উত্তর সিকিমের ভূত বাংলো – সমরেশ বসু
এবার আমি তোমাদের গোগোলের গল্প শোনাতে পারলাম না। তাই ঠিক করেছি, এ বছরে, আমার নিজে চোখে দেখা একটা ভূতুড়ে ঘটনার কথা তোমাদের শোনাব। ভূতুড়ে ঘটনাটা সত্যি ভূতের কাণ্ডকারখানা কিনা, সেটা তোমরাই বিচার করবে।
প্রায় চৌদ্দো বছর আগে আমি প্রথম সিকিমের রাজধানী গ্যাংটকে বেড়াতে গিয়েছিলুম। কোথায় কোন হোটেলে উঠব, সেসব আগের থেকেই ঠিক করা ছিল। কিন্তু সেখানে কারোকেই চিনি নে। আমি একলা মানুষ। গল্প করার কথাবার্তা বলার লোক নেই। একমাত্র হোটেলের মালিক আর তার মেয়ে বউ ছাড়া। হোটেলের মালিক ছিল একজন বাস্তুহারা তিব্বতী। চীনারা যখন তিব্বত দখল করে নিয়েছিল, তখন দলাই লামার সঙ্গে হাজার হাজার তিব্বতী ভারতবর্ষে চলে আসে, আর নানান জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে। এখনও সেই সব তিব্বতীরা আমাদের দেশেই থেকে গিয়েছে।
গ্যাংটক শহরের সবচেয়ে বড়ো সৌন্দর্য হল, প্রায় দু-কিলোমিটার জায়গা অনেকটাই সমতল। শহরের বাজার, দোকানপাট, হোটেল রেস্টুরেন্ট, সবই সেই সমতল রাস্তার দু-ধারে। আর এই রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে, নীল আকাশের গায়ে সবসময়েই দেখতে পেতাম, কাঞ্চনজঙ্ঘার বেশ বড়ো একটা অংশ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল থেকে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে, তুষারাবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘার রংও বদলাতে থাকত। সেই দিকে তাকালে, বাকিটা সবই নীচের পাহাড়ি অঞ্চল, গাছপালায় নিবিড় সবুজ আর নীল দেখাত। আবার অন্য দিকে পাইন দেবদারু নানা গাছের ফাঁকে ফাঁকে, পুলিশের ব্যারাক, সরকারি অফিসগুলো দেখা যেত। সমতল পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতেই চলে যেতাম, এককালের রাজা ছগিয়ালের প্রাসাদের দিকে। সেখানে একটি বৌদ্ধ মন্দিরে দেখতাম, তিব্বতী লামা ও ভক্তরা গম্ভীর স্বরে মন্ত্রোচ্চারণ করছেন। আর একটি অনির্বাণ প্রদীপ সবসময়েই জ্বলছে। অনির্বাণ প্রদীপ মানে হল, যে-প্রদীপ একবার জ্বালালে আর কখনো নিভবে না। তিব্বতী বৌদ্ধদের কাছে এ অনির্বাণ প্রদীপ খুবই পূণ্যের জিনিস।
দু-দিন বাদেই এক বাঙালি ভদ্রলোক এসে আমার সঙ্গে আলাপ করলেন। তিনি একটি সংবাদ প্রতিষ্ঠানের সংবাদদাতা। জিজ্ঞেস করলুম, ‘কী করে জানলেন আমি এখানে এসেছি?’
সাংবাদিক ভদ্রলোক হেসে বললেন, ‘আমাদের কাছে কোনো সংবাদই চাপা থাকে না। কলকাতার এক খবরের কাগজের সাংবাদিক বন্ধু আমাকে টেলিফোনে জানিয়েছেন, আপনি গ্যাংটক বেড়াতে এসেছেন। খবর পেয়েই হোটেলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানলুম, আপনি এই হোটেলে উঠেছেন। তাই আপনার সঙ্গে আলাপ করতে এলুম।’
আমিও ভদ্রলোককে পেয়ে খুশি হলুম। তিনি ওঁর বাড়িতে আমাকে নিয়ে গেলেন। তাঁর স্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁদের একটি চার পাঁচ বছরের মেয়ে ছিল। হাসিখুশি মেয়েটির সঙ্গেও আমার খুব ভাব জমে গিয়েছিল। সে আমাকে গ্যাংটকের অনেক গল্প শোনাত। সাংবাদিক ভদ্রলোক গ্যাংটকের যা-কিছু দেখবার, সবই আমাকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিলেন। তিনিই আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, মিলিটারি ক্যাপ্টেন টি. কে. বাসুর সঙ্গে। টি. কে. বাসু অর্থাৎ তাপসকুমার বসু।
গ্যাংটকের মতো জায়গায়, একজন বাঙালি মিলিটারি ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আলাপ হওয়া খুবই সৌভাগ্যের বিষয়। ক্যাপ্টেন বাসু একদিনের আলাপেই আমার এমন বন্ধু হয়ে গেলেন, পরের দিনই তিনি আমাকে তাঁদের মিলিটারি মেসে দুপুরে খাবার নিমন্ত্রণ করলেন। বললেন, ‘আপনি হোটেলেই তৈরি হয়ে বসে থাকবেন। আমি নিজে না আসতে পারলে, গাড়ি পাঠিয়ে দেব। মিলিটারি ড্রাইভার আপনার খোঁজ করে আপনাকে নিয়ে যাবে।’
গ্যাংটকের মতো জায়গায়, এরকম একজন ক্যাপ্টেনকে পেয়ে আমার খুবই আনন্দ হল। পরের দিন একজন মিলিটারি পোশাক পরা সর্দারজী অর্থাৎ শিখ ড্রাইভার বেলা এগারটায় হোটেলে এলেন। আমি হোটেলের নীচের তলায় রেস্টুরেন্টে বসেছিলুম। ড্রাইভার সর্দারজী হোটেলের মালিককে আমার নাম বলতেই, তিনি আমাকে দেখিয়ে দিলেন। সর্দারজী আমাকে একটি ছোটো চিরকুট দিলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘দাদা, ড্রাইভার যশোবন্ত সিং আপনাকে নিয়ে আসবে। আপনি এর সঙ্গে চলে আসবেন। ইতি, তাপস।
আমি যশোবন্ত সিংয়ের সঙ্গে একটা জিপে চেপে বেরিয়ে পড়লুম। সমতল পাহাড়ি পথে গিয়ে, মিলিটারি মেসে যেতে আমার রীতিমতো ভয় হয়েছিল। মেসটা ছিল একটা পাহাড়ের মাথায়। রাস্তাটা এমন উঁচু আর খাড়া, একটু এদিক- ওদিক হলেই একেবারে সোজা যমালয়ে চলে যেতে হবে।
যাই হোক, মেসে পৌঁছোলুম। সামনে লন। একটা গাড়ির পক্ষে পুরোপুরি পাক খাবার মতো জায়গাও নেই। মেস রুমটা বেশ বড়ো। ক্যাপ্টেন টি. কে. বাসু ছাড়াও আরও বেশ কিছু ভদ্রলোক, ভদ্রমহিলা ছিলেন। ভদ্রলোকেরা সকলেই নানা স্তরের অফিসার। এবং যিনি মিলিটারি ডাক্তার ছিলেন, তিনি একজন ওড়িয়া। ক্যাপ্টেন বাসু ছাড়া আর কোনো বাঙালি না থাকলেও, সকলের সঙ্গেই আমার খুব ভাব হয়ে গেল।
.
অনেকরকম রান্না হয়েছিল। সবই দেশীয় রান্না। মাংসের বিরিয়ানি, কাবাবের কোনো তুলনা ছিল না। খাওয়া-দাওয়া মিটতেই প্রায় বেলা তিনটে বেজে গিয়েছিল। ক্যাপ্টেন বাসুই ছিলেন মেসের ইনচার্জ। আর মেসের গায়েই ছিল তাঁর ছোটো দুই কুঠরির থাকবার ঘর। সেখানে বিশ্রাম নেবার সময়েই ক্যাপ্টেন বাসু আমাকে বললেন, ‘উত্তর সিকিম হল মিলিটারির হাতে। সেখানে সাধারণ মানুষ, এখান থেকে যেতে পারে না। বিশেষ অনুমতি লাগে। আর উত্তর সিকিমে যারা বাস করে, তারাও কেউ এদিকে আসতে পারে না। এই সীমান্ত অঞ্চলে, সামরিক কড়াকড়ি খুব বেশি। তবে আপনি যদি উত্তর সিকিমে বেড়াতে যেতে চান, আমি তার ব্যবস্থা করতে পারি। আমাদের সঙ্গে গেলে আপনার কোনো অনুমতির দরকার হবে না।’
আমি তো শুনে খুবই খুশি। তখনই রাজি হয়ে গেলুম।
.
দু-দিন পরেই, সকালবেলা একটা জোংগা জিপে চেপে আমরা উত্তর সিকিমের পথে রওনা হলুম। জোংগা জিপ এমন গাড়ি, যা খাড়া পাহাড়ি পথে চলতে পারে। ক্যাপ্টেন বাসু ছাড়া, আমি, আর ডাক্তার মেজর মোহান্তি, এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন। গাড়ির চালক ছিলেন সেই যশোবন্ত সিং।
উত্তর সিকিমের পথটা গিয়েছে তিস্তার উৎসের দিকে। অর্থাৎ তিস্তা যেখান থেকে, বরফ গলে, পাহাড় থেকে নেমে, শিলিগুড়ির পাশ দিয়ে সমতলে নেমেছে। আমরা সেই ওপরে উঠছিলুম। আর আস্তে আস্তে পাহাড় পর্বতের দৃশ্যও বদলে যাচ্ছিল। খুব সংকীর্ণ রাস্তা দিয়ে, খাড়া পাহাড়ের গা ঘেঁষে আমাদের জিপ চলছিল। আর তিস্তাকে একটা সরু নীল ফিতের মতো অনেক নীচে দেখা যাচ্ছিল। গাছপালা কমতে কমতে, আমরা পৌঁছে গিয়েছিলুম বরফের রাজত্বে। চারদিকের পাহাড়ই অধিকাংশ বরফে ঢাকা।
রাত্রে আমরা যেখানে থাকব, সেখানে রান্নার ব্যবস্থা হবে। কিন্তু দুপুরের খাবার সঙ্গে নেওয়া হয়েছিল। ঠিক হয়েছিল, একটা বাংলোয় আমরা দুপুরের খাবার খাব। সেখানেই একটু বিশ্রাম করব। বাংলোটা মিলিটারির অধীনেই ছিল। কিন্তু ডাক্তার মেজর মোহান্তির স্ত্রী মিসেস মোহান্তি ভয় পেয়ে বললেন, ‘আমি শুনেছি, ওটা ভূত বাংলো। আমি ওখানে ঢুকব না।’
মিসেস মোহান্তির কথা শুনে সবাই হেসে উঠলেন। ক্যাপ্টেন বাসু বললেন, ‘দিনেরবেলা সেখানে আপনার ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। তা ছাড়া, বাংলোটা মিলিটারি পাহারা দেয়। বাইরের ঘরে অফিসাররা মাঝে মাঝে অফিসের কাজ নিয়েও বসেন। দুটি খুব ভালো শোবার ঘর আর বাথরুম আছে। আমরা আছি, আপনার কোনো ভয় নেই।’
প্রায় বেলা একটার সময় আমরা সেই বাংলোর সামনে এসে দাঁড়ালাম। চারদিকেই বরফে আবৃত পাহাড়। উত্তরে, আকাশের গায়ে তুষার ঢাকা পর্বত ছাড়া কিছু নেই। কোথাও কোনো শব্দ নেই। এমনকী একটা পাখির ডাকও শোনা যায় না। বাংলোর গেটেই দেখা গেল, বন্দুক হাতে একজন সিকিমি সৈনিক পাহারা দিচ্ছে। আমাদের আসার সংবাদ নাকি আগেই দেওয়া হয়েছিল। সিকিমি সৈনিক মিলিটারি কায়দায় সেলাম ঠুকে, বাংলোর দরজার তালা খুলে দিল। আমরা ভিতরে ঢুকলুম।
বাংলোর বাইরের ঘরটা বেশ বড়ো। সোফা-সেট ছাড়াও রয়েছে মস্তবড়ো একটা টেবিল। অনেকগুলো চেয়ার। টেবিলের ওপর রাখা জলভরা কাচের জাগ। অনেক প্লেট থাকে থাকে সাজানো। আর ডজন খানেক জলের গেলাস।
আমি বাংলোর ভিতরের অন্যান্য ঘরগুলো দেখে এলুম। সত্যি বেশ সুন্দর সাজানো ঘর। খাটের বিছানা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন। ডাক্তার মোহান্তি নিজেই মিসেস মোহান্তিকে নিয়ে একটি শোবার ঘরে ঢুকলেন। ক্যাপ্টেন বাসু ড্রাইভাররের সাহায্যে গাড়ি থেকে খাবার নামিয়ে টেবিলের ওপর সাজালেন। ডাক্তার মোহান্তি বাইরের ঘরে এসে বললেন, ‘আমার স্ত্রীর ভয় কেটে গেছে। উনি বাথরুমে গেছেন। এখন বেশ খুশি।’
আমার খুব শীত করছিল। তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে একটা শোবার ঘরে গিয়ে, কম্বল মুড়ি দিয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম করবার জন্য ব্যস্ত হয়েছিলুম। এই সময়ে হঠাৎ মিসেস মোহান্তির একটা আর্ত চিৎকার ভেসে এল। তিনি ছুটতে ছুটতে বাইরের ঘরে এলেন। দেখলাম, তাঁর দু-চোখ ভয়ে ও আতঙ্কে বিস্ফারিত। মুখে বোধ হয় জল দিয়েছিলেন। মুখটা ভেজা। আমরা সবাই তাঁকে একটা সোফায় বসিয়ে দিলুম। তিনি প্রথমে কোনো কথাই বলতে পারছিলেন না। তারপরে কোনোরকমে যা বললেন, তা হল, বাথরুমের জানলাটা নাকি হঠাৎ যেন বাতাসের ঝাপটায় খুলে যায়। জানলায় কোনো গরাদ ছিল না। জানলায় দেখা যায় বিকট দর্শন একটা মুখ। মাথায় লম্বা লম্বা চুলে বেণি পাকানো, অথচ মুখে ঝুলের মতো গোঁফ দাড়ি। সে হাসছিল না কী করছিল বোঝা যায়নি। কেবল তার মস্ত লাল জিভ আর বোগড়া বোগড়া বড়ো দাঁত দেখা গিয়েছিল। সে অদ্ভুত শব্দ করে, মিসেস মোহান্তির দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। তখনই তিনি কোনোক্রমে দরজার ছিটকিনি খুলে বেরিয়ে আসেন।
সব শুনে ক্যাপ্টেন বাসু তৎক্ষণাৎ সিকিমি সৈনিকটিকে নিয়ে বাইরে ছুটে গেলেন। ডাক্তার মিসেস মোহান্তির পাশে বসে তাঁকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করছিলেন। আমি মনে মনে অবাক হচ্ছিলুম। আশেপাশে কোনো মানুষের বসতি নেই। ওরকম অদ্ভুত মূর্তি এই বরফে ঢাকা পাহাড়ে কোথা থেকে এল?
মিসেস মোহান্তি আবার বললেন, ‘ক্যাপ্টেন বাসু আমার সব কথা না শুনেই চলে গেলেন। সেই মূর্তি দেখে, আমি যখন ছিটকিনিটা খোলবার চেষ্টা করছি, তখন হঠাৎ মূর্তিটার চেহারা বদলে গেল। দেখলাম, একটা মাথায় এলানো চুল পাহাড়ি মেয়ে খিলখিল করে হাসছে। তার গলায় অনেক রঙের পাথরের মালা। সে তার এমন লম্বা হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়েছিল, ছিটকিনি না খুলতে পারলে সে আমাকে নির্ঘাত ধরে ফেলত। তোমরা কি সেই বিকট হাসি শুনতে পাওনি?’
ডাক্তার মোহান্তি মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমি কিছুই শুনতে পাইনি।’
মিসেস মোহান্তি আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, বললুম, ‘না, আমিও কিছু শুনতে পাইনি।’
প্রায় পনেরো মিনিট পরে ক্যাপ্টেন বাসু ফিরে এসে জানালেন, কোথাও কিছু দেখতে পাননি। কাছে-পিঠের মধ্যে বাংলোর পিছনে, পাহাড়ের ওপরে একটি বৌদ্ধ মন্দির রয়েছে। সেখানে একটি আলাদা কাঠের বাড়িতে একটি তিব্বতী পরিবার রয়েছে। সেখানে ওরকম কোনো মানুষের মূর্তি দেখা যায়নি, তা ছাড়া, ক্যাপ্টেন বাসু সিকিমি সৈনিকটিকে নিয়ে এত তাড়াতাড়ি গিয়েছিলেন, কেউ পালাতে গেলে তিনি নিশ্চয়ই দেখতে পেতেন। তা ছাড়া সিকিমি সৈনিকটি বলল, পিছনের পাহাড়ে তিব্বতী পরিবারটি খুবই ভালো। তারা এই পাহাড়ে খুব কষ্ট করে কিছু ফসল করে, আর তা খেয়েই, বুদ্ধের সেবা করে বেঁচে আছে।
যাই হোক, খাবার ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছিল। খিদেও পেয়েছিল সকলেরই। বাইরের ঘরের বড়ো টেবিল ঘিরে আমরা সবাই খেতে বসে গেলাম। বন্ধ কাচের জানলা দিয়ে বাইরে, ওপারের পাহাড়ে বরফের ওপর রোদের ঝিকিমিকি দেখা যাচ্ছিল। পরোটা, আলুর দম, শুকনো করে রান্না মাংস আর মিষ্টি ছিল দুপুরের খাবার। আর বড়ো ফ্লাস্কে ছিল গরম কফি।
ক্যাপ্টেন বাসুকে বলে আমি ভিতরে একটি শোবার ঘরে গেলুম। জোংগা জিপে অনেকটা পথ এসে, আর পেট ভরে খেয়ে, আমার যেন শীতটা আরও বেশি লাগল। কম্বল জড়িয়ে শুয়ে পড়লুম। ঘুমের দরকার ছিল না। ঘুম আসছিলও না। আমি একটু আরাম করতেই চাইছিলুম। শুয়ে শুয়ে মিসেস মোহান্তির দেখা ঘটনার কথা ভাবছিলুম।
