিত্ব এখনো বোঝা যায়। সুস্থ অবস্থায় নিশ্চয় অনেক বেশি সুন্দর চুলের অধিকারিণী ছিল।

    পদ্মজা শুধাল, ‘আমি আপনাকে তুমি করে বলি?’

    রুম্পা দাঁত বের করে হেসে মাথা নাড়াল।

    পদ্মজা হেসে বলল, ‘কিছু বলবেন?’

    রুম্পা হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে পদ্মজার দিকে। কোনো জবাব দেয় না। সেকেন্ড কয়েক পর রুম্পার চোখের দৃষ্টি এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। হাসি মিলিয়ে মুখে নেমে আসে আঁধার। হঠাৎই যেন চাঁদের মতো ঝকঝক করা মুখ কলঙ্কে লেপটে দিয়েছে কেউ। পদ্মজা অবাক হয়ে রুম্পার পরিবর্তন দেখতে লাগল।

    আকস্মিক তাকে আক্রমণ করে বসল রুম্পা, খামচে ধরল পা। আমির লাফিয়ে উঠে রুম্পার হাত থেকে পদ্মজাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করল। রুম্পা পা ছেড়ে এবার কামড়ে ধরল পদ্মজার শাড়ি। মুখ দিয়ে ক্ষোভে-আক্রোশে ভাষাহীন শব্দ করতে থাকল।

    আমির ধমকে ওঠে, ‘ভাবি ছাড়ো বলছি। পদ্মজা তোমার ক্ষতি করতে আসেনি। ভাবি ছাড়ো।’

    পদ্মজা স্তব্ধ হয়ে দেখছে রূম্পাকে। তার চোখেমুখে কোনো ভয়ভীতি নেই। কিছু যেন খুঁজছে রুম্পার মধ্যে। খুঁজে কূলকিনারা পাচ্ছে না। রুম্পা শাড়ি ছেড়ে দিতেই পদ্মজা একটু পিছিয়ে গেল, দরজার ওপর পড়ল চোখ। দেখতে পেল: কেউ সরে গেল যেন। অদ্ভুত কারণে পদ্মজার বুক কাঁপতে থাকে। নুরজাহান নিজ ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। আমির- পদ্মজাকে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ! তিনি বাজখাঁই কণ্ঠে বললেন, ‘তালা খুলছে কেডায়? বাবু, নতুন বউরে নিয়া এইহানে আইছোস কেন?’

    আমির দ্রুত রুম্পার কাছ থেকে সরে আসে। নুরজাহানকে কৈফিয়ত দেয়, ‘ভাবলাম, বাড়ির সবাইকে পদ্মজা দেখেছে। রুম্পা ভাবিকেও দেখুক। ভাবতে পারিনি ভাবি এমন কাজ করবে। ভাবি তো এখন আরো বেশি বিগড়ে গেছে, দাদু।’

    ‘তুই আমারে কইয়া আইবি না? তোর চিল্লানি হুইননা আমার কইলজাডা উইড়া গেছিল। বউ, তোমারে দুঃখ দিছে এই ছেড়ি?’

    পদ্মজা দ্রুত বলল, ‘না, না। কিছু করেনি।’

    আমির চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী বলছ? কিছু করেনি মানে? হাত দেখি?’

    আমির পদ্মজার দুই হাত টেনে নিয়ে দেখে, বাঁ-হাতে নখের জখম।

    আমির ব্যথিত স্বরে বলল, ‘ইস! কতটা আঘাত পেয়েছ। ঘরে চলো। দাদু এই নাও চাবি। তালা মেরে দিয়ো।’

    আমির পদ্মজাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বেরোবার আগ মুহূর্তে পদ্মজা রুম্পার দিকে তাকাল। দেখতে পেল, রুম্পা আড়চোখে তাকে দেখছে। সে চোখে স্নেহ, মমতা! একটু হাসিও লেগে ছিল। পদ্মজার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।

    কী হচ্ছে এসব!

    ঘরে এসে আমিরকে বলল, ‘উনার যত্ন কেউ নেয় না কেন?’

    ‘দেখোনি কী রকম করল? এই ভয়েই কেউ যায় না। শুরুতে তোমাকে দেখে যদি রেগে যেত তখনই তোমাকে নিয়ে চলে আসতাম। সবাইকে ভাবি তুই করে বলে। তোমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে দেখে ভেবেছি, বোধহয় তোমাকে পছন্দ হয়েছে। তাই আঘাত করবে না। কিন্তু সেই ধারণা ভুল হলো।

    ‘আপনি অকারণে চাপ নিচ্ছেন। নখের দাগ বসেছে শুধু।’

    ‘রক্ত চলে এসেছে।’

    ‘এইটুকু ব্যাপার না।’

    আমির তুলা দিয়ে পদ্মজার হাতের রক্ত মুছে দিয়ে বলল, ‘আর ওইদিকে পা দিবে না।’

    ‘আম্মার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।’

    ‘লাবণ্যকে ঘুম থেকে তুলছে। ও ফজরে উঠতেই চায় না।’ আমির হেসে ফেলল।

    ‘আমি যাই।’

    ‘কোথায়?’

    ‘আম্মা সকাল সকাল রান্নাঘরে যেতে বলেছিলেন।’

    ‘তুমি রান্না করবে কেন?

    ‘অনুরোধ করছি এমন করবেন না। আমি আমার বাড়িতেও রান্না করেছি। টুকটাক কাজ করেছি। এখন না গেলে আম্মা রেগে যাবেন। রাগানো ঠিক হবে না।’

    ‘এসব ভালো লাগে না, পদ্মজা।’

    ‘আমি আসছি।’

    আমিরকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে পদ্মজা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যায়। আমির শুধু চেয়ে থেকে দেখল।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleআমি পদ্মজা – ইলমা বেহরোজ
    Next Article পৃথিবীর ইতিহাস ২ – সুসান ওয়াইজ বাউয়ার

    Related Articles

    ইলমা বেহরোজ

    আমি পদ্মজা – ইলমা বেহরোজ

    July 11, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আবদুল হালিম
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক শেফার
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    থ্রিলার পত্রিকা
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতম বসু
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সায়ক আমান
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিক দে
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026
    Our Picks

    আমাজনিয়া – জেমস রোলিন্স

    March 24, 2026

    হেরুক – সৌমিত্র বিশ্বাস

    March 24, 2026

    বিভাষিকা – ১৪৩২ পূজাবার্ষিকী -(থ্রিলার পত্রিকা)

    March 24, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }