Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    ফাউণ্ডেশন – আইজাক আসিমভ

    লেখক এক পাতা গল্প323 Mins Read0
    ⤶

    ৫. বণিক রাজপুত্রদের কথা

    পঞ্চম পর্ব – বণিক রাজপুত্রদের কথা

    এক

    বণিকদল-… সাইকোহিস্টোরিক অনিবার্যতায় ফাউণ্ডেশনের অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকল। সম্পদশালী হয়ে উঠল বণিকরা। এবং সম্পদের হাত ধরে এল ক্ষমতা।…

    হোবার ম্যালো যে একজন সাধারণ বণিক হিসাবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেছিলেন সেকথা লোকে প্রায়ই ভুলে যায়। কিন্তু যে কথা তারা কখনোই ভোলে সেটি হচ্ছে, মারা যাবার সময় তিনিই ছিলেন প্রথম বণিক রাজপুত্র।…

    –ইনসাইক্লোপীডিয়া গ্যালাকটিকা

    .

    জোরেন সাট তাঁর সযত্নচর্চিত নখের ডগাগুলো এক করে বলে উঠলেন, ব্যাপারটা বেশ রহস্যজনক। সত্যি বলতে কী- কথাটা কিন্তু গোপনে বলছি- এটা হয়ত আরেকটা সেলডন ক্রাইসিস।

    উল্টোদিকে বসা লোকটি তার খাটো স্মিরনীয় জ্যাকেটের পকেট চাপড়ালেন সিগারেটের জন্যে। সেকথা ঠিক বলতে পারব না, সাট। বরাবরই তো দেখে আসছি মেয়র নির্বাচনের সময় এলেই রাজনীতিবিদরা সব সেলডন ক্রাইসিস বলে চেঁচাতে শুরু করে।

    ক্ষীণ একটা হাসির রেখা দেখা দিল সাটের ঠোঁটে। আমি এখানে ভোটের জন্যে আসিনি, ম্যালো। পারমাণবিক অস্ত্র আমাদের নাকের ডগা দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অথচ সেগুলো কোত্থেকে আসছে আমরা জানিই না।

    স্মিরনিয়ার মাস্টার ট্রেডার হোবার ম্যালো শান্তভাবে, অনেকটা নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে সিগারেটে টান দিলেন। বলে যান। আরো কিছু বলার থাকলে, ঝেড়ে কাশুন।

    ফাউণ্ডেশনের লোকজনের সামনে বিনয়ে বিগলিত হবার মতো ভুলটি কখনন করেন না ম্যালো। তিনি একজন আউটল্যাণ্ডার হতে পারেন, তাই বলে ফেলনা নন।

    টেবিলের ওপর একটা ট্রাইমেনশনাল স্টার-ম্যাপ রয়েছে। সেটার দিকে ম্যালোর দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন সাট। কন্ট্রোলগুলো অ্যাডজাস্ট করতেই আধ ডজন স্টেলার সিস্টেমে লাল আলো জ্বলে উঠল। শান্ত কণ্ঠে সাট বললেন, এটা হচ্ছে কোরেলিয়ান রিপাবলিক।

    মাথা ঝাঁকালেন ট্রেডার। গিয়েছি ওখানে। দুর্গন্ধ ভরা ইঁদুরের গর্ত একটা! ওটাকে আপনি রিপাবলিক বলতে পারেন, কিন্তু প্রতিবারই দেখা যায়, এমন এক লোক কমোডর নির্বাচিত হয়েছে যে কি না আর্গো পরিবারের কেউ নয়। আর ব্যাপারটা যদি কারো পছন্দ না হয়, তাহলে কপালে খারাবি আছে তার। ঠোঁট বাঁকিয়ে কথার পুনরাবৃত্তি করলেন তিনি, গিয়েছি ওখানে।

    কিন্তু তুমি ফিরে এসেছ, আর এ-ব্যাপারটা বার বার ঘটে না। গত বছর রিপাবলিকের এলাকার ভেতর থেকে তিনটে ট্রেডশিপ হাওয়া হয়ে গেছে। তিনটি শিপই কনভেনশনের আওতায় অনাক্রমণ চুক্তিবদ্ধ। তিনটে শিপই সব ধরনের সাধারণ নিউক্লিয়ার এক্সপ্লোসিভ আর ফোর্স-ফিল্ড ডিফেন্সে সজ্জিত ছিল।

    শেষবারের মতো কী খবর পাঠিয়েছিল ওগুলো?

    রুটিন রিপোর্ট, তার বেশি কিছু নয়।

    তা, কোরেল কী বলে এ-ব্যাপারে?

    বিদ্রুপের ঝিলিক খেলে গেল সাটের দুচোখে, কোনো কিছু জিগ্যেস করার জো ছিল না ওদেরকে। গোটা পেরিফেরি জুড়ে ফাউণ্ডেশনের ক্ষমতার যে খ্যাতি ছড়িয়ে আছে সেটাই এর সবচেয়ে বড় সম্পদ। তোমাদের কি মনে হয় মাত্র তিনটে শিপ খুইয়ে সে-সম্পর্কে খোঁজ-খবর করা সাজে আমাদের?

    বেশ তো, সেক্ষেত্রে আপনি আমার কাছে ঠিক কী চান সেটা আমাকে বলে ফেললে হতো না?

    বিরক্তি প্রদর্শন করে বাজে সময় খরচ করলেন না জোরেন সাট। কিছু লোক আছে যারা মনে করে, হ্যারি সেলডন নির্দেশিত ভবিষ্যৎ ইতিহাসের গতিপথের সন্ধান পেয়ে গেছে তারা। এদের মধ্যে আছে বিরোধীদলীয় কাউন্সিল সদস্য, চাকুরি প্রার্থী, সমাজ সংস্কারক আর বাতিকগ্রস্ত লোকজন। মেয়রের সেক্রেটারি হিসেবে তিনি ভাল করেই জানেন, এ-ধরনের লোকজনকে কী করে এড়িয়ে চলতে হয় বা দূরে সরিয়ে রাখতে হয়। সুতরাং তার বিরক্তি উৎপাদন করা খুব কঠিন কাজ।

    তিনি তাই শান্তভাবে বললেন, এক মিনিট। একই সেক্টরে আর একই বছরে তিন তিনটে শিপ খোয়া যাবার ব্যাপারটা কিছুতেই দুর্ঘটনা হতে পারে না। আর পারমাণবিক শক্তিকে কেবল পারমাণবিক শক্তি দিয়েই জয় করা সম্ভব। সুতরাং স্বভাবতই এই প্রশ্নটা মনে উঁকি দেয়, কোরেলের কাছে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকে তাহলে সে-অস্ত্র তারা পাচ্ছে কোত্থেকে?

    কোত্থেকে?

    সম্ভাব্য দুটি উপায়ে। হয় কোরোলিয়ানরা নিজেরাই সেগুলো তৈরি করছে—

    কষ্টকল্পনা।

    নিঃসন্দেহে। আর দ্বিতীয় সম্ভাবনাটা হচ্ছে, আমাদের মধ্যে বিশ্বাসঘাতক আছে। এক বা একাধিক।

    আপনার তাই মনে হয়? ম্যালোর কণ্ঠ উত্তাপহীন, শীতল।

    শান্ত কণ্ঠে সাট বললেন, এটা এমন কিছু অলৌকিক ব্যাপার নয়। চার রাজ্য ফাউণ্ডেশন কনভেনশন মেনে নেবার পর থেকে প্রতিটি ভিন্নমতাবলম্বী বেশ কয়েকটা দলের মুখোমুখি হতে হয়েছে আমাদের। ফাউণ্ডেশনের প্রতি তাদের একটা দরদ আছে- এই ভানটুকুও নিখুঁতভাবে করতে পারে না এমন ধোকাবাজ আর প্রাক্তন অভিজাত শ্রেণীভুক্ত লোকের অভাব নেই আগেকার ঐ রাজ্যগুলোয়। হয়ত তাদেরই কেউ কেউ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।

    ম্যালোর মুখটা একটু লাল হয়ে উঠল। বটে! তা, আপনি কি আমাকে কিছু বলতে চান? আমি স্মিরনোর লোক।

    আমি জানি তুমি কোথাকার লোক- প্রাক্তন চার রাজ্যের অন্যতম রাজ্য স্মিরনোতে জন্ম তোমার। স্রেফ শিক্ষার বদৌলতে ফাউণ্ডেশনের লোক হয়েছ তুমি। জন্মগতভাবে তুমি একজন আউটল্যাণ্ডার আর ভিনদেশী। অ্যানাক্রিয়ন আর লরিস এর মধ্যে যুদ্ধের সময় তোমার দাদা যে একজন ব্যারন ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আর একথাও নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সেফ সেরম্যাক যখন ভূমি পুনর্বণ্টন করেন তখন তোমাদের ভূ-সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়েছিল।

    না! ব্ল্যাক স্পেসের দিব্যি, না। নেহাতই সামান্য একজন মহাকাশচারীর সন্তান ছিলেন আমার দাদা। ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠার আগেই অনাহারে ধুকে ধুকে মারা যান তিনি। সাবেক আমলের শাসকদের কাছে আমার কোনো ঋণ নেই। তবে স্মিরনোতেই জন্ম আমার, আর গ্যালাক্সির দিব্যি, স্মিরনো বা স্মিরনোবাসীদের ব্যাপারে আমি মোটেই লজ্জিত নই। বিশ্বাসঘাতকতার যে নোংরা ইঙ্গিত আপনি করলেন, সেজন্যে ভয় পেয়ে ফাউণ্ডেশনের থুতু চাটতে যাব না আমি। এবার আপনি আমাকে হুকুম দিতে পারেন অথবা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগও করতে পারেন, আমার কিছুই আসে যায় না।

    দেখ বাপু, মাস্টার ট্রেডার, তোমার দাদা স্মিরনোর রাজা ছিলেন, না পথের ফকির ছিলেন, তাতে ইলেকট্রন পরিমাণও আসে যায় না আমার। তোমার জন্ম আর পূর্বপুরুষ সংক্রান্ত লম্বা কাসুন্দি ঘেটেছি স্রেফ এই কথা বুঝিয়ে দিতে যে, ও ব্যাপারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। বোঝাই যাচ্ছে, তুমি আমার মূল বক্তব্যটাই ধরতে পারনি। আবারো পেছনে ফেরা যাক তাহলে। তুমি একজন স্মিরনিয়ান। আউটল্যাণ্ডাররা তোমার পরিচিত। তাছাড়া তুমি একজন ট্রেডার, বলা উচিত সেরা ট্রেডারদের একজন। তুমি কোরেল গিয়েছ, কোবরালিয়ানদেরও চেনো। আর ওখানেই যেতে হবে তোমাকে।

    লম্বা করে শ্বাস নিলেন ম্যালো৷ স্পাই হিসাবে?

    মোটেই না। ট্রেডার হিসেবে- তবে চোখ-কান খোলা রেখে। তোমাকে বের করতে হবে, ওদের শক্তির উৎসটা কোথায়- আর তুমি যেহেতু স্মিরনিয়ান তাই স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, হারিয়ে যাওয়া তিনটে ট্রেড শিপের দুটোতেই কিন্তু স্মিরনিয়ান ক্রু ছিল।

    কখন রওনা হব?

    শিপ রেডি করতে ক দিন লাগবে তোমার?

    দিন ছয়েক।

    তাহলে ঐ ছ দিন পরেই রওনা হচ্ছ তুমি। অ্যাডমিরালটিতে প্রয়োজনীয় সমস্ত কাগজপত্র পাবে তোমার।

    ঠিক আছে, উঠে দাঁড়ালেন ম্যালো। দায়সারাভাবে করমর্দন করে বেরিয়ে গেলেন।

    আয়েশ করে হাতের আঙুলগুলো ছড়িয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলেন সাট। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঢুকে পড়লেন মেয়রের কামরায়। ভিসিপ্লেটটা বন্ধ করে দিয়ে চেয়ারের পিঠে হেলান দিলেন মেয়র। কী বুঝলে, সাট?

    লোকটা ভাল অভিনেতাও হতে পারে, জবাব দিলেন সাট চিন্তিতভাবে, তাকিয়ে রইলেন সামনের দিকে।

    .

    দুই

    সেদিনই সন্ধ্যেবেলা। হার্ডিন বিল্ডিং-এর একুশ তলায় জোরেন সাটের ব্যাচেলর অ্যাপার্টমেন্ট। মদের গ্লাসে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছেন পাবলিস ম্যানলিয়ো।

    কৃশকায়, প্রৌঢ় পাবলিস ম্যানলিয়ো ফাউণ্ডেশনের দুটো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের কর্তাব্যক্তি। একদিকে তিনি মেয়রের কেবিনেটের পররাষ্ট্র সচিব, অন্যদিকে একাধারে, ফাউণ্ডেশন ছাড়া অন্যসব আউটার সান-এর প্রাইমেট অভ দ্য চার্চ, পার্ভেয়র অভ দ্য হোলি ফুড, মাস্টার অভ দ্য টেম্পলস, ইত্যাদি কিছু গালভরা পদের অধিকারী।

    মদ্যপানে বিরতি দিয়ে তিনি বললেন, কিন্তু তিনি তো তোমাকে সেই ট্রেডারকে বাইরে পাঠিয়ে দেবার ব্যাপারে সম্মতি দিয়েছেন। এটা কিন্তু একটা উল্লেখযোগ্য ব্যাপার।

    তেমন উল্লেখযোগ্য কিছু নয়। অন্তত এক্ষুনি এতে কোনো লাভ হচ্ছে না আমাদের। কৌশল হিসেবে খুব কাঁচা এটা। তার কারণ, শেষ পর্যন্ত কী হবে সেটা আগে থেকেই বোঝা যাচ্ছে না। শেষ প্রান্তে একটা ফাঁস থাকলেও থাকতে পারে এই মনে করে দড়ি টেনে যাওয়া মতো ব্যাপার এটা।

    তা ঠিক। আর তাছাড়া ম্যালো করিৎকর্মা লোক। তাকে যদি বোকা বানানো না যায়?

    ঝুঁকিটা নিতেই হবে। বিশ্বাসঘাতকতামূলক কোনো কিছু যদি এর মধ্যে থেকে থাকে, দেখা যাবে, করিৎকর্মা আর ধুরন্ধর লোকেরাই তার সঙ্গে জড়িত। আর তা যদি না হয় তাহলে আসল ব্যাপারটা খুঁজে বের করার জন্যে একজন যোগ্য লোকেরই দরকার আমাদের। তাছাড়া ম্যালোকে চোখে রাখার ব্যবস্থা করা হবে। তোমার গ্লাস কিন্তু খালি।

    নো, থ্যাংকস, যথেষ্ট হয়েছে।

    সাট তার নিজের গ্লাস ভরে নিলেন। ম্যানলিয়োর চোখে-মুখে অস্বস্তি, কী যেন ভাবছেন তিনি। সাট ধৈর্য ধরে অপেক্ষা কররেন।

    ভদ্রলোকের মাথায় যে-চিন্তাই ঘুরপাক খাক না কেন, তিনি যে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন সেটা বোঝা গেল। হঠাৎ তিনি প্রশ্ন করলেন, সার্ট, তুমি কী ভাবছ বলে তো?

    বলছি, ম্যানলিয়ো। পাতলা ঠোঁট জোড়া ফাঁক হলো তাঁর। একটা সেলডন ক্রাইসিসের মধ্যে রয়েছি আমরা।

    ম্যানলিয়োর দৃষ্টি সামান্য প্রসারিত হলো। শান্ত গলায় আবার প্রশ্ন করলেন তিনি, কী করে বুঝলে? সেলডন কি টাইম ভল্টে দেখা দিয়েছেন আবার?

    সেলডনের আসার দরকার নেই, ভায়া, যুক্তি দিয়েই বোঝা যায় সেটা। গ্যালাকটিক এম্পায়ার পেরিফেরি পরিত্যাগ করে আমাদের একা ফেলে রেখে যাবার পর থেকে পারমাণবিক ক্ষমতাধারী কোনো প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হইনি আমরা। এবারই হলাম প্রথমবারে মতো। বিচ্ছিন্নভাবে এটার গুরুত্বই অনেক, কিন্তু তার ওপর আবার আরেকটা ব্যাপার যোগ হয়েছে- সত্তর বছরের মধ্যে এই প্রথম বড়সড় একটা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছি আমরা। আমার তো ধারণা, বাইরের আর ভেতরের এই দুই সমস্যা বিশ্লেষণ করলেই একথা পানির মতো পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, এটা সেলডন ক্রাইসিস ছাড়া আর কিছু নয়।

    ম্যানলিয়োর চোখ জোড়া কুঁচকে গেল। শুধু যদি এই দুটো ব্যাপার হয় তাহলে বলব সেলডন ক্রাইসিসের জন্যে এগুলো যথেষ্ট নয়। এর আগে দুটো ক্রাইসিস এসেছিল আর দুবারই হুমকির সম্মুখীন হয়েছিল ফাউণ্ডেশনের অস্তিত্ব। ঐ একই বিপদ না এলে সেটাকে থার্ড ক্রাইসিস বলা যাবে না।

    সাট কখনো অস্থিরতা প্রকাশ করেন না। সে-বিপদও আসছে। ক্রাইসিস এলে সেটা একটা নির্বোধও দেখতে পায়। প্রাথমিক অবস্থাতে সেটা শনাক্ত করতে পারলে স্টেটের মহা উপকার করা হবে। দেখ, ম্যানলিয়ো, আমরা একটা পরিকল্পিত ইতিহাসের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছি। আমরা জানি, হ্যারি সেলডন ঐতিহাসিক সম্ভাব্যতা নির্ণয় করেছিলেন। আমরা জানি, কোনো এক সময় আমাদেরকে গ্যালাকটিক এম্পায়ার পুনর্নির্মাণ করতে হবে। আমরা জানি, কমবেশি এক হাজার বছর লাগবে কাজটা করতে। আমরা এ-ও জানি, মাঝখানের এই সময়টাতে আমরা নির্দিষ্ট কিছু ক্রাইসিসের মুখোমুখি হব।

    এখন, প্রথম ক্রাইসিসটা এসেছিল ফাউণ্ডেশন প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছর পর। দ্বিতীয়টা প্রথমটার তিরিশ বছর পর। তারপর পঁচাত্তর বছর কেটে গেছে। ইটস টাইম, ম্যানলিয়ো, ইটস টাইম।

    দ্বিধাগ্রস্ত ভঙ্গিতে আঙুল দিয়ে নাক ঘষলেন ম্যানলিয়ো। আর তুমি এই ক্রাইসিস থেকে উদ্ধার পাবার পরিকল্পনা করে ফেলেছ, এই তো?

    সাট মাথা ঝাঁকালেন।

    আর, ম্যানলিয়ো বলে চললেন, আমাকে তাতে অংশ নিতে হবে, ঠিক?

    আবারো মাথা ঝাঁকালেন সাট। অ্যাটমিক পাওয়ার সংক্রান্ত বৈদেশিক হুমকির মোকাবিলা করার আগে তোমার কাজ হবে আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা মেটান। এই ট্রেডাররা-

    হুঁ! অস্ফুট শব্দ করে উঠলেন ম্যানিলো। শরীরটা শক্ত হয়ে গেল তার। চোখ জোড়া হয়ে উঠল তীক্ষ্ণ।

    এই ট্রেডাররা কাজের ঠিকই, তবে খুব শক্তিশালী, সাট বলে চললেন, আর খুব অবাধ্যও। সব আউটল্যাণ্ডার্স। শিক্ষিত, তবে ধর্মীয় দিকটা বাদে। আর আমরা ওদেরকে এই শিক্ষা-দীক্ষা দেবার ফলে ওদের ওপর আমাদের কর্তৃত্বটাও আস্তে আস্তে কমে যাচ্ছে।

    যদি আমরা বিশ্বাসাতকতা প্রমাণ করতে পারি? ম্যানলিয়ো জিগ্যেস করলেন।

    সেক্ষেত্রে ডিরেক্ট অ্যাকশনই হবে সবচেয়ে সহজ আর কার্যকর ব্যবস্থা। কিন্তু সেটা বড় কথা নয়। ওদের কেউ বিশ্বাসঘাতক বলে প্রমাণিত না হলেও কিন্তু আমাদের সমাজে একটা অনিশ্চিত পরিস্থিতির সৃষ্টি করবে ওরা। দেশপ্রেম বলো আর সম-উত্তরাধিকার বলো বা ধর্মীয় ভীতিই বলো, কোনো বন্ধনেই আমাদের সঙ্গে বাঁধা থাকবে না ওরা। হার্ডিনের সময় থেকে যেসব আউটার প্রভিন্স আমাদেরকে হোলি-প্ল্যানেট বলে গণ্য করে আসছে, ওদের ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্বের আওতায় থেকে সেগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি আমূল পাল্টে যাবে।

    সবই বুঝলাম, কিন্তু সমাধান-

    সমাধান হতে হবে খুব শিগগিরই, সেলডন ক্রাইসিসটা জটিল হয়ে ওঠার আগেই। ঘরে অসন্তোষ আর বাইরে পারমাণবিক অস্ত্র- এই যদি হয় অবস্থা সেক্ষেত্রে পরিণতি ভয়ংকর হতে পারে। হাতের খালি গ্লাসটা নামিয়ে রাখলেন সাট। ঘর সামলানোর কাজটা পুরোপুরি তোমার।

    আমার?

    আই কান্ট ডু ইট। আমার দপ্তরটা যাকে বলে অ্যাপয়েন্টিভ, আইন প্রণয়ন সংক্রান্ত কোনো অধিকার নেই সেটার।

    মেয়র-

    অসম্ভব। তার ব্যক্তিত্ব পুরোপুরি নেতিবাচক। দায়িত্ব এড়াবার বেলাতেই যত উৎসাহ তার। অবশ্য যদি স্বাধীন কোনো পার্টির আবির্ভাব ঘটে হঠাৎ করে, যারা পুনর্নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে পারে, সেক্ষেত্রে তাকে দিয়ে কাজ করানো সম্ভব হতে পারে।

    কিন্তু সাট, সক্রিয় রাজনীতি করবার মতো স্বাভাবিক প্রবণতাই নেই আমার মধ্যে।

    সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। কে জানে, ম্যানলিয়ো? স্যালভর হার্ডিনের পর সর্বোচ্চ যাজকের পদ আর মেয়রশিপ কখনো একজনের ওপর বর্তায়নি। এবার সেই দুর্লভ ঘটনাটা ঘটতেও পারে- যদি তুমি তোমার কাজটা ঠিকমত করতে পার।

    .

    তিন

    শহরের অন্যপ্রান্তে, আরো ঘরোয়া পরিবেশে, ম্যালো তখন দ্বিতীয় এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলছেন। অনেকক্ষণ ধরে শুনে যাচ্ছিলেন তিনি, এবার সতর্কতার সঙ্গে মুখ খুললেন। হ্যাঁ, আমি শুনেছি নির্বাচনী প্রচারাভিযানের সময় তুমি কাউন্সিলে সরাসরি ট্রেডার প্রতিনিধিত্বের দাবি তুলেছ। বাট হোয়াই মি, টুয়ার? আমাকে টানছ কেন?

    ফাউণ্ডেশনে আউটল্যাণ্ডারদের যে দলটি প্রথম লে এজুকেশন অর্থাৎ সাধারণ লোকদের শিক্ষা গ্রহণ করে, জেইম টুয়ার সেই দলে ছিলেন। এবং তাকে জিগ্যেস করা হোক আর না হোক, তথ্যটি তিনি প্রথম সাক্ষাতেই লোকজনকে জানিয়ে দিতে ভোলেন না। স্মিত হাসিতে তার মুখটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠল ম্যালোর প্রশ্ন শুনে।

    আমি জানি আমি কী করছি, বললেন তিনি। তোমার সঙ্গে আমার প্রথম কোথায় দেখা হয়েছিল গত বছর মনে আছে?

    ট্রেডার্স কনভেনশনে।

    ঠিক। মিটিংটা তুমিই পরিচালনা করেছিলে। লাল গর্দানওয়ালা ষাঁড়গুলোকে তুমি প্রথমে ওদের যার যার সিটে গেড়ে বসিয়ে রাখলে, তারপর ঢোকালে তোমার শার্টের পকেটে আর শেষে ঐ পকেটস্থ অবস্থাতেই সবাইকে নিয়ে বেরিয়ে এলে। আর ফাউণ্ডেশনের লোকগুলোকেও তুমি ভালোই সামলাতে পার। তোমার একটা গ্ল্যামার আছে, বা অন্তত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে খ্যাতি আছে, যেটা ঐ একই জিনিস।

    বেশ, শুকনো কণ্ঠে বললেন ম্যালো। কিন্তু এখন কেন?

    কারণ, এখনই আমাদের সুযোগ। তুমি কি জান, শিক্ষাসচিব তার পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন? এখনো সবাই জানে না ব্যাপারটা, তবে জেনে যাবে।

    তুমি কী করে জানলে?

    সেটা- যাকগে, বিরক্তিসূচক ভঙ্গিতে একটা হাত নাড়লেন টুয়ার। কিন্তু ঘটনাটা সত্যি। অ্যাকশনিস্ট পার্টিতে বিরাট ফাটল দেখা দিয়েছে। ট্রেডারদের জন্যে সম-অধিকারের প্রশ্নে অথবা গণতন্ত্রের পক্ষ-বিপক্ষের প্রশ্নে এই মুহূর্তে দলটাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া যায়।

    চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে বসলেন ম্যালো। তাকিয়ে রইলেন তাঁর তাতের পুরু আঙুলগুলোর দিকে। কিন্তু আমি দুঃখিত, টুয়ার। সামনের সপ্তাহে একটা কাজে বাইরে যেতে হচ্ছে আমাকে। অন্য কাউকে খুঁজে বের করতে হবে তোমাকে।

    টুয়ার বড় বড় চোখ করে তাকালেন।

    কাজে? কী কাজে?

    কাজটা যাকে বলে ভেরি সুপার সিক্রেট। ট্রিপল-এ প্রায়োরিটি। মেয়রের সেক্রেটারির সঙ্গে কথা হয়েছে আমার।

    ঐ সাপের মতো খল সাটের সঙ্গে? উত্তেজিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন টুয়ার। ধোকাবাজি! ঐ ঘোড়েল লোকটা তোমাকে কাজের সময় সরিয়ে দিতে চাইছে ম্যালো-

    থামো! ম্যালোর হাত টুয়ারের মুষ্টিবদ্ধ হাতের ওপর এসে পড়ল। উত্তেজিত হয়ো না। ব্যাপারটা যদি চালাকি হয়ে থাকে, কয়েকদিন পরেই ফিরে আসব আমি ঘটনাটা পরখ করার জন্যে। যদি তা না হয়, সাপের মতো খল তোমার ঐ সাট আমার হাতের পুতুলে পরিণত হবে। শোন, একটা সেলডন ক্রাইসিস এগিয়ে আসছে।

    কথাটার প্রতিক্রিয়া কী হয় দেখার জন্যে একটু অপেক্ষা করলেন ম্যালো। কিন্তু তাঁকে হতাশ হতে হল। বরং চোখ ঈষৎ বিস্ফারিত করে টুয়ার জিগ্যেস করলেন, সেলডন ক্রাইসিস-টা আবার কী?

    গ্যালাক্সি! বিস্ময়ে ফেটে পড়লেন ম্যালো। স্কুলে বসে বসে করেছটা কী? এমন হাঁদার মতো প্রশ্ন করল কী করে তুমি?

    বয়স্ক লোকটি ভুরু কুঁচকালেন। একটু যদি বুঝিয়ে বলতে—

    কিছুক্ষণ এক দৃষ্টিতে তার দিকে নিঃশব্দে তাকিয়ে থেকে ম্যালো বললেন, বলছি। ভুরু জোড়া ঝুলে পড়ল তার। ধীর কণ্ঠে শুরু করলেন তিনি। গ্যালাক্সির সীমান্ত অঞ্চলে গ্যালাকটিক এম্পায়ার তখন অস্তগামী; সেই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে, হ্যারি সেলডন আর তার মনোবিজ্ঞানীর দল ফাউণ্ডেশন নামে একটা উপনিবেশ স্থাপন করলেন, যাতে করে আমরা শিল্পকলা, বিজ্ঞান আর প্রযুক্তি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা ও কাজ করতে পারি, আর সেকেন্ড এম্পায়ার-এর কেন্দ্রবিন্দুটি তৈরি করতে পারি।

    ও, হ্যাঁ হ্যাঁ–

    শেষ করিনি এখনো, শীতল কণ্ঠে বললেন ম্যালো। ফাউণ্ডেশনের ভবিষ্যতের গতি নির্ধারণ করা হয়েছিল সায়েন্স অভ সাইকোহিস্ট্রি বা মনোঐতিহাসিক বিজ্ঞান অনুযায়ী। সাইকোহিস্ট্রি তখন অনেক ডেভলপড়। আর পরিস্থিতি এমনভাবে সৃষ্টি করা হলো যাতে ফাউণ্ডেশন ধারাবাহিক কিছু সংকটের মুখোমুখি হয়, যে সংকটগুলো দ্রুততম গতিতে ভবিষ্যৎ এম্পায়ারের দিকে এগিয়ে যাবে। প্রতিটি ক্রাইসিস, প্রতিটি সেলডন ক্রাইসিস, আমাদের ইতিহাসে নতুন একেকটি যুগের সূচনা করেছে। এ-মুহূর্তে আমরা তৃতীয় ক্রাইসিসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।

    ঠিক, ঠিক, শ্রাগ করলেন টুয়ার। মনে পড়া উচিত ছিল আমার। তবে আমি অনেক দিনের জন্য স্কুলের বাইরে ছিলাম। তুমিও এতদিন বাইরে থাকনি।

    তাই হবে সম্ভবত। যাকগে, ভুলে যাও। আসল কথা হল, এই ক্রাইসিসটা যখন একটা পরিণতির দিকে এগোচ্ছে, তখনই সাট আমাকে বাইরে পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমি ফিরে এসে কী দেখব তা আগে থেকে বলা যাচ্ছে না। ওদিকে আবার কাউন্সিল ইলেকশন হবার কথা প্রতি বছরই।

    টুয়ার মুখ তুলে তাকালেন। তুমি কি কাউকে অনুসরণ করতে যাচ্ছ?

    না।

    নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা আছে তোমার?

    একেবারেই না।

    তো?

    তো, কিছু না। হার্ডিন একবার বলেছিলে: সাফল্যের জন্যে কেবল পরিকল্পনাই যথেষ্ট নয়। ওয়ান মাস্ট ইম্প্রোভাইজ অ্যাজ ওয়েল। অর্থাৎ, পরিকল্পনার সঙ্গে তাকে উপস্থিত বুদ্ধি খাঁটিয়ে আগে ধারণা করা যায়নি এমন সমস্যারও সমাধান করতে হবে। আই উইল ইম্প্রােভাইজ।

    অনিশ্চিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন টুয়ার। উঠে দাঁড়ালেন দুজনে। পরস্পরের দিকে চেয়ে আছেন দুজন।

    গাছাড়াভাবে, হঠাৎ করে বলে উঠলেন ম্যালো, ভাল কথা, যাবে নাকি আমার সঙ্গে? হাঁ করে চেয়ে থাকার কী আছে, বাপু! আগে তো তুমি ট্রেডারই ছিলে, সেটা হঠাৎ পানসে ঠেকাতে উত্তেজনার খোঁজেই না পলিটিক্সে নামলে! অন্তত আমি সেরকমই শুনেছি।

    আগে বলো তুমি কোনদিকে যাচ্ছো?

    হোয়েসালিয়ান র‍্যাফট-এর দিকে। স্পেসে গা ভাসাবার আগে এর চেয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছি না। এবার বলো, যাবে?

    কিন্তু ধর, সাট যদি চায় আমি এখানে থাকি, যাতে সে আমাকে চোখে চোখে। রাখতে পারে?

    সম্ভাবনা কম। সে যদি আমাকে দূরে সরিয়ে দিতে চায় সেক্ষেত্রে তোমাকেও নয় কেন? তাছাড়া পছন্দমত ক্রু বাছাই করতে না দিলে কোনো ট্রেডারই স্পেসে ওড়ে না। আমার যাকে খুশি তাকে নেব।

    টুয়ারের চোখে অদ্ভুত এক আলোর ঝিলিক খেলে গেল। ঠিক আছে, যাব আমি। হাত বাড়িয়ে দিলেন তিনি। তিন বছরের মধ্যে এটাই হবে আমার প্রথম ট্রিপ।

    ম্যালো টুয়ারের হাত ঝাঁকিয়ে দিলেন। বেশ। আমাকে এখন বাকি ক্রুদের খোঁজে যেতে হবে। ফার স্টার ডকটা কোথায় তা তো জানোই। কাল ওখানে দেখা কোরো। গুড বাই।

    .

    চার

    ইতিহাসের এক পুনরাবৃত্তি বলা যেতে পারে কোরেলকে। কাগজে কলমে প্রজাতন্ত্র, কিন্তু আসলে এর শাসক সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একজন সম্রাট ছাড়া কিছু নন, নামেই যা তফাৎ একটু। সুতরাং স্বৈরতন্ত্রের বাতাস অবাধে বয়ে যায় এখানে। দরবারি শিষ্টাচার এবং রাজকীয়, সৌজন্য- নিয়মতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের এই দুই উদার প্রভাবে সে-বাতাসে আরো উদ্দাম এবং বন্ধুহীন।

    সত্যি বলতে, কোরেল-এর সমৃদ্ধির অবস্থা তেমন ভাল নয়। গ্যালাকটিক এম্পায়ারের দিন বিদায় নিয়েছে। কিছু নীরব স্মারকস্তম্ভ আর ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠামো ছাড়া সেসব দিনের আর কোনো সাক্ষী নেই। ফাউণ্ডেশনের আগমন এখনো ঘোষিত হয়নি এখানে। কোনোদিন হবে বলেও মনে হয় না। কারণ, কোরেলের শাসক কমোডর অ্যাসপার আর্গো ভীষণ একয়ে লোক। ট্রেডারদের ব্যাপারে তার নিয়ম কানুন বড় কড়া। আরো কড়া নিষেধাজ্ঞা মিশনারিদের ব্যাপারে।

    নিতান্তই জরাজীর্ণ এবং ভাঙাচোরা চেহারা স্পেস-পোর্টটার। ফার স্টারের ক্রুদের সেকথা ভাল করেই জানা। হ্যাঁঙ্গারগুলোর অবস্থাও তথৈবচ। পেশেন্স ধরনের একটা খেলা খেলতে খেলতে মেজাজটা খিঁচড়ে যাচ্ছিল জেইম টুয়ারের।

    গম্ভীর কণ্ঠে হোবার ম্যালো মন্তব্য করলেন, ব্যবসা করার ভাল সুযোগ আছে এখানে।

    ভিউপোর্ট দিয়ে শান্তভাবে বাইরে তাকিয়ে আছেন তিনি। আপাতত কোরেল সম্পর্কে এর বেশি কিছু মন্তব্য করার মতো ব্যাপার ঘটেনি। জার্নিটাও ছিল ঘটনাবিহীন। ফার স্টার-কে দেখে কোরেলিয়ান শিপের যে স্কোয়াড্রনটা ধুঁকতে ধুঁকতে ছুটে এসেছিল সেগুলোকে অতীত গৌরবের নেহাতই অকিঞ্চিৎকর কিছু স্মারকচিহ্ন বলাই ঠিক হবে। সমীহের সঙ্গে একটা দূরত্ব বজায় রেখে চলছিল সেগুলো। এখনো রাখছে। এক হপ্তা হয়ে গেছে, কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে দেখা করতে চেয়ে ম্যালো যে অনুরোধ পাঠিয়েছিলেন এখনো তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

    ম্যালো আবার বললেন, ভাল ব্যবসা করা যায় এখানে। এটাকে তুমি রীতিমত একটা পতিত জমি বলতে পার।

    চেহারায় চরম অধৈর্যের ছাপ মেখে মুখ তুললেন টুয়ার। ছুঁড়ে ফেলে দিলেন কার্ডগুলো এক পাশে।

    তোমার ইচ্ছেটা কী, বলো তো শুনি, ম্যালো?–রা গজরাচ্ছে, অফিসাররা সবাই চিন্তিত হয়ে উঠছে, আর আমি ভেবে মরছি

    কী?

    এই অবস্থার কথা, তোমার কথা। হোয়াট আর উই ডুয়িং?

    ওয়েটিং!

    নাক দিয়ে ঘোৎ জাতীয় একটা শব্দ করলেন প্রৌঢ় ট্রেডার জেইম টুয়ার।

    অন্ধের মতো এগোচ্ছ তুমি, ম্যালো, গর্জন করে উঠলেন তিনি। ফিল্ডের চারপাশে পাহারা রয়েছে, মাথার ওপরও শিপ চক্কর দিচ্ছে। এমনও তো হতে পারে, আমাদেরকে মাটিতে পুঁতে ফেলার জন্যে তৈরি হচ্ছে ওরা?

    এক হপ্তা সময় পেয়েছে ওরা কাজটা করার।

    হতে পারে ওরা রিইনফোর্সমেন্টের জন্যে অপেক্ষা করছে। এবং ধারাল হয়ে উঠল টুয়ারের।

    ধপ করে বসে পড়লেন ম্যালো। তাঁ, একথাটা ভেবে দেখেছি আমি। বেশ একটা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু, বুঝলে! প্রথমত, কোনোরকম ঝামেলা ছাড়াই এখানে পৌঁছেছি আমরা। অবশ্যি তাতে কিছুই প্রমাণিত হয় না। কারণ, গত বছর তিনশোর মধ্যে মাত্র তিনটে শিপ নিখোঁজ হয়েছে। পার্সেন্টেজটা কম। তবে তার অর্থ এটাও হতে পারে যে, পারমাণবিক শক্তিতে সজ্জিত শিপ খুব একটা বেশি নেই ওদের হাতে। আর, সংখ্যাটা বাড়ার আগে অপ্রয়োজনে সেগুলো বের করতে চায় না ওরা।

    অন্যদিকে আবার এও হতে পারে যে, পারমাণবিক শক্তি ওদের আদৌ নেই। অথবা আছে; কিন্তু লুকিয়ে রাখছে পাছে আমরা কিছু জেনে যাই। তার কারণ, হালকা অস্ত্রে সজ্জিত মার্চেন্ট শিপে মাঝে মধ্যে হামলা চালান এক কথা আর ফাউণ্ডেশনের একজন আস্থাভাজন দূতের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। কথা, বিশেষ করে যখন সেই দূতের উপস্থিতির অর্থই হচ্ছে যে ফাউণ্ডেশন ক্রমেই সন্দিহান হয়ে উঠছে।

    এর সঙ্গে আবার রয়েছে—

    থামো, ম্যালো, থামো। আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দুহাত ওপরে তুলে ফেললেন টুয়ার। তুমি তো দেখছি কথার তোড়ে একেবারে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে। ঠিক কী বলতে চাচ্ছ দয়া করে বলবে? ডিটেইলে যাবার দরকার নেই, সংক্ষেপে বলো।

    খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো তোমাকে জানতেই হবে, টুয়ার, নইলে কিছুই বুঝতে পারবে না তুমি। দুপক্ষই আমরা অপেক্ষা করছি। আমি এখানে কী করছি সেটা যেমন ওরা জানে না, তেমনি আমিও জানি না ওরা কী করছে। তবে দুপক্ষের মধ্যে আমার অবস্থাটা অপেক্ষাকৃতভাবে বেশ নাজুক। তার কারণ, আমি একা। অন্যদিকে ওরা একটা গোটা বিশ্ব, যার হাতে হয়ত পারমাণবিক শক্তিও আছে। কিন্তু এর চেয়ে দুর্বল অবস্থানে যাওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। কোনো সন্দেহ নেই ব্যাপারটা বিপজ্জনক, বিরাট কোনো গর্ত হয়ত আমাদের গ্রাস করার জন্যে তৈরি হয়ে আছে। কিন্তু সেকথা তো আমরা আগে থেকেই জানি। সেক্ষেত্রে চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আপাতত আর কী করা যেতে পারে?

    আমি তো- এসময় আবার কে?

    শান্তভাবে মুখ তুলে তাকালেন ম্যালো। রিসিভার টিউন করলেন। ভিসিপ্লেটে ওয়াচ সার্জেন্টের রুক্ষ চেহারা ভেসে উঠল।

    বলো, সার্জেন্ট।

    মাফ করবেন, স্যার, বলে উঠল সার্জেন্ট। ওরা ফাউণ্ডেশনের একজন মিশনারিকে ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে।

    কাকে? মুহূর্তে বিবর্ণ হয়ে গেল ম্যালোর মুখটা।

    একজন মিশনারিকে, স্যার। তিনি সাহায্য প্রার্থনা করছেন, স্যার।

    এই অপরাধটার জন্যে আরো অনেকেরই সেটা দরকার হবে, সার্জেন্ট। ব্যাটল স্টেশনে হাজির হতে বললো সবাইকে।

    প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে কু-লাউঞ্জ। সার্জেন্ট অর্ডার দেবার পর পাঁচ মিনিটও হয়নি, অফ শিফট-এর লোকেরাও সব যে যার অবস্থানে চলে গেছে। পেরিফেরিতে ইন্টারস্টেলার স্পেসের অরাজকতাপূর্ণ অঞ্চলে ক্ষিপ্রতাকে একটা বিশেষ গুণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এবং একজন মাস্টার ট্রেডারের ক্রুরা এই ক্ষিপ্রতার ব্যাপারেই অন্য সবার চেয়ে এগিয়ে।

    ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলেন ম্যালো। মিশনারির পা থেকে মাথা পর্যন্ত চারপাশ থেকে চোখ বুলালেন। লেফটেন্যান্ট টিন্টারের ওপর সরে এল তাঁর দৃষ্টি। অস্বস্তির সঙ্গে নড়ে উঠে এক পাশে সরে গেল সে। ওয়াচ-সার্জেন্ট ডেমেন-এর দিকে তাকালেন এবার ম্যালো। নির্লিপ্ত চেহারা নিয়ে মিশনারির অপর পাশে দাঁড়িয়ে আছে সে।

    টুয়ারের দিকে তাকিয়ে কী যেন চিন্তা করলেন ম্যালো। তারপর বললেন, টুয়ার, কোঅর্ডিনেটর আর ট্র্যাজেক্টরিয়ান ছাড়া সব অফিসারকে আসতে বলো এখানে। অন্য কোনো অর্ডার না দেয়া পর্যন্ত ঐ দুজন যেন ওদের জায়গা থেকে না নড়ে।

    বেরিয়ে গেলেন টুয়ার। এদিকে ম্যালো ব্যস্ত হয়ে পড়লেন আরেক কাজে। ল্যাভেটরির দরজাগুলো খুলে ফেললেন লাথি মেরে, বার-এর পেছন দিকটায় উঁকি দিলেন। জানালার মোটা পর্দাগুলো টেনে টেনে দেখলেন। তিরিশ সেকেণ্ডের জন্যে ঘর ছেড়ে বাইরে গেলেন। যখন ফিরলেন, দেখা গেল আপন মনে গুন গুন করছেন তিনি।

    অফিসাররা সার বেঁধে ঢুকল। সবার শেষে টুয়ার ঢুকে দরজাটা নিঃশব্দে বন্ধ করে দিলেন।

    ম্যালো শান্তকণ্ঠে বলে উঠলেন, প্রথমে জবাব দাও, আমার আদেশ ছাড়া এই লোকটিকে ভেতরে ঢুকতে দিয়েছে কে?

    ওয়াচ সার্জেন্ট এক পা এগিয়ে এল। চকিতে সব কটা চোখ ঘুরে গেল তার দিকে। মাফ করবেন, স্যার। ঠিক নির্দিষ্ট কেউ নয়। আমরা সবাই মিলেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। উনি আমাদেরই একজন, আর এখানকার এই বিদেশীরা-

    মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিলেন ম্যালো। আমি তোমার অনুভূতি বুঝতে পারছি, সার্জেন্ট। এরা কি তোমার কমাণ্ডে ছিল?

    জী, স্যার।

    ব্যাপারটা মিটে গেলে, এক সপ্তাহের জন্যে ইনডিভিজুয়াল কোয়ার্টারে বন্দি থাকবে সবাই। ঐ একই সময়ের জন্যে তোমাকেও সব ধরনের সুপারভিজিটরি ডিউটি থেকে অব্যাহতি দেয়া হলো। ঠিক আছে?

    সার্জেন্টের চেহারায় কোনো পরিবর্তন দেখা গেল না, তবে খুব সামান্য হলেও, তার কাঁধ জোড়া ঝুলে পড়ল।

    ইয়েস, স্যার। দ্রুত, কোনোরকম ইতস্তত না করে জবাব দিল সে।

    তুমি যেতে পার এখন। তোমার গান-স্টেশনে ফিরে যাও।

    বেরিয়ে গেল ওয়াচ সার্জেন্ট। বন্ধ হয়ে গেল দরজা। একটা গুঞ্জন উঠল ঘরের মধ্যে।

    মুখ খুললেন টুয়ার। শাস্তিটা কেন দিচ্ছ ম্যালো? তুমি ভাল করেই জান, এই কোরেলিয়ানরা বন্দি মিশনারিদের মেরে ফেলে।

    আমার আদেশ না মেনে অন্য কোনো কাজ করাটাকেই একটা অপরাধ মনে করি আমি, তাতে কাজের পক্ষে যত যুক্তিই থাকুক না কেন। আমার অনুমতি ছাড়া কারোরই শিপের ভেতরে ঢোকা বা বাইরে যাওয়ার কথা নয়।

    সাত সাতটা দিন সবাই হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, লেফটেন্যান্ট টিন্টারের কণ্ঠে মৃদু বিদ্রোহের সুর। এভাবে আপনি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারবেন না।

    ম্যালো শীতল কণ্ঠে বললেন, আমি পারব। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে শৃঙ্খলার কোনো মূল্য নেই। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমি শৃঙ্খলা বজায় রাখব, নইলে সে শৃঙ্খলা অর্থহীন। কোথায় তোমাদের মিশনারি? আমার সামনে দাঁড় করাও তাকে।

    ম্যালো বসে পড়লেন চেয়ারে। লাল আলখাল্লা পরা মিশনারিকে সাবধানে সামনে নিয়ে আসা হলো।

    কী নাম আপনার, রেভারেণ্ড?

    পুরো শরীরটা যেন একটি-ই অঙ্গ, এমনিভাবে নড়ে উঠে ম্যালোর দিকে ঘুরে গেল লাল আলখাল্লা পরা দেহটা অস্ফুট একটা শব্দ করে। চোখে কেমন একটা ফাঁকা দৃষ্টি তার। কপালে একটা জায়গায় কালশিরে পড়া। ম্যালো খেয়াল করলেন, এর আগে পর্যন্ত কোনো কথা বলেনি লোকটা, এমনকি নড়েওনি।

    আপনার নাম, রেভারেণ্ড?

    হঠাৎ উত্তেজনায় চমকে উঠল মিশনারি। আলিঙ্গনের ভঙ্গিতে দুহাত বাড়িয়ে দিল সে। বাবা আমার, বাবারা আমার গ্যালাকটিক স্পিরিট তোমাদের মঙ্গল করুক!

    এগিয়ে এলেন টুয়ার। তাঁর চোখে উদ্বেগ, কণ্ঠ শুকনো। ভদ্রলোক অসুস্থ। কেউ ওঁকে ধরে বিছানায় নিয়ে যাও। ম্যালো, মিশনারিকে বিছানায় শুইয়ে দিতে বলো ওদের। চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। উনি গুরুতর আহত।

    ম্যালোর বিশাল হাতটা তাকে পেছনে সরিয়ে দিল। বাগড়া দিও না, টুয়ার। নইলে এঘর থেকে বের করে দেব তোমাকে। আপনার নাম, রেভারেণ্ড?

    অনুনয়ের ভঙ্গিতে হঠাৎ দুটো হাত এক হয়ে গেল মিশনারির। তুমি জ্ঞানী; আমাকে এই স্লেচ্ছদের হাত থেকে বাঁচাও! তার কথা জড়িয়ে গেল। এই পশুগুলোর হাত থেকে, বর্বরদের হাত থেকে রক্ষা কর আমাকে। ওরা আমাকে খেয়ে ফেলবে। ওদের এই অপরাধের জন্যে গ্যালাকটিক স্পিরিট কলংকিত হবে। আমি অ্যানাক্ৰিয়নিয়ন ওয়ার্ল্ড-এর জর্ড পার্মা। লেখাপড়া ফাউণ্ডেশনেই। খোদ ফাউণ্ডেশনে, বাবারা আমার। স্পিরিটের একজন প্রিস্ট আমি। সব ধরনের মিস্ট্রির ব্যাপারে দীক্ষিত আমি। আমার অন্তরাত্মা আমাকে যেখানে ডেকে এনেছে আমি সেখানেই এসেছি। হাঁপাচ্ছে লোকটা। বর্বরদের হাতে আমি অনেক নির্যাতন সহ্য করেছি। তোমরা যে স্পিরিটের সন্তান-সন্ততি, সেই স্পিরিটের দোহাই, আমাকে ওদের হাত থেকে রক্ষা কর।

    অকস্মাৎ ইমার্জেন্সি এলার্ম বক্সের কলরব এবং তারপরই একটা কণ্ঠ, এনিমি ইউনিট ইন সাইট! ইন্সট্রাকশন ডিজায়ারড়!

    সব কটা চোখ চট করে ওপরে, স্পিকারের দিকে চলে গেল।

    হিংস্র মুখভঙ্গি করে একটা দিব্যি আওড়ালেন ম্যালো। ক্লিক শব্দে রিভার্স ওপেন করে চেঁচিয়ে উঠলেন, সতর্ক দৃষ্টি রাখ, আর কিছু না। সংযোগ ছিন্ন করে দিলেন তিনি।

    জানালার দিকে এগিয়ে গিয়ে ঝট করে পর্দা সরিয়ে দিলেন তিনি একপাশে। গম্ভীর মুখে বাইরে তাকালেন।

    এনিমি ইউনিট-ই বটে। হাজার হাজার কোরেলিয়ান এসে ভিড় করেছে শিপের বাইরে। পোর্টের এমাথা থেকে ওমাথা পর্যন্ত বিস্তৃত সেই জনারণ্য সাপের মতো মোচড় খাচ্ছে। ম্যাগনেসিয়াম মশালের শীতল, উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত জনতার সামনের অংশটা কাছে এগিয়ে এল।

    টিন্টার! ঘুরে না তাকিয়েই আদেশ করলেন ম্যালো, তাঁর গলার পেছনের দিকটা লাল হয়ে উঠেছে। আউটার স্পীকারটা অন করে দাও। জিগ্যেস কর, ওরা কী চায়। জিগ্যেস কর, ওদের সঙ্গে কোনো আইনজীবী বা এধরনের কোনো লোক আছে কিনা। কোনোরকম প্রতিশ্রুতি দিও না, কোনো হুমকি দিও না। যা বললাম ঠিক তাই করবে, নইলে তোমাকে খুন করব আমি।

    ঘুরে দাঁড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল টিন্টার।

    ম্যালো অনুভব করলেন, খসখসে, কর্কশ একটা হাত এসে পড়েছে তার কাঁধের ওপর। সরিয়ে দিলেন তিনি সেটা। ম্যালোর কানের কাছে ক্রুদ্ধ কণ্ঠে হিস হিস করে উঠলেন টুয়ার, ম্যালো, এই লোকটাকে আশ্রয় দিতে বাধ্য তুমি। তাছাড়া, শত হলেও সে একজন প্রিস্ট। বাইরের ঐ বর্বরগুলো শুনতে পাচ্ছ তুমি আমার কথা?

    শুনতে পাচ্ছি, টুয়ার, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠলেন ম্যালো। মিশনারি পাহারা দেবার চেয়ে অনেক জরুরি কাজ পড়ে রয়েছে আমার এখানে। আই উইল ডু, স্যার, হোয়াট আই প্লীজ। সেলডন আর গ্যালাক্সির দিব্যি দিয়ে বলছি, আমাকে বাধা দেবার চেষ্টা করলে আমি তোমার গলার রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলব। আমার পথ থেকে সরে যাও, টুয়ার, নইলে এটাই হবে তোমার শেষ অপচেষ্টা।

    ঘুরে, টুয়ারকে পাশ কাটিয়ে, এগিয়ে এলেন ম্যালো।

    আর এই যে, আপনি! রেভার্ড পার্মা! আপনি কি জানেন, চুক্তি অনুযায়ী ফাউণ্ডেশনের মিশনারিদের কোরেলিয়ান টেরিটোরিতে ঢোকা নিষেধ?

    ঠক ঠক করে কাঁপছে তখন মিশনারি লোকটা। স্পিরিট যেখানে নিয়ে যায় আমি কেবল সেখানেই যাই। নিজেদেরকে জ্ঞানের আলো থেকে বঞ্চিত রাখার প্রচেষ্টা থেকেই কি প্রমাণিত হয় না যে এই মূঢ় লোকগুলোর জন্যে ঐ জ্ঞান কত দরকারি?

    এটা অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার, রেভারেণ্ড। কোরেল আর ফাউণ্ডেশন- দুটোরই আইন ভঙ্গ করেছেন আপনি, সেটাই আসল কথা। আইনত আমি আপনাকে রক্ষা করতে পারি না।

    মিশনারি তার হাত দুটো আবারও ছড়িয়ে দিল আগের মতো। তবে আগের সেই হতভম্ব অবস্থাটা কাটিয়ে উঠেছে সে। শিপের আউটার কমিউনিকেশন সিস্টেম কর্কশ শব্দ তুলে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে ক্রুদ্ধ জনতার সম্মিলিত, তরঙ্গায়িত কণ্ঠ আবছাভাবে ভেসে আসছে। সেদিকে ম্যালোর দৃষ্টি আকর্ষণ করল পৰ্মা।

    শুনতে পাচ্ছ ওদের গলা? তুমি আমাকে বানানো আইনের কথা শোনাচ্ছ কেন? এর চেয়ে বড় আইন আছে। গ্যালাকটিক স্পিরিট কি বলেনি যে, তোমার ভাইকে আহত অবস্থায় দেখে তুমি অলসভাবে দাঁড়িয়ে থেক না? এও কি বলেনি যে, অসহায় আর দুর্বল লোকের সঙ্গে যেরকম ব্যবহার করবে, সে রকম ব্যবহারই পাবে তুমি প্রতিদানে?

    তোমার কি গান নেই? শিপ নেই? তোমার পেছনে কি ফাউণ্ডেশন নেই? তার চেয়ে বড় কথা, তোমার চারদিকে কি সেই স্পিরিট নেই যে-স্পিরিট গোটা মহাবিশ্বকে শাসন করছে? শ্বাস নেবার জন্যে বিরতি দিল সে।

    হঠাৎ করে ফার স্টারের বাইরে থেকে আসা শব্দ থেমে গেল, আবার ঘরে ঢুকল লেফটেন্যান্ট টিন্টার। চেহারায় স্পষ্ট উদ্বেগের ছাপ।

    বলো! সংক্ষেপে আদেশ করলেন ম্যালো।

    স্যার, ওরা জর্ড পার্মাকে ওদের হাতে তুলে দিতে বলছে।

    যদি না দেয়া হয়?

    এক গাদা হুমকি দিয়েছে ওরা, স্যার। অসংখ্য মনে হচ্ছে পাগল হয়ে গেছে ওরা পুরোপুরি। ওদের একজন বলছে, ডিসট্রিক্টটা নাকি সে-ই চালায়। তার হাতে নাকি পুলিশ পাওয়ারও আছে। তবে তার ওপরেও যে লোক আছে সেটা বোঝা গেল।

    থাকুক বা না থাকুক, কাঁধ ঝাঁকালেন ম্যালো, সে-ই আইনের লোক; ওদেরকে বলো, এই প্রশাসক লোকটা বা পুলিশ অথবা সে যা-ই হোক না কেন- সে যদি একা শিপে আসে তাহলে রেভার্ড পার্মাকে ছেড়ে দেয়া হবে তার কাছে।

    হঠাৎ একটা গান চলে এল তার হাতে। তিনি বলে চললেন, অবাধ্যতা কাকে বলে আমার জানা নেই। এব্যাপারে আমার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তবে এখানে যদি এমন কেউ থেকে থাকে যার ধারণা সে আমাকে এব্যাপারে কিছু শেখাতে পারবে, তাহলে সেক্ষেত্রে আমিও আমার প্রতিষেধকটার পরিচয় জানিয়ে দেব তাকে।

    ধীরে ধীরে ঘুরল গানটা। স্থির হলো টুয়ারের ওপর এসে। অনেক কষ্টে মুখের ভাব সংযত রাখলেন প্রৌঢ় ট্রেডার। মুষ্টিবদ্ধ হাত দুটো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে গেল। নাক দিয়ে ফোঁস ফোঁস শব্দ বেরুচ্ছে তার।

    বেরিয়ে গেল টিন্টার। পাঁচ মিনিটের মধ্যে সেই জনতার ভিড়ের মধ্যে থেকে ছোটখাটো চেহারার এক লোক বেরিয়ে এল। ধীরে ইতস্তত হাঁটতে শুরু করল সে। পরিষ্কার বোঝা গেল, ভয় এবং উৎকণ্ঠা ঘিরে ধরেছে তাকে। দুবার ঘুরে দাঁড়াল সে, দুবারই দশানন দানবরূপী ক্রুদ্ধ জনতার ধমক এগিয়ে নিয়ে চলল তাকে।

    ঠিক আছে। হ্যাঁণ্ড-ব্লাস্টারটা দিয়ে ইশারা করলেন ম্যালো। গ্রান আর আপশার, নিয়ে যাও একে।

    তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চেঁচিয়ে উঠল মিশনারি লোকটা। দুহাত তুলে তার কঠিন আঙুলগুলো বর্শার মতো করে ওপরের দিকে তাক করল। ফলে আলখাল্লার ঢোলা আস্তিন নেমে এল কনুই-এর দিকে। বেরিয়ে পড়ল শিরাবহুল চিকন দুটো হাত। মুহূর্তের জন্যে হঠাৎ করে সামান্য একটু আলোর ঝরকানি দেখা গেল। পর মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল সেটা। বিরক্তির সঙ্গে আবারও হাত নেড়ে ইশারা করলেন ম্যালো। লোক দুটোর হাত থেকে ছাড়া পাবার জন্যে ধস্তাধস্তি শুরু করল জর্ড পার্মা, সেই সঙ্গে শুরু হলো বৃষ্টির মত অভিশাপ বর্ষণ। যে-বেঈমান তার নিজের লোককে সর্বনাশ আর মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় সে অভিশপ্ত হোক! অসহায়ের আর্তনাদ যে কানে পৌঁছোয় না সে-কান বধির হয়ে যাক! যে-চোখ নিরপরাধকে চিনতে পারে না সে-চোখ অন্ধ হয়ে যাক। অন্ধকারের সঙ্গে যে-আত্মার আত্মীয়তা সে-আত্মার জ্যোতি চিরতরে নিভে যাক

    টুয়ার দুহাতে কান চাপা দিলেন।

    ম্যালো তার ব্লাস্টারে একটা টুসকি মেরে সেটা যথাস্থানে রেখে দিলেন। মৃদু কণ্ঠে বললেন, যার যার স্টেশনে চলে যাও সবাই। লোকগুলো চলে যাবার পরেও দু ঘণ্টা সতর্ক বজায় রাখবে পুরোমাত্রায়। আর পরবর্তী আটচল্লিশ ঘণ্টার জন্যে স্টেশনের সংখ্যা দ্বিগুণ করে দেবে। টুয়ার, এস আমার সঙ্গে।

    ম্যালোর প্রাইভেট কোয়ার্টারে ঢুকলেন দুজন। একটা চেয়ার দেখিয়ে দিলেন ম্যালো। টুয়ার বসলেন সেটায়। তার গাট্টাগোট্টা শরীরটা বেশ সংকুচিত দেখাচ্ছে।

    টুয়ারের দিকে বেশ কিছুক্ষণ ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ম্যালো। টুয়ার সে-দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে চোখ সরিয়ে নিলেন। টুয়ার, বলে উঠলেন ম্যালো, হতাশ হয়েছি আমি। তিন বছরের রাজনৈতিক জীবন তোমার ট্রেডারসুলভ স্বভাবগুলো ভুলিয়ে দিয়েছে। মনে রেখ, ফাউণ্ডেশনে আমি একজন গণতন্ত্রী হতে পারি, কিন্তু শিপে আমি স্বৈরতন্ত্রী। আমার নিজের লোকজনের সামনে এর আগে কখনো ব্লাস্টার বের করতে হয়নি আমাকে। এবারও তা করতে হতো না, যদি না তুমি সীমা লঙ্ঘন করতে।

    টুয়ার, তোমার কোনো অফিশিয়াল পজিশন নেই এখানে। তুমি এসেছ আমার আমন্ত্রণে, আর সেজন্য আমি তোমার সঙ্গে সম্ভাব্য সব ধরনের সৌজন্যমূলক ব্যবহার করব। তবে সেটা সবার চোখের আড়ালে। যাই হোক, এখন থেকে আমার অফিসার বা অন্যান্য লোকজনের সামনে আমি স্যার, ম্যালো নই। আর আমি যখন কোনো আদেশ করব, তখন একজন তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী যেভাবে পড়িমরি করে হুকুম তামিল করে, তার চেয়ে দ্রুত সে-আদেশ পালন করবে তুমি। নইলে তার চেয়ে তাড়াতাড়ি সাব-লেভেলে আটকে রাখব আমি তোমাকে। বুঝতে পারছ?

    পার্টি লিডার টুয়ার ঢোক গিললেন। অনিচ্ছাভরে বললেন, স্বীকার করছি, ভুল হয়ে গেছে।

    ঠিক আছে! এবারের মতো ক্ষমা করে দিলাম। হাত মেলাও।

    ম্যালোর বিশাল হাতের তালুর ভেতর টুয়ারের আঙুলগুলো হারিয়ে গেল।

    টুয়ার বলে উঠলেন, আমার উদ্দেশ্য খারাপ ছিল না। বিনা বিচারে কোনো লোককে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়াটা সহ্য করা যায় না। ঐ ডরপুক গভর্নর মিশনারি লোকটাকে বাঁচাতে পারবে না। ইটস মার্ডার। এটা রীতিমত খুন।

    এছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না আমার। সত্যি বলতে কী, ব্যাপারটা আগাগোড়াই বেশ সন্দেহজনক ছিল, তুমি খেয়াল করোনি?

    কী খেয়াল করব?

    দূরবর্তী অঞ্চলে একটা নিঝুমগড়ের একেবারে মধ্যেখানে এই স্পেস পোর্টটার অবস্থান। হঠাৎ একজন মিশনারি পালাল। কোত্থেকে পালাল সে? চলে এল এখানে। কাকতালীয় ব্যাপার? হাজারো লোক এসে ভিড় জমাল। কোত্থেকে এল তারা? সবচেয়ে কাছের শহরটা নিশ্চয়ই একশো মাইল দূরে, কিন্তু মাত্র আধ ঘণ্টার মধ্যে এসে হাজির হলো তারা। কীভাবে?

    কীভাবে? টুয়ার প্রতিধ্বনি করলেন।

    ব্যাপারটা যদি এমন হয় যে, মিশনারি লোকটাকে আসলে এখানে একটা টোপ হিসেবে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল? পার্মাকে যথেষ্ট কনফিউজড় বলে মনে হয়েছে আমার। এক মুহূর্তের জন্যও লোকটা নিজের মধ্যে ছিল না। কেমন একটা হতভম্ব, হকচকানো ভাব ছিল তার মধ্যে।

    একটু বেশি কল্পনা করে ফেলেছ। তিক্ত কণ্ঠে বিড়বিড় করে বললেন টুয়ার।

    হতে পারে! কিন্তু এও হতে পারে যে, ওরা আসলে চেয়েছিল আমরা যেন বীর বাহাদুর আর শিভালরাস সেজে বোকার মতো লোকটাকে আশ্রয় দেই। এখানে এসে লোকটা কোরেল এবং ফাউণ্ডেশন- দুটোরই আইন অমান্য করেছে। লোকটাকে আশ্রয় দিলে তা হতো কোরেলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। আর তখন

    আমাদেরকে রক্ষা করার কোনো লিগ্যাল রাইট থাকত না ফাউণ্ডেশনের।

    এটা- এটা অতিমাত্রায় কষ্টকল্পনা।

    ম্যালো কিছু বলার আগেই গর্জন করে উঠল স্পীকার। স্যার, অফিশিয়াল কমিউনিকেশন রিসিভড়।

    এক্ষুনি পাঠিয়ে দাও।

    ক্লিক শব্দ করে একটা স্লটে দেদীপ্যমান সিলিণ্ডারটা পৌঁছল। ম্যালো সেটা খুলে ভেতর থেকে সিলভারসমৃদ্ধ একটা শীট বের করলেন। বুড়ো আঙুল আর তর্জনীর সাহায্যে সমঝদারের মতো সেটা ঘষে বলে উঠলেন, খোদ রাজধানী থেকে টেলিপোর্ট করা হয়েছে। শিপটা কমোডরের নিজস্ব স্টেশনারি।

    এক নজরে সেটা পড়ে হেসে উঠলেন তিনি। আমার ধারণা অতিমাত্রায় কষ্টকল্পিত, তাই না? শীটটা ছুঁড়ে দিলেন তিনি টুয়ারের দিকে। বললেন, পার্মাকে ফেরত দেবার আধ ঘণ্টা যেতে না যেতেই আমরা শেষ পর্যন্ত মহামান্য কমোডরের সঙ্গে দেখা করার আমন্ত্রণ পেয়ে গেলাম অথচ সাত দিন ধরে এজন্যেই বসে আছি। আমার কী মনে হচ্ছে জান, টুয়ার, আমরা একটা পরীক্ষায় পাস করেছি।

    .

    পাঁচ

    কমোডর অ্যাসপারকে অনেকটা গাঁয়ে মানে না আপনি মোড়ল গোছের লোক বলা যেতে পারে। মাথাজোড়া টাক তার। অল্প কিছু পাকাচুল আছে পেছন দিকে, নিস্তে জভাবে ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে সেগুলো। গায়ের জামা-কাপড় ময়লা। কথায় নাকিসুর।

    ভান বা ভণিতার কোনো ব্যাপার নেই এখানে, ট্রেডার ম্যালো, বললেন তিনি। নো ফলস শশা। আমি শুধু স্টেটের ফার্স্ট সিটিজেন, কমোডর বলতে সেটাই বোঝায়। আর আমার উপাধি বলতে এই একটাই।

    এতেই তাকে যথেষ্ট সুখী বলে মনে হলো। সত্যি বলতে কী, আমার মনে হয় এটিই কোরেল আর আপনার জাতির মধ্যে সবচেয়ে জোরালো বন্ধন সৃষ্টি করেছে। আমার ধারণা, আমাদের মতো আপনারাও প্রজাতন্ত্রের অনেক সুফল ভোগ করেন।

    আপনি ঠিকই বলেছেন, কমোডর, গম্ভীরভাবে কথাটা বলে মনে মনে পার্থক্যটা ভেবে নিলেন ম্যালো। আমাদের সরকারের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন শান্তি আর বন্ধুত্বের ক্ষেত্রে এটাকে আমি একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করি।

    শান্তি! আহা! কমোডরের ইতস্তত বিক্ষিপ্ত খোঁচা খোঁচা দাড়িভরা মুখটা ভাবপ্রবণ হয়ে উঠল। আমার তো ধারণা, শান্তির আদর্শ আমার মতো করে বুকের এত গভীরে বয়ে বেড়ায় না কেউ এই গোটা পেরিফেরিতে। শুধু এটুকুই বলি, আমার খ্যাতনামা পিতার মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে আমি এই স্টেটের ভার গ্রহণ করার পর থেকে এখানে শান্তিভঙ্গ হয়নি। হয়ত আমার বলা উচিত নয় মৃদুকাশি কিন্তু আমি শুনেছি, মানে আমাকে জানানো হয়েছে, আমার স্টেটের লোকেরা, বলা ভাল আমার নাগরিক ভাইয়েরা, আমাকে নাকি সুপ্রিয় অ্যাসপার বলে ডাকে।

    ছিমছাম বাগানটার ওপর নজর বুলালেন ম্যালো। দীর্ঘদেহী যে-লোকগুলো অদ্ভুত ডিজাইনের অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে অস্বাভাবিক কোনো-ঘুপচি থেকে উঁকিঝুঁকি মারছে তারা সম্ভবত তাঁর নিজের কারণে নেয়া সতর্কতার অংশ বিশেষ। সে না হয় বোঝা গেল। কিন্তু প্রাসাদ ঘিরে থাকা উঁচু স্টিল মোড়া পাঁচিলগুলো নিঃসন্দেহে সপ্রতি সুরক্ষিত করা হয়েছে। এরকম একজন সুপ্রিয় অ্যাসপারের পক্ষে এমন নিবাস বেমানান।

    ম্যালো বললেন, আমি ভাগ্যবান যে, কাজে এসে আপনার মতো লোকের সঙ্গে পরিচয় হলো। দক্ষ প্রশাসনিক ব্যবস্থাবিহীন আশপাশের বিশ্বগুলোের স্বৈরাচারী রাজ রাজড়াদের তেমন কোনো গুণ নেই যা তাদেরকে আপনার মত এমন জনপ্রিয় করে তুলতে পারে।

    কোন ধরনের গুণ তাদের নেই বলছেন? কমোডরের কণ্ঠে সতর্কতার ছোঁয়া।

    এই যেমন ধরুন, কীসে জনগণের কল্যাণ হয় সে-ব্যাপারে তাদের কোনো মাথাব্যথাই নেই বলতে গেলে। আপনার আছে, আপনি বুঝবেন।

    বাগানের ভেতর অলসভাবে পায়চারি করতে করতে কথা বলছেন তাঁরা। পেছনে দুহাত বেঁধে নুড়ি বিছানো পথের দিকে তাকালেন কমোডর।

    মসৃণ কণ্ঠে ম্যালো বলে চললেন, ট্রেডারদের ওপর আপনার সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে আমাদের দুজাতির মধ্যে বাণিজ্য বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক আগেই নিশ্চয়ই আপনার কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে গেছে যে, মুক্ত বাণিজ্য–

    অবাধ বাণিজ্য, বিড় বিড় করে বলে উঠলেন কমোডর।

    ঠিক আছে,অবাধ বাণিজ্য। তো, এই অবাধ বাণিজ্যের ফলে যে আমাদের দু পক্ষেরই লাভ হবে, এটা আপনাদের বোঝাতে চাই আমি। আপনাদের কাছে কিছু জিনিস আছে যা আমরা চাই, আবার আমাদের কাছে কিছু জিনিস আছে যা আপনাদের দরকার। এ অবস্থায় ক্রমাগত উন্নতির জন্যে যা দরকার তা হচ্ছে বিনিময়। আপনি একজন জ্ঞানী শাসক, জনগণের বন্ধু। ভুল হলো, জনগণের সদস্য- আপনাকে এত ভেঙে বলার কিছু নেই; আর তা করতে গিয়ে আপনার বুদ্ধিমত্তাকে অপমান করব না আমি।

    বুঝতে পেরেছি আমি ব্যাপারটা। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, আপনার লোকেরা বড় একগুঁয়ে। যুক্তি-টুক্তির ধার ধারে না। বাণিজ্য যত চলুক, আমার আপত্তি নেই। তবে সেটা হতে হবে আমাদের অর্থনীতির অনুমোদনসাপেক্ষে। আপনাদের শর্তসাপেক্ষে নয়। আমি এখানকার একচ্ছত্র অধিপতি নই। তাঁর গলা একটু চড়ে গেল এখানে এসে। আমি জনমতের ভূত্য মাত্র। সোনা রুপোর চাকচিক্যভরা বাণিজ্য আমার জনগণ গ্রহণ করবে না।

    কারণটা কী? কোনো ধর্মীয় অনুশাসন?

    মূলত সেটাই। বিশ বছর আগের সেই অ্যাসকোনের ঘটনাটা নিশ্চয়ই মনে আছে আপনার? প্রথমে ওদের কাছে আপনাদের কিছু গুড় বিক্রি করা হলো। এরপর আপনার লোকজন সেখানে মিশনারিদের অবাধ যাতায়াতের অনুমতি চাইল যাতে করে ঐ বিক্রীত জিনিসপত্র তারা দেখাশোনা করতে পারে, নষ্ট হলে মেরামত করে দিতে পারে। তারা টেম্পল অভ হেলথ বা স্বাস্থ্য-মন্দির স্থাপনের অনুমতি চাইল। এরপর সেখানে স্থাপিত হলো ধর্মীয় স্কুল। ধর্মীয় অফিসারদের দেয়া হলো স্বায়ত্বশাসন। ফলে কী দেখা গেল? দেখা গেল অ্যাসকোন এখন ফাউণ্ডেশন সিস্টেমের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। আর এ্যাণ্ড মাস্টার ভদ্রলোক তো তাঁর আণ্ডারওয়্যারটা পর্যন্ত নিজের বলে দাবি করতে পারেন না। না, না, স্বাধীন একটা জনগোষ্ঠীর সম্মান এভাবে ধুলোয় গড়াগড়ি যেতে পারে না।

    বাধা দিলেন ম্যালো। আপনি এতক্ষণ যা বললেন আমি তার কিছুই করতে বলছি না।

    বলছেন না?

    না।

    আমি একজন ট্রেডার। অর্ধই আমার ধর্ম। এই সব মিস্টিসিজম আর মিশনারিদের ছলচাতুরি দেখলে গা জ্বলে আমার। আপনিও এসব সমর্থন করতে নারাজ দেখে সুখী হলাম। বোঝা গেল, আপনি আর আমি একই ধাতুতে গড়া।

    তীক্ষ্ণ শব্দে হেসে উঠলেন কমোডর।

    ভাল বলেছেন। এর আগে, আপনার মাপের লোক পাঠানো উচিত ছিল ফাউণ্ডেশনের।

    ম্যালোর বিশাল কাঁধে বন্ধুসুলভ ভঙ্গিতে একটা হাত রাখলেন তিনি। কিন্তু মশাই, এতক্ষণ আপনি গল্পের অর্ধেকটা শোনালেন আমাকে। ব্যাপারটা কী নয়, এতক্ষণ সেটা বললেন। এবার বলুন, ব্যাপারটা কী?

    ব্যাপারটা স্রেফ এই, আপনি পাহাড়প্রমাণ ধনসম্পদের ভারে ভারাক্রান্ত হতে যাছেন।

    তাই? জোরে একটা শ্বাস ফেললেন কমোডর। কিন্তু ধনসম্পদ দিয়ে কী করব আমি? সত্যিকারের সম্পদ হচ্ছে জনগণের ভালবাসা। আমি তা পেয়েছি।

    আপনি দুটোই পেতে পারেন এক সঙ্গে। এক হাতে সোনা আর অন্য হাতে ভালবাসা কুড়ানোটা এমন কিছু অসম্ভব ব্যাপার নয়।

    তাহলে তো খুবই মজার ব্যাপার হতো সেটা। তা, কী করে এই অসাধ্যটা সাধন করবেন আপনি?

    ও, সে অনেক উপায় আছে। কোন উপায়টা অবলম্বন করবেন সেটা ঠিক করাই বরং সমস্যা একটু। একটা একটা করে দেখা যাক। প্রথমে বিলাস সামগ্রীর কথাই ধরুন। এই যেমন-

    ভেতরের একটা পকেট থেকে পলিশড় মেটালের চ্যাপ্টা একটা চেইন বের করলেন ম্যালো। এটার কথাই ধরুন।

    কী এটা?

    মুখে বলার চেয়ে দেখিয়ে দিলে ভাল হবে। একটা মেয়ে যোগাড় করা যাবে? ইয়াং একটা মেয়ে হলেই চলবে। আর একটা আয়না- প্রমাণ সাইজের।

    হুম! চলুন তাহলে, বাড়ির ভেতর যাওয়া যাক। নিজের বাসস্থানকে কমোডর বাড়ি বললেও সাধারণ লোকে সেটাকে এক বাক্যে প্রাসাদই বলবে। আর ম্যালোর নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে সেটাকে অসাধারণ একট দুর্গ বলে মনে হলো। বেশ উঁচু জমির ওপর বানানো সেই দুর্গ যেন গোটা রাজধানীর ওপর উঁকি দিয়ে আছে। দেয়ালগুলো যথেষ্ট পুরু এবং সুরক্ষিত। প্রবেশ পথগুলোতে প্রহরার ব্যবস্থা। বাড়িটার স্থাপত্যে প্রতিরক্ষার ছাপ সুস্পষ্ট। এই হচ্ছে সুপ্রিয় অ্যাসপারের বাসস্থান! ম্যালোর মনটা তিক্ততায় ভরে গেল।

    একটি তরুণীকে ডেকে আনা হলো। কমোডরকে কুর্নিশ করে সোজা হয়ে দাঁড়াল সে। অ্যাসপার বললেন, মেয়েটি কমোডরার পরিচারিকাদের একজন। কাজ হবে একে দিয়ে?

    বিলক্ষণ।

    মেয়েটির কোমরে চেইনটা পরিয়ে পিছিয়ে এলেন ম্যালো। সতর্ক দৃষ্টিতে তার দিতে তাকিয়ে ছিলেন কমোডর। সশব্দে একটা নিশ্বাস ফেলে তিনি বলে উঠলেন, ব্যস, এই!

    পর্দাগুলো একটু টেনে দেবেন দয়া করে, কমোডর? ইয়াং লেডি, ম্যাপটার ওখানে ছোট্ট একটা নব আছে। দয়া করে ওটাকে ওপরের দিতে তুলে দাও একটু। হ্যাঁ, ওঠাও, ভয় নেই, কোনো ব্যথা লাগবে না।

    মালোর কথামত কাজ করল মেয়েটি। ছোট্ট করে একটা শ্বাস টেনে নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে উঠল, ওহ!

    কোমরটা যেন উৎস, আর সেখান থেকে হলুদাভ, জলস্রোতের মতো সঞ্চরণশীল আলোর দীপ্তি বেরিয়ে এসে তাকে ঢেকে দিয়েছে। আলোর সেই দীপ্তি তার মাথার ওপর তরল আগুনের একটা মুকুটের আকার নিয়েছে। মনে হলো কেউ যেন আকাশ থেকে সুমেরু-প্রভা ছিনিয়ে এনে একটা আলখাল্লার মতো করে পরিয়ে দিয়েছে মেয়েটার গায়ে।

    আয়নার দিকে এগিয়ে গেল মেয়েটি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল নিজের প্রতিবিম্বের দিকে।

    এটা ধর। নিপ্রভ নুড়ির একটা নেকলেস মেয়েটার দিকে এগিয়ে দিলেন ম্যালো। গলায় পর।

    নির্দেশ পালন করল তরুণী। দেদীপ্যমান সেই প্রভার রাজ্যে প্রবেশ করামাত্র প্রতিটি নুড়ি আলাদা আলাদা অগ্নিশিখার রূপ ধরে ফুলিঙ্গের মতো লাল এবং সোনালি আলোর ফুলঝুরি ছড়াতে লাগল।

    কী মনে হচ্ছে? মেয়েটিকে জিগ্যেস করলেন ম্যালো। সে কোনো উত্তর দিল না। তবে তার চোখ উপছে পড়ছে বিমুগ্ধ বিস্ময় মেশানো একটা সশ্রদ্ধ ভাব। কমোডর ইঙ্গিত করতে নিতান্ত অনিচ্ছাভরে নবটা নিচে ঠেলে দিল মেয়েটি। অমনি নিভে গেল স্বর্গীয় জ্যোতি। শুধু একটা স্মৃতি নিয়ে চলে গেল মেয়েটি।

    এটি আপনার, কমোডর, দরাজ কণ্ঠে বললেন ম্যালো। কমোডরাকে দেবেন। ফাউণ্ডেশনের তরফ থেকে ছোট্ট একটা উপহার।

    হুম্‌-ম্‌-ম্‌। বেল্ট এবং নেকলেসটা হাতে নিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখলেন কমোডর, যেন ওজন আন্দাজ করছেন দুটোর।

    কীভাবে করলেন কাজটা?

    শ্রাগ করলেন ম্যালো। সেটা বলতে পারবে আমাদের টেকনিক্যাল এক্সপার্টরা। তবে এটুকু বলতে পারি, যাজকীয় কোনো সাহায্য ছাড়াই, আবারও বলছি, যাজকীয় কোনো সাহায্য ছাড়াই এটা কাজ করবে।

    ,বুঝলাম। কিন্তু শত হলেও এটা তো স্রেফ মেয়েলী খেলনা মাত্র। এজিনিস দিয়ে কী হবে? টাকাটা আসবে কোত্থেকে?

    আপনাদের এখানে নিশ্চয়ই বল-নাচ, সংবর্ধনা, ভোজসভা- এসব আছে?

    হ্যাঁ, তা তো থাকতেই হবে।

    আপনি কি অনুমান করতে পারছেন, এধরনের জুয়েলারি মহিলারা কত টাকা দিয়ে কিনবেন? কম করে হলেও দশ হাজার ক্রেডিট।

    ওফ! কমোডরের যেন বোষধাদয় হলো।

    আর যেহেতু এক একটা আইটেমের পাওয়ার ইউনিট ছমাসের বেশি কাজ করবে না, তাই কিছুদিন পর পর নতুন একটার দরকার পড়বে। আপনার যত বেল্ট দরকার সব আমরা সাপ্লাই দিতে পারব। একেকটার দাম পড়বে এক হাজার ক্রেডিট মূল্যের পেটা লোহা। শতকরা নশো ভাগ লাভ থাকবে আপনার।

    কমোডর তার দাড়িতে মৃদু টান দিতে দিতে চিন্তায় ডুবে গেলেন। মনে হলো, জটিল কোনো হিসেব কষছেন তিনি মনে মনে। গ্যালাক্সি! বুড়িরা কী কাড়াকাড়িই না শুরু করে দেবে এগুলোর জন্যে। আর সাপ্লইটা আমি সব সময়ই একটু কমিয়ে রাখব, যাতে কিনতে গিয়ে রীতিমত নিলাম ডাকার মতো অবস্থা হয়। তবে, আমি নিজেই যে ব্যবসাটা চালাচ্ছি সেটা অবশ্যি

    আপনি চাইলে আমি আমাদের কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করতে পারি। ইচ্ছে করলে এসব জুয়েলারি ছাড়াও আপনি আমাদের পুরো হাউসহোল্ড গ্যাজেট, আই মীন, গৃহস্থালী যন্ত্রপাতির দিকেও হাত বাড়াতে পারেন। আমাদের কাছে এমন কোলাপসিবল স্টোভ আছে যা ভীষণ শক্ত মাংসও আপনার পছন্দমত রোস্ট করতে সময় নেবে মাত্র দুমিনিট। আছে এমন ধরনের ছুরি যাতে কখনো ধার দিতে হবে না। এমন এক যন্ত্র আছে, যা কিনা গোটা একটা লণ্ড্রীর বিকল্প হিসেবে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করবে। ছোট্ট একটা ক্লজেটেই পুরে রাখা যাবে সেটা। এছাড়াও আছে ঐ ধরনের ডিশ ওয়াশার, ফ্লোর-স্ক্রাবার, ফার্নিচার পলিশার, ঘরের বাতাসের ধুলো-বালি অধঃক্ষিপ্ত করার যন্ত্র ডাস্ট-প্রেসিপিটেটর, লাইটিং ফিকচার- আর কত বলব? মোদ্দাকথা, আপনি যা যা চান সব। সাধারণ লোকের হাতে এগুলো তুলে দিতে পারলে কী ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে যাবেন আপনি, একবার ভাবুন তো! সরকারি মনোপলিতে নশো পার্সেন্ট লাভে যদি ওগুলো বিক্রি করার ব্যবস্থা করতে পারেন, তাহলে আপনার জাগতিক সম্পদের পরিমাণ কীরকম হু হু করে বেড়ে যাবে ভাবুন। তো একবার! যে-দাম দিয়ে লোকে ওগুলো কিনবে তার চেয়ে বহুগুণ মূল্যবান বলে মনে হবে জিনিসগুলো তাদের কাছে। আর মনে রাখবেন, এগুলোর কোনোটিরই কোনো যাজকীয় তত্ত্বাবধানের দরকার পড়বে না। সবাই ধেই ধেই করে নাচবে খুশিতে।

    শুধু আপনি ছাড়া, সম্ভবত। তা আপনি কী পাচ্ছেন এ থেকে?

    ফাউণ্ডেশনের আইন অনুযায়ী প্রত্যেক ট্রেডার যা পায়, স্রেফ তাই। যে লাভ হবে তার অর্ধেক পাব আমি আর আমার লোকজন। আমি যেসব জিনিস বিক্রি করতে চাইছি তার সব যদি আপনি কিনে নেন, আমি বলছি, আমাদের দুজনেরই রমরমা লাভ হবে। রমরমা লাভ।

    কী দিয়ে যেন আপনার মূল্য পরিশোধ করতে হবে বললেন? লোহা? বেশ উপভোগ করছেন কমোডর গোটা ব্যাপারটা।

    লোহা, কয়লা আর বক্সাইট। এছাড়া, তামাক, মরিচ, ম্যাগনেসিয়াম, হার্ড উড যেমন, সেগুন বা শাল কাঠ, এসব দিলেও চলবে। মোট কথা, এমন কিছু নয় যা আপনার অঢেল নেই।

    ভালই তো মনে হচ্ছে।

    আমারও তাই মত। ও, আরও একটা আইটেম আছে, কমোডর। আমি আপনাদের ফ্যাক্টরির যন্ত্রপাতি সব নতুন করে দিতে পারি।

    তাই? কীভাবে?

    এই যেমন, স্টীল ফাউরি কথাই ধরুন। আমার কাছে এমন কিছু সহজে বহনযোগ্য যন্ত্র আছে যেগুলো স্টিলের ওপর ম্যাজিকের মতো কাজ করে উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় এক শতাংশে নিয়ে আসবে। দাম অর্ধেক কমিয়ে দেবার পরেও প্রচুর লাভ থাকবে আপনার। একটা ডেমনস্ট্রেশনের অনুমতি দিলে আমি হাতে-কলমে ব্যাপারটা দেখিয়ে দিতে পারতাম। এই শহরে কোনো ইস্পাত ঢালাই এর কারখানা আছে? বেশি সময় লাগবে না।

    সে-ব্যবস্থা করা যাবে, ট্রেডার ম্যালো। তবে আগামীকাল। আজ রাতে ডিনার করুন আমার এখানে?

    আমার লোকজন- ম্যালো ইতস্তত করে বললেন।

    সবাইকে নিয়েই চলে আসুন। দরাজ কণ্ঠ কমোডরের। বন্ধুত্বপূর্ণ এক প্রতীকী মিলন হবে তাতে করে আমাদের দুই জাতির। খোলামেলাভাবে আরো একবার আলোচনা করার সুযোগ পাওয়া যাবে। তবে একটা কথা, তাঁর মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। নান অভ ইওর রিলিজন। আপনাদের ঐ ধর্ম-টর্ম টেনে আনবেন না এর মধ্যে। ভাববেন না যে এসবের ফলে মিশনারিদের ঢোকার একটা পথ পাওয়া গেল।

    কমোডর, শুকনো কণ্ঠে ম্যালো বললেন, একটা ব্যাপারে আমি আপনাকে কথা দিতে পারি, ঐ ধর্ম এখানে টেনে আনলে আমার নিজেরই লোকসান। কারণ, তাতে আমার লভ্যাংশ কমে যাবে।

    সেক্ষেত্রে আর কোনো কথা নেই। আপনাকে শিপে পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করছি।

    .

    ছয়

    কমোডরার বয়স তাঁর স্বামীর বয়সের চেয়ে অনেক কম। তার পাণ্ডুর মুখে শীতল একটা অভিব্যক্তি। কালো চুল সুন্দর করে পেছন দিকে টেনে বাঁধা।

    আশা করি আমার মহান পতিদেবতার আলাপ শেষ হয়েছে। পুরোপুরি শেষ হয়েছে কি? এবার বোধ হয় আমি একটু বাগানে হাঁটতে যেতে পারি?

    এত নাটক করার দরকার নেই, লিসিয়া, মাই ডিয়ার, শান্তভাবে বললেন কমোডর। আজ রাতে ডিনার খেতে আসছে লোকটা। যত ইচ্ছে কথা বলতে পার তুমি তার সঙ্গে। আর সেসময় আমি যা বলব তা শুনে হয়ত বেশ খুশিই হবে তুমি। ওর সব লোকজন নিয়ে আসছে সে। নক্ষত্রের কৃপায় ওরা সংখ্যায় কম হলে বাঁচি।

    শুয়োরের মতো মহা পেটুক হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি ওদের। গাদা গাদা মাংস খাবে একেকজন আর মদ খাবে পিপে ধরে ধরে। যেটাকা খরচ হবে ওদের খাওয়াতে সেটা হিসেব করার পর দুই দিন ধরে মাথার চুল ছিঁড়বে তুমি।

    তা হয়ত ছিঁড়ব না। তবে সে যাই হোক, সব কিছুর ঢালাও বন্দোবস্ত থাকে যেন খাবার সময়।

    বটে! অবজ্ঞাভরা দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকালেন কমোডর লিসিয়া। বর্বরগুলোর সঙ্গে বেশ দহরম-মহরম দেখছি তোমার। এর জন্যেই বুঝি ঐ লোকটার সঙ্গে আলাপের সময় আমাকে থাকতে দাওনি? মনে হচ্ছে, আমার বাবার বিরুদ্ধে ঘৃণ্য কোনো ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছ তুমি মনে মনে।

    মোটেই না!

    হ্যাঁ, তোমার কথা বিশ্বাস করি আর কী! কূটনীতির স্বার্থে যদি কখনো কোনো মেয়েকে ধরে বেঁধে যেনতেন প্রকারে একটা বিয়ের নামে বলি দেয়া হয়ে থাকে তো সেই মেয়ে আমি ছাড়া আর কেউ না। আমার দেশের ঐ অকর্মা লোকগুলোর ভেতর থেকেই যোগ্য একজন বর অনায়াসে খুঁজে নিতে পারতাম আমি।

    তাহলে বলেই ফেলি কথাটা। নাচতে নাচতে ফিরে যেতে পার তুমি তোমার বাপের বাড়ি। তবে তার আগে, তোমার দেহের যেঅঙ্গটির সঙ্গে আমি সবচেয়ে বেশি পরিচিত, সেই জিভটা স্যুভেনির হিসেবে কেটে রাখব আমি প্রথমে। আর তারপর, সাবধানে মাথাটা এক পাশে কাত করলেন কমোডর, তোমার অপরূপসৌন্দর্য যাতে আরো চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে, সেজন্যে কান দুটো আর নাকের ডগাটুকু কেটে নেব।

    সে-সাহস কোনেদিন হবে না তোর, আঁদা নাক কুকুর কোথাকার! ধূমকেতুর ধুলোর মত গুঁড়োগুঁড়ো করে ফেলবেন তোকে বাবা! যদি আমি তাকে জানিয়ে দিই যে, এই বর্বরগুলোর সঙ্গে তুই সম্পর্ক গড়ে তুলেছিস তাহলে এমনিতেও তাই করবেন তিনি।

    হুম্‌-ম্‌। অত ভয় দেখাবার কিছু নেই। তুমি নিজেই আজ রাতে লোকটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখতে পার। তার আগ পর্যন্ত মুখে কুলুপ এঁটে থাক।

    তোমার হুকুম মতো?

    বেশ, তাহলে এটা নিয়ে চুপ করে থাক।

    ব্যাণ্ড এবং নেকলেস দুটো স্ত্রীর কোমর ও গলায় পরিয়ে দিলেন কমোড়র। তারপর নবটা ঠেলে দিয়ে পিছিয়ে এলেন।

    বিস্ময়ে শ্বাস বন্ধ হয়ে এল কমোডরার। আলতো করে নেকলেসটার গায়ে হাত বুলোলেন তিনি। হাঁ করে শ্বাস নিলেন একটা। পরম স্বস্তির সঙ্গে দুহাত ঘষলেন কমোডর। আজ রাতে এটা পরতে পার তুমি, বললেন তিনি। আরো এনে দেয়া হবে তোমাকে। এবার মুখে কুলুপ এঁটে থাক।

    কমোডরা মুখে কুলুপ এঁটে রইলেন।

    .

    সাত

    তোমার চোখ-মুখ এমন কুঁচকে আছে কেন? জেইম টুয়ার অস্থির কণ্ঠে শুধোলেন। কিছু একটা চিন্তা করছিলেন হোবার ম্যালো। টুয়ারের কথায় সম্বিৎ ফিরে পেলেন।

    চোখ-মুখ কুঁচকে আছে নাকি আমার? কই সেরকম তো কিছু হয়নি?

    গতকাল নিশ্চয়ই কিছু হয়েছে- আই মীন, রাতে খাওয়ার সময় না হোক, কিন্তু সকালে? গলায় একটা নিশ্চিতভাব এনে তিনি যোগ করলেন, ম্যালো, ঘাপলা হয়েছে কোননা, তাই না?

    ঘাপলা? না, তো! বরং তার উল্টো। সত্যি বলতে কী, আমার অবস্থা অনেকটা এরকম- গায়ের সমস্ত শক্তিতে একটা বন্ধ দরজার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আমি বোকার মত আবিষ্কার করেছি যে, দরজাটা আসলে ভেজান ছিল। স্টীল ফাউণ্ডিতে ঢোকার ব্যবস্থাটা খুব সহজেই হয়ে গেল বলে মনে হচ্ছে না?

    তুমি কি কোনো ফাঁদের আশংকা করছ?

    সেলডনের দিব্যি, নাটুকেপনা কোরোনা। ম্যালো তার অস্থিরতা প্রকাশ করলেন না। আলাপের সুরে যোগ করলেন, সহাজেই ঢোকার ব্যবস্থা হয়ে গেল মানে, ভেতরে দেখার কিছুই নেই।

    তুমি অ্যাটমিক পাওয়ারের কথা বলছ, তাই না? চিন্তিত শোনাল টুয়ারের কণ্ঠ। শোন, কোরেলে অ্যাটমিক পাওয়ার ইকনমির কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়নি। অ্যাটমিক পাওয়ারের মতো মৌলিক একটা টেকনোলজি সবকিছুর ওপর এমন একটা সুদূরবিস্তার প্রভাব ফেলে যে তার চিহ্ন লুকিয়ে ফেলা চাট্টিখানি কথা নয়।

    কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলে সেটা লুকান কোনো ব্যাপার নয়, টুয়ার বিশেষ করে সেই অ্যাটমিক পাওয়ার যদি যুদ্ধ অর্থনীতিতে প্রয়োগ করা হয়। সেক্ষেত্রে কেবল শিপইয়ার্ড আর স্টীল ফাউলিলাতেই তার ছাপ দেখতে পাবে তুমি।

    অর্থাৎ, আমরা যদি তা না পাই তাহলে-

    তাহলে বুঝতে হবে ওদের কাছে অ্যাটমিক পাওয়ার নেই- অথবা ওরা সেটা লুকিয়ে রেখেছে। এদুটোর কোনটা ঠিক তা বের করার জন্যে হলে তুমি টস্ করে দেখতে পার, অথবা অনুমান করেও একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে পার।

    টুয়ার মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন, এখন মনে হচ্ছে, গতকাল তোমার সঙ্গে থাকা উচিত ছিল আমার।

    ম্যালো শীতল কণ্ঠে বললেন, হ্যাঁ, ভালই হতো তাহলে। নৈতিক সমর্থনের ব্যাপারে আমার কোনো আপত্তি নেই। দুর্ভাগ্যবশত, মিটিং-এর শর্তগুলো কমোডরই আরোপ করেছিলেন, আমি নই। ওই যে, বাইরে রয়্যাল গ্রাউণ্ড কার এসে দাঁড়িয়েছে, আমাদের ফাউজিতে নিয়ে যাবার জন্যে। যন্ত্রগুলো নিয়েছ তো?

    সবগুলো।

    .

