Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    প্রথম প্রতিশ্রুতি – আশাপূর্ণা দেবী

    আশাপূর্ণা দেবী এক পাতা গল্প774 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৩৮. হারিয়ে যাওয়া সত্য

    হারিয়ে যাওয়া সত্য যখন ফিরল, তখন সন্ধ্যে হয়-হয়। একটা ভাড়াটে ঘোড়ার গাড়ি থেকে নামল সত্য, সঙ্গে একটি গিন্নীবান্নি বিধবা।

    তুমি একটু দাঁড়াও বাছা, গাড়োয়ানকে আগে বিদেয় করি, বলে সত্য ভিতরে ঢুকে আসে। সুহাস তখন এ-জানালা ও-জানালা করে ছটফটিয়ে বেড়াচ্ছে, নবকুমার নিতাইয়ের বাড়ি থেকে ফেরে নি।

    সত্যকে দেখেই সুহাস প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে, পিসীমা! সে স্বরে অভিযোগ।

    সত্য ব্যস্তকণ্ঠে বলে, হবে, জবাবদিহি হবে, এখন গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে আমার ওই হাতবাক্স থেকে চার আনা পয়সা বার করে দে দিকি, গাড়ির কাপড়ে আর বাক্সটা ছোঁব না।

    আঁচলের গিট খুলে চাবিটা ফেলে দেয় সত্য সুহাসের সামনে।

    সুহাস স্বল্পভাষিণী, নেহাৎ অস্থির হয়েই চেঁচিয়ে উঠেছিল। আর কথা বলে না, নিঃশব্দে আদেশ পালন করে। শুধু অলক্ষ্যে বার বার দেখে নেয় সত্যকে। রহস্যময়ী সত্যকে।

    গাড়ির ভাড়া দিয়ে গাড়োয়ানকে বিয়ে করে সত্য সেই মেয়েমানুষটিকে বলে, নাও বসো, হাতেমুখে একটু জল দাও, একটু মিষ্টিমুখ কর, তবে যেও।

    মেয়েমানুষটি হৃষ্টচিত্তে বলে, আবার মিষ্টি কেন মা? তোমার ঘরদোর দেখলাম, চিনে গেলাম, এই ঢের। তোমার মিষ্টি কথাই মিষ্টি মা, শুনলে শরীর শীতল হয়।

    তা হোক, তুমি আমার জন্যে এতটি করলে, একটু মিষ্টিজল না খাইয়ে ছাড়ব না। বলে সত্য ফট করে গায়ের সিল্কের চাঁদরটা রেখে কলের ঘরে ঢুকে কাপড়টা সেমিজটা কেচে ফেলে ভিজে কাপড়েই ভাঁড়ার থেকে দুটো নারকেল নাড়ু বার করে এক ঘটি জল দিয়ে খেতে দেয়।

    মেয়েমানুষটি বিদায় নিলে সত্য শুকনো কাপড় পরে ঘরে এসে বসে সুহাসকে উদ্দেশ্য করে বলে, তার পর? আমার নামে হুলিয়া বেরিয়ে গেছে বোধ হয়?

    সুহাস অন্যদিকে ঘাড় ফিরিয়ে বলে, হুলিয়া আবার কি? পিসেমশাই অস্থির হয়ে বেরিয়ে গেলেন, এই পর্যন্ত।

    এই একদিনেই তোর পিসের কাছে আমার সব কীর্তি ফাঁস হয়ে গেল দেখছি– সত্য বলে, পাঠশালার খবরটা এযাবৎ চেপেচুপে ছিলাম

    সুহাস বোধ করি আজকের সুযোগে তার মনের সন্দেহটা প্রকাশ করে বসে। মুখ তুলে ঝপ করে বলে ফেলে, তা চাপাচাপিই কি ভাল? এদিকে তো তোমরা নিজেরাই বল স্বামী মেয়েমানুষের দেবতা।

    সত্যর মুখে আসছিল বলে, তোর যে দেখি স্বামী না হতেই স্বামীভক্তি! কিন্তু সামলে নেয়। কে জানে মেয়েটার কপালে স্বামী আছে কিনা। নিরুপায় বুদ্ধিহীন মা তো কুমারী মেয়েকে বিধবা পরিচয় দিয়ে তার ভবিষ্যতের পায়ে কুড়ল মেরে রেখে গেছে। এই রূপে ডালি মেয়ে, সভ্য, নম্র, লেখাপড়ায় কত চাড়, এ মেয়েকে যে স্বামী পেত, সে তো ধন্য হত!

    কিন্তু হয়তো দুঃখিনীর ভাগ্য দুঃখেই যাবে। তবু মনে স্থির করে রেখেছে সত্য, শেষ অবধি লড়বে মেয়েটার জন্যে। তাই না ব্রহ্মজ্ঞানীদের সম্পর্কে ঔৎসুক্য সত্যর, তাদের সঙ্গে চেনাজানার বাসনা।

    ব্রহ্মজ্ঞানীরা নাকি খুব উদার।

    বালবিধবা মেয়ের বিয়েতে নিন্দেও নেই তাদের। সত্য প্রথমে ভেবেছিল সত্য ঘটনা প্রকাশ করে দেবে সুহাসের কাছে।

    কুমারী পরিচয়েই স্কুলে ভর্তি করে দেবে তাকে, কিন্তু সাতপাঁচ ভেবে সে ইচ্ছে স্থগিত রাখতে হয়েছে। প্রথম তো এত বড় আইবুড়ো মেয়ের কৈফিয়ত অনেক, জাত যাওয়ার প্রশ্নও আছে। তা সে হয়তো সত্য তার ন্যায়ভাষণের জোরে একরকম করে মানিয়ে নিত, গরীবের মেয়ের বিয়ে দিয়ে দিতে পারে না সমাজ, জাতটা নিয়ে নিতে পারে? এ তর্ক তুলত। কিন্তু বাধা অন্যদিকেও।

    এত বড় নিষ্ঠুর সত্য প্রকাশ হয়ে পড়লে মাকে কী ভাববে সুহাস? কোন দিনই কি প্রাণ থেকে ক্ষমা করতে পারবে মাকে? যখন শুনবে কেবলমাত্র নিজের সুবিধার্থে মা তার কপালে দুর্ভাগ্যের ছাপ দেগে রেখে দিয়েছে, আজকাল খাওয়া পরা থেকে বঞ্চিত করে রেখেছে, মা কি নিতান্ত ছোট হয়ে যাবে না তার চোখে? স্বার্থপরতার নির্মমতায়? সে যে মড়ার ওপর খাড়ার ঘা!

    আর যদি মাকে সে দেবীর আসনে বেদীতে বসিয়ে রেখে থাকে, বিশ্বাসের ভালবাসার ভক্তির নড়চড় না হয়, তা হলে হয়তো বা সত্যকেই সন্দেহ করে বসবে। ভাববে সত্যই এখন তার বিয়ের সুবিধে করতে

    এই সব সাতপাঁচ ভেবেছে সত্য সুহাসের সম্পর্কে। ভেবেছে, থাক, আর একটু জ্ঞানবুদ্ধি বাড়ুক। সত্যিমিথ্যে বোঝবার চোখ হোক। তখন দেখা যাবে।

    তাই এখন ওদিক দিয়ে না গিয়ে সত্য দোষ মেনে নেওয়ার ভঙ্গীতে বলে, স্বামী দেবতা এ কথা শুধু আমরা কেন, ত্রিজগতের সবাই বলে। কিন্তু দেবতার অসন্তোষ ঘটানোও তো দোষের রে। আমি পাঠশালা খুলে গুরুমশাইগিরি করছি শুনলে তোর পিসে অসন্তোষের পরাকাষ্ঠা করবে বৈ তো না? অনর্থক রাগিয়ে দিয়ে লাভ? তাকেই মনে যন্তন্না দেওয়া। আর না বুঝেসুঝে দুম করে যদি বারণ করে একটা দিব্যিদিলেশা দিয়ে বসে, তাতেও তো বিপদ।

    সুহাস একটু চুপ করে থেকে আস্তে আস্তে বলে, তা পিসেমশাই যাতে রাগ করতে পারেন, সে কাজ তোমার না করাই উচিত।

    সত্য সুহাসের এই সদ্বিবেচনার কথায় খুশি হয়, তবে সত্য মনে মনে একটু হাসে। ভাবে তাই যদি উচিত হত, তুই কোথায় থাকতিস বাপু? এত কথা ভাববার মত বুদ্ধিই বা পেতিস কোথা থেকে? কম লড়ালড়ি করতে হয়েছে ওর সঙ্গে তোর জন্যে? তোকে কাছে রাখা নিয়ে তো বটেই, তাছাড়া ইস্কুলে ভর্তি করা নিয়ে?

    সাহেবী ইস্কুলে পড়ালে মেয়েকে, সে মেয়ের হাতের জল খাওয়া চলবে না, এ বলেও নিবৃত্ত করতে চেয়েছে নবকুমার। তবু সত্য ব্যাপারটা ঘটিয়ে তুলেছে।

    মনে পড়ে গেল সত্যর সেই কথাটা এই উচিত অনুচিতের’ প্রসঙ্গে। মুখেও আসছিল, সামলে নিল, মৃদু হেসে বলল, তুই তো দেখছি অনেক শিখে ফেলেছিস! হ্যাঁ, বলেছিস ঠিক, উচিত নয়। কিন্তু দেখ, সব নিয়ম সব ক্ষেত্রে খাটে না। কত স্বামী হরিনামে অসন্তুষ্ট হয়, হরিনাম শুনলে জ্বলে ওঠে, তা বলে তার স্ত্রী করবে না হরিনাম? তবে আবার তার কানের কাছে খোল পিটিয়ে নাম সংকীর্তন করাও ভাল নয়। আসল কথা, যে কাজটা করতে যাচ্ছ, আগে দেখবে সে কাজ ভাল কি মন্দ, সেই বিবেচনাটুকু রাখতে হবে, তার পর যতটা পারা যায় কাউকে না চটিয়ে সে কাজকে সামলে নিয়ে উদ্ধার করা। যারা পছন্দ করে না তাদেরকে অগ্রাহ্য করাও হল না, কাজটাও হল।

    সুহাসকে কি একেবারে বড়র দলে ফেলেছে সত্য? তাই তার কাছে এত কৈফিয়ত? অথবা সুহাসকে উপলক্ষ্য করে সত্য নিজের মনকেই কৈফিয়ত দিচ্ছে? স্বামীর সঙ্গে লুকোচুরি করতে, ভিতরে ভিতরে যে সূক্ষ্ম বিবেকের পীড়ন অনুভব করে সে, এ কৈফিয়ত তার জন্যে?

    সুহাস অবশ্য নিজেকে বড়ই ভাবে, পুরো একটা মানুষই ভাবে, তাই সত্যর কৈফিয়ত শুনেও আবার মতামত ব্যক্ত করতে সাহসী হয়। আর সত্যর কাছে আর যাই হোক সাহসী হতে বাধা নেই। তাই আস্তে বলে, আমার তো মনে হয় হরিনামটা ভাল কাজ, সেটা বুঝিয়ে দিয়ে

    সত্য হেসে ওঠে।

    বলে, কম বয়সে আমিও তোর মত করেই ভাবতাম সুহাস, সব কিছু নিয়ে লড়াই করতাম, তব্ধ করে অপরকে বুঝিয়ে ছাড়বার চেষ্টা করতাম, কিন্তু এখন বয়সে বুদ্ধি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এইটা বুঝেছি অবিরত লড়াইয়ে কেবল শক্তিক্ষয়। কাজের জন্যে যে শক্তি থাকা দরকার, সে শক্তির অনেকটা যদি তর্কেই খরচ করে ফেলি, তবে কাজটায় যে ঝিমিয়ে যাব। তাই যাতে সাপও মরে লাঠি ভাঙে, সেই পথই ধরি। তবে ওই যা বললাম, ক্ষেত্রবিশেষে। আর সেই বিশেষ’টা চেনবার চোখ চাই, বুঝলি? মেয়েমানুষ কি মানুষ নয় বলে অনেক তর্ক করেছি, কিন্তু দেখছি ক্রমশ সে তত্ত্ব সমুদ্রে বালির বাঁধ। এই আমাদের পোড়া দেশে মেয়েমানুষ হওয়ার অনেক জ্বালা, বুঝলি? একটা সৎ কাজ করতে যাও, তাও পায়ে পায়ে বাধা। মাস্টার মশাই বলেন, অনুদানের চেয়েও বড় পুণ্য বিদ্যাদানে। মানুষে আর জন্তু-জানোয়ারে যে তফাৎ সে তো এই বিদ্যে থেকেই। নইলে প্রাণী মাত্তরেই তো খায়, ঘুমোয়, ছানা পাড়ে। মানুষ থেকে কীটপতঙ্গ পর্যন্ত। তাই সে বিদ্যে বস্তুটা যার মধ্যে এতটুকুই আছে, তার উচিত আর একজনকে সে বিদ্যের ভাগ দেওয়া। এ জিনিস তো দানে কমে না, বরং বাড়ে। কিন্তু এসব কথা কজন বুঝতে চায় ব! চায় না।…. আগে ভাবতাম, যা ঠিক, তা সবাইকে বুঝিয়ে ছাড়ব। বুঝিয়ে সোজা করব, এখন বুঝতে শিখেছি সে চেষ্টা হচ্ছে হাত দিয়ে হাতী মাপা, আকাশের তারা গোনা। তার চেয়ে নিজের বিবেচনায় যা ঠিক বলে বুঝব, করে যাব একমনে। একদিন না একদিন বুঝবে লোকে ঠিক কি ভুল। যারা বিরক্ত হয়েছে, অপছন্দ করেছে, তারাই মেনে নেবে।

    অনেকগুলো কথা একসঙ্গে বলে সত্য একটু চুপ করে জিরিয়ে নেয়। সুহাস সেই অবসরে চট করে উঠে গিয়ে এক ঘটি মিশ্রীর পানা এনে সত্যর মুখের সামনে ধরে।

    সত্যর ভেতরটা বোধ করি এমনি একটা শীতল পানীয় চাইছিল। কোন্ কালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। বিনাবাক্যে ঢকঢক করে মিশ্রীর জলটা খেয়ে নিয়ে মৃদু হেসে বলে, মনের কথা টেনে নিয়ে তেষ্টার জল দিতে শিখেছিস, আর তোর শেখবার কিছু বাকী নেই সুহাস। জগৎ-সংসারে শুধু এইটুকু শিক্ষার সম্বল থাকলেই যথেষ্ট।

    সুহাস লজ্জায় মাথা হেঁট করে।

    সত্য তাকিয়ে দেখে।

    রূপে গুণে যেন আলো করা মেয়েটা! কিন্তু, কিন্তু গুণ কি ছিল এমন?

    সত্যর মনে পড়ে প্রথম দিনকার কথা। কী উদ্ধত অস্ত্র, ভেতর-চাপা, মুখ-গোঁজা গোছের স্বভাব ছিল সুহাসের। প্রতিনিয়ত তাকে নিয়ে অসুবিধেয় পড়তে হয়েছে সত্যকে। নেহাৎ যে সত্য নিজেকে সামলে থেকেছে, সে শুধু মেয়েটা সদ্য-মাতৃহারা বলে আর তার ওপর মায়ের মৃত্যুটা বড় মর্মান্তিক বড় আকস্মিক বলে।

    ক্রমশ সুহাসের প্রকৃতিতে এসেছে নম্রতা, সভ্যতা, কোমলতা। দত্তবাড়ির দরুন বহুবিধ বদভ্যাস, যা সত্যকে পীড়িত করত, বিরক্ত করত, সেগুলো অন্তর্হিত হল আস্তে আস্তে, একটা মেয়ের মত মেয়ে হয়ে উঠল সুহাস।

    তবে স্বভাবটা একটু গম্ভীর, চাপা।

    হৃদয়-বৃত্তির বহিঃপ্রকাশটা কম। আনন্দ-বেদনা, সুখ-দুঃখ, খুশী-অখুশী বোঝা যায় না ফট করে, বোঝা যায় না শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা স্নেহ। তাই আজ হৃদয়বৃত্তির এই প্রকাশটুকুতে বড় বেশী পরিতৃপ্ত হয় সত্য।

    সুহাসের ওই লজ্জানত মুখের দিকে তাকিয়ে বলে, তা আমার এত দেরি কেন, তা তো জিজ্ঞেস করলি না কই?

    সুহাস মৃদু হেসে বলে, জিজ্ঞেস করতে যাব কেন? বলবার হলে তুমি নিজেই বলবে।

    বলবার হলে? শোন কথা! সত্য বলে, বলবার নয়, এমন কাজ তোর পিসি করে বেড়ায় বুঝি?

    বাঃ, তাই বলেছি নাকি? বলেছি

    তা সুহাসের আর কথার শেষটা বলা হল না, উঠোনের দরজা ঠেলে দুই মূর্তিমান ঢুকলেন। নবকুমার আর নিতাই।

    দুজনের মুখ থেকেই একটা করে সম্বোধন বেরোল।

    বড়বৌ।

    বৌঠান?

    সত্য মাথার কাপড়টা একটু টেনে উঠে দাঁড়ায়।

    নবকুমার বসে পড়ে।

    বসে পড়ে বলে, কী ব্যাপার তোমার বড়বৌ? ভরদুপুরে রোজ তুমি যাও কোথায়? আজই বা এতক্ষণ ছিলে কোথায়? তোমার এসব রীতনীত তত ভালো ঠেকছে না আমার?

    সত্য এক মুহূর্ত নবকুমারের সেই বিপর্যস্ত মূর্তির দিকে তাকিয়ে, একটু মুখ টিপে হেসে বলে, তাই বুঝি? আমার রীতনীত আর ভাল ঠেকছে না তোমার?

    হাসি!

    সত্য হাসছে!

    তার মানে, হয় তার মনে কোনও অপরাধ-বোধ নেই, নয় সে পাকা ঘুঘু। নিতাইয়ের জ্ঞান থাকে না যে সে হাঁ করে সেই চাপা হাসিতে উজ্জ্বল অর্ধাবগুণ্ঠিত মুখের দিকে তাকিয়ে আছে এবং রীতিনীতির দিক দিয়ে সেটাও খুব শোভন নয়।

    নবকুমার কিন্তু এখন বিহ্বল নয়। এই এতক্ষণার উদ্বেগ অশান্তি দুশ্চিন্তা সব কিছুর যন্ত্রণা তার রাগের ঝুঁজ হয়ে ফুটে ওঠে। সত্যর হাসিটা তাতে ইন্ধন যোগায়। তাই এবার তেড়ে দাঁড়িয়ে উঠে বলে; না, ঠেকছে না। আমার মনে হচ্ছে তোমার মতিবুদ্ধি মন্দপথে যাচ্ছে।

    শুধু নবকুমার থাকলে সত্য দপ করে উঠত কিনা কে জানে, কিন্তু এখন সঙ্গে নিতাই। ওর সামনে রেগে উঠলে মান থাকে না। তাই সত্য তেমনি ভাবেই বলে, তা তোমার যখন মনে হচ্ছে, তখনই অবিশ্যিই তার একটা ন্যায্য কারণ আছে। বিজ্ঞ বিচক্ষণ পুরুষ তুমি। তা হলে এখন এই দুষ্টু পরিবারকে নিয়ে কি করবে বল? অগ্নিপরীক্ষা? না কেটে গঙ্গায় বিসর্জন?

    এ কী দুঃসহ স্পর্ধা! নবকুমারের মুখে কথা যোগায় না।

    নিতাই এতক্ষণে কথা বলে।

    বলে, কিন্তু বৌঠান, আপনি যে আমাদের ধাঁধায় ফেলে মজা দেখছেন, তারও তো একটা বিহিত চাই। এই আজ বিকেল থেকে ও হতভাগার কী গেরো! আর আমিও আজ এই সমগ্ৰ দিনটা না খাওয়া, না দাওয়া, তার ওপর বৌয়ের কাছে মুখ হেঁট_

    ওমা! ধাঁধায় যে তুমিই আমাকে ফেলছ ঠাকুরপো! তোমার খাওয়াদাওয়াতেই বা আমি হন্তারক হলাম কি করে? আর বৌয়ের কাছে মুখ হেঁট হবার দায়ীকই বা হলাম কেন? কিছু তো বুঝতে পারছি না! মুখ তো দেখছি কড়ি হয়ে গেছে!

    বেচারা নিতাই, উপোস সে একবারে সহ্য করতে পারে না, সেই উপোস আজ সারাদিন, তার উপর এত রকম কথাবার্তা, সর্বোপরি এই স্নেহবাণী, তার চোখের স্নায়ু দুর্বল হয়ে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসে। আর সেই বিশ্বাসঘাতকতার লজ্জাটা ঢাকতে সে তার বৌয়ের কাছে হেট হয়ে যাওয়া মাথাটা আর একবার হেঁট করে।

    নাঃ, এই দুটি বুড়ো খোকা হয়েছেন সমান, সত্য এবার ব্যঙ্গের রূপ ছেড়ে সদয় রূপে আসে, এই অবুঝপনার জন্যেই আমাকেও বুড়ো বয়সে ছলচাতুরী ধরে মরতে হচ্ছে … কিন্তু তার আগে ঠাকুরপো, কিছু খাও দিকি, মনে হচ্ছে বৌয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে হরিমটর চালিয়েছ আজ।… সুহাস, আগে তোর ছোট পিসেমশাইকে একটু কিছু খেতে দে তো

    না না, আমার কিছু লাগবে না, বলে প্রতিবাদ করে ওঠে নিতাই।

    সত্য মৃদু হেসে বলে, লাগবে কি না লাগবে সে কি তুমি বুঝবে?

    সুহাস বিনা বাক্যে দুখানি ঝকঝকে কাঁসার রেকাবে দুই পিসের জন্যেই খাবার এনে ধরে দেয়। বাড়িতে মজুত খাবার যা হয়, দুটি নারকেলনাড়ু খানচারেক জিবেগজা আর একবাটি মুড়ি।

    হঠাৎ নিতাইয়ের ভারী দুঃখ হয়। তার ঘরেও তো এমন কিছু অপ্রতুল নেই, অথচ এমন পরিপাটিত্ব কোন সময় চোখে পড়ে না। এই যে নবকুমার মাঝে মাঝে যায়, কই নিতাইয়ের বৌ তো কোনদিন এক গেলাস জল এগিয়ে দেয় না? খিদে দুর্দমনীয় হলেও, হাত বাড়িয়ে নিতে ইচ্ছে হচ্ছে না যেন!

    নবকুমারও ভারী মুখে বলে, আমার খাবার দরকার নেই।

    সত্য গম্ভীরভাবে বলে, তোমাদের দরকারে তো খেতে বলা হচ্ছে না, আমার দরকারেই বলা হচ্ছে। খাও, আমি বসে বসে আমার অপরাধের জবানবন্দী দিচ্ছি।

    অগত্যাই দুজনকে হাত বাড়াতে হয়।

    সত্য বলে, রোজ কোথায় যাই, সে বিত্তান্ত সুহাস জানে, ছেলেরা জানে, জান না শুধু তুমি। জানাব তোমাকে, তবে তার আগে কথা দিতে হবে, যে কাজ করছি নিষেধ করবে না।

    বাঃ! এ যে সাদা কাগজে সই-, নবকুমার বলে, কাজটা ভাল কি মন্দ না জেনে–

    সত্য এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শান্ত স্থির গলায় বলে, তাকাও আমার দিকে। দু বন্ধু আছ, দুজনেই তাকাও, পষ্ট তাকিয়ে বল, আমি একটা মন্দ কাজ করছি, এ সন্দেহ সত্যি আছে তোমাদের মনে? বল তবে আমি তোমাদের কথার উত্তর দেব।

    বলা বাহুল্য দু বন্ধুর কেউই চোখ তুলে তাকায় না, বরং দুজোড়া চোখ একেবারে নতমুখী হয়ে যায়।

    সত্য একটু অপেক্ষা করে বলে, বুঝলাম। শোন, রোজ দুপুরে আমি পাঠশালে পড়াতে যাই।

    নবকুমার একবার চোখ তোলে।

    চমকে! শিউরে!

    নিতাইও প্রায় তাই। বলে, পড়াতে!

    হ্যাঁ, পড়াতে। সর্বমঙ্গলাতলায় রোজ দুপুরে মেয়েমহলের একটা আড্ডা হয়। গিন্নী, মাঝবয়সী। বৌ ঝি আছে দু-একজন। সাধ করে কেউ বা মায়ের ফুল বিল্বপত্তর বেছে রাখেন, কেউ বা মালা গাঁথেন, একজন আছে মুখে মুখে পুরাণ-কাহিনী রামায়ণ-মহাভারতের কাহিনী বলেন, পাঁচজনে শোনে। আবার গালগল্পও খুব চলে। এটা দেখে মাস্টার মশাইয়ের মাথায় এসে গেল–

    আবার মাস্টার মশাই!

    নবকুমারের মুখটা বিকৃত হয়ে ওঠে। সত্য সেটা দেখেও দেখল না, বলতে লাগল, মাথায় এসে গেল এই মেয়েমানুষদের নিয়ে একটা পাঠশালা খুললে কেমন হয়, বৃথা গালগল্পে সময় নষ্ট না করে খুলে দিলেন ‘সর্বমঙ্গলা বিদ্যাপীঠ’! আমায় ধরলেন পড়াতে। বললেন, গুরুকে এবার গুরুদক্ষিণা দাও, পড়াও এদের। দেখলাম কাজটা পুণ্যের, বললাম, বেশ।

    বললাম বেশ! নবকুমার চঞ্চল হয়ে বলে ওঠে, আমাকে একবার শুধোবারও দরকার নেই?

    আহা, সে অপরাধ তো একশোবার স্বীকার করছি, কিন্তু তুমি যদি দুম করে দিব্যি দিয়ে বসতে? সে ঠেলে তো আর করা হত না। তাই মা সর্বমঙ্গলার নাম করে লেগে গেলাম।… বই খাতা শেলেট সব মাস্টার মশাইয়ের খরচ।

    তোমার এত বিদ্যে যে মাস্টারি করতে এগোও

    নবকুমারের এই ব্যঙ্গোক্তিতে সত্য মৃদু হেসে বলে, মাস্টারি করা তো সত্য বামনীর জন্মগত পেশা গো, আজ তো মাস্টারি করে এলাম। স্বভাবের দোষেই এগিয়ে পড়লাম। আর বিদ্যের? সে ওই পড়াতে পড়াতেই এগোবে। যতটুকু পারি ততটুকুই করে যাব।

    নিতাই আস্তে আস্তে বলে, বয়সওলা মেয়েরা পড়ায় মন দিচ্ছে?

    খুব খুব! দু-একজন বাদে শিখেও ফেলেছে চটপট! দেখলে বুঝতে, নিজেরা রামায়ণ মহাভারত পুরাণকাহিনী পড়বার জন্যে কী আগ্রহ! দেখে মনে হয় জীবন সার্থক হচ্ছে আমার।

    নবকুমারের মুখ তথাপি হালকা হয় না। বলে, মাস্টার মশাই যে ধর্মের মাথায় ঝাড়ু মেরে বেম্ম হয়েছে, সেকথা নিশ্চয় জানে না ওরা?

    জানবে না কেন? তবে তোমার মতন সবাই অত গোঁড়া নয়। মাস্টার মশাইয়ের হাতে ভাত তো খেতে যাচ্ছে না কেউ। আর ধর্মের মাথায় ঝাড়ু মারাই বা বলছ কেন? ব্রাহ্মধর্মও হিন্দুধর্ম। কান দিয়ে শোন না তো কিছু? এই যে আজ অত বড় ব্রাহ্মসমাজের চাই কেশব সেনের বাড়ি পরমহংস এসেছিলেন–

    কী কী! কোথায় কে এসেছিলেন?

    নবকুমার কাছা খুলে দাঁড়িয়ে ওঠে।

    পরমহংসদেব, বলি তার নামটাও কি শোন নি কখনো?

    শুনব না কেন? বেজার মুখে বলে নবকুমার, দক্ষিণেশ্বরে দেখেও তো এসেছি সেবার আপিসের বন্ধুদের সঙ্গে। তা তিনি।

    হ্যাঁ, তিনি। কেশব সেনের বাড়িতে এসেছিলেন। সেই দেখতেই তো আজ আমার এত দেরি, আর তোমাদের কাছে সব ফাস!

    নবকুমার স্তম্ভিত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে, তোমাকে আর কিছু বলবার নেই আমার বড়বৌ, তুমি আমার নাগালের উর্ধ্বে চলে যাচ্ছ। কিন্তু কেশববাবুর বাড়ি গেলে কি করে?

    কি করে আবার? একা নাকি? আরও কত মেয়েমানুষ গেল। দল করে শেয়ারের ঘোড়ার গাড়ি ভাড়া করে যেখানে দল, সেখানেই বল। কত চমৎকার গান হল, প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল।

    বুক কাপল না?

    বুক কাঁপবে কেন? সত্য অবাক দৃষ্টিতে বলে, এই যে মেয়েমানুষেরা তীর্থে যায়, যোগে গঙ্গাস্থান করতে যায়, দেবস্থানে মেলা দেখতে যায়, সাধুসন্নিসী দর্শনে যায়, কই বুক কাঁপার কথা ওঠে না! এসব জায়গায় মাঝে মাঝে যেও গো, তা হলে দিষ্টিটা খুলবে।

    আমরা যাব? হুঁ! নবকুমার বলে, আমরা ক্ষুদ্র প্রাণী, আমাদের অত সাহস কোথা?

    সত্য উঠে পড়ে বলে, নিজেকে চব্বিশ ঘণ্টা ক্ষুদ্র প্রাণী’ ভাবলেই মনটা ক্ষুদ্দুর হয়ে যায়। ক্ষুদ্দুরই বা ভাবতে যাব কেন? সব মানুষের মধ্যেই ভগবান আছেন, এটা মানো তো? সেই ভগবানের জোরেই জোর। সেই ক্ষেত্রে সবাই বড়।

    নিতাই সন্তর্পণে একটা নিঃশ্বাস ফেলে।

    তার বৌকে সে বৌঠানোর কাছে আসতে বলে। সাতজন্ম পার করে এসেও নিতাইয়ের বৌয়ের সাধ্য হবে এসব চিন্তা করতে?… নবকুমার ঠিকই বলেছে, সত্য যেন তাদের নাগালের উর্ধ্বে চলে যাচ্ছে।

    নবকুমার তাই টেনে নামাতে চেষ্টা করে, তা সে যাই হোক, বেম্মবাড়ি থেকে এসে কাপড় চোপড় ছেড়েছ? মাথায় একটু গঙ্গাজল স্পর্শ করেছ?

    সত্য মৃদু হেসে বলে, সেটা করেছি বাড়ির জন্য নয় গাড়ির জন্যে। গাড়ির কাপড়ে কোনকালেই থাকি না। ভেবেচিন্তে বুঝি এই মাথায় আনলে এতক্ষণে?… যাক, ছেলেরা কবে আসবে? ওরা নেই, বাড়ি ফাঁকা ফাঁকা ঠেকছে–

    নবকুমার বেজার মুখে বলে, তোমার আবার ফাঁকা ঠেকা! তোমার মনপ্রাণ তো সব তত্ত্বজ্ঞানে ঠাসা। সেখানে আবার স্বামী-পুত্তুরের জায়গা কোথা? বেশ বুঝছি তোমার বাপের মতই কাষ্ঠ-কঠিন হয়ে যাবে তুমি।

    সত্য শান্ত গলায় বলে, বাবার মতন? বাবার চরণের নখের এক কণা হতে পারলেও ধন্য মনে করব নিজেকে।…কিন্তু আজ আবার এ কথা কেন? নিজে মুখেই তো বলেছিলে, বাবা মানুষ নয়, দেবতা।

    সেকথা এখনও বলছি। কিন্তু দেবতাকে দূরে থেকে পুস্পাঞ্জলি দেওয়াই ভাল, নিয়ে ঘর করায় কোন সুবিধে নেই।

    সত্য হেসে ফেলে বলে, দেখ ঠাকুরপো, তোমার বন্ধুর কত উন্নতি হয়েছে! কত বাক্যি শিখেছেন!

    আর নিতাই এতক্ষণে কিঞ্চিৎ ধাতস্থ হয়ে বলে, না শিখলে তো শাস্তরই মিথ্যে বৌঠান! সগুণ বলে কথা–

    কথার মাঝখানে হঠাৎ সুহাস পাশের ঘর থেকে এসে বলে, কে যেন আসছেন মনে হচ্ছে।

    পাশের ওই ঘরের দুটো জানলাই রাস্তামুখো, সুহাস খুব সম্ভব সেখানেই দাঁড়িয়েছিল।

    এরা সন্ত্রস্ত হয়ে বলে, কে? কে আসছেন?

    চিনি না। বুড়ো মতন, কিন্তু খুব লম্বা,ফর্সা–সোজা—

    লম্বা ফর্সা! সোজা–

    সত্যর বুকটা ছাঁৎ করে ওঠে। আর পরক্ষণেই সেই ছাঁৎ-করা বুকটা হিম করে দিয়ে উঠোনের ওধার থেকে একটি মৃদু গম্ভীর ভারী গলায় প্রশ্ন ধ্বনিত হয়, বাড়িতে কে আছেন?

    বাবা!

    সত্য বিদ্যুৎগতিতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তারও আগে নিতাই বেরিয়ে পড়ে, পিছনে নবকুমার। আর ততক্ষণে সেই মৃদু গম্ভীর ভারী গলায় আর একটি প্রশ্ন উচ্চারিত হয়, এইটাই কি নবকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি?

    বাবা! বাবা গো! তুমি!

    সত্য প্রণামের মাথাটা না তুলেই বলতে থাকে, আমার যে সত্যি বলে বিশ্বাস হচ্ছে না

    তবে স্বপ্নই ভাব। বলে মৃদু হেসে রামকালী দাওয়ায় ওঠেন।

    নবকুমার নিতাই দুজনেই প্রণাম করে। আর মনে মনে ভাবে, অনেক দিন বাঁচবেন ইনি। ঠিক যে মুহূর্তে ওঁর কথা হচ্ছিল, সেই মুহূর্তেই এমন আকস্মিক এসে পড়া—

    .

    আবেগের উচ্ছ্বাস প্রশমিত হতে এবং কুশল বিনিময় হতে কিছুক্ষণ যায়। তারপর আসার কারণ ব্যক্ত করেন রামকালী। তিনি কাশীবাসের সংকল্প করেছেন, তাই শেষ একবার সত্যকে দেখতে এসেছেন।

    কাশীবাস!

    সত্য ভেঙে পড়ে বলে, বাবা! এই সংকল্প করেছ তুমি? তাই এই হতভাগা মেয়েটাকে দেখা দিতে এসেছ? আমি যে কিছু জানি না বাবা, তাহলে সব ফেলে ছুটে চলে যেতাম তোমার কাছে!

    রামকালীর এই আকস্মিক আবির্ভাবে সত্য যেন তার চির-অভ্যস্ত স্থিরতা হারিয়ে ফেলতে বসেছে।

    একে তো অপ্রত্যাশিত আনন্দের আবেগ, তার সঙ্গে অন্তর্নিহিত এক চিন্তা–তাদের এই বাসাবাড়িতে বাবা জলগ্রহণ করবেন কিনা। জলও তো কলের জল। যদি এ জল না খান, না হয় গঙ্গাজলেরই ব্যবস্থা করবে, কিন্তু বাসাবাড়ির দোষ খণ্ডাবার উপায় কি?

    গেরস্তবাড়িতে গুরু আসা দেখেছে সত্য, সেভাবে করতে পারে, কিন্তু বাবা কি সেই অতি যত্ন অতি সেবা নেবেন? এই সব চিন্তার সঙ্গে উপচে উঠছে এক অব্যক্ত বিচ্ছেদ-ব্যাকুলতা।

    বাবাকে সে নিত্যি দেখছে না সত্যি, কিন্তু জানে বাবা রয়েছেন, সত্যর সেই চির-পরিচিত পরিবেশের মাঝখানে বাবার চিরঅভ্যস্ত জীবনে।

    কিন্তু কাশীবাস!

    সে যে চিরবিরহের সমতুল্য। এ তো এক প্রকার মৃত্যু। কাশীবাসের সংকল্প মানেই সংসার থেকে মুখ ফিরোনো। সাতপাঁচ চিন্তায় সত্যর কণ্ঠে এই আবেগ, এই আকুলতা!

    রামকালী বোঝেন।

    তাই রামকালী এই অস্থিরতাকে ঈষৎ প্রশ্রয়ের দৃষ্টিতে দেখেন। আর মেয়ের কথার উত্তরে মৃদু হেসে বলেন, তুমি যাও নি, আমিই তোমার কাছে এলাম। একই কাজ হল।

    প্রণামান্তে নিতাই চলে গিয়েছিল, নবকুমার সত্যর কথা বলার সুবিধের জন্যে একটু তফাতে গিয়ে বসেছে। সত্য তাই স-আক্ষেপে বলে, দুই কি আর এক হল বাবা? সে আমি বাপের মেয়ে বাপের কাছে গিয়ে পড়তাম, আগের ছোটটি হয়ে যেতাম। যা প্রাণ চায় বলতাম। আর এ তুমি কুটুমবাড়ি এসেছ, আমি পরের ঘরের বৌ, আমার প্রতি পদে বাধা। কী বা বলব, কী বা কইব!

    নবকুমার তফাতে বসলেও এতো তফাতে নয় সে সত্যর বাক্যাবলী তার কর্ণগোচরিত হতে কোনও বাধা হচ্ছে। সে সহসা নৈর্ব্যক্তিক স্বগতোক্তি করে ওঠে, হায় ভগবান! প্রতি পদে বাধা! পা আরো অবাধ হলে কি যে হত।

    রামকালী সচকিত হয়ে বললেন, কী বললে বাবাজী?

