Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পুতুল নাচের ইতিকথা – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

    উপন্যাস মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প327 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ০৮. গ্রামে না-ফিরিবার প্রতিজ্ঞা

    এক মাস গ্রামে না-ফিরিবার প্রতিজ্ঞা দুদিনের বেশি টিকিল না শশীর। এ-গাঁয়ে ও-গাঁয়ে অসহায় বিপন্ন রোগীরা যে পথ চাহিয়া আছে।

    বিন্দুর সঙ্গে দেখা করিবার ইচ্ছা শশীর আর ছিল না। রওনা হওয়ার দিন বিকালে হঠাৎ অনিচ্ছা জয় করিয়া সে হাজির হইল নন্দও বাড়িতে। নন্দ বাড়ি ছিল। বিন্দু? না, বিন্দুকে এখনো এ-বাড়িতে আনা হয় নাই।

    নন্দ বলিল, ও বাড়ি যাব বলে তৈরি হচ্ছিলাম। দেখা করবে তো চলো আমার সঙ্গে।

    শশী বলিল, ও বাড়ি যাবার সময় হবে না নন্দ। আজ বাড়ি যাচ্ছি, সাতটায় গাড়ি।

    আজকেই যাবে? বোসো, চা-টা খাও।

    শশীর মনে কি এ আশা ছিল যে গাওদিয়ার বাড়িতে টিকিতে না পারিলেও নন্দর গৃহে গৃহিণী হইয়া বিন্দু থাকিতে পারবে? বিন্দু আসে নাই শুনিয়া সে যেন বড় দমিয়া গেল। নন্দর বাড়িঘর দেখিয়া সে একটু অবাক হইয়া গিয়াছিল। এখানে আগে সে কখনও আনে নাই, নন্দর গৃহে বনেদিত্বের ছাপ যে এত স্পষ্ট ও প্রীতিকর এ ধারণা তাহার ছিল না। সেকেলে ধরনের ভারী নিরেট সব আসবাব, দরজা জানলায় দামি পুরু পর্দা, দেয়ালে প্রকাণ্ড কয়েকটা অয়েলপেন্টিং, এমনি সব গৃহসজ্জা নন্দর এই ঘরখানাকে একটি অপূর্ব গম্ভীর শ্রী দিয়াছে। অন্দর বোধহয় বেশি তফাতে নয়—কোমল গলার কথা ও হাসি শশীর কানে আসিতেছিল,—সে অনুভব করিতেছিল অন্তরালে একটি বৃহৎ সুখী পরিবারের অস্তিত্ব। তারপর একসময় সাত-আট-বছর বয়সের একটি সুশ্ৰী ছেলে কী বলিতে আসিয়া শশীকে দেখিয়া নন্দর গা ঘেষিয়া দাঁড়াইয়া পড়িল। কী সুন্দর তার দুটি কৌতুহলী চোখ। আর কী মায়া নন্দর চোখে।

    গরমে যে ঘেমে উঠেছিস? বলিয়া নন্দ নিজে ছেলের জামা খুলিয়া দিতে শশী যেন অবাক হইয়া গেল। একি অসঙ্গতি নন্দ ও নন্দর আবেষ্টনীর মধ্যে? তার এই পুরুষানুক্রমিক নীড়ে শাস্তি আছে নাকি? এই গৃহের সীমাবদ্ধ জগতে কি সুখ ও আনন্দের তরঙ্গ ওঠে আর পড়ে?

    নন্দর ছেলে চলিয়া গেলে শশী বলিল, বিন্দুকে বলেছিলে নন্দ, এখানে আসার কথা?

    বলেছিলাম। সে আসবে না।

    আসবে না? ইহা অপ্রত্যাশিত নয়। তবু শশী যেন নিভিয়া গেল।

    চাকর তামাক দিয়া গিয়াছিল, নন্দর হাতের নলটা সাপের মতো দুলিয়া উঠিল, অন্যমনস্কভাবে সে বলিতে লাগিল, এমন জেদি মানুষ জন্মে দেখিনি শশী কথা বললে হেসে উড়িয়ে দেয়। রাগের মাথায় ঠিক থাকেনি দিকবিদিক,-কিন্তু সত্যি বলছি শশী, শেষের দিকে ওই আমাকে চালিয়ে নিয়ে এসেছে, থামতে দেয়নি। স্পষ্ট করে আমি অবশ্য এতদিন বলিনি কিছু মনটা আমার কদুর বদলে গেছে আগে ভালো বুঝতে পারিনি শশী। এবার যখন গাওদিয়া চলে গেল সেই থেকে কেমন—

    নন্দ হেন লোক, সেও আজ তামাক টানার ছলে কাশিল।

    এখানে আনবার জন্য কত তোশামোদ করছি, কী আর বলব তোমাকে। কত বলছি যে আর কেন, চলো এবার ও-বাড়িতে, সকলের সঙ্গে মিলেমিশে থাকবে-খোকার মা আজ এক বছর শয্যাশায়ী, তার ভালোমন্দ কিছু হলে এতবড় সংসার তো তোমারি। না, আমি আর একটা বিয়ে করতে যাব এই বয়েসে। তা শুনে এমন করে হাসে যেন ঠাট্টা করছি।

    শশী বলিল, তোমার মুখে এসব কথা হয়তো ঠাট্টার মতোই শোনায় নন্দ।

    নন্দর ভাবপ্রবণতা ভাঙিয়া গেল। মুখে দেখা দিল মেঘের মতো বিরাগের ছায়া। হাতের নল নামাইয়া, চোখের ভুরু কুচকাইয়া সে বলিল, তুমি যদি পরিহাস করতে এসে থাকো–

    পরিহাস? তোমার সঙ্গে? এরকম কান্ডজ্ঞানের অভাব না হলে তুমি এমন সব কাণ্ড করতে পারো!

    শশী আর বসিল না। তাঁহাকে আগাইয়া দিতে নন্দ উঠিয়া আসিল না, যে চা ও খাবার শশী স্পর্শ করে নাই সেদিকে চাহিয়া কী যেন ভাবিতে লাগিল।

    গ্রামে ফিরিয়া দিনগুলি এবার অপ্রীতিকর মানসিক চাঞ্চল্যের মধ্যে কাটিতে থাকে। গরমে শরীরও কিছু খারাপ হইয়া যায় শশীর। এ বছর একেবারে বৃষ্টি নাই। গ্রামের শ্যামল রূপ রোদে পুড়িয়া একেবারে বাদামি হইয়া উঠিয়াছে। এটা কলেরার মরসুমের সময়, শ্মশানে ধুম লাগিয়াই আছে। বেশি খাঁটিতে হওয়ায় শশীর মেজাজ গিয়াছে আরও বিগড়াইয়া। স্নানাহারের সময় পায় না, অথচ তেমন পয়সা নাই। কলিকাতায় এরকম পশার হইলে এতদিনে সে বোধ হয় লাখপতি হইয়া যাইত।

    পরাণ আশা করিয়াছিল কলিকাতা হইতে শশী তাহাকে মতির খবর আনিয়া দিবে। শশী ফিরিয়াছে শুনিবামাত্র সে ছুটিয়া আসিয়াছিল। শশী মুখ তুলিয়া চাহিতে পারে নাই। পরাণও চুপচাপ খানিক বসিয়া থাকিয়া উঠিয়া গিয়াছিল। সেটা সকাল। তারপর দুপুরে আসিয়াছিল কুসুম। বলিয়াছিল, কেন যে মরছে ভেবে ভেবে চুরি করে তো আর নিয়ে যায়নি বোনকে কেউ, সে গেছে সোয়ামির সঙ্গে, অত ভাবনা কিসের দিনরাত? —কী আনলেন আমার জন্যে?

    তোমার জন্যে? কিছু আনিনি বউ।

    কী ভুলো মন মাগো কত করে যে বলে দিলাম আনতে?

    শশী অবাক হইয়া বলিয়াছিল, কী আবার আনতে বললে তুমি? কখন বললে?

    ওমা, বলিলি বুঝি? তা হবে হয়তো বলব বলে বলিনি শেষ পর্যন্ত? কিন্তু না বললে কি আনতে নেই?

    কী অকৃত্রিম ছেলেমানুষি কুসুমের, কী নির্মল হাসি তারপর কয়েকদিন কুসুমের সঙ্গে দেখা হয় নাই, এই হাসি শশীর মনে ছিল। জোর করিয়া মনে রাখিয়াছিল। ভাপসা গুমোট, শুষ্ক ডোবা-পুকুর-ভরা গ্রামের রুক্ষ মূর্তি আর কলেরা রোগীর কদর্য সান্নিধ্য, এই সমস্ত পীড়নের মধ্যে কুসুমের খাপছাড়া হাসিটুকু ভিন্ন মনে করিবার মতো আর কিছু শশী খুঁজিয়া পায় নাই।

    কিছু ভালো লাগে না শশীর,-নাগ্রাম, না গ্রামের মানুষ। শেষরাত্রে টেকির শব্দে ঘুম ভাঙিয়া যায়। তখন হইতে সন্ধ্যার নীরবতা আসিবার আগে কায়েতপাড়ার পথের ধারে বটগাছটার শাখায় জমায়েত পাখির কলরব শুরু হওয়া পর্যন্ত, বন্য ও গৃহস্থ জীবনের যত বিচিত্র শব্দ শশীর কানে আসে, সব যেন ঢাকিয়া যায় যামিনীর হামানদিস্তার ঠকঠক শব্দে আর গোপলের গম্ভীর কাশির আওয়াজে। বাড়িতে মেয়ে-পুরুষ হাসে কাঁদে কলহ করে, বাহিরে যুবক ও বৃদ্ধের দল তাস খেলে আড্ডা দেয়, চাষি মজুর গয়লা কুমোর স্যাকরা জেলে দোকানি এরা ছাড়া অলস অকৰ্মণ্যতার অতিরিক্ত ভদ্র পেশা যাদের আছে আঙুলে গুনিয়া ফেলা যায়। শ্রীনাথের দোকানের লালচে আলোর কীর্তি নিয়োগীর মাথার তেলমাখা আবটি চকচক করিতে দেখিলে নৈশ আকাশের তারা ও চাঁদের আলোর দিকে চাহিতে শশীর লজ্জা করে! বাগদীপাড়ায় জেলফেরত কয়েকজন বীরপুরুষ রাতদুপুরে পরস্পরের মাথা ফাটাইয়া দেয়, শশীর হাতের বাধা ব্যান্ডেজ তাহাদের খোলা হয় জেলের হাসপাতালে। সুদেব বলিয়া বেড়ায়, মতির বিবাহটা মিছে, ছল—শশী কর্তৃক মতিকে গাপ করার কৌশল মাত্র।–ভদ্দরপানা যার সঙ্গে বিয়ে হয় মতির কত টাকা সে খেয়েছে জানো ছোটোবাবুর ঠেয়ে? হয়তো বাজিতপুরে হয়তো আর কোথাও মতিকে শশী লুকাইয়া রাখিয়াছে,–গাঁয়ে যে শশী থাকে না, রোগী দেখিবার ছলে কোথায় চলিয়া যায়, সুদেব ছাড়া আর কে তার অর্থ বুঝিবে! অন্ধকার রাত্রে গোয়ালপাড়ার আট-দশটা ছোকরা একদিন দু-তিন গামলা গোবর-গোলা জল শশীর গায়ে ঢালিয়া দেয়,–গোয়ালপাড়ার গোবর অতি সুপ্রাপ্য। পরদিন গোপালের গোমস্তা বাকি টাকার জন্য সদরে নালিশ রুজু করিতে গিয়াছে খবর পাইয়া গোয়ালপাড়ার মোড়ল বিপিন অবশ্য আসিয়া কাদিয়া পড়ে,-গোটাকয়েক নিরীহ ছোকরাকে ধরিয়া আয়িা কান মলায়, নাকে খত দেওয়ায়। তাতে মন শান্ত হওয়ার কথা নয়।

    তারপর আছে সেনদিদি। অন্ধকারে চোখের মতো পলায়নপর অবস্থায় সামনে পড়িয়া থমকিয়া দাঁড়ানো যেন আজকাল তার বিশেস একটা প্রিয় অভিনয়ে দাঁড়াইয়া গিয়াছে। অদূরে হ্রকার লাল আগুন হঠাৎ কোথায় অদৃশ্য হয়, খানিক পরে অন্দরে শোনা যায় গোপালের গলা।

    সেনদিদি নূতন একটা আব্দার আরম্ভ করিয়াছে শশীর কাছে। গ্রামের একটি বৃদ্ধের চোখের ছানি কাটিয়া শশী সম্প্রতি তাহার দৃষ্টিশক্তি ফিরাইয়া আনিয়াছে। সেই হইতে সেনদিদি তাহাকে রেহাই দেয় না। বলে, ও শশী, দাও বাবা দাও, কেটে-কুটে ওষুধ দিয়ে যেমন করে হোক, দাও চোখটা আমার সারিয়ে।

    শশী বলে, চোখ আপনার নষ্ট হয়ে গেছে সেনদিদি, ও আর সারবে না।

    সেনদিদি ব্যাকুল হইয়া বলে, তুমি কেটে-কুটে দিলেই সারবে শশী, আমি তো জন্মান্ধ নই, অ্যাঁ? আমার জন্যে তোমার এত মায়া ছিল সেসব কোথায় গেল বাবা?

    সেনদিদিকে বোঝানো দায়। কিছুই সে বুঝতে চায় না। শশীর হাতে চাপিয়া ধরিয়া কাদিয়া ফেলে—সবাই কানী বলে, আমার তা সয় না শশী। ওরে বাপরে, আমি কানি!

    নিরূপায় শশী ভাবিয়া চিন্তিয়া বলে, কাচের চোখ নেবেন সেনদিদি, নকল চোখ? দেখতে অবশ্য পাবেন না চোখে, তবে চোখটা আপনার আসল চোখের মতো দেখাবে, লোকে সহজে টের পাবে না।

    কাচের চোখ দিয়ে কী করব শশী!—বলিয়া সেনদিদি রাগিয়া ওঠে, তুমি ছাইয়ের ডাক্তার শশী, কিছু জানো তুমি চিকিচ্ছের। কর্তা যা বলে তা তো মিথ্যে নয় দেখছি তা হলে। তুমি চিকিচ্ছে করে চোখটা আমার খেয়েছ, অন্য কেউ হলে চোখ কি আমার নষ্ট হত। আজকে তুমি কাচের চোখ দিয়ে আমায় ভোলোতে চাও? পাজি, হতভাগা, জোচ্চোর মর তুই, মর!

    শশী চুপ করিয়া থাকে। কত ভালোবাসিত সেনদিদি তাকে, তার উপর কত বিশ্বাস ছিল। তবু শশী আর অবাক হয় না। যে স্নেহ-মমতার ভিত্তি ভাবপ্রবণতা, তা যে বুদ্ধদের মতো অস্থায়ী, শশী তা অনেককাল জানে।

    কদিন পরে সেনদিদি বলে, হ্যা শশী, কাচের চোখ লাগালে টের পাবে না লোকে?

    ভূমিকা নাই, সেদিনকার গালাগালির জন্য আপশোশ নাই, সোজা স্পষ্ট প্রশ্ন!

    সহজে পাবে না,–টের পেলেই বা কী এসে যায়? চোখটার জন্যে খারাপ দেখাচ্ছে এখন সেটা তো দেখাবে না।

    কবে লাগাবে চোখ?

    কাচের চোখের নামে সেদিন সেনদিদি খেপিয়া উঠিয়াছিল, আজ তাহার আগ্রহ দ্যাখো! শশী শান্তভাবেই বলে, আমি তো পারব না সেনদিদি, আমার কাছে যন্ত্রপাতি নেই। বাজিতপুরে হবে কি না তাও জানি না। কলকাতা গিয়ে করাতে হবে, সময় লাগবে অনেক। আপনার ভালো চোখটির সঙ্গে রংটং মিলিয়ে চোখ হয়তো তৈরি করেও নিতে হবে।

    কবে নিয়ে যাবে কলকাতা?

    একথা বলিতে সেনদিদির দ্বিধা হয় না, সঙ্কোচ হয় না! কত যেন দাবি তাহার কাছে শশীর উপর। প্রথমে শশীর রাগ হয়। তারপর মনে মনে সে হাসে। বলে, কবে যেতে পারব তা তো ঠিক নেই সেনদিদি। রোগী নিয়ে কী রকম ব্যস্ত হয়ে আছি তা তো দেখতে পান? পূজোর আগে আমার যাওয়া যাওয়া হবে কি না সন্দেহ, আর কারো সঙ্গে যান না?

    সেনদিদি কাঁদোকাঁদো হইয়া বলে, আমার কে আছে শশী, কে আমাকে নিয়ে যাবে। আমি মরলে সবাই বাঁচে, কে আমার জন্যে এসব হাঙ্গামা করবে? সময় করে একবারটি আমায় নিয়ে চলো বাবা, চোখটা ঠিক করে আনি।

    মুখের দাগ মিলাইয়া দিবার ওষুধও তাহাকে শশীর দিতে হয়। দুদিন না যাইতেই আসিয়া নালিশ জানায়, কই দাগ তো শশী মিলিয়ে যাচ্ছে না একটুও কীরকম ওষুধ দিচ্ছ?

    শশী ক্লান্তস্বরে বলে, যাবে সেনদিদি যাবে, বসন্তের দাগ কি এত শিগগির যায়?

     

    যত দিন যায়, গ্রাম ছাড়িয়া নূতন জগতে নূতন করিয়া জীবন আরম্ভ করিবার কল্পনা শশীর মনে জোরালো হইয়া আসে। সে বুঝিতে পারিয়াছে জোর করিয়া না গেলে সে কোনোদিন এই সংকীর্ণ আবেষ্টনী হইতে মুক্তি পাইবে না। ভবিষ্যতের জন্য স্থগিত রাখিয়া চলিতে থাকিলে জীবন শেষ হইয়া আসিবে, তবু নাগাল মিলিবে না ভবিষ্যতের। তা ছাড়া, জীবনে যে বিপুল ও মনোরম সমারোহ সে আনিতে চায় তাহা সম্ভব করিতে হইলে শুধু গ্রাম ছাড়িয়া গেলেই তাহার চলিবে না, আত্মীয়বন্ধু সকলের সঙ্গে মনের সম্পর্কও ভুলিতে হইবে। এদের সীমাবদ্ধ সংকীর্ণ জীবনের সুখ-দুঃখের ঢেউ যদি তাকে শক্তি সে পাইবে কেন? সে আবেষ্টনীতে যেভাবে সে বাঁচিতে চায় তার ব্যক্তিগত জীবনে তাহা বিপ্লবের সমান। এ বিপ্লব তাকে আনিতে হইবে একা, তারপর নবসৃষ্ট জগতে বাস করিতে হইবে একা-সেখানে তো এদের স্থান নাই। বিন্দুর কথা ভাবিয়া সে যদি কাতর হইয়া থাকে, কুসুম গোপনে কাঁদে কি না আর মতি কোথায় গেল তাই ভাবে সর্বদা, সিন্ধুকে মনের মতো করিয়া গড়িয়া তুলিতে পারিল না ভাবিয়া ক্ষোভ করে, নিজের জীবনকে সে গুছাইবে কখন, কখন করিবে নিজের কাজ? যাদের সাহচর্য অশান্তিকর, যাদের সে কাছে চায় না, জীবনের সার্থকতা আনিতে হইলে নির্মমভাবে মন হইতে তাহাদের সরাইয়া দিতে হইবে।

    যাদব বলেন, তা হবে না দাদা? বিরাগী হতে হলে মনে বিরাগ চাই। বাইশ বছর বয়সে এ গাঁয়ে এসে বাসা বাঁধলাম, কেউ জানে না কোথা থেকে এলাম, কী বৃত্তান্ত। আমার সব ছিল শশী-বাড়িঘর, আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব-চল্লিশ বছর কারো খবর রাখি না। বাপ-মা মরেছে, খবরও পাইনি, শ্রান্ধও করিনি। ভাইবোন ছিল গোটাকতক, আছে না গেছে তাও জানি না। সেজন্য দুঃখও নেই শশী। নতুন ঘর বাঁধতে হলে পুরোনো খড়কুটো বাদ দিতে হবে না?

    কষ্ট হত না প্রথমে?–শশী বলে।

    কদিন কষ্ট হত? ভুলো মন মানুষের, দুদিনে ভুলে যায়। সহ্য হল না বলেই ছেড়ে এলাম না সকলকে?

    পাগলদিদি হাসিয়া বলেন, সুখে শান্তিতে আছি এখনে–নয় গো?

    চল্লিশ বছরের সুখশান্তি! কোন গ্রামে কী জীবন ছিল যাদবের কে জানে? বাইশ বছর বয়সে কিসের লোভে সে গৃহ ছাড়িয়ছিল? গৃহী সাধকের এই জীবন কি তখনও কাম্য ছিল যাদবের, দশটা গ্রামের ভয় ও শ্রদ্ধায় সকলের উপরের একটি আসন? তা যদি হয়, জীবনে তিনি অতুলনীয় সাফল্য লাভ করিয়াছেন বলিতে হইবে। সিদ্ধপুরুষ বলিয়া চারিদিকে নাম রটিয়াছে, পদধূলির জন্য সকলে লোলুপ।

    ভালো করিয়া যাদবকে শশী কোনোদিন বুঝিতে পারে না। নিম্পূহ নির্বিকার মানুষ, কারো প্রণাম গ্রহণ করে না, ভক্তি-গদগদ কথা শুয়িা অবিচলিত থাকেন, কত লোক মন্ত্রশিষ্য হইবার জন্য ব্যাকুল, আজ পর্যন্ত একটি শিষ্যও করেন নাই। তবু, শশীর মনে হয়, প্রণাম যেন যাদব কামনা করেন। পদধূলি দেন না, আশীৰ্বাদ করেন না, পাষাণ দেবতার মতো উপেক্ষা করে ভক্তিকে,শশীর সন্দেহ জাগে লোকের মনে ভয় ও শ্রদ্ধা জাগানোর কৌশল এসব। তবে তাতে কী আসে যায়? মানুষের কাছে অলৌকিক শক্তিসম্পন্ন হইয়া থাকার অভ্যাস যে মিশিয়া আছে চল্লিশ বছরের সুখশান্তির সঙ্গে। নিলোভ সদাচারী শান্তিপূর্ণ নিরীহ মানুষ, মানুষের কাছে অপার্থিব ক্ষমতার অধিকারী হইয়া থাকিবার কামনাও পার্থিব কোনো লাভের জন্য নয়। ও যেন একটা শখ যাদবের, একটা খেয়াল।

    পাগলদিদি আম কাটিয়া দেন শশীকে, একটা খোলা পুঁথির সামনে বসিয়া স্থল শুভ্র উপবীতখানি যাদব আঙুলে জড়ান। দ্বিজত্বের এই চিহ্নটি শশী তাহার কখনও মলিন দেখিল না। শশীর দৃষ্টিপাতে যাদব হাসেন, পৈতে কখনও মাজি না শশী।

    মাজেন না?

    না। ও কাজের বরাত দিয়েছি সূর্যকে।

    সূর্যকে? —শশী সবিস্ময়ে বলে।

    যাদব গম্ভীর মুখে বলেন, সূর্যকে। সূর্যবিজ্ঞান বিশ্বাস করো না তাই অবাক হও, নইলে এ তো তুচ্ছ সূর্যজ্ঞিান যে জানে তার উপবীত কখনও ময়লা হতে পারে? কী করি জানো? স্নান করে উঠে রোজ একবার রোদে মেলে ধরি, ধবধবে সাদা হয়ে যায়। আজ খানিকটা বাদ পড়ে ছিল, কেমন ময়লা হয়ে আছে দ্যাখো—

    যাদব পইতা মেলিয়া ধরেন, শশী লক্ষ করিয়া দ্যাখে রোদের পাশে ছায়ার মতো পৈতার খানিকটা সত্যসত্যই নিম্প্রভ, মলিন। সূর্যবিজ্ঞানে আর নিজের অত্যাশ্চর্য ক্ষমতায় শশীর বিশ্বাস জন্মানোর জন্য কত যত্নে না-জানি যাদব পৈতার ওই অংশটুকু পাতলা জল-মেশানো কালিতে ডুবাইয়াছেন, কালি যাতে বুঝা না যায়। শশীর হাসিও পায়, মায়াও হয়। তাকে অভিভূত করার জন্য এত ব্যাকুল প্রয়াস কেন যাদবের? অলৌকিক শক্তিতে অবিশ্বাস করিলেও যাদবকে শ্রদ্ধা সে তো কম করে না!

    যাদব বলেন, কত বললাম, শেখো, শশী শেখো, সূর্যবিজ্ঞানের ভূমিকাটুক অন্তত শেখো, ওষুধের বাক্স ঘাড়ে করে রোগী দেখে বেড়াতে হবে না। তা তো শিখলে না। যে বিজ্ঞানের ভিত্তিই মিথ্যে তাই নিয়ে মেতে রইলে। যাকে-তাকে দেবার বিদ্যা এ তো নয়, সারাজীবনে একটি শিষ্য পেলাম না যাকে শিখিয়ে যেতে পারি। এদিকে সময় হয়ে এল যাবার। শুধু তুমি একটু শিখতে পারো শশী, সবটা নয়, সবটা নেবার ক্ষমতা তোমারও নেই, শুধু ভূমিকাটুকু। তাই বা কজনে পায়? কায়মনোবাক্যে আজও তুমি ব্রহ্মচারী বলে—

    বিব্রত, বিস্মিত শশী শুনিয়া যায়। এ-ধরনের কথা যাদব মাঝে মাঝে বলেন, শশীও সায় দেয় না, প্রতিবাদও করে না। যাদবের শাস্ত ধূপগন্ধ ঘরে সে দুদণ্ডের জন্য জুড়াইতে আসে, তাকে এসব অবিশ্বাস্য কাহিনী শোনানো কেন? সে কি শ্রীনাথ মুদি যে শুনিতে শুনিতে গদগদ হইয়া মুখে ফেলা তুলিবে?

    শশীর অবিশ্বাস যাদব টের পান। শশীকে জয় করিবার জন্য তার এত বেশি আগ্রহের কারণও বোধ হয় তাই।

    বলেন, সূর্যবিজ্ঞান যে জানে, তার অসাধ্য কী? অতীত ভবিষ্যৎ তার নখদর্পণে। কবে কী ঘটিবে জীবনে কিছুই তাহার অজানা থাকে না। মৃত্যুর দিনটি পর্যন্ত দশ বিশ বছর আগে থেকে জেনে রাখতে পারে।

    পৈতাটা যাদব আঙুলে জড়ান আর খোলেন। দুচোখ জ্বলজ্বল করে। সাধে কি ভীরু গ্রামবাসী ভয় করে যাদবকে এমন জ্যোতিষ্মান চোখে চাহিয়া এমন জোরের সঙ্গে যাই তিনি বলুন, অবিশ্বাস করিবার সাহস কারো হওয়া সম্ভব নয়।

    আপনি জানেন? – শশী জিজ্ঞাস করে।

    জানি না? বিশ বছর থেকে জানি।–বলেন যাদব।

    হাসি পায় বলিয়া শশী ফস করিয়া জিজ্ঞাসা করিয়া বসে, কবে?

    যাদবও সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেয়, রথের দিন। আমি রথের দিন মরব শশী। কবে কোন সালের রথের দিন যাদব দেহত্যাগ করবেন ঠিক হইয়া আছে, শশী আর সে কথা জিজ্ঞাসা করে না, কারণ কথাটা বলিয়াই যাদব হঠাৎ এমন ভীতভাবে স্তব্ধ হইয়া যায় এবং পাগলদিদি এমনভাবে অস্ফুট একটা শব্দ করিয়া ওঠেন যে শশী লজ্জবোধ করে। অবিশ্বাসের পীড়নে উত্তেজিত করিয়া অমন অসাবধানে যাদবকে ওকথা বলানো তাহার উচিত হয় নাই। আর ছ’মাস এক বছরের বেশি গ্রামে শশী থাকিবে না একথা যাদব জানেন। তবু, তার মধ্যেই অসুখ-বিসুখ হইয়া যদি তিনি মরিতে বসেন আর শশীকেই তার চিকিৎসা করিতে আসিতে হয়, মরিতেও বেচারির সুখ থাকিবে না!

    কথাটা চাপা দিবার জন্য শশী অন্য কথা পাড়ে। বলে, জানেন পণ্ডিতমশায়, চলে আমি যাব ঠিক, কিন্তু কেমন ভয় হয় মাঝে মাঝে। শুধু শহরে গিয়ে ডাক্তারি করার ইচ্ছা থাকলে কোনো কথা ছিল না, এত বড় বড় কথা আমি ভাবি! বিদেশে যাব, ফিরে এসে কলকাতায় বসব, মানুষের শরীর আর মনের রোগ সম্বন্ধে নতুন নতুন গবেষণা করব, দেশ-বিদেশে নাম হবে, টাকা হবে–।

    যাদব যেমন করিয়া সূর্যবিজ্ঞানের কথা বলতেছিলেন, তেমনিভাবে শশী এবার নিজের কল্পনার কথা বলে।

    সেই হল সূত্রপাত। রথের দিন দেহত্যাগ করিবার কথা যাদব যা বলিয়াছিলেন শশী জানে তা নেহাত কথার কথা, হঠাৎ মুখ দিয়া বাহির হইয়াছে। হারু ঘোষের বাড়ি গিয়া কথায় কথায় পরাণের কাছে এ গল্প সে কেন করিয়াছিল শশী জানে না। বোধ হয় কুসুমকে শোনানোর জন্য। যেখানে যা-কিছু বিচিত্র ব্যাপার সে প্রত্যক্ষ করে, পরাণকে বলিবার ছলে কুসুমকে সেসব শোনানোর কেমন একটা অভ্যাস তাহার জন্মিয়া যাইতেছে।

    তারপর কেমন করিয়া কথাটা যে ছড়াইয়া গেল! ছড়াইয়া গেল একেবারে দিগদিগন্তে। ঝোঁকের মাথায় শশীর কাছে যাদব যে অর্থহীন কথাটা বলিয়াছিলেন গ্রামে তাহা এমন আলোড়ন তুলিবে কে জানিত।

    শশী বাজিতপুরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হইতেছিল, ছুটিয়া আসিল শ্ৰীনাথ। সত্যি ছোটোবাবু, দেবতা দেহ রাখবেন?

    শশী বলিল, তুমি কী পাগল শ্রীনাথ? কথার ছলে কি বলেছেন না বলেছেন–

    শ্রীনাথ বলিল, কথার ছলে তো বলছেন ছোটোবাবু, নইলে নিজে কী রটিয়ে বেড়াবে শুধু এই কথাটি আপনি বলেন ছোটোবাবু, নিজের মুখে দেবতা উচ্চারণ করেছেন কি রথের দিন দেহ রাখবেন?

    শশী বলিল, বলেছেন বটে, কিন্তু কী জান–

    হায় সর্বনাশ। বলিয়া শ্ৰীনাথ আকুল হইয়া ছুটিয়া গেল।

    ব্যাপারটা যে এত বিরাট হইয়া উঠিবে তখনো শশী কল্পনা করে নাই। নতুবা শ্রীনাথকে ডাকিয়া সে বলিয়া দিত যে রথের দিন যাদব দেহ রাখিবেন বলিয়াছেন বটে কিন্তু সে কোনও এক রথের দিন, আগামী রথ নয়। হাসপাতালে ভরতি করিয়া দিবার জন্য একটি কঠিন অপারেশন রোগীর সঙ্গে শশী বাজিতপুরে যাইতেছিল। রোগীটির অবস্থা বড় শোচনীয়। হাসপাতালে লইয়া যাওয়ার ব্যবস্থা দেওয়া উচিত হইয়া কি না, পথেই যদি শেষ হইয়া যায় তবে বড়ই দুঃখের কথা হইবে, এইসব ভাবিতে ভাবিতে শশী অন্যমনস্ক হইয়া গিয়াছিল।

    বাজিতপুরের সরকারি ডাক্তারের সঙ্গে শশীর ঘনিষ্ঠতা হইয়াছিল। সম্প্রতি তিনি বদলি হইয়া যাইতেছেন। শশীকে সেদিন তিনি ফিরিতে দিলেন না। পরদিন গ্রামে ফিরিয়া কায়েতপাড়ার পথে লোকের ভিড় দেখিয়া শশী অবাক হইয়া গেল। যাদবের ভাঙা জীর্ণ বাড়ির সম্মুখে অনেক লোক জমিয়াছে। যাদব বাহিরে আসিয়া বসিয়াছেন, পদধূলির জন্য সকলে কাড়াকাড়ি করিতেছে। সজল কণ্ঠে শ্রীনাথ করিতেছে হায় হায়।

    একজন শশীকে বলিল, সামনের রথের দিন পণ্ডিত মশায় দেহ রাখবেন ছোটোবাবু।

    সামনের রথের দিন? কে বললে একথা? শ্ৰীমুখে নিজেই বলেছেন। দূর-গাঁ থেকে লোক আসছে ছোটোবাবু, খবর পেয়ে। শেতলবাবু এই মাত্তর ঘুরে গেলেন।

    ওদিক দিয়া ঘুরিয়া শশী বাড়ির ভিতের গেল। মেয়েরা দল বাঁধিয়া আসিতে শুরু করিয়াছিল, পাগলদিদি দরজা খোলেন নাই। শশীর ডাকাডাকিতে দুয়ার খুলিয়া দিলেন, কাদিয়া বলিলেন, ও শশী, এমন সর্বনাশ কেন করলি আমার, কেন রটালি ও কথা?

    শশী বিবর্ণমুখে বলিল, আমি তো ওকথা রটাইনি পাগলদিদি।

    পাগলদিদি বলিলেন, একদল লোক সঙ্গে নিয়ে শ্রীনাথ এসে কেদে পড়ল শশী, বলল, তুই নাকি বলেছিস ওঁর নিজের মুখে শুনে গেলি এবার রথের দিন—

    এবার রথের দিন? আমি তো বলিনি পাগলদিদি। পণ্ডিতমশায় স্বীকার করলেন?

    পাগলদিদি সায় দিলেন।

    শশী ব্যাকুল হইয়া বলিল, কেন তা করলেন? এ কী পাগলামি! পণ্ডিতমশায় বলতে পারলেন না এবারকার রথের কথা বলেননি?

    কই তা বললেন? হাসিমুখে মেনে নিলেন। কী হবে এবার?

    বাহিরের কলরব ভাসিয়া আসিতেছিল, শশী দরজাটা ভেজাইয়া দিল। সমস্ত ব্যাপারটা এমন দুর্বোধ্য মনে হইতেছিল শশীর যাদবের সম্বন্ধে এরকম একটা জনরব একেবারেই বিস্ময়কর নয়, মাঝে মাঝে তার সম্বন্ধে অনেক অস্তুত কথা রটে। যাদব সমর্থন করিলেন কেন? মাথা তো খারাপ নয় যাদবের, পাগল তো তিনি নন। একদল লোক সঙ্গে করিয়া শ্রীনাথ আসিয়া কাদিয়া পড়িল, অমনি কোনো কথা বিবেচনা না করিয়া যাদব স্বীকার করিয়া বসিলেন যে আগামী রথের দিন তিনি স্বেচ্ছায় মরিবেন? এরকম স্বীকারোক্তির ফলাফলটা একবার ভাবিয়া দেখিলেন না? কে জানে কী হইবে এবার রথের দিন যাদব যদি না মরেন, মানুষের কাছে মিথ্যাবাদী হইয়া থাকিতে হইবে তাকে; তার সিদ্ধিতে, তার শক্তিতে লোকের বিশ্বাস থাকিবে না,-যাদবের কাছে তাহা মৃত্যুর চেয়ে শতগুণে ভয়ংকর মানুষের অন্ধ ভক্তি ছাড়া বাঁচিয়া থাকিবার আর তো কোনো অবলম্বন তাহার নাই। একথা যাদব কেন স্বীকার করিয়া লইলেন? বলিলেই হইত এ শুধু জনরব, ভিত্তিহীন গুজব! যাদবের কথা কে অবিশ্বাস করিত রথের তো বেশিদিন বাকি নেই। সেদিন যাদব কেমন করিয়া মরিবেন? না মরিলে কেমন করিয়া মুখ দেখাইবেন গ্রামে?

    অনেকক্ষণ পরে ক্লান্ত যাদব বিশ্রামের জন্য ভিতরে আসিলেন। কয়েকটি ভক্তও সঙ্গে সঙ্গে ভিতরে আসিতেছিল, রূঢ়ভাবে ধাক্কা দিয়া তাহাএর বাহির করিয়া করিয়া কানি সদর দরজা বন্ধ করিয়া দিল। ভিড়ে, গরমে যাদব ঘামিয়া বিবর্ণ হইয়া গিয়াছেন, পাগলদিদি তাড়াতাড়ি পাখা আনিয়া বাতাস করতে লাগিলেন ফোকলা মুখের চিরন্তন হসিটি তাঁহার নিভিয়া গিয়াছে। দুচোখ-ভরা জল–বার্ধক্যের স্তিমিত দুটি চোখ।

    এ কী করলেন পণ্ডিতমশায়? স্বীকার করলেন কেন? ব্যাকুলভাবে শশী জিজ্ঞাসা করিল।

    কেন করলাম? রথের দিন মরব যে আমি। বলিনি তোমাকে? শান্তভাবে জবাব দিলেন যাদব।

    এবারকার রথের কথা তো বলেননি আমাকে?

    বলেছিলাম বইকী। এবারকার রথের কথাই বলেছিলাম। তুমি এত বিচলিত হচ্ছ কেন শশী? আমার কাছে কী জীবন-মরণের ভেদ আছে? গুরুর কৃপায় সূর্যবিজ্ঞান যেদিন আয়ত্ত হল, যেদিন সিদ্ধিলাভ করলাম, ও-পার্থক্য সেদিন ঘুচে গেছে শশী। এমনি হিসাবও যদি ধরো, মরবার বয়েস কি আমার হয়নি?

    শশী কাতর হইয়া বলিল, আমার জন্যই এ কাণ্ড হল। আমার যে কীরকম লাগছে পণ্ডিতমশায়–

    যাদব হাসিয়া বলিলেন, বাসাংসি জীর্ণানি…

    শশীর মনে পড়িতেছিল, সেদিন রাতের কথা। কলিকাতা-ফেরত যাদব শ্রীনাথের দোকান হইতে সাপের ভয়ে যেদিন লাঠি ঠুকিয়া ঠুকিয়া বাড়ি আসিয়াছিলেন। জীবনের সেই ভীরু মমতা কোথায় গেল যাদবের? কোথা হইতে আসিল মৃত্যু সম্বন্ধে এই প্রশান্ত ঔদাস্য? যাদবের সম্বন্ধে সে কি আগাগোড়া ভুল করিয়াছে? লোক যে অলৌকিক শক্তির কথা বলে সত্যই কি তা আছে যাদবের? খানকয়েক ডাক্তারি-বইপড়া বিদ্যায় হয়তো এসব ব্যাপারের বিচার চলে না, হয়তো তার অবিশ্বাস শুধু অজ্ঞানতার অন্ধকার!

    অনেক যুক্তিতর্ক অনুরোধ উপরোধেও যাদবকে শশী কিছুঁতেই টলাইতে পারিল না। আগামী রথের কথা বলেন নাই, একথা কিছুঁতেই স্বীকার করিলেন না। শশী কোনো ক্ষতি করে নাই। কথাটা না রটিলে রথের দিন তিনি অবশ্যই দেহত্যাগ করিতেন। জনরব তুলিয়া দিয়া শশী যদি তার কোনো অসুবিধা করিয়া থাকে তা শুধু এই যে, লোক পদধূলির জন্য জ্বালাতন করিতেছে, আর কিছু নয়।

    কিছুতেই এ মতলব ছাড়বেন না পণ্ডিতমশায়?

    তাই কী হয় শশী? বিশ বছর আগে থেকে এ যে ঠিক হয়ে আছে।

    কই পাগলদিদি তো কিছু জানতেন না?

    ওকে কি বলেছি যে জানবে? সময় এগিয়ে এসেছে তাই কথায় কথায় সেদিন তোমায় বললাম। নইলে একেবারে সেই যাবার দিন বলে বিদায় নিতাম।

    পিছিয়েও দিতে পারেন? তাই বলুন না সকলকে? বলুন যে আপনার অনেক কাজ বাকি, তাই ভেবেচিন্তে দু-চার বছর পিছিয়ে দিলেন দিনটা?

    কথাটা বোধ হয় যাদবের মনে লাগে। উৎসুক দৃষ্টিতে তিনি শশীর মুখের দিতে চাহিয়া থাকেন, শশীর মনে হয় একটি ফাঁদে-পড়া জীবন যেন হঠাৎ বেড়ার গায়ে ছোট একটি ফাঁক দেখিতে পাইয়াছে। তারপর আত্মসম্বরণ করিয়া যাদব মাথা নাড়েন।

    লোকে হাসবে শশী, টিটকারি দেবে।

    বলিয়া তাড়াতাড়ি যোগ দেন, সেজন্যও নয়। যোগসাধন করে যেসব শক্তি পাওয়া যায়, ভগবানের নিয়মকে ফাঁকি দেবার জন্য তার ব্যবহার নিষেধ শশী।

    একে ওকে জিজ্ঞাসা করিয়া সারাদিনের চেষ্টায় শশী কিছু কিছু বুঝিতে পারিল, বিনা প্রতিবাদে যাদব কেন জনরবকে মানিয়া লাইয়াছেন। কথাটা ছড়াইয়াছিল পল্পবিত হইয়া। ভক্তদের মধ্যে অনেকে জানিত যাদব বহুদিন হইতে শশীকে শিষ্য করিবার চেষ্টা করিতেছেন, শশীর এ সৌভাগ্যে তাহারা হিংসা করিয়াছে। কাল কুসুম নাকি ব্যস্ত ও উত্তেজিতভাবে বলিয়া বেড়াইয়াছিল যে স্নান করিয়া পাগলদিদিকে সে একবার প্রণাম করিতে গিয়াছিল, স্বকৰ্ণে শুনিয়া আসিয়াছে রথের দিন মরিবেন বলিয়া তাড়াতাড়ি শিষ্যত্ব গ্রহণের জন্য শশীকে যাদব পীড়াপীড়ি করিতেছেন। এসব ছাড়া আরও অনেক কথাই রটিয়াছিল। তবু, তখনও জনরবটা অস্বীকার করিবার উপায় হয়তো থাকিত যাদবের। বাজিতপুরে যাওয়ার আগে শ্রীনাথকে শশী যা বলিয়া গিয়াছিল তাহাই যাদবের সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হইয়াছে। শশীর কথা সহজে লোকে অবিশ্বাস করে না। তা ছাড়া, যাদবের বিশেষ প্রিয়পাত্র বলিয়াই লোকে তাহাকে জানে। তবু, শশী গ্রামে থাকিলে যাদব হয়তো স্বীকার করিবার আগে তাহাকে ডাকিয়া পাঠাইতেন, বলিতেন, এরা কী বলছে শোনো শশী। কিন্তু তাকে পাওয়া যায় নাই। গ্রামে আলোড়ন তুলিয়া দিয়া সে চলিয়া গিয়াছিল, তারপর সারাজীবনের চেষ্টায় গড়িয়া তোলা মানুষের অস্বাভাবিক ভক্তি ক্ষুন্ন হইবার ভয়ে, খানিকটা এই ভক্তি বাড়ানোর লোভে যাদব জনমতের স্রোতে ভাসিয়া গিয়াছেন।

    কীরকম হইয়াছিল শশী কিছু কিছু অনুমান করিতে পারে। রথের দিন মরিবার কথা শশীকে তিনি যাহা বলিয়াছিলেন সেকথা যাদবের স্মরণ ছিল। শশীর কথায় গ্রামের লোক কতখানি বিশ্বাস রাখে তাও তিনি মনে রাখিয়াছিলেন। শশী গ্রামে নাই শুনিয়া ভাবিয়াছিলেন, এখন যদি অস্বীকার করেন যে আগামী রথের দিন মরিবার কথা শশীকে বলেন নাই, শশী গ্রামে ফিরিবামাত্ৰ সকলে তাহাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করবে। হয়তো ধৈর্য ধরিতে না পারিয়া কেহ বাজিতপুরে ছুটিয়া গিয়াও শশীর সঙ্গে দেখা করিয়া আসিবে। ব্যাপারটির গুরুত্ব শশী কিছু বুঝিতে পারবে না, একবার সে যা বলিয়াছে আবার সেই কথাই বলিবে। লোকে তখন মনে করিবে, হয় শশী মিথ্যাবাদী–নয় যাদব নিজে।

    আরও কত কী হয়তো যাদব ভাবিয়াছিলেন। হয়তো জলরবের পিছনে কিরূপ এবং কতখানি শক্তি আছে বুঝিতে না পারিয়া যাদবের ভয় হইয়াছিল যে বিরোধিতা করিলে জীবন অপেক্ষা যাহা তার প্রিয় তাহা বিনষ্ট হইয়া যাইবে। হয়তো সমবেত মানুষগুলির উচ্ছ্বাস নেশার মতো আচ্ছন্ন করিয়া দিয়াছিল যাদবকে। ভাববার তাহার সময় থাকে নাই।

    শশী কুসুমকে বলিল, মিথ্যে কথাগুলো বলে বেড়ালে কেন বউ?

    কুসুম বলিল, বলতে কেমন ইচ্ছে হচ্ছিল ছোটোবাবু, তাই।

    মাথাটা তোমার খারাপ নাকি সময় সময় তাই ভাবি বউ, অবাক মানুষ তুমি।

    কয়েকটা দিন চলিয়া গেল। কলিযুগের ইচ্ছামৃত্যু মহাপুরুষ যাদবকে দেখিবার জন্য নিকট ও দূরবর্তী গ্রামের লোক কায়েতপাড়ার পথটিকে জনাকুল করিয়া রাখল। মুড়িচিড়া বেচিয়া শ্রীনাথ আর লোচন ময়রা বোধ হয় বড়লোকই হইয়া গেল। শ্রীনাথ দু হাতে মুড়ি-চিড়া বেচে, দু হাতে পয়সা লইয়া কাঠের বাক্সে রাখে, সর্বক্ষণ হায় হায় করে। কয়েক দিনে পাগলদিদি শীর্ণ হইয়া গেলেন। শশীর মনেও গুরুভার চাপিয়া আছে। রথের দিন কী হইবে সে বুঝিতে পারে না। সত্যই কি মনের জোরে যাদব সেদিন দেহত্যাগ করিতে পারবেন? এ যে বিশ্বাস করা যায় না। না মরিলেই বা যাদবের কী অবস্থা হইবে?

    যেখানে যায় শশী, এই কথাই আলোচিত হইতে শুনিতে পায়। যাদব মরিবেন বলিয়া অনেকেরই আপসোস নাই, সংগ্রহে রথের দিনটির প্রতীক্ষা করিতেছে। শশীকে চুপ করিয়া থাকিতে হয়। মিথ্যার ভিত্তিতে যে এতবড় ব্যাপারটা গড়িয়াছে, মুখ ফুটিয়া প্রকাশ করিবার উপায় নাই। এই জনমতের উৎস সে, কিন্তু এ গুজবকে পরিবর্তিত করিবার ক্ষমতা তাহার নাই। এই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হইতে শুকনো চালে আগুন ধরিয়াছে, কারো ক্ষমতা নাই আগুন নিভাইতে পারে। একটা অদ্ভুত অসহায়তার উপলব্ধি হয় শশীর। প্রাত্যহিক জীবনে যাদবের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক থাকে না মানুষের, তাদের সমবেত মতামত যে কতদূর অনিবার্য একটা অন্ধ নির্মম শক্তি হইয়া উঠিতে পারে, আজ সে তাহা প্রথম বুঝিতে পারে।

    যাদবের বাড়ি গিয়া শশী বসে, যাদবের ভাব লক্ষ করে। মনে হয় কী একটা তীব্র নেশায় যাদব আচ্ছন্ন, অভিভূত হইয়া গিয়াছেন। ব্যাপারটা যেন তার কাছে ক্রমে ক্রমে পরম উপভোগ্য হইয়া উঠিতেছে। বিশ্রাম করিতে কিছুক্ষণের জন্য ভিতরে আসেন, তারপর আবার বাহিরে গিয়া দর্শনার্থীদের সামনে বসেন, মুখ দিয়া ফোয়ারার মতো ধর্ম ও দর্শন, যোগসাধনার কথা বাহির হয়,-সেসব অপূর্ব বাণী শুনিয়া শশী অবাক মানে। কী এক অত্যাশ্চর্য প্রেরণা যেন আসিয়াছে যাদবের। মুখের উপদেশ শুনিয়া অভিভূত হইয়া যাইতে হয়, এক অপরূপ আনন্দে অন্তর ভরিয়া যায়, এক অনায়ত্ত অধ্যাত্মজগতে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ব্যাকুলতা জাগে অপরিসীম।

    পাগলদিদি কাতরকণ্ঠে বলেন, এ কী হল শশী?

    শশী চুপচাপ ভাবে। একদিন সে যাদবকে বলে, পণ্ডিতমশায়, রথের দিন আমাদের ছেড়ে যাবেন যদি ঠিক করেই থাকেন, এখানে থেকে কী করবেন? পুরী চলে যান না? রথের আসল উৎসব হয় সেখানে, এখানে তো কিছুই নেই। বাবুদের রথ সবচেয়ে বড়, তাও তিন হাতের বেশি উঁচু হবে না। আপনার পুরী যাওয়াই উচিত।

    যাদবের যেন চমক ভাঙে।–-পুরী যেতে বলছ?

