বিদুর – ২
২
কৌরবেরা আমাকে শুধু দাসীপুত্র আর কর্মচারী হিসাবেই গণ্য করেছে। মহাত্মা বাদরায়ণির শিক্ষায় আমি যে নিজেকে লোকহিতৈষক প্রাজ্ঞ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছি, এই জ্ঞান তাদের কদাপি হয়নি। দুর্যোধন তো বুঝতেই পারেনি যে দীর্ঘকাল কুরুকুলে মহামন্ত্রীত্ব করে তাদের জন্য আমি কী করেছি, আর কী করতে চেয়েছি। ক্ষমতাকামুকতা এমনই প্রগলভ যে মানুষ তখন সুজন-দুর্জনেও ভেদ করতে পারে না।
অপমানিত, লাঞ্ছিত আমি তাই হস্তিনাপুর ত্যাগ করে জ্ঞান আহরণকল্পে নানা তীর্থস্থান এবং জনপদ পরিভ্রমণ শুরু করেছিলাম। কখনো একাকী নানা পুর, উপবন, পর্বত, কুঞ্জ, সরোবর, নদী এবং সাগর-দর্শন করে মনের বিস্তৃতি ঘটিয়েছি। কখনো-বা তপোবনসমূহে জ্ঞানী মুনি-ঋষিদের সাহচর্যে এসে অধ্যয়ন এবং তত্ত্ব শ্রবণের দ্বারা জ্ঞান সঞ্চয় করেছি। এখন আর আমি কুরুমহামন্ত্রী তো নই। আমি একজন জিজ্ঞাসু প্রব্রাজক। খুবই সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত করেছি নিজেকে। প্রব্রাজকের মতোই অসংস্কৃত বস্ত্রবল্কল এখন আমার আভূষণ। রাজসভার মহামূল্য উজ্জ্বল আভরণ ত্যাগ করেছি। ফলে নিতান্ত পরিচিতজনের কাছ থেকেও নিজেকে গুপ্ত রাখতে অসুবিধে হয়নি।
এভাবে ভ্রমণ করতে করতে যখন এই প্রভাসতীর্থে এসে স্থিত হলাম, তখন শুনলাম, সেই অনাকাঙ্খিত যুদ্ধ শেষ। কৌরবকুল বিনষ্ট, যাদবকুলও ধ্বংস। ধ্বংস পাঞ্চাল, মৎস এবং আরও অগণ্য নৃকুল। মহাযুদ্ধ শেষে কৌরবপক্ষে একাদশ এবং পাণ্ডবপক্ষে সপ্ত, এই অষ্টাদশ অক্ষৌহিণী সৈন্যের মধ্যে মাত্র চতুর্বিংশতি সহস্র একশত পঁয়ষট্টি জন সৈন্য জীবিতাবস্থায় পালাতে সক্ষম হয়েছে। নিহত হয়েছে একশত ছেষট্টি কোটি বিশ হাজার সৈন্য।
সবচাইতে মর্মান্তিক সংবাদ এই যে লোকপুরুষ অচ্যুত আর ধরাধামে নেই। অচ্যুত অনুগত-প্রাণ উদ্ধব, আমারই মতো প্রব্রজ্যায় বেরিয়ে পড়েছেন। তাঁর কাছেই সব শুনতে পেলাম। যদুবংশ ধ্বংসের বিবরণ অতি মর্মান্তিক। কুরুবংশ যে ধ্বংসের অভিমুখে চলেছে, তার সূচনা তো আমি প্রত্যক্ষ করেই এসেছিলাম। আমি বুঝেছিলাম, পাণ্ডবদের অধিকার কৌরবেরা কোনোদিন মেনে নেবে না। কুরুকুলের কুরু এবং পাণ্ডব এই উভয় শাখার সঙ্গে যাঁরা বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ, সেইসব নৃকুল, হস্তিনাপুরের কর্তৃত্ব কোনোদিন সহ্য করতে পারেনি। গান্ধার, মদ্র, পাঞ্চাল, যদু, কুরু এইসব গোষ্ঠীগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক কোনোদিনই ভালো ছিল না। অচ্যুত কৌশলে জরাসন্ধকে বধ করালে, তাঁর কীকটদেশীয় মিত্র কোলরা আদৌ সন্তুষ্ট হয়নি। জরাসন্ধ তাদের মিত্র ছিলেন এবং জাত্যংশে ছিলেন কীকটদের প্রায় সমগোত্রীয়। তিনি অসুরদের একটি সম্প্রদায়ের অন্তর্গত মানুষ ছিলেন এবং তীব্র আর্যবিদ্বেষী ছিলেন। শুনলাম মহাযুদ্ধে কোলজাতীয়রা কৌরবপক্ষে যোগদান করে তাদের মিত্র-ঋণ শোধ করেছিলেন।
কৌরব এবং পাণ্ডবদের অন্তঃকলহ ছাড়াও, কুরু-পাঞ্চালদের সুদীর্ঘকালীন বিরোধও এই মহাযুদ্ধের অন্যতম প্রধান কারণ। সে অর্থে এই যুদ্ধকে কুরু-পাণ্ডব যুদ্ধ না বলে কুরু-পাঞ্চাল যুদ্ধ বলাই অধিক সঙ্গত। আর্যাবর্তের এই দুই বৃহৎ রাজবংশ পরস্পরের প্রতি বৈরিতা সাধন করে আজ সম্পূর্ণ ধ্বংসের সাগরে বিলীন হয়ে গেল। উদ্ধব বললেন, যুধিষ্ঠির এখন পৃথিবীপতি হয়েছেন। তিনি হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসেছেন, আর অনিরুদ্ধপুত্র বজ্র ইন্দ্রপ্রস্থের জন্য মনোনীত।
যুদ্ধ শুরু হবার আগেই হস্তিনাপুর ত্যাগ করেছিলাম। অন্তরে নির্বেদ এসেছিল তার আগেই। বস্তুত জাগতিক বিষয়ে এই নির্বেদের বীজ নিহিত ছিল আমার বাল্যাবধি অধ্যয়নশীলতার মধ্যে। আমার মাতা দাসীত্ব থেকে মুক্তি পেলে, কুক্ষিস্থ আমাকে নিয়েই স্বতন্ত্রা হয়েছিলেন। আমার ভূমিষ্ঠ হবার প্রাক্কালে কুরুকুলে কোনো আনন্দবাদ্য বেজেছিল কিনা জানা নেই। না বাজারই কথা। তবে শুনেছি, পট্টমহাদেবী অম্বিকার এবং রাজ্ঞী কৌশল্যার প্রসব-কালে নগরীতে সপ্ত-দিবসব্যাপী মাঙ্গলিকী অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ওই দুই দেবীর জাতকদের একজন অন্ধ এবং অপরজন পাণ্ডু-রোগগ্রস্ত হওয়ায় পুরীতে বিষাদেরও অন্ত ছিল না। এই উভয় কুমারদের ব্যাধিও কি মহারাজ বীচিত্রবীর্যের সহবাসে প্রাপ্ত মহিষীদের মাধ্যমেই লব্ধ? নতুবা আমি নীরোগ কেন? কিন্তু সর্বাঙ্গ-সুন্দর, সুস্থ-জাতক হওয়া সত্ত্বেও আমার জন্মকালে নিশ্চয় কোনো চঞ্চলতা দৃষ্ট হয়নি, এ আমি অনুমান করতে পারি। আমি যে শূদ্রা দাসীর গর্ভজাত! কিন্তু তথাপি, অহোভাগ্য, আমি কুলপিতার কোনো ব্যাধি পাইনি।
কৈশোরে মাতা, মহাজননীর নির্দেশে আমাকে বাদরায়ণির আশ্রমে পাঠিয়েছিলেন শিক্ষালাভের জন্য। পঞ্চম থেকে দীর্ঘ ষোড়শবর্ষকাল আমি সেই মহাত্মার শিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছি। ধৃতরাষ্ট্র বা পাণ্ডুর সে সৌভাগ্য হয়নি। তাঁরা যখন বিলাসে বর্ধিত হচ্ছেন আমি তখন স্বাধ্যায়ের ক্লেশ আনন্দ জ্ঞানে আহরণ করছি।
পিতা বাদরায়ণি শিক্ষার শুরু থেকেই আমাকে বলতেন, বৎস তুমি কুরুকুলের মহামন্ত্রী হবে, অতএব তদনুরূপ শিক্ষণে শিক্ষিত হও। জন্মান্ধ ধৃতরাষ্ট্র সিংহাসনের অধিকারী হতে পারেন না। শূদ্রীসূত আমিও সিংহাসনের অধিকারী নই। অতএব পাণ্ডুই রাজপদের অধিকারী। পিতা বললেন, এই নিয়মের ব্যত্যয় আমার সাধ্য নয়। তবে বৎস, একথা জানবে যে মহামন্ত্রীই রাজ্য পরিচালনার প্রধান শক্তি। প্রকৃত ক্ষমতার উৎস তিনিই। আমাকে মহামন্ত্রী পদে বৃত করার সময় কুরুবিশ্বে বিলক্ষণ বিতণ্ডার উদ্ভব হয়েছিল। কারণ, মহামন্ত্রীপদে ইতিপূর্বে ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্য কোনো বর্ণের মানুষ বৃত হননি। এই পদটি বহুকালাবধি ব্রাহ্মণদের একচ্ছত্র অধিকার। পৌরোহিত্য আর মন্ত্রীত্ব ব্রাহ্মণ ভিন্ন হয় না। আমি একজন পারশব, যেমন এঁরা আমায় বলে থাকেন, আমি কীভাবে মন্ত্রীপদে আসীন হতে পারি? কিন্তু পিতা দ্বৈপায়নের ক্ষমতার প্রভাবে কুরুবৃদ্ধগণকে এই সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হল। তখন তাঁরা প্রচার করলেন যে বিদুর যেহেতু ব্রাহ্মণের ঔরসে জাত এবং তপশ্চর্যা দ্বারা তিনি ব্রাহ্মণের সমকক্ষ বুদ্ধিমত্তার স্তরে পৌঁছেছেন, সেকারণে তিনি মহামন্ত্রী হবার সম্পূর্ণ যোগ্য।
এ ব্যাপারে পিতা দ্বৈপায়নের ইচ্ছা যতটা প্রতিফলিত, যুগধর্ম ততটা নয়। কিন্তু আশ্চর্য! কুরুবৃদ্ধরা তাও মেনে নিলেন। এর পিছনে সুকৌশলে প্রচারিত কিংবদন্তিসমূহের অবদান অনেক। হস্তিনাপুরের ভট্ট-ব্রাহ্মণেরা ততদিনে অনেক কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছেন। বিদুর যে শাপভ্রষ্ট ধর্ম স্বয়ং এবং পূর্বজন্মে কী কারণে মাণ্ডব্য নামক ঋষির শাপে তাঁকে এ জন্মে বিদুর হয়ে জন্মাতে হল, তার একটি চমৎকার আখ্যান তৈরি হয়ে গেল। যাঁরা ঘটনার আকস্মিকতার পারম্পর্য রক্ষায় অক্ষম, তাঁরা অবশ্যই এই কিংবদন্তিতে বিশ্বাসী হবেন। পিতাও বলেন, এর প্রয়োজন আছে। এও যুগধর্ম। প্রকৃতিপুঞ্জের সবাই সমান ধর্মতত্ত্বজ্ঞ হয় না। ব্রাহ্মণত্ব তপশ্চর্যা এবং স্বাধ্যায়লব্ধ। অধিকাংশ মানুষই তপশ্চর্যা এবং স্বাধ্যায়চর্চার অর্থ বোঝে না। মনগড়া অর্থ করে নেয়। স্বাধ্যায় বলতে শুধু বেদ অধ্যয়ন বোঝায় না। ব্রাহ্মণ শব্দটির যদি কোনো অর্থ থাকে তবে তা প্রকৃত তপশ্চর্যা এবং স্বাধ্যায়ের মধ্যেই নিহিত। সে অর্থে আমিও ব্রাহ্মণ এবং তুমিও। কিন্তু পিতা ব্রাহ্মণত্বের আধিকারিক হলেও, আমি ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়ত্বও অর্জন করতে পারলাম না। দাসীপুত্রই রয়ে গেলাম।
লোকাচার, দেশাচার অতিক্রম করা খুব সহজ কাজ নয়। জাতকদের দশবিধ সংস্কার করার সময় শাস্ত্রাচার যেমন অনুসরণীয়, লোকাচারও তদ্রূপ। তাই ধৃতরাষ্ট্র এবং পাণ্ডুর জাতকরণ এবং বিবাহাদি সংস্কার ক্ষত্রিয় কুলোচিত হলেও, আমার তেমন হয়নি। তাঁদের জন্য ক্ষত্রিয়কন্যা আহৃত হল। আমার বিবাহকালে জ্যেষ্ঠতাত মহারাজ দেবকের পারশবী কন্যাকে নির্বাচন করলেন। তাঁর গর্ভজাত পুত্ররা সবাই বিনয়ী এবং পরমগুণসম্পন্ন হয়েছে। আমি তাদের কুরুকুলের আবর্তের বাইরে রেখে, বাদরায়ণির শিক্ষায় মানুষ করেছি। দূরদর্শী পিতার নির্দেশেই তাদেরকে আমি কুরুকুল থেকে বিযুক্ত রেখেছি। কুরুকুলের কোনো ঋণ যেন তাদের ক্ষেত্রে না অর্শে। আমার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই যেন কুরুকুলের তাবৎ ঋণ আমার শেষ হয়ে যায়। আমার মাতা শূদ্রা হোন আর দাসী হোন কুলপিতা বিচিত্রবীর্যের দায় থেকে অন্তত তারা যেন মুক্ত থাকে।
হস্তিনাপুরের ব্রাহ্মণ এবং কুরুপ্রধানগণ একদিকে যেমন আমার পারশবী বর্ণসংকরত্বের জন্য আমাকে তাচ্ছিল্যকরণে প্রয়াসী ছিলেন, অপরদিকে বর্তমান কুরুকুলের বর্ণসংকরতা বিষয়ে তাঁদের বিলক্ষণ সন্ত্রস্ততাও ছিল। সর্বোপরি বাদরায়ণির অসাধারণ পাণ্ডিত্য তথা তত্ত্বজ্ঞতা তাঁদের মোটামুটি একটা সাম্যাবস্থায় রেখেছিল। আমি আবার বলছি, বাদরায়ণির শিক্ষাসমৃদ্ধ বিদুরকে উপেক্ষা করা খুব সহজ ছিল না। আগেই বলেছি, বাদরায়ণি এবং তাঁর মাতা, মহাজননী সত্যবতীর রাজনৈতিক প্রভাব কুরুকুলে অসম্ভব শক্তিশালী ছিল। তাই আমাকে কুলে প্রতিষ্ঠিত না করলেও একটা সম্মানজনক অবস্থানে রাখা কুলস্বার্থেই তাঁরা উপলব্ধি করেছিলেন। ব্রাহ্মণেরা তাই প্রচার শুরু করেছিল যে আমি ধর্ম, শতবর্ষের জন্য শূদ্রতা প্রাপ্ত হয়েছি, মাণ্ডব্য মুনির শাপে। এই সব কিংবদন্তির কল্যাণে আমি অধিকারী হলাম ধৃতরাষ্ট্রের মতো কুরুপ্রধানদের তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করার বিষয়। নতুবা শূদ্রা দাসীপুত্র, হস্তিনাপুর নরেশকে তত্ত্বজ্ঞান প্রদান করার স্পর্ধা কীভাবে দেখাতে পারে? ধর্মের অবতার বিদুর, বাদরায়ণির পুত্র বিদুর, যিনি সর্বশাস্ত্র মন্থন করে প্রাজ্ঞ হয়েছেন-তিনি তা অবশ্যই পারেন। ব্রাহ্মণদের এই কূটবুদ্ধির বাহবা না দিয়ে পারি না। যুধিষ্ঠির যে ধর্মপুত্র, তার নিশানাও এখানেই লভ্য। আমি ধর্মরাজ যমের অভিশপ্ত মনুষ্যরূপ, যুধিষ্ঠির ধর্মপুত্র, ধর্ম অংশে জাত।
আমি যখন কুরুসভায় স্ব-প্রণীত নীতির ব্যাখ্যা করতাম, কুরুকুলের কোনো সভাসদের সাধ্য হত না তাকে খণ্ডন করেন। কারণ শস্ত্র বিষয়ে তাঁরা যতই হস্তলাঘবের অধিকারী হউন, শাস্ত্র, অর্থাৎ জ্ঞান বিষয়ে আদৌ মস্তিষ্কবৃত্তির অধিকারী ছিলেন না। তাঁরা তো সেই যুগন্ধর, মহাপ্রাজ্ঞ দ্বৈপায়নের শিক্ষায় প্রথাগতভাবে সমৃদ্ধ হননি। তাঁরা শুধু তাঁর কিঞ্চিৎ উপদেশ আর কূটভাষের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। হ্যাঁ, ভীষ্মও এর অধিক কিছু ছিলেন না। তবে তিনি অসাধারণ বাস্তব-জ্ঞান-সম্পন্ন মানুষ ছিলেন, আর দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন। তাই তাঁর মধ্যে এক বিপুল অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার সঞ্চিত ছিল। সে কারণে তিনি ধার্তরাষ্ট্রগণের প্রতি নিয়ত উপদেশপ্রদানে উৎসাহী ছিলেন।
ভীষ্ম যে বাস্তববাদী ছিলেন, সেকথা অনস্বীকার্য। মানুষ দীর্ঘজীবন প্রাপ্ত হলে কিছু স্বাভাবিকগুণের অধিকারী হয়। জ্যেষ্ঠতাত সে কারণে দীর্ঘজীবনের নানা অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন। কিন্তু সব অভিজ্ঞতাই জ্ঞান নয়। দীর্ঘজীবী হলে মানুষ বহুদর্শী হয়। জ্যেষ্ঠতাত বহুদর্শী ছিলেন। অকৃতদার বিধায় তাঁর জাগতিককর্মের বিশেষ কোনো ভার ছিল না। ফলত ঋষিগণের নিয়মিত সঙ্গলাভের অফুরন্ত সময় তাঁর ছিল। সেকারণে, বহু ইতিহাস, পুরাণ কথা তাঁর জানা ছিল। কিন্তু তিনি প্রাজ্ঞ ছিলেন না। কেননা, প্রাজ্ঞ হলে আর্যরক্তের বিশুদ্ধতার প্রতি তাঁর পক্ষপাত থাকত না। দীর্ঘকাল সার্বভৌম রাজক্ষমতা তাঁর অধিকারেই ছিল। মহাজননী যাই সিদ্ধান্ত করুন, ভীষ্মকে দিয়ে অনুমোদন না করিয়ে প্রয়োগ করতেন না। তিনিও যেন কোন এক অজ্ঞাত কারণে মহাজননীর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতেন না।
তাঁর সম্পর্কে কুরুকুলে অনেক কাহিনি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আমার এমন কোনো অভিজ্ঞতাই ছিল না, যার জন্য তাঁকে আমরা একজন অসাধারণ বীর বা অসামান্য হস্তলাঘবের অধিকারী তিরন্দাজ হিসেবে মান্য করতে পারি। তাঁর যুদ্ধোদ্যমের প্রচেষ্টার কথা আদৌ আমার জানা নেই। কাশীরাজ দুহিতাদের স্বয়ংবর সভা থেকে তুলে আনার সময়, সামান্য কিছু যুদ্ধ হয়েছিল বটে, কিন্তু এসব ক্ষেত্রে ওরকম একটু ঘটেই থাকে, আর তা কখনোই তেমন ব্যাপক আকার ধারণ করে না। নিতান্ত সাধারণ ক্ষমতার ক্ষত্রিয়পুঙ্গবকেও এসব ক্ষেত্রে বিজয়ী হতে দেখা যায়। প্রতিস্পর্ধী রাজন্যরা কখনোই এই যুদ্ধকে তেমন গুরুত্ব দেন না। ব্যাপারটা অনেকটাই প্রহসন।
জ্যেষ্ঠতাত কোনোদিন দিগ্বিজয়ে বের হননি, মৃগয়ায় তাঁর আসক্তির কথাও জানা যায় না। বরং পাণ্ডু বহু রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত করে প্রভূত ধনরত্ন সংগ্রহ করে ধৃতরাষ্ট্রকে উপঢৌকন দিয়েছিলেন। যোদ্ধা হিসাবে তাঁর খ্যাতি ছিল। জ্যেষ্ঠতাত দুর্যোধনের সহায়তাকল্পে, বিরাটের উত্তর গোগৃহে গবীহরণেচ্ছু হলে বৃহন্নলাবেশী অর্জুনের হাতে উত্তমরূপেই লাঞ্ছিত হয়েছিলেন। এই তো তাঁর যুদ্ধের তাবৎ ইতিবৃত্ত। অথচ কুরুকুলে কিংবদন্তি এই যে, তিনি পরশুরামের প্রিয়শিষ্য এবং পৃথিবীতে অজেয় পুরুষ। পরশুরামও নাকি তাঁর কাছে একবার পরাজিত হয়েছিলেন। তিনি যে পরশুরাম শিষ্য, এ বিষয়ে আমরা শুধু কাহিনিই শুনেছি। এই পরশুরাম আদি ভৃগুরাম নন, যিনি ব্রাহ্মণদের নিয়ে ক্ষত্রধ্বংসে ব্রতী হয়েছিলেন। এটা আমার অনুমান।
পরশুরাম বা জাগদগ্ন্যরাম বহু প্রাচীন পুরুষ। যে যুগে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়েরা পরস্পরের প্রতি ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যুধ্যমান, তখন জামদগ্ন্যরাম ব্রাহ্মণদের নিয়ে একটি সশস্ত্র বাহিনী গঠন করেন। কথিত আছে যে, এই বাহিনী নিয়ে তিনি একুশবার পরপর পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করেছেন। কাহিনির বর্ণনায় যা উপলব্ধ হয়, তা হল, তাঁর নেতৃত্বে ক্ষত্রিয় নামধারী মানুষদের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণেরা একুশবার বা বহুবার যুদ্ধ করেন এবং ক্ষত্রিয়েরা পরাভূত হয়। তবে এরকম কাহিনি বা লোককথাও প্রচলিত যে, ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে ব্রাহ্মণরা বৈশ্য প্রভৃতি বর্ণের সাহায্যও কখনো কখনো গ্রহণ করেছিলেন এবং তথাপি পরাজিতও হয়েছিলেন। সে, বোধহয়, পরশুরামের আবির্ভাবের আগেকার কথা হবে। জামদগ্ন্যরাম যখন ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেননি, তখন তাঁরা নাকি বৈশ্য এবং শূদ্রদেরও সহায়তা নিয়ে ক্ষত্রিয়দের হাতে বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন।
যুদ্ধবিরতিকালীন সাময়িক শান্তির সময়ে ব্রাহ্মণেরা নাকি ক্ষত্রিয়দের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, তাঁরা কেন বিজয়ী হতে পারছেন না। ক্ষত্রিয়রা তখন বলেছিলেন, যে, এক অখণ্ড নেতৃত্বের অধীনে সংগ্রাম না করলে বিজয় লাভ করা যায় না। আপনারা যে যাঁর বিচারমতো চলতে চান, তাই কখনোই বিজয়লাভ করতে পারেন না। অতঃপর জামদগ্ন্যরামকে ব্রাহ্মণেরা তাঁদের অখণ্ড নেতা হিসেবে নির্বাচন করার পরই তাঁরা জয়লাভ করতে শুরু করেন। তার পরবর্তী দীর্ঘকাল এই পরশুরামের অনুগামী ব্রাহ্মণেরা শস্ত্রশিক্ষা বিষয়ে সবিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়ে আসছেন। এঁদের পরবর্তী সব দলপতিকেই এঁরা পরশুরাম নামে অভিহিত করে থাকেন। পরশুরাম নামটি একদা তাদের গোত্রনাম হয় এবং গোত্রাধিপতি এই নামেই পরিচিত হতে থাকেন। যখন ক্ষত্রিয় এবং ব্রাহ্মণদের বৃত্তির কোনো নির্দিষ্ট বা সুস্পষ্ট বিভাগ ছিল না, তখন এই সব পরশুরামেরা বহুবার ক্ষত্রিয়দের নিঃশেষ করার সংগ্রামে জয়ী হয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে এই সময়ে ব্রাহ্মণেরা কেউ যোগাচারী, স্বাধ্যায়ী বা তপোব্রতী ছিলেন, কেউ-বা শাসনাদি কার্যে ব্যাপৃত ছিলেন। সুতরাং ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কারণে ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণে বিরোধ ছিল। এখন বর্ণবিভাগ দৃঢ়তর এবং সুস্পষ্ট বৃত্তি-অনুযায়ী হওয়ায়, সেই সব বিরোধ শেষ হয়েছে। কিন্তু সম্প্রদায়টি ক্ষীণ হলেও আছে। এই সম্প্রদায়ের দলপতির প্রতীক চিহ্ন কুঠার। সম্ভবত জামদগ্ন্যরামের সময় লৌহময় কুঠারই তাঁদের অস্ত্র ছিল। তাই এই প্রতীক চিহ্ন। এখনও যাঁরা এই সম্প্রদায়ভুক্ত, তারা ক্ষত্রিয় এবং অস্ত্র-শিক্ষার্থী ব্রাহ্মণদের অস্ত্র-কৌশল শিক্ষা দিয়ে থাকেন। জ্যেষ্ঠতাত সম্ভবত এরকম কোনো ভৃগুবংশীয় পরবর্তী পরশুরামের কাছে অস্ত্রবিদ্যা শিক্ষা করেছিলেন এবং তাঁকেই কোনো একসময় শস্ত্রশৌর্যে পরাজিত করেছিলেন।