    নবকুমার গম্ভীর গলায় বলে, না, এমন কিছু নয়। তবে নাকি আপনার মেয়ে আক্ষেপ করছেন, প্রতিপদে বাধা, তাই বলছিলাম। আপনাদের নিত্যানন্দপুরে এমন কোন্ মেয়েটা আছে, আর আমাদের বারুইপুরে এমন কোন্ বৌটা আছে, যে আপনার মেয়ের সমতুল্য স্বাধীন, তাই বরং জিজ্ঞেস করুন।

    রামকালী অনুভব করেন নালিশের সুর।

    তাই মৃদু হাসেন।

    বলেন, তা যদি হয় সেটা তো ভালই। আমার মেয়ে যে ঝাঁকের কৈ হবার জন্যে জন্মায় নি, সে আমি তার শৈশবকালেই বুঝেছি।

    সত্য তার বাপের উপস্থিতি স্বামীর উপস্থিতি ইত্যাদি মানতে পারে না, ঘোমটাটা আর একটু টেনে বলে, আচ্ছা বাবা, তুমি এই তেতেপুড়ে এসেছ, এ সময় নালিশ ফোরেদ করতে বসাটা খুব ভাল হচ্ছে? থাকবে তো দু’চার দিন, পরে যত খুশি-

    ওরে বাবা! দু’চার দিন কি রে? একটা দিনের জন্যে চলে এলাম। কাল যাবো।

    একটা দিন! বাবা, মাত্তর একটা দিনের জন্যে এলে তুমি? সত্য কেঁদে ফেলে, তোমার সঙ্গে যে আমার অনেক কথা

    হ্যাঁ, বাবার সঙ্গে সত্যর অনেক কথা।

    কতদিন ভেবেছে চিঠি লিখে সব বলে বাবাকে, প্রশ্ন করে কোটা ঠিক, কোন্‌টা ভুল, কিন্তু লিখতে গিয়ে দেখেছে অগাধ কথা। এত কথা কি চিঠিতে লেখা যায়? তা ছাড়া উত্তর-প্রত্যুত্তরের মধ্যে বক্তব্য বোঝনো যায়, শুধু একতরফা পেশ করা যেন কৈফিয়ত দাখিল করা।

    বাবা যদি উত্তরে লেখেন, এত কথা আমায় লেখার উদ্দেশ্য কি?

    অথচ ব্রাহ্মধর্ম কি, কোন একজন চিরহিতৈষী গুরুজন যদি হঠাৎ ব্রাহ্মধর্ম নিয়ে বসেন, তাঁকে ত্যাগ করাই সমীচীন কিনা, গেরস্তঘরের মেয়ে, অথবা গেরস্তঘরের বৌ এই অপরাধে জগৎ সংসারের সকল প্রকার কাজ থেকে তাদের বঞ্চিত হওয়াই বিধি কিনা, স্বামী যদি হিতাহিতে অন্ধ হন, মেয়েমানুষের সেই অন্ধপথেই চলা নিয়ম কিনা, এমন অনেক প্রশ্ন তো আছেই, সর্বোপরি প্রশ্ন শঙ্করীর মেয়ের প্রশ্ন। শঙ্করীর কথা বলে যখন বাবাকে চিঠি লিখেছিল, তখন রামকালী উত্তর দিয়েছিলেন, যে যত বড় অপরাধেই অপরাধী হোক, সে যদি অনুতপ্ত হয়ে থাকে, তাকে ক্ষমা করাই কর্তব্য। তা ছাড়া তোমার বিবেচনার ওপর আমার আস্থা আছে।

    সুহাস সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে, এ একবার বাবাকে জিজ্ঞেস করবার তার বিশেষ ইচ্ছে।

    কিন্তু বাবা কিনা একদিন মাত্র থাকবেন?

    তার মানেই সত্যর এই বাসাবাড়িতে তিনি খাওয়া-মাখা করবেন না। হয়তো ফলমূল আর গঙ্গাজল খেয়েই একটা বেলা কাটিয়ে দেবেন। সত্যর আর পিতৃসেবার পুণ্য হবে না। এত সব উচ্ছাস মনের মধ্যে আলোড়িত হতেই চোখের জল বাঁধ মানে না।

    রামকালী আস্তে তার মাথায় একটু স্পর্শ রেখে বলেন, একটা দিনই কি কম হল রে? কত কথা বলবি, বল না?

    আর কথা! আমার তো শুধু উপচে উপচে কান্নাই আসছে বাবা?

    আঁচল ভিজে জবজবে হয়ে ওঠে সত্যর।

    অনেকক্ষণ পরে প্রশমিত হয় সে কান্না। কথাও হয়। যত কিছু বলার ছিল সব বলে ফেলে সত্য, তার চিরদিনের ধ্রুবতারার কাছে।

    রামকালী নবকুমারকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন। বলেন, সে কি! মাস্টার মশাই তোমার চিরহিতৈষী, তাঁকে ত্যাগ করবে কি? তার ধর্ম, বিশ্বাস তার কাছে। এই যে আমি, আমি শাক্ত কি বৈষ্ণব, এইটা কি দেখতে যাবে তোমরা? না দেখবে– বাবা? গুরু, শিক্ষক এঁরাও তেমনই পিতৃতুল্য। তা ছাড়া তিনি তো তার ধর্ম বিশ্বাস তোমার ওপর চাপাতে আসছেন না? তোমার কোনো অনিষ্ট আসছে না তা থেকে? তবে?

    সত্যর ওই পাঠশালায় পড়ানো শুনে রামকালী কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আস্তে একটি নিঃশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, সত্য, তোর মাকে তোর মনে পড়ে?

    মাকে মনে পড়ে না? কী বলছ বাবা? আবার সত্যর চোখ উপচে ওঠে।

    না, তাই বলছি। তোর মা থাকলে, একথা শুনে ভয় পেত, বুঝলি? নির্ঘাত ভয় পেত। আবার আড়ালে বলতো, আমি জানি ও আমার ক্ষণজন্মা মেয়ে।

    উত্তর পেয়ে যায় সত্য। তার কাজ ভুল কি ঠিক জেনে যায়।

    শুধু সুহাসকে নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা চলে। কিছুটা বাদ-প্রতিবাদও বুঝি। তখনও সত্য সুহাসকে সামনে আনে নি রামকালীর।

    রামকালী বলতে চাইছিলেন, বিয়ের চেষ্টার প্রয়োজন কি? বেশ তো, লেখাপড়া শিখছে ভাল কথা। নিজের জীবিকা নিজে অর্জন করতে পারে, সেটা মঙ্গল। কলকাতায় তো আজকাল এ রকম হচ্ছে। বিদূষী মেয়েরা গৃহশিক্ষয়িত্রী হয়ে অথবা মেয়েঙ্কুলে পড়িয়ে উপার্জন করছে!

    কিন্তু বাবা-, সত্য বলে মা-টা তো চিরদুঃখিনী হয়ে দুঃখে-দুঃখেই মরল। মেয়েটাও কোনদিন ঘর-সংসারের মুখ দেখবে না?

    মা-বাপের প্রায়শ্চিত্ত তো সন্তানকেই করতে হয় সত্য।

    আর যদি ইচ্ছে করে কেউ ওকে বিয়ে করতে চায়?

    রামকালী মাথা নেড়ে বলেন, কে চাইবে? একে তো জন্মের গোড়াতেই অত বড় গলদ, তার ওপর মেয়ের যথেষ্ট বয়েস হয়ে গেছে, বিধবা কি কুমারী তারও নিশ্চয়তা নেই।

    সত্য তখন নিজের গোপন ইচ্ছে ব্যক্ত করে। মেয়েটাকে যদি ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করিয়ে ব্রাহ্মসমাজের কোনও সমাজ-সংস্কারক পরহিতৈষী যুবকের হাতে তুলে দেওয়া যায়! সুহাসের যোগ্য বয়সের অবিবাহিত ছেলে ও সমাজে পাওয়া যায়।

    রামকালী যেন এ প্রস্তাব সমর্থন করেন না। তুচ্ছ একটা মেয়ের বিয়ে বিয়ে করে এত কাণ্ডর দরকার কি, এই যেন তার মত। তাই সহসা গম্ভীর হয়ে গিয়ে বললেন, যদি জিজ্ঞেসই করছ তো তা হলে বলি, একটা খুঁতওলা বয়সের ধারা বাড়িয়ে চলে লাভ কি?

    লাভ ওই মেয়েটার সংসার। মেয়ে বলেই কি তুচ্ছ বাবা? একটা মানুষের জীবন তো?

    মানুষের জীবন শুধু ভোগেই সার্থক নয় সত্য, ত্যাগেও সার্থকতা আছে। ও তো জানে ও বিধবা, বালবিধবার যেমন ভাবে জীবন কাটে–

    কী ভাবে আর তাদের কাটে বাবা! সত্য হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলে, চিরদুঃখেই কাটে। পিসঠাকুমার মতন আর ক’জন হয়? তাও তিনিও মনের দাহয় শুচিবাই করে বিশ্বসুদ্ধ লোককে অতিষ্ট করেছেন–

    রামকালী সহসা স্তব্ধ হয়ে যান। যেন মোক্ষদাকে চোখের ওপর দেখতে পান। পূর্বের সেই সুবৰ্ণবর্ণা তীব্র দীপ্তময়ীকেও দেখেন, আর তার পিছনে কায়ার পিছনে ছায়ার মত, সূর্যের পিছনে রাহুর মত, বর্তমানের রোগজীর্ণ মোক্ষদার প্রেতাত্মাকেও দেখতে পান। যে মোক্ষদা এখন ভীমরতি হয়ে যা-তা করে বেড়াচ্ছেন। লুকিয়ে-চুরিয়ে খাবার জন্যে নাকি সর্বদা ছোঁক ছোঁক করে বেড়ান তিনি, দেখ, তোর, না দেখ মোর নীতিতে মুঠো করে মাছভাজা নিয়ে মুখে পুরে বসে থাকেন।

    আর সারদা রাতদিন গালমন্দ করে টেনে টেনে নিয়ে গিয়ে পুকুরে চুবিয়ে আনে। একথা তবু জানে না সত্য। সত্য সেই শুচিবাইটাই জানে। রামকালী একটু চুপ করে থেকে বলেন, দেখ, তেমন পরোপকারী ভাল ছেলে যদি পাও।

    তোমার আশীর্বাদ না পেলে, এত বড় কাজ করতে ভয় পাচ্ছি বাবা। তুমি মন খুলে সায় দিয়ে যাও–

    রামকালী একটু হেসে বলেন, মন কি ঘরের জানলা-দরজা সত্য, যে গায়ের জোরে খোলাবি? তবে–আশীর্বাদ আমি করছি। তোর কাজে ভগবান সহায়।

    .

    সত্যর আশঙ্কাই ঠিক।

    রামকালী সামান্য কিছু ফলমূল গ্রহণ করেন এবং জানান পরদিনও তাঁর পূর্ণিমার ব্রত।

    এই বুঝেই তা হলে তুমি এসেছ বাবা? সত্য কাঁদো কাঁদো হয়ে বলে, আমি তোমার এমন অধম মেয়ে যে জীবনে একদিন বেঁধে ভাত দিতে পারলাম না।

    রামকালী সহসা একটি গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বলেন, জীবনের কথা কি এখুনি বলে শেষ করে ফেলা যায় সত্য? জীবনের পরিণতি গুহার অন্ধকারে।

    তারপর বলেন, এত কথা হল, কই সে মেয়েটাকে তো দেখলাম না?

    কি জানি বাবা, কি লজ্জা ঢুকেছে তার মনে, চৌকিতে পড়ে কাঁদছে।

    কাঁদছে! রামকালী একটু চকিত হন।

    আর কিছু বলেন না।

    কিন্তু পরদিন সকালে যখন স্নান-আহ্নিক সেরে বসেছেন, তখন সুহাস মাথা নীচু করে এসে আস্তে আস্তে প্রণাম করে রামকালীকে।

    পুব জানলা দিয়ে সকালের আলো এসে মেয়েটার মুখে পড়ে যেন তাকে একটা স্নিগ্ধ কৌমার্যের দ্যুতিতে স্নান করিয়ে দিয়েছে। আর স্র অথচ দৃঢ় মুখের রেখায় একটি প্রত্যয়ের আভা। পাতলা ঋজু দীর্ঘ দেহের গড়নেও সেই প্রত্যয়ের দৃঢ়তা।

    রামকালী বুঝি এমনটি আশা করেন নি।

    রামকালী যেন বিচলিত হন। হঠাৎ বহুদিন পূর্বের একটি কথা মনে পড়ে যায় তাঁর। মনে পড়ে যায়, পুকুরঘাটের ধারে বসে থাকা একটা বিধবা মূর্তি। কেমন সেই মূর্তি, রামকালী কি দেখেছিলেন?

    মাথায় হাত ঠেকিয়ে আশীর্বাদ করেন রামকালী।

    তার পর গম্ভীর শান্ত গলায় বলেন, সত্য, এ যে তপস্বিনী উমা!

    সত্য হাসি হাসি মুখে সুহাসের মুখের দিকে তাকায়। এ প্রশংসা যে তারই। সুহাস যে তার হাতে গড়া প্রতিমা।

    কচি নয়, শিশু নয়, পনেরো বছরের ধাড়ী মেয়েটাকে কাছে এনেছিল সত্য, তারা বহুবিধ অশিক্ষা কুশিক্ষা আর চরিত্রগত বহু দোষের সমষ্টি সমেত।

    এই ক’বছরে মাত্র ভেঙেচুরে গড়েছে সেই মেয়েকে।

    অবশ্য প্রকৃতির নিয়মে তার নিজের ভিতরেও একটা প্রবল ভাঙাগড়ার কাজ চলেছে। মায়ের ওই আকস্মিক বীভৎস মৃত্যু, এবং তার পরবর্তীকালে মায়ের জীবন-ইতিহাস জানার ফলে সেই বিরাট ওলট-পালটটা সংঘটিত হয়েছিল।

    তার পর এসেছে সুহাসের নবজন্মের পালা।

    কোথায় ওদের বাড়ির সেই বিলাসিতায় আবিল অশুচি আবহাওয়া, আর কোথায় সত্যর দৃঢ় চরিত্রের দৃষ্টান্ত! তা ছাড়া স্কুলের জীবন! সে যেন স্বর্গের জগৎ!

    সুহাসের প্রকৃতিই শুধু বদলায় নি, আকৃতিও বদলেছে। যেমন বাচাল মেয়েটা মিতভাষিণী হয়ে গেছে, তেমনি হঠাৎ লম্বা হয়ে গিয়ে গোলগাল পুষ্টদেহ মেয়েটা হয়ে উঠেছে বেতের ডগার মত ছিপছিপে লম্বা পাতলা। একটু বুঝি কৃশই।

    যে কৃশতাকে দেখে তপস্বিনী উমার তুলনা মনে পড়েছে রামকালীর। সত্য হাসি হাসি মুখে বলে, পর পর দু বছর ফার্স্ট হল।

    সত্যি নাকি! বলেন রামকালী।

    সুহাস বোধ করি লজ্জা পেল। মৃদু কণ্ঠিত একটু হাসি হেসে বলল, দাদুর নাতিদের ফার্স্ট হওয়ার খবর তোলা থাকল, আর

    তোলা নেই।

    সেকথা শুনেছেন রামকালী। নবকুমার বলেছে। নাতিদের সঙ্গে দেখা হল না বলে দুঃখ প্রকাশও করেছেন। রামকালী বলেছেন, তা সত্যি, দেখি নি অনেক দিন। জলপানি পেয়েছে শুনে খুশি হলাম।

    এসব গত রাত্রের কথা।

    সুহাস জানে। সুহাস নিজের লজ্জা ঢাকতে তাড়াতাড়ি ওদের কথা তোলে।

    রামকালী মৃদু হেসে বলেন, নাতির ফার্স্ট হওয়া আত্নাদের কথা, কিন্তু নতুন কথা নয় দিদি, নাতনীর ফার্স্ট হওয়াটাই নতুন কথা। আশীর্বাদ করি সুখী হও, সৌভাগ্যবতী হও!

    সত্যর দিকে ফিরে বলেন, মন খুলেই আশীর্বাদ করলাম রে!

    সত্যর চোখ আবার জলে ভরে আসে।

    বাবার কথাবার্তার ধরন বদলে গেছে। চিরদিনের সেই দূরত্ব বজায় রাখা মাপজোপা কথার জায়গায় এখন যেন নিকটের সুর।

    সংসার থেকে মুখ ফিরোবার কালে কি সহসা সংসারের প্রতি মমত্ব বোধ করেছেন রামকালী?

    নাকি তার এই সৃষ্টিছাড়া সংসার-ছাড়া মেয়েটার কার্যকলাপ তাঁকে বিচলিত করছে?

    .

    যাত্রাকাল যত নিকটবর্তী হয়, সত্যর গলার শব্দ তত ভার হয়ে আসে। থেকে যাও বলে অনুরোধ করারই বা পথ কোথা? এখানে একমুঠো ভাত খাবার অনুরোধ চলবে না। যেতেই দিতে হবে।

    ছোট ছোট কথা, ছোট ছোট নিঃশ্বাস।

    কবরেজী কি ছেড়ে দেবে বাবা?

    ছেড়ে দেব? না, ছেড়ে দেব কেন সত্য? ওই বিদ্যেটুকু দিয়ে যতটুকু যার উপকার হয়–তবে পেশাটা ছেড়ে দেব।

    অর্থাৎ দক্ষিণাটা বাদ।

    খুব কষ্ট করে থাকবে না তো বাবা?

    বিশ্বনাথের খাসমহলে কষ্ট কিরে পাগলী!

    শরীর-অশরীরে এই বেয়াড়া অবাধ্য মেয়েটা একটু খবর পাবে তো বাবা?

    সে বাপু এখন বাক্যদত্ত হতে পারছি না।

    সে জানি। সে কি আর জানতে বাকী আছে আমার!

    নবকুমার পায়ের ধুলো নিয়ে বলে, কবে যাত্রা?

    এই সামনের অষ্টমী তিথিতে নৌকা ছাড়বে।

    নৌকো! নবকুমার সাহসে ভর করে বলে, কেন, এখন তো রেলগাড়ি চলছে—

    চলছে। নৌকোও তো চলে এসেছে! রামকালী হাসেন, সে তো চলৎশক্তি হারায় নি!

    ওতে একদিনে পৌঁছে যেতে– সত্য এগিয়ে এসে বলে।

    রামকালী মৃদু হাসেন, অত তাড়াতাড়িই বা কী? মুমুর্ষ রোগী দেখতে তো যাচ্ছি না? তীর্থের পথটাই তীর্থ, পথটাকে চোখ বুজে অতিক্রম করে লাভ কি! এ একেবারে মা গঙ্গার কোলে চড়ে বসবো, কোলে কোলে চলে যাব।

    বাবা, ঠিকানা?

    ঠিকানা? সে কি আমি এখান থেকে ঠিক করে যাচ্ছি রে?

    গিয়ে পৌঁছানো খবরে জানাবে তা হলে?

    এই দেখ! এ মেয়ের কেবল সত্যবন্দী করিয়ে নেবার ফন্দী!

    হবেই তো। যেমন নাম রেখেছ!

    একেবারে যাবার সময়, রামকালী সহসা বেনিয়ানের পকেট থেকে দুখানি পাকানো কাগজ বার করে বললেন, এই নাও, এই দুটি জিনিস রাখো।

    কী এ? সত্য হাত পাতে না, চমকে তাকায়।

    রামকালী বলেন, একখানি তোমার জন্মপত্রিকা। আমার কাছে ছিল এযাবৎ

    ও আমি নিয়ে কি করব বাবা?

    থাক। থাকা ভাল। আর এইটা–, রামকালী একটু থামেন, দেশের বিষয়-আশয় যা কিছু বংশের ছেলেদেরই থাকল। ত্রিবেণীতে আলাদা কিছু লাখরাজ জমি ছিল, সেটা তোমার নামে

    না বাবা না, সত্য কেঁদে ওঠে, ও আমি চাই না। আমি তোমার মেয়েসন্তান, শুধু স্নেহের অধিকারী।

    তা এটুকু সেই স্নেহেরই চিহ্ন ধরে নাও।

    বাবা গো, চিহ্ন দিয়ে স্নেহ বুঝবো তোমার? না বাবা, দরকার নেই আমার।

    সত্য হাতও পাতে না, চোখের আঁচলও নামায় না। এত কান্না বোধ করি সারা জীবনে কাঁদে নি সত্য। মা মরতেও নয়।

    রামকালী মুখটা ফিরিয়ে আত্মস্থ করে নেন নিজেকে, তার পর নবকুমারের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন, রাখো!

    নবকুমার সত্যর এই বাড়াবাড়িতে চাঞ্চল্য বোধ করছিল।

    ভাবছিল, ছেলে নেই, মেয়ের তো সবই পাবার কথা। বলে মহারাণী ভিক্টোরিয়া রাজ্যটাই পেলেন। সে সব কিছুই না, মুষ্টিভিক্ষের উপহার, তাও মেয়ে নিচ্ছেন না! অতএব নবকুমারের হাত বাড়াতে দেরি হয় না।

    রামকালী পালকিতে ওঠেন।

    আপাতত পালকিতেই চড়লেন। কলকাতার বিশিষ্ট কয়েকটি দেবস্থান দেখবেন, তার পর নৌকোয় উঠবেন। রেলটা পছন্দ করেন না রামকালী। বললেন, তেমন তাড়া না থাকলে দরকার কি?

    পালকিটা যতদূর দেখা যায় দরজায় দাঁড়িয়ে দেখে সত্য। তার পর বাড়ির মধ্যে ঢুকে এসে বসে পড়ে। অনেকক্ষণ পরে চোখ মুছে নিঃশ্বাস ফেলে বলে, নেহাৎ নিরুপায় যদি না হতাম, ঠিক আমি বাবার সঙ্গে চলে যেতাম!

    নবকুমার বলে, তা নিরুপায় আর কি? ক’টা দিন নয় সুহাস চালিয়ে দিত, গেলেই পারতে! যে দুদিন না কাশী যান উনি, থেকে আসতে। বললে না তো?

    সত্য আর একটা লজ্জা আর ক্ষোভ মেশানো নিঃশ্বাস ফেলে বলে, সংসার চালানোর কথা নয়। অন্য কথা। শরীরের অবস্থাই আমার মনে হচ্ছে ভাল নয়। জানি না বুড়ো বয়সে আবার কপালে কী গেরো আছে—

    নবকুমার কিছুক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে থাকে সত্যের সেই লজ্জা-বিক্ষুব্ধ বিপন্ন মুখের দিকে, খবরটা হৃদয়ঙ্গম করতে তার কিছুক্ষণ লাগে। তারপর অকস্মাৎ এক অপ্রত্যাশিত পুলকে রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে সে।

    ওঃ, ভগবান!

    এইবার তাহলে সত্যর পায়ে একটু ছেকল পড়বে। এই ছেকল পড়ার কথাটাই সবচেয়ে আগে মনে পড়ে নবকুমারের। আর তাতেই আহ্লাদ উথলে ওঠে। হঠাৎ সত্যর একটা হাত চেপে ধরে বলে, সত্যি?

    আস্তে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে সত্য বলে, আহ্লাদে নাচবার কিছু নেই।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13 14 15 16 17 18 19 20 21 22 23 24 25 26 27 28 29 30 31 32 33 34 35 36 37 38 39 40 41 42 43 44 45 46 47 48
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleবকুলকথা – আশাপূর্ণা দেবী
    Next Article দশটি উপন্যাস – আশাপূর্ণা দেবী

    Related Articles

    আশাপূর্ণা দেবী

    বিবাগী পাখি – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    কুমিরের হাঁ – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    ঠিকানা – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    ততোধিক – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    ১. খবরটা এনেছিল মাধব

    April 7, 2025
    আশাপূর্ণা দেবী

    নতুন প্রহসন – আশাপূর্ণা দেবী

    April 7, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }