তিন ভাই ও ডাইনি – নীহার ঘোষ
কোনো এক গ্রামে তিন ভাই একসঙ্গে বাস করত। কিন্তু তাদের অবস্থা বড়োই খারাপ ছিল। সংসার যখন চলে না এমন এক সময়ে তাদের মধ্যে বড়ো ভাই বাড়ি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল ভাগ্যান্বেষণে।
চলতে চলতে অনেক দূরে এসে পড়ল সে। তারপর ক্লান্তিতে আর তার পা চলতেই চায় না। ঠিক সন্ধ্যার সময় সে এসে পৌঁছোল একটা ভাঙা বড়ির সামনে। দরজায় কড়া নাড়তে এক কুৎসিত-দর্শন বুড়ি এসে দরজা খুলে দিয়ে তাকিয়ে রইল বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে। বুড়িটা ডাইনি। বড়ো ভাই বলে ডাইনিকে, আজ রাত্রের মতো একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে?
ভেতরে এসো। বলে ডাইনি তাকে ওপরে যাওয়ার সিঁড়ি দেখিয়ে দিল। ওপরে উঠে এসে বড়ো ভাই দেখল মেঝেতে একটা মাদুর পড়ে আছে। সেটা ভালো করে বিছিয়ে নিয়ে সে শুয়ে পড়ল। পথ হেঁটে পরিশ্রান্ত হয়েছিল বলে শুতে-না- শুতেই ঘুমিয়ে পড়ল। কতকক্ষণ ঘুমিয়ে ছিল তার মনে নেই; হঠাৎ মাঝরাত্রে টুং টাং শব্দে তার ঘুম ভেঙে গেল। তাকিয়ে দেখল একপাশে মেঝেতে একটা জায়গার গর্ত মতো, সেখান দিয়ে আলো আসছে। আস্তে আস্তে গিয়ে সে সেই গর্ত দিয়ে দেখতে পেল, নীচে ডাইনি বুড়ি একটা থলিতে সোনার মোহর ভরছে। পাশে হারিকেনটা জ্বলছে। সব মোহরগুলো ভরা হয়ে গেলে ডাইনি বুড়ি থলিটা বেঁধে দেওয়ালে একটা তাকের ওপর রেখে দিল। তারপর এসে আলোটা কমিয়ে দিয়ে তার বিছানায় শুয়ে পড়ল। বড়ো ভাই ওপর থেকে সব দেখতে পাচ্ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাইনি বুড়ির নাক ডাকার আওয়াজ পাওয়া গেল।
বড়ো ভাই আস্তে আস্তে নীচে নামল। ঘরের দরজাটা ভেজানো ছিল, আস্তে ঠেলা দিতেই খুলে গেল সেটা। ঘরে ঢুকে তাক থেকে থলিটা নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল রাস্তায়। তারপর আরম্ভ করল ছুটতে। ছুটতে ছুটতে সে একটা কুঁড়ে ঘরের কাছে এসে পৌঁছোল। সেখানে আসতে ঘরটা তাকে বললে— ভেতরে বড্ড ময়লা জমেছে, একটু পরিষ্কার করে দেবে?
না। উত্তর দিল বড়ো ভাই, আমার দাঁড়াবার সময় নেই। সে আবার ছুটতে আরম্ভ করল।
সকাল হয়ে গেছে। সূর্য ক্রমশ ওপরের দিকে উঠছে। বড়ো ভাই ছুটতে ছুটতে একটা মাঠের কাছে এসে পৌঁছোল।
তাকে দেখে মাঠ বললে- ভাই, আমার আশপাশে বড্ড ঝোপ মতো হয়ে গেছে, একটু পরিষ্কার করে দেবে?
না, পারব না। বলে সে আবার ছুটতে শুরু করল। কিন্তু পারল না। খানিকটা গিয়েই তার মনে হল থলিটা যেন দ্বিগুণ ভারী হয়ে গেছে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সে একটা কুয়ার কাছে এসে পৌঁছোল। বড়ো ভাই ছুটতে ছুটতে পিপাসার্ত হয়েছিল। তাই সে জলপান করতে এগিয়ে এল। কুয়া বললে, আমার গায়ে শ্যাওলা জমেছে, একটু পরিষ্কার করে দেবে?
তক্ষুনি জবাব দিল বড়ো ভাই, না, আমার একটুও সময় নেই। এই কথা বলেই অবার চলতে শুরু করল সে।
দুপুরবেলা সে এসে পৌঁছোল একটা বটগাছের নীচে। সেই গাছের তলায় ছায়ায় বসে সে বিশ্রাম করতে লাগলো।
.
এদিকে সকালবেলায় ডাইনি বুড়ি ঘুম থেকে উঠে দেখল ছেলেটা তো নেই-ই, অধিকন্তু তার সোনার থলিটাও নেই। তখন সে বেরিয়ে পড়ল তার খোঁজে। যেতে যেতে ডাইনি গিয়ে পৌঁছোল সেই কুঁড়ে ঘরের কাছে। তাকে জিজ্ঞেস করল—
থলি কাঁধে একটি ছেলে,
আমার যত টাককড়ি,
নিয়ে গেছে করে চুরি,
পাবো তারে কোথায় গেলে?
ঘর তাকে বললে— মাঠের দিকে গেছে চলে।
ডাইনি তখন আবার মাঠের দিকে চলল। সেখানে গিয়ে জিজ্ঞেস করল—
থলি কাঁধে একটি ছেলে,
আমার যত টাকাকড়ি,
নিয়ে গেছে করে চুরি,
পাবো তারে কোথায় গেলে?
মাঠ তাকে বলল—
মাঠ পেরিয়ে কুয়ার ধারে,
গেলে সেথায় মিলতে পারে।
ডাইনি কুয়ার কাছে এসে জিজ্ঞেস করল—
থলি কাঁধে একটি ছেলে,
আমার যত টাকাকড়ি,
নিয়ে গেছে করে চুরি,
পাবো তারে কোথায় গেলে?
সেকথা শুনে কুয়া জবাব দিল—
বটগাছটি আছে যেথায়,
পাবে তারে গেলে সেথায়।
ডাইনি বুড়ি তাড়াতাড়ি বটগাছের দিকে চলল। সেখানে গিয়ে দেখতে পেল, বড়ো ভাই মাথায় থলিটি নিয়ে পরম সুখে নিদ্রা দিচ্ছে। ডাইনি এক মুঠো ধুলো মন্ত্র পড়ে ছুড়ে মারল বড়ো ভাইয়ের দিকে। চোখের নিমিষে উধাও হয়ে গেল বড়ো ভাই। পড়ে রইল শুধু সোনা ভরতি থলিটা। সেটা কাঁধে নিয়ে বুড়ি ফিরে চলল বাড়ির দিকে।
কিছুদিন পর মেজো ভাই দেখল এভাবে আর থাকা যায় না। এত কষ্ট করে বেঁচে থাকার কোনো মানে হয় না। সেও বেরিয়ে পড়ল সব ছেড়ে দিয়ে, যদি ভাগ্য ফেরাতে পারে কোনোরকমে।
হাঁটতে হাঁটতে সন্ধের সময় মেজো ভাই গিয়ে পৌঁছোল সেই ডাইনি বুড়ির বাড়ির সামনে। কড়া নাড়তে বুড়ি বেরিয়ে এল।
আজ রাত্রের মতো একটু আশ্রয় পাওয়া যাবে? জিজ্ঞেস করল মেজো ভাই। ভেতরে এসো। বলে বুড়ি তাকে ওপরে যাওয়ার সিঁড়ি দেখিয়ে দিল, এবং মেজো ভাই ওপরে গিয়ে একটা মাদুর পড়ে থাকতে দেখে, সেটা পেতে নিয়ে শুয়ে পড়ল। সারাদিন হাঁটার জন্যে পরিশ্রান্ত হয়ে গিয়েছিল ছেলেটি, তাই শুতে-না- শুতেই ঘুমিয়ে পড়ল। মাঝরাত্রে কীসের টুং টাং আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল তার। তারপর সেই গর্ত দিয়ে আলো আসতে দেখে তাকিয়ে দেখল মেজো ভাই, বুড়ি একটা থলিতে সোনার মোহর ভরছে।
বুড়ি ঘুমিয়ে পড়তে যখন সে তার নাক ডাকার আওয়াজ শুনতে পেল, তখন নীচে নেমে থলিটা নিয়ে দিল চম্পট।
ছুটতে ছুটতে সেই কুঁড়ে ঘরের কাছে আসতে, ঘর বললে, ভেতরটা বড্ড নোংরা হয়ে আছে, পরিষ্কার করে দেবে?
—না, আমার সময় নেই। বলেই আবার ছুটল মেজো ভাই।
—আমার আশপাশের ঝোপগুলো পরিষ্কার করে দেবে? –তাকেও বলল মাঠ।
—না আমার দাঁড়াবার সময় নেই। জবাব দিল মেজো ভাই।
—ভাই, আমার গায়ের শ্যাওলাগুলো পরিষ্কার করে দেবে? –বলল কুয়া।
-–বাজে কাজের সময় নেই আমার। বলে সেও তার বড়ো ভাইয়ের মতো গাছের নীচে গিয়ে বিশ্রাম করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লে।
ওদিকে সকালবেলা ডাইনি বুড়ি যখন দেখল। তার থলি আর অতিথি দুই-ই অদৃশ্য, তখন রাগে গরগর করতে করতে সে ছুটে চলল ছেলেটির খোঁজে। রাস্তার মাঝে সেই ঘর, মাঠ ও কুয়া আগের মতোই মেজো ভাইয়ের খোঁজ দিয়ে দিল ডাইনি বুড়িকে। মেজো ভাইকেও মন্ত্রবলে ডাইনি ধুলো পড়া দিয়ে অদৃশ্য করে দিল আর বাড়ি ফিরে গেল সোনার থলি নিয়ে।
.
এদিকে ছোটো ভাই একলা থাকে। কোনোরকমে তার দিন চলে। অবশেষে এমন সময় এল যে, আর তার দিন কাটে না। এইভাবে চলতে চলতে তারও বিতৃষ্ণা এসে গেল সংসারে। তখন সে-ও একদিন বেরিয়ে পড়ল ভাগ্যান্বেষণে। তারপর চলতে চলতে এসে পড়ল সেই ডাইনির বাড়ির কাছে এবং এসে সে-ও আশ্রয় পেল রাত্রের জন্যে। অনেক রাত্রে তার ঘুম ভেঙে যেতে – থলি ভরতি মোহর দেখে, বুড়ি ঘুমিয়ে পড়ার পর সে-ও সেটা নিয়ে চম্পট দিল। যেতে-না- যেতে সে এসে পৌঁছোল সেই কুঁড়ে ঘরের কাছে। ঘর তাকে বললে, ভেতরে বড্ড ময়লা জমে আছে, পরিষ্কার করে দেবে ভাই একটু?
এই ছোটো ভাইটি ছিল ভীষণ পরোপকারী, কখনো কাউকে ‘না’ বলত না। সে সেই কথা শুনে বললে, হ্যাঁ, দেবো। পরিষ্কার করতে যদিও তার সময় লাগলো, তবু সে ভালো করে সব ময়লা পরিষ্কার করে দিল। তারপর আবার ছুটতে শুরু করল যতক্ষণ না মাঠের কাছে এসে পৌঁছোল
আমার আশপাশের ঝোপগুলো পরিষ্কার করে দেবে? বললে মাঠ। ছোটো ভাই আপত্তি করল না। সে মাঠের চারিদিক পরিষ্কার করে দিল; আগাছা, ঝোপঝাড় সব তুলে ফেলে দিল। তারপর সে ডাইনি বুড়ির এসে পড়ার ভয়ে ছুটতে আরম্ভ করল। ছুটতে ছুটতে গিয়ে পৌঁছোল সেই কুয়ার ধারে। তাকে দেখে কুয়া জিজ্ঞেস করল, আমার গায়ের শ্যাওলাগুলি একটু পরিষ্কার করে দেবে ভাই?
এবারও ছোটো ভাই ‘না’ বলল না। যদিও তার ভীষণ ভয় হচ্ছিল যে, ডাইনি বুড়ি এসে নিশ্চয়ই তাকে ধরে ফেলবে, তবু সে ভালোভাবেই কুয়ার গায়ে জমা শ্যাওলাগুলি পরিষ্কার করে দিল। তারপর দুপুরবেলা পরিশ্রান্ত হয়ে সে গিয়ে বিশ্রাম করতে লাগল সেই বটগাছটার তলায়।
এখন, ডাইনি বুড়ি সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে ছোটো ভাই আর তার সোনার মোহরের থলি কোনোটাই দেখতে পেল না। তখন সে বিদ্যুতের মতো ফেটে পড়ল। ছুটে চলল ছোটো ভাইয়ের সন্ধানে। যেতে যেতে গিয়ে সেই কুঁড়ে ঘরের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল-
থলি কাঁধে একটি ছেলে,
আমার যত টাকাকড়ি,
নিয়ে গেছে করে চুরি,
পাবো তারে কোথায় গেলে?
কুঁড়ে ঘর তাকে কিছু বলল না। কিন্তু হঠাৎ ঝড়ের মতো ঘরের চালাটা উড়ে এল ডাইনি বুড়ির দিকে। বাঁশগুলো পটাপট খুলে গিয়ে এসে পড়ল বুড়ির ঘাড়ে। ডাইনি বুড়ি ছোটাছুটি করেও রেহাই পেল না, তার অবস্থা প্রায় সঙ্গিন হয়ে উঠল। অবশেষে কোনোরকমে পরিত্রাণ পেয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে এগিয়ে চলল বুড়ি। থামলো এসে মাঠের কাছে। জিজ্ঞেস করল তাকে—
থলি কাঁধে একটি ছেলে,
আমার যত টাকাকড়ি,
নিয়ে গেছে করে চুরি,
পাবো তারে কোথায় গেলে?
মাঠ তার উত্তরে ধুলোর ঝড় উড়িয়ে ডাইনি বুড়িকে প্রায় অন্ধ করে দিল। সে চোখ ঢাকে তো ধুলো ঢোকে মুখে, মুখ ঢাকলে চোখে। অতিষ্ঠ করে তুলল তাকে।
তারপর কুয়ার কাছে গেল ডাইনি। তাকে বললে—
থলি কাঁধে একটি ছেলে,
আমার যত টাকাকড়ি,
নিয়ে গেছে করে চুরি,
পাবো তারে কোথায় গেলে?
কুয়া কিছু বললে না, কিন্তু তার জল হঠাৎ বাড়তে লাগল। বাড়তে বাড়তে তার ঠান্ডা হাত দিয়ে বুড়িকে টেনে নিয়ে ভেতরে ফেলে দিল। ডাইনি বুড়ি জলে ডুবে— কোথায় তলিয়ে গেল।
ছোটো ভাই বাড়ি ফিরে গেল। তারপর সেই মোহর নিয়ে সে সুখে ঘরসংসার করতে লাগলো।*
.
* একটি বিদেশি উপকথা অবলম্বনে।
[ মৌচাক, আষাঢ় ১৩৬৫ (জুন ১৯৫৮)]
