জামাই – মনোজ বসু
অনেক দিনের কথা। খুলনা অবধি নতুন রেললাইন বসেছে। একটা স্টেশন ঝিকরগাছি।
শ্রাবণ মাস। সারাদিন ঝুপঝুপে বৃষ্টি। সন্ধ্যা থেকে একটুখানি ধরেছে। রাত্রি সাড়ে আটটায় কলকাতার ট্রেন ঝিকরগাছি এসে থামল। দুর্যোগে মোটে ভিড় নেই। জন তিন-চার গাড়িতে উঠল। নামল একটিমাত্র যুবাপুরুষ। নাম বিনোদ। কাছাকাছি সাদিপুর গাঁয়ের মাখনলাল করের জামাই। তাঁর ছোটো মেয়ে চঞ্চলার সঙ্গে বিয়ে হয়েছে বছর দুই আগে।
পুনায় থাকে বিনোদ, মিলিটারিতে জামাই চাকরি করে। সম্প্রতি বাসা পেয়েছে। বউকে নতুন বাসায় নিয়ে যাবে। এক হপ্তার ছুটি নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। এর পর ভাদ্র মাস পড়ে যাবে। শ্বশুর-শাশুড়ি তখন মেয়ে পাঠাবেন না। সেইজন্যে তাড়াতাড়ি।
স্টেশনে নেমে বিনোদ গেট পেরিয়ে বেরুল। গেটে লোক নেই, কেউ টিকিট চাইল না। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে, কোনো দিকে জনমানব দেখা যায় না। আরও দু-বার সে শ্বশুরবাড়ি এসে গেছে, পথ মোটামুটি জানা। তবু ভালো করে একবার স্টেশনমাস্টারের কাছে জিজ্ঞাসাবাদ করে নেবে।
অফিসঘরের দরজা ঝাঁকাচ্ছে— মাস্টারমশায়, মাস্টারমশায়-
দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। আলো জ্বলছে। স্টেশনমাস্টার আছেন অতএব অফিসে। সাড়া দিচ্ছেন না।
শুনুন একবারটি মাস্টারমশায়—
পয়েন্টসম্যান এল হঠাৎ কোন দিক থেকে। গায়ে নীল কোট; তার উপর মোটা কম্বল জড়ানো। তা সত্ত্বেও হি-হি করে কাঁপছে। বলে, ডাকেন কেন বাবু? মাস্টারমশায় জ্বরে বেহুঁশ। গাড়ির ছাড় গার্ডসাহেব আজ আমার কাছ থেকে নিয়ে নিল। উনি উঠতে পারবেন না, আমায় বলুন কী দরকার।
সাদিপুর থেকে আমার জন্য পালকি আসার কথা। দেখতে পাচ্ছিনে তো।
ভ্রূভঙ্গি করে পয়েন্টসম্যান বলে, পালকি চাচ্ছেন বাবু, বলি পালকিটা বইবে কারা? বেয়ারা জুটবে কোথা? ম্যালেরিয়ার নতুন আমদানি- ঘরে ঘরে মেয়েমর্দ সকলের জ্বর। একবাটি বার্লি রেঁধে দেবার মানুষ জোটে না, আপনার মাথায় পালকির শখ চাপল এখন।
হাঁসফাস করছিল লোকটা— বিনোদের সামনে সেইখানে মেঝের উপর বসে পড়ল। বলে, আগের লোকটা মারা গেল জ্বরে। পরশুদিন আমায় এই স্টেশনে পাঠাল। আমাকেও জ্বরে ধরেছে। কপালে কী আছে জানিনে।
দু-মাসের মধ্যে বিনোদ শ্বশুরবাড়ির কোনো চিঠিপত্র পায়নি। মন বড়ো উতলা। স্টেশনমাস্টার পুরোনো লোক, তিনি হয়তো খবরাখবর কিছু বলতে পারতেন। এ লোক একেবারে নতুন, একে জিজ্ঞাসা করে লাভ নেই।
সারাদিন খাওয়া হয়নি বিনোদের। বড়ো ক্লান্ত। একবার ভাবল, রাত্রিটা স্টেশনে কাটিয়ে সকালবেলা বেরুবে। কিন্তু সামান্য পথ, মাইল তিনেকের বেশি নয়। মশা ঝাঁকে ঝাঁকে এসে পড়ছে— যা গতিক, রাতের মধ্যে চোখ বুজতে দেবে না। তার চেয়ে কোনোরকমে পথটুকু কাটিয়ে শ্বশুরবাড়ির খাটের উপর গদিয়ান হয়ে পড়া ভালো।
.
পথে নেমে পড়ল বিনোদ। হনহন করে চলেছে। হাতঘড়িতে ন-টা। সন্ধ্যারাত্রি বলা যায়। এরই মধ্যে চারিদিক একেবারে নিশুতি। রাস্তার জল কলকল করে নালায় পড়ছে। ব্যাং ডাকছে গ্যাঙর-গ্যাং। বাদুড়ের ঝাঁক উড়ছে মাথার উপরে।
.
চাঁদ দেখা দিল আকাশে। মেঘ ভাঙা ঘোলাটে জ্যোৎস্না। অদূরে কেয়াঝাড়। ছত্রাকার কেয়া পাতার নীচে মানুষ যেন! মানুষটা কাঁটাবনের মধ্যে মোটা কেয়া গুঁড়ির উপর আরামে পা ছড়িয়ে বসে আছে। স্টেশন থেকে বেরিয়ে এতক্ষণের মধ্যে প্রথম এই মানুষ।
বিনোদ ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে, সাদিপুরে মাখনলাল করের বাড়ি যাব। যাচ্ছি তো ঠিক?
উঁহু—। শঙ্খের মতন আওয়াজে মানুষটা জবাব দেয়— সাদিপুর যাবে তো এই দিকে চলে এসো। ডাকছি, আসছ না কেন?
পথ কোথা গহিন জঙ্গলের মধ্যে। পাগল নিশ্চয়— নয় তো রাত্রিবেলা ঘরবাড়ি ছেড়ে এমন জায়গায় কেন? মিলিটারি মানুষ বিনোদ— সে কিছু গ্রাহ্য করে না। নিরুত্তরে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে আরও জোরে গটমট করে চলল।
দীর্ঘ একটা খেজুরগাছ ঝড়ে বেঁকে গেছে। কাত হয়ে আছে সেটা রাস্তার উপর গাছটা আগেও দেখেছে, বিনোদের মনে পড়ল। ঠিক পথেই যাচ্ছে তবে, পথ হারায়নি। যেই মাত্র গাছের নীচে আসা, গাছটা নুয়ে এসে বিষম জোরে মাটিতে আছড়ে পড়ল। সঙ্গেসঙ্গে আবার আগেকার অবস্থায়— তেমনি কাত হয়ে আছে রাস্তার উপর। আর যেন খলখল হাসি শুনতে পায় বাতাসে। বিনোদ ছুটে বেরুল, তাই রক্ষা! নইলে গাছ ঠিক মাথার উপরে পড়ত, মাথা ফেটে চৌচির হয়ে যেত। অল্পের জন্য বেঁচে গেছে।
খুব খানিকটা গিয়ে পিছনে তাকায়। খেজুরগাছ যেমন তেমনি আছে, পাতা ঝিলমিল করছে জ্যোৎস্নায়। সাহসী মানুষ বিনোদ— প্যারেড করে, বন্দুক চালায়। ভাবছে, চোখের ভুল। বম্বে মেল আজ বড্ড লেট ছিল— হাওড়া স্টেশনে নেমেই শিয়ালদা মুখো ছুটতে হল। খাওয়া-দাওয়া হয়নি সমস্তটা দিন। ক্ষিধে-তেষ্টায় অবসন্ন হয়ে মাথা ঘুরছে, আর এই সমস্ত আজব জিনিস দেখছে। আসলে কিছুই নয়।
.
শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে গেল। অবস্থা ভালো এঁদের, পাকা কোঠাবাড়ি। বৈঠকখানা অন্ধকার। শীতকালে বড়োদিনের সময় বিনোদ এসেছিল, দিনরাত লোক গিজগিজ করত তখন। রাতদুপুর অবধি পাশা খেলার হুল্লোড়। আজ কেউ নেই। সেটা হয় তো ওই পয়েন্টসম্যানের মুখে যা শোনা গেল— জ্বরজারির মধ্যে আড্ডা দেওয়ার পুলক নেই মানুষের। বাড়ির কর্তারাও হয়তো জ্বরের তাড়সে ভিতর-বাড়ির বিছানায় পড়ে কোঁ-কোঁ করছেন।
ভিতর-বাড়ির দরজাটা হাঁ-হাঁ করছে। জামাই ঢুকে গেল ভিতরে। বারান্দা দিয়ে যাচ্ছে শব্দসাড়া করে। কাশছে। একজন কেউ বেরিয়ে আসুক। কী আশ্চর্য, গেলেন কোথা সব?
এইরকম ভাবছে। কোন দিক থেকে ঘোমটা দেওয়া এক বউ এসে সামনে দাঁড়াল। বিনোদ হকচকিয়ে যায়। তাড়াতাড়ি পরিচয় দিল, এ বাড়ির ছোটো জামাই আমি— বিনোদ।
খিলখিল খিলখিল উচ্ছলিত হাসি। হাসতে হাসতে ঘোমটা খুলে ফেলে চঞ্চলা। বিনোদের সঙ্গে এই মেয়ের বিয়ে হয়েছে।
চঞ্চলা আগে আগে চলেছে। মস্তবড়ো বাড়ি। আরও কত বারান্দা কত সিঁড়ি উঠান পার হয়ে চলল। একসময়ে বিনোদ সেই আগের প্রশ্ন করে, মানুষ দেখিনে– গেলেন কোথা এঁরা সব?
চঞ্চলা বলে, ঝিকরগাছি আমার এক পিসির বাড়ি। পিসির মেয়ের বিয়ে আজ। বাড়িসুদ্ধ সেখানে চলে গেছেন।
একবার ঢোক গিলে বলে, আমারও যাবার কথা। কিন্তু জ্বর থেকে উঠে সবে কাল অন্নপথ্য করেছি কিনা—
ঘরের মধ্যে এসে গেছে দু-জনা। কুলুঙ্গিতে প্রদীপ। প্রদীপের আলোয় বিনোদ চঞ্চলার দিকে ভালো করে তাকাল। অসুখ করেছিল, চেহারায় তা বোঝা যায় না। আগে যেমন দেখে গেছে, তেমনি। চঞ্চলার চেহারা ও স্বাস্থ্য চমৎকার।
বিনোদ বলে, এত বড়ো বাড়ির মধ্যে একলা একটি প্রাণী ভয় হচ্ছে না তোমার?
একলা কেন হব? বুড়ো দরোয়ান আর গোবিন্দ চাকর রয়েছে। তারা বৈঠকখানায়। সৌদামিনী ঝি-ও আছে। শরীর খারাপ বলে সকাল সকাল শুয়ে পড়েছে, ডাক দিলে এসে পড়বে।
পালঙ্কের বিছানায় চেপে বসে বিনোদ অভিমান ভরে বলে, আজ এসে পৌঁছোব, স্টেশনে পালকি রাখবার জন্য চিঠি দিয়েছিলাম। পালকি না জুটুক, স্টেশনে অন্তত বুড়ো দরোয়ানকে পাঠালে পারতে।
চঞ্চলা ঘাড় নাড়ল—চিঠি পৌঁছোয়নি, পৌঁছোবার উপায়ও নেই। পোস্টমাস্টার— পিওন দুটোই মারা গেছে। যে রানার ডাক বয়ে আনত, সে-ও নাকি নেই।
সাংঘাতিক ম্যালেরিয়া। জ্বরজারি কাকে বলে এ অঞ্চলের লোক আগে জানত না। পাথরে কোঁদা নিরেট দেহ যেন মানুষের। রেললাইন হয়ে অবধি এই কাণ্ড। গাঙ-খালের মুখ বন্ধ করে রাস্তা বেঁধেছে। খানাডোবা চারিদিকে। বর্ষার জল পড়তে না পড়তে নরক গুলজার। মানুষজন উজাড় হয়ে গেল।
কথাবার্তার মধ্যে একসময় বিনোদ বলে, তোমার কাছে বলতে কী— সারাদিন ভাত জোটেনি, বিষম ক্ষিধে পেয়েছে। ক্ষিধের চোটে মুখে আমার কথা সরছে না। তাড়াতাড়ি চাট্টি ভাত ফুটিয়ে দিতে পার তো দেখ।
চঞ্চলা ব্যস্ত হয়ে উঠে পড়ল— ছি ছি, আগে বলতে হয়! চালে-ডালে খিচুড়ি চাপিয়ে দিইগে, তাড়াতাড়ি হবে। তরকারির হাঙ্গামায় যাব না। শুয়ে থাকো তুমি, বিশ্রাম করো। এসে ডাকব তোমায়।
চলে গেল চঞ্চলা। যেন উড়ে বেরিয়ে গেল পাখির মতন।
.
এই ঘরটায় বিনোদ আগেও থেকে গেছে। পিছনে খিড়কির বাগান। কদম ফুল ফুটেছে, খোলা জানলায় মিষ্টি গন্ধ আসছে। কুলুঙ্গির প্রদীপটা হঠাৎ দপদপ করে। আলো নাচে দেয়ালে দেয়ালে। চমক লাগে— অনেক লোকের আনাগোনা যেন বাইরে, ফিসফিস কথাবার্তা।
কে রে, গোবিন্দ নাকি ওখানে?
জবাব নেই। একা গোবিন্দ কিংবা দু-জন চার জন মানুষ নয়। অনেক, অনেক। বাড়ির সকলে নিমন্ত্রণে গিয়েছে। এত লোক তবে কোথা থেকে আসে?
উঁকি দিয়ে দেখল জানলার বাইরে। জ্যোৎস্না উজ্জ্বল হয়েছে এখন। না, কিছুই নয়। কিন্তু যেই মাত্র ভিতর দিকে সরে আসে, আবার সেই পাতার খসখসানি। ভিড় জমেছে বুঝি জানলায়, ঠেলাঠেলি করে তার দিকে উঁকি দিচ্ছে। চাপাগলায় শলাপরামর্শ।
উঠে গিয়ে বিনোদ দড়াম করে জানলার করাট বন্ধ করল। একলা ঘরে গা ছমছম করছে। চঞ্চলার কাছে একথা বলা যাবে না। হাসবে। ঠাট্টা করবে— এই বীরপুরুষ তুমি, এই সাহস নিয়ে লড়াইয়ের পাঁয়তারা কষে বেড়াও!
তার চেয়ে কোথায় চঞ্চলা রান্নাঘরে খিচুড়ি চাপিয়েছে— চলে যাওয়া যাক সেখানে। রান্না চলবে আর গল্প হবে দু-জনায়।
পা-টিপে-টিপে নিঃসাড়ে যাচ্ছে। হঠাৎ ঢুকে পড়ে চঞ্চলাকে চমকে দেবে।
.
কিন্তু— ওরে বাবা, কী সর্বনেশে কাণ্ড গো! রান্নাঘরে ঢুকতে গিয়ে বিনোদ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। রান্না করছে চঞ্চলা— উনুন জ্বালাবার কাঠকুটো নেই বুঝি, সেইজন্য নিজের পা দুখানা ঢুকিয়ে দিয়েছে উনুনের ভিতর, দাউদাউ করে পা জ্বলছে! উনুনের উপর কড়াইতে খিচুড়ি ফুটছে টগবগ করে। চঞ্চলা আঙুল দিয়ে এক-একবার তুলে টিপে দেখছে সিদ্ধ হল কি না। গরম খিচুড়ির মধ্যে ইচ্ছামতো আঙুল ডুবিয়ে দিচ্ছে, পা জ্বলছে ওদিকে উনুনের ভিতরে।
মশলা বাটবে। কোণের দিকে শিল-নোড়া। চঞ্চলার উঠবার জো নেই পা তুললেই তো নিভে যাবে উনুন। হাত বাড়াল শিল-নোড়া আনবার জন্য। হাত ক্রমেই লম্বা হচ্ছে। লম্বা হয়ে শিল-নোড়া ধরল। তারপর ছোটো হচ্ছে। হতে হতে আবার স্বাভাবিক আকারে এল। কাছে এনে শিল পেতেছে। হাত লম্বা করে তখন তাকের উপরের মশলার ডালা নামিয়ে আনল। এক জায়গায় বসে সমস্ত হচ্ছে। ঘটঘটর করে চঞ্চলা বাটনা বাটে এবার।
বিনোদ রুদ্ধনিশ্বাসে দেখে সব তাকিয়ে। পা দুটো খুঁটির মতন অনড় হয়ে গেছে। দেখছে একদৃষ্টিতে।
খিচুড়ি নামিয়ে চঞ্চলা থালায় ঢালে। পিঁড়ি পেতে ঠাঁই করল, জলের গেলাস দিল পাশে। পাতিলেবুর কথা মনে হল বুঝি এইসময়। জানলার গরাদ দিয়ে হাত বের করে দেয়। লম্বা হচ্ছে হাত— আরও, আরও। হাত পঞ্চাশ তো হবেই।
পাঁচিলের প্রান্তে পাতিলেবুর গাছ— বিনোদের দেখা আছে। ডান হাত সেই অবধি বাড়িয়ে পটপট করে গোটা চারেক লেবু ছিঁড়ে হাত আবার গুটিয়ে আনে। বঁটি পেতে লেবু কাটছে।
হঠাৎ বিনোদ যেন সংবিৎ পেয়ে যায়। উঠি-কি-পড়ি ছুটছে। শ্বশুরবাড়ির বাইরে, একেবারে রাস্তার উপর। রাস্তা ধরে ছুটছে। মানুষ দেখা যায় না, কিন্তু চারিদিক থেকে কলরব। বহুকণ্ঠে ডাকাডাকি করছে— পালাস কোথা? দাঁড়া! ভালোর তরে বলছি, দাঁড়িয়ে যা—! খলখল করে হাসি।
বাঁশতলার অন্ধকার। ছুটতে ছুটতে অন্ধকার কাটিয়ে বিনোদ ফাঁকায় এল। কী আশ্চর্য, তার সামনে-পিছনে ডাইনে-বাঁয়ে চারদিকে চারটে বউ। সে যত ছোটে, বউগুলোও ছোটে ততই। ছায়াকে যেমন ছেড়ে পালানো যায় না, তেমনি এরা।
সামনের বউটা একসময় থমকে দাঁড়ায়। গায়ের উপরে বিনোদ হুমড়ি খেয়ে পড়ছিল, কোনোরকমে সামলে নিল। রক্ষা নেই, এইবারে ধরল। তাকিয়ে দেখে, অন্য তিন বউও সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে গেছে।
সামনের বউটা ঘুরে দাঁড়ায় বিনোদের দিকে। এতক্ষণে মুখের ঘোমটা তুলল। তারই স্ত্রী চঞ্চলা— রান্না করছিল যে বসে বসে। ডাইনে-বাঁয়ে ও পিছনে মুখ ঘুরিয়ে দেখে, তারাও সব ঘোমটা খুলেছে। চঞ্চলা সবাই। এক চঞ্চলা চারজন হয়ে গেছে। পালাবার পথ নেই কোনো দিকে। বিনোদের গায়ে ঘাম দেখা দিয়েছে। চারজনের আটখানা হাত অক্টোপাসের মতো টুটি চেপে ধরে বুঝি এইবার। হাতগুলো সত্যি লম্বা হচ্ছে একটু একটু করে, তার দিকে এগিয়ে আসছে। ফাঁকার মধ্যে বেঘোরে প্রাণটা গেল— হায় ভগবান!
চেতনা হারিয়ে বিনোদ পড়ে যায় আর কী পথের উপর! কিন্তু, না— হাতের মুঠিতে গলা চেপে ধরে না, হাতের আঙুলের কোমল স্পর্শ তার দেহে। সর্বাঙ্গ জুড়িয়ে গেল।
চঞ্চলার চোখে জল। চারজনের একসঙ্গে জল এসে গেছে চোখে। বলে, দেখ, একজন আমি চারজন হয়ে চার দিক থেকে ঠেকিয়ে নিয়ে এলাম। নয় তো রক্ষা ছিল না। প্রাণ নিয়ে ফিরে আসতে দিত না ওরা।
বিনোদ বলে, ওরা কারা?
চঞ্চলা বলে, আমি মরে গেছি। আমার ভাই-বোন বাপ-মা সবাই। মহামারিতে এত বড়ো গাঁয়ের মধ্যে একটি প্রাণী বেঁচে নেই। বেঁচে থাকতে এখানকার মানুষ গাঁয়ের মধ্যে চোর ডাকাত ঢুকতে দিত না। মরার পরে তেমনি এখন জ্যান্ত মানুষ ঢুকতে দেয় না। ঢুকে পড়লে গলা টিপে মেরে দলের মধ্যে নিয়ে নেবে। তোমায় যে পারেনি, সে কেবল আমার জন্যে। তুমি বেঁচে থাক, শতেক পরমায়ু হোক। এই কম বয়সে কেন তুমি মরতে যাবে?
হাঁপাচ্ছিল চঞ্চলা ছুটোছুটির ক্লান্তিতে। খানিক দম নিয়ে বলে, গোড়ায় পিছু পিছু আসছিলাম। কিন্তু ভরসা হল না। কেউ এসে টপ করে যদি ধরে নেয়। সামনের দিক দিয়ে কিংবা ডাইনে-বাঁয়ে একজনে চারজন হয়ে চতুর্দিক ঘিরে নিয়ে এসেছি। সে যে কী কষ্ট! আর ভয় নেই, সাদিপুরের সীমানা ছাড়িয়ে এসেছি। একটুখানি গিয়েই স্টেশন।
চার বউ চার পাশ থেকে মাথা নুইয়ে চারখানা ডান হাত বের করে বিনোদের পায়ের ধুলো নিল। পলকের মধ্যে দেখে, ফাঁকা মাঠের মধ্যে একলা সে দাঁড়িয়ে। কোনো দিকে কেউ নেই।
[ শারদীয়া (দেব সাহিত্য কুটীর), ১৯৬১ ]
