Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বিদুর – মিহির সেনগুপ্ত

    মিহির সেনগুপ্ত এক পাতা গল্প296 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    বিদুর – ৬

    ৬

    ন কালস্য প্রিযঃ কশ্চিন্ন দ্বেষ্য কুরুসোত্তম।
    ন মধ্যস্থঃ ক্কচিৎকালঃ সর্বং কালং প্রকর্ষতি।।

    -হে কুরুশ্রেষ্ঠ, কালের কেউ প্রিয় বা অপ্রিয় নেই, কাল কারও প্রতি উদাসীন নয়, কাল সকলকেই আকর্ষণ করে নিয়ে যায়। মহাভারতম্

    যজ্ঞদত্ত মহাযুদ্ধ সম্পর্কীয় নানা সংবাদ আমায় বলছেন। আমরা সান্ধ্য স্নিগ্ধ সমীরণে, সমন্তপঞ্চক হ্রদের তীরস্থ একটি বৃক্ষ মূলে একটি শিলাখণ্ডের উপর বসে আলাপ-আলোচনা করছি। যজ্ঞদত্ত বললেন, ভদ্র, যুদ্ধ শেষে যুধিষ্ঠির হস্তিনাপুরে অভিষিক্ত হবার পর একদিন আমি প্রাসাদে গিয়েছিলাম। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের আজ্ঞাপত্র নিয়ে আমি সেদিন অন্ধরাজাকে দর্শন করতে গিয়েছিলাম। কিন্তু ভদ্র, তাঁকে দেখে আমার হৃদয় বিদীর্ণ হয়ে গেল। আহা! শতপুত্র নিধনের সেই ভয়াবহ শোক এবং নৈরাশ্য যে তাঁকে কী পর্যন্ত বিমর্দিত করেছে, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। এই মর্দিত জীবন বহন করে অন্ধরাজার যেন জীবিত থাকার আর কোনো অর্থ হয় না। প্রাসাদের এক প্রায়ান্ধকার প্রকোষ্ঠে নির্বাক দুই বিষাদপ্রতিমা বসে আছেন। জীবনের কাছে যেন তাঁদের আর কিছু চাইবারও নেই পাবারও নেই। শুধুমাত্র অপেক্ষা কখন মৃত্যু এসে তাঁদের এই শোকক্লিষ্ট পার্থিব দেহ জুড়িয়ে শীতল করবে।

    একথা অবশ্য বলার প্রয়োজন হয় না। আমি প্রকৃতই তাঁদের বর্তমান অবস্থা অনুভব করতে পারছিলাম। তবু এই মহাশোকের অনুভব আমার শরীর-মনকে আরও পীড়িত, আরও ক্লিষ্ট করুক এরকম এক মর্ষকামনায় যজ্ঞদত্তকে বললাম, হে বণিক, আপনি আমায় যুদ্ধপরবর্তী সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণনা করুন। কীভাবে সেই রণশয্যাশায়ী কৌরব-পাণ্ডব-পক্ষীয়রা এবং তাদের মিত্রগণের আত্মজনেরা যুদ্ধক্ষেত্রে এসে, স্ব স্ব প্রিয়জনের শব খুঁজে বার করলেন এবং কীভাবেই বা তাঁদের শোক প্রকাশ করলেন? আপনার কথা শুনে বোধ হচ্ছে, আপনি নিশ্চয় এই সব ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন। ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারী ইত্যাদির বর্তমান অবস্থা কল্পনা করতে পারি। সেই মহাপ্লব সমুৎপন্নকালে যে ধ্বংসতাণ্ডব পৃথিবী কম্পিত করেছিল তাও সহজেই অনুমেয়। শুধু প্লবোত্তর শোকোচ্ছ্বাসের তীব্রতা ধারণায় আনতে পারছি না। আপনি সেই শোকোচ্ছ্বাসের বৃত্তান্ত আমায় বলুন, আমি সেই বৃত্তান্ত শ্রবণ দ্বারা নিজ শরীর, মন, আত্মাকে ক্লিষ্ট করতে চাই।

    যজ্ঞদত্ত বললেন, মিত্র আপনার প্রশ্ন শুনে বোধ হচ্ছে আপনি কুরু-পাণ্ডবকুলের কোনো পরবাসী আত্মজন হবেন। আপনার চক্ষু ভ্রূদ্বয়, বাগ-ব্যাকুলতা, নিজেকে শোক সমাচারে মর্দিত করার মর্ষকামনা ইত্যাদি দেখে আমি আরও যেন এ বিষয়ে নিঃসংশয় হচ্ছি। নচেৎ আপনি এই ঘোর যুদ্ধ পরবর্তী পর্যায়ের বীভৎস এবং করুণ তথ্যের বর্ণনা শুনতে প্রয়াসী হতেন না। কিন্তু সেই পরিবস্থা বর্ণনা করাও যেমন কষ্টসাধ্য, কারও পক্ষে শ্রবণ করাও এক অসামান্য ক্লেশ বিশেষ। ভদ্র আমি কৌরব বা পাণ্ডব কোনো কুলেরই নিকটজন নই। তথাপি সেই কাহিনি বর্ণনা আমার পক্ষে বড়োই ক্লেশকর।

    যজ্ঞদত্তের কথায় আমার হৃদয় বড়ো উদ্বেলিত হল। সে তো জানে না আমি কে, কেন আমি তার কাছে এই মর্মন্তুদ কাহিনি শোনার আকুলতা প্রকাশ করছি। তার পক্ষে এ ধারণা করাও সম্ভব নয় যে নিহত কৌরব-পাণ্ডবদের শোক বিষয়ের বর্ণনা আমার শরীর-মন-আত্মাকেই বা ক্লিষ্ট করবে কেন। অথচ এ তো আমাকে শুনতেই হবে। আমার আত্মা বলছে, এই মহাপ্লব এবং তজ্জনিত উৎপন্ন মহাশোক প্রত্যক্ষ না করে, এর প্রকৃত অংশভাগী না হয়ে তুমি যে অধর্ম করেছ, তার প্রায়শ্চিত্ত তোমাকে করতেই হবে। কেননা যতই তুমি নিজেকে এই ঘোর সংগ্রাম থেকে বিযুক্ত এবং নিরপেক্ষ মনে কর না কেন, তুমি এর দায়ভাগ এড়াতে পার না।

    বস্তুত যে ঘটনাকে অধর্ম জ্ঞান করে আমি নিজেকে নির্দোষ নিষ্কলুষ রাখার নিমিত্ত বিচ্ছিন্ন হলাম, সেই ঘটনার পূর্বশর্ত হিসেবে আমার কার্যাবলি কি কোনোভাবেই সম্পৃক্ত নয়? এরকম এক ভাবনা আমার মস্তিষ্কে ক্রিয়াশীল হল। আমি উপলব্ধি করলাম, সামূহিক এই দ্বন্দ্বের দায়ভাগ, রাষ্ট্রের একজন প্রধান পুরুষ হিসেবে, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত অভিমান বা নৈতিক বিচারের মানদণ্ডে এড়াতে গেলে অন্য এক অধর্মের উৎপত্তি হয়, এবং এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এই ব্যক্তিক নৈতিকতা সমাজের কোনো হিতই সাধন করতে পারে না। একজন রাষ্ট্রপুরুষ শুধুমাত্র ব্যক্তি হিসেবেই নয়, সমষ্টি হিসেবেই সমাজের কাছে দায়বদ্ধ। অতএব আমি যজ্ঞদত্তকে বলি-বণিক, আমি জানি, সেই মর্মন্তুদ কাহিনি বর্ণন বা শ্রবণ কত ক্লেশকর। বিশেষ, আপনি যদি আমার পরিচয় জানতেন তাহলে বুঝতেন, তা আমার পক্ষে আরও তীব্র, আরও অসহনীয় দাহ আর বেদনার জন্ম দেবে। কিন্তু ভদ্র, আমি সেই ক্লেশ, সেই শোকতাপ দাহ নিয়ে, আমার এই দেহমন তথা অনুভূতিকে দগ্ধ করতে চাই। আমি চাই, এই মহাধ্বংসের দায়ভাগের অংশী হতে। এই মহা অধর্মের ক্লিন্নতা আমাকেও আচ্ছন্ন করুক, এর দাহ আমাকে দগ্ধ করুক, এর ক্ষোভ আমাকে বিমর্ষ করুক এবং এর শোকে যেন আমি নিতান্ত বিষণ্ণ হই, এ আমার ঐকান্তিক কামনা। ভদ্র, আমি কুরুকুল জাত, কৌরব মহামন্ত্রী বিদুর। এই মহা উপপ্লব কালে আমি, নিতান্ত নির্বেদে, প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছিলাম। তার সমূহ কারণও ছিল, কিন্তু কারণ ছিল বলেই সেই মহার্ণব উচ্ছ্বাসের তরঙ্গ থেকে নিজেকে বিযুক্ত রাখা বোধকরি আমার নিতান্ত অধর্ম এবং অকর্তব্যই হয়েছে। তাই আপনার নিকট আমার এই আবেদন, আপনি সমুদায় বৃত্তান্ত বর্ণনা করুন।

    এভাবে অনুরুদ্ধ হয়ে, যজ্ঞদত্ত সাতিশয় বিস্মিত এবং উচ্ছ্বসিত হলেন। তিনি উঠে এসে আমার পাদবন্দনা করে বললেন, হে সুজাত, আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি যে পরম লোকহিতৈষক, পরম প্রাজ্ঞ, মহাত্মা বিদুরের সাক্ষাৎ আমি আজ লাভ করেছি। হে মহাজ্ঞান তাপস, অজ্ঞানতা এবং অপরিচয়জনিত প্রমাদে যদি আপনার প্রতি কোনো তাচ্ছিল্য বা অসংস্কৃত আচরণ করে থাকি, তবে তার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী। আমি স্বভাবগতভাবেই ব্যবসায়জীবীর ব্যবহারধর্মে অভ্যস্ত। আমার আচরণ তথা বচন দ্রুত। একারণে আমি আপনার নিকট মার্জনাপ্রার্থী।

    তার বিনয়নম্র বচন এবং শ্রদ্ধার প্রকাশ দেখে আমি সাতিশয় অস্বস্তি বোধ করতে লাগলাম। ক্ষত্রিয় ব্রাহ্মণ অনুশাসিত সমাজে আমা হেন মনুষ্য একদা শুধুমাত্র তত্ত্বজ্ঞান এবং পিতা বাদরায়ণির প্রভাবে কুরুকুলে প্রবৃদ্ধ পদমর্যাদা লাভে ঋদ্ধ হয়েছিল। আমার সেই ঋদ্ধিকালে পক্ষে ও বিপক্ষে বিতণ্ডার শেষ ছিল না। কিন্তু যেহেতু সেই সময় এক বিমিশ্র ক্রান্তিকালের প্রদোষ, তাই সমাজে আমার প্রতিষ্ঠার বিষয়ে স্বপক্ষ যথেষ্ট শক্তিমান ছিল। সূত হওয়া সত্ত্বেও, তাই আমার মহামন্ত্রী হতে কোনো ব্যাপক বিঘ্ন ঘটেনি। তারপর দীর্ঘকাল নানা কৈতববাদ, নাগরিক বৃত্তির অনুশীলন, রাজ্য রাজনীতির আবর্তে থাকার স্বাভাবিক আভিজাত্য, এইসব কারণে এক উপচ্ছায়ার জগতের অধিবাসী হয়ে পড়েছিলাম আমি। তখন এতাদৃশ বিনয় বা শীলতা আমার কাছে কিছুমাত্র অস্বস্তির কারণ হত না। কিন্তু আমার সেইসব নাগরিক অভ্যাস, এই সুদীর্ঘকালীন প্রব্রজ্যায় একান্তভাবেই নিঃশেষিত। তাই যজ্ঞদত্তের এবম্বিধ শিষ্টাচারে আমার অস্বস্তি। ফলত আমি খুব স্বাভাবিকভাবে যজ্ঞদত্তের শিষ্টাচারের প্রথাসম্মত প্রত্যভিবাদন করতে পারলাম না। আমি বললাম, বণিক, বর্তমানে আমি একজন প্রব্রাজক মাত্র। দীর্ঘকালের অনভ্যাসবশত নাগরিক শিষ্টাচারে বিগতকৃত্য। তাই আপনার এই প্রথাসম্মত সাতিশয় শীলিত অভ্যর্থনার যথোচিত প্রতিসভ্যাচারে অপারঙ্গম আমি নিতান্ত লজ্জিত। আমি দীর্ঘকাল শুধুমাত্র জৈবিক-ধর্ম এবং প্রাকৃত জীবন-যাপনে অভ্যস্ত থাকায় এরূপ অনাগরিক ব্যবহারে গ্রাম্যতা প্রযুক্ত হয়েছি। একারণ মার্জনাপ্রার্থী। অবশ্য আমার বিশ্বাস, গ্রাম্য সরলতা এবং পারস্পরিক মতবিনিময়ের সহজ গ্রামীণ পদ্ধতি একের অন্যের নিকট বোধগম্য হওয়ার একটি উৎকৃষ্ট উপায়। সেখানে কোনোরূপ কপটতা দৃষ্ট হয় না। সে যা হউক, আপনাকে আমি যে আখ্যান বিবৃত করতে অনুরোধ করেছি, সে বিষয়ে যত্নশীল হোন, এই প্রার্থনা। হস্তিনাপুরের মহামন্ত্রী বিদুর অবশ্যই এমত প্রার্থনা করতেন না। কিন্তু প্রব্রাজক বিদুরের ব্যবহারবিশ্ব আমূল পরিবর্তিত। সে এখন একজন বিনীত শ্রোতা মাত্র।

    যজ্ঞদত্ত বললেন, মহাত্মন্, যখন যুদ্ধ শেষে, কৌরব-পাণ্ডবকুলের রমণীগণের আত্মজন দর্শনের সিদ্ধান্ত হল, তখন অন্ধরাজা রথ সহযোগে কুরুপত্নীগণ সমভিব্যাহারে হস্তিনাপুর থেকে নিষ্ক্রান্ত হলেন। একবস্ত্রা সদ্যবিধবা কুরুকুল রমণীরা সরোদনে, স্ব স্ব পতি পুত্র পিতা ভ্রাতাদের রণপাতিত নশ্বর দেহ দর্শনার্থ কুরুক্ষেত্র অভিমুখে ধাবমানা হলেন। কুরুকুল রমণীগণ ছাড়াও হস্তিনাপুর এবং তৎসন্নিকটবর্তী অঞ্চলের

    যোদ্ধৃবর্গের রমণীগণও তাঁদের স্বজনদের দেহ অন্বেষণে উন্মাদিনীর ন্যায় সেই মহাশবক্ষেত্রের অভিমুখে যাত্রা করলেন। কুরুরমণীগণের অনুগামিনী হলেন সেইসব রাজ-কুলকামিনীগণও, যাঁদের পতিগণ, কৌরব বা পাণ্ডব পক্ষ অবলম্বন করে এই মহারণে লিপ্ত হয়ে বীরশয্যা লাভ করেছেন। তাঁরা তাঁদের পত্নীগণকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে নানা শিবিরে স্থান দিয়েছিলেন। এইসব বিধবাকুলও এবং হস্তিনাপুরের তথা অন্যান্য রাজ্যের রাজভৃত্য, অমাত্য ইত্যকার সমুদায়জনেরা সবাই কুরুক্ষেত্র অভিমুখে গমনরত সেই অন্ধরাজা, গান্ধারী, কুন্তী প্রমুখদের সঙ্গে সরোদনে যাত্রা করল। তাদের সমবেত ক্রন্দনে যেন সমগ্র বসুন্ধরা কম্পিত হতে লাগল। আকাশ, বাতাস, নদী-সরোবর, বন-উপবন সর্বত্র মথিত করে যেন শুধু একটানা এক শোক-প্রকম্প চরাচরকে ব্যাপ্ত করে ফেলল।

    যেসব অবরোধবাসিনী কৌরবললনাদের দর্শন সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জ কোনোদিন স্বপ্নেও চিন্তা করেনি, তাঁরা এখন সর্বসমক্ষে, সাধারণ দাসদাসী, কৃষিবল রমণী, নর্তকী এবং বেশ্যাগণের সমভিব্যাহারে নিতান্ত প্রাকৃতজনের ন্যায় শোক প্রকাশ করতে লাগলেন। বিপুল এই জনতা যখন কুরুক্ষেত্রের মহারণস্থলে উপস্থিত হল, তখন তাদের মধ্য থেকে শার্দুলতাড়িত কুরঙ্গিনীদের মতো কৌরব এবং পাণ্ডব রমণীরা বিস্রস্তবসন, আকুল কেশকলাপ এবং দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য অবস্থায় রণশয্যাশায়ী বীরগণের দিকে ধাবিতা হলেন। রণক্ষেত্র তখন পূতিগন্ধময় অজস্র শব সমাকীর্ণ। সহস্র সহস্র শকুনি গৃধিনী, শিবা এবং কুক্কুরের চারণভূমি। কৌরব রমণীগণের করুণ আর্তনাদ এবং স্ব স্ব পতি, পুত্র, ভ্রাতা ইত্যাদিদের শব অন্বেষণ যে হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা করেছিল তার বর্ণনা আমাকে করতে বলবেন না। প্রকৃতপক্ষে, এই যুদ্ধ, পূর্ববর্তী যাবতীয় যুদ্ধ অপেক্ষা সহস্রগুণ লোকক্ষয়কারী এবং নিষ্ঠুর ছিল। এত বিচিত্র অস্ত্র ব্যবহারও ইতঃপূর্বে কখনো দৃষ্ট হয়নি বা এত অধর্মাচারও বোধ করি মানুষ কখনো আর দেখেনি।

    আমি আমার অগ্রজ ধৃতরাষ্ট্র এবং তাঁর প্রধানা মহিষী গান্ধারী আর পাণ্ডবজননী কুন্তীর বিষয় যজ্ঞদত্তের কাছে জিজ্ঞাসা করলাম। স্বেচ্ছান্ধা গান্ধারী তাঁর পুত্র দুর্যোধন বা দুঃশাসনকে কোনোদিন চাক্ষুষ করেননি। আমার জানার অভীপ্সা হচ্ছিল এই প্রগাঢ় দুঃখ কালেও গান্ধারকন্যা বস্ত্রবন্ধনে তাঁর চক্ষুর্দ্বয় আবদ্ধ রেখেছিলেন অথবা শোকাতিশয্যে তাঁর চিরপোষিত অভিমান পরিত্যাগ করে সেই বন্ধন ছিন্ন করেছিলেন। আমার এও জানার আগ্রহ ছিল যে শোকাবেগের আধিক্যে কুন্তী, কর্ণের প্রকৃত পরিচয় সর্বসমক্ষে বিবৃত করেছিলেন কিনা।

    যজ্ঞদত্ত জানালেন, হে প্রাজ্ঞ, আপনার অনুমান সঠিক। গান্ধারতনয়া, দুর্যোধনজননী কুরুক্ষেত্র রণস্থলে এসে যখনই রথ থেকে অবতরণ করলেন, তৎক্ষণাৎ, তাঁর চক্ষুবন্ধন ছিন্ন করে-হা পুত্র, হা পুত্র, বলে দুর্যোধনাদির অন্বেষণে ধাবমানা হলেন। দুর্যোধনপত্নী ভানুমতী তখন মহানায়ক দুর্যোধনের বক্ষোপরি আকুলিবিকুলি করছিলেন। তিনিই গান্ধারীকে আহ্বান করে বললেন, মাতঃ, আমি ভানুমতী, আর এই তোমার সেই দুর্দমনীয় পুত্র দুর্যোধন। জন্মাবধি তুমি এর মুখ দেখনি। দেখো, তোমার এই পুত্র কতই না রূপবান আর তাঁর আকৃতি কতই বীরত্বব্যঞ্জক। মহাত্মন্, গান্ধারী যেন তখন এক নতুন জীবন পেয়েছেন। চক্ষুর দৃষ্টির কী মহিমা। তিনি যেন জাদুমন্ত্রপাতে আচ্ছন্ন ব্যক্তির মতো আচরণ করতে লাগলেন তখন। তাঁর দৃষ্টির আচ্ছন্নতা মুক্ত হলে তিনি অবাক দৃষ্টিতে তাঁর সন্ততি এবং অন্যান্য পরিজনদের দর্শন করতে লাগলেন। জীবিত থাকাকালীন যাদের মুখ তিনি অবলোকন করেননি, আজ তাদেরই মৃতদেহের পরিচয়, অন্যজনেদের কাছ থেকে তাঁকে জানতে হচ্ছে যে, এই তোমার প্রথম পুত্র, এই দ্বিতীয়, এই তোমার জামাতা, এই রুদ্যমানা তোমার কন্যা দুঃশলা।

    যজ্ঞদত্ত এরূপ বললে, আমার স্মৃতি আলোড়িত হল। আমি যেন পুনর্বার গান্ধারীর পতিগৃহে আসার দিনের দৃশ্য প্রত্যক্ষ করলাম। হস্তিনাপুরের অবরোধে মধ্যে এসে যবনী প্রহরীবেষ্টিত একটি শিবিকা থামল। সেই শিবিকা থেকে অবতরণ করলেন দুই নারী। দুজনই অপরূপা। একজনের চক্ষু চীনাংশুকে আবদ্ধ, অপরজন তাঁর হস্তধারণ করে অন্দরে প্রবেশোন্মুখ। ক্রমশ জানলাম, তাঁদের একজন, যাঁর চক্ষু বন্ধনযুক্ত, তিনি ধৃতরাষ্ট্রপত্নী গান্ধারী, অপরজন, তাঁর নিত্য সহচারিকা, দাসী, ধাত্রী, মাতৃকা ইব। তিনি তুলনায় বর্ষীয়সী, কিন্তু সুভগা, সুস্তনী, সুনিতম্বা, সুমধ্যমা। গান্ধারীর সমগ্র শৈশব, কৈশোর এবং যৌবন তিনিই তাঁকে একমাত্র সাহচর্য দান করেছেন। হস্তিনাপুরেই তাঁর অতঃপরের স্থিতি নির্ধারিত হয়েছিল। নির্ধারিত হয়েছিল আরও একজনের স্থিতি। তিনি গান্ধারীভ্রাতা শকুনি। এঁরা দুইজন গান্ধারীর সঙ্গে হস্তিনাপুরে এসেছিলেন। তাঁরা আর কোনোদিনই গান্ধারে ফিরে যাননি।

    আমার খুবই আশ্চর্য বোধ হয়েছিল সেদিন। আমি ভেবেছিলাম গান্ধারী অসামান্যা পতিপরায়ণা, তাই, অন্ধ স্বামীকে পাছে অতিক্রম করে বসেন, সে কারণে স্বেচ্ছান্ধা। তখন আমার বয়স নিতান্ত নবীন। মানব চরিত্রের গুহাহিত ভাববিক্রিয়া সম্পর্কে কিছুমাত্র জ্ঞান নেই। তাই এমত এক আদর্শায়িত সিদ্ধান্তে আপ্লুত হয়েছিলাম। পরে জেনেছি, সে তাঁর একান্ত অভিমানের কারণে। তাঁকে এক ঘৃণ্য প্রবঞ্চনার শিকার হতে হয়েছিল। আমার জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম তাঁকে ধৃতরাষ্ট্র বধুরূপে সম্বন্ধ নিরূপণকালে বরের অন্ধত্ব বিষয়ে কন্যাপক্ষকে আভাসমাত্র দেননি, যেমন অম্বা, অম্বিকা, অম্বালিকাকে স্বয়ংবরসভা থেকে আনয়নকালে বিচিত্রবীর্যের নির্বীর্যতার বিষয়ে তাঁদের কিছু বলেননি এবং সেইসব রমণীরা প্রকৃতপক্ষে ব্যর্থকামাই হয়েছিলেন। আমি লক্ষ করেছি, জ্যেষ্ঠতাত যে যে রমণীকে এই কুলে আনয়ন করেছেন, তাঁরা সবাই দুঃখই পেয়েছেন। সহচরী ধাত্রিকা গূঢ় পুরুষের কাছে ধৃতরাষ্ট্রের অন্ধতা বিষয়ে জ্ঞাত হয়েছিলেন এবং গান্ধারীকে সমুদায় জানিয়ে বলেছিলেন-মন্দভাগ্যা। গান্ধারীর পিতা রাজা সুবল অবশ্য এ তথ্য জেনেছিলেন। শকুনি জেনেছেন পরে। সুবল কুরুবংশের বিক্রমের কথা চিন্তা করে ভীষ্মকে অতিক্রম করতে সাহসী হননি। শকুনি এ তথ্য জ্ঞাত হবার পর, ভীষণ প্রতিশোধপরায়ণ এবং অভিমানী হয়েছিলেন। তাই তিনি আর গান্ধারে প্রত্যাবর্তন করেননি, তাঁর জীবৎকালে। ভগিনীকে তিনি যথার্থ স্নেহ করতেন অথবা স্বীয় কুলমর্যাদাকে, এ বিষয়ে আমার ধন্দ ছিল। পরে তার নিরসন হয়েছিল। সে যা হোক, ওই ধাত্রিকার সাথে সুবলপুত্রের যে নিয়মিত সম্পর্ক ছিল, তা কুরুমহামন্ত্রী এই বিদুরের দৃষ্টি এড়ায়নি। কেননা, অবরোধের বিষয়েও গূঢ় সমাচার রাখা মহামন্ত্রীর দায়িত্ব। গূঢ় সমাচারে আমি তাঁদের নর্মলীলা বিষয়ে যেমন অবগত ছিলাম, তেমনি তাঁদের নিরন্তর ষড়যন্ত্র বিষয়েও। নর্মলীলা বিষয়ে আমার কিছু বক্তব্য বা করণীয় নেই, কারণ সে তাঁদের ব্যক্তিগত নির্বন্ধ। বিদেশ বিভুঁইয়ে প্রোষিতপত্নীক পুরুষ অথবা প্রোষিতভর্তৃকা নারী ঋষ্যশৃঙ্গ বা তপস্বিনী শবরী হয়ে কাল কাটাবে এমত বিধির অনুসারী আমি অবশ্য নই। কিন্তু ষড়যন্ত্র বিষয়ে উদাসীন থাকা মহামন্ত্রী হিসেবে আমার পক্ষে নিতান্ত অধর্ম। ভীষ্মকে একথা জানাতে, তিনি বলেছিলেন, সুবলপুত্রের প্রভাব বিষয়ে জ্ঞাত হয়ে, ব্যবস্থা অবলম্বন করবে। হঠকারিতা কোরো না। কিন্তু গূঢ় সংবাদে সংবেদ্য হয়ে ভীত হলাম। সুবলপুত্র হস্তিনাপুর প্রাসাদে নিতান্ত ক্ষীণবল নন। তাই এ নিয়ে কোনোদিন কোনো রাষ্ট্রীয় উপায় অবলম্বন করা মহামন্ত্রী হিসেবে আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। জ্যেষ্ঠতাত, ব্যবহারিক অভিজ্ঞতায় যদিও অসম্ভব ঋদ্ধ পুরুষ, তথাপি, শকুনির হস্তিনাপুরে অবস্থিতি তাঁর অপছন্দ হলেও, এর কোনো প্রতিবিধান করতে পারেননি। তবে গান্ধার তনয়া, তাঁর ভ্রাতাবিষয়ে একসময়ে মোহমুক্তা হয়েছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁর সঙ্গে আর সাক্ষাৎকার করতেন না।

    কিন্তু কী আশ্চর্য মানুষের মনের গতি! যিনি একদা অন্ধপতির সঙ্গে সম্বন্ধ হেতু অভিমানে স্বেচ্ছান্ধতা বরণ করে নিয়েছিলেন, তিনিই একসময় সেই স্বামী এবং তাঁর কুলের প্রতি মোহযুক্তা হলেন। শকুনি ভগিনীপতির জন্য অথবা স্বীয় কুলের মর্যাদা রক্ষায়, এক অর্থে তাঁর জীবন অকৃতার্থ করলেন। গান্ধার রাজ্যের রাজপদ, যা তাঁর স্বভাবতই প্রাপ্য ছিল, ভ্রূক্ষেপ করলেন না। গার্হস্থ্য জীবনের যে মধুর আস্বাদ, তা পরিত্যাগ করলেন এবং সজ্ঞানে কুরুসভার সমগ্র বৃদ্ধ, আচার্য এবং সভাসদগণের নিকট নিয়ত ধিক্কৃত হলেন।

    কিন্তু যাঁর প্রবঞ্চিত জীবনের জন্য তাঁকে এইসব সহ্য করতে হল, তিনি কি তাঁর প্রতি আদৌ প্রীতিপরায়ণ বা কৃতজ্ঞ ছিলেন? না। কেননা, গান্ধারী যেন, নিজের অজান্তেই কখন এই কুরুকুলের সঙ্গে অচ্ছেদ্য-বন্ধনে বাঁধা পড়েছিলেন। সুবলতনয় শকুনির পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। ভগিনী এবং কুলের অসম্মান, সারা জীবন বুকে বহন করে, কপট কৌশলে গোটা কুরুকুল ধ্বংস করলেন তিনি, নিজেকে সহ। এমনকী এই যজ্ঞে তার একমাত্র সন্তান উলুককেও তিনি উৎসর্গ করলেন। কুলমর্যাদার রক্ষাকল্পে কী ভয়ানক প্রতিহিংসা।

    আমার বরাবরই মনে হয়েছে, শকুনি যেন কোনো উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্যই হস্তিনাপুরে স্থায়ী আসন নিয়েছেন। কিন্তু এ বিষয়ে কোনোদিনই আমি পরিষ্কারভাবে কাউকে কিছু বলিনি। কিন্তু আমার বিচার, সর্বশেষ এই যে, তিনি প্রকৃত অর্থেই কুচক্রী। ভগিনীর প্রতি তার যত স্নেহই থাকুক, শুধুমাত্র সেকারণেই তিনি দুর্যোধনাদিকে কুমন্ত্রণা দান করেননি। তাঁর বংশগত গরিমা নষ্ট হওয়ার জন্যই হস্তিনাপুরে এসে তিনি চক্রান্তের জাল বুনেছিলেন। গান্ধারী তাঁর এই স্বভাব প্রকৃতই জানতেন। তাই তাঁকে কোনোদিন তিনি সহ্য করেননি বা উৎসাহ দেননি।

    যজ্ঞদত্ত বললেন, মহাত্মন্, সেই বিস্তীর্ণ শবাকুল প্রান্তরে, তখন চতুর্দিক রণিত করে হা, হা চিৎকার আর ক্রন্দনের ধ্বনি। সহস্র সহস্র একবস্ত্রা সদ্যবিধবা কৌরব নারীরা স্ব স্ব পতি, পুত্র, ভ্রাতা, পিতার ছিন্নভিন্ন দেহ নিয়ে বিলাপ করছেন। কেউ বা শকুনি, গৃধিনীদের বিতাড়নে প্রয়াস পাচ্ছেন। এঁদের মধ্যে একজনই শুধু শুষ্ক চক্ষু, নির্বাক। তিনি গান্ধারী। অক্ষিপট্ট উন্মোচনের পর স্বাভাবিক কারণেই তিনি বহুক্ষণ কিছুই দেখতে পাননি। পরে ধীরে ধীরে সব দৃশ্য তাঁর চক্ষুর সম্মুখে প্রতিভাত হতে থাকলে, তিনি অবাক বিস্ময়ে সব দেখতে লাগলেন। এই রণশয্যাশায়ী বিচ্ছিন্ন-অঙ্গ যোদ্ধাগণ, কেউ তাঁর পুত্র, কেউ ভ্রাতা, কেউ বা জামাতা। কিন্তু সর্বোপরি এই অযুত শবরাশির সকলেই মনুষ্য, তাঁরা এই বিশ্বেরই সন্তান। কী অপূর্ব এই বিশ্ব, এই প্রকৃতি। কি অপূর্ব-ই না তার বর্ণ, ছন্দ। তিনি অকস্মাৎ যেন তাঁর শৈশবের দিনগুলোতে ফিরে গেলেন। সেই কদাচিৎ শস্পাচ্ছাদিত, গান্ধারের শৈলময় ভূমি, বিস্তীর্ণ ঊষর প্রান্তর অথবা শ্যামল দ্রাক্ষাকুঞ্জ। তাঁর যেন নিজের প্রতি করুণা হল এই অনুতাপ করে, যে এতকাল কি তুচ্ছ কারণেই না তাঁর চক্ষুর্দ্বয় তিনি আবদ্ধ রেখেছিলেন!

    মহাশয়, গান্ধারীর যেন মনে হল, এই মনুষ্যকুল সকলেই তাঁর অপেক্ষাও অল্পধী। তিনি আত্মাভিমানে প্রমদা-জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় ব্যয়িত করছেন স্বেচ্ছান্ধতায়, আর এই বিপুল সংখ্যক মনুষ্য সন্তানেরা যারা চক্ষুষ্মান, যারা তাদের জীবনের প্রতিটি পল-অনুপল ধরে এই মহদবিশ্ব-প্রকৃতিকে দেখেছে, তারা কিনা সাধনা করল মহাধ্বংসের। কার জন্য তিনি রোদন করবেন? এদের কাউকেই তো তিনি চেনেন না, জানেন না। শুধুমাত্র কন্ঠস্বর এবং স্পর্শে যাঁদের তিনি অনুভব করতেন, তাঁর সেই পুত্রগণ তো এখন নির্বাক এবং স্পর্শজ্ঞান রহিত।

    কৃষ্ণবাসুদেব তখন বিজয়ী পাণ্ডব ভ্রাতাদের সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য অবলোকন করছেন। যুধিষ্ঠিরাদি ভ্রাতারা সবাই এসে গান্ধারীকে প্রণাম করে দাঁড়ালে, সেই মহীয়সী জিজ্ঞাসা করলেন, ভীম কে? বাসুদেবকৃষ্ণই বা কে? আমি তাঁদের দেখতে ইচ্ছা করি। ভীম এবং কৃষ্ণ দেবীর সন্নিকটে এসে প্রণত হলেন, তিনি ভীমকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ভীম, তুমি মহাবলশালী। আমার পুত্র দুর্যোধন এবং দুঃশাসন তোমাদের উপর বহুবিধ অন্যায় আচরণ করেছিল। তারা তাদের অন্যায়ের মূল্য দিয়েছে। কিন্তু আমাদের শত পুত্রের সকলেই কি সমান অপরাধী ছিল? ভীম অপরাধীর মতো হেঁট মুখে দাঁড়িয়ে থাকলে, বাসুদেবকৃষ্ণ বললেন, দেবি, আপনি প্রসন্ন হোন। ভীম আপনার ক্রোধের যোগ্য নন। দ্যূতসভায় যাজ্ঞসেনীর প্রতি আপনার সন্তানেরা যে আচরণ করেছিলেন, তারই প্রতিফলন এই দুঃখজনক যুদ্ধ আর মৃত্যু। ভীম ক্ষাত্রধর্ম পালন করেছেন মাত্র।

    বাসুদেবকৃষ্ণ একথা বললে, গান্ধারী পুনরায় এই কুরুক্ষেত্রের চতুষ্পার্শস্থ বৃক্ষাদি, মস্তকোপরি সুনীল আকাশ, সমন্তপঞ্চক হ্রদের নির্মল জলরাশি ইত্যাদি নির্নিমেষে অবলোকন করতে লাগলেন। তাঁর দৃষ্টি ক্রমশ সেই প্রকৃতির রেখা ধরে আবার শায়িত শবরাশির উপর এসে থামল। তখন তাঁর চক্ষে এক অসামান্য দ্যুতি, যেন মেঘের মধ্য থেকে সৌদামিনীর ঝলক। আবার সেই সঙ্গে মুহূর্তে যেন এক বিপুল বিষণ্ণতা, নৈরাশ্য, অবিশ্বাস ইত্যাদি যাবতীয় অভিব্যক্তির মুহুর্মুহু প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি একবার ভীম, একবার কৃষ্ণ বাসুদেব, একবার শায়িত শবরাশি এবং একবার অনন্ত প্রাকৃত ব্রহ্মাণ্ডের দিকে দৃষ্টিপাত করতে লাগলেন। মহাত্মন্, আমি শুনেছি, এই গান্ধারনন্দিনী, তাঁর কৈশোরিক কালে, অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রের পত্নী হয়ে হস্তিনাপুরে এসেছিলেন। তিনি পথিমধ্যে তাঁর ধাত্রী অম্বার নিকট ভাবীপতির অন্ধত্ব বিষয়ে অবগত হয়ে, স্বেচ্ছায় চীনাংশুক দ্বারা আপন চক্ষুদুটি আবৃত করেন। তখন সম্ভবত তিনি একাদশ কি দ্বাদশবর্ষীয়া কিশোরী। তদবধি, আপনি অবশ্যই অবগত আছেন, তিনি কদাপি সেই চীনাংশুক বন্ধন অপসৃত করেননি। এই দীর্ঘকাল স্বেচ্ছান্ধা থাকার পর, কুরুক্ষেত্রের এই বীভৎস কাণ্ড প্রত্যক্ষের জন্য তিনি সেই চীনাংশুক মোচন করলেন। আপনি জ্ঞানী, মহাপ্রাজ্ঞ। মনুষ্যচরিত্র বা শারীরিক নিয়ম বিষয়ে আপনার ধারণা অগাধ। এমতাবস্থায়, সেই মহীয়সীর কী জাতীয় প্রতিক্রিয়া সম্ভব, আপনি বিচার করুন। তিনি এইভাবে চারিদিক অবলোকন করার পর, তীব্র দৃষ্টিতে বাসুদেবকৃষ্ণের দিকে অক্ষিপাত করে বললেন, তবে তুমিই হলে কৃষ্ণ? তোমাকেই সকলে অচ্যুত বলে থাকে? তুমিই তাহলে বর্তমানে বাসুদেবের তাবৎ চিহ্ন ধারণ করে পুরুষোত্তম কৃষ্ণ হয়েছ, এবং এই বিপুল শবরাশিই কি তোমার বাসুদেবত্ব, অচ্যুতত্ব এবং পুরুষোত্তমত্ব লাভের বলি?

    মহাত্মন্, গান্ধারী এক নিশ্বাসে এই প্রশ্নসমূহ উচ্চারণ করলে, বাসুদেবকৃষ্ণ অধোবদন হলেন। মহাশয়, এই বোধকরি তাঁর প্রথম অধোবদন হওয়া। সেই দীপ্তিময়ী রমণী তখন তাঁকে সায়কের মতো প্রশ্নের পর প্রশ্নে বিদ্ধ করছেন। গান্ধারী বললেন, কৃষ্ণ, তুমিই এই মারণযজ্ঞের হোতা। আমার দৃষ্টি ছিল না, আমি ছিলাম স্বেচ্ছান্ধা। কিন্তু সঞ্জয়প্রমুখাৎ আমি সর্বসংবাদই জ্ঞাত ছিলাম। তোমার সমগ্র বিষয়ই আমি চিন্তা করেছি। কিন্তু অবরোধবাসিনী ক্ষত্রিয়বধূ হয়ে আমার উপায় ছিল না কোনো প্রতিবাদ করি। আজ যখন এই মহাধ্বংস সেই সুযোগ উপস্থিত করেছে, আজ যখন কুলকামিনীরা সবাই রণক্ষেত্রে পতি, পুত্র, পিতা, ভ্রাতার জন্য শোকপ্রকাশে আসতে অন্তত সক্ষম হয়েছে, তখন তুমি আমার সেই প্রতিবাদ শ্রবণ করো। তুমি কোন ধর্মের কথা বলছ কৃষ্ণ? ভীমের ক্ষাত্রধর্ম পালন কী? ক্ষাত্রধর্মই বা কী? ক্ষত্রিয়ই বা কে? এই ধর্মের রচয়িতা তো তুমি আর অপর এক কৃষ্ণ-কৃষ্ণদ্বৈপায়ন। তাঁর তবু ধর্মবোধ, মানবিকতাবোধ, নীতিবোধ কিছু আছে। কিন্তু তুমি? তোমার ধর্ম, তোমার নীতি কী কৃষ্ণ? তুমি তো এক হৃদয়হীন যন্ত্র। তুমি তোমার বাসুদেবত্ব, পুরুষোত্তমত্ব লাভের জন্য যাবতীয় সংহিতা তৈরি করিয়েছ। একারণেই তুমি হত্যা করেছ, শিশুপাল, পৌণ্ড্রক বাসুদেব বা জরাসন্ধকে। আমি স্বীকার করি তোমার ক্ষমতা অসীম, আর সেকারণেই বলছি, তুমি কি পারতে না এই যুদ্ধ বন্ধ করতে? পাণ্ডবেরা না হয় নাই পেত রাজ্য। তাঁরা পঞ্চভ্রাতা না হয় অন্য উৎপাদন কার্যে নিজেদের নিযুক্ত করে জীবনধারণ করত বা দুর্যোধনের অধীন থেকেই বেঁচে থাকত। তাতেই বা জগতের কতটুকু ক্ষতি হত। অথবা তোমরা যাদবেরা না হয় তাদের পোষণ করতে, তাতেও তো এত অযুত প্রাণহানি ঘটত না। রাজ্যলাভই কি মনুষ্যত্ব বিকাশের বা প্রাণধারণের একমাত্র উপায়?

    কৃষ্ণ, আমি কোনোদিন আমার কোনো সন্তানের মুখ নিরীক্ষণ করিনি। সুতরাং ভেব না, তাদের শোকে ব্যাকুল হয়ে এসব বাক্য আমি বলছি। আমি এসব বলছি একারণে যে, আজ জ্ঞানত আমি জেনেছি, এই বিশ্ব কত সুন্দর, শোভন, এই বিশ্ব এক মহোৎসব, আবার একই সঙ্গে এও জেনেছি যে, যুদ্ধ কতই না ঘৃণ্য, কুৎসিত এবং অকাম্য। যে কোনো মূল্যে মানুষের যুদ্ধ আর হত্যা বন্ধ হওয়া উচিত। বিশেষ, এই যুদ্ধ যখন প্রকৃতিপুঞ্জের কোনো কল্যাণের জন্য নয়। দুর্যোধন রাজ্যলাভ করুক, কি যুধিষ্ঠির, তাতে প্রকৃতিপুঞ্জের কতটুকু আসে যায়? রাজা যেই হোন, তাঁর একমাত্র কৃতকর্মই তো হচ্ছে প্রকৃতিপুঞ্জের দেহ থেকে একটু একটু করে মাংস সংগ্রহ করা। এই মাংসখণ্ড নিয়ে যে যুদ্ধ তাকে ধর্ম আখ্যা দেওয়ার হেতু কী কৃষ্ণ?

    মহাত্মন্, রাজ্ঞী গান্ধারীর এইসব প্রশ্নে বাসুদেব চঞ্চল হয়ে উঠলেও পুনরপি গান্ধারকন্যা বললেন, কৃষ্ণ তুমি জান, আমাকে তঞ্চকতা করে এই কুরুকুলের বধূ হিসেবে আনয়ন করা হয়েছে। আমার পিতা গান্ধাররাজ সুবল, কুরুবিক্রমের কথা জ্ঞাত থাকার জন্যই যে তুষ্ণী ছিলেন তাই নয়। তিনি কৌরবদের তুলনায় দুর্বল ছিলেন বটে, কিন্তু তিনিও তো ক্ষত্রিয়। উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের অন্যান্য ক্ষত্রিয় রাজন্যদের সঙ্গে মিলিত হয়ে তিনি কি রণোদ্যমে উন্মত্ত হতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। তিনি কৌরবদের ভয়ে ভীতও অবশ্য ছিলেন, কিন্তু তাঁর যুদ্ধ বর্জনের অন্য কারণও বর্তমান ছিল। তাঁর কন্যার স্বার্থের জন্য তিনি অগণ্য লোকক্ষয়ের বা সামূহিক বিপর্যয়ের পক্ষপাতী ছিলেন না। আমি জানি, আমার ভ্রাতা শকুনি আমার পুত্রদের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে যুদ্ধাবস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল বলেই এই যুদ্ধ। তারা সবাই মন্দমতি। আমি কদাপি তাদের অনুসৃত নীতির সঙ্গে সহমত ছিলাম না। কিন্তু তুমি তো বাসুদেব, তুমি আর্যাবর্তীয় সর্বজনের নেতা, তুমি তাদের কুচক্রান্ত কেন বিফল করতে পারলে না?

    কৃষ্ণ, তুমি শুধু আমার পুত্রদের যুদ্ধোদ্যমকে, তাদের দ্বারা অনুষ্ঠিত অন্যায় আচরণসমূহকে উল্লেখযোগ্য হিসেবে দেখেছ, আর তাদের নিন্দাবাদ করেছ। আমিও করেছি। কুন্তীর পুত্ররা, যাঁদের ঔরসেই জন্মাক, যেহেতু তারা কুন্তীর পুত্র, আমি তাদের আদরণীয়ই মনে করি। তবু বলব, তারা কি কোনো অন্যায়ই করেনি? তারা কি যুদ্ধোদ্যমে বীতস্পৃহ ছিল? যুধিষ্ঠির কি দ্যূতসভায় দ্রৌপদীকে পণ্যা হিসেবে বাজি রাখেনি? কই, সে তো তখন, তাঁর অন্য মহিষীকে অক্ষপণ হিসেবে ব্যবহার করেনি? সে কি শুধু দ্রৌপদী পঞ্চভোগ্যা বলেই নয়? তার মনে কি দ্রৌপদীর প্রতি আদৌ কোনো শ্রদ্ধাবোধ ক্রিয়াশীল ছিল, যখন তাঁকে পণ হিসেবে সে ব্যবহার করে? তুমি কি জান, দ্রৌপদীর লাঞ্ছনার সময় ভানুমতী সহ, আমার সমগ্র পুত্রবধূরা কৌরবদের শাপশাপান্ত করেছিল। কিন্তু পাণ্ডবদের স্ত্রীগণ কেউ কোনোই উচ্চবাচ্য করেনি? না, এমনকী তোমার ভগিনী সুভদ্রাও না। কৃষ্ণ, তোমার সখা অর্জুন, ভীম যখন যুধিষ্ঠিরের হস্তদহন করতে উদ্যত হলেন, তাঁকে নিরস্ত করেছিলেন। আমি তোমাকে প্রশ্ন করি, সুভদ্রা যদি পণ্যা হতেন, তাহলেও কি তিনি জ্যেষ্ঠের প্রতি এই বশংবদতা দেখাতেন? আসলে, দ্রৌপদী, যেহেতু পাঞ্চাল রাজের পালিতা কন্যা, তাঁর কুলশীলমান ইত্যাদি যেহেতু অজ্ঞেয়, যেহেতু তিনি পঞ্চভোগ্যা, তাই তাঁকে নিয়ে অক্ষক্রীড়ায় যুধিষ্ঠিরের কোনো অসুবিধেই হয়নি। একসঙ্গে এই সমুদায় প্রশ্নাবলি করে গান্ধারী স্তব্ধ হলেন। মহাশয়, তখন মনে হল সমস্ত চরাচর যেন স্তব্ধ হয়ে গেছে।

    যজ্ঞদত্ত এমত বর্ণনা করলে, আমি খুবই চিন্তাযুক্ত হলাম। অচ্যুতকৃষ্ণ আমার আদর্শ রাষ্ট্রপুরুষ, একথা আমি আগেই বলেছি। বাদরায়ণি আমার পিতা এবং শিক্ষাগুরু। তাঁদের নীতি, তাঁদের প্রচারিত ধর্মের অংশীদার আমিও। আমি তাই, এইসব তথ্য শুনে, অবসন্ন বোধ করছিলাম। কিন্তু, আমি জানি অচ্যুত এবং বাদরায়ণি ধার্তরাষ্ট্রদের নানাভাবে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন, যাতে এই ভ্রাতৃঘাতী কলহ বন্ধ হয়। তারা তা শোনেনি। আমি নিজেও আজ এই কলহের কারণে প্রব্রাজকের জীবনযাপন করছি। ধার্তরাষ্ট্রের আচার-আচরণ, কোনোদিন, আমার অনুমোদন লাভ করেনি। কিন্তু আজ পক্ষপাতশূন্য, নির্মোহ, আমি বুঝতে পারছি, গান্ধারীর যুক্তিতে কতই না সারবত্তা আছে। পাণ্ডবেরা রাজ্যলাভ করতে পারলে প্রকৃতিপুঞ্জের কতটুকুই বা ক্ষতি বৃদ্ধি হত! কিন্তু, প্রকৃতিপুঞ্জ নয়। বরাবরই আমি তাদের ক্ষতি বৃদ্ধির নিরিখেই সব বিচার বিশ্লেষণে যত্নশীল ছিলাম। গান্ধারীর যুক্তির মাত্রা, আমি অবশ্যই স্বীকার করব, আমার পিতা বাদরায়ণি বা অচ্যুতের যুক্তি এবং ন্যায়ধর্মের চাইতে অনেক বেশি গ্রাহ্য। এই সত্য স্বীকারে আমার কোনো কুন্ঠা নেই আজ। দীর্ঘ প্রব্রজ্যা আমাকে সেই শক্তি এবং উদারতা প্রদান করেছে।

    যজ্ঞদত্ত বলল, মহাশয়, রাজ্ঞী গান্ধারী সম্পর্কে, আমরা প্রাকৃত ইতরজনেরা সামান্যই জ্ঞাত ছিলান। জনশ্রুতি যতটুকু, ততটুকুই আমাদের জ্ঞান। শুনেছিলাম, তিনি অসামান্যা রূপসী, অসাধারণ পতিসেবাপরায়ণা এবং অনন্যসাধারণ বুদ্ধির অধিকারিণী। বাস্তবে যখন দেখলাম, জানলাম, শুধু তাই নয়, তিনি অসাধারণ শাস্ত্রজ্ঞাও। মহাত্মন্, সেই প্রদীপ্তা নারী, অযুত শবরাশির মধ্যে দাঁড়িয়ে যখন, বাসুদেবকৃষ্ণকে এইসব অকল্যাণকর যুদ্ধের জন্য অভিযুক্ত করছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল, মানবতা দেবীরূপ পরিগ্রহ করে ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীস্বার্থী ক্ষমতাকামুকদের তর্জনী সংকেতে শাসন করছেন। গান্ধারী আবার বললেন, শুনেছিলাম, যুদ্ধারম্ভের পূর্বেই কিছু নিয়মবন্ধ হয়েছিল উভয় পক্ষের মধ্যে এবং তা তোমার ওই ক্ষাত্রধর্মানুসারেই করা হয়েছিল। অস্ত্রহীনকে অস্ত্রাঘাত করা চলবে না, ক্লান্তকে বিশ্রামের অবকাশ দিতে হবে, অন্যের সঙ্গে যুধ্যমান ব্যক্তিকে পার্শ্বপ্রহার করা চলবে না, আরও নানান নীতিনিয়মের কথা আমরা শুনেছিলাম। কিন্তু হে কেশব, এই সব নিয়মবন্ধ কি আদৌ রক্ষিত হয়েছিল, যখন সাত্যকির সঙ্গে যুদ্ধরত ভূরিশ্রবাকে অর্জুন পার্শ্বপ্রহারে ছিন্নবাহু করেছিল? কোথায় ছিল নীতি বা এই নিয়মবন্ধ যখন অস্ত্রত্যাগী ভীষ্ম, দ্রোণ, বিপন্ন কর্ণ বা জয়দ্রথকে তুমি চক্রান্ত করে নিহত করালে? দুর্যোধনকে কি তোমরা বিশ্রামের অবকাশ দিয়েছিলে? সে তো অপরিসীম ক্লান্ত ছিল।

    কেশব, তুমি নিজে চিরকাল অন্যায় করে এসেছ এবং অন্যকে অন্যায় কর্মে উদ্যোগী করেছ। অন্যায়ের প্রতিকারের নিমিত্তও অন্যায় কর্ম করা নিন্দনীয়। তুমি চিরকাল তাই করে এসেছ। কংস, চাণূর, জরাসন্ধ, শিশুপাল, পৌণ্ড্রক বাসুদেব বা অন্যান্য যাঁদের তুমি হত্যা করেছ বা করিয়েছ, তাঁরা অন্যায় হয়তো করেছেন, কিন্তু তুমি তো কিছু ন্যায় যুদ্ধে তাঁদের বধ করনি। মানুষই অন্যায় করে, মানুষই তার প্রতিবিধান করে। কিন্তু হত্যা, অন্যায় প্রতিবিধানের নিকৃষ্ট পন্থা। তা বর্বরোচিত।

    শিশুপাল রাজসূয় যজ্ঞকালে তোমার কিছু সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু যেহেতু তিনি তোমার শত্রু তাই তাঁকে তুমি অপ্রস্তুত অবস্থায় হত্যা করলে। নিমন্ত্রিত অতিথি হত্যা যে মহাপাপ-এই চিরায়ত মূল্যবোধকে পর্যন্ত তুমি নষ্ট করলে। বস্তুত তুমি পূর্ববৈরিতা বশত আগেই এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের জন্য সিদ্ধান্ত তথা চক্রান্ত করে রেখেছিলে।

    এভাবেই তুমি এই মহাযুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করেছ, আর এখন বলছ, ভীম ক্ষাত্রধর্ম পালন করেছেন, কেননা, প্রতিজ্ঞা পালন করা ক্ষাত্রধর্ম। তাই যদি হয়, তবে অর্জুনের যুধিষ্ঠির হত্যা উদ্যোগ বা আত্মহত্যার প্রতিজ্ঞা রক্ষা বিষয়ে তুমি অন্যরূপ বিধি কেন দিয়েছিলে? কোনো ক্রুদ্ধ ব্যক্তির প্রতিজ্ঞার গুরুত্ব কতটুকু যে তার জন্য মানবিক বৃত্তি পর্যন্ত ত্যাগ করতে হবে? কোন মানুষ ভ্রাতৃরক্ত পান করে প্রতিজ্ঞা রক্ষা করে? কোন ক্ষত্রিয় যোদ্ধা শুধুমাত্র একটি কথা পালনের জন্য নাভির নিম্নভাগে গদাপ্রহার করে, যখন উভয় পক্ষের ঘোষিত নীতি ছিল এরূপ আচরণ না করা। তুমি অত্যন্ত সুবিধাবাদী, আত্মস্বার্থী এবং হৃদয়হীন। তুমি তোমার যে নীতির প্রতিষ্ঠার জন্য এই বিপুল লোকক্ষয় করালে, সেই নীতিই তোমার সমুদয় কুলকে ধ্বংস করবে। আমি বলছি, সাত্বৎ, বৃষ্ণি, কুক্কুর, ভোজ, অন্ধক, যদু এবং অন্যান্য যাদবেরা তোমার এই নীতি অনুসরণ করেই ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠার জন্য পরস্পরের প্রতি বিদ্বিষ্ট হবে এবং সমূলে ধ্বংস হবে।

    যজ্ঞদত্তের মুখে গান্ধারীর এবংবিধ বাক্য শ্রবণের পর উদ্ধব, কর্তৃক বর্ণিত যদুকুল ধ্বংসের সেই ভীষণ কাহিনি আমার স্মরণে এল! কী অব্যর্থ ভবিষ্যদবাণী। আমি কুরুকুল মহামন্ত্রী বিদুর, আমার রাজনীতি জ্ঞান বিষয়ে সর্বদেশে অশেষ সুনাম। কিন্তু আমিই কি অচ্যুতের নীতির এরূপ তীক্ষ্ণ সমালোচনা চিন্তা করেছি? অচ্যুত এবং বাদরায়ণির মূল সংহিতাকে আশ্রয় করেই আমার বিভিন্ন শাসনসংহিতা রচনা করেছিলাম। তাঁদের রচিত সংহিতা বিষয়ে আমার অনেক কিছুই বক্তব্য আছে, কিন্তু মূলসূত্র বিষয়ে কোনো বিরোধ ছিল না। অচ্যুত দিনের পর দিন পাণ্ডবদের, বিশেষত অর্জুনকে এই সংহিতা ব্যাখ্যা করে যুদ্ধে উদ্যোগী করেছেন। যুদ্ধই যে ক্ষত্রিয়ের একমাত্র কর্ম এবং এই কর্মই যে ধর্ম তা তিনি তাঁদের বোঝাতে পেরেছিলেন বলেই এই যুদ্ধ। আমি যুদ্ধবিরোধী হয়েও এই নীতির যে বিরোধিতা করিনি, তাতেই প্রমাণ আমি এখনও এই তথাকথিত ক্ষত্রিয় রাজ তথা যশঃকামুকদের চিনতে পারিনি। পরন্তু তাঁরা আমার পাণ্ডিত্য এবং ক্ষমতাকে চূড়ান্তভাবে কাজে লাগিয়েছে। আমার মেধাকে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়েরা স্বীয় স্বার্থে ব্যবহার করার জন্যই, সূত হওয়া সত্ত্বেও আমাকে মহামন্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছে। কিন্তু গান্ধারী ক্ষত্রিয়কন্যা হয়েও স্ব-সমাজের স্বার্থকামুকদের চরিত্র বিষয়ে কত গভীর চিন্তা করছেন।

    যজ্ঞদত্ত বললেন, হে প্রাজ্ঞ বিদুর, গান্ধারীর মুখে এইসব বাক্য শ্রবণের পর বাসুদেবকৃষ্ণ বললেন, দেবি, আমি জানি হয়তো যদুকুলও এভাবেই ধ্বংস হবে। কিন্তু আমি তো চেষ্টার ত্রুটি করছি না তাদেরকে সংহত রাখতে। কৌরব-পাণ্ডবদেরও সংহত রাখার বিষয়ে আমার উদ্যোগ এবং প্রচেষ্টা আপনার অজানা নয়। আমি কি বারংবার দৌত্যকর্ম করতে গিয়ে আপনার পুত্র দুর্যোধনের কাছে লাঞ্ছিত হইনি? তাঁরা কি পাণ্ডবগণের প্রতি অসূয়া পোষণ করতেন না? কিংবা বহুবারই তো দুর্যোধন, কর্ণ প্রভৃতিরা পাণ্ডবদের বিনাশের নিমিত্ত যত্নবান হয়েছেন। আমি স্বীকার করছি, আমার কৌশলেই তাঁরা রক্ষা পেয়েছেন। এই যুদ্ধে ন্যায়-নীতির লঙ্ঘন উভয়পক্ষই করেছেন। দ্রোণ, কর্ণ, জয়দ্রথের মতো বীরগণ কি অন্যায়ভাবে দুগ্ধপোষ্য শিশুপ্রায় অভিমন্যুকে হত্যা করেননি? অশ্বত্থামা, কৃপাচার্য, কৃতবর্মা কি অন্যায় নৈশসমরে ঘুমন্ত পাণ্ডবদের বা ধৃষ্টদ্যুম্নকে হত্যা করেননি? আপনি এখন সন্তপ্তা, তাই এই সমুদায় ধ্বংসের দায় আমার উপর ন্যস্ত করছেন। আপনি পাণ্ডবগণের বনবাসের লাঞ্ছনা, বাল্যাবধি তাদের উপর অত্যাচার, জতুগৃহ দাহ ইত্যাদির বিষয়ে কিছু বলছেন না। দ্যূতক্রীড়ার সময় অনুষ্ঠিত অন্যায় বিষয়ে আপনার বিচার কী বলে? আপনি আমার এবং ভীমের প্রতি দোষ আরোপ করছেন। কই, কৌরবদের এইসব অন্যায়ের বিষয়ে তো কিছু বলছেন না?

    বাসুদেবকৃষ্ণ এমত তীক্ষ্ণ বাক্য বললে, গান্ধারী সখেদে বললেন, তুমি ভুল বুঝেছ কেশব। তোমার যুক্তিও তাই প্রাকৃত ও শিশুজনসুলভ নির্দায়িক। কৌরবেরা পাপ করেছে বলে তোমার বা পাণ্ডবগণের পাপ করার অধিকার জন্মায় না। আমি কৌরবদের অন্যায়কে কখনোই সমর্থন করিনি, কখনোই প্রশ্রয় দিইনি। কিন্তু আমি অবরোধবাসিনী ক্ষত্রিয়া রমণী। আমার ক্ষমতা বা অধিকার কতটুকু। আমার কথা কে শুনবে? তা সত্ত্বেও তোমার দৌত্যকালে আমার পুত্র যখন সভা পরিত্যাগ করে চলে যায়, তখন আমি সভায় উপস্থিত হয়ে তাকে ফিরিয়ে এনে যে উপদেশ করেছিলাম তা তোমার অজানা নয়। কিন্তু সেও তো ক্ষত্রিয় পুরুষ। তোমার সংহিতায় তো তুমি স্ত্রীজাতি বিষয়ে নানা বিধিনিষেধের ব্যবস্থা রেখেছ। ক্ষত্রিয়শক্তি যতই বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হচ্ছে, নারীর অধিকার ততই খর্ব হচ্ছে। মহাজননী সত্যবতী যে স্বাধীনতা বা অধিকারের অধিকারিণী ছিলেন আমরা কি তার সামান্যমাত্রও ভোগ করি? তথাপি আমি আমার শিক্ষা, রুচি এবং ক্ষমতা অনুযায়ী তাদেরকে বাধা দেবার চেষ্টা করেছি। পারিনি। কিন্তু হে বার্ষ্ণেয়, অসহায়া আমি যা পারিনি, অসীম ক্ষমতাসম্পন্ন তুমি কিন্তু তা অবশ্য পারতে। কেননা, তুমি বাসুদেবত্বকামী অচ্যুত। তুমি নাকি কোনো সংকল্প থেকে চ্যুত হও না, এমত লোকবিশ্বাস। তাহলে যুদ্ধ বন্ধের নিমিত্ত তুমি অচ্যুত হলে না কেন?

    হে কেশব, তোমার আকাশের মতো নির্লিপ্তি পরিত্যাগ করে একবার তাকিয়ে দেখো, সহস্রাধিক সদ্যবিধবা কৌরবরমণীরা স্ব স্ব পতিকে আলিঙ্গন করে এই কুৎসিত পূতিগন্ধময় নারকীয় ভূমিতে লুন্ঠিতা হচ্ছেন। ওই দেখো, ভানুমতী, উন্মাদিনীর ন্যায় গতাসু কুরুরাজ দুর্যোধনের মস্তক আপন ক্রোড়ে স্থাপন করে তার মুখমণ্ডল মার্জনা করছেন। ওই দেখো আমাদের সর্বকনিষ্ঠা নপ্তা অভিমন্যুপত্নী উত্তরা অন্তর্বত্নী হওয়া সত্ত্বেও, তার এই ক্লেশকর অবস্থায় কীভাবে বিলাপ করছে, আহা! কন্যকা অবস্থায় কুন্তী তাঁর পিতৃগৃহে অতিথি ঋষি দুর্বাসার সেবাকার্যে নিযুক্তা হলে, সেই পাষণ্ড ঋষি তাঁকে ভোগ করে গর্ভিণী করে। সে তখন নিতান্ত অপাপবিদ্ধা। ভণ্ড ঋষি তাঁকে বলে, তোমাকে এই মন্ত্র শিখিয়ে দিলাম, এর নাম শারীর মন্ত্র। এই মন্ত্রে তুমি যে দেবকে আহ্বান করবে সেই তোমার কাছে আসবে। কুন্তী নিত্য নিশীথে সেই ভণ্ড ঋষিপ্রদত্ত মন্ত্রাভিচার করলে, ঋষিই দেবরূপে এসে তাঁকে রমণ করত। এভাবেই সে গর্ভিণী হয়। তখন সেই ভণ্ড তাঁকে বোঝায় যে স্বয়ং সূর্যকে সে চিন্তা করে মন্ত্রাভিচার করেছিল বলে, তিনিই তাঁর গর্ভাধান করেছেন। ওই দেখো কুন্তীর সেই সূর্যসম্ভূত পুত্র কর্ণ, বিক্ষত-অঙ্গে রণশয্যাশায়ী। তাঁর রমণীগণ বহুদূর অঙ্গরাজ্যে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসে এখনও বোধকরি সাধব্য পালন করছে। আর এখানে কুন্তী, তাঁর চিরকালীন লজ্জা পরিত্যাগ করে সেই কানীনপুত্রকে আলিঙ্গন করে রোদন করছেন। তুমি বলছ, আমি পক্ষপাতদুষ্ট, স্বজনদের দোষ দেখি না। কিন্তু কুন্তীর দুঃখ যে আমার হৃদয় বিদীর্ণ করছে, তা তুমি কী করে বুঝবে কেশব? তোমার তো হৃদয় নেই। তোমার কাছে ওই ভণ্ড ঋষি দুর্বাসার মতোই নারী হচ্ছে ভোগ-বস্তু। তারা রক্তমাংসজাত কোনো প্রাণী নয়, তারা বস্তু, ভোগের জন্যই তাদের প্রয়োজন, যেমন পুরুষকার-কামী ওই পঞ্চভ্রাতার জন্য ভূমি প্রয়োজন, যেমন বাসুদেবত্ব-কামী তোমার জন্য লক্ষ প্রাণের নিধন প্রয়োজন। কৃষ্ণ, ক্ষমতা, প্রয়োজন, আকাঙ্খা আর অধিকার, এই-ই হচ্ছে প্রকৃত অর্থে তোমার সংহিতার মূল বচন। নতুবা, তুমি এত একদেশদর্শী কেন? যে কর্ম পাণ্ডবেরা আচরণ করলে তুমি তাকে ধর্ম আখ্যা দাও, সেই একই কর্ম কৌরবদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হলে, তাকে তুমি অধর্ম বলবে কেন? নিষ্কামকর্মের তত্ত্ব অপরকে শিক্ষা দিয়ে, এই যুদ্ধের বিজয় বিষয়ে আকাঙ্খী হও কেন? আর সেই বিজয় পাণ্ডবেরাই অর্জন করুক এমতই বা অভিপ্রায় কেন তোমার? তুমি অস্বীকার করতে পার যে এই যুদ্ধের প্রকৃত দায়িকদের মধ্যে তুমিই প্রধান এবং রাজসূয় যজ্ঞের মাধ্যমেই তুমি তা আরব্ধ করেছ?

    অভিমন্যুর মৃত্যু আমার নিকটও সাতিশয় শোকাবহ। বস্তুত, সে তো আমারও নপ্তা। কিন্তু বল তো, তার মহাবলশালী জ্যেষ্ঠতাত এবং পিতৃব্যগণ উপস্থিত থাকতে, তাকে কেন দ্রোণ, কর্ণ, জয়দ্রথ প্রভৃতি অতিরথদের সঙ্গে যুদ্ধার্থে প্রেরণ করা হল? একটি কিশোরকে এরকম সিংহগহ্বরে পাঠানো কি ক্ষমতা লাভের নিমিত্ত মনুষ্যত্ব বর্জন নয়?

    কৃষ্ণ, তুমি যেইদিন থেকে পাণ্ডবদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছ, সেইদিন থেকেই এই কুরুপাণ্ডব কুলে শকুনি, গৃধিনীর পক্ষচ্ছায়া পতিত হতে শুরু হয়েছে। তুমি তোমার অনুপ্রবেশের শুরু থেকেই প্রচার করতে শুরু করেছ যে, পাণ্ডবেরা যা করে তাই ধর্ম, আর দুর্যোধন তথা কৌরবদের সবটাই অধর্ম। তোমাদের সংহিতা সূত্রও সেইভাবেই রচনা করেছ। আচ্ছা, তুমি বল তো, সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জ কি এই দীর্ঘকাল দুর্যোধনের শাসনে থেকে আদৌ তার প্রতি বিদ্বিষ্ট? তুমি কি জানতে না যে দুর্যোধন যেভাবেই রাজ্য অধিকার করুক, সে রাজন্যবর্গের এবং প্রকৃতিপুঞ্জের কত আদরণীয় করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছিল? আমিও সঞ্জয় প্রমুখাৎ শুনেছি, যখন মধ্যম পাণ্ডব তাকে অন্যায় গদাপ্রহারে পাতিত করল, তখন প্রকৃতিপুঞ্জ, হতাবশিষ্ট যোদ্ধাগণ এবং তোমার অগ্রজ বলরাম পর্যন্ত আমার পুত্রেরই জন্য জয়ধ্বনি করেছিল, আর ভীমের এই অকার্যের তীব্র নিন্দা করেছিল। তখনই নাকি তুমি হতভম্ব যুধিষ্ঠিরকে সম্বোধন করে বলেছিলে, নৈষ শক্যঃ অতি শীঘ্রাস্তস্তে চ সর্বে মহারথাঃ, ঋজুযুদ্ধেন হন্তুং যুস্মাভিঃ আহবে, কদাচিৎ তু হন্তুং ধর্মেন পার্থিবঃ, তে বা ভীষ্মমুখাঃ সর্বে মহাষ্বাসা মহারথাঃ, তুমি তো নিজের মুখেই বলেছ। তাহলে এই অন্যায় কর্ম কেন করা হল? এর উত্তরে তুমি পাণ্ডবদের বলেছ, যদি নৈবংবিধং জাতু কুর্যাৎ জিহ্মাম্ অহম্ রণে, কুতো বো বিজয়ো ভূযঃ, কুতো রাজ্যং, কুতো ধনম্?-কী করেই বা এ যুদ্ধ জয় হত, কী করেই বা ধনলাভ হত? ধর্ম পথে যুদ্ধ করে ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ এবং দুর্যোধন-এই চারজনকে পরাস্ত করা যেত না। একা ভীমই কি আমাদের সব পুত্রদের গদাপ্রহারে নিহত করতে পারত? নিশ্চয়ই তা পারত না, যদি তুমি কূটকৌশল প্রয়োগ না করতে। এই কি তোমার সংহিতা উক্ত নিষ্কাম কর্ম বা ধর্ম?

    কৃষ্ণ, সঞ্জয় যখন আমার অন্ধ স্বামীকে রণক্ষেত্রের যাবতীয় সংবাদ বলতেন, আমি তা সর্বৈব শ্রবণ করতাম। তিনি অন্ধরাজাকে তোমার সংহিতা বিষয়ক তাবৎ সূত্রই বিবৃত করেছেন। তা শ্রবণ করে আমার স্বামী সঞ্জয়কে বলেছিলেন, সঞ্জয়, কেশবের তত্ত্ব যদি এমন হয় যে, যেন তেন প্রকারেণ যুদ্ধ জয় এবং রাজ্য লাভই আদর্শ, তা হলে সেই নীতি-অনুসারীদের সঙ্গে যুদ্ধ জয়ের কোনো আশাই নেই, আর সে ক্ষেত্রে আমার অশিষ্ট সন্তান কী এমন অন্যায় করেছেন? কেশব, আমার স্বামীর এই প্রশ্ন সংগত কিনা তুমিই বিচার করো। তোমার সংহিতায় উক্ত তত্ত্ব যা বলে, সেই ও তো তাই-ই করেছে।

    যজ্ঞদত্ত বললেন, মহাত্মন্, গান্ধারীর এইসব বাক্য শ্রবণে, অচ্যুতকেশবের মুখমণ্ডল শ্রাবণী আকাশের

    মতো ভ্রূকুটি কুটিল হল। গান্ধারী যেসব বাক্য তাঁকে বললেন, তা নিতান্তই মানবিক যুক্তি বুদ্ধির বিচারে গ্রাহ্য সত্য। কিন্তু কেশব তার যথোচিত প্রত্যুত্তর করতে সমর্থ হলেন না। গান্ধারী তখন পুনর্বার তাঁকে বলতে লাগলেন, কেশব, তুমি অমিত ক্ষমতাশালী এবং যাদবগণের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি, তুমি স্বয়ং রাজা না হয়েও প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগে যাদবগণের তথা সমগ্র আর্যাবর্তের রাজগণের উপর কর্তৃত্ব করে থাক। তুমি কি পারতে না এই দুর্যোধনাদিকে স্বমতে আনয়ন করে যুদ্ধ বন্ধ করতে। অথবা অকস্মাৎ আক্রমণ করে তাদেরকে বন্দি করতে পারতে, তা হলেও তো এই মহারণ অতিক্রম করা যেত। জীবকুলের মঙ্গল হত। আর এই যুদ্ধ তো শুধুমাত্র আমার পুত্রের আয়োজনেই আরব্ধ হয়নি, হয়েছে যুধিষ্ঠিরকে সম্রাটত্বে স্থাপিত করার জন্য আর তোমার পুরুষোত্তম বাসুদেবত্ব প্রতিষ্ঠার কারণেও।

    হে কৃষ্ণ, আমার বিচারে আমি নিঃসন্দিগ্ধ যে তোমার যাবতীয় তত্ত্বই কুটিল এবং লোকজীবনের অহিতকর। তোমার সংহিতা শিক্ষাই কুরুপাণ্ডবদের মধ্যে ভেদবৃদ্ধি করেছে। তুমি সততই আমার পুত্র সুযোধনের, যাকে তোমরা বিদ্রূপ করে দুর্যোধন নামেই প্রচার করেছ, তার নিন্দাস্বরূপ আমাকে বলেছ, রাজ্ঞী, আপনার পুত্র দুর্যোধন অতি দুরাত্মা, পরশ্রীকাতর, আত্মাভিমানী, নিষ্ঠুর এবং গুরুজনের নিতান্ত অবাধ্য। তুমি এখনও এই সন্তাপ সময়ে আমাকে বলছ, আপনি তার দুষ্কৃত কার্যে তাকে সাধুবাদ করতেন, এখন আত্মদোষ স্খালনের জন্য আমাকে দোষারোপ করছেন। তুমি বলছ, ব্রাহ্মণীপুত্র তপশ্চর্যা, বৈশ্যাপুত্র পশুপালন, শূদ্রাপুত্র দাসত্ব করবে। তুরঙ্গীশাবক দ্রুততর ধাবমান হবে, গাভীরা বৎস ভার বহন করবে এবং আপনার ন্যায় ক্ষত্রিয়ারা পুত্র হলে সমর-মৃত্যু লাভ করবে বলেই গর্ভধারণ করে থাকেন। তোমার কথার প্রত্যুত্তর করতে আমার ঘৃণা বোধ হয়। তোমার বাক্য অত্যন্ত নিষ্ঠুর, ত্রুটিপূর্ণ এবং মনুষ্যসমাজে অসাম্য সৃষ্টিকারী। তোমার এই তত্ত্ব যুগ যুগ ধরে মানুষে মানুষে ভেদ সৃষ্টি করবে এবং সমাজে হিংসার চিরস্থায়ী আসন প্রতিষ্ঠা হবে।

    কৃষ্ণ, ব্রাহ্মণদের আমি জানি। আমি এও জানি আর্যাবর্তীয় কোনো নরেশই ব্রাহ্মণদের সাহচর্য এবং আশীর্বাদ ব্যতিরেকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকতে পারবেন না। তুমি বলে থাক, গুণ ও কর্ম অনুসারে বর্ণ চতুষ্টয় বিভাজিত। অবশ্য এই বিভাজনে তুমিই ব্রাহ্মণদের সহায়তায় করেছ। যদি তাই হয়, তবে ব্রাহ্মণীপুত্র, ক্ষত্রিয়াপুত্র, বৈশ্যা বা শুদ্রা পুত্রের প্রসঙ্গ ওঠে কী করে, এইসব পুত্ররাই তো শুধুমাত্র মানুষ হিসেবে স্ব-স্ব গুণকর্মের দ্বারা, সমাজে ব্রাহ্মণত্ব, ক্ষত্রিয়ত্ব ইত্যাদি লাভ করতে পারে, তা তারা যার গর্ভেই জন্মাক না কেন। আর আমার মতো ক্ষত্রিয়া বলতে তুমি কী বিশেষ করতে চাইছ। আমি নিজেকে ক্ষত্রিয়াণী বলে গর্ব করি না, কেননা, মানুষে মানুষে এই বর্ণভেদ আমার রুচি বা যুক্তিসম্মত বোধ হয় না। তুমি ব্রাহ্মণগণের অসম্ভব অনুগত এবং সর্বদা কৈতববৃত্তি দ্বারা তাঁদের মনোরঞ্জন করে থাক। রাজসূয় যজ্ঞকালে তুমি সমগ্র ব্রাহ্মণগণের পাদ প্রক্ষালনের ভার স্বহস্তে গ্রহণ করেছিলে কিন্তু কৃষ্ণ, শুধু ব্রাহ্মণের কেন, অন্যান্য বর্ণীয় নিমন্ত্রিতদের মধ্যে কি গুণ-কর্মে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি আর কেউ ছিল না? তোমার গুণ কর্মানুসারে বর্ণবিভাজন শুধুই কথার কথা, আসলে ব্রাহ্মণের পুত্র ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়ের পুত্র ক্ষত্রিয় ইত্যাদি পদ্ধতিতেই তোমার সংহিতা উক্ত চাতুর্বর্ণ্য সমাজে বিধৃত। হৃদয়হীন, তুমি যে আমাকে বলছ, আমার মতো ক্ষত্রিয়ারা পুত্র সমর-মৃত্যু লাভ করবে বলেই গর্ভধারণ করে থাকে, তা যদি সত্য হয়, তবে তোমরাও নিহত হলে না কেন?

    বস্তুত যুধিষ্ঠির তোমার এবং ব্রাহ্মণগণের সহায়তায়ই রণে বিজয়ী হয়েছেন। তোমার কূটকৌশল এবং ব্রাহ্মণদের সামাজিক আধিপত্য এই মহাধ্বংসের কারণ। প্রধানত দেখা যায়, রাজা যদি অসদুপায়ী, অত্যাচারী বা অপশাসক হন, তখন প্রকৃতিপুঞ্জ দ্রোহ করে তাঁকে উচ্ছেদ করে। কিন্তু বল তো, হস্তিনাপুর নগরে বা সমগ্র কৌরবরাজ্যে এমন কেউ আছে কি, যে বলবে আমার পুত্র রাজা দুর্যোধনের শাসনে তারা আদৌ অসুখী, অতৃপ্ত বা অত্যাচারিত ছিল? পক্ষান্তরে স্মরণ কর, অন্ধরাজা বিভাগ করে দিলে, তুমি আর অর্জুন খাণ্ডবদাহ করে কী অসম্ভব অত্যাচারই না অনুষ্ঠিত করেছিলে। অরণ্যবাসী সেইসব অনার্য মানুষেরা কী নির্মমভাবেই না তোমাদের উৎপীড়নের শিকার হয়েছিল। তোমাদের সেই মহা-অকীর্তিকে তোমরা নানা গল্পে মহানকার্য বলে প্রচার করেছ। অত্যাচারী, অসহায় প্রকৃতিপুঞ্জের উপর এই নির্মম আঘাত হানতে তোমাদের লজ্জা হল না? আমি বলছি, আমার পুত্ররাও অপরাধী, পাণ্ডবেরাও অপরাধী, তাদের উভয়পক্ষের অপরাধই হল, তারা নিজেদের গৃহবিবাদ শান্তিপূর্ণভাবে নিজেরা মিটিয়ে ফেলতে পারেনি। তুমি তাদের বিরোধের সূত্র ধরে অনুপ্রবেশ করেছ এবং এই অগণিত মানুষের মৃত্যু ঘটিয়েছ। তোমার নীতিকে ধিক, তোমাকেও আমি ধিক্কার জানাই। তুমি বা পাণ্ডবেরা কেউই রাজ্যশাসনের যোগ্য নও। তোমরা শুধু যুদ্ধকেই শ্রেয়োজ্ঞান করে তাকে ব্যাপকতা দিয়েছ। কিন্তু তা তো রাজন্যদের ঐতিহ্যগত দণ্ডনীতি নয়।

    গান্ধারী এরূপ বললে, বাসুদেবকৃষ্ণ ম্লান মুখে তাঁর শিবিরের দিকে ফিরে গেলেন। পাণ্ডবপক্ষীয় সকলেই গান্ধারীর তিরস্কারে অধোবদন হয়ে বারংবার, তাঁর ক্ষমা ভিক্ষা করতে লাগলেন।

    অন্তবন্ত ইমে দেহা নিত্যোস্যেক্তাঃ শরীরিণ।

    অনাশিনো অপেময়স্য তস্মাদ্ যুধ্যস্ব ভারত।

    য এমং বেত্তি হন্তারং যশ্চৈব মন্যতে হতম্ ।

    উভৌ তৌ ন বিজানীতো নায়ং হন্তি ন হন্যতে।।

    গীতা

    যজ্ঞদত্তের নিকট গান্ধারীর কৃষ্ণ তিরস্কার বৃত্তান্ত শুনে, আমার বহুকালাবধি পোষিত অহংকারের অবলুপ্তি হল। গান্ধারতনয়া অচ্যুত এবং বাদরায়ণি কৃত সংহিতা তথা আনুষঙ্গিক তত্ত্বাদির যে নির্মম সমালোচনা করেছেন, তা প্রজ্ঞাভিমানী আমার অহংকার বিনাশে অব্যর্থ। আমার অহংকার ছিল, আমি প্রজ্ঞা লাভ করেছি, আমার শাস্ত্রজ্ঞান সম্পূর্ণ হয়েছে। সমুদয় তত্ত্ব আমার অধিগত। কিন্তু এখন আমি দেখছি, ইতঃপূর্বে যে বিচার আমি অচ্যুত এবং বাদরায়ণি বিষয়ে উপস্থাপিত করেছি, তা নিতান্ত একদেশদর্শী এবং ভ্রান্ত দর্শনাশ্রয়ী। নবলব্ধ যুক্তি প্রয়োগে তার নিরসনকরণ অতীব আবশ্যক কর্তব্য। এমনকী হস্তিনাপুরে অধিষ্ঠিত বিজয়ী পাণ্ডবেরা যদি এখনও সেই নীতিই অনুসরণ করে রাজ্যশাসনে ব্রতী হয়, তথাপি তার বিরোধিতা এবং নিরাকরণ আমার কর্তব্য। আমি জানি আমার ঔরসজাত যুধিষ্ঠির আমার দর্শন পেলে, আমাকেই পুনর্বার মহামন্ত্রিত্বে বরণ করবেন। যদি করেন, তবে অবশ্যই, পাণ্ডবগণের আচরিত নীতির সঙ্গে আমার নবলব্ধ বিচার-পদ্ধতির বিরোধ ঘটবে। তা যদি ঘটে তো ঘটুক, তথাপি আমি সত্যচ্যুত হব না। গান্ধারকন্যার বিচারপদ্ধতি আমার দিগদর্শন। আমার কৃত শাসন-সংহিতা বিষয়ে আমি নিশ্চিত। বর্তমান সমাজে তার উপযোগিতা যুগানুযায়ী। কিন্তু অচ্যুত এবং বাদরায়ণিকৃত সমাজনৈতিক সংহিতার অপকৃষ্টতা বিষয়ে আমাকে অবশ্য সরবকন্ঠ হতে হবে। আমি জানি, সেক্ষেত্রে, পিতা বাদরায়ণির সঙ্গেও আমার দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী। সে কারণে, যদি পাণ্ডবেরা আমাকে মন্ত্রিত্বে বরণ নাও করেন, সেহ গ্রাহ্য।

    কিন্তু দার্শনিকভাবে আমি এক অসামান্য সংকটের সম্মুখীন হলাম। অচ্যুতোক্ত তত্ত্ব যদি এই হয়, অর্থাৎ, যে শরীরে অনন্ত আশ্রিত, সেই শরীরেই অন্তও আশ্রয় করে আছে, অতএব যুদ্ধ করো এবং হত্যায় ব্রতী হও, অথবা, যে ভাবে সে হন্তারক এবং যে ভাবে, একেই নিহত হওয়া বলে, দুজনেই সত্যোপলব্ধিতে ব্যর্থ, তাহলে কি হত্যা ব্যাপারটাই একটা অধ্যাস বলে বোধ হয় না? হত্যা যদি অলীক হয়, তাহলে তার নিষ্পাদন অন্যায় হবে কেন? কিন্তু তা যদি উভয়তই অধ্যাস হয়, তবে অচ্যুতই বা অর্জুনকে কেন হত্যায় প্ররোচিত করছেন? এই কর্মের তাহলে প্রয়োজনই বা কী? এমত হাজারো তত্ত্ব জিজ্ঞাসায় আমি বিগতনিদ্র হলাম।

    রজনী সামান্যই আর বাকি আছে। যজ্ঞদত্ত তার বস্ত্রাবাসে শয্যাগ্রহণ করেছেন। আমি এক শিলাখণ্ডোপরি উপবিষ্ট। মস্তকোপরি অনন্ত নক্ষত্রমণ্ডলী। সম্মুখে কুরুক্ষেত্রের নির্জন ধু-ধু প্রান্তর। প্রান্তবর্তী বৃক্ষরাজি যেন সহস্র নিহত বীরপুঞ্জের ছায়াময় অবয়ব। এই প্রান্তরেই সেই মহাক্ষয় সংঘটিত হয়েছিল। এখানেই ভ্রাতা ভ্রাতাকে, পিতা পুত্রকে, জামাতা শ্বশুরকে এবং ভাগিনেয় মাতুলকে হত্যা করেছে। এখানেই মাটির স্বামিত্ব নিয়ে মানুষ মানুষকে হত্যা করেছে। এখানেই রণক্লান্ত, নিদ্রিত যোদ্ধাদের অকস্মাৎ নৈশ আক্রমণে, কোনো এক হতাশাগ্রস্ত বিগতযশ প্রতিপক্ষীয় যোদ্ধা খড়্গাঘাতে নিহত করেছে। অচ্যুত এর কিছু ঘটনাকে ধর্ম এবং বাকি সমূহকে অধর্ম বলে অভিহিত করেছেন। আর তাঁর কথিত অধর্মকে অধর্ম জ্ঞান করে পুনরায় নতুন ভেদের উদ্ভব হয়েছে, যে কারণে অশ্বত্থামা, কৃতবর্মা হতশ্রী হয়েছেন, আর পরিণামে যদুকুল ধ্বংস হয়েছে। কৃতবর্মা যাদবকুলের হওয়া সত্ত্বেও, অচ্যুতের অনুগামী ছিলেন না। সাত্যকি ছিলেন তাঁর প্রতিপক্ষ। সাত্যকির সঙ্গে পানাধিক্যবশত তাঁর কলহ হয়। সাত্যকি তাঁকে নৈশ হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে দায়িক করলে, তিনি ভূরিশ্রবা হত্যাবিষয়ক অন্যান্য কর্মের উদাহরণ দেন। পরিণামে সাত্যকি কৃতবর্মাকে হত্যা করেন এবং তা অচ্যুতের সামনেই। এভাবেই সামগ্রিক বিরোধের সূত্রপাতে যদুকুল ধ্বংস। গান্ধারী যথার্থ ভবিষ্যৎ উক্তি করেছিলেন। আমার এখন বোধ হচ্ছে, অচ্যুত যেন তাঁর তত্ত্বে যুদ্ধ করো, যুদ্ধ করো এবং সমৃদ্ধ রাজ্য লাভ করার জন্য যুদ্ধে ব্রতী হও-এমত নির্দেশেই বেশি যত্নবান ছিলেন। রাজ্যলাভই যদি মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য হয় এবং তার জন্য যদি যুদ্ধ, কৌশল, ছলকপটতা ইত্যাদি কিছুই দূষণীয় না হয়, তবে দুর্যোধনের কোনো কর্মকেই তিনি দূষণীয় বলতে পারেন না। দুর্যোধন তো তাহলে, তাঁর তত্ত্বানুযায়ী ধর্ম পালনই করেছিলেন। সেমতে কীভাবে এ যুদ্ধের দায় তাঁর উপর বর্তায়? যুধিষ্ঠিরাদি রাজ্যলোভী। যুধিষ্ঠির ধীর শান্ত এবং উদার, কিন্তু প্রাচীন রীতিনীতির প্রতি বড়ো বেশি নির্ভরশীল। দুর্যোধন অধৈর্য, উদ্ধত এবং অবিনয়ী, কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রতি সদয়। তার রাজত্বে প্রজারা যে সুখে ছিল, গান্ধারীর এ উক্তি আদৌ অতিরঞ্জন নয়। পক্ষান্তরে যুধিষ্ঠির সুশাসক হিসেবে সুনামের অধিকারী হতে পারেননি। পাণ্ডবেরা অর্ধরাজ্য লাভ করেই দ্রুত দিগ্বিজয়ের নামে অন্যান্য নৃপতিদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন এবং অচ্যুতকৃষ্ণ, তাঁর যাদববাহিনীর সেনাদের এ কার্যে সহায়তার জন্য প্রদান করেছেন। ফলত বহু রাজন্যকে তাঁরা নির্জিত ও লুন্ঠন করে প্রচুর ধনরাশি সংগ্রহ করেছেন। সেই ধনরাশি রাজা যুধিষ্ঠিরের কোষাগার সমৃদ্ধ করেছে, আর অচ্যুতও স্বয়ং তার অংশ থেকে বঞ্চিত হননি। এখন বুঝতে পারছি অন্য রাজাদের নিগৃহীত করে ধনার্জনের এই অধর্মোচিত কার্যে দুর্যোধন কোনোদিন আগ্রহী ছিল না। দুর্যোধনেরও ক্ষত্রিয়োচিত অনেক দোষ ছিল, কিন্তু সে এসব কর্ম কোনোদিনই করেনি। সে শুধু সমগ্র কৌরব রাজ্য তার অধিকারে রাখতে চেয়েছিল এবং পাণ্ডবদের অধিকার কোনোদিন স্বীকার করেনি। দোষ গুণ বিচারে, অতএব উভয় পক্ষই তুল্যমূল্য। পার্থক্যের মধ্যে এই, কারও ব্যক্তিগত আচরণ শোভন, কারও বা অশোভন। কিন্তু ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার বিষয়ে সমগ্র ক্ষত্রিয় নামধারী রাজন্যবর্গ সমান মানসিকতাসম্পন্ন। চার্বাক সাহচর্যের জন্য দুর্যোধন সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জের প্রতি কিছুটা নীতিপরায়ণ ছিল। পাণ্ডবেরা ব্রাহ্মণদের প্রতি অধিক মনোযোগী হওয়ায় প্রজাসাধারণ তাদের মনোযোগ স্বভাবতই কম পাচ্ছে বলে আমার অনুমান। তবে বিজয়ী পাণ্ডবেরা যে অচ্যুতের সংহিতা অনুসারেই রাজ্য প্রতিপালন করবেন এবং সামাজিক স্তরবিন্যাস ঘটাবেন, সে বিষয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। চাতুর্বর্ণ্য সমাজব্যবস্থার মধ্যে যে অসাম্য রয়েছে, তা প্রকৃতিপুঞ্জের জন্য যুগ-যুগান্তরব্যাপী সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করবে বলে আমার বিশ্বাস।

    পূর্ব-দিগন্তে রক্তাভা দেখা দিয়েছে। আমার বিনিদ্র রজনী শেষ হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সার্থবাহদল তাদের গন্তব্যের দিকে যাত্রা করবে। আমাকেও হস্তিনাপুরের পথে যাত্রা করতে হবে। কিন্তু বিগত রজনীর তাবৎ চিন্তা আমাকে নতুন করে ভাবিত করল। আমি কি যুধিষ্ঠিরের নিকট যাব? সে যদি আমাকে মহামন্ত্রিত্বের পদে নতুন করে বৃত করতে চায়, আমি কি সেই পদ গ্রহণ করব? নাকি আমি আমার শোকগ্রস্ত অগ্রজ, তৎপত্নী গান্ধারী এবং আমার দয়িতা কুন্তীর সঙ্গে গিয়ে মিলিত হব? হস্তিনাপুরে আমার পত্নী এবং পুত্রেরা আছেন। তাঁরা কুরুকুলের এই আবর্তের বাইরেই প্রথমাবধি অবস্থান করছেন। কুরুকুলের কাছে তাঁদের কোনো ঋণ নেই। আমার বোধ হচ্ছে যুধিষ্ঠিরের মন্ত্রিত্বের চাইতে সেই হতভাগ্য শোকার্ত অন্ধরাজা, গান্ধারী এবং কুন্তীরও হয়তো আমাকে এখন অনেক বেশি প্রয়োজন। আমি চিরকাল ভালোয়-মন্দয় এঁদের অনুগত ছায়ার মতো থেকেছি, তাঁদের স্নেহ, প্রীতি, প্রেম এবং হ্যাঁ, অনাদরও পেয়েছি। প্রেমে, অপ্রেমে তাঁরাই আমার আত্মার আত্মীয়। তাই বাকি জীবনটা তাঁদের সেবায়ই কাটুক। হস্তিনাপুরে মহামন্ত্রীর অভাব হবে না, কিন্তু তাঁরা যদি এখন বিদুরকে পান, সে তাঁদের এক মহাপ্রাপ্তি হবে, এবং আমারও। সেখানে আরও একজন আছেন, যিনি আমার সতীর্থ এবং আমাদের মতোই দুঃখ শোক এবং বয়সে জীর্ণ। তিনি সঞ্জয়। আমরা এই পঞ্চজন মিলে জীবনের শেষ দিনগুলিতে চেষ্টা করব, পাণ্ডবদের যতটা সুপরামর্শ দিতে পারি। গান্ধারী তাঁর তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণে আমাকে তত্ত্বজ্ঞান শিক্ষা দেবেন। আমাদের পরামর্শ যখন গ্রাহ্য হবে না-তখন আবার প্রব্রজ্যা নেব। এবারে একা নয়, আমরা পাঁচজনেই এই নগরী ত্যাগ করে চলে যাব মহারণ্যে-বানপ্রস্থে।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleমহাদেবী – অভীক সরকার
    Next Article দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    Related Articles

    মিহির সেনগুপ্ত

    বিষাদবৃক্ষ – মিহির সেনগুপ্ত

    November 12, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026
    Our Picks

    সাইলাস মারনার – জর্জ ইলিয়ট

    January 20, 2026

    কলিকাতার কথা (আদিকাণ্ড) – প্রমথনাথ মল্লিক

    January 20, 2026

    দশরূপা – সৌমিত্র বিশ্বাস

    January 20, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }