বিদুর – ৭
৭
আমার আগমনবার্তা শঙ্খদত্ত তাঁর অনুচরদ্বারা হস্তিনাপুরে অগ্রেই প্রেরণ করেছিলেন। সঞ্জয় একথা জ্ঞাত হয়ে নগরদ্বারে সানুচর উপস্থিত থেকে আমায় প্রত্যুদগমন করলেন। আমার প্রব্রজ্যাজনিত রুক্ষ বেশবাস তথা তাপসদিগের ন্যায় অচঞ্চল দৃষ্টি অবলোকন করে সঞ্জয় অতিশয় বেদনাক্লিষ্ট হলেন। অতঃপর প্রগাঢ় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে গদগদস্বরে বলতে লাগলেন। আর্য, আপনি এসেছেন! কিন্তু এত বিলম্ব করলেন কেন? আপনি যদি তখন রাজধানী পরিত্যাগ না করতেন, আপনার গুণেই হয়তো এই মহানিধন রুদ্ধ হতে পারত। কিন্তু হায় এখন তো সবই শেষ।
হস্তিনাপুর নগরী যেন আমার নিকট আশ্চর্যরকম নিস্তব্ধ লাগছিল। এই কি সর্বদা কোলাহলমুখর সেই পুরী যাকে পরিত্যাগ করে আমি একদা প্রব্রজ্যা নিয়েছিলাম। সেই পথিপার্শ্বস্থ সুসজ্জিত বিপণিসমূহ, মধ্যে মধ্যে সুরম্য উজ্জ্বল বর্ণরঞ্জিত দারুময় গৃহাবলি, শষ্পাচ্ছাদিত কুসুমাকীর্ণ উদ্যান। স্বচ্ছতোয়া তড়াগাদি সবই কেমন হতশ্রী বোধ হচ্ছে। যজ্ঞস্থলীসমূহে ব্রাহ্মণগণ স্বাধ্যায়ে রত নেই। তাঁদের উচ্চনাদযুক্ত কন্ঠ থেকে সামাদির সুখশ্রাব্য সংগীত ধ্বনিত হচ্ছে না। পূর্ববৎ বুধজনসমাকীর্ণ কাব্য ব্যাকরণ, দর্শনাদির মণ্ডপে কোনো সুউচ্চ কন্ঠে বিতণ্ডা ধ্বনিত হচ্ছে না। সুদর্শনা, সুবেশা নগরনটীদের গৃহপ্রাঙ্গণে নাগরিকদের চঞ্চল যাতায়াত নেই। এ যেন হস্তিনাপুরের ছায়ামূর্তি বিষণ্ণ বিমর্ষ দাঁড়িয়ে থেকে নিঃশব্দে ঘোষণা করছে-সর্বং কালঃ প্রকর্ষতি।
যখন এস্থান থেকে অপমানিত আত্মা, বিক্ষুব্ধহৃদয় জীবনের প্রগাঢ় কামনার প্রতি নৈরাশ্যকেই একমাত্র ভবিতব্য জ্ঞানে প্রব্রজ্যা অবলম্বন করেছিলাম, তখনও এখানে যে ব্যবহার দৃষ্ট হত, তার সামান্যতম অংশও যেন এখন দৃষ্ট হচ্ছে না। গৃহস্থেরা সেই সময়ের ন্যায় এখন মাতা, পিতা, স্ত্রী, পুত্রাদি বেষ্টিত হয়ে জীবন যাপন করছে না। এ সত্য পরিদৃষ্ট হচ্ছে না যে সমগ্র প্রাণীজগতের সঙ্গে প্রত্যেকেরই যোগ থাকা বাঞ্ছনীয়, প্রত্যেকের জীবনযাত্রার সঙ্গে প্রত্যেকের যোগ থাকা কাম্য। নচেৎ মানবপ্রবাহ রুদ্ধতা প্রাপ্ত হয়ে সঞ্চিতপঙ্কবক্ষ জলাশয়ের মতো ক্রমশ উষর ক্ষেত্রে রূপান্তরিত হতে থাকে।
মানব বহুতর অবস্থার স্তর পার হয়ে এই সব বোধে বুদ্ধ হয়েছে। এই নগরীতে বসবাসকারী মানবদের মধ্যে সেই বোধের স্ফুরণ আমি দেখে গিয়েছিলাম। কিন্তু আর তা যেন নেই। আমি যে ধর্ম আচরণে মানুষদের অভ্যস্ত দেখেছি, সে আচরণে তারা এখন আর ঋদ্ধ নয়। গৃহস্থধর্মই এতকাল সাধারণ্যে সর্বাপেক্ষা দায়িত্বশীল ধর্ম ছিল। যেখানে প্রত্যেকের প্রতি কর্তব্য পালন করে গৃহস্থ মানুষের অন্তঃকরণ ক্রমশ প্রসারিত হবার সুযোগ পেত। অন্যের সুখের জন্য নিজ সুখ বিসর্জনের দীক্ষা তো গৃহস্থাশ্রমেই লভ্য দেখেছি, এখন তার ব্যত্যয় দেখে মানসিক এক পীড়া বোধ করছি। এ কি মহাযুদ্ধের মহাধ্বংসের অব্যবহিত ফল? যুদ্ধ কি গৃহস্থগণকে বৈষয়িক বলয়ের বাইরের কোনো সত্তায় স্থাপন করেছে। নাগরিকেরা এত নির্বেদ প্রাপ্ত বলে বোধ হচ্ছে কেন?
সন্দেহ নেই যুদ্ধ এবং ধ্বংসই এই নগরীকে বর্তমানাবস্থায় নিয়ে এসেছে। আমি পূর্বাপর ব্যবস্থার মধ্যে সামঞ্জস্য করতে পারছি না বলে আমার সতীর্থ তথা শিষ্য সঞ্জয়কে জিজ্ঞেস করি, হে সঞ্জয়, লোকাচারের বর্তমান যে স্বরূপ আমি প্রত্যক্ষ করছি তার হেতু কী? আমাদের পূর্ববর্তী দার্শনিক জ্ঞান তথা বিশ্বাসের কি কিছু রূপান্তর ঘটেছে? যুগধর্ম কি পরিবর্তিত হয়েছে? আমি কেন প্রাক্তন নিয়মনিবন্ধসমূহ লোকব্যবহারে প্রত্যক্ষ করছি না?
সঞ্জয় বললেন, মহাত্মন্, আপনি যখন যুদ্ধসম্ভাব্য কালে এই পুরী ত্যাগ করেন, তারপর বহু দিবস, মাস, বৎসর বিগত হয়েছে। কুরুকুল ধ্বংস হয়েছে। যদুকুলও আত্মকলহে সামূহিক বিনষ্ট। আমাদের প্রপালক মহারাজা দুর্যোধন অন্তিম সময়ে তাঁর গুহ্য সলিলাবাস থেকে আত্মপ্রকাশ করে মহারাজ যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন, হে ধর্মরাজ, আমি যাদের জন্য রাজ্যলাভের অভিলাষ করেছিলাম, আমার সেই সব ভ্রাতা পরলোক গমন করেছেন। পৃথিবীও রত্নহীন এবং ক্ষত্রিয়শূন্য হয়েছে। বিধবা রমণী সদৃশ এই ধরাকে উপভোগ করার স্পৃহা আমার আর নেই। অতএব তুমি এখন এই হস্তী, অশ্ব, বান্ধবশূন্য পৃথ্বী ভোগ কর। আমি এখন মৃগচর্ম পরিধান করে বনগমন করব। রাজ্যভোগে আমার আর স্পৃহা নেই। আর্য, সেই মানী পুরুষপুঙ্গব যথার্থ কথাই কয়েছেন, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা যতই তাঁর নিন্দাবাদ করি, তিনি তাঁর ধর্ম পালন করেই গতাসু হয়েছেন। কিন্তু সেই ধর্মচিন্তা আজ আর বলবতী নয়। ধর্ম যেন তাঁর রূপ নিয়ত পরিবর্তন করেই চলেছেন। অথবা এমন বলাই কি সঙ্গত, যে এ এক যুগসন্ধিকাল? আর্য, আমি আমার আহৃত এতকালের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানের সাহায্যে যেন কিছুই যথার্থরূপে ব্যাখ্যা করতে পারছি না। আপনি এখন এসেছেন, দেখুন, যদি আপনার প্রজ্ঞার প্রবল আলোকে বর্তমান পরিবস্থাকে আমাদের নিকট উদ্ভাসিত করতে পারেন।
সঞ্জয় সহ পুরবর্ত্মিকাসমূহ অতিক্রম করতে করতে এইসব বার্তালাপ করছিলাম। সঞ্জয় অনেক কথাই বলছিলেন যা আমার অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে শ্রবণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা আমি পারিনি। আমার হৃদয় তখন এইসব ধর্ম দর্শনাদি বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন থেকে শুধুমাত্র এক প্রগাঢ় মিলনের জন্য কাতর। কতক্ষণে আমি সেই দুঃখমগ্ন তিনটি প্রাণের নিকটে যাব। তাঁরা আমাকে দর্শন করে, তাঁদের দুর্বহ শোকের অনুভব আমার দেহে সঞ্চারিত করবেন। এই-ই তখন আমার সমূহ প্রত্যাশাবিশ্ব।
প্রাসাদের অগ্রমঞ্চের সোপানে তখন সভ্রাতৃক যুধিষ্ঠির দাঁড়িয়ে। সবাই উপানহবিযুক্ত হয়ে আমার হস্তাকর্ষণ করে, কৃতকৃতার্থ স্বরে মঙ্গলাচরণ উচ্চারণে বলতে লাগলেন, হে মহাত্মা, আপনার প্রত্যাগমনে এ পুরী ধন্য হল, ক্ষত্তা, আপনি, আমাদিগের তাতকল্প। আমরা শোকমগ্ন, জ্ঞাতিবধে সন্তাপী, ক্ষমাপ্রার্থী। আপনি আপনার প্রজ্ঞার দ্বারা আমাদের সমুদয় নির্বেদ অপনয়ন করুন। আমরা আপনাকেই মহামন্ত্রিত্ব পদে বরণ করছি। আমরা এতাবৎকাল আপনারই প্রত্যাশায় ছিলাম।
সম্মিলিত ভ্রাতৃগণের মধ্যে আমি যুধিষ্ঠিরকে নিতান্ত ক্লেশক্লিষ্ট দেখলাম। তাঁর অবয়বে সুখ বা স্বস্তির কোনো চিহ্ন মাত্র নেই। সদ্যবিজয়ী চক্রবর্তী সম্রাটের এ হেন বিষণ্ণ ও বিপন্ন অবয়ব প্রত্যক্ষ করার কোনো পূর্বচিন্তা আমার মস্তিষ্কে ইতোপূর্বে আদৌ ছিল না। সে বিজয়ী না পরাজিত, তাঁর ব্যবহার বা শারীর বিন্যাসে সে সব কিছুই বোধগম্য হচ্ছিল না। তাঁর ভ্রাতৃগণ অবশ্য বিজয়ীর স্বাভাবিক বিভায় উজ্জ্বলই ছিল। তাদের অবয়বে ক্ষাত্রতেজ বিচ্ছুরিত হচ্ছিল। কিন্তু যুধিষ্ঠির ছিল ম্লান, নিষ্প্রভ।
সবার কুশলাদি জিজ্ঞাসান্তে যুধিষ্ঠিরকে একান্তে প্রশ্ন করলাম। বৎস, তুমি কি কোনো আত্মিক ক্লেশে বেপথু হয়েছ? তুমি এমন হতশ্রী কেন? এই মহাআহব তো তোমাকে ধনৈশ্বর্যশালী নিষ্কণ্টক এক মহারাজ্যের চক্রবর্তী রূপে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তুমি এবং তোমার ভ্রাতৃগণ স্ব স্ব প্রতিজ্ঞা পূরণে সার্থক হয়ে এখন এই মহারাজ্যের প্রপালক হয়েছ। শত্রুগণ সকলেই গতাসু এবং হতবীর্য হয়েছে। তবে এই শ্রীহীনতা কেন? উত্তরে যুধিষ্ঠির বললেন, ক্ষত্তা, আমার বোধ হচ্ছে, আমি নিতান্ত অজ্ঞানতাপ্রযুক্ত হয়ে এই মহাপাপ সংঘটিত করেছি। প্রতিহিংসা পরবশ হিংস্রতা নিতান্তই অনৈতিক। আত্মসুখার্থ যে ব্যক্তি এ কর্ম করে সে মানবিক বিচারে বিনষ্ট হতে বাধ্য। তাত, আমি এক্ষণে প্রকৃতই বিনষ্ট। আমি তাঁর এহেন বক্তব্যে ক্ষত্রোকুলোচিত স্বধর্ম প্রত্যক্ষ করলাম না। ক্ষত্রিয়জাতি বিষয়ে আমার বিচার ইতোপূর্বেই আমি বলেছি। যুধিষ্ঠিরের ব্রাহ্মণানুবর্তিতা বিষয়েও আমার ধারণা এবং বিচার বলা হয়েছে। কিন্তু তাঁর এই পরিবর্তন তো সামান্য ব্যাপার নয়। প্রশ্ন করি, বৎস, তোমার জ্ঞানলাভাবধি তুমি ধর্মপ্রাণ। সাধারণ্যে তোমার প্রতিষ্ঠা, ধর্মাত্মা, ধর্মরাজ, ধর্মপুত্র হিসাবে। কিন্তু আমাদিগের সমাজে ধর্ম বলতে কোনো একক নির্দিষ্ট ধারণা নেই। আমি বিদুর, যে কিনা ব্রাহ্মণ ঔরসজাত হওয়া সত্ত্বেও সূত। আমাকেও বেশ কিছুকালাবধি সকলেই ধর্ম নামে অভিহিত করছে। কিন্তু এই ধর্মের স্বরূপ তো অচ্যুত বা পিতা বাদরায়ণি কথিত চাতুর্বর্ণ্য ধর্মের নয়। আমি নানা তীর্থ পর্যটন করেছি। নানা সম্প্রদায়ের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। তাঁদের আচার-আচরণ সম্পর্কে আমি সম্যক জ্ঞাত। আমার আচার-আচরণের মধ্যে প্রভূত লোকায়ত সংস্কৃতির প্রভাব লক্ষণীয়। কিন্তু তুমি কীভাবে সেই লোকায়ত সংস্কৃতিকেও অতিক্রম করে ক্ষপণকদের আশ্রিত আচরণের অনুসারী হয়েছ, একথা বোধগম্য হচ্ছে না। তুমি কি সৌগতপন্থা অবলম্বন করে এমন হিংসাশূন্য অবস্থা প্রাপ্ত হয়েছ?
যুধিষ্ঠির আমার হস্তাকর্ষণ করে একান্তে চলতে চলতে বলতে লাগলেন, ক্ষত্তা, আপনি প্রথমে আপনার এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিজনিত অপেক্ষমাণ অবশ্য-কর্তব্যাদি সমাপন করুন। আপনার সহিত আমার গভীর আলাপনের আবশ্যকতা আছে। আমি আপনার সেই যুধিষ্ঠির আছি অথবা নেইও। কিন্তু সে বিচার যথাসময়ে হবে। আপনি প্রথমে এই হতভাগ্য মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র, মন্দভাগ্যা জননী গান্ধারী এবং তাঁদের অনুগামিনী ছায়াপ্রায় কুন্তীর সম্মুখীন হয়ে বিগত মহাযুদ্ধের প্রখর সন্তাপে নিজেকে দগ্ধ করুন। আপনার ক্লেশের জন্য এখনও অনেক যন্ত্রণাই অপেক্ষা করে আছে। মানুষকে তার কৃতকর্মের ফল অবশ্য ভোগ করতে হবে। আপনি এক্ষণে সেই ফল ভোগ করুন। অন্তঃপর আমার নিজস্ব কথন ব্যক্ত করব।
যুধিষ্ঠিরের এবংবিধ বাক্য শ্রবণ করে আমার অকস্মাৎ যেন নতুন করে স্মরণ হল, সে আমারই ঔরসজাত। অতএব এ বাক্য একমাত্র সেই-ই বলতে পারে। যজ্ঞদত্তকেও এই দহন কামনা নিয়েই আমি অনুরোধ করেছিলাম কুরুক্ষেত্রের অন্তিম বিষাদ বিবৃত করতে।
যুধিষ্ঠির নিজেকে যেন দীনের চাইতেও অতি দীনভাবে আমার সম্মুখে প্রকট করতে লাগলেন। আমি সাতিশয় ক্লেশ-পরতন্ত্র হৃদয়ে অবরোধের উদ্দেশে সঞ্জয়ের সঙ্গে গমনাভিলাষী হলাম। বুঝলাম, যুধিষ্ঠির ব্যবহারিক ক্রমে আর চক্রবর্তী সম্রাটের স্তরে অবস্থিত নেই। তার এক অন্য উত্তরণ ঘটেছে, যা রাজরাজত্বের সাময়িকতাকে তুচ্ছ করে মানব-হিতৈষণার অন্য এক দিগদর্শনের পথ সন্ধানে ব্যাকুল।
সঞ্জয় আমাকে মূল প্রাসাদের একটি নির্দিষ্ট কক্ষ্যার প্রবেশদ্বারে পরিত্যাগ করে সানুনয় বচনে বললেন, আমি জ্ঞানাবধি আপনার অনুগত ছায়ামাত্র। আপনার অনুগমন করা আমার অবশ্য কর্তব্য। কিন্তু হে মহাভাগ, আপনি আমার এই স্বাধিকার সিদ্ধান্ত ক্ষমা করুন। কারণ আপনাদের এই করুণ মর্মবিদারক মিলনদৃশ্য আমি সহ্য করতে পারব না। একথা বলে সঞ্জয় অন্তর্হিত হলেন। কক্ষ্যার সোপানে দাঁড়িয়ে বিপুল এই কৌরব প্রাসাদের সুউচ্চ ডৌল থেকে গর্ভগৃহ পর্যন্ত পরিসরে সামান্যতম শব্দের আভাসও আমার শ্রুতিগোচর হচ্ছিল না। সর্বত্রই বিগত মহাযুদ্ধের স্মৃতিস্বরূপ এক গাঢ় বিষণ্ণতা ঊর্ণনাভের মতো তার জাল বিস্তার করে রেখেছিল। যে প্রাসাদে একদিন অমিততেজা কৌরব পুরুষেরা উজ্জ্বলবস্ত্র বিভূষিত হয়ে, চন্দনচর্চিত তথা গন্ধমাল্যাদি পরিশোভিত হয়ে বিরাজ করতেন, সেস্থান যেন এখন ক্ষপণকদের নিরলংকার বৈহারিক গুহা সদৃশ বোধ হচ্ছে।
তখন সময় দিবসের শেষ যাম। গবাক্ষপথে ক্ষীণ সবিতৃচ্ছটায় ত্র্যসরেণুর স্পন্দমানতাটুকুই যেন কুরুবিশ্বে একমাত্র আলোড়নকারী চৈতন্য। কক্ষ্যায় প্রবেশকালে অনুভবেও বোধ করিনি যে অভ্যন্তরে কোনো সজীব প্রাণের অবস্থিতি আছে। কিন্তু দুই পদ অগ্রসর হতেই এই সমুদয় নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে গম্ভীর ভেরী নির্ঘোষের ন্যায় শব্দ প্রসারিত হল-কোঅয়ম আয়াতি? মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যেন গভীরতম এক পর্বতগুহার মধ্য থেকে প্রশ্ন করলেন। বিপুল এক নৈঃশব্দ থেকে এমন গম্ভীর নির্ঘোষে অলিন্দ এবং সৌধচূড়া আশ্রয়কারী বিহঙ্গেরা পক্ষধ্বনি বিস্তার করে গোধূলির শান্ততা ছিন্নভিন্ন করে দিল যেন। মনে হল বহু বহুকাল পরে, এই প্রাসাদে কোনো ‘রাজবদুন্নতো’ নির্ঘোষ ব্যাপ্তি পেল। ভাবলাম, এই-গৃহ কি এতকাল ঈদৃশ্য ধ্বনিবিহীন ছিল? এখানে কি এতদকাল রাজকীয় কোনো রবই উত্থিত হয়নি? পরপর তিনটি পাশাপাশি বেদিকায় আমি সেই কক্ষ্যায় দিবসের শেষ যামের ম্লান আলোয় তিনটি বিষাদ মূর্তিকে উপবিষ্ট দেখলাম। দেখলাম, অতীত যেন শুধুমাত্র কালের কৌতুক চরিতার্থ করার নিমিত্ত অসহায়ভাবে এক স্থবির জৈবিকতা বহন করছে। জীবনের এই অর্থহীন বহতার কথা মৈত্রেয়ও আমায় কিছু উপদেশ করেননি, আমার প্রাক্তন আচার্যদের নিকট থেকেও এই বিড়ম্বিত অনন্ত উজাগরীর কোনো ব্যাখ্যা আমি পাইনি। আমার কন্ঠে কোনো সম্ভাষণ স্বাভাবিকতায় উচ্চারিত হচ্ছিল না। এই শুক্ল বেশধারী, শীর্ণ, বিষাদগ্রস্ত তথা ধ্বস্ত নারীদ্বয় এবং এই পুরুষকেই কি আমি নিজ অবমাননার অভিমানে পরিত্যাগ করে প্রব্রজ্যায় গিয়েছিলাম? এই কি সেই পুত্রস্নেহাতুর রাজ্যকামুক ধৃতরাষ্ট্র? এই কি সেই মহামান্যা অভিমানিনী প্রজ্ঞাবতী গান্ধারী? অথবা এই কি সেই স্বয়ংসিদ্ধা সতত স্বতন্ত্রা, ক্ষুরধার বুদ্ধিশালিনী কুন্তী? যন্ত্রবৎ তাঁদের সমীপবর্তী হয়ে ক্রমানুসারে অভিবাদন করে প্রায় অর্ধবাক উচ্চারণে বললাম, মহারাজ আমি বিদুর। এই ঘোর তামসে পুনর্বার আপনাদের সেবা এবং সাহচর্যের জন্য উপস্থিত হয়েছি। কৃপা করে আমাকে গ্রহণ করুন। আমি অত্যন্ত অনুতপ্ত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।
এ সংবাদে ধৃতরাষ্ট্র ত্বরিৎ গতিতে উত্থিত হয়ে ব্যাকুল কন্ঠে যেন আর্তনাদ করে উঠলেন, ভ্রাতঃ, প্রাণাধিক বিদুর, তুমি এসেছ? অহোভাগ্য অহোভাগ্য! গান্ধারী, শুনেছ আমার প্রাণপ্রিয় আত্মতুল্য ভ্রাতা বিদুর এসেছেন। এই সেই মহাত্মা, যাঁর কোনো সদুপদেশ আমাকে আমার অপকর্ম থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। যাঁকে আমি সতত অসম্মান এবং লাঞ্ছনায় নিষ্পিষ্ট করে এই পুরী ত্যাগ করতে বাধ্য করেছি এবং ফলত স্বয়ং সকুলে বিনষ্ট হয়েছি। সেই বিদুর আবার অনুগ্রহ করে আমার কাছে এসেছেন। গান্ধারী, আমি আর শোককে, নৈঃশব্দকে নৈরাশ্যকে ভয় করি না। আমার আত্মার আত্মীয় পরম প্রাজ্ঞ বিদুর এসেছেন। স্বাগত স্বাগত ভ্রাতঃ ।
