কে? – আনন্দ বাগচী
সারাদিন গল্পের বই পড়ে দিব্যি কাটিয়ে দিলেও এখন এই বিকেলের মুখে আর ভালো লাগছিল না। রহস্য রোমাঞ্চের বইখানা একটু আগে শেষ হয়েছে। দম বন্ধ করা উত্তেজনায় এতক্ষণ বুঁদ হয়েছিল, তাই নির্জনতাটা টের পায়নি। গল্পের ভেতরের লোকজন তখন সঙ্গে ছিল, এখন তারা গল্প ফুরনোর সঙ্গে সঙ্গে বিদায় নিয়েছে। এই গোটা বাড়িটায় সমীর এখন একা। ফাঁকা মাঠের মধ্যে এই বাড়িটাও একা। পাড়াটা খুব নির্জন। বলতে গেলে পাড়াটা এখনো ভালো করে গড়েই ওঠেনি। এপাশে-ওপাশে দু-চারটে আধ-তৈরি, প্রায় তৈরি বাড়ি ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা তফাতে কিছু বসতি।
ঘর থেকে বেরিয়ে সমীর দোতলার বারান্দায় এল। ঘরের ভেতরটা ময়লা হয়ে এলেও বাইরে এখনও বেশ আলো। দূরের মাঠে একদল ছেলে ক্রিকেট খেলছে, তাদের এক-আধটা চিৎকার আর ব্যাটে-বলে হওয়ার শব্দ বাতাসে সাঁতার কেটে ভেসে আসছে মিয়োনো ঢিমে তালে। মাঠের ওপারে রেললাইন ছুঁয়ে এক সার তাল গাছ। তার ফাঁকে লাল ফুটবলের মতো সূর্যটা, মনে হচ্ছে বারপোস্টের ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আর একটু পরেই অদৃশ্য হয়ে যাবে দিগন্তের তলায়। শীতের সন্ধ্যা ঝুপ করে নেমে আসবে তখন।
দিনমানে বুঝতে পারেনি সে নিজের ফাঁদেই নিজে আটকে পড়েছে। ক-দিন এখন যখের মতো এত বড়ো বাড়িটা আগলাতে হবে কে জানে! অথচ কয়েক ঘণ্টা আগেও এমন মনে হয়নি। তখন একলা একটা গোটা বাড়ির দায়িত্ব পাওয়াটা একটা অ্যাডভেঞ্চারের মতো মনে হয়েছিল। সে যে বড়ো হয়েছে, সাবালক হয়েছে, সেটা হাতেনাতে প্রমাণ করার এত বড়ো একটা সুযোগ সে কোনোমতেই হাতছাড়া করতে চায়নি। মনটা চনমন করে উঠেছিল এই আনন্দে যে, ক-টা দিন সে এখন সম্পূর্ণ স্বাধীন, মাথার ওপর কেউ নেই। পুরো বাড়িটাই তার দখলে, তার জিম্মায়। সারাদিন সে যা খুশি করবে, কেউ তাড়া দিতে, তাগাদা দিতে আসবে না। যখন খুশি চান করবে, যখন খুশি যা খুশি রাঁধবে, খাবে, ঘুমুবে। কলকাতার সেই ঘিঞ্জি বাসার জীবন না। মাপা সময়ে মাপা কলের জলে কাকস্নান সারা নয়। দাদা আর ভাইয়ের সঙ্গে ভাগের বিছানায় শোয়া, ভাগের টেবিলের এক কোণায় বসে পড়া না। একখানা গল্পের বই নিয়ে টানাটানির দরকার নেই। পিসির দুই আলমারি ভরা বাংলা ইংরেজি গল্পের বই, যখন যেটা খুশি হাত বাড়িয়ে টেনে নাও। সব তোমার। শাওয়ার খুললেই জলের ঝরনা। বিরাট চৌবাচ্চা ভরতি জল টলটল করছে টাইলস বসানো ঝকঝকে বাথরুমে। কমোড, বেসিন, নকশাকাটা মসৃণ মোজাইক, কাচের শার্সি দেওয়া গ্রিলের জানালা, দেওয়ালে ডিসটেম্পার। সবই নতুন, সবই সুন্দর, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখার মতো!
পিসি অনেকবার করে সমীরকে তাঁদের এই নতুন বাড়িতে বেড়াতে আসার জন্যে লিখেছিলেন, কিন্তু এতদিন নানা কারণে হয়ে ওঠেনি। এবার বড়োদিনের টানা দশ দিন ছুটি পাওয়ায় জামাকাপড় ব্যাগে ভরে বেরিয়ে পড়েছিল। একাই। এখন তো আর সে স্কুলের ছেলেটি নেই, স্কটিশ চার্চ কলেজে রীতিমতো ফার্স্ট ইয়ারের ছাত্র, ইংরেজিতে অনার্স পড়ছে। বাবা তাই আর আপত্তি করেননি একা ছাড়তে।
ব্ল্যাক ডায়মন্ড ধরে আজ সকালেই আসানসোলের এই বাড়িতে এসে পৌঁছেছে সমীর। ওকে পেয়ে পিসি পিসেমশাই আর ছোটো ভাই-বোন দুটি তো মহাখুশি। এই ক-দিন কাছে-পিঠে কোথায় কোথায় বেড়াতে যাওয়া হবে তাই নিয়ে যখন হইচই চলেছে, তখনই এল সেই টেলিগ্রাম। একেই কপাল বলে। আসানসোলের মাটিতে মাত্র ঘণ্টা দুই হল পা দিয়েছে অমনি পিসেমশাইয়ে বাবা হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তক্ষুনি সবাই মিলে বর্ধমানে রওনা হতে হবে। কিন্তু বাড়িটা তো এভাবে খালি ফেলে যাওয়া যায় না। এদিকে খুব চুরিচামারি বেড়েছে, ডাকাতিও মাঝেমধ্যে। আগের দিনকাল তো আর নেই, এই ফাঁকায় বাড়ি তালাবন্ধ করে গেলে দামি জিনিসপত্র বাসন-কোসন তো যাবেই, দরজা জানলা খুলে নিয়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
পিসেমশাইয়ের তো মাথায় হাত। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই নতুন জায়গায় বাড়ি পাহারা দেবার মত বিশ্বাসী লোক কোথায় পাবেন! সব শুনে সমীর বলেছিল, পিসি, তোমাদের এত ভাবনার কি আছে, আমি থাকবখন
পিসি-পিসেমশাই দু-জনেই চমকে উঠেছিলেন, তুই ছেলেমানুষ একা থাকবি এই বাড়িতে? বলিস কী!
সমীর সজোরে মাথা ঝাঁকিয়ে বলেছিল, থাকব পিসি, ঠিক থাকব, দেখে নিও। আমি কি এখনও ছেলেমানুষ আছি নাকি, যে এত ভাবছ?
তবু ভাবনা কী যায়! দু-জনেই কিন্তু কিন্তু করেছিলেন অনেকক্ষণ। পরের ছেলে তায় ছেলেমানুষ। বাড়িতে দ্বিতীয় কোনো প্রাণী থাকছে না। রাঁধুনি সতুর মা থাকলেও না-হয় কথা ছিল, বাড়িতে আর একজন থাকত। তা ছাড়া রেঁধে বেড়ে দিতে পারত। ঠিকে ঝি তো সকালে বিকেলে ঘোড়ায় জিন দিয়ে আসে, চোখের পলকে বাসন ক-টা মেজে দিয়ে চলে যায়। সমীর জানিয়েছিল রান্না-খাওয়া কোনো ব্যাপার না। দুটো ডাল-ভাত কী ঝোল-ভাত সে রেঁধে নিতে পারবে। গত বছর মায়ের কঠিন অসুখ করেছিল। তখন তাদের তিন ভাইয়ের এ ব্যাপারে হাতেখড়ি হয়ে গেছে।
পিসি বলেছিল, সে না-হয় হল। সতুর মা দেশে গেছে, গতকালই তার আসার কথা ছিল, আজ হয়তো এসে যেতেও পারে। মানুষটা ভালোই, ভদ্রঘরের বউ, শুধু অবস্থার বিপাকে— এলেই দেখতে পারি, তবে মাথায় সামান্য একটু ইয়ে আছে। বলে পিসি হাসল।
সমীরও হাসল, বলল, ভালোমানুষদের মাথায় একটু ইয়ে থাকেই। আমি ঠিক ম্যানেজ করে নেব।
—তা না হয় নিবি, কিন্তু বাবা রাত-বিরেতে শব্দ-টব্দ শুনলে গোঁয়ার্তুমি করে যেন হুটহাট দরজা খুলে বেরোস না। শুধু বাইরের আলোগুলো জ্বেলে দিবি।
তোমরা নিশ্চিন্ত থাক। সমীর হাসল। পিসি যাই ভাবুক সে কিছু গোবেচারা নয়। বক্সিং জানে, হালে ক্যারাটে শিখছে। তাদের পাড়ায় তো হইহল্লা লেগেই আছে। কথায় কথায় বোমাবাজি হয়। সমীর ডানপিটে না হোক, কিছু ভীতু টাইপের ছেলে না। দরকার হলে দু-একজন লোকের মহড়া নিতে পারবে।
প্রশংসার চোখে পিসি ওর দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, সমীর, ভূতের ভয়-টয় নেই তো তোর?
ভুত? –সমীর হাসল, ভূত বলে কিছু আছে নাকি পিসি? আমাদের নর্থ ক্যালকাটায় ভূত এখন ফুটপাথেও জায়গা পাচ্ছে না, একেবারে উদ্বাস্তু হয়ে গেছে। শুধু গল্পের বইয়ের পাতায় এখনও দু-চারটে কোনোমতে টিকে আছে বটে, কিন্তু ওদের আর ইজ্জত নেই। তা তোমাদের এ বাড়িতে আছে নাকি এক-আধটা? সমীরের কথা শুনে সবাই হো-হো হেসে উঠেছিল। পিসি বলেছিল, না বাপু, এ বাড়িতে ওসব ক্যারেকটার পায়ের ধুলো দেয়নি।
.
সূর্য ডুবে গিয়েছিল। মাঠ জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল তার আগেই। ঠান্ডাটা যেন অন্ধকারের অপেক্ষায় এতক্ষণ বসেছিল। চাদর জড়িয়েও বেশ শীত শীত করছিল সমীরের। আলোর মালা বুকে নিয়ে একটা প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলে গেল মন্থর গতিতে।
সমীর ঘরে ফিরে এসে আলোগুলো জ্বেলে দিল। সন্ধের মুখে সামান্য মন খারাপ হয়েছিল বটে; কিন্তু এখন আবার চাঙ্গা ভাবটা ফিরে এসেছে। আলমারি থেকে খানকয়েক গল্পের বই টেনে নিয়ে বিছানায় গিয়ে জুত হয়ে বসল। আজ রাতে আর হাবিজাবি রাঁধার মধ্যে যাবে না। বরং খিচুড়ি চাপিয়ে দেবে আর একটু রাত করে।
গল্পের বইয়ের পোকা সে। কিন্তু তবু কেন যেন বইয়ের পাতায় মন বসাতে পারল না। হয়তো প্রথম রাত্তির তাই। মনের মধ্যে কেমন একটা অস্থির চঞ্চলতা এসেছে। একটা রাত কেটে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু তার আগে রাতবিরেতের জন্যে একটু প্রস্তুতি চাই। হাতের কাছে হাতিয়ার মজুত রাখা দরকার। পিসেমশাইয়ের পাঁচ সেলের টর্চটা ড্রেসিং টেবিলের ওপরেই রয়েছে। একবার জ্বেলে পরখ করে দেখল। না, নতুন ব্যাটারিই ভরা আছে। এঘর-ওঘর খুঁজে একটা ভোজালি আর লোহার ডান্ডা পেয়ে গেল সমীর। এবার সে সশস্ত্র। অস্ত্র জিনিসটা মানুষের মনের জোর অনেক গুণ বাড়িয়ে দেয়। টর্চ আর ডান্ডা নিয়ে নীচের তলাটা এক চক্কর ঘুরে এল সমীর। দরজা জানালাগুলো ঠিক-ঠাক বন্ধই আছে দেখে নিশ্চিন্ত হল।
গল্পের বইয়ে মন না বসুক, বসার ঘরে টিভি রয়েছে, সময় কাটানো কোনো ব্যাপার নয়। টিভি খুলে দিয়ে সোফার ওপর আরাম করে জাঁকিয়ে বসল সমীর। কলকাতায় তাদের ফ্ল্যাটে টিভি নেই, খেলা-টেলা থাকলে কিংবা ভালো সিনেমা যেদিন দেখানো হয় বন্ধুদের বাড়িতে গিয়ে দেখে আসে সমীর। গাদাগাদি ভিড়ের মধ্যে বসে দেখতে হয়। পুরোপুরি মন দিয়ে দেখা যায় না। ছবির মনোযোগ নষ্ট করে দিয়ে হয়তো কোনো বাচ্চা ছেলে কেঁদে ওঠে কিংবা দুষ্টুমি করতে শুরু করে। কেউ কাউকে চেঁচিয়ে ডাকে, কেউ হয়তো হঠাৎ উঠে যায় আবার ফিরে এসে বসে— এইরকমই চলে। এখানে সে একাই দর্শক, তন্ময় হয়ে টিভির স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। টিভি-র এই এক মজা। ঘর ভরে থাকে। মনে হয় সে একা নয়, আরও কেউ আছে। পাশে বসে আছে। রেডিয়ো চালালে কি এরকম হয়? বোধ হয় হয় না। অবিশ্যি কখনো তো আর একা একা ঘরে বসে রেডিয়ো শোনা হয়নি, তাই ঠিক বলতে পারবে না এরকম হয় কি না।
টেলিভিশনের ছবির ব্যাপারটা সত্যিই ভাবলে থই পাওয়া যায় না। বিজ্ঞানের এ একটা বিস্ময়। এই বন্ধ ঘরের মধ্যে কত দূর থেকে ছবি এসে পৌঁছোচ্ছে। কোথাও এতটুকু বাধা পাচ্ছে না। আশ্চর্য! ঠিক আত্মার মতো। শাস্ত্রে বলেছে আত্মারও নাকি শরীর আছে, সূক্ষ্ম শরীর। নিশ্ছিদ্র দেওয়াল ফুঁড়েও সে চলে আসতে পারে। আমাদের এই শরীরের মতো, না, তার কোনো ক্ষয় নেই, ক্ষতি নেই, বিনাশ নেই।…
টিভি দেখতে দেখতে কেমন মনে হল সেটটায় কোনো গোলমাল আছে। নাকি টিভি ক্যামেরায় কোনো গণ্ডগোল হয়েছে? ছবির পিছনে কেমন একটা ধোঁয়ার রিং ঘুরছে যেন, অস্পষ্ট ঝাপসা, কিন্তু ঘুরছে। প্রথমটা ঠাহর হয় না, কিন্তু একবার চোখে ধরে গেলে কেমন একটা অস্বস্তির মতো দৃষ্টি আটকে থাকে সেই ধোঁয়াটে আবছায়ায়। সমীর চোখ সরাতে পারছিল না। টিভিতে যে ছবিটা দেখানো হচ্ছিল সেটাকে পিছনে ফেলে আকাশের ছায়াপথের মতো ধোঁয়ার আবর্তটাই পাক খেতে খেতে গড়িয়ে আসছিল সামনের দিকে। ব্যাপারটা ঠিক বোধগম্য হচ্ছিল না সমীরের কাছে। সমীর কেমন হতবাকের মতো তাকিয়েছিল। মনে হয় ধোঁয়া নয়, ধোঁয়াটে একজোড়া চোখ, বরফের মতো শীতল, বরফের মতো কঠিন, তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে। তারই চোখের দিকে। কেমন সম্মোহনের মতো টানছে। সমীরকে টানছে। আচমকা একটা ভয়ে সমীরের ঘাড়ের পিঠের লোমগুলো যেন খাড়া হয়ে উঠল! কেমন অলৌকিক, কেমন অশরীরী একটা অস্তিত্ব। এতক্ষণ কেন যে নিজেকে একা মনে হচ্ছিল না, এই একলা ঘরখানাকেও ভরাট মনে হচ্ছিল এবার যেন তার কারণ খুঁজে পাওয়া গেল।
সমীর তাড়াতাড়ি টিভিটা বন্ধ করে দিল। একরকম আতঙ্কিত হয়েই বলা যায়। তারপর কান খাড়া করল। হ্যাঁ, নীচে কলিং বেল বাজছে! টিভি-র আওয়াজে এবং অন্যমনষ্কতার দরুন বোধ হয় এতক্ষণ ঠিকমতো কানে এসে পৌঁছোয়নি। এই অসময়ে কে এল রে বাবা! পিসি বার বার করে সাবধান করে দিয়ে গেছে হুট-হাট করে দরজা না খুলতে। আজকাল শহরের অনেক ফ্ল্যাটে কলিং বেল বাজিয়ে ডাকাতি হচ্ছে। ভোজালিটা কোমরে গুঁজে নিয়ে ডান্ডাটা হাতে তুলে নিল সমীর। ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা অনুভব করল সে।
বাইরের আলো জ্বেলে দিয়ে নীচে নেমে এল সমীর। তারপর ‘ম্যাজিক আই’ দিয়ে দরজার বাইরে তাকাল। না, ডাকাত গুন্ডার দল নয়, বাইরে একজন বউ মতো কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একটু হকচকিয়ে গিয়েছিল প্রথম নজরে, কিন্তু পরের মুহূর্তেই মনে পড়ে গেল, সতুর মায়ের আসবার কথা আছে, সে নয় তো? স্ত্রীলোকটির পরনে আধময়লা শাড়ি, বগলে একটা কাপড়ের পুঁটুলি। হ্যাঁ, সতুর মা-ই হবে, চেহারা দেখে সে রকমই তো মনে হচ্ছে।
তালা খুলে দরজা খুলে ধরল সমীর, কে, সতুর মা?
মহিলা জবাব দিল না। শুধু বাঁ-হাতে ঘোমটাটা আরও কয়েক ইঞ্চি টেনে দিয়ে সমীরকে পাশ কাটিয়ে গুটগুট করে ভেতরে চলে গেল। সমীরের মনে পড়ল পিসি বলছিল, ওর মাথায় একটু ইয়ে আছে। কথাটা বোধ হয় মিথ্যে নয়। একটু নয়, ভালোই আছে।
কোনো প্রশ্ন করে লাভ নেই, হয়তো জবাবই দেবে না। অপরিচিত মানুষের সামনে তার ঘোমটার বহর দেখেই বোঝা গেছে, মানুষটার লজ্জার পরিমাণটা একটু বেশিই। দরজা বন্ধ করে ওপরে উঠে এল সমীর। একেবারে নিজের ঘরে চলে এল। মাকে একটা চিঠি দিতে হবে। কলকাতা থেকে আসবার সময় খাম পোস্ট কার্ড সঙ্গে করেই এনেছিল। ব্যাগ থেকে একখানা পোস্ট কার্ড বের করে নিয়ে টেবিলে গিয়ে বসল। চিঠি লিখতে লিখতে মনে পড়ল আজ বিকেলে চা খাওয়া হয়নি। কলকাতায় থাকলে এতক্ষণে দু-বার চা খাওয়া হয়ে যেত। টিভি খোলার আগে একবার ভেবেছিল এক কাপ চা বানিয়ে নেবে, কিন্তু ভুলে গিয়েছিল। এখন তো আর সে একা নয়, সুতরাং চা করতে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে নীচে গিয়ে একবার সতুর মাকে বলে আসলে হয়। বললে হয়তো অখুশি হবে না, মানুষটা শুনেছে তো ভালোই। বার কয়েক ইতস্তত করে শেষ পর্যন্ত উঠতে যাচ্ছিল, হঠাৎ চোখে পড়ল তার টেবিলের এক পাশে কখন সতুর মা নিঃশব্দে এসে চা রেখে গেছে। বেশ চমকাবার মতোই ঘটনা। কারণ সতুর মা এ ঘরে ঢুকেছে, টেবিলের ওপরে চায়ের কাপ নামিয়েছে, অথচ পাশে বসেও সমীর ঘুণাক্ষরে টের পায়নি। কখন এসেছিল?
কাপ-ডিশ কাছে টেনে নিয়ে আলগোছে একটা চুমুক দিল। না, এখনও গরম আছে। ভালোই বানিয়েছে চা-টা। আর একটা চুমুক দিয়ে সমীর একটা তৃপ্তির শব্দ করল। ভাবল, মনে মনে সে ভীষণভাবে চা চাইছিল অমনি চা এসে গেল। এটা কি টেলিপ্যাথি? নাকি কাকতালীয় ব্যাপার? বরাবরই এ সময়ে হয়তো সতুর মা এ বাড়িতে চা করে থাকে তাই আজও করেছে। কিংবা কিচেনে ঢুকেই টের পেয়েছে আজ চা হয়নি এ বাড়িতে, তাই।
তা সে যাই হয়ে থাক, সতুর মা আসায় সমীরের মনের ওপরের চাপ অনেক কমে গেছে। এ বাড়িতে এখন আর সে একা নয়। কথা বলুক আর না বলুক আর একটা মানুষ তো রয়েছে এই বাড়ির মধ্যেই। হোক একতলার কোণের ঘরটিতে কিংবা রান্নাঘরে, যেখানেই হোক, সে তো আছে।
অন্যমনস্কতার মধ্যে চিঠি লেখা হয়ে গিয়েছিল। একখানা মাকে লিখল, একখানা পাড়ার এক বন্ধুকে। পিসেমশাইরা এতক্ষণে নিশ্চয়ই বাড়িতে পৌঁছে গেছেন, ওর বাবার অবস্থা কীরকম কে জানে। একটু ভালো থাকলে উনি হয়তো কাল বা পরশুই চলে আসবেন। সেইরকমই বলে গেছেন।
সময় কাটানোই এখন একটা সমস্যা। এমন যে হবে, বিকেল পর্যন্তও ভাবা যায়নি। একটা লোকের যখন কিছুই করার নেই তখন গল্পের বইও মনে ধরে না। তবু সমীর আবার বইয়ের দিকেই মন ফেরাল। বিছানায় গিয়ে বসল। কিন্তু বইগুলোকে দেখতে পেল না। অবাক হল। বিছানার ওপরেই তো ছড়িয়ে রেখেছিল বইগুলো। ভারি আশ্চর্য তো! গেল কোথায়? টেবিলের দিকে তাকাল। না সেখানেও নেই। আবার উঠল। আলমারির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ওই তো! আবার কখন বুঝি মনের ভুলে আলমারিতেই সেন্ড রেখেছে। কিন্তু কখন? মনে পড়ল না। পছন্দ করে রাখা বইগুলো বের করে নিয়ে আবার বিছানায় ফিরে গেল।
কোমর অবধি লেপটা টেনে দিয়ে সেই বইখানাই ফের খুলল যেটা তখন সবে পড়তে শুরু করেছিল। গল্পের মধ্যে সবে ঢুকেছে, অমনি মনে হল খাটের তলা থেকে স্পষ্ট একটা শব্দ হল। এই নির্জন ঘরে এখন মেঝের ওপরে একটা ছুঁচ ফেললেও স্পষ্ট শোনা যাবে বোধ হয়। তাই শব্দটা কানের ভুল নয়, পরিষ্কার। কেউ যেন খাটের তলায় বসে একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল। উত্তেজনায় শরীরের পেশিগুলো শক্ত হয়ে উঠল সমীরের। ঘরে নিশ্চয় কোনো লোক ঢুকেছে। চোর হওয়া আশ্চর্য নয়। অনেক সময় এভাবেই ওরা আগেভাগে বাড়ির ভেতরে ঢুকে বসে থাকে। কিন্তু ঢুকবে কোথা দিয়ে। সদরের দরজায় সতুর মা ঢোকার পরে নিজে হাতে তালা বন্ধ করে এসেছিল মনে আছে। ছাদের সিঁড়ির দরজায় তালা, দুপুরেই দেখে নিয়েছে। বারান্দা গ্রিল দিয়ে ঘেরা। একমাত্র খিড়কির দরজাটা। তাতে তালা লাগানো নেই বটে; কিন্তু খিল এবং ছিটকিনি দুটোই তুলে দেওয়া আছে। তখনই দেখেছে। তবে কি সতুর মা কোনো কারণে দরজাটা খুলেছিল আর বন্ধ করেনি?
আবার নিশ্বাস ফেলার শব্দ হল। এবার আর একটু জোরে, আরও স্পষ্ট। লোকটার অস্তিত্ব সম্বন্ধে আর কোনো সন্দেহ নেই। সে আছে, হয়তো ওত পেতেই বসে আছে। হয়তো সমীরকে আক্রমণ করার তাল খুঁজছে। সমীর সে সুযোগ ওকে দেবে না। নিঃস্পন্দ ভঙ্গিতে শুয়ে থেকেই সমীর আস্তে আস্তে ঘাড় ফেরাল।
ডান্ডাটা ঘরের কোণে দাঁড় করানো রয়েছে। ভোজালিটাও নাগালের মধ্যে নেই, টেবিলের ওপরে। পরিস্থিতি খুব জটিল। খাটের তলায়, যে আছে সে নিশ্চয় শুধু হাতে আসেনি। সশস্ত্র হয়েই বসে আছে। খাট থেকে নামবার সঙ্গে সঙ্গেই হয়তো আক্রমণ করে বসবে।
একমাত্র উপায় ওকে কিছু বুঝতে না দিয়ে এক লাফে যদি টেবিলের কাছে গিয়ে পৌঁছানো যায়। হাতের মুঠোয় একবার ভোজালিটা পেয়ে গেলে সমীর যেকোনো ষণ্ডাগুন্ডার মোকাবিলা করতে পারবে। ভাবনা মাত্র কাজ। বিছানার ওপর থেকে সমীর হাত আর পায়ের ওপর ভর করে বিদ্যুৎ গতিতে ছিটকে চলে গেল টেবিলের সামনে। তারপর চোখের পলকে ভোজালিটা খুলে নিল খাপ থেকে। ঘুরে দাঁড়াল। খাটের তলা আধখানা দেখা যাচ্ছে, পুরোটা নয়।
দাঁতে দাঁত চেপে সমীর গর্জন করে উঠল, বেরিয়ে আয়! খাটের নীচে যে আছিস বেরিয়ে আয়!
গলার আওয়াজে ঘরখানা গমগম করে উঠল। কিন্তু কেউ বেরিয়ে এল না। সমীর নীচু হয়ে খাটের তলাটা দেখল। তাজ্জব! খাটের তলাটা বেবাক ফাঁকা একটা বেড়ালের বাচ্চা পর্যন্ত সেখানে বসে নেই।
বোকার মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল সমীর। বুকের ভেতরে হৃৎপিণ্ডটা তখনও উত্তেজনায় লাফাচ্ছে। এ যেন হাওয়ার বিরুদ্ধে তলোয়ার ঘোরানো। আসলে ভয়, তার অবচেতন মনের মধ্যে বুঝি হামাগুড়ি দিয়ে একটা ভয় কখন ঢুকে বসে আছে। পিসির কাছে যতই বড়াই করে থাকুক, আসলে সে একটা ভীতু। ভীতুর ডিম একটা! কাওয়ার্ড! তা না হলে ফাঁকা ঘরে নিশ্বাসের শব্দ শুনবে কেন! এ দুর্বল মনের কাজ। মানুষের মনটাই তো আসল। সে-ই মানুষকে খামোকা ভয় দেখায়। চোরের ভয় দেখায়, ভূতের ভয় দেখায়। ভয় একটা মনের রোগ ছাড়া আর কিছু নয়। নিজেকে ধিক্কার দিল সমীর। মন থেকে আজেবাজে কল্পনা সবলে ঝেড়ে ফেলতে চাইল সমীর
আর সেইজন্যেই আবার গিয়ে ঢুকল বসবার ঘরে। আবার টিভি চালাবে। চোখের ভুলের একটা এসপার ওসপার করবে। অলৌকিক, অশরীরী বলে কিছু নেই। ভূত শুধু গাঁজাখুরি কল্পনা। গুল গল্প। ছেলে ভুলনো।
টিভির নব ঘুরিয়ে দিয়ে সোফায় গিয়ে বসল সমীর। ছবি আসতে একটু বিলম্ব হয়, সাউন্ডটা আসে আগে। এখন কী চলছে সে জানে না। ঝনঝন করে একটা শব্দ শোনা গেল ছবি ভেসে ওঠার আগে। যেন একগাদা বাসন-কোসন পড়ে গেল টিভির মধ্যে। কিংবা দূরদর্শনের স্টুডিয়োর মধ্যে। আর তার পরেই ক্লোজ- আপে ভেসে উঠল এক জোড়া চোখ। বিশাল জ্বলজ্বলে! হালকা সাদা মেঘের জমিতে। ভ্রূ, কুঁচকে তাকিয়ে আছে যেন। এত জীবন্ত যে চোখে এসে ধাক্কা লাগে সেই দৃষ্টি। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল সমীরের। ঘাড়ের পিঠের রোঁয়া খাড়া হয়ে উঠল। কিন্তু সেই অতিকায় চোখ জোড়া তাকে ধরে থাকল চুম্বকের মতো। সে চোখ সরাতে পারল না। পলক ফেলতে পর্যন্ত যেন ভুলে গেল। সারা গায়ে কাঁটা দিয়েছে। এই শীতের রাতেও শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল সরীসৃপের মতো ঘামের ধারা নামছে যেন নীচের দিকে। সারা শরীর অসাড়, নড়বার ক্ষমতা লুপ্ত। প্রাণপণে সতুর মায়ের নাম ধরে চিৎকার করে ডাক দিল, কিন্তু গলা দিয়ে বোধ হয় আওয়াজ বেরলো না। জলের তলায় ডুবে গেলে যেরকম হয় সেইরকম একটা দমবন্ধ অবস্থার মধ্যে তার চেতনা আচ্ছন্ন হয়ে এল। সমীর বুঝতে পারল সে মরে যাচ্ছে, চোখ মেলে তাকিয়েই মরে যাচ্ছে। একসময় চোখের আলো নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে ডুবে গেল।
কালপ্যাঁচার একটানা কর্কশ তীক্ষ্ণ ডাক যেন ছুরির ফলার মতো কানের পর্দায় এসে বিঁধে গেল। ঘুমটা ভেঙে গেল সঙ্গে সঙ্গে, কিন্তু চোখ খুলে ঘুরঘুটি অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না সমীর। কেমন দিশেহারা ঠেকল। সে কোথায় কী বৃত্তান্ত কিছুই মনে পড়ল না। প্রথমে ভেবেছিল কলকাতায় তাদের ঘরের বিছানায় শুয়ে আছে, হয়তো লোডশেডিং, তাই চোখে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু হাত দিয়ে স্পর্শ করেই বুঝতে পারল বিছানা নয়, খুব সম্ভব কোনো সোফার ওপরে সে মুখ গুঁজড়ে পড়ে আছে। সমস্ত শরীর শীতে কুঁকড়ে আছে। এমন সময় একটা নরম আলোর রেখা এসে পড়ল ঘরের মধ্যে। মনে হল লন্ঠনের আলো দোলাতে দোলাতে কেউ দরজার ওপাশে এসে দাঁড়াল। একটা অস্পষ্ট গলাখাঁকারি শুনে ধড়মড় করে উঠে বসে সমীর দেখতে পেল ডাইনিং টেবিলে খাবার সাজিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সতুর মা। বিঘতখানেক ঘোমটার তলা দিয়ে তার নাকের ডগা আর চাপা ঠোঁট দুটো দেখা যাচ্ছে। চকিতে সব মনে পড়ে গেল। পেটের ভেতরটা খিদেয় জ্বলে যাচ্ছে। অন্য চিন্তা ভুলে গিয়ে সমীর উঠে পড়ল।
.
মুখের ওপর রোদ এসে পড়ায় ধড়মড়িয়ে উঠে বসল সমীর। দেখল অনেক বেলা হয়ে গেছে। কাল রাত্তিরটা দুঃস্বপ্নের ঘোরের ভেতর দিয়ে কেটেছে। আজ সতুর মাকে বসবার ঘরে শুতে বলতে হবে; কিন্তু তার আগে এককাপ চা চাই। সকাল আটটা বাজে। বার কয়েক গলা চড়িয়ে সতুর মাকে ডাকল। মানুষটার মাথায়ই শুধু ছিট নেই, কানেও বোধ হয় রীতিমতো খাটো।
আলোয়ানটা গায়ে জড়িয়ে চায়ের সন্ধানে নীচে নামল সমীর। রান্নাঘরে কোনো সাড়াশব্দ নেই। ভেতরে ঢুকে সতুর মাকে দেখতে পেল না। কলঘরেও নেই। ওর থাকার ঘরটার দরজায় শেকল তোলা। গেল কোথায় লোকটা? খিড়কির দরজা বন্ধ, সদর তো বন্ধই। কেমন ভয় ভয় করছিল। এমন সময় বাইরে কাদের গলা শোনা গেল, কলিং বেল বাজল। সেইসঙ্গে একটি কচি গলায় ডুকরে কেঁদে উঠল কেউ দরজার ওপিঠে।
সমীর হতভম্ব। সাড়া দিয়ে দোতলায় ছুটল চাবি আনতে। দরজা খুলে থ হয়ে গেল। তিন-চারজন গ্রাম্য গরিব গোছের মানুষ বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের সঙ্গে দশ-এগারো বছরের একটি ছেলে। ছেলেটা হাপুস চোখে কাঁদছে।
জানা গেল ছেলেটির নাম সতু। ওর মা সকালে রেলে কাটা পড়ে মারা গেছে। মায়ের বাক্স-প্যাঁটরা যা-কিছু আছে ওরা নিয়ে যেতে এসেছে।
[ কিশোর মন ১, ১৫ জানুয়ারি ১৯৮৬ ]