    আট

    কারখানাটা বিশাল। কিন্তু এতই জরাজীর্ণ যে, যেনতেন প্রকারের মেরামতিতে সেটার দৈন্যদশা ঢাকা পড়েনি। এ মুহূর্তে নির্জন এবং অস্বাভাবিক রকমের শান্ত কারখানাটিতে একটি বিরল ঘটনার মতো কমোডর সদলবলে আতিথ্যগ্রহণ করলেন।

    অনায়াস প্রচেষ্টায় ম্যালো নিজেই একটা স্টীল শীট স্থাপন করলেন দুটো সাপোর্টের ওপর। টুয়ারের বাড়িয়ে দেয়া যন্ত্রটা নিয়ে সীসার খাপে ঢাকা চামড়ার হাতলটা চেপে ধরলেন তিনি।

    যন্ত্রটা খুব বিপজ্জনক, বলে উঠলেন ম্যালো। কিন্তু বাজ স-ও কম বিপজ্জনক না। তবে এক্ষেত্রে শুধু খেয়াল রাখতে হবে যাতে আঙুলগুলো দূরে থাকে।

    কথার ফাঁকেই ইস্পাতের পাতটার দৈর্ঘ্য বরাবর যন্ত্রের মাজল-টিটা দিয়ে একটা টান দিলেন তিনি। অমনি দুভাগ হয়ে পড়ে গেল সেটা।

    একসঙ্গে লাফিয়ে উঠল সবাই। হেসে উঠলেন ম্যালো। কাটা শীটটার অর্ধাংশ হাতে তুলে নিলেন তিনি। হাঁটুর ওপর সেটা রেখে বললেন, ইচ্ছে করলে কাটিং লেংথ এক ইঞ্চির একশো ভাগের এক ভাগেও অ্যাডজাস্ট করা যাবে, আর তারপরেও একটা দুইঞ্চি লম্বা শীট ঠিক এভাবে একেবারে মাঝখান থেকে দুভাগ হয়ে যাবে। পুরুত্ব সঠিক জানা থাকলে আপনি শীটটা একটা কাঠের টেবিলের ওপর রেখেও কাজ করতে পারেন। দেখবেন, কাঠের ওপর বিন্দুমাত্র আঁচড় না ফেলে ধাতুর পাতটা দুফালি হয়ে গেছে।

    কথার সঙ্গে তাল রেখে তার হাতের অ্যাটমিক শিয়ারটা নড়ছে আর একটা একটা করে স্টীলের কাটা টুকরো ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে উড়ে যাচ্ছে।

    এ তো গেল স্টীল কাটার ব্যপার, শেষ টুকরোটা ছুঁড়ে ফেলে বললেন ম্যালো। শিয়ারটা ফেরত দিলেন। এবার দেখা যাক তলের ব্যাপারটা। কোনো শিটের পুরুত্ব কমাতে চান? অমসৃণ জায়গা মসৃণ করতে চান? নষ্ট অংশ চেঁছে ফেলতে চান? দেখুন।

    প্রথম পাতটার বাকি অর্ধেক থেকে প্রথমে ছইঞ্চি পরিমাণ পাতলা, স্বচ্ছ ধাতব পাত উঠে এল তারপর আট ইঞ্চি, তারপর বারো ইঞ্চি।

    কিংবা ছিদ্র করতে চান? সব একই ব্যাপার।

    সবাই গোল হয়ে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ম্যালোর চারদিকে। ম্যালো যেন জাদুকর। হাত সাফাইয়ের খেলা দেখাচ্ছেন। আসল উদ্দেশ্য কিছু একটা বিক্রি করা। স্টীলের টুকরোগুলো নেড়েচেড়ে দেখলেন কমোডর অ্যাসপার। সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা একজন আরেকজনের ঘাড়ের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। একজন আরেকজনের কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিস ফিস করছে।

    এদিকে ম্যালো তাঁর হাতের অ্যাটমিক ড্রিলের প্রতিটি স্পর্শে ইঞ্চিখানেক পুরু কঠিন ইস্পাতের গায়ে নিখুঁত, সুন্দর সুন্দর ছিদ্র করে চলেছেন।

    আর একটা জিনিস দেখার শুধু। ছোট মাপের দুটো পাইপ এনে দেবেন কেউ? অনারেবল চেম্বারলেইন গোছের একজন উত্তেজনার বশে বশংবদ ভূত্যের মতো ছুটে গেলেন। উপযুক্ত পাইপ বাছতে গিয়ে সাধারণ শ্রমিকের মতো হাতে ময়লা লাগাতেও কার্পণ্য করলেন না।

    পাইপ দুটোকে সোজা করে পাশাপাশি দাঁড় করালেন ম্যালো। তারপর শিয়ারটাকে মাত্র একবার ব্যবহার করে প্রান্ত দুটো হেঁটে নিলেন। এরপর সদ্য ছাঁটা অংশ দুটো এক করলেন।

    সঙ্গে সঙ্গে দুটো পাইপ একটা পাইপে পরিণত হল! জোড়া লাগানোর সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রান্ত দুটোর পারমাণবিক অমসৃণতাটুকু পর্যন্ত দূর হয়ে গিয়ে একটা নতুন পাইপে পরিণত হল।

    কিছু বলার জন্যে দর্শকবৃন্দের দিকে তাকালেন ম্যালো। প্রথম শব্দটা উচ্চারণ করেই থতমত খেয়ে থেমে যেতে হলো তাঁকে। উত্তেজনায় ধড়ফড় করতে লাগল বুক। পেটের ভেতর কেমন একটা ঠাণ্ডা আর শিরশিরে অনুভূতির সৃষ্টি হলো।

    ম্যালোর জাদু-প্রদর্শনীর বিশৃঙ্খল অবস্থার মধ্যে কমোডরের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের একজন ভিড় ঠেলে একেবারে সামনের কাতারে চলে এসেছে। এবং ম্যালো এই প্রথমবারের মতো ওদের অপরিচিত হ্যাঁণ্ড ওপেনগুলো খুব কাছে থেকে দেখার সুযোগ পেলেন।

    অস্ত্রগুলো অ্যাটমিক! কোনো ভুল নেই। এধরনের ব্যারেল কোনো এক্সপ্লোসিভ প্রোজেক্টাইল ওয়েপনে থাকা সম্ভব নয়। কিন্তু সেটা আসল কথা নয়। সেটা আসলে কোনো ব্যাপারই নয়। অস্ত্রগুলোর বাঁটে, জীর্ণ সোনার প্লেটিংয়ে মহাকাশযান এবং সূর্য খোদাই করা।

    সেই একই মহাকাশযান এবং সূর্য, যা ফাউণ্ডেশনের সেই অসমাপ্ত আদি বিশ্বকোষের প্রতিটি বিশাল খণ্ডে আঁকা আছে! সেই একই মহাকাশযান এবং সূর্য যা হাজার হাজার বছর ধরে গ্যালাকটিক এম্পায়ারের পতাকায় শোভা পেয়ে আসছে।

    মাথার ভেতর ঝড়ের গতিতে চিন্তা চলছে, এরই মধ্যে কথা বলে চলেছেন ম্যালো। পরীক্ষা করে দেখুন, পাইপটা অখণ্ড। নিখুঁত নয় অবশ্যি, জোড়া লাগাবার কাজটা হাত দিয়ে করা হয়েছে।

    আর কোনো ভোজভাজি দেখানোর প্রয়োজন পড়ল না। কাজ হাসিল হয়ে গেছে। ম্যালোর উদ্দেশ্য সফল। এখন তার মনে কেবল একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। একটাই ছবি তার চোখের সামনে খেলে বেড়াচ্ছে- রশ্মি বিচ্ছুরণত একটা উজ্জ্বল সোনালি গোলক আর তীর্যক একটা সিগার আকৃতির মহাকাশযান।

    এম্পায়ারের মহাকাশযান এবং সূর্য!

    এম্পায়ার! দেড়শো বছর পার হয়ে গেছে। অথচ এখনো গ্যালাক্সির দূর অভ্যন্তরে এম্পায়ারের অস্তিত্ব! সুদুর পেরিফেরিতে আবার বিকশিত হচ্ছে এম্পায়ার।

    ম্যালো মুচকি হাসলেন!

    .

    নয়

    ফার স্টার আবার মহাশূন্যে ভাসার ঠিক দুদিন পর হোবার ম্যালো তার ঘরে সিনিয়র লেফটেন্যান্ট ড্রটকে ডেকে পাঠিয়ে তার হাতে একটা খাম, মাইক্রোফিল্মের একটা রোল আর একটা গোলাকার বস্তু ধরিয়ে দিলেন।

    লেফটেন্যান্ট, আর ঘণ্টাখানেক পর থেকে, আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত, তুমি ফার স্টারের ভারপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। আমি না ফিরলেও তুমি শেষ পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাবে।

    ড্রট উঠে দাঁড়ানোর ভঙ্গি করতে কর্তৃত্বপূর্ণ ইঙ্গিতে তাকে বিরত করলেন ম্যালো।

    চুপ করে বসে শুনে যাও যা বলি। তোমাকে যে-গ্রহে যেতে হবে সেটার সঠিক লোকেশন আছে এই খামটার ভেতর। সেখানে তুমি দুমাস অপেক্ষা করবে আমার জন্যে। দুমাস পুরো হবার আগেই যদি ফাউণ্ডেশন তোমাকে লোকেট করে সেক্ষেত্রে মাইক্রোফিল্মটা তুমি আমার ট্রিপের রিপোর্ট হিসেবে জমা দেবে।

    অবশ্য যদি, তার গলা গম্ভীর হয়ে উঠল, দুমাস পরেও আমি না ফিরি আর ফাউণ্ডেশনের ভেসেলগুলো তোমাকে লোকেট না করে, সেক্ষেত্রে টার্মিনাসে চলে যাবে তুমি, আর টাইম ক্যাপসুলটা রিপোর্ট হিসেবে জমা দেবে। পরিষ্কার?

    জী, স্যার।

    কোনো অবস্থাতেই তুমি বা তোমার লোকজন আমার অফিশিয়াল রিপোর্ট অ্যামপ্লিফাই করতে পারবে না।

    আমাদের যদি কিছু জিগ্যেস করা হয়?

    সেক্ষেত্রে তোমরা কিছুই জান না।

    জ্বী, স্যার।

    মিনিট পনেরো পর ফার স্টারের পাশ থেকে একটা লাইফ-বোট বিচ্ছিন্ন হয়ে মহাকাশে ডানা মেলল।

    .

    দশ

    ওনাম বার এক বৃদ্ধ মানুষ, এতোটাই বৃদ্ধ যে কোনো ভয়ডর আর তাকে স্পর্শ করতে পারে না। শেষ যে-বার গণ্ডগোল হলো, তারপর থেকে গ্রহের এই প্রান্তসীমায় একাকী বাস করছেন তিনি। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে অল্প যে কটা বই রক্ষা করতে পেরেছিলেন, সেগুলোই তার একমাত্র সঙ্গী এখন। কোনো কিছুই হারাবার ভয় নেই তার। জীবনের এই শেষ অংশটুকু খোয়াবার ভয় তো আরো কম। সুতরাং নির্ভয়ে আগম্ভকের মুখোমুখি হলেন তিনি।

    দরজাটা খোলাই ছিল, আগন্তক ব্যাখ্যা করল।

    লোকটার বাচনভঙ্গি কর্কশ, কাটা কাটা। নিতম্বের কাছে অদ্ভুতদর্শন একটা র স্টিল-হ্যাণ্ড-ওয়েপন ঝুলছে, চোখ এড়াল না ওনাম বারের। ছোট্ট ঘরটার আবছা অন্ধকারে বার আরো লক্ষ্য করলেন, ফোর্স-শিন্ডের একটা আভা লোকটার দেহ ঘিরে আছে।

    ক্লান্ত স্বরে তিনি বললেন, ওটা বন্ধ রাখার তো কোনো কারণ নেই। তোমার জন্যে কী করতে পারি আমি? আমার কাছে কি কোনো প্রয়োজন আছে তোমার?

    হ্যাঁ, আছে। ঘরের একেবারে মধ্যেখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে আগন্তুক। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ দুদিকেই যথেষ্ট জায়গায় দখল করে আছে লোকটা। এদিকে আর কোনো বাড়ি-ঘর নজরে পড়ল না।

    এটা একটা নির্জন এলাকা। বার সায় দিলেন লোকটার কথায়। তবে পুবদিকে একটা শহর আছে। যদি ওদিকে যেতে চাও আমি পথ দেখিয়ে দিতে পারি।

    একটু পরে। তার আগে একটু বসতে পারি?

    চেয়ারগুলো তোমার ভার সইতে পারলে আমার কোনো আপত্তি নেই, গম্ভীর কণ্ঠে বললেন বৃদ্ধ। আমার মতো ওগুলোরও বয়স হয়েছে, তবে যৌবনে ভালই ছিল।

    আমার নাম হোবার ম্যালো, নিজের পরিচয় দিলেন আগন্তুক। অনেক দূরের এক প্রদেশ থেকে এসেছি আমি।

    ওপর-নিচে মাথা ঝাঁকিয়ে মৃদু হাসলেন বার। তোমার গলা শুনে অনেক আগেই সেটা বুঝতে পেরেছি। আমি সিওয়েনার ওনাম বার, এম্পায়ার-এর প্রাক্তন প্যাট্রিশন (অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত লোকঅনুবাদক)।

    এটাই তাহলে সিওয়েনা? কিছু পুরনো ম্যাপ ছাড়া গাইড বলতে কিছু নেই আমার কাছে।

    নক্ষত্রের অবস্থান পরিবর্তনের কারণে ওগুলো পুরনো হয়ে গেছে।

    একদম স্থির হয়ে বসে আছেন বার। ম্যালোর চোখ দুটো কেমন ভাবাচ্ছন্ন হয়ে পড়ল। বার লক্ষ্য করলেন, লোকটির দেহ ঘিরে থাকা অ্যাটমিক ফোর্স-শিল্ডটা উবে গেছে। বুঝলেন, লোকটা তাকে বিপজ্জনক বলে মনে করছে না।

    তিনি বললেন, আমি দরিদ্র মানুষ। বাড়িতে তেমন কিছু নেই। কালো রুটি আর ড্রায়েড কর্ন খেতে রুচি হলে আমরা ভাগাভাগি করে নিতে পারি।

    ম্যালো মাথা নাড়লেন।

    না, আমি খেয়ে এসেছি। তাছাড়া, বেশি সময় নেই আমার হাতে। সেন্টার অব গভর্নমেন্ট-এর পথনির্দেশ পেলেই খুশি হব আমি।

    তা দেয়া যাবে। কিন্তু তুমি গ্রহটির রাজধানীতে যেতে চাইছ, না ইম্পেরিয়াল সেক্টরে?

    ম্যালো চোখ কুঁচকে বললেন, দুটো কি একই নয়? এটা কি সিয়েনা নয়?

    ধীরে ধীরে মাথা আঁকালেন বৃদ্ধ। এটা সিওয়েনা-ই, তবে সিওয়েনা এখন আর নরম্যানিক সেক্টরের রাজধানী নেই। তোমার পুরনো ম্যাপ শেষ পর্যন্ত মিসলিড করেছে তোমাকে। নক্ষত্রগুলোতে কয়েক শতাব্দী ধরে হয়ত কোনো পরিবর্তন না-ও ঘটতে পারে, কিন্তু পলিটিকাল বাউণ্ডারি খুবই ক্ষণস্থায়ী।

    দ্যাটস টু ব্যাড। তা, রাজধানী কি খুব দূরে?

    ওরশা টু তে। বিশ পার্সেক দূরে। তোমার ম্যাপ দেখেই যেতে পারবে। কত পুরনো ওগুলো?

    তা, দেড়শো বছরের পুরনো তো হবেই।

    এত আগের? বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ইতিহাসের জল এর মধ্যে অনেক ঘোলা হয়ে গেছে। কোনো ধারণা আছে সে-সম্পর্কে?

    দু দিকে আস্তে করে মাথা নাড়লেন ম্যালো।

    তুমি ভাগ্যবান, মন্তব্য করলেন বার। এই দেড়শো বছরের অধিকাংশ সময় একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর দিয়ে অতিক্রম করেছে প্রদেশগুলো, ষষ্ঠ স্ট্যানেলের আমলটাই যা ব্যতিক্রম। কিন্তু তিনি মারা গেছেন আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে। তারপর থেকে শুধুই ধ্বংস আর বিদ্রোহ, বিদ্রোহ আর ধ্বংস।

    বারের একবার মনে হলো, তিনি বোধহয় বাঁচালতার পরিচয় দিচ্ছেন। খুবই নিঃসঙ্গ অবস্থায় জীবন কাটে তাঁর এখানে। কালেভদ্রে কথা বলার মানুষ পাওয়া যায়।

    ম্যালো হঠাৎ একটু বাড়তি আগ্রহের সঙ্গে বলে উঠলেন, ধ্বংস, তাই না? আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, প্রদেশগুলো সব নিঃস্ব হয়ে পড়েছিল।

    পুরোপুরি হয়ত নয়। কারণ, প্রথম সারির পঁচিশটা গ্রহের ফিজিকাল রিসোর্স শেষ হতেও তো সময় লাগে। তবে গত শতাব্দীতে যে পরিমাণ সম্পদ ছিল, সে তুলনায় আমরা অনেক নিচে নেমে গেছি এখন। আর এখন পর্যন্ত ওপরে ওঠার কোনো লক্ষণ দেখছি না। এদিকে তোমার এত আগ্রহ কেন, ইয়াং ম্যান? তোমার বয়স কম, চোখের জ্যোতিও কমেনি।

    প্রায় লাল হয়ে উঠলেন ম্যালো। বারের নিষ্প্রভ চোখ দুটো যেন তার ভেতর দেখে নিচ্ছে এবং দেখে, হাসছে।

    দেখুন, আমি একজন ট্রেডার। কিছু পুরনো ম্যাপ জোগাড় করে গ্যালাক্সির সীমান্ত অঞ্চলের দিকে এসেছি নতুন বাজার খোলার জন্যে। স্বাভাবিকভাবেই, নিঃস্ব প্রদেশের কথা শুনলে খুব একটা স্বস্তি বোধ করি না। যেখানে পয়সা নেই সেখানে তো লাভের আশা করা যায় না। তা, এই সিওয়েনার অবস্থা কেমন?

    সামনের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এলেন বৃদ্ধ। সে আমি বলতে পারব না। তবে এখনো হয়ত কিছু লাভের আশা রয়েছে এখানে। কিন্তু তুমি একজন ট্রেডার? তোমাকে তো দেখতে যোদ্ধার মতো লাগে। একটা হাত সারাক্ষণই গানটার কাছে পড়ে আছে তোমার। তাছাড়া চোয়ালের হাড়ে একটা দাগও দেখতে পাচ্ছি।

    ম্যালো মাথা ঝাঁকালেন। বলতে পারেন মগের মুল্লুক থেকে এসেছি আমি। আইন-কানুনের তেমন বালাই নেই সেখানে। মারামারি আর কাঁটা-ছেঁড়ার দাগ ওখানে ট্রেডারের উপরি পাওনা। কিন্তু মারামারি করে তখনি পোষায় যখন শেষ পর্যন্ত কিছু পয়সা পাওয়া যায়। এখানকার অবস্থা কেমন? মারমারি করে পোষাবে তো এখানে? মনে হচ্ছে, সে-সুযোগ এখানে প্রচুর।

    তা অবশ্যি, ঠিক, বার একমত হলেন। রেড স্টার্স-এ উইসকার্ড বাহিনীতে যোগ দিতে পার তুমি, যদিও সে-বাহিনীর আর খুব বেশি অবশিষ্ট নেই। তবে ওরা যেটা করে তুমি সেটাকে মারামারি বলবে, না ডাকাতি, বলতে পারি না। অথবা ইচ্ছে করলে তুমি আমাদের সদাশয় ভাইসরয়ের দলেও যোগ দিতে পার। তিনি তাঁর এই উপাধি অর্জন করেছেন খুন-খারাবি, লুটতরাজ আর ন্যায্য কারণে নিহত হওয়া এক বালক ম্রাটের প্রতিশ্রুতর বদৌলতে। সম্ভ্রান্ত বংশীয় বৃদ্ধের রুগ্ন গাল দুটো লাল হয়ে উঠল। চোখ দুটো বন্ধ হয়ে এল। পাখির চোখের মতো উজ্জ্বল হয়ে একটু পরই খুলে গেল আবার।

    প্যাট্রিশন বার, ম্যালো মন্তব্য করলেন, মনে হচ্ছে ভাইসরয় লোকটাকে আপনি তেমন পছন্দ করেন না। আমাকে যে এসব বলছেন, আমি যদি তার স্পাই হই?

    হলেই কী? তিক্ত কণ্ঠে বললেন বার। কী নেবে তুমি আমার? কৃশ হাতের ইঙ্গিতে তিনি তার জরাজীর্ণ গৃহের ফাঁকা অন্তঃপুরটা দেখালেন।

    আপনার প্রাণ।

    ওটা এমনিতেই বেরিয়ে যাবে, আর খুব শিগগিরই। পাঁচ বছর আগেই ওটার মেয়াদ ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু তুমি ভাইসরয়ের লোক নও। যদি হতে, তাহলে হয়ত এই বয়সেও আত্মরক্ষার সহজাত প্রবৃত্তি বশেই চুপ থাকতাম আমি।

    কী করে বুঝলেন, আমি ভাইসরয়ের লোক নই?

    হেসে উঠলেন বৃদ্ধ।

    মনে হচ্ছে তুমি আমাকে সন্দেহ করছ। বাজি ধরে বলতে পারি, তুমি ভাবছ আমি তোমাকে সরকারবিরোধী কথা বলতে প্রলুব্ধ করে ফাঁদে ফেলতে চাইছি। না, না, তোমার সন্দেহ অমূলক, রাজনীতির অনেক ঊর্ধ্বে চলে গেছি আমি।

    রাজনীতির ঊর্ধ্বে চলে গেছেন? কেউ কি তা যেতে পারে? ভাইসরয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে আপনি যে শব্দগুলো ব্যবহার করলেন- খুন-খারাবি, লুটতরাজ- এগুলো কী? আপনার কথায় নিরপেক্ষতার সুর ছিল না মোটেই। রাজনীতির ঊর্ধ্বে চলে গেলে কিন্তু তা থাকত।

    বৃদ্ধ শ্রাগ করলেন। মাঝে মাঝে স্মৃতি এসে হুল ফুটিয়ে যায়। ঠিক আছে, আগে আমার কথা শোন, তারপর নিজেই বিচার করে দেখ। সিওয়েনা যখন প্রাদেশিক রাজধানী, আমি তখন প্যাট্রিশন আর প্রাদেশিক সিনেটের সদস্য। আমার বংশ খুবই প্রাচীন ও সম্ভ্রান্ত। আমার প্রপিতামহদের একজন- না, বাদ দাও সেকথা। অতীত গৌরবের স্মৃতি রোমন্থন করে কোনো লাভ নেই।

    আমি ধরে নিচ্ছি, ম্যালো বললেন, আপনি কোনো গৃহযুদ্ধ বা বিপ্লবের কথা বলতে চাইছিলেন।

    বারের মুখ কালো হয়ে গেল! সেই অবক্ষয়ের দিনগুলোতে গৃহযুদ্ধ ছিল খুবই মামুলি ব্যাপার। কিন্তু সিওয়েনা নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল এসব থেকে। ষষ্ঠ স্ট্যানেলের আমলে সিওয়েনা তার অতীত গৌরবের অনেকটাই পুনরুদ্ধার করে। কিন্তু তারপর এল যতসব অযোগ্য আর দুর্বল সম্রাটের দল। আর দুর্বল সম্রাট মানেই শক্তিশালী ভাইসরয়। আর আমাদের লাস্ট ভাইসরয় তো ইম্পেরিয়াল পার্পল বাগাবার স্বপ্ন দেখতে লাগল। রেড স্টার্স-এর ব্যবসা-বাণিজ্যে উইসকার্ড নামের যে লোক এখনো প্রায়ই লুটতরাজ চালায়, আমাদের ভাইসরয় ছিল সে-ই। তো, এম্পায়ারের সিংহাসনের দিকে, আই মীন, ইম্পেরিয়াল পার্পলের দিকে যে উইসকার্ডই প্রথম নজর দিল তা নয়, তার আগেও অনেকে দিয়েছে। আবার, তার লক্ষ্য যদি পূরণ হতো সেক্ষেত্রেও একাজে সাফল্য অর্জনকারী ব্যক্তিদের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করার সৌভাগ্য তার হতো না। কারণ, তার আগেও বেশ কয়েকজন ও-কাজে সফল হয়েছে।

    সে যাই হোক, সে ব্যর্থ হলো। তার কারণ, সম্রাটের অ্যাডমিরাল যখন ফ্লিট নিয়ে প্রদেশের দিকে এগুলেন, খোদ সিয়েনা-ই তার বিদ্রোহী ভাইসরয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল। হঠাৎ থেমে গেলেন বৃদ্ধ। বিষাদের ছায়া নেমে এল তাঁর চেহারায়।

    ম্যালো আবিষ্কার করলেন, চাপা উত্তেজনায় তিনি চেয়ারের প্রান্তের দিকে এগিয়ে শিরদাঁড়া টানটান করে বসে আছেন। ধীরে ধীরে শরীর ঢিল করে দিলেন তিনি। দয়া করে বলে যান।

    এই বুড়োর কথা শুনতে চাইছ, সেজন্য ধন্যবাদ, ক্লান্ত কণ্ঠে বার বললেন। কী যেন বলছিলাম? ও হ্যাঁ, ওরা বিদ্রোহ করল। না, বলা উচিত, আমরা বিদ্রোহ করলাম। কারণ, আমি নিজেও পেছন সারির একজন নেতা ছিলাম তখন। উইসকার্ড সিওয়েনা থেকে পালিয়ে গেল। একটুর জন্যে তাকে ধরতে পারলাম না আমরা। আর এদিকে ম্রাটের অতি বাধ্যগত প্ল্যানেটটা তার প্রদেশসহ অ্যাডমিরালের করায়ত্ত হলো। কেন আমরা কাজটা করেছিলাম, বলতে পারব না ঠিক করে। নিষ্ঠুর ও ঘৃণ্য ম্রাটের প্রতি না হলেও হয়ত তার প্রতাঁকের প্রতি একটা আনুগত্য অনুভব করেছিলাম আমরা। কিংবা হয়ত অবরোধের ভয়ংকর পরিণতির কথা ভেবে ভয় পেয়েছিলাম সবাই। কে জানে!

    তারপর? ম্যালো শান্ত কণ্ঠে জানতে চাইলেন।

    ব্যাপারটা পছন্দ হলো না অ্যাডমিরালের, গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিলেন বার। সে আসলে চেয়েছিল একটা বিদ্রোহী প্রদেশ জয় করার গৌরব অর্জন করতে; আর তার সৈন্যরা চেয়েছিল লুটতরাজ করতে, এধরনের বিজয়ের পর যেটা স্বাভাবিক আর কী। তাই লোকজন যখন সবাই প্রতিটি বড় বড় শহরে জমায়েত হয়ে সম্রাট আর তার অ্যাডমিরালের নামে জয়ধ্বনি করছে, সে তখন সব কটা আর্মড সেন্টার দখল করে নিল। হুকুম দিল, অ্যাটম ব্লাস্ট দেগে লোকজনকে উড়িয়ে দেবার।

    কোন অজুহাতে?

    এই খোঁড়া অজুহাতে যে, তারা সম্রাটের প্রতিনিধি ভাইসরয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে তাকে দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। গোটা এক মাস ধরে ম্যাসাকার, লুটতরাজ আর নির্জলা আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করে নতুন ভাইসরয় হয়ে বসল সেই অ্যাডমিরাল। ছটা ছেলে ছিল আমার। বিভিন্নভাবে মারা গেল পাঁচজন। একটা মেয়েও ছিল আমার। আশা করি সে-ও শেষ পর্যন্ত মারা গেছে। আমি পার পেলাম তার কারণ আমি বুড়ো। চলে এলাম এখানে। তার কারণ ভাইসরয়ের বিরুদ্ধে কিছু করার ক্ষমতা আর নেই তখন আমার। বৃদ্ধ তার পাকা চুলে ভরা মাথাটা নিচু করলেন। ওরা আমার কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি। কারণ, আমি এক বিদ্রোহী গভর্নরকে তাড়াতে সাহায্য করেছি। একজন অ্যাডমিরালকে বঞ্চিত করেছি তার বিজয়-গৌরব থেকে।

    চুপচাপ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন ম্যালো। তারপর নরম সহানুভূতি মাথা গলায় শুধোলেন, আপনার ষষ্ঠ ছেলের কী হলো?

    হু? বার তিক্তভাবে হাসলেন। সে নিরাপদেই আছে। ছদ্মনামে, একজন সাধারণ সৈনিক হিসেবে অ্যাডমিরালের বাহিনীতে যোগ দিয়েছে সে। ভাইসরয়ের পার্সোনাল ফ্লিটের একজন গানার সে এখন। না, না, যা ভাবছ তা নয়। ছেলে আমার কুলাঙ্গার নয়। মাঝে মধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করে যায় সে। যখন যা, সম্ভব, দিয়ে যায়। ও-ই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একদিন আমাদের মহান আর প্রতাপশালী ভাইসরয় মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করবে, আর তখন দেখা যাবে তার ঘাতক আর কেউ নয়, আমার সেই ছেলে!

    আর আপনি এসব কথা একজন অপরিচিত লোকের কাছে ফাঁস করে দিচ্ছেন? আপনি তো আপনার ছেলের বিপদ ডেকে আনছেন!

    না। ভাইসরয়ের একজন নতুন শত্রু সৃষ্টি করে আমি আমার ছেলেকে সাহায্য করছি। ভাইসরয়ের শক্ত না হয়ে আমি তার বন্ধু হলে, তাকে আমি শিপ দিয়ে আউটার স্পেস একেবারে গ্যালাক্সির প্রান্ত পর্যন্ত ঘিরে ফেলার পরামর্শ দিতাম।

    ওখানে কোনো শিপ নেই?

    দেখেছ একটাও? কোনো স্পেস গার্ড তোমাকে ঢুকতে বাধা দিয়েছে? একে তো শিপের সংখ্যা কম, তার ওপর সীমান্ত প্রদেশগুলোয় যে অরাজকতা আর নৈরাজ্য চলছে তাতে ঐ বর্বর আউটার সানগুলো পাহারা দেবার জন্যে কোনো শিপ মোতায়েন করা সম্ভব নয়। অবশ্যি তুমি আসার আগ পর্যন্ত গ্যালাক্সির খণ্ডিত প্রান্ত থেকে অন্য কোনো বিপদের আবির্ভাব হয়নি এখানে।

    আমি? না, আমি কোনো বিপদ সৃষ্টি করছি না।

    তোমার পিছু পিছু আরো অনেকেই এসে হাজির হবে।

    ধীরে ধীরে মাথা নাড়লেন ম্যালোলা। ঠিক বুঝলাম না আপনার কথা।

    শোন! তীক্ষ্ণ, উত্তেজিত কণ্ঠে বৃদ্ধ ওনাম বার বলে উঠলেন, তুমি এ-ঘরে ঢোকামাত্র আমি চিনেছি তোমাকে। তোমার দেহের চারপাশে একটা ফোর্স-শিল্ড আছে। বলা ভাল ছিল, যখন তোমাকে দেখি।

    দ্বিধাপূর্ণ নীরবতা, তারপর ম্যালোর কণ্ঠে শোনা গেল, হ্যাঁ, ছিল।

    গুড। ওটা একটা ক্রটি। কিন্তু তুমি সেটা জানতে না। কিছু ব্যাপার আছে যা আমি জানি। এই অবক্ষয়ের সময় সৈনিক হওয়াটা খুব বেমানান। ঘটনাগুলো ঘটে খুব দ্রুত আর অ্যাটম ব্লাস্ট হাতে যে এই স্রোতের মোকাবিলা করতে পারে না সে ভেসে যায়। যেমন আমি গিয়েছিলাম। কিন্তু আমি একজন স্কলারও ছিলাম, আমি জানি, অ্যাটমিকস-এর ইতিহাসে কখনো কোনো বহনযোগ্য ফোর্স-শিল্ড তৈরি হয়নি। ফোর্স-শিল্ড আমাদেরও আছে। বিশাল জগদ্দল সেই পাওয়ার হাউসগুলো একটা শহর, এমন কী একটা শিপও হয়ত রক্ষা করতে পারবে, বাট নট ওয়ান সিঙ্গল ম্যান।

    তাই বুঝি? তা এ থেকে কী বুঝলেন আপনি?

    স্পেস জুড়ে বিস্তর গল্প-কাহিনী ছড়িয়ে আছে। রানীর কাক প্রসব করার গল্পের মতো প্রতি পার্সেক অন্তর সেই গল্পগুলোর বিকৃতি ঘটতে থাকে। তবে আমার যুবক বয়সে একবার অদ্ভুত কিছু লোজনসহ ছোট্ট একটা শিপ নেমেছিল সিয়েনায়। তারা আমাদের রীতিনীতি কিছুই জানত না। কোত্থেকে এসেছে সেটাও তারা বলেনি। ওরা আমাদেরকে গ্যালাক্সির প্রান্তে বাস করা জাদুকরদের গল্প শুনিয়েছিল। সেই জাদুকররা নাকি অন্ধকারে জ্বলজ্বল করে, কোনো কিছুর সাহায্য ছাড়াই শূন্যে উড়ে বেড়ায়। অস্ত্র তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারে না।

    আমরা হেসেই উড়িয়ে দিয়েছি সেসব আষাঢ়ে গল্প। আমি নিজেও হেসেছি ওসব শুনে। ভুলেই গিয়েছিলাম আমি ওগুলোর কথা। আজ আবার মনে পড়ল হঠাৎ করে। অন্ধকারে তোমার দেহ জ্বলজ্বল করে। আমার কাছে যদিও কোনো ব্লাস্টার নেই, কিন্তু যদি থাকত, মনে হচ্ছে সেটা কোনো আঁচড় কাটতে পারত না তোমার গায়ে। এই বসা অবস্থা থেকে তুমি বাতাসে ভেসে বেড়াতে পারবে হঠাৎ করে?

    ম্যালো শান্ত কণ্ঠে বললেন, আমি আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।

    মৃদু হাসলেন বার। তোমার এই উত্তরেই সন্তুষ্ট আমি। অতিথিদের যাচাই করে দেখা আমার স্বভাব নয়। কিন্তু জাদুকররা যদি সত্যিই থেকে থাকে আর তুমি যদি তাদের একজন হও, তাহলে বোধহয় নতুন রক্ত প্রয়োজন। শেষের দিকে তার গলা প্রায় শোনাই গেল না, আপনমনে ধীরে ধীরে বিড়বিড় করে যাচ্ছেন তিনি। অবশ্য এর একটা বিপরীত প্রতিক্রিয়াও আছে। উইসকার্ডের মতো আমাদের নতুন ভাইসরয়ও স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

    সম্রাটের মুকুটের স্বপ্ন?

    বার মাথা ঝাঁকালেন। এরকম কিছু কথা কানে এসেছে আমার ছেলের। ভাইসরয়ের ব্যক্তিগত সহচরদের সঙ্গে ওঠাবসা করলে এসব কথা কানে আসতে বাধ্য। ও আবার এসে বলে সেসব আমাকে। সুযোগ পেলে আমাদের নতুন ভাইসরয় হয়ত রাজ মুকুটটা মাথায় পরবে, কিন্তু তার আগে পালাবার পথটা সে ঠিকই তৈরি করে রেখেছে। এমনও গুজব শোনা যাচ্ছে, ইম্পেরিয়াল শ্রেষ্ঠত্ব ক্ষুণ্ণ করে বর্বর কোনো পশ্চাদভূমিতে সে একটা নতুন এম্পায়ার সৃষ্টি করবে। শোনা যায়, সত্যি-মিথ্যা বলতে পারব না, ইতিমধ্যে সে তার এক মেয়েকে পেরিফেরির মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না এমন অখ্যাত রাজ্যের খুদে রাজার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছে।

    এভাবে সব গুজবে কান দিলে তো—

    জানি। তবে এরকম আরো গুজব আছে। বুড়ো হয়ে গেছিতো, তাই হয়ত আবোল-তাবোল বকছি। কিন্তু তুমি কী বলো? বৃদ্ধের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ম্যালোকে যেন এফেঁড়-ওফোঁড় করে দিয়ে গেল।

    একটু ভেবে নিলেন ম্যালো। তারপর বললেন, আমি কিছুই বলছি না। বরং কয়েকটা প্রশ্ন জিগ্যেস করতে চাই। সিওয়েনার হাতে অ্যাটমিক পাওয়ার আছে? দাঁড়ান, আমি জানি অ্যাটমিক সংক্রান্ত জ্ঞান সিওয়েনার আছে, কিন্তু আমি জানতে চাইছি, তাদের পাওয়ার জেনারেশনগুলো অক্ষত অবস্থায় আছে কি না। নাকি। সাম্প্রতিক ধ্বংসযজ্ঞে সেগুলোর বারোটা বেজে গেছে?

    বারোটা বাজার কথা বলছ? আরে না, সবচেয়ে ছোট পাওয়ার স্টেশনের গায়ে একটা আঁচড় পড়ার আগে গ্রহটার অর্ধেকই উড়ে যাবে। ওগুলো যাকে বলে, ইররিপ্লেসেবল। ফ্লিটের শক্তি যোগায় তো ওগুলোই। প্রায় গর্বের সুর ফুটে উঠল বারের কণ্ঠে, উই হ্যাভ দ্য লার্জেস্ট অ্যাণ্ড বেস্ট অন দিস সাইড অভ ট্রানটর ইটসে।

    তাহলে, আমি যদি এই জেনারেটরগুলো দেখতে চাই, প্রথমে কী করতে হবে আমাকে?

    কিছুই করতে হবে না, দৃঢ়কণ্ঠে বললেন বার। কোনো মিলিটারি সেন্টারে ঢোকার চেষ্টা করামাত্র গুলি করে মেরে ফেলা হবে তোমাকে। শুধু তোমাকেই না, যে চেষ্টা করবে তাকেই। সিওয়েনাবাসী এখনো নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।

    আপনি বলতে চান, সব কটা পাওয়ার স্টেশন সামরিক বাহিনীর দখলে?

    না। ছোট ছোট কিছু সিটি স্টেশন আছে যেগুলো ওরা ছোয়নি। বাড়িঘরে হিটিং আর লাইটিং পাওয়ার যোগায় সেগুলো। যানবাহনের পাওয়ারও। রীতিমত হাঁড়ির হাল ওই স্টেশনগুলোর। টেক-ম্যানদের নিয়ন্ত্রণে আছে সেগুলো।

    এরা কারা?

    পাওয়ার প্ল্যান্টের তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত একটা বিশেষ দল। দলের সবাই উত্তরাধিকার সুত্রে ঐ দায়িত্ব পায়। শিক্ষনবীশ হিসেবে ছোটদের ঐ পেশাতেই দীক্ষিত করে তোলা হয়। শেখানো হয় কঠোর কর্তব্যপরায়ণতা, আত্মসম্মানবোধ, এই সব। টেক-ম্যান ছাড়া কেউ স্টেশনের ভেতর যেতে পারে না।

    বটে!

    অবশ্যি, বার যোগ করলেন, টেক-ম্যানদের ঘুষ খাবার ঘটনা যে দু-একটা ঘটে না, তা নয়। তবে গত পঞ্চাশ বছরে আসা ন জন সম্রাটের মধ্যে যদি সাতজনই আততায়ীর হাতে নিহত হয়, প্রত্যেক স্পেস-ক্যাপ্টেনই যদি ভাইসরয়শিপ দখল করতে চায়, আর ভাইসরয় চায় ইম্পেরিয়াল দখল করতে, সেক্ষেত্রে একজন টেক-ম্যানকে যে টাকা দিয়ে বশ করা গেলেও যেতে পারে তাতে আর আশ্চর্য কী! কিন্তু টাকার অঙ্কটা বিরাট হতে হবে। আমার কাছে অবশ্যি ফুটো পয়সাও নেই। তোমার আছে নাকি?

    টাকা? না। তবে টাকা দিয়েই যে সবসময় ঘুষ দিতে হবে তার কি কোনো মানে আছে?

    টাকা দিয়ে যখন সবকিছুই কেনা যায় তখন তার চেয়ে দামি আর কী আছে?

    অনেক কিছুই টাকা দিয়ে কেনা যায় না। সে যাই হোক, এবার যদি আপনি অনুগ্রহ করে পাওয়ার স্টেশন আছে সবচেয়ে কাছের এমন একটা শহরের পথ বলে দেন তাহলে খুব উপকৃত হব।

    দাঁড়াও। হাত উঠিয়ে বাধা দিলেন বার। ছুটছ কোথায়? তুমি এখানে এসেছ, কিন্তু আমি তোমাকে কোনো প্রশ্ন করিনি। এশহরের বাসিন্দাদের এখনো বিদ্রোহী বলে গণ্য করা হয়। এখানে তোমার গলা শোনামাত্র, তোমার পোশাক চোখে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রথম রক্ষী-ই চ্যালেঞ্জ করে বসবে তোমাকে।

    উঠে দাঁড়ালেন তিনি। পুরনো একটা বাক্সের অন্ধকার এক কোনা থেকে একটা বুকলেট বের করলেন তিনি। আমার পাসপোর্ট। জাল। এটার সাহায্যেই পালিয়েছিলাম আমি।

    ম্যালোর হাতের ওপর রাখলেন তিনি পাসপোর্টটা। তারপর তরুণ ট্রেডারের আঙুলগুলো ভাঁজ করে দিলেন সেটার ওপর। বর্ণনায় অমিল আছে ঠিকই, কিন্তু তুমি যদি ঘাবড়ে না গিয়ে, বুক ফুলিয়ে পাসপোর্টটা দেখাতে পার সেক্ষেত্রে খুব একটা খুঁটিয়ে না দেখেই ছেড়ে দেবে তোমাকে ওরা। সে সম্ভাবনাই প্রচুর।

    কিন্তু আপনি? আপনার কাছে তো কোনো পাসপোর্ট রইল না?

    নির্বাসিত বৃদ্ধ উদাসীন ভঙ্গিতে শ্রাগ করলেন। তাতে কী? ও, আরেকটা ব্যাপারে সাবধান করে দিচ্ছি তোমাকে। মুখ বন্ধ করে রাখবে। তোমার উচ্চারণ একেবারে চড়ালের মতো। তুমি যে বাগধারা ব্যবহার কর সেগুলো অদ্ভুত। তাছাড়া তোমার কথার মধ্যে আশ্চর্য সব সেকেলে শব্দের ছড়াছড়ি। যত কম কথা বলবে, তত কম সন্দেহ করবে ওরা তোমাকে। এখন শোন, কীভাবে শহরটাতে যেতে হবে।

    মিনিট পাঁচেক পর বিদায় নিলেন ম্যালো।

    তবে চিরতরে বিদায় নেবার আগে আর মাত্র একবার এক মুহূর্তের জন্য বৃদ্ধ ওনাম বারের বাড়িতে ফিরে এসেছিলেন তিনি।

    পরদিন খুব ভোরে ওনাম বার তাঁর ছোট্ট বাগানে ঢুকে দেখলেন, একটা বাক্স পড়ে রয়েছে তার সামনে। খুলে দেখলেন, সেটার ভেতর কিছু খাবার রয়েছে। এধরনের খাবার সাধারণত মহাকাশযানের লোকেরা খায়। খাবারটার স্বাদ এবং প্রস্তুতপ্রণালী দুটোই ভিনদেশী।

    তবে খাবারটা ভাল। টাটকা রইল অনেকক্ষণ।

    .

    এগার

    টেক-ম্যান লোকটা ছোটখাটো। বেশ গোলগাল, নাদুস-নুদুস চেহারা। গায়ের চামড়ায় বেশ একটা চকচকে ভাব। টাক মাথার চারদিকে ঝালরের মতো চুল। টাক জুড়ে গোলাপি আভা। আঙুলের আংটিগুলো মোটা এবং ভারি। জামা-কাপড়ে সুগন্ধীমাখা। ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছে না, এমন একটা লোক এ-গ্রহে এই প্রথম চোখে পড়ল ম্যালোর।

    বিরক্তিসূচক ভঙ্গিতে ঠোঁট জোড়া সংকুচিত হয়ে গেল টেক-ম্যানের। জলদি কর, ব্যাটা, হাতে ম্যালা জরুরি কাজ আছে আমার। তোকে বিদেশী মনে হচ্ছে

    ম্যালোর নিখাদ বিদেশী পোশাক-আশাকের দিকে সন্দেহভরা চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইল সে।

    আমি প্রতিবেশী রাজ্যের কেউ নই, শান্ত কণ্ঠে জানালেন ম্যালো। কিন্তু সেটা নেহাতই অপ্রাসঙ্গিক ব্যাপার। গতকাল আপনাকে ছোট্ট একটা উপহার পাঠিয়েছিলাম

    টেক-ম্যানের নাকটা সামান্য উঁচু হলো। পেয়েছি। মজার খেলনা একটা। মাঝে মাঝে জিনিসটা ব্যবহার করা যাবে।

    আমার কাছে আরো মজার মজার উপহার আছে। ঐ খেলনাটা থেকে একেবারেই ভিন্ন ধরনের সেগুলো।

    বটে-এ-এ, শব্দের শেষাংশটা একটু টেনে উচ্চারণ করল সে। সাক্ষাৎকারটা কোন দিকে গড়াবে সেটা চোখ বুজে বলে দিতে পারি আমি। এর আগেও এ-রকম ব্যাপার ঘটেছে। তুই আমাকে তুচ্ছ দু-একটা জিনিস দিবি, হয় কয়েকটা ক্রেডিট, নয় একটা ক্লোক অথবা দ্বিতীয় শ্রেণীর জুয়েলারি- এমন কিছু, যা দিয়ে একজন টেক-ম্যানকে হাত করা যাবে বলে তোর মতো ইতরের ধারণা! যুদ্ধংদেহী ভঙ্গিতে নিচের ঠোঁটটা ফুলে উঠল তার। ওগুলোর বদলে তুই কী চাস, তা-ও জানি আমি। অনেক উর্বর মস্তিষ্কেই এ-ধরনের অসাধারণ আইডিয়া গজিয়েছে। তুই আমাদের দলে ঢুকতে চাস। অ্যাটমিক-এর রহস্য জানতে চাস তুই- জানতে চাস, কী করে মেশিনগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়।

    যেহেতু তোরা- এই সিওয়েনার কুত্তারা তোদর বিদ্রোহের জন্যে নিত্যদিন শাস্তি পাচ্ছিস, তাই সারাক্ষণই তোরা ফন্দি আঁটিস কী করে কোনোরকমে টেক ম্যান সংঘে ঢুকে পড়া যায়। কারণ তাহলে তোরা তোদের প্রাপ্য শাস্তি এড়াতে পারবি। আমার তো মনে হচ্ছে তুই গা বাঁচাবার জন্যেই বিদেশী সেজেছিস।

    ম্যালো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ টেক-ম্যানের গলার পর্দা চড়ে গিয়ে সেটা গর্জনে পরিণত হলো। ভালো চাস তো শহরের প্রোটেক্টরের কাছে তোর নাম রিপোর্ট করার আগে জলদি ভাগ এখান থেকে। তুই কি ভাবিস, আমি নিমকহারামী করব? আমার আগে যেসব সিওয়েনিজ বেঈমানরা ছিল, তারা করতে পারে, কিন্তু তোর সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে সে অন্য ধাতুতে গড়া। তোকে যে কেন দু হাতে গলা টিপে মারিনি এখনো, গ্যালাক্সি মালুম।

    মনে মনে হাসলেন ম্যালো। সুর এবং সার, টেক-ম্যানের গালভরা বক্তৃতাটা দু দিক দেয়েই ফাঁপা। ফলে, এমন সুললিত অলংকারপূর্ণ গালিগালাজটা একটা প্রহসনে পরিণত হলো।

    টেক-ম্যানের তুলতুলে হাত দুটোর দিকে কৌতুকভরা দৃষ্টিতে তাকালেন ম্যালো। ঐ দুর্বল দুটো হাত দিয়ে লোকটা তাঁকে হত্যা করতে চায়, কথাটা ভাবতেই হাসি পেল তার। লোকটার ঢালাও তুই-তোকারিতে মাথা গরম না করে তিনি ছদ্ম সমীহের সুরে বললেন, ইওর উসডম, আপনি তিনটি ভুল করেছেন। এক, আমি ভাইসরয়ের হয়ে আপনার বিশ্বস্ততা পরীক্ষা করতে আসিনি। দুই, উপহার হিসেবে আমি যা দিতে চাই তা এমনই এক বস্তু যা খোদ সম্রাটের কাছেও নেই, থাকবেও না কখনন, তা তিনি যতই সমৃদ্ধশালী হোন না কেন। তিন, বিনিময়ে আমি যা চাই তা খুবই ছোট্ট, কিছুই না বলতে গেলে; স্রেফ বাতাস।

    বটে তীব্র ব্যঙ্গ ঝরে পড়ল টেক-ম্যানের কণ্ঠ থেকে। তা, তোর ঐশ্বরিক শক্তি আমাকে কী এমন রাজকীয় উপহার দিতে চায় শুনি? খোদ সম্রাটেরও সে জিনিস নেই, তাই না? কর্কশ উপহাসে লোকটার গলা বিকৃত হয়ে গেল।

    উঠে দাঁড়িয়ে চেয়ারটা পাশে ঠেলে দিলেন ম্যালো। আপনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে আমি তিনদিন অপেক্ষা, করেছি, ইওর উইসডম। কিন্তু এই ডিসপ্লেটা মাত্র তিন সেকেণ্ড সময় নেবে। আপনার হাতের একেবারে কাছে আমি যে ব্লাস্টারের বাটটা দেখতে পাচ্ছি সেটা দয়া করে বের করুন।

    অ্যাঁ?

    এবং তারপর আমাকে গুলি করুন। আমি খুবই বাধিত হব।

    কী?

    আমি মারা গেলে আপনি না হয় পুলিশের কাছে বলবেন, আমি আপনাকে সংঘের গোপন তথ্য জানানোর জন্যে ঘুষ দিতে চেয়েছি। তাতে প্রচুর প্রশংসা পাবেন আপনি। আর যদি মারা না যাই সেক্ষেত্রে আপনি আমার শিল্ডটা পেতে পারেন।

    এই প্রথম টেক-ম্যান খেয়াল করল, বিদেশী লোকটার দেহের চারপাশে হালকা সাদা একটা দ্যুতি রয়েছে। মনে হচ্ছে মুক্তোর গুঁড়োর মধ্যে চুবিয়ে আনা হয়েছে তাকে।

    টেক-ম্যানের ব্লাস্টারটা ম্যালোর বুক বরাবর উঠে এল। দুচোখ ভরা বিস্ময় আর সন্দেহ নিয়ে কন্ট্যাক্ট ক্লোজ করল সে।

    পারমাণবিক বিস্ফোরণের আকস্মিক অভিঘাতে বায়ু কণাগুলো উজ্জ্বল, জ্বলন্ত আয়নে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, চোখ-ধাঁধান একটা সরু রেখা সৃষ্টি করে আঘাত করল ম্যালোর হৃৎপিণ্ড বরাবরু- তারপর ছিটকে গেল।

    ম্যালোর মুখে কোনো ভাবান্তর নেই। প্রচণ্ড বেগে ধেয়ে আসা পারমাণবিক শক্তি সেই মুক্তোর মতো দ্যুতি ছড়ান ক্ষীণ আভার গায়ে পুরোপুরি প্রতিহত হয়ে সশব্দে শূন্যে মিলিয়ে গেল।

    টেক-ম্যানের অজান্তেই সশব্দে ব্লাস্টারটা পড়ে গেল তার হাত থেকে।

    ম্যালো জিগ্যেস করলেন, ম্রাটের কি পার্সোনাল ফোর্স-শিল্ড আছে? ইচ্ছে করলে আপনি এই বিরল জিনিসটির অধিকারী হতে পারেন।

    তোতলাতে শুরু করল টেক-ম্যান। তু-তুমি কি টেক-ম্যান?

    না। তা-তাহলে কোথায় পেলে এটা?

    সে-খবরে আপনার কী দরকার? ম্যালের কণ্ঠে শীতল ব্যঙ্গ। আপনি জিনিসটা চান কিনা বলুন। পাতলা, নব লাগান একটা চেইন ডেস্কের ওপর পড়ল।

    ছোঁ মেরে জিনিসটা তুলে নিল টেক-ম্যান। কাঁপা হাতে নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগল।

    এটাই পুরো ফোর্স-শিল্ড?

    হ্যাঁ। পাওয়ার কোথায় তাহলে?

    সবচেয়ে বড় নবটার ওপর একটা আঙুল রাখলেন ম্যালো। সীসার অবরণে সেটাকে নিপ্রভ দেখাচ্ছে।

    টেক-ম্যান চোখ তুলে তাকাল ম্যালোর দিকে। শরীরের সমস্ত রক্ত যেন তার মুখে এসে জমা হয়েছে।

    দেখো, আমি সিনিয়র গ্রেডের একজন টেম-ম্যান। বিশ বছর সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করেছি। ট্র্যানটর বিশ্ববিদ্যালয়ের মহান ব্লার-এর ছাত্র ছিলাম। আখরোটের মতো একটা পিচ্চি সাইজের জিনিসে অ্যাটমিক জেনারেটর ঢুকল কী করে খোলাসা করে বলো শিগগির, নইলে তিন সেকেণ্ডের মধ্যে প্রোটেক্টরের সামনে হাজির করব তোমাকে।

    বিশ্বাস না হলে আপনি নিজেই পরীক্ষা করে দেখুন না। আমি তো একবারই বলেছি, ওটাই পুরো ফোর্স-শিল্ড।

    চেইনটা নিজের কোমরে বাঁধল টেক-ম্যান। তার চেহারা স্বাভাবিক হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। ম্যালো ইশারা করতে নবটা ঠেলে দিল সে। অমনি হালকা একটা আলোর দীপ্তি ঘিরে ধরল তাকে। ব্লাস্টারটা মেঝে থেকে উঠিয়ে নিজের দিকে তাক করার আগে একটু ইতস্তত করল সে। বার্নলেস মিনিমাম পজিশনে সেটাকে অ্যাডজাস্ট করে নিজের দিকে ফেরাল। তারপর হঠাৎ ব্লাস্টারের সার্কিট ক্লোজ করে দিল।

    অ্যাটমিক ফায়ার তার দেহের কোনো ক্ষতি না করে হাতের ওপর আছড়ে পড়ল।

    তেড়ে উঠল টেক-ম্যান। তোমাকে মেরে ফেলে শিল্ডটা যদি রেখে দিই আমি এখন, তাহলে?

    চেষ্টা করেই দেখুন, ম্যালো উদাসীনভাবে বললেন। আপনি কি ভেবেছেন আর কোনো শিল্ড নেই আমার কাছে? তার দেহের চারপাশে আগের সেই আলোর আভা ফিরে এসেছে।

    নার্ভাস ভঙ্গিতে খিক খিক করে হেসে উঠল টেক-ম্যান। ডেস্কের ওপর সশব্দে ছুঁড়ে ফেলল ব্লাস্টারটা।

    তা তোমার সেই কিছুই নাটা কী?

    আমি আপনাদের জেনারেটরগুলো দেখতে চাই।

    তুমি ভাল করেই জান কাজটা বেআইনি। আমাদের দুজনেরই প্রাণ নিয়ে টানাটানি পড়ে যাবে।

    আমি ওগুলো ছুঁয়েও দেখব না। কিছুই করব না। দূর থেকে শুধু দেখব একটু।

    যদি না দেখাই?

    বেশ তো, দেখাবেন না। কিন্তু আপনার কাছে একটা শিল্ড থাকলে কী হবে, আমার কাছে অন্য জিনিস আছে। এই যেমন ধরুন, আমার কাছে এমন একটা ব্লাস্টার আছে যেটা ঐ শিল্ড ভেদ করতে পারে।

    হুম্‌-ম্‌, এস আমার সঙ্গে।

    .

    বার

    শহরের মধ্যেখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে জানালাবিহীন এক বিশাল বাড়ি। তার লাগোয়া ছোট্ট দোতলা বাড়িটাই টেক-ম্যানের। আণ্ডারগ্রাউণ্ড একটা প্যাসেজ ধরে প্রথমটিতে নিতে আসা হলো ম্যালোকে। পাওয়ার হাউসের নিঃশব্দ পরিবেশে নিজেকে আবিষ্কার করলেন তিনি। বাতাসে ওজোন-এর গন্ধ পেলেন।

    ঝাড়া পনেরো মিনিট তিনি তাঁর গাইডকে অনুসরণ করে গেলেন। একটা কথাও বললেন না ম্যালো। কিছুই এড়াল না তাঁর চোখ। কিছুই ছুঁলো না তাঁর হাত। তারপর একসময় চাপা গলায় টেক-ম্যান জিগ্যেস করল, কি, হয়েছে দেখা? আমার লোকজনের কাউকে এ-ব্যাপারে বিশ্বাস করতে পারলাম না, তাই নিজেই নিয়ে এসেছি তোমাকে।

    কখনো কি পেরেছেন? ম্যালো শ্লেষের সঙ্গে বললেন। যাকগে, একটু উদ্বেগের সুরে জিগ্যেস করলেন, এই জেনারেটরগুলো সব আপনার দায়িত্বে?

    প্রত্যেকটা, গর্বের একটা রেশ ফুটে উঠল টেক-ম্যানের উত্তরে।

    আপনিই এগুলো চালান, ঠিকঠাক রাখেন?

    ঠিক।

    যদি কখনো বিগড়ে যায়?

    অবজ্ঞাভরে মাথা নাড়ল টেক-ম্যান। এগুলো বিগড়ায় না। কখনো না। অনন্ত কাল ধরে চলার জন্যে তৈরি করা হয়েছে এই জেনারেটর গুলো।

    সেটা তো খুব লম্বা সময়, কিন্তু মনে করুন

    অর্থহীন ব্যাপারে কিছু মনে করাটা অবৈজ্ঞানিক।

    ঠিক আছে। কিন্তু ধরুন, আমি যদি একটা ভাইটাল পার্ট ব্লাস্টার দিয়ে উড়িয়ে দিই? ধরুন, মেশিনগুলো যদি পারমাণবিক শক্তির কাছে হার মানে? ধরুন, আমি একটা ভাইটাল কানেকশন ফিউজ করে দিলাম, বা একটা কোয়ার্টজ ডি-টিউব ভেঙে ফেললাম- তাহলে কী হবে?

    কী হবে? বাজখাই গলায় চেঁচিয়ে উঠল টেক-ম্যান। খুন হয়ে যাবে তুমি!

    হ্যাঁ, তা আমি জানি, ম্যালো আর রেয়াত করলেন না, পাল্লা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন। কিন্তু জেনারেটরগুলোর কী হবে? আপনি কি ওগুলো মেরামত করতে পারবেন?

    দেখ হে, ঘেউ ঘেউ করে উঠল সে। তোমার পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় শোধ করে দিয়েছি। যা চেয়েছিলাম তা পেয়েছ। এবার বিদেয় হও।

    বিদ্রুপাত্মক একটা কুর্নিশ করে বেরিয়ে গেলেন ম্যালো।

    তাকে নিয়ে টার্মিনাস গ্রহে যাবার জন্য একটা ঘাঁটিতে অপেক্ষা করছিল ফার স্টার। দুদিন পর সেই ঘাঁটিতে পৌঁছুলেন ম্যালো।

    এবং ঠিক সেই দু দিনের মাথায় অকেজো হয়ে গেল টেক-ম্যানের শিন্ডটা। হতভম্ব লোকটার হাজার গালিগালাজেও আর জ্বললো না সেটা।

    .

    তের

    ছমাসের মধ্যে এই প্রথম একটু জিরোবার ফুরসত পেয়েছেন ম্যালো। নগ্ন অবস্থায় তাঁর নতুন বাড়ির সান-রুমে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন তিনি। তার বিশাল বাহু দুটো .. উঠে দু দিকে ছড়াল, টানটান হয়ে ফুটে উঠল প্রতিটি মাংসপেশী। শরীরে ঢিল পড়তে আবার মিলিয়ে গেল সেগুলো।

    তাঁর পাশে বসা লোকটা ম্যালোর ঠোঁটের ফাঁকে একটা সিগার খুঁজে দিয়ে সেটায় অগ্নিসংযোগ করলেন। তারপর নিজেই একটা সিগার ধরিয়ে বলে উঠলেন, নিশ্চয়ই বাড়াবাড়ি রকমের খাটুনি গেছে তোমার ওপর দিয়ে। এবার বোধকরি কিছুদিনের টানা বিশ্রাম দরকার তোমার।

    তা হয়ত দরকার, কিন্তু বিশ্রামটা আমি কাউন্সিল সিটে বসেই নিতে চাই। কারণ, আমি ঐ সিটটা পেতে যাচ্ছি আর তুমি আমাকে এব্যাপারে সাহায্য করছ।

    অ্যাংকর জেল ভুরু কুঁচকে বললেন, এর মধ্যে আবার আমি আসছি কেন?

    সঙ্গত কারণেই। প্রথমত, তুমি একজন ঝানু পলিটিশিয়ান। দ্বিতীয়ত, জোরেন সাট নামে এক লোক তোমাকে তোমার সিট থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল আর সেই লোকটা আমাকে কাউন্সিলে দেখার বদলে নিজের একটা হাত খোয়াতেও রাজি। তুমি বোধ করি আমার কাউন্সিলে ঢোকার তেমন একটা সম্ভাবনা দেখছ না, তাই না?

    ঠিক, তেমন সম্ভাবনা দেখছি না। প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী সায় দিলেন। তুমি স্মিরনোর লোক।

    আইনত সেটা কোনো বাধা নয়। আই হ্যাভ হ্যাড আ লে এজুকেশন। সাধারণ লোকদের শিক্ষা আছে আমার।

    সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু মিথ্যা আক্রোশ কি কখনো আইন মানে? তা, তোমার নিজের লোক, জেইম টুয়ার কী বলে এব্যাপারে?

    প্রায় বছরখানেক আগে সে একবার বলেছিল কাউন্সিলে ঢোকার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য করবে, গাছাড়াভাবে বললেন ম্যালো। কিন্তু এখন আমিই তার ওপরে উঠে গেছি। কাজটা সে অবশ্যি করতে পারত না। কাউন্সিলে সে বেশ সরব আর প্রভাবশালী ঠিকই, কিন্তু আজেবাজে ব্যাপারেই চেঁচামেচি করে লোকটা। আমি একটা সত্যিকারের কু ঘটাতে চাইছি। আই নিড ইউ।

    টার্মিনাসের সবচেয়ে ধুরন্ধর পলিটিশয়ান ঐ সাট। লোকটা তোমার বিরোধিতা করবে। ওকে টেক্কা দিতে পারব, সেকথা বুক ফুলিয়ে বলতে পারি না। তাছাড়া, এসব ক্ষেত্রে নোংরা চাল চালতে খুব ওস্তাদ লোকটা।

    আমার কাছে টাকা আছে।

    তাতে হয়ত কিছুটা কাজ হবে। তবে কিনা মিথ্যা আক্রোশ দূর করতে প্রচুর টাকা খরচ হবে- বুঝতে পেরেছে, ইউ ডার্টি স্মিরনিয়ান?

    দরকার হলে টাকা ভোলামকুচির মতোই খরচ করব।

    ঠিক আছে, দেখব আমি ব্যাপারটা, কিন্তু পরে আবার গলা ফাটিয়ে বলে বেড়িও না, আমি তোমাকে এ-কাজে উৎসাহ দিয়েছি। …কে আসে?

    ম্যালো মাথাটা একটু কাত করে বললেন, মনে হচ্ছে, স্বয়ং জোরেন সাট। আগেই এসে পড়েছে। কেন, সেটা বুঝতে পারছি। গত এক মাস ফাঁকি দিয়ে এড়িয়ে গেছি আমি লোকটাকে। জেল, শোন, পাশের ঘরে যাও। স্পীকারটা লো করে চালিয়ে দাও। আমি চাই, আমাদের আলাপটা শোন তুমি।

    নগ্ন পায়ে একটা ধাক্কা দিয়ে জেলকে পাশের ঘরে যেতে সাহায্য করলেন ম্যালো। উঠে, একটা সিল্কের রোব গায়ে চাপালেন। সিন্থেটিক সানলাইট মৃদু হয়ে নরমাল পাওয়ারে ফিরে এল। ঋজু ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলেন জোরেন সাট। গম্ভীর মুখে দরজাটা বন্ধ করে দিলেন ম্যালো।

    কোমরে বেল্টটা বেঁধে নিয়ে ম্যালো বলে উঠলেন, যে-কোনো চেয়ারে বসতে পারেন, সাট।

    সাটের মুখে একটা ভাঙা হাসি ফুটল কি ফুটল না। যে-চেয়ারটা পছন্দ করলেন সেটা আরামদায়ক ঠিকই, কিন্তু তিনি সেটায় আয়েশ করে না বসে, কিনারার দিকে বসলেন। বললেন, প্রথমেই তুমি তোমার শর্তগুলো জানিয়ে দিলে সরাসরি কাজের কথায় যাওয়া যেত।

    শর্ত? কীসের শর্ত?

    মিষ্টি কথা শুনতে চাও বুঝি? বেশ, তাহলে প্রথমেই জবাব দাও, কোরেলে গিয়ে কী করেছ তুমি? তোমার রিপোের্টটা অসম্পূর্ণ।

    সেটা আপনাকে দিয়েছি কয়েক মাস আগে। তখন তো আপনি সন্তুষ্ট হয়েছিলেন?

    হয়েছিলাম। চিন্তিত মুখে এক আঙুলে কপাল ঘষলেন তিনি। কিন্তু তারপর থেকেই তোমার কার্যকলাপ রহস্যময় হয়ে উঠেছে। তুমি কী করছ না করছ সে ব্যাপারে অনেক কিছুই জানি আমরা। আমরা জানি, তুমি ঠিক কটা ফ্যাক্টরি তৈরি করছ। জানি, বেশ তাড়াহুড়ো করে কাজটা করতে চাইছ তুমি। কত খরচ পড়ছে তাও জানি। নিজের চারদিকে শীতল আর বিরূপ দৃষ্টিতে তাকালেন তিনি, তোমার এই প্রাসাদ তো আমার পুরো এক বছরের বেতন দিয়েও বানানো যাবে না। তুমি যে। বিস্তর কাঠ-খড় পুড়িয়ে ধীরে ধীরে ফাউণ্ডেশন সোসাইটির ওপরের দিকে উঠছ, সেদিকেও তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছি আমরা।

    তো? করিৎকর্মা কিছু পোষা টিকটিকি আছে আপনার। এছাড়া আর কী প্রমাণ হয় এতে?

    প্রমাণ হয় যে, এক বছর আগেও এত টাকাকড়ি ছিল না তোমার হাতে। আর তার অনেক রকম অর্থ হতে পারে। যেমন ধর, কোরেলে হয়ত এমন অনেক কিছুই ঘটেছিল যার বিন্দুবিসর্গ আমরা জানি না। এত টাকা তুমি পাচ্ছ কোত্থেকে?

    মাই ডিয়ার সাট, সে কথা আপনাকে জানাব, এ আপনি মোটেই আশা করতে পারেন না,

    পারি না তা ঠিক।

    আর সেজন্যই আপনাকে জানাব আমি। টাকাটা আসছে সরাসরি কোরেলের কমোডরের কোষাগার থেকে।

    চোখ পিট পিট করে তাকালেন সাট।

    মুচকি হেসে ম্যালো বলে চললেন, আপনার দুর্ভাগ্য, টাকাটা পুরোপুরি বৈধ উপায়ে আয় করা। আমি একজন মাস্টার ট্রেডার। কমোডরকে তুচ্ছ কিছু জিনিসপত্র দিয়ে তার বদলে যে পেটা লোহা আর ক্রোমাইট পেয়েছিলাম, সেখান থেকেই এসেছে টাকাটা। ফাউণ্ডেশনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী লাভের পঞ্চাশ শতাংশ আমার। বছরের শেষে সুবোধ নাগরিকরা যখন আয়কর জমা দেয়, তখন বাকি পঞ্চাশ ভাগ সরকারী কোষাগারে চলে যায়।

    তোমার রিপোর্টে তো কোনো বাণিজ্য চুক্তির কথা উল্লেখ ছিল না?

    প্রতিদিন সকালে নাস্তার টেবিলে আমি কী খাই না খাই, বা আমার বর্তমান রক্ষিতার নাম কী, এসব অপ্রয়োজনীয় কথাও লেখা ছিল না ওখানে। ম্যালোর মৃদু হাসিটা এখন নির্জলা অবজ্ঞার হাসিতে পরিণত হয়েছে। আপনার কথায় বলতে গেলে, আমাকে পাঠান হয়েছিল, চোখ-কান খোলা রাখার জন্য। তা, এই ইন্দ্রিয় দুটি এক মুহূর্তের জন্যও বন্ধ ছিল না আমার। আপনি ফাউণ্ডেশনের মার্চেন্ট শিপের হদিস জানতে চেয়েছিলেন। দেখা তো দূরে থাক, শিপগুলোর নাম পর্যন্ত শুনিনি আমি ওখানে। কোরেলের কাছে অ্যাটমিক পাওয়ার আছে কিনা আপনি জানতে চেয়েছিলেন। রিপোর্টে আমি পরিষ্কার লিখে দিয়েছি, কমোডরের ব্যক্তিগত দেহরক্ষীর হাতে আমি অ্যাটমিক ব্লাস্টার দেখেছি, এছাড়া অ্যাটমিক পাওয়ারের আর কোনো চিহ্ন নজরে পড়েনি আমার। তাছাড়া যে-ব্লাস্টারগুলো আমি দেখেছি সেগুলোকে আপনি প্রাচীন এম্পায়ারের স্মৃতিচিহ্নই বলতে পারেন। আমার ধারণা স্রেফ অকেজো শো-পিসও হতে পারে ওগুলো।

    এগুলো সবই আমি আপনাদের আদেশমাফিক করছি। কিন্তু তার বাইরে যা কিছু করেছি তা একজন ফ্রি এজেন্ট হিসেবে করেছি। এখনো আমি একজন ফ্রি এজেন্ট। ফাউণ্ডেশনের আইন অনুযায়ী একজন মাস্টার ট্রেডার তার ইচ্ছেমত নতুন মার্কেট খুলতে পারে আর তার অর্ধেক লভ্যাংশ সে তার প্রাপ্য হিসেবেই পেতে পারে। আপনার আপত্তির কী আছে? আমি তো সেরকম কিছু দেখছি না।

    চোখের দৃষ্টি সতর্কভাবে দেয়ালের দিকে সরিয়ে মৃদু উম্মার সঙ্গে সাট বললেন, ট্রেডাররা তাদের বাণিজ্য ধর্মের উন্নতি সাধন করবে, এটাই সনাতন প্রথা।

    আমি সনাতন প্রথা অনুযায়ী কাজ করি না, আইন অনুযায়ী কাজ করি।

    প্রথা অনেক সময় আইনের উর্ধ্বে স্থান পেতে পারে।

    তাহলে আদালতে গিয়ে মামলা ঠুকুন।

    গম্ভীর মুখে ম্যালোর দিকে তাকালেন সাট। তার চোখ দুটো কোটরের ভেতর ঢুকে গেছে বলে মনে হলো। সত্যিই তুমি একজন স্মিরনিয়ান। নাগরিক অধিকার আর শিক্ষা যে বিদেশীদের রক্তের দোষ মুছতে পারে না সেটা বোঝা গেল।

    শোন, ব্যাপারটা টাকা-পয়সা বা মার্কেট- এসবের অনেক ঊর্ধ্বে। মহান হ্যারি সেলডন যে-বিজ্ঞান আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন সেটার সাহায্যে প্রমাণ করতে হবে যে, গ্যালাক্সির ভবিষ্যৎ এম্পায়ার আমাদের ওপরই নির্ভর করছে। আর যে-পথ আমাদেরকে ইম্পেরিয়ামের দিকে নিয়ে যাচ্ছে সে-পথ থেকে আমরা সরে যেতে পারি না। আমাদের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছানোর মোক্ষম উপায় হচ্ছে আমাদের ধর্ম।. এই ধর্মের সাহায্যে আমরা চার রাজ্য-কে আমাদের বশে এনেছি, তা-ও এমন এক সময়ে যখন ওরা ইচ্ছে করলে আমাদেরকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারত। মানুষ আর বিশ্ব- এই দুটোকে হাতের মুঠোয় আনার সবচেয়ে জুতসই অস্ত্র এটা।

    এই ধর্মের প্রচলন করে সেটাকে আরো দ্রুত ছড়িয়ে দেবার উদ্দেশ্যেই ট্রেড এবং ট্রেডারদের উন্নতি করা হয়েছিল মূলত। নতুন নতুন প্রযুক্তি আর একটা নতুন অর্থনীতি প্রবর্তনের ব্যাপারে আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যও ছিল এই উন্নতির পেছনে।

    দম নেবার জন্যে থামলেন সাট। ম্যালো শান্তভাবে তাকে বাধা দিয়ে বললেন, তত্ত্বটা আমার জানা আছে। আই আণ্ডারস্ট্যাণ্ড ইট এনটায়ারলি।

    তাই? এতটা আমি আশা করিনি। কিন্তু এতকিছু জেনেও তুমি কী করছ এসব? স্রেফ ব্যবসার উদ্দেশ্যেই ব্যবসা করতে চাইছ; মূল্যহীন গ্যাজেটগুলোর ঢালাও প্রোডাকশনে যেতে চাইছ, যা কি না একটা বিশ্বের অর্থনীতিতে তেমন কোনো ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে না। সেই সঙ্গে তুমি আন্তঃনক্ষত্রীয় নীতি বলি দিতে চাইছ অর্থ আর মুনাফার দেবতার পায়ে; সবকিছুর নিয়ামক আমাদের ধর্মকে বিচ্ছিন্ন করতে চাইছ অ্যাটমিক পাওয়ার থেকে। তুমি কী বুঝতে পারছ না যে এতে করে পুরো এক শতাব্দী ধরে কার্যকর একটি নীতির বিলুপ্তি আর চরম পরাজয় ঘটবে?

    এরকম একটা সেকেলে, বিপজ্জনক আর অবাস্তব নীতি যে একশো বছর টিকেছে, এই তো বেশি। ম্যালো মন্তব্য করলেন। চার রাজ্যের বেলায় সফল হলেও, পেরিফেরির আর কোনো বিশ্বে কিন্তু আপনারা সফল হননি। তারা কেউ গ্রহণ করেনি আপনাদের ধর্ম। আমরা যখন চার রাজ্যের কর্তৃত্ব নিজেদের হাতে নিলাম তখন কত লোক যে দেশত্যাগী হয়েছে, তা গ্যালাক্সি জানে। যাজকতন্ত্র আর মানুষের কুসংস্কারকে ব্যবহার করে স্যালভর হার্ডিন কীভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাজাদের স্বাধীনতা আর ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছেন সে-কাহিনী নিশ্চয়ই তারা ছড়িয়ে দিতে কার্পণ্য করেনি। তাতেও যদি যথেষ্ট না হয়ে থাকে, সেক্ষেত্রে বিশ বছর আগে অ্যাসকোনের ঘটনাটা নিশ্চয়ই হাটে হাঁড়ি ভেঙে দেবার মতো কাজ করেছে। পেরিফেরিতে বোধকরি এখন একজনও শাসক নেই যিনি ফাউণ্ডেশনের কোনো প্রিস্টকে নিজের এলাকায় ঢুকতে দেবার বদলে নিজের গলা নিজে কাটতে চাইবেন না।

    কোরেল বা অন্য কোনো বিশ্ব যা অবাঞ্ছিত মনে করে সেটা তাদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেবার ঘোর বিরোধী আমি। ধরে নিলাম, অ্যাটমিক পাওয়ার পেলে ওরা বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। কিন্তু আধ্যাত্মিক পরাশক্তির নোংরা দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল একটা অনিশ্চিত আধিপত্যের চেয়ে, বাণিজ্যের মধ্যে দিয়ে গড়ে তোলা একটা আন্তরিক বন্ধুত্ব শতগুণে ভাল। তাছাড়া, এই আধিপত্য যদি কোনো কারণে এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয় বা দুর্বল হয়ে পড়ে, তাহলে তার সমূহ পতন ঘটবে, আর পেছনে আতঙ্ক ও ঘৃণার অনির্বাণ শিখা ছাড়া মূল্যবান কিছুই রেখে যাবে না। ( উদাসীন ভঙ্গিতে সাট মন্তব্য করলেন, বলেছ ভাল। এবার তাহলে সেই পুরনো প্রসঙ্গেই ফিরে যাই, আলোচনা যেখান থেকে শুরু করেছিলাম। তোমার শর্তগুলো কী? তোমার বিশ্বাস ছুঁড়ে ফেলে আমারটা গ্রহণ করার বদলে কী চাও তুমি?

    আপনি কি মনে করেন আমার বিশ্বাস বিক্রির জিনিস?

    কেন নয়? নির্লিপ্ত উত্তর এল। বেচাকেনাই তো তোমার কাজ। নয়?

    লাভ হলে তবেই। অপমানটা গায়ে মাখলেন না ম্যালো। এখন আমি যা পাচ্ছি আপনি তার চেয়ে বেশি কী দিতে পারবেন?

    অর্ধেকের বদলে, তোমার ট্রেড প্রফিটের চার ভাগের তিন ভাগ পেতে পারতে তুমি।

    ছোট্ট করে হাসলেন ম্যালো।

    চমকার অফার। আপনার শর্ত মোতাবেক গোটা ব্যবসা থেকে যা আসবে তা আমার শর্ত অনুযায়ী আসা লাভের এক দশমাংশের অনেক কম হবে। এর চেয়ে লোভনীয় কিছু দিয়ে চেষ্টা করে দেখুন।

    তুমি একটা কাউন্সিল সিট পেতে পার।

    সে আমি এমনিতেই পাব- আপনার সাহায্য ছাড়াই, এমনকি আপনি না চাইলেও।

    হঠাৎ সাটের শরীরটা নড়ে উঠল। মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল তাঁর হতে দুটো। সেই সঙ্গে তুমি কারাদণ্ডের হাত থেকেও রেহাই পেতে পার। সবকিছু আমার ইচ্ছেমত চললে বিশ বছরের কারাদণ্ড হয়ে যেতে পারে তোমার। সেটা থেকে রেহাই পাবার লাভটা বিবেচনা কর।

    হুমকিটা কার্যকর করতে না পারার আগে সেটা কোনো লাভই না।

    অভিযোগটা কিন্তু খুনের।

    খুন? কাকে আবার খুন করলাম আমি? তাচ্ছিল্যের সঙ্গে জিগ্যেস করলেন ম্যালো।

    সাটের কণ্ঠ কর্কশ হয়ে উঠল, যদিও গলা চড়ল না। ফাউণ্ডেশনের সেবায় নিয়োজিত এক অ্যানাক্ৰিয়নিয়ান প্রিস্টকে।

    বটে? তা, আপনার কাছে প্রমাণ আছে তো?

    মেয়রের সেক্রেটরি ঝুঁকে এলেন সামনের দিকে। ম্যালো, আমি কিন্তু ধাপ্পা দিচ্ছি না, প্রাথমিক কাজকর্ম সব গুটিয়ে আনা হয়েছে। শেষ কাগজটায় আমি সই করে দিলেই ফাউণ্ডেশন বনাম মাস্টার ট্রেডার হোবার ম্যালোর মামলা শুরু হয়ে যাবে। একদল বিদেশী লোকের হাতে ফাউণ্ডেশনের একজন নাগরিককে তুলে দিয়েছিলে তুমি। টর্চার করে মেরে ফেলে তাকে ওরা। শাস্তিটা এড়াবার জন্যে তোমার হাতে আর মাত্র পাঁচ সেকেণ্ড সময় আছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি চাই, তুমি ব্যাপারটা ধাপ্পা বলে উড়িয়ে দাও। তার কারণ, আমাদের দুজনের মধ্যে রেষারেষি শেষ হয়ে গেলেও তোমার ওপর থেকে আমাদের সন্দেহ যাবে না। তার চেয়ে, বিনাশ হয়ে যাওয়া একজন শত্রু হিসেবেই তুমি বেশি নিরাপদ।

    ম্যালো গম্ভীর মুখে বললেন, আপনার যা অভিরুচি।

    গুড। ক্রুর একটা হাসি খেলে গেল সেক্রেটারি সাহেবের মুখে। সত্যি বলতে কী, তোমার সঙ্গে একটা আপোসে আসার জন্যে মেয়রই পাঠিয়েছেন আমাকে। আমি নিজের গরজে আসিনি। সেজন্যেই বেশি চাপাচাপি করলাম না।

    দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে গেলেন তিনি।

    অ্যাংকর জেল আবার ঘরে ঢুকতে মুখ তুলে তাকালেন ম্যালো। জিগ্যেস করলেন, শুনলে?

    কোনদিন এত রাগতে দেখিনি লোকটাকে।

    কিন্তু কী বুঝলে তাই বল।

    বলছি। আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে স্বৈরশাসন চালাবার পররাষ্ট্রনীতি ছাড়া সাটের মাথায় আর কিছু ঢোকে না। কিন্তু আমার ধারণা, চূড়ান্ত লক্ষ্য আর যাই হোক আধ্যাত্মিক কিছু নয়। ঠিক এই ইস্যু নিয়ে কথা বলার কারণেই যে আমাকে কেবিনেট থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল সেকথা তো তুমি জানই।

    জানি, কিন্তু সেই চুড়ান্ত লক্ষ্যটা কী বলে মনে হয় তোমার যা কি না আধ্যাত্মিক কিছু নয়?

    জেল-এর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। দেখ, লোকটা নির্বোধ নয়। সুতরাং আমাদের ধর্মীয় নীতির গণেশ উল্টান অবস্থাটা সে ঠিকই বুঝতে পেরেছে। গত সত্তর বছরে একটা রাজ্যও হাত করতে পারিনি আমরা এই ধর্মের সাহায্যে। ধর্মটাকে যে সে নিজের উদ্দেশ্য হাসিলের জন্যে ব্যবহার করছে সেটা পানির মতো পরিষ্কার।

    বিশ্বাস আর আবেগপ্রবণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত যেকোনো নীতিই খুব মারাত্মক একটা অস্ত্র। তার কারণ, সেই অস্ত্র যে উল্টো ব্যবহারকারীর ওপরই প্রয়োগ করা হবে না এমন নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব না। একশো বছর ধরে আমরা এমন একটা ধর্মীয় আচার-ব্যবস্থা আর মিথলজিকে সমর্থন যুগিয়ে এসেছি যা দিনে দিনে আরো সমাদৃত, সনাতন এবং অনড় হয়ে উঠছে। অথচ বিশেষ কিছু কারণে এটা আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই।

    কারণগুলো কী? ম্যালো জানতে চাইলেন। থেমো না, আমি তোমার ধারণাটা শুনতে চাই।

    ধরে নাও, একটা লোক, উচ্চাকাঙ্ক্ষী একটা লোক, ধর্মীয় শক্তিটাকে আমাদের পক্ষে ব্যবহার না করে বিপক্ষে ব্যবহার করছে।

    তুমি বলতে চাও, সাট-

    ঠিকই ধরেছ। সাটের কথাই বলতে চাইছি আমি। আমাদের অধীনে যেসব গ্রহ আছে সেগুলোর যাজকদের যদি সে অর্থোডক্সির নাম, ধর্মীয় গোঁড়ামিকে কাজে লাগিয়ে, ফাউণ্ডেশনের বিরুদ্ধে খেপিয়ে তুলতে পারে সেক্ষেত্রে আমাদের কী অবস্থা হবে বলতে পার? নিজেকে ঐ সাধু লোকগুলোর মাথায় বসিয়ে সে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধও ঘোষণা করতে পারে। আর সবশেষে এভাবে হয়ত সে রাজা-ই বনে যাবে। যুদ্ধটা সে তোমার বিরুদ্ধেও ঘোষণা করতে পারে, তার কারণ তুমি বিধর্মীদেরই প্রতিনিধি, অন্তত ওদের চোখে। হার্ডিন একটা কথা বলেছিলেন, অ্যাটম ব্লাস্টার অস্ত্র হিসেবে খুব ভাল সন্দেহ নেই, কিন্তু এটাকে দুদিকেই তাক করা যায়।

    সপাটে নিজের নগ্ন উরুতে চাপড় বসালেন ম্যালো। ঠিক আছে, জেল, সেক্ষেত্রে তুমি আমাকে কাউন্সিলে ঢোকাবার ব্যবস্থা কর, আমি লড়ব ওর সঙ্গে।

    জেল খানিক ভেবে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, তা বোধহয় পারবে না। আচ্ছা, ওই প্রিস্ট হত্যার ব্যাপারটা কী? মিথ্যা কথা নিশ্চয়ই?

    না, সত্যি। উদাসীনভাবে জবাব দিলেন ম্যালো।

    শিস দিয়ে উঠলেন জেল। ওর কাছে অকাট্য কোনো প্রমাণ আছে?

    থাকাই উচিত। একটু ইতস্তত করে ম্যালো যোগ করলেন, গোড়া থেকেই সাটের লোক ছিল জেইম টুয়ার। অবশ্যি আমি যে এটা জানি তা আবার ওরা কেউ জানে না। আর এই জেইম টুয়ার লোকটা ঘটনাটার প্রত্যক্ষদর্শী।

    জেল মাথা নাড়লেন ডাইনে-বাঁয়ে। তাহলে মুশকিল।

    মুশকিলের কী দেখলে তুমি এখানে? প্রিস্ট লোকটা তখন খোদ ফাউণ্ডেশনের আইন ভঙ্গ করে ঐ গ্রহে অবস্থান করছিল। সন্দেহ নেই, লোকটাকে কোরেলিয়ান সরকার একটা টোপ হিসেবে ব্যবহার করেছিল, হয় তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে, নয় তার সম্মতিতেই। আমার তখন একটাই কাজ করার ছিল, আর সেকাজটা ছিল পুরোপুরি আইনসঙ্গত। আমাকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে লোকটা একটা গর্ধবের মতো কাজ করবে।

    জেল আবারো মাথা নাড়লেন। না, ম্যালো, তুমি ব্যাপারটা ধরতে পারনি। আমি আগেই বলেছি লোকটা নোংরামিতে ওস্তাদ। সে নিজে তোমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনবে না। সে জানে, সে তা করতে পারবে না। কিন্তু সে তোমার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করার চেষ্টা করবে। লোকটা কী বলে গেল শুনলে না? প্রথা অনেক সময় আইনের ঊর্ধ্বে স্থান পেতে পারে। তুমি বেকসুর খালাপ পেয়ে যেতে পার ঠিকই, কিন্তু জনগণ যদি মনে করে তুমি একজন প্রিস্টকে হিংস্র কুকুরের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছ, তাহলেই তোমার জনপ্রিয়তার বারোটা বেজে গেল। তারা মেনে নেবে যে তুমি বেআইনি কিছু করনি বরং বিচক্ষণের মতই কাজ করেছ। কিন্তু সেই সঙ্গে তারা এ ও মনে করবে, তুমি একটা ভীতু কুকুর, অনুভূতিশূন্য পশু, নিষ্ঠুর দানব। ফলে নির্বাচনে জিতে কাউন্সিলে যাওয়া আর কোনোদিনই সম্ভব হবে না তোমার পক্ষে। এমনকি মাস্টার ট্রেডার হিসেবে তোমার রেটিংও হারাতে পার তুমি; ভোটের মাধ্যমে তোমার সিটিজেনশিপ কেড়ে নিয়ে সে-কাজটা করা হবে। তুমি তো জানই, আর যাই হও, তুমি এ-দেশী নও। তো, এর চেয়ে বেশি আর কী চাওয়ার থাকতে পারে সাটের?।

    গোঁয়ারের মতো ভুরু কোঁচকালেন ম্যালো। তো?

    বুড়ো থোকা, জেল বললেন, আমি তোমার পাশে আছি ঠিকই, কিন্তু এক্ষেত্রে কিছুই করার নেই আমার। তুমি যাকে বলে, তপ্ত কড়াই-এর মধ্যে আছ এখন।

    .

    চৌদ্দ

    মাস্টার ট্রেডার হোবার ম্যালোর বিচারের চতুর্থ দিন। কাউন্সিলের চেম্বারে আক্ষরিক অর্থেই তিল ধারণের ঠাঁই নেই। একজন মাত্র কাউন্সিল সদস্য অনুপস্থিত। দুর্ঘটনায় শয্যাশায়ী অবস্থায় এমুহূর্তে তিনি ক্ষীণ কণ্ঠে তার ফেটে যাওয়া মাথার ওপর অভিশাপ বর্ষণ করছেন। গ্যালারিগুলো আইলওয়ে ছাপিয়ে একেবারে সিলিং পর্যন্ত ভর্তি। অর্থ, প্রতিপত্তি এবং স্রেফ অমানুষিক অধ্যাবসায়ের জোরে এই লোকগুলো ভেতরে ঢোকার যোগ্যতা অর্জন করেছে। বাইরের স্কোয়ারটাও লোকে লোকারণ্য, জায়গায় জায়গায় মৌমাছির মতো দল বেঁধে ঘিরে আছে তারা ওপেন-এয়ার ট্রাইমেনশনাল টেলিভিজরগুলো।

    ।প্রচণ্ড সেই ভিড় ঠেলে, পুলিশ বিভাগের প্রায়-অসার, গলদঘর্ম কসরতের বদৌলতে, অ্যাংকর জেল কোনোরকমে চেম্বারে ঢুকলেন। কিন্তু এরপর হোবার ম্যালোর আসন পর্যন্ত পৌঁছুতেও কম কষ্ট হলো না তাকে।

    পরম স্বস্তির সঙ্গে ঘুরে তাকালেন ম্যালো। যাক বাবা, এসে পড়েছ। পেয়েছ?

    এই যে ধর, যা যা চেয়েছিলে, সব আছে এর মধ্যে। গুড!

    বাইরে লোকজন কীভাবে নিচ্ছে ব্যাপারটাকে?

    ওরা স্রেফ পাগল হয়ে গেছে, অস্বস্তির সঙ্গে নড়ে উঠলেন জেল। পাবলিক হিয়ারিং-এর ব্যাপারটা মেনে নেয়া উচিত হয়নি তোমার। ইচ্ছে করলে তুমি এটা বন্ধ করতে পারতে।

    কিন্তু আমি চাই সবাই শুনুক।

    খুনের ব্যাপারে কথা হচ্ছে খুব। তাছাড়া আউটার প্ল্যানেটগুলোয় পাবলিস ম্যানলিওর লোকজন–

    এই কথাটাই জিগ্যেস করতে চাইছিলাম তোমাকে, জেল। আমার বিরুদ্ধে সমস্ত যাজককে খেপিয়ে তুলছে সে, তাই না?

    তুলছে মানে? এমন চমৎকার সেট-আপ তুমি আগে দেখনি। পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে সে আন্তঃনক্ষত্রীয় আইন অনুযায়ী মামলাটা পরিচালনা করছে। আর চার্চের হাই প্রিস্ট আর প্রাইমেট হিসেবে খেপিয়ে তুলছে ধর্মান্ধ জনতাকে-

    যাক গে, বাদ দাও। গত মাসে হার্ডিনের একটা উক্তি শুনিয়েছিলে তুমি আমাকে, মনে আছে? আমরা ওদের দেখিয়ে দেব, অ্যাটম-ব্লাস্টার দুদিকেই তাক করা যায়।

    মেয়র আসন গ্রহণ করছেন। কাউন্সিল মেম্বাররা সবাই উঠে দাঁড়িয়েছেন তাঁকে সম্মান দেখানোর জন্যে।

    ম্যালো ফিস ফিস করে বললেন, আজকে আমার পালা। বসে বসে মজা দেখ শুধু।

    দিনের কার্যক্রম শুরু হলো এবং তার মিনিট পনেরো পরে রুষ্টভাবে বিড়বিড় করতে করতে মেয়রের বেঞ্চের সামনে খালি জায়গাটায় এসে দাঁড়ালেন হোবার ম্যালো।

    আলাদা একটা আলোকরশ্মি এসে পড়ল তাঁর ওপর। শহরের পাবলিক ভিজরগুলোতে এবং ফাউণ্ডেশনের গ্রহগুলোয় প্রায় প্রতিটি বাড়ির অগুনতি প্রাইভেট ভিজরে দশাসই চেহারার এক লোকের অবজ্ঞাভরা মুখ ভেসে উঠল।

    শান্ত, সাবলীল কণ্ঠে শুরু করলেন তিনিঃ সময় বাঁচাবার জন্যে আমি প্রথমেই এই মামলায় আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ স্বীকার করে নিচ্ছি। সেই প্রিস্ট আর উন্মত্ত জনতার গল্পটি পুরোপুরি সত্য।

    একটা আলোড়ন উঠল চেম্বারে। গ্যালারি থেকে ভেসে এল জনরোষের গর্জন। আবার নীরবতা নেমে না আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন ম্যালো। তবে যে-কাহিনীটি আপনারা শুনেছেন সেটা অসম্পূর্ণ। আমি আমার মতো করে গল্পটি শেষ করার সুযোগ দানের আবেদন জানাচ্ছি। আমার গল্পটি প্রথমে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, কিন্তু তাতে বিচলিত না হয়ে পুরোটা শোনার জন্যে অনুরোধ জানাচ্ছি আপনাদের।

    ম্যালো তার সামনে ধরা কাগজপত্রের দিকে না তাকিয়ে বলে চললেন:

    জোরেন সাট আর জেইম টুয়ারের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের দিন থেকেই শুরু করছি আমি। দুজনের সঙ্গে সেদিন আমার কী কথা হয়েছে তা আপনারা জানেন। সেব্যাপারে আমি নতুন কিছু যোগ করতে চাই না। তবে সেদিন আমার মনে কী প্রতিক্রিয়া হয়েছিল সেটা বলতে চাই।

    আমার মনে কিছু সন্দেহ দেখা দিয়েছিল। তার কারণ, সেদিনের ঘটনাগুলো ছিল বেশ অদ্ভুত। ভেবে দেখুন, আমার সঙ্গে তেমন কোনো ঘনিষ্ঠতা বা পরিচয় নেই এমন দুজন লোক আমাকে দুটো অস্বাভাবিক আর কিছুটা অবিশ্বাস্য প্রস্তাব দিলেন।

    অত্যন্ত গোপনীয় একটা ব্যাপারে সরকারের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করতে বললেন আমাকে প্রথম জন, অর্থাৎ মেয়রের সেক্রেটারি। এই গোপনীয় ব্যাপারটির প্রকৃতি আর গুরুত্ব সম্পর্কে ইতিমধ্যেই আপনাদের অবহিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়জন একটি রাজনৈতিক দলের স্বঘোষিত নেতা- আমাকে বললেন আমি যেন কাউন্সিলে একটা আসন বাগাবার চেষ্টা করি।

    স্বাভাবিকভাবেই, তাঁদের আসল উদ্দেশ্য সম্পর্কে কৌতূহল জাগল আমার। সাটের উদ্দেশ্যটা মোটামুটি পরিষ্কার বোঝা গেল। আমাকে তিনি বিশ্বাস করেন না। খুব সম্ভব তিনি ভাবতেন, আমি শত্রুপক্ষের কাছে অ্যাটমিক পাওয়ার বিক্রি করছি আর সেই সঙ্গে একটা অভ্যুত্থানের পাঁয়তারা করছি। সুতরাং ঐ মিশনে স্পাই হিসেবে তাঁর নিজের একজন লোক মোতায়েন করা দরকার তার, আমাকে চোখে চোখে রাখার জন্যে। অবশ্যি এব্যাপারটা জেইম টুয়ার সিনে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত আমার মাথায় আসেনি।

    আবার দেখুন, টুয়ার বললেন তিনি একজন ট্রেডার, তবে এখন রাজনীতি করছেন। অথচ এই ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আমার ব্যাপক জানাশোনা থাকা সত্ত্বেও তার ট্রেডিং ক্যারিয়ার সম্পর্কে কিছুই কানে আসেনি আমার। আরো একটা মারাত্মক ব্যাপার হচ্ছে, টুয়ার আমাকে গর্ব করে জানালেন, তাঁর লে এজুকেশন আছে, অথচ দেখা গেল তিনি সেলডন ক্রাইসিসের নামই শোনেননি কখনো।

    কথাটার গুরুত্ব অনুধাবন করার জন্যে সবাইকে একটু সময় দিলেন ম্যালো। চমৎকার একটা নীরবতা উপহার পেলেন তিনি। সবাই যেন শ্বাস বন্ধ করে আছে। বলাবাহুল্য, ম্যালোর বক্তব্যের এই অংশগুলো কেবল টার্মিনাসবাসীদের জন্যে। আউটার প্লানেটের লোকজন ঠিক ততটাই শুনতে পাবে যতটুকু তাদের ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। আর যাই হোক, সেলডন ক্রাইসিসের কথা তারা কিছুই শুনবে না। তবে সেই সেন্সর করা অংশেও এমন কিছু ব্যাপার থাকবে যা তাদের ভাবাবে।

    ম্যালো শুরু করলেন আবার: এখানে উপস্থিত সবাই একবাক্যে স্বীকার করবেন যে, লে এজুকেশনপ্রাপ্ত কোনো লোক সেলডন ক্রাইসিস সম্পর্কে অজ্ঞ থাকতেই পারে না। অন্যদিকে, সেলডন পরিকল্পিত ইতিহাস সম্পর্কে একেবারেই নীরব এরকম শিক্ষা ব্যবস্থা ফাউণ্ডেশন মাত্র একটাই আছে, আর সেই শিক্ষা ব্যবস্থা তাকে আধা-পৌরাণিক একজন জাদুকর বলে মনে করে।

    সুতরাং আমি তখনই বুঝে নিলাম, জেইম টুয়ার কস্মিনকালেও ট্রেডার ছিলেন। বুঝলাম, তিনি আসলে হোলি অর্ডার-এর অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। কিংবা হয়ত দস্তুরমত পাদ্রীই ছিলেন। আর যে তিন বছর তিনি পাদ্রীদের রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ছিলেন বলে দাবি করছেন, সে তিন বছর আসলে জোরেন সাটের চর হিসেবে কাজ করেছেন তিনি।

    তো, এই সময় আমি অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়লাম একটা। সাট আমাকে নিয়ে কী করতে চান আমি জানতাম না। কিন্তু তিনি যেহেতু আমার ওপর নানান চাল খাটাচ্ছিলেন, আমিও বাধ্য হয়ে ছোট্ট একটা চাল চেলে দিলাম। আমি ভাবলাম, আন-অফিসিয়াল গার্ডিয়ান হিসেবে আমার সঙ্গে নিতে হবে টুয়ারকে। আমি জানতাম, চালটা ব্যর্থ হলেও, অর্থাৎ টুয়ার আমার সঙ্গে না গেলেও, আমার পেছনে অন্য কোনো ফেউ ঠিকই লাগবে। সেই ফেউটাকে সময়মত চিনতে পারাটা সমস্যা হতে পারত আমার জন্যে। সে তুলনায় চেনা শত্রু অনেক নিরাপদ। আমি টুয়ারকে আমার সঙ্গে যাবার আমন্ত্রণ জানালাম। তিনি রাজি হলেন।

    কাউন্সিল সদস্যবৃন্দ, এতে কিন্তু দুটো ব্যাপার পরিষ্কার হলো। এক, জেইম টুয়ার আমার বন্ধু নন। অথচ এই মামলা আপনাদের এই ধারণাই দিতো যে, বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও বিবেকের তাড়নায়, অনিচ্ছাসত্ত্বেও তিনি আমার বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছেন। তিনি আসলে একজন পাই, টাকা খেয়ে সেই মতো কাজ করছেন। দুই, যাকে খুন করার দায়ে আমার বিচার হচ্ছে সেই প্রিস্ট লোকটা আমার কাছে আশ্রয় চাওয়ার পরেও কেন আমি তাকে ঐ বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে তুলে দিয়েছিলাম তার ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে এতে।

    কাউন্সিলের চেম্বার জুড়ে ফিস ফিস, কানাকানি শুরু হয়ে গেল। নাটুকে ভঙ্গিতে গলা খাকারী দিয়ে আবার বলতে লাগলেন ম্যালোর।

    আমাদের শিপে একজন রিফিউজি মিশনারি এসে উঠেছে, এই খবরটা প্রথম শুনে আমার মনের ভেতর যে-অনুভূতি হয়েছিল সেকথা বলতে ঘৃণা হচ্ছে আমার। এমনকি সেকথা মনে করতেও ঘৃণা হয় আমার। আসলে চরম অনিশ্চিত এক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল তখন। সে-মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল, কাজটা সাটের। আমার সমস্ত হিসেব-নিকেশের বাইরে ছিল এঘটনাটা। একেবারে অথৈ সাগরে পড়ে গিয়েছিলাম আমি।

    আমার তখন একটাই কাজ করার ছিল। অফিসারদের ডাকতে পাঠাবার ছলে পাঁচ মিনিটের জন্যে টুয়ারকে ঘরের বাইরে পাঠিয়ে দিলাম আমি। তারপর তার অনুপস্থিতিতে একট ভিজুয়াল রেকর্ডার চালু করে দিলাম। যাতে করে, যা-ই ঘটুক

    কেন ভবিষ্যতে সেটা যেন বিশ্লেষণ করে দেখা যায়। একটা আশাতেই আন্তরিক এবং উন্মত্ত একটা আশা নিয়েই কাজটা করেছিলাম আমি আর তা হল, সে-মুহূর্তে আমার কাছে যা ঘোলাটে মনে হচ্ছিল, রিভিউ করার পর তা হয়ত পরিষ্কার হয়ে যাবে।

    সেই ভিজুয়াল রেকর্ডটা কম করে হলেও অন্তত পঞ্চাশবার দেখেছি আমি এ পর্যন্ত। এ মুহূর্তে সেটা আমার সঙ্গেই আছে। আর কাজটা আমি আপনাদের সামনে একান্নতমবার করতে চাই।

    মুহূর্তের মধ্যে চেম্বারের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেল। শোরগোল পড়ে গেল গ্যালারিতে। একঘেয়ে শব্দে মেয়রের হাতুড়ির বাড়ি পড়ল। টার্মিনাসের পঞ্চাশ লাখ বাড়ির উত্তেজিত দর্শকরা তাদের রিসিভিং সেটের আরো কাছে গিয়ে বসল। ওদিকে প্রসিকিউটরের বেঞ্চে জোরেন সাট গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে হাই প্রিস্টের দিকে তাকালেন। নার্ভাস দেখাচ্ছে হাই প্রিস্টকে। জ্বলজ্বলে দৃষ্টিতে ম্যালোর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন তিনি।

    চেম্বারের মাঝখানটা পরিষ্কার করা হলো। কমে এল আলো। বাঁ দিকের বেঞ্চ থেকে অ্যাংকর জেল প্রয়োজনীয় অ্যাডজাস্টমেন্ট করলেন। ছোট্ট একটা ক্লিক শব্দ। তারপরই ভেসে উঠল একটি দৃশ্য- রঙিন, ত্রিমাত্রিক, একেবারে জীবন্ত, যদিও জীবন্ত নয়।

    সার্জেন্ট এবং লেফটেন্যান্টের মাঝখানে বিধ্বস্ত, হতবিহ্বল মিশনারিকে দেখা গেল। একটু দূরেই দেখা গেল ম্যালোকে। তারপর সার বেঁধে অফিসাররা ঘরের ভেতর ঢুকল। টুয়ার এক প্রান্তে এসে দাঁড়ালেন।

    পরিষ্কারভাবে শোনা গেল কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ- সার্জেন্টকে শাসানো হলো, জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো মিশনারিকে। জনতার আবির্ভাব ঘটল। তাদের সম্মিলিত গর্জন শোনা গেল। এবং রেভার্ড জর্ড পার্মা তার আকুল আবেদন পেশ করল। ম্যালো তার গান বের করলেন, টেনে নিয়ে যাওয়ার সময় মিশনারি লোকটা পাগলের মতো হাত উচিয়ে অভিশাপ বর্ষণ করে গেল, ছোট্ট একটা আলোর শিখা জ্বলে উঠেই নিভে গেল।

    পরিস্থিতির ভয়াবহতায় থ মেরে যাওয়া অফিসাররা দাঁড়িয়ে আছে, টুয়ার কাঁপা হাতে দুকান চেপে ধরেছেন, ম্যালো শান্তভাবে তাঁর গান সরিয়ে রাখছেন- এই অবস্থায় শেষ হয়ে গেল দৃশ্যটা।

    আবার আলো জ্বলে উঠেছে। মেঝের মাঝখানের অংশটা দেখে বোঝার উপায় নেই একটু আগে এখানে কী ঘটে গেছে। ম্যালো, বাস্তবের ম্যালো, আবার কথকের ভূমিকা নিলেন:

    যেদৃশ্যটা আপনারা দেখলেন, বাহ্যিকভাবে ঠিক এভাবেই ঘটনাটাকে উপস্থাপিত করা হয়েছে এই মামলায়। একটু পরই ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করছি। কিন্তু তার আগে বলে নেই, জেইম টুয়ার এই ঘটনায় যেভাবে রিঅ্যাক্ট করেছেন তাতে পরিষ্কারভাবে বোঝা যায় তিনি যাজকীয় শিক্ষায় শিক্ষিত।

    ঘটনাটার কয়েকটা অসঙ্গতির দিকে সেদিনই টুয়ারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলাম আমি। প্রায় জনশূন্য একটা এলাকায় ছিলাম আমরা তখন। সেখানে মিশনারি লোকটা হঠাৎ কোত্থেকে উদয় হলো সেকথা জানতে চাইলাম আমি তাঁর কাছে। একথাও জিগ্যেস করলাম, সবচেয়ে কাছের শহরটা কয়েক শশা মাইল দূরে, কিন্তু তারপরেও এত লোক হুট করে কোত্থেকে হাজির হলো? এই মামলায় এসব সমস্যার দিকে কোনো নজর দেয়া হয়নি।

    কিংবা অন্যগুলোর দিকেও না, জর্ড পার্মা যেভাবে আমায় দেখ বলে গায়ে পড়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল সেটার কথাই বিবেচনা করুন। কোরেল আর ফাউণ্ডেশনের আইন অগ্রাহ্য করে, প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে, একজন মিশনারি ঝকঝকে নতুন পুরোদস্তুর যাজকীয় পোশাক পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে ব্যাপারটা কেমন যেন গোলমেলে মনে হয় না? সে-মুহূর্তে আমি যে ব্যাখ্যাটি দাঁড় করিয়েছিলাম তা হলো, খুব সম্ভব কমোডর মিশনারি লোকটাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই একটা টোপ হিসেবে পাঠিয়েছে, যাতে করে আমরা আগ্রাসনমূলক একট বেআইনি কাজ করতে বাধ্য হই। তাতে করে আমাদের সবাইকে শিপশুদ্ধ উড়িয়ে দেবার কোনো আইনগত বাধা থাকবে না।

    সেদিক থেকে যে আমার কাজটি ঠিকই ছিল, বাদিপক্ষ তা আগেই বুঝতে পেরেছেন। তাঁরা জানতেন, আর আশাও করেছিলেন যে, আমি কেবল একটি যুক্তিই দেখাতে পারব আমার কাজের পক্ষে; আর সেটা হচ্ছে আমার শিপ, আমার, এমনকি আমার মিশন পর্যন্ত হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল তখন। আর মাত্র একটি লোকের জন্যে এতকিছু বিসর্জন দেয়া সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে যখন আমাদের সাহায্য পাক বা না পাক, লোকটাকে মরতেই হতো। কিন্তু তাঁরা ইনিয়ে বিনিয়ে বারবার শুধু একটা কথাই জিকির করছেন, এতে নাকি ফাউণ্ডেশনের সম্মান নষ্ট হয়েছে, আমাদের মর্যাদার পতাকা ধুলোয় লুণ্ঠিত হয়েছে আর আমাদের কর্তৃত্ব ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

    অথচ কিছু রহস্যময় কারণে তাঁরা ব্যক্তিগতভাবে জর্ড পার্মাকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। পার্মা সংক্রান্ত কোনো তথ্যই তারা হাজির করেননি। তার জন্ম, শিক্ষা বা অতীত ইতিহাস- কোনো কিছুই না। কেন করেননি তা যদি জানা যায় তাহলে একটু আগে যে অসঙ্গতিগুলোর দিকে আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি, সেগুলোর একটা সদুত্তর পাওয়া যাবে। দুটো ব্যাপার একই সূত্রে গাঁথা।

    জর্ড পার্মা সংক্রান্ত কোনো তথ্য বাদীপক্ষ হাজির করেননি তার কারণ তাঁরা তা করতে অপারগ। ভিজুয়াল রেকর্ডে আপনারা যে দৃশ্য দেখবেন সেটা কি মেকি বলে মনে হয়নি আপনাদের? সত্যি-ই দৃশ্যটা মেকি। তার কারণ, স্বয়ং জর্ড পার্মাই মেকি। জর্ড পার্মা বলে কেউ কখনো ছিল না। যে ইস্যুর কোনো অস্তিত্বই নেই তার ওপরে দাঁড় করানো, ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রহসন হচ্ছে এই মামলাটা।

    গুঞ্জন এবং কোলাহল প্রশমিত হবার জন্য আবারও বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো ম্যালোকে। তারপর ধীর কণ্ঠে তিনি বললেন:

    আমি এখন আপনাদের ভিজুয়াল রেকর্ডের একটা স্টিল আর সেটার এনলার্জমেন্ট দেখাচ্ছি। এটা দেখলেই সবকিছু পানির মতো পরিষ্কার হয়ে যাবে আপনাদের কাছে। লাইটস এগেইন জেল।

    আলো কমে এল চেম্বারে। স্থির কিছু প্রতিমূর্তির ভৌতিক বিভ্রম সৃষ্টি হলো শূন্যে। ফার স্টারের অফিসাররা উদ্ভট ভঙ্গিতে স্থির হয়ে আছে। ডান হাতে একটি গান তাক করে আছেন ম্যালো। তাঁর বাঁ দিকে রেভার্ড পার্মাকে দেখা গেল চিৎকারের মাঝপথে ধরা পড়ে গেছে, তার হাত থাবার মতো করে ওপরে তোলা, আস্তিনটা নিচে মেনে আসার মুহূর্তে মাঝ পথে থেমে গেছে। গতবার যে ক্ষীণ আলোকরশ্মি জ্বলে উঠেই নিভে গিয়েছিল সেটাই এবার দেখা গেল মিশনারির ঐ হাত থেকে স্থির হয়ে জ্বলছে।

    পার্মার হাতের ঐ আলোর ওপর নজর রাখুন সবাই ভাল করে, অন্ধকারে ম্যালোর কণ্ঠ ভেসে এল। দৃশ্যটা বড় কর, জেল।

    চোখের নিমেষে বড় হয়ে গেল দৃশ্যটা। অন্যান্য অংশ বাদ পড়ে গিয়ে মিশনারি লোকটা চলে এসেছে মধ্যেখানে। দানবের মতো লাগছে তাকে এখন। এরপর শুধু মাথা, আর একটা বাহু। তারপর শুধু হাতটাই রইল সমস্তটা জুড়ে।

    আলোটা হয়ে গেছে তিনটে জ্বলজ্বলে অক্ষরের একটা সেট- কে এস পি।

    জেটেলমেন, ওটা একটা উল্কি। গমগম করে উঠল ম্যালোর গলা গোটা চেম্বার জুড়ে। সাধারণ আলোতে চোখে পড়ে না। কিন্তু আন্ট্রাভায়োলেট রশ্মিতে একেবারে দেয়ালভাস্কর্যের মতো নজরে পড়ে। ভিজুয়াল রেকর্ডটা গ্রহণ করার সময় এই অতিবেগুনী রশ্মিতে ঘর ভরে দিয়েছিলাম আমি।

    গোপন পরিচয়চিহ্ন এঁকে রাখার জন্যে এধরনের উল্কির ব্যবহার বেশ সেকেলে ঠিকই, কিন্তু কোরেলে তাতে কাজ চলে যায়, অসুবিধে হয় না। কারণ সেখানে যত্রতত্র এই ইউভি লাইট পাওয়া যায় না। এমনকি আমাদের শিপেও অনেকটা আকস্মিকভাবেই আবিষ্কার হয়েছে ঐ উল্কির অস্তিত্ব।

    অনেকেই হয়ত ইতিমধ্যে অনুমান করতে পেরেছেন, কে এস পি-তে কী হয়। জর্ড পার্মা যাজকীয় কথাবার্তা বেশ ভালই রপ্ত করেছিল, আর সে তার কাজ সুচারুভাবেই শেষ করেছিল। কোত্থেকে কীভাবে সে এতকিছু শিখল বলতে পারব না, তবে কে এস পি হচ্ছে কোরেলিয়ান সিক্রেট পুলিশ-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।

    যেন বোমা ফাটল কাউন্সিল চেম্বারে। তুমুল হৈ-হট্টগোল আর হুলস্থূল ছাপিয়ে কথা বলার জন্যে রীতিমত গর্জন করতে হলো ম্যালোকে। ডকুমেন্টের মতো করে কোরেল থেকে এব্যাপারে উপযুক্ত প্রমাণাদি নিয়ে এসেছি আমি। দরকার হলে আমি সেগুলো কাউন্সিলের কাছে জমা দিতে পারি।

    এখন কোথায় গিয়ে ঠেকল বাদীপক্ষের ঐসব অভিযোগ? তাঁরা বার বারই এই অসম্ভব কথাটাই বোঝাতে চেয়েছেন যে, ফাউণ্ডেশনের সম্মানের খাতিরে, আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, মিশনারি লোকটার পক্ষ নেয়া উচিত ছিল আমার। উচিত ছিল আমার শিপ, আমার মিশন আর নিজেকে বিসর্জন দেয়া।

    কিন্তু একটা প্রতারকের জন্যে এতবড় কাজ করতে হবে?

    ছদ্মবেশী একজন কোরেলিয়ান সিক্রেট এজেন্টের জন্যে সেকাজ করা কি উচিত ছিল আমার? জোরেন সাট আর পাবলিস ম্যানলিও আমাকে এ রকম একটা জঘন্য, নোংরা ফাঁদে ফেলতে পারলে-

    জনতার সোল্লাস চিৎকারে ম্যালোর ভাঙা গলা চাপা পড়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে তারা তাঁকে কাঁধে তুলে নিয়ে মেয়রের বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ম্যালো দেখলেন, পাগলপারা জনস্রোত স্কোয়ারের হাজার হাজার জনতার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে।

    অ্যাংকর জেল-এর খোঁজে চারদিকে তাকালেন ম্যালো। কিন্তু সেই উন্মত্ত জনতার ভিড়ে একটি বিশেষ মুখ শনাক্ত করা দুঃসাধ্য ব্যাপার। ধীরে ধীরে তিনি থেকে থেকে ওঠা একটা সম্মিলিত, ছন্দোবদ্ধ চিৎকার সম্পর্কে সচেতন হলেন, ছোট্ট করে শুরু হয়ে উন্মত্তের মতো স্পন্দিত হতে হতে ছড়িয়ে পড়ছে চিৎকারটা।

    ম্যালো, জিন্দাবাদ- ম্যালো, জিন্দাবাদ- ম্যালো, জিন্দাবাদ–

    .

    পনের

    চোখ পিটপিট করে ম্যালোর বিধ্বস্ত মুখের দিকে তাকালেন অ্যাংকর জেল। নিষ্ঠুম উন্মাদনার মধ্যে গত দুটো দিন কেটেছে তাঁদের।

    ম্যালো, খেল তুমি ভালই দেখালে। কিন্তু তাই বলে বামন হয়ে চাঁদ ধরার জন্যে লাফিয়ে সব কিছু নষ্ট কোরো না। মেয়র হবার কথা নিশ্চয়ই সিরিয়াসলি ভাবছ না তুমি? জনতার উচ্ছ্বাস একটা শক্তিশালী জিনিস বটে, কিন্তু সেটা ভালুক-জ্বরের মতোই ক্ষণস্থায়ী।

    ঠিক!গম্ভীর চালে সায় দিলেন ম্যালো। আর সেজন্যেই এটাকে গলার মাদুলি করে রাখতে হবে আমাদের। আর সেটা করার শ্রেষ্ঠ উপায় হচ্ছে খেলাটা চালিয়ে যাওয়া।

    তাহলে এবার কোন চালটা চালছ?

    পাবলিক ম্যানলিয়ো আর জোরেন সাটকে গ্রেফতার করাবার ব্যবস্থা কর-

    কী!

    যা শুনেছ, ঠিকই শুনেছ। মেয়রকে দিয়েই কাজটা করাও। যেকোনো হুমকি দিয়ে কাজটা করতে পার তুমি, আমার আপত্তি নেই। জনতা আপাতত আমার হাতের মুঠোয়। মেয়রের সাহস হবে না তাদের মুখোমুখি হওয়ার।

    কিন্তু বাপু, গ্রেফতার করা হবে কোন অজুহাতে?

    কেন? সেটা তো দিব্যি নাকের ডগাতেই রয়েছে। ফাউণ্ডেশনের দলীয় কোন্দলে অংশগ্রহণ করার জন্যে তারা আউটার প্ল্যানেটগুলোর যাজকদের ইন্ধন যোগাচ্ছিল। সেলডনের দিব্যি, এধরনের কাজ বেআইনি। স্টেটের নিরাপত্তা নষ্ট করছিল ওরা এই অভিযোগও আনতে পার তুমি দুজনের বিরুদ্ধে। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার সময় সেটা টিকবে কি না তা নিয়ে যেমন ওরা মাথা ঘামায়নি, আমিও তেমনি সেব্যাপারে মাথা ঘামাচ্ছি না। আমি মেয়র না হওয়া পর্যন্ত মূলধারা থেকে সরিয়ে রাখ শুধু ওদের দুজনকে।

    নির্বাচনের তো এখনো ছমাস বাকি!

    সেটা এমন কিছু সময় নয়, ম্যালো উঠে দাঁড়ালেন। শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন জেলের দু বাহু।

    শোন, দরকার হলে আমি গায়ের জোরে ক্ষমতা দখল করব, একশো বছর আগে স্যালভর হার্ডিন যেমন করেছিলেন। সেই সেলডন ক্রাইসিস আবার এগিয়ে আসছে, আর সেটা যখন একেবারে সামনে এসে দাঁড়াবে, আমাকে তখন মেয়র আর হাই প্রিস্ট- এই দুটো পদেই থাকতে হবে।

    জেলের ভ্রূ কুঁচকে গেল। শান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, তা, ক্রাইসিসের কারণটা কী? কোরেল, তাই না?

    ম্যালো মাথা ঝাঁকালেন, আলবৎ। শেষ পর্যন্ত ওরা যুদ্ধ ঘোষণা করবে। যদিও আমি নিশ্চিত, সেজন্য অন্তত আরো দুবছর সময় নেবে ওরা।

    ওরা কি অ্যাটমিক শিপ ব্যবহার করবে?

    তোমার কী মনে হয়? ওদের স্পেস সেক্টরে আমরা যে তিনটে মার্চেন্ট শিপ হারিয়েছি সেগুলো নিশ্চয়ই কম্প্রেসড এয়ার পিস্তল দিয়ে ভূপাতিত করা হয়নি? জেল, ওরা খোদ এম্পায়ারের কাছ থেকে শিপ পাচ্ছে। বোকার মতো অমন হাঁ করে তাকিয়ে থাকার কী হলো? ঠিকই শুনেছ তুমি শব্দটা, এম্পায়ার। এখনো ইন্তেকাল ফরমায়নি এম্পায়ার, বুঝেছ। এখানে, এই পেরিফেরিতে হয়ত তার কোনো চিহ্ন নেই, কিন্তু গ্যালাকটিক সেন্টারে সেটা বেশ বহাল তবিয়তেই আছে। একটা চাল এদিক সেদিক হলেই একেবারে আমাদের ঘাড়ের ওপর এসে পড়তে পারে সেটা। সেজন্যই আমার মেয়র আর হাই প্রিস্ট হওয়াটা এত জরুরি। কেবল আমিই জানি, কীভাবে ক্রাইসিসটা ঠেকাতে হবে।

    একটা ঢোক গিললেন জেল। কীভাবে? কী করতে চাইছ তুমি?

    রহস্যময় একটা হাসি খেলে গেল ম্যালোর মুখে। কিছুই না।

    কিন্তু ম্যালোর গলায় কোনো সংশয়, কোনো দ্বিধার চিহ্ন নেই। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে তিনি বললেন, ফাউণ্ডেশনের সর্বেসর্বা হয়ে বসার পর আমি কিছুই করব না। নির্জলা কিছুই না। আর এটাই এই ক্রাইসিসের গোপন কথা।

    .

    ষোল

    পাতলা ভুরু ধূর্তের মতো একটু নামিয়ে স্ত্রীর আগমনকে স্বাগত জানালেন কোরেলিয়ান রিপাবলিকের কমোডর সুপ্রিয় অ্যাসপার আর্গো। তবে তাঁর স্ত্রীর কাছে যে উপাধিটির কানাকড়িও মূল্য নেই, তা তিনি ভাল করেই জানেন।

    কমোডরা তার চুলের মত মসৃণ এবং চোখের মত শীতল গলায় বলে উঠলেন, যদ্র বুঝতে পারছি, সদাশয় পতিদেবতা আমার শেষ পর্যন্ত ফাউণ্ডেশনের ঐ ভূঁইফোড়গুলোর ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।

    বটে! তিক্ত কণ্ঠ কমোডরের। তা, তোমার বহুমুখী বোধশক্তিতে আর কী ধরা পড়ল?

    অনেক কিছু, মহাত্মা পতিদেবতা। আপনি আপনার কাউন্সিলারদের সঙ্গে আবারো একটা আলোচনায় মিলিত হয়েছেন। আর সে-আলোচনার ফল হয়েছে অষ্টরম্ভা। বলিহারি উপদেষ্টা আপনার! তীব্র শ্লেষ ঝরে পড়ল ভদ্রমহিলার কণ্ঠ থেকে।

    তা এই অসাধারণ উৎসটি কে যার বদৌলতে তোমার বোধশক্তি এত কিছু বুঝে ফেলল? শান্ত কণ্ঠে কমোডর জিগ্যেস করলেন।

    হেসে উঠলেন কমোডরা। সেকথা তোমাকে বলে দিলে আমার উৎস আর উৎস থাকবে না। পরদিনই লাশ হয়ে যাবে।

    তা বেশ। বরাবর নিজের খেয়ালেই চলেছ, এখনো তাই চলবে, এ আর এমন কথা কী! শ্রাগ করে ঘুরে দাঁড়ালেন কমোডর। তবে তোমার বাবা যেরকম চটে আছেন তাতে আমার আশঙ্কা হচ্ছে তিনি বরাবরের মতো এবারো কৃপণের মতোই আচরণ করবেন। অর্থাৎ বলতে চাচ্ছি, আরো শিপ পাঠাতে অস্বীকার করবেন তিনি।

    আরো শিপ! দপ করে জ্বলে উঠলেন কমোডরা। পাঁচটা শিপ আছে তোমার, কী নেই? না বোলো না, কারণ আমি ভাল করেই জানি যে, পাঁচটা শিপ আছে তোমার। এবং আরেকটা শিপের প্রতিশ্রুতি পেয়ে গেছ।

    গত এক বছর ধরেই সেই মুলো আমার নাকের ডগায় ঝুলে আছে।

    কিন্তু একটা, স্রেফ একটা শিপই তো ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে ফাউণ্ডেশনকে। হ্যাঁ, স্রেফ একটা। ওদের ঐ পিচ্চি সাইজের ডিঙিগুলোকে মহাকাশ থেকে ঝেটিয়ে বিদেয় করার জন্য ঐ একটা শিপই তো যথেষ্ট!

    একটা কেন, এক ডজন শিপ নিয়েও ওদের অ্যাটাক করা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।

    ওদের ঐ ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে, ঐ খেলনা-পাতি আর ফালতু জিনিসগুলো ধ্বংস হয়ে গেলে ওরা কদ্দিন টিকে থাকবে?

    কিন্তু ঐ খেলনা-পাতি আর ফালতু জিনিস মানেই তো টাকা! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন কমোডর। কাড়ি কাড়ি টাকা।

    কিন্তু ফাউণ্ডেশনই যদি তোমার হাতের মুঠোয় চলে আসে তাহলে ওগুলোর সবই কি তোমার হবে না? তাছাড়া আমার বাবার সমীহ আর কৃতজ্ঞতা আদায় করতে পারলে তুমি এমন জিনিস পাবে যা ফাউণ্ডেশন তোমাকে জিন্দেগীতেও দিতে পারবে না। তিন বছরের বেশি হয়ে গেল সেই বর্বর লোকটা এসে ঐ ভেলকি দেখিয়ে গেছে। তিন বছর নেহাত কম সময় নয়।

    মাই ডিয়ার! কমোডরার দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন অ্যাসপার আর্গো। বয়স বাড়ছে আমার। আমি ক্লান্ত। তোমার মুখ ঝামটা সহ্য করার মতো শক্তি আর নেই আমার। একটু আগেই বললে, আমি যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি সেটা তুমি জানো। ঠিকই ধরেছ, আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। কোরেল আর ফাউণ্ডেশনের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।

    যাক, শরীর টানটান করে বলে উঠলেন কমোডরা। ঝিলিক দিয়ে উঠল তাঁর চোখের তারা। শেষ পর্যন্ত শিক্ষা হলো তোমার। যদিও একেবারে শেষ বয়সে এসে। তো, তুমি এই অজপাড়াগাঁর সর্বেসর্বা হলে এম্পায়ারে নিশ্চয়ই প্রভাব প্রতিপত্তি বাড়বে তোমার। তখন কিন্তু আমরা এই বর্বর জায়গা ছেড়ে ভাইসরয়ের প্রাসাদে উঠব। ওঠাই উচিত।

    মুচকি একটা হাসি হেসে, পেছনে একটা হাত ফেলে দ্রুত পায়ে ঘর ছেড়ে চলে গেলেন তিনি। আলোতে ঝলমলিয়ে উঠল তার চুল।

    কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন কমোডর। তারপর বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, যাকে তুমি অজপাড়াগাঁ বললে সেটার ক্ষমতা আমার হাতে এলে তোমার বাবার কুটি আর তার কন্যার ক্ষুরধার জিভের তোয়াক্কা না করেই অনেক কিছু করার মতো সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছে যাব আমি। হ্যাঁ, তোমাদের তোয়াক্কা না করেই!

    .

    সতের

    চোখভরা নির্জলা আতঙ্ক নিয়ে ভিসিপ্লেটটার দিকে তাকিয়ে রইলেন ডার্ক নেবুলা-র সিনিয়র লেফটেন্যান্ট।

    গ্রেট গ্যালপিং গ্যালাক্সি আর্তনাদ করে ওঠা উচিত ছিল, কিন্তু তার বদলে ফিস ফিস করে বলে উঠলেন তিনি, ওটা কী?

    একটা শিপ। তবে ডার্ক নেবুলা যদি একটা মিঠে পানির মাছ হয়, এটা একটা তিমি। এবং সেটার এক পাশে এম্পায়ার-এর মহাকাশযান ও সূর্যের নকশা আঁকা। শিপের প্রতিটি অ্যালার্ম পাগলের মতো বাজতে শুরু করল।

    একটা ছুটোছুটি পড়ে গেল শিপে। ডার্ক নেবুলা সিদ্ধান্ত নিল, সম্ভব হলে লেজ গুটোবে, আর যদি নেহাত বাধ্য হয়ে লড়তেই হয়, তাহলে লড়বে। সেই অনুযায়ী প্রস্তুতি নেয়া হলো। এদিকে আন্ট্রাওয়েভ রুম থেকে একটা মেসেজ হাইপারস্পেস ভেদ করে ছুটে চলল ফাউণ্ডেশনের উদ্দেশে।

    অবিরাম গতিতে মেসেজ পাঠাতে শুরু করল ডার্ক নেবুলা! অংশত সাহায্যের আবেদন হলেও এটা আসলে বিপদ সংকেতই।

    .

    আঠার

    পায়ের ওপর পা চাপিয়ে রিপোর্টের পাতা ওল্টাচ্ছেন হোবার ম্যালো। কিছুক্ষণ পর ক্লান্তভাবে পা বদল করলেন। দু বছরের মেয়রত্ব তাকে আগের চেয়ে একটু বেশি ঘরকুনো, নরম এবং ধৈর্যশীল করে তুলেছে ঠিকই, কিন্তু সরকারি রিপোর্ট এবং সেগুলোর গতানুগতিক একঘেয়ে ভাষা পছন্দ করতে শেখায়নি এখনো।

    কটা শিপ ঘায়েল করেছে ওরা? জেল শুধোলেন।

    ট্র্যাপড্‌ করে চারটে মাটিতে নামিয়েছে, দুটোর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বাকিগুলোর কোনো ক্ষতি হয়নি। নিরাপদেই আছে।

    ঘোৎ জাতীয় একটা শব্দ করলেন ম্যালো নাক দিয়ে। আরো ভাল করা উচিত ছিল আমাদের, অবশ্যি এটা নেহাত একটা আঁচড় ছাড়া কিছু নয়।

    জেল কোনো উত্তর দিলেন না। মুখ তুলে তাকালেন ম্যালো। চিন্তিত মনে হচ্ছে তোমাকে?

    ভাবছি সাট কখন আসবে।

    ও হ্যাঁ, এবার ওর কাছ থেকে আরেকটা লেকচার শোনা যাবে হোম ফ্রন্টের ওপর।

    না, যাবে না, ঝাঁপটা মারলেন জেল। আর তুমি কিন্তু একগুঁয়েমি করছ ম্যালো। বাইরের পরিস্থিতির চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে বিস্তর মাথা ঘামালেও, আমাদের ঘরের মধ্যে, এই টার্মিনাসে কী হচ্ছে না হচ্ছে তুমি কখনো তার কোনো খবর নাওনি।

    দেখ, সেটা তো তোমার কাজ, তাই না? নইলে আর কী জন্যে এজুকেশন অ্যাণ্ড পোপাগাণ্ডা মন্ত্রী বানিয়েছি তোমাকে?

    আর কেন, যাতে অকালে, অসহায়ের মতো করে যেতে পারি। যা একেকটা কাজ চাপাও তুমি আমার ওপর! সাট আর তার অনুসারী ধর্মবাদীরা যে ধীরে ধীরে একটা বিপদ হয়ে দাঁড়াচ্ছে সেকথা বলতে বলতে তো মুখে ফেনা তুলে ফেললাম আমি গত এক বছর। একটা বিশেষ নির্বাচন দিতে বাধ্য করে সে যদি তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়, তাহলে তোমার ঐ সব প্ল্যানে কোনো ফায়দা হবে?

    স্বীকার করছি, কোনো ফায়দা হবে না।

    কাল রাতে তুমি যে বক্তৃতা দিলে তাতে তো ইলেকশনটা একরকম সাটের হাতে তুলে দেয়াই হলো। এত খোলামেলা হওয়ার কি আদৌ কোনো দরকার ছিল?

    তোমার কি একবারও মনে হয়নি যে আসলে সাটের অস্ত্র সাটের ওপরই প্রয়োগ করা হলো?

    না, জের জোর গলায় বলে উঠলেন। অন্তত তুমি যেভাবে কাজটা করলে তাতে সেটা মনে হয়নি। তাছাড়া তুমি দাবি কর, সবকিছু আগে থেকেই বুঝতে বা দেখতে পার তুমি। কিন্তু কখনো এটা ব্যাখ্যা করনি কেন গত তিন বছর ধরে তুমি এমনভাবে কোরেলের সঙ্গে ব্যবসা করেছে যাতে লাভের গুড় বেশির ভাগই ওদের হাতে চলে যায়। এদিকে তোমার সমর-নীতি হচ্ছে যুদ্ধ না করে চুপচাপ বসে থাকা। কোরেলের অদূরে স্পেস সেক্টরগুলোর হাতে সব বাণিজ্য ছেড়ে দিয়ে বসে আছ তুমি। প্রকাশ্যভাবে একটা অচলাবস্থার ঘোষণা দিয়েছ তুমি। বর্তমানের কথা ছেড়েই দিলাম, ভবিষ্যতেও যে কখনো কোনো আগ্রাসী নীতি গ্রহণ করবে তেমন কথাও বলছ না। গ্যালাক্সি, ম্যালো, এই জগাখিচুড়ি অবস্থায় আমি কী করব বলতে পার?

    ব্যাপারটাতে কোনো গ্ল্যামার নেই তাই না, জেল?

    জনতার আবেগ অনুভূতিতে নাড়া দেবার মতো কিছুই নেই তোমার কাজ কর্মে।

    ওই একই কথা হলো। ম্যালো, চোখ মেলে তাকাও একটু। দুটো বিকল্প আছে তোমার হাতে। হয় তোমার ব্যক্তিগত পরিকল্পনাগুলো শিকেয় তুলে রেখে জনগণকে একটা বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি উপহার দাও, আর নয়ত সাটের সঙ্গে একটা আপোস করে ফেল।

    ম্যালো বললেন, ঠিক আছে, মনে কর প্রথম বিকল্পটা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছি আমি। দ্বিতীয় বিকল্পটা চেষ্টা করে দেখা যাক। সাট এসে গেছে।

    দুবছর আগে অনুষ্ঠিত সেই বিচারের পর সাট এবং ম্যলোর এটাই প্রথম ব্যক্তিগত সাক্ষাৎ। দুজনের আচরণের সূক্ষ্ম তারতম্যই পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিল শাসক এবং বিরোধী পক্ষের ভূমিকাটা পাল্টে গেছে। দুজনে পরস্পরের মধ্যে আর কোনো পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন না। করমর্দন না করেই বসে পড়লেন সাট।

    জেল থাকলে কি অসুবিধা আছে? একটা সিগার অফার করে জিগ্যেস করলেন ম্যালো। ওর আন্তরিক ইচ্ছে, একটি আপোসরফা হোক আমাদের মধ্যে। আর তাছাড়া, তেমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ও মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাও নিতে পারবে।

    শ্রাগ করলেন সাট। আপোস হলেই তোমার জন্যে মঙ্গল। এর আগে একবার তোমাকে আমি তোমার শর্ত জানানোর আহ্বান জানিয়েছিলাম। আমার ধারণা পরিস্থিতি এখন ঠিক তার উল্টো।

    ঠিকই ধরেছেন।

    তাহলে আমার শর্তগুলো শুনে নাও। অর্থনৈতিক উৎকোচ প্রদান আর গ্যাজেট বিক্রির হঠকারী নীতি তোমাকে ত্যাগ করতেই হবে, আর ফিরে যেতে হবে আমাদের বাপ-দাদাদের পরীক্ষিত নীতিতে।

    অর্থাৎ মিশনারিদের সাহায্যে রাজ্য জয়ের নীতিতে?

    ইগজ্যাক্টলি।

    এর কমে অন্য কিছুতে আপোস সম্ভব নয়?

    না।

    হুমম। খুব ধীরে ধীরে সিগারে অগ্নিসংযোগ করলেন ম্যালো। কষে একটা টান দিতে সেটার ডগায় উজ্জ্বল দীপ্তি দেখা গেল। হার্ডিনের সময় মিশনারিদের সাহায্যে রাজ্য জয় যখন নতুন আর মৌলিক একটা ব্যাপার ছিল তখন আপনার মতো লোকেরাই তার বিরোধিতা করেছিল। এখন যখন এটা পরীক্ষিত, প্রমাণিত আর পবিত্র বলে স্বীকৃতি পেয়েছে তখন জোরেন সাটের মতো লোকেরা আর কোনো দোষ খুঁজে পান না তার মধ্যে। সে যাই হোক, এবার বলুন, আমাদের এই জগাখিচুড়ি অবস্থা থেকে আপনি কীভাবে সবাইকে উদ্ধার করতে চান?

    বলো তোমার জগাখিচুড়ি অবস্থা থেকে। আমার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক ছিল না।

    প্রশ্নটা আপনার সুবিধে মতো বদলে নিন।

    একটা কড়া আগ্রাসী নীতির প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। যে-অচলাবস্থা নিয়ে তুমি সন্তুষ্ট হয়ে বসে আছ সেটা কিন্তু খুব মারাত্মক। যেখানে সবাইকে আমাদের শক্তির পরিচয় দেয়াটাই সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার সেখানে এটা পেরিফেরির তাবৎ বিশ্বের কাছে নিজেদের দুর্বলতা স্বীকার করারই নামান্তর। আর ওদের মধ্যে এমন কোনো শকুন পাওয়া যাবে না যেটা আমাদের লাশের ওপর ভাগ বসাতে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করবে। এটা তোমার বোঝা উচিত। অবশ্য তুমি স্মিরনোর লোক। … :

    মন্তব্যটার ভেতরে যে ইঙ্গিত ছিল সেটা উপেক্ষা করে গেলেন ম্যালো। বললেন, ধরে নিলাম, কোরেলকে যুদ্ধ হারালেন আপনি, কিন্তু এম্পায়ারের কী হবে? ওটাই তো আসল শত্রু।

    সাটের চাপা হাসি ঠোঁটের দুকোনায় গিয়ে জমা হলো।

    তোমার সিওয়েনা সফরের বিবরণটা কিন্তু অসম্পূর্ণ ছিল না আর যাই হোক। নরম্যানিক সেক্টরের ভাইসরয় তার নিজের স্বার্থেই পেরিফেরিতে বিভেদ সৃষ্টি করতে চান। তবে সেটা একটা সাইড-ইস্যু। গ্যালাক্সির প্রান্তসীমায় অভিযান চালিয়ে সব কিছু বিপদের মুখে ঠেলে দেবার ঝুঁকি তিনি নেবেন না, যখন অন্তত পঞ্চাশটি প্রতিবেশী রাজ্য আর একজন সম্রাট রয়েছে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার জন্যে। এগুলো তোমারই কথা, আমি সংক্ষেপে বললাম।

    কিন্তু সাট, ঝুঁকিটা তিনি নিতেও পারেন, যদি তিনি মনে করেন আমরা বিপজ্জনক রকমের শক্তিশালী। আর আমরা যদি কোরেলকে ধ্বংস করি তাহলে সেকথা মনে করার যথেষ্ট কারণ থাকে বৈকি। সুতরাং আমাদেরকে আরো সূক্ষ্মভাবে এগোতে হবে।

    যেমন–

    চেয়ারের পিঠে গা এলালেন ম্যালো। সাট, আপনাকে আমি একটা সুযোগ দিচ্ছি। আপনাকে আমার দরকার নেই ঠিকই, তবে আপনাকে আমি ব্যবহার করতে পারি। সেকারণেই ব্যাপারটা খুলে বলছি আপনাকে। এরপর ইচ্ছে করলে আপনি আমার সঙ্গে যোগ দিয়ে কোয়ালিশন কেবিনেটে একটা আসন পেতে পারেন, অথবা জেলে পচে মরে শহীদের সম্মান লাভ করতে পারেন।

    এর আগেও তুমি এই শেষ কৌশলটা খাটাতে চেষ্টা করেছিলে।

    এবারের মতো এত আন্তরিকভাবে করিনি, মোক্ষম সময়টা আসলে সবে এল মাত্র। যাক গে, শুনুন এবার। ম্যালোর চোখ দুটো ছোট হয়ে এল।

    প্রথমে নেমে কোরেলে আমি ট্রেডারদের স্টকে সাধারণত যেধরনের জিনিস থাকে সেই সব খেলনা যন্ত্রপাতি ঘুষ দিয়েছিলাম কমোডরকে। গোড়ায় আমার উদ্দেশ্য ছিল শুধু একটা স্টীল ফাউজিতে ঢোকা। ঘুষটা সেজন্যই দেয়া আর এর বাইরে আমার অন্য কোনো প্ল্যান ছিল না। তো, প্ল্যানটা সফল হলো, যা চেয়েছিলাম তা পেলাম। কিন্তু ট্রেডকে যে কী ভীষণ এক অস্ত্রে পরিণত করতে পারি আমি সেটা উপলব্ধি করলাম এম্পায়ার থেকে ঘুরে আসার পর।

    এমুহূর্তে আমরা একটা সেলডন ক্রাইসিসের মুখোমুখি, সাট, আর, বিশেষ কিছু ব্যক্তিকে দিয়ে সেলডন ক্রাইসিসের সমাধান করা যায় না; হিস্টোরিক ফোর্স বা ঐতিহাসিক শক্তি দিয়ে এই ক্রাইসিসের সমাধান করতে হয়। হ্যারি সেলডন যখন আমাদের ভবিষ্যৎ ইতিহাসের পরিকল্পনা করেন, তখন কিন্তু তিনি অসাধারণ সব বীরত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দেননি, বরং অর্থনীতি আর সমাজবিদ্যার ব্যাপক প্রসারের ওপরই নির্ভর করেছিলেন। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, বিভিন্ন ক্রাইসিসের সমাধান করতে চাইলে তা করতে হবে সেই বিশেষ সময়ে প্রচলিত বা সহজলভ্য শক্তি দিয়েই।

    এ ক্ষেত্রে সেই শক্তি হচ্ছে ট্রেড, বাণিজ্য!

    চোখে সন্দেহ নিয়ে ভুরু তুললেন সাট। বিরতিটুকুর সুযোগ নিয়ে বলে উঠলেন, আমার ধারণা, বুদ্ধিশুদ্ধির দিক দিয়ে আমি একেবারে গোবরগণেশের পর্যায়ে পড়ি না। কিন্তু তোমার এই ঘোলাটে লেকচার আমার মাথায় ঢুকছে না।

    ঢুকবে, সাটকে আশ্বস্ত করলেন ম্যালো। একটা কথা ভেবে দেখুন যে, বাণিজ্য শক্তিকে এখন পর্যন্ত তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ভাবা হয়েছে, যাজকতন্ত্রকে ব্যবহার করে বাণিজ্য একটি জোরাল অস্ত্রে পরিণত হচ্ছে। কিন্তু আসলে তা নয়। আর গ্যালাকটিক পরিমণ্ডলে আমার নিজের অবদান এটা। বাণিজ্য কর, কিন্তু প্রিস্টদের ছাড়া। ট্রেড এলোন। আর তার জোর নেহাত কম নয়। আরো সহজে বোঝান যাক ব্যাপারটা। এমুহূর্তে কোরেলের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ চলছে, তাই তো? স্বাভাবিকভাবেই ওদের সঙ্গে আমাদের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু গত তিন বছর ধরে ওদের অর্থনীতি ক্রমবর্ধমান গতিতে যে অ্যাটমিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে সেপ্রযুক্তি আমরাই প্রবর্তন করেছি আর কেবল আমরাই তা সরবরাহ করতে পারি। তো, এই অবস্থায় যদি ছোট ছোট অ্যাটমিক জেনারেটরগুলো হঠাৎ করে নষ্ট হতে শুরু করে, একটার পর একটা যন্ত্রপাতি অকেজো হয়ে যেতে থাকে, তাহলে কী হবে, বলুন তো?

    প্রথম ধাক্কাটা পড়বে গৃহস্থালি ছোটখাটো যন্ত্রপাতির ওপর। প্রথমেই সেগুলো অকেজো হয়ে পড়বে। আপনি যেটা একেবারেই পছন্দ করছেন না অর্থাৎ এই অচলাবস্থাটা, সেটা মাত্র ছমাস চললেই দেখবেন একজন গৃহবধূর অ্যাটমিক ছুরি আর কাজ করছে না, তার স্টোভ অকেজো হয়ে পড়ছে। তার ওয়াশার আর আগের মতো কাজ করছে না। গ্রীষ্মের এক দুঃসহ দুপুরে তার বাড়িতে তাপ-আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচল হয়ে গেছে। কী ঘটবে সেক্ষেত্রে?

    উত্তরের জন্যে অপেক্ষা করে রইলেন তিনি। সাট শান্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন কিছুই ঘটবে না। যুদ্ধের সময় লোজন অনেক কষ্ট সহ্য করে।

    তা ঠিক, করে। বিধ্বস্ত স্পেসশিপের ভেতর করুণভাবে মৃত্যুবরণ করার জন্যে অসংখ্য বাবা-মা তাদের ছেলেদের যুদ্ধে পাঠায়, শত্রুপক্ষের বোমাবর্ষণের মুখেও থাকে অটল-অনড় আর সে জন্য যদি পচা রুটি আর নোংরা পানি খেয়ে আধ মাইল গভীর মাটির গর্তেও দিন কাটাতে হয়, তারা হাসিমুখেই তা মেনে নেয়। কিন্তু এটা তারা করে কখন? যখন গতানুগতিক অর্থে বড়সড় একটা যুদ্ধের মুখোমুখি হয় তারা। করে দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত হয়। কিন্তু আসন্ন দুর্যোগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার মতো কোনো ব্যাপার যখন থাকে না, তখন এসব ছোটখাটো ব্যাপার, অর্থাৎ এই গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি নিয়ে ঝামেলা সহ্য করা খুব কঠিন।

    আমি যেটা বলতে চাইছি তা হলো, আমার স্ট্রাটেজিটা কাজ করলে পরিস্থিতিটা হয়ে দাঁড়াবে পুরোদস্তুর একটা স্টেলমেট- রীতিমত একটা অচলাবস্থা। তাতে যুদ্ধ বলতে সাধারণত আমরা যা বুঝি তার কোনো চাপই থাকবে না। কেউ হতাহত হবে না। বোমাবর্ষণ থাকবে না, হবে না কোনো সংষর্ঘ।

    কী থাকবে তাহলে? থাকবে একটা চাকু, যা দিয়ে কিছু কাটা যায় না; একটা স্টোভ, যা দিয়ে রান্না করা যায় না; একটা বাড়ি, শীতকালে যেটা হিমাগারে পরিণত হয়। মোদ্দা কথা, বিশ্রী একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। লোকজন সব রাগে ফুসবে।

    আকাশ থেকে পড়লেন সাট। তুমি কি এর ওপর ভরসা করে বসে আছ? কী আশা কর তুমি? গৃহিণীদের বিদ্রোহ? ফিরিয়ে দাও আমাদের অটোম্যাটিক সুপার ক্লিনো অ্যাটমিক ওয়াশিং মেশিন- এই স্লোগান দিতে দিতে, হাতে দা-ছুরি নিয়ে নেমে পড়া মুদি আর কসাইদের বিক্ষোভ?।

    না, জনাব, অধৈর্য গলায় বলে উঠলেন ম্যালো, এধরনের কোনোকিছুই আশা করছি না আমি। আমি আশা করছি অসন্তোষ আর বিরক্তিকর একটা অবস্থা, তার কারণ, সেটাকে আমি পরে আরো বড় কোনো ব্যাপারে ব্যবহার করতে পারব।

    তা সেই বড় ব্যাপারটা কী?

    কোরেলের সব ম্যানুফ্যাকচারার, কল-কারখানার মালিক আর শিল্পপতি। স্টেলমেট অবস্থাটা বছর দুই চলার পরেই কল-কারখানার যন্ত্রপাতিগুলো একটা করে অকেজো হতে শুরু করবে। ওদের সব কল-কারখানা আমরা আমাদের অ্যাটমিক যন্ত্রপাতি দিয়ে আপাদমস্তক নতুন করে সাজিয়েছি। সেগুলো হঠাৎ করে পথে বসে পড়বে। ভারি কল-কারখানাগুলো দেখবে, তারা সব একসঙ্গে আর এক ধাক্কায় শুধু অকেজো স্ক্র্যাপ মেশিনারির মালিক বনে গেছে।

    তুমি কোরেলে পা দেবার আগে কিন্তু ওদের ফ্যাক্টরিগুলো ভালই চলত ম্যালো।

    হ্যাঁ, সাট, চলত। কিন্তু এখন তার চেয়ে বিশগুণ বেশি লাভ হচ্ছে। সে যাই হোক, এমন ভরাডুবির পর শিল্পপতি, ফিন্যান্সিয়ার আর গড়পড়তা সাধারণ লোকজন সবাই তার বিরুদ্ধে চলে গেলে কমোডর লোকটা কদিন টিকবে বলতে পারেন?

    তার যতদিন খুশি ততদিন। এম্পায়ার-এর কাছ থেকে নতুন অ্যাটমিক জেনারেটর আনিয়ে নেবে সে।

    হো হো করে হেসে উঠলেন ম্যালো।

    ধরতে পারেননি, সাট, কমোডরের মতো আপনিও ধরতে পারেননি ব্যাপারটা। একেবারেই না। তার মানে, আপনি কিছুই বোঝেননি। শুনুন, সাট, এম্পায়ার একটা জিনিসও রিপ্লেস করতে পারবে না। এম্পায়ার-এর সবকিছুই বিশাল বিশাল, অতিকায়। গ্রহ, স্টেলার সিস্টেম আর গ্যালাক্সির সব কটা সেক্টরের কথা চিন্তা করে ওরা সেই অনুপাতে সবকিছু তৈরি করছে, সবকিছু হিসেব করেছে। ওদের জেনারেটরগুলো পেল্লায় সাইজের। তার কারণ ওদের চিন্তা-ভাবনাও ওরকম।

    কিন্তু একটাই মাত্র গ্রহে সীমাবদ্ধ আমাদের ছোট্ট ফাউণ্ডেশনকে লড়তে হয়েছে একটা নিষ্ঠুর অর্থনীতির বিরুদ্ধে। আমাদের জেনারেটর বুড়ো আঙুলের সমান না হয়ে উপায় ছিল না। কারণ ঐটুকু মেটালই কেবল সম্বল আমাদের। বাধ্য হয়েই নতুন নতুন প্রযুক্তি, আর কৌশল আবিষ্কার করতে হয়েছে আমাদের। আর এই প্রযুক্তি আর কলা-কৌশল অনুকরণ করা সম্ভব নয় এম্পায়ারের পক্ষে। তার কারণ, সত্যিকারের কোনো বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি সাধন করার মতো অবস্থা আর নেই তাদের, অধঃপতন ঘটেছে আগেই।

    গোটা একটা শিপ, শহর, এমনকি একটা গোটা বিশ্ব সুরক্ষিত করার মতো বড় বড় অ্যাটমিক শিল্ড থাকলে কী হবে, আলাদাভাবে মাত্র একটা মানুষকে রক্ষা করার মতো ছোট্ট একটা শিল্ড তারা কখনোই বানাতে পারেনি। আমি নিজেই তো দেখেছি,, শহরে আলো আর তাপ সরবরাহ করার মোটরগুলো একেকটা ছ তলা দালানের সমান উঁচু। আমাদের অ্যাটমিক জেনারেটর আখরোটের আকারের একটা ছোট সীসের কৌটোতেই পুরে রাখা যায় শুনে ওদের এক অ্যাটমিক স্পেশালিস্ট তো একদিন নাক সিঁটকিয়েই মরে।

    ওরা যে এই বিশালতার মধ্যে কতখানি ডুবে আছে সেকথা ওরা নিজেরাই বুঝতে পারে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মেশিনগুলো কাজ করে যাচ্ছে। উত্তরাধিকারসূত্রে কেয়ারটেকার নিযুক্ত হচ্ছে। সেই কেয়ারটেকাররা এমনিই পণ্ডিত যে, বিশাল যন্ত্রটার ছোট একটা ডি-টিউব পুড়ে গেলেই তারা ঠুটো জগন্নাথ হয়ে পড়বে।

    পুরো যুদ্ধটাই কিন্তু হচ্ছে আসলে ঐ দুটো সিস্টেমের মধ্যে; ফাউণ্ডেশন আর এম্পায়ারের মধ্যে, বড় আর ছোটুর মধ্যে। একটা বিশ্বের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতের মুঠোয় আনতে ওরা ঘুষ দেয় বিশাল শিপ, সেগুলো হয়ত যুদ্ধ করতে পারে, কিন্তু কোনো অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে না। অন্যদিকে আমরা ঘুষ দেই ছোট ছোট জিনিস- যুদ্ধে সেগুলো কাজে লাগে না ঠিকই, কিন্তু সমৃদ্ধি আর মুনাফার ব্যাপারে সেগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।

    একজন রাজা বা কমোডর সেই ঘুষের শিপ লুফে নেবে, হয়ত যুদ্ধেও ব্যবহার করবে। ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, সেখানে সব স্বেচ্ছাচারী শাসকদের ছড়াছড়ি। তথাকথিত মান, সম্মান, গৌরব আর বিজয়ের কারণে তারা জনগণের স্বার্থকে বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেনি। কিন্তু তাই বলে এখনো জীবনের ছোটখাটো ব্যাপারগুলোর গুরুত্ব কমে যায়নি, বরং সেগুলোই শক্তিশালী আর সেকারণেই, দুতিন বছরের মধ্যে সারা কোরেল জুড়ে যে অর্থনৈতিক মন্দা ছড়িয়ে পড়বে তার প্রবল তোড়ে অ্যাসপার আর্গো ভেসে যাবে।

    সাট উঠে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন, ম্যালো এবং জেলের দিকে পেছন ফিরে। সবে সন্ধ্যা নেমেছে। গুটিকতেক তারা ফুটেছে আকাশে। মিটমিট করে জ্বলছে গ্যালাক্সির এপ্রান্তে। সাট বলে উঠলেন, না, তোমাকে দিয়ে চলবে না।

    আমার ওপর আপনার আস্থা নেই? আমি বলতে চাইছি, আমি তোমাকে বিশ্বাস করি না। কথা বেচে খেতে ওস্তাদ তুমি। কোরেলে তোমার প্রথম ট্রিপের সময় আমি যখন এই ভেবে খুশিতে নাচছি যে, তুমি আমার হাতের মুঠোতেই রয়েছ, ঠিক সেই সময় আমাকে বোকা বানিয়ে ছেড়ে দিলে তুমি। বিচারের সময় ভাবলাম তোমাকে কোণঠাসা করে ফেলেছি, সেই সময় তুমি আবারো ফসকে গেলে। জননেতার মতো কথার ফুলঝুরি ছড়িয়ে একেবারে মেয়রের চেয়ারে বসে পড়লে। তোমার পেটভরা জিলিপির প্যাঁচ। তোমার প্রতিটি কাজেই দ্বিতীয় একটা উদ্দেশ্য লুকিয়ে থাকে। এক কথায় থাকে তিন রকমের অর্থ।

    এমনকি হতে পারে না যে, তুমি আসলে একটা বিশ্বাসঘাতক? পয়সা আর প্রতিপত্তির টোপ যে গেলোনি এম্পায়ারে গিয়ে সে কথাই বা কে বলবে? আর সেক্ষেত্রে তুমি যে কাজ করতে, এখন ঠিক সেই কাজই করছ। শত্রুর হাত শক্তিশালী করে তুমি একটা যুদ্ধ ডেকে আনতে, ফাউণ্ডেশনকে বাধ্য করতে নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকতে, আর সবকিছুরই এমন একটা বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে যে, কেউ কিছুই সন্দেহ করত না।

    তার মানে আপনি বলতে চাইছেন, আপোস হচ্ছে না? শান্তভাবে জিগ্যেস করলেন ম্যালো।

    ঝট করে ঘুরে দাঁড়ালেন সাট। আমি বলতে চাইছি, তোমাকে বেরিয়ে যেতে হবে- স্বেচ্ছায় অথবা বাধ্য হয়ে।

    সহযোগিতা না করলে আপনার ভাগ্যে কী ঘটবে সেব্যাপারে কিন্তু আগেই সতর্ক করে দিয়েছি আপনাকে।

    আকস্মিক উত্তেজনায় সাটের মুখ মুহূর্তে লাল হয়ে উঠল। আর আমি তোমাকে সতর্ক করে দিচ্ছি, স্মিরনোর হোবার ম্যালো, আমাকে গ্রেফতার করলে তোমার বাঁচার আর কোনো উপায় থাকবে না। আমার লোকেরা তোমার সম্পর্কে সমস্ত তথ্য ফাঁস করে দেবে, আর ফাউণ্ডেশনের জনগণ তাদের ভিনদেশী শাসকের বিরুদ্ধে এক জোট হয়ে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে। নিয়তি সম্পর্কে তাদের মধ্যে একটা সচেতনতা আছে, সেই সচেতনতা তোমার ধ্বংস ডেকে আনবে।

    ঘরের ভেতর ততক্ষণে দুজন গার্ড ঢুকে পড়েছে। ম্যালো শান্তভাবে তাদের হুকুম করলেন, নিয়ে যাও। একে গ্রেফতার করা হলো।

    সাট বলে উঠলেন, শেষ সুযোগটা হারালে তুমি।

    ম্যালো তাঁর হাতের সিগারটা অ্যাশট্রেতে গুঁজে দিলেন। মুখ তুলে তাকালেন না।

    মিনিট খানেক পর নড়েচড়ে উঠলেন জেল। ক্লান্ত কণ্ঠে জিগ্যেস করলেন একজনকে তো শহীদ বানালে। এবার?

    অ্যাশট্রেটা নাড়াচাড়া করছিলেন ম্যালো। থেমে গিয়ে মুখ তুলে তাকালেন।

    আমি যে সাটকে চিনতাম, এ সে নয়। এ একটা অন্ধ ষড়। গ্যালাক্সি! লোকটা আমাকে ঘৃণা করে!

    তার মানে, আরো বিপজ্জনক। আরো বিপজ্জনক? ননসেন্স। ঐ লোকটার সব বিচারবুদ্ধি নষ্ট হয়ে গেছে।

    জেল গম্ভীরভাবে বললেন, তুমি ওভার-কনফিডেন্ট হয়ে পড়ছ ম্যালো। একটা গণআন্দোলনের সম্ভাবনাকে এড়িয়ে যাচ্ছ তুমি।

    ম্যালোও গম্ভীর চালে বললেন, গণআন্দোলনের কোনো সম্ভাবনাই নেই, জেল।

    গায়ের জোরে বললে কিন্তু কথাটা।

    গায়ের জোরে বলিনি, সেলডন ক্রাইসিস আর তার সমাধান যে একটা ঐতিহাসিক সত্য, বাহ্যিকভাবে এবং অভ্যন্তরীণভাবে, সেকথা স্মরণ রেখে বলেছি। কয়েকটা কথা সাটকে বলিনি আমি। আউটার ওয়ার্ল্ডগুলোকে সে যেভাবে ধর্মীয় শক্তির সাহায্যে বশে রেখেছিল, খোদ ফাউণ্ডেশনকেও সে ঐ একই শক্তি দিয়ে বশে রাখার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু পারেনি। এতেই প্রমাণিত হয়ে যে, সেলডন প্রকল্পে ধর্মের আর কোনো ভূমিকা নেই এখন।

    এদিকে অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটা কিন্তু ভিন্নভাবে কাজ করছে। আর তুমি আমাকে স্যালভর হার্ডিনের যে বিখ্যাত কথাটা শুনিয়েছিলে সেটা ধার করে বলতে গেলে বলতে হয়, এটা এমন একটা অ্যাটম-ব্লাস্টার যা দুদিকেই তাক করা যায় না। আমাদের সঙ্গে ব্যবসা করে কোরেল উন্নতি করেছে, আমরাও উন্নতি করেছি। আমাদের সঙ্গে ওদের বাণিজ্য বন্ধ হয়ে গেলে যদি কোরেলিয়ান কল-কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায় আর বাণিজ্যিক অন্তরীণ অবস্থার কারণে যদি আউটার ওয়ার্ল্ডগুলোর সমৃদ্ধি নষ্ট হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে আমাদের কল-কারখানাগুলোও বন্ধ হয়ে যাবে, নেই হয়ে যাবে আমাদের সমৃদ্ধিও।

    এদিকে, এমন কোনো কল-কারখানা, বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান বা শিপিং লাইন নেই যা আমার নিয়ন্ত্রণে নেই। সাট যদি বৈপ্লবিক প্রোপাগাণ্ডা চালায় তখন দেখবে আমি সেটা কীভাবে নস্যাৎ করে দিই। যেসব জায়গায় ওর প্রোপাগাণ্ডা সফল হবে, বা এমনকি সফল হবে বলে মনে হবে, সেসব অঞ্চলের অগ্রগতি যাতে শূন্যের কোঠায় নেমে আসে আমি তা দেখব। কিন্তু যেসব এলাকায় ওর প্রোপাগাণ্ডা ব্যর্থ হবে, সেসব এলাকার সমৃদ্ধি আর অগ্রগতি পুরোপুরি অব্যাহত থাকবে। তার কারণ আমার কল-কারখানায় লোকের কমতি নেই।

    সুতরাং যেযুক্তিতে আমি বিশ্বাস করি যে, কোরেলিয়ানরা তাদের সমৃদ্ধির দাবিতে বিদ্রোহ ঘোষণা করবে, ঠিক একই যুক্তিতে আমি বিশ্বাস করি যে, আমরা এই সমৃদ্ধির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করব না। খেলাটার শেষ পর্যন্ত দেখা হবে।

    তার মানে, ম্যালো, কথার উপসংহার টানলেন জেল, তুমি একটা ধনতন্ত্র প্রতিষ্ঠান করছ। টার্মিনাসকে তুমি ট্রেডার আর বণিক রাজপুত্রদের আবাসভূমিতে পরিণত করছ। তাহলে ভবিষ্যতের কী হবে?

    ম্যালো উগ্র কণ্ঠে বলে উঠলেন, ভবিষ্যৎ দিয়ে আমি কী করব? সেলডন অবশ্য ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামিয়েছেন, আগেভাগে সেটা দেখতে পেয়ে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছেন। কিন্তু আমি যোবার ম্যালো ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামাতে যাব কোন দুঃখে? ভবিষ্যতে আরো অনেক ক্রাইসিস আসবে, আর আজ ধর্ম যেভাবে একটা মৃত শক্তিতে পরিণত হয়েছে তখন মানি পাওয়ারও ঠিক এভাবে মৃত শক্তিতে পরিণত হবে। আমার সমস্যা আমি সমাধান করেছি, আমার উত্তরপুরুষরাও ঠিক একইভাবে তাদের সমস্যা সমাধান করুক।

    ***

    কোরেল- …সুতরাং, ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তপাতহীন যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত এই তিন বছরব্যাপী যুদ্ধের পর কোরেল প্রজাতন্ত্র নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণ করল। এবং ফাউণ্ডেশনের জনগণের হৃদয়ে হ্যারি সেলডন ও স্যালভর হার্ডিনের পাশেই ঠাই পেলেন হোবার ম্যালো।

    –ইনসাইকোগীড়িয়া গ্যালাকচিকা

    ========

    সায়েন্স ফিকশন ফাউণ্ডেশন সিরিজ
    আইজাক আসিমভ

    আইজাক আসিমভ–যাকে বলা হয় গ্র্যাণ্ড মাস্টার অব সায়েন্স ফিকশন। যুগ-যুগ ধরে অগনিত পাঠককে তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মতো আকৃষ্ট করে রেখেছেন। বিজ্ঞানের জটিল বিষয়গুলোকে সহজ সরল ভঙ্গিতে গদ্যে রূপ দিয়েছেন তিনি। ফাউণ্ডেশন সিরিজ আইজাক আসিমভের অমর এক কীর্তি। মাত্র ২১ বছর বয়সে এই সিরিজ লেখা শুরু করেন তিনি। সিরিজের প্রথম ৩টি বই ফাউণ্ডেশন, ফাউণ্ডেশন এণ্ড এম্পায়ার এবং সেকেণ্ড ফাউণ্ডেশন কে একত্রে বলা হয় ফাউন্ডেশন ট্রিলজি।

    ফাউণ্ডেশন ট্রিলজি বেস্ট অল টাইম সিরিজ সম্মানে ভূষিত। প্রথম ৩টি বই লেখার পর আসিমভ ফাউণ্ডেশন সিরিজ লেখা বন্ধ করে দেন। কিন্তু পাঠক, প্রকাশকের অনুরোধে দীর্ঘ দুই যুগ পরে তিনি আবার ফাউণ্ডেশন সিরিজ লেখা শুরু করেন এবং আরো ৪টি খণ্ড যথাক্রমে ফাউণ্ডেশন্স এজ, ফাউণ্ডেশন এণ্ড আর্থ, প্রিলিউড টু ফাউণ্ডেশন ও ফরোয়ার্ড দ্য ফাউণ্ডেশন লিখেন। সিরিজের শেষ বইটি প্রকাশিত হয় তার মৃত্যুর আগের বছর।

    এক সাক্ষাৎকারে তিনি সিরিজটিকে আরো বাড়ানোর ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। আসিমভ বেচে থাকলে পাঠক হয়তো এ সিরিজের আরো বই পড়ার সুযোগ পেতেন। আইজাক আসিমভ ফাউণ্ডেশন সিরিজের মোট ৭টি খণ্ড লিখেছেন। বেস্ট সেলিং সায়েন্স ফিকশন হিসেবে ফাউণ্ডেশন সিরিজ হুগো অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।

    ⤶
    1 2 3 4 5
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleফাউণ্ডেশন অ্যাণ্ড এম্পায়ার – আইজাক আসিমভ
    Next Article অবাক বাংলাদেশ : বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি – আকবর আলি খান

    Related Articles

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    January 8, 2026
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    ভয় সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    কিশোর অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র – হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়

    December 9, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    প্রকাশ্য দিবালোকে – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 18, 2025
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    তারপর কী হল – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

    November 17, 2025
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    শর্ম্মিষ্ঠা নাটক – মাইকেল মধুসূদন দত্ত

    November 11, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }