Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ফাউণ্ডেশন – আইজাক আসিমভ

    লেখক এক পাতা গল্প323 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ৩. মেয়রদের কথা

    তৃতীয় পর্ব – মেয়রদের কথা

    এক

    চার রাজ্য- ফাউণ্ডেশন যুগের গোড়ার দিকে প্রথম এম্পায়ার থেকে বেরিয়ে এসে অ্যানাক্রিয়ন প্রদেশের চারটি অংশ স্বাধীন এবং ক্ষণস্থায়ী রাজ্য গড়ে তোলে। এদেরকেই চার রাজ্য নামে অভিহিত করা হয়। চার রাজ্যের মধ্যে অ্যানাক্রিয়নই ছিল সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী। অ্যানক্রিয়নের এলাকা বিস্তৃত ছিল…

    …স্যালভর হার্ডিনের প্রশাসনিক আমলে রাজ্য চারটির ওপর যে এক অদ্ভুত সমাজ ব্যবস্থা অস্থায়ীভাবে চাপিয়ে দেয়া হয়, নিঃসন্দেহে সেটাই চার রাজ্যের ইতিহাসে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ব্যাপার।…

    –ইনসাইক্লোপীডিয়া গ্যালাকটিকা

    .

    প্রতিনিধিদল!

    হার্ডিন আগেই বুঝতে পারছিলেন, ওরা আসছে, আর সেজন্যই বিরক্তিকর ঠেকছে তার কাছে ব্যাপারটা।

    ইয়োহান লী পরামর্শ দিলেন চরমপন্থা গ্রহণের। সময় নষ্ট করার কোনো কারণ দেখি না আমি, হার্ডিন। সামনের ইলেকশান পর্যন্ত ওরা কিছু করতে পারছে না লিগ্যালি অন্তত- তার মানে, বছরখানে সময় হাতে পাচ্ছি আমরা। সেক্ষেত্রে, ঝেড়ে ফেলছ না কেন ওদের?

    ঠোঁট দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরলেন হার্ডিন। তুমি আর কিছু শিখলে না, লী। চল্লিশ বছর ধরে চিনি তোমাকে, এখন পর্যন্ত পিঠে ছুরি মারার চমৎকার কৌশলটা শিখতে পারলে না তুমি।

    এভাবে যুদ্ধ করা আমার নীতি নয়, বিরস বদনে বললেন লী।

    হ্যাঁ, জানি। সম্ভবত সেজন্যই একমাত্র তোমাকেই আমি বিশ্বাস করি। থেমে একটা সিগার বের করলেন তিনি পকেট থেকে। পেছন দিকে হাঁটতে অভ্যস্ত ইনসাইক্লোপীডিস্টদের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান ঘটবার পর অনেক দূর চলে এসেছি আমরা, লী। বুড়ো হয়ে যাচ্ছি। বয়স বাষট্টি হয়ে গেছে। কখনও কি ভেবে দেখেছ, কত দ্রুত কেটে গেল সেই তিরিশটা বছর?

    শব্দ করে নাক দিয়ে খানিক বাতাস নির্গত করলেন লী। আমার কিন্তু নিজেকে ততটা বুড়ো মনে হয় না। অথচ ছেষট্টিতে পড়েছি আমি।

    তোমার মতো প্রাণশক্তি আমার নেই। অলস ভঙ্গিতে সিগারটা টানছেন হার্ডিন। ভেগার সেই হালকা তামাকের জন্য যৌবনে যে আকুতি ছিল, সেটা অনেক আগেই নষ্ট হয়ে গেছে তার। সে-সময়ে টার্মিনাস গ্রহের সঙ্গে গ্যালাকটিক এম্পায়ার-এর প্রতিটি অঞ্চলের লেনদেন ছিল। সব সুদিন যেখানে চলে যায় সেই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে ঐ সময়টা। বিস্মৃতির অতলে চলে গেছে গ্যালাকটিক এম্পায়ারও। হার্ডিন মনে করার চেষ্টা করলেন, এখন নতুন সম্রাট কে হয়েছেন আদৌ কোনো সম্রাট আছেন কিনা তা-ই বা কে জানে! কোনো এম্পায়ার-ই কি আছে? কী ভীষণ ব্যাপার! গ্যালাক্সির এই প্রান্তে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর তিরিশ বছর ধরে টার্মিনাস কেবল পার্শ্ববর্তী চার রাজ্য আর নিজেকে নিয়েই আছে।

    কীভাবেই না পতন হলো পরাক্রান্ত শক্তিটার! রাজ্য! আগে ছিল প্রিফেক্ট, সব একই প্রদেশের অংশ। প্রদেশ ছিল সেক্টরের অংশ, সেক্টর কোয়াড্র্যান্টের এবং কোয়াড্রন্ট সুবিস্তৃত গ্যালাকটিক এম্পায়ার-এর। অথচ এখন, এম্পায়ার গ্যালাক্সির প্রান্তবর্তী অংশগুলোর ওপর তার কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলেছে, এবং ছোট ছোট গ্রহের এই খণ্ড খণ্ড দলগুলো হয়ে বসেছে এক একটা রাজ্য। অথচ এদের সম্বল বলতে ঐ যাত্রাদলের রাজা-রানী, অমাত্যবর্গ, নিরর্থক ও উদ্দেশ্যহীন যুদ্ধ, আর করুণভাবে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাওয়া জীবন।

    পতন হচ্ছে একটা সভ্যতার। পারমাণবিক শক্তি বিলুপ্ত। বিজ্ঞান হারিয়ে যাচ্ছে পৌরাণিক ধূসরতায়- এমনি সময় ফাউণ্ডেশন ঢুকল মঞ্চে। হ্যারি সেলডনের ফাউণ্ডেশন।

    জানালার কাছ থেকে লী-র কণ্ঠ ভেসে আসতে হার্ডিনের স্মৃতি রোমন্থনে বাধা পড়ল। পুরনো মডেলের গ্রাউণ্ড কারে চেপে চলে এসেছে কুকুর ছানাগুলো! অনিশ্চিতভাবে দরজার দিকে কয়েক পা এগিয়ে ফিরে তাকালেন তিনি হার্ডিনের দিকে।

    হার্ডিন হেসে উঠে ফিরে আসতে বললেন তাকে হাত নেড়ে। আমি বলে রেখেছি, ওদের এখানেই নিয়ে আসা হবে।

    এখানে? কী জন্য? তুমি ওদের খুব বেশি সম্মান দেখাচ্ছ!

    লাল ফিতের কড়াকড়ি মেনে চলার বয়স আর এখন নেই আমার। তাছাড়া ছেলে-ছোকরাদের সঙ্গে ডীল করার সময় তোষামোদটা বেশ কাজে দেয়। বিশেষ করে তখন, যখন এ জন্যে কোনো দায়-দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছে না। চোখ টিপলেন তিনি। বোসো, লী। আমাকে তুমি শুধু তোমার নৈতিক সমর্থনটা দিয়ে যাও। ঐ ছোকরা সেরম্যাকের ব্যাপারে জিনিসটা দরকার হবে আমার।

    সেরম্যাক লোকটা কিন্তু বিপজ্জনক, গম্ভীর মুখে বললেন লী। লোক আছে ওর পেছনে। সুতরাং আণ্ডারএস্টিমেট কোরো না ওকে।

    কাউকে কখনো আণ্ডারএস্টিমেট করেছি আমি এ পর্যন্ত?

    ঠিক আছে, তাহলে ওকে গ্রেফতার কর। কোনো না কোনো অভিযোগ খাড়া করে ফেলতে পারবে তুমি পরে।

    হার্ডিন এই শেষ উপদেশটা উপেক্ষা করলেন। ওরা এসে পড়েছে, লী। সিগন্যালে সাড়া দিয়ে ডেস্কের নিচের পেডালে চাপ দিলেন হার্ডিন। এক পাশে সরে গেল দরজাটা।

    প্রতিনিধিদলের চারজন সার বেঁধে ঢুকল। হার্ডিন হাত নেড়ে তাঁর ডেস্কের সামনে অর্ধবৃত্তাকারে রাখা আর্মচেয়ারে বসার ইঙ্গিত করলেন তাদেরকে। মাথা নুইয়ে অভিবাদন জানাল তারা। বসল চেয়ারে। মেয়রকে প্রথমে কথা বলার সুযোগ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল শান্তভাবে।

    অদ্ভুতরকমের কারুকাজ করা সিগার বক্সের ঢাকনা খুললেন হার্ডিন। জর্ড ফারা একসময় ব্যবহার করতেন বাক্সটা। অনেক আগে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া ইনসাইক্লোপীডিস্টদের যুগের সেই বোর্ড অভ ট্রাস্টিজের সদস্য জর্ড ফারা। বাক্সটা স্যানটানির তৈরি খাঁটি এম্পায়ার আমলের জিনিস। যদিও ওটায় এখন যে সিগারগুলো রয়েছে, সেগুলো টার্মিনাসেই তৈরি। গম্ভীর মুখে একে একে চারজন চারটি সিগার নিয়ে তাতে অগ্নিসংযোগ করল।

    ডান দিক থেকে দু নম্বর চেয়ারে বসেছে সেফ সেরম্যাক। এই তরুণ দলের তরুণতম সদস্য সে। নিখুঁতভাবে ছাঁটা খাড়া খাড়া হলদে গোঁফ আর ধূসর গভীর চোখ তাকে অন্য সবার চেয়ে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বাকি তিনজনকে তো হার্ডিন একবার দেখেই বাতিল করে দিলেন। নেহাতই সাদামাঠা এবং অনাকর্ষণীয় তাদের চেহারা ও হাবভাব। সেরম্যাকের ওপরই মনোনিবেশ করলেন তিনি। সিটি কাউন্সিলে তাঁর প্রথম টার্মেই বেশ কয়েকবার গোলমাল পাকিয়ে শান্ত পরিস্থিতি উল্টে-পাল্টে একেবারে অশান্ত করে দিয়েছে সেরম্যাক। তাকে লক্ষ্য করে হার্ডিন বলে উঠলেন, গত মাসে সেই অসাধারণ বক্তৃতার পর থেকে আমি বিশেষ করে আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে উদগ্রীব হয়ে ছিলাম, কাউন্সিলম্যান। বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র নীতির ওপর আপনার আক্রমণটা জুতসই ছিল খুব।

    চোখ জোড়া জ্বলে উঠল সেরম্যাকের। আপনার আগ্রহ আমাকে সম্মানিত করেছে। আক্রমণটা হয়ত জুতসই ছিল, হয়ত বা ছিল না, তবে ন্যায়সঙ্গত যে ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

    খুব সম্ভব! অবশ্য আপনার মতামত আপনার নিজের। কিন্তু তারপরেও বলব, আপনি বয়সে তরুণ।

    কাঠ-শুকনো গলায় সেরম্যাক জবাব দিল, জীবনের একটা বিশেষ সময়ে প্রত্যেককেই এই দোষে দোষী হতে হয়। আপনি যখন শহরের মেয়র নিযুক্ত হন তখন আপনার বয়স আমার বয়সের চেয়ে দুবছর কম ছিল।

    মনে মনে হাসলেন হার্ডিন। বাচ্চা ছেলেটা খুবই ঠাণ্ডা মাথার খদ্দের। বললেন, আমি ধরে নিচ্ছি কাউন্সিল চেম্বারে যে পররাষ্ট্রনীতি আপনাকে বিরক্ত করে তুলেছিল সেই ব্যাপারে কথা বলার জন্যেই এসেছেন আপনি। আপনি কি আপনার তিন সহকর্মীর পক্ষ থেকে কথা বলছেন, না আপনাদের সবার কথাই শুনতে হবে আমাকে আলাদা আলাদা ভাবে?

    চার তরুণের মধ্যে ত্বরিত দৃষ্টি বিনিময় হয়ে গেল একবার। আলতো করে চোখের পাতাগুলো নামল-উঠল।

    গম্ভীর চালে সেরম্যাক বলল, আমি টার্মিনাসের জনগণের হয়ে কথা বলছি একটি রাবার স্ট্যাম্প বডিকে যারা কাউন্সিল নামে ডাকে এবং সেখানে সত্যিকার অর্থে যাদের কোনো প্রতিনিধি নেই সেই জনগণের হয়ে কথা বলছি আমি।

    বটে। যা বলার আছে বলে যান।

    মি. মেয়র, আমরা অসন্তুষ্ট

    আমরা বলতে আপনি নিশ্চয়ই জনগণ-কে বোঝাচ্ছেন, তাই না?

    একটা ফাঁদের আভাস পেয়ে দৃষ্টি বিদ্বেষপূর্ণ হয়ে উঠল সেরম্যাকের। বরফশীতল কণ্ঠে সে বলল, আমার বিশ্বাস, আমার দৃষ্টিভঙ্গি টার্মিনাসের অধিকাংশ ভোটারের দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রতিফলন। এবার চলবে আপনার?

    এ-কথার পর আর প্রমাণ দরকার হয় না। সে যাই হোক, বলে যান। আপনারা অসন্তুষ্ট।

    হ্যাঁ, যে-নীতি গত তিরিশ বছর ধরে টার্মিনাসকে বাইরের অবধারিত আক্রমণের বিরুদ্ধে ক্রমেই অসহায় আর নির্জীব করে তুলেছে সেই নীতির ব্যাপারে আমরা অসন্তুষ্ট।

    আচ্ছা। আর তাই–? বলে যান, বলে যান।

    আর তাই আমরা একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করতে যাচ্ছি। এমন একটি দল যা টার্মিনাসের আশু চাহিদাগুলোর পক্ষে কথা বলবে, ভবিষ্যৎ এম্পায়ার এর রহস্যময় সুস্পষ্ট পরিণতির পক্ষে নয়। আমরা আপনাকে আর আপনার থুতু চাটা, ঘোঁট পাকানো মোসাহেবদেরকে সিটি হল থেকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে যাচ্ছি আর সেটা খুব শিগগিরই।

    যদি না? এসব ক্ষেত্রে সব সময়ই একটা যদি না থাকে, আপনি জানেন নিশ্চয়ই?

    যদি না আপনি এই মুহূর্তে পদত্যাগ করেন, শুধু এটুকুই। আমি আপনাকে আপনার নীতি পরিবর্তন করতে বলছি না- অতোখানি বিশ্বাস আপনাকে করি না আমি। আপনার প্রতিশ্রুতির কোনো দাম নেই। স্রেফ পদত্যাগ ছাড়া আর কিছু গ্রহণীয় নয় আমাদের কাছে।

    বটে! আড়াআড়িভাবে পা রেখে চেয়ারটাকে পেছন দিকে ঠেলে দুপায়ের ওপর দাঁড় করালেন হার্ডিন। এটাই তাহলে আপনাদের চরমপত্র। আমাকে সতর্ক করে দেয়ার জন্য ধন্যবাদ। তবে কথা হচ্ছে, আমি এটাকে অগ্রাহ্যই করছি।

    ভাববেন না এটা একটা ওয়ার্নিং, মি, মেয়র। এটা একটা ঘোষণা- কিছু নীতি আর সেগুলো কাজে পরিণত করার একটা ঘোষণা। আসলে নতুন দল ইতিমধ্যে গঠন করা হয়ে গেছে। আর দলটি আগামীকাল থেকে তার অফিশিয়াল কাজকর্ম শুরু করবে। আপোষের কোনো অবকাশ নেই। ইচ্ছেও নেই। আর খোলাখুলিই বলছি, শহরের প্রতি আপনার অবদানের কারণেই আপনাকে মুক্তির একটা সহজ পথ বাতলে দিলাম আমরা। আমি জানতাম, আপনি আমাদের পরামর্শ গ্রহণ করবেন না। তবে পদত্যাগটা যে জরুরি, সেটা আরো জোরালো আর একেবারে অনিবার্যভাবে স্মরণ করিয়ে দেবে সামনের নির্বাচন।

    উঠে দাঁড়াল সেরম্যাক। তারপর বাকি তিনজনকে উঠে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করল।

    হার্ডিন হাত তুলে বলে উঠলেন, থামুন! বসুন!

    একটু তৎপর ভঙ্গিতেই ফের বসে পড়ল সেরম্যাক। মনে মনে হাসলেন হার্ডিন। একটা প্রস্তাবের জন্যে অপেক্ষা করছেন তিনি- একটা প্রস্তাব।

    জিগ্যেস করলেন, আপনি চান আমাদের পররাষ্ট্রনীতি বদলানো হোক। কিন্তু ঠিক কোন ব্যাপারে? কীভাবে? আপনি কি চান, আমরা চার রাজ্যকে এই মুহূর্তে আক্রমণ করি, চারটিকে একই সঙ্গে?

    সে-ধরনের কোনো পরামর্শ আমি দিচ্ছি না, মি. মেয়র। আমাদের প্রস্তাবটা সরল। সব ধরনের তোষামোদ অবিলম্বে বন্ধ হোক। আপনার প্রশাসনিক আমলের গোটা সময় জুড়ে আপনি রাজ্যগুলোকে সায়েন্টিফিক এইড দেবার একটা নীতি মেনে চলেছেন। আপনি ওদের পারমাণবিক শক্তি যোগান দিয়েছেন। ওদের টেরিটোরিতে পাওয়ার প্ল্যান্ট পুনঃনির্মাণে সাহায্য করেছেন। আপনি মেডিক্যাল ক্লিনিক, রাসায়নিক গবেষণাগার আর কল-কারখানা স্থাপন করেছেন রাজ্যগুলোয়।

    তো? আপনার আপত্তিটা কোথায়?

    কাজটা আপনি করেছেন যাতে ওরা আমাদের আক্রমণ না করে সেজন্য। ঘুষ হিসেবে এসব ব্যবহার করে আপনি এই বিরাট ব্ল্যাকমেইল খেলায় একটা বোকার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে টার্মিনাসকে শুষে ছোবড়া করে দেবার সুযোগ দিয়েছেন। ফলে আমরা এখন এসব অসভ্য বর্বরদের করুণার পাত্র হয়ে পড়েছি।

    কীভাবে?

    আপনি ওদের ক্ষমতা দিয়েছেন, অস্ত্র দিয়েছেন, নেভির শিপগুলো মেরামত করে দিয়েছেন। ফলে, তিন দশক আগে ওদের যে-শক্তি ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তি ধরে এখন ওরা। দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে ওদের দাবি। এক সময় ওদের নতুন অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে ওরা ওদের সব দাবি একসঙ্গে আদায় করে নেবে টার্মিনাসে আক্রমণ চালিয়ে। ব্ল্যাকমেইল নামক খেলাটি সচরাচর এভাবেই শেষ হয় না কি?

    তা, আপনি কীভাবে এ প্রতিকার করতে বলেন?

    অবিলম্বে ঘুষ দেয়া বন্ধ করুন। চেষ্টা করুন খোদ টার্মিনাসকে শক্তিশালী করার। অ্যাণ্ড অ্যাটাক ফাস্ট!

    সেরম্যাকের গোঁফজোড়ার দিকে বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন হার্ডিন। আত্মবিশ্বাসে ছোকরা টইটম্বুর; তা না হলে এত কথা বলত না। কোনো সন্দেহ নেই, ওর কথাগুলো জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশেরই কথা, একটা বিরাট অংশের।

    হার্ডিনের কণ্ঠে সামান্য বিরক্তির আভাস পাওয়া গেল, আপনি কি আপনার কথা শেষ করেছেন?

    আপাতত।

    বেশ। তা, আমার পেছনের দেয়ালে বাধিয়ে রাখা লেখাটা কি আপনার নজরে পড়েছে? কী লেখা আছে পড়ন দয়া করে।

    সেরম্যাকের ঠোঁট জোড়া বেঁকে গেল। লেখা তো রয়েছে, সহিংসতা অক্ষমের শেষ অবলম্বন। এটা বুড়োদের নীতি, মি. মেয়র।

    নীতিটা কিন্তু আমি প্রয়োগ করেছিলাম তরুণ বয়সেই, মি, কাউন্সিলম্যান এবং সাফল্যের সঙ্গে। আপনারা সবে জন্মেছেন তখন। অবশ্যি স্কুলে হয়ত কিছু পড়ে থাকবেন এ-ব্যাপারে।

    চোখ জোড়া ছোট করে সেরম্যাকের দিকে তাকালেন তিনি। তারপর নিয়ন্ত্রিত সুরে বলে চললেন, হ্যারি সেলডন যখন এখানে ফাউণ্ডেশন স্থাপন করেন, তিনি বলেছিলেন, এটার উদ্দেশ্য বিশাল এক ইনসাইক্লোপীডিয়া তৈরি করা। পঞ্চাশটা বছর সেই আলেয়ার পেছনে ঘুরে মরেছি আমরা। তারপর টের পেয়েছি তার আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু ততক্ষণে বড় দেরি হয়ে গেছে। পুরনো এম্পায়ার-এর কেন্দ্রীয় অংশের সঙ্গে যখন যোগাযোগ নষ্ট হয়ে গেল, দেখলাম, মাত্র একটা শহরে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি আমরা সব বৈজ্ঞানিক, যাদের কোনো কল-কারখানা নেই; অথচ চারপাশে নতুন গজিয়ে ওঠা শত্রুভাবাপন্ন চরম বর্বর রাজ্য ঘিরে আছে। বর্বরতার সাগরে আমরা পরিণত হলাম অ্যাটমিক-পাওয়ার সম্পন্ন একটা ছোট্ট দ্বীপে, শিকার হিসেবে যা খুবই মূল্যবান।

    এখনকার মতো তখনো চার রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী ছিল অ্যানাক্রিয়ন। তো, তারা সত্যি সত্যিই একটা ঘাঁটি স্থাপন করে বসল টার্মিনাসে। তখন শহরের শাসনকর্তারা অর্থাৎ ইনসাইক্লোপীডিস্টরা পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি করলেন এটা আসলে গোটা গ্ৰহটাকে গ্রাস করে নেবার প্রাথমিক পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তো, এই ছিল পরিস্থিতি, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি… মানে… প্রকৃত শাসনভার নিজের হাতে তুলে নিলাম। আপনি হলে এসময়ে কী করতেন?

    শ্রাগ করলেন সেরম্যাক। এটা তো একটা, অ্যাকাডেমিক প্রশ্ন হয়ে গেল। অবশ্যি আপনি যা করেছিলেন, তা আমার জানা আছে।

    তারপরও আবার বলছি আমি। সম্ভবত আপনি আসল ব্যাপারটা ধরতে পারছেন না। সে মুহূর্তে আসলে সামরিক শক্তির সমাবেশ ঘটিয়ে একটা যুদ্ধ বাঁধিয়ে দেবার প্রলোভন ছিল প্রচণ্ড। ওটাই ছিল সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে সহজ পথ। আর তাতে আত্মগরিমাও তুষ্ট হতো খুব। কিন্তু একই সঙ্গে চরম নির্বুদ্ধিতারও পরিচয় দেয়া হতো। আপনি হলে তা-ই করতেন। আক্রমণ করে বসতেন আগেভাগে। কিন্তু তার বদলে আমি কী করলাম? বাকি তিনটা রাজ্য সফর করলাম এক এক করে। প্রতিটি রাজ্যকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলাম যে, অ্যাটমিক পাওয়ারের গোপন রহস্য অ্যানাক্ৰিয়নের হাতে পড়তে দিলে সেটা হবে নিজের হাতে নিজের গলা কাটার শামিল। বললাম, তাদের উচিত সবচেয়ে সহজ উপায় অবলম্বন করা। ব্যস, ওই পর্যন্তই। অ্যানাক্রিয়নিয়ান ফোর্স টার্মিনাসে ল্যাণ্ড করার এক মাসের মধ্যে তিন প্রতিবেশীর কাছ থেকে একটা যৌথ চরমপত্র পেল অ্যানক্রিয়ন। সাতদিন পর একজন অ্যানক্রিয়নবাসীকেও আর দেখা গেল না টার্মিনাসে।

    তো, এখন বলুন, ভায়োলেন্সের কোনো দরকার ছিল?

    সেরম্যাক চিন্তিত মুখে কিছুক্ষণ তার সিগারের শেষাংষের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিল ভস্মীকরণ যন্ত্রের সংকীর্ণ ঢালু পথটার ভেতর।

    দুটো পরিস্থিতির মধ্যে আমি তো কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছি না, বলল সে অবশেষে। ছুরির কোনোরকম সাহায্য ছাড়াই একজন ডায়াবেটিক রোগীকে স্বাভাবিক অবস্থায় নিয়ে আসবে ইনসুলিন, কিন্তু অ্যাপেন্ডিসাইটিসের জন্যে অপারেশন দরকার। আপনি এটা এড়াতে পারবেন না। অন্যান্য পথ ব্যর্থ হওয়ার পর আপনার পরামর্শমতো ঐ শেষ পথ অবলম্বন করা ছাড়া আর উপায় কী? আমরা যে এ-পথ অবলম্বন করতে বাধ্য হচ্ছি সে তো আপনারই দোষে।

    আমার দোষে? ও হ্যাঁ, আবার সেই আমার তোষামোদ-নীতি। মনে হচ্ছে ঐ পরিস্থিতির একেবারে প্রাথমিক দাবিগুলো কী ছিল সেটাই ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেননি আপনি এখনো। অ্যানাক্ৰিয়নের লোকজন চলে যেতেই কিন্তু আমাদের সমস্যা শেষ হয়ে গেল না। উল্টো, শুরু হলো মাত্র। চার রাজ্যের সঙ্গে শত্রুতা আমাদের আরো বেড়ে গেল। তার কারণ, অ্যাটমিক পাওয়ার চাইছিল প্রত্যেকেই। আর প্রত্যেকেই বাকি তিন রাজ্যের ভয়ে আমাদের গলা কাটা থেকে বিরত রইল। ধারাল একটা তলোয়ারের ঠিক ডগার ওপর যেন বসে আছি আমরা, যে কোনো দিকে একটু ঝুঁকলেই অবস্থা সঙ্গীন- যেমন ধরুন, একটা রাজ্য বাকি তিনটির চেয়ে খুব বেশি শক্তিশালী হয়ে পড়ল অথবা দুটো রাজ্য একটা কোয়ালিশন গঠন করে ফেলল- বুঝতে পারছেন তো?

    বিলক্ষণ। সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেবার একটা মোক্ষম সময় ছিল সেটা।

    ঠিক তার উল্টো। সর্বাত্মক শক্তিতে যুদ্ধ ঠেকানোর প্রস্তুতি নেবার সময় ছিল সেটা। এক রাজ্যকে আরেকটার পিছে লাগিয়ে দিলাম আমি। পালাক্রমে প্রত্যেকের দিকেই আমি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলাম। পালাক্রমে প্রত্যেককেই সাহায্য করলাম বিজ্ঞান, বাণিজ্য, শিক্ষা, সায়েন্টিফিক মেডিসিন, ইত্যাদি দিয়ে। সামরিক অভিযানের লক্ষ্যস্থল নয়, টার্মিনাসকে আমি একটা সমৃদ্ধশালী বিশ্ব হিসেবে বেশি মূল্যবান করে তুললাম ওদের চোখে। তিরিশ বছর ধরে কাজ দিয়েছে এই কৌশল।

    কিন্তু সেই সঙ্গে আপনি বাধ্য হয়েছেন এসব সায়েন্টিফিক গিফটের চারপাশে একটা হাস্যকর ধর্মীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে। সায়েন্টিফিক এসব গিফট দিয়ে আপনি আধা-ধর্মীয়, আধা-অর্থহীন একটা ব্যাপার গড়ে তুলেছেন। একটা যাজকতন্ত্র তৈরি করেছেন আপনি। সেই সঙ্গে সৃষ্টি করেছেন অর্থহীন আচার অনুষ্ঠানের জটিলতা।

    ভুরু কুঁচকে গেল হার্ডিনের। তাতে কী হয়েছে? এর সঙ্গে আমাদের বিতর্কের বিষয়বস্তুর সম্পর্ক কোথায় আমি তো বুঝতে পারছি না। কাজটি আমি ওভাবে শুরু করেছিলাম তার কারণ বর্বররা আমাদের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিকে মনে করেছিল মোহিনী এক জাদুবিদ্যা, আর সেভাবেই ব্যাপারটা ওদের গ্রহণ করানো অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। যাজকতন্ত্র আপনা আপনিই গড়ে উঠল। আর আমরা যদি কোনোরকম সাহায্য করে থাকি তো সেটা এই পর্যন্তই যে, আমরা তাতে কোনো বাধা সৃষ্টি করিনি। এটা একটা মামুলি ব্যাপার।

    কিন্তু পাওয়ার প্ল্যান্টগুলোর দায়িত্ব আছে তো এই প্রিস্টরাই। এবং সেটা কোনো মামুলি ব্যাপার নয়।

    ঠিক। তবে ওদের ট্রেনিং দিয়েছি আমরাই। আর এসব যন্ত্রপাতি সম্পর্কে ওদের জ্ঞান কেবলমাত্র অভিজ্ঞতানির্ভর, আই মিন ইমপেরিক্যাল। তাছাড়া ওদের চারপাশে ঐ হাস্যকর ধর্মীয় ব্যবস্থার ওপরও অগাধ বিশ্বাস রয়েছে ওদের।

    কিন্তু ধরুন, কেউ যদি ঐ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে, আর শুধুমাত্র অভিজ্ঞতা নির্ভর জ্ঞানের উর্ধ্বে ওঠার মতো প্রতিভাসম্পন্ন হয়, সেক্ষেত্রে তাকে আসল টেকনিকগুলো শেখা থেকে আর সেগুলো সর্বোচ্চ মূল্যে বিক্রি করে দেয়া থেকে ঠেকিয়ে রাখবে কে? রাজ্যগুলোর কাছে আমাদের আর কী মূল্য থাকবে?

    সে সম্ভাবনা খুব ক্ষীণ, সেরম্যাক। আপনি ব্যাপারটা তলিয়ে দেখছেন না। চার রাজ্যের গ্রহগুলো থেকে সেরা লোকজনকে এই ফাউণ্ডেশনে পাঠানো হয় যাজকতন্ত্রের শিক্ষায় শিক্ষিত করা হয় তাদের। এদের মধ্যে আবার যারা সেরা বলে বিবেচিত হয়, তারা থেকে যায় রিসার্চ স্টুডেন্ট হিসেবে। আপনি যদি ভেবে থাকেন, এরা অ্যাটমিক পাওয়ার, ইলেকট্রনিক্স আর হাইপারওয়ার্ল-এর রহস্য ভেদ করে ফেলবে, তাহলে বলতেই হয় বিজ্ঞান সম্পর্কে আপনার ধারণা খুবই হাস্যকর ও রোমান্টিক। তার কারণ, সত্যিকার অর্থে, বিজ্ঞানের প্রাথমিক জ্ঞানই নেই এদের, তার ওপর, প্রিস্টদের বিকৃত ভুল-ভালে ভরা শিক্ষায় শিক্ষিত এরা। অথচ অ্যাটমিক পাওয়ার ইত্যাদির রহস্য ভেদ করতে হলে উর্বর মস্তিষ্ক আর দীর্ঘদিনের ট্রেনিং দরকার।

    হার্ডিনের বক্তৃতার এক পর্যায়ে ঘর ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন ইয়োহন লী। হার্ডিনের কথা শেষ হতে ফিরে এলেন তিনি। কাছে যেয়ে কানে কানে কী যেন বললেন। উত্তরে হার্ডিনও কিছু বললেন। সীসার তৈরি একটা সিলিণ্ডার হার্ডিনের হাতে তুলে দিলেন লী। তারপর চার প্রতিনিধির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি হেনে চেয়ারে বসে পড়লেন নিজের।

    কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করার পর হার্ডিন হঠাৎ জোরে একটা মোচড় দিয়ে খুলে ফেললেন সিলিণ্ডারটা। সৎ করে একটা ভাঁজ করা কাগজ বেরিয়ে পড়ল সেটার ভেতর থেকে। সেরম্যাক ছাড়া বাকি তিনজন একটা ত্বরিত দৃষ্টি হানলেন সেটার দিকে।

    হার্ডিন বলে উঠলেন, সংক্ষেপে, সরকার যা বলতে চায় তা হচ্ছে, সরকার জানে, সে কী করছে। কথা শেষ করে পড়তে শুরু করলেন তিনি। একগাদা জটিল আর অর্থহীন কোডে ভরা কাগজটা। এক কোনায় পেন্সিলে লেখা তিনটি শব্দে মূল মেসেজটা লেখা। এক নজর সেটা দেখেই ভস্মীকরণ যন্ত্রের শ্যাফটের ভেতর গাছাড়াভাবে কাগজটা ঢুকিয়ে দিলেন তিনি।

    আমাদের সাক্ষাত্তারপর্ব এখানেই শেষ হচ্ছে, বললেন তিনি। আপানাদের সঙ্গে কথা বলে খুশি হয়েছি আমি। এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ। দায়সারাভাবে সবার সঙ্গে করমর্দন করলেন হার্ডিন। সার বেঁধে বেরিয়ে গেল প্রতিনিধি চারজন। হার্ডিন সাধারণত কম হাসেন, কিন্তু সেরম্যাক এবং তার তিন নীরব সঙ্গী বেরিয়ে খানিকদূর যাবার পরই তিনি মুখ টিপে একটা চাপা হাসি হাসলেন।

    ধাপ্পাবাজির যুদ্ধটা কেমন লাগল, লী?

    অসন্তুষ্ট ভঙ্গিতে ঘেৎ জাতীয় একটা শব্দ করলেন লী। লোকটা ধাপ্পা দিচ্ছে বলে কিন্তু মনে হয়নি আমার। ওর সঙ্গে নরম ব্যবহার কর, দেখবে সামনের নির্বাচনে জিতে গেছে সে তার কথামত।

    হতেই পারে, তা হতেই পারে- যদি না তার আগেই কিছু ঘটে যায়।

    এবার যেন ওরা উল্টো-পাল্টা কিছু ঘটাতে না পারে সেদিকে নজর রেখ, হার্ডিন। আমি তোমাকে বলে রাখছি, এই সেরম্যাকের একটা বিরাট জনসমর্থন রয়েছে। যদি সে সামনের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে তাহলে? শক্তিপ্রয়োগ সম্পর্কে তোমার ঐ শ্লোগান সত্ত্বেও কিছু তুমি আর আমি একবার শক্তি প্রয়োগ করেই কার্যোদ্ধার করেছিলাম।

    একটা ভুরু ওপরে উঠে গেল হার্ডিনের। আজ তুমি বড় হতাশাবাদী হয়ে পড়েছ, লী। আবার তার উল্টোটাও বটে, নইলে শক্তি প্রয়োগের কথা বলতে না। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, আমাদের সেই ছোট বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের কোনো রক্তপাত হয়নি, কোনো প্রাণহানি ঘটেনি, ওটা ছিল সঠিক সময়ে নেয়া একটা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। আর সেটা সম্পন্ন হয়েছে নির্বিঘ্নে, নিঝঞ্ঝাটে; তবে বেশ পরিশ্রমের ফলে। অবশ্যি সেরম্যাক পুরোপুরি উল্টো ধরনের মানুষ। তুমি আর আমি, বুঝেছ, লী, ইনসাইক্লোপীডিস্ট নই। আমাদের একটা প্রস্তুতি আছে। ছোকরাদের ওপর নজর রাখার ব্যবস্থা কর। কিন্তু দেখ, ওরা যেন কিছু টের না পায়।

    যেন বেশ মজা পেয়েছেন, এমনভাবে হেসে উঠলেন লী। তোমার অর্ডার পাবার অপেক্ষায় বসে আছি বলে মনে করেছ? সেরম্যাক আর তার সঙ্গী-সাথীদের চোখে চোখে রাখা হচ্ছে তা প্রায় এক মাস হতে চলল।

    একটা চাপা হাসি হাসলেন মেয়র। তাই! তাহলে তো সব ঠিকই আছে। ভাল কথা, গলা একটু খাদে নামালেন তিনি, অ্যামব্যাসাডার ভেরিসফ টার্মিনাসে ফিরে আসছেন। আশা করছি সাময়িকভাবে।

    খানিক নীরবতা। তারপর লী বললেন, মেসেজে তাই লেখা ছিল? এর মধ্যে সবকিছু ভেঙে পড়ছে নাকি?

    জানি না। ভেরিসফ কী বলে সেটা শোনার আগ পর্যন্ত কিছু বলতে পারছি না। ভেঙে পড়তেই পারে। তবে তা হতে হবে ইলেকশনের আগে। কিন্তু তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন?

    কারণ, আমি জানি না কী ঘটতে যাচ্ছে, বা পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে। তুমি খুব চাপা স্বভাবের লোক, হার্ডিন। কী করছ, না-করছ, তা তুমি ছাড়া আর কেউ জানে না।

    ক্লটাস, তুমিও! বিড়বিড় করে বললেন হার্ডিন। তারপর গলায় জোর এনে বললেন, এর মানে কি এই যে তুমিও সেরম্যাকের দলে যোগ দিচ্ছ?

    অনিচ্ছাসত্তেও হেসে উঠলেন লী। ঠিক আছে। তুমিই জিতলে। তা, লাঞ্চটা সারা যায় না এখন?

    .

    দুই

    তীক্ষ্ণ ব্যঞ্জনাপূর্ণ উক্তি করায় হার্ডিন সিদ্ধহস্ত। এ ধরনের বহু উক্তিই হার্ডিনের নামে চালু আছে, যদিও সেগুলোর একটা বিরাট অংশই তাঁর কিনা সে নিয়ে প্রবল সংশয় আছে। তারপরেও বলা হয়ে থাকে, একবার নাকি তিনি বলেছিলেন:

    খোলামেলা হওয়ার কিছু সুবিধা আছে, বিশেষ করে, লুকোছাপার ব্যাপারে যদি কারো খ্যাতি থেকে থাকে।

    একাধিকবার সে-উপদেশ অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ হয়েছে পলি ভেরিসফের। তার কারণ, বর্তমানে তিনি অ্যানক্রিয়নে তাঁর দ্বৈত পদমর্যাদার চতুর্দশ বছর অতিবাহিত করছেন। এমনই এক দ্বৈত পদমর্যাদা যার ঠাট বজায় রাখতে গিয়ে তার প্রায়ই অপ্রসন্নচিত্তে মনে পড়ে উত্তপ্ত ধাতব মেঝের ওপর খালি পায়ে নাচার কথা।

    অ্যানাক্ৰিয়নের জনগণের কাছে তিনি হাই প্রিস্ট, ফাউণ্ডেশনের প্রতিনিধি- যে ফাউণ্ডেশন বর্বর জনসাধারণের কাছে এক চুড়ান্ত রহস্য, যে ফাউণ্ডেশন হার্ডিন আর তাদের তৈরি করা ধর্মের বাস্তব ভিত্তিভূমি। এই পদমর্যার কারণে বেশ শ্রদ্ধা-ভক্তি পান তিনি মানুষের। কিন্তু বড় ক্লান্তিকর লাগে তার কাছে এই শ্রদ্ধা। তার কারণ, যে আচার-ব্যবস্থার তিনি কেন্দ্রস্থল সেটাকেই তিনি মনে-প্রাণে ঘৃণা করেন। একেবারে অন্তর থেকে ঘৃণা করেন।

    কিন্তু অ্যানাক্ৰিয়নের রাজার কাছে তিনি সাধারণ একজন রাষ্ট্রদূত মাত্র। তবে এমন এক শক্তির দূত তিনি, যে-শক্তি একই সঙ্গে ভীতিকর এবং লোভনীয়। আগের বৃদ্ধ রাজা এবং বর্তমানে সিংহাসনে আসীন তার তরুণ পৌত্র- দুজনের কাছেই।

    মোটের ওপর তার পেশা খুব একটা সুবিধের নয়। তিন বছর পর এলেন তিনি ফাউণ্ডেশনে। একটা বিরক্তিকর ঘটনা আসতে বাধ্য করেছে তাকে। কিন্তু তার পরেও অনেকটা ছুটি কাটানোর মেজাজ নিয়েই এসেছেন তিনি এখানে।

    আর কাকপক্ষীকেও জানাতে না দিয়ে আসাটা যেহেতু এবারই প্রথম নয় তাঁর জন্যে আর তাই আবার আগের কৌশলটাই ব্যবহার করলেন তিনি।

    পাদ্রির পোশাক ছেড়ে সাধারণ পোশাক পরে নিলেন। ছুটির একটা আমেজ সেই পোশাকেই ফুটে উঠল। তারপর ফাউন্ডেশনের উদ্দেশে চড়ে বসলেন একটা প্যাসেঞ্জার লাইনারে। সেকেণ্ড ক্লাস কামরায়। টার্মিনাসে নেমে স্পেস-পোর্টের ভিড় ঠেলে বাইরে এসে একটা পাবলিক ভিসিফোনে যোগাযোগ করলেন সিটি হলের সঙ্গে।

    বললেন, আমার নাম জ্যান স্মাইট। আজ বিকেলে মেয়রের সঙ্গে একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।

    অপর প্রান্তের নিপ্রাণ গলার মহিলা দ্বিতীয় একটি সংযোগ স্থাপন করে কিছু কথা বিনিময় করল। তারপর শুকনো, যান্ত্রিক কণ্ঠে ভেরিসফকে জানাল, মেয়র হার্ডিন আধ ঘণ্টার মধ্যে আপনার সঙ্গে দেখা করবেন, স্যার, তারপরই নেই হয়ে। গেল স্ক্রীন থেকে।

    অ্যানাক্ৰিয়নের রাষ্ট্রদূত টার্মিনাস সিটি জার্নালের সর্বশেষ সংস্করণের একটা কপি কিনলেন। সিটি হল পার্কের দিকে এগুলেন ধীর পায়ে। প্রথম যে খালি বেঞ্চটা সামনে পড়ল সেটাতেই বসে পড়লেন। তারপর সময় কাটানোর জন্যে একে একে সম্পাদকীয়, খেলার পাতা আর কমিক শিটটা শেষ করলেন। আধ ঘণ্টা পেরিয়ে যেতে কাগজটা বগলদাবা করে ঢুকে পড়লেন সিটি হলে। সোজা চলে এলেন হার্ডিনের রুমে।

    পরিচয় লুকোবার কোনো চেষ্টা করেননি বলেই এত কিছুর পরেও কেউ-ই চিনতে পারল না তাঁকে।

    হার্ডিন মুখ তুলে তাকালেন। আকর্ণ বিস্তৃত এক হাসি উপহার দিলেন হাই প্রিস্টকে। নাও, সিগার খাও। ভ্রমণটা কেমন হলো?

    ভেরিসফ এগিয়ে এসে নিজেই একটা সিগার তুলে নিলেন। ইন্টারেস্টিং। আমার পাশের কেবিনেই এক পাদ্রি উঠেছিল। ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য রেডিও অ্যাকটিভ সিনথেসিস তৈরির ব্যাপারে একটা স্পেশাল কোর্সে অংশ গ্রহণ করতে টার্মিনাসে আসার জন্যে-

    লোকটা নিশ্চয়ই ঠিক রেডিও অ্যাকটিভ সিনথেসিস কথাটা ব্যবহার করেনি?

    অবশ্যই না। তার কাছে জিনিসটা হোলি ফুড- পবিত্র পথ্য।

    হাসলেন মেয়র। বলে যাও।

    ঈশ্বরতত্ত্ব সম্পর্কে এক আলাপ ফেঁদে আমাকে তো সে একরকম মুগ্ধই করে ফেলল। খুব এক চোট চেষ্টা চালাল নোংরা ইহজাগতিক চিন্তা-ভাবনা থেকে আমাকে মুক্ত করে আনতে।

    অথচ নিজের দেশের হাই প্রীস্টকে ঘুণাক্ষরেও চিনতে পারল না?

    আমার ঐ গাঢ় লাল আলখাল্লা ছাড়া? তাছাড়া, লোকটা স্মিরনিয়ার বাসিন্দা। যাই হোক, অভিজ্ঞতাটা বেশ মজার। রিলিজিয়ন অভ সায়েন্স-এর এই গেড়ে বসার ব্যাপারটা কিন্তু লক্ষ্য করার বিষয়, হার্ডিন। ব্যাপারটা নিয়ে আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছি- স্রেফ খেয়ালের বশেই অবশ্যি। কোথাও ছাপাবার ইচ্ছে নেই। তো, সমস্যাটিকে আমি সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছি। দেখিয়েছি যে গ্যালাক্সির প্রান্তসীমায় যখন প্রাচীন সাম্রাজ্যে ঘুণ ধরল, তখন কিন্তু বিজ্ঞান খোদ বিজ্ঞান হিসেবে আউটার ওয়ার্ল্ডগুলোতে তার ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে। আবার গ্রহণযোগ্য হতে হলে একে এক নতুন রূপে হাজির হতে হতো। আর এই যাজকতন্ত্র ঠিক সেই কাজটিই করছে, অর্থাৎ বিজ্ঞানকে মানুষের সামনে একটা নতুন রূপে হাজির করছে। সিম্বলিক লজিক ব্যবহার করলেই খুব চমৎকারভাবে বেরিয়ে আসে ব্যাপারটা।

    ইন্টারেস্টিং! মেয়র তাঁর হাত দুটো ঘাড়ের পিছে রাখলেন। তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করলেন, অ্যানাক্রিয়নের পরিস্থিতি কেমন?

    ভুরু জোড়া ধনুক করে মুখ থেকে সিগারটা বের করলেন ভেরিসফ। বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে সেটার দিকে তাকিয়ে টেবিলের ওপর রেখে দিলেন। বললেন, তা, পরিস্থিতি বেশ খারাপ।

    নইলে কি আর তুমি আসতে এখানে?

    তা ঠিক। তো, পরিস্থিতিটা এ রকম- অ্যানাক্রিয়নের সব কলকাঠি নাড়াচ্ছেন প্রিন্স রিজেন্ট (রাজপুত্রের প্রতিনিধিত্বকারী শাসক- অনুবাদক) উইনিস। রাজা লিপন্ডের চাচা।

    সে কথা আমি জানি। কিন্তু লিপল্ড তো সামনের বছরই সাবালক হচ্ছে, তাই? আগামী ফেব্রুয়ারিতেই বোধহয় মোলতে পড়ছে সে।

    হ্যাঁ। বিরতি, তারপর বিরক্তিভরা কণ্ঠ, যদি বেঁচে থাকে তদ্দিন পর্যন্ত। লিপন্ডের বাবার মৃত্যুটা ঠিক স্বাভাবিক ছিল না। শিকারের সময় একটা সুচ-বুলেট এসে বেঁধে তার বুকে। বলা হয়েছে, অ্যাক্সিডেন্ট।

    হুম! টার্মিনাস থেকে ওদের যখন আমরা লাথি মেরে তাড়াই তখন অ্যানাক্রিয়নে একবার দেখেছিলাম বোধহয় উইনিসকে। তুমি তখনো হাই প্রীস্ট হওনি। যদুর মনে পড়ে, লোকটা কালো, চুলও কালো, ডান চোখটা একটা ট্যারা, নাকটা বড়শির মতো হাস্যকর রকমের বাঁকা। বয়সে তরুণ ছিল তখন।

    একই লোক। বড়শির মতো নাক আর ট্যারা চোখ এখনো আছে। চুলগুলো শুধু পেকে গেছে। পানি ঘোলা করছে সে-ই। ভাগ্য বলতে হবে, পুরো গ্রহে তার মতো নির্বোধ আর একটাও নেই। ধূর্ত একট শয়তান বলে ভাবে নিজেকে; তাতে ওর নির্বুদ্ধিতাই প্রকট হয়ে ওঠে আরো।

    সেটাই স্বাভাবিক।

    ডিম ভাঙতে অ্যাটমিক ব্লাস্টার ব্যবহার করার পক্ষপাতী লোকটা। দুবছর আগে বুড়ো রাজা মারা যাওয়ার ঠিক পরপরই মন্দিরের সম্পত্তির ওপর ট্যাক্স বসাতে চেয়েছিল সে। মনে পড়ে?

    চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন হার্ডিন। মৃদু হাসলেন তারপর। পাদ্রিরা তাতে মহা চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছিল।

    লুক্রেজা থেকে শোনা গিয়েছিল সেই চেঁচামেচি। এর পর থেকে সে যাজকতন্ত্রের সঙ্গে বেশ বুঝে সমঝে চলে বটে, কিন্তু অন্যান্য ব্যাপারে পরিস্থিতি ঘোলা করার ব্যাপারটা ঠিকই বজায় রেখে চলেছে। একদিক দিয়ে এটা আমাদের জন্যে দুঃখজনক; লোকটার আত্মবিশ্বাস সীমাহীন।

    তুমি যাকে সীমাহীন আত্মবিশ্বাস বলছ সেটা সম্ভবত অতি খেসারত দেয়া হীনমন্যতা। রাজ পরিবারের ছোট ছেলেরা ওরকমই হয়।

    কিন্তু দুটোর ফল তো সেই একই। ফাউণ্ডেশন আক্রমণ করার উদগ্র বাসনায় ওর মুখ দিয়ে লালা ঝরছে। ব্যাপারটা গোপন করার খুব একটা চেষ্টাও সে করে না। আর অস্ত্রশস্ত্রের দিক দিয়ে দেখতে গেলে, আক্রমণ করার মতো অবস্থাও তার আছে। বুড়ো রাজা একটা অসাধারণ নেভি গড়ে দিয়ে গিয়েছিল। আর উইনিসও গত দুবছর নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকেনি। আসলে মন্দিরের সম্পত্তির ওপর সে ট্যাক্স বসাতে চেয়েছিল তার অস্ত্র-ভাণ্ডারটাকে আরো শক্তিশালী করার জন্যই। ওখানে কামড় বসাতে না পেরে সে ইনকাম ট্যাক্স দ্বিগুণ করে দেয়।

    তাতে কোনো অসন্তোষ দেখা দেয়নি?

    তেমন গুরুতর কিছু নয়। কর্তৃপক্ষের প্রতি বাধ্য থাকার ওপর জোর দিয়ে রাজ্যে কয়েক সপ্তাহ ধরে ধর্মীয় উপদেশ দেয়া হয়েছিল।

    ঠিক আছে, পটভূমিটা জানা গেল। এখন বলো কী ঘটেছে?

    দুহপ্তা আগে অ্যানাক্ৰিয়নের এক মার্চেন্ট শিপ ওল্ড ইম্পেরিয়াল নেভির একটা পরিত্যক্ত ব্যাটল ক্রুজার-এর মুখোমুখি হয়। ক্রুজারটা নিঃসন্দেহে অন্তত তিন শতাব্দী ধরে ঘুরে বেড়াচ্ছিল মহাশূন্যে।

    আগ্রহে হার্ডিনের চোখের তারা জ্বলে উঠল। উঠে বসলেন তিনি। হ্যাঁ, শুনেছি আমি ওটার কথা। বোর্ড অভ নেভিগেশন আমার কাছে একটা আবেদন পাঠিয়েছিল, যাতে আমি শিপটা নিয়ে এসে পরীক্ষা করে দেখি। বেশ ভাল অবস্থাতেই আছে

    ওটা, যদুর বুঝতে পারছি।

    শুকনো গলায় ভেরিসিফ বললেন, খুবই ভাল অবস্থায়। আপনি তাকে শিপটা ফাউণ্ডেশনের হাতে তুলে দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শুনে গত হপ্তায় উইনিস তো চটে লাল।

    এখনো কোনো জবাব দেয়নি সে। দেবেও না- বন্দুক দিয়ে যদি দেয়; অন্তত ও তাই দিতে চায়। আমি যেদিন অ্যানাক্রিয়ন ছেড়ে আসি সেদিন সে আমার কাছে এসে অনুরোধ করল যাতে ফাউণ্ডেশন ব্যাটল ক্রুজারটিকে যুদ্ধের উপযোগী করে অ্যানাক্রিয়ন নেভির কাছে হস্তান্তর করে। লোকটা কী ধুরন্ধর দেখুন, বলে কিনা, গত হপ্তায় আপনার পাঠানো খবরটা নাকি আর কিছুই না, ফাউণ্ডেশনের অ্যানাক্ৰিয়ন আক্রমণের একটা পাঁয়তারা মাত্র। সে বলল, ব্যাটল ক্রুজার মেরামত করে দিতে অস্বীকার করলে নাকি তার সন্দেহটাই বদ্ধমূল হবে। সেই সঙ্গে এটাও বুঝিয়ে দিল ইঙ্গিতে যে, সেক্ষেত্রে অ্যানাক্ৰিয়নের আত্মরক্ষার ব্যাপারটা তাকে বাধ্য হয়েই দেখতে হবে। কথার কী ছিরি! বাধ্য হয়ে দেখতে হবে। তো, এজন্যই আমাকে দেখছেন এখানে।

    মৃদু হাসলেন হার্ডিন।

    ভেরিসফও হাসলেন। বললেন, আপনি প্রস্তাবটা ফিরিয়ে দেবেন সেটাই আশা করছে সে। তাহলে মোক্ষম একটা অজুহাত পেয়ে যাবে অবিলম্বে আক্রমণ করার।

    সে আমি বুঝতে পারছি, ভেরিসফ। যাই হোক, মাস ছয়েকের মতো সময় আছে আমাদের হাতে। এর মধ্যে শিপটা মেরামত করে আমার শুভেচ্ছাসহ উপহার দিয়ে এসো ভদ্রলোককে। আমাদের শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ ওটার নতুন নাম দিও দ্য উইনিস।

    আবারো হেসে উঠলেন তিনি।

    প্রত্যুত্তরে ভেরিসফের মুখেও হালকা হাসি ছড়াল। আশা করছি আপনি যুক্তিসঙ্গত ভাবেই পদক্ষেপটা নিচ্ছেন, হার্ডিন- কিন্তু আমি চিন্তিত বোধ করছি।

    কোন ব্যাপারে?

    এটা একটা পুরনো আমলের শিপ। এটার কিউবিক ক্যাপাসিটি গোটা অ্যানাক্রিয়ন নেভির অর্ধেক। গোটা একটা গ্রহ উড়িয়ে দেয়ার মতো অ্যাটমিক ব্লাস্ট আছে শিপটার। তাছাড়াও আছে এমন একটা শীল্ড, যেটা কোনো রকম রেডিয়েশন না ছড়িয়েই কিউ-বীম হজম করে ফেলতে পারে। এত ভাল একটা জিনিস কি হার্ডিন-

    দেখ ভেরিস, তুমি আমি দুজনেই জানি, তার হাতে এখন যে পরিমাণ অস্ত্র আছে তা দিয়ে অনায়াসে টার্মিনাসকে পরাজিত করতে পারে সে। আর ব্যাটল ক্রুজারটা মেরামত করে আমাদের কাজে লাগাবার অনেক আগেই সে এ কাজ করার শক্তি রাখে। সুতরাং শিপটা যদি আমরা তাকে দিয়ে ফেলি তাহলে এমন কী আর উনিশ-বিশ হবে? তুমি ভাল করেই জান, ব্যাপারটা শেষতক যুদ্ধ পর্যন্ত গড়াবে না।

    হয়ত। কিন্তু হার্ডিন-

    থেমে গেলে কেন? বলে ফেল।

    দেখুন, এটা আমার প্রদেশ নয়, তা-ও বলছি। এই কাগজটা পড়ছিলাম।

    জানালটা ডেস্কের উপর বিছিয়ে প্রথম পাতার প্রতি মেয়রের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন তিনি। এই খবরটার মানে কী?

    হার্ডিন অলস চোখে একবার তাকালেন সেদিকে। একদল কাউন্সিল সদস্য নতুন একটা রাজনৈতিক দল গঠন করছে।

    অস্থির দেখাল ভেরিসফকে। আমি জানি, অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে আপনি আমার চেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল। কিন্তু এরা তো দেখছি আপনার গায়ে হাত দিতেই বাকি রেখেছে শুধু। কতটা শক্তিশালী এরা?

    ভীষণ শক্তিশালী। সামনের নির্বাচনের পর ওরা-ই সম্ভবত কাউন্সিল চালাবে।

    তার আগে নয় তো? মেয়রের দিকে তির্যক দৃষ্টি হানলেন ভেরিসফ। নির্বাচন ছাড়াও নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবার কায়দা আছে।

    তুমি কি আমাকে উইনিস মনে করছ?

    না। কিন্তু শিপটা মেরামত করতে মাস খানেক লেগে যাবে। আর তারপরই যে আক্রমণ হবে সেটা নিশ্চিত। আমরা বশ্যতা স্বীকার করলে সেটা ভয়ানক দুর্বলতার পরিচায়ক হবে। তাছাড়া ইম্পেরিয়াল ক্রুজারটা হাতছাড়া হলে উইনিস-এর নেভির শক্তি দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। আমি একজন হাই প্রীস্ট- এটা যেমন সত্যি, ও যে হামলা করবে সেটাও তেমনি সত্যি। কেন ঝুঁকি নিচ্ছেন শুধু শুধু? দুটো কাজের একটা করুন- হয় নির্বাচনী প্রচারণার পরিকল্পনাটা কাউন্সিলের কাছে খোলাসা করে দিন, আর নয়তো অ্যানাক্ৰিয়নের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ুন।

    ভুরু কোঁচকালেন হার্ডিন। অ্যানক্রিয়নের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ব? সংকট দেখা দেবার আগেই এই কাজটা আমি একদমই করতে পারব না। হ্যারি সেলডন আর তার প্ল্যানের একটা ব্যাপার আছে, তুমি তো জানই।

    একটু ইতস্তত করে ভেরিসফ বিড়বিড় করে বললেন, আপনি তাহলে পুরোপুরি নিশ্চিত, একটা প্ল্যান সত্যিই আছে?

    সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই বললেই চলে, দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিলেন হার্ডিন। ভল্টটা খোলার সময় আমি সেখানে ছিলাম আর সেলডনের রেকর্ড করা বক্তব্যে পষ্ট করে বলা ছিল সেকথা।

    আমি সেকথা বলিনি হার্ডিন। আমি ঠিক এই কথাটা বুঝতে পারছি না, এক হাজার বছরের পরের ইতিহাস কী আগে থেকে নির্ণয় করা সম্ভব? হতে পারে সেলডন ওভারএস্টিমেট করেছিলেন নিজেকে। হার্ডিনের ব্যাঙ্গাত্মক হাসি দেখে খানিকটা মিইয়ে গেলেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে যোগ করলেন, অবশ্যি আমি সাইকোলজিস্ট নই।

    ঠিক তাই। আমরা কেউই নই। তবে যৌবনে কিছু প্রাথমিক ট্রেনিং নিয়েছিলাম তার থেকে আমি কোনো ফায়দা নিতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু সাইকোলজির দৌড় কর তা জানার জন্য যথেষ্ট ছিল ট্রেনিংটা। যা করতে পেরেছেন বলে সেলডন দাবি করেছেন, তা যে তিনি সত্যিই করেছেন তাতে কোনো সন্দেহই নেই। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল একটা সায়েন্টিফিক রিফিউজ বা বৈজ্ঞানিক আশ্রয় শিবির হিসেবে, যে আশ্রয় শিবিরের সাহায্যে মুমূর্ষ এম্পায়ারের বিজ্ঞান আর সংস্কৃতিকে সদ্য শুরু হওয়া বর্বরতার মধ্যেও বাঁচিয়ে রেখে শেষ পর্যন্ত একটা দ্বিতীয় এম্পায়ারের ভেতর দিয়ে আবার প্রজ্বলিত করা হবে।

    দ্বিধান্বিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন ভেরিসফ। সবাই জানে ঘটনাগুলো এই পরিকল্পনা অনুযায়ীই ঘটার কথা। কিন্তু ঝুঁকি নেয়াটা কি পোষাবে আমাদের? শূন্যগর্ভ একটা ভবিষ্যতের জন্যে বর্তমানকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেব আমরা?

    অবশ্যই দেব। তার কারণ, ভবিষ্যণ্টা শূন্যগর্ভ নয় মোটেই। সেলডন এটা শুধু হিসেব করেই রেখে যাননি, একটা চিত্রও এঁকে দিয়ে গেছেন। আমাদের ইতিহাসের ধারাবাহিক প্রতিটি সংকটের চেহারা-চরিত্র নির্ণয় করা হয়েছে। এসব সংকটের প্রত্যেকটি ঠিক তার পূর্ববর্তী সংকটের সাফল্যজনক সমাধানের ওপর অনেকখানি নির্ভরশীল। এটা সবে দ্বিতীয় সংকট- স্পেস জানে, সামান্য বিচ্যুতিও শেষ পর্যন্ত না

    জানি কী ফল বয়ে আনে।

    এ হিসেব-নিকেশ নেহাতই অর্থহীন।

    না! টাইম-ভল্টে সেদিন হ্যারি সেলডন নিজে বলেছেন, প্রতিটি সংকটের সময় আমাদের ফ্রীডম অভ অ্যাকশন সংকুচিত হতে হতে এমন এক পর্যায়ে চলে আসবে যে, তখন মাত্র একটা পথে এগোনো ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।

    আমাদেরকে স্ট্রেইট অ্যাণ্ড ন্যারো- সরল ও সংকীর্ণ পথে চালিত করার জন্য?

    হ্যাঁ, যাতে আমরা পথ হারিয়ে না ফেলি। আবার উল্টোভাবে একথাও ঠিক যে, যতক্ষণ পর্যন্ত একাধিক পথে এগোনো সম্ভব হচ্ছে, ধরে নিতে হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো সংকট নেই বা আসেনি। ঘটনাপ্রবাহকে অবশ্যই নিজের মতো করে এগিয়ে যেতে দিতে হবে আমাদের। আর স্পেসের দোহাই দিয়ে বলছি, আমি ঠিক তাই করতে যাচ্ছি।

    ভেরিসফ চুপ করে রইলেন। নিচের ঠোঁটটা দাঁত দিয়ে কামড়াচ্ছেন তিনি। মাত্র একবছর আগে সমস্যাটি নিয়ে হার্ডিন প্রথম আলাপ করেছিলেন তার সঙ্গে সত্যিকারের এই সমস্যাটা নিয়ে। কী করে অ্যানাক্ৰিয়নের আক্রমণাত্মক প্রস্তুতি মোকাবিলা করা যায়। করেছিলেন তার কারণ ভেরিসফ আপত্তি তুলেছিলেন ভবিষ্যতে আর কোনো তোষামোদ করার ব্যাপারে।

    হার্ডিন যেন ভেরিসফের মনের কথাটা বুঝতে পেরেই বললেন, তোমাকে এ ব্যাপারে কিছু না বলাই উচিত ছিল আমার।

    কেন মনে হল কথাটা আপনার? বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলেন ভেরিসফ। কারণ, সামনে কী রয়েছে, সেসম্পর্কে ধারণা আছে ছজন লোকের তোমার, আমার, তিনজন রাষ্ট্রদূতের আর ইয়োহান লী-র। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, ছজন কেন একজনও কিছু জানুক এটা সেলডন চাননি-

    কেন?

    কারণ, এমনকি সেলডনের অ্যাডভান্সড সাইকোলজির ক্ষমতাও ছিল সীমাবদ্ধ। খুব বেশি সংখ্যক ইণ্ডিপেণ্ডেন্ট ভ্যারিয়েবল নিয়ে কাজ করার ক্ষমতা ছিল না সেটার। বায়বীয় পদার্থের গতি-তত্ত্ব যেমন আলাদা কণার ওপর প্রয়োগ করতে পারো না, সেলডনও তেমনি ব্যক্তি বিশেষের কোনো সময়সীমা নিয়ে কাজ করতে পারেননি। সেলডন কাজ করেছেন জনসাধারণকে নিয়ে সব গ্রহের জনসংখ্যা নিয়ে, আর শুধুমাত্র সেই ধরনের অন্ধ জনসাধারণ নিয়ে নিজেদের কাজের ফলাফল সম্পর্কে যাদের কোনো পূর্বধারণা নেই।

    ব্যাপারটা পরিষ্কার হলো না।

    আমি নিরুপায়। বিজ্ঞানসম্মতভাবে ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার মতো যোগ্য সাইকোলজিস্ট আমি নই। টার্মিনাসে কোনো ট্রেইনড সাইকোলজিস্ট নেই। নেই এটার ওপর কোনো গাণিতিক বই-পত্তর। এটা পানির মতো পরিষ্কার যে, আগেভাবেই ভবিষ্যৎ আঁচ করে ফেলবার মতো কেউ টার্মিনাসে থাকুক তা তিনি চাননি। সেলডন চেয়েছেন, আমরা অগ্রসর হব অন্ধের মতো- পরিণতিতে পা দেব সঠিক পথে- মব সাইকোলজির নীতি অনুসারে। তোমাকে আমি আগেও বলেছি, অ্যানাক্রিয়নবাসীদের যখন এখান থেকে তাড়িয়ে দিই, তখন আমি নিজেও জানাতাম না কোন দিকে এগুচ্ছি আমরা। আমার ইচ্ছা ছিল শক্তির ভারসাম্য রক্ষা করা, তার বেশি কিছু নয়। কাজটা করার পরই কেবল আমি যেন ঘটনাগুলোর মধ্যে একটা প্যাটার্ন দেখতে পেলাম। পাছে দূরদৃষ্টিজনিত বাধার কারণে প্ল্যানটা ভণ্ডুল হয়ে যায় সেজন্যে পরে আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করেছি এই পূর্বজ্ঞান বা পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুযায়ী কাজ না করতে।

    চিন্তিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন ভিরিফ। অ্যানাক্ৰিয়নের মন্দিরগুলোতেও প্রায় এ-রকম জটিল যুক্তি শুনেছি আমি। তা, অ্যাকশন নেবার সঠিক সময়টা কীভাবে নির্বাচন করবেন আপনি?

    সেটা অলরেডি নির্বাচন করা হয়ে গেছে। একটু আগেই তুমি স্বীকার করেছ ব্যাটল-ক্রুজারটা আমরা মেরামত করে দিলেই উইলিস আমাদের আক্রমণ করবে, এর কোনো বিকল্প নেই। ঠিক কিনা?

    হ্যাঁ।

    বেশ। এ তো গেল বাইরের ব্যাপার। এদিকে তুমি আরো স্বীকর করবে যে, সামনের নির্বাচনের পর নতুন আর আগ্রাসী এক কাউন্সিল ক্ষমতায় বসবে আর তারা অ্যানাক্ৰিয়নের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগ করবে। এক্ষেত্রেও কোনো বিকল্প নেই।

    হ্যাঁ। আর, সব বিকল্প যখন একে একে নেই হয়ে যাচ্ছে, বুঝতে হবে, সংকট দোরগোড়ায়। এজন্যেই আমি উদ্বিগ্ন।

    বিরতি দিলেন হার্ডিন। ভেরিসফ অপেক্ষা করছেন। হার্ডিন আবার শুরু করলেন, আমার একটা কথা মনে হচ্ছে- স্রেফ একটা ধারণা মাত্র, আর সেটা হচ্ছে, বাইরের এবং ভেতরের চাপ দুটোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে যাতে একই সঙ্গে তারা চরমে পৌঁছায়। এক্ষেত্রে কয়েকটা মাস এদিক-ওদিক হয়ে গেছে- উইনিস সম্ভবত বসন্তের আগেই আক্রমণ চালাবে, ওদিকে নির্বাচনের এখনো বছর খানেক বাকি।

    এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলে মনে হচ্ছে না।

    হতে পারে, আবার না-ও হতে পারে। আমি জানি না। এটা হয়ত স্রেফ হিসেবের অবধারিত ভুলেরই ফল। আবার এ-কারণেও হতে পারে যে, আমি একটু বেশিই জানতাম। সব সময়েই আমি চেষ্টা করেছি যাতে আমার দূরদর্শিতা আমার কাজে কোনো প্রভাব না ফেলে; কিন্তু সব সময়েই যে সে চেষ্টা সফল হয়েছে সে কথা কি আমি নিজেই জোর দিয়ে বলতে পারি? মাঝে মাঝে দুচারটে যে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়েছে তার এফেক্টটা কী হবে? যাই হোক, একটা ব্যাপারে আমি কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।

    কী সেটা?

    যখনই দেখব সংকটটা বাস্তব রূপ নিতে যাচ্ছে অমনি অ্যানাক্ৰিয়নে চলে যাব আমি। আই ওয়ান্ট টু বি অন দ্য স্পট।…আহ্ যথেষ্ট হয়েছে, ভেরিসফ। আর নয়। চল, বাইরে গিয়ে রাতটা একটু ফুর্তিতে কাটিয়ে আসি। আই ওয়ান্ট সাম রিলাক্সেশন।

    তাহলে সেটা এখানেই করার ব্যবস্থা করুন, ভেরিসফ বললেন। আমাকে কেউ চিনে ফেলুক সেটা আমি চাই না। চিনে ফেললে আপনার কাউন্সিল সদস্যদের নতুন পার্টি আবার কী রটাবে কে জানে। এখানেই ব্র্যাণ্ডি দিয়ে যেতে বলুন।

    হার্ডিন ব্র্যাণ্ডি আনালেন ঠিকই, কিন্তু খুব বেশি নয়।

    .

    তিন

    প্রাচীনকালে, গ্যালাকটিক এম্পায়ার যখন সারা গ্যালাক্সি জুড়ে বিস্তৃত এবং অ্যানাক্রিয়ন পেরিফেরির প্রিফেক্টগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ধনী হিসেবে পরিচিত, তখন একাধিক সম্রাট পদধূলি দিয়ে গেছেন এরাজ্যের রাজপ্রাসাদে। আর তখন সবাই অন্ত ত একবার এয়ার স্পীডস্টার এবং নীল গান দিয়ে পালকমোড়া উড়ন্ত নিয়াকবার্ড-এর বিরুদ্ধে তাদের দক্ষতা যাচাই করে গেছেন।

    কালস্রোতে অ্যানাক্রিয়নের সব গৌরব ভেসে গেছে। ফাউণ্ডেশনের কর্মীরা যে উইং-টা মেরামত করে দিয়েছে সেটা ছাড়া রাজপ্রসাদের বাকি অংশটা একটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত। দুশো বছর হতে চলল, কোনো সম্রাটের পা পড়েনি অ্যানাক্রিয়নে।

    তবে নিয়াক-শিকার এখনো রয়ে গেছে রাজক্রীড়া হিসেবে। এবং এখনো অ্যানাক্রিয়ানের রাজা হবার প্রাথমিক যোগ্যতাগুলোর একটি হচ্ছে নীড়ল গান-এর ব্যাপারে শ্যেনচক্ষু থাকা।

    বয়স এখনো ষোল না হলে কী হবে, অ্যানাক্ৰিয়নের রাজা এবং অনিবার্যভাবে, তবে মিছেমিছিই লর্ড অভ আউটার ডরিমনিয়নস বলে আখ্যায়িত- প্রথম লিপল্ড বহুবার তাঁর দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন নিয়াক-শিকারে। তিনি যখন প্রথম নিয়াকটি ভূপাতিত করেন, তখন তার বয়স কুড়িয়ে বাড়িয়েও তেরো হবে না। দশমটা ফেলেন সিংহাসনে আরোহণ করার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায়। এ-মুহূর্তে তিনি তাঁর ছেচল্লিশতম শিকার ধরাশায়ী করে ফিরছেন।

    সাবালক হবার আগেই পঞ্চাশ হয়ে যাবে, গলায় তাঁর উল্লাস। কেউ বাজি ধরতে রাজি আছে?

    কিন্তু পারিষদবর্গের কেউই সাধারণত রাজার দক্ষতা নিয়ে বাজি ধরতে রাজি হন না। তার কারণ, জিতে গেলে অর্থাৎ রাজা হেরে গেলে, চরম বিপদ হতে পারে। সুতরাং কেউই রাজি হলেন না। রাজা অতএব গর্বিত ভঙ্গিতে পোশাক বদলাতে চললেন।

    লিপন্ড!

    পদক্ষেপের মাঝ পথে, মাটিতে পা পড়ার আগেই, থেমে গেলেন লিপল্ড একটি ডাক শুনে। একমাত্র এই কণ্ঠেরই সাধ্য আছে তাকে এভাবে থামিয়ে দেবার। গোমড়ামুখে ঘুরে দাঁড়ালেন তিনি।

    নিজের চেম্বারের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন উইনিস।

    চলে যেতে বল ওদের, অস্থির গলায় বললেন তিনি। ছেড়ে দাও ওদের।

    আবছাভাবে মাথা নাড়লেন রাজা। দুজন রাজসেবক কুর্নিশ করে চলে গেল। লিপন্ড চাচার ঘরে ঢুকলেন।

    বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে রাজার শিকার-পোশাকের দিকে তাকালেন উইনিস।

    নিয়াক-শিকারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে মনোযোগ দেবার সময় আসছে তোমার শিগগিরই।

    ঘুরে ডেস্কের কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন তিনি। বয়সের কারণে এখন আর বাতাসের বেগ, বিপজ্জনক ডাইভ, স্পীডস্টারের ঘুরপাক এবং দ্রুত ওঠানামা সহ্য হয় না তার। সেজন্য খেলাটাকেও আর সহ্য করতে পারেন না তিনি।

    চাচার এই আঙুর ফল টক মনোভাবটা লিপন্ড ভালই বুঝতে পারেন। কিছুটা তাঁর প্রতি বিদ্বেষবশতই তিনি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, আজ কিন্তু, আংকল, আমাদের সঙ্গে থাকা উচিত ছিল তোমার! সামিয়ার অরণ্যে দানবের মতো একটা শিকার উড়িয়েছিলাম আমরা। দুই ঘণ্টা ধরে সত্তর বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ওটার সঙ্গে বোঝাঁপড়া হলো আমাদের। আর তারপর উঠতে শুরু করলাম আমি সূর্য বরাবর- যেন ফের তিনি তার স্পীডস্টারে চেপেছেন, এমনিভাবে চমৎকার অঙ্গ ভঙ্গি করছেন তিনি। তারপর ডাইভ দিলাম ঘূর্ণি বরাবর। ওঠার সময় ওর বাঁ ডানার একেবারে কাছে চলে এলাম আমি। এতে ভীষণ রেগে গিয়ে আড়াআড়িভাবে ধেয়ে গেল সে। চ্যালেঞ্জটা নিয়ে হঠাৎ বাঁ দিকে ঘুরে গেলাম আমি, ওর নিচে নেমে আসার আশায় অপেক্ষা করে রইলাম। সত্যি সত্যিই নিচে নেমে এল সে। ডানার ঝাঁপটার কাছাকাছি আসতেই ধেয়ে গেলাম আমি, আর তারপরই

    লিপন্ড!

    সত্যি-ই!–তারপরই পেড়ে ফেললাম আমি ওকে।

    বুঝলাম। এবার তুমি আমার কথা শুনবে?

    কাঁধ ঝাঁকিয়ে টেবিলের শেষ মাথার দিকে এগোলেন রাজা। একটা লিরা নাট নিয়ে সেটায় অ-রাজোচিত একটা কামড় বসালেন। পিতৃব্যের চোখে চোখ রাখতে সাহস পাচ্ছেন না তিনি।

    আলাপ শুরু করার ঢঙে উইনিস বললেন, শিপটায় গিয়েছিলাম আমি আজ।

    কোন শিপে?

    একটাই মাত্র শিপ আছে। নেভির জন্যে ফাউণ্ডেশন যেটা মেরামত করে দিচ্ছে সেই প্রাচীন ইম্পেরিয়াল ক্রুজার। আমি কি যথেষ্ট সহজ করে বলতে পেরেছি?

    ও, সেই শিপটা? আমি তো তোমাকে আগেই বলেছিলাম আমরা বললেই ফাউণ্ডেশন ওটা মেরামত করে দেবে। তুমি যে বলেছিলে, ওরা আমাদের আক্রমণ করতে চায়, সেটা বাজে কথা। আক্রমণই যদি করবে, তাহলে আর শিপ সারিয়ে দেবে কেন? ব্যাপারটা অর্থহীন না?

    লিপল্ড, তুমি একটা নির্বোধ।

    লিরা নাটটার বিচি ফেলে দিয়ে কেবলই আরেকটা তুলে নিতে যাচ্ছিলেন রাজা। চাচার কথা কানে যাওয়া মাত্র লাল হয়ে উঠল তার চেহারা।

    দেখ, গলায় স্পষ্ট ক্রোধ রাজার, তুমি আমাকে এভাবে গাল দিতে পার না। তুমি তোমার অবস্থান ভুলে যাচ্ছে। তুমি জান, দু মাসের মধ্যেই সাবালক হতে যাচ্ছি আমি।

    হ্যাঁ, রাজ্য সংক্রান্ত দায়-দায়িত্ব কাঁধে নেবার উপযুক্ত বয়স তোমার এখন। যে সময়টা তুমি নিয়াক-শিকারে ব্যয় কর, তার অর্ধেকটাও যদি পাবলিক অ্যাফেয়ার্সে ব্যয় করতে আমি তাহলে একটু স্বস্তিতে রিজেন্সি থেকে পদত্যাগ করতে পারতাম।

    আই ডোন্ট কেয়ার। নিয়াক-শিকারের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। তুমি যদিও রিজেন্ট এবং আমার চাচা, কিন্তু তারপরেও আমি রাজা আর তুমি প্রজা। আমাকে নির্বোধ বলা উচিত নয় তোমার। উচিত নয় আমার সামনে বসা-ও। তুমি আমার অনুমতি নাওনি। আমার মনে হয়, এ-ব্যাপারে তোমার সাবধান হওয়া উচিত- নইলে আমাকে একটা ব্যবস্থা নিতে হবে এবং খুব শিগগিরই।

    উইনিসের দৃষ্টি হিমশীতল। আপনাকে কি ইওর ম্যাজেস্টি বলে সম্বোধন করতে হবে?

    হ্যাঁ।

    বেশ! আপনি একটা নির্বোধ, ইওর ম্যাজেস্টি!

    রোমশ ভুরুর নিচে চোখ জোড়া জ্বলে উঠল লিপন্ডের। তরুণ রাজা ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন। কিছুক্ষণের জন্যে উইনিসের চেহারায় একটা ব্যঙ্গপূর্ণ ভাব দেখা দিলেও দ্রুত মিলিয়ে গেল সেটা। তার পুরু ঠোঁট জোড়া ফাঁক হয়ে হাসিতে পরিণত হলো। রাজার কাঁধের ওপর একটা হাত রাখলেন তিনি।

    কিছু মনে করো না, লিপন্ড। তোমার সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করা উচিত হয়নি আমার। মানুষের সঙ্গে ঠিকমত ব্যবহার করা মাঝে মাঝে খুব কঠিন হয়ে পড়ে। এতসব চাপের মুখে থাকতে হয় যে- বুঝতেই তো পারছ? তাঁর কথায় একটা আপোসরফার সুর থাকলেও, চোখের দৃষ্টিতে তার লেশমাত্র নেই।

    লিপল্ড দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে বললেন, হ্যাঁ, রাজ্যের পরিস্থিতি বেশ গোলমেলে। তার আশংকা হলো, এই বুঝি স্মিরনোর সঙ্গে সে-বছরের বাণিজ্য আর রেড করিডর-এর বিশ্বগুলোর বিক্ষিপ্তভাবে বসতি স্থাপন করা নিয়ে দীর্ঘ, উচ্চকণ্ঠ বিবাদের অর্থহীন খুঁটিনাটির বিরস খপ্পরে পড়ে গেলেন তিনি।

    উইনিস বললেন, বাবা, এসব নিয়ে অনেক আগেই তোমার সঙ্গে কথা বলব ভেবেছিলাম। বলা উচিতও ছিল সম্ভবত। কিন্তু আমি ভাল করেই জানি, তারুণ্যের উচ্ছ্বাসভরা এই সময়টাতে রাজ্য পরিচালনার খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো নিয়ে মাথা ঘামানোর ধৈর্য থাকে না কারো।

    লিপল্ড মাথা ঝাঁকালেন। না, সে ঠিক আছে-

    উইনিস রাজাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, দু মাসের মধ্যে সাবালক হচ্ছো তুমি। তাছাড়া সামনের কঠিন সময়গুলোতে তোমাকে সক্রিয়ভাবে পুরোপুরি কাজে নামতে হবে। এরপরই তুমি রাজা হবে, লিপল্ড।

    আবার মাথা ঝাঁকালেন লিপন্ড। কিন্তু তার চোখে-মুখে কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ পেল না।

    যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে, লিপল্ড।

    যুদ্ধ। কিন্তু রিনো-র সঙ্গে তো চুক্তি হয়েছে—

    স্মিরনোর সঙ্গে নয়, যুদ্ধ হবে খোদ ফাউণ্ডেশনের সঙ্গে।

    কিন্তু আংকল, ওরা তো শিপটা মেরামত করে দিতে রাজি হয়েছে। তুমি বলেছিলে-

    ঠোঁট জোড়া বেঁকে গেল উইনিসের। তাই দেখে থেমে গেলেন রাজা।

    লিপন্ড,- আন্তরিক ভাবটা খানিকটা উবে গেছে- খোলাখুলিভাবে কথা বলতে হবে আমাদের। শিপ মেরামত হোক বা না হোক, ফাউন্ডেশনের সঙ্গে যুদ্ধ হবেই। আর মেরামত যখন হচ্ছেই, তখন যুদ্ধটা হবে আরো তাড়াতাড়ি। সব ক্ষমতা আর শক্তির উৎস হচ্ছে এই ফাউণ্ডেশন। নিতান্ত অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফাউণ্ডেশন যে-ক্ষমতা আমাদের ফোঁটায় ফোঁটায় দিয়েছে, সেটার ওপরই অ্যানাক্রিয়নদের সব কিছু নির্ভর করছে- এর শিপ, শহর, নগর, জনগণ আর বাণিজ্য। আমার মনে আছে, একসময় অ্যানাক্ৰিয়নের শহরগুলোকে উত্তপ্ত করতে পোড়ান হতে কয়লা আর তেল। যাই হোক, ও নিয়ে ভেবো না, সেসময় সম্পর্কে তোমার কোনোই ধারণা নেই।

    মনে হচ্ছে, রাজা একটু ভয়ে ভয়েই বললেন, আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

    কৃতজ্ঞ? গর্জে উঠলেন উইনিস। কেন? নিজেদের জন্যে স্পেস জানে কি রেখে বাকি উচ্ছিষ্টটা আমাদের ওরা ছুঁড়ে দেয় বলে? তাছাড়া, কোন উদ্দেশ্যে নিজেদের জন্য এতকিছু জমাচ্ছে তারা? একটা উদ্দেশ্যেই একদিন যাতে তারা গ্যালাক্সি শাসন করতে পারে।

    ভাস্তের হাঁটুর ওপর এসে পড়ল তার একটা হাত। ছোট হয়ে এল চোখ জোড়া। লিপল্ড, তুমি অ্যানাক্ৰিয়নের রাজা; কিন্তু তোমার সন্তানেরা এবং তাদের সন্তানের সন্তানের সন্তানেরা একদিন গোটা মহাবিশ্বের সম্রাট হবে, শুধু যদি তুমি ফাউণ্ডেশন যে-শক্তিটা আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছে সেটা অর্জন করতে পার।

    একটা কিছু রহস্য আছে এর মধ্যে, জ্বলে উঠল লিপন্ডের চোখ জোড়া। শিরদাঁড়া সোজা করে বসলেন তিনি। শত হলেও, ওদের কী অধিকার আছে জিনিসটা আমাদের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার? মোটেই ভাল নয় এটা। অ্যানাক্ৰিয়নেরও দরকার আছে ঐ শক্তির।

    এতক্ষণে বুঝতে শুরু করেছ তুমি ব্যাপারটা। এখন আরেকটা ব্যাপার খেয়াল কর, বাবা। স্মিরনো যদি নিজেই ফাউণ্ডেশন আক্রমণ করে ক্ষমতা দখল করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে? সেক্ষেত্রে ওদের ক্রীতদাসে পরিণত হওয়াটা কদ্দিন ঠেকিয়ে রাখতে পারবে? কদ্দিন সিংহাসন আগলে রাখতে পারবে?

    উত্তেজিত হয়ে উঠল লীপন্ড। আরে তাই তো! ঠিক বলেছ তুমি। উই মাস্ট স্ট্রাইক ফার্স্ট। এটা স্রেফ আত্মরক্ষা আর কিছু নয়।

    উইনিসের হাসিটা সামান্য ছড়াল। তাছাড়া, তোমার দাদার রাজত্বের একেবারে গোড়ার দিকে অ্যানাক্রিয়ন কিন্তু ফাউণ্ডেশনের গ্রহ টার্মিনাসে সত্যি সত্যিই একটা সামরিক ঘাঁটি বসিয়ে ফেলেছিল- জাতীয় প্রতিরক্ষার খাতিরেই মূলত বসান হয়েছিল সামরিক ঘাঁটিটা। ফাউণ্ডেশনের ঐ নেতা, শরীরে যার নীল রক্তের ছিটেফোঁটাও নেই- সেই ধূর্ত, ইতর, লোকটার ষড়যন্ত্রের কারণে অবশ্যি শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েছিলাম আমরা ঘাটিটা গুঁড়িয়ে ফেলতে। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছ তো তুমি, লিপল্ড? তোমার দাদা অপমানিত হয়েছিলেন ঐ অনভিজাত লোকটার কাছে। মনে আছে আমার লোকটার কথা। অ্যানক্রিয়নের পরাক্রমের বিরুদ্ধে কাপুরুষের মতো একজোট বাঁধা তিনটে রাজ্যের ক্ষমতা পুঁজি করে, শয়তানী বুদ্ধি ভরা মাথা নিয়ে লোকটা যখন অ্যানক্রিয়নে আসে, আমার তখন প্রায় ওরই সমান বয়স।

    লাল হয়ে উঠল লিপন্ডের চেহারা। অঙ্গারের মত জ্বলতে লাগল তার চোখ দুটো। সেলডনের দিব্যি, আমি যদি দাদা হতাম তাহলে এরপরেও যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতাম।

    না, লিপল্ড। উপযুক্ত সময়ে বদলা নেবার আশায় আমরা অপেক্ষা করারই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তোমার বাবার ইচ্ছে ছিল, তিনিই, সেটা করবেন, কিন্তু তার আগেই অকালমৃত্যু হলো তার- উইনিস মুহূর্তের জন্যে অন্যদিকে মুখ ফেরালেন। তারপর আবেগটাকে বশে এনে বললেন, আমার ভাই ছিল সে। এখন যদি তার ছেলে-

    আংকল, আমি তার ইচ্ছে পূরণ করব। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। অ্যানাক্রিয়ন প্রতিশোধ নেবে, এবং সেটা এই মুহূর্তে।

    না, এখনি না। ব্যাটল ক্রুজার মেরামতের কাজটা শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের। ওরা যে আমাদের ভয় পায় সেটা ব্যাটল ক্রুজার মেরামত করে দিতে রাজি হওয়াতেই পরিষ্কার বোঝা গেছে। বোকারা আমাদের খুশি করতে চায়। কিন্তু আমাদের সিদ্ধান্ত থেকে আমরা নড়ছি না, কী বলে?

    সজোরে লিপন্ডের একটা মুষ্টিবদ্ধ হাত তালুর ওপর এসে পড়ল। আমি অ্যানাক্ৰিয়নের রাজা থাকতে নয়।

    ব্যঙ্গাত্মক ভাবে বেঁকে গেল উইনিসের ঠোঁট জোড়া। তাছাড়া, স্যালভর হার্ডিন এখানে আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে আমাদের।

    স্যালভর হার্ডিন! গোল গোল হয়ে গেল হঠাৎ রাজার চোখ দুটো। একটু আগে তার চোয়ালে যে দৃঢ়তার রেখা ফুটে উঠেছিল, অকস্মাৎ প্রায় মিলিয়ে গেল সেটা।

    হ্যাঁ লিপন্ড, তোমার জন্মদিনে ফাউণ্ডেশনের নেতা স্বয়ং আসছে অ্যানাক্রিয়নে। কিছু মিষ্টি কথায় চিড়ে ভেজানোর উদ্দেশ্যেই সম্ভবত। কিন্তু তাতে কাজ হবে না।

    স্যালভর হার্ডিন, রাজা বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন শুধু।

    ভুরু কুঁচকে গেল উইনিসের। নাম শুনেই ঘাবড়ে গেলে নাকি? এই সেই স্যালভর হার্ডিন, যে গতবার এসে আমাদের নাক ধুলোয় ঘষে দিয়ে গিয়েছিল। রাজপরিবারের সেই ভয়ঙ্কর অপমানের কথা নিশ্চয়ই ভুলে যাচ্ছ না তুমি? তা-ও কী, একজন অনভিজাত লোকের হাতে! নর্দমার কীট!

    না, ভুলে যাচ্ছি না। ভুলব না। ভুলব না। প্রতিশোধ নেব আমরা কিন্তু… কিন্তু- আমি একটু ভয় পাচ্ছি।

    চট করে দাঁড়িয়ে গেলেন উইনিস। ভয় পাচ্ছ? কীসের ভয় পাচ্ছ? তুমি ইয়াং থেমে গেলেন তিনি।

    ফাউণ্ডেশন আক্রমণ করাটা- ইয়ে, মানে… একটু ধর্ম বিরোধী কাজ হয়ে যায়? মানে বলতে চাইছিলাম- থেমে গেলেন রাজা।

    বলে যাও।

    দ্বিধান্বিত সুরে লিপন্ড বললেন, মানে বলছিলাম, গ্যালাকটিক স্পিরিট বলে সত্যিই যদি কিছু থেকে থাকে তাহলে, সে…মানে…সেটা হয়ত ব্যাপারটা ঠিক ভাল চোখে দেখবে না। তোমার কী মনে হয়?

    না, আমি তা মনে করি না, রূঢ় উত্তর এল। আবার বসে পড়লেন উইনিস। অদ্ভুত একটা হাসিতে ঠোঁট জোড়া বেঁকে গেল তার। তুমি তাহলে গ্যালাকটিক স্পিরিট নিয়ে মাথা ঘামাও, ঠিক কিনা? সেজন্যেই এই অবস্থা তোমার। ভেরিসফের কথাবার্তার অনেকটাই গিলেছ তাহলে?

    সে অনেক কিছু বুঝিয়েছে—

    গ্যালাকটিক স্পিরিট সম্পর্কে?

    হ্যাঁ।

    কচি খোকাই রয়ে গেছ এখনো। এসব ধর্মীয় বুজরুকিতে স্বয়ং ভেরিসফেরই বিশ্বাস আমার চেয়ে অনেক কম; আর আমি তো এসব মোটেই বিশ্বাস করি না। কতবার বলা হয়েছে তোমাকে যে, এসব পাগলের প্রলাপ ছাড়া কিছু নয়?

    দেখ, আমি তা জানি। কিন্তু ভেরিসফ বলে-

    গোল্লায় যাক ভেরিসফ। সব পাগলের প্রলাপ।

    মতানৈক্যসূচক সংক্ষিপ্ত বিরতি। তারপর লিপন্ড বললেন, সবাই কিন্তু ব্যাপারটা ঠিকই বিশ্বাস করে, মানে বলতে চাইছি, ভবিষ্যদ্বক্তা হ্যারি সেলডন সম্পর্কে নানান গুজব, আর কী করে তাঁর আদেশ পালনের মাধ্যমে পার্থিব স্বর্গে ফিরে যাবার লক্ষ্যে তিনি ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে গেছেন, তাঁর কথা অমান্য করলে লোকে কীভাবে চিরতরে ধ্বংস হবে- এসব কথা ঠিকই বিশ্বাস করে তারা। বিভিন্ন উৎসবে গিয়েছি আমি, আমার দৃঢ় বিশ্বাস ওরা এসব বিশ্বাস করে।

    হ্যাঁ, ওরা করে। কিন্তু আমরা করি না। ওরা যে বিশ্বাস করে সেজন্যে তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। কারণ, তুমি যে স্বর্গীয় বিধান বলে রাজা, আর নিজে আধা স্বর্গীয়- সেটা সম্ভব হয়েছে ওদের এই নির্বুদ্ধিতার কারণেই। কী চমৎকার ব্যাপার! এতে করে সব বিদ্রোহের সম্ভাবনা তো নষ্ট করা গেলই, সেই সঙ্গে সব ব্যাপারে একশো ভাগ বাধ্যতাও নিশ্চিত করা হলো। আর এ-কারণেই ফাউণ্ডেশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে তোমাকে। আমি তো রিজেন্ট মাত্র। তাছাড়া নেহাতই মানুষ। তুমি রাজা, আর ওদের কাছে পুরোপুরি দেবতা না হলেও অর্ধেকেরও বেশি।

    কিন্তু আমার তো মনে হয়, আমি তা নই, চিন্তিত সুরে বললেন লিপন্ড।

    না, সত্যি সত্যি তুমি তা নও, ব্যাঙ্গাত্মক সুরে সুরে উত্তর এল উইনিসের তরফ থেকে। তবে ফাউণ্ডেশন ছাড়া আর সবার কাছে তাই-ই। বুঝতে পেরেছ? ফাউণ্ডেশনের লোকজন ছাড়া আর সবার কাছে। একবার ওদের সরিয়ে দিতে পারলে তোমার দেবত্ব নিয়ে আর কেউ-ই প্রশ্ন তুলতে আসবে না। ভেবে দেখ কথাটা।

    তখন কি আমরা মন্দিরের শক্তি কেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে পারব? মনুষ্যবিহীন উড়ন্ত শিপগুলোর মালিক বনে যাব? ক্যান্সারের মহৌষধ হোলি ফুড আর অন্যান্য সবকিছুর অধিকারী হয়ে যাব? ভেরিসফ তো বলেছিল, গ্যালাকটিক স্পিরিটের আশীর্বাদপ্রাপ্তরাই কেবল-

    হ্যাঁ, ভেরিসফ তো বলবেই! শুনে রাখ, স্যালভর হার্ডিনের পর এই ভেরিসফই সবচেয়ে বড় শত্রু তোমার। আমার সঙ্গে থাকো, লিপল্ড। কান দিও না ওদের কথায়। আমরা দুজনে মিলে এক নতুন এম্পায়ার সৃষ্টি করব। সে-সাম্রাজ্য শুধু অ্যানাক্রিয়ন রাজ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং সে-সাম্রাজ্য হবে গ্যালাক্সির শত কোটি বিলিয়ন সূর্য জুড়ে। কথা-সর্বস্ব একটা পার্থিব স্বর্গের চেয়ে কি ভাল মনে হচ্ছে এটা তোমার কাছে।

    হ…চ্ছে।

    ভেরিসফ কি তোমাকে এর বেশি কোনো কিছুর প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে?

    না।

    বেশ, কর্তৃত্বপূর্ণ হয়ে উঠল উইনিসের কণ্ঠ। তাহলে ধরে নিতে পারি, আমরা একমত হলাম এ-ব্যাপারে। উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করলেন না তিনি। এখন এস তাহলে, আমি পরে আসছি। ও, আরেকটা কথা, লিপন্ড।

    দোরগোড়া থেকে ঘুরে দাঁড়ালেন রাজা।

    চোখ দুটো ছাড়া উইনিসের মুখের বাকি অংশটা হাস্যোজ্জ্বল। ঐ নিয়াক শিকারের ব্যাপারে সাবধান থেকো, বাবা। তোমার বাবার দুর্ভাগ্যজনক মৃত্যুর পর থেকে তোমাকে নিয়ে প্রায়ই অদ্ভুতসব স্বপ্ন দেখি আমি। নীড়ল গান থেকে ছোঁড়া বর্শায় যখন বাতাস ভারি হয়ে ওঠে, তখন কী যে হয়, কিছুই বলা যায় না। আশা করি সাবধান হবে তুমি, আর ফাউণ্ডেশন সম্পর্কে যা বললাম তাই করবে। কি, করবে না?

    লিপন্ডের চোখ দুটো বড় হলো, উইনিসের চোখের ওপর থেকে সরে তাঁর দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো মেঝের ওপর।

    হ্যাঁ, অবশ্যই।

    গুড!

    অভিব্যক্তিহীন দৃষ্টিতে ভাস্তের গমনপথের দিকে চেয়ে রইলেন তিনি। তারপর নিজের ডেস্কে ফিরে গিলেন।

    কিন্তু যেতে যেতে নিরানন্দ আর দুঃসাহসী চিন্তা পেয়ে বসল লিপন্ডকে। ফাউণ্ডেশনকে পরাজিত করে উইনিসের কথামত ক্ষমতা অর্জন করার চেয়ে ভাল সম্ভবত আর কিছু হতে পারে না। কিন্তু তারপর, যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে, তার সিংহাসন যখন কন্টকমুক্ত হবে- লিপন্ডের মনে পড়ে গেল, তার পরে উইনিস এবং তার দুই উদ্ধত ছেলেই সিংসনের সবচেয়ে জোরাল দাবিদার।

    কিন্তু রাজা তো তিনিই। আর রাজা কি হুকুম দিয়ে তোক খুন করান না?

    হোক না সে-লোকগুলো তার চাচা আর চাচাতো ভাই।

    .

    চার

    ভিন্ন মতাবলম্বী যে-দলগুলো ইদানীং-সরব-হয়ে-ওঠা অ্যাকশন পার্টিতে যোগ দিয়েছে, সেগুলোকে একত্রিত করার ব্যাপারে সেরম্যাকের পরই সবচেয়ে সক্রিয় ছিল লুইস বোর্ট। কিন্তু তা সত্ত্বেও ছমাস আগে সেই প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে হার্ডিনের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া হয়নি তার। তার অর্থ এই নয় যে, বোর্টের প্রচেষ্টার স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। বরং ঠিক তার উল্টো। সে সময় সে অনুপস্থিত ছিল তার কারণ সে তখন খোদ অ্যানাক্ৰিয়নের রাজধানীতে।

    গিয়েছিল স্রেফ সাধারণ একজন নাগরিক হিসেবে। কোনো আমলার সঙ্গে দেখা করেনি। গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজই করেনি সে। তাহলে কী করেছে সে সেখানে গিয়ে ব্যস্ত গ্ৰহটার অন্ধকার গলি-ঘুপচির দিকে নজর রেখেছে কেবল, আর, মাঝে মাঝে তার ভোঁতা নাক গলিয়েছে বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে।

    শীতের এক ছোট্ট দিনের শেষ ভাগে অ্যানাক্ৰিয়ন থেকে ফিরল সে। আকাশে মেঘ ছিল সকালে। এখন তুষার ঝরছে। গোধূলি নেমে এসেছে। বিষণ্ণ, একঘেয়ে পরিবেশ। লুইস বোর্ট যখন মুখ খুলল তখন আর যাই হোক, এই বিষণ্ণ, নিরানন্দ পরিবেশের কোনো উন্নতি ঘটল না।

    আমার ধারণা, সে বলল, বর্তমানে আমাদের যে অবস্থা, নাটুকে ভাষায় সেটাকেই বলে লস্ট কজ- অর্থাৎ আমি বলতে চাইছি, আমাদের উদ্দেশ্য সাধনের সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে।

    তোমার তাই মনে হচ্ছে বুঝি? গল্পীর কণ্ঠে সেরম্যাক শুধোল।

    মনে হওয়ারও আর কোনো অবকাশ নেই, সেরম্যাক। এটাই ঠিক।

    সেনাবাহিনী– ব্যগ্র কণ্ঠে শুরু করতে যাচ্ছিল ডোকোর ওয়াল্টো। কিন্তু বোর্ট থামিয়ে দিল তাকে সঙ্গে সঙ্গে।

    ফরগেট দ্যাট। ওটা পুরনো কাসুন্দি। বৃত্তাকারে সবার দিকে তাকাল সে। আমি জনগণের কথা বলছি। স্বীকার করছি, ফাউণ্ডেশনের কাছে আরো গ্রহণযোগ্য কাউকে রাজা হিসেবে বাসানোর জন্যে একটা প্রাসাদ ষড়যন্ত্র করার আইডিয়াটা আমারই ছিল মূলত। এবং ভালোই ছিল; এখনো ভালোই আছে। তবে ছোট একটা খুঁত আছে; আর সেটা হলো, কাজটা অসম্ভব। মহান স্যালভর হার্ডিন সেটা ঠিকই বুঝতে পেরেছিলেন।

    তিক্ত কণ্ঠে সেরম্যাক বলল, বোর্ট, তুমি যদি খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো জানাতে পার–

    খুঁটিনাটি কিছু নেই। ব্যাপারটা অত সহজ নয়। গোটা অ্যানাক্রিয়ন জুড়ে এই জঘন্য অবস্থা। এই একটা ধর্ম ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছে আর এটা কাজও করছে!

    তো?

    এমনভাবে কাজ করছে যে তুমি তা দেখে প্রশংসাই করবে। এখানে, অর্থাৎ টার্মিনাসে তুমি যা দেখছ তা হচ্ছে, প্রিস্টদের প্রশিক্ষণ দেবার জন্যে নিবেদিতপ্রাণ একটা বিরাট স্কুল আর কালেভদ্রে শহরের কোনো অখ্যাত অংশে তীর্থযাত্রীদের জন্যে আয়োজন করা বিশেষ কোননা প্রদর্শনী- ব্যস, এ-ই সব। গোটা ব্যাপারটা আমাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলছে না বললেই চলে। কিন্তু অ্যানাক্ৰিয়নে-

    লেম টার্কি গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠল, এটা ঠিক কোন ধরনের ধর্ম? হার্ডিন বরাবরই বলে আসছেন, বিনা প্রতিবাদে যাতে ওরা আমাদের সায়েন্স গ্রহণ করে সেজন্য ওদের হাতে ধরিয়ে দেয়া একটা মোরব্বা ছাড়া এই ধর্মটা আর কিছুই না। মনে আছে তোমার, সেরম্যাক? সেদিন উনি বললেন

    হার্ডিনের কথার কিন্তু প্রায়ই দু রকম অর্থ থাকে, সেরম্যাক সতর্ক করে দিল, তেমন মন দিয়ে না শুনলে মনে হবে, নিতান্তই সাধারণ কথাবার্তা; কিন্তু একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায়, সেগুলো মামুলি নয় মোটেই। সে যাই হোক, বোর্ট, বলো তো, এই ধর্মটা কেমন?

    একটু ভেবে নিল বোর্ট। নীতিগতভাবে চমৎকার। প্রাচীন এম্পায়ার-এর বিভিন্ন দর্শন আর এটার মধ্যে পার্থক্য প্রায় নেই বললেই চলে। উন্নত নৈতিক আদর্শ, এইসব আর কী। এদিক থেকে আপত্তি করবার মতো কিছু নেই। সবাই জানে, মানব সভ্যতার ইতিহাসে ধর্মের একটা বিরাট ভূমিকা আছে, আর এদিক থেকে এটা সেই ভূমিকাই পালন করছে।

    এসব আমরা জানি, অসহিষ্ণু কণ্ঠে বাধা দিল সেরম্যাক। আসল কথায় এস।

    আসছি। একটু অপ্রতিভু বোধ করল বোর্ট, কিন্তু বাইরে তার প্রকাশ ঘটল না। ফাউণ্ডেশন এই ধর্মটিকে লালন করেছে, শক্তি যুগিয়েছে, আর এটি গড়ে উঠেছে একেবারে অথরিটেরিয়ান রীতি অনুযায়ী। অর্থাৎ ব্যক্তি স্বাধীনতার চেয়ে কর্তৃপক্ষের ধামাধরা হয়ে থাকারই পক্ষপাতী এই ধর্ম। যেসব বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আমরা অ্যানক্রিয়নকে দিয়েছি, সেগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে যাজকতন্ত্রের। কিন্তু ওরা এসব যন্ত্র চালানো শিখেছে অভিজ্ঞতার সাহায্যে, প্রযুক্তিবিদ্যার সাহায্যে নয়। এই ধর্মের ওপর অগাধ বিশ্বাস ওদের। শুধু এই ধর্মের ওপরই নয়, যে-শক্তি, আই মীন, যে-সব যন্ত্রপাতি তারা নাড়াচাড়া করে সেগুলোর আধ্যাত্মিক শক্তির ওপরেও দৃঢ় আস্থা আছে ওদের। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দুমাস আগে এক গর্দভ লুকিয়ে থেসালেকিয়ান টেম্পলের পাওয়ার প্ল্যান্টে একটা গড়বড় করতে গিয়ে নিজে তো মরেই, সেই সঙ্গে পাঁচটা সিটি ব্লকও দেয় উড়িয়ে। ব্যাপারটাকে সবাই ঐশ্বরিক প্রতিশোধ বলে ধরে নিয়েছেন। এমনকি প্রিস্টরাও।

    মনে পড়ছে। কাগজগুলোয় ঘটনাটা একটু বিকৃতভাবে ছাপা হয়েছিল সে সময়। কিন্তু তুমি ঠিক কী বলতে চাইছ বুঝতে পারছি না।

    শোন তাহলে, খুলে বলি, বোর্ট ঠাণ্ডা স্বরে বলল। যাজকতন্ত্র এমন একটা শ্রেণীবিভাগ- আই মীন, হায়ারার্কি সৃষ্টি করেছে যার একেবারে চুড়োয় বসে আছেন রাজা। আর, এই রাজাকে ছোটখাটো একজন দেবতা বলে গণ্য করা হচ্ছে। ঐশ্বরিক অধিকারবলে তিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। জনগণ এটা মনে-প্রাণে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে যাজকরাও। সুতরাং অত সহজে রাজাকে হটাতে পারছ না তুমি। এবার পরিষ্কার হয়েছে?

    দাঁড়াও, ওয়াল্টো বলে উঠলো এই সময়। এগুলো সব হার্ডিনের কাজ বলতে খানিক আগে কী বোঝাতে চেয়েছ তুমি? সে এখানে আসছে কীভাবে?

    বিরক্তিভরা দৃষ্টিতে প্রশ্নকর্তার দিকে তাকাল বোর্ট। অনেক কষ্টে ফাউণ্ডেশন এই বিভ্রমটি সৃষ্টি করেছে। আমাদের সমস্ত সায়েন্টিফিক পৃষ্ঠপোষকতা এই ভুয়া ব্যাপারটির পেছনে ব্যয় করছি আমরা। এমন কোনো উৎসব-অনুষ্ঠান নেই যেখানে রাজা তার দেহ ঘেরা উজ্জ্বল রেডিও-অ্যাকটিভ আভা নিয়ে উপস্থিত হন না। আলোর সেই আভা তার মাথার ওপর একটা মুকুটের মতো উঁচু হয়ে থাকে। কেউ তাঁকে স্পর্শ করতে গেলেই ভয়ংকরভাবে পুড়ে যায় সে। সংকটময় মুহূর্তে তিনি বাতাসে ভর করে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ভেসে চলে যান। সবাই ধরে নেয়, এগুলো ঐশ্বরিক কোনো গুণেই সম্ভব হয়। আঙুলের একটা সংকেতে রাজা মুক্তোর মতো ঝকঝকে আলোয় সারা মন্দির ভরে দেন। তার সুবিধের জন্যে এ-ধরনের কত যে ছোটখাটো ফাঁকিবাজির সৃষ্টি করছি আমরা তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু প্রিস্টরাও এসব বিশ্বাস করে। অথচ দেখ, ওরাই কিন্তু যন্ত্রপাতির সাহায্যে এসব ধোঁকাবাজি চালায়।

    খারাপ! ঠোঁট কামড়ে সেরম্যাক বলল।

    যে-সুযোগটা আমরা হারিয়েছি, সেটার কথা মনে হলে সিটি হল পার্কের ঝরনাটার মতো দিন-রাত কাঁদতে ইচ্ছে করে আমার, আন্তরিকভাবে বলে উঠল বোর্ট। তিরিশ বছর আগে হার্ডিন যখন অ্যানক্রিয়ন-এর হাত থেকে ফাউণ্ডেশনকে রক্ষা করলেন, তখনকার কথাই ধরা যাক। সে-সময় অ্যানাক্রিয়নবাসীদের কোনো ধারণাই ছিল না যে, এম্পায়ার অধঃপাতে যাচ্ছে। জিওনিয়ান রিভল্টের আগ পর্যন্ত ওরা কম-বেশি নিজেদের নিয়েই ব্যস্ত ছিল। এমনকি যখন কমিউনিকেশন ভেঙে পড়ল আর লিপন্ডের হার্মাদ দাদামশাই নিজেকে রাজা বলে ঘোষণা করল, তখনো ওরা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারেনি যে, এম্পায়ার পটল তুলেছে।

    তেমন বুকের পাটা থাকলে সম্রাট তখন দুটো ক্রুজার আর সে-সময় দেখা দেয়া অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ কাজে লাগিয়ে আবার উঠে দাঁড়াতে পারতেন। আর আমরা, আমরাও ঠিক একই কাজ করতে পারতাম; কিন্তু না, হার্ডিন রাজা-পূজার প্রচলন করলেন? কেন? কেন? কেন?

    ভেরিসফ করছেটা কী? হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল জেইম। একটা সময় গেছে যখন সে ছিল রীতিমত সক্রিয় একজন অ্যাকশনিস্ট। সে কী করছে ওখানে?

    সে-ও কি অন্ধ?

    আমি জানি না, বোর্ট সংক্ষেপে বললেন। সে ওদের হাই প্রিস্ট। আমি যদুর জানি, যাজকতন্ত্রের একজন উপদেষ্টা হিসেবে টেকনিক্যাল খুঁটিনাটিগুলো দেখাশোনা ছাড়া আর কিছুই করে না সে। ঠুটো জগন্নাথ যত্তসব! নিপাত যাক!

    হঠাৎ একটা নীরবতা নেমে এল ঘরের মধ্যে। সব কটা চোখ সেরম্যাকের ওপর গিয়ে স্থির হলো। নার্ভাস ভঙ্গিতে দাঁত দিয়ে আঙুলের নখ কাটছে সে। হঠাৎ উঁচু গলায় বলে উঠল, খুব খারাপ! ব্যাপারটা রহস্যজনক।

    চারদিকে তাকিয়ে, গলা আরো খানিকটা চড়িয়ে সে যোগ করল, হার্ডিন কি তাহলে এতই বোকা?

    সেরকমই তো মনে হচ্ছে, শ্রাগ করে বলল বোর্ট।

    মোটেই না। কোথাও কোনো গণ্ডগোল আছে। এভাবে অসহায়ের মতো নিজের গলা নিজে কাটার জন্যে পাহাড়-প্রমাণ নির্বুদ্ধিতার প্রয়োজন- হার্ডিন বোকা হলে তার পক্ষে যতটা বোকামির পরিচয় দেয়া সম্ভব হত, তার চেয়েও বেশি। হার্ডিন বোকা, এ কথা মানতে রাজি নই আমি। একদিকে সে এমন এক ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেছে যা কিনা সমস্ত অভ্যন্তরীণ সমস্যা দূর করবে, অথচ অন্যদিকে, যুদ্ধের জন্যে অ্যানাক্রিয়নকে অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সাহায্য করছে। নাহ, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।

    নির্জলা নেমকহারামি, ঝট করে বলে উঠল ওয়ান্টো। ব্যাটা ওদের পয়সা খায়।

    কিন্তু সেরম্যাক অধৈর্যের মতো ডাইনে-বাঁয়ে মাথা ঝাঁকাল। সেটাও আমার মনে হয় না- গোটা ব্যাপারটাই অর্থহীন এক পাগলামি, যেন ভাল কথা, বোর্ট অ্যানক্রিয়ন নেভির জন্যে ফাউণ্ডেশন মেরামত করে দেবে এমন কোনো ব্যাটল ক্রুজার-এর কথা কানে এসেছে তোমার?

    ব্যাটল ক্রুজার?

    পুরনো একটা ইম্পেরিয়াল ক্রুজার

    না, শুনিনি তো। তবে না শোনাটাই স্বাভাবিক। নেভি ইয়ার্ডগুলো এক একটা ধর্মীয় পবিত্রস্থান রীতিমত। সাধারণ লোকের প্রবেশাধিকার নেই সেখানে। ফ্লিট সম্পর্কে কোনো কথা কখনো বাইরে আসে না।

    সে যাই হোক, এ-ধরনের একটা গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। পার্টির কেউ একজন ব্যাপারটা কাউন্সিলে উঠিয়েছে। হার্ডিন অবশ্যি অস্বীকার করেনি, তবে তার মুখপাত্ররা গুজবপ্রেমীদের ওপর একচোট ঝাল ঝেড়েছে। এর একটা অর্থ থাকতে পারে।

    আগের ব্যাপারগুলোরই অংশ এটা, সিদ্ধান্তের সুরে বোর্ট বলল ব্যাটল ক্রুজারের ব্যাপারটা যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটা পাগলামির চুড়ান্ত। তবে আগেরগুলোর চেয়ে মারাত্মক কিছু নয়।

    আমার মনে হয়, ওরসি বলল, হার্ডিনের হাতে কোনো গুপ্ত অস্ত্র নেই। সেটা থাকলে-।

    হ্যাঁ, সেরম্যাক তিক্ত কণ্ঠে বলল, বিরাট একটা ব্রহ্মা, যেটা কিনা সাইকোলজিকাল মোমেন্টে বেরিয়ে এসে বুড়ো উইনিসকে ভিরমি খাইয়ে দেবে। এরকম কোনো গুপ্ত অস্ত্রের অপেক্ষায় থাকলে ফাউণ্ডেশনের অস্তিত্ব নেই হয়ে যাবে।

    তা, এখন কথা হচ্ছে, দ্রুত প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল ওরসি, আমাদের হাতে আর কতটা সময় আছে, বোর্ট?

    বুঝলাম, প্রশ্ন এটাই। কিন্তু আমাকে জিগ্যেস করে লাভ নেই; আমি জানি না। অ্যানাক্ৰিয়নের প্রেস ফাউণ্ডেশনের নাম ভুলেও মুখে আনে না। আপাতত কাগজগুলোতে সামনের ঐ উৎসবের খবর ছাড়া আর কিছুই নেই বলতে গেলে। লিপন্ড সামনের সপ্তাহে সাবালক হচ্ছে, জানো নিশ্চয়ই?

    তাহলে কয়েক মাস হাতে পাচ্ছি আমরা, সারা সন্ধ্যায় এই প্রথমবারের মতো হাসি দেখা গেল ওয়ান্টোর মুখে। এর মধ্যে–

    এর মধ্যে ঘোড়ার ডিম হবে। অধৈর্য কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল বোর্ট। আমি আবারো বলছি, রাজা হচ্ছে দেবতা। তুমি কি মনে কর, লোকজনের মধ্যে যুদ্ধের উন্মাদনা জাগাতে রাজাকে প্রোপাগান্ডার ক্যাম্পেইন করতে হবে? তুমি কি ভাবো, আমাদের বিরুদ্ধে আক্রমণের অভিযোগ আনতে হবে তাকে? সস্তা আবেগে সুড়সুড়ি দিতে হবে তাঁকে? না। যখন আঘাত হানার সময় হবে, লিপল্ড স্রেফ হুকুম দেবে, লোকজন যুদ্ধ করবে। এই হচ্ছে ব্যাপার। এটাই সিস্টেমটার সবচেয়ে খারাপ দিক। দেবতার মুখের ওপর কেউ কথা বলে না। আমি যতদূর জানি, হুকুমটা সে আগামীকালও দিতে পারে। তো, এখন বসে বসে তামাক সেবন করা ছাড়া আর কিছুই করার নেই তোমার।

    এই সময় দড়াম করে খুলে গেল দরজাটা। ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল লেভি নোর্যাস্ট। গায়ে ওভারকোট, তুষার ঝরছে সেটা থেকে।

    দেখ। টেবিলের ওপর ঠাণ্ডা, বিন্দু বিন্দু তুষার জমা একটা খবরের কাগজ ছুঁড়ে দিল সে।

    ভাঁজ খোলা হলো। একসাথে পাঁচটা মাথা ঝুঁকে পড়ল কাগজটার ওপর।

    চাপা গলায় সেরম্যাক বলে উঠল, গ্রেট, স্পেস! লোকটা অ্যানাক্রিয়নে যাচ্ছে। অ্যানাক্রিয়নে যাচ্ছে!

    এটা নেমকহারামি, আকস্মিক উত্তেজনায় চি চি কণ্ঠে বলে উঠল টার্কি। ওয়ান্টোর কথা সত্যি না হলে আমি আমার কান কেটে ফেলব। লোকটা আমাদের বিক্রি করে দিয়েছে। এবার সে তার পাওনা আনতে যাচ্ছে।

    ঝট করে উঠে দাঁড়ালেন সেরম্যাক। আর কোনো বিকল্প নেই আমাদের হাতে। আগামীকালই আমি কাউন্সিলকে বলছি, হার্ডিনকে যেন রাজদ্রোহের গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। আর তা যদি করা না যায়—

    .

    পাঁচ

    বন্ধ হয়ে গেছে তুষারপাত। পথে পুরু হয়ে জমে শক্ত হয়ে আছে শ্বেতশুভ্র তুষার। ফাঁকা রাস্তা ধরে এদিক-ওদিক দুলতে দুলতে হালকা গ্রাউণ্ড কারটা এগিয়ে চলেছে। প্রত্যুষের আবছা, ধূসর আলো শুধু কাব্যিক অর্থেই ঠাণ্ডা নয়, আক্ষরিক অর্থেও। কিন্তু ফাউণ্ডেশন-এর রাজনীতির এই টালমাটাল পরিস্থিতিতেও অ্যাকশনিস্ট বা হার্ডিন সমর্থক দলের কারোরই উৎসাহ এতটা চাঙ্গা নয় যে, এত ভোরে রাজপথে নেমে হৈ হট্টগোল বাঁধিয়ে দেবে।

    ব্যাপারটা ইয়োহান লী-র খুব একটা পছন্দ হচ্ছে না। তাঁর অসন্তোষভরা বিড়বিড় ক্রমেই গ্রিাহ্য হয়ে উঠল, ব্যাপারটা খারাপ দেখাবে, হার্ডিন। লোকে বলবে তুমি লেজ গুটিয়েছ।

    বলতে দাও। অ্যানাক্রিয়নে আমাকে যেতেই হবে, আর, কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই কাজটা করতে চাই আমি। অন্য কোনো কথা শুনতে চাই না আমি এ ব্যাপারে, লী।

    গদিমোড়া সিটের পিঠে হেলান দিলেন দিলেন হার্ডিন। কেঁপে উঠলেন সামান্য। গাড়ির ভেতর উষ্ণতার কমতি নেই। কিন্তু চারদিনের তুষার-মোড়া রাজ্যটা কেমন যেন কঠিন-কঠোর একটা রূপ নিয়ে ঘিরে আছে তাঁকে- কাঁচের আড়াল থেকেও ব্যাপারটা অনুভব করলেন তিনি, অস্বস্তি বোধ করলেন।

    অনেকটা আপন মনেই বলে উঠলেন, ঝামেলাগুলো চুকে গেলে টার্মিনাসকে ওয়েদার-কণ্ডিশনড় করে ফেলতে হবে আমাদের। এমন কিছু অসম্ভব নয় কাজটা।

    তার আগে, লী বলে উঠলেন, আমি অন্য দু-একটা কাজ সমাপ্ত অবস্থায় দেখতে চাই। যেমন ধর, টার্মিনাসের বদলে সেরম্যানকে ওয়েদার-কণ্ডিশনড় অবস্থায় দেখতে চাই আমি। কেমন হবে ব্যাপারটা? পঁচিশ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রার ছোট, ছিমছাম সেলে সারা বছর পুরে রাখলেই চলবে।

    আর তখন আমার সত্যিকার অর্থেই বডি-গার্ড দরকার হবে, হার্ডিন বললেন। এবং মাত্র ওই দুজনে কুলোবে না। সামনে, ড্রাইভারের পাশে, যার যার অ্যাটম ব্লাস্টের ওপর হাত রেখে ফাঁকা রাস্তার দিকে কঠিন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা লোক দুটোর দিকে ইঙ্গিত করলেন হার্ডিন। লী-র ভাড়াকরা লোক এরা। তুমি দেখছি একটা গৃহযুদ্ধ বাধাতে চাও।

    আমি চাই? আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি, আগুনে এরই মধ্যে কাঠ ঢুকিয়ে দিয়েছে লোকজন, খুব একটা নাড়াচাড়া করতে হবে না সে-কাঠ। আঙুলের কড়া গুনতে শুরু করলেন তিনি। এক: গতকাল সিটি কাউন্সিলে সেরম্যাক তুলকালাম কাণ্ড বাঁধিয়ে ছেড়েছে, ইম্পিচমেন্টের দাবি জানিয়েছে সে।

    সে-দাবি জানাবার ন্যায়সঙ্গত অধিকার রয়েছে তার, ঠাণ্ডা, নির্লিপ্ত গলায় হার্ডিন বললেন। কিন্তু ভুলে যাচ্ছে কেন, তার প্রস্তাব ১৮৪-২০৬ ভোটে নাকচ হয়ে গেছে।

    তা হয়েছে। কিন্তু মাত্র বাইশ ভোটের ব্যবধানে। অথচ আমরা আশা করেছিলাম ফারাকটা হবে ষাট। অস্বীকার কোরো না, তুমিও তাই আশা করেছিলে।

    ব্যবধানটা সত্যিই অল্প, স্বীকার করলেন হার্ডিন।

    বেশ। এবার, দুই: ভোটের পর অ্যাকশনিস্ট পার্টির উনষাটজন সদস্য কাউন্সিল চেম্বার থেকে ওয়াক আউট করেছে।

    হার্ডিন নিপ; লী বলে চলেছেন, এবং তিন বেরিয়ে যাওয়ার আগে সেরম্যাক ঘেউ ঘেউ করে বলে গেছে, তুমি বিশ্বাসঘাতক এবং তুমি অ্যানাক্ৰিয়নে যাচ্ছ তোমার বকশিশ আনতে। সে আরো বলেছে, ইম্পিচমেন্টের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে চেম্বারের অধিকাংশ সদস্য তোমার বিশ্বাসঘাতকতায় অংশগ্রহণ করেছে। শুধু তাই নয়, সেরম্যাক এই বলে হুমকি দেখিয়ে গেছে যে, তাদের দলের নাম খামোকা অ্যাকশনিস্ট পার্টি রাখা হয়নি। তা, এসব শুনে কী মনে হচ্ছে?

    সমস্যার গন্ধ পাচ্ছি।

    আর তারপরেও রাতের অন্ধকারে অপরাধীর মতো গা ঢাকা দিচ্ছ। ওদের মুখোমুখি হওয়া উচিত তোমার হার্ডিন। স্পেসের দোহাই, সেজন্যই মার্শাল ল জারি কর।

    সহিংসতা অক্ষমের—

    শেষ অবলম্বন, পাদপূরণ করলেন লী। যত্তসব!

    ঠিক আছে। সে দেখা যাবেখন। এবার মন দিয়ে আমার কথা শোন, লী। ফাউণ্ডেশন স্থাপনের পঞ্চাশ বছর পূর্তির দিন, আজ থেকে তিরিশ বছর আগে, টাইম ভল্টটা খুলেছিল, আর আসল ব্যাপারটা কী ঘটেছিল সেটা আমাদের জানানোর জন্যে হ্যারি সেলডনের রেকর্ড করা কথা শোনান হয়েছিল। তাকে দেখেছিলাম আমরা।

    মনে আছে আমার। মুখে আধো হাসি ফুটিয়ে স্মৃতিচারণের সুরে বললেন লী। সেদিনই আমরা ক্ষমতা দখল করেছিলাম।

    ঠিক। সেটা ছিল আমাদের প্রথম মেজর ক্রাইসিস। এটা দ্বিতীয়- আর আজ থেকে তিন হপ্তা পর ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠার আশি বছর পূর্ণ হবে। তোমার কাছে কি ব্যাপারটা কোনো দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে?

    তার মানে তুমি বলতে চাও, তিনি আবারো দেখা দিচ্ছেন?

    আমি কথা শেষ করিনি এখানে। ফিরে আসার ব্যাপারে কখনো কিছু বলেননি সেলডন, বুঝলে; তবে সেটা তাঁর গোটা প্যানের একটা অংশ। তিনি তার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন আমরা যাতে আগেভাবে কোনো কিছু জানতে না পারি। ভল্টটা না সরিয়ে রেডিয়াম লকটা আর ভোলা যাবে কিনা সেটা বোঝারও কোনো উপায় নেই। ওটা সম্ভবত এমনভাবে সেট করা যে ভল্টটা সরাতে গেলে বিস্ফোরণ ঘটবে! হ্যারি সেলডনের প্রথম অবির্ভাবের পর থেকে প্রতিটি বার্ষিকীতেই ওখানে উপস্থিত ছিলাম আমি, ঘটনাচক্রেই বলতে পার। একবারও দেখা দেননি তিনি। তবে সেবারের পর এবারই একটা সত্যিকারের সংকট দেখা দিয়েছে।

    তাহলে উনি আসবেন।

    হয়ত। আমি জানি না। সে যাই হোক, এটাই আসল কথা। আমি অ্যানাক্রিয়নে চলে গেছি- কাউন্সিলের আজকের অধিবেশনে এই ঘোষণা দেবার পরপরই তুমি অফিসিয়ালি আরেকটা ঘোষণা দেবে যে, আগামী ১৪ই মার্চ আরেকটা হ্যারি সেলডন রেকর্ডিং অনুষ্ঠিত হবে। আর তাতে সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করা সাম্প্রতিক সংকট সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেসেজ থাকবে। দ্যাটস ভেরি ইম্পর্ট্যান্ট, লী। আর, তোমাকে যতই প্রশ্ন করা হোক না কেন, এর বাইরে তুমি একটা কথাও বলবে না।

    ওরা কী বিশ্বাস করবে? লী শুধোলেন।

    করুক বা না করুক তাতে কিছু আসে যায় না। এতে ওরা একটা বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যাবে। আর আমি সেটাই চাই। ব্যাপারটা সত্যি কি না, বা, মিথ্যা হলে, আমার উদ্দেশ্য কী- এই দোটানার মধ্যে পড়ে ওরা ওদের অ্যাকশন ১৪ই মার্চ পর্যন্ত মুলতবি রাখবে। তার ঢের আগে ফিরে আসব আমি।

    কিন্তু এই সাফল্যের সঙ্গে মোকাবিলা করার কথাটা তো অর্থহীন, লী-কে দ্বিধান্বিত দেখাল।

    খুবই বিভ্রান্তিকরভাবে অর্থহীন। এই যে এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেছি।

    আবছা অন্ধকারে একটা গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল মহাকাশযানটি। তুষার মাড়িয়ে সেটার দিকে এগিয়ে গেলেন হার্ডিন। খোলা এয়ার লকটার সামনে পৌঁছে ঘুরে দাঁড়ালেন।

    গুড-বাই, লী। তোমাকে এভাবে কড়াই-এর ওপর রেখে যেতে খারাপ লাগছে আমার, কিন্তু তুমি ছাড়া আর কেউ নেই যার ওপর বিশ্বাস রাখা যায়।

    ঘাবড়িও না। কড়াইটা যদিও বেশ গরম, তবুও আমি ঠিকই আদেশ পালন করব। পিছিয়ে এলেন তিনি। বন্ধ হয়ে গেল এয়ার লক।

    .

    ছয়

    যে-গ্রহের নাম অনুসারে রাজ্যের নাম রাখা হয়েছে সেই অ্যানাক্রিয়ন গ্রহে কিন্তু স্যালভর হার্ডিন সরাসরি গেলেন না। অ্যানাক্ৰিয়ন রাজ্যের বৃহত্তর স্টেলার সিস্টেমগুলোর আটটিতে ঝটিকা সফর সেরে, অভিষেক অনুষ্ঠানের ঠিক আগের দিন পা ফেললেন তিনি গ্রহটির মাটিতে। ফাউন্ডেশনের স্থানীয় প্রতিনিধিদের সাথে আলাপ সারতে যতটুকু সময় লেগেছে, তার পরই উড়ে গিয়েছেন তিনি পরবর্তী সিস্টেমে।

    রাজ্যটির বিশালতা উপলব্ধি করে একটু দমে গেলেন তিনি ভেতরে ভেতরে। সন্দেহ নেই, যে গ্যালাকটিক এম্পায়ার-এর একটি বিশেষ অংশ হিসেবে এটি এক সময় পরিচিত ছিল, সেই এম্পায়ার-এর বিশালত্বের তুলনায় রাজ্যটি নেহাতই একটি ছোট্ট টুকরো মাত্র স্রেফ একটা উড়ন্ত বিন্দু- কিন্তু যার চিন্তা-ভাবনা মাত্র একটি গ্রহকে কেন্দ্র করে উঠেছে তার কাছে অ্যানাক্ৰিয়নের আকার এবং জনসংখ্যা রীতিমত অকল্পনীয় রকমের বিশাল।

    অ্যানাক্রিয়ন প্রিফেক্ট নামে পরিচিত পুরনো এই অংশটির সীমারেখা জুড়ে আছে পঁচিশটা স্টেলার সিস্টেম, পঁচিশটার মধ্যে ছটার আবার রয়েছে বসবাসযোগ্য একাধিক বিশ্ব। জনসংখ্যা উনিশ বিলিয়ন। এম্পায়ার-এর বৃহস্পতি যখন তুঙ্গে, তখনকার তুলনায় সংখ্যাটা যদিও অনেক কম, তবে ফাউণ্ডেশনের পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত ক্রমবর্ধমান সায়েন্টিফিক ডেভেলপমেন্টের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনসংখ্যাটাও ক্রমেই বেড়ে চলেছে।

    এবং কেবলমাত্র এই ঝটিকা সফরের সময়েই সেই কাজের বিশালত্ব দেখে হতবুদ্ধি হয়ে গেলেন হার্ডিন। তিরিশ বছর লেগেছে শুধুমাত্র ক্যাপিটাল ওয়ার্ল্ডটাকেই পারমাণবিক শক্তি যোগাতে। আউটার প্রভিন্সগুলোর এক বিশাল অংশে এখনো অ্যাটমিক পাওয়ার পুনঃস্থাপন করা সম্ভব হয়নি। এই অগ্রগতিটুকুও হতো না; হয়েছে শুধু এম্পায়ার-এর ভাটার স্রোতে রেখে যাওয়া কার্যকর কিছু ধ্বংসাবশেষের কারণে।

    ক্যাপিটাল ওয়ার্ল্ড-এ পৌঁছে হার্ডিন দেখলেন, সেখানকার দৈনন্দিন কার্যক্রম একদম বন্ধ। আউটার প্রভিন্সগুলোয় আগেও উত্সব হতো। এখনও হয়। কিন্তু অ্যানক্রিয়ন গ্রহের ব্যাপারটা দেখা গেল একেবারে ভিন্ন। উদ্দীপনাভরা এই জাঁকাল ধর্মীয় উৎসব দেবরাজ লিপন্ডের সাবালকত্ব ঘোষণা করছে এবং এতে উন্মত্ত, অধীরভাবে অংশগ্রহণ করছে প্রতিটি লোক।

    ক্লান্ত, বিধ্বস্ত ভেরিফের কাছ থেকে কোনোরকম মোটে আধ ঘণ্টার মতো সময় আদায় করতে সমর্থ হলেন হার্ডিন। আর সেই তিরিশ মিনিট শেষ হতে না হতে হিজ অ্যাম্বাসাডরকে ছুটতে হলো আরেকটা মন্দিরের উৎসব ব্যবস্থা দেখ-ভাল করতে। তবে ঐ আধঘণ্টা সময়টুকুতেই যারপর নাই কাজ হলো। সন্তুষ্ট মনে রাতের আতশবাজি পোড়ানোর অনুষ্ঠান দেখার প্রস্তুতি নিলেন হার্ডিন।

    সারাক্ষণ একজন দর্শকের ভূমিকা পালন করে গেলেন তিনি। কারণ, পরিচয় ফাঁস হয়ে গেলে তাঁকে যেসব ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করতে হবে সেগুলোর প্রতি তাঁর বিন্দুমাত্র উৎসাহ নেই। আর তাই, রাজপ্রাসাদের বলরুম যখন রাজ্যের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত লোকজনে ভরে গেল, তিনি তখন এক কোনায় দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কেউ-ই তেমন একটা গুরুত্ব দিচ্ছে না তাঁকে। কেউ কেউ পুরোপুরিই উপেক্ষা করছে।

    পরিচয় প্রার্থীদের লম্বা এক লাইনে দাঁড়িয়ে লিপন্ডের সঙ্গে পরিচিত হলেন তিনি। নিরাপদ দূরত্ব থেকে অবশ্যই। কারণ আঁকাল একটা ভাব নিয়ে, চারদিকে রেডিও-অ্যাকটিভ দ্যুতির মারাত্মক অগ্নিচ্ছটা পরিবেষ্টিত হয়ে, একা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন লিপল্ড। আর মাত্র এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সোনার অলংকার খচিত রেডিয়াম-ইরিডিয়াম সংকরের তৈরি প্রকাণ্ড সিংহাসনে বসবেন তিনি। তারপর তাঁকে নিয়ে শূন্যে ভাসবে সেই সিংহাসন। মেঝের সামান্য ওপর দিয়ে ভেসে বিশাল জানালাটার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। জনগণ তাদের রাজাকে দেখে উন্মত্তের মত চিৎকার জুড়ে দেবে। সিংহাসনটা এত বড় হতো না, যদি না ওটাতে একটা অ্যাটমিক মোটর লাগান থাকত।

    এগারটার বেশি বেজে গেছে। হার্ডিন অস্থির হয়ে উঠলেন। চারপাশটা ভাল করে দেখার জন্যে পায়ের আঙুলের ওপর ভর করে দাঁড়ালেন। একটা চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়ানোর ইচ্ছেটা কষ্টে দমন করলেন। এমনি সময় দেখলেন, ভিড় ঠেলে উইনিস তার দিকেই এগিয়ে আসছেন। তাঁর পেশিতে ঢিল পড়ল।

    দ্রুত এগোতে পারছেন না উইনিস। প্রায় প্রতি পদক্ষেপে তাঁকে কোনো না কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে হচ্ছে যার দাদা লিপন্ডের দাদাকে রাজ্য দখল করতে সাহায্য করেছিলেন এবং বিনিময়ে ডিউকের পদ লাভ করেছিলেন।

    অবশেষে উর্দিপরা শেষ সম্ভ্রান্ত জনের কাছ থেকে নিজেকে মুক্ত করে হার্ডিনের কাছে পৌঁছুলেন উইনিস। তার হাসিটা বেঁকে একটা আত্মতুষ্টির হাসিতে পরিণত হলো। কালো চোখ দুটো পুরু ভুরুর নিচ থেকে সন্তুষ্টির ঝিলিক নিয়ে তাকাল।

    মাই ডিয়ার হার্ডিন, নিচু গলায় বলে উঠলেন তিনি, পরিচয় প্রকাশে যখন অনীহা দেখাচ্ছ তার অর্থ, নিশ্চয়ই একা একা দাঁড়িয়ে বোরড় হতে চাও তুমি।

    একঘেয়ে লাগছে না আমার, ইওর হাইনেস। পুরো ব্যাপারটাই খুব, ইন্টারেস্টিং। আপনি জানেন, এ-রকম কোনো দৃশ্যের কথা টার্মিনাসে ভাবাই যায় না।

    তা ঠিক। কিন্তু তুমি কি আমার প্রাইভেট রুমে গিয়ে বসবে একটু সময় নিয়ে কথা বলা যেত তাহলে। প্রাইভেসিও পেতাম।

    অবশ্যই।

    বাহুতে বাহু জড়িয়ে দুজনে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে এলেন। ডাউয়েজার ডাচেসদের অনেকেই অবাক হয়ে ভাবলেন, সাধারণ পোশাক পরিহিত, সাদামাঠা চেহারার লোকটি এমন কে যে প্রিন্স রিজেন্ট তাকে এত সম্মান দেখাচ্ছেন!

    উইনিসের চেম্বারে ঢুকে পরম স্বস্তি বোধ করলেন হার্ডিন। রিজেন্ট নিজ হাতে তাকে এক গ্লাস পানীয় ঢেলে বাড়িয়ে দিলেন। মৃদু স্বরে ধন্যবাদ জানিয়ে গ্লাসটি গ্রহণ করলেন হার্ডিন।

    রয়্যাল সেলার থেকে আসা লক্রিস ওয়াইন এটা, হার্ডিন, উইনিস জানালেন। একেবারে আসল জিনিস- দুশো বছরের পুরনো। জিওনীয় বিদ্রোহেরও দশ বছর আগের তৈরি।

    সত্যিই একটা রয়্যাল ড্রিংক বটে, হার্ডিন মৃদু স্বরে একমত প্রকাশ করলেন। অ্যানাক্রিয়ন-এর রাজা প্রথম লিপন্ডের উদ্দেশে।

    দুজনেই পান করলেন। খানিক পর উইনিস হার্ডিনের শেষ কথাটার খেই ধরে বলে উঠলেন, শিগগিরই পেরিফেরির সম্রাট হয়ে যাবে ও, বা আরো বড় কিছু কে বলতে পারে? ভবিষ্যতে গ্যালাক্সি রিইউনাইটেড হলেও হতে পারে।

    নিঃসন্দেহে। অ্যানাক্ৰিয়নের উদ্যোগে?

    কেন নয়? ফাউণ্ডেশনের সাহায্যে বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা শিগগিরই পেরিফেরির অন্য সবাইকে ছাড়িয়ে যাব।

    হার্ডিন তাঁর বালি গ্লাসটা নামিয়ে রেখে বললেন, তা হয়ত যাবেন, কিন্তু এখানে একটা কথা আছে। কোনো জাতি সায়েন্টিফিক এইড চাইলে, ফাউণ্ডেশন সাহায্য দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। আমাদের সরকারের হাই আইডিয়ালিজমের কারণে এবং আমাদের স্থপতি হ্যারি সেলডনের সুমহান নৈতিক আদর্শ ও লক্ষ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবশত আমরা বিশেষ কারো প্রতি পক্ষপাত প্রদর্শন করতে পারি না। এই প্রশ্নে কোনো আপোস নেই, ইওর হাইনেস।

    উইনিসের হাসিটা বিস্তৃত হলো। বহুল প্রচলিত একটা কথা আছে- গ্যালাকটিক স্পিরিট তাদেরকেই সাহায্য করে, যারা নিজেদেরকে সাহায্য করে। নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকলে ফাউণ্ডেশন যে সহযোগিতা করবে না, সেটা ভাল করেই বুঝি আমি।

    আমি সে কথা বলছি না। ইম্পেরিয়াল ক্রুজারটা আমরা আপনাদের মেরামত করে দিয়েছি- যদিও আমার বোর্ড অভ নেভিগেশন রিসার্চের জন্যে ওটা নিজেদের কাছেই রেখে দিতে চেয়েছিল।

    রিসার্চের জন্যে! ব্যঙ্গাত্মক প্রতিধ্বনি করে উঠলেন উইনিস। বটে! অথচ আমি যুদ্ধের হুমকি না দিলে তোমরা ওটা মেরামত করে দিতে না।

    তাই নাকি? কী জানি, কাঁধ ঝাঁকিয়ে কথাটা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গি করলেন হার্ডিন।

    আমি ঠিকই জানি। আর সে-হুমকিতে বরাবরই কাজ হয়েছে।

    হুমকিটা কি এখনও বজায় আছে?

    হুমকি, নিয়ে কথা বলার আর সময় নেই এখন। দেরি হয়ে গেছে। ডেস্কের ওপর রাখা ঘড়িটার দিকে তাকালেন উইনিস। দেখ, হার্ডিন, এর আগে একবার অ্যানাক্রিয়নে এসেছিলে তুমি। তোমার তখন তরুণ বয়স। আমাদের দুজনেরই তরুণ বয়স। কিন্তু তখনো আমাদের দুজনের দৃষ্টিভঙ্গি এক ছিল না। তুমি হচ্ছ গিয়ে, লোকে যাকে বলে, শান্তিপ্রিয় মানুষ, ঠিক কি না?

    আমার ধারণা, আমি তাই। অন্তত আমি মনে করি, কোনো একটা লক্ষ্য অর্জনের জন্যে সহিংসতার কোনো দরকার নেই। ওটা এক ধরনের বাহুল্য মাত্র। সহিংসতার কোনো না কোনো বিকল্প সব সময়েই থাকে, অবশ্যি মাঝে মাঝে সেই বিকল্প পথটা অতটা সরাসরি না হয়ে একটু ঘোরানো হয়ে থাকে।

    হ্যাঁ, তোমার সেই বিখ্যাত মন্তব্যটা আমার কানেও পৌঁছেছে- সহিংসতা অক্ষমের শেষ অবলম্বন। কিন্তু, ছদ্ম একটা নির্লিপ্ততার সাথে কান চুলকে নিলেন উইনিস, আমি নিজেকে ঠিক অক্ষম বলে মনে করি না।

    হার্ডিন শান্তভাবে মাথা ঝাঁকালেন শুধু, কিছু বললেন না।

    আর তাছাড়া, উইনিস বলে চলেন, আমি বরাবরই ডিরেক্ট অ্যাকশনে বিশ্বাসী। লক্ষ্য বরাবর একটা সোজা পথ কেটে আমি সেটা ধরে এগিয়ে যাই। অনেক কাজই এভাবে করেছি আমি আর আমার বিশ্বাস, এই নীতি অনুসরণ করে আরো অনেক কাজ করতে পারব আমি।

    আমি জানি, হার্ডিন বাধা দিলেন। তবে আপনি যে-পথের কথা বললেন, আমার ধারণা, সেটা আপনি আপনার নিজের এবং আপনার সন্তানদের জন্য তৈরি করছেন; আর পথটা যাচ্ছে সরাসরি সিংহাসনের দিকে। রাজার বাবার অর্থাৎ আপনার বড় ভাই-এর মৃত্যু এবং রাজার ভগ্নস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখেই কথাগুলো বললাম। রাজার স্বাস্থ্য খুব একটা ভাল যাচ্ছে না, কি ঠিক বলিনি?

    ভুরু কোঁচকালেন উইনিস কথাটা শুনে। তাঁর গলা আগের চেয়ে কঠিন শোনাল, এসব ব্যাপারে তোমার কথা না বলাই উচিত, হার্ডিন। টার্মিনাসের মেয়র হবার সুবাদে তুমি হয়ত ভাবতে পার এসব … বিবেচনাহীন কথা বলার অধিকার তোমার আছে। কিন্তু আমি বলছি, চোখ বুজে এসব ধারণা ঝেড়ে ফেলতে পার তুমি। এসব কথায় ভয় পাবার লোক নই আমি। আমার জীবনের দর্শন হচ্ছে, বুক ফুলিয়ে দাঁড়াও, সব সমস্যা উঠে যাবে, এবং এখন পর্যন্ত আমি কখনো পিঠ দেখাইনি।

    সে-ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তা, এ মুহূর্তে আপনি ঠিক কোন সমস্যার দিকে পিঠ ফেরাবেন না বলে ভাবছেন?

    সহযোগিতা করতে ফাউণ্ডেশনকে রাজি করানোর সমস্যাটার দিকে পিঠ ফেরাব না বলে ভাবছি আপাতত। তোমার ঐ শান্তি বজায় রাখার নীতিটা, বুঝলে, বেশ কয়েকটা ভুলের দিকে টেনে নিয়ে গেছে তোমাকে। তার কারণ, তুমি তোমার প্রতিদ্বন্দ্বীর সাহসকে আণ্ডারএস্টিমেট করেছ। সবাই তোমার মতো ডিরেক্ট অ্যাকশনে যেতে ভয় পায় না।

    বুঝিয়ে বলুন, হার্ডিন বললেন।

    এই যেমন, অ্যানাক্ৰিয়নে একা এসেছ তুমি, আর একাই আমার সঙ্গে আমার চেম্বারে ঢুকেছ।

    হার্ডিন নিজের চারদিকে তাকালেন একবার।

    এসেছি, তো, কী হয়েছে তাতে?

    কিছুই হয়নি, উইনিস বললেন। তবে এই ঘরের বাইরে এই মুহূর্তে পাঁচজন পুলিশ-গার্ড দাঁড়িয়ে আছে। পাঁচজনই সশস্ত্র আর গুলি করার জন্যে তৈরি। তুমি বোধকরি আর ফিরতে পারছ না, হার্ডিন।

    সামান্য উঁচু হলো মেয়রের ভুরু জোড়া। এখুনি ফেরার কোনো ইচ্ছেও আমার নেই। আপনি তাহলে আমাকে ভয় পান?

    তোমাকে আমি মোটেই ভয় পাই না। তবে আমার দৃঢ়তার একটা পরিচয় পেতে পারো তুমি এর থেকে। আমরা কি একে বন্ধুত্বের নিদর্শন বলবো?

    আপনি যা খুশি তাই বলতে পারেন, নির্লিপ্ত গলায় হার্ডিন বললেন। আপনি ব্যাপারটাকে যাই বলুন না কেন তা নিয়ে নিজেকে বিব্রত করবো না আমি।

    আমি নিশ্চিত, সময়ের সঙ্গে তোমার এই দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাবে। ভাল কথা, তুমি আরেকটা ভুল করেছ, হার্ডিন। এবং এটা আরো মারাত্মক। টার্মিনাস প্রায় পুরোপুরি অরক্ষিত অবস্থায় রেখে এসেছ।

    সেটাই স্বাভাবিক। কীসের ভয় আমাদের? আমরা কারো স্বার্থের প্রতি হুমকিস্বরূপ নই। সবাইকেই সমানভাবে সাহায্য করি আমরা।

    নিজেরা অরক্ষিত থেকে, যোগ করলেন উইনিস। তোমরা দয়া করে আমাদের সশস্ত্র হতে সাহায্য করেছ। বিশেষ করে আমাদের নেভির উন্নতির জন্যে প্রচুর সহায়তা করেছ। ফলে আমাদের নেভি হয়ে উঠেছে অসাধারণ। সত্যি বলতে কী ইম্পেরিয়াল ক্রুজারটা তোমরা দান করার পর আমাদের নেভি হয়ে উঠেছে অপ্রতিরোধ্য। উইনিসের গলায় চাপা কৌতুক এবং শেষ।

    ইওর হাইনেস, আপনি সময় অপচয় করছেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার ভঙ্গি করলেন হার্ডিন। আপনার যদি যুদ্ধ ঘোষণা করার ইচ্ছে থাকে, আমি ধরে নিচ্ছি, সেকথাই আপনি জানাচ্ছেন আমাকে, এই মুহূর্তে আমার সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দিন।

    সিট ডাউন, হার্ডিন। আমি যুদ্ধ ঘোষণা করছি না। আর তুমি তোমার সরকারের সঙ্গে আদৌ যোগাযোগ করছ না। যুদ্ধ যখন করা হবে- ঘোষণা করা হবে না, হার্ডিন, করা হবে তখন অ্যানাক্ৰিয়নিয়ান নেভি অ্যাটম ব্লাস্ট ছুঁড়ে ফাউণ্ডেশনকে তা যথাসময়ে জানিয়ে দেবে। ফ্লাগশিপ উইনিস-এ চেপে অ্যানাক্রিয়নিয়ান নেভির নেতৃত্ব দিচ্ছে আমার ছেলে।

    হার্ডিন কুটি করলেন। তা, ব্যাপারটা কখন ঘটবে?

    সত্যিই যদি জানতে চাও তাহলে বলি, ফ্লিটের শিপগুলো এখন থেকে ঠিক পনেরো মিনিট আগে, ১১ টায়, অ্যানাক্রিয়ন ত্যাগ করেছে। টার্মিনাস নজরে পড়া মাত্র প্রথম ফায়ারটা করা হবে। সেটা ধর, আগামীকাল দুপুর নাগাদ ঘটবে। আপাতত নিজেকে তুমি স্বচ্ছন্দে একজন যুদ্ধবন্দী ভাবতে পার।

    আমি নিজেকে ঠিক তাই ভাবছি, ইওর হাইনেস, হার্ডিন তিক্ত স্বরে বললেন। তার কুটি এখনো বজায় আছে। তবে আমি হতাশ হলাম।

    খিক খিক করে ব্যঙ্গাত্মক একটা হাসি হাসলেন উইনিস। ব্যস, এই পর্যন্তই?

    হ্যাঁ। আমি ভেবেছিলাম, যৌক্তিকভাবেই অভিষেকের সময়টা অর্থাৎ মাঝরাতকে বেছে নেবেন আপনি ফ্লিট ছাড়ার সময় হিসেবে। এখন বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধটা আপনি নিজে রিজেন্ট থাকাকালীনই শুরু করতে চেয়েছেন। যাই হোক, সেক্ষেত্রে উল্টো দিক থেকে কিন্তু ব্যাপারটা বেশি নাটকীয় হতো।

    কী বলতে চাইছ তুমি? অবাক হয়ে বললেন রিজেন্ট

    বুঝতে পারছেন না? কোমল গলায় শুধোলেন হার্ডিন। আমি আমার পাল্টা আঘাতের সময় হিসেবে মাঝরাতটাই ঠিক করে রেখেছি।

    ঝট করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন উইনিস। ধাপ্পাবাজি! পাল্টা আঘাত টাঘাত কিছু নেই। তুমি যদি অন্য রাজ্যগুলোর সমর্থনের কথা ভেবে থাক তাহলে সেকথা ভুলে যাও। ওদের সবার নেভি এক করলেও আমাদের সামনে টিকতে পারবে না।

    আমি জানি সেটা। একটাও ফায়ার করার ইচ্ছে নেই আমার। তবে সপ্তাহখানেক আগে একটা কথা শোনা গিয়েছিল যে, আজ মাঝরাত নাগাদ গোটা অ্যানাক্রিয়ন গ্রহটা নাকি বিরাট এক নিষেধাজ্ঞার আওতায় চলে যাচ্ছে।

    নিষেধাজ্ঞা?

    হ্যাঁ। আপনার বোঝার সুবিধার জন্যে আরো সহজ করে বলছি। আমি প্রত্যাহার করার আদেশ না দেয়া অ্যানাক্ৰিয়নের প্রত্যেক প্রিস্ট ধর্মঘটে যাচ্ছেন। আর এভাবে অজ্ঞাতবাসে থাকলে আমার পক্ষে কোনো আদেশ দেয়া সম্ভব হবে না। অবশ্যি মুক্ত থাকলেও আমি সে-আদেশ দিতাম না। হঠাৎ সামনের দিকে ঝুঁকে এসে, গলায় আরো জোর এনে তিনি যোগ করলেন, ইওর হাইনেস, আপনি কি বুঝতে পারছেন, ফাউণ্ডেশনের ওপর আক্রমণ হানা একটি পবিত্র জিনিসকে চূড়ান্তভাবে অপবিত্র করা ছাড়া আর কিছুই নয়?

    দৃশ্যতই, আত্মসংযম বজায় রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন উইনিস। এসব কথা আমাকে শুনিও না, জনগণের জন্যে তুলে রাখ।

    মাই ডিয়ার উইনিস, তাদের ছাড়া আর কার জন্যে কথাগুলো জমা রাখছি বলে মনে করেন আপনি? কল্পনা করতে পারি, গত আধ ঘণ্টা ধরে অ্যানাক্ৰিয়নের প্রতিটি মন্দিরে একজন প্রিস্ট সম্মিলিত জনতাকে ঠিক এই কথাগুলোই বোঝানোর চেষ্টা করছে। অ্যানাক্রিয়নে আজ পুরুষ বা মহিলা কারো জানতে বাকি নেই যে, তাদের সরকার তাদের ধর্মের কেন্দ্রবিন্দুর ওপর বর্বরোচিত, ঘৃণ্য এবং গায়ে পড়া আক্রমণ চালিয়েছে। মাঝরাত হতে আর মাত্র মিনিট কয়েক বাকি। আপনি বরং বলরুমে গিয়ে দেখে আসুন কী ঘটছে। দরজার বাইরে পাঁচজন গার্ড আছে, সুতরাং নিরাপদেই থাকব আমি এখানে।

    চেয়ারের পিঠে গা এলিয়ে দিলেন তিনি। শূন্য গ্লাসে নিজেই লক্রিস ওয়াইন ঢেলে নিলেন। তারপর নির্জলা একটি নির্লিপ্তভাব নিয়ে তাকিয়ে রইলেন সিলিং-এর দিকে।

    বিড়বিড় করে হলপ করার মতো কী যেন আউড়ে তীর বেগে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন উইনিস।

    বলরুমের অভিজাত অতিথিরা সবাই নিশ্চুপ হয়ে গেছেন। সিংহাসন চলার জন্যে একটা প্রশস্ত পথ তৈরি করে দিয়েছেন তাঁরা নিজেরা সরে গিয়ে। সিংহাসনে বসে আছেন লিপল্ড। হাত দুটো বুকের ওপর জড়ো করে রাখা। মাথা উঁচু, মুখ থমথমে। বিশাল ঝাড়বাতিগুলো নিভু নিভু। ছোট ছোট অ্যাটমো বা থেকে নিঃসরিত বিভিন্ন রঙের আলো ধনুকাকৃতির ছাদে প্রতিফলিত হচ্ছে। ঝকমকে একটা মুকুটের আকার নিয়ে রাজকীয় একটি আভা উজ্জ্বল হয়ে আছে লিপন্ডের মাথার ওপর।

    সিঁড়ির কাছে থমকে দাঁড়ালেন উইনিস। কেউ লক্ষ্য করছে না তাকে। সবার চোখ সিংহাসনের দিকে। হাত জোড়া মুঠি পাকিয়ে, যেখানে থেমেছিলেন সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। ছোটখাটো ব্যাপারে তাঁকে ধোঁকা দেবেন না হার্ডিন।

    হঠাৎ নড়ে উঠল সিংহাসনটা। নিঃশব্দে ওপরের দিকে উঠল। একদিকে সরে গেল সামান্য। মঞ্চ থেকে বেরিয়ে এল। সিঁড়ি ধরে নেমে, মেঝে থেকে আনুভূমিকভাবে ছ ইঞ্চি ওপর দিয়ে, ভেসে চলল বিশালাকৃতি জানালার দিকে।

    গম্ভীর এক ঘণ্টাধ্বনি মাঝরাত ঘোষণা করল আর সেই ঘণ্টাধ্বনির সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল সিংহাসনটা জানালার সামনে এসে। আর সেই সঙ্গে, রাজার চারপাশ ঘিরে থাকা আলোর আভাটা নেই হয়ে গেল।

    বিস্ময়ে মুখ বিকৃত হয়ে গেল রাজার। সময় যেন জমাট বেঁধে গেছে। এক মুহূর্তের জন্যে স্থির রইলেন তিনি। দ্যুতিহীন অবস্থায় তাঁকে নিতান্তই মানবিক মনে হচ্ছে। এমনি সময় হঠাৎ কেঁপে উঠে ছ ইঞ্চি ওপর থেকে সশব্দে মেঝেতে পড়ল সিংহাসনটা এবং প্রাসাদের সব কটা আলো নিভে গেল এক সঙ্গে।

    চারদিকের চিত্তার আর কোলাহল ভেদ করে উইনিসের ষাঁড়ের মতো গলা শোনা গেল, মশাল আনন। মশাল আনন।

    ডাইনে-বাঁয়ে কনুই চালিয়ে, ভিড় ঠেলে, দ্রুত দরজার দিকে এগোলেন তিনি। যেন শূন্য থেকে প্রাসাদক্ষীরা এসে হাজির হলো অন্ধকারের ভেতর।

    কিছু মশালও চলে এল বলরুমে। অভিষেকের পর শহরের রাস্তায় রাস্তায় বিশাল মশাল মিছিলে এগুলো ব্যবহার করার কথা ছিল।

    নীল, সবুজ, লাল- বিভিন্ন রঙের মশাল শোভা পাচ্ছে এখন রক্ষীদলের সদস্যদের হাতে। ভয়ার্ত, হতবুদ্ধি মুখগুলো আলোকিত হয়ে উঠল সেগুলোর অদ্ভুত আলোয়।

    কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি, চেঁচিয়ে উঠলেন উইনিস। সবাই যে যার জায়গায় থাকুন। এক্ষুনি পাওয়ার চলে আসবে।

    একেবারে অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রক্ষীদলের প্রধানের দিকে ফিরে তিনি জিগ্যেস করলেন, কী ব্যাপার, ক্যাপ্টেন?

    ইওর হাইনেস, তুরিত জবাব এল, শহরের লোকজন গোটা প্রাসাদ ঘিরে ফেলেছে।

    কী চায় তারা? গর্জে উঠলেন উইনিস।

    একজন প্রিস্ট তাদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। হাই প্রিস্ট পলি ভেরিসফ বলে চেনা গেছে তাকে। তিনি অবিলম্বে মেয়র স্যালভর হার্ডিনের মুক্তি এবং ফাউণ্ডেশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানাচ্ছেন। সৈনিকোচিত নির্লিপ্ত কণ্ঠে রিপোর্ট পেশ না করলেও ক্যাপ্টেনের চোখের দৃষ্টি অস্থিরভাবে এদিকে-সেদিকে ছুটে যাচ্ছিল।

    কোনো বদমাশ গেট দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করলে, চিৎকার করে উঠলেন উইনিস, ব্লাস্ট করে একদম হাওয়ায় মিলিয়ে দেবে তাকে। আপাতত এর বেশি কিছু করতে যেয়ো না। যত পারুক চেঁচাক ওরা। কাল একটা হিসেব-নিকেশ হবে।

    বিভিন্ন স্থানে মশাল বসিয়ে দেবার পর বলরুম প্রায় আগের মতো আলোকিত হয়ে উঠেছে আবার।

    সিংহাসনের দিকে ছুটে গেলেন উইনিস। এখনো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে আছে সেটা। মোমের মতো সাদা হয়ে গেছে লিপন্ডের জমাট বাঁধা মুখটা। টেনে মেঝেতে দাঁড় করালেন তাকে উইনিস।

    এসো আমার সঙ্গে।

    জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেন তিনি। সারা শহর মিশমিশে অন্ধকারে ঢাকা। নিচ থেকে ভেসে আসছে ক্ষুব্ধ জনতার কর্কশ চিৎকার। ডাইনে, শুধুমাত্র আর্গোলিড মন্দিরে আলো জ্বলছে। ক্রুদ্ধ স্বরে একটা খিস্তি করে রাজাকে টেনে সরিয়ে আনলেন তিনি সেখান থেকে।

    পাঁচ রক্ষীকে সঙ্গে নিয়ে ঝড়ের বেগে চেম্বারে ঢুকলেন উইনিস। সবার পরে ঢুকলেন রাজা লিপন্ড। বিস্ফারিত চোখ ভয়ার্ত, নির্বাক।

    কর্কশ কণ্ঠে উইনিস বলে উঠলেন, হার্ডিন, তুমি যে খেলা খেলছ তা সামাল দেবার শক্তি তোমার নেই।

    মেয়রের আচরণে নির্জলা অবজ্ঞা প্রকাশ পেল। তার পাশে ছোট্ট অ্যাটমো বা থেকে মুক্তোর মতো আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। ঠোঁটে একটা ব্যঙ্গাত্মক হাসি মেখে চুপচাপ বসে রইলেন তিনি। কোনো জবাব দিলেন না উইনিসের কথার।

    গুড মর্নিং, ইওর ম্যাজেস্টি, লিপন্ডের উদ্দেশে বলে উঠলেন তিনি একটু পর। অভিষেক উপলক্ষে অভিনন্দন জানাচ্ছি আপনাকে।

    হার্ডিন, আবার চেঁচিয়ে উঠলেন উইনিস, তোমার প্রিস্টদেরকে যার যার কাজে ফিরে যেতে হুকুম দাও।

    আপনি নিজেই হুকুম দিন, উইনিস, শীতল দৃষ্টিতে রিজেন্টের দিকে তাকিয়ে বললেন হার্ডিন। তারপর দেখুন কে কার সামর্থ্যের অতিরিক্ত শক্তি নিয়ে খেলছে। ঠিক এই মুহূর্তে একটা চাকাও ঘুরছে না অ্যানাক্ৰিয়নে। মন্দিরগুলো ছাড়া আর কোথাও কোনো আলো জ্বলছে না। মন্দিরগুলো ছাড়া আর কোথাও কোনো কল থেকে এক ফোঁটা পানি পড়ছে না। মন্দিরগুলো ছাড়া এই গ্রহের অর্ধেক অঞ্চলের কোথাও এক ক্যালোরি তাপও পাওয়া যাচ্ছে না। হাসপাতালগুলোতে কোনো রুগী ভর্তি করা হচ্ছে না। পাওয়ার প্ল্যান্টগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, গ্রাউণ্ডেড হয়ে আছে সব কটা শিপ। যদি ইচ্ছে হয় তাহলে আপনি নিজেই প্রিস্টদেরকে তাদের কাজে ফিরে যাবার হুকুম দিয়ে দেখতে পারেন। আমার অন্তত সেরকম কোনো ইচ্ছে নেই।

    স্পেসের দিব্যি, হার্ডিন, আমি তাই করব। তুরুপের তাস কটা আছে তা যদি দেখাতেই হয় তাহলে তা-ই দেখাব। দেখব, তোমার প্রিস্টরা আর্মির সামনে কতক্ষণ টেকে। আজ রাতে গ্রহের সব কটা মন্দির আর্মির আশ্বারে চলে যাবে।

    বেশ তো। কিন্তু আপনি সে আদেশ কীভাবে দেবেন? যোগাযোগের সব পথ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আপনি দেখতে পাবেন, রেডিও কাজ করছে না, টেলিভিজর কাজ করছে না; কাজ করছে না আট্রাওয়েভ-ও। মন্দিরগুলোর বাইরে এ-গ্রহের একমাত্র যে কমিউনিকেটরটি কাজ করবে সেটা হচ্ছে ঠিক এই রুমের টেলিভিজরটা। আর আমি এটাকে শুধু সংবাদ গ্রহণের জন্যে ফিট করে রেখেছি, অর্থাৎ বাইরে কোনো আদেশ পাঠানো যাবে না এটা দিয়ে।

    শ্বাস নেবার বৃথা চেষ্টা করলেন উইনিস। হার্ডিন বলে চললেন, ইচ্ছে হলে আপনার আর্মিকে অর্ডার দিয়ে দেখতে পারেন, প্রাসাদের ঠিক বাইরে ঐ আর্গোলিড মন্দিরে ঢুকে তারা যেন সেখানকার আত্রাওয়েভ সেটের সাহায্যে গ্রহের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে। আমার ধারণা, জনতা সেক্ষেত্রে আপনার ঐ আর্মিকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলবে। আর তখন আপনার প্রাসাদ সামলাবে কে, উইনিস? আপনাদের জীবন রক্ষা করবে কে, উইনিস?

    উইনিস গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আমরা ঠিকই টিকে যাৰ, শয়তান। আমরাই জিতে যাব শেষ পর্যন্ত। জনতা চেঁচাক, পাওয়ার না থাকুক, কোনো অসুবিধা নেই। যখন খবর আসবে ফাউণ্ডেশন দখল হয়ে গেছে, তখন তোমার মহাশক্তিধর জনতা টের পাবে তাদের ধর্ম কী এক অসীম শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। তখন তারাই তাদের প্রিস্টদের পরিত্যাগ করে তাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে। আমি তোমাকে আগামীকাল দুপুর পর্যন্ত সময় দিলাম, হার্ডিন, কারণ, অ্যানাক্ৰিয়নের পাওয়ার বন্ধ করতে পারলেও, আমার ফ্লিট তুমি থামাতে পারবে না। উল্লাসের আতিশয্যে তাঁর কণ্ঠস্বর বিকৃত হয়ে গেল। তুমি নিজে যে বিশাল ক্রুজারটি মেরামতের অর্ডার দিয়েছিলে সেটার নেতৃতু ওরা টার্মিনাসের দিকে এগিয়ে চলেছে।

    হার্ডিন হালকা সুরে জবাব দিলেন, হ্যাঁ, আমিই আদেশ দিয়েছিলাম ক্রুজারটা ঠিক করার জন্যে। কিন্তু আমার মনের মতো করে। অ্যাস্ট্রাওয়েভ রিলে-র কথা কখনো শুনেছেন, উইনিস? বুঝেছি, শোনেননি। ঠিক আছে, দু মিনিটের মধ্যে আপনি জেনে যাবেন সেটা কী করতে পারে।

    তাঁর কথা শেষ না হতেই টেলিভিজরটা প্রাণ পেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হার্ডিন নিজেকে শুধরে নিয়ে বলে উঠলেন, না, দু সেকেণ্ডের মধ্যে। বসুন, উইনিস, কান পেতে শুনুন।

    .

    সাত

    থিও অ্যাপোরাট অ্যানাক্ৰিয়নের অতি উচ্চপদস্থ প্রিস্টদের একজন। স্রেফ পদমর্যাদার দিক থেকে এই উচ্চ অবস্থানের কারণেই হেড প্রিস্ট হিসেবে ফ্ল্যাগশিপ উইনিস-এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাবার যোগ্যতা রাখেন তিনি।

    কিন্তু তার যোগ্যতা শুধু পদমর্যাদার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। শিপটাকে তিনি নিজের হাতের চেটোর মতো ভালোভাবে চেনেন। শিপের মেরামতের কাজে ফাউণ্ডেশন থেকে আসা হোলিম্যানদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে কাজ করেছেন তিনি। তাদের আদেশে তিনি শিপটার মোটরগুলো পরীক্ষা করে দেখেছেন। রিওয়্যার করেছেন টেলিভিজরগুলো। কমিউনিকেশন সিস্টেম ঠিক করে প্রায় নতুনের মতো করে দিয়েছেন। ফুটো হয়ে যাওয়া হাল-এ আবার ধাতুর প্রলেপ দিয়েছেন। বীমগুলো আরো শক্তপোক্ত করেছেন। এমনকি ফাউণ্ডেশনের হোলিম্যানরা যখন শিপে একটা নতুন যন্ত্র বসান, তখন তাঁকে সে-কাজে সাহায্য করার অনুমতিও দেয়া হয়েছিল। যন্ত্রটা এতই পবিত্র যে, এর আগে অন্য কোনো শিপে সেটা বসান হয়নি। এই অসাধারণ, প্রকাণ্ড শিপটির জন্যেই বেছে রাখা হয়েছিল ওটাকে। যন্ত্রটার নাম আন্দ্রাওয়েভ রিলে।

    সুতরাং এতে অবাক হবার কিছু নেই যে, গৌরবময় এই শিপটিকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহারের নির্দেশ দেয়া হয়েছে দেখে রীতিমত মর্মপীড়া অনুভব করছেন তিনি। ভয়ানক এক দুষ্কর্মে ব্যবহার করা হবে শিপটাকে- ভেরিসফের এই কথা তিনি কখনোই বিশ্বাস করতে চাননি। শিপটির অস্ত্রগুলো নাকি ফাউণ্ডেশনের দিকেই তাক করা হবে। সেই ফাউণ্ডেশনের দিকে, তরুণ বয়সে তিনি যেখানে ট্রেনিং নিয়েছেন, যে ফাউণ্ডেশন থেকে পেয়েছেন সব ধরনের আশীর্বাদ।

    কিন্তু একটু আগে অ্যাডমিরাল তাকে যা বললেন তা শুনে তার সব সন্দেহ দূর হয়ে গেছে। ভেরিসফের কথাই ঠিক।

    কিন্তু ঐশ্বরিক আশীর্বাদপ্রাপ্ত রাজা কী করে এই ঘৃণ্য কাজের অনুমতি দিলেন? অনুমতিটা কি রাজা দিয়েছেন? রাজার অজ্ঞাতসারে তাঁর অভিশপ্ত রিজেন্ট উইনিসই কি করেননি কাজটা? খুব সম্ভব তাই। এবং এই উইনিসের ছেলেই সেই অ্যাডমিরাল। পাঁচ মিনিট আগে সে-ই তাঁকে বলেছিল:

    আপনি আপনার ধর্ম-কর্মের দিকে মনোযোগ দিন, প্রিস্ট। আমি আমার শিপের ভার নিচ্ছি।

    বাঁকা হাসি হাসলেন অ্যাপোরাট। শুধু ধর্ম-কর্মের দিকে নয়, শুধু আশীর্বাদের দিকেই নয়, অভিশাপের দিকেও মনোনিবেশ করবেন তিনি। এবং প্রিন্স লেফর্কিন শিগগিরই গোঙাতে শুরু করবে সেই অভিশাপের ফলে।

    জেনারেল কমিউনিকেশন রুমে ঢুকলেন তিনি। তার আগে আগে অধস্তন দু জন উপাসক ঢুকলো ঘরটিতে। দুজন অফিসার ইনচার্জ বসে আছে সেখানে। অ্যাপোরাটকে বাধা দেবার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না তাদের মধ্যে। শিপের সর্বত্র অবাধ যাতায়াতের এক্তিয়ার আছে হেড প্রিস্ট অ্যাটেনডেন্ট-এর।

    দরজা বন্ধ করে দাও, আদেশ করলেন অ্যাপোরেট। তাকালেন ক্রনোমিটারের দিকে।

    বারোটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। সময়মতই এসেছেন তিনি।

    অভ্যস্ত হাতে ছোট্ট লিভারগুলো টেনে দিলেন তিনি। দু মাইল লম্বা শিপটার যে কোনো স্থান থেকে তার কণ্ঠ শোনা যাবে এখন, দেখা যাবে তাঁর ছবিও।

    রয়্যাল ফ্ল্যাগশিপ উইনিস-এর সৈনিকেরা শোন! আমি তোমাদের প্রিস্ট অ্যাটেনডেন্ট বলছি! অ্যাপোরাট জানেন, শিপের একদম শেষ প্রান্তে, স্টার্নের অ্যাটম ব্লাস্ট থেকে শুরু করে, প্রাউ-এর নেভিগেশন টেবিল পর্যন্ত পুরো এলাকা জুড়ে ধ্বনিত হচ্ছে তার কণ্ঠস্বর।

    তোমাদের শিপ, তিনি বলে চলেছেন, পবিত্র বস্তু অপবিত্র করার কাজে লিপ্ত হয়েছে। তোমাদের অজ্ঞাতসারে এই শিপ এমন এক কাজ করতে যাচ্ছে, যাতে করে এ-জাহাজে অবস্থানরত তোমাদের প্রত্যেকের আত্ম চিরতরে অভিশপ্ত হবে। তোমাদের কামাণ্ডার শিপটিকে তার পাপপূর্ণ ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করাতে চাইছেন। এই যখন তাঁর ইচ্ছা, তখন আমি গ্যালাকটিক স্পিরিট-এর নামে তাঁকে তাঁর কমাণ্ড থেকে অপসারিত করছি। তার কারণ, গ্যালাকটিক স্পিরিটের আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হলে কমাণ্ডের কোনো কার্যকারিতা থাকে না। স্পিরিটের অনুমোদন না থাকলে খোদ দেবোপম রাজাও আর রাজা থাকেন না।

    পরম শ্রদ্ধাভরে অ্যাপোরাটের কথা শুনে যাচ্ছে দুই সহকারী। সৈনিক দুজন আতঙ্কে সাদা হয়ে গেছে। আরো গম্ভীর হয়ে উঠল অ্যাপোরাটের কণ্ঠস্বর। আর শিপটি যেহেতু এরকম অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে ছুটে চলেছে, সেহেতু এটার ওপর থেকেও স্পিরিটের আশীর্বাদ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছে।

    গম্ভীরভাবে একটা হাত তুললেন অ্যাপোরাট। হাজারখানেক টেলিভিজরের সামনে দাঁড়ানো সৈন্যরা সব হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। প্রিস্ট অ্যাটেনডেন্ট-এর রাজকীয় প্রতিচ্ছবিটি বলে চলল :

    গ্যালাকটিক স্পিরিটের নামে, তার প্রফেট হ্যারি সেলডনের নামে, গ্যালাকটিক স্পিরিটের ব্যাখ্যাদাতাদের নামে, অর্থাৎ ফাউণ্ডেশনের হোলিম্যানদের নামে আমি শিপটিকে অভিশাপ দিচ্ছি। শিপটির চক্ষুস্বরূপ টেলিভিজরগুলো অন্ধ হয়ে যাক! বাহুস্বরূপ এ্যাপলগুলো অবশ হয়ে যাক। মুষ্টিস্বরূপ অ্যাটম ব্লাস্টগুলো তাদের কার্যক্ষমতা হারাক! হৃৎপিণ্ডস্বরূপ মোটরগুলোর স্পন্দন বন্ধ হয়ে যাক! কণ্ঠস্বরূপ কমিউনিকেশনগুলো মূক হয়ে যাক! প্রশ্বাসস্বরূপ ভেন্টিলেশনগুলো স্তিমিত হয়ে যাক! আত্মস্বরূপ লাইটগুলো অন্ধকার হয়ে যাক! গ্যালাকটিক স্পিরিটের নামে, শিপটির প্রতি এ-ই আমার অভিশাপ।

    তার শেষ কথাটি শেষ হবার সঙ্গে রাত ঠিক বারোটা বাজতেই, কয়েক আলোকবর্ষ দূরে একটি হাত আর্গোলিড মন্দিরে একটি আন্দ্রাওয়েভ রিলে ওপেন করল। সেটি আবার সঙ্গে সঙ্গে আন্ট্রাওয়েভের গতিতে ফ্লাগশিপ উইনিসের আরেকটি রিলে ওপেন করল।

    এবং সেই মুহূর্তে মৃত অবস্থায় পতিত হল শিপটি।

    হবার কোনো কারণ নেই, কেননা, বিজ্ঞাননির্ভর ধর্ম মোটেই ঠুটো জগন্নাথ নয় এবং অ্যাপোরাটের অভিশাপ সত্যিই মারাত্মক।

    অ্যাপোরাট দেখলেন, সারা জাহাজ জুড়ে অন্ধকার নেমে এল। হাইপার অ্যাটমিক মোটরগুলোর দূরাগত মৃদু ঘড় ঘড় আওয়াজ থেমে গেল হঠাৎ করে। উত্যু হয়ে উঠলেন তিনি। পরনের দীর্ঘ আলখাল্লার পকেট থেকে একটা সেলফ পাওয়ার্ড অ্যাটমো বা বের করলেন। মুক্তোর মতো আলোয় ভরে গেল ঘর।

    সৈন্য দুজনের দিকে তাকালেন তিনি। এমনিতে এরা দুজনেই খুব সাহসী। এখন ঠঠক করে কাঁপছে ভয়ে। ইওর রেভারেন্স, আমাদের রক্ষা করুন, ফুঁপিয়ে উঠল একজন। আমরা সামান্য লোক। নেতাদের অপরাধ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানতাম না।

    আমার সঙ্গে এসো, কঠিন সুরে আদেশ করলেন অ্যাপোরাট। তোমাদের আত্মার পবিত্রতা এখনো বিনষ্ট হয়নি।

    গোটা জাহাজ জুড়ে অন্ধকারের রাজত্ব। জলাভূমি থেকে যেমন পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে, সেই অন্ধকার থেকে ঠিক তেমনি নির্জলা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। অ্যাপোরাট এবং তাঁকে ঘিরে থাকা আলোকবৃত্তের কাছে এসে জটলা পাকাল সৈন্যরা। তাঁর কাপড়ের প্রান্ত স্পর্শ করার জন্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল তাদের মধ্যে। কাতর কণ্ঠে অনুনয়-বিনয় শুরু করল তারা যাতে তিনি তাদের সামান্যতম দয়া করেন।

    প্রতিবারই তাঁর এক জবাব, আমাকে অনুসরণ কর।

    অবশেষে পেলেন তিনি প্রিন্স লেফকিনকে। অফিসার্স কোয়ার্টারের ভেতর দিয়ে অন্ধকারে পথ হাতড়ে এগোচ্ছেন তিনি। সেই সঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন আলোর জন্যে। চোখে মুখে একরাশ ঘৃণা নিয়ে প্রিস্ট অ্যাটেনডেন্টের দিকে তাকালেন তিনি।

    এসেছ তাহলে! মায়ের কাছ থেকে নীল চোখ জোড়া পেয়েছেন তিনি। কিন্তু বড়শির মতো বাঁকা নাক আর চোখের তীর্যক দৃষ্টি বলে দেয়, তিনি উইনিসের ছেলে। তোমার এই নেমকহারামীর মানে কী? শিপের পাওয়ার ফিরিয়ে আনে। আমি এ শিপের কমান্ডার।

    এক সময় ছিলে, এখন আর নও, গম্ভীর মুখে বললেন অ্যাপোরাট।

    বুনো হয়ে উঠেল লেফকিনের মুখটা। ধর এই লোকটাকে! গ্রেফতার করা নইলে, স্পেসের দিব্যি, সবাইকে জামাকাপড় খুলে এয়ার লকের বাইরে পাঠাব আমি। এক মুহূর্ত থেমে আবার চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। আমি তোমাদের অ্যাডমিরাল হুকুম করছি, অ্যারেস্ট হিম!

    কেউ এক চুলও নড়ল না দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেল তার পুরোপুরি। তোমরা এই মূর্খ সঙটার কথায় বোকা বনে গেলে? ভুয়া, বুজরুকিভরা এক ধর্মের কাছে মাথা নোয়ালে? এই লোকটা একটা শঠ, আর ও যে গ্যালাকটিক স্পিরিটের কথা বলছে, সেটা একটা জালিয়াতি। ওর আসল উদ্দেশ্য।

    ভয়ানকভাবে চেঁচিয়ে উঠে তাঁকে থামিয়ে দিলেন অ্যাপোরাট।

    নাস্তিকটাকে ধর। যতই ওর কথা শুনবে, তোমাদের আত্মার পবিত্রতা ততই নষ্ট হতে থাকবে।

    মুহূর্তের মধ্যে জনা বিশেক সৈন্যের হাতে বন্দি হয়ে গেলেন মহামান্য অ্যাডমিরাল।

    ওকে নিয়ে আমার সঙ্গে এসো তোমরা, ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করলেন অ্যাপোরাট। লেফকিনকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলল সৈন্যরা তার পিছু পিছু। পেছনের করিডরটা আবার অন্ধকারে ঢেকে গেল। কমিউনিকেশন রুমে ফিরে এলেন অ্যাপোরাট। একমাত্র সচল টেলিভিজরটার সামনে দাঁড়িয়ে প্রাক্তন কমাণ্ডারকে হুকুম করলেন, ফ্লিটের বাকি সবাইকে আর এগোতে নিষেধ কর। তৈরি হতে বল অ্যানাক্রিয়নে ফেরার জন্যে।

    আলুথালু বেশবাস, রক্তাক্ত, পর্যুদস্ত লেফকিন বিনা তর্কে হুকুম তামিল করল।

    অ্যাপোরাট এরপর গম্ভীর স্বরে বললেন, আন্ট্রওয়েভ বীমের সাহায্যে অ্যানাক্রিয়নের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে আমাদের। এবার আমি যা বলতে বলব ঠিক তাই বলে যাবে।

    নেতিবাচক একটা ভঙ্গি করলেন লেফকিন। অমনি ঘরে বাইরে করিডরে জমায়েত হওয়া সৈন্যরা ভয়ংকরভাবে গর্জে উঠল।

    কী হলো! ধমকে উঠলেন অ্যাপোরাট। শুরু কর, বলো, অ্যানাক্রিয়ন নেভি—

    শুরু করলেন লেফকিন।

    .

    আট

    টেলিভিজরে প্রিন্স লেফকিনের চেহারা ভেসে উঠতেই পিতপতন স্তব্ধতা নেমে এল উইনিসের চেম্বারে। ছেলের বিধ্বস্ত মুখ আর ছেঁড়াফাড়া ইউনিফর্ম দেখে উইনিসের মুখ থেকে বিস্ময়সূচক একটা শব্দ বেরুল; এবং তারপর, ধপ করে বসে পড়লেন তিনি চেয়ারে। বিস্ময় এবং আকস্মিকতার ধাক্কায় মুখ বিকৃত হয়ে গেল তাঁর।

    হাত দুটো আলতো করে কোলের ওপর রেখে অবিচলভাবে সব শুনে গেলেন হার্ডিন। এদিকে সদ্য অভিষিক্ত লিপন্ড ঘরের এক অন্ধকার কোণে জবুথবু হয়ে বসে রইলেন। মাঝে মাঝেই রাগে, ক্ষোভে, সোনার পাত দিয়ে মোড়া আস্তিন কামড়াচ্ছেন তিনি। এমনকি সৈন্যদের আবেগশূন্য দৃষ্টিতে চাঞ্চল্য দেখা দিল। অ্যাটম ব্লাস্ট হাতে নিয়ে দরজার কাছে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রইল তারা। চোরাদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল টেলিভিজরের দিকে। অনিচ্ছুক ভঙ্গিতে বলে যাচ্ছেন ফেলকিন। ক্লান্ত কণ্ঠ তাঁর থেমে যাচ্ছে একটু পর পর। মনে হচ্ছে, নাটকের সংলাপের মতো আড়াল থেকে কথাগুলো বলে দেয়া হচ্ছে তাকে। তাছাড়া, তার গলার স্বরে শিষ্টতাও নেই খুব একটা।

    অ্যানক্রিয়নিয়ান নেভি… তার মিশনের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে…এবং ফাউণ্ডেশনের মতো একটি পবিত্র ভূমি অপবিত্র করতে অনিচ্ছুক হয়ে…অ্যানাক্রিয়নে ফিরে যাচ্ছে… সেই সঙ্গে সকল কল্যাণের উৎস… ফাউণ্ডেশন এবং গ্যালাকটিক স্পিরিটের বিরুদ্ধে… যে সমস্ত অধার্মিক এবং পাপী অপবিত্র শক্তি ব্যবহারে উদ্যোগী হবে… তাদের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছে। … এই মুহূর্তে শাশ্বত বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সমস্ত যুদ্ধ বন্ধ করা হোক…আমাদের প্রিস্ট অ্যাটেনডেন্ট থিও অ্যাপোরাটের নেতৃত্বাধীন নেভির মাধ্যমে নিশ্চয়তা প্রদান করা হোক… যে… ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো যুদ্ধ আবার শুরু করা যাবে না এবং… এইখানে একটা লম্বা বিরতি, তারপর আবার শুরু করলেন লেফকিন এবং প্রাক্তন প্রিন্স রিজেন্ট উইনিসকে… গ্রেফতার করে… তার সমস্ত অপরাধের জন্যে ধর্মীয় আদালতে নিয়ে বিচার করা হোক। অন্যথায়… অ্যানাক্রিয়নে ফিরে এসে… রয়্যাল নেভি… রাজপ্রসাদ ধুলোয় মিশিয়ে দেবে এবং বাকি সব পাপী এবং মানবাত্মা বিনষ্টকারীর আখড়া… খুঁড়িয়ে দেবার… প্রয়োজনীয় সব রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

    থেমে গেল কণ্ঠটা। উদগত কান্নার একটা চাপা শব্দ শোনা গেল এবং তারপরেই কালো হয়ে গেল পর্দাটা।

    অ্যাটমো বালের ওপর দ্রুত খেতে গেল হার্ডিনের আঙুল। সঙ্গে সঙ্গে নিভে গেল সেটার আলো। রিজেন্ট, রাজা এবং সৈন্যরা সবাই অস্পষ্ট ছায়ায় পরিণত হলো। এবং এই প্রথমবারের মতো দেখা গেল, একটা আভা ঘিরে আছে হার্ডিনকে।

    আভাটা প্রাক্তন রাজাদের আভার মতো উজ্জ্বল নয় বরং আরো কম দর্শনীয়, কম। মোহনীয়, কিন্তু তারপরেও সেটা তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণেই আরো কার্যকর এবং আরো প্রয়োজনীয়।

    মাত্র এক ঘণ্টা আগে উইনিস তাঁকে যুদ্ধবন্দি ঘোষণা করেছিলেন। বলেছিলেন, টার্মিনাস ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এখন তিনি ক্লান্ত, বিধ্বস্ত, নিশূপ।

    অনেক পুরনো একটা গল্প আছে, উইনিসের উদ্দেশে বলে উঠলেন হার্ডিন। তাঁর গলায় ঈষৎ ব্যঙ্গের ছোঁয়া। খুব সম্ভব গল্পটা মানব সভ্যতার মতই প্রাচীন। আপনার ভাল লাগতে পারে। বলছি, শুনুন।

    একটা নেকড়ে বাঘের কারণে একটা ঘোড়া সারাক্ষণই ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত। হতাশার চূড়ান্তে পৌঁছে সে ভাবল, নেকড়ের হাত থেকে বাঁচার জন্যে শক্তিশালী একজন মিত্র দরকার তার। এক মানুষের কাছে গিয়ে প্রস্তাবটা পাড়ল সে। যুক্তি দেখাল, নেকড়ে বাঘটা আসলে মানুষেরও শক্র। মানুষটি তৎক্ষণাৎ ঘোড়ার সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে রাজি হয়ে গেল। সেই সঙ্গে প্রস্তাব করল, ঘোড়াটা যদি তার দ্রুতগতি নিয়ন্ত্রণের ভার তার হাতে ছেড়ে দেয় তাহলে সে নেকড়ে বাঘটাকে এই মুহূর্তে মেরে ফেলতে পারে। ঘোড়ার কোনো আপত্তি নেই তাতে। সানন্দে নিজের পিঠে জিন আর লাগাম পরাবার অনুমতি দিল মানুষটাকে। ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে, নেকড়ে বাঘকে তাড়িয়ে নিয়ে মেরে ফেলল লোকটা তখুনি।

    আনন্দে, স্বস্তিতে আত্মহারা ঘোড়া তখন মানুষটিকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলল, আমাদের শত্রু তো খতম-ই হয়ে গেছে। এবার তোমার লাগাম আর জিন সরিয়ে নিয়ে আমাকে আমার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দাও।

    উত্তরে লোকটা হো হো করে হেসে বলে উঠল, বেড়ে বলেছ যা হোক। হেট হেটু, বলে সে ঘোড়ার পিঠে চাবুকের এক বাড়ি মারল।

    কোনো উত্তর এল না। উইনিসের ছায়াটা এক চুলও নড়ল না।

    শান্তভাবে হার্ডিন বলে চললেন, মিলটা আশা করি দেখতে পাচ্ছেন আপনি। তাদের নিজেদের লোকের ওপর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা বজায় রাখার জন্যে চার রাজ্যের রাজারা রিলিজন অভ সায়েন্স অর্থাৎ বিজ্ঞান-ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, আর এই ধর্মই তাদের ঐশ্বরিক মর্যাদা দান করেছে। এই বিজ্ঞান-ধর্ম হলো তাদের পিঠে চাপানো লাগাম ও জিন, কারণ এই ধর্ম অ্যাটমিক পাওয়ার-এর প্রাণভোমরাটিকে যাজকদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং যাজকরা আমাদের হুকুম তামিল করত, আপনাদের নয়। আপনি নেকড়ে বাঘটাকে মেরেছেন টিকই, কিন্তু ঐ লাগাম আর জিনের হাত থেকে মুক্তি পাননি।

    ঝট্‌ করে উঠে দাঁড়ালেন উইনিস। অন্ধকারে তার চোখ দুটো ধক ধক করে জ্বলছে। তাঁর গলা ভারি, কথা খাপছাড়া। তারপরেও আমি তোমাকে দেখে নেব। পালাতে পারবে না তুমি। তুমি পচে মরবে। গুঁড়িয়ে দিক ওরা আমাদের সবকিছু, গুঁড়িয়ে দিক ওরা আমাদের। তুমি পচে মরবে! তোমাকে আমি ঠিকই হাতে পাব?

    সোলজার্স, হিস্টিরিয়াগ্রস্তের মতো বজ্রকণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, গুলি কর শয়তানটাকে। ব্লাস্ট হিম! ব্লাস্ট হিম!

    চেয়ারে বসেই সৈন্যদের দিকে ঘুরে তাকালেন হার্ডিন। মুচকি হাসলেন। একজন তাঁর দিকে একটা অ্যাটম ব্লাস্ট তাক করল। তারপরেই নামিয়ে নিল। অন্যরা এক বিন্দু নড়ল না কেউ। খানিক দূরে দাঁড়ান উন্মত্ত লোকটা যতই চেঁচাক না কেন, কোমল আভা পরিবেষ্টিত হয়ে যিনি সোফায় বসে পরম আত্মবিশ্বাসের হাসি হাসছেন, অ্যানাক্রিয়নের সমস্ত দম্ভ যিনি গুঁড়ো করে দিয়েছেন, টার্মিনাসের মেয়র সেই স্যালভর হার্ডিন তাদের চোখে একটা বিরাট কিছু।

    চেঁচিয়ে একটা অভিশাপ বর্ষণ করে সবচেয়ে কাছের সৈনিকটির দিকে ছুটে গেলেন উইনিস। লোকটার হাত থেকে উন্মত্তের মতো ছোঁ মেরে অ্যাটম ব্লাস্টটা কেড়ে নিলেন। তাক করলেন হার্ডিনের দিকে। স্থির হয়ে আছেন হার্ডিন। ঝটিতি লিভার ঠেলে দিয়ে ধরে রইলেন উইনিস।

    পাণ্ডুর বর্ণের একটা রশ্মি একটানা কিছুক্ষণ হার্ডিনকে ঘিরে থাকা ফোর্স-ফিল্ডের ওপর আছড়ে পড়ল। একটা লোমও পুড়ল না হার্ডিনের। ফোর্স-ফিল্ড সেই রশ্মি টেনে নিউট্রাল করে ফেলল। উইনিস আরো জোরে চেপে ধরলেন লিভারটা। হেসে উঠলেন পাগলের মতো। কান্নার মতো শোনাল হাসিটা।

    এখনো হাসছেন হার্ডিন। অ্যাটম ব্লাস্টের এনার্জি টেনে নেবার পরেও তাঁর ফোর্স-ফিল্ডের আভা আগের মতই অনুজ্জ্বল রয়ে গেছে। ঘরের সেই অন্ধকার কোনায় বসে লিপল্ড দু হাতে চোখ ঢেকে ফুঁপিয়ে উঠলেন। হঠাৎ একটা হতাশ আর্তচিৎকার করে উইনিস তাঁর অ্যাটম ব্লাস্টটা ঘুরিয়ে নিজের দিকে তাক করলেন। ফায়ার করতেই শূন্যে মিলিয়ে গেল তাঁর মাথা। মস্তকহীন দেহটা সশব্দে মেঝেতে পড়ে গেল।

    দৃশ্যটা দেখে মুখ বিকৃত করে ফেললেন হার্ডিন। বিড়বিড় করে আপন মনে বললেন, ডিরেক্ট অ্যাকশন নেবার পক্ষপাতী এক লোকের শেষ পরিণতি। শেষ অবলম্বন!

    .

    নয়

    ভরে গেছে টাইম ভল্ট। আসনগুলোতে ভরে গেছেই, ঘরের পেছনেও তিন-চার সারি লোক দাঁড়িয়ে আছে।

    আজ এত লোক এখানে, অথচ, হার্ডিনের মনে পড়ে গেল, তিরিশ বছর আগে হ্যারি সেলডনের প্রথম আবির্ভাবের সময় গুটিকতেক লোক ছিল এ-ঘরে। সর্বসাকুল্যে মাত্র ছজন- পাঁচজন সাবেক ইনসাইক্লোপীডিস্ট, তাঁরা সবাই আজ মৃত- আর তিনি নিজে, ঠুটো জগন্নাথ এক মেয়র। তার আরো মনে পড়ল, সেই বিশেষ দিনটিতেই ইয়োহান লী-র সাহায্যে তিনি তাঁর সেই কলংক দূর করেছিলেন, ঠুটো জগন্নাথ বিশেষণটা ঘুচিয়েছিলেন তিনি সেদিন তাঁর নাম থেকে।

    আজকের অবস্থা সেদিনের তুলনায় একেবারেই ভিন্ন। সবদিক থেকেই। সিটি কাউন্সিলের প্রত্যেক সদস্য উপস্থিত হয়েছেন আজ, সেলডন দেখা দেবেন সেই অপেক্ষায় বসে আছেন। হার্ডিন এখনো সেই মেয়রই আছেন, তবে তাঁর হাতে এখন সর্বময় ক্ষমতা। আর বিশেষ করে, অ্যানাক্রিয়ন চরমভাবে নাস্তানাবুদ হবার পর থেকে তাঁর জনপ্রিয়তাও তুঙ্গে।

    উইনিসের মৃত্যু এবং ভয়কম্পিত লিপন্ডের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির খবর নিয়ে টার্মিনাসে পা দেবার পর উল্লসিত হাজার হাজার জনতার উষ্ণ অভিনন্দন আর অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছেন তিনি। এরপর খুব দ্রুত কয়েকটি চুক্তি সম্পাদিত হলো বাকি তিনটি রাজ্যের সঙ্গে। চুক্তিগুলো ফাউণ্ডেশনকে এমন কিছু ক্ষমতা দিল যার ফলে অ্যানাক্ৰিয়নের মতো এ-ধরনের আক্রমণ-প্রচেষ্টার সম্ভাবনা চিরতরে দূর হয়ে গেল। টার্মিনাসের প্রত্যেক শহরে, রাস্তায় রাস্তায়, মশাল মিছিলের ধুম পড়ে গেল। স্বয়ং হ্যারি সেলডনের নামেও এমন আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি শোনা যায়নি। হার্ডিনের ঠোঁট দুটো বেঁকে গেল একটু। এমন জনপ্রিয়তা তিনি প্রথম ক্রাইসিসের পরেও পেয়েছিলেন।

    কামরার ওধারে সেফ সেরম্যাক এবং লুইস বোর্ট নিজেদের মধ্যে আলোচনায় মত্ত। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাদেরকে মোটেই হতোদ্যম করতে পারেনি। অবশ্যি আস্থা ভোটে তারা হার্ডিনের পক্ষেই রায় দিয়েছে, প্রকাশ্যে নিজেদের ভুল স্বীকার করেছে, আগের বৈঠকগুলোতে বিশেষ কিছু শব্দ ব্যবহারের জন্যে বিস্তর ক্ষমা প্রার্থনা করেছে। আর সেই সঙ্গে এই বলে নিজেদের সাফাইও গেয়েছে যে, তারা আসলে স্রেফ তাদের বিচার-বুদ্ধি এবং বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করেছে। এবং ঠিক তারপরই তারা একটি নতুন অ্যাকশনিস্ট কর্মসূচী ঘোষণা করেছে।

    ইয়োহান লী এসে হার্ডিনের আস্তিন ছুঁয়ে তাঁর ঘড়ির দিকে একটা গূঢ় ইঙ্গিত করলেন।

    মুখ তুলে তাকিয়ে হার্ডিন বলে উঠলেন, লী, এসেছ। কিন্তু মুখ হাঁড়ি করে আছ কেন এমন? কী হয়েছে বলো তো?

    আর পাঁচ মিনিটের মধ্যেই তো দেখা দেবার কথা তাঁর, তাই না?

    সেরকমই তো মনে হয়। গতবার ঠিক দুপুরেই এসেছিলেন তিনি।

    কিন্তু এবার যদি তিনি একেবারেই না আসেন তাহলে?

    ওফ! সারাটা জীবন এভাবে দুশ্চিন্তা করে জ্বালিয়ে মারলে তুমি আমাকে। না এলে আসবেন না!

    ভুরু কুঁচকে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন লী। ব্যাপারটা ভেস্তে গেলে, আই মীন, তিনি যদি না আসেন, তাহলে আমরা আরেকটা ঝামেলায় পড়ে যাব। আমরা যা করেছি তাতে যদি সেলডনের সম্মতি না থাকে, তাহলে সেরম্যাক চেঁচামেচি শুরু করে দেবে। সে চায় চার রাজ্য পুরোপুরি দখল করা হোক, ফাউণ্ডেশনকে বাড়ানো হোক এই মুহূর্তে। অলরেডি সে তার প্রচারণা শুরু করে দিয়েছে।

    তা জানি। কিন্তু চোর যেমন চুরি করতে না পারলে যে নিজের ঘরের জিনিস এদিক সেদিক সরিয়ে রাখে, লী, তোমারও তেমন দুঃশ্চিন্তা করা চাই-ই চাই, এমনকি দুঃশ্চিন্তা করার মতো কিছু বের করতে গিয়ে নিজের জান কোরবান করে হলেও।

    উত্তরে লী হয়ত কিছু বলতেন কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের আলো হলুদ, নিভু নিভু হয়ে যেতে তার শ্বাস বন্ধ হয়ে এল। ঘরের অর্ধেকটা জুড়ে থাকা কাঁচের কিউবিকলের দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে একটা সশব্দ শ্বাস ফেলে বসে পড়লেন তিনি চেয়ারে।

    কিউবিকলে একজন লোকের আবির্ভাব ঘটেছে। হুইলচেয়ারে বসা একজন লোক। হার্ডিন সোজা হয়ে বসলেন। কয়েক দশক আগে এই লোক যেদিন প্রথম আবির্ভূত হয় সেদিনের স্মৃতি মনে পড়ে গেল তার। বলাবাহুল্য, তার একারই সে কথা মনে পড়ল। তখন তিনি যুবক, লোকটি বৃদ্ধ। সেই থেকে লোকটির বয়স আর একদিনও বাড়েনি, কিন্তু তিনি নিজে আজ বৃদ্ধে পরিণত হয়েছেন।

    সরাসরি দর্শকদের দিকে তাকিয়ে আছে লোকটি। কোলের ওপর একটি বই নাড়াচাড়া করছে সে।

    আমি হ্যারি সেলডন, কোমল এবং বাধ্যক্যপীড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধ বলে উঠলেন।

    সারা ঘরে রুদ্ধশ্বাস নীরবতা নেমে এল। হ্যারি সেলডন বেশ একটা আলাপের সুরে বলে চললেন, এই নিয়ে দুবার এলাম আমি আপনাদের সামনে। অবশ্যি প্রথমবার আপনাদের কেউ এখানে উপস্থিত ছিলেন কিনা জানি না। সত্যি বলতে কী, এখানে আদৌ কেউ উপস্থিত আছেন কিনা তা-ও আমি জানি না। তবে তাতে কিছু আসে যায় না। দ্বিতীয় ক্রাইসিসটা যদি আপনারা ভালোয় ভালোয় কাটিয়ে উঠতে পেরে থাকেন, তাহলে এখানে থাকতে বাধ্য আপনারা। এর কোনো বিকল্প নেই। আপনারা যদি এখানে না থাকেন, তাহলে বুঝতে হবে, দ্বিতীয় ক্রাইসিসটা ঠেকাতে পারেননি আপনারা।

    মনোরম একটা হাসি উপহার দিলেন তিনি সবাইকে। এই দ্বিতীয় সম্ভাবনাটির ব্যাপারে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে, বলে চললেন তিনি, তার কারণ, আমার হিসেব অনুযায়ী, শতকরা ৯৮.৮ ভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যায়, প্রথম আশি বছরের মধ্যে প্ল্যানটিতে তেমন বড়সড় কোনো বিচ্যুতি ঘটবে না। আমার হিসেবে বলছে, আপনারা এমুহূর্তে ফাউণ্ডেশনের ঠিক পার্শ্ববর্তী বর্বর রাজ্যগুলোর ওপর আপনাদের আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়েছেন। প্রথম ক্রাইসিসের সময় যেভাবে শক্তির ভারসাম্য নীতির সাহায্যে ওদের আগ্রাসন ঠেকিয়ে রেখেছিলেন, এবারে, এই দ্বিতীয় ক্রাইসিস শেষে, আধ্যাত্মিক শক্তি-র সাহায্যে পার্থিব শক্তির মোকাবেলা করেছেন আপনারা।

    তবে আপনারা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়বেন না যেন। আগেভাগে কিছু জানিয়ে দেয়া যদিও আমার এই রেকর্ডিংগুলোর উদ্দেশ্য নয়, তবুও এটুকু অন্তত জানিয়ে দেয়া নিরাপদ বলে মনে করছি যে, আপনারা এ-মুহূর্তে স্রেফ একটা নতুন ভারসাম্য অর্জন করেছেন। তার বেশি কিছু নয়। অবশ্যি এতে করে আপনারা আগের চেয়ে একটু ভাল অবস্থায় পৌঁছেছেন, সেকথা ঠিক।

    আধ্যাত্মিক শক্তি পার্থিব শক্তির আক্রমণ প্রতিহত করতে পারলেও উল্টো আঘাত হানার ক্ষমতা আধ্যাত্মিক শক্তির নেই। বিচ্ছিন্নতাবাদ বা জাতীয়তাবাদের মতো বিরুদ্ধশক্তির বিরামহীন ক্রমবিকাশের কারণে আধ্যাত্মিক শক্তি টিকতে পারবে না। আশা করছি, কথাগুলো আপনাদের কাছে নতুন ঠেকছে না। তবে কথাগুলো একটু দুর্বোধ্য এবং ভাসাভাসা বলে মনে হতে পারে। সে জন্য আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর যেহেতু মনোইতিহাস বা সাইকোহিস্ট্রিতে ব্যবহৃত সিম্বলজি বোঝার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন কোনো লোক নেই আপনাদের মধ্যে, সেহেতু আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করছি সহজ করে বলতে।

    আসলে নতুন এম্পায়ার-এর দিকে সবেমাত্র পা বাড়াল ফাউণ্ডেশন। জনশক্তি আর প্রাকৃতিক সম্পদের দিক থেকে প্রতিবেশী রাজ্যগুলো আপনাদের তুলনায় ভয়াবহ রকমের শক্তিশালী এখন। তাদের এলাকার বাইরেই রয়েছে বর্বরতার এক জটিল অরণ্য। বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত সেই অরণ্যের পরে রয়েছে গ্যালাকটিক এম্পায়ার-এর অবশেষটুকু। সেটা যদিও ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়েছে, যদিও তার মধ্যে ভাঙন অব্যাহত রয়েছে, কিন্তু তার পরেও সেটা এখনো অতুলনীয় রকমের শক্তিশালী।

    কোলের ওপর রাখা বইটা হাতে নিলেন হ্যারি সেলডন। পাতা মেললেন। তাঁর মুখটা গম্ভীর হয়ে এল। একটা কথা কখনো ভুলে যাবেন না। আশি বছর আগে, স্টারস এণ্ড-এ গ্যালাক্সির একেবারে অন্য প্রান্তে- দ্বিতীয় একটি ফাউণ্ডেশন স্থাপিত হয়েছিল। সেটার কথা সবসময় মাথায় রাখতে হবে আপনাদেরকে। জেন্টেলমেন, আপনাদের সামনে এখনো নশো বিশ বছরের প্ল্যান পড়ে আছে। সমস্যাটা আপনাদের! সুতরাং ঝাঁপিয়ে পড়ন!

    বই-এর পাতায় চোখ নামালেন তিনি। তারপরেই নেই হয়ে গেলেন। বাতিগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠল আগের মতো।

    কোলাহলে ভরে উঠল ঘরটা। হার্ডিনের কানের কাছে মুখ নিয়ে লী বললেন, আবার কখন আসবেন সেটা কিন্তু বলে গেলেন না সেলডন।

    হার্ডিন হালকা গলায় বললেন, তা বলেননি, তবে এটুকু জানি, তিনি আবার আসার অনেক আগেই তুমি আর আমি মরে ভূত হয়ে যাব।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleফাউণ্ডেশন অ্যাণ্ড এম্পায়ার – আইজাক আসিমভ
    Next Article অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি – আকবর আলি খান

    Related Articles

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    ভয় সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    প্রকাশ্য দিবালোকে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 18, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    তারপর কী হল – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 17, 2025
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    শর্ম্মিষ্ঠা নাটক – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    November 11, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }