বিদুর – ৪
৪
আমার এই প্রত্যাবর্তন বড়ো নিবিড়, বড়ো বিষণ্ণ, বড়ো শান্তি এবং বেদনার। এমন প্রত্যাবর্তন বড়ো ঘটে না। যাদের অনাদরের, অপ্রীতির এবং লাঞ্ছনার বিষবাষ্পে একদা শ্বাসরুদ্ধ আমি, শিকড় ছিন্ন করে প্রব্রজ্যার উঞ্ছ জীবনে ভেসে পড়েছিলাম, আজ আবার তাদেরই স্নেহস্মৃতি, প্রীতির অভিজ্ঞান আর হৃদয়বৃত্তির টানে ফিরে চলেছি সেই শিকড়ে। দীর্ঘ অনিকেত প্রব্রজ্যা একদার নিকেতনের সুখস্মৃতিটুকুই যেন শুধু জীইয়ে রেখেছে। এখন আবার এক নতুন বোধ যেন সক্রিয় হয়েছে মনের মধ্যে। সেই বোধের যুক্তিক্রম আগের যুক্তিক্রমের সঙ্গে মেলে না। এখন বোধ হচ্ছে, এইসব দম্ভী মানুষেরা, এই ক্ষমতাকামুক মানুষেরা, এই ক্রোধী, আত্মস্বার্থী, অপরিণামদর্শী মানুষেরাই আমার স্বজন। তারা যেখানে বাস করে, সেই আমার গৃহ, আর সেই স্থানই আমার স্বদেশ, যেখানে এরা নিয়ত দ্বন্দ্ব, কলহ, কুটিলতা, পরশ্রীকাতরতা, অভিমান, দম্ভ, ক্রোধ এবং অনুরূপ সহস্র দোষের সঙ্গে মানুষের অবশ্য প্রাপণীয় সব দুঃখ নিয়ে বসবাস করে। এরাই আমার স্বজন। প্রজ্ঞাভিমানী আমি যদি, এদের অবহেলা করে, অবজ্ঞা করে প্রব্রজ্যাকে সঙ্গত জ্ঞান করি, তবে আমিই শুধু শিকড়চ্যুত হব। শিকড়ে প্রত্যাবর্তনেচ্ছু আমার মনে এরকমই একটা ভাব ক্রীড়া করছে।
হরিদ্বার থেকে হস্তিনাপুরের পথ, পদব্রজে একপক্ষকালের। কিন্তু সে পথে আমি হস্তিনাপুরে যাব না। আমি এক গর্হিত কাজ করেছি। আমাকে তার প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, যে মহামন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও যুদ্ধকে পরিত্যাগ করে, ব্যক্তিক অভিমান পরবশ হয়ে আমি প্রব্রজ্যা নিয়েছিলাম, তার সন্তাপ যেন আমি সমূহ ভোগ করি। শুধু যুদ্ধ বন্ধ করতে বিফল মনোরথ হয়েছিলাম বলেই তার দায়, অন্তত মহামন্ত্রী হিসেবে আমি এড়াতে পারি না। এই যুদ্ধ একদিনের কোনো ঘটনার ফল নয়। কোনো ব্যক্তিক মান-অভিমানের ফল নয়-এর দায় বর্তমান আর্যাবর্তীয় সমাজের সকলেরই এবং আমিও তার অংশীদার। তাই এই যুদ্ধের সন্তাপ আমার অবশ্য প্রাপ্য, এমত বিবেচনায় আমার যাত্রাপথকে কুরুক্ষেত্র পর্যন্ত প্রলম্বিত করব, যেখানে আমার স্বজনেরা সমূলে বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। সেখানেই সেই শূন্যতা আর হাহাকারকে হৃদয়ে ধারণ করে, তবেই হস্তিনাপুরে যাব। আর সেখানে সেই অন্ধ গলিত বৃদ্ধ পিতা, অভিমানিনী স্বেচ্ছান্ধা হতভাগ্য জননী গান্ধারী আর স্বয়ংসিদ্ধা কুন্তী আছেন। এই সময়ে মনে পড়ল, আমার অন্ধ অগ্রজের একদিনকার একটি অদ্ভুত স্নেহপূর্ণ আচরণ। দুর্যোধন, দুঃশাসন প্রভৃতির নিন্দাবাদ এবং পাণ্ডবদের প্রশংসাসূচক আলোচনা করায় অন্ধ কুরুরাজ আমাকে বলেছিলেন, তোমার সমুদায় বাক্য পাণ্ডবদের হিতকর এবং আমাদের অহিতকর। পাণ্ডবদের জন্য, কীভাবে আমি আমার পুত্রদের ত্যাগ করতে পারি? পাণ্ডবরাও আমার পুত্র বটে, কিন্তু দুর্যোধন আমার দেহ থেকে উৎপন্ন। বিদুর, আমি তোমার বহু সম্মান করে থাকি, কিন্তু তুমি যা বলছ, সবই কুটিলতাময়। তুমি চলে যাও বা থাক, যা ইচ্ছা কর। অসতী স্ত্রীর সঙ্গে মিষ্ট ব্যবহার করলেও সে স্বামী ত্যাগ করে।
আমি বরাবরই রাজাকে উপদেশ দিয়েছি, তিনি যেন দুর্যোধনকে পরিত্যাগ করেন। সে দুর্বিনীত, সে পাণ্ডবগণের অহিতকারী। কিন্তু আমি তখন চিন্তা করিনি যে দুর্যোধন ওই অন্ধরাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র। ওই অন্ধরাজা তাঁর অন্ধত্বের জন্য সিংহাসন পাননি। তাঁর পুত্র সর্বগুণসম্পন্ন হয়েও কেন যুধিষ্ঠিরের অনুগত থাকবে, এ চিন্তা যে তাঁর স্বাভাবিক, তা আমি বুঝিনি। আমি বুঝিনি, দুর্বিনীত বলেই স্বীয় অংশজাত সন্তানকে ত্যাগ করা যায় না। দুর্যোধন যুধিষ্ঠিরের চাইতে বয়ঃকনিষ্ঠ, শুধুমাত্র এই কারণেই যুধিষ্ঠির রাজত্ব পাবেন, এই যুক্তি যে অন্ধরাজার স্বাভাবিকভাবে মনঃপূত নাও হতে পারে, সেকথা আমি ভাবিনি। পাণ্ডু তো তাঁর কনিষ্ঠ হয়েও রাজত্ব পেয়েছিলেন, এক্ষেত্রে না হয় তাঁর পুত্র রাজ্য লাভ করুক-এমন একটি চিন্তা তাঁর থাকা তো স্বাভাবিক। আমি এসব তখন ভাবিনি এবং রাজার তিরস্কারে বিরক্ত হয়ে সভাত্যাগ করে যুধিষ্ঠিরের কাছে চলে গিয়েছিলাম। তারা তখন বনবাসী।
রাজা পরে তাঁর ব্যবহারের জন্য অনুতপ্ত হয়েছিলেন। তিনি প্রকৃতই আমাকে ভালোবাসতেন। তাঁর বিরক্তি এবং ক্রোধ প্রশমিত হলে আমার উপস্থিতির অভাবে তিনি সাতিশয় ক্লেশ অনুভব করতে লাগলেন এবং অচিরাৎ সঞ্জয়কে আমার সন্ধানে প্রেরণ করলেন। আমিও চলে আসতে বাধ্য হয়েছিলাম। রাজা তখন আমাকে তাঁর কোলে বসিয়ে মস্তক আঘ্রাণ করে বলেছিলেন, ধর্মজ্ঞ, আমার ভাগ্যক্রমে তুমি ফিরে এসেছ, তোমার জন্য দিবারাত্র অনিদ্রায় আছি, অসুস্থ বোধ করছি। যা বলেছি তার জন্য ক্ষমা করো। আমি এখন সেই স্মৃতি রোমন্থন করে বুঝতে পারছি, সেই অন্ধরাজার প্রীতি কতই-না গভীর ছিল। আমি তাঁকে যেসব উপদেশ দিয়েছি, আজ বুঝতে পারছি, তা তাঁর পক্ষে পালন করা নিতান্তই অসাধ্য ছিল। সন্তানকে কোনো কারণেই ত্যাগ করা যায় না। সন্তান যদি নিতান্ত দুর্বিনীত পাষণ্ডও হয় তথাপি পিতামাতা তার প্রতি স্নেহমুক্ত হতে পারেন না। একারণে আমার মনে হল, আমাকে এক্ষুনি তাঁদের বড়ো প্রয়োজন। আমাকে পেলে তাঁদের সন্তাপিত চিত্তে প্রাথমিক আলোড়ন হয়তো খুবই তীব্র হবে, তবে, আমার সাহচর্য সেই সন্তাপে চন্দন প্রলেপনও তো বটে। তাঁদের বর্তমান শোকমগ্নতার কালে তাও কি এক অসামান্য সঞ্জীবনী নয়?
আমার দেহমন এখনও কর্মক্ষম। দীর্ঘকাল প্রব্রজ্যায় কাটিয়ে প্রভূত কষ্টসহিষ্ণুতাও আয়ত্ত হয়েছে। নানান দেশ, জনপদ ও তীর্থ দর্শনে অন্তরের বিস্তৃতিও হয়েছে প্রচুর। বহু ঋষি এবং বহুদর্শী শাস্ত্রজ্ঞ পুরুষের সাহচর্যে মানসিক তামসও অপসৃষ্ট। এখন প্রত্যাবর্তনের উত্তেজনায় আমি যেন যুবাপুরুষের উদ্দীপনা ও শক্তি বোধ করছি। শুধু ক্ষণে ক্ষণে দুঃস্বপ্নের মতো কুরু ও যদুকুল ধ্বংসের উদ্ধবকৃত বর্ণনা মনে পড়ায় হৃদয়ের হাহাকারকে প্রশমিত করতে পারছি না। মন তখন, বড়োই নৈরাশ্যে মগ্ন হচ্ছে।
বড়ো অদ্ভুত বোধ হচ্ছে আমার। যেসব রমণীরা অচ্যুতের মতো মহান পুরুষের প্রীতিধন্যা ছিলেন, তাঁরা নাকি, কেউ কেউ আভীর দস্যুদের সঙ্গে স্বেচ্ছায় চলে গেছেন। দ্বারাবতীতে যাদবেরা পরস্পরের প্রতি বিদ্বিষ্ট হলে, অচ্যুত এবং বলদেব তাঁদের মধ্যে সম্প্রীতি পুনঃস্থাপন মানসে প্রভাসতীর্থে এসে কিছুকাল আমোদ-আহ্লাদ উপভোগ করছিলেন। সেখানে অতিরিক্ত মদ্যপানে মত্ত যাদবপ্রধানরা পরস্পরের ধ্বংসসাধন করলে, অর্জুন স্ত্রী, বৃদ্ধ এবং বালক-বালিকাদের আনয়ন করার জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। প্রত্যাবর্তনের সময় পথিমধ্যে পঞ্চনদের কোনো স্থানে সামান্য আভীর দস্যু তস্করেরা কুরুক্ষেত্র-বিজয়ী অর্জুন এবং তাঁর সহযোগী যোদ্ধাদের হেলায় হারিয়ে, তাঁদের সর্বস্ব এবং কৃষ্ণ প্রভৃতি যাদবশ্রেষ্ঠদের পত্নীগণকে লুন্ঠনে প্রবৃত্ত হয়। উদ্ধব বলেছেন, তখন স্বয়ং অচ্যুতেরই কোনো কোনো পত্নী সাতিশয় আগ্রহ সহকারে সেইসব আভীর দস্যুদের কন্ঠলগ্না হয়ে স্বেচ্ছায় চলে যান। অর্জুন বহু আয়াসে বাকিদের হস্তিনাপুরে নিয়ে আসেন। এই ঘটনা আমার বড়ো মর্মান্তিক এবং আশ্চর্যকর বোধ হল। কালের কী বিচিত্র গতি-
