বিদুর – ৩
৩
সংহিতা বিষয়ক এই দীর্ঘ স্মৃতিচারণা এ কারণে যে এতৎসত্ত্বেও সেই অনাকাঙ্খিত মহাপ্লবকে অতিক্রম করা গেল না। দ্বৈপায়নকৃষ্ণ এবং বাসুদেব-কৃষ্ণের অনুজ্ঞায় যে সংহিতা আমি নিরলস প্রচেষ্টায় রচনা করেছিলাম, তার গূঢ় উদ্দেশ্য ছিল, যদি এই সংহিতায় দীক্ষিত রাজন্যবর্গ পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ, ঈর্ষা পরিত্যাগ করে আর্যাবর্তের সমগ্র মানুষের কল্যাণকর্মে ব্রতী হয়। কিন্তু তা হল না। মহাপ্লব সংঘটিত হল। অত্যাচারী এবং অত্যাচারিত উভয়েই ভস্মীভূত হল এক উন্মাদ তাণ্ডবে।
সংহিতা রচনাকালে জনৈক নারদীয় ঋষি বলেছিলেন-
ব্যাধিভির্মর্থ্যমানং ত্যাজতাং বিপুলং ধনম্।
বেদনাং নাপকর্ষন্তিষতমানাশ্চিকিৎসকাঃ।।
তে চাতি নিপুণা বৈদ্যাঃ কুশলাঃ সম্ভূতৌষধাঃ।
ব্যাধিভিঃ পরিকৃষ্যন্তে মৃগা ব্যাধৈরিবার্দিতাঃ।।
কে বা ভূবি চিকিৎসন্তে রোগার্তান্ মৃগপক্ষিণঃ।
শ্বাপদানি দরিদ্রাংশ্চ প্রয়ো নার্তা ভবন্তি তে।।
ঘোরানপি দূরাধর্ষান্ নৃপতিনুগ্রতেজসঃ।
আক্রম্যাদদতে রোগাঃ পশূন্ পশুগণনা ইব।।
ব্যাধিতে ক্লিষ্ট হয়ে যাদের বিপুল ধন ত্যাগ করতে হয়, বৈদ্যরা যত্ন করেও কি তাদের মনস্তাপ দূর করতে পারেন? অতি কুশলী প্রাজ্ঞ বৈদ্যরাও, যাঁরা ঔষধ সংগ্রহে যত্নশীল, ব্যাধ যেমন মৃগদের নিপীড়ন করে, তেমনি ব্যাধি দ্বারা আক্রান্ত হন। এ ধরাধামে রোগগ্রস্ত মৃগ, পক্ষী, শ্বাপদ আর দরিদ্রদের কে চিকিৎসা করে? এরা প্রায়ই পীড়িত হয় না। পশু যেমন প্রবলতর পশু কর্তৃক আক্রান্ত হয়, অতি দুর্ধর্ষ উগ্রতেজা নৃপতিরাও সেইরূপ রোগের কবলে পড়েন।
প্রকৃতই, যখন কোনো ব্যক্তি, সমাজ বা জাতি কালরূপ মহারোগের শিকার হয়, তখন কোনো ঔষধেই তার নিরাময় হয় না। সে হিসাবে আমার সংহিতা তো ছার। কৌরব এবং যাদবকুল তথা সমুদায় আর্যাবর্তীয় রাজন্যকুলই যেন মহাকালের মহারোগে আপতিত হয়েছিল। লোভ অসূয়াদি এই মহাকাল রোগেরই উপসর্গ। জ্ঞান এবং প্রজ্ঞারূপ ঔষধেই এর নিরাময় সম্ভব। তাঁরা তা অর্জন করেননি।
উদ্ধব যখন আমাকে যদুকুল ধ্বংস এবং অচ্যুতের প্রয়াণ বিষয়ে সবিস্তারে বললেন, তখন এভাবেই আমি নিজেকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করলাম। কুরুকুল যে ধ্বংস হবে, এ আমার অনুসিদ্ধান্ত ছিলই। কিন্তু অচ্যুত জীবিত থাকতেই সাধারণতন্ত্রী যাদবেরাও পরস্পরের বিদ্বেষী হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এ চিন্তা কদাপি করিনি। এতকাল জেনেছি সবাই এবং সবই কালের অধীন। কিন্তু তার প্রকোপ যে এতই দ্রুত তা তো অনুভব করিনি। এখন এই অনুভবে শীলিত আমার স্মরণে আসে মহাত্মা সনৎ কুমারের উক্তি,
ন হিংস্যাৎ সর্বভূতানি মৈত্রেয়ণগতশ্চরেৎ।
নেদং জন্ম সমাসাদ্য বৈরং কুর্বীত কেনোচিৎ।।
মৃতং বা যদি বা নষ্টং যোঙ্কতীতমনুশোচতি।
দুঃখেন লভতে দুঃখং স্বাবনর্থৌ প্রপদ্যতে।
ভৈষজ্যমেতদ দুঃখস্য যদেত দানুচিন্তয়েৎ।
চিন্ত্যমানং হি ন ব্যেতি ভূয়শ্চাপি প্রবর্ধতে।।
কিন্তু তবুও কি চিন্তাকে পরিত্যাগ করা যায়? তবুও কি অতীতকে ভোলা যায়? হস্তিনাপুর আমার তাবৎ লীলার ক্ষেত্র। হস্তিনাপুর এবং দ্বারকা এই দুই নগরীর ধ্বংস, কুরু এবং যাদবকুল, এদের নিধন, শুধু কি তত্ত্ব শ্লোকের গাম্ভীর্যে মুছে ফেলা সম্ভব? উদ্ধব জানালেন, হে প্রিয় বিদুর, অচ্যুত প্রয়াণ করার পূর্বে আমাকে বলে গেছেন, উদ্ধব, তুমি এখন প্রব্রজ্যা নাও, তীর্থে যাও। পরিভ্রমণ করো। হিমালয়ের ঊর্ধ্বে বদরিকাশ্রম একটি সুরম্য স্থান। সেখানে গিয়ে আত্মস্থ হও এবং শান্তি লাভ করো। সব ক্ষয়, ক্ষতি গ্রহণ করো। কেননা, কালই গড়ে, কালই ক্ষয় করে। মানুষ কালের সৃজন গ্রহণ করে থাকে, বিনাশকেও তার গ্রহণ করতেই হবে। তাকে তো বর্জন করা সম্ভব নয়।
এমত বলেছেন অচ্যুত। আরও বলেছেন তিনি, সম্ভবমতো, প্রকৃতিপুঞ্জের কাছে আমার মর্মগত ইচ্ছা এবং উপদেশ বিবৃত কোরো। আমার অবর্তমানে, লোকহিতৈষণার কর্ম তুমিই কোরো। তীর্থের কোনো প্রান্তে যদি ব্যথিত চিত্ত, অভিমানী, মহাভাগ বিদুরের সাক্ষাৎ পাও, তাঁকে বোলো, তিনি যেন অতঃপর মহাত্মা মৈত্রেয়র উপদেশ মতো চলেন। এইকথা জানিয়ে উদ্ধব বদরিকার উদ্দেশ্যে চলে গেলেন। আমিও মহর্ষি মৈত্রেয়ের সন্ধানে একের পর এক তীর্থ অতিক্রম করে, হরিদ্বারে এসে তাঁর দর্শন পেলাম।
প্রভাসের যমুনাতীর থেকে পদব্রজে নানান স্থান ও তীর্থপদ ভ্রমণ করে হরিদ্বারে এসে জানলাম অগাধ জ্ঞান-সমুদ্র মহামুনি মৈত্রেয় এখানে সশিষ্য অবস্থান করছেন। আমি সশ্রদ্ধ প্রণতি সহকারে তাঁর পাদবন্দনা করে বললাম, মহাত্মন্, আমি বিদুর। আমি একদা কুরুবংশের মহামন্ত্রী ছিলাম। শুনলাম, সেই মহাবংশ অধুনা ধ্বংসপ্রাপ্ত। ভ্রাতৃকলহের ভীষণ অনলে কৌরবেরা সব ভস্মীভূত হয়েছেন। যাদবগণও একই প্রকার ভ্রাতৃবৈরিতায় নিঃশেষিত। অচ্যুতকৃষ্ণ তাঁর নশ্বর দেহ পরিত্যাগ করেছেন। মহাকাল-তনয়া জরা তাঁর অলৌকিকপ্রায় ব্যক্তিত্বকেও অব্যাহতি দেয়নি। এখন শুধুমাত্র পাণ্ডবগণ জীবিত আছে, আর আমার অগ্রজ মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, তৎপত্নী গান্ধারী এবং পাণ্ডব-জননী কুন্তী শোক, জরা আর নৈরাশ্য অবলম্বন করে হস্তিনাপুরে আছেন। ভগবন, যুদ্ধ আরম্ভ হবার প্রাক্কালে, যুদ্ধরোধে বিফলমনোরথ আমি, সাতিশয় গ্লানি এবং অভিমান নিয়ে রাজধানী পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যা নিয়েছিলাম। এক্ষণে আপনার চরণসমীপে এসে উপস্থিত হয়েছি। আমি মহাত্মা দ্বৈপায়নপুত্র, তাঁর নিকট শিক্ষাপ্রাপ্ত। বর্তমানে জ্ঞানতৃষ্ণা ছাড়া আমার অন্য কোনোরূপ তৃষ্ণা বা আসক্তি নেই। আপনি সর্বশাস্ত্রবিৎ, বহুদ্রষ্টা। আপনি আমাকে জ্ঞানবিষয়ে উপদেশ করুন।
আমি একথা বললে, মৈত্রেয় স্মিত হাস্যে আমাকে জানালেন যে, তিনিও জ্ঞানমার্গী এবং আমার পরিচয়, কীর্তি তথা আমার বর্তমান প্রব্রজ্যা বিষয়ে তিনি সম্যক অবহিত। তিনি প্রথমে সৃষ্টি সম্পর্কে পুরুষ-প্রকৃতি বিষয়ক সাংখ্য-তত্ত্ব উপদেশ করলেন। আমি দ্বৈপায়নের নিকট সাংখ্যসূত্রের মূল তত্ত্ব জেনেছিলাম। এক্ষণে কুশারু পুত্র মৈত্রেয় তা সবিস্তারে ব্যাখ্যা করলেন। কিন্তু দীর্ঘকাল বৌদ্ধিক চর্চায় অতিবাহিত আমার নাগরিক চেতনায় মৈত্রেয়র ভক্তিবাদী তত্ত্বার্থ কোনো উৎসাহের সঞ্চার করল না। আমি প্রশ্নের পর প্রশ্নে তাঁকে উদ্ব্যস্ত করে তুলতে তিনি বললেন, বিদুর আমি ভেবেছিলাম, স্বজন শোকসন্তপ্ত হয়ে আপনি, যে জ্ঞান ভক্তিমার্গে বিলীন হয়েছে, সেই পথকে অবলম্বন করতেই যত্নশীল হবেন। সাংখ্যোক্ত সেই বিরাট পুরুষের প্রতি নিজের অহংকারসমূহ অঞ্জলি দিয়ে শুধুমাত্র ভক্তিরসে প্লুত হয়ে বাকি দিনগুলো অতিবাহিত করবেন। কিন্তু অনুমান হচ্ছে, আপনার অন্তরে এখনও কিছু আকাঙ্খা বর্তমান। আপনি অবশ্যই জ্ঞানী। কিন্তু সেই জ্ঞান আপনাকে বৈরাগ্য দিতে পারেনি। মৈত্রেয়র কথার প্রত্যুত্তরে বিনীতভাবে জানালাম, ভগবন, বৈরাগ্য তো আমি এখনও যাচ্ঞা করি না। আমি সর্বস্বান্ত, স্বজন-বন্ধুহারা বটে, তবু যে জ্ঞান কাঙ্খা করি তা লোকহিতৈষণায় প্রয়োগের নিমিত্তই করি। সাংখ্যোক্ত বিরাট পুরুষের প্রতি আমার কৌতূহল আছে, তাঁর স্বরূপও আমি জানতে বাঞ্ছা করি, কিন্তু এই মুহূর্তে তার থেকেও বেশি আকাঙ্খিত হচ্ছে সেই জ্ঞান, যা লোকহিতৈষণায় আমি প্রয়োগ করতে পারি।
আমার স্পষ্ট বক্তব্যে প্রীত হয়ে ঋষি লোকহিতৈষণা বিষয়ে আমাকে প্রভূত উপদেশ প্রদান করলেন। মৈত্রেয়র পারমার্থিক তত্ত্বাদির প্রতি যদ্যপি আমার বিশেষ কোনো আকর্ষণ ছিল না। তবু, তাঁর সাংখ্যতত্ত্বের ভাষ্যে যে বিরাটত্বের এক ধারণা আমার অন্তরে প্রবেশ করল, তার সাহায্যে আমার সমস্ত শোক, স্বজন-হারানোর সন্তাপ এবং বিপুল নৈরাশ্যকে আমি যেন অনেকটাই প্রশমিত করতে পারলাম। উদ্ধবের নিকট সেই মহাবিনাশের সংবাদ পাবার পর থেকে যে বেপথুর সৃষ্টি হয়েছিল, আজ যেন তার অনেকটা ভারই লাঘব হল। আমি জন্ম এবং কর্ম সূত্রে নিতান্তই বিষয়ী লোক। রাজনীতি আমার পেশা। মানুষ নিয়ে আমার যাবতীয় কর্মকাণ্ড। মানুষের সবকিছু নিয়েই আমার জ্ঞান এবং কর্ম প্রবাহিত হয়েছে এতকাল। আজ স্বজনবিয়োগের সন্তাপে কাতর হয়ে যে বেপথু প্রাপ্ত হয়েছি, তার নিরসনকল্পে বৈরাগ্য বা উদাসীনতা চাই না। আমার শরীর এখনও সক্ষম। মন সজীব। যতদিন যাচ্ছে, স্বজন-বান্ধব বিয়োগের সন্তাপ ক্রমশ ক্ষীণ হচ্ছে। কালই যেমন সব কিছুর সংহারক, কালই সেই সংহারজনিত বিয়োগ ব্যথার প্রশমক। মৈত্রেয় এই কাল সম্পর্কে গূঢ় সব তত্ত্ব আলোচনা করলে, সে বিষয়ে আমার সন্ধিৎসা তীব্র হল। আমি জানতে চাইলাম, হে ব্রহ্মণ, আপনি বলেছেন যে বহুরূপ অদ্ভুতকর্মা হরির কাল নামে এক রূপ আছে, তার কল্পনা কেমন? তার স্থূল বা সূক্ষ্মরূপ বর্ণনা করুন।
মৈত্রেয় বললেন, কালের আকার মহৎ ইত্যাদির পরিণামের দ্বারা স্থির হয়। কাল নির্বিশেষ, মূর্তিরহিত এবং আদি-অন্তহীন। হরি এই কালকে নিমিত্ত হিসেবে অবলম্বন করে লীলা দ্বারা নিজেকে বিশ্বরূপে সৃজন করে থাকেন। আমি জানতে চাইলাম-ভগবন, লীলাদ্বারা বিশ্বরূপ নিজেকে সৃজন করলে, সৃজনের পূর্বে লীলাকারের কি এক কায়িক সত্তার প্রয়োজন হয় না? বিশ্ব সৃজনের আগে কায়িক সত্তার অবস্থান বা অবয়ব কেমন? লীলার উপাদানই বা কী আর লীলাই বা কী নিয়ে? যাঁর লীলা, তিনি সৃজনের পূর্বে কি কালে স্থিত না অ-কালে? কালের সৃজন কে করেছেন? যদি স্বয়ং লীলাকারই কালকে সৃজন করে থাকেন, তবে তাকে নিমিত্ত হিসেবে অবলম্বনের হেতু কী? কাল যদি নির্বিশেষ হয়, তবে তাকে নিমিত্তরূপে অবলম্বনকারী সেই লীলাকার কি বিশেষ? তিনি যদি বিশেষ হন তবে তাঁর স্বরূপ কী?
এইসব প্রশ্নের উত্তরে মৈত্রেয় যেসব কথা বললেন, আমি বৌদ্ধিকভাবে সেইসব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হতে পারলাম না। তিনি দেহ বা চৈতন্য নিয়ে নানা তত্ত্বের অবতারণা করলেন। তাঁর বক্তব্য এতই উপমা দ্বারা বিধৃত যে সেই কুয়াশা সরিয়ে প্রকৃত তত্ত্বে বা বিষয়ে পৌঁছোনো বড়োই কষ্টকর।
যদিও অচ্যুত উদ্ধবের কাছে মৈত্রেয়র প্রাজ্ঞতা বিষয়ে উত্তম প্রস্তাবই করে গেছেন, আমি কিন্তু সব বিষয়ে তাঁর মতকে গ্রহণ করতে পারছি না। অবশ্য এর কারণ বৌদ্ধিক চর্চার ভিন্নতাও হতে পারে। মৈত্রেয় যে তত্ত্বাশ্রয়ী, আমি সে তত্ত্ব নিয়ে কদাপি ভাবিত ছিলাম না। তাই মৈত্রেয়র তত্ত্ব এখনও আমার কাছে গ্রাহ্য হতে পারছে না। সে কারণে তাঁর কাছে অন্য ভাবে কিছু প্রশ্ন উত্থাপন করলাম। কালতত্ত্বই অবশ্য আমার বিষয়। কালতত্ত্ব নিরূপণে আমার আগ্রহ চিরকালের।
আমি প্রশ্ন করলাম, ভগবন, আপনার নিকট জ্ঞাত হলাম যে ক্ষিতি প্রভৃতি উৎপন্ন বস্তুর নাম কার্য। ওই কার্যের চরম অংশকে, অর্থাৎ যাকে আর বিভাগ করা যায় না, বা যা কার্যাবস্থা প্রাপ্ত হয়নি, কিংবা অন্যের সঙ্গে মিলিতও হয়নি, যা কার্যাবস্থা বা মিলনাবস্থা ব্যতিরেকেও বিদ্যমান থাকে, তাকে আপনি পরমাণু আখ্যা দিয়েছেন। আপনি বলেছেন, এই পরমাণুর অস্তিত্ব অনুমানসিদ্ধ, তা কখনো দৃষ্টিগোচর নয়। একটি বস্তু বহু পরমাণুর সমষ্টিরূপে গঠিত হলেও তাকে একটি একক বলেই মানুষ ভ্রম করে থাকে। পরমাণুর অস্তিত্বের এটাই প্রমাণ বলে আপনি মনে করেন। পরমাণু সম্পর্কে আপনি আরও যা যা বললেন-অর্থাৎ আপনি যাকে পরম মহান এবং পরম মহৎ পরিমাণ ইত্যাদি আখ্যা দিলেন, বস্তু সম্পর্কে সেই চূড়ান্ত সূক্ষ্ম ও স্থূল জ্ঞান আমি লাভ করলাম। এখন আমার জ্ঞাতব্য, কালও এইরূপ সূক্ষ্ম ও স্থূল রূপে অনুমিত হয় কিনা। এ বিষয়ে যদি বিশদ করে কিছু জানান তাহলে কৃতার্থ হই।
মৈত্রেয় বললেন, বিদুর, আপনার প্রশ্ন আপনারই সঙ্গত বটে। কাল, পরম পুরুষের শক্তি বিশেষ। কাল পরমাণু প্রভৃতি অবস্থা ভোগ দ্বারা ব্যক্ত পদার্থে ব্যাপ্ত হয়ে অবস্থান করেন। সূর্য যে পরিমাণ সময়ে পরমাণু পরিমিত দেশ অতিক্রম করেন তাকে পরমাণুকাল বলে, আর যে সময়ে পরমাণু সমষ্টিরূপ ভুবনকোষ অতিক্রম করেন তাকে পরমমহান কাল বলে। দুটি পরমাণু দ্ব্যণুক এবং তিনটির সম্মিলনকে ত্রসরেণু বলা হয়। যে কাল তিনটি ত্রসরেণু ভোগ করে তাকে ত্রুটি বলে। শত ত্রুটিতে এক বেধ, তিন বেধে এক লব, তিন লবে এক নিমেষ ও তিন নিমেষে এক ক্ষণ হয়ে থাকে। এভাবে পাঁচ ক্ষণে এক কাষ্ঠা, পঞ্চদশ কাষ্ঠায় এক লঘু, পঞ্চদশ লঘুতে এক জাড়িকা অর্থাৎ দণ্ড, দুই দণ্ডে এক মুহূর্ত এবং ছয় বা সাত দণ্ডে এক যাম গণনা করা হয়। এভাবেই ক্রমশ প্রহর দিবামান, রাত্রিমান, পক্ষ, মাস, বৎসর, ঋতু ইত্যাদি গণিত হয়ে থাকে।
মহাত্মা মৈত্রেয় এইভাবে নানান তত্ত্ব ও কাহিনি বর্ণনদ্বারা আমার চিত্তকে প্রভূত প্রশান্তি দান করলেন। কিছুদিন হরিদ্বারে তাঁর সাহচর্য লাভ করে স্থির করলাম, হস্তিনাপুরে প্রত্যাবর্তন করব। মৈত্রেয় বললেন, বিদুর, আমি পূর্বেও বলেছি, আপনার এখনও বানপ্রস্থ অবলম্বনের সময় হয়নি। আপনার পক্ষে হস্তিনাপুরে প্রত্যাবর্তনই উত্তম। হয়তো আপনাকে লাভ করে, সন্তপ্ত রাজা ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী এবং কুন্তী তথা সাম্রাজ্য লাভ করেও যাঁরা দুঃখী, সেই পাণ্ডবেরা কথঞ্চিৎ সান্ত্বনা লাভ করবেন! মৈত্রেয়র নিকট স্বজনদের নাম শ্রবণে আমার মন অত্যন্ত চঞ্চল হল। হায় কী সন্তাপ! আমি একের অন্যায়ে সবাইকে পরিত্যাগ করে এই সুদীর্ঘ কাল কিনা প্রব্রজ্যায় কাটিয়েছি। যে দুঃখের দিনে নিকটে থাকে না সে কি স্বজন? আমার মনে হল, আমি অত্যন্ত গর্হিত কাজ করেছি। এইরূপ গ্লানিতে দগ্ধ হয়ে, আমি হস্তিনাপুর যাত্রা করলাম।
