পুতুলবাড়ির গুনাই বিবি – দীপ মুখোপাধ্যায়
সকালের গুলতানিতে মেজকা বলল, তোরা কি গুনাই বিবির নাম শুনেছিস? অবশ্য শোনার কথা না। গুনাই বিবি বরিশালের লোককাহিনিভিত্তিক একটি নাটকের মূল চরিত্র। শব্দাবলি গ্রুপের উপস্থাপনায় নাটকটা আমি দেখেছি।
গবলু ফুট কাটল, লোককাহিনির গল্প কি সবটাই মনগড়া? গুনাই বিবি নামে সত্যিকারের কেউ ছিল বুঝি?
—কল্পকাহিনি কি না বলতে পারব না। তবে বরিশালের প্রত্যন্ত গ্রামের নট্টপরিবার এই পালাটা করতে চেয়েছিলেন। কোনো অজানা কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। তবে অতি উৎসাহী নট্টদের এক পূর্বপুরুষ অখ্যাত কোনো শিল্পীকে দিয়ে গুনাই বিবির কাল্পনিক মূর্তি তৈরি করান। এরাই কিন্তু বিখ্যাত নট্ট কোম্পানির আদি পুরুষ।
বকুল বলল, যাত্রা-ফাত্রা কেউ দ্যাখে নাকি? যতসব গেঁয়ো ব্যাপার। কিন্তু গুনাই বিবির মধ্যে রহস্যের গন্ধ আছে।
— তা তো আছেই। তবে সেই রহস্যে ঢোকার আগে নট্টদের কথায় ফিরে আসি। বাংলা যাত্রাপালায় নট্টরা খুবই নাম করেছিল। ওদের দলের নামই নট্ট কোম্পানি। বৈকুণ্ঠ নট্ট থেকে মাখনলাল নট্ট মানে সাফল্যের ইতিহাস। ওরা বরিশাল থেকে কলকাতা চলে আসার সময় অনেক লোকপুতুল নিয়ে আসেন। তার মধ্যে গুনাই বিবিও ছিল।
গবলু রসিকতা করল, কলকাতায় নিশ্চয় নট্টদের বাড়ি রয়েছে? গুনাই বিবির সঙ্গে দেখা করে আসা যায় না?
—অবশ্যই যায়। আমরা আজই উত্তর কলকাতার সেই দেড়শো বছরের পুরোনো বাড়িটা দেখতে যাব। গুনাই বিবির পুতুলটা নিয়ে বরিশালে একটি জনশ্রুতি ছিল। সেই অনামী শিল্পী পুতুল বানানোর সময় এক মহিলার আত্মা অতিপ্রাকৃত শক্তি নিয়ে পুতুলটার ভেতর ঢুকে পড়ে। নট্টরা ব্যাপারটায় তেমন গুরুত্ব দেননি। কেউ কেউ গভীর রাতে পুতুলটার উচ্চস্বরে গান শুনেছেন। এই অসঙ্গতিপূর্ণ আচরণ অশুভ আত্মার আছর বলে অনেকের ধারণা।
—বলছ কী মেজকা? বকুল চোখ গোল গোল করল। আমরা তাহলে একটা ভূতুড়ে বাড়িতে গুনাই বিবির খোঁজে যাচ্ছি। অ্যানাবেলা নামের ভূত- পুতুলকে নিয়ে অবশ্য আমি একটা সিনেমা দেখেছি। তুই দেখিসনি গবলু?
গবলু সায় দিল। আমিও দেখেছি। মনে নেই? ওয়ারেন নামের মহিলা তাকে কাচের শো-কেসে বন্দি রাখত।
গবলু আর বকুল ততক্ষণে রেডি হয়ে নিয়েছে। ওদের গন্তব্য আহিরিটোলা- কুমারটুলির কাছে হারাচন্দ্র মল্লিক লেনের একটি পোড়ো বাড়ির খোঁজে; যেটা শোভাবাজার লঞ্চঘাট থেকে হাঁটাপথ। কাছেই সার্কুলার ট্রেনের লাইন।
কাউকে জিজ্ঞেস না করেই ওরা বাড়িটা খুঁজে পেল। বাইরে থেকে অভিনব কিছু মনে হল না। লাল ইট আর চুন-সুরকির গাঁথুনিতে পুরোনো কলকাতার আর পাঁচটা বাড়ির মতোই। বোঝা গেল ঘরগুলো বেশ বড়ো বড়ো। বাড়ির মাথায় দুটো পেল্লায় কংক্রিটের স্ট্যাচু শোভাবর্ধন করছে। মূল ফটকের সামনে ঝুলছে একটি নোটিশ
বকুল পড়তে লাগল— অযথা গুজবে কান দেবেন না। গুজব ছড়াবেন না। ভূত-সংক্রান্ত তথ্য সম্পূর্ণ মিথ্যে!
গবলু ঘাবড়ে গিয়ে বলল, মেজকা, এই বাড়িতে সত্যিই ভূত আছে? থাকুক বা না-থাকুক আমরা ভেতরে ঢুকবই!
মেজকা বলল, বাড়িটার নাম পুতুলবাড়ি। শুনেছি ভেতরে শ্বেতপাথরের অনেক পুতুল দিয়ে সাজানো। রাত্রি হলে পুতুলরা নাকি ঘুরে বেড়ায়। কখনো কান্না কখনো-বা খিলখিল করে অদ্ভুত হাসির শব্দে কেঁপে ওঠে জানলা-দরজা।
তখন শেষ বিকেল হলেও পুতুলবাড়ির ঘরগুলোয় রাত্রি নেমেছে। টিমটিম করে জ্বলছে একটা আলো। এক সিল্যুয়েট ছায়ামূর্তি ওদের দিকে এগিয়ে এসে বলল, তোমরা কেন ভেতরে ঢুকেছ? শান্তিতে থাকতেও দেবে না!
বকুল দেখল একজন কোঁচকানো চামড়ার বুড়ি-মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে। সে বলল, আমরা ভূত খুঁজতে এসেছি।
—ভূত? বুড়ির গলা খনখন করে উঠল। আমাকে দেখে কি ভূত মনে হচ্ছে? যত গাঁজাখুরি গালগল্প।
এক প্রবীণ ভদ্রলোক অন্ধকার ফুঁড়ে দেখা দিলেন। বললেন, আমরা কেউ ভূত-টুত নই। এখানে একটা দর্জির কারখানা রয়েছে। তা ছাড়া বাড়িটা দীর্ঘদিন ধরেই গুদামঘর হিসেবে ব্যবহার করা হয়। খবরের কাগজগুলো এই বাড়ি নিয়ে অকারণ গুজব ছড়িয়েছে। আপনাদের মতো ভূতের খোঁজে এখানে বহু মানুষ আসেন। বুঝুন কারবার।
মেজকা ধৈর্য ধরে ভদ্রলোকের কথা শুনছিলেন। এবার বললেন, তবে আপনারা দোতলায় ওঠেন না কেন?
—আরে মশাই উঠব কী? তাকিয়ে দেখুন না সিঁড়িটা কেমন নড়বড়ে। তা ছাড়া দোতলা থেকে প্রায়ই চাঙাড়ি খসে পড়ে। একবার তো সেই দুর্ঘটনায় একজন মারাও গেছিল। লোকে শুধুমুধু বলেছিল ওটা ভূতের কারসাজি। মেজকা ভদ্রলোককে নরম গলায় বলল, আমরা ভূতের খোঁজে আসিনি। এটা একটা হেরিটেজ বাড়ি। পুরোনো স্থাপত্যে আমাদের উৎসাহ। কিছুক্ষণের জন্য যদি দেখার অনুমতি দিতেন খুব কৃতজ্ঞ থাকতাম।
ভদ্রলোকের রাগ হয়তো কিছুটা গলল। তবু সাবধানতা দেখালেন। আপনারা নিজের দায়িত্বে যেতে পারেন। ওপরে কিন্তু ইলেকট্রিক নেই। ইঁদুর কিংবা তেঁতুলে বিছেরও স্বর্গরাজ্য। মাকড়সারাও চারদিকে জাল বিছিয়ে।
মেজকা আশ্বাস দিল, আমাদের সঙ্গে টর্চ রয়েছে। তা ছাড়া আমার ভাইপো-ভাইঝিরাও খুব সাহসী। বেশিক্ষণ তো আর থাকব না ওপরে! কীরে গবলু-বকুল? ভয়ে বুক ধড়ফড় করবে না তো? আমার পেছন পেছন চলে আয়।
পা টিপে টিপে ওরা উঠে পড়ল ওপরের হলঘরে। অসহ্য গন্ধে নাকচাপা দিল সবাই। মেজকার জোরালো টর্চের আলোয় চোখে পড়ল ঘরময় ছড়ানো রয়েছে অজস্র পাথর পুতুলের বিকৃত দেহ আর ভাঙা হাত-পায়ের মতো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। যেন সেই পুতুলের টুকরোগুলো তাদের গতিবিধি অনুসরণ করে চলেছে। কয়েকটা পুতুলের ভাঙা মুণ্ডু দেওয়ালের আড়াল থেকে ওদের নজরে রাখছে। সত্যিই গা হিম হয়ে যাওয়ার জোগাড়! চোখের পলক পড়ে না কারুর। বকুলের গলা শুকিয়ে আসছিল। তবু সাহস করে বলল, রাতে এরাই কি আতঙ্ক ছড়াতে জেগে ওঠে?
মেজকা বলল, পুতুল দেখেই তোদের এই অবস্থা। আসল ভূত দেখলে তো ভিরমি খাবি। আরে! তাকিয়ে দ্যাখ একটা পুতুল এখনও অক্ষত আছে। মুখে হিজাব পরা। মাটিতে লুটিয়ে পড়েছে এক ঢাল চুল। গলায় একটা বিছে হার। কী অপূর্ব পাথর খোদাই কাজ! চোখের দিকে তাকালে মনে হচ্ছে পুতুলটা কিছু-একটা যেন বলতে চাইছে।
ভাঙা জানলা দিয়ে তখন ভেসে আসছে গঙ্গার জোলো বাতাস। পুতুলটার চোখ দুটো থেকে টুপটুপ কয়েক ফোঁটা জল গড়াল। এবার যেন ঠোঁট নড়ে উঠল। গান শোনা গেল, কহছেন দেহি এ্যাহন মুই অ্যালহা অ্যালহা কি হরি?
গবলু আর বকুল ঠাহর করতে পারে না ওরা ঠিক দেখছে নাকি মনের ভুল। থমথমে পরিবেশে বোধবুদ্ধি ক্রমশ লোপ পাচ্ছে ওদের। হঠাৎ ফ্লাশগানের আলোর মতো ঝলকানি টুকরো টুকরো হয়ে ঘরটাতে ভেঙে পড়ল।
গবলু নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, এই পুতুলটাই হয়তো গুনাই বিবি। এখানে বন্দিদশার কষ্টে নিশ্চয় কাঁদছে।
মেজকা গম্ভীর হয়ে বলল, আকাশের বিদ্যুৎ চমকানিতেই তোরা চমকে গেছিস। খসখস শব্দে নিশ্চয়ই মনে হচ্ছে এই বুঝি গুনাই বিবি তোদের কাছে চলে এল। আরে, তোদের সঙ্গে গুনাই বিবির তো কোনো শত্রুতা নেই!
বকুল বলল, তোমার কথা মেনে নিচ্ছি। বরিশালের ভাষায় যে গানটা শুনলাম সেটাও কি কানের ভুল?
—গঙ্গার ঘাটে কোনো বাউল-ফকির গেয়ে থাকতে পারে। সেটাই হাওয়ায় ভেসে ঘরে ঢুকছে। আর তোরা ভাবছিস গুনাই বিবির গলা। বরিশালে গুনাই বিবি পালা থাকলেও আত্মার ব্যাপারটা বানানো গল্পও হতে পারে। হয়তো গ্রামবাসী চাননি পুতুলমূর্তিটা নট্টবাবুরা গ্রাম থেকে কলকাতা শহরে নিয়ে যান। তাই এই মনগড়া কাহিনি ফাঁদা।
বাইরে তখন প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। থেকে থেকে দমকা হাওয়া ঝাপটা মারছে জানলায়। গবলু আর বকুল দু-জনেরই গা বেয়ে ঘাম গড়াচ্ছে। মুখে কোনো আওয়াজ নেই। একটা সাদা কাপড় দেখে গবলুর মনে হল এক বুড়ি মহিলা তাকে চিবিয়ে খাবার জন্য এগিয়ে আসছে। একটু পরেই হাড় চেবানোর মটমট শব্দ শোনা যাবে।
বকুলও মেজকার সব কথা বিশ্বাস করেনি। তার শরীরেও খেলা করছে ভয়ের শিহরন। ভাঙা পুতুলগুলো একটু পরেই নিরেট ভূত হয়ে উঠবে। এমনি এমনি কি আর এই বাড়ির দোতলায় ওঠার নিষেধাজ্ঞা?
হঠাৎ একটা বিকট শব্দে সবাই চমকে উঠল। এমনকী মেজকাও। টর্চের আলোয় দেখা গেল, গুনাই বিবির পুতুল মূর্তিটা হাওয়ার দাপটে মাটিতে আছড়ে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গিয়েছে। হাত, পা, মাথা— সব ছড়িয়ে গেল ঘরের মেঝেতে। ঠিক যেখানে কাটা লাশের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে আরও পুতুল মূর্তি।
মেজকা বলল, আহা, এত উচ্চমানের শিল্পকর্ম চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে গেল! দু-চোখ ফেটে জল আসছে।
গবলু বলল, গুনাই বিবির ভেতর বন্দি আত্মাটা দমবন্ধ ঘর থেকে এতদিন পর মুক্তি পেল। কী বল বকুল?
—ঠিক বলেছিস। এবার সে পুতুলের শরীর থেকে বেরিয়ে নিজের দেশ বরিশালে চলে যাবে। উড়ে বেড়াবে নদীর তীরে। মেজকা যে কীর্তনখোলা নদীর কথা বলে ঠিক সেখানে। কী তাই তো মেজকা?
মেজকাও হতভম্ব। পুতুলবাড়িতে পূর্ণাঙ্গ গুনাই বিবির পুতুলমূর্তি দেখতে পাবে সেটা স্বপ্নেও ভাবেনি। সবার মুখে শুনেছে দোতলায় কিছুই নেই। সব লোপাট হয়ে গিয়েছে। আবাসিক ভদ্রলোকও একই কথা জানিয়েছিলেন। তবে যা দেখা গেল সবই কি মনের ভুল? গবলু আর বকুলকে কিন্তু এই নিয়ে কিছুই বলা চলবে না।
[ ছুটির সুবাস (নির্মল বুক এজেন্সী), ২০১৮ ]