সর্বে ক্ষয়ান্তা নিচয়াঃ পতনান্তাঃ সমুচ্ছ্রায়াঃ।
সংযোগা বিপ্রয়োগান্তাঃ মরণান্তং চ জীবিতম্।।
বৃষ্ণি এবং যদু বংশীয় পুরুষপ্রধানেরা যে ঋদ্ধিশালী দ্বারকায় বাস করতেন, সেই দ্বারকা আজ সমুদ্রগ্রাসে। দ্বারকার বিপুল সৌন্দর্যের কথা আজও স্মৃতিতে বড়ো উজ্জ্বল প্রভায় প্রভাবান। আহা! যে সুমার্জিত রাজবর্ত্মসমূহে বিদ্যুৎবরণী নবীনা সুন্দরীরা কন্দুকক্রীড়ায় নিয়ত চঞ্চলা থাকত, তা এখন মকর, কুম্ভীরের আশ্রয়স্থল মহার্ণব। কত উদ্যান, কত উপবন, কতই না কুঞ্জে অলংকৃত ছিল অচ্যুতের প্রিয় এই দ্বারবতী! কত কলগুঞ্জন, কলহাস, প্রণয়লীলায় সতত আমোদিত এই পুরী মানুষের নয়নরঞ্জন ছিল। আজ সেখানে ভয়াল তরঙ্গমালার বীচিক্ষেপ যেন উন্মাদের মতো বিগতদিনের স্মৃতিকে খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সেই মহতী নগরীর মহত্তম পুরুষের পত্নীগণ কীভাবে স্বেচ্ছায়, সানন্দে আভীর তস্করদের সঙ্গে রহঃকেলিতে লিপ্ত হন, আমার এই সুদীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতায় তার মর্ম অনুধাবনে ব্যর্থ হই। মানুষ বড়ো বিচিত্র, আরও বিচিত্র বুঝি মানুষী। অথবা অচ্যুত, যিনি একজন আদর্শ মানব হিসেবে, তাঁর জীবৎকালেই বহুজন গ্রাহ্য হয়েছিলেন, তাঁরও জীবনচর্যার কিছু ত্রুটি ছিল, যা তাঁর কোনো কোনো পত্নীর এইরূপ আচরণের জন্য দায়ী। আমি জনশ্রুতিতে জেনেছি এবং উদ্ধবও আমায় বলেছেন যে অচ্যুতের রূপবান পুত্র শাম্বকে তাঁর অনেক বিমাতাই কামনা করতেন এবং এ কারণে অচ্যুত স্বয়ং তাঁর প্রতি বিরক্ত ছিলেন।
অচ্যুত সম্পর্কে যে লোকশ্রুতি প্রচলিত, যে তিনি অসংখ্য দার পরিগ্রহ করেছিলেন এবং স্ত্রী-জাতি বিষয়ে তাঁর অতিরিক্ত আসক্তি ছিল, তার মধ্যে সত্যতা আছে। বর্তমান সমাজে একাধিক দারপরিগ্রহ করা সামাজিক রীতিতে অধর্ম নয়। তবে আমার মনে হয়, অধিক কলত্র অধিক দুঃখের কারণ অবশ্যই হয়ে থাকে। অচ্যুত বহু লোকাতীত গুণের অধিকারী হয়েও নারীর প্রণয় বিষয়ে বড়ো উদার ছিলেন। একথা সত্য, তাঁর মহিষীরা, তাঁর অসামান্য গুণকীর্তির জন্যই, তাঁকে দয়িত পদে বৃত করেছিলেন। কিন্তু মানুষ হিসেবে তিনি যতই অসামান্য হোন, তাঁর জৈবিক ক্ষমতার নিশ্চয়ই এক সীমা থাকবে। একজন পুরুষ কখনোই অসংখ্য যুবতী স্ত্রীলোকের শারীরিক এবং মানসিক তৃপ্তি সাধন করতে পারেন না। প্রকৃতির বিধিকে লঙ্ঘন করলে, প্রকৃতি প্রতিশোধ অবশ্য নেয়। অচ্যুতের যে স্ত্রীগণ আভীর দস্যুদের সঙ্গে আহ্লাদের সঙ্গে চলে গেছেন, তাঁরা নিশ্চয় অতৃপ্ত জীবনযাপনে ক্লিষ্টা ছিলেন। অচ্যুত যেভাবে সত্যভামা, জাম্ববতী, চারুদেষ্ণা বা রুক্মিণী প্রভৃতি মহিষীদের প্রীতি সম্পাদন করতেন, সেভাবে নিশ্চিতই অন্যান্য স্ত্রীগণ আপ্যায়িত হতেন না। অধিকন্তু তিনি যথেষ্ট প্রাচীনতা প্রাপ্ত হলেও অসংখ্য যুবতী কন্যার পাণিগ্রহণে নিবৃত্ত হননি। জীবধর্মানুযায়ী তাদের আচরণ অবশ্য অসম্ভব নয়। অচ্যুতের নির্বিচার স্ত্রী গ্রহণের ফলে, বেশ কিছু পত্নী বস্তুত শাম্ব, প্রদ্যুম্ন প্রভৃতির অপেক্ষা বয়সে ছোটোই ছিলেন, এবং এসব ক্ষেত্রে তো কত কী-ই না ঘটতে পারে। রমণীর মন, প্রীতি সম্ভোগ ছাড়া কদাপি কি অনুগত থাকে? যে সব পত্নীরা তাঁর একবারই মাত্র সম্ভোগ লাভ করে বাকি জীবন অবরোধে, অনাদরের, অপ্রেমের যন্ত্রণায় ছিলেন, তাঁদের কাছে পুরুষ মাত্রেরই কাঙ্খিত হবার কথা, তা, তারা দস্যু তস্কর বা যাই হোক না কেন। পাণ্ডবদের নিরামিষ অন্তঃপুরের থেকে তস্করের সকাম আলিঙ্গন তাদের অবশ্যই শ্রেয় বোধ হওয়া স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে লোকাচার অথবা আভিজাত্য কোনো প্রতিবন্ধকতাই নয়।
পথ বড়ো দীর্ঘ। রাজবর্ত্ম সর্বত্র তত প্রতুল নয়। লোকায়ত পথসমূহ ঘন অটবীর অভ্যন্তর দিয়ে কোনো কোনো রাজবর্ত্মে গিয়ে মিলেছে। কিন্তু এই অটবী অধ্যুষিত পথ আদৌ নিরাপদ নয়। খাণ্ডব অরণ্য দহনের সময় তৎস্থানীয় যেসব ভূমিপুত্ররা কৃষ্ণার্জুনের দৃষ্টি এড়িয়ে পলায়নে সক্ষম হয়েছিল, তারা এইসব আটবিক প্রদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। আমি যখন মহামন্ত্রী ছিলাম, তখন এইসব অরণ্য সীমান্তবর্তী গ্রাম এবং জনপদের প্রকৃতিপুঞ্জ তাদের দ্বারা নিয়ত নির্যাতিত হত। এখনও সেইসব স্ব-ভূমিচ্যুত মানুষেরা, বিশেষত, নাগজাতীয় অনার্যরা, আর্য ক্ষত্রিয় বা তাদের সন্নিহিত মানুষদের প্রতি অসম্ভব ক্রোধপরতন্ত্র। নিরপেক্ষ বিচারে বুঝি, এই ক্রোধ অযৌক্তিক নয়। তবু একের অন্যায়ের প্রতিকার তো অন্যের উপর প্রতিশোধ নিয়ে হয় না, সে স্বজনদের কেউ হলেও না। কিন্তু উচিত অনুচিতের বিচার, মানুষের এই প্রতিশোধ-স্পৃহার ক্ষেত্রে একান্তই নিষ্ফল। জগতের সব মানুষ কোনোদিনই একই সঙ্গে সুবুদ্ধিপরায়ণ হতে পারবে না। হত্যা থাকলে প্রতিশোধ থাকবে, প্রতিশোধ যদি আবার হত্যা সংঘটিত করে তবে তার প্রতিশোধেও পুনর্বার হত্যাই ঘটবে, এবং এর পৌনঃপুনিকতার শেষ হয় না। অথচ লোকশিক্ষার জন্য কত মনীষীরা কত না কথা বলে গেছেন। তাঁরা বলেছেন, মা হিংসীঃ। বলেছেন, জীবাতবে ন মৃত্যবে। হত্যা সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য-একথা তো সবাই বলেন। কিন্তু মানুষ যেন মৃত্যুকেই স্বীয় কর্মদ্বারা অবধার্য করে তুলতে চায়। কৃষ্ণার্জুনের মতো মহান ক্ষত্রিয় চর্যাশ্রয়ী রাষ্ট্রপুরুষেরা কেন যে খাণ্ডবদাহের মতো এক অমানবিক কর্ম করলেন, তা আমি অনুধাবন করতে পারিনি। সবাই বলে, বাসুদেবকৃষ্ণের সব কার্যের তাৎপর্য বোঝা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। পিতা দ্বৈপায়নও একথা বলেন। আমি অচ্যুতকৃষ্ণের নিতান্ত গুণগ্রাহী। অর্জুনও আমার অপরিসীম স্নেহ এবং শ্রদ্ধার পাত্র। তাঁদের উভয়ের গুণ, কীর্তি এবং যশ আমার শ্লাঘার বস্তু। খাণ্ডব বন আবাদ করানো ইন্দ্রপ্রস্থ নগরীর বিস্তারের জন্য প্রয়োজনীয় অবশ্য ছিল। কিন্তু খাণ্ডব অরণ্যাশ্রয়ী মনুষ্য তথা সর্বপ্রাণীকে সংহারের হেতু যে কী, তা আমি কোনোদিনই বুঝতে পারলাম না। আমি পাণ্ডব পক্ষপাতী এই বদনামের সত্যতা স্বীকার করেই বলছি, এর ফলে দুর্যোধনেরই লাভ হয়েছে। অথবা খাণ্ডবদাহ এবং তার অভ্যন্তরস্থ সব প্রাণীর নির্বিচার নিধনও কি কুরুক্ষেত্রের এই ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের অন্যতম পূর্বশর্ত নয়? কে জানে এই ধ্বংসের প্রতিশোধ যজ্ঞ আরও কত ক্রমান্বয়ী হবে? নাগরাজ তক্ষকের পুত্র, শুনেছি এখন নাগজাতির নেতৃপদে আসীন। খাণ্ডবদাহের সময় অর্জুন আর কৃষ্ণ বহু নাগ জাতীয় অনার্য মানুষদের হত্যা করেছেন। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তাই বহু নাগ জাতীয় বীর কৌরবপক্ষ অবলম্বন করেছিল। নাগেরা বহুকাল ক্রোধ পুষে রাখতে পারে, এটা তাদের স্বাভাবিক প্রবণতা। তারা বড়োই প্রতিশোধপরায়ণ এবং গোপন যুদ্ধই তাদের ধর্ম। তারা ক্ষত্রিয়দের মতো সম্মুখ যুদ্ধ সাধারণত করে না। কে জানে ভবিতব্য কী?
ক্ষত্রিয়দের কতকগুলো নিয়মবিধি আছে। যেসব ক্ষত্রিয়বীর সেই নিয়মবিধির বাইরে গিয়ে কাজ করেন, সমাজে তাঁদের বড়ো অখ্যাতি হয়। কোনো ক্ষত্রিয় বীরের নিরস্ত্রের প্রতি, রণপরাঙমুখ যোদ্ধার প্রতি, স্ত্রী-জাতীয়, রুগ্ন, অসমর্থ, বিশ্রামরত, সংগমরত বা শরণাগত কারওর প্রতি অস্ত্রপ্রয়োগ অকর্তব্য, অধর্ম। সে বিচারে তাঁদের খাণ্ডবদাহ সম্পর্কীয় কার্যাবলিতে বিলক্ষণ অধর্মের ব্যাপার আছে। খাণ্ডবদাহ কোনো যজ্ঞ নয়। যজ্ঞ করা বা করানো ক্ষাত্রধর্ম। রতিক্রিয়া থেকে শুরু করে, অশ্বমেধ, গোমেধ, নরমেধ ইত্যাদি সব কর্মই ক্ষত্রিয়েরা যজ্ঞের নামে করে থাকেন এবং তা বিভিন্ন যুগধর্মে আদৃতও। কিন্তু নির্বিচার হত্যা, তা মানবই হোক কিংবা পশুই হোক তা কোনোযুগেই ক্ষত্রিয়ের কর্তব্যকর্ম বা ধর্ম বলে আদৃত হয়নি। খাণ্ডবদাহ প্রকল্পে কৃষ্ণার্জুন এই ধর্মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছিলেন। তাঁরা যজ্ঞকর্ম ব্যতিরেকেই প্রাণী হত্যায় লিপ্ত হয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, সে প্রাণী হত্যা নিতান্তই নির্বিচার প্রাণী হত্যা, এমনকী নির্বিচার অরণ্যসংহারও কোনো যজ্ঞকর্ম বলে অভিহিত হতে পারে না। সেটাও পরোক্ষভাবে ব্যাপক প্রাণী ধ্বংসেরই তুল্য।
শরণাগতকে রক্ষা করা ক্ষাত্রধর্ম। খাণ্ডবদাহ কর্মেও কৃষ্ণার্জুন কিছু শরণাগতকে রক্ষা করেছিলেন। কিন্তু যে কজন শরণাগত হতে পেরেছিল, তার বহু গুণ বেশিই তো হবার সুযোগই পায়নি। তার আগেই তো তারা কৃষ্ণার্জুনের অব্যর্থ শরসন্ধানের শিকার হয়েছিল। নাগ এবং পক্ষিকুলীয় অনার্যরা, যারা এই আটবিক ভূমির স্বাভাবিক জাতক, তারা কৃষ্ণার্জুনের দ্বারা শান্ত মস্তিষ্কে, বিনাপরাধে নিহত হয়েছিল। এক্ষেত্রে তাঁরা আদৌ ক্ষাত্রধর্ম রক্ষা করেননি। স্বার্থের কারণে প্রকৃতি এবং প্রকৃতিজদের সংহারে তাঁরা অগ্নির বড়ো অপ-ব্যবহার করেছিলেন।
হরিদ্বার থেকে কুরুক্ষেত্র যাওয়া সে কারণে খুবই বিপদসঙ্কুল। মৈত্রেয়র উপদেশ মতো, একটি সার্থবাহদলের সঙ্গ নিয়েছি। এই সার্থবাহেরা কুরুক্ষেত্র হয়ে পঞ্চনদ পর্যন্ত যাবে তাদের পণ্য নিয়ে। তাদের কাছে নিজ পরিচয় গোপন রেখেছি। আমি একজন তীর্থযাত্রী পর্যটক-এরকমই তারা ধরে নিয়েছে। তারা সারাদিনমান রাস্তায় চলে, রাতে কোনো গ্রামপ্রান্তে আশ্রয় নিয়ে এক বৃহৎ অগ্নিকুণ্ড প্রজ্বলিত করে অবস্থান করে। তাদের সঙ্গে শস্ত্রধারী রক্ষকেরা আছে। তারা সারারাত প্রহরায় থাকে। যাতে দুষ্ট গ্রামীণ বা দস্যুরা সার্থবাহদের পণ্য অপহরণ করতে সাহসী না হয়। এইসব শস্ত্রধারী রক্ষীরা বিভিন্ন রাজ্যের রাজাদের বেতনভুক। এর মধ্যে কিছু রক্ষী আছে, যারা মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনুগত। তাদের অধিকাংশই ময়রাষ্ট্র বা মৈরাটের মানুষ। খাণ্ডবদাহের পর, ইন্দ্রপ্রস্থের প্রসার বৃদ্ধি হয়, তখন ইন্দ্রপ্রস্থের সীমান্তরেখার শিল্পীশ্রেষ্ঠ ময়ের প্রতি প্রীতিবশত মহারাজ যুধিষ্ঠির কৃষ্ণার্জুনের পরামর্শে এই সীমান্তবর্তী নগরটির নাম রাখেন ময়রাষ্ট্র।
সার্থবাহদের নিজেদের মধ্যে নানা বাক্যালাপে হস্তিনাপুর এবং ইন্দ্রপ্রস্থ সম্পর্কে নানা খবর পাই। ইন্দ্রপ্রস্থের ময়সভায় এখন আর পাণ্ডবেরা থাকেন না। যুদ্ধ জয়ের পরেই তাঁরা হস্তিনাপুরের প্রাচীন প্রাসাদে চলে গেছেন। ইন্দ্রপ্রস্থে এখন শুধু কিছু উচ্চপদস্থ অমাত্য, তাঁদের পরিবার নিয়ে বাস করছেন। অনিরুদ্ধের নাবালক পুত্র বজ্রকে সেস্থানের উত্তরাধিকারী মনোনীত করার কথা নাকি ভাবা হচ্ছে। উদ্ধব অবশ্য আমাকে অনেক সংবাদই বলেছিলেন। তবে যেহেতু তিনি যদুকুল ধ্বংস হবার পরপরই বেরিয়ে পড়েছিলেন, তাই পরবর্তী অনেক খবরই তাঁর জানা ছিল না।
ভীষ্মের তথা নিহত কৌরব ও পাণ্ডবপক্ষীয় যোদ্ধাদের অন্ত্যেষ্টির পরপরই যুধিষ্ঠির নাকি অত্যন্ত অবসাদ এবং বিষণ্ণতায় মুহ্যমান হয়ে পড়েছিলেন। দীর্ঘকালব্যাপী এক ভীষণ যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং বিপুল আত্মীয়-বান্ধব ক্ষয়কারী এই যুদ্ধের পর এরকম অবসাদ বিষণ্ণতা খুবই স্বাভাবিক। আবার এই বিপুল কর্মোদ্যোগের পর, অকস্মাৎ কর্মহীনতাও এই বিষণ্ণতাকে বাড়িয়ে তোলে। সেকারণে, ব্রাহ্মণ ও ঋষিগণ অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে উপদেশ দেন। ফলত যুদ্ধের এক বছরের মধ্যেই এই যজ্ঞকাণ্ড পাণ্ডব-ভ্রাতাদের পুনরায় কর্মোদ্যোগী করে তোলে।
মৈরাটের অরণ্যভূমি নিতান্তই সংকটসংকুল। যদিও এইস্থান যুধিষ্ঠিরের সাম্রাজ্যেরই অন্তর্গত। তথাপি এই অরণ্যেই খাণ্ডববিতাড়িত অনার্যকুল-সম্ভবেরা বসবাস করে থাকে। তাদের প্রধান বৃত্তি সার্থবাহ এবং পথচারীদের লুন্ঠন। তাদের শাসিত রাখা সাধারণ কর্ম নয়। এইসব দস্যুবৃত্তিধারীদের মধ্যে নাগকুল, পক্ষিকুল, কচ্ছপকুল প্রভৃতিদেরই প্রবলতা অধিক। আমাদের মণ্ডলে শস্ত্রধারী রক্ষী এবং সার্থবাহদের সংখ্যাধিক্য হওয়ার জন্যই আমরা এখনও পর্যন্ত আক্রান্ত হইনি।
নতুন নতুন সব সার্থবাহগোষ্ঠীরা পথে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছিল। তাদের কাছ থেকে নতুন সব ঘটনার সংবাদ পাচ্ছিলাম। দীর্ঘদিন প্রাসাদ, রাজ্য রাজধানীর আবেষ্টনীর বাইরে থেকে শুধুমাত্র জ্ঞান আর দর্শনের জগৎ নিয়েই ব্যস্ত ছিলাম। ব্যাবহারিক জগতের বর্তমান পরিব্যবস্থা বিষয়ে কোনো সম্যক ধারণা ছিল না। আমার অন্তরস্থ নাগরিক সত্তা এবং একদার মহামন্ত্রিত্ব সুলভ সংবাদ সংজ্ঞাত হবার বৃত্তি, একটু একটু করে পূর্বাবস্থায় ফিরে আসছিল। সার্থবাহদের কাছ থেকে নানা খবরের মধ্যে হস্তিনাপুর সংক্রান্ত সংবাদের বিষয়েই আমার অধিক আগ্রহ ছিল। সেইসব সংবাদ জ্ঞাত হয়ে বুঝলাম, পাণ্ডবেরা রাজ্যলাভ করলেও, দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, শাসনসংক্রান্ত দিক দিয়ে ভালো নয়। প্রধান সমস্যা যেটি বুঝলাম, তা হল, তাদের কোনো সুযোগ্য মন্ত্রী নেই। রাজা রাজ্য জয় করেন, শাসনক্রম প্রতিষ্ঠা করেন, মূল শাসনরীতি বিষয়ে মোটা দাগের একটা নির্দেশ সাধারণ্যে ঘোষণা করেন। এর পর তাঁর আর বিশেষ কোনো দায়িত্ব থাকে না। যদি অকস্মাৎ কোনো আক্রমণাদি ঘটে, তবে ব্যূহরক্ষিত হয়ে তিনি কিছু অস্ত্রাদি আস্ফালন করে থাকেন। রাজ্যের প্রশাসনিক ক্রম এবং শান্তিশৃঙ্খলা, রাজস্ব, শুল্ক এসব বিষয়ে যাবতীয় কর্তব্য-কর্ম করে থাকেন মন্ত্রী এবং অমাত্যরা। মহাযুদ্ধের পর কুরু-পাণ্ডবকুলে মন্ত্রী বা অমাত্য বলতে কেউ নেই। এ অবস্থায় সেই কুলেরই একজন হয়ে আর কী করেই বা নিজেকে বিযুক্ত রাখা যায়?
গত সন্ধ্যায় যখন আমরা কুরুক্ষেত্রের সন্নিকটস্থ একটি গ্রামে রাত্রিযাপন করছিলাম, তখন জনৈক বণিকের নিকট জানলাম যে যুদ্ধ শেষে হস্তিনাপুর রাজভবনে প্রবেশের সময় জনৈক চার্বাকপ্রধানকে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। তার অপরাধ সে নাকি দুর্যোধনের সখা ছিল এবং যুদ্ধে ব্যাপক লোকক্ষয়জনিত অবসাদে ক্ষিপ্ত হয়ে যুধিষ্ঠিরকে কিছু কটুকাটব্য করেছিল। সে কারণে, যুধিষ্ঠিরের কল্যাণাকাঙ্খী ব্রাহ্মণেরা তাকে পুড়িয়ে মেরেছে। ঘটনাটি আমার নিকট নিতান্ত বর্বরোচিত বলে বোধ হল। প্রথম কথা সে দুর্যোধনের সখা ছিল কিনা তা সঠিকভাবে প্রতিপন্ন না করেই তাকে আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। যুদ্ধে লোকক্ষয় বিষয়টি, রাষ্ট্রীয় বিচারে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখা হয়, ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে সেভাবে বিচার করা সম্ভব নাও হতে পারে। নগর ধর্মাধিকরণ, রাষ্ট্রিক এবং ব্যক্তিক দৃষ্টিকোণের সামঞ্জস্য তুল্যমূল্য করে তবেই অপরাধ সাব্যস্ত তথা দণ্ডবিধান করবেন। এক্ষেত্রে যুধিষ্ঠিরের সিংহাসনারোহণের শুরুতেই এমন একটি বিচারহীন বর্বর হত্যাকাণ্ড নিঃসন্দেহে ব্যাপক স্বৈরাচারী মনোভাবকে প্রকাশ করে। উপযুক্ত মন্ত্রী থাকলে ঘটনাটি কিছুতেই এমন ঘটত না বলে আমার বিশ্বাস।
চার্বাকরা এখন নিতান্ত নগণ্য। তাদের পুড়িয়ে মারার ঘটনা কিছু নতুন নয়। অধিকাংশ চার্বাকদেরই ব্রহ্মবিদ্যাভিমানী ব্রাহ্মণেরা আগুনে পুড়িয়েই মেরেছেন। তাদের শাস্ত্রও ধ্বংস করেছেন। তবু যেহেতু তাদের একটি লোকায়ত ভিত্তিভূমি আছে, তাই তাদের সম্পূর্ণ ধ্বংসসাধন সম্ভব হয়নি। তারা প্রচলিত বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য তত্ত্ব, অনুশাসন ইত্যাদিতে বিশ্বাসী নয়। ব্রহ্মবিদ্যা বিষয়ে তাদের তাচ্ছিল্য রীতিমত উগ্র। কিন্তু তারা স্বভাবত শান্তিপ্রিয়ই ছিল। ব্রাহ্মণেরা, তাদের বিবেচনায় ভণ্ড, ধূর্ত এবং প্রবঞ্চক। পারলৌকিক কৃত্যাদি বিষয়ে তারা ঘোর বিতার্কিক এবং সংশয়ী। তারা মনে করে ব্রাহ্মণেরা সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জকে প্রবঞ্চনা করে শুধু নিজস্ব ধন বৃদ্ধি করে থাকে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানকে চার্বাকেরা আদৌ শ্রদ্ধা বা বিশ্বাসের দৃষ্টিতে দেখে না।
এই চার্বাক সম্প্রদায়ের বিষয়ে আমার সন্ধিৎসা বহুকালের। এদেরকে ব্রাহ্মণেরা যতটা নিন্দা করে, এরা বাস্তবিকই ততটা নিন্দার পাত্র কিনা সে বিষয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তারা আত্মা, পরমাত্মা, পরলোক, পুনর্জন্ম ইত্যাদি বিষয়ে শুধু অবিশ্বাসীই নয়, এ নিয়ে তারা ব্রাহ্মণদের রীতিমতো ব্যঙ্গবিদ্রূপও করে থাকে। কিন্তু তবুও বলব, তাদের চিন্তনের একটা দার্শনিক ক্রমান্বয় আছে। তারা অত্যন্ত সুতার্কিক। ব্রাহ্মণেরা বলে থাকেন-তারা স্থূল ভোগবাদী, আচার-অনুষ্ঠান বর্জিত, দেব-ব্রাহ্মণে শ্রদ্ধাহীন এবং অজাচারী। পিতা বাদরায়ণির কাছ থেকে এদের বিষয়ে আমি অনেক কথাই শুনেছি। তিনি জনৈক জাবালির কথা আমাকে বলেছিলেন। এই জাবালি একদা চার্বাকদের দলপতি ছিলেন। তিনিই এদের ব্যাপকভাবে সংহত করেন এবং এক বেদবিরোধী ইহলোকসর্বস্ব দর্শন রচনা করেন। রাজন্যবর্গ ক্রমশ ব্রাহ্মণ্য পক্ষাশ্রয়ী হওয়ায়, ব্রাহ্মণেরা নিরন্তর তাদের উপর অত্যাচার চালিয়ে আসছেন। তাদেরকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা, তাদের শাস্ত্রগ্রন্থ ভস্মসাৎ করা ইত্যাদি ব্রাহ্মণদের প্রায় যজ্ঞকর্মের মতোই হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ নিয়ে প্রকৃতিপুঞ্জের মধ্যে ব্যাপক বিক্ষোভের উদ্ভব হলে রাজন্য ও ব্রাহ্মণেরা খানিকটা সংযত হয়েছেন। এক্ষেত্রে আমার নীতি হল, বলপ্রয়োগ না করে, মুক্তভাবে তাদের সঙ্গে যুক্তিসিদ্ধ বিতর্কের অবতারণা করা। বলপ্রয়োগ যুক্তিহীন মানুষের অস্ত্র। কিন্তু সেক্ষেত্রে ব্রাহ্মণপন্থীদের বিপদ এই যে তাঁরা কখনোই চার্বাকদের যুক্তির সম্মুখে দাঁড়াতে পারেন না।
দুর্যোধন এই চার্বাকদের নীতির গোপন পোষক ছিল। একারণেই ব্রাহ্মণেরা তাকে পরিত্যাগ করে যুধিষ্ঠিরের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়। এখন সার্থবাহের কথায় আমার মনে হচ্ছে, বিজয় উৎসবের প্রাক্কালে উৎসাহী ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় হস্তিনাপুরে আবার একটি ব্যাপক চার্বাক নিধন ঘটেছে। যুধিষ্ঠিরের জ্ঞাতসারে যদি এই ঘটনা ঘটে থাকে-তাহলে আমি তাকে অবশ্যই নীতি-কৌশলের বিষয়ে অল্পবুদ্ধি বলব। তার বোঝা উচিত ছিল, সমাজে দুর্যোধনের অনুসারী এবং হিতৈষী বহু মানুষ তথা সম্প্রদায় এখনও বিদ্যমান আছে। দুর্যোধন রাজা হিসেবে আদৌ কম জনপ্রিয় ছিল না। তারা সবাই দুর্যোধনের কল্যাণাকাঙ্খীই ছিল। তাদের বলপ্রয়োগ নয়, প্রীতির সাহায্যেই জয় করতে হবে।
দুর্যোধনের পতনের এও একটা অন্যতম কারণ, যে, সে ব্রাহ্মণদের সমর্থন হারিয়েছিল। একথা যে আমি বলছি তার অর্থ এই নয় যে দুর্যোধন এবং তার সহযোগী সবাই চার্বাক মতাবলম্বী ছিল এবং দেব-দ্বিজে তাদের কোনো শ্রদ্ধা ছিল না। না, দুর্যোধন কোনো ব্রাহ্মণের বৃত্তি লোপ করেনি, অকারণে তাঁদের সঙ্গে বিসংবাদ করেনি বা চার্বাকদের কাউকে কোনো উচ্চরাজপদে বসিয়ে ব্রাহ্মণদের অধিকার খর্ব করেনি। তথাপি সে ব্রাহ্মণদের প্রিয় হতে পারেনি। কারণ চার্বাকদের বিষয়ে তার পোষকতা ব্রাহ্মণেরা পছন্দ করেননি। যুধিষ্ঠির আমার ঔরসজাত, আমি আন্তরিকভাবেই তাদের জয় কামনা করতাম, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই, তথাপি বলব, দুর্যোধন অনেক সমদর্শী রাজা। এ বিষয়ে যুধিষ্ঠিরের চাইতে সে অনেক বেশি বাস্তববাদী। তাই এবম্বিধ হত্যাকাণ্ড, তার রাজত্বের সময় কখনো অনুষ্ঠিত হয়নি। বিরুদ্ধবাদীদের কাউকে হত্যা করে তাদের কন্ঠরোধ করা অধর্ম। রাজধর্মের কোনো সংহিতায় এর সমর্থন পাওয়া যায় না। ‘রাজা’ বা ‘রাজন্’ শব্দ দ্বারা তাঁকেই বোঝানো হয়ে থাকে যিনি প্রজা বা প্রকৃতিপুঞ্জকে রঞ্জন করেন। প্রজাঃ রঞ্জয়তি যঃ সঃ রাজা। কিন্তু সব প্রজাই যে রাজার অনুবর্তী হবে এমন কোনো পূর্বশর্ত নেই। দুর্যোধন এই তত্ত্ব সম্যক বুঝত।