সে যা হোক, জ্যেষ্ঠতাতের সর্বাপেক্ষা বড়ো অবদান হল, এই বিশাল কুরুকুলকে দীর্ঘকাল ধরে সংরক্ষণ করা। চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্য মারা গেলে ধৃতরাষ্ট্র, পাণ্ডু এবং আমাকে তিনিই পোষণ করেছেন। দুর্যোধন এবং যুধিষ্ঠিরাদি কুমারগণের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থাও তিনিই করেছেন। তপোবনে পাণ্ডুর মৃত্যু হলে, পাণ্ডবদের কুমার হিসেবে কুলে গ্রহণ করা তাঁর পক্ষে কম কঠিন কাজ ছিল না। কারণ এবিষয়ে তাঁকেই বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছিল পরিবারস্থ জনেদের নিকট। তাঁরা পাণ্ডুর অক্ষমতা বিষয়ে তখন তাবৎ সংবাদ জ্ঞাত। নগরবাসীরাও ইতোমধ্যে অনেকেই পাণ্ডুর অক্ষমতার কথা জেনেছিল। এখন এইসব বালকদের দেখে, তারাও নানারকম প্রশ্ন উত্থাপন করতে শুরু করেছিল। ভীষ্ম তাঁর প্রখর বাস্তব-জ্ঞান এবং বুদ্ধির সাহায্যে এই সব তুচ্ছ ব্যাপারের মূলোচ্ছেদ করতে চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তথাপি সে ব্যাপারের মূলোচ্ছেদ সম্ভব হয়নি। দগ্ধবীর্য পাণ্ডুর পুত্ররা সেকারণেই ধার্তরাষ্ট্রদের নিকট গৃহীত হলেন না। তবে, আমার কাছে, এইসব লুকোচুরির কোনো অর্থ নেই। কে কার ঔরসে জন্মেছে, তা জেনে মানুষের কী যে পরমার্থ লাভ হয় তা আমি বুঝি না। জানি, অভিজাতরা শুধু এইসব বিষয় নিয়ে ভাবুক হন। যাঁরা তত্ত্বজ্ঞ তাঁরাও এসব নিয়ে কেন যে ভাবেন জানি না। পিতা দ্বৈপায়নও এই নিয়ে তত্ত্ব রচনা করেছেন। তিনি একস্থানে লিখেছেন, স্ত্রীগণ দুষ্টা হলে বর্ণসংকরের জন্ম হয়। আর বর্ণসংকর হলে, জাতিধর্ম এবং কুলধর্ম নষ্ট হয়। এখন আমার বিচার এই যে, জাতি আর কুলধর্ম বিষয়টাই বড়ো ধোঁয়াটে। এর নির্ণয় বংশভিত্তিক হলে বড়োই সংকট দেখা দেয়। তখন এই ধর্মের কূটভাষসমূহ একের পর এক সৃষ্ট হতে থাকে এবং ধর্ম এক জটিল রূপ পরিগ্রহ করে। বাদরায়ণি আমার পিতা এবং শিক্ষাগুরু। তাঁর সংহিতা অনুসারেই কুরুকুল এবং অন্যান্য মহৎকুলগুলি পরিচালিত হচ্ছে। সেই সংহিতাই বর্তমানে ধর্ম। কিন্তু না বলে পারছি না পিতার এই সংহিতায় একদেশদর্শিতা আছে। বিশেষত স্ত্রীজাতি বিষয়ে অনেক স্থলেই পিতা বড়ো অকরুণ-বিধির নিদান দিয়েছেন।
জ্ঞান হওয়া অবধি দেখেছি যে, ক্ষত্রিয় রাজপুত্ররা এবং আমরা, যারা সূত বা পারশব, তারা একই পিতার সন্তান, মাতা ভিন্ন। ক্ষত্রিয় রাজপুত্রদের অবশ্যই রাজকন্যাদের গর্ভে জন্মাতে হবে। অর্থাৎ, রাজপুত্রদের মাতারা অবশ্যই রাজবংশীয়া হবেন এবং রাজকুলের বধূও হবেন। সূতদের পিতারা রাজকুলজাত হতে পারেন, কিন্তু যেহেতু তাঁদের মাতারা রাজকুলজাতা নন, তাই তাঁরা কৌলিক অধিকারের আধিকারিক হবেন না।
আমার পিতা বাদরায়ণি, মাতা শূদ্রা। আমার কথা স্বতন্ত্র। কেননা, আমার মাতা দাসী ছিলেন এবং পিতা বাদরায়ণিও কোনো রাজকুলসম্ভূত পুরুষ নন। কর্ণের পিতা সূর্য, অথবা আমার বিশ্বাসমতো যদি বলি, পিতা সূর্যতেজা দুর্বাসা, মাতা কুন্তী, পালক পিতা অধিরথ, কর্ণ প্রকৃত অর্থে পাণ্ডুর সহোঢ় পুত্র, সূত বা পারশবী নন। নিয়মানুসারে তিনি মূর্ধাভিষিক্ত। সঞ্জয় সূতপুত্র। সংহিতা-নির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ী আমাদের অধিকার ভেদ করা হয়েছে। আমাদের মতো বর্ণসংকরদের মধ্যেও নানান রকমভেদ, জাতিভেদ ইত্যাদির উদ্ভব বর্তমান সমাজে হয়েছে। আমরা সূতরা একটি বিশিষ্ট জাতি। আমরা ক্ষত্রিয়দের খুবই নিকটবর্তী, কিন্তু সমান অধিকারের আধিকারিক নই।
ধৃতরাষ্ট্র জন্মান্ধ, পাণ্ডু যৌনরোগগ্রস্ত। আমি সর্বাঙ্গকুশল কুমার, কিন্তু আমার মাতা শূদ্রা দাসী তাই আমার রাজা হবার অধিকার নেই।
উদ্ধবের কাছে জানলাম, অভিমন্যু পুত্র পরীক্ষিৎ, হস্তিনাপুরে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হয়েছেন এবং অনিরুদ্ধ পুত্র বজ্রকে ইন্দ্রপ্রস্থের সিংহাসনের উত্তরাধিকারীর পদে বৃত করা হয়েছে। কিন্তু ধৃতরাষ্ট্রের একমাত্র জীবিত পুত্র যুযুৎসুর এইসব রাজ-রাজত্বে আদৌ কোনো অধিকার নেই। কেন? না, তার মাতা বৈশ্য, সে জন্মসূত্রে সূত।
যদি কেউ আমাদের পিতা সংহিতাকারক মহাত্মা বাদরায়ণিকে সূত বলেন, তা কিন্তু অবশ্যই গ্রাহ্য হবে না। বর্তমান ক্ষত্রিয় রাজন্যকুল তাঁকে এক অসামান্য সামাজিক অবস্থানে সংস্থাপিত করেছেন। তাঁকে সবাই ব্রাহ্মণ বলেই জানেন। তাঁর এরূপ প্রতিষ্ঠার পিছনে বহুবিধ কারণের মধ্যে যে দুটি প্রধান তা হল, তিনি অগাধ জ্ঞানসম্পন্ন পুরুষ, তাঁর তুল্য প্রজ্ঞাবান অপর কেউই আর্যাবর্তে দৃষ্ট হন না এবং তাঁর দিক থেকে ক্ষমতা বা রাজত্বে লোভী হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বস্তুতই বিশাল বুদ্ধিসম্পন্ন কৃষ্ণদ্বৈপায়ন রাজ-রাজত্ব বা তাবৎ ক্ষমতাসম্ভব বিষয়ের বহু ঊর্ধ্বে স্থিত। কিন্তু তাঁর অর্থ এই নয় যে তিনি রাজক্ষমতার পরিচালনে আদৌ উৎসাহী নন। তিনি ক্ষুদ্র ক্ষমতায় বিশ্বাস করেন না বা তা তাঁকে প্রলুব্ধও করে না। আর্যাবর্তীয় রাজারা যেমন স্ব-স্ব রাজ্যখণ্ড এবং তার অভ্যন্তরস্থ ক্ষমতা ভোগ করতে আগ্রহী, কৃষ্ণদ্বৈপায়ন আগ্রহী গোটা আর্যাবর্তের ক্ষমতার তুঙ্গে থেকে স্ব-অঙ্গুলিহেলনে তা পরিচালনা করতে। অচ্যুৎকৃষ্ণ এবং তিনি এ বিষয়ে সমধর্মী কিন্তু পরস্পরের প্রতিপক্ষ নন। তাঁদের উভয়েরই উদ্দেশ্য এক এবং তা হল, সারা আর্যাবর্তে বর্ণাশ্রমী সমাজ স্থাপন করা। আমি দেখেছি, কৃষ্ণদ্বৈপায়নের অঙ্গুলিহেলনে শুধু কুরুকুল নয়, অনেক কুলই ওঠে এবং বসে।
কৃষ্ণদ্বৈপায়ন সূত এবং ক্ষত্রিয়দের খুব চমৎকারভাবে জানেন এবং বোঝেন। যদিও প্রকৃতিপুঞ্জ এবং রাজন্যদের কাছে তিনি একজন ব্রাহ্মণ ঋষি বলেই সম্মানিত এবং আদৃত, তিনি নিজে কিন্তু আপনাকে একজন সূত বলেই গণ্য করেন। একথা তিনি আমাকে অনেকবারই বলেছেন। তিনি বলেন, আমি চাই না সূতরা তাদের অর্ধভ্রাতা ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে ক্ষমতা নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে লিপ্ত হোক। আমি চাই তারা রাজন্যদের কাছাকাছি থাকুক-দুর্গের ভিতরেই থাকুক-কিন্তু প্রাসাদে নয়। প্রাসাদে থাকলেই ক্ষমতার লোভে পড়বে তারা, রাজন্য হবার বাসনা হবে তাদের। তার চাইতে, আমি চাই, তারা সারথি হোক, যোদ্ধা হোক বা রাজাদের স্তুতি পাঠ করুক। তারা জ্ঞানচর্চায় ব্রতী হোক, সর্বোপরি ইতিহাসকথনে নিপুণতা লাভ করুক।
কিন্তু তাঁর এমত আকাঙ্খা সত্ত্বেও সূতরা যে কখনো ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়নি তা নয়, বা ভবিষ্যতে লিপ্ত হবে না এমনও কোনো নিশ্চয়তা দেখি না। ক্ষমতা বর্ণবিশেষের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে শাসিত বর্ণ দ্বন্দ্বে রত হবেই। কিন্তু সে প্রসঙ্গ ভিন্ন।
আমি লক্ষ করেছি, পিতা এই মহাযুদ্ধের বহু আগে থেকেই বিভিন্ন স্থানের সূতদের উপর দায়িত্ব ন্যস্ত করেছেন, যেন তাঁরা ভারত বিপ্লবের প্রতিটি ঘটনা অনুপুঙ্খভাবে লিপিবদ্ধ করে রাখেন। পিতা যদিও সচেষ্ট ছিলেন যাতে এই দুঃখজনক ঘটনা না ঘটে, কিন্তু তাঁর দীর্ঘদৃষ্টির অনুমানে বুঝেছিলেন যে এ যুদ্ধ ঘটবেই। শুধু কুরুকুলই নয়, আর্যাবর্তের সমগ্র রাজন্যকুলই অতিমাত্রায় ক্ষমতাকামুক হয়ে পড়েছিল। কেউ কারও আধিপত্য সহ্য করতে রাজি ছিল না। এমনকী অচ্যুতকৃষ্ণের নেতৃত্বে ধী, শ্রী এবং ঋদ্ধি সম্ভোগকারী যাদবগণও তাঁদের গণরাজ্যের সুষম ব্যবস্থার কথা বিস্মৃত হয়ে পরস্পর পরস্পরকে স্পর্ধা করতে শুরু করেছিলেন। মহাযুদ্ধে তাই অচ্যুত আপাত নিরপেক্ষ কিন্তু সদর্থে পাণ্ডবপক্ষাবলম্বী হলে নারায়ণী সেনাসহ কৃতবর্মা স্বয়ং কৌরবপক্ষে যোগদান করেছিলেন। রোহিণী কুমার বলদেব তো প্রকাশ্যেই অচ্যুতকে পক্ষপাতিত্ব দোষে দুষ্ট বলে অভিযুক্ত করেছেন। উদ্ধব জানালেন, যে গদাদ্বন্দ্বে ভীমের অন্যায় আচরণ অসহ্য বোধ হলে, তিনি, কৃতবর্মা ইত্যাদি যাদবদের নিয়ে পাণ্ডবগণকে নির্মূল করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। অচ্যুত কূট-কৌশলে তাঁকে নিবৃত্ত করেন। দুর্যোধন তাঁর প্রিয় শিষ্য ছিলেন। তাঁর পতনে বলদেবের ক্ষোভ স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্ষোভই তাঁর উত্তেজিত হবার একমাত্র কারণ নয়। মহাযুদ্ধে যেসব যাদব কুরুপক্ষে ছিল, তিনি ছিলেন তাদের নেতা। বলদেব অচ্যুতের ন্যায় সূক্ষ্ম কূটবুদ্ধির অধিকারী ছিলেন না। উপরন্তু, অত্যধিক সুরাপানে তাঁর বিচার-বুদ্ধি সর্বদা তরল থাকত। তিনি অকস্মাৎ জ্বলে উঠতেন, আবার নিমেষে নিভে যেতেন। সেকারণে রাজনীতির কূটকৌশল বা চতুরতা তাঁর চরিত্রানুগ ছিল না। অচ্যুত তাই কূটকৌশলে তাঁর বিরোধী যাদবদের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাণ্ডবেরা সৈন্যের পরিবর্তে ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ অচ্যুতকে বরণ করে সুবুদ্ধির কাজই করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের সুবুদ্ধি বা অচ্যুতের কূটনীতি শেষ পর্যন্ত কিছুই কাজে লাগল না।
এখন সমগ্র আর্যাবর্ত শোকমগ্ন। বিজয়ী এবং হতাবশিষ্ট বিজিত তথা তাদের স্বজন-বান্ধবগণ সকলেই সন্তপ্ত। রাষ্ট্রক্ষেত্রে যদিও এখন অস্থিরতা নেই, কিন্তু শাসন ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা আছে। দস্যুতস্করের উপদ্রব অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্যোধনপক্ষীয় যেসব সৈন্যগণ পলায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল, তারা দ্রোহ উৎপন্ন করছে। মানুষ অপরিসীম অভাবগ্রস্ত। শস্যক্ষেত্রে কৃষিবলের অনটন হেতু ধান্যকৃত বা গোধূমের চাষ বিঘ্নিত।
উদ্ধবের কাছ থেকে যা শুনছি, তাতে এই মুহূর্তে যদি কোনো তীক্ষ্ণধী পুরুষ কুরুবংশে আবির্ভূত না হন, তবে যেটুকু অবশিষ্ট আছে তাও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। যুদ্ধ অবসানের পরও বেশ কিছুকাল গত হয়েছে। এর মধ্যে নাকি যুধিষ্ঠির একটি অশ্বমেধ যজ্ঞের অনুষ্ঠানও করেছেন। সেও এক যুদ্ধেরই ব্যাপার। তাতেও সেনা এবং অর্থক্ষয় অবধারিত। এই সময় অশ্বমেধ যজ্ঞ না করে তিনি শাসন সংস্কারে প্রয়াসী হলে, রাজ্যের প্রকৃতিপুঞ্জ স্বস্তি পেত। দুর্যোধনের অনেক দোষ থাকা সত্ত্বেও যে মহৎ গুণটি ছিল, তা হল সে সাধারণ প্রজাদের সুখ-শান্তির প্রতি দৃষ্টি রেখে চলত। তার শাসনে প্রজারা সুখেই ছিল। অনাবশ্যক যজ্ঞ-টজ্ঞ নিয়ে সে মাথা ঘামাত না বা সে কারণে যেসব অনভিপ্রেত বৈরী উৎপন্ন হয়, আর্যাবতের রাজন্যবর্গের সঙ্গে তার কোনোদিনই তা ঘটেনি। একারণে মহাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ নৃপতিই স্বেচ্ছায় তার অনুগামী হয়েছিল, তার ভাগ্যের সঙ্গে নিজেদের ভাগ্য জড়িত করেছিল, তার পক্ষীয়গণের এই সংখ্যাধিক্য অবশ্যই তার কিছু সুকৃতির ফল। পাণ্ডবদের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। কেননা রাজ্য শাসন বিষয়ে তাদের তেমন কিছু সুকৃতি ছিল না। যদিও বলা হয়ে থাকে যে, তারা ন্যায় এবং সত্যের পথে বরাবর চলতে চেষ্টা করেছে, তবু তাদের বন্ধু-ভাগ্য যে ভালো ছিল না একথা বলা যেতে পারে। দুর্যোধনের পক্ষে তার সঙ্গে আত্মীয়তাবিহীন অনেক নৃপতিই যোগদান করেছিল। কিন্তু পাণ্ডবপক্ষে শুধু তাদের আত্মীয়রাই সহযোগিতা করেছে।
ন্যায় এবং সত্যের কোনো শাশ্বত সংহিতা নেই। মনীষীরা যুগ নিয়ম নির্বন্ধে যে সংহিতা প্রবর্তন করেন, আমার পিতা বাদরায়ণি তাকেই যুগধর্ম বলেছেন। যুধিষ্ঠির এবং তার ভ্রাতারা সত্য এবং ন্যায়ের যে সংহিতা বাল্যাবধি অনুসরণ করে চলেছেন, তা সর্বক্ষেত্রে যুগানুগ নয়। সে কারণে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন যাদবশ্রেষ্ঠ কূটনীতিবিশারদ অচ্যুতের সাহচর্যে যুগানুযায়ী একটি সংহিতা সৃষ্টি করেছেন। সেই সংহিতা অচ্যুতকৃষ্ণ বহুকাল ধরেই পাণ্ডবদের অনুসরণ করতে অনুজ্ঞা করেছেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির পুরা-সংহিতাসমূহের মোহে এত বেশি আবদ্ধ ছিলেন যে, বর্তমান সংহিতার যুগ-নির্বন্ধতা বিষয়ে সম্যকজ্ঞান লাভ করতে সক্ষম হননি। ফলে, দুর্যোধনাদির নিয়ত কূটকৌশলের কাছে তাঁকে বরাবর অপদস্থ হতে হয়েছে।
কুরুকুলের কুলপতিরা পাণ্ডবদের নীতিনিষ্ঠা এবং সত্যবৎসলতায় খুবই মুগ্ধ ছিলেন। কারণ তাতে তাঁদের যথেষ্টই লাভ ছিল। কিন্তু দুর্যোধনাদি ধার্তরাষ্ট্ররা এই অবক্ষয়ী যুগান্তকালের স্বাভাবিক কূটকচালি, ক্ষমতা কুক্ষিগত করার অপকৌশল বিষয়ে সম্যক অবহিত ছিল। মারি অরি পারি যে কৌশলে-এই মন্ত্র ততদিন তাদের আদর্শ হয়েছিল। যুধিষ্ঠির এবং তাঁর ভ্রাতারা এই নীতি অনেক পরে অনুসরণ করে। ক্ষমতার দ্বন্দ্বে কোন নীতি ভালো, কোনটা মন্দ, বা কোনটা ধর্ম আর কোনটা অধর্ম-এই বিচারের অবকাশ নেই। থাকা উচিত কিনা, সে প্রশ্ন অবান্তর, তবে থাকে না এটাই দেখা যায়। এই সংহিতায়, তাই বাদরায়ণি এবং অচ্যুতকৃষ্ণ, ভালোমন্দ, পাপপুণ্য, ধর্ম-অধর্ম ইত্যাকার যাবতীয় সমাজনৈতিক বিষয়কে আলোচনার বাইরে রেখে শুধুমাত্র কর্মকেই প্রাধান্য দিয়েছেন, আর, সেই কর্ম করার কৌশলকে বলেছেন যোগ। বলেছেন, যোগাঃ কর্মসু কৌশলম। বলেছেন, জানামি ধর্মং ন চ মে প্রবৃত্তিঃ, জানাম্যধর্মং ন চ মে নিবৃত্তিঃ। ত্বয়া হৃষীকেশ হৃদিস্থিতেন যথা নিযুক্তো স্মি তথা করোমি। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, হৃদিস্থিত হৃষীকেশের নিযুক্তির সদর্থক স্পন্দন অনুসরণ করে কজনেই বা এ সংসারে কর্ম করতে পারে? কিন্তু ‘নচমে প্রবৃত্তি’ এই সহজ অনুভবে আকৃষ্ট হয় সবাই। ফলে, অনর্থ বাড়ে। এই সব তত্ত্ব অচ্যুত এবং বাদরায়ণি আমাকে প্রায়শই বলতেন। পূর্বের যাবতীয় ধ্যানধারণাকে বিচারের বাইরে রেখেই তাঁরা এই সংহিতা সৃষ্টি করেন, যার মূলকথা ক্লৈব্য পরিত্যাগ করে কর্ম করা এবং ফলের প্রত্যাশী না হওয়া। কেননা, ফলপ্রাপ্তির বিষয়ে কেউই নিশ্চয় করে জানেন না। পিতাকে একদিন এই অদ্ভুত তত্ত্বের বিষয়ে আলোচনা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করেছিলাম। আমি বলেছিলাম, ভগবন, মানুষ কর্ম করে ফললাভের আশায়, ফল সম্পর্কে আশাবাদী বা আকাঙ্খী না হয়ে কীভাবে তাহলে সে কর্মে উৎসাহী হবে? পিতা বলেছিলেন, মানুষ কর্মে উৎসাহী হোক নিরুৎসাহী হোক, কর্ম তার জন্মনির্দিষ্ট। কর্ম তাকে করতেই হবে। কর্মফল প্রাপ্তির আকাঙ্খী হলে, ব্যর্থতার দুঃখ তাকে পেতে হবে, তাই এ তত্ত্ব। নির্মোহ কর্মে এই দুঃখের সম্ভাবনা থাকে না। আমি আবার প্রশ্ন করেছিলাম, সাংসারিক জীবনে, ত্রিতাপদুঃখক্লিষ্ট মানুষ কীভাবে নির্মোহ কর্মে যুক্ত হতে পারে? লোকায়ত লাভক্ষতির কথাও একেবারে তুচ্ছ করা যায় না। তারা কীভাবে নিষ্কাম কর্মে উৎসাহী হবে? কৃষিবলেরা ধান্যকৃত, গোধূম, মুদগ প্রভৃতি শস্যের আশায় ক্ষেত্র কর্ষণ করে থাকে। তারা যদি স্বর্ণকান্তি ধান্যকৃত বা এইসব শস্যের আকাঙ্খা না করে তবে ওই নিদারুণ ক্লেশ বহন করে ক্ষেত্রকর্ষণাদির কাজ কেন করবে? পিতা উত্তর করেছিলেন বৎস, তোমার বিতর্ক উত্তম এবং ন্যায়াশ্রয়ী। কিন্তু একটু গহনে যদি দৃষ্টিপাত কর, দেখবে, কৃষিবলের কর্ষণ বপন এবং রোপণে যে স্বাধিকার, শস্যলাভে সে স্বাধিকার নেই। শ্রমাদি আবশ্যকীয় ক্রিয়ার সঙ্গে ধান্য, যব বা গোধূমের ফলপ্রাপ্তি আদৌ শর্তসাপেক্ষ নয়। উপযুক্ত পর্জন্য বর্ষণ, আতপ কিরণ, পঙ্গপালাদির আধিভৌতিক আক্রমণ ইত্যাদি নৈসর্গিক কারণে ফলপ্রাপ্তি বিঘ্নিত হতে পারে। তপস্যা দ্বারা কৃষিবলেরা হয়তো এই সমুদায় প্রতিকূলতাকে জয় করতে সক্ষম হতে পারে, তবু আরও অনেক প্রতিকূলতাই ফললাভের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করে থাকে। যদিও আমার সংহিতার বাস্তবানুসরণ অতি কষ্টসাধ্য, তবু বলব, মনুষ্য যদি এই প্রজ্ঞায় নিজেকে ঋদ্ধ করে, তবে দুঃখরূপ সন্তাপ তাকে সামান্যই ক্লিষ্ট করবে। ফলত সে আত্যন্তিক হতাশার শিকার হবে না।
এর প্রত্যুত্তরে পিতাকে বলার মতো আমার যথেষ্ট বাস্তব যুক্তি ছিল না তা নয়, তবে আমি তা বলিনি। আমি বলতে পারতাম যে এই তত্ত্বের অনুজ্ঞাসমূহকে মানুষ যদি মোহযুক্ত হয়ে অনুসরণ করে তবে তার থেকে মহৎ বিপত্তি ঘটতে পারে। তবে আমিও অন্তরে যে পিতার এই তত্ত্বের দার্শনিকতায় আকৃষ্ট হইনি, তা নয়। আমার মনে হয়েছিল, যুক্তিই সব সময়ে সত্যকে সার্বিকতায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। যুক্তির এক নির্দিষ্ট সীমারেখা আছে। এই মানসিকতার জন্য আমি আর কোনো প্রতিযুক্তির অবতারণা করিনি। কিন্তু এই সংহিতার তত্ত্ববিষয়ে আমার মনে নানারূপ সংশয় ছিল।
এই সংহিতাকে বাদরায়ণি এবং অচ্যুত আর্যাবর্তীয় রাজন্যবর্গের তথা চাতুর্বর্ণ্যের যাবতীয় মনুষ্যের অনুসরণীয় এক সনাতন বিধি হিসেবে প্রচার করেছেন। সেখানে কর্মের বিষয়ে নৈর্ব্যক্তিকতাকে তাঁরা চূড়ান্ত তাত্ত্বিকতায় প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছেন। অচ্যুত চেয়েছিলেন পাণ্ডবেরা এই সংহিতাকে আশ্রয় করে কর্ম করে যান। ফল কী দাঁড়ায় দেখা যাক। বাদরায়ণির ইচ্ছাও অনুরূপই ছিল। ক্রমশ আর্যাবর্তীয় রাজন্যকুল এই নতুন সংহিতাকে অবলম্বন করে রাষ্ট্রধর্ম পালন করুন এবং চাতুর্বর্ণ্য বিধি অনুযায়ী সামাজিক বিন্যাস করুন, এমত আকাঙ্খাও তাঁদের ছিল।
কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে এই যে আর্যাবর্তীয় রাজন্যকুল মস্তিষ্কবৃত্তির দিক দিয়ে নিতান্তই বদ্ধ-মস্তক। সেখানে প্রথাগত, কুলগত এবং যে সব অর্ধশিক্ষিত বা অশিক্ষিত ব্রাহ্মণ ঋষিগণের দ্বারা তাঁরা পরিবৃত এবং উপদিষ্ট হয়ে থাকেন, তাঁদের কুশিক্ষাজনিত প্রভাববশত পুরা-সংহিতাসমূহকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। সেই সব সংহিতার কার্যকাল যে ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে সেদিকে কারওরই কোনো ভ্রূক্ষেপ মাত্র নেই। যেমন, আমারই ঔরসজাত পুত্র যুধিষ্ঠিরের কথাই যদি ধরা যায়, সে বাল্যাবধি যে ধর্মাচরণ করে যশস্বী হতে চেয়েছে, তার উল্লেখ করা যেতে পারে। যুধিষ্ঠির বেদবিধি এবং ব্রাহ্মণ্য অনুশাসনের বড়ো অন্ধ অনুসরণকারী। ব্রাহ্মণেরা যে সবাই সমান বেদবিদ নন, সবার যে শাস্ত্রজ্ঞান সমান নয়, এ তথ্য তার অজ্ঞাত। ব্রাহ্মণমাত্রেই শ্রদ্ধার যোগ্য এবং তাঁদের অনুশাসন মানাই ধর্ম এরকমই তার বিশ্বাস ছিল। প্রাচীন লোকাচার এবং বৈদিক রীতিনীতির দ্বারা সে সম্যক পরিচালিত হত। এমনকী যেসব রীতি অধুনা সমাজে অপ্রচলিত, তাকেও সে ধর্ম হিসেবেই প্রতিষ্ঠা দিতে প্রয়াসী ছিল। এর ফল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খুব ক্ষতিকারক হয়েছে। ব্রাহ্মণদের প্রতি পাণ্ডবেরা কেন যে এত অধিক আকৃষ্ট তা নিয়ে আমি অনেক চিন্তা করেছি। যুধিষ্ঠিরকে বহুবার এ নিয়ে প্রশ্নও করেছি। যুধিষ্ঠির পরিষ্কারভাবে আমাকে কিছু উত্তর দেয়নি। তবে আমার মনে হয়েছে এবং অবশ্যই তার কার্যকারণও আমি বিশ্লেষণ করেছি, যে তাদের এই ব্রাহ্মণ নীতি আদৌ অকারণ নয়।
বর্তমান সময়ে ব্রাহ্মণদের প্রতাপ খুবই উগ্র। বিগতকালে এঁরা ক্ষত্রিয়দের সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রামে লিপ্ত হয়েছিলেন। সংগ্রামের কারণ অবশ্যই রাজনৈতিক ক্ষমতা সম্ভোগের বাসনা। তখন বর্ণভেদের সমস্যা তত তীব্র নয়। তখনও আর্যসন্তানদের মধ্যে কে ক্ষাত্রবৃত্তি অবলম্বন করবে, কে ব্রাহ্মণ্যবৃত্তি, তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। তখন, পিতা যেমন আমায় বলেছেন, সবাই ব্রাহ্মণ, একবর্ণ। চাতুর্বর্ণ্য সমাজ তখনও গড়ে ওঠেনি। প্রথমে বর্ণভেদ হল দুভাগে। তাঁদের দুই বেদ। তারপর বৈশ্য বর্ণ এলে তিন বেদ হল। চতুর্থ বেদের সৃষ্টি হল অনেক কাল পরে। এর সব কিছুরই মূলে রয়েছে আর্য আর অনার্যদের বিরোধ আর ক্রমান্বয়ে বর্ণসংকরী প্রজনন। আমার পিতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বর্ণাসংকর্যের পক্ষে, কিন্তু একই সঙ্গে আবার বর্ণাশ্রমেরও প্রতিষ্ঠাকামী।
ব্রাহ্মণ আর ক্ষত্রিয়দের বিরোধে এক সময় ক্ষত্রিয় বর্ণ নিশ্চিহ্ন হল। আগেই বলেছি, তখন যে সব মনুষ্য ক্ষত্রিয়বৃত্তিধারী ছিল, তারা পরশুরাম সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণদের হাতে নিশ্চিহ্ন হল। নিহত ক্ষত্রিয়দের বিধবারা তখন পরশুরামপন্থী ব্রাহ্মণদের দ্বারা রমিত হয়ে নতুন ক্ষত্রিয়দের সৃষ্টি করলে নানান ক্ষত্রিয় প্রবরদের উদ্ভব হয়। প্রবরভিত্তিক কুলোল্লেখের সূচনা তখন থেকেই- ঔর্বচ্যবনজামদগ্ন্যপ্নোবৎ প্রবরস্য ইত্যাদি মন্ত্রেই এর আভাস আছে।
বর্তমান ক্ষত্রিয়কুলের কেউই মূল ক্ষত্রিয় নন। এঁদের সকলেরই পূর্বজরা একদা পরশুরামপন্থী ব্রাহ্মণদের দ্বারা নিহত ক্ষত্রিয়দের বিধবাদের গর্ভে সেই সব ব্রাহ্মণগণ কর্তৃকই জনিত। সেই সব জনক ব্রাহ্মণেরা ঔর্ব, চ্যবন, জামদগ্ন্য অর্থাৎ পরশুরাম এবং তৎসম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণদের বীর্যসম্ভব। চতুর্বর্ণের উদ্ভব বৃত্তান্তের কথা পিতা এভাবেই আমায় বলেছেন। এখন যারা ক্ষত্রিয়ত্ব দাবি করে বর্ণ-শুদ্ধতার, বংশকৌলীন্যের অহংকারে মত্ত, তারা কেউই বিশুদ্ধ ক্ষত্রিয় নয়। অথবা বিশুদ্ধ ক্ষত্রিয়, ব্রাহ্মণ, বা অন্য কোনো বর্ণ একটা নিছক বানানো ব্যাপার। কারণ মানুষের জন্মবৃত্তান্ত বড়োই রহস্যময়। মানুষ মানুষের ঔরসেই জন্মায়। বর্ণভাগ অতঃপরের বৃত্তান্ত। বর্তমানে চাতুর্বর্ণ্যের শিথিলতা সর্বত্রই পরিদৃশ্যমান। এখন তো বর্ণবিভাগ বংশভিত্তিকতার উপরেই আশ্রয়ী। তবে দ্বন্দ্বোত্তর যুগে ব্রাহ্মণ্যবৃত্তিধারীরা সবিশেষ শক্তিশালী হয়েছেন। এর কারণ, ক্ষত্রিয়দের চিরন্তন শস্ত্র সাধনা এবং ব্রাহ্মণদের শাস্ত্র। ব্রাহ্মণেরাই শাস্ত্রনির্মাতা, ব্যাখ্যাকর্তা তথা সংহিতার স্রষ্টা। ক্ষত্রিয়াদি যাবতীয় বর্ণের মানুষেরা ধন, যশ বা ক্ষমতায় যতই ঋদ্ধ হোক না কেন, তাদের ব্রাহ্মণদের উপর নির্ভরশীল থাকতেই হত। জ্ঞানের চর্চা কুক্ষিগত রেখেই সমাজে এই সুবিধাজনক অবস্থানে তাঁরা স্থায়ী হয়েছেন। সেকারণেই সংহিতাকে সনাতন করার জন্য তাঁরা এত উৎসাহী এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই সংহিতাই সনাতন ধর্ম। ক্ষমতার কেন্দ্রে যাঁরা থাকেন তাঁরা স্বকীয় সংহিতাকে সর্বদাই সনাতন বা শাশ্বত রূপে দেখতে চান।
এ নিয়ে পিতা দ্বৈপায়নের সঙ্গে আমার বিতর্ক অনেকই হয়েছে। পিতার অভিমত এই যে ক্ষত্রিয়কুল যেহেতু রাজন্য এবং চতুর্বলের অধিকারী, এরকম একটি সংহিতায় তাদের আবদ্ধ না রাখলে, তারা অপরিসীম স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠবে, আর তা অন্যান্য মনুষ্যজনেদের পক্ষে খুব দুঃসহ। কিন্তু আমার বিচারে, এই সংহিতাও রাজন্যবর্গকে সংহত বা সংযত রাখতে পারবে না। তা ছাড়া নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী ব্রাহ্মণেরাও কি অন্যান্য বর্ণের মানুষদের উপর উৎপীড়ন করছেন না? এই উৎপীড়ন ক্রমশ বাড়তেই থাকবে। কোনো সংহিতায় এর কিছুমাত্র প্রতিকারব্যবস্থা রাখা হয়নি, বর্তমান সংহিতায়ও নয়। প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় চর্যাশ্রয়ী মানুষেরাই অপর বর্ণীয়দের উপর স্বেচ্ছাচারে প্রমত্ত। ব্রাহ্মণ্য বর্ণ সেখানে মস্তিষ্কের ভূমিকায়।
যুধিষ্ঠির একারণেই ব্রাহ্মণদের অত অনুগত। তার মনে অন্য ভীতিও আছে। সে জানে, ব্রাহ্মণেরাই মানুষের উচ্চ এবং নীচ বর্ণের ব্যবস্থাপনা করে থাকেন। তাঁদের খুশি মতোই বর্ণসংকরেরা বা ভিন্ন বর্ণের মানুষেরা ক্ষত্রিয়ত্ব লাভ করে। এমনকী অনার্য জাতীয় বহু মানুষকেও তাঁরা এভাবে ক্ষত্রিয়ত্বে উন্নীত করেছেন দেখা যায়। সেখানে তাঁদের বিচার, সেইসব মানুষেরা ক্ষমতাশালী কিনা তার উপর নির্ভর করে। বহু শক, যবন, আভীর ইত্যাদি জাতির মানুষকে তাঁরা ক্ষত্রিয়ত্বে স্থায়ী করেছেন দেখেছি। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি ক্ষত্রিয়ত্ব, বৈশ্যত্ব অথবা শূদ্রত্ব থেকে ব্রাহ্মণত্বে উত্তীর্ণ হতে চায়, তাঁরা তাকে কঠোর আঘাতে শাসন করেন। আবার তাঁদের খেয়ালে ক্ষত্রিয়নৃপতিরাও যে চণ্ডাল বা অনুরূপ জাতীয় মনুষ্যে পরিণত হয়েছে তারও দৃষ্টান্তের অভাব নেই। তাই যুধিষ্ঠিরের ভীতি যে ব্রাহ্মণেরা যদি তাঁদের ক্ষত্রিয়ত্ব লোপ করেন, তবে বর্ণগতভাবে তারা আমারই মতো সূত হিসেবে পরিগণিত হবে। কুরুকুলের সম্পত্তির অধিকার নিয়ে যে বিরোধ, তার আর সমাধানের পথ থাকবে না। কৌরবদেরও এটাই ছিল সবচেয়ে বড়ো যুক্তি, এবং শাস্ত্রানুযায়ী তারা অবশ্যই সঠিক ছিল। একারণেই তারা সূচ্যগ্র পরিমাণ ভূমিও পাণ্ডবদের দিতে রাজি হয়নি। তারা পাণ্ডবদের কখনোই ক্ষত্রিয় বলে বা কুরুকুলের বলে গণ্য করত না। ক্ষেত্রজ ব্যবস্থা স্বীকার করলেও না। কারণ ক্ষেত্রজ বিধিনির্দেশনা পাণ্ডবদের ক্ষেত্রে রক্ষিত হয়নি।
ক্ষেত্রজ ব্যবস্থা অবলম্বন করে কুল বা বংশ রক্ষা করতে হলে, তার নির্দিষ্ট বিধি অনুযায়ীই তা করতে হবে। এই ব্যবস্থার ভালো বা মন্দের কথা বাদ দিয়েই বলছি। আগেও যেমন বলেছি, বর্তমান সমাজে, অর্থাৎ, এক্ষেত্রে পাণ্ডবদের জন্মকালে কিংবা আমাদের জন্মের সময়েও ক্ষেত্রজ ব্যবস্থা আদরণীয় ছিল না। তথাপি তার প্রচলন যে নেই তা নয়। এক্ষেত্রে সংহিতাসম্মত বিধি হল এই, যে পতি এবং কুলবৃদ্ধগণের সম্মতিসাপেক্ষ সদব্রাহ্মণ জনক দ্বারা কোনো কুলবতী একবারই মাত্র সন্তানলাভ করার অধিকার পাবে। কুন্তীর ক্ষেত্রে এই বিধি প্রযুক্ত হয়নি। তাঁর ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পতির অনুজ্ঞা ছিল, এরকম শোনা যায়। কুলবৃদ্ধের এবিষয়ে কোনো ভূমিকা ছিল না। আবার কুন্তী একাধিকবার একাধিক পুরুষের দ্বারা সন্তানবতী হয়েছেন। এছাড়াও তাঁর ক্ষেত্রে আরও যে ব্যতিক্রম ঘটেছে, তা হল, তাঁর সন্তানদের পিতৃ-পরিচয় কিংবদন্তি দিয়ে আচ্ছাদিত হয়েছিল, কারণ, সেইসব জনকদের পরিচয় অজ্ঞাত ছিল। একমাত্র আমিই জানি যে যুধিষ্ঠিরের পিতা আমি। কর্ণ সম্পর্কে, কুন্তী আমাকে বলেছিলেন বলে জেনেছি যে, দুর্বাসা তাঁকে কৈশোরিককালে ছলনা দ্বারা ভোগ করেছিলেন তাতেই তার জন্ম। কিন্তু অন্যান্যদের অর্থাৎ ভীম এবং অর্জুনের জনকদের বিষয়ে আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করেও কিছু জানতে পারিনি। আমি সন্ধিৎসু হলে কুন্তী বলেছিলেন, আমি সুস্থা, সবলা, সুন্দরী এবং সর্বাংশে কাম্যা রমণী। একজন ক্লীবের সঙ্গে বিবাহিতা হয়েছি বলে কি আমার যাবতীয় কামনা, বাসনা, আকাঙ্খা সব বিসর্জন দিতে হবে? ক্ষত্তা, আমি তোমাদের প্রচলিত বিধিতে বিশ্বাসী নই। আমি জানি, এসব বিষয়ে মানুষ শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক উত্তেজনায় বাঙময় হয়, তারপর সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। আমি কেন আমার সুখের বা আকাঙ্খার অধিকার ছাড়ব, বলতে পার? আমি তাঁকে বলেছিলাম, কুন্তী, তোমার বিচার করার জন্য এ প্রশ্ন আমি করিনি। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, ভীম, অর্জুনের জনক কে বা কারা? আর, মাদ্রীই বা তোমার ঔদার্যে কার বা কাদের দ্বারা অনুগৃহীতা হয়েছিলেন? কুন্তী বলেছিলেন, প্রিয় দেবর, স্ত্রীজাতীয়দের কিছু গুপ্ত কথা থাকে। তাকে উন্মোচন করতে চায় যে পুরুষ, তাকে দুঃখ পেতে হয়। আমি তোমাকে যথার্থই প্রীতি করি। তাই চাই না, তুমি সে দুঃখ পাও। তিনি এইসব বলেছিলেন। আমি পুরুষ হিসেবে আদৌ ঈর্ষাপরবশ মানুষ নই। কুন্তীর প্রতি আমার প্রীতি একটু ভিন্ন ধরনের। তার গভীরতা ঠিক নর্ম সহচর, দেবর বা অধুনা যাকে জার বলে অভিহিত করা হয়, তার কোনো অনুষঙ্গের মধ্যে পড়ে না। তিনি আমাকে একটা অবলম্বন মনে করেন এবং অবশ্যই আমিও তাঁর উপর অনেক বিষয়েই নির্ভরশীল। এ ক্ষেত্রে কামনা চরিতার্থ করাই শেষ কথা নয়। তার আরও অনেক বিস্তৃতি আছে।
আমিই যে যুধিষ্ঠিরের পিতা, এ বিষয়ে হয়তো অনেকেই সন্দিহান, কিন্তু কেউই প্রকৃত তথ্য জানেন না। কুন্তীর বা আমার, কারওরই এই বিষয়টি খুব সুখজনক স্মৃতি নয়। আমাদের এই মিলন বড়োই দুঃখের। আমাদের সম্পর্ক নর্মলীলার চাইতেও অনেক বেশি গভীর এবং এতই গভীর যে প্রয়োজন-প্রযুক্তিও সেখানে সুখানুভূতির চাইতে বিষণ্ণতারই জন্ম দিয়েছিল সমধিক। যুধিষ্ঠির আমার এবং কুন্তীর বড়ো বিষাদের ফসল। এ তথ্য বোধকরি পিতা বাদরায়ণি জানেন। কারণ, কুরুকুল, যেহেতু তাঁরই ধারা, সেকারণে তাঁর অগোচর কিছুই থাকে না। হায়, কুন্তী এবং আমাদের সম্পর্কের মধুরতা এবং মনস্তাপ আমি কাকেই বা বলব, কেই-বা বুঝবে।
তপোবনে কুন্তী যে কাদের দ্বারা অনুগৃহীতা হয়েছিলেন অথবা মাদ্রীর ক্ষেত্রেই বা কাদের নিয়োগের সম্মতি দিয়েছিলেন, তা অন্ধকারেই নিহিত থাকল। অথবা, আমার এমনও মনে হয়, দ্বৈপায়নই তার ব্যবস্থা করেছিলেন কিনা। কারণ, ইন্দ্র, পবন বা অশ্বিনীকুমার ইত্যাদিদের অনুসঙ্গ তিনিই তো প্রচার করেছিলেন। তিনিই ব্রাহ্মণদের দ্বারা তাদের দৈবোৎপন্নতা বিষয়ে প্রচার করান। যাঁরা প্রচার করেছিলেন তাঁরা প্রকৃত অর্থমূল্যও অর্জন করেছেন এবং পিতার বাক্য তাঁরা পরম সত্য বলেই জেনেছেন। জ্যেষ্ঠতাত এইসব কুমারদের কুলে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ তখনও মহাজননী এবং দ্বৈপায়নের কর্তৃত্ব কুরুকুলে অপ্রতিহত। ভীষ্ম প্রকৃতই ক্ষমতাহীন তখন। তাঁর সেই সময়ে অভিপ্রায় কী ছিল, তা তিনি প্রকাশ করেননি। প্রকাশ করেও কিছু লাভ হত না। কারণ কুলমর্যাদা দানের অধিকারী ব্রাহ্মণেরাই যখন তাদের প্রতিষ্ঠা দিচ্ছেন, তখন তার বিরুদ্ধে যাওয়া যে মূর্খামি ভীষ্ম তা বুঝেছিলেন।
আমার এই ব্যাখ্যার অর্থ এই নয় যে, আমি পাণ্ডবগণের অধিকারকে সমর্থন করি না। বরং আমি যে বরাবরই তাদের প্রতি পক্ষপাতপ্রবণ, এই নিন্দাই চিরকাল আমাকে শুনতে হয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে, আমি কুন্তীর প্রতি শুধু আকৃষ্টই নই, তাঁর গুণগ্রাহীও বটে। তাঁর মতো তেজস্বিনী বুদ্ধিমতী এবং কৌশলী রমণী আমি আর দুজনমাত্রই দেখেছি। প্রথমজন মহাজননী সত্যবতী এবং অপরজন পাণ্ডবজায়া দ্রৌপদী। এঁদের মধ্যে একমাত্র দ্রৌপদীই কিছুটা স্বামী পরতন্ত্রী। কিন্তু সত্যবতী এবং কুন্তী নিয়ত স্বতন্ত্রা এবং স্ব-বুদ্ধি পরিচালিতা। কোনো পুরুষ, তাঁদের স্বাধীনসত্তাকে কোনোদিন খর্ব করতে পারেনি। আমি, এই তিন নারীকে অন্তর থেকেই শ্রদ্ধা করি। কুরুকুলে তাঁরা একটি মহৎ ধারা। কুরুপুঙ্গবদের দুর্ভাগ্য যে তাঁরা এই মহীয়সী রমণীদের যথার্থ মর্যাদা দিতে পারেননি। কিন্তু পাণ্ডবদের অধিকার বিষয়ে যে কথা বলছিলাম যে, সংহিতাসম্মতভাবে তারা কুরুকুলের উত্তরাধিকারী হতে পারে কিনা সে বিষয়ে আমার ধারণা এই যে এক্ষেত্রে তাদের অধিকারী হওয়ার কোনো বাধা নেই। দুর্যোধনাদির বক্তব্যে সংহিতাসম্মত যুক্তি থাকলেও, তার অন্য বিচার বা কূটভাষ আছে এবং তা নিতান্ত উপেক্ষণীয়ও নয়। প্রথমত কুরুবৃদ্ধগণ, অর্থাৎ ধৃতরাষ্ট্র, ভীষ্ম ইত্যাদিরা পাণ্ডবদের কুমার হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সে কারণেই তাঁরা তখন কোনো প্রশ্ন তোলেননি। মহারাজ পাণ্ডুর সন্তান হিসেবেই তারা লালিত হয়েছে। কুরু মহাসভায়, সে সময়ে কেউ কোনোদিন এদের অধিকার বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। তাই দুর্যোধনাদির বক্তব্য হঠাৎ উপস্থিত হলে, তার ন্যায়ের দিকটা যতটা না ভারী হয়, অপকৌশল বা ধূর্তামির দিকটা প্রকাশ পায় তার অনেক বেশি। আমি আবারও বলছি, এইসব সংহিতাবিষয়ক বিচারে ভালো বা মন্দের নৈতিক দিকটাকে আমি আদৌ গ্রাহ্য করি না। সংহিতার কূটভাষ কদাচিৎ ভালো বা মন্দ, পাপ বা পুণ্যের মতো নৈতিক মানদণ্ডে বিচার্য হয়। সে কারণে ক্ষেত্রজ সন্তান লাভের ব্যাপারে কুন্তীর স্বাধিকার প্রয়োগকে আমি অন্যায় বলি না বা তাঁর সন্তানদের আমি অবৈধও মনে করি না। সংহিতার কূটভাষে, তাই কুন্তীর একাজকে আমি এভাবে ব্যাখ্যা করব যে কুলের স্বার্থে কুলবৃদ্ধরা যদি তাঁদের কুলবতীদের ব্রাহ্মণদের দ্বারা রমিত হতে দিতে পারেন-তবে সেই কামিনীদেরও অধিকার আছে অক্ষম পতির পরিবর্তে, সক্ষম এক বা একাধিক পুরুষের কাছ থেকে সুখ বা সন্তান লাভ করার। এক্ষেত্রে তো স্বামী আবার স্বয়ং অনুমতি প্রদান করেছিলেন। আমার এই কূটভাষ প্রাচীন প্রয়োগবিধির ক্ষেত্রেও আদৌ অপ্রচলিত ছিল না। প্রাচীন রমণীদের স্বাধিকারই ছিল নিজ অভিরুচি মতো পুরুষ নির্বাচন করে, তার কাছ থেকে সুখ এবং সন্তান লাভ করা। এক্ষেত্রে শুধু সন্তান বা উত্তরাধিকারী লাভই নয়, নারীর নিজস্ব শারীর সুখের বিষয়টিকেও আমি উপেক্ষা করতে পারি না।
এই সব কূটতর্ক ছাড়াও পাণ্ডবদের অধিকার বিষয়ে আমার প্রধান বক্তব্য, যা আমি আমার অগ্রজকে বহুবারই বলেছি যে, যখন কুরুরাজ্য, ভীষ্ম, দ্রোণ ইত্যাদি প্রধানদের সামনেই তিনি সমানভাবে ভাগ করে দিয়েছিলেন, তখনও তাদের অধিকারকে স্বীকার করেই নেওয়া হয়েছিল। তিনি কর্তা, তাঁর অভিপ্রায়েই সম্পত্তি বণ্টিত হয়েছে। যেকোনো নীতিতেই তার যাথার্থ গ্রাহ্য হওয়া উচিত। তা যদি গ্রাহ্য না হয় তবে অধর্মের উদ্ভব হয়। অধর্ম ধ্বংসকেই আহ্বান করে।
প্রসঙ্গত বলি, এই বণ্টন বিষয়ে কুরুবৃদ্ধগণ ও অন্যান্য প্রধানগণ অন্ধ থাকলেও, আমি লক্ষ্য করেছি, কীভাবে পাণ্ডুপুত্রদের বঞ্চিত করা হল। রাজ্য অর্ধ বিভক্ত হল বটে, কিন্তু পাণ্ডবেরা প্রাচীন প্রাসাদ, কোষাগারে সঞ্চিত রত্ন, অর্থ, মণিমুক্তা, প্রবাল ইত্যাদির কিছুই পেল না। সেনাবল, প্রতিষ্ঠিত নগরাদি বা উত্তমক্ষেত্র এর কিছুই তাদের দেওয়া হল না। তারা পেল শুধু অরণ্যসংকুল ভূমি। যমুনা তীরবর্তী সেই ভূমি তখন বিশাল মহীরুহ গুল্ম-লতা, শ্বাপদ আর বিষধর সরীসৃপাদির দ্বারা অধ্যুষিত ঘন-অরণ্যভূমি। কুরুকুল নৃপতিরা সেখানে শুধু মৃগয়াদির জন্যই যেতেন। এই অরণ্যভূমি সংলগ্ন একটি ক্ষুদ্র নগর, খাণ্ডবপ্রস্থ, তারা পেয়েছিল বসবাসের জন্য। সেখানে একটি জীর্ণ প্রাসাদ ছিল। তারই সংস্কার করে পাণ্ডবেরা সেখানে স্থিত হয়েছিলেন। অচ্যুতকৃষ্ণ এবং তাঁর অনুগত অন্ধক, বৃষ্ণি ইত্যাদি যাদবদের সহায়তায় দীর্ঘকাল পরিশ্রম ও অধ্যবসায় দ্বারা সেই খাণ্ডবপ্রস্থকে রমণীয় ইন্দ্রপ্রস্থে রূপান্তরিত করে পাণ্ডবেরা। সুতরাং এক অর্থে এ তো তাদের অর্জিত ভূমি। এই নগরী স্থাপন আর সুরম্য প্রাসাদ হর্ম্যাদি রচনায় দানবশিল্পীশ্রেষ্ঠ ময়ের অবদানের কথা কে না জানে? তবে এই নগরী পত্তনের বিষয়ে অচ্যুত এবং পাণ্ডবগণের কিছু অকীর্তির কথাও উল্লেখযোগ্য। সে বৃত্তান্ত ক্রমশ বলব। সে যাই হোক, এরপর তারা বিভিন্ন রাজ্য জয় করে করদ ও মিত্র রাজগণের সহায়তায় যখন ঋদ্ধিশালী হল, তখন তাদের বংশগত অধিকারের প্রশ্নের আর কীই-বা তাৎপর্য থাকে? এ তো স্বোপার্জিত সাম্রাজ্য এবং যুধিষ্ঠির অবশ্যই তার স্বামী। কিন্তু তাঁদের এই স্বাভাবিক প্রাপ্তি একসময় তাঁদের চক্রবর্তী সম্রাট হওয়ার দিকে আকর্ষণ করল। তাঁরা রাজসূয়ের আয়োজনে চেষ্টিত হলেন।
খাণ্ডবপ্রস্থে পাণ্ডবদের নগরায়ণের পর, পিতা দ্বৈপায়ন এবং তাঁর আদর্শ রাষ্ট্রপুরুষ বাসুদেবকৃষ্ণ একদিন আমাকে আহ্বান করলেন। দ্বৈপায়ন এবং বাসুদেব উভয়েই আমার পরম প্রিয়। একজন আমার পিতা, অপরজন আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ পুরুষ, যাঁকে খুব কম লোকই উপেক্ষা করতে পারে। তিনি আবার পাণ্ডবগণের এবং কৌরবগণেরও পরমাত্মীয়। একদিকে তিনি কুন্তীর ভ্রাতুষ্পুত্র, অপরদিকে অর্জুনের শ্যালক। আবার দুর্যোধন-কন্যা লক্ষণার শ্বশুরও তিনি, যেহেতু তাঁর রূপবান পুত্র শাম্ব লক্ষণাকে বিবাহ করেছেন। কিন্তু আমার কাছে তিনি অচ্যুত। আমাদের পিতা বাদরায়ণি তাঁকে শুধু পুরুষোত্তম বলে মনেই করেন না, তাঁর অনুগামীদের দ্বারা গোটা আর্যাবর্তে তা প্রচারও করে থাকেন। ফলত বিরাট সংখ্যক মানুষের মনে এমন বিশ্বাসও জন্মেছে যে বাসুদেবকৃষ্ণ ঈশ্বরেরই স্বরূপ। তাঁর ইচ্ছামাত্রেই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয় ঘটতে পারে। সে যাই হোক কৃষ্ণ আমার পরম মিত্র এবং আমি তাঁর একান্ত অনুগত। আমার এই প্রীতির কারণ অবশ্যই তাঁর অসামান্য বৌদ্ধিক উৎকর্ষ, তাঁর অসম্ভব কর্মদক্ষতা, যাদব গোষ্ঠীসমূহকে একসূত্রে গ্রথিত রাখার মতো কূটনৈতিক কুশলতা। তিনি নির্লোভ, তাঁর ক্ষমতাকামুকতা আদৌ নেই, অন্যের প্রয়োজনে সতত নিয়োজিত এবং সর্বোপরি সংহিতা এবং ইতিহাসজ্ঞ প্রাজ্ঞশীর্ষ পুরুষ তিনি। দ্বৈপায়ন এবং তিনি বর্তমানে আর্যাবর্তীয় রাজন্যবর্গের কর্তব্যাকর্তব্য বিষয়ে সম্যক চিন্তাশীল। অবশ্য অচ্যুত বিষয়ে এগুলি আমার নিজস্ব ধারণা মাত্র। আমি তাঁকে এভাবে ভাবতেই অভ্যস্ত।
ক্ষত্রিয় নামধারী বর্তমান রাজন্যকুল শৈশব থেকে একটি বিষয়ের শিক্ষার উপরেই অধিক মনোনিবেশ করে থাকেন-তা হল ধনুর্বিদ্যা ও অন্যান্য শস্ত্রবিদ্যা। এর সঙ্গে কিছু সাধারণ বৈদিক তথা সংহিতা সম্পর্কীয় জ্ঞানকে অবলম্বন করে তাঁরা শাসনক্ষমতার আসনে আসীন হন। অভিষেক পর্ব শেষ হতেই তাঁরা সৈন্য-সামন্ত নিয়ে পার্শ্ববর্তী ছোটো বড়ো কিছু দুর্বল বা সবল ভূস্বামীদের রাজত্বে হামলা করে কিছু ধনরত্ন লুন্ঠন করেন এবং এই কর্মের একটি গালভরা নাম দেন দিগ্বিজয়। বিজিত নৃপতিরা ক্ষত্রিয়দের বর্ণীয় বিধি অনুযায়ী রাজ্যচ্যুত হন না। তাঁরা নানা উপঢৌকন দিয়ে বিজয়ীর সঙ্গে সন্ধি করেন, আর যদি যুদ্ধে নিহত হন, তবে তদীয় পুত্ররা তৎস্থানে সিংহাসনে আসীন হন। স্ব স্ব ক্ষমতা অনুযায়ী রাজন্যরা এইসব করেন, তারপর একটা যজ্ঞ-টজ্ঞ করে নিজেকে চক্রবর্তী সম্রাট বলে ঘোষণা করেন। এটাই হচ্ছে সাধারণ চিত্র। তাঁদের ভাটব্রাহ্মণেরা অর্থহীন কিছু চাটুকারী শ্লোক রচনা করে তাঁদের যশোবৃদ্ধি ঘটান এবং নিজেরা প্রভূত ধনলাভ করেন। নৃপতিরা শ্লাঘায় স্ফীত হয়ে ভাবেন, পৃথিবীতে তিনিই শ্রেষ্ঠতম নৃপতি এবং তাঁদের বংশই যাবচ্চন্দ্রদিবাকরৌ পৃথিবীপতি থাকবেন।
কিন্তু শুধু রাজ্যজয় বা দিগবিজয় করে, আর যজ্ঞ করেই তো রাজ্যসমূহের শাসন কাজ চলে না। রাজারা মৃগয়া, যুদ্ধ-বিগ্রহ নিয়ে থাকেন। তাঁদের মন্ত্রীরা রাজ্য শাসন করেন। কিন্তু রাজ্য শাসনের নিমিত্ত যে সংহিতার প্রয়োজন, সে সংহিতা একমাত্র নারদীয় ঋষিগণ ছাড়া কারওরই গোচর নেই। এই নারদীয় ঋষিগণ প্রাচীনকাল থেকে দেশ-দেশান্তরে ঘুরে শাসকদের নিকট সংহিতা ব্যাখ্যা করে যশস্বী হয়েছেন। কিন্তু সমগ্র আর্যাবর্তে কোনো একক সাধারণসংহিতা এত কাল ছিল না, যা দ্বারা রাজ্যের প্রকৃতিপুঞ্জের শাসন তথা বিভিন্ন বিভাগীয় লোককৃত্যগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়। এমনকী মহারাজ পাণ্ডুর সময়ও, যখন থেকে আমি কুরুরাজ্যের মহামন্ত্রিত্ব করছি, কোনো নির্দিষ্ট সংহিতার সাহায্য পাইনি। নারদীয় ঋষিগণের সহায়তায়ই আমাকে কর্মসম্পাদন করতে হয়েছে। অবশ্যই তা নিতান্ত খণ্ডচ্ছিন্ন ভাবে সংগ্রহ করে।
অচ্যুত এবং পিতা একদিন অপারাহ্নে আমাকে আহ্বান করে যমুনাতীরে বসলেন। পিতা বললেন, বিদুর, আমি এবং বাসুদেব অনেক আলোচনা করে সিদ্ধান্ত করেছি যে তোমার উপর একটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যভার ন্যস্ত করব। আমি আশা করি, এবং বিশ্বাস করি, তুমি সেই দায়িত্ব খুব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করবে। কারণ, এই দায়িত্বের সঙ্গে আর্যাবর্তীয় তাবৎ মনুষ্যকুলের কল্যাণ জড়িত। আমি এবং কেশব, প্রকৃতিপুঞ্জ এবং রাজন্যদের অনুসরণীয় এক সাধারণ সমাজ-সংহিতা রচনা করেছি। প্রাচীন সংহিতাসমূহ মন্থন করে তার সার সংগ্রহ করেই যে সেসব রচিত হয়েছে এমন নয়, তার সঙ্গে নতুন অনেক কিছুই সংযুক্ত হয়েছে। সেই সংহিতা যথাসাধ্য প্রচারের চেষ্টাও করছি। তুমি মহারাজ পাণ্ডুর সময় থেকে এই মহান কুরুকুলে মহামন্ত্রীর কার্য খুবই দক্ষতার সহিত সম্পন্ন করে এসেছ। এমনকী মহারাজ পাণ্ডুর দীর্ঘ অনুপস্থিতিকালেও এই রাজ্য এবং কুল কোনো প্রকার উপপ্লব বা মাৎস্যন্যায়ের সম্মুখীন হয়নি। আমি এবং পুরুষোত্তম বাসুদেব তোমার এই প্রগাঢ় দক্ষ শাসন কার্যের নিতান্ত গুণগ্রাহী। আমরা উভয়েই তোমার এই মহান কার্যকে সাধুবাদ জানাই। এখন এই কুরুকুল, কাল নির্দেশে দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। মহাকালের রথচক্র অনেকটা পথই অতিক্রান্ত হয়েছে মহারাজ পাণ্ডুর লোকান্তর গমনের পর। আমাদের মনে হয়, এই কুরু, পাণ্ডব তথা আর্যাবর্তীয় অন্যান্য নরেশকুল বা সাধারণতন্ত্রী যেসব রাষ্ট্রব্যবস্থা বর্তমান আছে, তাদের সবার সাধারণ কার্যক্রমের বা শাসন-রক্ষণের জন্য একটি ব্যাপক নতুন শাসনযন্ত্র রচনার প্রয়োজন আছে।
পিতা একথা বললে, অচ্যুত আমাকে গাঢ় আলিঙ্গনে বেঁধে বললেন, হে মহাভাগ, আপনি দীর্ঘকালব্যাপী এই বিশাল কুরুরাজ্যের শাসন-সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নখদর্পণে রেখে, এর সামূহিক ব্যবস্থাদি সুচারুরূপে সম্পাদন করেছেন। আপনি প্রাচীন এবং বর্তমান সংহিতা বিষয়ে প্রাজ্ঞ। এই কারণে আমরা আপনাকে অনুরোধ করছি, যুগানুযায়ী একটি শাসন কার্যক্রম সংহিতা রচনা করুন, যার কল্যাণে ঘোর উপপ্লব কালে, কিংবা রাজা ব্যতিরেকেও যেন প্রকৃতিপুঞ্জ রাষ্ট্রের সুশাসন-প্রসাদ থেকে বঞ্চিত না হয়। কারণ, ক্ষত্রিয়কুল, আপনি অবগত আছেন, সাতিশয় কলহ তথা সমরপ্রেমী এবং কোনো রাজন্যকুলই এ সংসারে যাবচ্চন্দ্রদিবাকর শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারে না। কিন্তু প্রকৃতিপুঞ্জ থাকে। যেহেতু শাসন না থাকলে সমাজে মাৎস্যন্যায়ের সম্ভাবনা, সে কারণে আমরা এমন এক শাসন কার্যক্রম সংহিতা চাই যা, কোনো রাজা বা শাসকের অবর্তমানেও সুচারুরূপে প্রকৃতিপুঞ্জকে শাসিত রাখতে এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রীয়-কর্ম প্রবাহিত রাখতে সক্ষম হয়। আপনি নিশ্চয় জানেন যে শাসকের অবলুপ্তিতে শাসনের অবলুপ্তি কাম্য নয়।
এই অনুজ্ঞা প্রাপ্ত হয়ে আমি উভয়কেই নমস্কার নিবেদন করে বললাম, হে পিতা, হে অচ্যুত, আপনারা উভয়েই আমার তাবৎ জ্ঞান এবং কর্মদক্ষতার উৎস স্বরূপ। আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে, আপনাদের শিক্ষা এবং প্রসাদেই আমি কৌরব মহামন্ত্রীর কার্যনির্বাহে সক্ষম। এই মহামন্ত্রিত্ব পদও আপনাদের আশীর্বাদেই আমি লাভ করেছি। নচেৎ প্রথাসম্মতভাবে আমার তো আজ রথচালনা বা মাগধীকৃত্য করারই কথা ছিল। আপনারা যদি আমাকে এরকমই অনুজ্ঞা করেন, তবে, আমার প্রার্থনা এই যে, আমাকে বৎসরকাল সময় এ কার্যের জন্য নির্দিষ্ট করুন। এর জন্য আমাকে পূর্বাপর অনেক অনুসন্ধানই তো করতে হবে। আর এই বৃহৎ কর্মে অবশ্যই প্রভূত অর্থব্যয়ের আবশ্যকতা হবে, তার সংস্থানও যেন যথাযোগ্যভাবে থাকে।
পিতা এবং অচ্যুত আমার এই প্রার্থনা সঙ্গত মনে করলেন। অচ্যুত বললেন, হে মহাভাগ, আপনি যদি আমার পরামর্শে আস্থাশীল হন, তবে জানাই, আপনি এ কর্মে, সর্বাগ্রে নারদীয় গোষ্ঠীর ঋষিদের নিকট তথ্যানুসন্ধান করুন। কারণ, আমার জ্ঞানত তাঁরাই প্রাচীন সংহিতা বিষয়ে প্রাজ্ঞ। আবার যেহেতু, ইক্ষ্বাকুবংশীয় নৃপতিদের সংহিতাকারক ছিলেন বশিষ্ঠ প্রমুখ ঋষিগণ, তাই আপনার পিতা বশিষ্ঠ-প্রপৌত্র এই শ্রীকৃষ্ণদ্বৈপায়নের সতত সাহচর্যের বিষয়ও কদাপি বিস্মৃত হবেন না। ইনি সাতিশয় প্রাজ্ঞ। সর্বশাস্ত্র বিশারদ। আর্যানার্য কুলভেদে তাবৎ সংহিতা বিষয়ে ইনি কোষ বিশেষ। আবার এই আর্যাবর্তের প্রান্তীয় প্রদেশ সকল, যেমন সুমঙ্গল, ভদ্রাশ্ববর্ষ, হরিবর্ষ, কিম্পুরুষবর্ষ বা ইলাবৃতবর্ষের, কুরুদেশের, অর্থাৎ উত্তর কুরুর সংহিতাকারক মুনিগণের পরামর্শও আপনি গ্রহণ করবেন। আমার এমন পরামর্শের কারণ এই যে, এতাবৎকালে সার্বজনীন কোনো সংহিতা সৃষ্ট হয়নি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য বা জনপদের জন্য পৃথক পৃথক সংহিতাতেই সব কাজ এতকাল চলেছে। আপনিই প্রথম ব্যক্তি, যাঁর অনুগ্রহে এক সর্বজনীন সংহিতা সৃষ্ট হতে চলেছে। আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে আপনি চিন্তিত হবেন না। তার দায় আমি গ্রহণ করছি।
যদিও খুবই কঠোর কর্ম, তথাপি এই দুই মহাত্মার অনুজ্ঞা আমি অত্যন্ত হৃষ্টচিত্তে গ্রহণ করলাম। মহামন্ত্রিত্বের নৈমিত্তিক দায়িত্বের জন্য উপমন্ত্রীমণ্ডলীর কয়েকজন বিচক্ষণ মন্ত্রীকে দায়িত্ব অর্পণ করে, প্রয়োজনীয় নির্দেশাদি প্রদান করে এই মহান কার্য পরিচালনা শুরু করলাম। এখন থেকে এক বৎসরকাল সময়ের মধ্যে আমাকে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে। একাজ কখনোই একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই প্রথমেই আমি সর্বতোভদ্র, সুশিক্ষিত, কর্মনিপুণ এবং নিরলস একটি মণ্ডল গঠন করলাম। এই মণ্ডলের সভ্যরা বিভিন্ন রাজসভায় বহুকাল ধরে রাষ্ট্রীয় কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করে অবসর জীবনযাপন করছিলেন। অন্ধ্র, ভোজ, বৃষ্ণি, দ্রাবিড়, পঞ্চাল, কুরু, মদ্র, প্রাগজ্যোতিষ এবং পৌণ্ড্রবর্ধনের রাজসভায় তথা সীমান্তস্থিত রাজ্যসমূহের অবসরপ্রাপ্ত জ্ঞানবৃদ্ধ মন্ত্রীরা সবাই সাগ্রহে এই মহান কার্যের জন্য আমার সহায় হলেন। মণ্ডলের প্রতিটি প্রবন্ধক সদস্যের সাহায্যের জন্য উপযুক্ত সংখ্যক করণিক, গবেষক এবং লিপিকার কায়স্থের ব্যবস্থা করলাম। প্রত্যেক প্রবন্ধক সভ্য স্ব স্ব দল নিয়ে আপন আপন রাজ্যের প্রাচীন এবং বর্তমান সংহিতা সূত্র সংকলনের কার্য শুরু করলেন। সেইসব সংহিতার প্রশাসনিক ব্যবস্থাদির পুঙ্খ পুঙ্খ বিবরণ পর্যালোচনা করে তাঁরা সারার্থ সংকলন করতে লাগলেন। আমি স্বয়ং নারদীয় গোষ্ঠীর সংহিতাকারদের সঙ্গে দীর্ঘ বিচার-বিশ্লেষণ এবং যাবতীয় কূটভাষাদি কার্যে ব্যাপৃত থাকলাম। প্রাক্তন দণ্ডনীতি প্রণেতাদিগের অর্থাৎ মনু, বৃহস্পতি, শুক্রাচার্য এবং অন্যান্য আচার্যদিগের রচিত মহৎ রচনাবলিরও তন্নিষ্ঠ অনুশীলনে যত্নবান হলাম।
নারদীয় গোষ্ঠীর ঋষিরা বহু প্রাচীন কালাবধি বিবিধ শাস্ত্র চর্চা এবং রচনায় দক্ষতার সঙ্গে কার্য করছিলেন। তাঁদের সেই পরম্পরা, সমাজ, রাষ্ট্র এবং অর্থনীতির উন্নয়নকল্পে অদ্যাবধি প্রবাহিত। এ কারণে আর্যাবর্তীয় রাজন্যবর্গ তাঁদের সবিশেষে সমাদর করতেন। এঁরা প্রায় যাযাবরের মতো পর্যটক। নানা জনপদ, নগর ঘুরে ঘুরে তাঁরা রাজা এবং শাসকদের সংহিতা বিষয়ে উপদেশ প্রদান করতেন। এইসব রাজন্যরাও তাঁদের সৎকারার্থে উপযুক্ত ধনাদি প্রদান করে তাঁদের কাজের বহমানতা বজায় রাখতে সহায়তা করতেন। আমি আমার উপরে ন্যস্ত কর্ম উপলক্ষে বর্তমান নারদীয় গোষ্ঠীপ্রধানকে সানুচর আহ্বান করেছিলাম। তাঁরা আমার এই কাজের জন্য স্থাপিত যমুনাতীরস্থ প্রধান শিবিরে এসে উপস্থিত হলেন। রীতি অনুযায়ী এঁদের গোষ্ঠীপ্রধান নারদ নামেই অভিহিত হয়ে থাকেন। বর্তমান নারদ, তাঁর সুযোগ্য প্রিয় সহচর পারিজাত, রৈবত, সুমুখ, ধৌম্য ইত্যাদিদের সঙ্গে নিয়ে এসে উপস্থিত হলেন। এঁরা পুরুষানুক্রমে সমস্ত বেদ, উপনিষদ, ন্যায়, পাতঞ্জল, শিক্ষা, কল্প, ব্যাকরণ, ছন্দ, জ্যোতিষ প্রভৃতি শাস্ত্র তথা কৃষি, বাণিজ্য, দুর্গ-সংস্কার, সেতু নির্মাণ ও পূর্ত ব্যবস্থা, আয়ব্যয় শাস্ত্র, পৌরকার্য বিষয়ক শাস্ত্র, জনপদ পর্যবেক্ষণ শাস্ত্র প্রভৃতি অষ্টবিধ রাজকার্যের শাস্ত্র বিষয়ে অসামান্য পারদর্শী।
যে ঋষি লোকহিতৈষণা কল্পে এই গোষ্ঠীর স্থাপনা করেছিলেন তিনি দেবর্ষি আখ্যায় আভূষিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ইলাবৃতবর্ষের অধিকারী। ইলাবৃতবর্ষের রাজার উপাধি ইন্দ্র। প্রাচীনকালে এই ইলাবৃতবর্ষ অত্যন্ত ঋদ্ধিশালী ছিল। দেবজাতীয় মানুষেরা ছিলেন সে দেশের অধিবাসী। বর্তমানকালে যদিও তাঁদের সেই প্রতিপত্তি এবং ঐশ্বর্য ততটা আর নেই, তবু সমতলস্থ রাজন্যবর্গ, ইলাবৃতবর্ষের প্রতি শ্রদ্ধাবান। সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জ এই দেশকে স্বর্গ মনে করে এবং সেই নামেই অভিহিত করে। ইলাবৃতবর্ষের স্বর্গ নামায়ণ এবং পর্বতোপরি দুরধিগম্য স্থানে তার অবস্থানের জন্য সাধারণ মানুষেরা একে জীবিত মনুষ্যের পক্ষে নিষিদ্ধ দেশ এবং পুণ্যবান মনুষ্যের মরণোত্তর লোক হিসেবে কল্পনা করে থাকে। অল্প শিক্ষিত ভণ্ড ব্রাহ্মণেরা নানাবিধ উপকথা কিংবদন্তির রচনা করে এই অনৈসর্গিক বিশ্বাসকে ব্যাপক মানুষের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এখন অনেকেই মনে করেন যে স্বর্গ নামে একটি মনোরম, চিরসুখকর স্থান আছে এবং সেখানকার অধিবাসীরা-দেব, পিতর ও সিদ্ধগণ জরা, মৃত্যু এবং ব্যাধির অতীত। নারদীয় গোষ্ঠীর প্রথম নারদ এখানকার অধিবাসী ছিলেন বলেই তাঁকে দেবর্ষি অভিধায় ভূষিত করা হয়েছিল বলে মনে হয়।
আমি রৈবত, সুমুখাদি সংহিতাবিৎ নারদীয়গণের সাহচর্য নিয়ে মণ্ডলস্থ বিভিন্ন দল প্রেরিত সংহিতা-সূত্রগুলির পর্যালোচনা করলাম। মূলত প্রাচীন কুরুকুলের শাসন কার্যক্রমের শৃঙ্খলাকে চিন্তায় রেখে, একটি সুচারু শাসন-সংহিতা প্রণয়ন করা হল। যে যে বিষয় এই সংহিতায় অগ্রাধিকার পেল, তা হল কৃষি এবং কৃষি সম্বন্ধীয় কার্যাবলি, আন্তর্বাণিজ্য এবং বহির্বাণিজ্য, দুর্গসংস্কার এবং প্রতিরক্ষা বিষয়ক কার্যাবলি, আয়ব্যয় সংক্রান্ত হিসাবনিকাশ, পৌর-কার্য পরিদর্শন বিষয়ক কর্ম এবং জনপদ পর্যবেক্ষণ। এর প্রত্যেকটির জন্য এক একটি মহাবিভাগ এবং তার অধীনে প্রয়োজনমতো ক্ষুদ্র-বৃহৎ উপবিভাগ স্থাপনের বিধি দেওয়া হল। এইসব বিভাগ এবং উপবিভাগের কর্মচারী আধিকারিকগণ মহাবিভাগের কাছে তাঁদের কাজকর্মের জন্য দায়ী থাকবেন, মহাবিভাগগুলো স্ব-স্ব মন্ত্রকের কাছে এবং মন্ত্রকসমূহ মহারাজ অথবা সম্রাটের কাছে দায়বদ্ধ থাকবে। প্রত্যেকটি সংবৎসরের আয়ব্যয়ের হিসাবনিকাশ এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলির কার্যনির্বাহের জন্য আবশ্যক অর্থাদি বরাদ্দ বৎসরের প্রারম্ভেই করে রাখবেন। সমস্ত বিভাগীয় আয়ব্যয়ের পরীক্ষার জন্য অপর একটি বিভাগের হিসাব পরীক্ষকগণ একটি নির্দিষ্ট সময় অন্তর যাবতীয় হিসাবাদি পরীক্ষা করে দেখবেন। সমস্ত বিভাগের কর্মচারী এবং প্রবন্ধকেরা নির্দিষ্ট আচরণবিধি অনুযায়ী কর্ম করবেন। যে সমস্ত কর্মচারীগণ বার্ধক্যবশত অবসর গ্রহণ করবেন তাঁদের পোষণের জন্য রাজকোষাগার থেকে প্রতি মাসে উপযুক্ত ভাতা প্রদান করা হবে এবং বিভাগটি পরিচালনার জন্যও অন্য একটি বিভাগ কার্যশীল থাকবে। এছাড়া প্রতিবন্ধী, অসহায়, অক্ষম, যুদ্ধে বিকলাঙ্গ ইত্যাদি মানুষদের জন্য ভাতার বন্দোবস্ত করতে হবে।
কৃষি এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত বিষয়ে সংহিতায় কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ বিধির ব্যবস্থা রাখা হয়। কৃষি এবং বাণিজ্য রাজকোষে অর্থাগমের মূল উৎস। তাই কৃষিবল এবং বণিকদের স্বার্থে সংহিতায় নানাবিধ সুযোগ-সুবিধার বন্দোবস্ত রাখা হল। কৃষিকাজকে বৃষ্টিপাত নিরপেক্ষকরণের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক তড়াগ, বাপী, নদীসংলগ্ন প্রণালিকা ইত্যাদি সারা রাজ্যব্যাপী খননের দায় নির্দিষ্ট বিভাগের উপর বর্তাল। কৃষিকর্মে নিয়োজিত পশ্বাদির চিকিৎসা-সংক্রান্ত ব্যবস্থারও বিধি নির্দেশিত হল। কৃষিকর্মের সুগমতার জন্য প্রয়োজনীয় বীজাদির সরবরাহ এবং আপৎকালে বা প্রয়োজনে কৃষিবলসমূহকে শতচতুর্থাংশ বৃদ্ধিতে অনুগ্রহস্বরূপ শতসংখ্যক ঋণ প্রদান করার বিধিও সংহিতায় অন্তর্ভুক্ত হল, যাতে কৃষিবলেরা তাঁদের সাময়িক অর্থাভাব হেতু উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে।
দেশীয় এবং বৈদেশিক বণিকদের ক্ষেত্রে শুল্ক গ্রহণের বিষয়টি যাতে কোনোভাবেই পীড়াদায়ক না হয়, তার জন্য যথোপযুক্ত অনুশাসন রাখা হল। পণ্যাদির পরিবহণসংক্রান্ত সুযোগের ব্যবস্থা, নদী ও সড়ক পথে সার্থবাহদের নিরাপত্তা বিধান, ইত্যাকার যাবতীয় ব্যবস্থার উপযুক্ত নিয়ম নির্দেশনা সংহিতায় স্পষ্টরূপে উল্লেখিত থাকল। সংহিতা রচনাকালে, নারদীয়গণের সঙ্গে আমি অনেক বিতর্কই করেছিলাম। তাঁরা পুরাতন সংহিতা অনুযায়ী কৃষি এবং বাণিজ্য-সংক্রান্ত নিয়মাবলির যে প্রস্তাবনা করেছিলেন, আমার তা মনঃপূত না হওয়ায়, আমি নতুন ও সহজ নিয়মবন্ধের পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলাম। বৈদেশিক বাণিজ্যের শুল্কবিষয়ক প্রশ্নে তাঁদের বক্তব্য ছিল যে শুল্কহার যত বৃদ্ধি করা যায়, রাজকোষে অর্থাগম ততই বৃদ্ধি পায়। আমার বিচার ছিল সে ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় পণ্যের রপ্তানির বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। এ কারণে দেশীয় পণ্যের রপ্তানি এবং বিদেশি পণ্যের আমদানির ক্ষেত্রে আমি একটা সমীকৃত ব্যবস্থার বিধি সংহিতাবদ্ধ করতে অভিমত দিয়েছিলাম।
কর্মিক ও শিল্পীদের ক্ষেত্রে সংহিতায় যে ব্যবস্থা বিধিবদ্ধ হল, তা হচ্ছে, তাদের জন্য কতকগুলো কর্মাগার তৈরি করা হবে এবং তাদের নির্মিত শিল্পদ্রব্য নির্ধারিত প্রশাসন বিভাগ থেকে ক্রয় করা হবে। সেই বিভাগ আবার সমগ্র দেশে এবং বিদেশেও এইসব শিল্পদ্রব্য বিপণন ব্যবস্থা করবে। আমি বুঝেছিলাম এরকম ব্যবস্থা থাকলে শিল্পীগণ সম্বৎসর নিয়মিতভাবে তাঁদের প্রয়োজনীয় অর্থ পাবেন, আর তাঁদের শিল্পতপস্যাও অব্যাহত থাকবে।
এইসব প্রশাসনিক সংহিতার সঙ্গে আমি তখন আরও একটি সংহিতা তৈরি করেছিলাম। সেটি ছিল রাজ্য ব্যবস্থাপনার নিমিত্ত মূল সংহিতা। এই সংহিতার মাধ্যমে রাজা এবং রাজ্যের শাসক পদে বৃত সামন্তদের আচরণবিধি এবং ক্ষমতার বিষয়সমূহ গ্রন্থিত করেছি। সাধারণের অধিকার এবং কর্তব্যাকর্তব্য সম্পর্কেও সেখানে নির্দেশাবলি খুবই স্পষ্ট ভাষায় দেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক সংহিতায় শুধুমাত্র বিভিন্ন বিভাগীয় অধিকর্তা এবং কর্মীদের কর্তব্যাদি বিষয় তথা ক্ষমতা ও অধিকারের সম্বন্ধে বিধি নির্দেশ করা হয়েছিল। দ্বিতীয় সংহিতাটি শাসক এবং শাসিতদের ব্যাবহারিক বিষয়ের প্রয়োজনীয় নিয়মাবলির কোষ হিসেবে রচিত হল।
সংহিতা রচনা সম্পূর্ণ করে, আমি পিতা দ্বৈপায়ন এবং বাসুদেবকৃষ্ণকে তা অর্পণ করলাম। তাঁরা সেই বিপুল তালপত্রীয় লিপিকা পাঠ করে অতিশয় প্রীত হলেন। পিতা বললেন, বৎস, তুমি এক অতি প্রয়োজনীয় মহৎ কর্ম সম্পাদন করেছ। এই সংহিতাসমূহ অতঃপর বিদুর নীতি নামে খ্যাত হবে এবং আর্যাবর্তীয় রাজন্যগণ যুগ যুগ ধরে একে পরম সমাদরে ব্যবহার করবেন। আমার বিশ্বাস, এই নীতি অনুসৃত হলে তাবৎ প্রকৃতিপুঞ্জ এবং রাজন্যকুল উভয়েরই প্রভূত কল্যাণ হবে।
অচ্যুত বললেন, মহাভাগ, আপনি কুরুকুলের মহামন্ত্রী, আবার পাণ্ডবগণের হিতার্থী। আপনি অনুগ্রহ করে কৌরব সভায় এই নীতির প্রবর্তনা করুন এবং সম্রাট যুধিষ্ঠিরকে অনুজ্ঞা করুন তিনিও যেন ইন্দ্রপ্রস্থের প্রশাসনে এর ব্যাপক প্রচলন করেন। আমি যাদবদের পক্ষ থেকে, যাদব মহাসভায় এই সুনীতি অনুসৃত হবার বিষয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হচ্ছি। আমার বিশ্বাস, কুরু-পাণ্ডব এবং যাদব গণজোটের এই নীতি প্রয়োগের সুফল দর্শন করে আর্যাবর্তীয় অন্যান্য রাজন্যগণ সাগ্রহে এর অনুসরণ করবেন। আপনি মহাপ্রাজ্ঞ, আপনার বুদ্ধি এবং ক্ষমতার উপযুক্ত কর্মই আপনি করেছেন। আপনার সর্বাঙ্গীণ কুশল হোক।
