Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • 🔖
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    Subscribe
    সাইন ইন
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    পৃথিবীর সেরা ভৌতিক গল্প – অনীশ দাস অপু

    লেখক এক পাতা গল্প330 Mins Read0

    হ্যারি

    ছোট্ট ছোট্ট জিনিস আমাকে ভীত করে তোলে। রোদ। ঘাসের উপরে গাঢ় ছায়া। সাদা গোলাপ। কোঁকড়ানো লাল চুলের শিশু। আর একটা নাম– হ্যারি। কত সাধারণ একটা নাম!

    ক্রিস্টিন যখন প্রথম নামটা বলল আমাকে, আমার গা শিউরে উঠেছিল।

    ওর বয়স পাঁচ, মাস তিনেক বাদে ভর্তি হবে স্কুলে। এক সুন্দর, উষ্ণ বিকেলে বরাবরের মতো বাগানে খেলা করছিল ক্রিস্টিন। দেখলাম ঘাসের উপর পেট দিয়ে শুয়ে আছে ও, ফুল ছিঁড়ে মালা গাঁথছে মনের আনন্দে। ওর স্নান লাল চুলে রোদ ঝলসাচ্ছে, ত্বক আশ্চর্য সাদা লাগছে। যেন গোলাপি। একটা আভা ফুটে বেরুচ্ছে শরীর থেকে। বড় বড় নীল চোখ জোড়া গভীর মনোযোগের কারণে ঈষৎ বিস্ফারিত।

    হঠাৎ সাদা গোলাপের ঝাড়ের দিকে চোখ তুলে চাইল ক্রিস্টিন। ঝোঁপটার ছায়া পড়েছে ঘাসে। হাসল মেয়েটা।

    হ্যাঁ, আমি ক্রিস্টিন, বলল ও। সিধে হলো। ধীর পায়ে হেঁটে এগোল ঝোঁপের দিকে। পরনের নীল সুতির স্কার্টটা উরু ছুঁয়েছে। দ্রুত লম্বা হয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।

    থাকি মাম্মি আর ড্যাডির সাথে, পরিষ্কার গলা শোনা গেল ওর। তারপর একটু বিরতি দিয়ে, কিন্তু ওরাই আমার মাম্মি আর ড্যাডি।

    ঝোঁপের ছায়ার মধ্যে এখন ক্রিস্টিন। যেন আলোর পৃথিবী থেকে ঢুকে পড়েছে আঁধারে। কেমন অস্বস্তি লাগল আমার, জানি না কেন, ডাক দিলাম ওকে।

    ক্রিস্টিন, কী করছ তুমি?

    কিছু না, অনেক দূর থেকে যেন ভেসে এল কণ্ঠটি।

    ঘরে এসো। বাইরে অনেক রোদ।

    বেশি রোদ না।

    ঘরে এসো, ক্রিস।

    ও বলল, আমাকে এখন যেতে হবে। বিদায়, বাড়ির দিকে পা বাড়াল মন্থর ভঙ্গিতে।

    ক্রিস, কার সঙ্গে কথা বলছিলে?

    হ্যারি ভাইয়া।

    হ্যারি ভাইয়া কে?

    হ্যারি ভাইয়া।

    ও আর কিছু বলল না। আমি ওকে দুধ খাওয়ালাম, ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত পড়ে শোনালাম বই। শুনতে শুনতে বাগানের দিকে চোখ ফেরাল ক্রিস্টিন। হেসে কাকে যেন উদ্দেশ্য করে হাত নাড়ল। ওকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার পরে স্বস্তির শ্বাস ফেললাম।

    আমার স্বামী জিম বাড়ি ফেরার পরে ওকে রহস্যময় হ্যারি ভাইয়া সম্পর্কে বললাম। হেসেই উড়িয়ে দিল সে আমার কথা।

    তোমার সঙ্গে দুষ্টুমি শুরু করেছে ও। বলল জিম।

    মানে?

    বাচ্চারা কল্পনায় এরকম নানান সঙ্গী-সাথী জোগাড় করে। কেউ কেউ তাদের পুতুলের সঙ্গে কথা বলে। ক্রিস্টিনের তো আবার পুতুল-টুতুলের প্রতি কোন কালেই আগ্রহ ছিল না। ওর ভাই-বোন নেই, নেই সমবয়সী কোন বন্ধু। তাই কল্পনায় একজনকে নিজের সাথী করে নিয়েছে। এতে অস্বাভাবিক কিছু নেই।

    কিন্তু নির্দিষ্ট কোন নাম কেন বেছে নেবে ও?

    ত্যাগ করল জিম। বাচ্চারা এরকম কত কিছুই তো করে। এ নিয়ে এত দুশ্চিন্তার কোন মানে হয় না।

    না, ঠিক দুশ্চিন্তা নয়। ওর প্রতি আরেকটু খেয়াল রাখার প্রয়োজন বোধ করছি। ওর আসল মায়ের চেয়েও বেশি।

    জানি আমি। কিন্তু ক্রিস্টিন ঠিকই আছে। ও চমৎকার একটি মেয়ে। সুন্দরী, স্বাস্থ্যবতী, বুদ্ধিমতী। এর সমস্ত ক্রেডিট তোমার।

    তোমারও।

    ইনফ্যাক্ট, আমরা বাবা-মা হিসেবে মন্দ নই।

    এবং খুব বিনয়ী। বলে দুজনে হেসে উঠলাম একসাথে। ডজম আমার কপালে চুমু খেল। আমার মন শান্ত হলো ।

    তবে পরদিন সকাল পর্যন্ত।

    আজও প্রখর রোদ চমকাচ্ছে ছোট বাগানটিতে, সাদা গোলাপ ঝাড়ের গায়ে। ক্রিস্টিন পা মুড়ে বসেছে ঘাসে, চোখ ঝাড়ের দিকে। হাসছে। হ্যালো, বলল সে। জানতাম তুমি আসবে…কারণ তোমাকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে। তোমার বয়স কত? …আমি পাঁচে পা দিয়েছি…আমি বাচ্চা মেয়ে নই। আমি শিগগিরি ইশকুলে ভর্তি হব, নতুন ড্রেস পরব। নীল জামা। তুমি ইশকুলে যাও?…তারপর কী করো? এক মুহূর্ত নিরব থাকল সে, মাথা ঝাঁকাচ্ছে, শুনছে, আলাপচারিতায় মগ্ন।

    রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখে গা হিম হয়ে এল আমার। বোকার মতো কিছু ভেবে বোসো না। অনেক বাচ্চারই কাল্পনিক সঙ্গী থাকে। নিজেকে প্রবোধ দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিছুই ঘটছে না, তুমি কিছুই দেখছ না বা শুনছ না এমন ভাব করলেই হয়। নির্বোধের মতো কিছু করে বোসা না।

    কিন্তু আমি ডাক দিলাম ক্রিস্টিনকে দুধ খাওয়ার জন্য। সাধারণত এত তাড়াতাড়ি ওকে দুধ খাওয়াই না আমি।

    তোমার দুধ রেডি, ক্রিস। চলে এসো।

    এক মিনিট, জবাব শুনে অবাক লাগল। ও দুধ খেতে খুব পছন্দ করে চকলেট ক্রিম বিস্কিট দিয়ে। ডাকলেই চলে আসে।

    এখুনি আসো, সোনা, বললাম আমি।

    হ্যারি ভাইয়াকে নিয়ে আসি?

    না! চিৎকারটা এতই কর্কশ শোনাল যে নিজেই অবাক হয়ে গেলাম।

    গুডবাই, হ্যারি ভাইয়া। তোমাকে নিয়ে যেতে পারছি না বলে স্যরি। কিন্তু আমাকে এখন দুধ খেতে যেতে হবে। বলে লাফাতে লাফাতে ঘরে ঢুকল ক্রিস্টিন।

    হ্যারি ভাইয়াকে কেন দুধ খেতে ডাকলে না? রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করে বসল আমার মেয়ে।

    হ্যারিটা কে সোনা?

    হ্যারি আমার ভাই।

    কিন্তু ক্রিস্টিন, তোমার তো কোন ভাই নেই। ড্যাডি আর মাম্মির একটাই মাত্র সন্তান, একটি মাত্র মেয়ে, আর সে হলে তুমি। হ্যারি তোমার ভাই হতে পারে না।

    হ্যারি আমার ভাই। ও আমাকে তাই বলেছে। দুধের গ্লাসে মুখ নামাল ও, চুমুক দিল। মুখ তুলল উপরের ঠোঁটে দুধের সাদা রেখা নিয়ে। তারপর থাবা মেরে তুলে নিল বিস্কিট। যাক হ্যারি অন্তত ওর খিদে নষ্ট করতে পারেনি।

    দুধ খাওয়া শেষ হলে আমি বললাম, আমরা এখন শপিং করতে যাব, ক্রিস। আমার সঙ্গে যাবে?

    না। আমি হ্যারি ভাইয়ার সঙ্গে থাকব।

    তা হবে না। তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ।

    হ্যারি ভাইয়া যেতে পারবে?

    না।

    চুল আঁচড়ানোর সময় লক্ষ করলাম আমার হাত কাঁপছে। আজকাল ভীষণ ঠান্ডা লাগছে ঘরে। যেন শীতল একটা ছায়া ঘিরে আছে বাড়িটাকে সূর্যালোক আড়াল করে। সুবোধ বালিকাটির মতো আমার সাথে বেরিয়ে পড়ল ক্রিস্টিন। তবে রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় ঘুরে হাত নাড়ল সে অদৃশ্য কাউকে উদ্দেশ্য করে।

    এ ঘটনা জিমকে জানালাম না আমি। বললে আগের দিনের মতো লেকচার শুনিয়ে দেবে সে আমাকে। কিন্তু ক্রিস্টিনের হ্যারি ভাইয়ার ফ্যান্টাসী দিনের পর দিন চলতে লাগল, সেই সাথে চাপ বাড়ল আমার। স্নায়ুতে। গ্রীষ্মের লম্বা দিনগুলো এখন আমার চোখে বিষের মতো, চাতকের মত অপেক্ষা করছি ধূসর মেঘভর্তি আকাশ আর বৃষ্টির জন্য। বাগানে ক্রিস্টিনের গলা শুনলেই আজকাল কেঁপে উঠি আমি। হ্যারি ভাইয়ার সাথে সে বিরামহীন বকবক করে চলে।

    এক শুক্রবারে জিম সবকিছু শোনার পরে মন্তব্য করল, আমি তোমাকে আগেও বলেছি এখনও বলছি কল্পনায় ও তার একজন সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে।

    ওর ভাষাও বদলে যাচ্ছে, বললাম আমি। খানিকটা আঞ্চলিক টানে কথা বলে। খাইয়াম, দিবাম ইত্যাদি।

    লন্ডনের প্রতিটি বাচ্চাই আঞ্চলিক টানে কথা বলে। কেউ কম, কেউ বেশি। স্কুলে যাবার পরে অন্যান্য বাচ্চাদের সাথে মিশে তো ওর উচ্চারণ আরও বাজে হয়ে উঠবে।

    আমরা তো এভাবে কথা বলি না। এরকম উচ্চারণ ও শিখল কোত্থেকে? আর কার থেকে ও এ উচ্চারণ শিখবে ওই ইয়েটা ছাড়া..হ্যরির নামটা মুখে এল না আমার।

    দুধঅলা, দারোয়ান, ক্লিনার-আরও নাম শুনতে চাও?

    চাই না, তিক্ত একটা হাসি দিয়ে চুপ হয়ে গেলাম আমি।

    তবে, বলল জিম। আমি কিন্তু ওর উচ্চারণে কোন টানের প্রভাব লক্ষ করিনি।

    আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় সে ওভাবে উচ্চারণ করেও না। শুধু বলে ওর-ওর সঙ্গে কথা বলার সময়।

    অর্থাৎ হ্যারি। এই হ্যারির ব্যাপারে আমার বেশ কৌতূহল হচ্ছে। চলো, একদিন খুঁজে দেখি সত্যি এ নামে কেউ আছে কিনা?

    না! আর্তনাদ করে উঠলাম আমি। ও কথা আর মুখেও এনো না। ওটা আমার দুঃস্বপ্ন। আমার জীবন্ত দুঃস্বপ্ন। ওহ্। আমি আর সহ্য করতে পারছি না।

    বিস্মিত দেখাল ওকে। এই হ্যারি দেখছি তোমার বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে!

    আসলেই তাই। সারা দিনরাত আমাকে অনর্গল শুনতে হচ্ছে হ্যারি ভাইয়া ওটা, হ্যারি ভাইয়া এটা, হ্যারি ভাইয়া অমুক বলেছে?

    হ্যারি ভাইয়া তমুক ভাবছে। হ্যারি ভাইয়াকে এটা দিই?

    হ্যারি ভাইয়াকে নিয়ে আসি? তুমি অফিসে থাকো বলে এ যন্ত্রণা তোমাকে সইতে হয় না। কিন্তু এটার সঙ্গে আমাকে বাস করতে হচ্ছে। আমি আমি ভয় পাচ্ছি, জিম। ব্যাপারটা খুবই অস্বস্তিকর।

    তোমার মানসিক বিশ্রামের জন্য কী করা দরকার জানো?

    কী?

    ক্রিসকে নিয়ে কাল ডা. সালামের কাছে যাবে। উনি এ শহরের সেরা সাইকিয়াট্রিস্ট। ক্রিসের সাথে উনি কথা বলুন।

    ক্রিস কি অসুস্থ–মানে মানসিক ভাবে…?

    আরে না! তবে প্রফেশনাল অ্যাডভাইসটা এখন দরকার।

    পরদিন ক্রিস্টিনকে নিয়ে গেলাম ডা. ওয়েবস্টারের কাছে। ওকে ওয়েটিং রুমে বসিয়ে ডাক্তারের কাছে হ্যারির ব্যাপারটা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করলাম। সহানুভূতির ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন তিনি, তারপর বললেন, এটা একটা অদ্ভুত কেস, মিসেস জেমস। তবে অস্বাভাবিক নয়। কাল্পনিক সঙ্গী কোন কোন বাচ্চার কাছে এমন বাস্তব হয়ে ওঠে যে বাবা মার আত্মা শুকিয়ে যায় ভয়ে। এরকম ঘটনা বহু দেখেছি। আপনার মেয়েটি বোধহয় একা থাকে, তাই না?

    ওর কোন বন্ধু নেই। আমরা নতুন এসেছি ওই এলাকায়। তবে স্কুলে যেতে শুরু করলে আর বন্ধুর অভাব হবে না।

    ও স্কুলে যাবার পরে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে যখন মিশতে থাকবে, দেখবেন ফ্যান্টাসিগুলো অদৃশ্য হয়ে গেছে। প্রতিটি শিশুরই সমবয়সী সঙ্গী সাথী দরকার। না পেলে সে নিজেই কোন সঙ্গী আবিষ্কার করে বা বানিয়ে নেয়। বয়সী কিংবা বুড়োরা যেমন আপন মনে নিজেদের সাথে কথা বলে। এর মানে এই নয় যে তারা পাগল। কারও সঙ্গে কথা বলার দরকার হয়। বলেই এমনটা করে। শিশুরা আরও বেশি প্র্যাকটিকাল। নিজে নিজে কথা বলার চেয়ে কল্পনায় কোন সঙ্গী সে তৈরি করে। আমার মনে হয় না এ নিয়ে দুশ্চিন্তার কিছু আছে।

    আমার স্বামীও তাই বলেছে।

    ঠিকই বলেছেন তিনি। তবে ক্রিস্টিনকে যেহেতু নিয়ে এসেছেন, ওর সঙ্গে একটু কথা বলি। তবে আমাদের আলাপচারিতায় আপনার না থাকলেও চলবে।

    আমি ওয়েটিংরুমে গেলাম ক্রিস্টিনের কাছে। সে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে দেখে বলল, হ্যারি ভাইয়া অপেক্ষা করছে।

    কোথায়, ক্রিস? শান্ত গলায় প্রশ্ন করলাম।

    ওই তো। গোলাপের ঝাড়ের ধারে।

    ডাক্তার তার বাগানে গোলাপ ঝাড় বানিয়েছেন। তাঁর বাসা এবং চেম্বার একসাথে।

    ওখানে কেউ নেই। বললাম আমি। ক্রিস্টিন কটমট করে তাকাল আমার দিকে। ডা. ওয়েবস্টার তোমার সাথে কথা বলবেন, সোনা। ওর চাউনিতে এমন কিছু একটা ছিল, কথা বলার সময় গলা কেঁপে গেল আমার। ওনাকে তো তুমি চেনোই। চিকেন পক্স থেকে সেরে ওঠার পরে তোমাকে ক্যাডবেরি খেতে দিয়েছিলেন, মনে নেই?

    মনে আছে। বলল ক্রিস্টিন। সোৎসাহে পা বাড়াল ডাক্তারের চেম্বারের দিকে। আমি অস্থিরচিত্তে ওর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ওদের অস্পষ্ট গলা ভেসে আসছে। ডাক্তার খিক খিক করে হাসলেন। ক্রিস্টিন জোর হাসিতে ফেটে পড়ল। ডাক্তারের সাথে যেরকম আন্তরিক ভঙ্গিতে কথা বলছে আমার সঙ্গে সেভাবে কখনও বলে না।

    ওরা ঘর থেকে বেরুল। ডাক্তার বললেন, আপনার মেয়ের কোন সমস্যা নেই। ওর মনটা শুধু কল্পনায় ভরা। একটা কথা মিসেস জেমস, ওর সঙ্গে হ্যারির ব্যাপারে আলোচনা করুন। আপনার উপরে যেন সে আস্থা রাখতে পারে। আপনি ওর এই ভাইটির ব্যাপারে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করছেন, শুনেছি আমি। তাই ক্রিস্টিন হ্যারি সম্পর্কে আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায় না। হ্যারি কাঠের খেলনা বানাতে পারে, তাই না, মামণি?

    হ্যাঁ। হ্যারি ভাইয়া কাঠের খেলনা বানাতে পারে।

    সে লিখতে পড়তেও জানে, না?

    হ্যাঁ। এছাড়া সাঁতার কাটতে পারে, গাছে চড়তে পারে, ছবি আঁকে। হ্যারি ভাইয়া সব পারে। ও খুব ভাল ভাই। ক্রিস্টিনের ছোট্ট মুখখানা জ্বলজ্বল করে উঠল।

    ডাক্তার আমার কাঁধ চাপড়ে দিলেন। হ্যারি ওর কাছে খুব ভালো একটা ভাই। ক্রিস্টিনের মত তার চুলের রঙও লাল, তাই না?

    হ্যারি ভাইয়ার চুল আমার চেয়েও লাল আর কোঁকড়ানো। ড্যাডির মতোই প্রায় লম্বা তবে একটু শুকনা। গর্বের সুর ক্রিস্টিনের কণ্ঠে। মাম্মি, তোমার সমান লম্বা হ্যারি ভাইয়া। ওর বয়স চোদ্দ। বলেছে বয়সের তুলনায় ও নাকি বেশি লম্বা হয়ে গেছে। এ কথার মানে কী?

    বাড়ি যাবার পথে মাম্মি তোমাকে এ কথার মানে বুঝিয়ে দেবেন বললেন ডা.ওয়েবস্টার। এখন বিদায়, মিসেস জেমস। দুশ্চিন্তা করবেন না। ও আবোল তাবোল যা বলে বলুক। গুডবাই, ক্রিস্টিন। হ্যারিকে আমার ভালবাসা দিয়ো।

    ও তো ওখানে, ডাক্তারের বাগানের দিকে আঙুল তুলে দেখাল ক্রিস্টিন। আমার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

    গলা ছেড়ে হাসলেন ডাক্তার। এদেরকে সংশোধন করা সম্ভব নয়, তাই না? আমি এক আদিবাসী মায়ের কথা জানি যার বাচ্চারা কল্পনায় গোটা একটি আধিবাসী দল আবিষ্কার করে বাড়িতে নানারকম পূজা-অর্চনা শুরু করে দিয়েছিল। সেদিক থেকে আপনি ভাগ্যবতী, মিসেস জেমস!

    নিজেকে ভাগ্যবতী ভাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু পারলাম না। মনে প্রাণে আশা করলাম ক্রিস্টিন স্কুলে যেতে শুরু করলে তার মাথা থেকে হ্যারির ভূতটা নেমে যাবে।

    ক্রিস্টিন আমার আগে আগে ছুটে চলেছে। এমনভাবে পাশ ফিরে তাকাচ্ছে যেন সঙ্গে কেউ আছে। একটি ভয়ঙ্কর সেকেন্ডের জন্য আমি ফুটপাতে ওর ছায়ায় পাশে আরেকটি লম্বা, সরু ছায়া দেখতে পেলাম–কোঁকড়ানো চুলের মাথার কোন ছেলের ছায়া। পরের মুহূর্তে ওটা উধাও। ছুটে গিয়ে ক্রিস্টিনের হাত চেপে ধরলাম। বাকি রাস্তাটা আর মুঠো ছাড়লাম না।

    আমাদের বাড়িটিতে যথেষ্ট নিরাপত্তা রয়েছে। কিন্তু এ গরমেও বাড়িটি আশ্চর্য রকম ঠান্ডা। আমি আর এক মুহূর্তের জন্যও ক্রিস্টিনকে চোখের আড়াল হতে দিলাম না। ও আমার চোখের সামনেই আছে, কিন্তু বাস্তবে যেন আমার কাছ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আমার বাড়িতে আমার বাচ্চা ক্রমে অচেনা একজনে পরিণত হচ্ছে।

    ক্রিস্টিনকে দত্তক নেওয়ার পরে এই প্রথম সিরিয়াসভাবে প্রশ্নগুলো মাথায় এল আমার : কে ও? কোত্থেকে এসেছে ও? ওর আসল বাবা-মা

    কে? যাকে আমি মেয়ে হিসেবে হিসেবে দত্তক নিয়েছি এর প্রকৃত পরিচয় কী? কে ক্রিস্টিন?

    আরেকটি হপ্তা গেল। সারা হপ্তা শুধু হ্যারির গল্পই শুনতে হলো। স্কুলে যাবার আগের দিন ক্রিস্টিন জানাল সে স্কুলে যাবে না।

    অবশ্যই যাবে। বললাম আমি। তোমার স্কুলে ভর্তি হবার বয়স হয়েছে। ওখানে তোমার বয়সী অনেক বন্ধু পাবে।

    হ্যারি ভাইয়া বলেছে সে যেতে পারবে না।

    স্কুলে হ্যারিকে দরকার হবে না তোমার। সে– ডাক্তারের উপদেশ মনে পড়ে গেল, অনেক কষ্টে গলার স্বর শান্ত রাখলাম। –মানে স্কুলে ভর্তি হবার জন্য তার বয়স অনেক বেশি। ছোট ছোট বাচ্চাদের মধ্যে চোদ্দ বছরের একটা বুড়ো ছেলের খুবই অস্বস্তি লাগবে।

    আমি হ্যারি ভাইয়াকে ছাড়া স্কুলে যেতে পারব না। আমি হ্যারি ভাইয়ার সঙ্গে থাকব। ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করল ও। ক্রিস, কান্না বন্ধ করো! বন্ধ করো বলছি! ঠাস্ করে ওর হাতে সজোরে চড় বসিয়ে দিলাম। সাথে সাথে থেমে গেল কান্না। আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। বড় বড় নীল চোখ জোড়া বিস্ফারিত এবং ভয়ঙ্কর ঠান্ডা। বড়দের মতো ভীতিকর চাউনি। ছমছম করে উঠল গা।

    ক্রিস্টিন বলল, তুমি আমাকে ভালবাস না। হ্যারি ভাইয়া আমাকে ভালবাসে। ও আমাকে চায়। বলেছে ওর সঙ্গে আমি যেতে পারি।

    এসব কথা আমি আর শুনতে চাই না!

    চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, পরক্ষণে নিজের উপরে রাগ হলো ছোট একটা বাচ্চার সাথে এরকম খারাপ ব্যবহার করার জন্য। আমার বাচ্চা হাঁটু–গেড়ে বসে পড়লাম আমি। দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে ব্যাকুল গলায় ডাকলাম, ক্রিস, সোনা। এসো।

    ধীর পায়ে এগিয়ে এল সে। আমি তোমাকে ভালবাসি। বললাম আমি। তুমি স্কুলে গেলে আমি খুব খুশি হবো।

    স্কুলে গেলে হ্যারি ভাইয়াকে পাব না।

    অন্য অনেক বন্ধু পাবে।

    আমি অন্য কাউকে চাই না। শুধু হ্যারি ভাইয়াকে চাই। আবার চোখ ছাপিয়ে জল এল। আমার কাঁধে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে লাগল ফুঁপিয়ে। আমি ওকে জোরে জড়িয়ে ধরলাম।

    তুমি ক্লান্ত,মা। চলো, ঘুমাতে যাবে।

    মুখে জলের শুকনো দাগ নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল ক্রিস্টিন।

    তখনও দিনের আলো ছিল। আমি জানালার ধারে গেলাম পর্দা ফেলে দিতে। বাগানে সোনালি ছায়া আর রোদের লম্বা ফালি। তারপর, আবার স্বপ্নের মত, সাদা গোলাপ ঝাড়ের পাশে ছায়া ফেলল লম্বা, পাতলা একটি শরীর। পাগলিনীর মতো ঝট করে জানালা খুলে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম, হ্যারি! হ্যারি!

    কোঁকড়ানো চুলের মাথাসহ ছায়াটা দেখলাম যেন এক মুহূর্তের জন্য। তারপর আর কিছু নেই।

    রাতে জিমকে ক্রিস্টিনের কথা বললাম। সহানুভূতির ভঙ্গিতে মাথা দোলাল সে। বেচারী। স্কুলে যাবার সময় সব বাচ্চাই এরকম কান্নাকাটি করে। একবার স্কুলে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিছুদিন পরে আস্তে আস্তে হ্যারির কথাও ভুলে যাবে।

    হ্যারি চায় না ও স্কুলে যাক।

    অ্যাই! তুমিও দেখছি হ্যারিকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছ।

    কখনও কখনও করি।

    বুড়ো বয়সে ভূত–প্রেতে বিশ্বাস? ঠাট্টা করল জিম।

    হ্যারি ভূত–প্রেত নয়, বললাম আমি। একটা কিশোর মাত্র। যার কোন অস্তিত্ব নেই শুধু ক্রিস্টিরে কাছে ছাড়া। আর ক্রিস্টিন কে?

    ওভাবে বলছ কেন? কঠিন শোনাল জিমের কণ্ঠ। ক্রিস্টিনকে দত্তক নেয়ার সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ও আমাদের আপন সন্তানের মতো বেড়ে উঠবে। আমরা ওর অতীত নিয়ে মাথা ঘামাব না। কোন দুশ্চিন্তা করব না। কোন রহস্য নিয়ে ভাবব না। আমরা ভাবব ক্রিস্টিন আমাদের রক্ত মাংসের সন্তান। অথচ তুমি এখন প্রশ্ন তুলছ ক্রিস্টিন কে! ও আমাদের মেয়ে-এ কথাটা ভুলে যেয়ো না।

    জিমকে আগে কখনও এভাবে রেগে উঠতে দেখিনি। তাই পরদিন ক্রিস্টিন স্কুলে থাকার সময় কী করব সে ব্যাপারটা গোপন করে গেলাম ওর কাছে।

    পরদিন সকালে ক্রিস্টিনকে চুপচাপ আর গম্ভীর দেখলাম। জিম ওর সঙ্গে ঠাট্টা-তামাশা করে মন ভালো করে দিতে চাইল। কিন্তু সেদিকে পাত্তা না দিয়ে ও জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর একসময় বলল, হ্যারি ভাইয়া চলে গেছে।

    হ্যারিকে তোমার দরকার নেই। তুমি এখন স্কুলে যাবে। বলল জিম।

    ক্রিস্টিন ওর দিকে সেই ঘৃণামিশ্রিত বড়দের মতো চাউনি দিল।

    স্কুলে যাবার পথে মেয়ের সঙ্গে কোন কথা হলো না আমার। খুব কান্না পাচ্ছিল। তবু যে ওকে স্কুলে নিয়ে যেতে পারছি তাই যথেষ্ট। ওকে আমি হারিয়ে ফেলছি এরকম বিচিত্র অনুভূতি জাগল মনে। প্রতিটি মায়েরই হয়তো তার বাচ্চাকে প্রথম স্কুলে নিয়ে যাবার সময় এরকম অনুভূতি হয়। স্কুলে ভর্তি হওয়া মানে শিশুর শৈশবকালের সমাপ্তি, বাস্তব জীবনে প্রবেশ। জীবনের নিষ্ঠুরতা, বর্বরতা, অচেনা দিকের সাথে পরিচয়। স্কুলের গেটে দাঁড়িয়ে ওকে বিদায় চুম্বন করে বললাম, তুমি আজ স্কুলের অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে লাঞ্চ করবে, ক্রিস। তিনটার সময় ছুটি হলে তোমাকে নিতে আসব।

    আচ্ছা, মাম্মি, আমার হাত শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ও। নার্ভাস চেহারায় অন্যান্য বাবা-মাদের সাথে ভয় আর দুশ্চিন্তা নিয়ে বাচ্চারা স্কুলে আসতে শুরু করেছে। সুন্দর চুলের, সাদা সুতির স্কার্ট পরা এক সুন্দরী তরুণী হাজির হলো স্কুল গেটে। নতুন বাচ্চাদের জড়ো করে ওদের নিয়ে। স্কুল অভিমুখে রওনা হয়ে গেল। আমার সামনে দিয়ে যাবার সময় তার মুখে সহানুভূতির হাসি ফুটল। আমরা ওর ঠিক মতো যত্ন নেব।

    ক্রিস্টিনকে নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না জেনে হালকা হয়ে গেল মন। এবার আমার গোপন অভিযানে বেরিয়ে পড়া চলে। বাসে উঠে পড়লাম। নামলাম বিশালাকৃতির, বিষণ্ণ চেহারার বিল্ডিংটির সামনে। চার বছর আগে জুবেরকে নিয়ে একবার এসেছিলাম এ দালানে। এরপর আর আসার দরকার হয়নি। বিল্ডিং-এর টপ ফ্লোরে গ্ৰেথর্ন অ্যাডপশন সোসাইটির অফিস। আমি পাঁচতলায় উঠে এলাম। রঙচটা, পরিচিত দরজায় কড়া নাড়লাম। এক মহিলা, আগে কখনও দেখিনি, ভিতরে আসতে বলল আমাকে। মিসেস ক্লিভারের সাথে দেখা করতে পারি? আমি মিসেস জেমস।

    অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে?

    না। তবে ব্যাপারটা খুব জরুরি।

    আচ্ছা, দেখছি। বলে ভিতরের ঘরে ঢুকল সে। একটু পরেই ফিরে এল।

    মিসেস ক্লিভার আপনাকে যেতে বলেছেন, মিসেস জেমস।

    মিসেস কিভার রোগা, লম্বা, ধূসর চুলের হাসি মুখের এক মহিলা। তাঁর চেহারা থেকে করুণা ঝরে পড়ছে, কপালে অসংখ্য ভাঁজ। আমাকে দেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। মিসেস জেমস, কতদিন পরে দেখা! ক্রিস্টিন কেমন আছে?

    ভাল আছে, মিসেস ক্লিভার। আপনার সময় নষ্ট না করে সরাসরি কাজের কথায় চলে আসি। আমি জানি দত্তক সন্তানদের জন্মবৃত্তান্ত আপনারা গোপন রাখেন। কিন্তু ক্রিস্টিনের আসল পরিচয় জানা আমার খুবই দরকার।

    দুঃখিত, মিসেস জেমস, শুরু করলেন তিনি। আমাদের নিয়ম আছে…

    প্লীজ, গল্পটা আগে শুনুন। তারপর বুঝতে পারবেন কেন ক্রিস্টিনের জন্ম নিয়ে তথ্য চাইছি।

    হ্যারির ঘটনা বললাম তাঁকে।

    সব শুনে তিনি মন্তব্য করলেন, খুব অদ্ভুত ঘটনা। খুবই অদ্ভুত। মিসেস জেমস, এই প্রথম আমি নিয়ম ভাঙছি। ক্রিস্টিনের জন্ম শহরতলীর এক হত দরিদ্র এলাকায়। ওদের সংসারে ছিল চার সদস্য, বাবা, মা, ভাই ও ক্রিস্টিন।

    ভাই?

    হ্যাঁ। তার যখন চোদ্দ বছর তখন ঘটনাটা ঘটে।

    কী ঘটেছিল?

    গোড়া থেকে বলি। বাবা-মা ক্রিস্টিনের জন্ম হোক তা চায়নি। তিনতলা একটা জরাজীর্ণ বিল্ডিংয়ের চিলেকোঠার ঘিঞ্জি ঘরে গাদাগাদি করে বাস করত গোটা পরিবার। ওখানে অতি স্বল্প আয়ের লোকজন বাড়ি ভাড়া করে থাকত। সেই ভবনের চিলেকোঠার ঘরে তিনজনেরই ঠিক মতো শোয়ার জায়গা হত না, আর একটা বাচ্চা যোগ হওয়ায় খুবই মুশকিলে পড়তে হয়েছিল ক্রিস্টিরে বাবা-মাকে। মা-টা ছিল পাগলাটে টাইপের, মোটাসোটা, নোংরা আর অত্যন্ত অসুখী একজন মানুষ। মেয়ের প্রতি তার কোন আগ্রহই ছিল না। তবে ভাইটি প্রচণ্ড ভালবাসত তার বোনকে। স্কুল বাদ দিয়ে বোনের দেখাশোনা করত।

    একটা গুদাম ঘরে স্বল্প বেতনে কাজ করত বাপ। ও দিয়ে সংসার চলত না। তারপর একদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে সে। অনেকদিন অসুস্থ ছিল বলে চাকরিটাও হারায়। ওই গুমোট ঘরে দিনের পর দিন স্ত্রীর গঞ্জনা আর ক্ষুধার্ত বাচ্চার কান্না সহ্য করতে হয়েছে তাকে অসুস্থ শরীরে। আমি এ সমস্ত তথ্য পেয়েছি প্রতিবেশিদের কাছ থেকে। শুনেছি ভয়ানক দুঃসময় যাচ্ছিল ওদের। এত দারিদ্র সহ্য করা কঠিন হয়ে উঠেছিল বেকার বাপের জন্য।

    তারপর একদিন খুব ভোরে, ওই বাড়ির নীচতলার এক মহিলা দেখতে পায় তার জানালার পাশ দিয়ে কী যেন একটা উপর থেকে পড়ল। পরক্ষণে দড়াম করে শব্দ, মহিলা বাইরে এসে দেখে চিলেকোঠার পরিবারের ছেলেটি পড়ে আছে মাটিতে। ক্রিস্টিনকে জড়িয়ে রেখেছে সে। ছেলেটির ঘাড় ভেঙে গেছে। মারা গেছে সে।

    মহিলার ডাকাডাকিতে ওই বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দারা জেগে ওঠে। পুলিশ আর ডাক্তারকে খবর দিয়ে তারা চিলেকোঠায় যায়। ভেতর থেকে তালা বন্ধ দরজা ভেঙে ঢুকতেই তীব্র গ্যাসের গন্ধ ধাক্কা মারে তাদের নাকে। যদিও জানালা খোলা ছিল। স্বামী আর স্ত্রীকে বিছানায় মৃত পড়ে থাকতে দেখে তারা। স্বামী একটা চিরকুট লিখে রেখে গিয়েছিল :

    আমি আর পারলাম না। আমার পরিবারকে খুন করতে যাচ্ছি আমি। এ ছাড়া কোন রাস্তা নেই।

    পুলিশ বলেছিল পুরুষ লোকটা পরিবারের সবাই যখন ঘুমাচ্ছিল ওই সময় দরজা-জানালা বন্ধ করে গ্যাস চালিয়ে দেয়। তারপর শুয়ে পড়ে স্ত্রীর পাশে এবং অজ্ঞান হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। ছেলেটি যেভাবে হোক জেগে গিয়েছিল। দরজা খোলার চেষ্টাও বোধহয় করেছিল। দুর্বল শরীরে পারেনি। শেষে জানালা খুলে নিচে লাফিয়ে পড়ে আদরের বোনকে বুকে জড়িয়ে ধরে।

    এক বছর বয়সী ক্রিস্টিন কেন গ্যাসে আক্রান্ত হয়নি এটা একটা রহস্য। হয়তো বেডক্লথ দিয়ে মাথা ঢাকা ছিল তার। ভাইয়ের বুকের সাথে মাথা চেপে ঘুমিয়েছে-ভাইয়ের সঙ্গেই ঘুমাত সে। যাহোক, বাচ্চাটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, সেখান থেকে এই হোমে। এখানে আপনি আর জিম সাহেব ওকে প্রথম দেখলেন…নিঃসন্দেহে ওটা সৌভাগ্যের দিন ছিল ক্রিস্টিরে জন্য।

    ওর ভাই তাহলে বোনকে বাঁচাতে গিয়ে মারা গেছে? বললাম আমি।

    হ্যাঁ। খুব সাহস ছিল ছেলেটার।

    কী নাম ছিল ভাইয়ের?

    দেখছি, ফাইলের স্তূপ থেকে একটা ফাইল বের করলেন মিসেস ক্লিভার। চোখ বুলাতে লাগলেন। অবশেষে বললেন, পরিবারটির নাম। জোনস পরিবার। আর চোদ্দ বছরের ছেলেটির নাম ছিল হ্যারি জোনস।

    তার মাথায় কোঁকড়ানো লাল চুল ছিল? বিড়বিড় করলাম আমি।

    তা বলতে পারব না, মিসেস জেমস।

    কিন্তু ওটা হ্যারি। ছেলেটার ডাকনাম হ্যারি। কিন্তু এর অর্থ কী? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

    অর্থ আমিও বুঝতে পারছি না। তবে আমার ধারণা ক্রিস্টিনের মনের গভীর অবচেতনে হ্যারির স্মৃতি রয়ে গেছে। তার শৈশবের সাথী। আমরা ভাবি শিশুদের স্মৃতিশক্তি তেমন প্রখর নয়, কিন্তু অতীতের অনেক কথাই তাদের ছোট্ট মস্তিষ্কে গেঁথে থাকে। ক্রিস্টিন এই হ্যারিকে আবিষ্কার করেনি, এর স্মৃতি তার মনে পড়ে যাচ্ছে। তাই তাকে সে একটা জ্যান্ত রূপ। দিয়েছে। আমার কথা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কিন্তু গোটা ব্যাপারটাই এমন অদ্ভুত যে অন্য কোন ব্যাখ্যা মাথায় আসছে না।

    ওরা যে বাড়িতে থাকত সেটার ঠিকানা পেতে পারি?

    মিসেস ক্লিভার ঠিকানা দিতে রাজি নন। কিন্তু আমার পীড়াপীড়িতে শেষে দিতেই হলো। আমি ১৩, কানভাররোর ঠিকানা খুঁজতে বেরিয়ে পড়লাম। অবশেষে বাড়িটি খুঁজে পেলাম। শহরের শেষ মাথার বাড়িটি জনমানবশূন্য মনে হলো। নোংরা এবং ধ্বংসের শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। তবে একটা দৃশ্য দেখে থমকে গেলাম। ছোট একটা বাগান আছে বাড়ির সামনে। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সবুজ ঘাস। তবে ছোট্ট বাগানের এক জায়গার অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য গ্রাস করতে পারেনি বিষণ্ণ রাস্তার পাশের বাড়িগুলো-সাদা গোলাপের একটা ঝাড়। ঝলমল করছে গোলাপগুলো। চমৎকার সুগন্ধ ছড়াচ্ছে।

    ঝোঁপের পাশে দাঁড়িয়ে চিলেকোঠার জানালার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম আমি।

    একটা কণ্ঠ শুনে চমকে উঠলাম, এইহানে কী চান?

    নিচতলার জানালা দিয়ে উঁকি মেরেছে এক বুড়ি। মাথায় শনের মত সাদা চুল। পরনে ময়লা, ছেঁড়া কাপড়।

    ভেবেছিলাম বাড়িটি খালি, বললাম আমি।

    খালি থাকবারই কতা ছিল। এইহানে আমি ছাড়া কেউ থাহেও না। আমারে ওরা বাইর করবার পারে নাই। আমার কোতাও যাইবার জায়গা নাই। ঘটনা ঘটবার পর অন্য মাইনষেরা ভয় পাইয়া বাড়ি ছাইড়া পালায়। তারপর আর কেউ এই বাড়ি ভাড়া লইবার আয় নাই। এইটা বলে হানাবাড়ি।

    একটু বিরতি দিল সে। তারপর লাল টকটকে চোখ মেলে আমার দিকে তাকাল। আমি ওরে আমার জানলার পাশ দিয়া ছিটকা পইড়া যাইতে দেখছি। ঐ যে গোলাপ ঝাড়টা দেখছেন, ঐহানে পইড়াছিল সে ঘাড় মটকাইয়া। তয় ও এহনও ফিরা আসে। আমি অরে দেখতে পাই। বইনরে না পাওয়া পর্যন্ত সে কোথাও যাইব না।

    শিউরে উঠি আমি। কে-কার কথা বলছেন আপনি?

    বুড়ি বলল, হ্যারি। মাথা ভর্তি কোঁকড়াইন্যা লাল চুল। শুটকা। খুব জিদ্দি। তয় পোলাড়া খুব ভাল আছিল। বইনডারে জান দিয়া ভালবাসত। ঐ গাছের ধারে ছোড বইনরে নিয়া খেলত। মরছেও ঐহানেই। কিন্তু সত্যই কি মরছে?

    ফ্যাকাসে, কোঁচকানো আঙুলের ফাঁক দিয়ে উন্মাদিনীর দৃষ্টিতে এমনভাবে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল সে, শিরশির করে উঠল গা। পাগল মানুষ ভয়ঙ্কর প্রকৃতির হয়। কেউ এদের করুণা করে, কেউ ভয় পায়। আমি বিড়বিড় করে বললাম, আ-আমি যাই।

    উত্তপ্ত ফুটপাত দিয়ে দ্রুত পা চালালাম। কিন্তু পা জোড়া ভয়ানক ভারি আর অসাড় মনে হলো, যেন দুঃস্বপ্নের মাঝ দিয়ে হাঁটছি। সূর্য প্রচন্ড উত্তাপ ছড়াচ্ছে মাথার উপরে। কিন্তু টের পাচ্ছি না যেন। সময় এবং স্থান জ্ঞান হারিয়ে ছুটছি আমি।

    হঠাৎ একটা শব্দ কানে যেতে রক্ত হিম হয়ে এল আমার। ঘড়িতে দেখলাম তিনটা বাজে। তিনটার সময় আমার স্কুল গেটে থাকার কথা, ক্রিস্টিনের জন্য। আমি এখন কোথায়? এখান থেকে স্কুল কত দূরে? রাস্তায় কোন বাস বা ট্যাক্সিও নেই। বাস কোথায় পাব? পথচারীদের পাগলের মত এসব প্রশ্ন করতে লাগলাম। তারা আমার দিকে ভীত চোখে দেখছে, যেন ওই বুড়ির মত চেহারা আমার। ওরা নিশ্চয় আমাকে পাগল ঠাউরেছে। অবশেষে সঠিক বাসটি পেয়ে গেলাম।

    ধুলো আর গরমে অস্থির আমি বুকে দারুণ ভয় নিয়ে অবশেষে স্কুলে। পৌঁছালাম। এক দৌড়ে পার হলাম খেলার মাঠ। ক্লাসরুমে সাদা স্কার্ট পরা সেই তরুণী শিক্ষিকা বইপত্র গোছাচ্ছে।

    ক্রিস্টিন জেমসকে নিতে এসেছি। আমি ওর মা। দুঃখিত, দেরি হয়ে গেছে। কোথায়?

    ক্রিস্টিন জেমস? –কোঁচকাল তরুণী, তারপর কলকল করে বলল, ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে। লাল চুলের ছোট্ট, সুন্দর মেয়েটি। ওর ভাই এসেছিল ওকে নিতে, মিসেস জেমস। দুজনের চেহারায় অদ্ভুত মিল দেখলাম। তবে বোনকে সে যে খুব ভালবাসে তা তার আচরণ দেখেই বুঝতে পেরেছি। আচ্ছা আপনার স্বামীরও কি তার বাচ্চাদের মতো লাল চুল?

    ওর ভাই- কী বলল? অস্পষ্ট গলায় জানতে চাইলাম।

    কিছুই বলেনি। প্রশ্ন করলেও শুধু হেসেছে। এতক্ষণে ওরা বোধহয় বাড়ি পৌঁছে গেছে। আপনি ঠিক আছেন তো?

    হ্যাঁ। ধন্যবাদ। আমি গেলাম।

    পা পুড়ে যাওয়া উত্তপ্ত রাস্তার পুরোটাই দৌড়ে বাড়ি চলে এলাম আমি।

    ক্রিস্টিন! কোথায় তুমি? ক্রিস! ক্রিস্টিন! মাঝে মাঝে এখনও শুনতে পাই আমার সেই আর্তনাদ ঠাণ্ডা বাড়িটির দেয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছে। ক্রিস্টিন! ক্রিস্টিন! কোথায় তুমি? জবাব দাও! ক্রিস্টিন! তারপর, হ্যারি! ওকে নিয়ে যেয়ো না! ফিরে এসো! হ্যারি! হ্যারি!

    উন্মত্তের মতো বাগানে ছুটলাম আমি। প্রখর রোদ ধারাল ফলার মতো আঘাত হানল। ধবধবে সাদা গোলাপগুলো ভীষণভাবে জ্বলজ্বল করছে। স্থির বাতাস। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমি বুঝি ক্রিস্টিনের খুব কাছে চলে এসেছি। যদিও ওকে দেখতে পেলাম না। তারপর আমার চোখের সামনে নাচতে শুরু করল গোলাপগুলো, রঙ বদলে হয়ে উঠল লাল। রক্ত লাল। বৃষ্টিস্নাত লাল। মনে হলো আমি লালের মাঝ দিয়ে কালোর মাঝে ঢুকে পড়েছি, তারপর শুধুই শূন্যতা–প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি।

    .

    মারাত্মক হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছিলাম আমি। বেশ কয়েক দিন বিছানায় পড়ে থাকতে হলো আমাকে। ওই সময় জিম আর পুলিশ মিলে বেহুদাই খুঁজেছে ক্রিস্টিনকে। ব্যর্থ এ প্রচেষ্টা চলল মাস কয়েক ধরে। মেয়েটা অদৃশ্য হয়ে যাবার ঘটনা নিয়ে স্থানীয় খবরের কাগজে নানান গল্প ছাপা হলো। তারপর এক সময় থিতু হয়ে এল উত্তেজনা। পুলিশ ফাইলে আরেকটি অমীমাংসিত রহস্য জমা হলো।

    শুধু দুজন মানুষের জানা থাকল আসল ঘটনা। পরিত্যক্ত একটি বাড়িতে বাস করা এক পাগলি বুড়ি আর আমি। বছর পার হয়ে গেল। কিন্তু আজও ভয়টা গেঁথে আছে আমার মনে।

    ছোট্ট ছোট্ট জিনিস আমাকে ভীত করে তোলে। রোদ। ঘাসের ওপর গাঢ় ছায়া। সাদা গোলাপ। কোঁকড়ানো লাল চুলের শিশু। আর একটা নাম হ্যারি। কত সাধারণ একটা নাম!

    –রোজমেরি টিম্পারলি

    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleঅশুভ ছায়া – অনীশ দাস অপু
    Next Article ভূত প্রেত রক্তচোষা – অনীশ দাস অপু

    Related Articles

    তসলিমা নাসরিন

    সেইসব অন্ধকার – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    আমার প্রতিবাদের ভাষা – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    অগ্রন্থিত লেখার সংকলন – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    বন্দিনী – তসলিমা নাসরিন

    August 21, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    নির্বাসন – তসলিমা নাসরিন

    August 20, 2025
    তসলিমা নাসরিন

    নেই, কিছু নেই – তসলিমা নাসরিন

    August 20, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Demo
    Most Popular

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    অনুরাধা

    January 4, 2025

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025
    Our Picks

    রঙ্কিণীর রাজ্যপাট এবং অন্যান্য – নবনীতা দেবসেন

    August 30, 2025

    আনা ফ্রাঙ্ক-এর ডায়েরি

    August 30, 2025

    আগাথা ক্রিস্টি রচনা সমগ্র ১ (অনুবাদ : নচিকেতা ঘোষ)

    August 30, 2025
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2025 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    Sign In or Register

    Welcome Back!

    Login below or Register Now.

    Lost password?

    Register Now!

    Already registered? Login.

    A password will be e-mailed to you.