কুন্তী এবং গান্ধারীও যেন সদ্য চেতনাপ্রাপ্তের ন্যায় বেদিকা থেকে উত্থিত হয়ে বলতে লাগলেন, স্বাগত ক্ষত্তা, স্বাগত। স্বাগত প্রিয় দেবর, স্বাগত।
এরকম এক হার্দিক সংবর্ধনায় আমি যেন আরও বেদনাক্লিষ্ট হলাম। হায়! তুচ্ছ অভিমানবশে এঁদেরই আমি পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিলাম। তাঁরা যে আমার প্রতি কী পরিমাণে নির্ভরশীল, সেকথা তখন চিন্তামাত্রও করলাম না! আমার নিজের প্রতি বড়ো ধিক্কার বোধ জন্মাল।
আবার আমার পরম প্রিয় এবং শ্রদ্ধেয় জনেদের নিকট এমন আদৃত হয়ে আমার নিয়তবিষণ্ণ অন্তঃকরণেও যেন আনন্দের জ্যোতিঃপ্রবাহ চঞ্চল সৌদামিনীর মতো বিচ্ছুরিত হতে লাগল। আমি একে একে প্রত্যেককেই আঘ্রাণ, আলিঙ্গনাদি করার পর হস্তধারণ করে স্ব স্ব বেদিকায় উপবিষ্ট করালাম। স্বয়ং তাঁদের পদপ্রান্তের কুট্টিমে উপবেশন করে বললাম, আপনারা আমাকে হৃদয় থেকে মার্জনা করুন। আমি মহা অপরাধী। স্বজনের প্লবমানতা কালে যে ব্যক্তি তাঁদের পরিত্যাগ করে, সে কৃতঘ্ন। আমার মহা অপরাধ এই যে আমি পুত্রকল্পদের প্রতি অভিমানবশত অতি ঘোর সংকট সময়ে স্ব-দায়িত্ব পরিত্যাগ করে আত্মস্বার্থীপথ অবলম্বন করেছিলাম। আমার দীর্ঘ প্রব্রজ্যায় যদি কিছুমাত্র তত্ত্বজ্ঞান আমার লাভ হয়ে থাকে, তবে তা এই যে নির্ধারিত প্লবতা কোনো একক ব্যক্তিত্বের অপরাধের ফল নয়। সমাজের সমগ্র মানুষই সেই প্লবতার বা দ্রোহের কারণসমূহকে কোনো-না-কোনোভাবে ঋদ্ধ করে থাকে। দ্রোহ বা প্লবতা যদি অবশ্যম্ভাবী হয়ই, তবে তাকে পশ্চাতে রেখে আত্মগোপন করা অবশ্যই অধর্ম। মহারাজ, আমি সেই অধর্মে ক্লিষ্ট। আমি প্রজ্ঞাভিমানী হয়ে প্রজ্ঞারই অবমাননা করেছি। বস্তুত আমি যখন এই পুরী ত্যাগ করে প্রব্রজ্যায় গমন করি, তখন প্রজ্ঞা নয় অভিমানই আমাকে আচ্ছন্ন করেছিল। নতুবা এই মহারাজ্যের মহামন্ত্রী এবং এই কুলের একজন অর্ধভ্রাতা হয়েও সেই মহাপ্লাবনিক সন্ধিক্ষণে কীভাবে আমার পুরীত্যাগ সঙ্গত হতে পারে?
গান্ধারী বললেন, ক্ষত্তা, আপনিও দেখছি যুধিষ্ঠিরের মতো সৌগত যুক্তির অবতারণা করছেন। আমরা যে দেশ কালে সমৃদ্ধ ছিলাম, তখন এই জাতীয় আন্বীক্ষিকী কিন্তু আদৌ প্রশংসিত ছিল না। অধুনা, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পরবর্তীকালে, দেখছি বেদ বহির্ভূত আন্বীক্ষিকীই প্রকৃত বিস্তৃতি পাচ্ছে। বর্তমান নাগরিকগণ বেদনির্দিষ্ট অন্বীক্ষা পরিত্যাগ করে যজ্ঞাদি বিস্মৃত হচ্ছেন। চার্বাক তথা সৌগত পরম্পরায় তাঁরা এক্ষণে বর্ণাশ্রমী সমাজকে উপেক্ষা করতেই যেন অধিক সচেষ্ট। অথচ ঈদৃশ নবচেতনাও যে লোকাচারে সামগ্রিকভাবে সমৃদ্ধি পাচ্ছে তাও নয়। এই সময়টা যেন এক অদ্ভূত এবং অজ্ঞাতপূর্ব অধ্যায়। যখন প্রাক্তন স্থিতিশীলতাও প্রতিষ্ঠিত নেই আবার নূতন সমাজ বিন্যাসেরও কোনো শক্ত ভিত্তির উপস্থিতি দেখছি না। ক্ষত্তা, এমত অনুমানের হেতু নেই যে, আমি পুত্রশোকাতুর বলে এই মহারাজের মতো বিগতচিন্তন হয়েছি। আমার চিন্তনস্রোত খুবই স্বচ্ছ এবং সেই স্বচ্ছতায় বর্তমানকালীন পরিবস্থাও যথোচিত স্বচ্ছতায় গ্রাহ্য। আমাদের অধুনা যদ্যপি কিছুই আর নেই, তথাপি আমি এই পরিবর্তন লক্ষ না করে পারছি না। বর্তমানে, আমি বীতরাগভয়ক্রোধঃ । আমার মস্তিষ্ককেই তবু সচল রেখেছি একটি কারণবশত, যে আমি কালতত্ত্বজিজ্ঞাসু। কালের আচরণ কি এমতই?
যজ্ঞদত্ত যে গান্ধারীর বর্ণন আমার কাছে করেছিলেন সেই গান্ধারীকে আমি এখন সম্যক অবলোকন এবং উপলব্ধি করছি। এ এক অসামান্যা নারী। আমার পরিচিত বিশ্বে এই দার্ঢ্য এই অনির্বচনীয় বিকাশ কোনো নারীর মধ্যে আমি প্রাপ্ত হইনি। এও কি সম্ভব! যে রমণী বয়ঃসন্ধিকাল থেকে স্বেচ্ছান্ধা, যে নিজ পুত্রদেরও স্নেহবশত কোনোদিন জীবিতাবস্থায় স্বচক্ষে অবলোকন করেননি, শুধুমাত্র তাদের মৃতশরীর দর্শন করেছেন, তাঁর জীবনে এমন তত্ত্বজিজ্ঞাসা এখনও এমন চমৎকারভাবে জীবন্ত! আমার মনে হল যে সৃষ্টিতে সব নারীই অতি অমূল্য সৃষ্টি। তাঁরাই সমস্ত জ্ঞান, প্রজ্ঞার মূলাধার।
কুন্তী বললেন, দেবর, তুমি যুধিষ্ঠিরকে অবলোকন করো। যে মহাপ্লব সংঘটিত হবার ছিল, তা ঘটেছে। অনুমানে বোধহয় এর কোনো ব্যত্যয় ছিল না। কুরু এবং পাণ্ডবকুল কেউই জয়ী বা পরাজিত হয়নি। লোকক্ষয় যেন নির্ধারিত ছিলই। সেকারণে লোকক্ষয় হয়েছে। তুমি নিশ্চিত জান এ বিরোধ কুরুপাণ্ডবেরই শুধু নয়, কুরু-পাঞ্চাল তথা সমগ্র ভারতীয় রাজকুলেরও। যদু, কুরু, পাঞ্চাল তিন কুলই ধ্বংস। তার সঙ্গে অন্যান্য অনেক ক্ষুদ্র কুলও। কৃষ্ণ হয়তো যথার্থই বলেছেন যে এরা সবাই নিহত হয়েই আছেন। পাণ্ডবেরা উপলক্ষ-মাত্র। কিন্তু সেই উপলক্ষকে কেন্দ্র করে যুধিষ্ঠির যদি এখন ক্ষপণকবৃত্তি অবলম্বন করেন তবে অবশিষ্ট প্রকৃতিপুঞ্জের প্রতি কি সুবিচার হয়? বিজিত রাজ্য ভোগ করার বয়স বা মানসিক অবস্থা অবশ্যই যুধিষ্ঠিরের থাকার কথা নয়। তথাপি যে সব বীর যোদ্ধাগণ এই মহা আহবে আপন আপন প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাদের সন্ততি, বিধবাগণ এবং প্রকৃতিপুঞ্জের ভবিষ্যতের জন্য কি এক সুষ্ঠু সাবলীল ও স্বচ্ছল শাসনক্রমের আবশ্যকতা নেই? আমাদের জীবনের ধারা বহু পথ অতিক্রম করে এখন ক্ষীয়মান। কিন্তু যেসব পিতৃহীন শিশুরা জীবিত আছে এবং ক্রমশ বর্ধিত হবে আর নতুন বিশ্বে বিকশিত হবে, তাদের পোষণের চিন্তার ভার কি এই মহা আহবে জীবিত রাজতন্ত্রীদের নেই? তবে এই আহবের অর্থ কী? দেবর, প্রাক্তন কৌরব ব্যবহার চিন্তায় রেখেও একথা কি যথার্থ ভাবে বলা যায় না যে আমার সন্তানেরাও এই যুদ্ধের জন্য বহুলাংশেই দায়ী? অথবা এই আহবে কেই-বা আমাদের মধ্যে নিষ্কলুষ? তুমি, আমি, মান্যা গান্ধারী, আমার ভ্রাতৃশ্বশুর এই হতভাগ্য অন্ধরাজা, ভীষ্ম, আচার্য দ্রোণ এবং কে নয়? মনান্তর মতান্তর জ্ঞাতিজনের মধ্যে কিছু বিচিত্র নয়। কিন্তু তা বলে এই মহাধ্বংস!
ধৃতরাষ্ট্র সখেদে বললেন, না বৎস। এই সমগ্র বিপর্যয়ই আমার বুদ্ধিভ্রষ্টতার কুফল। আমি তো কোনো সদবিচার বা সৎ পরামর্শে কর্ণপাত করিনি। যুদ্ধ আন্তরিকভাবে আমিও কামনা করিনি। বস্তুত আমার বিশ্বাস ছিল, শান্তিকামী গৃহস্থাশ্রমপ্রেমী যুধিষ্ঠির কদাচ যুদ্ধে রত হবেন না। কিন্তু সে তো একা নয়। অন্যান্য পাণ্ডবেরা তাঁকে যতই মান্য করুন, তাঁর যুদ্ধবিরোধী নীতির প্রতি, তাঁরা কদাচ সহমত ছিলেন না। কৃষ্ণ তাঁর তত্ত্ব এবং চাতুর্য অবলম্বনে যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুললেন। অথচ তাঁর পক্ষে দুর্যোধনকে বন্দি করেও অবস্থার উন্নতি সাধন কিছুমাত্র অসম্ভব ছিল না।
আমি বললাম, মহারাজ আপনি, আপনারা ধৈর্য অবলম্বন করুন। আজ জ্ঞাতিগণ ধ্বংসপ্রাপ্ত। আমরা সকলেই ব্যথিতচিত্ত এবং বিষণ্ণ। কিন্তু ক্ষমতা প্রতিষ্ঠাকল্পে সব ক্ষত্রিয়কুলই কি এই যুদ্ধের আয়োজন করেনি? সেকারণেই সকলে এই যুদ্ধে বিনষ্ট হয়েছে। আর্যাবর্তীয় সব রাজন্যই ছোটো বড়ো নির্বিশেষে লোভকে আরাধ্য করেছিল। সেই লোভই তার অন্তঃস্থ অগ্নিতে সকলকে দগ্ধ করেছে। বায়ু, পিত্ত, কফের অসাম্যে শরীর যদি ব্যাধিগ্রস্ত হয়, বৈদ্যরা তার নিরাময়ে সক্ষম হন। কিন্তু ব্যাধি যদি রিপুর হয়, সেই রোগের প্রতিকার হয় না। সেই রোগ তখন দেহের বিনষ্টি ঘটায়। মহারাজ, এঁরা সকলেই লোভ-নামক রিপুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে ব্যাধিগ্রস্ত হয়েছিলেন। অতএব, এজন্য সন্তাপ বৃথা। কাল যেমন এদের সৃষ্টি করেছিল, সেই কালই আবার তাদের গ্রাস করেছে। মানুষ কালের উপর প্রভূত্ব করার মানসে তাকে অতিক্রম করতে চাইলেও, সে অনতিক্রমণীয়ই থাকে। একক মানুষের অপরাধই যেমন কোনো প্লবতার জন্য দায়ী নয় তেমনই একক মানুষের শুভবুদ্ধিও সেই প্লবতাকে রোধ করতে পারে না। অন্যান্য প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মতো যুদ্ধও যেন এক প্রাকৃতিক নিবন্ধ। কেননা, মানুষ যে লোভ, মাৎসর্য, ক্রোধ এবং অসূয়াপরতন্ত্র হয়ে যুদ্ধকামী হয়, সেই সকল রিপুসমূহও প্রকৃতিজাত। মানুষ তার পরম সম্পদ বিচারবুদ্ধির সাহায্যে এই রিপুসমূহের উপর নিয়ন্ত্রণকামী হয় এবং নিয়ত তপস্যার দ্বারা এর প্রভাবে উত্তীর্ণ হতে প্রযত্ন করে। কিন্তু বিচারবুদ্ধিও যে সতত শুভকামী হবে এমন কোনো ধ্রুব নিয়ম নেই। রিপুসমূহ সতত অতন্দ্র কিন্তু বিচারবুদ্ধিকে সেমত অতন্দ্রতায় জাগরূক রাখা কঠিন তপস্যাসাপেক্ষ। আবার সব মানুষই একসঙ্গে সেই তপস্যায় ব্রতী হতে পারে না। ফলত জগতে সংঘাত সংঘর্ষের বিলুপ্তিও হয় না।
এইরকম নানা বাক্যালাপ এবং খেদ প্রকাশের পর আমি পরবর্তী কর্তব্য-কর্ম বিষয়ে চিন্তাশীল ছিলাম। যুধিষ্ঠিরের বিষয়ে এই দুই রমণী যা যা বললেন তাতে মনে হল সে চূড়ান্ত বিপন্নতার শিকার হয়েছে। এক অনিবার্য নির্বেদ তার অন্তরে স্থায়ী আসন পেতে বসেছে। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে তাঁর এই অন্তর্বেদনা প্রশমনার্থে পিতা বাদরায়ণি তাঁকে অশ্বমেধ যজ্ঞ করবার পরামর্শ দেন। তাঁর ভ্রাতৃগণ, ব্রাহ্মণগণ এবং সুহৃদবর্গ সকলেই সেই কর্মযজ্ঞে যুধিষ্ঠিরকে উৎসাহিত করার প্রয়াস পান। কিন্তু সেই যজ্ঞ যথোচিত শাস্ত্রানুসারে সম্পাদিত হলেও তিনি নির্বেদমুক্ত হলেন না। ক্ষত্রজনোচিত গৌরববোধ তথাপি তাঁর বিমর্ষতা বিমোচনে সমর্থ হল না। প্রভাসে অবস্থান কালেই একথা উদ্ধব আমায় বলেছিলেন। বলেছিলেন, প্রিয় বিদুর, বোধ হচ্ছে বৈদিক সমাজের কাল অন্তর্হিত হয়েছে। মহারাজ যুধিষ্ঠিরের যজ্ঞ শেষে এক ক্ষপণক যজ্ঞদ্বারে সাতিশয় ঔদ্ধত্যপূর্ণ দৃঢ়তায় দণ্ডায়মান হয়ে সরোষে বলেছিল, “এই অশ্বমেধ যজ্ঞ অতি তুচ্ছ। ধনবানের দান অশ্রদ্ধেয়, যে দানের জন্য দাতাকে কোনো কৃচ্ছ্রসাধন করতে হয় না, তার কোনো মূল্য নেই।” সেই ক্ষপণক এক কাহিনিও বিবৃত করেছিল তখন। বলেছিল, “আমি দেখেছি সেই অপূর্ব যজ্ঞ, যেখানে এক ভিক্ষু সারাদিনের শেষে একমুঠো যব ভিক্ষা পেলেন। সেই যবচূর্ণ সত্তু আহার করবার প্রাক্কালে এক অতিথি তাঁর কাছে খাদ্য প্রত্যাশী হল। ভিক্ষু তাঁর আহার তাঁকে সহর্ষে তুলে দিলেন। কিন্তু ওই স্বল্পাহারে অতিথি পরিতৃপ্ত না হলে, ভিক্ষু তাঁর পত্নী, পুত্র ও পুত্রবধূর আহার্য সত্তুও তাঁকে নিবেদন করলেন। মহারাজ, এই অশ্বমেধ অপেক্ষা সেই যজ্ঞ কি সহস্রগুণে অধিক শ্রেষ্ঠ নয়?” উদ্ধব বলেছিলেন তদবধি যুধিষ্ঠির নাকি ভিক্ষুজীবন যাপন করার জন্য আকুল হয়ে আছেন। এক্ষণে গান্ধারী, কুন্তী এবং আমার অগ্রজের নিকটেই সেই মর্মে বিবিধ সংবাদ জ্ঞাত হলাম।
একদা যুধিষ্ঠিরাদি পঞ্চভ্রাতা এবং আমি তত্ত্বালোচনা করছিলাম। ধর্ম অর্থ কাম এবং মোক্ষ এই চতুর্বর্গের মধ্যে কোন বর্গ শ্রেষ্ঠ সে বিষয়ে যুধিষ্ঠির প্রশ্ন করলে, আমি বলেছিলাম, ধর্ম শ্রেষ্ঠ। অর্জুন কর্মকে শ্রেষ্ঠ বললেন, ভীম কামকে এবং নকুল সহদেব অর্থকেই শ্রেষ্ঠ প্রতিপাদ্য করলেন। বস্তুত অর্জুন কোনো বর্গকেই শ্রেষ্ঠ বললেন না। কর্ম কোনো বর্গ নয়। তাঁর সখা এবং শিক্ষক অচ্যুত তাঁকে নিরন্তর কর্মবিষয়ে উপদেশ প্রদান করেন বলে, তাঁর সেরূপ উত্তর প্রদান স্বাভাবিক ছিল। যুধিষ্ঠির বললেন, তোমরা সবাই শাস্ত্র অবগত হয়েছ। কিন্তু আমি বলি, যিনি পাপানুষ্ঠান করেন না বা পুণ্যাচরণ করেন না তিনিই সুখদুঃখ থেকে মুক্ত হতে পারেন। মোক্ষ যে কি বস্তু আমরা তার কিছুই জানি না। তবে আমার মতে মোক্ষই সবচেয়ে ভালো।’ যুধিষ্ঠির কোনো নির্দিষ্ট পথের সন্ধান নিশ্চয় করে পাননি। শুধু কর্মপাশ মুক্ত হবার এক অদম্য কাঙ্খা তাঁর মধ্যে ক্রীড়াশীল ছিল। কিন্তু অচ্যুত তো একথা অব্যর্থ বলেছেন যে কর্মহীনতায় কেউ মুহূর্তকালও থাকতে পারে না।
যুধিষ্ঠিরের মধ্যে একটি প্রবণতা তাঁর বাল্যাবধি আমার নিকট প্রকট হয়েছে যে সে স্বাভাবিক ধর্মে নিরন্তর তত্ত্বজিজ্ঞাসু। তাঁর নিজস্ব বক্তব্য প্রায় কিছুই নেই, শুধু অপার জিজ্ঞাসা। বনবাসকালে, আরণ্যক ঋষিগণ তাঁর এই অনন্ত জিজ্ঞাসার নিমিত্ত কত যে পৌরাণিক কাহিনি তাঁকে শুনিয়েছেন তার অন্ত নেই। সে যেন তাবৎ বিশ্বের শিক্ষালয়ে এক চিরন্তন স্বাধ্যায়ী। শুধু জানতে হবে, বুঝতে হবে এবং মানুষের প্রাণসংশয় কালে এই স্বাধ্যায়লব্ধ জ্ঞানের পরীক্ষা দিতে হবে। কিন্তু রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করতে হবে বা সেকারণে যুদ্ধ, দ্রোহ প্লবতার সপক্ষে অনুশীলন করতে হবে, এ যেন তাঁর স্বধর্ম নয়। ফলত এই ধ্বংসের পরে যে বিজয় লাভ হল, যে রাজ্য হস্তগত হল, তা যেন তাঁর কাম্য নয়, ঈপ্সিত নয়। সেকারণে, তিনি আজ ক্ষপণক বা ভিক্ষু হয়ে একাহারী, বৃক্ষতলবাসী হয়ে এই ব্যথিত জীবনের শেষ ভাগ অতিবাহিত করতে চান। এই ভাব, বিবেক এবং চর্যায় নিহিত জীবন-যুধিষ্ঠিরকে চিনতে আমার কোনো অসুবিধে হয় না। আমি আমার প্রচ্ছায়া তাঁর মধ্যে সম্যক অবলোকন করি। যে কারণে আমি পরিব্রাজক হয়ে এই পুরী ত্যাগ করে দীর্ঘকাল তীর্থে তীর্থে ভ্রমণ করি, সেই কারণেই যুধিষ্ঠির ভিক্ষু বা ক্ষপণক জীবনে প্রয়াসী হয়ে বাকি জীবন যাপন করতে চান। তিনি তা পারেন না, কেননা, তাঁকে ক্ষত্রিয় চরিত্রচর্যার পথে নিরন্তর চলমান রাখার জন্য তাঁর ভ্রাতৃগণ তথা পারিপার্শ্বিকতা সর্বদাই সতর্ক থাকে। অশ্বমেধে তাঁর রুচি না থাকলেও তাঁকে তা সম্পন্ন করতে হয়। চার্বাকের তিরস্কার তাঁকে ব্যথিত করলেও ব্রাহ্মণদের চার্বাক নিধনরূপ অন্যায়কে বহন করতে হয় এবং এভাবেই তিনি নিজেকে ক্রমান্বয়ে ধ্বস্ত করে চলেন। এই একই প্রকারেই কর্ণ নিহত হলে এক অজ্ঞাত উন্মাদনায় তিনি নৃত্য করেন। দ্রোণকে অর্ধসত্য বলে, তাঁর হত্যার কারণ হন এবং ভীষ্মের মৃত্যুর উপায় তাঁর নিকট থেকেই জ্ঞাত হয়ে তাঁর বিরুদ্ধে শিখণ্ডীকে দাঁড় করান। যুধিষ্ঠির কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলনেই অভ্যস্ত নন। তিনি দশচক্রে যুদ্ধে যুযুধান। মূলত তিনি যুদ্ধবিরোধী, তত্ত্বজিজ্ঞাসু প্রায় এক তপোবনবাসী ঋষিবালকের ন্যায়। কিন্তু ক্ষত্রিয়তন্ত্র তাঁকে দিয়ে অনেকবিধ অন্যায় করিয়ে নেয়। তিনি কখনোই ওই রাহুগ্রাসমুক্ত হতে পারেন না। আর এখানেই তার সমূহ সংকট।
কিন্তু আমি শাসনক্রমের বর্তমান পরিস্থিতি অবলোকন করে অবগত হলাম যে একটি সুস্থ সাবলীল মন্ত্রীসভার অবর্তমানে প্রকৃতিপুঞ্জের অবস্থা ভয়াবহ। সেক্ষেত্রে আমি আমার প্রাক্তন মন্ত্রীবর্গকে আহ্বান করে যদি অচিরে কোনো নবতর ব্যবস্থাপনার আয়োজন না করি তবে পরিস্থিতি প্রকৃতই মাৎস্যন্যায়ী হয়ে পড়বে। বৈরাগ্য বা ক্ষপণকবৃত্তি বস্তুত কোনো সমাজহিতৈষণার জন্য প্রার্থিত হতে পারে না। সন্ন্যাসধর্ম কোনো সমাজ সৃজন করে না। আর সমাজ যখন প্রাকৃতিক নির্বন্ধে একবার বাস্তবতায় স্থাপিতই হয়েছে তাকে সংরক্ষণ করার ধর্মও পালন করতেই হবে। আমাদের পূর্বজরা এই গৃহস্থাশ্রম নামক অতিসুখকর একটি ব্যবস্থা বহু তপস্যায় স্থাপিত করেছেন। সেই আশ্রমকে রক্ষাকল্পে রাজাদের আবির্ভাব বা সৃজন হয়েছে। ফলত তার শাখাপ্রশাখা বিস্তারিত হয়ে এক বৃহৎ মানবসমাজ ব্যক্তিক চর্যাকে সামাজিক স্তরে উন্নীত করে গড়ে উঠেছে। ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্য, বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাস সেই সমাজেরই এক একটি শাখা বা স্তর। একমাত্র গার্হস্থ্যস্তরেই বাকি সমুদয় শাখার রস সংগ্রহ সম্ভব। কেননা গার্হস্থ্যই সমাজের ভিত্তিভূমি। বাকি সব শাখাই শুষ্কপত্রের মতো ঝরে যাবে যদি গার্হস্থ্য তার দয়া বা করুণার দক্ষিণহস্ত প্রসারিত না রাখে। অতএব গার্হস্থ্যের চূড়ান্ত প্রতিনিধি রাজা যদি ক্ষপণক বৃত্তি অবলম্বন করেন তবে তা অধর্মই হয় বলে আমার বিশ্বাস। যুধিষ্ঠির কি সেই অধর্মের পথ গ্রহণ করেছেন?
