জ্ঞান হারালেন অর্চিতা সেন – সৈয়দ রেজাউল করিম
কলিংবেলের আওয়াজ শুনে দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন অর্চিতা সেন। দরজা খোলা ঠিক হবে কিনা চিন্তায় পড়ে গেলেন। ভর দুপুরবেলা বাড়িতে কেউ নেই। চোর-ডাকাতের ছড়াছড়ি। কে কোন বেশে এসে গলা টিপে সব কিছু ধুয়ে মুছে নিয়ে চলে যাবে তার ঠিক নেই। তা ছাড়া আশপাশে জানাশোনা কেউ নেই। থাকলেও কলকাতার কেউ কারো খোঁজখবর রাখে না। সবাই আপন আপন ধান্দায় ঘোরে। দরজা খুলে মিছিমিছি বিপদে পড়া ঠিক হবে না।
‘খোলো খোলো দ্বার, দুয়ারে তোমার মধুর শব্দে আবার কলিং বেজে উঠল। আর তাতেই আরও চঞ্চল হয়ে উঠল অর্চিতা সেনের মন। বুকের ধুকধুকুনি গেল বেড়ে। আর ঠিকসময় বুদ্ধিটা হঠাৎ চলে এল মাথায়। দেরি না করে দরজার গুপ্ত ছিদ্রে চোখ রাখলে। দেখতে পেলেন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তান্ত্রিকবাবা। গলায় সেই পরিচিত রুদ্রাক্ষের মালা। পরনে গেরুয়া পোশাক। হাতে কুমণ্ডলু। মাথায় চুলের জটা।
তান্ত্রিক বাবাকে ছেলেবেলা থেকে চেনেন অর্চিতা সেন। গতকাল রাত্রে তাকে খবর পাঠিয়েছিলেন অর্চিতা সেন নিজেই। তাই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজাটা খুলে দিলেন। সাথে সাথে ভক্তিভরে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলেন অর্চিতা সেন।
তার মাথায় হাত রেখে তান্ত্রিকবাবা বললেন— ‘তোমাদের মঙ্গল হোক মা। তা হঠাৎ করে এরকম জরুরি তলব কেন মা?’
—‘বলছি বাবা। আপনি আগে একটু স্থিতু হয়ে বসুন।’
একথা বলে তান্ত্রিকবাবাকে ড্রইংরুমে নিয়ে গিয়ে বসালেন অৰ্চিতা সেন। তারপর কিচেনরুমে ঢুকে প্লেটে করে গোটাচারেক মিষ্টি, চারখানা লুচি, একবাটি ঘুঘনি ও একগ্লাস জল এনে তান্ত্রিক বাবার সামনে রেখে বললেন— ‘নিন বাবা! এগুলো খেয়ে নিন।’
তান্ত্রিকবাবা বললেন- ‘এগুলো আবার করতে গেলি কেন মা। জরুরি তলব কেন, সেটা আগে শুনি।’
—‘বলছি বাবা। আপনি খেতে শুরু করুন। সেই সাতসকালে বার হয়েছেন, পেটে কিছু পড়েছে কি না-পড়েছে।’
তান্ত্রিকবাবা আর দেরি করলেন না, খেতে শুরু করলেন। অর্চিতা সেন শুরু করলেন তার কাহানি।
গাঁয়ে বেশ ভালো ছিলাম বাবা। ভূতে ধরলো, গাঁয়ের সব জমিজমা বেচে দিয়ে কলকাতায় কবরডাঙায় এই বাড়িটা কেনার পর। মনে অনেক আশা ছিল। চোখে অনেক স্বপ্ন ছিল। ছেলেকে একটা ভালো স্কুলে পড়াব। হাতের কাছে বাঙ্গুর হাসপাতাল, টালিগঞ্জ মেট্রো রেল। বিনয়ের অফিসটাও কাছাকাছি। সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে আমাদের দিন কাটবে। কিন্তু সে আশায় আমার ছাই পড়ল।
তান্ত্রিকবাবা বললেন— ‘কেন পড়ল সেটাই তো জানতে চাইছি মা।’
—‘আমি তা নিজেই জানি না বাবা। তবে বুঝতে পারছি এ বাড়িতে আর আমরা বেশিদিন থাকতে পারব না।’
—‘কেন, কোনো চোরডাকাত, খুনি গুন্ডা, রকবাজ, দাঙ্গাবাজেরা তোদের পিছনে লেগেছে না কি?
—’না বাবা। সেরকম কিছু নয়।’
—‘তাহলে?’ বিস্ময়ে চোখ দুটো কপালে তুলে তান্ত্রিকবাবা জানতে চাইলেন।
প্রত্যুত্তরে অর্চিতা সেন যা জানালেন তার মর্মার্থ কতকটা এরকম-
সেদিন সন্ধ্যাবেলা বাজার করে বাড়িতে ফিরে দরজার তালা খুলবেন, এমন সময় শুনতে পেলেন খুটখাট আওয়াজ। প্রথমে ভাবলেন বোধহয় ইঁদুর-টিদুর হবে। পরমুহূর্তে ভাবলেন কোনো চোর-টোর ঢোকেনি তো? কিন্তু দরজার তালা তো বন্ধ। তাহলে কি কোনো জানালা-টানালা ভেঙে…।
মনে অদম্য সাহস ছিল অর্চিতা সেনের। ছেলেবেলা থেকে একটু ডানপিটে স্বভাবের ছিলেন বলে, সব কিছু ভয়ডর উপেক্ষা করে দরজার তালা খুলে ভিতরে ঢুকলেন। ঘর ছিল অন্ধকার। দরজার পাশেই ছিল সুইচ বোর্ড। খুট করে আলো জ্বালতেই দেখতে পেলেন এক মহিলা ত্ৰস্ত পদে রান্না ঘরে ঢুকে পড়ল। এই অবস্থা, এই পরিস্থিতিতে কোনো মহিলা পড়লে সাথে সাথে জ্ঞান হারাতেন, কিন্তু অর্চিতা সেন, অৰ্চিতা সেনই। একটু বিড়ম্বনার মধ্যে পড়লেও সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিলেন তিনি। মহিলা বলেই বোধহয় মনে একটু বেশি সাহস হল তাঁর। সোজা গিয়ে ঢুকলেন রান্না ঘরে। সুইচ টিপে আলো জ্বাললেন। আর আলো জ্বেলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন তিনি। কোথায় গেল সেই মহিলা! ত্রস্তপদে এঘর-সেঘর খুঁজে বেড়ালেন। ঘরের দরজা, জানালা, খিল সব কিছু পরীক্ষা করে দেখলেন। কিন্তু কোথাও কোনো অসঙ্গতির লক্ষ্য গোচর হল না তার। আর তার পরেই শুরু হল যত অবাস্তব ভাবনাচিন্তা।
এটা তার মনের ভুল, এটা ইলিউশন, এটা দড়ি দেখে সাপ ভাবার মতো এরকম অনেক ভাবনাই ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি যখন একদিন, দু-দিন, তিনদিন, পর পর সাত-আটটা দিন ঘটল তখন সত্যই চিন্তায় পড়ে গেলেন তিনি। সত্যই কি মেয়েটি অশরীরী? সত্যই কি ভূতপেতনি বলে তাহলে কিছু আছে? মনের মধ্যে এসব কিছু হলেও ঘুণাক্ষরে তা ছেলে ও স্বামীকে জানালেন না তিনি। সেদিন বাবার শরীর খারাপ শুনে ছেলে ও স্বামীকে রেখে গাঁয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন অর্চিতা সেন। তিনদিন পর কলকাতায় ফিরলেন তিনি। দিনটা ছিল রবিবার। স্বভাবতই ছুটির দিন। ছেলে ও স্বামী দুজনেই বাড়িতে ছিল। বাবার সুস্থতার খবর দিয়ে একসময় ছেলের কাছে অর্চিতা সেন জানতে চাইলেন— হ্যাঁরে বাবা! এই ক-দিন রান্না করে খেতে তোদের কষ্ট হয়নি তো?’
বিকাশ বলল— ‘কষ্ট হবে কেন মা। বিন্দাস ছিলাম এ ক-টা দিন। তুমি চলে গেলে, আর জয়া মাসি এসে হাজির হল। রান্নাবান্না করে আমাদেরকে খাওয়ালো। তুমি হাজির হলে, আর জয়া মাসি চলে গেল।’
ছেলের কথা শুনে তাজ্জব বনে গেল অর্চিতা সেন। একী কথা বলছে বিকাশ! সে কি তার কাটা ঘায়ে নুনের ছেটা দিতে এই কথাগুলো বলল। বড়ো বিমর্ষ বোধ করলেন অর্চিতা সেন। স্বামীর দিকে অসহায়ের মতো মুখ তুলে তাকাতেই বিনয় সেন বললেন— ‘তুমি জয়ার কথা ভুললে কি হবে, সে কিন্তু আমাদের কথা ভুলতে পারেনি।’
স্বামী ও ছেলের কথা শুনে আরও ধন্ধে পড়ে গেলেন অৰ্চিতা সেন। বাবা-ছেলে মিলে তাকে কি পাগল বানাতে চাইছে। হ্যাঁ, রাগের মাথায় সেদিন জয়াকে তিনি বলেছিলেন— যা, তোর আর কাজে আসতে হবে না। কিন্তু সে তো আজ ছ-মাস আগের কথা। সেটা তো গাঁয়ের বাড়ির কথা। সেই থেকে জয়া তো তাদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেনি। সে তো দিনকয়েক আগে…।
‘সেকথা আমি জানি অর্চিতা। দিন পনেরো আগে তোমাদের জয়া বসু মারা গেছে। বুঝতে পারছি সে এখন তোমাদের সংসারে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু গাঁ ছেড়ে সে এখন কলকাতায় এসে উঠেছে কেন?’ মাথা চুলকাতে চুলকাতে তান্ত্রিকবাবা বললেন।
অর্চিতা সেন বললেন— ‘সে-কথা আমি কী করে বলব বাবা?’
তান্ত্রিকবাবা গুম হয়ে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর একসময় বললেন, ‘তোমার জানার কথা। যজ্ঞ করে এ ভূত আমি বিদেয় করতে পারি; কিন্তু এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে অধরা থেকে যাবে। তবে যদি…।’
—‘তবে যদি’
—‘কী বাবা?’ সাগ্রহে জানতে চাইলেন অর্চিতা সেন।
—‘তবে যদি তুমি রাজি থাকো তাহলে প্লানচেটে জয়াকে ডেকে আমি তা জানতে পারি।’
—‘আমি রাজি তান্ত্রিকবাবা! তবে আমার একটা বিনীত নিবেদন, জয়া যেন আমাদের সামনে আর না আসে কখনো।’
তান্ত্রিকবাবা বললেন— ‘সে ব্যবস্থা আমি করে দেব।’
সেইমতো সেদিন রাতে অর্চিতা সেনকে নিয়ে এক নির্জন কক্ষে বসলেন। জয়া বসুর আত্মা এসে হজির হল তাদের সামনে। তান্ত্রিকবাবা শুধালেন— ‘জয়া, তুমি হঠাৎ গাঁ ছেড়ে কলকাতায় এলে কেন?’
—‘কী করবো বাবা! গাঁয়ে কাজ কোথায়? খাবো কী? ছেলেপুলে মানুষ করবে কে? তাই অর্চিতাদির বাড়িতে কাজে এসেছি।’
—কেন, সরকার তো আজকাল চালডাল লেখাপড়া সব দিচ্ছে।
—ওই ভিক্ষের পয়সায় দু-চারদিন চলে, কিন্তু বইখাতা কিনে মাস্টার পুষে শিক্ষে দেওয়া যায় না।
অর্চিতা সেন বললেন— ঠিক আছে, তোর ছেলে দুটোর পড়াশুনার খরচ আমি বহন করব। দয়া করে তুই…।
—আমি কি তোমার কোনো ক্ষতি করেছি দিদি? বরং তোমার উপকার করেছি। তোমার ছেলে ও বরের জন্য রান্নাবান্না করে দিয়েছি। তোমার অবর্তমানে তোমার ঘরদোর সব গুছিয়ে দিয়েছি।
—‘আর তোকে করতে হবে না।’ তান্ত্রিক জোর দিয়ে বললেন— ‘অর্চিতা যখন চাইছে না তখন আর তোকে আসতে হবে না। তবে কোনো অসুবিধা হলে আমাকে বলিস। আমি অর্চিতার মতো ছেলে দুটোর জন্য কিছু-একটা ব্যবস্থা করে দেব। একদম চিন্তা করতে হবে না।’
—তাহলে আমি আসি। একথা বলে সাঁই সাঁই করে জয়ার আত্মা কোথায় যে চলে গেল কে জানে! তার ঝাপটায় জ্ঞান হারালেন অৰ্চিতা সেন।
জ্ঞান ফিরলে কী বলতে পারে সে ভাবনায় ব্রতী হলেন তান্ত্রিকবাবা।
[ ছুটির ছুটি (নির্মল বুক এজেন্সী), ২০১৫ ]