ভাবতে ভাবতেই আমার যেন একটু তন্দ্রার ঘোর এসে গিয়েছিল। শুনতে পেলুম, ঘরের মধ্যে যেন কেউ পায়চারি করছে। তারই তালে তালে ঠুং ঠুং শব্দ হচ্ছে। আর আমার নাকে আসছে একটা মিষ্টি সুগন্ধ। আমার তন্দ্রা কেটে গেল। চোখ মেলে তাকালুম। দেখলুম, একটি অদ্ভুত দেখতে মেয়ে বাথরুমে ঢুকে গেল। কিন্তু বাথরুমের দরজাটা খোলাই রইল।
দরজাটা কি খোলাই ছিল? মনে করতে পারলুম না। হয়তো স্বপ্নই দেখছিলুম তন্দ্রার ঘোরে। কোনোরকমে কম্বলের ঢাকা খুলে, খাট থেকে নেমে, বাথরুমের দরজাটা টেনে বন্ধ করে দিলুম। দিয়েই আবার গিয়ে শুয়ে পড়লুম। এর পরেও আমাদের অনেকটা পথ যেতে রাত্রি হয়ে যাবে। এসব পাহাড়ি পথে রাত্রে চলাটা নিরাপদ নয়। কোথায় যে রাস্তায় ধস নেমে আছে, কেউ বলতে পারে না। আর আমরা এমন একটা সীমান্ত অঞ্চল দিয়ে চলেছি, যেকোনো সময়েই বিদেশি সৈনিকের গুলি ছুটে আসতে পারে।
আবার বোধ হয় আমার একটু তন্দ্রা এসেছিল। শুনতে পেলুম, ঘরের মেঝেয় কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে। আমি চোখ মেলে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখলুম, গলা থেকে হাঁটু অবধি লাল পোশাক পরা একটি লোক ঘরের একটা জানলার কাছ থেকে দরজা অবধি হেঁটে বেড়াচ্ছে। পায়ে মোজা আর জুতো। মাথায় টুপি পরা থাকলেও, লম্বা চুল বেরিয়ে পড়েছে। আর তার ফর্সা মুখে গোঁফ দাড়িও রয়েছে। আশ্চর্য! এ কোথা থেকে এল? আমি উঠে বসে জিজ্ঞেস করলুম, ‘কে আপনি? এ ঘরে এলেন কেমন করে?’
লোকটি আমার দিকে একবার তাকাল। তারপর বাথরুমের দরজা খুলে ভিতরে চলে গেল। দরজাটা বন্ধ করে দিল। আশ্চর্য! সত্যিই ভূত বাংলো নাকি? আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লুম। পায়ে জুতো গলিয়ে, বাথরুমের দরজা খুললুম। কেউ কোথাও নেই! কেবল বড়ো জানলার কাচের পাল্লা দুটো খোলা। জানলার বাইরে জংলি ঝোপঝাড়। আমি এগিয়ে গিয়ে জানলায় উঁকি দিতে গেলুম। তৎক্ষণাৎ দরজাটা শব্দ করে বন্ধ হয়ে গেল।
আমি লাফ দিয়ে দরজার কাছে গিয়ে পাল্লা ধরে টানলুম। কিন্তু দরজাটা বাইরে থেকে কেউ বন্ধ করে দিয়েছে। আমি চিৎকার করে ডাকলুম, ‘ক্যাপ্টেন বাসু, দরজাটা খুলে দিন!’
তখনই জানলার কাছে খিলখিল হাসি শুনতে পেলুম। ফিরে তাকিয়ে দেখি, চুল এলো করা একটা পাহাড়ি মেয়ে জানলার বাইরে দাঁড়িয়ে হাসছে। মুখটা তার মোটেই খারাপ নয়। গলা থেকে তার বুক অবধি নানা রঙের পাথরের মালায় ঢাকা। তাকে আমার পাগলি ছাড়া কিছুই মনে হল না। আমি তার দিকে তেড়ে গেলুম। সে ভয় না পেয়ে তার একটা হাত ভিতরে বাড়িয়ে দিল। আমি সে হাতটা ধরতে গেলুম। অমনি সে হাতটা সরিয়ে নিল। আমি ওর এলো চুল ধরবার জন্য হাত বাড়ালুম। সে পেছিয়ে গেল, আর খিলখিল করে হাসতে লাগল।
আমি এমনই ক্ষেপে গেলুম, বড়ো জানলাটায় উঠে বাইরে লাফ দিয়ে পড়লুম। মেয়েটি বোধ হয় ভাবতে পারেনি, আমি এমন একটা কাণ্ড করতে পারি। সে দৌড় দিল। আমিও তার পিছনে পিছনে ছুটলুম। কিন্তু জংলি ঝোপঝাড়ের মধ্যে সে যে কোথায়, দেখতে পেলুম না। অথচ তার হাসি শুনতে পেলুম। হাসির শব্দ লক্ষ করে আমিও জংলি ঝোপে ঢুকে পড়লুম। এ নিশ্চয়ই কোনো মতলববাজ মানুষদের ব্যাপার। হাসির শব্দ লক্ষ করে ছুটতে ছুটতে, হঠাৎ একসময়ে আমি বাংলোর সামনে পাহাড়ের খাদের ধারের রাস্তায় এসে পড়লুম। তখন আর হাসি শোনা যাচ্ছে না। জংলি ঝোপও নেই।
অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লুম। আর একটু হলে আমি হাজার হাজার ফুট নীচে পড়ে যেতুম। উত্তরের আকাশে তুষারাবৃত পর্বতের গায়ে রোদে নানা রং খেলছে। আমি বাংলোর দিকে এগিয়ে গেলুম। দেখলুম সিকিমি সৈনিকটি বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘরে ঢুকে দেখলুম, ডাক্তার মেজর মোহান্তি আর ক্যাপ্টেন বাসু দুটো ছোটো সোফায় গা এলিয়ে চোখ বুজে আছেন। মিসেস মোহান্তি বড়ো সোফায় শুয়ে ঘুমোচ্ছেন। আমার পায়ের শব্দে ক্যাপ্টেন বাসু চোখ মেললেন। জিজ্ঞেস করলেন, এর মধ্যে আবার বাইরে গেলেন কখন?’
বললুম, ‘ঘর থেকে এসে বলছি।’
আমি যে-ঘরে শুয়েছিলুম, সে-ঘরে ঢুকে বাথরুমের দরজাটা দেখলুম। অবাক কাণ্ড! সত্যি বাইরে থেকে বাথরুমের দরজাটার ছিটকিনি বন্ধ। কে বন্ধ করতে পারে?
আমি শোবার ঘর থেকে বাইরের ঘরে এলুম। ক্যাপ্টেন বাসুকে ইশারায় ডেকে ঘরের বাইরে গিয়ে সব কথা বললুম। তিনি শুনে খুব অবাক হয়ে বললেন, ‘আমরা কেউ আপনার শোবার ঘরে ঢুকিনি। কোনো মেয়ের হাসিও শুনতে পাইনি।’
আমরা দু-জনেই দু-জনের মুখের দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে রইলুম।
এ ভূতুড়ে ব্যাপারের কোনো ব্যাখ্যাই আমি আজ পর্যন্ত খুঁজে পাইনি। আমার ধারণা, ওখানে এমন কিছু লোক হয় তো আছে, যারা চায় না, বাংলোয় এসে কেউ থাকুক। ওখান থেকে চলে আসবার সময় সিকিমি সৈনিকটিকে জিজ্ঞেস করেছিলুম, সে কখনো কিছু দেখেছে কিনা। সে পরিষ্কার বলল, ‘না, সে রকম কিছু দেখলেই আমি গুলি চালিয়ে দিতুম।’
দুর্ভাগ্যের বিষয়, আমার কাছে বন্দুক বা রিভলবার কিছুই ছিল না। কিন্তু ক্যাপ্টেন বাসু আর ডাক্তার মেজর মোহান্তির কাছে রিভলবার ছিল, সেইজন্যই কি ভূতেরা তাঁদের দেখা দেয়নি? কে জানে।…
[ আরাধনা (দেব সাহিত্য কুটীর), ১৯৮৪ ]
