বড়োমা – শ্রীঅসমঞ্জ মুখোপাধ্যায়
যে কাহিনিটি বলতে বসেচি, এটি বহুবছর পূর্বেকার আমার নিজের দেখা একটি সত্য ঘটনা। যে পরিবারে এই ঘটনাটি এককালে ঘটেছিল, তার বংশধরেরা অনেকেই জীবিত; সুতরাং তাঁদের প্রকৃত নাম-ধাম আমি প্রকাশ করব না; তাতে মূলবিষয়বস্তুর কোনো হানি ঘটবে না। এঁরা ছিলেন আমাদের নিকট আত্মীয়।
এঁরা ছিলেন সম্পন্ন গৃহস্থ। পশ্চিমের কোনো শহরে বাস করতেন। দুই ভাই। বড়ো ভাই যোগেনবাবু সেখানকার একজন নামকরা উকিল; ছোটো ভাই পশারওলা ডাক্তার। দু-ভাই মিলে প্রচুর আয় করতেন। সেখানকার সমাজে দু- ভাইয়ের যথেষ্ট নাম-যশ ও খ্যাতি-প্রতিপত্তি।
সংসারটিও বেশ বড়ো। বুড়ো বাপ-মা, দু-ভাইয়ের দুই স্ত্রী, প্রত্যেকের পাঁচ- ছয়টি করে সন্তান, এক বর্ষীয়সী বিধবা ভগিনী, তাঁরও চার-পাঁচটি সন্ধান। তাদের মধ্যে আবার কারো বিবাহ হয়েছে, তাদের স্ত্রী ও ছেলেপুলে। এ ছাড়া চাকরবাকর, ঝি, পাচক, মুহুরি, কমপাউন্ডার, সরকার, গোমস্তা প্রভৃতি মিলে সংসারটি খুবই বড়ো। সর্বদাই জমজম করত।
এই বৃহৎ সংসারের যিনি গিন্নি ছিলেন, সকলেই তাঁকে ‘বড়োমা’ বলে সম্বোধন করত। তিনি যোগেনবাবুর স্ত্রী। বৃহৎ সংসারের ছোটো-বড়ো সবরকম খুঁটিনাটিই তাঁকে দেখতে হত। ভোর পাঁচটা থেকে রাত এগারোটা পর্যন্ত তাঁর কাজের আর বিরাম ছিল না- যদিও বিধবা ননদ কাদম্বিনী দেবী সর্ববিষয়েই তাঁকে সাহায্য করতেন। কিন্তু একবছর হঠাৎ বড়োমা মারাত্মক ব্যাধি কলেরাতে আক্রান্ত হলেন ও মারা গেলেন।
তাঁর মৃত্যুর কিছু পরে একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটল। যমুনা নামে এক প্রৌঢ়বয়স্ক দাসী অনেকদিন থেকে এ-বাড়িতে কাজ করে আসছিল। ছোটো ছোটো জন কয়েক ছেলে-মেয়েকে নিয়ে রাত্রে সে দোতলার একটা ঘরে শুতো। একদিন রাত দুটো-আড়াইটের সময়, তাকে বাইরে আসতে হয়। ঘরের বাইরে একটা খোলা লম্বা টানা বারান্দা ছিল। সেই বারান্দার শেষপ্রান্তে মুখ-হাত ধোবার ঘর ছিল। বাড়িটা ছিল সেকালের চক-মেলানো বাড়ি; মাঝে খানিকটা জমি উঠানের মতো রেখে, চারিধারে চারি সার ঘর, ও চারি সার ঘরের কোলে, ভেতরের দিকে উন্মুক্ত টানা বারান্দা। ঠিক এর ওপর, এইভাবেই এর দোতালা। দোতালায় চারি দিককার এই টানা বারান্দার দুই বিপরীত কোণায় দুটো বাথরুমের মতো মুখ-হাত ধোবার ঘর ছিল। সেদিনের রাত্রিটা ছিল জ্যোৎস্নাময়।
যমুনা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে, বিপরীত দিককার বারান্দায় চেয়ে দেখবার সঙ্গে সঙ্গেই, বিকট একটা চিৎকারের সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। তার চিৎকারে অনেকেরই ঘুম ভেঙে যায়। সকলে সেখানে ছুটে আসে। ছোটো ভাই দ্বিজেনবাবু ছিলেন ডাক্তার; তাঁর চেষ্টায় শীঘ্রই যমুনার জ্ঞানসঞ্চার হল। তারপর একটু সুস্থ হয়ে যমুনা যা বলল, তা কেউ-বা বিশ্বাস করল, কেউ-বা তার কথাটা হেসে উড়িয়ে দিল। যমুনা বলল, সে ওদিককার বারান্দায়, বড়োবাবুর শোবার ঘরের জানালা ধরে বড়োমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল।
সেদিন কথাটা অনেকেই হেসে উড়িয়ে দিল বটে, কিন্তু এর কয়েক দিন পরেই যখন পিসিমা অর্থাৎ যোগেনবাবুর বিধবা ভগিনী বললেন যে, গতরাত্রে হঠাৎ তাঁর ঘুম ভেঙে গেলে, তিনি খোলা জানালা দিয়ে, বড়ো বউকে ওদিকের বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছেন, তখন সকলেরই মনে আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তার একটা ঘন ছায়া চেপে বসল। তখন ব্যাপারটাকে কেউ আর উড়িয়ে দিতে বা অবিশ্বাস করতে পারলেন না।
তারপর থেকেই এইরকম ঘটনা খুব ঘন ঘন ঘটতে লাগলো। বাড়ির অনেকেই ‘বড়োমা’র যেখানে-সেখানে দেখা পেতে লাগলো। কখনো ছাদের আলসেতে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন, কখনো রেলিং বা রেলিং-এর লোহার-খুঁটি ধরে দাঁড়িয়ে আছেন, কখনো-বা যোগেনবাবুর শোবার ঘরের একটি কোণায়, লালপাড় শাড়ির ঘোমটাটা টেনে দিয়ে বসে আছেন। ক্রমাগত দিনের-পর-দিন এইরকম ব্যাপার ঘটতে থাকায়, সকলের প্রাথমিক আতঙ্কটা অনেক পরিমাণে কেটে গেল বটে, কিন্তু একটা অশুভ আশঙ্কায় সকলেই উদ্বিগ্ন ও ব্যাকুল হয়ে পড়লেন।
হিতৈষী বন্ধুবান্ধবের দল নানারকম পরামর্শ দিলেন। তাদের মধ্যে অধিকাংশই বললেন— ‘খুব শিগগির গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদানের ব্যবস্থাটা করে আসুন।’ সুতরাং তাই করা স্থির হল এবং তারই জোগাড়যন্তর হতে থাকল।
কিন্তু কয়েক দিন পরে, কাদম্বিনী দেবীর বড়ো ছেলে সুরেশ রাত প্রায় ১১ টার সময় যখন বার বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে দোতালায় উঠে, ওদিককার বারান্দা পার হয়ে এদিককার বারান্দার দিকে আসছিল, তখন স্পষ্ট দেখলে যে, বারান্দার একপাশে তার বড়ো মামিমা দাঁড়িয়ে আছেন এবং তাঁকে সম্বোধন করে বলছেন— ‘সুরেশ, ওসব তোরা কী মতলব কচ্ছিস? কিছু করিসনি, বাবা; ওতে কোনো ফল হবে না।’ –কথা কয়টা বলবার পর আর তাঁকে দেখতে পাওয়া গেল না।
অতঃপর গয়ায় পিণ্ডদানও হল এবং আরও অনেক কিছুই হল, ফল কিন্তু কিছুই হল না। এদিকে যোগেনবাবুর শরীর দিন দিনই শুকিয়ে যেতে লাগলো। অথচ তাঁর কোনো নির্দিষ্ট রোগের কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা গেল না।
তখন আত্মীয়স্বজন সকলের পরামর্শে স্থির হল যে, এ অবস্থায় এস্থান ছেড়ে কলকাতায় গিয়ে বাস করাই কর্তব্য। সুতরাং মাসখানেকের মধ্যেই তাঁরা সকলে কলকাতা চলে এলেন।
কলকাতায় এসেও অবস্থার কোনো পরিবর্তন হল না। পশ্চিমের বাড়ির মতো এখানেও ‘বড়োমা’কে সকলে দেখতে পেতে থাকল। এদিকে যোগেনবাবুর শরীরও দিন দিন বেশি বেশি শীর্ণ হয়ে আসতে লাগলো। কলকাতায় তখনকার বড়ো বড়ো ডাক্তারদের দেখানো হল, কিন্তু তাঁর শরীর দিনের-পর-দিন ভাঙনের দিকেই যেতে লাগলো। কোনো রোগের লক্ষণই তাঁর দেহে পাওয়া গেল না; শুধুমাত্র দুর্বলতা। এদিকে ‘বড়োমা’র ব্যাপারেও অনেক কিছু করা হল; অনেক নামকরা ‘রোজা’কে আনানো হল। তারা অনেক কিছু ঝাড়ফুঁক, অনেক কিছু কাণ্ডকারখানা করলে, কিন্তু ফল— ‘যথা পূর্ব তথা পরম্’।
অবশেষে যোগেনবাবু একেবারে শয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। তাঁর বিকালের দিকে প্রত্যহই একটু করে জ্বরও হতে লাগলো। এই জ্বর হবার সূত্রটা পেয়ে, ডাক্তাররা অকূলে একটু যেন কূল পেলেন। তাঁরা নতুন উদ্যমে চিকিৎসা চালাতে লাগলেন। কিন্তু কিছুতেই যোগেনবাবুকে ভালোর দিকে আনা গেল না। তাঁর অবস্থা ক্রমেই সঙ্গিন হয়ে আসতে লাগলো।
এই সময়টায় আমি আমার ঠাকুরমার সঙ্গে এদের বাড়িতে এসে দিন পনেরো থাকি। পূর্বেই বলেছি, এঁরা আমাদের আত্মীয় হতেন। এঁরা পশ্চিমে থাকায় এঁদের সঙ্গে সে আত্মীয়তায় কতকটা ভাটা পড়েছিল, কিন্তু কলকাতায় ফিরে এলে আবার ঘনিষ্ঠতা ও যাতায়াত বৃদ্ধি পায়। যোগেনবাবুর অসুখ বাড়াবাড়ির দিকে খবর পেয়ে, ঠাকুমা তাঁকে দেখতে গেলেন। আমার তখন বালক বয়স। বোধ হয় ১২ কী ১৩ বছর মাত্র।
ঠাকুরমা যোগেনবাবুর ঘরে গিয়ে বলতেই, তিনি ঠাকুরমাকে বললেন- ‘পিসিমা, এরা আমাকে বাঁচাবার জন্যে অনর্থক চেষ্টা আর অর্থব্যয় করছে; আমাকে যেতেই হবে।
পূর্বের মতোই সকলে ‘বড়োমা’কে দেখতে পায়। এ জিনিসটা এখন সকলের গা- সওয়া হয়ে গিয়েছে, সেজন্যে প্রথম দিককার মতো কেউ আর ভয় খায় না। বিশেষত এই সময়টায়, ব্যাপারটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। অবশ্য এ-ব্যাপারের জন্যে কারোর মনেই শান্তি ছিল না; অথচ শান্তি পাবার আশায় প্রত্যেক পথে অগ্রসর হয়ে, শেষ পর্যন্ত পথ হারাতে হয়েছে। শুধু একজনের একটি প্রস্তাব মতো কাজ করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তিনি বলেছিলেন, ভারতের বাইরে, কোনো সুদূর দেশে যোগেনবাবুকে পাঠিয়ে দেওয়া। বাড়ির সকলেরও ইচ্ছা হয়েছিল, কয়েকটা মাস ইংলন্ডে ওঁকে রাখবার জন্য। কিন্তু এ ব্যবস্থা প্রথম দিকে হলে হয়তো হতে পারত, এখন তাঁর শরীরের যেরূপ অবস্থা, তাতে— ইচ্ছা হলেও এ কাজ সম্ভবপর নয়। এখন তাঁকে জাহাজে তুললে, হয়তো জাহাজের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটবে।
ঠাকুমার সঙ্গে যে-কটা দিন ও-বাড়িতে ছিলাম, তার মধ্যে আমি দু-দিন ‘বড়োমা’কে দেখতে পেয়েছিলুম; কিন্তু বিশেষ কিছু ভয় পাইনি। তার কারণ, ভূত-প্রেতের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গাদি ও তাদের ‘নাকি সুরে’ কথা কওয়া প্রভৃতি সম্বন্ধে, তোমাদের ছোটো ছোটো মনে যেরকম একটা কাল্পনিক বিকট ছবি অঙ্কিত ছিল, সেসবের সঙ্গে এর কিছুই মিল নেই; এ যেন বাড়ির অন্য দশজনেরই মতো একজন মানুষের মতোই আকার, মানুষের মতোই কথা, মানুষের মতোই কণ্ঠস্বর। বাড়ির গৃহিণীর মতোই তাঁর সব বিষয়ে গৃহিণীপনা। টকটকে লাল পেড়ে শাড়ি পরা, হাতে বালা, নোয়া, মাথায় সিঁদুর –এ যেন জীবন্ত ‘বড়োমা’ তাঁর বহুদিনের হাতে গড়া বৃহৎ সংসারটির সকল দিকের সমস্ত খুঁটিনাটি ব্যাপারই সুগভীর মমতা ও প্রীতির ভরে পরিচালনা করছেন। এই সূত্রেই তিনি এক রাত্রে বিমলা নামে অল্পবয়স্কা এক দাসীকে বলেন, ‘দেখ বিমলি, ন-বউমার ছোটো ছেলেটা দিন দিন পাকিয়ে যাচ্চে। ওর কৃমি হয়েছে। ঠাকুরপো যেন ওর ওষুধের ব্যবস্থা করে দেয়, বুঝলি?’ একদিন দ্বিজেনবাবুর স্ত্রীকে বললেন, ‘ও রে ছোটো, নিমুর কোলের মেয়েটা রোজই মাঝ রাতে কেঁদে কেঁদে কোকিয়ে যাবার মতো হয়। ওর মা কি মরে ঘুমোয়? ওই সময় উঠে বসে মেয়েটার গলাটা একটু ভিজিয়ে দিতে পারে না? কী ঘুম রে বাবা! বলিস তো ছোটো, ওর মাকে।’ —এইরকম জীবিতকালের মতো, মরে গিয়েও সব দিকে নজর। তার মধ্যে বেশি নজর- স্বামীর দিকে। ন-বউমার ছোটো ছেলে ওষুধের ব্যবস্থা করছেন। নিমুর কোলের মেয়ের প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি, কিন্তু স্বামী যে দিনের- পর-দিন মৃত্যুর পথে এগিয়ে যাচ্চে, সে বিষয়ে কোনোই তাঁর খেয়াল নেই, দুঃখ নেই, অস্থিরতা নেই, শুধু আছে একটা গভীর আকর্ষণ। অথচ তখন যোগেনবাবুর এমন অবস্থা যে, কবে কোন দিন তাঁর হয়তো কী ঘটে!
কয়েক দিন পরে ঘটলও তাই। হঠাৎ একদিন মধ্যরাত্রে যোগেনবাবু চিরদিনের মতো চক্ষু বুজলেন।
বিস্ময়ের কথা এই যে, সেদিন থেকে আর কোনোদিনই ও-বাড়িতে ‘বড়োমা’কে দেখা যায়নি।
[মৌচাক, শারদীয়া ১৩৬৫ (১৯৫৮)]
