প্রসাদবাবুর ভয় – প্রচেত গুপ্ত
একটাই ঘর। দোতলায় ছাদের উপর। ঘর খুব বড়ো। একজন কেন, পাঁচজন হাত-পা ছড়িয়ে থাকতে পারে। ঘরের সঙ্গে লাগোয়া ছাদটাও বড়ো। শহরের এ পাড়াটা বেশ নিরিবিলি। গাছপালা অনেক। এই বাড়ির চারপাশেও গাছ। ভিতরে একটা ছোটো মতো বাগান রয়েছে। তবে সে বাগানে ফুল-ফলের গাছ কিছুই নেই, শুধুই আগাছা। থাকার মধ্যে রয়েছে শুধু ঝাঁকড়া একটা নারকেল গাছ। গাছটা বাড়ির গা ঘেঁষে একেবারে ছাদ পর্যন্ত উঠে এসেছে। ছাদের ছোট্ট পাঁচিল টপকে ডালপালা নিয়ে ঝুঁকে পড়েছে ছাদের উপর। বাড়ি দেখে প্রসাদবাবুর মনটা ভালো হয়ে গেল। ভগ্নীপতি কিঙ্কর আর বোন ছন্দাকে মনে-মনে ধন্যবাদ জানালেন। এ বাড়িটায় না এলে মস্ত বোকামি হয়ে যেত। এমন চমৎকার ঘর, এমন চমৎকার ছাদ কোথায় পাওয়া যাবে! এর পরেও প্রসাদবাবুর মন হালকা খচখচ করে উঠল। কারণ কী?
কারণ, চুয়ান্ন বছরের প্রসাদবাবু একজন ভীতু মানুষ। অন্ধকার ঘর, খাটের তলার খুটখাট, দরজার ক্যাঁচকোঁচে তিনি চমকে ওঠেন। তাই ছাদ দেখেও একটু ঘাবড়ে গিয়েছেন। ছোটোদের ভূতের ভয় মানায়। কিন্তু বড়োরা ভূতে ভয় পেলে সেটা বিরাট একটা হাসি-ঠাট্টার ব্যাপার হয়। আমাদের এই প্রসাদবাবুর বেলাতেও তাই হয়েছে। সবাই তার ভূতের ভয় নিয়ে মজা করে। হয়তো কোনো একদিন অফিসে ফাইল নিয়ে ক্যাশ ডিপার্টমেন্টে গিয়েছেন। সেখানে কাজ করেন শিশিরবাবু। তিনি ফাইল সরিয়ে নীচু গলায় বলেন, ‘হিসেব-টিসেব পরে হবে দাদা। আগে বলুন, কাল রাতে ওরা কেউ এসেছিল নাকি?
প্রসাদবাবু অবাক হয়ে বলেন, ‘কারা? রাতে কারা আসবে?’
শিশিরবাবু ঝুঁকে পড়েন, আরও গলা নামিয়ে বলেন, ‘আরে বাবা, রাতবিরেতে আপনার কাছে যারা আসে তাদের কথা বলছি। ওই যে লম্বা-লম্বা হাত, উলটো দিকে গোড়ালি… কেউ এসেছিল নাকি?’
প্রসাদবাবু শুকনো হেসে বললেন, ‘ঠাট্টা করছেন?
শিশিরবাবু হেসে ফেলেন। বলেন, ‘না, না। ঠাট্টা করব কেন? ভূত খুব সিরিয়াস একটা বিষয়। সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কখনো ঠাট্টা করা যায়? আমার ছোটো ছেলেটা ক্লাস ফাইভে পড়ছে। সেও ঠিক আপনার মতো। ভূত নিয়ে হাসিঠাট্টা একেবারে সহ্য করতে পারে না। হা হা!’ অফিসের বাইরেও একই কাণ্ড। পাড়াতেও অনেকে তার ভয়ের কথা জানে। সেদিন সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরছিলেন প্রসাদবাবু। গলির মোড়ে জটলা করে দাঁড়িয়েছিল পাড়ার ছেলেরা। প্রসাদবাবুকে দেখে চুপ করে গেল। পল্টু গম্ভীর গলায় বলল, ‘প্রসাদকাকু নাকি?’
প্রসাদবাবু থমকে গেলেন। বললেন, ‘কিছু বলবে পল্টু?’
পল্টু সিরিয়াস গলায় বলল, ‘না তেমন কিছু নয়, আপনাকে একটু সাবধান করে দিচ্ছিলাম।’
‘সাবধান! কীসের জন্য? গোলমাল-টোলমাল কিছু হয়েছে না কি?’
পল্টু গলা গম্ভীর করে বলল, ‘না, এখনও হয়নি। তবে হতে পারে। আজ অমাবস্যা কিনা। ভূতেদের ফেভারিট তিথি। এ জন্যই আপনাকে বলছিলাম যে সাবধানে থাকবেন কাকু।
ছেলেরা সবাই হেসে উঠল। প্রসাদবাবু মাথা নামিয়ে হাঁটতে লাগলেন।
শুধু বাইরের লোক নয়, নিজের লোকেরাও প্রসাদবাবুকে ছাড়ে না। আসানসোল থেকে বিচ্ছু ভাগনে ফোন করে বলে, ‘মামা, নেট সার্চ করে দেখলাম, জাপানে একটা দারুণ জিনিস বেরিয়েছে। ঘোস্ট লক। ভূত ঠেকাতে তালা। জানলা-দরজায় লাগালে ঘরে ভূত ঢুকতে পারবে না। যদি বলো তো একটা অর্ডার দিই।’
প্রসাদবাবুর রাগ হয়। ইচ্ছে করে ভাগনেকে একটা ধমক দিতে। কিন্তু পারেন না। কারণ, দোষ তো আর অন্য কারও নয়, দোষ তাঁর নিজের। বড়ো বয়সে ভূতে ভয় পেলে সকলেই রসিকতা করবে। ব্যাপারটাও বিচ্ছিরি। বয়সকালের নানা অসুখ আছে। বাত, দাঁত ব্যথা, কান কটকট। সেসবের ওষুধ আছে। ভূতের ভয় কাটানোর কোনো ওষুধ নেই। প্রসাদবাবু রোজই মনে-মনে প্রতিজ্ঞা করেন, আর নয়, এবার মনে জোর এনে ভয়ের অসুখ সারাবেন। কিন্তু পারছেন না। কী লজ্জার কথা!
প্রসাদবাবুর পুরো নাম প্রসাদরঞ্জন প্রামাণিক। সহজ, সরল, ছা-পোষা মানুষ। কলকাতা থেকে বেশ খানিকটা দূরের এই শহরে ছোটোখাটো একটা চাকরি করেন। ঠিক সময়ে অফিসে আসেন। টিফিনের সময়ে অফিসের নীচে নেমে ফুটপাথের দোকান থেকে টোস্ট আর কলা কিনে টিফিন সারেন। সহকর্মীরা বলেন, ‘ও প্রসাদদা, পাউরুটি-কলা ছেড়ে একদিন অন্য কিছু হবে নাকি? একটা ফিশফ্রাই বলি?’
প্রসাদবাবু অল্প হেসে দু-পাশে মাথা নাড়েন। বলেন, ‘না ভাই, আমার এই পাউরুটিই ভালো।’
প্রসাদবাবু সাধারণ খাবার পছন্দ করেন, সাধারণভাবে থাকেন। যাকে বলে ‘সিম্পল লিভিং’। বিয়ে-থা করেননি। নিজের লোক বলতে, বোন- ভগ্নীপতি। তারা থাকে আসানসোলে। কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রসাদবাবু ‘সুখে আছি’ নামের একটা মেসবাড়িতে ছিলেন। স্টেশনের ঠিক পাশেই। বাড়িটা অতি পুরোনো। মেসের মালিক ‘সারাচ্ছি, সারাব’ করেছেন, কিন্তু কাজের কাজ কিছু করেননি। একদিন সকালে ‘সুখে আছি’তে একটা কাণ্ড ঘটল। খাওয়ার ঘরে সবাই খেতে বসেছে। অফিস যাওয়ার তাড়া। হঠাৎ ছাদ থেকে ঝিরঝির করে বালি, সুরকি ইত্যাদি ডাল, মাছের ঝোলের উপর ঝরে পড়তে লাগল। মেসের মালিক চিৎকার করে উঠলেন, ‘ভূমিকম্প! ভূমিকম্প!’ খাওয়া-টাওয়া ফেলে সবাই ছুটল বাড়ির বাইরে। দু-একজন ভাতের থালাও হাতে নিয়ে ছুটল। একটু পরেই বোঝা গেল, ভূমিকম্প-টুমিকম্প বাজে কথা। পুরোনো মেসবাড়ি এবার ভিতর থেকেও ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। চুন-সুরকি ফেলে ওয়ার্নিং দিচ্ছে। এর পর মাথায় ইট-পাথর, লোহা-লক্কড় ফেলবে। এর পরই ‘সুখে আছি’ মেস খালি করে মেরামতের
কাজ শুরু হয়েছে। কাজ শেষ হতে সময় লাগবে। বছরখানেকও লাগতে পারে। যাঁরা মেসে ছিলেন, তাঁরা নিজেদের মতো ব্যবস্থা করে নিলেন। এই ছোটো শহরে আর দ্বিতীয় মেস নেই। কেউ গেলেন আশেপাশের আত্মীয়ের বাড়িতে। কেউ দলবেঁধে বাড়ি ভাড়া করলেন। কেউ আবার হোটেল ঘর নিলেন। প্রসাদবাবুও তাই করলেন। আপিসের কাছাকাছি একটা হোটেলে উঠলেন। কিন্তু খরচে পোষাতে পারলেন না। তার উপর হোটেলের খাওয়াও তাঁর একেবারে সহ্য হল না। সারাদিন ঢেকুর উঠতে শুরু করল।
এরকম সময় আসানসোলে বসে এই বাড়িটার ব্যবস্থা করে দিল কিঙ্কর আর ছন্দা। বাড়ির মালিক আসানসোলে চাকরি করেন। পরিবার নিয়ে সেখানেই থাকেন। এক বছর হল বাড়িটা ফাঁকা পড়ে আছে। অনেকদিন ধরে নিজের একজন পছন্দসই ভাড়াটে খুঁজছিলেন। ছাদের ঘরে থাকবেন। বয়স্ক মানুষ, যিনি ভাড়া থাকবেন, অথচু পুরোপুরি ভাড়াটে হবেন না। বাড়িটা একটু দেখভালও করবেন। ছেলেপিলেরা পাঁচিল টপকে বাগানে ঢুকলে ধমক দেবেন, ভবঘুরেরা বারান্দায় উঠে আস্তানা গাড়তে চাইলে তেড়ে যাবেন, রোববার করে লোক ডেকে বাগানের আগাছা কাটবেন। প্রস্তাবটা লুফে নিল কিঙ্কর। কারণ ভাড়া অতি যৎসামান্য। কিঙ্কর প্রসাদবাবুকে টেলিফোনে সব বলল। প্রসাদবাবু বললেন, ‘বাড়ি দেখভাল করতে হবে মানে? এটা আমার পছন্দ নয় কিঙ্কর। উটকো ঝামেলা!
কিঙ্কর বিরক্ত গলায় বলল, ‘চুপ করুন! বাড়ি দেখভাল মানে কী আর লাঠি হাতে রাত জেগে পাহারা? একটু-আধটু হাঁকডাক দিলেই হবে। বাড়ির মালিক ভয় পাচ্ছে, খালি বাড়ি দেখে এরপর চোর-ডাকাত দরজা, জানলা খুলে নিয়ে না-যায়। এজন্যই একজনকে চাইছে। বছরখানেক আগে ওই বাড়িতে কী যেন একটা গোলমাল হয়েছিল। তারপর থেকে বাড়ি বন্ধ।’
প্রসাদবাবু ঢোক গিলে বললেন, ‘কী গোলমাল?
কিঙ্কর আরও বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আমি জানি না। আপনি বোনের সঙ্গে কথা বলুন।’
ছন্দা টেলিফোন ধরে দাদার উপর রাগ দেখাল। বলল, ‘কী গোলমাল জেনে তোমার কী হবে দাদা?’
প্রসাদবাবু মিনমিন করে বললেন, ‘চুরিটুরি নয় তো?’
‘চুরি, ডাকাতি, খুন যাই হোক, তোমার কী? কিচ্ছু না। তোমার সস্তায় বাড়ি চাই। ব্যস! সব গোলমাল মিটে গেল। এই সপ্তাহেই মালপত্র নিয়ে ওখানে চলে যাবে। ওই ঘর কিন্তু মোটেও ফাঁকা থাকবে না, এই বলে দিচ্ছি। দেখবে, তোমার পুরোনো মেসেরই কেউ ডবল ভাড়া দিয়ে নিয়ে নিয়েছে। তখন মাথা চাপড়াতে হবে। আজই তোমার ভগ্নীপতি বাড়ির মালিককে একমাসের অ্যাডভান্স ভাড়া দিয়ে দিচ্ছেন। পরশুর মধ্যেই লোক মারফত তোমার কাছে চাবি চলে যাচ্ছে। শুনেছি নিরিবিলি জায়গা। ছাদের উপর ঘর বলে রোদ-হাওয়া ফ্রি। কোনো ঝামেলা নেই। তুমি মেসবাড়ির অন্ধকার ছোটো-ছোটো ঘরে থাকতে বলেই তোমার ওইসব ভূতটুতের ভয়। খোলামেলা জায়গায় থাকবে, আজেবাজে ভয় পালাবে। তা ছাড়া খাওয়া নিয়ে চিন্তা নেই। ওই বাড়িতে একসময় কাজ করত বীণার মা, সে তোমার রান্নাবান্না করে দেবে। আমি বলে রাখব।’
প্রসাদবাবু বললেন, ‘বাড়িতে গেলাম না, তার আগেই রান্নার লোক ঠিক করে ফেললি।’
ছন্দা কিছু একটা বলতে গিয়ে চুপ করে গেল। বলল, ‘তুমি অত ভেবো না। আমি নিজে গিয়ে তোমার নতুন বাড়ি গুছিয়ে দিয়ে আসব। ওকে ছুটি নিতে বলেছি।’
প্রসাদবাবু বুঝলেন আর কোনো উপায় নেই। বোন-ভগ্নীপতির ঠিক করে দেওয়া বাড়িতে উঠতেই হবে। বেচারিরা অতদূর থেকে বাড়ি খুঁজে দিয়েছে এটাও একটা কথা। দিন-তিনেক পর এক ভোরবেলা মালপত্র নিয়ে নতুন বাড়িতে উঠে এলেন প্রসাদবাবু। এসে দেখলেন, সত্যি অসুবিধে কিছুই নেই। একতলা বাড়ি। নীচটা বড়ো-বড়ো তালা দিয়ে বন্ধ। পাশ দিয়ে ছাদ পর্যন্ত উঠে গিয়েছে লোহার সিঁড়ি। উঠে গেলে ছাদ, একপাশে ঘর। ঘর দেখে প্রসাদবাবু চমকে উঠলেন। ঘর তো বিরাট! হেসেখেলে গড়াগড়ি দিয়ে থাকতে পারবেন। ঘরের কোণে খাট। খাটের মাথার কাছে জানলা। জানলা খুলতেই ছাদ। সেটাও বড়ো। ভোরের নরম রোদ পড়েছে। নারকেল গাছটা ঝুঁকে আছে শান্ত ভঙ্গিতে। একটু-একটু দুলছে। বাঃ! অল্পক্ষণের মধ্যেই মনের খচখচানি দূর হয়ে গেল প্রসাদবাবুর। তিনি মনে- মনে ঠিক করলেন, এবার বদলে যাবেন। ভূতটুতের ছেলেমানুষি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলবেন একদম। সবাই চমকে যাবে। হাসিঠাট্টা বন্ধ হয়ে যাবে। আজ সন্ধেবেলা অফিস থেকে ফিরে মাদুর পেতে ছাদটায় খানিকক্ষণ বসে থাকলে কেমন হয়?
বেলা একটু বাড়তেই এগারো-বারো বছরের একটা মেয়ে এসে হাজির হল। মিষ্টি দেখতে। গায়ে একটা ফুলকাটা ফ্রক। ঘাড়ের দু-পাশে দুটো বিনুনি ঝুলছে। তাতে লাল রঙের দুটো সস্তার ফিতে। কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ। প্রসাদবাবু বললেন, ‘তুই কে?’
মেয়েটা হাসি-হাসি মুখে বলল, ‘আমি বীণা।’
প্রসাদবাবু বললেন, ‘বীণা কে?’
মেয়েটা ফিক করে হেসে বলল, ‘বীণার মায়ের মেয়ে।’
প্রসাদবাবুর এবার মনে পড়ে গেল। বীণার মা মানে যে মহিলা তার রান্না করবে। প্রসাদবাবু বললেন, ‘তোর মা কোথায়?’
বীণা বলল, ‘মায়ের জ্বর হয়েছে। আমায় বললে, তুই গিয়ে রান্না করে দিয়ে আয়, নইলে নতুন মানুষ, বিপদে পড়বে।’
প্রসাদবাবু অবাক হয়ে বললেন, ‘তুই কী রান্না করবি? এইটুকু মেয়ে। বীণা হেসে বলল, ‘এইটুকু মেয়ে বলে এইটুকু-এইটুকু রান্না পারব। ভাত, ডাল, আলুভাজা। চলবে?’
প্রসাদবাবু মেয়েটার কথা শুনে মজা পেলেন। বললেন, ‘ডাল-ভাতে খুব হবে। তুই বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারিস তো বীণা!
গুছিয়ে রান্নাও করতে পারি। হি হি।’
প্রসাদবাবুও হাসলেন। বললেন, ‘তুই কথায়-কথায় হাসিস কেন?’
বীণা একমুখ হেসে বলল, ‘মনে হয় হাসির রোগ আছে।’
প্রসাদবাবু চোখ পাকিয়ে তাকালেন। বীণা রান্নাঘরে ছুটে পালাল। রান্নাঘর পাশেই। বীণা ছুটে যাওয়ার সময় একটা ঝমঝম আওয়াজ পেলেন প্রসাদবাবু। মেয়েটা ঘুঙুর পরেছে নাকি? কই চোখে পড়ল না তো। কে জানে, ছোটো মেয়েরা ছোটাছুটি করলে বোধ হয় এরকম ঘুঙুরের আওয়াজ হয়। প্রসাদবাবু হেসে ফেললেন। অফিস যেতে হবে। খানিক পরে খবরের কাগজ রেখে স্নানে গেলেন। এ বাড়িতে জলের সমস্যা নেই। সময় নিয়ে স্নান করা গেল। ‘সুখে আছি’ মেসে জলের টানাটানি ছিল। মাথাপিছু এক বালতি পাওয়া যেত। খেতে বসলেন প্রসাদবাবু। বীণা রান্না খারাপ করেছে। সবেতেই গাদাখানেক চিনি। ছোটো মেয়ে কতটা আর পারবে। খাওয়া শেষে প্রসাদবাবুকে মুখ ধোওয়ার জল এগিয়ে দিল বীণা। বলল, ‘রান্না ঠিক হয়েছে?
প্রসাদবাবু বললেন, ‘ঠিক আছে।’
‘রাতের রুটি করতে কখন আসবি?’ বীণা বলল, ‘আমি আর আসব না। রাতের রুটি-তরকারি করে গেলাম। কাল থেকে মা আসবে। বীণার মা। হি হি।’
বীণার হাসি শুনে প্রসাদবাবুর ভালো লাগল। তবু বললেন, ‘ফাজিল মেয়ে আবার হাসে! চড় খাবি এবার। ঠিক আছে, তুইও মায়ের সঙ্গে-সঙ্গে মাঝেমধ্যে চলে আসিস।’
‘কী জানি, মা আমাকে আসতে দেবে কি না। মনে হয় না দেবে।’ প্রসাদবাবু বললেন, ‘আমি বলে দেব।’
প্রসাদবাবু অফিস যাওয়ার জন্য বেরিয়ে ঘরে তালা দিলেন। বীণা দাঁড়িয়ে ছিল ছাদের এক কোণে। প্রসাদবাবু বললেন, ‘কী রে, বাড়ি যাবি না?’
‘আমি একটু থাকব এখানে? এই বেশি না, খানিকক্ষণ।’ দু-আঙুল ফাঁক করে ‘খানিকক্ষণ’ সময়টা দেখাল বীণা।
প্রসাদবাবু ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘থাকবি? কী করবি?’
বীণা আবদারের ঢঙে বলল, ‘ছাদে খেলব।
‘বাড়ি গিয়ে খেল।’
বিনুনি ঝাঁকিয়ে বীণা বলল, ‘মা খেলতে দেবে না, কাজে পাঠিয়ে দেবে।’ এমনিতেই মেয়েটাকে খুব পছন্দ হয়েছে প্রসাদবাবুর, এখন মনটা আরও নরম হয়ে গেল। আহা রে! ছোটো মেয়ে। কাজকর্ম করে খেলতে চাইছে। হেসে বললেন, ‘সে না হয় থাকবি। কিন্তু খেলবি কার সঙ্গে? একা?
বীণা উৎসাহ নিয়ে বলল, ‘একাই খেলব। ছক কেটে এক্কা-দোক্কা খেলব। আর ওই যে গাছটা আছে, নারকেল গাছটা, ওর সঙ্গেও খেলব। দ্যাখো না, আমার সঙ্গে একবার খেলবে বলে একেবারে ছাদে উঠে এসেছে। হি হি। আমরা হাত ধরাধরি করে নাচব, লাফাব। দুজনে আগেও খেলেছি।’
এগিয়ে গিয়ে গাছের পাতাগুলো ধরে নাড়া দিল বীণা। ডালপালা দুলে উঠল। সাড়া দিল। প্রসাদবাবু মনে-মনে বললেন, ‘পাগল মেয়ে।’ মুখে বললেন, ‘ঠিক আছে, খেল। আমি চললাম। তুই যখন যাবি সিঁড়ির মুখের গ্রিলের দরজাটা ভালো করে বন্ধ করে দিয়ে যাবি, আর তোর মা কাল যেন তাড়াতাড়ি আসে। দেরি হলে অফিসে লেট হয়ে যাবে।
লোহার সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামার সময় প্রসাদবাবু গুনগুন করে গান করতে লাগলেন। কত বছর পর যে তিনি নিজের মনে গান করলেন।
অফিসের কাউকে নতুন বাড়ির কথা ভাঙলেন না প্রসাদবাবু। তিনি ঠিক করেছেন, রবিবার সন্ধেবেলা অফিস আর ‘সুখে আছি’ মেসের কয়েক জনকে ডাকবেন। ছাদে বসে গল্পগুজব হবে। সঙ্গে চা আর একটা করে ফিশ ফ্রাই? একটু খরচ হয়ে যাবে ঠিকই। তা হোক। চমৎকার বাড়ি দেখাতে একটু খরচ করতে হয়। বীণার মাকে বলতে হবে, মেয়েটাকে যেন সেদিন সঙ্গে নিয়ে আসে। সবাইকে চা দেবে। অফিস থেকে বেরনোর সময় ভগ্নীপতিকে একটা ফোন করতে গেলেন প্রসাদবাবু। বাড়িটার জন্য একটা ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। ফোন পাওয়া গেল না। ঠিক আছে কালই হবে। তাড়াহুড়োর কিছু নেই। বরং একটা রাত কাটুক।
বাড়ি ফিরে প্রসাদবাবুর মন আরও ভালো হয়ে গেল। ছাদটা একেবারে ঝকঝক করছে। বোঝাই যাচ্ছে, বীণার কাজ। খেলা শেষে ঝাঁট দিয়ে গিয়েছে। একপাশে ইট দিয়ে আঁকা এক্কা-দোক্কা খেলার অস্পষ্ট ছক। প্রসাদবাবু মুচকি হাসলেন। নিজের হাতে চা বানিয়ে এনে ছাদে মাদুর পেতে বসলেন। ফুরফুর করে হাওয়া দিচ্ছে। ঘরে ফেরা পাখির কিচিরমিচির ডাক। ধীরে-ধীরে সন্ধে নামল। আকাশ ভরা তারা। মস্তবড়ো একটা চাঁদ। নারকোল গাছের পাতায় হাওয়া লেগে ফিসফিস করে আওয়াজ হচ্ছে। বেশ লাগছে। এভাবে আকাশ, গাছপালা, পাখি অনেকদিন দেখা হয়নি। না, কিঙ্কর আর ছন্দা কাজটা ভালো করেছে। প্রসাদবাবু হাত বাড়িয়ে নারকেল গাছের পাতা ছুঁলেন। পাতার দল হাওয়ায় সরসর করে সরে গেল, ফিরে এলও আবার। যেন প্রসাদবাবুর সঙ্গে খেলতে চাইছে। অনেক রাত পর্যন্ত ছাদেই বসে রইলেন প্রসাদবাবু। নিজেই অবাক হয়ে গেলেন প্রসাদবাবু, কই ভয়টয় কিছু করছে না তো। ভয় সব পালিয়েছে না কি? নিশ্চয় পালিয়েছে। ছন্দা ঠিকই বলেছে, এতদিন অন্ধকার ঘুপচি ঘরে থাকতে-থাকতে মনের ভিতরেও অন্ধকার বাসা বেঁধেছিল। এই খোলামেলা পরিবেশ তাকে মুক্ত করেছে। প্রসাদবাবু মনে-মনে হেসে উঠলেন।
না, ভয় পালায়নি। ভয় ফিরে এলও অনেক রাতে। তবে সেটা প্রসাদবাবুর পরিচিত ভয় নয়। অপরিচিত ভয়। অনেক তীব্র। হাড় হিম হয়ে যায়। রাত তখন ক-টা? একটা? নাকি দুটো?
নতুন বাড়িতে সাধারণত প্রথম দিন ঘুম আসতে দেরি হয়। এই বাড়িতে প্রসাদবাবু কিন্তু বিছানায় শুয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। ঘুম ভাঙল এক ধরনের অস্বস্তিতে। প্রসাদবাবু বুঝতে পারলেন, অস্বস্তি নয়, আওয়াজ। হালকা একটা আওয়াজে ঘুম ভেঙেছে। ঝম ঝম…। আওয়াজটা আসছে থেমে-থেমে। কে যেন ঘুঙুর পায়ে হাঁটছে। হাঁটছে না লাফাচ্ছে। কে লাফাচ্ছে? কোথায় লাফাচ্ছে? গলা শুকিয়ে গেল প্রসাদবাবুর। তিনি চোখ খুললেন। ঘর অন্ধকার। অন্ধকার কেন। ঘর অন্ধকার থাকার কথা নয়। রাতে আলো জ্বেলে শুয়ে ছিলেন। নতুন জায়গায় তিনি ঝুঁকি নেননি। চোর-ডাকাত থাকতে পারে। আলো দেখলে ভয় পাবে। ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসলেন প্রসাদবাবু। আলো কে নেভাল? লোডশেডিং? হতে পারে। মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে না। প্রসাদবাবু বুঝলেন ঝম ঝম আওয়াজটা আসছে ছাদ থেকে। কখনো জোরে, কখনো মিলিয়ে যাচ্ছে। শরীরের অস্বস্তিটা এবার ভয়ের চেহারা নিল। অন্য কোনো সময়ে এর ছিটেফোঁটা ভয় পেলেও প্রসাদবাবু চাদর মুড়ি দিয়েছেন, আজ কিন্তু উঠে বসলেন। একবার ছাদে গিয়ে দেখলে কেমন হয়? কথাটা ভাবতেই প্রসাদবাবুর মন একসঙ্গে দুটো উত্তর দিল। একবার বলল, ‘কিছু হয়নি। সব মনের ভুল। নিজে গিয়ে দেখে এসো। ভয় পেলে চলবে না। ভয়ের দিন তোমাকে শেষ করতে হবে।’ তারপরেই বলল, ‘যেয়ো না, যেয়ো না, বাইরে বিপদ আছে।’
দোনামোনার মধ্যেই খাট থেকে নামলেন প্রসাদবাবু। অন্ধকারে টলতে- টলতে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। পা দুটোকে মনে হচ্ছে পাথর। কাঁপা হাতে দরজার ছিটকিনি খুলতে অনেকটা সময় গেল। খোলা দরজা দিয়ে কয়েক পা বেরিয়ে এসে দাঁড়ালেন। নির্জন, অন্ধকার ছাদ। আকাশে চাঁদ নেই, অসংখ্য তারা। ছাদ জুড়ে নরম আলো পড়েছে কুয়াশার মতো। সেই আলো সাদা আর নীলে মেশা। বেশ লাগছে দেখতে। মনে সাহস এনে চারপাশে ভালো করে তাকালেন প্রসাদবাবু। না, কেউ নেই। ঘুঙুরের আওয়াজটাও আর শোনা যাচ্ছে না। দূরে বড়ো রাস্তা দিয়ে ট্রাক চলে যাওয়ার আওয়াজ ভেসে এল। নিশ্চিন্ত হলেন প্রসাদবাবু। নিজের মনেই পিঠ চাপড়ালেন। ভাগ্যিস চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকেননি। তা হলে ভয়টা বেড়ে যেত। কাল সকালেই এই চমৎকার বাড়ি ছেড়ে পালাতেন। ঘুরে দাঁড়িয়ে ফের ঘরে ঢুকতে গেলেন প্রসাদবাবু, আর তখনই চোখ পড়ল নারকেল গাছটার দিকে। নিমেষে ঠান্ডা একটা স্রোত বয়ে গেল শরীরের মধ্যে দিয়ে। ওটা কী! গাছ তো নয়, অন্য কিছু। একটা মানুষ যেন ঝাপসা চুল। হাসছে। অন্ধকারের চোখ-মুখ। অন্ধকারের হাসি। ডালপাতাগুলো লম্বা হাতের মতো বাড়িয়ে রেখেছে। পেতে রেখেছে ছাদের উপর। হাওয়ায় দুলছে তারা। আওয়াজ হচ্ছে খসখস খসখস…। খামচে ধরার আগে বাঁধানো ছাদে যেন নখ শানাচ্ছে। চোখের পাতা ফেলতে পারছেন না প্রসাদবাবু। তাকে কে যেন মাথার ভিতরে বলছে, ‘চলে যাও, পালিয়ে যাও। ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ফ্যালো এখনই।’ কণ্ঠস্বরটা বাচ্চা মেয়ের মতো। চেনা, কিন্তু চিনতে পারছেন না প্রসাদবাবু। তিনি বুঝতে পারছেন, এখনই ঘরে ঢুকে যাওয়া দরকার। খুব দরকার।
কিন্তু পারছেন না। নারকেল গাছের ডালপাতা তাঁকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। তারপর হাত ধরে টান দিল। তিনি সম্পূর্ণ নিজের অনিচ্ছায় এগিয়ে যেতে লাগলেন ছাদের কিনারার দিকে। আর কয়েক পা গেলেই ছাদের ছোট্ট পাঁচিল। পাঁচিল টপকালেই….।
জ্ঞান হারানোর আগে প্রসাদবাবু স্পষ্ট শুনতে পেলেন, গাছটা বাচ্চা একটা মেয়ের গলায় হেসে উঠল। গলাটা এবার চিনতে পারলেন প্রসাদবাবু। ছোট্ট মেয়ে বীণা।
পরদিন সকালে ছাদের ধারে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গেল প্রসাদবাবুকে। পেল আসানসোল থেকে আসা প্রসাদবাবুর বোন ছন্দা আর ভগ্নীপতি কিঙ্কর। তারা প্রসাদবাবুকে না জানিয়ে কাল রাতে ট্রেনে উঠেছিল। পরিকল্পনাটা কিঙ্করের। একেবারে বাড়িতে হাজির হয়ে প্রসাদবাবুকে চমকে দেবে। এই কারণে দু-দিন অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এসেছে। ছন্দার কাজও আছে। দাদার জন্য বাড়িটা একটু গুছিয়ে দিয়ে যাবে। রান্নার একজন লোক চাই। খুঁজতে হবে। বীণার মা থাকলে কোনো চিন্তা ছিল না। কিন্তু এ শহরের পাট চুকিয়ে সে চলে গিয়েছে। এক বছর আগে পর্যন্ত এ বাড়িতে বন্ধ দরজা খুলে ঝাড়পৌঁছ করতে আসত। সঙ্গে তার বারো বছরের মেয়েটাও থাকত। ছাদে খেলত। একদিন খেলতে খেলতে এই বাড়ির ছাদ থেকেই পড়ে মারা যায় বেচারি! তার মা তখন একতলায় ছিল। বাড়ির মালিকের কাছে ছন্দা শুনেছে, বীণা মেয়েটা ছিল ভারি সুন্দর। কথায়-কথায় হাসত। বায়না করায় একজোড়া ঘুঙুর কিনে দিয়েছিল তার মা। মেয়েটা সেই ঘুঙুর পরে লাফিয়ে বেড়াত। আওয়াজ হত ঝম-ঝম। বীণা যে কী করে ছাদ থেকে পাঁচিল টপকে পড়ল তা নিয়ে রহস্য রয়ে গিয়েছে। কেউ যেন হাত ধরে টান দিয়েছিল। নইলে পাঁচিল টপকাবে কেন? যদিও এসব কথা প্রসাদবাবুকে বলেনি তার বোন। একেই তিনি ভীতু মানুষ…।
কিঙ্কর ডাক্তার ডাকতে ছুটল।
[ আনন্দমেলা, ২০ মার্চ ২০১১ ]