    শশীর ভয় যে পুরী যাইতে বলার আসল অর্থ যাদব হয়তো বুঝতে পারেন নাই। কত ভাবিয়া যাদবের সমস্যার এই সমাথা ন সে আবিষ্কার করিয়ারেছ। পুরী যান না যান যাদব, এতবড় দেশটা পড়িয়া আছে, পুরী যাওয়ার নাম করিয়া যেখানে খুশি তিনি চলিয়া যাইতে পারেন, বাস করিতে পারেন অজানা দেশে অচেনা মানুষের মধ্যে, রথের দিন না মরিলেও যেখানে তাহার লজ্জা নাই। স্পষ্ট করিয়া যাদবকে কথাটা বুঝাইয়া বলা যায় না। ভান তো যাদব শশীর কাছেও বজায় রাখিয়াছে। সে ইঙ্গিতে বলে—জিনিসপত্র নিয়ে পাগলদিদিকে সঙ্গে করে পুরই চলে যান পণ্ডিতমশায়,–গাঁয়ের লোক হৈচৈ করে যে কষ্টটা আপনাকে দিচ্ছে! শেষ সময়টা স্বস্তি পাচ্ছেন না। সেখানে কেউ আপনার নাগাল পাবে না।

    পাগলদিদি মেঝেতে এলাইয়া পড়িয়া ছিলেন, সহসা উঠিয়া বসেন। যাদব সবিস্ময়ে চাহিয়া থাকেন শশীর দিকে। শশী আবার ইঙ্গিতে বলে, পুরী যাবার নাম করে বেরিয়ে পড়ুন। তারপর পুরীই যে আপনাকে যেতে হবে তার তো কোনো মানে নেই? অন্য কোনো তীর্থে যেতে চান, পথে মত বদলে তাই যাবেন। অচেনা লোকের মধ্যে শেষ কটা দিন শান্তিতে কাটিয়ে দিতে পারবেন। গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ে শশী, –বেয়াড়া গাঁয়ের লোকের হাত থেকে আপনার রেহাই পাবার আর তো কোনো পথ দেখতে পাই না।

    কী বলছ শশী? শেষকালে পালিয়ে যাব?–যাদব বলেন।

    পালিয়ে কেন? তীর্থে যাবেন।–বলে শশী।

    যাদব কী ভাবেন কে জানে, দপ্‌ করিয়া জুলিয়া ওঠেন আগুনের মতো। রাগে কাঁপিতে কাঁপিতে বলেন-আমার সঙ্গে তুমি পরিহাস করছ শশী, ঠাট্টা জুড়েছ। আমি ভণ্ডামি আরম্ভ করেছি ভেবে নিয়েছ, না? কোনোদিন আমাকে তুমি বিশ্বাস করনি, চিরকাল ভেবে এসেছ সব ভড়ং,–লোক ঠকিয়ে আমি জীবন কাটিয়েছি! দুপাতা ইংরেজি পড়ে সবজান্তা হয়ে হয়ে উঠেছ, এসব তুমি কী বুঝবে? কী তুমি জানো যোগসাধনের? তুমি তো ম্লেচ্ছাচারী নাস্তিকা স্নেহ করি বলে কখনও কিছু বলিনি তোমাকে-উপদেশ দিয়ে ধর্মের কথা বলে বরং চেষ্টাই করেছি যাতে তোমার মতিগতি ফেরে। আসল শয়তান বাস করে তোমার মধ্যে, আমার সাধ্য কি কিছু করি তোমার জন্যে। যাও বাপু তুমি সামনে থেকে আমার, তোমার মুখ দেখলে পাপ হয়।

     

    কে জানিত শশীকে যাদব এমন করিয়া বকিতে পারেন!

    এ জগতে পাগলদিদির পর সে-ই যে তার সবচেয়ে মেহের পাত্ৰ!

    মুখ দেখিলে পাপ হয়! ম্লেচ্ছাচারী, নাস্তিক মরণ অথবা অপযশের মধ্যে একটা যাকে বাছিয়া লইতে হইবে কদিনের মধ্যে, তাকে বাঁচিবার উপায় বলিয়া দিতে যাওয়ার কী অপরূপ পুরস্কার! যাদবের তিরস্কারে শশী ছেলেমানুষের দুঃখে অভিমানে কাতর হইয়া থাকে।

    তবে কি যাদব সত্যিই রথের দিন দেহত্যাগ করবেন? মৃত্যুর ওই দিনটি যে তাহার নির্ধারিত হইয়া আছে, যোগের শক্তিতে বহুদিন হইতেই যাদব তবে তাহা জানিয়া রাখিয়াছিলেন? তা যদি হয় তবে সন্দেহ নাই যে সে মেচ্ছাচারী নাস্তিক। এখন তো তাহার বিশ্বাস হয় না যে মানুষ নিজের ইচ্ছায় মরিতেও পারে, মরিবার আগে জানিতে পারে কবে মরণ হবে।

    বিশ্বাস হয় না, তবু শশীর মনের আড়ালে লুকানো গ্রাম্য কুসংস্কার নাড়া খাইয়াছে। এক এক সময় তাহার মনে হয়, হয়তো আছে, বাধা যুক্তির অতিরিক্ত কিছু হয়তো আছে জগতে, যাদব আর যাদবের মতো মানুষেরা যার সন্ধান রাখেন। দলে দলে লোক আসিয়া যে যাদবের পায়ে লুটাইয়া পড়িতেছে, এদের সকলেরই বিশ্বাস কি মিথ্যা? সাধারণ মানুষের চেয়ে অতিরিক্ত কিছু যদি নাই থাকে যাদবের মধ্যে, এতগুলি লোক কি অকারণে এমনি পাগল হইয়া উঠিয়াছে? দশ-বারো ক্রোশ দূরবর্তী গ্রাম হইতে সপরিবারে গৃহস্থ আসিয়াছে, বাসা বাঁধিয়া আছে গাছতলায়। কত নরনারীর চোখে শশী জল পড়িতে দেখিয়াছে। কায়েতপাড়ার পথে নামিয়া দাঁড়াইলেই মনে হয় এ যেন তীর্থ। সকল বয়সের যে-সমস্ত নরনারী এদিক-ওদিক বিচরণ করিতেছে, প্রাত্যহিক জীবনে হিংসা-দ্বেষ স্বার্থপরতার সঞ্চিত গ্লানি তারা পিছনে ফেলিয়া আসিয়াছে; ভুলিয়া গিয়াছে পার্থিব সুখের কামনা, লাভের হিসাব। হয়তো সাময়িক, ফিরিয়া গিয়া সম্পূর্ণ জীবনের কদৰ্যতায় আবার সকলে মুখ গুড়িয়া দিবে, তবু ওদের মুখের উৎসুক একাগ্রতা আজ তো মুগ্ধ করিয়া দেয়।

    সকলে যাদবকে লইয়া ব্যাপৃত থাকায় শশীর সঙ্গে দেখা করার সুবিধা হইয়াছে কুসুমের। সে উদ্বিগ্ন কষ্ঠে বলে, মুখ এত শুকনো কেন?

    মনটা ভালো নেই বউ।

    ওমা, কী হল মনের?

    শশী বিরক্ত হইয়া বলে, তোমার কাছে অত কৈফিয়ত দিতে পারব না বউ।

    কুসুম সগর্বে মাথা তুলিয়া বলে, কৈফিয়ত কেউ চায়নি আপনার কাছে। মুখ শুকনে দেখে মায়া হল, তাই জানতে এলাম অসুখবিসুখ হয়েছে না কি। সংসারে জানেন, ছোটোবাবু, যেচে মায়া করতে গেলে পদে পদে অপমান হতে হয়। আমি এদিকে চলে যাচ্ছি বাপের বাড়ি, কৈফিয়ত চাইব!

    শশী নরম হইয়া বলে, গাঁয়ে এতবড় ব্যাপার ঘটছে, দেখা হলে ও-বিষয়ে তুমি কিছুই বলো না,—শুধু আমার তোমার নিজের কথা। বলবার কি আর কথা নেই জগতে?

    নেই? কত আজেবাজে কথা আছে, সীমা নেই তার।

    বলিয়া কুসুম হাসে। শশী বলে, হালকা ভাবটা একটু কমাও বউ। বাপের বাড়ি যাবে তো শুনছি ঢের দিন থেকে, যাওয়া তো হল না।

    কুসুম সপ্রতিভভাবেই বলে, যেতে যে পারি না।

    তারপর বলে, যেসব মজার কাণ্ড গাঁয়ে। সত্তর বছরের একটা বুড়ো মরবে, তাই নিয়ে দশটা গাঁয়ের লোক হৈ হৈ করছে। বেঁচে থাকলে আরও কত দেখব!

    কুসুমের এ ধরনের কথাবার্তা শশীর যে খুব ভালো লাগিল তা নয়, তবু একা একা ভাবিতে ভাবিতে মনের মধ্যে যে বদ্ধ আবহাওয়ার সৃষ্টি হইয়াছিল, খানিকট খোলা বায়ু আসিয়া তা যেন কিছু হালকা করিয়া দিল। তাই বটে। এত সে বিচলিত হইয়াছে কেন একটা গ্রাম্য ব্যাপারে? মরেন, তো মরিবেন যাদব, তার কী আসিয়া যায়? দুদিন পরে এ গাঁয়ে বাস করিবার স্মৃতিটুকু মনে আনিবার সময়ও কি থাকিবে তাহার?

    বিকালে সেদিন শ্রীনাথ আসিয়া শশীকে ডাকিয়া গেল। পরদিন আসিলেন পাগলদিদি স্বয়ং। না গিয়া শশীর উপায় থাকিল না।

    পাগলদিদি বলিলেন, তীর্থে যাবার কথা তো বলে এলি ভাই, গিয়ে কী হবে? দল বেঁধে গায়ের লোক সঙ্গে যাবে। এতলোক দিনরাত পাহারা দিচ্ছে, সকলের নজর এড়িয়ে পালাব কোথা?

    একটু যেন গা-ঝাড়া দিয়া উঠিয়াছেন পাগলদিদি, কোনোদিকে আশার আলো দেখিতে পাইছেন কি-না কে জানে। মুখখানা খুব বিষন্ন কিন্তু শান্ত, ভয় ও উদ্বেগের ছাপটা গিয়াছে। চলিতে চলিতে বলেলেন, পালিয়ে গিয়েই বা কী হবে বলো? ক বছর আর বাঁচিব। বিদেশে নতুন লোকের মধ্যে কত কষ্ট হবে, মনে একটা আপসোসও থাকবে। অমন করে দুটো একটা বছর বেশি বেঁচে থেকে সুখটা কী হবে, তাই ভাবে। তার চেয়ে এভাবে যাওয়া ঢের বেশি গৌরবের।

    শশী বলিল, কিন্তু নিজের ইচ্ছায় যখন খুশি কেউ কি যেতে পারে দিদি?

    ও যে সিদ্ধিলাভ করেছে পাগল। ওর অসাধ্য কিছু আছে?

    পাগলদিদি বোধহয় লুকাইয়া আসিয়াছিলেন, তাহাকে দেখিবামাত্র একদল নরনারী আসিয়া ছাঁকিয়া ধরিল। শশীর সঙ্গে অতি কষ্টে বাড়িতে ঢুকিয়া তিনি দরজা বন্ধ করিয়া দিলেন। ভিড় পাগলদিদির সহ্য হয় না। তাহাকে দেখিবার জন্যও জনতা চেঁচামেচি করে কিন্তু তিনি কখনও বাহিরে আসেন না। তেল সিঁদুর হাতে করিয়া মেয়েরা তাহার রুদ্ধ দরজার সম্মুখ হইতে ফিরিয়া যায়।

    যাদব ভিতরে আসিয়া বলিলেন, শশী এসেছ? সেদিন একটু বকেছিলাম বলে রাগ করে কদিন আর দেখাই দিলে না ভাই! তোমার কথা ভাবছিলাম শশী কত ক্ষতি করে গিয়েছিলে সেদিন, তোমার সে ধারণা নেই, মায়ার বশে কুপরামর্শ দিয়ে গেলে, থেকে থেকে কথাটা বিমনা করে দিয়েছে, সহজে তুচ্ছ তো করতে পারি না তোমার কথা।

    অনেক কথা বলেন যাদব; তিনি তো চলিলেন, পাগলদিদিকে শশী যেন দেখাশোনা করে। এতকাল অসুখবিসুখ হইলে সূর্যবিজ্ঞানের জোরে আরোগ্য তিনিই করিয়াছেন, এবার হয়তো শশীর ওষুধ খাইতে হইবে। -শিখলে পারতে শশী সূর্যবিজ্ঞান। বামুনের ছেলে নও, মন্ত্রশিষ্য তোমাকে করতে পারি না, বিদ্যেটা শিখিয়ে দিতে পারতাম। শিখবে? যাদব হাসিলেন।–আর তো শেখবার সময় নেই শশী!

    রথের দুদিন আগে খুব বৃষ্টি হইয়া গিয়াছিল। সেদিনও সকালের দিকে কখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়িল, কখনও মেঘলা করিয়া রহিল। আগের দিন সন্ধ্যা হইতে সংকীর্তন আরম্ভ হইয়াছিল, সারারাত্রি একমুহূর্ত বিরাম হয় নাই। সকালবেলা নূতন নূতন লোক আসিয়া দল ভারী করিয়াছে, কীর্তন আরও জাকিয়া উঠিয়াছে। যাদব স্নান করিয়া পট্টবস্ত্র পরিধান করিয়াছেন, সকালে ফুলের মালায় তাহাকে সাজাইয়াছে। পাগলদিদিও আজ রেহাই পান নাই, তার গলাতেও উঠিয়াছে অনেকগুলি ফুলের মালা। তবে তেল সিঁদুর দেয়া সধবারা বন্ধ করিয়াছে। আজ যার বৈধব্যয়যোগ তাকে ওসব আর দেয়া যায় না। বেলা বাড়িবার সঙ্গে যাদবের বাড়ির সামনে আর কায়েতপাড়ার পথে লোকে লোকারণ্য হইয়া উঠিল। গাওদিয়া, সাতগাঁ আর উখার গ্রামের একদল ছেলে ভলান্টিয়ার হইয়া কাজ করিতেছে, উৎসাহ তাদেরই বেশি। বাঁশ বাঁধিয়া দর্শনার্থী মেয়ে-পুরুষের পথ পৃথক করি দেওয়া হইয়াছে। ভাঙা দাওয়ায় যাদবের বসিবার আসন। অঙ্গনে কয়েকটা চৌকি ফেলিয়া গ্রামের মাতব্বরেরা বসিয়াছেন। তাদের হুঁকা টানা ও আলাপ-আলোচনার ভঙ্গি উৎসব-বাড়ির মতো। যেন বিবাহ উপনয়ন সম্পন্ন করাইতে আসিয়াছেন। শীতলবাবু ও বিমলবাবু সকালে একবার আসিয়াছিলেন, দুপুরে আবার আসিলেন। বাবুদের বাড়ির মেয়েরা আসিলেন অপরাষ্ট্রে। যাদব এবং পাগলদিদির তখন মুমূর্ষ অবস্থা।

    শশী আগাগোড়া দুজনকে লক্ষ করিয়াছিল। বেলা এগারোটার পর হইতে দুইজনেই ধীরে ধীরে নিস্তেজ ও নিদ্রাতুর হইয়া আসিতেছেন দেখিয়া, মনের মধ্যে তাহার আরম্ভ হইয়াছিল তোলপাড়। আরও খানিকক্ষণ পরে শশীর দিকে ঢুলঢুল চোখ মেলিয়া একবারমাত্র চাহিয়া যাদব এক অদ্ভুত হাসি হাসিয়াছিলেন, পাগল দিদি তখন চোখ বুজিয়াছেন। যাদবের মুখ ঢাকিয়া গিয়াছিল চটচটে ঘামে আর কালিমায়, চোখের তারা দুটি সংকুচিত হইয়া আসিয়াছিল। তিন-চার হাজার ব্যগ্র উত্তেজিত লোকের মধ্যে ডাক্তার শুধু শশী একা, সে শিহরিয়া উঠিয়াছিল। তবু পলক ফেলিতে পারে নাই। যাদব ও পাগলদিদির দেহে পরিচিত মৃত্যুর পরিচিত লক্ষণগুলির আবির্ভাব একে একে দেখিয়াছিল।

    সকলে যখন টের পাইল যাদবের সঙ্গে পাগলদিদিও পরলোকে চলিয়াছেন, যাদবের আগেই হয়তো তাহার শেষ নিশ্বাস পড়িবে, চারিদিকে নূতন করিয়া একটা হৈচৈ পড়িয়া গেল। ছেলে-বুড়ো স্ত্রী-পুরুষ একেবারে যেন খেপিয়া উঠিল! ভলান্টিয়ারদের চেষ্টায় এতক্ষণ সকলের দর্শন ও প্রণাম শৃঙ্খলাবদ্ধভাবেই চলিতেছিল, এবার আর কাহাকেও সংযত করা গেল না। যাদব আর পাগলদিদি বুঝি পিষিয়াই যান ভিড়ে। পাগলদিদির দুটি পা ঢাকিয়া গেল সিঁদুরে।

    তারপর ছেলেদের চেষ্টায় জনতা ঠেকাইবার ব্যবস্থা হইলে শয্যা রচনা করিয়া পাশাপাশি দুজনকে শোয়োনো হল। কায়েতপাড়ার সংকীর্ণ পথে কোনোবার রথ চলে নাই, শীতলবাবুর হুকুমে বেলা প্রায় তিনটার সময় বাবুদের রথটি অনেক চেষ্টায় যাদবের গৃহের সম্মুখে পর্যন্ত টানিয়া আনা হইল। পাগলদিদিকে কোনোমতে চোখ মেলানো গেল না, যাদব কষ্টে চোখ মেলিয়া একবার চাহিলেন। চোখের তারাদুটি এখন তাহার আরও ছোট হইয়া গিয়াছে।

    তারপর যাদবও আর সাড়াশব্দ দিলেন ন। সকলে বলিল, সমাধি। পাগলদিদি মারা গেলেন ঘণ্টাখানেক পরে, ঠিক সময়টি কেহ ধরিতে পারিল না। একটি ব্রাহ্মণ সধবা গঙ্গাজলে মুখের ফেনা ধুইয়া দিলেন। যাদবের শেষ নিশ্বাস পড়িল গোধূলিবেলায়।

    শশীর স্পর্শ করিবার অধিকার নাই! তফাত হইতে সে ব্যাকুলভাবে বলিল—ওঁর মুখে কেউ গঙ্গাজল দিন।

     

    সত্যি-মিথ্যায় জড়ানো জগৎ। মিথ্যারও মহত্ত্ব আছে। হাজার হাজার মানুষকে পাগল করিয়া দিতে পারে মিথ্যার মোহ। চিরকালের জন্য সত্য হইয়াও থাকিতে পারে মিথ্যা। যারা যাদব ও পাগলদিদির পদধূলি মাথায় তুলিয়া ধন্য হইয়াছিল, তাদের মধ্যে কে দুজনের মৃত্যুরহস্য অনুমান করিতে পরিবে? চিরদিনের জন্য এ ঘটনা মনে গাঁথা রহিল, এক অপূর্ব অপার্থিব দৃশ্যের স্মৃতি। দুঃখযন্ত্রণার সময় একথা মনে পড়িবে। জীবন রুক্ষ নীরস হইয়া উঠিলে এ আশা করিবার সাহস থাকিবে যে, খুঁজিলে এমন কিছুও পাওয়া যায় জগতে, বাঁচিয়া থাকার চেয়ে যা বড়। শোক, দুঃখ, জীবনের অসহ্য ক্লাস্তি—এসব তো তুচ্ছ, মরণকে পর্যন্ত মানুষ মনের জোরে জয় করিতে পারে। কত সংকীর্ণ দুর্বল চিত্তে যে যাদব বৃহতের জন্য, মৃদু হোক, প্রবল হোক, ব্যাকুলতা জাগাইয়া রাখিয়া গিয়াছেন, শশী তাই ভাবে। যখন ভাবে, তখন আপিমের ক্রিয়ায় যাদবের চামড়া ঢাকিয়া চটচটে ঘাম, বিন্দুর মতো ছোটো হইয়া আসা চোখের তারকে আর মুখে ফেনা উঠিবার কথা সে ভুলিয়া যায়।

    বর্ষা আসিয়াছে। খালে জল বাড়িল, ডোবা-পুকুর ভরিয়া উঠিল। চারিদিকে কাদা, ভাঙা পথে কোথাও যাওয়া মুশকিল। পালকি-বেহারাদের পা কাদায় ডুবিয়া যায়, ধীরে ধীরে চলিতে হয়। এমনি বৃষ্টিবাদলার মধ্যে একদিন কুসুমের বাবা মেয়েকে লইয়া আসিল। সেইদিন তালপুকুরের ধারে কুসুম কেমন করিয়া পড়িয়া গেল সে-ই জানে। বলিল, কোমরে চোট লাগিয়াছে আর হাতটা গিয়াছে ভাঙিয়া।

    কী করে যাব তোমার সঙ্গে? আমি তো যেতে পারব না বাবা! পুজোর সময় এসে আমারয় নিয়ে যেয়ো।

    কুসুমের বাবা অত্যন্ত আপসোস করিয়া বলিল, কতকাল যাওয়া হয়নি, তোর মা কাঁদাকাটা করেন কুসি। দুটো দিন বরং দেখে যাই, ব্যথাটা যদি কমে।

    কুসুম বলিল, দু-চার দিনে এ ব্যথা কি কমবে বাবা? কোমরের ব্যথায় নড়তে পারি না। হাড়-টাড় কিছু ভেঙেছে নাকি কে জানে!

    হাতটা সত্যই মচকাইয়া গিয়াছিল। শশী আসিয়া পরীক্ষা করিবার সময় এক ফাঁকে জিজ্ঞাসা করিল, ইচ্ছে করে পড়নি তো বউ?

    কী যে বলেন ছোটোবাবু! ইচ্ছে করে পড়ে কেউ কোমর ভাঙে?

    হাতে তবে তোমার কিছু হয়নি, শুধু কোমর ভেঙেছে, না?

    হাতও ভেঙেছে।–কুসুম বলিল।

    শশী হাতটা নাড়িয়া চাড়িয়া বলিল, কই, বেশি ফোলেনি তো?

    কুসুম রাগিয়া বলিল, আবার কী ফুলবে ছোটোবাবু, ফুলে কি ঢোল হবে?

    পরদিন দুপুরবেলা আকাশ-ঢাকা মেঘে চারিদিকে অন্ধকার হইয়া আসিয়াছিল। শশী বসিয়া ছিল নিজের ঘরে। গ্রামাস্তরে রোগী দেখিতে যাইবার কথা ছিল, মেঘ দেখিয়া বাহির হয় নাই। নানা কথা ভাবিতে ভাবিতে জোরে বৃষ্টি নামিয়া আসিল। পরক্ষণে আসিল কুসুম। হাতের ব্যথা সহিতে না পারিয়া ওষুধ লইতে আসিয়াছে।

    শশী বলিল, হাতে এমন কী ব্যথা হল যে, এ বৃষ্টি মাথায় করে ওষুধ নিতে এলে? এলেই বা কী করে? কোমর না তোমার ভেঙে গেছে?

    কুসুম অস্পষ্টভাবে বলিল, কষ্ট করে এলাম।

    কেন তা এল? বিকেলে আমিই তো যেতাম।

    সইতে পারি না ছোটোবাবু।

    এবার শশী একটু বিবর্ণ হইয়া গেল। চিরকাল এমনভাবে চলিবে না সে জানিত, একদিন ছেলেখেলায় আর কুলাইবে না। তবু এমন বাদলায় কুসুম বোঝাপড়া করিতে আসিল? কুসুমকে দোষ দেওয়া যায় না। ভাসা-ভাসা হালকা ভাবের আড়াল দিয়া এই দিনটিকে এড়াইয়া চলিবার চেষ্টা বড় নির্মম। কুসুম যে এতদিন সহ্য করিয়াছে তাই আশ্চর্য। যাই থাক তার মনে, কুসুমের কী আসিয়া যায়? সে কেন চিরকাল তার ভীরু নীরবতাকে প্রশ্রয় দিয়া যাইবে? দীর্ঘকাল ধরিয়া কুসুমের প্রতি নিজের অন্যায় ব্যবহার মনে করিয়া শশীর লজ্জা বোধ হইল।

    মৃদুস্বরে সে বলিল, কিছু মনে কোরো না বউ, আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।

    কুসুম কথা বলিল না, শশী যেন তাতে আরও বিবর্ণ হইয়া গেল। জানালা দিয়ে ঘরে ছাট আসিতেছিল। উঠিয়া জানালাটা বন্ধ করিয়া এতক্ষণে সে হঠাৎ অত্যন্ত বেখাপ্পা ভদ্রতা করিয়া বলিল, বোসো না বউ, বোসো ওইখানে।

    কুসুম বসিল এবং বসিয়া যেন বাঁচিল। শশী আরও মৃদুস্বরে বলিল, অনেক দিন থেকে তোমায় কটা কথা বলব ভাবছিলাম বউ। বলি বলি করে বলতে পারিনি। বলা কিন্তু দরকার,–নয়? আমরা ছেলেমানুষ নই, ইচ্ছে হলেই একটা কাজ কি আমরা করতে পারি? সুঝে-বুঝে কাজ করা দরকার। এই তো দ্যাখো পরাণ আমার বন্ধু, উপকার করতে গিয়ে চিরকাল শুধু অপকারই করেছি। তবু, তাও আমি গ্রাহ্য করতাম না বউ। এই বৃষ্টিতে তুমি এলে, তোমার কাছে সরে বসতে না পেরে আমার যা কষ্ট হচ্ছে, কারো মুখ চেয়ে আমি তা সইতাম না। কিন্তু আমি গাঁয়েই থাকব না বউ। আজ বাদে কাল চলে যাব বিদেশে, আর কখনও ফিরব না। এরকম অবস্থায় একটু মনের জোর করে–

    কুসুম হঠাৎ মুখ তুলিয়া বলিল, হাতে ব্যথা বলে ওষুধ নিতে এলাম, এসব আমাকে কি শোনাচ্ছেন?

    শশী থতমথত খাইয়া গেল। তারপর শুদ্ধস্বরে বলিল, কী বললে? ওষুধ নিতে এসেছ?

    হাতটার ব্যথা সইতে পারি না ছোটোবাবু।

    শশী স্নানমুখে বলিল, হাতের ব্যথার ওষুধ তো জানি না বউ। মালিশের ওষুধ যা দিয়ে এসেছি তাই মালিশ করো গে।–কী করে যাবে এই বৃষ্টিতে?

    কী করে এলাম?—বলিয়া কুসুম দরজা খুলিয়া বৃষ্টির মধ্যে নামিয়া গেল। চলন দেখিয়া মনে হইল না কাল সে কোমরে চোট খাইয়া শয্যাগত ছিল। শশীর মনে বর্ষার মতো বিষন্নতা ঘনাইয়া আসে। কুসুম শেষে এমন দুর্বোধ্য হইয়া উঠিল! সে কত আশা করিয়াছিল কুসুম ধীর শাস্তভাবে তার সমস্ত কথা শুনিবে, সমস্ত বুঝিতে পারবে। কোথাও একটুকু না-বোঝার কিছু না-থাকায় তাদের দুজনের করো মনে দুঃখ থাকিবে না, অভিমান থাকিবে না, লজ্জাও থাকিবে না। বোঝাপড়া শেষ হইবে গভীর অন্তরঙ্গতায়,–নিবিড় সহানুভূতিতে। তার বদলে এ কী হইল? ভাবিয়া ভাবিয়া শশীর মনে হইল, গ্রাম্য মন কুসুমের, কিছু তার বুঝিবার ক্ষমতা নাই।

    পরদিন পরাণের কাছে সে খবর পাইল, কুসুমের হাত আর কোমরের ব্যথা কমিয়াছে, কাল সে বাপের বাড়ি যাইবে।

    কদিন থাকবে বাপের বাড়ি?

    বলছে তো পুজো পেরিয়ে আসবে। কদিন থাকে এখন।

    তোমার কষ্ট হবে পরাণ।–শশী বলিল।

    পরাণ গম্ভীরমুখে বলিল, কিসের কষ্ট, দুবেলা ভাত দুটো মা-ই ফুটিয়ে দিতে পারবে। ভেবেচিন্তে আমিই একরকম পাঠাচ্ছি ছোটোবাবু। বাপের বাড়ি যেতে না পেলে মেয়েমানুষের মাথা বিগড়ে যায়।

    রাত্রে কিছু ঠিক ছিল না, ভোর রাত্রে গোবর্ধন এবং আরও দুজন মাঝিকে তুলিয়া শশী বাজিতপুরে যাইবে বলিয়া বাহির হইয়া পড়িল। একা বাজিতপুর যাইতে বড় নৌকা সে ব্যবহার করে না, ছোট নৌকোয় গোবর্ধন একাই তাহাকে লইয়া যায়। আজ তাহার বড়ো নৌকাটির প্রয়োজন হইল কেন কেহ বুঝিতে পারিল না। বিছানা পাতিয়া, জলের কুঁজো, বাড়ির তৈরি খাবার ভরা টিফিন ক্যারিয়ার, এক ডালা পাকা আম, চায়ের সরঞ্জাম, ওষুধের ব্যাগ প্রভৃতি নৌকায় তুলিয়া গোবর্ধন সব ঠিক করিয়া ফেলিল। শশী কিন্তু নৌকা খুলিল না। তীরে দাঁড়াইয়া টানিতে লাগিল সিগারেট।

    রোদ উঠিবার পর কুসুমের ভুলি আসিল ঘাটে। সঙ্গে অনন্ত আর পরাণ। শশীকে দেখিয়া পরাণ বলিল, ছোটোবাবু যে এখানে?

    শশী বলিল, বাজিতপুর যাব পরাণ। তোমাদের জন্য দাঁড়িয়ে ছিলাম। তোমাদের ও ছোট নৌকায় এদের দিয়ে কাজ নেই, বাজিতপুর পর্যন্ত আমার নৌকায় চলো। সেখানে ভালো দেখে একটা নৌকা ঠিক করে দেব।

    তাই হোক। কারো আপত্তি নাই।

    পরাণকে ধরিয়া কুসুম শশীর নৌকায় উঠিল। তার তোরঙ্গ, বোঁচকা ও অন্য সব জিনিস তোলা হইলে শশী বলিল, তুমি ছইয়ের মধ্যে বিছানায় বসবে যাও বউ। সামনের দিকে এগিয়ে বসো, তাহলে চাদ্দিক দেখে যেতে পারবে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅহিংসা – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    Next Article পদ্মা নদীর মাঝি – মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    উপন্যাস বুদ্ধদেব গুহ

    নগ্ন নির্জন – বুদ্ধদেব গুহ

    May 28, 2025
    উপন্যাস বুদ্ধদেব গুহ

    কোয়েলের কাছে – বুদ্ধদেব গুহ

    May 23, 2025
    উপন্যাস সত্যজিৎ রায়

    রবার্টসনের রুবি – সত্যজিৎ রায়

    April 3, 2025
    উপন্যাস সত্যজিৎ রায়

    বোম্বাইয়ের বোম্বেটে – সত্যজিৎ রায়

    April 3, 2025
    উপন্যাস সত্যজিৎ রায়

    রয়েল বেঙ্গল রহস্য – সত্যজিৎ রায়

    April 3, 2025
    উপন্যাস সত্যজিৎ রায়

    যত কাণ্ড কাঠমাণ্ডুতে – সত্যজিৎ রায়

    April 3, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }