Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বকধার্মিক – লীলা মজুমদার

    লীলা মজুমদার এক পাতা গল্প83 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    ০৬-১০. এসব এতদিন আগের কথা

    ০৬.

    এসব এতদিন আগের কথা যে ঘটনাগুলো কোনটা আগে কোনটা পরে ঠিক মনে নেই, তবে ওই একটা গোটা বছর আমার জীবনে আর সব বছর থেকে একেবারে আলাদা, এ-বিষয়ে কোনোই সন্দেহ নেই।

    মনে আছে সে বছরটা খাওয়া-দাওয়া বেড়ানো-বুড়োনো এসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাত না। সকলের মুখে সর্বদা ওই এক কথা, কে জানলায় লোহার শিক বসালে, কে লোহার সিন্দুক কিনল, সেটা কোথায় রাখা হল, কার গয়নাগাটি ব্যাঙ্কে জমা হল, কে সেসব সেখানে পৌঁছে দিল– এইসব।

    নেপু বলত, বাঃ, চোরদের তো ভারি সুবিধে হয়ে গেছে, একটু কানখাড়া করে থাকলেই হল, সব খবর পেয়ে যাবে। কার কার কুকুর আছে, তাদের মধ্যে কারা কামড়ায়? কার ঘরে বন্দুক আছে, কে কে সেসব ছুঁড়তে জানে কিছুই কারো জানতে বাকি থাকল না।

    ওই ঘটনার পর যেই পিসিমা সন্ধ্যে বেলায় আলোয়ান মুড়ি দিয়ে আমাদের বারান্দায় উঠেছেন, মা আর জেঠিমা ওঁকে জেরা করতে লেগে গেলেন। ততক্ষণে পিসিমারও রাগ পড়ে গেছে, অনেক কথার উত্তর দিলেন। সবাই সেসব শুনতে এমনি মেতে গেল যে, মাছওয়ালি বুড়ি এক চুবড়ি বিকেলে-ধরা পাহাড়ে কইমাছ নিয়ে এসে ডেকে ডেকে, সাড়া না পেয়ে ফিরেই যাচ্ছিল। ভাগ্যিস আমি বুদ্ধি করে জ্যাঠামশাইকে বললুম, নাহলে সেদিন মাছ খাওয়া হয়েছিল আর কী!

    পিসিমারা তো গিয়ে জেঠিমার শোবার ঘরে ঢুকলেন। আমিও একটু পরে সেখানে গিয়ে শুনি মা বলছেন, যাই বল ঠাকুরঝি, ওই বুড়োর নাতি-নাতনিরা কে কোথায় আছে খোঁজ করা উচিত।

    জেঠিমা বললেন, আর তাই যদি হয় যে সোনার নস্যির কৌটো উদ্ধার করা ওদের উদ্দেশ্য, তবে সে তো হয়েই গেছে, তবু চুরি থামে না কেন?

    পিসিমা জেঠিমার খাটের ওপর পা গুটিয়ে বসে বললেন, তোরা কিছুই জানিস না নাকি? জুয়ো খেলায় আর চুরি করাতে, যতই সফল হওয়া যায় ততই নেশা লেগে যায়।

    মারা চুপ করে থাকছেন দেখে আবার বললেন, তাহলে তোদের সত্যি কথাটাই খুলে বলি। তোরা যেন আবার পাঁচকান করিস নে।

    কৌটো নাহয় চুরি গেছে কিন্তু তার ঢাকনিটা আছে তো? এই এত বড়ো হিরের প্রজাপতি বসানো ঢাকনিটাই তো আসল। সেটি তো আর ওরা পায়নি। আমার তো মনে হয় সেটি উদ্ধারের চেষ্টা চলছে, এ আর কিছু নয়।

    মা অবাক হয়ে বললেন, সেটি বুঝি ব্যাঙ্কে পাঠাওনি? পিসিমাকে যেন বিরক্ত মনে হল।

    আরে তবে বলছি কী, খুঁজে পেলে তো পাঠাব। সে যে কোথায় রেখেছি সে আর কিছুতেই মনে করতে পাচ্ছি নে।

    একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, চোররা পাবে কি, আমিই পাচ্ছি না!

    জেঠিমা বললেন, এই যদি ব্যাপার হয় তো গুটেকে সন্দেহ করা কেন?

    মা-ও আর থাকতে না পেরে আসল কথাটাই বলে বসলেন, আর পরশু বোর্ডিঙের মাসিমার টাকাগুলো দেখে অমন করে চলে গেলে কেন?

    পিসিমা অমনি টুক করে খাট থেকে নেমে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললেন, ওমা, বাগানে এই শীতের মধ্যে ও আবার কীসের চারা গজিয়েছে রে? যাই, একবার দেখেই আসি।

    এই বলে বাগান দেখার নাম করে সেখান থেকে দে পিটান।

    জেঠিমারা বোধ হয় খুব রেগে গেলেন, তাই এতক্ষণ কিছু বলেননি, এবার হঠাৎ আমার দিকে ফিরে খুব ধমকধামক করতে লাগলেন, এইটুকু মেয়ে, তবু বড়োদের কথা শোনা; হেন-তেন কত কী!

    আর একটু রাত হলে জগদীশদা এসে নীচু গলায় বললে, ও মামিমা, তোমরা কি একটা খুব ভালো চাকর রাখতে চাও? দশ টাকা মাইনে, দু-বেলা পেট ভরে ভাত, দু-বেলা চা-জলখাবার, বছরে চারখানি কাপড়, ব্যস্।

    জেঠিমা বললেন, ঠাকুর ছুটি চাইছে, লোক অবিশ্যি আমাদের সত্যি দরকার, কিন্তু অত চায় কেন?

    জগদীশদা কপালে চোখ তুলে বললে, অত মানে কী? তার বদলে কী পাচ্ছ জান? সাক্ষাৎ একটি দ্রৌপদী! ওর রান্না যদি একবার খাও তো সারাজীবন হা-হুঁতাশ করে মরবে! চপ-কাটলেট রাঁধে তো দাঁতের মধ্যে কুরকুর করে ওঠে, আবার মুখে যেতেই মিলিয়ে যায়।

    মাংস রাঁধে যেন ক্ষীর। আর পায়েস-পিঠে বাঙালি হয়ে জন্মানোর দুঃখ ভুলিয়ে দেয়। রাখ তো বলো, গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, ডেকে আনি। খুব ভালো লোক, খুব চেনা আমার।

    জেঠিমা বললেন, তা রাখলে মন্দ হয় না, ঠাকুর তো পাস পার্মিট করিয়ে যাবার জন্যে পা বাড়িয়ে রয়েছে। তার দু-মাস মানেই সাত মাস। তাই তাকে আন তো দেখি।

    জগদীশদা এক দৌড়ে গিয়ে একমুখ দাড়ি গোঁফওয়ালা একটা লোককে ধরে নিয়ে এল।

    আমার জেঠিমা উঠে এসে লণ্ঠনটা তুলে ধরে মুখ দেখতে লাগলেন। চোখে আলো পড়াতে সে লোকটা চোখ পিটপিট করতে লাগল।

    আমি অবাক হয়ে বললুম, ইয়ার্কি পেয়েছ জগদীশদা? এই তোমাদের সেই চোরের সর্দার গুটে না?

    জেঠিমা চমকে উঠে আরেকটু হলেই লণ্ঠনটা ফেলে দিচ্ছিলেন। জগদীশদা আমাকে এক ধমক, তুই থাম দিকিনি। যত বড়ো মুখ নয় তত বড় কথা!

    গুটেও বিরক্ত হয়ে বলল, অত তেজ কীসের তোমার, দিদি? জানো আমি ম্যাট্রিক পাশ? গোয়েন্দাগিরির সার্টিফিকেট আছে আমার। ট্যাক্স দিই।

    জেঠিমা বাধা দিলেন, আচ্ছা আচ্ছা ঢের হয়েছে, করবে তো রাঁধুনিগিরি, তা অত সার্টিফিকেট দিয়ে কী হবে? দেখো, তোমাকে আমি রাখতে পারি ওই মাইনেতে, কিন্তু তাহলে তুমি খালি মন দিয়ে রাঁধাবাড়া করবে। গোয়েন্দাগিরি যা করবার আমরা করব, আমাদের সার্টিফিকেট না থাকতে পারে, কিন্তু খাতায় নাম লেখা আছে। বুঝলে।

    বাবুরা বাজার করে দেবে, আমি দু-বেলার ভাড়ার বের করে দেব, মেজোবউ কুটনো কুটে দেবে, আর তুমি কী রাঁধাবাড়া হবে সব নিজে ঠিক করে, মশলা বেটে, দু-বেলা রাঁধবে, ব্য। তোমার পেছনে আমরা ম্যাও ধরে বেড়াতে পারব না বলে রাখলাম। এবার একটু তদন্ত করবার তাহলে ফুরসত পাব।

    গুটে মাথা চুলকোতে চুলকোতে বললে, গোয়েন্দাগিরিটাই হল গিয়ে আমার পেশা, মাঠাকরুন, সেটাই ছেড়ে দিলে যে একেবারে রাঁধুনে বামুন বনে যাব।

    জেঠিমা আশ্চর্য হয়ে বললেন, মাইনে নিয়ে, দু-বেলা পেটপুজো করে, লোকের বাড়ি রান্নার কাজ করবে আর রাঁধুনে বনবে না, সেটা কী করে হয় বাছা? আমার কথা ভালো না লাগে তো অন্য জায়গায় চেষ্টা করতে পার। তবে পুলিশে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে সেটা মনে রেখো।

    গুটে একটু রেগে গেল, যা হয় একটা বললেই হল কিনা মাঠাকরুণ! পিসিমার কথায় আমাকে যদি পুলিশে ধরে তো ক্ষতি হবে কার?

    গুটে আরও কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ততক্ষণে জগদীশদা গিয়ে বাবা আর জ্যাঠামশাইকে ধরে এনেছে। তারাও চপ কাটলেট মুর্গ-মসল্লামের নাম শুনে ছুটতে ছুটতে এসে হাজির!

    হ্যাঁ, হ্যাঁ, গুটেকে রাখা হোক। জগদীশ ওকে ক-দিন খাটের তলায় লুকিয়ে রাখতে পারে? না হে গুটে, তুমি এখন থেকেই কাজে বহাল হলে। বাপ! পনেরো বচ্ছর ধরে রোজ দু-বেলা শাক-চচ্চড়ি আর মাছের ঝোল খেয়ে খেয়ে খাওয়ায় ঘেন্না ধরে গেছে-না! তা, কাল সকালে কী রাঁধছ বলো!

    এই নিয়ে মহা একটা শোরগোল হয়েছিল। শেষ অবধি জ্যাঠামশাই বললেন যে, আমাদের বাড়ির মধ্যে গুটে গোয়েন্দাগিরি করবে না। কিন্তু রোজ সন্ধ্যে সাড়ে সাতটার মধ্যে রাঁধাবাড়া সেরে ঢাকাটুকি দিয়ে চলে যাবে। আবার সাড়ে দশটায় জ্যাঠামশাই শুতে যান, তার মধ্যে ফিরে আসা চাই। তাই শুনে গুটে মহা কাওম্যাও লাগাল, ও বাবা! রাতে আমি বেরুতে পারব না, আমার ভূতের ভয় করে!

    জেঠিমা দারুণ চটে গেলেন। নবাব! চাকরের কাজ করবেন, তার আবার ভূতের ভয়! ওসব বড়োমানুষি এখানে চলবে না বলে রাখলুম!

    কিন্তু যে যাই বলুক মুর্গ-মসল্লামের কথা শুনে অবধি, বাবা জ্যাঠামশাই গুটেকে ছাড়তে রাজি নন। বাবা বললেন, বেশ, তা হলে রোজ বেলা এগারোটার মধ্যে রান্না সেরে বেরিয়ে যাবে, চারটের সময় ফিরে এসে চায়ের জল চাপাবে।

    বলেই বাবা একটু ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, হারে, দিনে বেরুলে তোকে পুলিশে ধরবে না?

    গুটে সলজ্জ হেসে বললে, না স্যার, আমি লেডি সেজে থাকব। এর মধ্যে দু-দিন ও-রকম সেজে ইন্সপেক্টর বাবুর বাড়ি গিয়ে লেবু বেচে ওনাদের পরখ করে এসেছি। তবে আপনারা কিন্তু আমাকে শশীকলা বলে ডাকবেন। তাতে কোনো দোষ হবে না। শশীকলা হল গিয়ে আমার স্ত্রীর নাম, সে দেশে থাকে, জানতেও পারবে না। আপনাদের কোনো ভয় নেই, কাল সকালের মধ্যে দাড়ি চেঁচে শাড়ি পরে কেমন কাজে লেগে যাই দেখবেন।

    যাবার আগে জগদীশদা বাবাকে বলল, দেখবেন মামা, ওটি একটি রত্ন। আপনার ঠাকুর ফিরে এলেও ওকে আপনার ছাড়তে ইচ্ছে করবে না। তখন কিন্তু আমার কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে বলে রাখলাম। ততদিনে আশা করছি এদিককার গোলযোগ চুকেবুকে যাবে।

    গুটে কিন্তু খুব আপত্তি করতে লাগল, ও আবার কী কথা, স্যার? গোলযোগ চুকে গেলেও আমাকে এ-রকম চাকরি করতে হবে নাকি? আমি হলাম গিয়ে গোয়েন্দা, অন্য কোথাও তদন্ত করতে চলে যাব।

    জগদীশদা বিরক্ত হয়ে বললে, রাখো! তোমার তদন্তের চাইতে তোমার রান্না শতগুণে ভালো।

    তারপর বাবাকে বললে, মামা, বড়ো উপকার করলেন, তার পুরস্কার হাতে হাতে ওই গুটের হাতেই পেয়ে যাবেন রোজ দু-বেলা!

    ০৭.

    এমনি করে শশীকলাদিদি আমাদের বাড়িতে এসে জুটলেন। মা-বাবা, জ্যাঠামশাই, জেঠিমা, জগদীশদাদা আর আমি ছাড়া কেউ আসল ব্যাপারটা জানল না, নেপুও না। ওকে বলা মানেই অপূর্বদাকে বলা, তার মানেই খবরের কাগজে ছেপে দৈওয়া।

    তবে একথা সত্যি শশীকলাদিদি খাসা রাঁধে। প্রথম দিনটা মা-জেঠিমা একটু খেইমেই করেছিলেন, বড় ঘি খরচ করে, ওঁরা রান্নাঘরে গেলে তেড়িয়া হয়ে ওঠে ইত্যাদি। কিন্তু একবার রান্না খেয়ে আর টু শব্দটি করলেন না। একমনে এর ওর বাক্স সার্চ করতে লাগলেন।

    দেখতে দেখতে এক মাস কেটে গেল। আমাদের সকলের ইস্কুল-টিস্কুল কবে খুলে গেল, নতুন বছরের পড়াশুনো শুরু হয়ে গেল, গোছ গোছা সব নতুন বই খাতা এল। কী সুন্দর যে তাদের গন্ধ, নাক লাগিয়ে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করত।

    নেপু দিস্তে দিস্তে হলদে কাগজ কিনে এনে, এক ভাঁড় ময়দার লেই বানিয়ে খাতার মলাট দিতে লেগে গেল। অথচ পড়াশুনো করবে কচু!

    চুরিটুরি গুলোও কমতে কমতে একরকম বন্ধই হয়ে গেল। যাদের ধরা হয়েছিল, তাদের অনেকের বিরুদ্ধেই কোনোরকম প্রমাণ না পাওয়াতে বেশিরভাগই ছাড়া পেয়ে গেল। দেখলুম দিব্যি চেকনাই শরীর করে সব দলে দলে বেরিয়ে এলেন।

    বিকেলে জগদীশদার পিসিমা আমাদের বাড়িতে এলেন।

    দ্যাখ দিকিনি কাণ্ডটা! গুরুদেব সেখান থেকে আধখানা হয়ে এলেন, তবু তার কাছে সব কথা খুলেই বলে ফেললাম। শুনে বললেন, কৌটো গেছে আবার পাওয়া যাবে, কিন্তু হিরের প্রজাপতি দেয়া ঢাকনিটে হাতছাড়া করার কোনো মানেই হয় না, ওটি ওঁর চরণে জিম্মা করে দিলে আর কারো বাবার সাধ্যি থাকবে না খুঁজে বের করে।

    কিন্তু সে যে কোথায় লুকিয়ে রেখেছি কিছুতেই মনে করতে পাচ্ছিনে। গোটা বাড়িটাকে ওলটপালট করে ফেললাম, তবু পেলাম না! কী করা যায় বল দিকিনি? ওটি এখন চুরি গেলেও তো টের পাব না! গুটেকে কেন যে তাড়ালাম! সে থাকলে ছোঁকছোঁক করে ঠিক বের করে দিত!

    মা জেঠিমা এ ওর মুখের দিকে তাকালেন, মা একটু আমতা আমতা করে অন্য কথা পাড়লেন, আচ্ছা, ঠাকুরঝি, সেদিন মাসিমার হাতে পুরোনো টাকা দেখে অমন করে ছুটে চলে গেলে কেন, সে তো বললে না?

    পিসিমা দু-চোখ কপালে তুলে বললেন, ওমা বলিনি বুঝি? দ্যা দিকি কাণ্ড। তবে শোন, আমার বাবা চোখ বুজলে, শ্রাদ্ধশান্তির আগের দিন, ওঁর খাটের তলা থেকে বিরাট এক লোহার ট্রাঙ্ক বেরুল, এমন ভারী যে একা আমি সহজে নাড়াতে পারি নে!

    একদম কানায় কানায় এই বড়ো বড়ো ভারী ভারী রুপোর টাকায় ঠাসা, একেবারে অবিকল বোর্ডিঙের মাসিমার ওই টাকার মতন! তখন আর সময় ছিল না, কে কোথা থেকে দেখে ফেলবে এক মুঠো তুলে ভালো করে দেখবার জন্যে আঁচলে বেঁধে ফেলে বাকি আবার বন্ধ করে ফেললাম। সে কি বন্ধ হয়! বাক্সের ডালায় চেপে বসে তবে বন্ধ করতে হল! অথচ শ্রাদ্ধশান্তির পর ডালা খুলে দেখা গেল কেবল ছেঁড়া কাগজ আর পুরোনো বই দিয়ে ঠাসা!

    জেঠিমা বললেন, ওমা! অত সব নিলে কে?

    পিসিমা প্রায় কেঁদেই ফেলেন, কে নিল বুঝবে কে? এমনকী, যখন টাকার কথা বললাম কেউ বিশ্বাসই করে না। বলে হ্যাঁ, এর বাড়ি ওর বাড়ি খেয়ে বেড়াত, ওর আবার অত টাকা আসবে কোত্থেকে?

    পিসিমা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। মা বললেন, তারপর মাসিমার হাতে ও টাকা দেখে বুঝি ভাবলে যে তোমার গুলোই কেউ সরিয়েছে? বাড়ি গিয়ে কী দেখলে?

    পিসিমা বললেন, দেখলাম আমার পঁচিশটে টাকা ঠিকই আছে। অথচ এগুলোও সেইরকমই দেখতে বটে! কী জানি, কত কী মনে হচ্ছে!

    শশীকলাদিদি এতক্ষণ দোরগোড়া থেকে সব শুনছিল, কেউ টের পায়নি। এবার একটা ছোটো নোটবই আর কপিং পেনসিল বের করে বলে উঠল, আচ্ছা, আপনার বাবা মারা যাবার সময় বাড়িতে কে কে ছিল?

    পিসিমা বললেন, তোমার তাতে কী, বাছা? তবে বলতে কোনো বাধা নেই, বাড়িতে ছিল না বিশেষ কেউ, বুড়ো কি আর কাকেও চটাতে বাকি রেখেছিল! ছিলাম আমি, আর জগদীশের বাবা ঘেঁটু আর আমার অধরা, তার মেয়ে রেবতী আর আমাদের চাকর রামভজন। তাদের কাকেও সন্দেহ করা যায় না, পুরোনো লোক, নিকট আত্মীয়, বিশ-পঁচিশ বছরের সব জানা। তা ছাড়া তাদের বাক্স প্যাটরা খুলিয়ে নিজে দেখেছিলাম, তাইতেই তো সকলের সঙ্গে চিরকালের ছাড়াছাড়ি!– ও কী শশীকলা, আমার সব কথা টুকে রাখছ কেন? না মেজোবউ, বড়োবউ, এ আমি ভালো বুঝি নে!

    শশীকলাদিদি লজ্জা পেয়ে বললে, না, মানে, বাবু আমাদের সবাকার নাম লিখিয়েছেন কি না, তাই সময় পেলেই একটু চেষ্টাচরিত্তির করি।

    জেঠিমা শুকনো গলায় বললেন, সময় কোথায় পেলে বাছা?

    শশীকলাদিদি আর দাঁড়াল না।

    পিসিমা চলে গেলে পর জেঠিমা রান্নাঘরে গিয়ে শশীকলাদিদিকে আচ্ছা করে বকে দিলেন।

    মেয়েমানুষের অত কী বাপু? বলছি না টিকটিকির কাজ আমরা করব, তুমি রাঁধাবাড়া নিয়ে থাকবে। বেলা এগারোটা থেকে চারটে অবধি বাড়ির বাইরে তুমি যা ইচ্ছে করতে পার, তার ওপর আমাদের হাত নেই কিন্তু এখন তুমি আমাদের রাঁধুনি– দাও শিগগির খাতা!

    বলে খাতাখানা টেনে নেন আর কী! শশীদিদিও কিছুতেই দেবে না, উলটে মহা হউমাউ লাগল! তাই শুনে বাবা জ্যাঠামশাই ছুটে এলেন, আহা, করো কী করো কী, অ্যাদ্দিন বাদে চাট্টি ভালো-মন্দ খেয়ে বাঁচছি, তা তুমি দেখছি সব পণ্ড করে দেবে! না, না, তোমার খাতা দিতে হবে না, এখন যাও দিকিনি রান্নাঘরের দিকে, আপগানি কাটলেট করবে বলেছিলে না?

    বাস্তবিক শশীকলাদিদির সে রান্নার স্বাদ আজও আমার মুখে লেগে রয়েছে। কাজেই নেপু, আমি, বড়দা ইত্যাদি সবাই ওর ওপর মহাখুশি ছিলাম।

    সন্ধ্যে বেলা পড়ার ঘরে অঙ্ক কষছি, এমন সময় শশীকলাদি এসে হাজির!

    ও দিদি, বলোই-না সে টাকা দেখেছিলে নাকি?

    আমি নেপুর দিকে তাকিয়ে বললুম, কোন টাকা?

    সে বললে– ওই যে বুড়ো মলে পব বাক্স থেকে উধাও হল, তারপর বোর্ডিঙের বড়ো মাসিমা ঠিক সেইরকম দেখতে টাকা তোমার কাছে রাখতে দিলেন? দেখি-না একবারটি।

    নেপু রেগে গেল, আঃ শশীকলাদিদি, তুমি দেখছি আমাকে কাল বকুনি খাওয়াবে। এমনিতেই অঙ্ক হয় না।

    সে চলে গেলে আমাকে জিজ্ঞেস করল, কোন টাকা রে?

    আমি বললুম, হ্যাঁ, সে আমি তোমায় বলি আর তুমি গিয়ে কাপ্তান অপূর্বর কাছে লাগাও আর কী!

    নেপু অঙ্কটঙ্কর কথা ভুলে গেল।

    অপূর্বদার বিষয় তুই কী জানিস শুনি? জানিস ইন্টার-কলেজিয়েট সাঁতারের জন্যে উনি মেডেল পেয়েছিলেন? তা ছাড়া ভাগ্যিস ওঁর দল রাতে পাড়ায় পাড়ায় টহল দেয়, তাই চোরবাছাধনরা আর টু শব্দটি করতে পারছেন না!

    বললুম, রেখে দাও!ওঁর নাকের সামনে আমাদের ইস্কুলে অমন কাণ্ড হয়ে গেল, ভারি আমার ওস্তাদ রে!

    নেপু তাই শুনে একটু মুচকি হেসে বললে, সে বিষয়ও কিছু এগোয়নি ভেবেছিস নাকি তোরা? শিগগির একদিন সব চোখ ট্যারা হয়ে যাবে দেখিস!

    এমনি সময় শশীকলাদিদি দরজায় মুখ বাড়িয়ে বলল, গরম গরম চপ ভেজেছি, খাবে নাকি দু-একটা?

    এরপর তো আর কোনো কথাই হতে পারে না।

    ওসব ছোটো জায়গায় সেকালে কারো ঘরের কথা কারো জানতে বাকি থাকত না। দু-দিনেই একথা জানাজানি হয়ে গেল যে জগদীশদার সঙ্গে অপূর্বদার কিছু নিয়ে মন কষাকষি চলেছে।

    সত্যি আগে দেখতুম দু-জনায় ভারি ভাব, কিন্তু আজকাল দেখা হলেই আমাদের কাছে জগদীশদা অপূর্বর্দার খুব নিন্দেমান্দা করতে শুরু করল। প্রথমটা বেশ মজা লাগত।

    পরে নেপুকে গিয়ে বলতুম আর সে তো রেগে টং!

    ওই স্টুপিডটাকে এ-বাড়িতে আসতে দিস কেন রে? যার নিজের পকেট থেকে নিজেদের সোনার কৌটো চুরি যায়, অথচ নিজে টের পায় না, সে আবার একটা মানুষ নাকি? অপূর্বার সঙ্গে ও ব্যাটার তুলনা! কীসে আর কীসে, সোনায় আর সিসেয়! কই অপূর্বদা তো জগদীশদার বিষয় কিছু বলতে আসেন না!

    শশীকলাদিদি যে কখন এসে আমাদের পেছনে দাঁড়িয়েছে সে আমরা টের পাইনি। সে বললে, তা সে বলবে কেন? একটা ধর্ম আছে তো? জগদীশবাবুর কাছে রাশি রাশি ঘুস খেয়েছে-না!

    নেপু বললে, কী আবার ঘুস খেয়েছে?

    শশীকলাদিদি জিভ কেটে বললে, না, না, ও কিছু না। বলে তাড়াতাড়ি সরে পড়ল।

    এবার আর মাসিমার ওই টাকাগুলোর কথা নেপুকে না বলে পারলুম না। নেপু তো হাঁ!

    কই, দেখা তো টাকাগুলো?

    আস্তে আস্তে বইয়ের তাকের কাছে গিয়ে দেখি তাক তোলপাড় করে কে খোঁজাখুঁজি করেছে!

    নেপু বললে সর্বনাশ! তবে তো সেগুলোও গেছে! না হেসে পারলুম না। তাকের তলা থেকে আমার পুরোনো জুতোটা টেনে বের করে তার মধ্যে থেকে টাকা বের করে নেপুকে দেখালুম।

    নেপু ওগুলোকে নেড়েচেড়ে বললে, এখন এর এক-একটার দাম হয়তো পঁচিশ টাকা। সাধে মাসিমা কাছে রাখতে ভয় পান। দে আমাকে, অপূর্বার কাছে রেখে দিই, কারো বাবাঠাকুর টেরটি পাবে না!

    দিলুম না কিছুতেই।

    ওদিকে জগদীশদাদের বাড়িতেও মহা গোলমাল। পিসিমার গুরুদেব কায়েমি হয়ে বসেছেন। এমনিতে পিসিমার মুখের ওপর কিছু বলতে জগদীশদা সাহস পায় না, এবার কিন্তু দারুণ একচোট ঝগড়া হয়ে গেল! জগদীশদা বললে, দ্যাখো, তোমার গুরুদেবকে এবার কাশীবাসী হতে বলল, নইলে ভালো হবে না। একবার শ্রীঘর ঘুরে তো যথেষ্ট চেঞ্জ হয়েছে, আবার এখানে কেন? তা ছাড়া সন্নিসি মানুষের অত কী রে বাবা! রোজ রোজ গাওয়া ঘি, খ্যাসরাপাতি চালের ভাত, ছানার বড়া! কই আমাকে তো এর সিকির সিকিও দাও না! অথচ খালি খালি বলল, টাকা দাও, টাকা দাও। বলি, তোমার গুরুদেবকে পুষবার জন্যে তো আর আমি আপিসে চাকরি করি না!

    পিসিমাও রুখে উঠলেন, ওরে হতভাগা! গুরুদেব শিবের মাথায় বেলপাতা দিলেন, তবে-না চাকরি পেলি! আবার বড়াই! যা আছে তোর সব-ই তো গুরুদেবের দয়াতে।

    জগদীশদা বললে, ইস্, তা তো বটেই! এই বাড়ি আমার ঠাকুরদা দেননি আমাকে? গয়নাগাটি, টাকাকড়ি সবই আমার হত, তুমি যদি মাঝখান থেকে সেগুলো মেরে না দিতে! যাক গে, ওকে এখন ভালোয় ভালোয় কেটে পড়তে বলো দিকিনি।

    চ্যাঁচামেচি শুনে গুরুদেবও এসে হাজির! রাগের চোটে মুখের রং পাকা আম, চুলদাড়ি খাড়া। চেঁচিয়ে বললেন, তাই কেটিয়ে যাবে রে। তখন তোর কী অবস্থা হয় দেখিয়ে দেব। দে বেটি, কৌটোর সে পতাঙ্গটো দে, লিয়ে যাই।

    পিসিমা গুরুদেবের পায়ে পড়ে বললেন, আর দুটো দিন সময় দেবেন ঠাকুর, কোথাও খুঁজে পাচ্ছি নে যে।

    জগদীশদা তো থ!

    খবরদার পিসিমা, বুড়োকে এ-বাড়ি থেকে কোনো জিনিস দিতে পারবে না।

    পরে পিসিমা জেঠিমাকে বলেছিলেন যে জগদীশদার যে আবার এত তেজ এ তার ধারণার বাইরে ছিল। বললেন, কী বলব তোদের, ওকে দেখে নেকড়ে বাঘের কথা মনে হচ্ছিল। গুরুদেব বেচারা আর কথাটি না বলে, পোঁটলা-পুঁটলি বেঁধে রওনা! একটু টিপিন পর্যন্ত দিতে পারলাম; মাঝের ঘরে দাঁড়িয়ে চোখ রাঙিয়ে জগদীশ বললে, একটা সটির দানা পর্যন্ত দেবে না! উঃ! রাঁধিনি, খাইনি, পেট জ্বলে গেল! ফলপাকুড় কিছু থাকে তো দে।

    মা সন্দেশ আর পাকা কলা এনে দিয়ে বললেন, জগদীশ কী খেল?

    পিসিমা বললেন, ও ব্যাটার কথা আর বলিস না। প্রফুল্ল কেবিন থেকে একরাশ গিলে এল। ভাবছি আজ তোদের এখানেই শোব!

    ০৮.

    সত্যি সত্যি রাতটা পিসিমা থেকে গেলেন। শুলেন আবার আমার খাটে। সারারাত ঘুমুব কী? খালি খালি ঠান্ডা খড়খড়ে পা দুটো আমার লেপের মধ্যে গুঁজে দিয়ে গরম করতে চেষ্টা করতে লাগলেন।

    হঠাৎ কড়াৎ করে ছিটকিনি খোলার শব্দ শুনে উঠে বসলুম। জানলা দিয়ে তাকিয়ে দেখি শশীকলাদিদি, টর্চ হাতে নিয়ে, রান্নাঘরের দোরে তালা লাগিয়ে খিড়কি দিয়ে বেরিয়ে গেল।

    বিছানায় ফিরে এসে কাউকে কথাটা জানাব কি না ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লুম। সকালে রোজকার মতন শশীকলাদিদিকে ঘোমটা মাথায় ডিম রুটি পরিবেশন করতে দেখে জিজ্ঞেস করলুম, শশীদিদি কাল রাতে কোথায় গেছলে?

    শশীকলাদিদি এমনি চমকে উঠল যে ঘোমটা খসে গেল, তখুনি সেটাকে টেনে দিয়ে বললে, রাত দুপুরে আবার যাব কোথায়?

    বললুম, কেন, পষ্ট দেখলুম রান্নাঘরে তালা দিয়ে বেরুলে।

    শশীদিদি দারুণ চটে গেল, না বাপু! বাড়ির ছেলেপুলেরাও পেছনে লাগলে তো পারা যায়। তা হলে তো কাজ করা দায় হয়ে ওঠে!

    অমনি বাবা, জ্যাঠামশাই, নেপু, বড়দা সবাই আমাকে তাড়া!

    খবরদার, ওর পেছনে লাগবে না বলছি। না, না, ও ছেলেমানুষ কী দেখতে কী দেখেছে, ওর কথায় কান দিয়ো না।

    তারপর শশীকলাদিদির দিকে খানিক তাকিয়ে থেকে নেপু জিজ্ঞেস করলে, ও কী? মুখে কাপড় জড়িয়েছ কেন? দাঁত ব্যথা নাকি?

    শশীদিদিও অমনি ঘাড় নেড়ে বললে যে হ্যাঁ, ভীষণ দাঁত কনকন!

    আমি তো হেসে বাঁচি নে, কারণ ঘোমটা খোলার সময় পষ্ট দেখেছিলুম শশীদিদির গালে চড় খাওয়ার পাঁচ আঙুলের দাগ।

    চা খাবার পর পিসিমাকে বাড়ি পৌঁছোতে গিয়ে জেঠিমা আর আমি অবাক! দরজা জানলা সব হাট করে খোলা। জিনিসপত্র তচনচ। দেয়ালের ছবি ওলটানো, আলমারির বই মাটিতে, তোশক বালিশ ফালা ফালা। ভাঁড়ারের তালা ভাঙা, শিশি বোতল, বাক্স ভঁড় সব নীচে। বাড়িতে জনমানুষের সাড়া নেই।

    এতক্ষণ বাদে পিসিমা ভাড়ার ঘরের মেঝেতে পা ছড়িয়ে বসে হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগলেন।

    ওরে জগদীশ, ওরে লক্ষ্মীছাড়া, গুরুদেবকে অশ্রদ্ধা করেছিলি বলেই-না তোর এ দশা হল! ভাঁড়ারের এই অবস্থা আর তুই কি আর আছিস রে!

    কিছুতেই থামেন না। জেঠিমা পিঠ থাবড়াতে লাগলেন, আমি একটা পুরোনো খবরের কাগজ দিয়ে হাওয়া করতে লাগলাম। কিন্তু পিসিমা সমানে চাঁচাতে লাগলেন, ওরে হতভাগা! তুই মলে আমার প্রজাপতি কে খুঁজে দেবে বল?

    ঠিক সেই সময় সামনের স্নানের ঘরের দরজা খুলে, উশকোখুশকো চুল আর লাল টকটকে চোখ নিয়ে জগদীশদা বেরুল। জামাকাপড় ছেঁড়া, গা-ময় কালশিটে আর আঁচড়কামড়। ভাঙা গলায় বললে, থামো দিকিনি!

    পিসিমাও অমনি হাত-পা এলিয়ে ভিরমি!

    সেই সময় লাবণ্যদি আর লতিকাদি এসে না পড়লে কী মুশকিলেই যে পড়া যেত! জগদীশদা ওঁদের দেখে এক দৌড়ে নিজের ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে ছিটকিনি!

    শেষটা লাবণ্যদিরা ধরাধরি করে পিসিমাকে খাটে শুইয়ে মাথায় ঘড়া ঘড়া জল ঢাললেন, তবে পিসিমা চোখ মেলে চাইলেন।

    চেয়েই বললেন, বিছানা ভেজালে, এখন শুকুবে কী করে শুনি?

    লতিকাদি শুনবেন কেন, বললেন, জল ঢালব না তো কী, আরেকটু হলেই যে চোখ উলটে গেছিল! বলে নিজেরাই হাতে হাতে ভঁড়ার ঘর গুছুতে লেগে গেলেন। আমাকে বললেন, ছোকরা চাকরটা গেল কোথায়, গুদোমে গিয়ে খোঁজ নে।

    দেখি সে এইমাত্র কোত্থেকে যেন ফিরে, চকচকে পামশু খুলে রেখে, পা ধুচ্ছে। বলল নাকি অপূর্বদা ওকে কাল রাত নটার বাইস্কোপে পাস দিয়েছিলেন, ম্যানেজার ওর দোস্ত কি না। রাতে আর ফেরেনি, কোন বন্ধুর বাড়িতে খেয়েদেয়ে শুয়ে ছিল। এ বাড়ির রাঁধাবাড়ার তো কিছু ঠিক নেই। কাল দুপুরেও দোকানে গিয়ে তেলেভাজা দিয়ে মুড়ি দিয়ে খেয়ে আসতে হয়েছিল। এখানে আর বেশিদিন ওর কাজ করার ইচ্ছে নেই। আরও কী কী যেন বলতে যাচ্ছিল, লাবণ্যদিরা ডাকাডাকি করাতে আর বলা হল না।

    ওর হাতে চিঠি লিখে লাবণ্যদিই থানায় পাঠালেন। জগদীশদা অনেক ডাকাডাকি করাতেও ঘরের দোর খুলল না। শেষটা জেঠিমা পিসিমার কাছে থাকলেন, লাবণ্যদিদিদের সঙ্গে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন। আমার একটুও যেতে ইচ্ছে করছিল না।

    ততক্ষণে পিসিমা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসেছেন। এঁটে খোঁপা বেঁধে লাবণ্যদিদিদের বললেন, একটু দাঁড়িয়ে যাও বাছা। আমার জন্যে অনেক করলে, দু-জনায় এই শিশি দুটো নিয়ে যাও দিকিনি। ধরো লতিকা, লেবুর ঝাল আচার। ওটা সামান্য একটু গেঁজে গেছে, কিন্তু দু-দিন

    রোদ্দুরে দিয়ে নিলেই কেউ টেরও পাবে না। আর লাবণ্য, তুমি বাছা এই পেয়ারার জেলিটা নিয়ে যাও। কালো দেখে মনে কোরো না যে খেতে খারাপ খারাপ জিনিস আমার হাতে বেরোই না কখনো, তবে ওই একটু কালচিটে রং ধরে গেছে। এ কি আর আমি সহজে হাতছাড়া করি, নেহাত কোন অজাতে-বেজাতে ছুঁয়ে দিয়েছে, তার কোনো ব্যামোটামো ছিল কিনা তাই-বা কে জানে। আচ্ছা বাছা, এসো তা হলে, আমার এই বেলা অবধি জপ সন্ধ্যে কিছুই হল না।

    এই বলে আমাদের সদর দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিলেন। আমাকে কিন্তু কিছু দিলেন না। অথচ লেবুর আচার, পেয়ারা-জেলি আমিও যথেষ্ট ভালোবাসি।

    বাড়ির বাইরে এসেই দেখি শীতের রোদ্দুরে সারা শহরটা ঝিমঝিম করছে। দূরে মাথার ওপর ঘন নীল আকাশে দুটো চিল ঘুরছে। ঝাউ গাছের পাতা বাতাসে দুলছে, কোত্থেকে যেন কমলা লেবুর গন্ধ আসছে। কে বলবে জগদীশদাদের বাড়ির মধ্যে এত কাণ্ড!

    আমাদের চান-খাওয়া সারা হয়ে যাবার কত পরে জেঠিমা ফিরলেন। মা আর অরুণাবউদি ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, খিদেও পেয়েছিল বোধ হয়, ওঁদের আবার চান করে উঠেই না খেলেই নয়! জেঠিমা এসে ঢুকতেই দু-জনে কী হল, কী হল করে হামলে পড়লেন।

    জেঠিমা মাথায় দু-ঘটি জল ঢেলে, একসঙ্গে খেতে বসে বললেন, সে এক কাণ্ড, বুঝলি মেজোবউ, বাড়িঘর ডালের কাঠি দিয়ে নাড়া, অথচ ঠাকুরঝি বলে কী, না কিছু হারায়নি। আবার হারায়নি বলে রাগ কত! বলে কি না, কই করুক তো কেউ আমার মতো জ্যাম জেলি, অথচ একটা ছোটো শিশি অবধি নিল না! কেন, আমার জিনিস খারাপ নাকি? নাকি, তোরাই ভালো জিনিস দেখলে চিনিস না? চুরি করতে এইচিস অথচ কোনটা ভালো কোনটা মন্দ জানিস না! এ আবার কেমনধারা চোর! শেষটা পুলিশ ইন্সপেক্টর লোকজন নিয়ে এসে পড়াতে পিসিমাকেও থামতে হল, আর জগদীশদাকেও বেরিয়ে আসতে হল। বেরিয়েই পুলিশদের ওপর রাগমাগ করতে লাগল।

    ট্যাক্স নেবার বেলায় সব ঠিক আছেন, অথচ নিজের বাড়িতে নিরাপদে ঘুমুতে পারব না, ঠ্যাঙাড়ের দল এসে মেরে পিটিয়ে জিনিস নষ্ট করে দিয়ে চলে যাবে! কেন, থানার লোকেরা করে কী?

    কিন্তু জগদীশদা নিজে কিছুই বলতে পারে না। ক-টা লোক, কোন দিক দিয়ে এল, কেমন চেহারা, সঙ্গে হাতিয়ার ছিল কি না কিছুই জানে না!

    মা হেসে বললেন, তা জানবে কী করে? সাড়া পেয়েই বোধ হয় স্নানের ঘরে ঢুকেছিল। আমি বললুম, ওমা, না, তাহলে অমন বেদম পিটল কী করে ওকে?

    ব্যস্, সবাই মিলে আমাকে সে কী বকুনি! জ্যাঠা মেয়ে, বড়োদের কথায় কথা বলতে আসে, এইসব। চুপ করে সব শুনলুম, কিছু বললুম না।

    সন্ধ্যে বেলা পড়ছি, নেপু গেছে তার গুরুঠাকুর অপূর্বদার বাড়ি, কী নাকি জরুরি দরকার! হেসে বাঁচি নে। এমন সময় শশীকল্লাদিদি আস্তে আস্তে দোর গোড়ায় দাঁড়াল।

    ও দিদি, সবই তো জানো, এদিকে আমি যে গাল ব্যথায় মলাম। উঃ, দাঁতের গোড়াসুদ্ধ নড়িয়ে দিচ্ছে বোধ হয়! দাও-না, ওই যে কী বড়ি আছে তোমাদের, নইলে আর তো পারছি না!

    তাকিয়ে দেখি শশীদিদির গাল ফুলে চালকুমড়ো! বললুম, দেব, যদি বল কে মেরেছে।

    শশীকলাদিদি শিউরে উঠে বলল, ও দিদি, দাও দিদি লক্ষ্মীটি, তোমাকে এক্ষুনি গরম পেঁয়াজি খাওয়াব। কুটে রেখে এসেছি ও ঘরে, কড়াইতে তেল ঢেলেছি, দাও দিদি, পায়ে পড়ি!

    আমি উঠে বললুম, তা হলে বলবে না? এই আবার বসলুম।

    শশীদিদি প্রায় কেঁদে ফেলে, ও কী আবার বসলে কেন? না দিলে যে মরে যাব! বলব কোন সাহসে, ফালা করে চিরে ফেলবে যে! তবু এইটুকু বলছি যে জগদীশবাবুকে রোগা পটকা দেখে মনে কোরো না যে ওনার হাতে জোর নেই!– দাও দিদি দুটো বড়ি!

    বড়ি নিয়ে শশীকলাদিদি চলে গেলে পর, নেপু এসে জুতো খুলতে খুলতে বলল, অপূর্বদার খুব জ্বর, সর্দিকাশি। বেরুতে পারছেন না, তাই আমাকে একটা কাজ দিয়েছেন।

    আমি কিছুই বিশ্বাস করিনি। মুখে বললুম, কাকে? তোকে? আর হাসতে পারি নে বাবা।

    ০৯.

    অবিশ্যি নেপু কী বলে না বলে আমি থোড়াই কেয়ার করি। তবু এর দু-দিন পরে যখন একদিন বিকেলে জঘন্য নোংরা প্যান্ট-শার্ট পরে এসে, এক ঘণ্টা ধরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে, ভিজে হাত দিয়ে চেপে চেপে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল, তুই অপূর্বার যত খুশি নিন্দে করতে পারিস, কিন্তু তোদের নেকি লাবণ্যদিদিমণি দারুণ খাতির করেন। জানিস, ওঁকে এক বোতল পেয়ারা-জেলি পাঠিয়েছেন?

    তখন অবাক না হয়ে পারলুম না।

    নেপু আমার দিকে না তাকিয়ে, মুখটাকে আয়নার খুব কাছে নিয়ে গিয়ে মাথার মাঝখানকার খাড়া চুলগুলোকে প্লেন করতে করতে বলল, জানিস, অপূর্বদা রোজ সকালে একমনি মুগুর ভাঁজেন! তারপর এক-পো শেকড়ওয়ালা কঁচা ছোলা খান। আমাকেও খেতে বলেছেন, তা তোদের বাড়িতে কি ওসব হবার জো আছে? বলতে-না-বলতে মা তেড়ে আসবেন! জানিস, অপূর্বদা একবার একটা পাগলা মোষের শিং চেপে ধরে, এমনি করে এক মোচড় দিয়ে, তাকে রাস্তার মাঝখানে একেবারে কুপোকাত-এর বেশি আর বলা হল না, কারণ কায়দাটা দেখাতে গিয়ে, নেপুর হাত থেকে চিরুনি ছুটে গিয়ে, জানালার কাছে পড়াতে, কাচ ভেঙে চৌচির আর নেপু জিভ কেটে পগার পার। একা একা কত হাসব?

    কিন্তু আজকাল আর খেয়ে-দেয়ে কোনো সুখ নেই, বাবা জ্যাঠামশাইদেরও মন খারাপ! শশীকলাদিদি কেমন যেন বিগড়ে আছে, কখনো বলে দাঁত ব্যথা, বলে পেট কামড়াচ্ছে। মোটে রান্নাঘরের দিকে যায় না। মা জেঠিমাকে আবার হাঁড়ি ঠেলতে হচ্ছে।

    সবাই মিলে শশীদিদির কম তোয়াজ করা হয়নি। মুখে গলায় গরম জলের সেঁক, কাগজি লেবু দিয়ে কই মাছের ঝোল-ভাত, হেন-তেন কত কী। আমার যেন বাড়াবাড়ি মনে হয়, কিন্তু আমাদের কথা তো আর তখন কেউ শুনত না।

    ও বাড়িতে জগদীশদার শরীর ভালো নেই, তার ওপর সারাক্ষণ গুম হয়ে থাকে। পিসিমা রোজ রোজ এসে বলেন ওঁর নাকি ভয় ভয় করে। শেষটা মাদের বলে-কয়ে, ও বাড়িতে নেপুর আর আমার শোবার ব্যবস্থা করে নিলেন।

    বেশ ভালো লাগত। রাতে আমরা ওখানেই খেতুম। পিসিমা নিজের হাতে লুচি, বেগুনভাজা, আলুর দম, ক্ষীর, এইসব করতেন। খাবার সময় ওঁদের ছোটোবেলাকার কত গল্প বলতেন। জগদীশদার বাবা কীরকম দুষ্টু ছিলেন, আর উনি নিজে কী ভালো! ওঁরা নাকি খুব বড়োলোক ছিলেন, পাড়ার লোকের চোখ টাটাত। তারপর জিজ্ঞেস করলেন বোর্ডিঙের মাসিমার টাকাগুলো ফিরিয়ে দিয়েছি কি না? বললুম, মা রাখতে মানা করেছেন, তাই দিয়ে এসেছি। তাই শুনে পিসিমা একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বললেন, ঠিক আমার বাবার টাকার মতন দেখতে ওগুলো। ওরই মধ্যে পুলিশরা দু-চারদিন এসে জগদীশদাকে দিয়ে সেই রাতের কথা সব লিখিয়ে নিয়ে গেল। নাকি তিন-চারজন দারুণ ষণ্ডা লোক এসে জগদীশবাবুকে চেয়ারের সঙ্গে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলেছিল। তবু যখন জগদীশদা বলতে লাগল বাড়িতে আর সোনাদানা কিছু নেই, তখন নাকি রেগেমেগে, চুল টেনে, কান মলে, একাকার করে দিল।

    জগদীশদাও ছেড়ে কথা বলেনি। তবে হাত-পা বাঁধা, কী আর করতে পারে, কষে দুকথা শুনিয়ে দিয়েছে। ব্যাটাদের কান লাল হয়ে উঠেছিল।

    পুলিশরা চলে গেলে, পিসিমার ওপর জগদীশদার সে কী রাগ! ওর বিশ্বাস ওর ওপর রেগে, পিসিমার গুরুদেব তাঁর শিষ্যদের দিয়ে এইসব করাচ্ছেন। আমাদের সামনেই পিসিমাকে ডেকে বললে, হিরের প্রজাপতি বসানো ঢাকনিটা কোথায় রেখেছ বলোই-না। ভুলে গেছি আবার কীরকম কথা? সমস্ত বাড়ি তচনচ করেও পাওয়া যায় না, ও আবার কীরকম লুকোবার জায়গা?

    পিসিমা হাউ হাউ করে কেঁদে বললেন, পেলে তো গুরুদেবকেই দিয়ে দিতাম।

    নেপু আর আমি সকালে উঠে গিয়ে পড়াশুনা করি, স্নান করে খেয়ে ইস্কুলে যাই, বিকেলে জলখাবার খেয়ে এবাড়ি চলে আসি। সঙ্গে আবার হাতের লেখার খাতা আর পদ্য মুখস্থর বই নিয়ে আসতে হয়।

    আমাকে পৌঁছে দিয়ে নেপু অপূর্বর্দার কাছ থেকে একবার ঘুরে আসে। ফিরে এসে, রোজ মিথ্যে করে বলে– অনাথদার কাছে অঙ্ক বোঝাতে গেছলুম; এইসব। কারণ আজকাল অপূর্বদার নাম শুনলেই জগদীশদা রেগে যায়।

    আমাদের বাড়িতে শশীকলাদিদিকে নিয়ে খুব গোলমাল চলেছে। তার নাকি আজকাল রোজ চোখে ব্যথা করে। তাই নিয়েই একদিন রাতে জগদীশদার কাছে এল।

    পিসিমা রান্নাঘরে, নেপু ফেরেনি, আমি খাটের পায়ের দিকে মাটিতে বসে ভূতপ্রেত পড়ছি, সেদিকে কারো নজর পড়েনি।

    শশীকলাদিদি খুব গজগজ করতে লাগল, এবার আমার পাওনা টাকা চুকিয়ে দিয়ে ছুটি দিয়ে দেন, বাবু। নইলে একেবারে রাঁধুনি বামনি বনে যাব।

    জগদীশদা এক ধমক দিয়ে বলল, গুটে, খবরদার! তোর পেছনে-না পুলিশ ঘুরছে? বলেছি তো গোলমাল চুকে গেলে তোকে আমার এখানেই চাকরি দেব। ক-দিন চুপ করে থাক, যাবার কথা মুখে আনবি নে!

    শশীদিদি বললে, কী চাকরি দেবেন বাবু? আমি পাসকরা গোয়েন্দা, আমি তো আর বাবুর্চি নই।

    জগদীশদা চটে গেল, চোপ! তুই একটা থার্ড ক্লাস টিকটিকি কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস বাবুর্চি! যার যেটা কাজ! আর দেখ, ফের যাবার কথা মুখে এনেছিস কি আমি সেই সাইকেলের ব্যাপারটা বলে দেব! তাই শুনে শশীদিদির মুখে আর কথাটি নেই! জগদীশদা আরও কী বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু ঠিক সেই সময়, পড়বি তো পড়, আমার হাত থেকে বইটা ঝুপ করে পড়ে গেল।

    দু-জনেই প্রথমে দারুণ চমকে গেছিল, তারপর আমাকে দেখে সে কী রাগ! ভাগ্যিস ঠিক সেই সময় রাঁধাবাড়া সেরে কলতলা থেকে পিসিমা আমাকে ডাকলেন, নইলে আর রক্ষে ছিল না।

    শশীদিদি সুড়ুত করে কোথা দিয়ে যে কেটে পড়ল টেরও পেলুম না! ভীষণ রেগে গেছলুম। পরদিন সকালে মাকে সব বলে দিলুম। মা তো রেগে কই!

    তুমি তো আচ্ছা মেয়ে শশীকলা! কাজকর্মের নাম নেই, দু-বেলা থালা থালা ভাত ওড়াবে আর দিব্বি পাড়া বেড়াবে! তোমার মাইনে কাটা হবে!

    শশীদিদিও মার মুখের ওপর ভীষণ বেয়াদপি করতে লাগল।

    যান, আপনারা অন্য লোক দেখুন গে, এত কাজ আমার পোষায় না। একটা গোটা পরিবারের প্রত্যেকটা লোক যে এ-রকম সাংঘাতিক পেটুক হতে পারে এ আমি ভাবতে পারতাম না!

    তাই শুনে জেঠিমা বউদি-টউদি সবাই মিলে মহা চেঁচামেচি লাগালেন। তারপর বাবা জ্যাঠামশাইরা বাড়ি ফেরবার আগেই আমাকে শশীদিদির মাইনের হিসেব কষিয়ে, তার হাতে দিয়ে, তাকে বিদেয় করে দেওয়া হল।

    আমি বার বার বলতে লাগলুম, ও শশীদিদি, যেখানে-সেখানে ঘুরো না, তোমাকে পুলিশে ধরবে। সটান জগদীশদার কাছে চলে যাও।

    শশীদিদির কী দেমাক! চোখ ঘুরিয়ে বললে, সেখানে যেতে আমার বয়ে গেছে। তা আমার জন্যে তোমায় ভাবতে হবে না। একটা চাকরি নাহয় খেয়েই দিয়েছ, জান রাজরাজড়ারা আমাকে লুফে নেবে। কই রাঁধুক তো কেউ আমার মতো হোসেনি কারি! তা যতই লাগানি ভাঙানি করনা কেন!

    বলে এক হাত ঘোমটা টেনে বড়ো বড়ো পা ফেলে চলে গেল!

    রাত্রে আমার কাছে সব কথা শুনে জগদীশদা এমনি রাগারাগি করতে লাগল যে, শেষপর্যন্ত নেপু, পিসিমা আর আমি আমাদের বাড়িতে চলে আসতে বাধ্য হলুম!

    পরদিন সকালে পিসিমা মা জেঠিমার সঙ্গে সঙ্গে তরকারি কুটতে কুটতে বললেন, আসল কথা তোদের বলাই হয়নি। আমার বাবা ছিলেন লাখপতি, কিন্তু এমনি হাড়কিপটে যে লোকে বলত সকালে ওঁর নাম করলে হাঁড়ি ফাটে। তোরা এখানে ওঁর যে নাম জানিস সেটা ওঁর নাম নয় মোটেই। সেই সব্বনেশে বুড়োর ভয়ে নাম ভাড়িয়ে এখানে এসে ঘাপটি মেরে ছিলেন। এখন পর্যন্ত নাকি লোকে ওঁকে এখানে-ওখানে খুঁজে বেড়াচ্ছে!

    সে যাক গে, এখানে বাকি জীবনটা ভগবানের নাম করে কাটিয়ে, শেষটা যখন চোখ বুজলেন, থাকবার মধ্যে রইলাম আমি আর জগদীশের বাবা। আর তাল তাল সোনাদানা আর গোছ গোছ টাকা!

    শুনে মা জেঠিমা কুটনো ফেলে গালে হাত দিয়ে বললেন, দেখছ কী কাণ্ড! তা সে সব গেল কোথায়? তোমাদের তো দেখি মাসকাবারে বেশ টানাটানি!

    পিসিমা দুঃখু করে বললেন, আরে সে কথা আর বলিস নে! বাবার শ্রাদ্ধের পর কে যে সব চেঁচেপুঁছে নিয়ে গেল বুঝতেই পারলাম না। ওই যা দুটো-একটা বাবার পা টেপার সময় বাঁ-হাতে করে সরিয়ে রেখেছিলাম, সে ছাড়া আর কিছু পেলাম না। আমি আর থাকতে না পেরে বললুম, বাঁ-হাতে করে সরানো মানে কী?অমনি মা জেঠিমা চোখ পাকিয়ে উঠলেন, তোর সব কথাতে কী দরকার? যা পড়গে যা!

    আমি সরে গিয়ে দরজার ওপাশে বসলাম। পড়া আমার কখন হয়ে গেছে। পিসিমা বলতে লাগলেন, সে এক মজার ব্যাপারে। বাবা বলতেন সিন্দুকের মধ্যে কোনো দামি জিনিস রাখতে হয় না। কারণ চোররা এসে আগেই সিন্দুক ভাঙে, বাক্স খোলে। তাই বাবা করতেন কী, গয়নাগাটি টাকাকড়ি পুটলি বেঁধে চ্যবনপ্রাশের টিনের পেছনে, চ্যাঙারি করে খাটের নীচে, কাগজে মুড়ে যেখানে-সেখানে ফেলে রাখতেন। বাবাও চোখ বুজলেন আর সেসব হাওয়া! ওই দু-চারটে যা আমার কাছে ছিল, তাই-বা রাখতে পারছি কই? জগদীশটা তো অত দামের কৌটো হারাল, হিরের প্রজাপতিটাও খুঁজে পাচ্ছি নে।

    একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে, একটু হেসে পিসিমা আবার বললেন, তবে একটা ভালো হয়েছে এই যে সে বুড়োও আরও কৌটো ভরে নাতনির বিয়েতে সিঁদুর দিতে পারবে না!

    সবচাইতে আশ্চর্য ব্যাপার হল যে প্রায় এক বছর ধরে এত সব হাঙ্গামার পর আবার আমাদের শহর আগেকার মতন চুপচাপ হয়ে গেল। আবার সবাই বলতে লাগল, এখানে কোনো দিনও কিছু হয় না, বিশ্রী একটা জায়গা। আবার ডিমওয়ালার, রুটিওয়ালার কাছ থেকে সবাই এর। বাড়ির ওর বাড়ির খবর জোগাড় করতে লাগল। আমার একটুও ভালো লাগত না। এত যে জিনিস গেল, চোর ধরা পড়বে কবে?

    শশীদিদির জন্য মন কেমন করত, রোজ নেপুকে আমাকে এটা-ওটা ভেজে খাওয়াত। অথচ সেই যে চলে গেল আর তার টিকিটির দেখা নেই। নিজের বাক্সটা অবধি নিয়ে গেল না, তাতে অবিশ্যি কাগজপত্র ছাড়া কিছু ছিল না। আমরা আবার আগের মতো শাক-চচ্চড়ি খেতে লাগলাম। রোজ খেতে বসে বাবারা শশীদিদির জন্যে আক্ষেপ করতেন।

    তবে জগদীশদাদের বাড়িতে খানিকটা অদলবদল হল। সেই যে পিসিমার ওপর চটে গেল, সেই থেকে জগদীশদার পিসিমার সঙ্গে কথা বন্ধ। রোজ রাত্রে এক টুকরো কাগজে পরদিন কী কী খাবে, তার একটা ফর্দ লিখে পিসিমার দরজায় আলপিন দিয়ে এঁটে রাখত!

    শেষটা একদিন সন্ধ্যে বেলায় একগাল হাসি নিয়ে আমাদের বাড়িতে দেখা করতে এল। জেঠিমার তক্তপোশের ওপর কেঠো-কেঠো ঠ্যাং দুটো তুলে বসে বললে, কলকাতায় আমার খুব ভালো চাকরি হয়েছে, আমি কাল সকালের মোটরেই চলে যাচ্ছি। দিন, চাট্টি পায়ের ধুলো দিন। তবে ওই একটা দুঃখ থেকে গেল, গুটেকে হারালাম।

    জগদীশদা চলে গেলে আমাদের খুব মন কেমন করছিল। এমন সময় বিকেল বেলায় নেপু বাড়ি এল, মাথা ধরা, পেট ব্যথা আর জ্বর নিয়ে।

    নেপুর মাম্পস হল, আমার মাম্পস হল, বড়দার মাম্পস্ হল, শংকর ঠাকুর দেশ থেকে ফেরবামাত্র ওর মাম্পস হল। সব গাল ফুলে চাল কুমড়ো, ইস্কুল যাওয়া, কাজকম্ম, খাওয়া-দাওয়া বন্ধ।

    শুধু আমাদের নয়, শহরসুদ্ধু সকলের মাম্পস হল–পিয়োনদের, পুলিশদের, দোকানদারদের, মাস্টারমশাইদের, এমনকী ডাক্তারবাবুর স্ত্রীর পর্যন্ত মা হল।

    ছেলেদের ইস্কুল, মেয়েদের ইস্কুল, পাহাড়তলির প্রাইমারি ইস্কুল সব বন্ধ হয়ে গেল। বোর্ডিঙের ছেলে-মেয়েদের মধ্যে যাদের মাম্পস হয়নি, তাদের সব বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হল।

    লাবণ্যদি, লতিকাদিও একটা বড়ো দল মেয়ে নিয়ে কলকাতা চলে গেলেন। যাবার আগে আমাকে কত আদর করে গেলেন।

    নেপুর অপূর্বদাও গেলেন। যাবার আগে গালফুলো নেপুকে দেখতে এলেন। উনি চলে গেলে পর নেপু বললে, অপূর্বদা আমাকে একটা ভারী কাজ দিয়ে গেছেন। কী, তা বলব না।

    আমার তো শুনতে ভারি বয়ে গেছে! এমনিতেই ভীষণ গাল টনটন করছে, খিদে খিদে পাচ্ছে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleমাকু -– লীলা মজুমদার
    Next Article নেপোর বই – লীলা মজুমদার

    Related Articles

    লীলা মজুমদার

    বদ্যিনাথের বড়ি – লীলা মজুমদার

    November 27, 2025
    লীলা মজুমদার

    হলদে পাখির পালক – লীলা মজুমদার

    November 27, 2025
    লীলা মজুমদার

    বাঘের চোখ – লীলা মজুমদার

    November 27, 2025
    লীলা মজুমদার

    গুপির গুপ্তখাতা – লীলা মজুমদার

    November 27, 2025
    লীলা মজুমদার

    পদিপিসীর বর্মিবাক্স – লীলা মজুমদার

    November 27, 2025
    লীলা মজুমদার

    টং লিং – লীলা মজুমদার

    November 27, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }