হানাবাড়ির বেগম – বামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়
গল্পটি আমার বাবার জ্যাঠামশায়ের মুখে শোনা। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের ডাকাবুকো পুলিশ কর্তা। নাম বিশ্বনাথ মুখোপাধ্যায়। আমরা ডাকতাম, বিশু দাদু। চাকরির খাতিরে ভারতের নানা জায়গায় তাঁকে ঘুরতে হয়েছিল। তাই অভিজ্ঞতার ঝুলি উপচে উঠত ছোটো-বড়ো নানা গল্পে। তাঁর বাড়ি ছিল ভবানীপুরের বলরাম বসু ঘাট রোডে। তখন তাঁর অবসর জীবন চলছিল। ছাদের এক পাশে ছিল তাঁর নিজস্ব মস্ত ঘর। নানা ধরনের মানুষজন আসতেন তাঁর কাছে। কেন না তিনি ছিলেন খুব আড্ডাবাজ মানুষ। গল্প বলতেন একেবারে নাটকের অভিনেতার স্টাইলে। তাঁর প্রিয় বিষয় ছিল বাঘ আর ভূত। তিনি বলতেন এই দুটি বিষয়ে গল্প বলে রাতের পর রাত কাটিয়ে দেওয়া যায়। তিনি গল্প বানাতেন না। যেখানে যেমন অভিজ্ঞতা চাকরি জীবনে লাভ করেছিলেন মুখে মুখে তাই টানা বলে যেতেন।
আমি তখন খুবই ছোটো। বোধহয় ক্লাস থ্রি কিংবা ফোর-এ পড়ি। বিজয়ার প্রণাম সারতে বাবা, মা আর ছোটো বোনের সঙ্গে দাদুর বাড়ি গেছিলাম। দিনটা ছিল কোজাগরী পূর্ণিমা। দাদুর লাইব্রেরি ঘরে সেদিন বেশ ভিড়। আমাদের আরও অনেক আত্মীয়স্বজন এসেছিলেন দাদুকে প্রমাণ করতে। চা শরবত আর জলখাবারের পর সকলেই একটু উশখুশ করতে লাগল। যেন কোথাও কিছু-একটা বাদ পড়ে যাচ্ছে অথচ সেটা সংকোচবশত মুখে কেউ বলতে পারছে না। ছোটোদের মধ্যে জড়তা বা সংকোচের ব্যাপারটা কম থাকে। তাই আমাদের মধ্যে যারা একটু বড়ো তাদের কেউ কেউ বলেছিল, দাদু একটা ভূতের গল্প বলুন না। ছোটো করে নয়, বেশ বড়ো গল্প চাই। দাদু হেসে বললেন, বটে। ভয় পাবি না তো? আমরা সমস্বরে সবাই না না করে উঠলাম। দাদু বললেন, বেশ। ঠিক আছে তাহলে সবাই মিলে একটা কাজ করো। ওই শতরঞ্জি ক-খানা ছাদে বিছিয়ে বস সবাই। আমি আসছি।
ছাদ তখন জোছনায় ভাসছে। কলকাতায় সেই সময় এমন আলোর মাত্রা ছাড়া দাপাদাপি ছিল না। আর আলো কম ছিল বলেই পূর্ণিমার রাতে জ্যোৎস্নার বানভাসি হত সর্বত্র। মস্ত ছাদের চারপাশে টবের ওপর নানান ফুলগাছ। বিস্তর সাদা ফুল চাঁদের টুকরো হয়ে লেগেছিল গাছের পাতায় পাতায়। মাঝখানে দুটি শতরঞ্জির ওপর আমরা সকলে। একটু দূরে দাদু বসে একা একটি আরাম কেদারায়।
প্রায় ষাট বছর আগেকার সেই সন্ধেবেলা আজও চোখ বুজলে দেখতে পাই। চাঁদের আলোয় আমরা সবাই সাদা কালো ফিল্মে তোলা গ্রুপ ছবি হয়ে বসে আছি। মাথার ওপর থেকে নেমে আসছে হলুদ জ্যোৎস্না ধারা। সেই ধারায় আমরা ভিজছিলাম সকলে। বাতাসে ছিল হেমন্তের চিঠি। সবাই উদগ্রীব হয়ে বসে দাদুর গল্পের জন্য। দাদু চুপ করে থেকে যেন পরিবেশ তৈরি করছিলেন তাঁর গল্পের জন্য।
একটু পরে গলাখাঁকারি দিয়ে দাদু বলেছিলেন, আজ ছোটোরা যখন দলে ভারী তখন ওদের পছন্দের গল্পই হোক। ভূত-ফুত কোনোদিন মানিনি। আজও মানি না। কিন্তু অত বছর আগেকার সেই ঘটনাটা মনে করলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। গল্পটা চলাকালীন কারও যদি অসহ্য মনে হয়, তো বল। গল্প বলা থামিয়ে দেব।
আমি তখন রাঁচির ডি.এস.পি। ক-দিন হল বদলি হয়ে এসেছি পাটনা থেকে। মস্তবড়ো জুরিসডিকশন। তখনও কিছুই দেখাশোনা হয়নি। সেদিন একটা ডাকাতি মামলার ফাইল নিয়ে বসেছি। এমন সময় টেলিগ্রাফে খবর এল, আমাকে ল্যাম্বার্ড সাহেব তাঁর হাজারিবাগ অফিসে ডেকে পাঠিয়েছেন। এই ল্যাম্বার্ড ছিলেন ইম্পিরিয়াল পোলিস সার্ভিসের ডেপুটি কমিশনার। ভারি হৃদয়বান মানুষ। আমাকে খুব স্নেহ করতেন। হয়তো নতুন কোনো কাজের ভার আমাকে দেওয়ার জন্যই ডেকে পাঠিয়েছেন। এমনটাই ভাবলাম আমি। আমার ড্রাইভার ছিল রমজান। যেমন ওস্তাদ ড্রাইভার তেমনি পাকা রাঁধুনি। তখন ওর সঙ্গে সদ্য পরিচিত হয়েছি অবশ্য। ওকে ডেকে গাড়ি বার করতে বললাম।
তখন কি আপনারা অ্যামবাসাডার চড়তেন? আমার এক খুড়তুতো ভাই জিজ্ঞেস করল। দাদু হেসে বললেন অ্যামবাসাডার তো এল, স্বাধীনতার পর। হিন্দুস্থান মোটরস তৈরি করত এই গাড়ি। সেই সময় দেশে কোনো মোটর গাড়ির কারখানাই ছিল না। আমাদের জন্য সরকার আমেরিকার উইলস কোম্পানির জিপ আনত জাহাজে করে। দারুণ শক্তপোক্ত গাড়ি। স্পিড উঠত ঘণ্টায় আশি মাইলের মতো। গাড়ি চলত পেট্রোলে। রমজান গাড়িও খুব টিপটিপ রাখত। তা ও এসে জানাল, দেড়শো মাইল রাস্তা যেতে তিন-সাড়ে তিন ঘণ্টা লেগে যাবে। তখন বাজে প্রায় বিকেল পাঁচটা।
কোয়ার্টার্সে গিয়ে ইউনিফরম পরে ট্র্যাভেল ব্যাগ, টর্চ লাইট আর চব্বিশ ঘণ্টার সঙ্গী মাউজার সি নাইনটি সিক্স পিস্তল নিয়ে গাড়ির সওয়ার হলাম পনেরো মিনিটের মধ্যে। রমজান গাড়ি ছাড়ার সময় জানাল, দুটো রাস্তা আছে হাজারিবাগ পৌঁছোতে। একটা ওরমানজি, রামগড়, কুজু হয়ে আর একটা কাঁকে এবং পত্রার্ত হয়ে। রমজান জানিয়েছিল সে পত্রাতুর পথ ধরবে। কেন না এ পথটা অপেক্ষাকৃত ছোটো তাই কম সময় লাগবে। মনে রাখতে হবে ওই সময়ের পথঘাট এখনকার মতো চমৎকার ছিল না। আর রাস্তা রাতের বেলায় ঘুটঘুটে অন্ধকার, কেন না ল্যাম্পপোস্টই বসেনি। তবে আজও মনে আছে সেই রাতটাও আজকের মতোই পূর্ণচন্দ্রের ছিল।
গাড়ি ছাড়ার আধঘণ্টা কিংবা এক ঘণ্টা পর রমজান বলল, এ ক্যয়া অজীব চিজ হো রহা হ্যায়। যো রাস্তা, পকড়না থা ও বদল হো গয়া। হামলোগ ওরমানজি অউর কুজু বা রাস্তা পর আ পৌঁছা। খোদা মালুম, ইয়ে গড়বড়ি ক্যায়সে হো গয়া। আমি বললাম এ রাস্তায় অসুবিধে কী? তার উত্তরে রমজান জানিয়েছিল, ঘুরপথ তো বটেই এবং রাস্তার অবস্থাও ভালো নয়।
পশ্চিম আকাশে ততক্ষণে লাল রং ধরেছে। রাস্তা খুবই নির্জন। জনপদ চোখেই পড়ছে না। জঙ্গল দু-দিকেই। কখনো-সখনো দু-একটা গ্রাম দূরে দূরে। আমি প্রকৃতি ভালোবাসি, তাই লং-ড্রাইভ সারাজীবন খুব এনজয় করেছি। কিন্তু সেদিন বার বার ঘড়ি দেখছি। সাহেবের ডিনারের আগে না পৌঁছালে কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করতে হবে।
তখনও চারপাশে অস্তরাগের ছবি। পশ্চিম আকাশ ডিমের কুসুমের মতো রক্ত ধরেছে। পাখিরা ধীরে ধীরে ঘরমুখো হবার কথা ভাবছে। হঠাৎ গাড়িটা ঝপ করে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সমস্ত যান্ত্রিক শব্দ একেবারে বন্ধ। রমজান কয়েক বার চাবি-টারি ঘোরালো বটে কিন্তু গাড়ি স্পিকটি নট। রমজান লাফিয়ে নামল গাড়ি থেকে, তারপর বনেট খুলে অনেকক্ষণ ধরে যন্ত্রপাতি নাড়াচাড়া করল। কিন্তু গাড়ি স্তব্ধ হয়েই রইল। রমজান কপাল চাপড়ে হিন্দিতে যা বলল, তার সহজ বাংলা হল, গাড়ির সব কিছু ঠিকঠাক দেখেই বেরিয়েছি। খারাপ হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তবু দেখি একবার বনেট খুলে।
রমজান গাড়ি থেকে নামতেই আমিও নামলাম। সময়টা সম্ভবত ছিল বসন্তকাল। সারা দিন ভ্যাপসা গরম থাকার পর ভারি সুন্দর ফুরফুরে হাওয়া বইছে। বহু দূরে দূরে গ্রামের বাড়ি ঘর। পাহাড়ের একটা হালকা আভাসও যেন দেখা যাচ্ছিল। আমি নিশ্চিত ছিলাম গাড়ি ঠিক হবেই। কিন্তু মিনিট দশেক পর রমজান জানাল, তার বিশ বছরের চাকরি জীবনে এমনটা কখনো ঘটেনি। সে বুঝতেই পারছে না গাড়ি কেন চলছে না। যন্ত্রপাতি সব ঠিক আছে।
রমজান মাঝরাস্তায় গিয়ে দাঁড়াল। আমাকে সে বলল, যদি হাজারিবাগের দিকে গাড়ি পাই তবে তো হয়েই গেল। নইলে আমি রাঁচি গিয়ে মেকানিক নিয়ে আসছি। কিন্তু কোনো দিকেই গাড়ির আসা-যাওয়া দেখা গেল না। রমজান বলল, স্যার চলুন আপনার একটা ব্যবস্থা করি আগে। তারপর আমি দেখছি বাকিটা। এই না বলে সে আমার ট্রাভেল ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে হাঁটা শুরু করল। দেখেছিলাম একটি লোক তাড়াহুড়ো করে গেটটি তালা বন্ধ করছে। রমজান দূর থেকেই চেঁচাল। আমাদের ইউনিফরমে দেখেই সে একটা সেলাম করল তারপর দ্রুত পায়ে এগিয়ে এল আমাদের দিকে।
লোকটি নাম বাগীশ্বর। সরকারি কেয়ারটেকার। এই বাড়িতে সে সকাল থেকে সন্ধে অবধি ডিউটি করে, তবে বিকেল বিকেল সে বাড়ি ফিরে যায়। কারণ হিসেবে, সে জানিয়েছিল তার বাড়ি বেশ দূর এবং পথে বাঘের উৎপাত আছে। রমজান তাকে দিয়ে গেট খোলাল এবং আমাকে সঙ্গে নিয়ে একটি ঘরে ঢুকল। বাগীশ্বরকে বললাম স্নানের জলের ব্যবস্থা করতে। রান্নাবান্নার ব্যাপারে সে প্রথমেই জানিয়েছিল উনুন ধরাবার কাঠ বা কয়লা কিছুই নেই। কেন না এ বাড়িতে কেউ থাকতে আসে না। আর এ বাড়িতে জিনের উৎপাত আছে এবং এর আগে দু-জন পুলিশের লোক নাকি এখানে রাত কাটানোর কিছুদিনের মধ্যেই মারা গেছে। এবং তারাও নাকি একইভাবে এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল এবং তাদেরও গাড়ি খারাপ হয়ে গেছিল।
রমজান আমাকে বলল, লোকটা মিথ্যে বলছে ভয় দেখাতে। আসলে ওর ছুটি দরকার। আমি বললাম হাজারিবাগের দিকে গাড়ি পেলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল, না হলে আমি একাই এখানে রাত কাটিয়ে দেব। পুলিশের চাকরিতে তো আর কম মড়া ঘাঁটিনি। মর্গে বসেও একা রাত কাটিয়েছি। কাজেই ওসব জিন-ফিনকে আমি মোটেই ভয় পাই না। রমজান বলল, স্যার আমি গাড়ির কাছে ফিরে যাচ্ছি। যদি ব্যবস্থা কিছু হয় আপনার কাছে ফের আসছি। আপনি সাবধানে থাকবেন।
রমজান চলে যেতেই ঘরটা দেখি। পেল্লায় হল ঘর। তবে দেওয়ালে বড়ো বড়ো ফাটল এবং ছাদ থেকে জল চুঁইয়ে পড়ার দাগ সর্বত্র। তবে বিছানা, এবং আসবাবপত্র পরিষ্কার। আলো-টালোর কোনো ব্যবস্থা নেই। ঘরের মেঝে লাল রঙের, তবে সেও ফুটিফাটা। কিন্তু প্রত্যহ পরিষ্কার করা হয়। মনটা বেশ প্রসন্ন হয়ে উঠল। কখনো এভাবে পোড়োবাড়িতে এর আগে রাত কাটাইনি। তাই নতুন অভিজ্ঞতা লাভের আনন্দে মনটা বেশ খুশি খুশি লাগছিল। বাইরের বিরাট বারান্দায় একটি রংচটা আরামকেদারা এবং তার সামনে গোল পাথরের টেবিল। সেখানেই আরাম করে বসি। বাগীশ্বর কুয়ো থেকে জল তুলে ভরছে বাথরুমের বাথটবে। সেই শব্দটাই মনে হচ্ছিল পৃথিবীর একমাত্র শব্দ। বাইরে পাখির ডাকাডাকি বন্ধ। অন্ধকার ঘনিয়ে আসছিল ধীরে ধীরে। একটু পরেই বাগীশ্বর এসে সেলাম করে জানাল, সে এবার যাবে। আর কাল দিনের আলো ফুটলেই চলে আসবে। চীনের এবং খাবার জল সে তুলে রেখে গেল।
খুব সুন্দর ঠান্ডা বাতাসে তন্দ্রা এসে গেছিল। চটকাটা ভাঙল একটা অদ্ভুত কারণে। আমার ঘাড়ের ওপর কে যেন শ্বাস ফেলল অস্ফুট মেয়েলি গলায় শব্দ করে। আমি সোজা হয়ে বসতেই আবার সব স্বাভাবিক। ততক্ষণে পুব আকাশে মস্ত চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় জঙ্গলভরা সেই ভাঙাচোরা ডাকবাংলোটাকে দেখে আমার হঠাৎ মনে হল, এখানে থাকাটা হয়তো ঠিক হয়নি। ঠিক করলাম, ভালো করে স্নান সেরে পোশাক বদলে রাতের সামান্য খাবার যা সঙ্গে আছে তা খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ব। যদি তার মধ্যে গাড়ির ব্যবস্থা হয়ে যায় তা হলে তো আর চিন্তার কোনো ব্যাপার নেই।
কিন্তু চিন্তার ব্যাপার আবারও ঘটল। ফের কানের ওপর কারোর নিশ্বাস ফেলার অনুভূতি এবং হালকা নিমতেলের গন্ধ। ওই অঞ্চলের মানুষরা সেইসময় গায়ে নিমতেল মাখত। আমি বারান্দা থেকে ঘরে চলে এলাম। টেবিলে রাখা ছিল পাঁচ সেলের হাতি মারা টর্চ আর মাউজার রিভলবার। জার্মানি থেকে তখন পুলিশদের জন্য সরকার আনাত। রিভলবারটা হাতে নিতেই মনে জোর আসে। ঘরের মেঝেতে তখন চাঁদের আলো এসে পড়েছে। বাইরে বিদঘুটে রকমের ঝিঁঝির ডাক। ঘরেও ঝিঁঝির আস্তানা ছিল। কাছে-পিঠে কোথাও একটা তক্ষক থেকে থেকে ডেকে উঠছিল।
আমি বিছানায় বসেছিলাম। মিনিট দশেক পর আমার মনে হতে লাগল এই ঘরে আমি একা নই। অত্যন্ত কাছে কেউ একজন আমার সঙ্গী হয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে আছে। টর্চ জ্বালাতেই সব অবশ্য ভ্যানিশ। যেই না টর্চ নিভিয়েছি অমনি আবার। এবার নিশ্বাসের সঙ্গে নারী কণ্ঠের ফোঁপানি। রিভলবারটা তাক করে টর্চ জ্বালাই। কোথায় কে? হঠাৎ কুকুরের ভয়ংকর চিৎকারে আমি চমকে উঠি। সম্ভবত ফাঁকা বারান্দায় কুকুরটা আশ্রয় নিয়ে থাকবে। তার চিৎকারটা ছিল প্রবল আতঙ্কের। কেউ কেঁউ করতে করতে সে দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি ছেড়ে। শুনেছিলাম মানুষ যা দেখতে পায় না ওরা পায়। বিশেষ করে অশরীরীদের। তবে কি?
দাদু গল্পের মাঝপথে একটু জিরোতে দম নেয়। ছাদ থমথমে হয়ে আছে। ছোটো-বড়ো সকলের মুখে-চোখে একটা কী হয় কী হয় ভাব! আমরা তো প্রায় জড়াজড়ি করে বসে আছি। কাছে খুব জোর একটা টিকটিকি ডেকে উঠতেই দাদু বলেছিলেন, সে রাতেও কানের কাছে বিকট স্বরে এমন টিকটিকি ডাকছিল। মনটাকে শান্ত করতে স্থির করলাম, পুলিশের উর্দি ছেড়ে বাথটাবে নেমে আরাম করে স্নান করব। পোশাক ছেড়ে একটি তোয়ালে পরে হাতে টর্চ নিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। বাথটাবটার দিকে আন্দাজ করে টর্চ মারতেই আমার হৃদপিণ্ড একেবারে জেনারেটারের মতো শব্দ করে চলতে শুরু করল। আমার হাত-পা তখন পুতুলের মতো স্থির।
কেন? কেন? কী হয়েছিল বাথটাবে? জানতে চাইল আমাদের কেউ কেউ।
দেখলাম বাথটাবের স্বচ্ছ জলে একজন দেহাতি মহিলার দেহ ভাসছে! তার চোখ খোলা এবং মাছের মতো স্থির চোখে সে আমাকেই দেখছে। আমি ভীতু নই। টর্চের আলো ফেলে নিশ্চিত হলাম মহিলা মৃত নইলে ভেসে উঠত না। তবে কি কেউ ওকে মেরে রেখে গেছে এখানে? আমি দ্রুত ঘরে ফিরি এবং রিভলবার নিয়ে ফের বাথরুমের দিকে যাই। পুলিশ হিসেবে মৃতদেহ প্রথম দেখা মানেই আমার সরকারি দায়িত্বভার নেওয়া শুরু।
বাথরুমে ঢুকে ফের টর্চের ফোকাস ফেলি বাথটবের ওপর এবং কনকনে বরফের উপস্থিতি টের পাই আমার মেরুদণ্ড বরাবর। দেখলাম বাথটাবে রয়েছে টলটলে টাটকা জল। মৃতদেহের কোনো চিহ্নমাত্র নেই। মনকে বোঝালাম নিশ্চয়ই কোনো মনস্তাত্ত্বিক কারণে চোখের ভুল হয়ে থাকবে। কাজেই ঠিক করলাম এইবার এই জলেই স্নান করে মনের অস্বস্তি দূর করব। তাই ভেবে ঘরে যাই টর্চটা রাখতে। এবং মেঝেতে টর্চের আলো ফেলতেই আমার পুলিশি সাহস এক লহমায় উবে যায়। দেখি ঘরের মেঝেতে মেয়েলি পায়ের জল ছাপ। কে যেন এইমাত্র জল পায়ে সারা ঘর হেঁটে বেড়িয়েছে। আমি আর দেরি না করে ইউনিফরম পরি। তারপর কাঁধের ব্যাগ, টর্চ আর রিভলবার নিয়ে বেরতে যেতেই দেখি বিছানায় চাঁদের আলো এসে পড়েছে। আর সেই আলো গায়ে মেখে পড়ে আছে বাথটবের সেই দেহাতী মহিলার মৃতদেহ। মাথাটা আমার দিকে ঘোরানো।
পরের দিন যখন জ্ঞান এল আমি তখন রাঁচি হাসপাতালে। ল্যাম্বার্ড সাহেব স্বয়ং তখন ওখানে। হাসপাতালের বড়ো ডাক্তারকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন, যে কোনোভাবে আমাকে সুস্থ করে তুলতে হবে। কেন না ওই একই পরিস্থিতিতে গত পাঁচ বছরে দুজন অফিসারের মৃত্যু হয়েছিল প্রবল জ্বরে। ডাক্তারদের মতামত ছিল খুব আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ায় দুজনের শরীরেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার গ্রন্থিটি স্রেফ কাজ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছিল।
আমি অবশ্য সুস্থ হয়ে উঠেছিলাম। তারপর ওই জায়গায় গিয়ে তদন্তও শুরু করেছিলাম, বাতুলো থেকে মাইল দূরে থাকত ওই যুবতী। ওর নাম ছিল বেগম। একদিন সে ওই গ্রাম থেকে বেপাত্তা হয়ে যায়। কয়েক দিন পর বেগমের লাশ উদ্ধার হয় বাংলোর বাথরুম থেকে। পুলিশের কাছে সে খবর পৌঁছায়নি। তাই মামলাও হয়নি। গ্রামের লোক বলেছিল বেগমকে ঠান্ডা মাথায় খুন করেছিল কেউ। সে ঘটনাও ঘটেছিল বছর দশেক আগে। অনুসন্ধান করে বেরল বেগমের এক সতীন ছিল, যার নাম মনুয়া। ওই মনুয়াই তার স্বামীর সম্পত্তির লোভে ভাড়া করা খুনি দিয়ে বেগমকে খুন করায়। তারপর এতগুলি বছর কেটে যাওয়ার পর সে বেশ নিশ্চিন্তে সংসার গুছিয়ে করছিল। আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণ পেশ করার পর মনুয়ার ফাঁসি হয়ে যায়। আর আমিও গয়ার প্রেতশিলায় গিয়ে বেগমকে পিণ্ডদান করে আসি। এই দুটি কাজ করে আমার খুব শান্তি হয়েছিল মনে
বেগমকে আর দেখা যায়নি?
আমি ফের এক রাত কাটিয়েছিলাম ওই বাংলোয়। একেবারে একা। সে রাতেও চাঁদ ছিল। ওই বাথটাবের তোলা জলে আরামের স্নানও সেরেছিলাম। কিন্তু বেগম আর দেখা দেয়নি। সে যে বিচারের আশাতেই পুলিশের লোককে নিয়ে আসত ওই বাংলোয় তা নিয়ে সেই সময়কার খবরের কাগজে লেখাও হয়েছিল বিস্তর।
দাদু বেগমকে না দেখলে কী হবে। আমরা ছোটোরা সেই গল্প শোনার পর রাতে ছাদে বাথরুমে কিংবা বিছানায় কাল্পনিক বেগমকে দেখে যে চেঁচিয়ে উঠতাম সে-কথা আজও মনে আছে।
[ ছুটির জোয়ার (নির্মল বুক এজেন্সী), ২০১৯ ]
