বিদুর – ৮
৮
“অরাজকে জনপদে দোষা জায়ন্তে বৈ সদা”
সঞ্জয়াদি আমার প্রাক্তন মন্ত্রীমণ্ডলীর সঙ্গে বার্তালাপ করে বুঝলাম মহাযুদ্ধ-পরবর্তীকালে এই বিশাল সাম্রাজ্য এবং জনপদসমূহের অবস্থা সম্পূর্ণতই অরাজক। যুদ্ধাবসানে যাঁরা স্বাভাবিকভাবে এই রাজ্যের শাসক হয়েছেন, তাঁরা উপযুক্ত দণ্ডনীতির প্রয়োগ করতে পারছেন না। রাজরোষ, যুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী অশ্বমেধ যজ্ঞানুষ্ঠানের কারণে প্রায় শূন্য। কৃষিবল, বৈশ্য এবং শিল্পীরা স্ব স্ব কর্মের ফল ভোগ বা সংরক্ষণে অসমর্থ, কেননা রাজা এখন প্রকৃত দণ্ডধর নন। যে ঐশ্বর্য লাভের নিমিত্ত এই বিপুল লোকক্ষয়, সেই ঐশ্বর্যের প্রতিই রাজা বর্তমানে বিগতস্পৃহ। চৌর, দস্যু এবং প্রবঞ্চকদের দৌরাত্ম্যে পৃথিবী নিয়ত নির্জিত। সর্বত্রই সকলে যেন হতোদ্যম। বিদ্যাস্নাত, ব্রতস্নাত তপস্বী ব্রাহ্মণগণ রাজার উদ্দীপনাহীনতার নিমিত্ত স্বাধ্যায়াদি কর্ম থেকে বিরত। দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে প্রকৃতিপুঞ্জ সম্পূর্ণ নিমজ্জিত। সীমান্তবর্তী অঞ্চলসমূহ প্রায় অরক্ষিত।
কুন্তী এবং গান্ধারী উভয়েই আমাকে আহ্বান করে একদিন বললেন, ক্ষত্তা আপনি যুধিষ্ঠিরকে রক্ষা করুন। সে রক্ষিত না হলে প্রকৃতিপুঞ্জ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। সাম্রাজ্য ধ্বংস হবে। আপনি এর কিছু প্রতিকার করুন। ইতোপূর্বেই আপনি শুনেছেন যে মহারাজ বর্ণাশ্রমী আচরণ প্রায় পরিত্যাগ করে ক্ষপণক ভিক্ষুকদের মতো সৌগত মার্গ অবলম্বন করছেন। দিন দিন তাঁর এই আকাঙ্খা ক্রমশ বর্ধিত হচ্ছে। একারণে ত্বদীয় ভ্রাতৃগণ বিলক্ষণ বিচলিত এবং বিরক্ত। রাজমাতা গান্ধারী এবং কুন্তীর এইরূপ আকুলতায় আমিও খানিক চিন্তাযুক্ত হলাম। অন্য প্রসঙ্গ ব্যতিরেকেও এই পঞ্চ ভ্রাতার পারস্পরিক প্রীতি এবং সম্ভ্রমের সম্পর্কের হ্রাসমানতা আমার নিকট নিতান্ত আশ্চর্যজনক বোধ হল। এই ভ্রাতৃপঞ্চক দীর্ঘ দীর্ঘকালব্যাপী স্নেহ, প্রীতি, শ্রদ্ধা এবং বিনয়ে এতই ওতপ্রোত ছিল যে তাঁদের মধ্যে বর্তমানকালীন অসদ্ভাবের কথা আমার নিকট নিতান্ত দুঃসংবাদ বলে বোধ হল। আমি রাজ্ঞী কুন্তীকে জিজ্ঞাসা করলাম, মহারানি, ভ্রাতাদের মধ্যে এরূপ অসন্তোষের হেতু কী? যে ভ্রাতৃপঞ্চক শৈশবাবধি নানাবিধ আধিভৌতিক দুর্দশা এবং দুঃসহ ক্লেশ একযোগে হাসিমুখে বহন করেছে, যারা পঞ্চশরীরে একই আত্মারূপে বিপন্ন সময়ে, দ্রোহকালে এবং ইন্দ্রপ্রস্থে রাজকৃত্য করার সাময়িক সুসময়েও কিছুমাত্র বিযুক্তিভাব প্রদর্শন করেনি, তারা আজ কেন ঈদৃশ অসদ্ভাবে ক্লিষ্ট? ভ্রাতারা তো কদাচিৎ মহারাজ যুধিষ্ঠিরের প্রতি বিরূপ ভাব প্রদর্শন করেছে এরকম দেখিনি? এমন অনেক অবস্থাই আমরা অতীতে প্রত্যক্ষ করেছি যখন ভ্রাতাদের, তাঁর প্রতি বিরূপ আচরণ করার, বিরক্ত হবার সঙ্গত কারণ ছিল। কিন্তু সে সব দিন বিগত হয়েছে। এখন রাজ্য যখন করায়ত্ত তখন এই বিপর্যয় কেন?
কুন্তী বললেন, দেবর, যুধিষ্ঠির যে বাল্যাবধি তত্ত্বজিজ্ঞাসু, নির্লোভ, পরহিতকামী এবং শ্রমণস্বভাবী এ তথ্য নিশ্চয় আপনার অজ্ঞাত নয়। তথাপি তিনি যে যুদ্ধের মতো এক ভয়ানক কর্মে আত্মনিয়োগ করলেন এবং তাঁর স্বধর্মবিরোধী নানাবিধ মিথ্যাচারে লিপ্ত হলেন এর কারণ তাঁর পারিপার্শ্বিকতা জানবেন। আমার ভ্রাতুষ্পুত্র বাসুদেব তাঁর তত্ত্ব প্রতিষ্ঠাকল্পে আমার পুত্রদের ক্রীড়নক হিসেবে ব্যবহার করেছেন বলে বোধ হয়। ফলশ্রুতি হিসেবে সমগ্র ভারতীয় রাজন্যকুল যেমন বিনষ্ট হয়েছে, তেমনি বিনষ্ট হয়েছে তাঁর নিজস্ব কুলও। অতি প্রতিভাধর পুরুষেরা যে কারণে প্রকৃতির শিকার হন বাসুদেবও তাই হয়েছেন। তাঁর উচ্চারিত সংহিতামালা যুধিষ্ঠির গ্রহণ না করে অনুগামী হয়েছে সেই তত্ত্বের সৌগতভাষ্যের। সে কারণেই বিবিধ বিড়ম্বনা। দেবর, আপনি নিশ্চিতই সৌগতপন্থা বিষয়ে অবহিত। তাঁরা অহিংসা এবং ব্যক্তিক মুমুক্ষা বিষয়ে বড়োই আগ্রহী।
কুন্তী এবং গান্ধারী উভয়েই সাতিশয় তত্ত্বজ্ঞা। সাধারণ নারীসুলভ যাপিত জীবন তাঁদের নয়। তাঁরা দর্শন, শাস্ত্র এবং লোকচরিত্র বিষয়ে প্রকৃত জ্ঞানের অধিকারিণী। কুন্তী যে অতি প্রতিভাধর পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কথাটি বললেন, তা বড়ো সামান্য চিন্তার ফসল নয়। শ্রীমান অচ্যুতের লোকাতীত প্রতিভা আমি প্রত্যক্ষ করেছি এবং তাঁর উপর প্রকৃতির নির্মমতম প্রতিশোধও উদ্ধবের বর্ণনায় জ্ঞাত হয়েছি। কিন্তু কুন্তী তো পূর্বে কদাপি এমন উচ্চারণ করেননি যে পাণ্ডবেরা অচ্যুতের হাতের পুত্তলী হয়ে এই মহা আহবের সংঘটন করেছেন। বস্তুত এই যুদ্ধের ইন্ধন বিষয়ে তিনিও একদা যথেষ্টই সক্রিয় ছিলেন। কিন্তু কোনো মানসিকতাই মানুষের জন্য কোনো শাশ্বত মূল্যবোধের সৃজন করে না। যুদ্ধের ভয়াবহতা এবং ব্যাপকতা কুন্তীর প্রাক্তন অভীপ্সাকে যেন সম্পূর্ণ মুছে দিয়েছে বলে বোধ হয়। কল্পনায় বুঝলাম গান্ধারীর কৃষ্ণ তিরস্কার তিনি অসামান্য নৈর্ব্যক্তিকতায় গ্রহণ করেছেন এবং এ কারণেই তিনি বিজয়ী পুত্রদের সান্নিধ্যে না থেকে তাঁর হতভাগ্য অসহায় অন্ধ ভ্রাতৃশ্বশুর এবং যে নারী তাঁর আজীবন প্রতিস্পর্ধী কিন্তু তথাপি সহমর্মী, সেই গান্ধারীকে আশ্রয় করে আছেন। যেন দুই অন্ধের এক যষ্ঠিরূপে। মনে মনে আমার একদা দয়িতার মহীয়ানতার প্রতি সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করলাম। অন্তর থেকে যে নিঃশব্দ প্রার্থনা স্বাভাবিক ব্যাপ্তি পেল, তার শব্দাশ্রয় এই, হে নারী, তুমি তোমার জ্ঞান এবং মনুষ্যত্বের পথে অগ্রসর হও। এ সেবক তোমার আমৃত্যু অনুসারী হবে। কী অসম্ভব হৃদয়বৃত্তির অনুসারিণী হলে এই ত্যাগ, সেবা, তপস্যা এবং তিতিক্ষা কেউ অর্জন করতে পারে। ধন্য কুরুক্ষেত্র, ধন্য তোমার রক্তস্নান। কেননা, সেই উপলক্ষেই তো এমন মহৎ এবং বৃহৎ মনুষ্যত্বের মানদণ্ড হিমালয় সদৃশ হল। এই দুই নারীকে প্রত্যক্ষ করে আমার মনে হল, আমাকে এখনও বহুকর্ম সম্পাদন করতে হবে, তা যুধিষ্ঠির যে পথেই গমন করুন।
অবশ্য এই চিন্তাও আমি না করে পারি না যে যুধিষ্ঠির তাঁর স্বধর্মচ্যুতও নন। কুন্তী বা গান্ধারী, তথা আমার পিতা বাদরায়ণি, অথবা তাবৎ বর্ণাশ্রমী প্রবক্তাদের বক্তব্যের সত্য এক আর যুধিষ্ঠিরের সত্য অন্য। যুধিষ্ঠির আমার পুত্র। স্বীকার করতে দোষ নেই যে আমিও অন্তরে অন্তরে প্রকৃতই সৌগত সত্যাশ্রয়ী, যদিচ যুধিষ্ঠিরের ন্যায় এত তীব্রতা আমার নেই। বরঞ্চ বলা ভালো যে আমার মধ্যে এখনও উভয় মতের বিমিশ্রতা ক্রিয়াশীল। আমি জানি আমার মধ্যে সৌগত, বর্ণাশ্রমী এবং সপ্তভঙ্গী-নয়বাদীদের দার্শনিক প্রভাবের মিশ্রতা বিদ্যমান আছে। যুধিষ্ঠির অচ্যুতোক্ত তত্ত্বের সৌগতভাষ্যের প্রতি বড়োই অনুরক্ত। অবশ্য এ বিষয়ে তাঁর সঙ্গে আমার এখনও কোনো তত্ত্ববিচার হয়নি। তাঁর বিষয়ে নানা মন্তব্য শোনার প্রেক্ষিতে এ আমার অনুমান মাত্র। তবে একথা আমাকে বলতেই হবে যে যুধিষ্ঠিরের প্রকৃত স্বধর্ম তপস্যা। সে কর্মাশ্রয়ী ক্ষত্রিয় পুরুষ আদপেই নয়। সে প্রাণীমাত্রেরই বন্ধু এবং রক্ষক হতে চায়। হিংসা তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। কিন্তু পরিস্থিতি তাঁকে হিংসক পন্থায়ই স্থাপিত করে আর একারণেই আমার পুত্র নিয়ত বিপন্নতায় ব্যক্তিক মোক্ষের চরম শূন্যতায় বিলীন হতে চায়।
গান্ধারী বললেন, ভ্রাতঃ তুমি বহুতীর্থ দর্শন করে, বহু সংসর্গ লাভ করে অবশ্যই দীর্ঘদর্শী এবং পূর্বাপেক্ষাও অধিক প্রাজ্ঞ হয়েছ। অতএব তোমার নিকট আমাদের জ্ঞাতব্য বহু বিষয়ই আছে। তুমি বলো, সত্যের প্রকৃত স্বরূপ কী?
এই একটি স্থানে আমি প্রকৃত অসহায় বোধ করি। সত্য এবং ধর্ম এই দুটি শব্দ দ্বারা আমরা প্রকৃতভাবে যে কোন ধারণাকে বোঝাতে চাই তার সার্বিক নিষ্কর্ষ আমার অধিগম্য নয়। ইতিপূর্বেই এ বিষয়ে আমি যথেষ্ট আলোকপাত করেছি। গান্ধারীর প্রশ্নে পুনশ্চ ‘সত্যের’ দ্বৈতাদ্বৈত তত্ত্ব নির্ণয়ে যাবার প্রয়োজন হয় না। এ এক অনির্ধারিত বিষয়, যা বহু প্রাচীন কাল থেকে অদ্যাবধি বিস্তীর্ণ এবং ভবিষ্যতেও এর চূড়ান্ত নির্ণয় কোনো দিন হবে এমন প্রত্যয় আমার নেই। আমার জ্ঞান এবং ব্যবহারবিশ্বে আমি সত্য এবং ধর্মকে এক বা অদ্বৈত ধারণায় পাইনি। স্মৃতি, শ্রুতি, লোকব্যবহার ইত্যাকার তাবৎ বিষয়ে আমার প্রব্রজ্যাকালে অথবা নাগরিক জীবনে আমি নিয়ত জিজ্ঞাসু তথা সন্ধিৎসু থেকেও কোনো অদ্বৈত সত্য বা অদ্বৈত ধর্মের সাক্ষাৎ লাভ করিনি। গান্ধারীকে তাই কীভাবে আমি সত্যের প্রকৃত স্বরূপ জ্ঞাত করাতে পারি? আমি বললাম, রাজ্ঞি, অচ্যুতের যে সারগর্ভ সংহিতা আমরা এতকাল শ্রবণ করেছি এখনও পর্যন্ত তার ত্রুটিবিচ্যুতি যেটুকু আছে, তা সত্ত্বেও, অনুধাবনযোগ্য। আমাদের যাপিত জীবনের সমগ্রতার এক চূড়ান্ত দার্শনিক রূপ তিনি সেখানে বিধৃত করার প্রয়াস করেছেন। কিন্তু আমার বিশ্বাস, তাও শাশ্বত হতে পারে না। একমাত্র জন্ম এবং মৃত্যুই অমোঘ সত্য। বস্তু এবং চৈতন্যের কালপ্রকোপন ভোগজনিত নিত্যতা ছাড়া একক শাশ্বত সত্য বলতে অন্য কোনো সত্তা বা অস্তিত্বের কল্পনা আমি করতে পারিনি বা তার পরিচয়ও পাইনি। আমি যাবতীয় সম্প্রদায়াদির সাহচর্য করেও এমন কোনো সত্যের সাক্ষাৎ পাইনি যা ব্যাপক মানবজীবনের ব্যবহারিকতার ক্ষেত্রে শাশ্বত হতে পারে। দার্শনিক সত্য এক এবং ব্যবহারিক সত্য অন্য, এমন অভিজ্ঞতাই আমার জীবনের শিক্ষায় লব্ধ হয়েছে। সমগ্র বস্তুবিশ্বের মতো সত্যও পরিবর্তনশীল বলে আমার বোধ হয়েছে। মনুষ্য তার ঐকান্তিক যত্ন ও তপস্যায় সত্যের এই গূঢ় বিকাশকে অনুভব করতে পারে।
এবিষয়ে আরও বহুকথা আমার বলার ছিল। বাহুল্য বোধে বললাম না। তবে দুই রাজ্ঞীর যে বিষয়টিকে আমার কালোপযোগী গুরুত্বপূর্ণ বলে বোধ হল, তা তাঁদের পরম্পরা রক্ষার প্রকল্পনা। উভয়েই আমাকে জানালেন, ক্ষত্তা, এই কুরুকুল নানাবিধ সংকুল পর্যবস্থা ভোগ করে বর্তমানে নির্মূলতার সম্মুখীন। এই বংশ অতি প্রাচীন। প্রকৃতিপুঞ্জ এই বংশের কাছে এখনও নানাবিধ প্রত্যাশায় প্রত্যাশী। কেননা, এরা রাজন্য। রাজন্যদের দায় বিষয়ে তোমাকে অধিক বলার হেতু নেই, যেহেতু তুমি বর্তমানকালের শ্রেষ্ঠতম রাজনীতিজ্ঞ। কুরুক্ষেত্র এবং প্রভাসের ধ্বংস শেষে বর্তমান সাম্রাজ্যের প্রকৃতিপুঞ্জের কী ব্যবস্থা করা ধর্মসাপেক্ষ হয় সেই বিষয়ে তুমি কিছু উপায় উদ্ভাবন করো। আমরা এখন প্রায় গতাসু। আমাদের পুত্রগণ কেউ-বা নিহত কেউ-বা উদাসীন উন্মন। এমতাবস্থায় গার্হস্থ্য ধর্মের পরম্পরা রক্ষার দায় কে নেবে?
আমি বললাম, দেবীদ্বয়, আপনারা জানেন, এমন একটি সময় ছিল যখন ‘রাজা’ বলে কোনো সত্তা প্রকৃতিপুঞ্জের শাসনকর্তৃত্বে বিরাজিত ছিল না। তখনকার পরিস্থিতি অবশ্যই কিন্তু মাৎস্যন্যায়ী ছিল না। কিন্তু যখন থেকে রাজন্য প্রথার উদ্ভব হল তদবধি প্রকৃতিপুঞ্জ এই অভ্যাসে অভ্যস্ত হল যে ‘রাজা’ তাঁদের যাবতীয় ক্লেশ থেকে রক্ষা করবে। এখন আর পূর্বেকার নৈরাজন্যে ফিরে, ঠিক সেই অভ্যাসে বসবাস করার উপায় নেই। যেহেতু কাল তার পূর্বসংঘটনকে কখনোই বর্তমানের ভূমিতে সম্পূর্ণভাবে পুনঃস্থাপিত করে না। তা আদৌ কালের ধর্ম নয়। সে কারণে অবশ্যই আমরা রাজন্যপরম্পরার যুগানুগ ব্যবস্থাপনার জন্যই প্রচেষ্ট হব। কুমার পরীক্ষিৎকে এখন থেকে রাজকার্য বিষয়ে সুশিক্ষিত করতে হবে। সেই এক্ষণে একমাত্র কুলপ্রদীপ। প্রকৃতিপুঞ্জ দীর্ঘকাল বংশ পরম্পরাগত শাসনতন্ত্রে অভ্যস্ত। সে দণ্ডধর হলে তারা সহজেই দীর্ঘাচরিত রাজভক্তিবশত তার অনুগামী হবে, এরকমই আমার অনুমান।
হে দেবীদ্বয়, আপনারা এই সেবককে সহায়তা করুন। আসুন আমরা আবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই কুরুবংশকে প্রতিষ্ঠা করি। অভিমন্যুপুত্র পরীক্ষিৎ এই বংশপ্রদীপ। আসুন সমবেতভাবে আমরা তাঁকে উপযুক্ত করে গড়ে তুলি। রাজ্ঞী গান্ধারী আপনি যে সত্য বিষয়ে প্রশ্ন করেছিলেন, সেই সূত্রে বলছি, এই পরম্পরার প্রবাহকেও ব্যবহারিক সত্যের এক অধ্যায় বলে জানবেন। এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ‘অনুসত্য’ একত্রিত হয়ে এক বৃহৎ এবং মহৎ সত্যের সৃজন করে। অতএব, একথা জানুন যে এই বিশ্বের যাবতীয় সংঘটনে মিথ্যা শুধু সেটুকুই যা জীবনের প্রতিস্পর্ধী। আর তা সততই ক্ষীয়মাণ। জীবনের স্বাভাবিক গতিই সত্য।
গান্ধারী এবং কুন্তী যেন একীভূত সত্তায় দুইটি দেহমাত্র আশ্রয় করে আছেন। তাঁদের জিজ্ঞাসা এক। চিন্তন এক। অনুভূতিও যেন এক। যেন কুরুক্ষেত্রে নিপাতিত দেহসমূহ তাঁদেরই উভয়ের এই একক সত্তার রক্তমাংস। তাই কুন্তীর প্রশ্ন, দেবর, তবে এই নিধন কেন? দেবর, আমরা নারী, তোমাদের কুলপ্রকরণের পরম্পরা সৃষ্টির যন্ত্রমাত্র। সেই প্রক্রিয়াগত আক্ষেপ-বিক্ষেপে বিজড়িত এই আমিও একদিন কুরুক্ষেত্র সংঘটন কামনা করেছিলাম। কিন্তু হায়! আজ আমি কতই-না বিড়ম্বিত এবং দুঃখিত। হায়! কেন আমি এর নিরোধ ঘটাতে সক্ষম হলাম না। আমার পুত্রেরা যদি আজীবন আরণ্যক জীবন যাপন করত তাহলেও আজকের এই আক্ষেপ আমাকে ভোগ করতে হত না।
দেবর, তোমার অচ্যুত অথবা আমাদিগের শ্বশুর বাদরায়ণি জীবের নিত্য-জন্ম নিত্য-মৃত্যু বিষয়ে যতই জ্ঞানগর্ভ সন্দর্ভ রচনা করুন না কেন হত্যা, ধ্বংস বা নৃশংসতার সপক্ষে কোনো যুক্তিই জীবনের কাছে গ্রাহ্য নয়। দেবর, আমি কী করে মেনে নেব যে আমার পুত্র ভীম তাঁর ভ্রাতার রক্ত পান করেছেন? বলা হয় এই প্রতিজ্ঞা তাঁর ছিল এবং প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা ক্ষাত্রধর্ম। কিন্তু প্রতিজ্ঞা যদি নারকীয় বা পাশবিক কর্ম বিষয়ের জন্য কোনো ক্রুদ্ধ ব্যক্তির দ্বারা ঘোষিত হয়, তার পালনকেও কি ‘ধর্ম’ আখ্যা দিতে হবে? যদিচ সে দাবি করেছে যে ওই রক্ত তার কন্ঠের অভ্যন্তরে গমন করেনি, তথাপি, আমি ভাবতে পারি না যে কোনো ভ্রাতা, তাঁর ভ্রাতার নিহত শরীরের বিচ্ছিন্নাঙ্গ-উচ্ছৃত রক্তধারা অঞ্জলিতে ধারণ করে পানোদ্যোগীও হতে পারে। ধিক আমার জীবন। ধিক আমার গর্ভধারণ।
কুন্তী সাতিশয় আক্ষেপযুক্তা হলেন। গান্ধারী অনুমানে কুন্তীর অবস্থানে গমন করে তাঁকে সযতনে ধারণ করে বললেন, বৃথা আক্ষেপ কোরো না। আমরা ক্ষত্রিয়কুলকামিনী। ক্ষত্রিয় চরিত্রচর্যার যাবতীয় হলাহল আমাদের পরিপাক করতে হবে। আমরা রমণী বলেই শুধু এই পরিতাপের ভাগী হয়েছি। নচেৎ, অনুমান করো আমার পুত্র দুর্যোধনাদিও যদি আজ বিজয়ী হত, আমাদের আক্ষেপের কিছুমাত্র তারতম্য হত না। দুর্যোধন কি ভীমকে বিষ প্রয়োগে, বা তাঁর ভ্রাতাদের তোমাসহ দগ্ধ করতে যত্নবান হয়নি? এই হচ্ছে ক্ষত্রিয় চরিত্রচর্যা বা ক্ষমতাকামুকদের ধর্ম। অতএব তোমার এবংবিধ আক্ষেপের কোনো হেতু নেই। আক্ষেপ যদি করতেই হয় ক্ষত্রিয়কামিনী হিসেবে এসো আমরা এই ক্ষত্রিয়ধর্মকেই নিন্দা করি। ক্ষমতার লোভকে ধিক্কার দিই।
আমি বিদুর। একদা এই বংশের মুখ্যমন্ত্রী। আমি জাত্যংশে ক্ষত্রিয় নই। তথাপি এই বংশের একজন পুরুষ তো বটি। এই দুই রমণীর আক্ষেপজনিত আলোচনার লক্ষ্যবস্তু আমিও কি নই অথবা সমস্ত পুরুষেরাই কি নয়? তবে বর্তমানে সামাজিক বিধান নির্ণয়ে যেহেতু ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় পুরুষেরাই প্রধান, সেকারণে, আমি মনে করি, তাঁরাই এই আক্ষেপের মূলীভূত আক্রমণস্থল। আমাসদৃশ বর্ণীয় মনুষ্যেরা তো তাঁদের অনুসরণেই সমাজ বিন্যাসে যত্নবান। আমরা যারা তাঁদেরকে আদর্শ করে তাঁদের জীবনধারাকে অনুসরণ করে স্ব স্ব সমাজের বিধি নির্মাণে সচেষ্ট, সেখানেও পুরুষের পুরুষ-জান্তবতা, স্বাভাবিক কারণেই প্রধান হয়ে ওঠে এবং নারী ব্যথায় বেপথু হয়। উচ্চবর্গীয় এবং বর্ণীয়ের দায়ভাগ এভাবেই অপবর্গীয়দের উপর তাদের অজ্ঞাতেই অর্শায়।
দুর্যোধনাদি শতভ্রাতার যেসব হর্ম্য বর্তমানে পাণ্ডবগণের অধিকারে এসেছে মহারাজ যুধিষ্ঠির তা তাঁর ভ্রাতৃগণকে ভোগ করার নিমিত্ত প্রদান করেছেন। বিধবা কৌরবমহিষীগণের নিমিত্ত নির্ধারিত হয়েছে বাকি সব প্রাসাদগৃহ। তাঁদের আহার বাসস্থান বিষয়ে কোনো বিপাকে পড়তে হয়নি। বর্তমানে সমূহ বিধবা, প্রায় বিগতযৌবনা এবং উদ্দণ্ডযৌবনা এইসব রমণীদের এখন কোনো কর্মই আর অবশিষ্ট নেই যেন। ভগিনী দুঃশলা পতিশোক বুকে নিয়ে সিন্ধু দেশে প্রস্থান করেছেন। সেখানে তাঁর অন্তত একটি আকর্ষণ আছে। তাঁর পুত্র সেখানে রাজা। যুদ্ধে ক্ষত্রিয়দের মৃত্যু কিছু অভিনব নয়। রাজার মৃত্যু হলেও পুত্র যদি বর্তমান থাকে, তবে রাজ্ঞী রাজমাতা হয়ে বাকিকাল সসম্মানে কাটাতে পারেন। কৌরবরমণীদের কারওই কোনো সন্তানও জীবিত নেই। বর্তমান রীতিতে যেসব রমণীরা যৌবন অতিক্রান্তা নন, তাঁরাও যে পূর্বজাদের মতো স্ব স্ব ক্ষেত্রে নিয়োগবিধির আনুকুল্যে কোনো পুংবীজ ধারণে সন্তানবতী হবেন, এমন কোনো সম্ভাবনা নেই। কেননা এ বংশ উত্তরাধিকারী হিসেবে অন্তত পরীক্ষিৎকে পেয়েছে। অতএব নিয়োগ ব্যাপারে আর কোনো মহাজননী উদ্যোগী যে হবেন না একথা ঘোষণা করার অপেক্ষা রাখে না। নিয়োগ প্রয়োজনানুসারেই হবে। সে প্রয়োজন ক্ষত্রিয়পুঙ্গবদের রাজনৈতিক প্রয়োজন। রাজতন্ত্রীর ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রয়োজনেই তা অনুমেয়। নারীর অসহায়ত্ব দূরীকরণে অথবা তাদের যৌনতার স্বাভাবিক প্রয়োজনে কোনো ষণ্ড পুরুষের সাহচর্য তারা লাভ করবে না। নারী ভূমিরিব। প্রয়োজনেই সেথায় কর্ষণ গ্রাহ্য। সে প্রয়োজন ভূমিপতির, ভূমির নয়। একথা অক্ষরে অক্ষরে সর্বযুগেই যেন পালিত হয়ে আসছে এবং পালিত হবে। এমনিই আমার ধারণা। আজ বিকর্ণমহিষী যার বয়ঃক্রম ত্রিংশতি অতিক্রান্ত নয়, সে স্বেচ্ছায় কখনোই কোনো ষণ্ড পুরুষের নিকট পুত্র যাচ্ঞাকারী হয়ে, একদা আমার নিকটে আগতা কুন্তীর মতো বলতে পারবে না, আপনি আমাতে পুত্রোৎপাদন করুন। আমার জীবন সমূহরস-বঞ্চিত। আমি অন্তত একটি অপত্য নিয়ে বাঁচতে চাই। অপত্যমেকং কাঙ্খিতব্যং ময়া। না, এই প্রথা এখন আর সমাজস্বীকৃত নয়। যেন যুদ্ধজয়ী পাণ্ডবেরা রাজ্যের অর্থাৎ ভূমির সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রী যোনিসমূহও জয় করে নিয়েছেন। স্ত্রী যোনি বা ভূমির কোনো নিজস্ব প্রয়োজন থাকতে পারে না।
যুযুৎসু, যিনি একমাত্র জীবিত ধার্তরাষ্ট্র, অথচ আমার মতোই অগৃহীত রাজপুত্রবৎ; একদিন আমায় বললেন, আর্য আমার কিছু বলার আছে। যুযুৎসু পাণ্ডব পক্ষধারী একমাত্র ধার্তরাষ্ট্র। ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী এবং অন্য পত্নীদের অন্তর্বত্নী কালে এক দাসীর সঙ্গে সঙ্গত হয়ে এর উদ্ভব ঘটান। বললাম, বলো বৎস, তুমি কী জ্ঞাপন করতে চাও। তিনি বললেন, তাত, আপনি আমার জ্যেষ্ঠা ভ্রাতৃবধূদের সংরক্ষণের বিষয় চিন্তা করুন। তাঁরা বড়োই নির্জিতা এবং ধর্ষণাতঙ্কিতা। বললাম, কেন বৎস, তাঁদের নিগ্রহের কারণ কী? কারণ তাঁরা বিধবা এবং তাঁদের মধ্যে অনেকেই এখনও যৌবনবতী। অধিক অনুসন্ধিৎসার হেতু নেই। এও ক্ষত্রিয় চরিত্রচর্যার এক প্রকরণ বিশেষ। বিশেষত পাণ্ডবদের ক্ষেত্রে যখন যাজ্ঞসেনীর উপর নির্যাতনের পূর্বসংঘটন পুঁজ-শোণিতবাহী ক্ষতের মতো এখনও বাস্তবস্মৃতি। কিন্তু সেক্ষেত্রে প্রশ্ন এই যে বিজয়ী ক্ষত্রিয়নামধারীরা বিজিত ক্ষত্রিয়নামধারীদের অপেক্ষা তবে কোন মানবিক গুণে মহীয়ান? যুযুৎসু আমায় জানালেন যে প্রৌঢ়া মহারানি ভানুমতীও স্বয়ং যে কোনো সময় নির্বস্ত্রা হবার আশঙ্কায় কাল কাটাচ্ছেন। ভীম নাকি এতসব ধ্বংসের পরেও কৌরবকুলের, এমনকী বৃদ্ধ অন্ধরাজা নির্বিশেষে কাউকেই সহ্য করতে পারছেন না। তাঁর প্রতিহিংসার আগুন এখনও নির্বাপিত হয়নি। যুযুৎসু বললেন, তাত, মধ্যম পাণ্ডব প্রায়শই মত্তাবস্থায় তাঁর দুই বাহু আস্ফালন করে বলেন, এই বাহুদ্বয়ের সাহায্যেই আমি ওই ধৃতরাষ্ট্র পুত্রদের সমনসদনে পাঠিয়েছি। এখন ওই অন্ধরাজাটা, যে আমাদের শৈশবকাল থেকে নির্জিত করে এসেছে, সে আমাদের প্রসাদভোগী। সে নাকি বীভৎস ভঙ্গিতে এই সব কথা উচ্চারণ করে এবং ঘোর অট্টহাস্যে প্রাসাদ কম্পিত করে থাকে। এই সব সংবাদ শ্রবণ করে আমার নিতান্ত বিবমিষা হল। আমিও যেন যুধিষ্ঠিরের মতো বলতে চাইলাম, না রাজ্য নয়, রাজত্ব নয়। শাসনক্ষমতা বা ঐশ্বর্য কিছুই নয়। আমি ভিক্ষু হব, শাকান্ন আহার করে সর্বজীবে মৈত্রী, করুণা এবং সেবা নিবেদন করে এই তাপিত দেহের অবসান করব। আমি আর কোনো সংস্কারে বদ্ধ হব না। আমার চিন্তায় জীবের প্রতি সামান্যতম অসূয়া বা হিংসার লেশমাত্র থাকবে না। কেননা তবে আমার দেহান্তের পরেও সেই মলিন চিন্তা অন্য জীবনকে আশ্রয় করে মানবকে আরও দুঃখে নিপাতিত করবে।
কিন্তু যা ভাবা যায়, কার্যত তা কি করা সম্ভব? পরক্ষণেই এই অরক্ষণীয় মাৎস্যন্যায়ী রাষ্ট্রের নিমিত্ত চিন্তার কষাঘাত আমাকে উজ্জীবিত করে অন্য কর্তব্য-কর্মের উদ্দেশ্যে। এই রাষ্ট্রকে সুস্থ এবং প্রকৃতিপুঞ্জের রক্ষক হিসেবে পুনঃস্থাপনা করার দায়িত্ব আমার রয়েছে। সেই কর্মে আমার স্বধর্ম এখনও অনেকটাই দায়বদ্ধ। একারণেই যুধিষ্ঠিরের ন্যায় নির্দায়িক সৌগত নির্বাণের চিন্তায় নিজেকে নিয়োজিত করার কথা ভাবতে পারছি না।
সঞ্জয় দুর্গপ্রাকারের অভ্যন্তরেই থাকেন, কিন্তু প্রাসাদে নয়। প্রাচীন রীতি অনুযায়ী তিনি প্রাসাদ থেকে বেশ কিছু সম্ভ্রমজনক দূরত্বে একটি সাধারণ গৃহে অবস্থান করেন। একক ব্রহ্মচারী মানুষ। বিবাহাদি বন্ধনে বদ্ধ নন। শুধুমাত্র রাজনীতি এবং তত্ত্ববিদ্যাকে জীবনের একমাত্র কৃতকর্ম হিসেবে অবলম্বন করে তাঁর যাপিত জীবন। সঞ্জয় নিরতিশয় তপঃপরায়ণ, উৎকৃষ্ট বুদ্ধি তথা উত্তম মন্ত্রণাপ্রদানকারী। মন্ত্রী হিসেবে সঞ্জয়ের তুল্য তত্ত্বদর্শী তীক্ষ্ণধী পুরুষ, আমি খুবই স্বল্পসংখ্যক প্রাপ্ত হয়েছি। সে আদৌ চাটুকার নয়। শ্রবণসুখকর অন্যায্য বচন কদাপি সে উচ্চারণ করে না। সে নিঃস্বার্থী, প্রকৃতবাক্য প্রয়োগে অকুতোভয়, নিরলস এবং প্রভুর হিতার্থী। সে বয়সে তুলনামূলকভাবে এখনও নবীন, প্রায় অর্জুনের সমান এবং বাল্যাবধি তাঁর সখা কিন্তু অর্জুন যেমন শস্ত্রবিৎ যোদ্ধা সঞ্জয় সেইমতোই শাস্ত্রবিৎ বুধবিশেষ। মহাত্মা গবলগণ তাঁর পিতা। তিনি যথার্থই স্বাধ্যায়ী ব্যক্তি ছিলেন এবং পুত্রকেও উত্তমরূপে শিক্ষা প্রদান করেছেন। সঞ্জয় পরমত-অসহিষ্ণু নন। ধর্মীয় আচরণে তিনি বৈদিক রীতির পক্ষপাতী, কিন্তু সৌগতমার্গীদের বা লোকায়তিক চার্বাক ইত্যাদিদের বিষয়ে অশ্রদ্ধাপরায়ণ নন। পরন্তু তিনি সকলেরই সমান আদর করে থাকেন। অবশ্য যদি তাঁরা স্বমতে নিষ্ঠাবান হন।
সঞ্জয় বিষয়ে ভূমিকার হেতু এই যে, তাঁকে অবলম্বন করে আমি আমার পরবর্তী কার্যকলাপ শুরু করব স্থির করেছি। কারণ বর্তমানে আমি এই পুরীতে সে ভিন্ন অন্য কোনো বহুদর্শী সুবিবেচক মন্ত্রককে প্রত্যক্ষ করছি না। অপিচ সে আমার অনুপস্থিতিকালীন যাবতীয় সংঘট্টনের বিষয় পুঙ্খ পুঙ্খ তথ্য আহরণ করে রেখেছে। আমাদের পিতা বাদরায়ণি যেসব অনুগামী শিষ্যদের উপর ভারত যুদ্ধের তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করে রাখতে অনুজ্ঞা করেছিলেন, সঞ্জয় তাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব। পশ্চাৎ না জানলে সম্মুখ মসীময়। যদ্যপি আমি মহাত্মা উদ্ধবের নিকট থেকে মৌল সংঘট্টনসমূহের সংবাদ অবগত হয়েছি, তথাপি সমগ্র সংঘট্টনের কূট বিন্যাস আবশ্যক হলে তার বিস্তারিত নিবন্ধ জানা আবশ্যক হয়। সঞ্জয় তা জানেন বলেই আমার বিশ্বাস। সঞ্জয় একমাত্র ব্যক্তি যাঁকে পিতা বাদরায়ণি দায়িত্ব অর্পণ করেছিলেন সমগ্র যুদ্ধ বিবরণ ঘটনা সংঘটনের সঙ্গে ধারাবাহিকতা বজায় রেখে অগ্রজ ধৃতরাষ্ট্রকে তার দৈনন্দিন পঞ্জি জ্ঞাপন করার জন্য। শুনেছি সে তা উত্তমরূপেই সম্পন্ন করেছে। অতএব যুদ্ধের দিনলিপিসমূহ, যেমন যেমন তিনি তদীয় অনুগত সংবাদবাহকের সাহায্যে পেয়েছেন, সেই অনুলেখন অবশ্যই তাঁর সংগ্রহে আছে। এই মহাসমরের অনুপুঙ্খ জানার ইচ্ছা তথা প্রয়োজন আমার সাতিশয় প্রবল। অতএব সঞ্জয়কেই আমি চাই। সে কারণে তার উদ্দেশে সংবাদ পাঠাই যেন সে অচিরে আমার সন্নিধানে আসে। বর্তমান পরিস্থিতি সর্বাগ্রে তার সঙ্গে বিচার না করলে, আমি আমার পরবর্তী কর্তব্য নির্ধারণ করতে সমর্থ হব না। এই মহাঘোর সমরের প্রয়োজন হয়েছিল যে ন্যায়প্রতিষ্ঠার কারণে, সেই ন্যায়ই যদি এতৎসত্ত্বেও প্রতিষ্ঠা না পায়, তবে এ মহা আহবের কি কিছু মূল্য থাকে? তবে এ যুদ্ধকে ধর্মযুদ্ধ বলা হচ্ছে কেন? কেন আজও কুরুকুল বিধবারা নির্যাতিত হবেন? কেন মহারাজ্ঞী ভানুমতী নিগৃহীত হবার আশঙ্কা করবেন? কেন একমাত্র যুধিষ্ঠির ব্যতিরেকে কারওরই যথার্থ ধর্ম জিজ্ঞাসা থাকবে না? তাহলে একমাত্র যুধিষ্ঠির ছাড়া বাকি পাণ্ডবভ্রাতারা কি শুধুই ক্ষত্রচর্যাশ্রয়ী? মানবিক বোধে বুদ্ধ নয়? যুদ্ধে বিজয়ী হলেই কি পরমার্থ লাভ হয় এবং প্রকৃতিকে উদ্দাম স্রোতে ভাসিয়ে দেওয়া চলে? বস্তুত আগেও যেমন বলেছি এখনও বলছি আনুপূর্ব তৌল করলে এই দুই পক্ষের কাউকেই একান্ত বা সমষ্টিগত ভাবে মানবিক বলা যাবে না। যুধিষ্ঠিরের উপর নিহিত স্বার্থের প্রকোপজনিত ঘটনাসমূহ ব্যতিরেকে সে ভিন্ন, বাকি সব ব্যক্তিই ক্ষত্রিয় চর্যাশ্রয়ী। শুধু মাত্র ক্ষত্রিয়ই, ব্যাপক মানবিক নয়, একারণেই বোধ করি আমার পুত্র যুধিষ্ঠিরের এই নির্বেদ। একারণেই সে আত্যন্তিক ভাবে সৌগত ভিক্ষুর জীবন যাপনে আগ্রহী। একারণেই সে এই বিজয়কে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করতে পারছে না। সে চেয়েছিল মানবিক বৃত্তির দ্বারা সমূহ সমস্যার সমাধান করতে। যুদ্ধের মতো এক নিষ্ঠুর অগৃহস্থোচিত কার্যের অনুষ্ঠান তার আদৌ অভিপ্রেত ছিল না। তথাপি ক্ষমতাকামুকেরা সেই যুদ্ধের দাহের ভিতর তাকে নিক্ষেপ করলই।
সঞ্জয় এলে তাকে সমাদরে বসাই। তার মস্তক আঘ্রাণ করে বলি, বৎস, আমার পরম পূজ্য জনক পিতা বাদরায়ণির প্রিয় শিষ্য তুমি, আমিও তোমার আচার্যকল্প। কিন্তু তুমি এত ক্লিষ্ট কেন? আমি জানি প্রাক্তন ঘটনার ভয়াবহতা তথা সেই সব ক্রমান্বয়ের বাহক হিসেবে তোমার স্নায়ু নিত্য পীড়িত। তথাপি একথা স্মরণে রাখবে যে আমরা সূত, আমরা ব্যাসশিষ্য, আমরা তাবৎ ঘটনার সাক্ষী এবং গ্রাহক তথা পরিবেশক। এই আমাদের পরম্পরা। কোনো আনন্দ সংঘট্টন আমাদের উদ্বেলিত করবে না, কোনো দুঃখদায়ক দুর্ঘটনের নিমিত্তও আমরা ভগ্নোদ্যম হব না। আমরা বাহক মাত্র। তুমিও সূত মাগধি, আমিও। বর্ণাশ্রমী সমাজে বসবাসকালে আমরা এই রীতি ত্যাগ করতে পারি না, রাজারা ক্রমান্বয়ে আবির্ভূত এবং অন্তর্হিত হবেন সে যেভাবেই হোন। আমরা বাহকই থাকব, কখনো রথের বাহক, কখনো বার্তার, কখনো সুসংবাদ, কখনো-বা দুঃসংবাদ। অতএব বৎস, আমরা কোনোভাবেই নিজস্ব অনুভবসমূহ প্রকট করে ক্ষত্রিয় বা রাজন্যদের অতি নিকটবর্তী আত্মীয় হবার প্রচেষ্টা করতে পারি না। আমরা তাদের অর্ধভ্রাতা, এই কথাটি সর্বদা চিন্তনে ধ্রুব রাখবে।
সঞ্জয় বলল, মহাত্মন্, এ বিষয়ে আমার আচরণে সম্ভবত অদ্যাবধি কোনো ব্যত্যয় দৃষ্ট হয়নি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে আমি রাজন্যদের চাটুকারিতা করব। আমি আমার ধর্ম পালন করেও স্ব-মতামত স্বাধীনভাবে ব্যক্ত করতে আকাঙ্খী এবং বস্তুত নিরন্তর তাই করেছি। রাজন্যদের চিন্তন-বিশ্ব নিতান্ত নিঃস্রোতবাহী হ্রদের মতো। তাঁরা প্রকৃতই বদ্ধমস্তক। সে কারণে তাঁরা সততই চাটুকারিতার গ্রাহক। কিন্তু আমার স্বভাবে যে চাটুকারিতা বা অকারণ বাকশৈলী কদাপি প্রযুক্ত হয় না এ তথ্য আপনার অজানা নয়। এই সব নৃপতিবৃন্দ কদাচ দর্শনাদি শাস্ত্রে অভিজ্ঞ বা স্বাধ্যায়ী নন। প্রাচীন রাজন্যরা যেমন জনক, উশীনর, পৃথু, বেণ অথবা ইক্ষ্বাকুকুলোদ্ভব সগর, ভগীরথ বা স্বয়ং নরচন্দ্রমা রাঘব প্রমুখ, প্রজ্ঞায় প্রাজ্ঞ, ব্যবহারে লোকরঞ্জন এবং তপস্যায় নিয়ত ঋষিতুল্য প্রগাঢ় মহিমার আধিকারিক ছিলেন, এঁরা তা নন। এ কারণে এইসব নৃপতির স্বভাব বিষয়ে তত্ত্বার্থ নিরূপণ বড়োই ক্লেশদায়ক হয়। এঁরাও নানাবিধ প্রশ্নাদি উত্থাপন করেন, আমরা সেসব প্রশ্নের যথাসম্ভব উত্তর প্রদানেও যত্নবান হই, কিন্তু পরিশেষে এমন হয় যে, তাঁরা যে প্রশ্ন অবলম্বন করে প্রারম্ভে জিজ্ঞাসু, তত্ত্ববিশ্লেষণ শেষে সেই প্রশ্নেই জিজ্ঞাসু থাকেন। একারণে, একই তত্ত্বের পরিক্রমণ চলতেই থাকে এবং সূত মাগধিগণের কর্ম বড়োই ক্লান্তিকর হয়ে দাঁড়ায়। আর্য, রূপ নির্বিশেষে রাজকৃৎদিগের কি এমন বদ্ধাবস্থাই শাশ্বত হবে? তাঁরা আর কখনোই স্বয়ংসিদ্ধ হবে না?
বললাম, বৎস, এ কিছু আশ্চর্য নয়। আমাদের এই বৃদ্ধ অন্ধরাজার কথাই যদি ধর, তুমি, আমি এবং বিভিন্ন মুনিগণ কি একই উপদেশ এবং তত্ত্বের ব্যাখ্যা পুনঃ পুনঃ তাঁর নিকট করিনি? কিন্তু এখনও তো তিনি সেই একই প্রশ্ন করে যাচ্ছেন। অবশ্য এ কথাও স্বীকার্য যে আমাদের তাবৎ পরামর্শ গ্রহণও তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। দুর্যোধনাদিকে পরিত্যাগ করার বিষয়ে আমরা যে উপদেশ এবং মন্ত্রণা তাঁকে দিয়েছি, সে সবই আমাদের ব্যবহারগত অনুভূতিহীন মন্ত্রণামাত্র। স্নেহময় পিতা মাতা কিংবা আত্মীয়জনেরা কদাপি উপদেশ অনুসরণ করতে পারেন। উপদিষ্ট ব্যক্তি যদি আমাদের মতো নির্লিপ্ত তত্ত্বাশ্রয়ী না হন, তবে উপদেশের প্রকৃত মর্মোদ্ধার করতে পারবেন না বা তদনুসারে কার্যও করবেন না। এও অতি স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এ তত্ত্ব থাক, বল বৎস, এখন আমরা কীভাবে বাকি জীবিত মনুষ্যের শ্রেয় বিধান করতে পারি। বৎস, আমার অভিপ্রায় এই যে আমরা অচিরেই এক সভা আহ্বান করি, যেখানে এই সমগ্র বিষয়ে আলোচনা করে সরল সিদ্ধান্ত অনুসারী একটি নির্দিষ্ট কর্মপন্থা গ্রহণ করতে পারি। এই রক্তস্নাত ভূমিকে তো অরক্ষণীয়া যুবতীর মতো দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত রাখা সঙ্গত নয়। অচিরেই একে মাৎস্যন্যায়ী প্রকরণে দস্যু ধর্ষিতাবস্থার নিগ্রহ থেকে রক্ষা করা আবশ্যক। এই বিষয় তোমার চিন্তাই বা কী বল।
সঞ্জয় বেশ কিছুক্ষণ তুষ্ণীম্ভাব অবলম্বন করে বলল, হে প্রাজ্ঞ, বহুকালাবধি আমরা রাজন্যশাসিত সামাজিক নির্বন্ধে আশ্রিত হয়ে প্রাচীন নৈরাজন প্রথা বিস্মৃত হয়েছি। অতএব রাজন ব্যতিরেকে প্রকৃতিপুঞ্জ কখনোই প্রাক্তন সেই শৃঙ্খলায় পুনরাশ্রয় গ্রহণ করতে সক্ষম হবে না। ফলত রাজনহীন সমাজ দস্যু, তস্কর তথা অন্যান্য পরস্বাপহারীদের দ্বারা মাৎস্যন্যায়ীই হবে। আপনি অবশ্যই ইতোমধ্যে সেই অবস্থার সমূহ উপস্থিতি সমাজে অবলোকন করেছেন।
হে প্রাজ্ঞ, অরাজক জনপদ সর্বদাই ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে কাল কাটায়। রাজাই একমাত্র ব্যক্তি যিনি উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে দণ্ডবিধানে শান্ত রাখেন। রাজাই লোকস্থিতি এবং যাবতীয় বিষয়ের মূল। ভগবান মনু বলেছেন, রাজা দশজন শ্রোত্রিয়ের সমান মান্য।
কিন্তু হে মহাত্মন্, মহাত্মা যুধিষ্ঠির যদবধি যুদ্ধোত্তরকালে হস্তিনাপুর রাজপদে সমাসীন হয়েছেন, তদবধি প্রকৃতপক্ষে কোনো সার্বিক নীতিনির্ধারণ সভার আয়োজন হয়নি। ফলত রাজা বর্তমানেও এই রাজ্য অশাসিত। মহারাজ যুদ্ধ শেষ হবার অব্যবহিত কাল থেকেই নিতান্ত বৈরাগ্য আশ্রয় করেছেন। তিনি রাজকার্যে আদৌ উৎসাহী নন। ভ্রাতৃগণ এবিষয়ে তাঁকে যথোচিত মন্ত্রণাদি প্রদান করলেও তিনি নিশ্চয় করে নিয়েছেন যে রাজন্য চর্চা পরিত্যাগ করে তিনি ভিক্ষুবৃত্তি অবলম্বন করবেন। জ্ঞাতিবধজনিত পাপসন্তাপের বিপন্নতা তাঁকে এতই ধ্বস্ত করেছে যে তাঁর পক্ষে বোধকরি রাজদণ্ডবিধি পালন করা কদাচ সম্ভব হবে না। অথচ রাজনীতি তথা রাজধর্ম বিষয়ে কৃতবিদ্য আপনি তো নিশ্চয়ই জানেন যে কুরুক্ষেত্র মহাসমর পরবর্তী সমাজে সাম-দান-ভেদাদি কোনো পন্থা সমাজ পুনর্গঠনে কার্যকরী হবে না। একমাত্র সুকঠিন দণ্ডনীতি ব্যতিরেকে এই সমাজকে সুস্থ, স্বাভাবিক অবস্থায় উত্তীর্ণ করা অসম্ভব। কিন্তু দণ্ডধারী যদি ব্যক্তিগত পাপস্খালনের নিমিত্ত ব্যাকুল হয় অথবা স্বনির্বাণ কামনায় নিঃসঙ্গ তপস্যাচারী হতে বাঞ্ছা করে তবে রাজধর্ম পালন কীভাবে সম্ভব? মহাত্মন্, আমি এখনও বর্ণাশ্রমী আদর্শের প্রতি আস্থাহীন হইনি। কারণ, এখনও পর্যন্ত আমার বিশ্বাস সমষ্টিগত জীবনধারাকে বহমান রাখতে এ ভিন্ন অন্য কোনো ব্যাপক পন্থা অদ্যাবধি আবিষ্কৃত হয়নি। অধুনাকার সৌগত, লোকায়ত সপ্তভঙ্গীনয়বাদী জৈন, তার্কিক, তৈর্থিক, উডুলোম ইত্যাকার কোনো দার্শনিক ক্রমেই বর্ণাশ্রমী আদর্শের মতো সুসংগঠিত গার্হস্থাশ্রমের ব্যাপকতা নেই। সেখানে সমূহ লাভালাভই ব্যক্তিকেন্দ্রিক।
সঞ্জয়ের বচনে যথার্থ সত্য অনেকটাই বর্তমান একথা অস্বীকার করা চলে না। আমারও বিচার এই যে চাতুর্বর্ণ্য সমাজ কদাপি সমূলে ধ্বংস হবে না। কোনো-না-কোনো প্রকার ভেদে তা থাকবেই। কিন্তু সে যাই হউক, বর্তমান অচলাবস্থার অবসান যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক তপঃসাধনায় লভ্য নয় এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। অতএব অতি শীঘ্র সঞ্জয়াদির সাহচর্যে এক সভা আহ্বান করা নিতান্ত আবশ্যক। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পরবর্তীকালে রাজধর্মীয় কর্তব্যাবলি কী কী সম্পাদিত হয়েছে, বর্তমানে প্রাক্তন রাষ্ট্রীয় বিন্যাস কতটুকুই বা স্থায়িত্বে আছে, সামন্ত, বিশপতি, দশগ্রাম অধ্যক্ষ বা গ্রামপতিরা কে কেমন ভাবে শাসনক্রম পরিচালনা করছেন এসব বিষয়ে সংবাদাদি সংগ্রহণ করতে হবে। প্রাক্তন ব্যক্তিবর্গ, অভিজাত পুরুষগণ এবং গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের নিয়ে অচিরেই এক মহা-সম্মেলন না হলে কিছুই বোধ হবে না তথা নতুন সংস্কার কর্মও আরম্ভ করা যাবে না। সঞ্জয়কে এই মর্মে নির্দেশাদি প্রদান করে আমি যুধিষ্ঠিরের উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলাম।
যং হি ধর্মং চরন্তীহ প্রজা রাজ্ঞা সুরক্ষিতাঃ।
চতুর্থং তস্য ধর্মস্য রাজা ভারত বিন্দতি।।-শান্তিপর্ব
প্রজাসমূহ সুরক্ষিত হলে তাদের অনুষ্ঠিত ধর্মের চতুরাংশ পুণ্য রাজার ভোগ্য। রাজার ত্রুটিতে যদি কোনো পাপকার্যের সংগঠন হয়, তবে তার চতুরাংশও রাজাকে বহন করতে হবে। একারণে রাজ্য সংগ্রহান্তে রাজা কখনোই তার এবম্বিধ দায়ভার পরিত্যাগ করতে পারেন না। দুর্যোধনাদির অর্থ, ভূমি এবং ক্ষমতালিপ্সা যতই নিন্দনীয় হোক রাজা হিসাবে প্রকৃতিপুঞ্জ কখনোই তাঁর নিন্দা করতে পারবেন না। কারণ তাঁর শাসনকালে কুরুরাজ্যে গর্হিত কর্ম কমই অনুষ্ঠিত হয়েছে। পূর্বে বলেছি, দুর্যোধন রাজা হিসাবে অসামান্য প্রজারঞ্জক ছিলেন। তাঁর ক্রূরতা, লুব্ধতা বা নৃশংসতা শুধুমাত্র জ্ঞাতিবৈরীজনিত কর্মেই প্রকটিত দেখা যায়। নচেৎ, তিনি রাজ্যশাসনাদি বিষয়ে অসামান্য প্রাজ্ঞ পুরুষ ছিলেন। মদীয় শাসন কার্যক্রমকে কদাপি তিনি অতিক্রম করে, স্বকীয় স্বেচ্ছাচারিতা প্রদর্শন করেছেন। তাঁর শাসনকালে প্রকৃতিপুঞ্জ কোনো রাজকীয় নির্দায়িকতার বা ঔদাসীন্যের শিকার হয়নি। বস্তুত তাঁর পতনে বর্তমানে বহুসংখ্যক বিশিষ্ট সামন্ত, সহস্র শত বা দশ গ্রামাধিপগণ ক্ষুব্ধই আছেন। ক্ষুব্ধ আছেন বর্ণাশ্রমী এবং বর্ণাশ্রমবিরোধী বহু সমাজ। এঁদের মধ্যে লোকায়তিক চার্বাকরা বিশেষ উল্লেখ্য। এর কারণ অবশ্যই যে যুধিষ্ঠিরের নির্বেদ, এ বিষয়ে সকলেই আমায় বলেছেন।
যুধিষ্ঠির বিজিত রাজ্যে অভিষিক্ত হবার পর স্বয়ং কোনো বিশেষ সুবিধা গ্রহণ করতে পারেননি। এমনকী প্রাসাদসমূহ বণ্টন কালে মহারাজ দুর্যোধনের ইন্দ্রালয় তুল্য মণিমাণিক্যখচিত, দাসদাসীসমন্বিত ভবনটি ভীমকে, দুঃশাসনের প্রাসাদটি অর্জুনকে, দুর্মর্ষণের গৃহ নকুলকে এবং দুর্মুখের আলয়টি সহদেবের বাসস্থানার্থ নির্দিষ্ট করলেন। এ বিষয়ে অবশ্যই আমার পুত্র যুধিষ্ঠির অন্ধরাজার সম্মতি গ্রহণ করে যথাকর্তব্য করেছেন। কিন্তু স্বয়ং কোনো নিহত ব্যক্তির বাসগৃহকে অধিগ্রহণ না করে প্রাচীন প্রাসাদের একটি সাধারণ কক্ষ্যা আশ্রয় করেছেন। এই ব্যবস্থাপনা প্রত্যক্ষ করে একটি বিষয় আমার নিকট প্রতিভাত হল যে মহারাজ স্বয়ং এ-তাবৎ আচার ও কৃচ্ছ্রতা পরিত্যাগপ্রয়াসী নন। তবে যে ভ্রাতৃগণ তাঁর রাজ্য উদ্ধার নিবন্ধন এ-তাবৎ ক্লেশ ভোগ করেছেন এবং মানসিকভাবে ক্ষত্রজনোচিত বিজয়সুখ সম্ভোগের মানসিকতা পোষণ করেন, তাঁদের ইচ্ছানুরূপ ব্যবস্থা করা তিনি কর্তব্য-কর্ম হিসাবে সম্পাদন করেছেন। এর থেকে বোঝা যায় যুধিষ্ঠির যতটা নীতিধর্মপরায়ণ ততটাই ক্ষত্রিয়চরিত্র-চর্যাশ্রয়ী নন। এই নীতিধর্মপরায়ণতা অবশ্যই সাধারণ গৃহস্থাশ্রয়ী ব্যক্তিদের নিকট এক উজ্জ্বল আদর্শ। কিন্তু বর্তমানে এই গৃহস্থাশ্রমী মনোভাবও নাকি তার স্বভাবধর্ম হিসাবে বিচার্য হচ্ছে না। যুধিষ্ঠিরের ভবনের উদ্দেশ্যে গমনকালে এ বিষয়টি আমাকে ভাবিত করল। আমার যে আত্মজ একদা সমগ্র জীবের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার বিষয়টিকে স্বধর্ম হিসাবে বিবেচনা করেছিল, এবং তাবৎ বিষয়ে জিজ্ঞাসু থেকে তার অনুগত জনেদের ধর্মাচরণের বিবিধ বিষয়ে অতন্দ্র কাল ব্যয়িত করেছে, সেই যুধিষ্ঠির যদি আজ স্ব-পাপ বিষয়ে অধিক চিন্তিত হয়ে স্ব-মোক্ষকামী ভিক্ষু ধর্মচর্যাশ্রয়ী হয় তা অবশ্যই অতীব বিস্ময় তথা ক্ষোভের কারণ। সৌগত তত্ত্বচর্যা, প্রব্রাজনা অথবা অহিংস, অমল পন্থায় শাকাহারী একক বৈরাগ্যপূর্ণ জীবনযাপন আমারও যে আকাঙ্খ্য নয়, সে কথা বলতে পারব না। আমিও অন্তরে অন্তরে এমন যাপিত জীবনের আকাঙ্খায় আকাঙ্খী। কিন্তু আরব্ধকর্ম, সামাজিক দায়, যুগসন্ধিক্ষণের নানাবিধ নৈতিক বৈপরীত্যের সমাধানকে বিনা বিচারে অতিক্রম করে সেই ব্যক্তিক আদর্শকে যথাযথ মর্যাদা দিতে আমি কেমন যেন কুন্ঠা বোধ করি। আমি ভাবি যে ব্যক্তি নির্বাসনকালেও আশ্রিতজনেদের পরিত্যাগ করেনি সে এমন ব্যক্তিতামুমুক্ষু কীভাবে হতে পারে?
বস্তুত যুধিষ্ঠিরকে এ বিষয়ে দায়ী করে লাভ নেই। অশ্বমেধ যজ্ঞ যে তার নিরতিশয় আন্তরিক কাঙ্খায় সংঘটিত হয়েছে এমন নয়। এবম্বিধ যজ্ঞীয় আচারাদি বর্তমানে যে সমাজে আদৌ আদৃত তাও নয়। তথাপি মহারাজের নির্বেদ নিবারণার্থ কোনো এক মহৎ কর্মযজ্ঞে তাঁকে আবিষ্ট করানোই এই নিহিতস্বার্থ সদর্থক পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করেছিল বলে এই যজ্ঞের সূত্রপাত। কিন্তু সে কারণেও যে লোকক্ষয় ঘটেছিল আমার পুত্র সেই ক্ষতিকেও ব্যক্তিক দায়িত্বে গ্রহণ করেছেন। তাঁর হৃদয়ে তখন এমত মন্ত্র উদগত যে পঞ্চস্কন্ধশীল এই শরীর যেন কোনো সংস্কার বহন করে পরবর্তী জীবনশরীরকে আর ভারাক্রান্ত না করে। এই দেহের সঙ্গেই যেন দেহস্থ আহৃত সংস্কার নিঃশেষিত হয়। এভাবেই সংস্কারসমূহ যেন আত্যন্তিক লুপ্ততায় নির্বাণের পথে প্রাণকে অগ্রগামী করে। কিন্তু কোনো হিংস্র যজ্ঞ দ্বারা তো এই সংস্কার দূরীকরণ সম্ভব হয় না। সে কারণে সহজ জীবনই কাম্য। করুণা, দয়া, প্রেম, তিতিক্ষা এবং নিয়ত আত্মশুদ্ধি করণই তাঁর একমাত্র কাম্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে চাতুর্বর্ণ্য আচার, অন্যদিকে দুঃখময় সংসার থেকে সার্বিক নির্বাণের আকাঙ্খা, এই দ্বিবিধ সমস্যার দ্বন্দ্বে যুধিষ্ঠির জর্জরিত। সে যেন প্রমাদবশত রাজকুলে আবির্ভূত হয়েছে। তার স্থান যেন রাজধানীর কেন্দ্রে নয়, অন্য এক সন্ধানের, সেবার মহাপথ পরিক্রমার।
যুধিষ্ঠিরের ভ্রাতৃগণ প্রথম যেদিন হস্তিনাপুর নগরীর দুর্গপ্রাকারের অভ্যন্তরে প্রবেশ করল সেদিন থেকেই পুরজন এই সব কুমারদের বিষয়ে অসম্ভব কৌতূহলী এবং জিজ্ঞাসু হয়েছিল। যখন আমার অগ্রজ পাণ্ডু তাঁর দুই পত্নীসহ অকালে বাণপ্রস্থাবলম্বী হলেন, তখনও পুরজন অসংখ্য প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। লোককৌতূহল নিবারণার্থ পুণ্যপাদ শান্তনুনন্দন এবং আমাকে যে ব্রাহ্মণাদির সাহচর্যে বিবিধ উপাখ্যান প্রচার করতে হয়েছে এ কথা অস্বীকার করে লাভ নেই। যখন কুন্তী তাঁর একক অভিভাবকত্বে পুত্রপঞ্চকসহ রাজধানীতে এলেন তখনকার স্মৃতিও আমার মনে সম্যক জাগরূক। মহারাজ পাণ্ডু এবং রাজ্ঞী মাদ্রী গতাসু। জনৈক ব্যাসশিষ্য সহ সদ্যবিধবা কুন্তী তাঁর এবং মাদ্রীর পুত্রপঞ্চক রাজধানীতে উপস্থিত। লৌকিক প্রথা বিষয়ে প্রাজ্ঞ মহাত্মা ভীষ্ম সকলকে কুলপুত্র হিসাবে গ্রহণ করে প্রতিষ্ঠা করলেন যে এরা কৌরব। যুধিষ্ঠির তখন অন্য ভ্রাতাগণ অপেক্ষা অনেক বয়স্ক এবং স্বাভাবিকভাবেই অধিক কৌতূহলী। সে কৌতূহল তার ভ্রাতাদের কৌতূহলের মতো বালোচিত অবশ্যই ছিল না। অতএব সে পৌরজনের গ্রহণ-বর্জনজনিত আচার-ইঙ্গিতসমূহ সবিশেষ বিচারের সঙ্গেই গ্রহণ করেছে এবং স্বাভাবিক প্রকরণে স্বয়ং ঋদ্ধ হয়েছে। কোথায় সেই আরণ্যক উন্মুক্ততা, ঋষিবালকদের সঙ্গে নিরন্তর বনবিহার, প্রাকৃতিক জগতের স্বাভাবিক আচরণ, আর কোথায় দুর্গমধ্যস্থ প্রাসাদের পাষাণ-আবেষ্টনী, কুলাচার শিক্ষার নিয়মবন্ধ, সদাসতর্ক ভৃত্যগণের নিয়ত অনুশাসন। সদ্য-উদ্ভিন্ন কিশোর হৃদয়ে এই দুই বিপরীত ভাব তথা তাদের বিষয়ে পৌরজনদের স্বাভাবিক কৌতূহল তাকে এক বিশেষ মানসিকতায় উপনীত করে। এখানেই তার বর্তমান পরিণতির বীজাভাস। অন্য ভ্রাতাদের ক্ষেত্রেও এই সব সমস্যা ক্রিয়াশীল যে ছিল না তা নয়, তবে তারা তখন নিতান্তই শিশু। একমাত্র যুধিষ্ঠিরই তখন স্বাভাবিক জ্ঞানবলক্রিয়ায় জীবনের সত্যসমূহ গ্রহণ-বর্জনের সন্ধিক্ষণে। তখন তাকে ক্রমান্বয়ে অনেক অপ্রীতিকর কথা শুনতে হয়েছে যা তার কিশোর মানসিকতায় এক স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করেছে। এই মানসিকতাই তাকে ক্রমশ বর্তমান দার্শনিক বিপন্নতায় উপনীত করেছে। প্রকৃত ক্ষত্রিয়জনোচিত শিক্ষা সে কারণে সে কদাপি অর্জন করতে সক্ষম হয়নি। তার মধ্যে তপোবনবাসী মুনিগণের দার্শনিক প্রবণতা এবং গৃহস্থজনোচিত কৃষকী আকাঙ্খাই বিকাশ পেল। সে তাই একজন অতি সাধারণ মানুষ যে অন্য সাধারণের স্বার্থে তার তাবৎ সত্তাকে উৎসর্গ করতে পারে, এমত দর্শনেই বুদ্ধ হয়।
যুধিষ্ঠিরের আবাসটিকে প্রাসাদ বলা সঙ্গত হয় না। এই গৃহটি অতি প্রাচীন, ভগ্ন নয় তবে কোনো সম্রাটের বাসোপযোগ্য রূপে এটি বিবেচিত হতে পারে না। দ্বিকক্ষযুক্ত এই গৃহটি কবে এবং কেন যে নির্মিত হয়েছিল সে কথা আজ আর কারওরই স্মৃতিতে নেই। যুধিষ্ঠির তাঁর বসবাসের জন্য এই গৃহটিকেই সংগ্রহণ করেছেন। একথা মনে হওয়া অন্যায় নয় যে এ যুধিষ্ঠিরের এক প্রকার আত্মপীড়ন। এমন আত্মপীড়ন একমাত্র হঠযোগী বা সৌগতপন্থীরাই করে থাকেন। এই গৃহটি বহুকাল অসংস্কৃত অবস্থায় ছিল। শুনলাম, আমার আত্মজ যুধিষ্ঠির স্বহস্তে তার সংস্কার সাধন করে তাকে বাসপোযোগী করে নিয়েছে। সেখানে সে এবং দ্রৌপদী বসবাস করে। দ্রৌপদীর এবম্বিধ আচরণ বিষয়ে যথাসময়ে বলব। এখন শুধু এটুকুই বলব যে এই বিতর্কিতা রমণী পঞ্চস্বামীর পত্নী হওয়া সত্ত্বেও এবং প্রকৃতপক্ষে অর্জুনের বীর্যশুল্কা হয়েও যেন মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অনুবর্তিনী ছায়া, তিনি যেন একমাত্র তারই সহধর্মিণী, যদিও অর্জুনের প্রতি তাঁর প্রগাঢ় প্রণয় সকলেরই জানা।
আমি যুধিষ্ঠিরের প্রাঙ্গণে উপস্থিত হতেই যাজ্ঞসেনীর দ্বারা অভ্যর্থিত হলাম। তিনি হার্দিক বচনে গদগদস্বরে আমাকে বরণ করে বললেন, স্বাগত হে তাতকল্প, স্বাগত। আমরা মহৎ ভাগ্যফলে আজ আপনার দর্শন পেলাম। আপনার সর্বাঙ্গীণ কুশল তো? আপনার পুত্রপ্রতিম আপনারই অপেক্ষায় রয়েছেন। কেননা আপনার মহান উপদেশ বিনা তিনি কোনো ভবিতব্য বিষয়েই কৃতনিশ্চয় হতে পারছেন না। মহাভাগ, আপনি পদার্পণ করলে এ গৃহ ধন্য হবে। আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি।
যাজ্ঞসেনীর বক্তব্য শেষ হতে না হতে যুধিষ্ঠির গৃহসংলগ্ন উদ্যানে স্বয়ং এসে আমাকে হৃষ্টচিত্তে অভিবাদন করে পরম সমাদরে অভ্যন্তরস্থ কক্ষ্যায় প্রবেশ করল। আমি এক অনাস্বাদিত পুলকে তার সৎকার গ্রহণপূর্বক নির্ধারিত আসনে উপবিষ্ট হলাম। মনে হল দুইটি আতপ্ত প্রাণ বহু প্রতীক্ষিত আকাঙ্খার উপসংহারে মিলিত হয়ে এক পরম প্রশান্তিময় মিলনে স্নিগ্ধ হল। চরাচরে যেন তখন কোনো প্রকার অভাববোধ, বৈক্লব্য বা নৈরাশ্যের অস্তিত্ব থাকল না। যাজ্ঞসেনী দুইটি বৃহৎ ভাণ্ডে সুশীতল অম্লমধুর তক্র প্রদান করে বললেন, হে তাতকল্প আপনারা বার্তালাপ করুন, আমি আপনাদের ভোজনের নিমিত্ত পাকশালে গমন করি। আপনি তো জানেন আমি রন্ধনপটিয়সী, সে কারণে জিজ্ঞাস্য আপনি কীরূপ ব্যঞ্জনে তৃপ্তি লাভ করবেন? বললাম কন্যা, আমি জ্ঞাত আছি বনবাসকালে তুমি দুর্বিনীত কোপনস্বভাব ঋষি দুর্বাসাকে সশিষ্য ভোজনে পরিতৃপ্ত করেছিলে। অতএব এই প্রৌঢ় বালককে মাতৃতাবোধে যা কিছুই ভক্ষণ করাও তাই অমৃততুল্য বোধ হবে। মাতঃ, দীর্ঘ দিবস প্রব্রজ্যাবশত আমিষে অনভ্যস্ত। অতএব যদি কিছু ভর্জিত মুগদ, নীবারণ্ডতণ্ডুল এবং তরুণ কুষ্মাণ্ড, কন্দমূল খণ্ড, শাক ইত্যাদির সহযোগে উপযুক্ত শর্করা তিন্তিরি মরিচ প্রদানে ঘৃত সম্ভরায় কৃশর প্রস্তুত হয় তবে এ বৃদ্ধের আর কিছু অধিক বাঞ্ছা থাকে না। বৎস, আমি আহার শেষে কিছু সমরিচচূর্ণ দধি পছন্দ করি। আমিষ বহুকালাবধি অভ্যাস না থাকায় শুদ্ধমাত্র দু-একখণ্ড শূলপক্ব গোবৎস অথবা নধর মৃগমাংস ভিন্ন কিছুই যাচ্ঞা করি না। মিষ্টান্ন আহার পরিত্যাগ করেছি। অতএব সামান্য ঈষদম্ল মিষ্টান্ন ভোজন শেষের রসনাশ্লেষহেতু প্রদান করতে পার। আর হ্যাঁ বৎসে, ভোজন পূর্বকালে ক্ষুধা-উদ্রেকহেতু দু-এক পাত্র মাধ্বীর উপযোগ বিষয়ে পাঞ্চাল কন্যাকে নিশ্চয়ই কিছু বলার প্রয়োজন নাই।
দ্রৌপদী আদেশ শ্রবণ করে স্মিত মুখে পাকশালার উদ্দেশ্যে প্রস্থান করলে যুধিষ্ঠির বলল, হে পিতৃব্য, আপনি জানেন সকলে আমাকে ধর্মাত্মা, ধর্মরাজ বলে কীর্তন করে থাকেন। আপনিও ধর্মাংশজাত বা শাপভ্রষ্ট ধর্ম হিসাবেই কীর্তিত। কিন্তু আমি কুরুক্ষেত্র সংঘট্টন পরবর্তীকালে এক সংকটে আপ্লুত আছি। যে সংকটের স্বরূপ আমার আত্মজন তথা ঋষি উপদেষ্টাগণ কেহই অনুধাবন করতে সমর্থ নন। আমার নিকট ধর্মের প্রকৃতি অতি বিচিত্র। এক্ষেত্রে কোন মত অনুসরণ করলে সার্বিক কল্যাণ হয় তা আমার বোধগম্য নয়। অচ্যুত বলেছেন দেহের নাশের পরেও আত্মা থাকেন। আমাদের আত্মজনদের বিনাশের পর অদ্যাবধি তাদের আত্মার অস্তিত্বের কোনো সন্ধান আমি পাইনি। লোকয়তগণ আত্মার তত্ত্ব মানেন না। সপ্তভঙ্গীনয়বাদীরা বলেন, সবই সংশয়িত। তৈর্থিকগণ সব বস্তুকেই নিঃসংশয় অর্থাৎ পৃথক পৃথক অবস্থিত বলে মনে করেন। তার্কিকেরা অধিকাংশ বস্তুরই সৃষ্টি এবং নিলয় স্বীকার করে থাকেন। মীমাংসকরা বলেন জগৎপ্রবাহের মধ্যে নিত্যতা আছে। কেউ কেউ শূন্যবাদ, কেউ-বা ক্ষণিকত্ববাদে বিশ্বাসী। আবার যোগাচারীরা বিজ্ঞানকেই জ্ঞেয় এবং জ্ঞাতৃরূপে কীর্তন করে থাকেন। এমতই উডুলোমগণ বলেন সব বস্তুই পরস্পর ভিন্ন। এখন এসব দর্শন-শ্রবণে আমার সংশয় এক চূড়ান্ত রূপ পরিগ্রহ করেছে। আমি কোনো নির্দিষ্ট পন্থায় নিজেকে স্থাপিত করতে পারছি না।
হে পিতৃপ্রতিম, যেহেতু আপনি তৎকালে উপস্থিত ছিলেন না, সেহেতু এবিষয়ে বিশদ হতে হচ্ছে। সেই ঘোর আহব সময় আমরা সবাই শুধু ক্ষত্রিয় ছিলাম, স্বাভাবিক গৃহস্থ মানুষ ছিলাম না। এক্ষণে মনে হচ্ছে ক্ষত্রিয় জাতি আর ধর্মত ঠিক গৃহস্থ মনুষ্য নেই। তারা ভূমি, ক্ষমতা এবং ভোগের অতিরিক্ত অন্য কিছুর প্রতিই আকৃষ্ট নয়। হে মহাত্মন্, আমি ইতিপূর্বে কদাপি এবম্বিধ সবাক হইনি। জ্ঞানলাভাবধি শুধুমাত্র জিজ্ঞাসু, জ্ঞান আহরণেচ্ছু হয়েই কাল কাটিয়েছি। আপনি জ্ঞাত আছেন রাজ্যভোগ দুর্লভ জেনে আমি কেবলমাত্র পঞ্চভ্রাতার অবলম্বন হিসাবে গ্রামপঞ্চ ভিক্ষা চেয়েছিলাম। কিন্তু নিহিতস্বার্থী কুলগৌরবাভিমানীরা সেটুকুও প্রদানে ইচ্ছুক হল না। ফলত এই আহব। তথাপি অবলোকন করুন সেই আরোপিত, সন্তাপজনিত আহবের আক্ষেপ আমাদেরই আশ্রয় করল। যুদ্ধে হত বীরেরা প্রশংসার স্বর্গে ভাস্বর হল, কিন্তু আমরা জ্ঞাতিহত্যার দূরপরনেয় কলঙ্কই শিরোধার্য করলাম। শিরোধার্য করলাম এক শাশ্বত শোক যা কোনো উপদেশ, তত্ত্বজ্ঞান, দর্শন অথবা লোকাচার কথনে নির্বাণ লাভ করছে না। মহাশয়, আমি চিরকালই এক সাধারণ গৃহস্থের কর্তব্য পালন করার আকাঙ্খা পোষণ করেছি। কদাপি ক্ষত্র চর্যাশ্রয়ী কঠোর এমত এক অমানবিক জীবনের কল্পনা করিনি।
আমি যুধিষ্ঠিরের এমন উন্মোচন অবলোকন করে অনুভব করলাম সে বড়ো নিঃসঙ্গ। তার বোধের জগতে আদৌ কোনো সঙ্গী নেই। সে যেন রাজকুলে জাত কোনো ব্যতিক্রমী মানুষ নয়। সে এক সাধারণ গৃহস্থ, যে তার যাবতীয় কর্তব্য নিঃশর্তে নিবেদন করে জীবন এবং জগৎকে অথবা তার উদ্দিষ্ট ধর্মকে জানতে চায়, উপলব্ধি করতে চায়। আমি অনুমান করতে পারি বর্তমানে যে বৈরাগ্য তাকে আশ্রয় করেছে, তার আচরণে পৌর আত্মজনেরা যে সৌগত তথা ভিক্ষুভাবের আভাস পাচ্ছেন, তাও তার কিন্তু স্বভাবধর্ম নয়। এসবই সাময়িক, যেহেতু যুধিষ্ঠির সব দর্শন এবং ধর্মীয় ভাবেরই গ্রাহক। কিন্তু সে শুধু গ্রাহকই, প্রচারক নয়। তার সন্ধিৎসা কখনোই চূড়ান্ত উত্তর পাচ্ছে না। সে কারণে সে সততই জিজ্ঞাসু। এই জিজ্ঞাসা একজন সাধারণ গৃহস্থের পক্ষেই সম্ভব, যে অন্তরে একজন বিশুদ্ধ কৃষক মাত্র।
যুধিষ্ঠির জানাল, হে পিতৃপ্রতিম, আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন, ইতোমধ্যে আমি একটি অশ্বমেধ যজ্ঞানুষ্ঠানও সম্পন্ন করেছি। ক্ষত্রোজনোচিত যুদ্ধাদি বিষয়ে যেটুকু আমার অলব্ধ জ্ঞান ছিল, অশ্বমেধ যজ্ঞকালে তাও পরিপূর্ণতা পেয়েছে। কেননা, অশ্বমেধও নানাবিধ যুদ্ধফল বহন করে। আমার এমনও বোধ হয় যে সমগ্র ক্ষত্রিয়চর্যাই যেন শুধুমাত্র যুদ্ধকর্মের নিমিত্তই নির্ধারিত হয়েছে। যে কেশবের চিত্ত অসামান্য দার্শনিকতায় ঔপনিষদিক সামগ্রিকতাকে মন্থন করে আমাদের সংহিতার প্রবক্তা হিসাবে খ্যাত হল, তিনিও কিনা আমায় বৈদিক যজ্ঞাদির বিড়ম্বনায় আশ্লিষ্ট করলেন! অশ্বমেধে আমার রুচি ছিল না। কিন্তু পিতামহ মহর্ষি ব্যাস এবং তার বন্ধু কেশবের অনুপ্রেরণায় আমাকে এই কর্ম করতে হল। যজ্ঞাশ্ব নিয়ে অর্জুন এতদ্দেশের সমুদায় রাজন্যকুলকে হেলায় পরাজিত করেন। আমি অর্জুনকে যজ্ঞাশ্বসহ দিগ্বিজয়ে বহির্গমনের প্রাক্কালে বলেছিলাম, বৎস, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আমরা আর্যাবর্ত্মীয় প্রায় সমগ্র নৃপকুলকে সংহার করেছি। ক্ষত্রিয়গণ স্বভাবতই পরস্পর পরস্পরের প্রতিস্পর্ধী। বস্তুত তা ভূমিশাসনের অধিকারজনিত ক্ষমতাবিস্তারের কারণেই হয়ে থাকে। স্বভাব ভূমিপ্রেমী ক্ষত্রিয়কুল এই ক্ষমতার তীব্র সুরা পান করে এমন একটি স্তরে নিজেদের উপনীত করেছে যে পিতা পুত্র ভ্রাতা কিংবা যাবতীয় রক্তসম্পর্কীয় আত্মজনেরাও পরস্পর পরস্পরের ঘৃণিত শত্রু। অতএব বৎস, এক্ষণে যারা আর্যাবর্ত্মীয় বিভিন্ন রাজ্যের অধীশ্বর তাঁরা কুরুক্ষেত্রে নিহত যোদ্ধাদের তরুণ বংশজমাত্র। তুমি যথাসম্ভব এইসব নৃপতিদিগকে জীবিত রেখে স্বকর্ম সম্পাদন করবে। মনে রেখো এঁরা সবাই বিগত যুদ্ধের তিক্ততাজনিত কারণে তোমার প্রতিস্পর্ধী হতেই পারেন। তুমি অবশ্যই প্রাক্তন স্ব-কৃতকর্ম স্মরণ করে ক্ষমাসুন্দর হবে। কিন্তু দেখুন, কী দুর্দৈব! সিন্ধুদেশে যখন অশ্বসহ অর্জুন গমন করলেন তখন আমাদের মন্দভাগ্যা বিধবা ভগিনী দুঃশলার একমাত্র পুত্র সুরথ, তাঁর উপস্থিতির সংবাদ শ্রবণেই আতঙ্কে গতাসু হলেন। তথাপি সিন্ধুবাসীরা অর্জুনকে স্পর্ধা করলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী হল। অর্জুনও রণোন্মাদনায় তাঁর প্রাক্তন কর্ম বিস্মৃত হয়ে পুনর্বার ক্রোধবহ্নির প্রকাশ ঘটালেন। ফলত অসংখ্য লোকক্ষয় হল। অবশেষে, ভগিনী দুঃশলা তাঁর এবং হায় অবশ্যই আমাদেরও নপাৎ সুরথপুত্রকে ক্রোড়ে করে অর্জুনের চরণপ্রান্তে উপনীত হয়ে বললেন, ভ্রাতঃ, আমার পুত্র সুরথ পিতৃশোকে নিতান্ত কাতর হয়ে ইহলোক পরিহার করেছে। তার মৃত্যুর বিবরণ আমি তোমাকে বলছি শ্রবণ করো। আমার স্বামী সংগ্রামশায়ী হলে সে পিতৃশোকে অত্যন্ত কাতর ছিল। এখন আবার তুমি অশ্ব অনুসরণে যুদ্ধার্থী হয়ে এখানে এসেছ এই সংবাদ শ্রবণ করে সে ভীত বিষণ্ণ হয়ে অকস্মাৎ মৃত্যুমুখে পতিত হয়েছে। আমি তার মৃতশরীর গৃহে শায়িত রেখে তাঁর এই শিশুটিকে নিয়ে তোমার শরণাপন্ন হয়েছি। তুমি এই অনাথ বালকের প্রতি প্রসন্ন হও। সে তোমার ভাগিনেয়-পুত্র। ভ্রাতঃ, আমার পুত্রের অন্ত্যেষ্টি এখনও সম্পন্ন হয়নি। আমার একান্ত প্রার্থনা তুমি নিজ ঔদার্যপ্রয়োগে এই যুদ্ধ সংবরণ করো।
মহাশয়, মহাত্মা অর্জুনকে এমন মানবিক ক্লেশও এই ক্ষত্রধর্মচর্যার জন্য বহন করতে হয়েছিল। কিন্তু এমন কত অসংখ্য ঘটনা আছে, কতই-বা আপনাকে বলব। মহাযোদ্ধা ধনঞ্জয়ও সেইসব সময় খুবই স্বাভাবিক কারণে এই নিষ্ঠুর ক্ষত্রচর্যাকে ধিক্কার জানিয়েছিলেন। অশ্ব নিয়ে ফিরে এসে সখেদে আমাকে বলেছিলেন, মহারাজ, আমি অত্যন্ত সন্তপ্ত। আসুন আমরা পুনরায় বনবাসী জীবন যাপন করি। এই ক্ষত্রধর্ম অতি নিষ্ঠুর এবং ছার। মহারাজ, ভগিনী দুঃশলার পতি এবং পুত্র শোক আমার হৃদয়কে এতই বিমর্দিত করেছে যে বোধ হচ্ছে এক্ষুনি আমি আবার চীরবল্কলধারী হয়ে নাগরিক এই বিকৃতির বহুদূরে কোনো এক আরণ্যক উপত্যকায় ফলাহারী যোগীজনোচিত জীবন আশ্রয় করি।
একথা যুধিষ্ঠির অনুধাবন করেছিলেন কিনা আমি জানি না। এই অশ্বমেধের পরামর্শ শুধুমাত্র বিষণ্ণ উদ্যোগহীন নরপতিকে কর্মে ব্যাপৃত করার নিমিত্ত প্রদত্ত হয়নি। নিহিতস্বার্থীরা বিজয়ী নরপতির প্রতিস্পর্ধীদের যেন পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছিলেন যে যুধিষ্ঠির একজন চক্রবর্তী সম্রাট, তাঁকে মান্যতা প্রদান সমগ্র নৃপতিদের অবশ্যকর্তব্য, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের স্বভাবধর্মে এমত কাঙ্খা ছিল না। সে এখন তার নানাবিধ স্বধর্ম বিচ্যুতির কারণে দগ্ধপ্রাণ, যে বিচ্যুতিসমূহ তার স্বাভাবিক প্রবণতায় সংঘটিত হয়নি, হয়েছে বহিস্থ প্রভাবহেতু। এই বহিস্থ প্রভাববশতই বাল্যাবধি সে অব্যবস্থিত চিত্ত। একথা অনুমান করা অসম্ভব হবে না যে পাঞ্চালগণ তাঁদের চিরপোষিত বৈরিতা নিবন্ধন পাণ্ডবগণের সঙ্গে সম্মিলিত হয়ে এই বৃহৎ কুলে ভেদ সৃষ্টি করে। পাঞ্চালীর নিগ্রহও আবার এই বৈরিতারই এক অন্যতম প্রকাশ। পাঞ্চালগণ পাণ্ডবপক্ষে যোগদান না করলে বোধহয় ভীষ্ম, দ্রোণাদি মহাত্মারা এই যুদ্ধ ঘটতে দিতেন না। মনে হয় প্রাকবৈরিতা চিন্তা করেই তাঁরা দুর্যোধনাদির আপাত অন্যায় অশিষ্টতা স্বীকার করেও তাঁর পক্ষই অবলম্বন করেন।
কিন্তু সে যা হবার তা হয়েছে। তা এখন বিগত ইতিহাস। এখন রাজ্যের শাসনক্রম কীভাবে সুস্থিত করা যায় সেই মর্মে যুধিষ্ঠিরকে প্রশ্ন করি। বলি, বৎস, আমার প্রত্যাবর্তনের পর রাজ্যের শাসনশৃঙ্খলা বিষয়ে তোমাদের জননীদের এবং আমার প্রাক্তন মন্ত্রীসভার সদস্যদিগের সহিত যে বার্তালাপ করেছি তাতে বুঝলাম রাজ্যশাসন বিষয়ে তুমি যেন একান্তই উদাসীন। তুমি কি অন্তর থেকে এই রাজ্যের স্বামিত্ব গ্রহণ করনি? যুধিষ্ঠির বলল, পিতৃব্য, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এই রাজ্যের প্রকৃত শাসনক্ষমতা ভোগ করার জন্য আজীবন প্রয়াসী ছিলেন এবং একারণেই সমূলে ধ্বংস হয়েছেন। বস্তুত এই যুদ্ধে তাঁরই সর্বাধিক সন্তাপ উপস্থিত হয়েছে। এই নিমিত্ত আমি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রত্যাবর্তন করেই এই রাজ্যভার তাঁর হস্তে অর্পণ করে ভারমুক্ত হয়েছি এবং আমাদের দ্বারা কৃত বিপুল পাপরাশির প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রয়াসী হয়েছি। একারণে আমার ভ্রাতৃগণ আদৌ আমার প্রতি প্রসন্ন নন। একথা জানবেন যে তাঁদের প্রতি আমার অসামান্য স্নেহপ্রবণতা থাকলেও তাঁরা আমার সমধর্মী নয়। অনেকেই মনে করেন আমার এই সামান্য গৃহে বসবাস একপ্রকার কৃচ্ছ্রতাসাধন। বস্তুত তা নয়। আমি আমার ভ্রাতাদের ন্যায় নিহত আত্মজনেদের স্মৃতিবিজড়িত প্রাসাদগুলোতে বসবাস করতে পারি না। ধার্তরাষ্ট্রগণকে শতবিরোধ সত্ত্বেও আমি কোনোদিন অনাত্মীয় বোধ করিনি। আমার স্বভাবধর্ম সেই বোধে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। আমার ভ্রাতাদের প্রতি আমি দোষারোপ করি না। তাঁরা আমার রাজ্যলাভ নিমিত্ত নিরন্তর অশেষ ক্লেশ এবং গ্লানি সহ্য করেছেন। স্বভাবতই তাঁরা এখন বিশ্রাম এবং ভোগসুখের প্রত্যাশী। কিন্তু আমি প্রাক্তন জীবনচর্যায়ই সহজ স্বচ্ছন্দ বোধ করি। এই যাপিত জীবনকে ঠিক কৃচ্ছ্রসাধন বলা উচিত অথবা স্বাভাবিক গৃহস্থ জীবন এমত হওয়াই সঙ্গত তা আপনি বিচার করে সিদ্ধান্ত করুন। হে মহাত্মন্, আমার বিচারে সাধারণ স্বাভাবিক লোকায়ত ধর্মকেই ধর্ম বলে অধুনা বোধ হয়। যে ধর্মে ত্যাগ এবং ভোগ এক মিতাচারে আবদ্ধ, যেখানে লোভ, অসূয়া, ক্ষমাহীনতা, অপ্রেম, অবিবেচনা ইত্যাকার অমানবিক আচরণ তীক্ষ্ণ হয় না। অকারণ হিংসা, ধর্মের নামে পশুমেধ, যজ্ঞজনিত ক্ষমতা প্রদর্শনী, যুদ্ধ, ভূমির উপর অতিরিক্ত আসক্তি ইত্যাদির বিষয়কে কৌলিক প্রথা হলেও, ধর্ম বলে মেনে নিতে আমার মন চায় না। মৈত্রী এবং চূড়ান্ত মৈত্রীকেই আমি ধর্মের একমাত্র চৈত্য বলে মনে করি। এই চৈত্যে বিপুল মানব তার আশ্রয় লাভ করুক, তাহলেই সব সংকট থেকে সে শুদ্ধ, বুদ্ধ এবং মুক্ত হয়ে অক্ষয় হবে। সব অকল্যাণ এবং অশান্তি স্তিমিত হয়ে এক চলমান আলোকবর্তিকা মনুষ্যকে তার সম্মুখের অশেষ অসীম জ্ঞান প্রস্থানের পথ আলোকিত করে ক্রম-অগ্রসর করবে, এই আমার বিশ্বাস। মহাশয়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ এবং তৎপরবর্তী সংঘটনসমূহ তথা অশ্বমেধ যজ্ঞকালীন নানা অভিজ্ঞতার কথা স্মরণে রেখে আপনাকে নিবেদন করছি সহজ সরল অহিংস জীবনযাপনই আমার স্বধর্ম। স্বাভাবিক গৃহস্থ কর্ম এবং তাদৃশ যাপিত জীবন, মাতাপিতাস্ত্রীপুত্রাদি তথা প্রতিবেশী সুহৃদগণের জন্য মঙ্গলময় কর্ম নির্বাহ করেই আমি বাঁচতে চাই। রাজ্য, রাজত্ব, ক্ষমতা, যশ, প্রতিপত্তি কোনোকিছুই আমার কাম্য নয়। একারণেই যিনি সতত রাজপদাভিলাষী নিরন্তর ক্ষমতাকামুক এবং আজীবন যশোলাভের নিমিত্ত নানাবিধ অপকার্যের নায়ক হয়ে অবশেষে হতাশার শেষতম স্তরে উপনীত হয়েছেন তাঁকেই এই রাজ্যভার অর্পণ করে আমি ভিক্ষুপ্রায় জীবনের শান্ততাশ্রয়ী হয়েছি। অবশ্যই আমি আমার ভ্রাতাদের বর্তমান যাপিত জীবনের উপর কোনো নিষেধক্রমের বন্ধন রাখিনি। তাঁদের ইচ্ছানুরূপ ভোগসুখের ব্যবস্থাপনার কোনো ব্যত্যয় এ অবস্থায় নেই। শুধুমাত্র আমিই এসব অনুসর্গের বৃত্তের বাইরে নিজেকে স্থাপন করতে প্রয়াসী হয়েছি। একে যদি আপনারা সৌগত আচরণ বলেন বলুন। কিন্তু আমি তো অন্তরে জানি যে সৌগতপন্থাও আমার উপজীব্য নয়। কারণ সেও সাধারণ পন্থা নয়।
আমি জিজ্ঞেস করি, পুত্র যদিচ শাস্ত্রে উক্ত আছে ‘রাজা কর্ণেন পশ্যতি’, তথাপি তাঁর চক্ষুবিষয়ের অন্ধতা তাতে প্রতিপন্ন হয় না। বিশাল রাজ্যশাসনে রাজাকে কর্ণের উপর অধিক নির্ভরশীল হতে হয় বলে এরকম শাস্ত্রবাক্য রচিত হয়েছে। কিন্তু বৎস, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যে প্রকৃতই অন্ধ এ সত্য তোমার অজানা থাকার তো কারণ নেই। আমার এমন বিশ্বাস, মহারাজ শারীরিক ভাবে চক্ষুষ্মান হলেও এইরকম অন্ধই হতেন। এক্ষেত্রে আমি তোমার বচনই উদ্ধৃত করে বলব, যে তিনি নানাবিধ অপকার্যের নায়ক হয়েছেন তাঁর তীব্র যশোলাভ তথা ক্ষমতালাভের উদগ্র বাসনা থেকেই। ক্ষমতার আকাঙ্খা তাঁর ক্ষেত্রে সর্বগুণরাশিকেই নাশ করেছে যেন। এখানেই তাঁর সার্বিক অন্ধত্বের স্বরূপ। ক্ষমতা-কাঙ্খা এভাবেই বোধ করি ক্ষমতাকামুকদের অন্ধত্ব প্রদান করে থাকে। এই আকাঙ্খার তীব্র মদিরা তাঁদের স্বাভাবিক বোধ জ্ঞান তথা সামাজিক কর্তব্যমন্যতা নিরাকৃত করে যেন এক নিঃসীম তামসে স্থাপিত করে। তখন যে তমসা ব্যাপ্তি পায় তার গাঢ়তা সাধারণ্যকেও গ্রাস করে থাকে। যুধিষ্ঠির বলল, তথাপি তিনি যে অধুনা সন্তপ্ত এবং বিধ্বস্ত সে বিষয়ে সন্দেহ কি? আমি যেহেতু তাঁর পুত্রপ্রতিম আমার কি সঙ্গত হয় না তাঁর এই সন্তাপ দূরীকরণে যাবতীয় সামর্থ্য ব্যয় করা হয়? হায়, তাঁর হৃদয় আজ কি নিদারুণ দুঃস্থ তা কীভাবে ব্যক্ত করব?
যুধিষ্ঠির বিষয়ে যে সব মন্তব্য আমি ইতোপূর্বে করেছি তা যে সর্বৈব গ্রাহ্য এখন আমার তা বোধ হচ্ছে না। এই দীর্ঘ অনুপস্থিতিজনিত কারণে আমার ইতোপূর্বের বিচারকে পুনর্বিবেচনা করার সম্যক কারণ আছে। এক্ষণে তাঁর উন্মোচিত হৃদয়ের সন্তাপ অনুভব করে বলতে চাই আমার পুত্র এক বিশাল হৃদয়ের কৃষক। সে বহুকালাবধি এক অনিঃশেষ কর্ষণে ব্যাপৃত আছে এবং সেই কর্ষণ মহারাজ কুরুর আরব্ধ কুরুক্ষেত্রের ভূমির কর্ষণই শুধু নয়। সে কর্ষণ কুরুক্ষেত্র নামক ভূমির নিষ্কর্ষ হিসাবে যে জ্ঞানময় এক মানস-ভূমির উদ্ভব হয়েছে ক্রমশ সেই ভূমির কর্ষণেই তা বিধৃত। এই কর্ষণকৃতিই সংস্কৃতির জন্মদাত্রী। এই ধর্মকেই বহু গুহ্য সাধনায়, বহু ক্লেশে, বহু যত্নে আয়ত্ত করতে হয়। এই ধর্ম বা যাকে সংস্কৃতি নামে বিবৃত করেছি তা ‘ন মেধয়া ন বহুনা শ্রুতেন’ লভ্য। তার সাধনার পথ ভিন্ন। যুদ্ধপারঙ্গম অর্জুন, মহাদ্রোহশালী ভীম, অমিততেজা নকুল, এবং অদ্ভুতকর্মা সহদেব কিংবা সর্বমনমোহিনী দ্রৌপদী সকলেই একদিন জিজ্ঞাসিত হবেন তাঁদের কৃতকর্ম বিষয়ে এবং তাদের চরিতচর্যা অনুযায়ী তাঁরা জনমানসে একদা হয়তো স্ব স্ব লোক প্রাপ্ত হবেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির স্বধর্মনিষ্ঠ হিসাবেই যুগযুগান্ত ধরে আদৃত হবেন এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তা তার সমগ্র বিচ্যুতি সত্ত্বেও সত্য।
সে পুনরায় বলল, পিতৃব্য, আমার প্রয়াত পিতার কাল থেকে আপনিই এই রাজ্যের যাবতীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থাদি পরিচালনা করেছেন। দুর্যোধন এবং তদনুবর্তীদের দুর্ভাগ্য যে তাঁরা আপনার প্রজ্ঞার সমুচিত মূল্য হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হয়েছে কিন্তু আপনার নীতির বিরুদ্ধাচার করতেও সাহসী হয়নি। স্বয়ং অচ্যুত তথা আর্যাবর্তীয় রাজারা ‘বিদুর নীতি’ বিষয়ে কোনো প্রশ্নই উত্থাপন করেন না। তাঁরা এই তত্ত্ব জানেন যে সুষ্ঠুভাবে রাজ্য পরিচালনায় আপনার বিধিব্যবস্থা অতিক্রম করা অসম্ভব। এমনকী আমি যখন অর্ধরাজ্যের নৃপতি হিসাবে ইন্দ্রপ্রস্থে রাজত্ব করি তখনও আপনার রচিত নীতি এবং উপদেশ অনুসারেই প্রজাপালন তথা অন্যান্য প্রশাসনিক কর্তব্যাদি নির্বাহিত হত। একমাত্র দুর্যোধন ব্যতিরেকে কেউই আপনার সমালোচক হয়ে স্বেচ্ছাচারিতা প্রদর্শন করেনি। কিন্তু তাও কিছু সমরবিষয়ক নির্ণয়েই সীমাবদ্ধ মাত্র। একথা উল্লেখ্য যে ভ্রাতা দুর্যোধন সমর বিষয়ে আপনার নীতির বিরোধী হলেও প্রশাসনিক বিষয়ে কদাচ স্বৈরাচারিতা অবলম্বন করেনি। সেই আপনি যখন অনুগ্রহ করে পুনরায় আগমন করেছেন তখন আপনিই পুনর্বার আপনার প্রাক্তন প্রকরণে শাসনক্রম সুশৃঙ্খলিত করুন। আপনি যেমন আদেশ করবেন তদনুসারে আমরা কার্য করব। তবে প্রকৃত রাজা হিসাবে ধৃতরাষ্ট্রই রাষ্ট্রশীর্ষে অবস্থান করবেন এই আমার অভিলাষ। আমি তাঁর প্রতিভূ হিসাবেই সব কর্ম করব।
আমি বললাম, বৎস, আমি অচ্যুত এবং পিতা বাদরায়ণি কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে যে সংহিতা রচনা করেছিলাম তদনুসারেই রাষ্ট্রকার্যক্রম সুন্দরভাবে পরিচালিত হতে পারে বলে আমার এখনও বিশ্বাস। তুমি যখন আমার উপর আস্থা জ্ঞাপন করছ তখন রাষ্ট্র সমাজে শৃঙ্খলা আনয়ন আমার পক্ষে খুব কষ্টসাধ্য হবে বলে বোধ হচ্ছে না। বর্তমানে যে সব মাৎস্যন্যায়ী আচার যত্রতত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে তার কারণ এই যে বর্তমানে প্রজাসংরক্ষণ নিমিত্ত কোনো বিধি শাস্ত্রোচিত দণ্ড নিয়মে অনুসৃত হচ্ছে না। আমার প্রাক্তন মন্ত্রীমণ্ডলীর মধ্যে শ্রেষ্ঠতম ব্যক্তিত্ব সঞ্জয় যদি তাঁর স্বকীয় চেতনে জাগরূক থাকতেন তাহলেও বোধকরি পরিবস্থা এতাদৃশ জটিলরূপ ধারণ করত না। কিন্তু শুনেছি তিনি যুদ্ধকালে আমার পিতা বাদরায়ণি কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ওই যুদ্ধের যাবতীয় ফলাফল, দৈনন্দিন সংবাদ সংগ্রহে এই অন্ধরাজাকে বিবৃত করতেন। এই দুরূহ কর্তব্য করতে করতে যখন দেখলেন শল্য পর্যন্ত নিপাতিত এবং দুর্যোধনের জয়ের আর কিছুমাত্র আশা নেই তখন অন্নঋণকে সাতিশয় অপরিশোধ্য ঋণ হিসাবে বিবেচনা করে তিনি শুধুমাত্র চারজন যোদ্ধাসহ কৃতান্তসদৃশ ধৃষ্টদ্যুম্নের প্রতিযোদ্ধা হলেন। পাণ্ডবপক্ষে নাকি তখনও দুইসহস্র রথ সপ্তশত হস্তী, পঞ্চসহস্র অশ্ব, এবং দশসহস্র পদাতিক অবশিষ্ট। দুর্যোধন তার কিছুমাত্র সহায় অবশিষ্ট নেই দেখে নিহত অশ্ব পরিত্যাগ করে একাকী গদাটি মাত্র সম্বল করে দ্রুত পূর্বমুখে গমন করেছেন। এমন সময় সঞ্জয় চতুর্যোদ্ধা সমন্বিত হয়ে আত্মদানে কৃতনিশ্চয় কল্পে ধৃষ্টদ্যুম্নকে আক্রমণ করলেন। এভাবেই তিনি তার অন্নঋণ পরিশোধ করতে প্রচেষ্ট হয়েছিলেন। অর্জুন এবং সাত্যকির অস্ত্রপীড়ন এবং প্রহারে বিদীর্ণবর্ম মূর্ছিত সঞ্জয় সাত্যকির হাতে বন্দি হলেন। সঞ্জয় যখন দৌত্যকার্যের নিমিত্ত উপপ্লব্য নগরে পাণ্ডব সকাশে এসেছিলেন তখন বিস্তারিত মতামত বিনিময়ের পর সকলেই তাঁর প্রতি প্রসন্ন হয়ে একটি বাক্য বলেছিলেন, সঞ্জয়, তুমি এই যুদ্ধের মধ্যে সকর্মক থেকো না। তুমি আমাদের অর্জুনের বাল্যসখা এবং ফলত আমাদের সকলের প্রিয়। কিন্তু সঞ্জয় সে অনুরোধও রক্ষা করতে পারেনি। কারণ তাঁকে প্রপালকের অন্নঋণ শোধ করতে হবে। বন্দি সঞ্জয়কে হত্যা করার আদেশ দিয়েছিলেন সাত্যকি। কিন্তু সহসা উপস্থিত কৃষ্ণদ্বৈপায়ন তাঁকে রক্ষা করলেন। প্রহৃত তথাপি মুক্ত সঞ্জয় অতঃপর হস্তিনাপুরে রুধিরাক্ত দেহে প্রত্যাবর্তন করে ধৃতরাষ্ট্রকে বাকি বৃত্তান্ত জ্ঞাত করান। এই বিপুল কর্মসাধন করে সঞ্জয় সাতিশয় বিমর্ষ এবং হতোদ্যম হয়ে পড়েছেন বলেই অতঃপর যথা কর্তব্যকর্মে উদ্যোগী হতে পারেননি। নচেৎ তিনি আমা অপেক্ষা কিছুমাত্র ন্যূন প্রশাসনজ্ঞ ছিলেন না। আশা করছি আমি অচিরেই তাঁর এবংবিধ ক্লৈব্য তথা স্থবিরতা দূরীকরণে সমর্থ হব। সে অবশ্যই তাঁর প্রাক্তন উৎসাহে পুনরধিষ্ঠিত হয়ে রাজ্যের কল্যাণে ব্রতী হবে।
যুধিষ্ঠির আমার বক্তব্য প্রণিধান করে বলল, ক্ষত্তা, আপনার ইচ্ছাই আমার ইচ্ছা জানবেন। আমি আপনার অনুগত ছায়ামাত্র।
আমি জানালাম, বৎস, সর্বাগ্রে এক মহতী সভার আয়োজন করো। প্রথা এই যে রাজকীয় সভা আহ্বান করার আধিকারিক রাজা। রাজতন্ত্র, মহামন্ত্রী হিসাবে আমাকে যতই ক্ষমতা প্রদান করুক আমার আহ্বানে সামন্তবর্গের কোনো ব্যক্তি সভাগৃহে আগমন করবেন না। রাজা পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তি। তাঁর আদেশ নির্দেশাদি ব্যতিরেকে কোনো সভাদির আয়োজন সম্ভব নয়। এখন প্রশ্ন সভার উদগাতা কে হবেন, যুধিষ্ঠির অথবা অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্র? যুধিষ্ঠির স্বয়ং কোনো সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন না। এমন বিশ্বাসে একদিন অগ্রজকে নিবেদন করি, মহারাজ, আপনার এই বিশাল রাজ্যের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত বিধায় অচিরেই এক আলোচনাসভার আয়োজন করা আবশ্যক হয়েছে। যুধিষ্ঠির আপনার অনুমতি প্রার্থনা করে আমায় বলেছেন যে, সভার প্রয়োজন অপ্রয়োজনের সিদ্ধান্ত এই রাজ্যের অধীশ্বরের। আপনি সম্মতি প্রদান করে যথাকর্তব্য সম্পাদন করুন। মহারাজ, আপনি যথোচিত বিচার ক্রমেই এ বিষয়ে অনুসিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।
অন্ধরাজা শান্তগম্ভীর বচনে বললেন, ভ্রাতঃ, একথা সত্য যে আমি নিতান্ত ক্ষমতাকামুক এবং ফলত রাজপদলোভী ছিলাম। তুমি জান, আমার কুল আমাকে তা থেকে বঞ্চিত করেছে। আমার পুত্রেরা প্রাণোৎসর্গ করেও আমাকে সেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে পারেনি। যুধিষ্ঠির আমার কুলকৃন্তক হওয়া সত্ত্বেও আমার সেই আজন্ম কাঙ্খাকে বাস্তবায়িত করল। কিন্তু এ কি প্রহসন, না আন্তরিক অভীপ্সা? অথচ দেখো, বস্তুতই যুধিষ্ঠির রাজকার্য বিষয়ে কোনো স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন না। কিন্তু তোমার অনুপস্থিতিতে, হে বিদুর, আমার রাজ্যপ্রশাসন বিষয়ে কী বা করার ক্ষমতা ছিল বা আছে? অতএব রাজ্য যে প্রশাসনগতভাবে বিশৃঙ্খলিত তা আমার উপলব্ধিতে অবশ্যই আছে। তুমি এখন এসেছ, তুমি অবশ্যই এক সভার আহ্বান করে তাবৎ কর্তব্যের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। যদ্যপি যুধিষ্ঠির আমাকে রাষ্ট্রশীর্ষ হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, তথাপি এতাবৎ শোক তথা শারীরিক প্রতিবন্ধকতাবশত আমি রাষ্ট্রকর্ম বিষয়ে কোনো প্রচেষ্টাই গ্রহণ করিনি। এক্ষণে যদি তোমার এক সভা আহ্বানের অভীপ্সা হয়ে থাকে, আমার কোনো আপত্তি নেই জানবে।
অতএব যুধিষ্ঠিরকে জানালাম যে, সে যেন তার ভ্রাতাদের সহিত এই সভা আহ্বান এবং কর্তব্য নির্ধারণ বিষয়ে আলাপাদি করে। কারণ ইতোপূর্বে জ্ঞাত আছি তার ভ্রাতৃগণ জ্যেষ্ঠর প্রতি বিরূপ আছে। সভায় অবশ্য তারা স্ব স্ব মর্যাদা অনুযায়ী উপস্থিত থাকবে। তখন যদি কোনো অশিষ্ট প্রমাদে এই ভ্রাতৃভেদ সাধারণ্যে প্রকটিত হয় তবে তা সমস্যা সৃজন করবে। অগ্রজ বলেছিলেন, যুধিষ্ঠিরের এই বিবেচনা বা ঔদার্য আমার প্রহসন বলেই বোধ হয় কখনো কখনো যেহেতু মহাবাহু ভীম তাঁর এসব কর্ম অনুমোদন করেন না। ভীম এখনও পুরাতন ক্ষোভ থেকে মুক্ত হননি। যুযুৎসু এ বিষয়ে আমাকে ইতোপূর্বে সম্যক জানিয়েছেন। ভীম কারণে অকারণে ধৃতরাষ্ট্রকে তীক্ষ্ণ বাক্যসায়কে বিদ্ধ করতে থাকলে যুধিষ্ঠির বাধ্য হয়ে বলেছিলেন, ধৃতরাষ্ট্রকে যাঁরা মান্য করবে তারাই আমার মিত্র। যাঁরা তাঁর অহিতকামী তাঁরা অবশ্যই আমার শত্রু। এ অর্থে ভীম এতদিনে নিশ্চিত তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়েছেন। অর্জুনাদি কনিষ্ঠগণ অবশ্য ভীমের মতো পরুষ আচরণ কদাপি করেন না। এরও হেতু আছে। ভীম যেভাবে বাল্যাবধি আমার অগ্রজ এবং তৎপুত্রগণ কর্তৃক অত্যাচারিত এবং অবহেলিত হয়েছেন তাতে তাঁর ইহাদিগের প্রতি কোনো হার্দিক ভাব পোষণ করা সম্ভবই নয়। বাল্যে বিষপ্রয়োগ, কৈশোরে অগ্নিযোগ এবং পরবর্তীকালে বিবিধ প্রক্রিয়ায় ধার্তরাষ্ট্রগণ তাঁকেই তো হত্যা করার বিষয়ে সবিশেষ মনোযোগী ছিল। এখন সুদীর্ঘকালীন নির্যাতন শেষে যখন তারা আজন্ম শত্রুদের নিপাত করে রাজ্য লাভ করেছেন তখন কী কারণে আর তাদের মুখাপেক্ষী থাকতে হবে। ভীমের দর্শনবিশ্বে এ প্রশ্নের উত্তর নেই। ভীম, যুধিষ্ঠিরের প্রকৃতিসম্পন্ন নন। তিনি একান্তই ক্ষত্রিয় বুদ্ধির বা চর্যার লোক। সম্ভবত এ তাঁর পিতৃধারা হতেই লব্ধ। লোকাচারমতে তাঁর এই ধর্ম নান্বীক্ষিকীও নয়। যুধিষ্ঠিরের মানবধর্ম তার দার্শনিক বোধচর্চার ফল। ভীম ব্যবহারিক ধর্মে অনুগত এক ক্ষত্রিয়মাত্র। সে কদাচ তার চিন্তনজগতে মানুষের স্বাভাবিক দুঃখবোধাদি নিয়ে দার্শনিকভাবে ভাবিত নয়। ফলত শতপুত্র নিহত হলে সেই পুত্রদের পিতার হৃদয়সঞ্জাত বেদনা যে তাঁর শত দোষত্রুটি থাকা সত্ত্বেও স্বাভাবিক এমন বোধ ভীমের দার্শনিকতায় উপলব্ধ হয় না। সে এসব কিছুই একটা আত্যন্তিক বিভাগে বিভক্ত করে নিয়েছে যে, যেহেতু এই সব আচরণ আমাদের প্রতি অন্যায্য ছিল অতএব সংগত কারণেই এর প্রতিকূল ব্যবহার, সুযোগসাপেক্ষে অনুষ্ঠান করা আমাদের অধর্ম নয়। সেখানে ক্ষমা বা সহানুভূতি বলে কোনো সুমানবিক ব্যবহারের স্থান নেই। ভীমের চরিত্র নিতান্তই পবনধর্মী, পবন যেমন সূর্যের তেজ অনুযায়ী আচরণ করে ভীমও তদ্রূপ।
বরাবরই দেখেছি, অগ্রজ, দুর্যোধনাদির প্ররোচনায় ভীমকে বিনষ্ট করার বিষয়ে ইন্ধন জোগাতে কার্পণ্য করেননি। বালক ভীম তার অত্যধিক সুস্বাস্থ্য হেতু ভোজন বিষয়ে সর্বদাই অমিতাচারী ছিলেন। তাঁর এই দুর্বলতার সুযোগে মিষ্টান্নে বিষ মিশ্রিত করে ধার্তরাষ্ট্রগণ তাঁকে হত্যা করার কৌশল করলে সরল ভীম তা বুঝতেই পারেননি। অচেতন ভীমকে গঙ্গায় নিক্ষেপকালে কিছু নাগজাতীয় বিষবৈদ্যগণ তা দেখতে পেয়ে তাঁকে উদ্ধার করে। নাগগোষ্ঠীর এই সব মানুষেরা গঙ্গা কিংবা যমুনার দোয়াবের অরণ্য অঞ্চলের আদি গোষ্ঠী। সর্পবিদ্যাধর হিসাবে তাদের খ্যাতি ছিল। বিষক্রিয়া নিরাময়ের জন্য তাদের ভেষজ অমৃত রসায়ন প্রয়োগে তারা ভীমকে সুস্থ করে তুলেছিল। ভীমের চেতনাপ্রাপ্ত হতে অষ্টদিবস কাল সময় অতিবাহিত হয়েছিল। এই অষ্টদিবস সে যে নাগপ্রধানের আশ্রয়ে ছিল তিনি কুন্তীভোজের সঙ্গে আত্মীয়তাসূত্রে আবদ্ধ ছিলেন বলে ভীমকে দৌহিত্র স্নেহে শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তোলেন। ভীম সুস্থ হলে তিনি তাকে বলেছিলেন, বৎস, হস্তিনাপুর প্রাসাদে তোমরা কিন্তু আর নিরাপদ নও। তোমার মাতা এবং ভ্রাতাদের বলবে যে দুর্যোধনাদির তোমাকে বিনষ্ট করার এমন প্রচেষ্টা নাগপ্রধান স্বয়ং অবলোকন করে তোমাকে উদ্ধার করেছেন। আর একথাও স্মরণ রাখবে যে দুর্যোধনাদির এই প্রচেষ্টার কথা যেন সাধারণ্যে রাষ্ট্র না হয়। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে মহদ্ভয় উৎপন্ন হতে পারে কেননা তারা ক্ষমতাবান।
এসব তথ্য ভীমের নিকট হতে পরবর্তীকালে আমি জেনেছি। গঙ্গাতীরস্থ প্রমাণকোটি প্রস্থের উদকক্রীড়ন নামক আবাসটি অগ্রজ দুর্যোধনের সনির্বন্ধ অনুরোধেই রচনা করিয়েছিলেন। দুর্যোধন তখন ষোড়শ কি সপ্তদশ বর্ষীয়, ভীমও তদনুরূপ বয়স্ক। আমার মধ্যমাগ্রজ পাণ্ডু তাঁর নির্বেদকালে এই অঞ্চলেই অকাল বানপ্রস্থী হয়ে বসবাস করতেন। নাগপ্রধান সে সময়ে তাঁর এবং কুন্তী ইত্যাদির সহিত পরিচিত ছিলেন বলেই বোধহয়। একারণেই ভীম নাগাবাসে এই আনুকূল্য লাভে সমর্থ হয়েছিলেন। এই প্রথম পাণ্ডবদের প্রতি দুর্যোধন ইত্যাদির অসূয়া প্রকাশ। এই অসূয়া ক্রমশ বর্ধিত হতে হতে এক সময় কুরুক্ষেত্র হয়ে তার বলয় সম্পূর্ণ করে। এই প্রসঙ্গে নাগজাতি বিষয়ে কিছু আলোচনা আবশ্যক। নাগ এবং ধীবর কুল হস্তিনাপুরের রাজন্যদের স্বাভাবিক শত্রু। এই শত্রুতার কারণও অবশ্যই ভূমির স্বামিত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব। একথা ইতোপূর্বে আমি বিবৃত করেছি মহাজননী সত্যবতীর সঙ্গে মহারাজ শান্তনুর পরিণয় প্রসঙ্গে। নাগদের বিষয়ে তখন অবশ্য কিছু আলোকপাত হয়নি। যা খাণ্ডবদাহ প্রসঙ্গে আভাসিত হয়েছে। ধীবরদের মতো নাগেরাও স্বাভাবিক মৎস্যক্ষেত্র এবং শস্যক্ষেত্রের ভূমিজ ভোক্তা, তদনুরূপেই নাগেরা আরণ্যক অটবী অঞ্চলের স্বভূমক স্বত্বাধিকারী। হস্তিনাপুর নরেশদের স্বাভাবিক শত্রু। একথা বলছি এ কারণে যে ধীবররা যেমন গঙ্গা যমুনার দোয়াবের একসময় পুরুবংশীয় ক্ষত্রিয়গণ এই ভূমি গ্রাস করতে শুরু করেন। এই বংশেরই অন্যতম বীজপুরুষ কুরু কৃষিবিদ্যায় অসামান্য প্রাজ্ঞ ছিলেন এবং স্বমহিমায় কুরুজাঙ্গাল রচনা করে বর্তমানে নটি ‘কুরুক্ষেত্র’ নামে খ্যাত তা আবাদ করেন। তিনি এবং তার অনুচরবর্গ দীর্ঘকালীন কৃষিতপস্যায় এই ভূমিকে শস্যফলপ্রসবিনী করে এক অলৌকিক কীর্তির অধিকারী হন। এই সময় থেকেই ধীবর এবং নাগজাতির স্বার্থের সঙ্গে হস্তিনাপুর নরেশদের বিসংবাদ শুরু হয়। শুরু হয় পঞ্চাল ক্ষত্রিয়কুলের সঙ্গে ভূমির সীমানা নিয়ে বিরোধও। পাঞ্চালরাও এক ঋদ্ধ কৃষকবৃত্তির অনুসারী ভূমিলোভী ক্ষত্রিয়কুল। নাগ এবং ধীবরকুলজাত মনুষ্যেরা এই দোয়াব অঞ্চলের স্বাভাবিক অধিবাসী এবং অধিকর্তা। ভূমিলোভী এই সব ক্ষত্রিয়কুল যখন এখানে স্ব স্ব অধিকার প্রতিষ্ঠায় প্রয়াসী, তখন এই সব কুল যে তাদের স্বাভাবিক শত্রু হবে তাতে আর বিচিত্র কী? তথাপি এদের এই দ্বন্দ্ব বিরোধ একসময়ে সমন্বিত হয়ে স্থিত হয় যখন শান্তনু সত্যবতীর পাণিগ্রহণ করেন কিংবা নাগপ্রধানের সঙ্গে কুন্তীভোজের আত্মীয়তা সম্পর্ক ঘটে। কিন্তু এই আত্মীয়তাও আবার চিড় ধরে যখন এই উপকৃত পাণ্ডবরাই খাণ্ডবদাহ প্রকল্পনা গ্রহণ করে নাগদের উত্তেজিত করেন। এইভাবেই বৈরিতা বৃদ্ধি পায় এবং কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ নামক মর্মান্তিক ঘটনার সংঘটন ঘটে। কুরুক্ষেত্র সংঘটন সে কারণেই এক ভূমিযুদ্ধ কিন্তু সেই ভূমি বিরোধ শুধুমাত্র কৌরব পাণ্ডবের নয়। কৌরব পাণ্ডবের পারিবারিক ভূমিবিরোধ অতিক্রম করে তা কৌরব (বৃহদর্থে, পঞ্চাল, সৃঞ্জয়, মৎস্য, যাদব তথা সমগ্র আর্যাবর্তীয় ভূস্বামী তথা ভূমিকামীদের)।
ধৃতরাষ্ট্র জানতেন ভীমকে বিষপ্রয়োগে হত্যার চেষ্টা হয়েছে। যেহেতু তিনি তখন কুলশীর্ষ তথা রাষ্ট্রশীর্ষ, তাঁর এই অন্যায় কর্মের প্রতিবিধান অবশ্যই কর্তব্য ছিল। দুর্যোধনাদির যতই দোষত্রুটি থাকুক না কেন মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র যেহেতু রাষ্ট্রশীর্ষ, তাঁকে বা তাঁদেরকে উপেক্ষা করে বা তাঁদের অভিমত না নিয়ে তারা কোনো কর্মই করত না। বিষপ্রয়োগের বিষয়টি ধৃতরাষ্ট্রের গোচরে ছিল না এমন ধারণা ভুল। অতএব এ ক্ষেত্রে এই অন্যায় কর্মের নিরাকরণ প্রচেষ্টা তাঁর কর্তব্যকর্ম তো ছিলই। অত্যন্ত দুঃখের বিষয় তিনি তার কিছুই করেননি। কুন্তী তখন সদ্যবিধবা, রাজাবরোধে তাঁর কষ্ট কেই-বা শোনে। তথাপি একদা আমার সেই কদাচিৎ-দয়িতা আমাকে এক নিশীথ সাক্ষাতে এসে জানিয়েছিলেন, ক্ষত্তা, আমার পুত্রেরা বিপন্ন, তাঁদের রক্ষা করবেন না? আমি সব অবগত ছিলাম। বললাম, কল্যাণী আমার উপর ভরসা রাখো। তোমার কোনো চরম ক্ষতি হতে আমি অন্তত দেব না।
তার পরের সংঘটনই জতুগৃহ। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র এই চক্রান্তবিষয়ে অবহিত। এবারও কোনো উচ্চবাচ্য তিনি করলেন না। পাণ্ডবেরা দগ্ধীভূত হয়েছেন এই সংবাদ পাওয়ার পর জনপ্রদর্শনকারী এক তথাকথিত শোকাকুল পরিবেশে আহা, আহা ইত্যাকার শব্দচারণে কুন্তী এবং পাণ্ডবদের শ্রাদ্ধাদি সম্পন্ন করে নিশ্চিন্তে রাজত্বভোগে প্রয়াসী হলেন। এমতাবস্থায় ভীমের বর্তমান মানসিকতাকে দায়ী করা ব্যবহারিক দিক থেকে সম্ভব নয়। যুধিষ্ঠির সর্বজনের কল্যাণকামী গৃহস্থ ছিলেন। কিন্তু তার ভ্রাতৃগণ ক্ষমতা এবং রাজ্যকামী ক্ষত্রিয়। তাঁর ভ্রাতারা এবং পারিপার্শ্বিক ক্ষমতালোভী সমাজ তাঁকে কখনো কখনো সাধারণ কৃষক গৃহস্থের জগৎ থেকে রাজন-এর ক্ষমতার শিখরে উন্নত করার নিমিত্ত স্বধর্মচ্যুত করেছে বটে তথাপি সম্পূর্ণত ক্ষত্রিয় চরিত্রাশ্রয়ী করে গড়ে তুলতে পারেনি। যদি পারত তবে অশ্বমেধ-পরবর্তী যুধিষ্ঠির অন্তত একজন প্রকৃত চক্রবর্তী ক্ষত্রিয় সম্রাট হতেন। কিন্তু আমার প্রত্যাগমনের পরেও দেখেছি তিনি তা হননি। আমার বোধে এরকম একটা সন্দেহ স্থায়িত্বই পাচ্ছে যে যুধিষ্ঠির কদাপি একজন প্রকৃষ্ট রাজা হবার মতো মানসিক স্তরের অবেক্ষমান পুরুষ নন। যে গার্হস্থ্য প্রসাদে আমরা এ তাবৎ বহমান যুধিষ্ঠিরকে দেখেছি কুরুক্ষেত্রের মহাধ্বংসের ব্যাপক বিষণ্ণতা তাঁকে আর সে স্তরে রাখেনি। দেখছি যুধিষ্ঠির তাঁর চিরকালীন পোষিত গার্হস্থ্য জীবনের প্রতিও বর্তমানে বিগতস্পৃহ। তাঁর ধ্যানলোকে এখন একমাত্র জীবনও নয় মৃত্যুও নয় এমন এক অসম্ভাব্য অস্তিত্বের দার্শনিক কামনা বিরাজমান। জীব যদি না জন্মায়, তার দুঃখক্লেশাদি ভোগের সম্ভাবনা থাকে না। জন্মালে দুঃখসমুদায় তাকে অবশ্য পরিবেষ্টিত করবে। এমতাবস্থায় জন্ম এবং মৃত্যুর চক্রের বাইরে যদি কোনো স্থান থাকে সে স্থানই লভ্য। এমন একটি কাঙ্খায় সে এখন কাঙ্খী। কিন্তু হায়, দার্শনিক সত্য যদি কদাপি ব্যবহারিক বাসনায় স্ফূর্তি পেত, তবে কত অসম্ভবেরই না সুষ্ঠু সমন্বয় হত।
ভীম সর্বৈব এক সরলস্বভাব জীবধর্মী। সে কারণেই ব্যবহারিক জীবনে তাঁর এমন বলিষ্ঠতা। মহারাজ যুধিষ্ঠির ধৃতরাষ্ট্রের উপর রাজকোষের আনুপূর্ব ব্যবহারের অধিকার অর্পণ করেছেন। কারণ অর্থের স্বাধীন ব্যবহার, প্রাক্তন নানাবিধ অনর্থের প্রতিষেধক হতে পারে। অর্থের যথেচ্ছ ব্যবহার মনুষ্যকে এক ধরনের স্বস্তি প্রদান করে তথা মহৎ শোকাদি থেকেও বিযুক্ত রাখে এমন লোকবিশ্বাস। কোষাগারের ধনবিশ্লেষণে যদি কুরুরাজ কিছুমাত্র শান্তিলাভ করতে পারে কোহত্র দোষঃ এমন বাসনা প্রথম পার্থ যুধিষ্ঠিরের মতো মনুষ্যের থাকতেই পারে। কিন্তু ভীম কিনা তাবৎ অত্যাচারে অত্যাচারিত। তাই তাঁর প্রতিক্রিয়া ভিন্নরূপ। এতসব কাণ্ডের পর ধৃতরাষ্ট্র কেন অর্থ ব্যবহারের উপর কর্তৃত্ব করবেন? কেন তিনি বিনীত এক প্রায় ভিক্ষোপজীবী হিসাবে পাণ্ডব কর্তৃত্বাধীনে থাকবেন না। এরকম এক স্বাভাবিক পরিণামবোধ তার মধ্যে ক্রিয়াশীল হয়। দুই চরম বৈপরীত্যের মাঝামাঝি কোনো সত্তায় স্থিত নয়। হয় এরা আমার শত্রু এবং ত্যাজ্য অথবা বধ্য, নচেৎ এরা আমার মিত্র, অতএব আদরণীয় এবং প্রতিপাল্য। এই দ্বিমাত্রিক আচরণ ছাড়া ভীমের স্বভাবধর্মে অন্য কোনো বোধ নেই। ফলত ইদৃশ বিপর্যয়। ধৃতরাষ্ট্র, গান্ধারী তখন যে ক্লেশে আছেন সে ক্লেশ তাঁদের অর্জিত, তাঁরা তা ভোগ করতে বাধ্য। কিন্তু মাতা কুন্তী কেন স্বেচ্ছায় সেই ক্লেশের ভাগী হতে চান, অথবা যুধিষ্ঠির কেন ওই কূটচক্রী অন্ধরাজাকে সর্বক্ষমতায় ক্ষমতাসীন করবেন এবং তাঁর তাবৎ ইচ্ছার নিমিত্ত স্ব-স্বার্থ ত্যাগ করবেন, এই বিচার তাঁর বোধে বোধ্য হয় না। ফলত তিনি ধৃতরাষ্ট্রকে স্ব-সহচর দ্বারা অতিক্রম করতে প্রয়াসী হন। তাঁর বিশাল বাহুদ্বয় আস্ফালন করে বন্ধুজন সমাগমে ধৃতরাষ্ট্র এবং গান্ধারীর শ্রবণ সাপেক্ষেই সিংহনাদ সহকারে বলেন, এই বাহুদ্বয়ের শৌর্যেই আমি ওই অন্ধরাজার শতপুত্র বিনাশ করেছি। আর দেখো ওই অন্ধটা এখন আমাদের অর্জিত সম্পদ যথেচ্ছ দান করে তাঁর পুণ্য বৃদ্ধি করছে। এর চাইতে হাস্যকর ব্যবস্থা আর কী-বা হতে পারে।
অর্জুন, নকুল, সহদেব ইত্যাদির মন মানসিকতা এমন কর্কশ ছিল না। অর্জুন বিষয়ে বলতে গেলে বলা উচিত সে একজন আনুপূর্ব পেশাদার ক্ষত্রিয় যোদ্ধা। সে যখন যোদ্ধা তখন একজন চূড়ান্ত যোদ্ধার পেশা তার চরিত্রানুগ। সে যখন প্রেমিক তখন সে রমণীরঞ্জন এবং তা চূড়ান্তভাবেই। আবার সে যখন একজন পরিব্রাজক তখন তার সমগ্র পশ্চাৎ পশ্চাতেই থাকে। তখন চরৈবেতিই তাঁর মন্ত্র। তাঁর পেশাদারি মনন কখনোই তাঁকে কোনো নিবিষ্ট গার্হস্থ্যে বা স্থায়িত্বে আবদ্ধ করে না। যখন নিবাত কবচদের নিধনকালে উর্বশী তাঁর প্রেমকাঙ্খিণী হয় তখন তিনি লোকাচারের উপলক্ষে তাঁকে প্রত্যাহারের দৃঢ়তা অবলম্বন করেন। কিন্তু বিধবা উলুপী যখন তাঁর যৌন নিঃসঙ্গতা ব্যক্ত করে তাঁকে আত্মসমর্পণ করেন তখন তাঁকে সম্ভোগশীর্ষে উপনীত করতে তিনি তাঁর আচরিত ব্রহ্মচর্যব্রত ভঙ্গে কিছুমাত্র বিচলিত হন না। সুভদ্রা বা চিত্রাঙ্গদার ক্ষেত্রে তাঁর অনুরূপ মানসিকতা ক্রিয়াশীল। আবার জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার সামান্যতম ব্যবহারিক বিচ্যুতিতে তিনি তাঁকে হত্যায় উদ্যোগী হন। এ সব কিছুই যেন এক পেশাদারি মনোবৃত্তির পরিচায়ক বলে আমার মনে হয়। সেখানে হৃদয়বৃত্তির প্রসারের কোনো স্ফুরণ আমি দেখি না। নকুল এবং সহদেবের যাপিত জীবনচর্যার যতটুকু খবর আমার জানা তাঁরাও অনেকাংশেই পেশাদার। সেখানে তারা কদাচিৎ স্ব স্ব ব্যবহারের অতিরিক্ত বিষয়ে বাগবিস্তারী। একমাত্র ভীমের আচরণেই কিছু স্বাভাবিক হার্দিক ব্যবহার তথাপি প্রত্যক্ষ করা যায়। সে হার্দিকতা হয়তো-বা অতিমাত্রায় প্রাকৃতগন্ধী কিন্তু তা হার্দিকতা তো বটেই। তিনি দ্রৌপদী বিষয়ে সাতিশয় স্পর্শকাতর, নিতান্ত সরল প্রেম তাঁর কিন্তু এই সরল প্রেমই বিপরীতক্রমে এক অবিশ্বাস্য কাঠিন্যে তাঁকে ক্রূর প্রতিশোধপরায়ণ করে তোলে।
যাজ্ঞসেনীর স্বভাব যে আমি সম্যক অনুধাবন করতে পারি এমন নয়। দ্রুপদ তাঁকে এবং তাঁর সহভ্রাতা ধৃষ্টদ্যুম্নকে যজ্ঞে লাভ করেছেন বলে কিংবদন্তি। এই যাজ্ঞসেন ধৃষ্টদ্যুম্ন এবং যাজ্ঞসেনী দ্রৌপদী, ভারতযুদ্ধ তথা সামূহিক বিপর্যয়ের কেন্দ্রবিন্দু। মহারাজ দ্রুপদ পাঞ্চাল-প্রধান। আগেই বলা হয়েছে, পাঞ্চাল এবং কৌরবদের বিরোধ অতি প্রাচীন। ‘আল’ শব্দটি ভূমির সীমানা নির্ধারক। কুরুজাঙ্গাল এবং পঞ্চআল যে সব ভূমির সীমানা নির্ধারণ করে অরণ্য আবাদকারী জনেদের মধ্যে সেই সীমানা নিয়ে বিরোধ দীর্ঘকালীন। ইতোমধ্যে আচার্য দ্রোণ তাঁর প্রাক্তন সখা দ্রুপদের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে কৌরব সহায়তায় তাঁকে পালটা নিগ্রহ করলে সে বিরোধ আরও ব্যাপ্তি পায়। দ্রুপদের অতঃপরের প্রচেষ্টাই ছিল আচার্য দ্রোণ এবং তাঁর ভর্তাদের বিনাশ। তাঁর বীর্যোৎপন্ন সন্তানগণ সে কার্যে সক্ষম হবে না জেনেই তিনি পুত্র এবং কন্যার বিষয়ে যত্নবান হয়েছিলেন। পাঞ্চাল দ্রুপদ বিবিধ যজ্ঞকর্মে নিষ্ঠাবান হয়ে যজ্ঞসেন উপাধি লাভ করেন। অতএব নানাবিধ দান যজ্ঞ অনুষ্ঠান করে তিনি এই পুত্র এবং পুত্রী লাভ করেন।
ধৃষ্টদ্যুম্ন বাল্যকাল থেকেই আচার্য দ্রোণের নাশকারী হিসাবে দ্রুপদ কর্তৃক সুচারু প্রকল্পে প্রশিক্ষিত হন। যেহেতু তার পরিসৃজনে এই অভীষ্টতা পূর্ব শর্ত ছিল সে কারণে ধৃষ্টদ্যুম্নের চরিত্রে ক্ষত্রোজনোচিত শিষ্টাচার, রণাচার অথবা নৈতিকতা কদাপি দৃষ্ট হল না। সে যেন যন্ত্রবৎ আবির্ভূত হয়ে নির্ধারিত কর্মান্তে বিলীন হয়ে গেল। তাঁর মধ্যে মনুষ্যজনোচিত কোনো আচরণই আমরা পেলাম না।
যাজ্ঞসেনীর ক্ষেত্রে বিষয়টি কিন্তু তা নয়। তিনিও যজ্ঞসম্ভবা। কিন্তু তিনি প্রেমে, কল্যাণে রূপে, গরিমায়, সমাদরে, লাঞ্ছনায়, কিংবা ক্ষমা এবং প্রতিহিংসায় এক অনির্বচনীয় মানবী। তাঁর মধ্যে যাবতীয় মানবিক দোষ, গুণ, মহত্ত্ব বা যাবতীয় মনুষ্যজনোচিত ব্যবহার লভ্য যা যাজ্ঞসেন ধৃষ্টদ্যুম্নের মধ্যে লভ্য নয়। কিন্তু যে কথা বলছিলাম যে তাঁদের সৃষ্টি এবং উপস্থাপনার পশ্চাতে এক অসম্ভব ক্রূর কল্পনা তথা উদ্দেশ্য কার্যকর ছিল। দ্রোণের নিহত হওয়া এবং অশ্বত্থামার শ্রীহীনতাপ্রাপ্তি তার প্রমাণ।
যুধিষ্ঠিরের গৃহে গিয়ে আমার এমত কোনো আবেশ হয়নি যে যাজ্ঞসেনী এই বিপুল ধ্বংসে সামান্যতমও স্পর্শিতা। হ্যাঁ, তাঁর সন্ততিদের ধ্বংসে তিনি অবশ্য বিচলিতা, কিন্তু ব্যাপক ধ্বংসের শোক তাঁকে যে আদৌ বিমর্ষ করেছে এমন আমার বোধ হয়নি। এই অসামান্যা রমণীর চরিত্রে এমন প্রাকৃতভাব আমাকে বিমর্ষ করে।
এরকমই এক পরিস্থিতিতে আমি যুধিষ্ঠিরকে অনুজ্ঞা করলাম, সে যেন একটি নির্ণায়ক সভার আয়োজন করে। এই নির্ণায়কতা যতটা সাধারণ প্রকৃতিপুঞ্জের স্বার্থে ততটা অবশ্যই এই ক্ষমতাকামুকদের প্রয়োজনে নয়। কিন্তু সে বিষয়ে আমি সবিশেষ বিস্তারিত হলাম না। কারণ একমাত্র যুধিষ্ঠির ব্যতিরেকে ক্ষমতাকামুক নয় এমন একজন চরিত্রও আমার গোচরে ছিল না। অতএব এ বিষয়ে বিস্তারিত হবার বিড়ম্বনা অনেক। যুধিষ্ঠির বলল, হে তাত নিশ্চয়, আপনার আকাঙ্খাই পূর্ণ হোক। আপনি আপনার প্রস্তাবিত সভার আয়োজন করুন।
প্রাচীন কুরু মহাসভা প্রাঙ্গণে সভার আবাহন হয়েছে। আর্যাবর্তীয় সমগ্র নরেশকুল এই মহাসভায় অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। এটি কোনো যজ্ঞ সম্মেলন নয়। অতএব, রাজসূয়কালীন মালিন্য তথা অশিষ্টাচারের ভাবনা এখানে নেই। নেই অশ্বমেধকালীন প্রদর্শনীমূলক অভিচার, যাতে মনে হতে পারে একজন ক্ষমতাকামুক তার একরাটত্ব প্রতিষ্ঠাকল্পে এই আবাহনের আয়োজন করেছেন। এ নিতান্ত এক নূতন ব্যবস্থাপনার নিমিত্ত এক ব্যাকুল প্রকল্পনা। যেন বিগত সেই মহাধ্বংসের পরে অবশিষ্ট মনুষ্য খানিক শান্তির আশ্বাস পায়, শান্তিতে খানিকক্ষণ অন্তত বিরাম লাভ করে।
এই সভাগৃহ অতি প্রাচীন এবং নানা স্মৃতিবিজড়িত। এখানেই একদা সত্যবতী পিতা দাসরাজ তাঁর কন্যার বিবাহ নির্ণয়কল্পে এক মহাশর্ত আরোপ করে সভার মণিকুট্টিম থেকে স্তম্ভাদি পর্যন্ত প্রকম্পিত করেছিলেন। এই সেই সভাগৃহ যেখানে ধার্তরাষ্ট্রগণ অক্ষক্রীড়াচ্ছলে পাণ্ডবগণ এবং তদীয় পত্নী যাজ্ঞসেনীকে অশেষ লাঞ্ছনায় নির্যাতিত করে এক ভিত্তিভূমির দৃঢ়তা শিথিল করেছিল। এখানেই অচ্যুতকৃষ্ণ বাসুদেব শান্তিকামী দূত হিসাবে উপস্থিত হয়ে তাঁর জলদমন্দ্র ভাষণে কুরুকুলকে প্রজ্ঞালোকিত করতে প্রয়াসী হয়ে প্রায় বন্দি হতে চলেছিলেন। যুদ্ধকালীন পরিবস্থায় এই সভাগৃহের অভ্যন্তরেই বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বিগত সমুদয় সভার থেকে আজিকার এই সভা ভিন্ন। ভিন্ন এ কারণে যে, এই সভায় উপস্থিত নৃপতিবৃন্দ সকলেই বিগত কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নিহত বীরবৃন্দের উত্তরাধিকারী। যাঁরা পাণ্ডব প্রাধান্য বিষয়ে কেউই কোনো প্রকার বিতণ্ডা উপস্থাপিত করার ক্ষমতাধারী নন। সকলেই তাঁদের স্বামিত্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। কোনো শিশুপাল এখন অকস্মাৎ উত্থিত হয়ে বিড়ম্বনা সৃষ্টি করবেন না যে এই সভায় পুরুষোত্তমকল্পে অমুককে প্রাধান্য দিয়ে তমুককে অসম্মানিত করা হয়েছে। এখানে যাঁরা আজ উপস্থিত হয়েছেন তাঁদের একটিই আকাঙ্খা “সর্বে লোকা সুখিনো ভবন্তু”।
রাজসূয় যজ্ঞকালীন যাবতীয় ঘটনা এবং ঘটনা বিপর্যয়ের সাক্ষী আমি স্বয়ং। অশ্বমেধ যজ্ঞকালে আমি অনুপস্থিত ছিলাম। ফলত, তৎকালীন সংবাদাদি সঞ্জয় এবং গূঢ় পুরুষদের নিকট প্রাপ্ত হয়েছি। রাজসূয় যজ্ঞ বিষয়টি বস্তুত আমার অভীপ্সা সম্মত ছিল না। কারণ রাজসূয় যজ্ঞে অভিলাষী ব্যক্তির আকাঙ্খাই হচ্ছে এই সংবাদ ঘোষণা যে, দেখো আমি চক্রবর্তী, আমি মহৎ চতুর্বলাধিকারী অজেয় একরাট। আমার বশ্যতা স্বীকার করো, আমাকে প্রভু হিসাবে মান্যতা করো। যুধিষ্ঠিরের স্বধর্মও এই যজ্ঞের অনুকূলে ছিল না। কিন্তু তাকে এই যজ্ঞে ব্রতী হতে হল শুধুমাত্র একটি কারণে। সে কারণটি হচ্ছে অচ্যুতকৃষ্ণের পুরুষোত্তমত্ব তথা বাসুদেবত্ব প্রতিষ্ঠার সহায়তা। শঙ্খদত্ত যে আমায় গান্ধারীর কৃষ্ণ তিরস্কার বিষয়ে সবিস্তার বিবরণ দিয়েছিলেন তার উল্লেখে আমি এ বিষয়ের আভাস ইতোপূর্বে দিয়েছি। প্রসঙ্গত, আরও বলি, সে সময়ে আর্যাবর্তীয় রাজন্য বা ক্ষত্রিয় শাসকসমাজে এই পদপ্রার্থী আরও অনেকেই ছিলেন। পৌণ্ড্রক বাসুদেব, শিশুপাল, জরাসন্ধ, রুক্মী, শাল্ব ইত্যাকার বহু ব্যক্তির নামই উল্লেখ করা যেতে পারে। তাঁরা সবাই কৃষ্ণের হাতে অথবা তাঁর চক্রান্তে নিহত হয়েছেন। বস্তুত, নিরপেক্ষ বিচারে এইসব পুরুষের এমন কোনো পাপাচার উল্লেখ্য নয় যে ধরনের পাপাচারে ধর্মাত্মা বা সাধুজন পরিত্রাণকারী তথা তাদের সহযোগীরা দোষী নন। শিশুপাল রাজসূয় যজ্ঞকালে যে ভাবে নিহত হলেন তাকে “অকস্মাৎ আক্রমণে হত্যা” বলে অভিহিত করা ছাড়া অন্য কোনো অভিধায় অভিহিত বাস্তবসম্মতভাবে করা যায় না। এ কথা সত্য যে সভাস্থলে শিশুপাল ব্যাপক ধৃষ্টতা সহকারে কৃষ্ণনিন্দা করেছিলেন। শিশুপাল, অচ্যুতের পিতৃস্বসাপুত্র। আত্মীয়। ঈদৃশ আত্মীয়তার ক্ষেত্রে বিষয়াদির সম্পর্ক থাকলে নানাবিধ তিক্ততার সঞ্চার সংসারে যে ঘটে তা কিছু অভিনব নয়। সে ক্ষেত্রে তাঁকে কৃত্রিম শত্রু বলা চলে। বহুদিনের নানাবিধ ক্ষোভ বোধকরি শিশুপালের মধ্যে সঞ্চিত ছিল এবং এক ব্যাপক প্রকাশস্থল প্রাপ্ত হয়ে সে তার বিস্ফোরণ ঘটায়। তার ঈদৃশ আচরণও প্রশংসনীয় কর্ম নয়। কিন্তু সে কারণে অকস্মাৎ আক্রমণে হত্যা! বিতর্কের উত্তরে বিতর্ক কি উত্থাপিত হতে পারত না? যজ্ঞস্থলে উপস্থিত রাজন্যবর্গ কি প্রচলিত আন্বিক্ষীকি বিষয়ে সকলেই মূঢ় ছিলেন? শিশুপাল যজ্ঞস্থলে কিছু বিতর্কের উপস্থাপনা করেছিলেন। তা নিতান্তই তার্কিকভাবে প্রতিপন্ন বা অপ্রতিপন্ন হবার অপেক্ষা রাখে। সেখানে অকস্মাৎ ক্রুদ্ধ হয়ে হত্যা করার বিষয়টি কীভাবে ধর্মরক্ষার্থে অবশ্যকর্তব্য হয় তা আমার বোধগম্য হয়নি। আমি পুনরায় বলছি, অচ্যুতের প্রতি আমার অসামান্য অনুরাগ এবং শ্রদ্ধা থাকা সত্ত্বেও তাঁর সর্বকর্ম আমি অনুমোদন করতে পারি না বিশেষত তাঁর মতো সুতার্কিক প্রবক্তা এবং দর্শনাদি বিষয়ে প্রাজ্ঞ পুরুষ যখন অনাবশ্যক রক্তপাত এবং অকারণ বলপ্রয়োগের মতো স্থূল ক্ষত্রপন্থা অবলম্বন করেন। সকলের স্বধর্ম বিষয়ে আমি অবহিত, শুধুমাত্র কেশবের যে কীদৃশি স্বধর্ম তাই আমার বোধগম্য নয় এখনও। আর এও এক বিস্ময় যে মহাত্মা ভীষ্ম এবং আমার প্রজনক পিতা মহর্ষি বাদরায়ণি ব্যাস পর্যন্ত তাঁকে পুরুষোত্তম বাসুদেব বলেই সার্বিক মান্যতা প্রদান করেছেন। রাজসূয়কালে এই পুরুষোত্তমের প্রতিষ্ঠা এমন এক অভিচারে নির্ধারিত হল যা আর্যাবর্তীয় রাজন্যকুলের অধিকাংশ ব্যক্তিই সমর্থন করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে এই দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল অচ্যুত তথা তার স্বজনগণের মথুরা বাসকালীন সময়ে এবং মহারাজা কংসের হত্যাকাণ্ডের পর। যদু, কুকুর, অন্ধ, ভোজ, সাত্ত্বত, বৃষ্ণি, কুরু, সৃঞ্জয়, মৎস্য, যবন, ম্লেচ্ছ, এবং অন্যান্য নৃবংশ তথা বিভিন্ন আটবিক গোষ্ঠীর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব নিরাময়ের জন্য একজন পুরুষোত্তম বাসুদেবের প্রয়োজন ছিল। আর্যাবর্তীয় প্রাচীখণ্ডে পৌণ্ড্রক বাসুদেব যিনি প্রাগজ্যোতিষপুরের একরাট, তিনি ছিলেন প্রবল এক প্রতিদ্বন্দ্বী এই সম্মানের জন্য। চেদিরাজ শিশুপাল, মগধ নরেশ জরাসন্ধ প্রমুখের কেউই এবিষয়ে নিরুৎসাহী বা উদাসীন ছিলেন না। কংস এই পক্ষেরই একজন রাজা বিধায়, তাঁর পতনে এঁদের ক্রোধ বর্ধিত হয়েছিল। এইসব রাজন্যগণের মধ্যে পারস্পরিক আত্মীয়তার সম্পর্কও ছিল। কিন্তু আত্মীয়তা সম্পর্ক এক, আর ক্ষমতা বিস্তারের জন্য নিষ্ঠুরতা অবলম্বন অন্য। ক্ষমতা এমন এক রক্তস্বাদ, যার কোনো বিকল্প প্রতিস্বাদ নেই। বরং এক্ষেত্রে এমনই দেখা যায় যে ঋদ্ধিকামী আত্মীয়গণ একে অন্যের প্রতিস্পর্ধী এবং একে অন্যের চূড়ান্ত ধ্বংসকামী।
একারণে আর্যাবর্তীয় ভারতখণ্ডের বিভিন্ন রাজ্যের মধ্যে দুটি পরস্পর বিরোধী গোষ্ঠী বহুকালাবধি এই পুরুষোত্তম বাসুদেব পদাভিলাষী ছিল এবং তাদের সংঘর্ষও বহুকালাবধি প্রবাহিত ছিল। প্রথম ব্যাপক বিরোধের সূত্রপাত হয় কংস কর্তৃক উগ্রসেনকে রাজপদ থেকে উৎসৃজনের প্রাক্কালে। এই সংঘটনের কিছু পশ্চাৎ কথা আছে।
যাদবকুল পশুপালনকারী রূপেই প্রথমত খ্যাত। ক্রমশ পশুপালনাদি কর্ম তাদের কৃষিধর্মে উত্তীর্ণ করে। ফলত, গোষ্ঠীবিভাগ অবশ্যম্ভাবী হয়। যাঁরা শুধুমাত্র পশুপালনকেই জীবিকা হিসাবে নির্ধারিত করে নেন তাঁরা কৃষিজীবী যাদবদের সঙ্গে একপ্রকার দ্বন্দ্ব অবধার্য করে তোলেন এবং তাঁদেরকে স্বধর্মচ্যুত মনে করতে থাকেন। আবার কৃষিকর্মে অনুরাগীরা অধিকতর আর্থিক ক্ষমতাক্রমে ক্রমশ রাজপদাসীন হতে থাকেন এবং প্রাক্তন পন্থাকে হীন মনে করে তাঁদের উন্নত আর্থিক ক্রমকে আভিজাত্যমণ্ডিত করতে প্রয়াসী হন।* এভাবেই কৃষিবল থেকে ক্ষত্রিয় রাজন্য বৃত্তির উদ্ভব হয়। কংস পশুপালনকারী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধ পন্থায় যখন ঋদ্ধিযুক্ত হয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে জয়লাভ করেন তখন প্রাচীন ক্ষমতাধারীরা বেশ কিছুকাল ক্ষীণবীর্যতাবশত তাঁর সব স্বেচ্ছাচার মেনে নেন। কিন্তু একসময় তাঁরাই আবার কালের কূটকৌশল সম্বল করে জয়ী হয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেন। এই রকমই এক জটিল উত্থানপতনজনিত কারণে যাদবকুল একসময় কৃষি এবং গোচারণ বা পশুপালন জাতীয় আর্থকর্মের সমন্বয় সাধন করতে সক্ষম হয়। তথাপি কুলভাগও থাকে এবং কুলবিরোধের বীজসমূহও ক্রমান্বয়ী হয়ে ভবিষ্যতের এক মহা ধ্বংসের সম্ভাবনার কারণরাশিকে পুঞ্জীভূত করে। একসময়, এইসব কারণ এক মহাবিস্ফোরণে প্রকৃতিপুঞ্জ তথা প্রাকৃতিক বিশ্বকে আলোড়িত করে এবং তার প্রাক্তনতা পরিত্যাগ করে নতুন এক সত্তায় জন্মলাভ করে। ইতোপূর্বে কুলভাগ জাতিত্বের বিন্যাসে হলধরী পশুচারী বিভাগ একান্তভাবে বিভক্ত ছিল না। হলধর রাম এবং পশুচারী কৃষ্ণ পরস্পরকে বিভক্ত করার কথা ভাবেননি। কিন্তু একসময় এই বিভাজন যাদবসমাজে এক ব্যাপক সংঘর্ষের বাতাবরণ সৃষ্টি করে। বস্তুত কংস এবং হলধররাম একই বর্গের বলে আমার বোধ হয়। এই হল যাদবকুলের ইতিহাস। কুরুকুল বিষয়ে এর আগে যথেষ্ট বলা হয়েছে। অধিক বলা নিষ্প্রয়োজন। তবে কোনো কুল বা গোষ্ঠীই আনুপূর্ব যে ধ্বংস হয়ে নিঃশেষ হয়ে যায় তা নয়। কুরু, যদু, মৎস্য, সৃঞ্জয়, পঞ্চাল ইত্যাকার তাবৎ কুলসমূহ যে নিঃশেষে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে কোনো চিহ্ন মাত্র রাখেনি এমন নয়। তাঁদের কোনো-না-কোনো শিকড় অদ্যাবধি আছে এবং ব্যাপক গণস্রোতে অবলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের বিশিষ্টতাও থাকবে।
__________________________
* ক্ষত্রিয় শব্দটির উদ্ভব ক্ষেত্র থেকে। কৃষকের ক্রমবিকাশে একসময় রাজন এর আবির্ভাব। রাজনেরা ক্ষত্রিয় জাতি। সুতরাং ক্ষত্রিয়রা মূলত কৃষক। ক্ষেত্র রক্ষার স্বার্থেই একসময় তারা যোদ্ধৃ হিসাবে বিকাশ লাভ করে দ্বিতীয় প্রধান বর্ণের মর্যাদা লাভ করে-লেখক।
রাজসূয় যজ্ঞ না ঘটলে কুরুক্ষেত্ররূপ প্লবতার উদ্ভব হত বলে আমার মনে হয় না। বিভাজিত রাজ্য নিয়ে কুরু এবং পাণ্ডব উভয়পক্ষই সাময়িক শান্তিতেই ছিল। ওই সময়ে ওই রাজ্য বিভাজনে অসুখী অতৃপ্ত দুর্যোধনও কোনো বিশেষ বৈরিতা উৎপন্ন করেননি। খাণ্ডবদাহ সম্পন্ন হলে পাণ্ডবগণ অসম্ভব ঋদ্ধিশালী হন। যাদব এবং পাণ্ডবগণের যৌথ প্রচেষ্টায় খাণ্ডবের অরণ্যভূমির আবাদ অবশ্যই অনেক সুচারুরূপে সম্পন্ন হতে পারত। আটবিকগণের ব্যাপক নিধনের প্রয়োজন এক্ষেত্রে ক্ষমতা প্রদর্শন ছাড়া আর কিছুই নয়। ওই ঘটনায় প্রকৃতি এবং প্রকৃতিপুঞ্জের মধ্যে এক বিসদৃশ প্রাকৃতিক তথা মানব সামাজিক ধর্মহীনতার সৃষ্টি হয়। এই প্রকারে লব্ধ ক্ষমতা স্বাভাবিক কারণেই অধিকতর ক্ষমতা-লোভে পাণ্ডবদের উৎসাহিত করলে ব্রাহ্মণগণ এবং অচ্যুত স্বয়ং যুধিষ্ঠিরকে একরাট বা সম্রাট হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে প্রয়াসী হন। একদিকে অচ্যুতের বাসুদেবত্ব লাভ অপরদিকে যুধিষ্ঠিরকে চক্রবর্তী সম্রাটরূপে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার উদ্দেশ্য, অতএব রাজসূয়ের আয়োজন করা হল। রাজসূয় যজ্ঞারম্ভেই যে ব্যাপক দ্বন্দ্ব প্রকাশলাভ করল তা এই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার সূত্র ধরেই ঘটেছিল। কৃষ্ণকে পুরুষোত্তম বাসুদেব কল্পে অর্ঘ্যদান করা সঙ্গত কি অসঙ্গত সে প্রশ্ন অবান্তর। কিন্তু যে ভূমিকা অবলম্বন করে কৃষ্ণবাসুদেবকে অর্ঘ্য অর্পণ করা হল আমি মনে করি সেখানে কিছু প্রথাগত বিচ্যুতি ঘটেছিল। গোপালক এবং হলধারী যাদববৃন্দ যথেষ্ট ক্ষত্রিয় কিনা এবিচার প্রাচীন ক্ষত্রিয় কুলোদ্ভবদের দীর্ঘকালব্যাপী ছিল। এ সময় শাসনক্ষমতার অধিকারী তাবৎ নৃকুল নিজেদেরকে ক্ষত্রিয় বলে প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী ছিল। আমি অতি গভীর অভিনিবেশে অবলোকন করেছি যে ব্রাহ্মণ্য সহায়তা গ্রহণ করে প্রভূত অনার্য জাতির শাসককুল ক্ষত্রিয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে। অসুর গোষ্ঠীর মানুষেরাও সঙ্করতা প্রাপ্ত হয়ে মাতৃ বা পিতৃ কুলের ধারা ধরে ক্ষত্রিয় হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভে প্রয়াসী হচ্ছে এবং প্রাচীন ক্ষত্রিয় বংশজদের স্বাভাবিক শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করছে। একারণেই পুরুষোত্তমত্বের বা বাসুদেবত্বের পদাধিকার সাতিশয় প্রয়োজনীয় তথা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
যুধিষ্ঠির প্রথাসম্মতভাবেই ভীষ্মকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, পিতামহ, আপনি উপস্থিতজনেদের মধ্যে এমন একজনের নাম উল্লেখ করুন যিনি সর্বতোভাবে অর্ঘ্যদানের যোগ্য। এ কথা শাস্ত্রসম্মত যে অর্ঘ্যদানের যোগ্য ব্যক্তির নির্বাচন হয় গুরু, পুরোহিত, সম্বন্ধী, স্নাতক, সুহৃৎ এবং রাজা এই ছয় প্রকার মনুষ্যের মধ্যে। এঁদের প্রত্যেককেই অর্ঘ্য দেওয়া যেতে পারে। অথবা এদের মধ্যে থেকে কাউকে বিশেষভাবে নির্বাচনও করা যেতে পারে। ভীষ্ম তার বিচারে অচ্যুতকেশবকে শ্রেষ্ঠ মনে করে তাঁকেই অর্ঘ্য দান করতে অনুজ্ঞা করলে চেদিরাজ শিশুপাল এই প্রস্তাব অন্যায্য বোধ করলেন। তাঁর প্রারম্ভিক ভাষণে তিনি এ সম্পর্কে যে বিতর্কের উপস্থাপনা করেন তা যে প্রচলিত ন্যায়াশ্রয়ী নয় একথা আমি বলতে পারি না। তাঁর বক্তব্যে যথেষ্ট সারবত্তা ছিল। ভীষ্ম, অচ্যুতকে পুরুষোত্তম বলে গ্রহণ করেছেন বলেই যে তিনি সাধারণ্যে পুরুষোত্তম হবেন এমন কোনো শর্ত নেই। কেননা অচ্যুতবিরোধী রাজকুলের উপস্থিতি সেখানে বড়ো সামান্য ছিল না। চেদিরাজের বিতর্ক সেক্ষেত্রে একটি সঙ্গত বিতর্কই। তর্কের মাধ্যমে তাঁকে যে উত্তর প্রদান করা প্রথাসম্মত, তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করে সে উত্তর দেওয়া শোভনও ছিল না, সঙ্গতও ছিল না। স্বয়ং ভীষ্ম এবং সহদেব এই বিরোধিতায় অসম্ভব ক্রুদ্ধ হয়ে আমন্ত্রিত তথা কৃষ্ণবিরোধী রাজন্যদের মস্তকে পদস্থাপনের কথা ঘোষণা করলে সভাস্থলেই এক ব্যাপক যুদ্ধের সূচনা হয়। কোনো সভাস্থলে আমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গের উপস্থাপিত কোনো বিরোধী বক্তব্যের প্রত্যুত্তরে কারও মস্তকে পদস্থাপন করার প্রতিজ্ঞা অবশ্যই শিষ্টাচারসম্মত নয়। ফলত তর্ক এক স্পর্ধায় পৌঁছোয় এবং তারই অব্যবহিত ফল শিশুপালের মুণ্ডচ্ছেদ। ঘটনাটি এতই কুৎসিত এবং বীভৎস হয়েছিল যে উপস্থিত তাবৎ আমন্ত্রিত ব্যক্তিবর্গ সম্প্রদায় নির্বিশেষে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনাকে স্বেচ্ছাচার ছাড়া আর কী-বা বলা যেতে পারে? এমন ইতিবৃত্তাচার আমার অভিজ্ঞতায় নেই। এ এক নতুন অভিজ্ঞা এবং অবশ্যই হৃদয়বিদারক। সর্বোপরি দুঃখের হেতু এই যে স্বয়ং অচ্যুত ঈদৃশ হত্যার নায়ক এবং এ কর্মে যদি তাঁর অচ্যুতত্ব মসীলিপ্ত না হয় তবে বর্বরতাকেই কি আমরা স্বাগত করব না?
বস্তুত এরকম বিচার আমি আজকের পরিপ্রেক্ষিতেই করছি। গান্ধারীর অন্বীক্ষা আমাকে ভাবিত করেছে বলেই এই সব বিচার আজ আমার পক্ষে করা সম্ভব হচ্ছে, এ কথা সত্য। কিন্তু এখন বিষয়টি বীভৎস তথা রুচিবিরুদ্ধ মনে হলেও এরকম ভেবেছিলাম যে মহৎ কিছু স্থাপনা করতে গেলে ঈদৃশ ঘটনা ঘটা স্বাভাবিক। এখন বুঝি এই ঘটনাই কুরুক্ষেত্রের নির্মমতম সংঘটনের পূর্বশর্ত ছিল।
এরকমই এক পরিমণ্ডলে প্রাচীন কুরুসভাপ্রাঙ্গণে এই মহাসভার আয়োজন হয়েছে। এই সভার নির্ণয়ক্রম যুদ্ধোত্তর প্রকৃতিপুঞ্জের শাসনসংরক্ষণজনিত কর্মভার বিন্যাস। আমি যেহেতু দীর্ঘকাল রাজধানীতে অনুপস্থিত ছিলাম এবং শ্রীমান সঞ্জয় তৎকালে যাবতীয় আরব্ধ কর্ম পরিচালিত করেছেন এ কারণে তাঁকেই অনুজ্ঞা করলাম সভার প্রারম্ভিক ভাষণ প্রদান করতে। সভা সঞ্চালনের দায়িত্ব নিজের উপরেই রাখলাম। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে রাজন্যগণ যতই ক্ষমতাশালী বা স্বৈরতন্ত্রী হোন মহাসভার কার্যনির্বাহকালীন সময়ে তাঁদের প্রাধান্য বিশেষ কিছুই থাকে না। তখন সচিবগণই প্রধান। এ বিধান সংহিতাকারক ঋষিগণ প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত করেছেন। নচেৎ, প্রকৃতিপুঞ্জ মাৎস্যন্যায়ী স্বভাবে দুষ্ট হয়ে রাজন্যশাসনের বিলুপ্তি ঘটাতে পারে। এই কৃত্য এমন এক প্রয়োজনীয় ঘটনা যাকে উপেক্ষা করলে সমূহ সমাজশৃঙ্খলা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।
সঞ্জয় বললেন, সমবেত রাজন্য, সামন্ত, বুধ, সম্বন্ধি, ঋষিগণ, মন্ত্রীগণ, লোকশিক্ষক বিভিন্নাচারী দার্শনিকগণ এবং উপস্থিত আপামর প্রকৃতিপুঞ্জ, আপনারা সম্প্রদায় নির্বিশেষে আমার প্রণাম গ্রহণ করুন। আপনারা জানেন আমি গবলগণ পুত্র সঞ্জয়, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের সারথি এবং সংবাদবাহক। আমি দীর্ঘকাল এই রাজপরিবারের তথা কুরু রাজ্যের প্রকৃতিপুঞ্জের সেবায় নিজেকে নিযুক্ত রেখে যথাধর্ম কর্তব্য পালন করেছি। বর্তমানে এই মহাধ্বংস যখন কালবিপর্যয়ে সংঘটিত হয়েছে তখনও আমার কর্তব্যকর্ম পরিত্যাগ করিনি। মহাশয়গণ, আমি অকৃতদার অতএব নিজ সামান্য গ্রাসাচ্ছাদন এবং বাসস্থান ব্যতিরেকে অধিক অর্থোপার্জনের কাঙ্খা বা প্রয়োজন কদাপি অনুভব করিনি। সে কারণে আমি প্রকৃতিপুঞ্জ এবং এই রাজপরিবারের সেবা ব্যতীত অন্য কোনো স্বার্থে আবদ্ধও হইনি। আমার এই বচনসমূহ অনুগ্রহ করে আপনারা আত্মশ্লাঘা হিসেবে গণ্য করবেন না। এর সত্যতা আপনাদের অজ্ঞাত থাকার কথা নয়।
আমি এই অন্ধরাজার সারথ্য এবং সংবাদমন্ত্রকতা সম্পাদনকালে কখনোই তাঁর চাটুকারিতা করিনি। যদ্যপি তাঁর আন্তরিক খেদ আমার জ্ঞানগোচর ছিল এবং তন্নিমিত্ত আমি সহানুভূতিপরায়ণও ছিলাম তথাচ, তাঁর আত্যন্তিক ক্ষমতাকামুকতা এবং তজ্জনিত অসদাচরণবিষয়ে আমি কদাপি মৌনতা অবলম্বন করিনি। আমি তাঁকে তাঁর যে কোনো অন্যায্য আচরণ বিষয়ে বিলক্ষণ সমালোচনা করেছি। সভায় উপস্থিত মহাত্মা বিদুর অবগত আছেন যে যুদ্ধোদ্যোগকালে আমি স্বেচ্ছায় উপপ্লব্য নগরে গমন করে পাণ্ডবগণের সঙ্গে সন্ধিবিষয়ে বার্তালাপ করেছিলাম। একথা আমার অবশ্যই বলা বাঞ্ছনীয় যে সে স্থান থেকে প্রত্যাগমন করে প্রথমে আমি এই অন্ধ রাজনকে মূল সংবাদ জ্ঞাপন করে মহাত্মা বিদুরকে বিস্তারিত বিবরণ অবগত করাই। সে দিনের কথা আমার স্মরণ আছে। আমি নিতান্ত ক্লান্ত ছিলাম। দীর্ঘ পথশ্রম এবং অসম্ভব মানসিক ক্লেশজনিত কারণে আমি সেদিন বিশ্রাম লাভের জন্য গৃহে গমন করলে মহারাজ শ্রীমান বিদুরকে আহ্বান করেছিলেন আমার দৌত্য বিষয়ের তাবৎ সংবাদাদি জানার জন্য। সে বিষয়ে আমি পরে জ্ঞাত হয়েছি। বস্তুত সেই দিনটি কিংবা এমন বলাই সঙ্গত যে সেই রাত্রিটি প্রকৃতই একটি নির্ণায়ক দিন বা রাত্রি ছিল। আমি সামান্য কটি কথায় আপনাদের নিকট মহারাজ যুধিষ্ঠিরের বিষয়ে দু-চারটি হার্দিক কথা বলব। আমি মহাত্মা ধনঞ্জয়ের বাল্যসখা। সে কারণে পাণ্ডব বস্ত্রাবাসে সেদিন আমার সমাদর যথেষ্ট স্নেহের সহিতই সম্পন্ন হয়েছিল। পাণ্ডবগণের পঞ্চভ্রাতাকেই আমি বিলক্ষণ চিনি এবং জানি। সে কারণে মহারাজ যুধিষ্ঠির ব্যতীত অন্য চার ভ্রাতার মানসিকতা বিষয়ে আমার পূর্বনির্ধারিত ধারণা এই ছিল যে তাঁরা দুর্যোধনাদিকে কদাপি ক্ষমা করতে পারবেন না। এক অর্থে ক্ষমা করা আদৌ সম্ভবও হয়তো ছিল না। এজন্য আমি তাঁদের দোষও দিই না। কিন্তু আমার দুঃখ হল যখন মহাত্মা ধর্মরাজও যুদ্ধের সম্ভাবনাকে দূরীকরণে অসমর্থ হলেন। আমার এক অত্যন্ত বলবতী প্রত্যাশা ছিল যে এই মহাত্মাই একমাত্র ব্যক্তি যিনি প্রকৃতই ধর্মবেত্তা এবং এই ছার সংসারে সাধারণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে গিয়ে এক মরণান্তক প্লবতাকে সংহত করে সর্বমাঙ্গলিক সদাচারের প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ। কিন্তু হায়! এই মহাত্মা যথেষ্ট কল্যাণকামী লোকহিতব্রতী এবং শান্তিকামী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আমি প্রত্যক্ষ করলাম। তিনি আমাকে যা বললেন তা ছিল তাঁর যৌক্তিক বক্তব্য। আন্তরিক বক্তব্য ছিল না। এই মহাত্মাও তাঁর সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠে আজকে যেরূপ আচরণ করছেন তা করতে পারলেন না। বস্তুত মানুষ ব্যক্তিগতভাবে যতই ধর্মাত্মা হোন না কেন তাঁর পারিপার্শ্বিকতা অতিক্রম করা তাঁর পক্ষে সর্বদা সম্ভব নয়। একক মনুষ্য মহাত্মা হলেও পারিপার্শ্বিক সিদ্ধান্তকে প্রায় কখনোই লঙ্ঘন বা অতিক্রম করতে পারে না।
আমি বলেছিলাম, ‘অজাতশত্রু যুধিষ্ঠির! কৌরবেরা আপনাকে বিনাযুদ্ধে রাজ্য দেবে না। কিন্তু আমি বলি যুদ্ধে রাজ্য জয় করার চাইতে ভিক্ষাবৃত্তিও ভালো। বিশেষত আপনি, যাঁর তুল্য ধার্মিক ও বুদ্ধিমান আর কেউ নেই। আপনিও যদি এই জ্ঞাতিহত্যার পাপে লিপ্ত হবেন তাহলে এতকাল বনবাস দুঃখ ভোগ করলেন কেন? আপনি তো ক্রোধান্ধ হয়ে কোনো পাপ করেননি কখনো। তাহলে কেন এই ঘোর দুষ্কর্মে প্রবৃত্ত হতে চান? মহারাজ, সর্বদোষাকর তিক্ত ক্রোধ শুধু সজ্জনেরাই পান করতে পারেন, আপনিও তাই করুন, আপনি শান্ত হোন। আর যদি অমাত্যদের কথায় আপনি যুদ্ধে ইচ্ছুক হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদেরই উপর সব ভার ছেড়ে দিন। নিজে আপনার দেবযান থেকে ভ্রষ্ট হবেন না।’
মহাশয়গণ, ক্ষত্রিয়চরিত্রচর্যাবিষয়ে আমি আদৌ অনবেদ্য নই। বিশেষত আমি সূত। ক্ষত্রিয় রাজপুরুষদের সঞ্চালন আমার কুলধর্ম। কিন্তু বাল্যাবধি মহাত্মা ধর্মপুত্রকে যে ভাবে আমি জেনেছি তাতে তাঁর পক্ষে কোনো প্রচণ্ড আচরণ আমার বোধে স্থান পায়নি। কোনো প্রতিহিংসাপরায়ণ রণদুর্মদ, জ্ঞাতিহত্যাকারী যুধিষ্ঠিরকে আমি কল্পনা করতে সমর্থ হইনি। কেননা, সে যে এক পরম কল্যাণব্রতী গৃহস্থ, সে একজন অসম্ভব করুণাময় কৃষক, সে যে শুধুই মৈত্রী আর করুণা আর দয়াতেই নিজেকে ঋদ্ধ রেখেছে। সে শুধুমাত্র একটিই মন্ত্র জেনেছে-‘জীবাতবে ন মৃত্যবে।’ কৌরবগণ এবং পাণ্ডবদের অন্যান্য ভ্রাতৃচতুষ্টয় তথা মহামান্য অচ্যুতকেশব ও যাদবপ্রধানদের বিষয়ে একথা আমি বলব না। ওরা ক্ষত্রাচারী। যুধিষ্ঠিরকে সেই পর্যায়ে আমি ভাবতে পারিনি। ফলত আজকের তাঁর এই যে বীতস্পৃহতা তা আমার নিকট কিছুমাত্র বিসদৃশ বোধ হচ্ছে না।
মহাশয়গণ, আপনারা আমার এতাদৃশ বাগবাচালতা মার্জনা করবেন। কিন্তু আমাকে একথা বলতেই হচ্ছে মহারাজ যুধিষ্ঠির প্রকৃতই মহারাজা, কিন্তু সে ভিন্ন অর্থে। বর্তমান পর্যাবস্থায় তিনি কোনোমতেই একজন রাজন হিসাবে গ্রাহ্য হতে পারেন না। তাঁর রাজত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বোধ করি আরও বহুকাল প্রকৃতিপুঞ্জকে অপেক্ষা করতে হবে তথা প্রস্তুত হতে হবে সেই রাজ্যে বাস করার অধিকার অর্জন করতে।
আমি তাঁর মর্মবাণী অবগত আছি। সে কারণে এ কথা বলতেই পারি যে তিনি আজকের এই প্রতিস্পর্ধী ক্ষত্রধর্মাশ্রয়ী মনুষ্য নন। এখন এযুগে তিনি নিতান্তই একজন কৃষক যিনি কর্ষণ করছেন, বীজ আহরণ করছেন, বপন করছেন। অন্তত তার এতাবৎ কালের যাপিত জীবনে তিনি সেই কর্মই করে এসেছেন। সেই কর্মকেই তিনি ধর্ম হিসাবে গ্রহণ করেছেন। সেই ধর্মই তাঁর প্রকৃত জনক। কারণ সেই ধর্মই তাঁকে প্রবাহিত রেখেছিল এতকাল। এখন তাঁর আচরণবিধি দেখে বোধ হচ্ছে তাঁর পিতা ধর্ম তাঁকে পরিত্যাগ করে অন্তর্হিত হয়েছেন যেন। অধুনা তিনি তাঁর স্বধর্ম ত্যাগ করে ব্যক্তিক মুক্তির অন্বেষণ করছেন। একবার যুদ্ধের গ্রাহক হয়ে তিনি স্বধর্ম ত্যাগ করেছিলেন বলেই আমার মনে হয়েছিল, এখন আবার গার্হস্থ্য ধর্মে সংশয়ী হয়ে তিনি পুনরায় স্বধর্মচ্যুত হচ্ছেন বলেই বোধ হচ্ছে। তবে সর্বশেষ তাঁর স্বধর্মই যে বিজয়ী হবে এবিষয়ে আমার সন্দেহ নেই।
মহাশয়গণ, আমি এতক্ষণ যেসব বিষয় বললাম তা অদ্যকার সভার উপজীব্য বিষয় আদৌ নয়। এক্ষণে বাস্তবার্থেই আমাদের একজন প্রকৃত রাজার প্রয়োজন। আমি প্রস্তাব করি, বয়ঃপ্রাপ্ত ক্লান্ত এই পাণ্ডুপুত্রগণ নতুন কোনো শাসনক্রম বিষয়ে যদি উদ্যোগী না হতে পারেন তবে কুমার পরীক্ষিৎকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করা হোক এবং অন্ধরাজার একমাত্র জীবিত পুত্র বৈশ্যাগর্ভ জাত যুযুৎসু তাঁর মন্ত্রী হয়ে প্রকৃতিপুঞ্জের পরিচালনা করুন। এমন নির্বাচনে যদি কারওর আপত্তি থাকে তিনি সভাস্থলে তা ব্যক্ত করতে পারেন। তবে স্মরণ রাখবেন যে এই রাজ্য পরিচালনায় সূতপুত্রেরাই, যেমন স্বয়ং বিদুর এবং আমি সঞ্জয়, উভয়েই সূত এবং এই পরিবারের অর্ধভ্রাতা, আমরাই দায়িক। মহাশয়গণ, আসুন আমরা ভবিষ্যৎপ্রজন্মকে সংরক্ষণ করি। যুদ্ধাদি বর্জন করি এবং প্রকৃতিপুঞ্জের কল্যাণে মহারাজ ধর্মপুত্রের আন্তরিক অভিলাষকে প্রতিষ্ঠিত করি। মহাত্মা যুধিষ্ঠির কখনোই এই রাজ্যে রাজত্ব বিষয়ে আর উদ্যোগী হবেন না একথা আমি ধ্রুব জেনেছি। বৃদ্ধ অন্ধরাজা ধৃতরাষ্ট্রকে সে কারণেই তিনি সর্বতোভাবে রাজ্যভার অর্পণ করেছেন। তবে একথা আপনারা জানবেন যে যুধিষ্ঠির কখনোই তাঁর দায় অতিক্রম করবেন না অথবা এই পঞ্চভ্রাতারা কেউই একে অপরকে অতিক্রম করবেন না।
আমি একটি কথার পুনরাবৃত্তি করি, কেননা সেই বার্তাটিই আজিকার এই আলোচনাসভার বীজবার্তা বলে আমি মনে করি। আপনারা সবিশেষ অনুধাবনপূর্বক বিষয়টি বিবেচনা করবেন। মহারাজ যুধিষ্ঠির আমার বিশ্বাসানুযায়ী মূলত দুইবার স্বধর্মচ্যুত হয়েছেন। প্রথমবার যেমন বলেছি যুদ্ধ বিষয়ে স্বয়ং জড়িত হয়ে, দ্বিতীয়বার এই এখন তাঁর চিরাকাঙ্খিত গার্হস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করে। তবে একথা বলব, মানুষের করণবিধি বিষয়ে শেষ কথা তিনিই বলবেন। তিনিই একমাত্র ব্যক্তি বলে আমি মনে করি যিনি জ্ঞানরূপ মহাহর্ম্যের সমস্ত অলিন্দ, গবাক্ষ, অন্দর কন্দর তথা সেই হর্ম্যের যাবতীয় ছিদ্রপথ পর্যন্ত পরিজ্ঞাত আছেন। পারিপার্শ্বিক নানাবিধ চাপ এবং লোকরীতির আবশ্যকতা জনিত প্রয়োজনীয় কারণে তিনি যে এমত স্বধর্মচ্যুত হয়েছেন সে বিষয়ে আমার সন্দেহ নেই। তাঁর মহত্ত্ব আমরা যথাসময়ে উপলব্ধি করব।
সভাস্থ সকলকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণতি নিবেদন করে এবং আমার বক্তব্যে যদি কোনো অনধিকারজনিত প্রমাদ ঘটে থাকে তবে সকলের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে আমার বক্তব্য সমাপন করছি।
সঞ্জয় তার বক্তব্য শেষ করলে যুধিষ্ঠির বললেন আমাদের পরম বান্ধব সঞ্জয় যে সব বিষয়ের উপস্থাপন করেছেন তার সবিশেষ গ্রহণ বর্জন সম্পর্কে আমার অবশ্যই কিছু বলা প্রয়োজন। সভার নিকট আমার প্রার্থনা সেই বক্তব্য নিবেদনের জন্য যেন আমাকে সর্বশেষ বক্তা হিসাবে নির্ধারিত করা হয়। কারণ পরবর্তী বক্তারাও সম্ভবত আমার বিষয়ে বিভিন্ন মতামত ব্যক্ত করতে পারেন। আমি মনে করি, আমাদের জ্যেষ্ঠতাত এই অন্ধ রাজাও যদি তার বক্তব্যাদি অগ্রে কীর্তন করেন তবে আমি সর্বশেষ বক্তা হিসাবে আমার কথন বিশদভাবে বর্ণন করতে প্রয়াসী হতে পারি। অথবা সবার বক্তব্যশেষে আমার অতিরিক্ত কিছু বলার প্রয়োজন নাও হতে পারে।
যুধিষ্ঠির সঙ্গত কথাই বললেন। সভা এ বিষয়ে অনুমোদন করলে মহামন্ত্রী হিসাবে আমি সভাস্থ ব্যক্তিবর্গকে আহ্বান করলাম। তাঁরা যেন স্ব স্ব বক্তব্য সুচারুরূপে সভায় নিবেদন করেন। এই সভায় আমি সঞ্জয়ের প্রারম্ভিক ভাষণান্তে অনুভব করলাম ইতোপূর্বে ঈদৃশ সভা এই সভাগৃহে অনুষ্ঠিত হয়নি। পূর্ববর্তী যে যে সংকটকালীন সভা এখানে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেই সব সভার নিপুণ ভাষকেরা আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। এ প্রসঙ্গে অচ্যুতকেশবের কথাই আমার সর্বাধিক মনঃপীড়ার উদ্রেক করল। সেই মহান বাগ্মী, ধুরন্ধর রাজনীতিবিদ ব্যক্তিটি আজ কোথায়? তাঁর যত সমালোচনাই আজ আমরা করি না কেন সংকট সময়ে তাঁকে যেহেতু পরম পরিত্রাণ হিসাবে আমরা সদাসর্বদা পেয়েছি, অধুনাতন সংকটে স্বভাবতই তাঁর অনুপস্থিতি অন্তত আমার তীব্রভাবে বোধ হচ্ছে। হায়! কাল সেই মহাসঞ্চালক পুরুষকেও গ্রাস করল। আমার জিজ্ঞাসু মন বর্তমানাবস্থায় তাঁর নির্ণয় বিষয়ে বড়োই কৌতূহলী ছিল। কেননা কুরুবংশের এই পরিণতি যুধিষ্ঠিরের এই অন্তহীন, অপ্রশংসনীয় বিষাদ, এ বিষয়ে তাঁর উত্তরণ প্রচেষ্টা কীদৃশ কার্যশীল হত, তা উপলব্ধি করারও এক উদগ্র কামনা আজ আমার মধ্যে ক্রিয়াশীল। কেশব কি স্বকুল ধ্বংস হবার পরেও তাঁর তত্ত্ব বিষয়ে নিশ্চল থাকতেন? যুধিষ্ঠিরের মতো বিষাদ কি তাঁকেও বিপন্ন করত না? অথবা ওই মহাকৌশলী এবং ধীসম্পন্ন পুরুষ কীভাবে বর্তমান সংকটের সমাধান করতেন এরকম এক সন্ধিৎসায় আমি আকুল হলাম। বস্তুতই কুরুক্ষেত্রে এবং প্রভাসের প্লবতার পর এক যুগান্ত যেন ঘটে গেছে। আমরা সকলেই বোধহয় প্রাক্তন, ভূতপূর্ব হয়ে গেছি। মহাত্মা সঞ্জয় কি কুমার পরীক্ষিৎকে যুযুৎসুর মন্ত্রিত্বে রাজাসনে সে কারণেই বসাবার প্রস্তাব করেছেন?
সমবেত সভাসদদের মধ্যে যুধিষ্ঠির ব্যতীত অন্য চার ভ্রাতাকে জিজ্ঞাসা করলাম তাঁরা কোনো প্রকার বক্তব্য নিবেদন করবেন কিনা। সকলেই এক বাক্যে জানালেন যে মহারাজ যুধিষ্ঠির যা বলবেন তাই তাঁদেরও বক্তব্য, তার অতিরিক্ত কিছুই তাদের বলার নেই। এই অবসরে যুযুৎসু দাঁড়িয়ে সভাসদদের নমস্কারাদি নিবেদন করে অনুজ্ঞা-প্রার্থী হলেন যেন সভা তাকে কিছু বক্তব্য নিবেদন করার অধিকার প্রদান করেন। সভা তার প্রার্থনা অনুমোদন করলে যুযুৎসু বলতে লাগলেন-
মহাশয়গণ, আমি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের ঔরস জাত বৈশ্যাপুত্র যুযুৎসু। অদ্যকার এই সভায় অভিজাত অথবা স্বমহিমালব্ধ কোনো পদাধিকারী না হয়েও আপনাদের নিকট যে আপন বক্তব্যাবলি নিবেদন করার স্পর্ধা করছি তার কারণ মহাত্মা সঞ্জয়ের কৃত ভাষণে মাদৃশ সামান্য ব্যক্তির ভবিষ্যৎ মহামন্ত্রী হিসাবে উল্লেখ বলে জানবেন। আমি বিগত যুদ্ধে যে কৌরবপক্ষ পরিত্যাগ করে পাণ্ডবপক্ষীয় হয়ে যুযুধান ছিলাম এবিষয়ে সকলেই অবগত আছেন। কিন্তু বোধহয় আপনারা জ্ঞাত নন কেন ঈদৃশ সিদ্ধান্ত আমি গ্রহণ করেছিলাম। মহাশয়গণ আমি জন্মসূত্রে সূত মাগধি। আমার শিক্ষা দীক্ষা বা কোনোপ্রকার বিষয়েই আমার উরস পিতা কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। আমার মাতা, মহিষী গান্ধারীর অনুরক্তা সৈরিন্ধ্রীবিধায় মহারাজের মহিষীদের গর্ভাবস্থাকালে মহারাজ কর্তৃক অনুগৃহীতা হন। মহারানি গান্ধারী এবিষয়ে অবহিতা ছিলেন এবং তাঁর বোধকরি এই সম্পর্ক অনাকাঙ্খিত ছিল না। কিন্তু আমার জননী অনুগৃহীতা হলেও আমি এই কুলে কোনোদিন অনুগৃহীত হইনি। মহারাজ যথাসময়ে সেই বৈশ্যাকে বিস্মৃত হয়েছেন এবং তাঁর পুত্রেরা পরবর্তীকালে আমার প্রতি রাজপুত্রসুলভ আচরণ করেছেন, ভ্রাতৃসুলভ নয়। আমি মহারথী, রথী অথবা অর্ধরথী হয়ে গড়ে ওঠার মতো কোনো শিক্ষায় শিক্ষিত হইনি। শস্ত্র বা শাস্ত্র কোনো বিষয়ে আমি পারঙ্গম নই। অথচ কৌরবগণের অর্ধভ্রাতা হিসাবে আমার কিছু-কিঞ্চিৎ শিক্ষা লাভ করার অধিকার ছিল। সে শিক্ষা মহাত্মা বিদুর পেয়েছেন, মহাত্মা সঞ্জয় পেয়েছেন, এরকম আরও কত গুণীজনেরাই না পেয়েছেন। কিন্তু আমি পাইনি। এই পরিবার আমার বা আমার মাতার প্রতি কোনো বিশেষ কর্তব্য করেনি। আমার মাতা শুধুমাত্র আমাকে অবলম্বন করেই জীবনকে শ্লাঘনীয় বোধ করেছেন। কিন্তু আমার অবলম্বনে শ্লাঘনীয় কিছুই ছিল না। শুধুমাত্র মহাত্মা বিদুরের সান্নিধ্যে কিয়ৎকাল যাপন করেছি বলে আমার যেটুকু সফলশিক্ষা আয়ত্ত তা লব্ধ হয়েছে।
আজকে যখন এই সংকটকালে আমাকে ভবিষ্য মহামন্ত্রী হিসেবে সঞ্জয় উল্লেখ করলেন তখন আমি ভাবছি এই গুরুভার বহন করার মতো প্রজ্ঞা আমি কোথায় পাব? অথবা এই কার্য সম্পাদন করার মতো প্রায়োগিক জ্ঞানই বা আমার কোথায়? মহাশয়গণ, একথা সত্য আমি সাতিশয় অভিমানভারাক্রান্ত হৃদয়েই পাণ্ডবপক্ষ অবলম্বন করেছিলাম। সেখানে যেকোনো কারণেই হোক তাঁরা আমাকে সমমর্যাদায় গ্রহণ করেছেন। সেখানে আমি কিছু সম্মান অন্তত পেয়েছি যা দুর্যোধনাদি কদাপি আমায় প্রদান করেনি। মহাত্মা বিদুর অসামান্য প্রজ্ঞার অধিকারী বলেই যে পিতা ধৃতরাষ্ট্র তাঁর সৎকার করতেন এমন নয়। তিনি ভ্রাতা হিসেবে বিদুরকে প্রকৃতই প্রীতির চক্ষে দেখতেন এবং এখনও দেখেন। একথা আমি বিশ্বাস করি। বিদুরও নানাবিধ তাত্ত্বিক তথা ব্যবহারিক বিরোধ থাকা সত্ত্বেও এই অন্ধরাজাকে প্রাণতুল্য প্রীতি করেন। সেকারণেই বারংবার তাঁকে পরিত্যাগ করে চলে গেলেও আবার ফিরে আসেন তাঁরই কাছে। এ তাঁর ধর্ম। তাঁর এই ভ্রাতৃপ্রীতির প্রকাশ আমি জ্ঞানলাভাবধি প্রত্যক্ষ করেছি। সম্ভবত, আমার উরস পিতা স্বীয় অন্ধতাবশত মহাত্মা বিদুরের প্রতি অত্যধিক নির্ভরশীল ছিলেন। সভাসদগণ, আপনারা আমার প্রগলভতা মার্জনা করবেন। আমার স্বকীয় প্রচেষ্টায় যেটুকু জ্ঞানলাভ করতে সক্ষম হয়েছি বা পিতৃব্য বিদুরের, মহাত্মা সঞ্জয়াদির এতাবৎকালের আচরণে যে ব্যবহার আমার গোচর হয়েছে তাতে এমত বুঝেছি যে ক্ষত্রিয় রাজন্যবর্গ যেহেতু পেশিবিক্রমের মূলাধার, মস্তিষ্কবিক্রমে বা তন্নিহিত তত্ত্বের উপস্থাপনে তাঁরা স্বভাবতই স্থৌল্য স্বভাবী। পেশি এবং মেধা এই দুই বস্তু সম্ভবত একত্রে স্থায়িত্ব পায় না।
যুযুৎসু বড়ো চমৎকার ভঙ্গিতে তাঁর বক্তব্য বলেছেন। যদিচ, উপস্থিত সভাসদগণ হয়তো এরূপ বাস্তব তীক্ষ্ণ বচন শ্রবণে অভ্যস্ত নন। কিন্তু আমার বিগত প্রব্রজ্যা আমাকে সর্বমত সহিষ্ণুতায় দীক্ষিত করেছে। সেকারণে যুযুৎসুর ভাষণ কালে সভায় যে ইতস্তত গুঞ্জনের উদ্ভব ঘটেছে তাকে আমি শাসন করতে প্রয়াসী হলাম। আজিকার এই সভায় সব মতের বিশ্বাসের এবং বিরোধের বিষয়সমূহ কীর্তিত হোক। সব সভাসদ তাঁদের দার্শনিক বিভেদসমূহ নিরাকৃত করুন, এমনই আমার আকাঙ্খা ছিল।
যুযুৎসু বলতে লাগলেন, মাননীয় সভাসদবর্গ, আপনারা এই দীন সূতমাগধি জনের বাক্য শ্রবণে ক্রুদ্ধ হবেন না। অথবা আপনাদের ক্রুদ্ধ হয়েও কোনো লাভ নেই। যুগধর্মে ক্রমশ আমা হেন লোকেরা শাসক পর্যায়ে উন্নীত হতে চলেছেন। হে মহান নৃপতিবৃন্দ, আপনারা কালের পক্ষধ্বনি শ্রবণ করুন। যাদের একদা অর্ধভ্রাতা হিসেবে সূতমাগধি হিসেবে, রথচালক, কথক, বাহক হিসেবে আপনারা ব্যবহার করতেন, যাদের মাতাদের আপনারা শুধুমাত্র ক্ষণিকের ভোগজনিত প্রণয়ের পর পরিত্যাগ করে বিস্মৃত হতেন তাঁরা কিন্তু আজ ক্রমশ ক্ষমতার কেন্দ্রে এসে আপনাদের তাবৎ অহংকারকে অবনমিত করেছে। তারাই এখন ক্রমশ ক্ষত্রিয়চর্যাশ্রয়ী হয়ে উঠেছে এবং আমি মনে করি অচিরেই তাঁরা নিজেদেরকে ক্ষত্রিয় বা ক্ষত্রকল্প বলে দাবি করবে। আপনারা জানবেন ক্ষত্রিয়ত্ব কিছু জাতিগত বিষয় নয়। বস্তুত কোনো বর্ণই তেমন নয়। যারা ক্ষত্রিয়কর্ম অনুষ্ঠানে প্রয়াসী হয় তারাই একদা এই বর্ণের পুরুষ হয়। আমার বিচার এই যে আপনাদের গরিমার দিন আজ প্রায় বিগত হতে চলেছে। বস্তুত সূতমাগধি বা যেমন অধুনা বলা হয় শূদ্র তারা যে বর্ণক্ষত্রিয়দের উচ্ছেদ করে ক্ষত্রোচিত আচরণ অবলম্বনে প্রয়াসী হয়েছে তা নয়। আপনাদের নিরন্তর স্বধর্মচ্যুতি আপনাদের এইসব অর্ধভ্রাতাদিগকে স্বাভাবিকভাবেই ক্ষত্রিয়চরিত্র চর্যার পথে অগ্রগামী করেছে। সম্পূর্ণ স্বাভাবিক নিয়মেই তা ঘটেছে। অতএব, তাদেরকে নিধন করে যে প্রাক্তন অবস্থায় ফিরে যাওয়া যাবে এমন নয়। মহাশয়গণ, আমার মনে হয় ক্ষত্রিয় রাজন্য বলতে এতকাল আমরা যাঁদের জেনেছি তাঁরা পরবর্তীকালে আর রাজন্য হিসেবে কার্যকর থাকবেন না। বংশগতভাবে নামে মাত্রই থাকবেন। প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী সূতগণ, যাঁরা রথচালক সংবাদবাহক কথক অথবা মন্ত্রক হিসেবে এতাবৎ কার্য সংবহন করেছেন তাঁরাই হবেন। ক্ষত্রিয় শব্দটি ক্ষমতাকামী জনেদের পরিচয় হয়েই শুধু থাকবে। কিন্তু এই কুরুপাণ্ডব সদৃশ ক্ষত্রিয় আর থাকবে না।
মহাশয়গণ, আমি মহাত্মা বিদুরের মহামন্ত্রিত্বের কাল থেকে স্বজ্ঞানোচিত বিচারের প্রেক্ষিতে এই বিশ্লেষণ করছি। আপনারা স্বজাতি গর্ববশত আমার প্রতি কোপপরায়ণ হবেন না। এক্ষণে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের নিষ্পত্তিকরণ আবশ্যক। কুরুক্ষেত্র প্লবতাপূর্ববর্তী ক্ষত্রিয় রাজন্য এবং বর্তমান ক্ষত্রিয় রাজন্য এক অথবা সমার্থক নয়। আমি এক্ষেত্রে মুনিবর্গের বিধিবিধান পর্যন্ত অগ্রাহ্য করছি এবং বলছি মহাত্মা মনুকথিত স্মৃতিশাস্ত্রই শেষ কথা নয়। বর্তমানে এক যুগান্ত উপস্থিত হয়েছে, এই যুগান্তের সমাজবিন্যাসের প্রবক্তা হিসেবে যদিও এখনও কোনো মনু বা বৃহস্পতিকে আমরা পাচ্ছি না তথাপি অচিরেই যে তাঁদের উদ্ভব হবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আপনারা অবশ্যই বিগত। অতঃপর আমা হেন মনুষ্যদেরই ইচ্ছা প্রাধান্য পাবে এবং রাজন্যনীতিও তদনুরূপ হবে। এই ভবিতব্য স্বীকার করে নেওয়াই বোধকরি যুগধর্ম। এই যুগধর্মকে অতিক্রম করার সাধ্য মহাত্মা অচ্যুতেরও ছিল না বলেই বোধ করি তিনি সসম্মানে অন্তর্হিত হয়েছেন। আর এ কথাও সত্য যে স্বয়ং কেশবও যুগধর্ম বিষয়ে তাঁর চিন্তনের নির্যাস আমাদের প্রদান করেই গেছেন। যুগধর্ম বিষয়ে তাঁর উপদেশের তুল্য অন্য কোনো উপদেশই আর নেই। যুগধর্মকে মান্যতা দেওয়া সবারই কর্তব্য। মাননীয় সভ্যবৃন্দ, মহাত্মা অচ্যুত আপনাদের নিতান্ত প্রিয়। অঘটনঘটনপটু মহাধুরন্ধর এক প্রাজ্ঞ পুরুষ। তাঁর আখ্যান কল্পে সমগ্র কুরুপাণ্ডব যাদবকুল তথা বিভিন্ন মুনিবৃন্দ তাঁকে সনাতন পরব্রহ্ম পর্যন্ত আখ্যায় বর্ণিত করেছেন। তিনি ভবিষ্যতে আরও হয়তো বহু লোকাতীত সম্মানে বিভূষিত হবেন। কিন্তু আমি মনে করি না তাঁর সর্বৈব কর্মই লোকহিতৈষণাসঞ্জাত অথবা তৎকর্তৃক বর্ণিত তাবৎ তত্ত্বই সনাতন। মহাশয়গণ, ইহসংসারে যদি মৃত্যু এবং জন্ম মনুষ্যের চূড়ান্ত পরম্পরা হয় তবে কোনো তত্ত্বই শাশ্বত সনাতন বলে গণ্য হতে পারে না। ব্যক্তির মৃত্যুতে ব্যক্তির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয় এবং তৎকর্তৃক জাত সন্তান ভিন্নতর তত্ত্বে তার বহতা বজায় রাখতে পারে। কিন্তু সেখানে যুগানুযায়ী পরিবর্তন, পরিবর্জনাদি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সামাজিক ব্যবস্থানে ভিন্নতর ভাবে বিকাশশীল করে সনাতনত্বের সম্ভাবনাকে বিনষ্টই করে। অতএব অচ্যুতকে আমি আদৌ অচ্যুত বলে মনে করি না। পরন্তু বহুক্ষেত্রেই তিনি যে চ্যুত হয়েছেন স্বপ্রতিজ্ঞা এবং তত্ত্ব থেকে, তা আমার এই সামান্য জ্ঞানের ব্যতিরেক নয়। যদি উদাহরণ চান এই মহাপ্লবতার মহামুহূর্তে সংঘটিত বহু ঘটনার উল্লেখ আমি করতে পারি। আমি জানি এই সভায় পাণ্ডবগণ ব্যতিরেকেও বহু ব্যক্তিই আছেন যাঁরা সেই অমোঘ শক্তিধর ধুরন্ধর কূটনীতিক কেশবের গুণমুগ্ধ, তাঁরা অবশ্যই আমা হেন এক বৈশ্যাপুত্রের মুখে সেই যুগন্ধর পুরুষের সমালোচনা স্বাভাবিক বোধে গ্রহণ করবেন না। তথাপি আমাকে কিছু এতাদৃশ অপ্রীতিকর আলোচনা করতেই হচ্ছে। কারণ এমত সুযোগ সূতমাগধীগণের জীবনে নিয়ত আসে না।
আমি মনে করি কেশব অত্যন্ত স্বার্থপ্রণোদিত হয়ে এই যুদ্ধে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তিনি অবশ্যই এযুদ্ধকে কোনো-না-কোনো ক্রমে যে রোধ করতে পারতেন মাতা গান্ধারীর এমন এক ধারণাকে আমি অসম্ভব বোধ করি না। তিনি যেরূপ ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রবিৎ ছিলেন তাঁর পক্ষে এ যুদ্ধ অতিক্রম করে এক সুষ্ঠু সংহত ব্যবস্থা নির্মাণ করা আদৌ অসম্ভব ছিল না। তাঁর স্বকুলে, কুরুপাণ্ডবদের বিরোধের চাইতে বহু বহুগুণ অধিক বিরোধ যে বর্তমান ছিল তা নিশ্চয়ই আপনাদের বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্ধ, কুকুর, বৃষ্ণি, সাত্বত ইত্যাদি গোষ্ঠীদের মধ্যে যে পারস্পরিক বিবাদ তা সভাস্থলে উপস্থিত জ্ঞানীদের মধ্যে কে না জানে? সে সমস্ত বিবাদকে কি তিনি বিধিমতে নিরাময় করে এক অখণ্ড যাদব অভিজাততন্ত্র গঠন করেননি? মহারাজ উগ্রসেনকে নামে মাত্র এক রাজনামাঙ্কিত আসনে স্থাপন করে তিনি এবং মহাত্মা বলদেব যাদবশক্তির শীর্ষে অবস্থান করেছেন। মন্দ করেছেন একথা বলছি না তবে স্বয়ং যে সিংহাসন গ্রহণ করেননি তার কারণ এই যে অন্যান্য গোষ্ঠীদের মধ্যে তাহলে রাজপদ নিয়ে যাদব স্বভাবানুযায়ী এক লগুর যুদ্ধ যা মুষল যুদ্ধ রূপে অতঃপর সংঘটিত হয়েছে, পূর্বেই অনুষ্ঠিত হত।
বুধগণ, আমি বলছি কেশব শুধুমাত্র পাণ্ডবগণের প্রতি প্রীতিবশত এই মহাপ্লবের আয়োজন করেননি। তিনি সমগ্র আর্যাবর্তে ভবিষ্যৎ যাদবশক্তির প্রতিষ্ঠাকল্পেই এই কূটনীতি অবলম্বন করেছিলেন। সে কারণেই, আপনারা দেখুন, এই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কিন্তু কৌরব পাণ্ডবদের সমুদয় অপত্যই নিঃশেষিত। তাঁর অর্থাৎ কেশবের ভাগিনেয় অভিমন্যু পর্যন্ত। অভিমন্যুর নিধন সম্ভবত তাঁর গণনায় ছিল না। কেননা, কৌরবপক্ষীয় ঈদৃশ ব্যূহ নিবেশ হয়তো তিনি অনুমানই করেননি। কিন্তু যুদ্ধশেষে প্রায় নিহত দুর্যোধন এবং অবশিষ্ট যোদ্ধাবর্গ যে এমত এক নৈশসংহারে প্রবৃত্ত হতেই পারে এ আশঙ্কা তাঁর না থাকার কোনো কারণ নেই। তিনি লোকচরিত্রে অভিজ্ঞ।
কৃতবর্মা, অশ্বত্থামা ইত্যাদিদের স্বরূপ তিনি বোঝেননি অথবা যে মৃতপ্রায় পুরুষকে তাঁরা রণক্ষেত্রে শায়িত রেখে নির্বিকারে তাঁরই রণশিবিরে বিশ্রামাভিলাষী স্বপক্ষীয়দের ছেড়ে নিজেরা স্ব স্ব সংরক্ষিত শিবিরে বিশ্রামে গমন করলেন তা আমার অতীব বিস্ময়কর বোধ হয়েছে। তিনি তো এত সরল বিশ্বাসী মনুষ্য নন। তিনি এই নৈশসংহারের সম্ভাব্যতা অনুমান করলেন না কেন? তা কি উত্তরার গর্ভবিষয়ে তিনি জ্ঞাত ছিলেন বলেই? হায়! যে পাঞ্চালী তাঁর সখী ছিলেন তাঁর পুত্রদের রক্ষাকল্পে তিনি এমত উদাসীনতা দেখালেন যদিচ উদাসীনতা তাঁর চরিত্রে কদাপি আমরা পূর্বে প্রত্যক্ষ করিনি। এ কি অভিমন্যুকে সংরক্ষণে অপারগতার জন্য পাণ্ডবদের প্রায়শ্চিত্ত করানো?
মহাশয়গণ, যুদ্ধ শেষ হয়েছে আজ বহুদিবস গত, অচ্যুতের প্রভাবও শেষ হয়েছে, দ্বারকা আজ জলমগ্ন এবং যাদবকুলও পরস্পর সংঘর্ষে বিনষ্ট। বর্তমানে দুটি মাত্র কুলপ্রদীপ প্রজ্বলিত আছেন, একটি যাদবকুল দৌহিত্র পরীক্ষিৎ অপরটিও যাদব কুলাত্মজ কৃষ্ণ নপাৎ বজ্র। ভবিষ্যতে তাঁরা রাজা হবেন। ফলত শেষ জয় যাদবদের উত্তরাধিকারীদেরই। প্রসঙ্গত একটি বিষয় আপনারা লক্ষ্য করবেন। বিগত যুদ্ধে যদিচ বিপুলসংখ্যক যাদব-সৈন্য উভয় পক্ষে যুদ্ধ করেছে এবং অধিকসংখ্যকই হতাহত হয়েছেন কিন্তু অচ্যুতের পুত্রগণকে সযত্নে এই আহবের বাইরেই রাখা হয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নিহত যাদবদের নিধন তাঁর বোধকরি কাম্যই ছিল এবং তা গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বেরই কারণ। অন্যান্য শত্রুদের নিধন যেমন তিনি পাণ্ডবদের দ্বারা করিয়েছেন এক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। কিন্তু কালের কী পরিহাস। এই যুদ্ধের সূত্র ধরেই তাঁর সমগ্র আত্মজন এক অভাবনীয় গৃহযুদ্ধে সমূলে শেষ হল। অচ্যুত, তাঁর কাঙ্খিতফল আনুপূর্ব না পেলেও মূলত বোধকরি এই প্লবতায় একমাত্র ভাসমান অস্তিত্ব, যদিচ তাঁর স্বপ্নের দ্বারাবতী এখন অতীতের স্মৃতিমাত্র।
অভিমন্যুর কাল থেকেই পরম্পরাগতভাবে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু হয়েছিল তাতে দেখা যাচ্ছে কার্যগতিকে পাণ্ডবকুমারেরা তাঁদের যাদব কুটুম্বকুলেই শিক্ষাদি লাভ করেছেন। বনবাসকালে পাণ্ডবতনয়গণ হস্তিনাপুরে বসবাস করেননি। অচ্যুতের ব্যবস্থাপনায় সুভদ্রা পঞ্চ দ্রৌপদীপুত্র তথা অভিমন্যু দ্বারাবতীতেই যাদবকুমারদের সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষায় পরিবর্ধিত হয়েছেন। কুমার পরীক্ষিৎ কুরুক্ষেত্রযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম। তিনি কিঞ্চিৎ বয়ঃপ্রাপ্ত হলে অচ্যুত তাকেও যাদবমণ্ডলীতে শিক্ষিত করার ব্যবস্থা করেন। ইতোমধ্যে প্লাবন তথা গৃহযুদ্ধ দ্বারাবতীকে বিনষ্ট করলে তিনি বর্তমানে অতিবৃদ্ধ আচার্য কৃপের তত্ত্বাবধানে শস্ত্রাদি শিক্ষা অভ্যেস করছেন। এটুকুই মাত্র কুরুকুল সংস্কৃতি যা পরীক্ষিৎ প্রাপ্ত হচ্ছেন। নচেৎ, যাদব-সংস্কৃতিই এখন এ প্রজন্মের সংস্কৃতি। প্রাচীন কুরুকুলপরম্পরার বিশেষ কিছুই বর্তমানে এই বংশে লভ্য নয়। এখানেই যাদব বিজয়ের তাৎপর্য এবং তা অচ্যুতের স্বার্থসিদ্ধি বলে আমি মনে করি।
বর্তমানে হস্তিনাপুরে দুর্গমধ্যস্থ পরিব্যবস্থা ব্যক্তিগতভাবে আমার নিতান্ত রুচিবিগর্হিত বলে বোধ হয়। এই বৃহৎ কৌরব পরিবার দু-এক জন বিশেষ ব্যক্তি ব্যতিরেকে কদাপি স্বাভাবিক গার্হস্থ্যের অনুগামী হয়নি। সভায় উপস্থিত প্রাচীনজনেরা অবগত আছেন মহারাজ শান্তনু কীদৃশ ইন্দ্রিয়পরায়ণ তথা আত্মসুখান্বেষী নৃপতি ছিলেন। ভট্ট ব্রাহ্মণদের চাটুকারী কুলপঞ্জিকা এক্ষেত্রে প্রামাণ্য কোনো ইতিহাস নয়। মহারাজ যযাতির ইন্দ্রিয়পরায়ণতার কথা অবশ্যই উপস্থিত সর্বজনের নিকট বিদিত। শুধুমাত্র মহামাত্য, মহামন্ত্রী এবং কতিপয় সর্বতোকল্যাণবৃদ্ধি ঋষিগণই দীর্ঘকাল ধরে এই বংশের সুনাম সুশাসনজনিত কীর্তি তথা প্রকৃতিপুঞ্জের প্রতি কর্তব্যনিষ্ঠার এক পরম্পরা বহমান রেখেছেন। সর্বোপরি দীর্ঘজীবনের অধিকারী তথা মেধাবৃত্তিতে ক্ষমতাশালী মহাত্মা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন জীবিত থেকে এই বংশকে কলুষমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা করেছেন। বর্তমান বিবর্তিত পরিবস্থায়ও দেখা যাচ্ছে এই বংশাধিপদের একমাত্র মহারাজ যুধিষ্ঠির ব্যতিরেকে কারওরই যেন উদার মুক্তবুদ্ধি কার্যশীল নয়। সভায় উপস্থিত মহাবীর ভীমসেন সম্পর্কে এ বিষয়ে আমি কিছু বলতে চাই।
মহাশয়গণ, আমি নিশ্চিতই বিগতযুদ্ধে পাণ্ডবপক্ষ অবলম্বন করে প্রমাণ স্থাপন করেছি যে আমি আমার জন্মদাতা পিতা অথবা কৌরবগণের পক্ষপাতী নই। শুধুমাত্র ব্যক্তিগতভাবে আমার প্রতি তাঁদের ঔদাসীন্য বা তুচ্ছাচরণই এর হেতু নয়। তাঁদের অমানবিক আচরণসমূহই সেক্ষেত্রে প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়েছে। কিন্তু তাঁরা যে সব অসদাচরণ করেছেন তার মূল্যও চূড়ান্তভাবেই তাঁরা দিয়ে গেছেন। তাহলে এক্ষণে ভীমসেনের ক্ষোভের আর কী কারণ থাকতে পারে? তিনি কি ওই অন্ধ হতভাগ্য রাজা, তাঁর পত্নী মাতা গান্ধারী অথবা অগণিত এই কৌরব বিধবাকুলকে বিনাশ করতে আগ্রহী? নচেৎ কেন তাঁদেরকে ভীমসেনের নিয়ত বাহ্বাস্ফোট শ্রবণ করে সশঙ্ক থাকতে হবে? তাঁরা তো বর্তমানে অনাথা প্রায়! প্রৌঢ়া রাজ্ঞী ভানুমতীকে কেন অতিভীতা কুরঙ্গীর মতো কাল যাপন করতে হবে? তিনি বা অন্যান্য কৌরবমহিষীরা তো যাজ্ঞসেনীর অবমাননা কালে অন্যান্য পাণ্ডবরমণীদের মতো অপ্রতিবাদিনী ছিলেন না। পরন্তু তাঁরাই তো সে সময়ে কৌরবদিগের প্রতি নিন্দায় বিশদ বিতণ্ডা সৃষ্টি করেছিলেন, যখন অন্যান্য পাণ্ডবমহিষীরা এমনকী কৃষ্ণভগিনী সুভদ্রাও কোনো বিতণ্ডা তোলেননি।
একথা সত্য যে ভীমসেন পিতা অন্ধরাজ তথা তাঁর কতিপয় পুত্র কর্তৃক অমানবিকভাবে দীর্ঘকাল নির্যাতন ভোগ করেছেন। কিন্তু বিকর্ণাদি ভ্রাতারা সকলেই যে সেই অপরাধের জন্য দায়ী এমন মনে করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই। কিন্তু জ্যেষ্ঠগণের পাপের ফল হিসেবে তাঁরাও ভীমের হিংসার বলি হয়েছেন। কিন্তু এই অনাথা বিধবাকুল তো কোনো অপরাধ তাঁর প্রতি অথবা কারও প্রতিই করেননি। এই সভাস্থলে যে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন মহাত্মাগণ নানা প্রকার সদাচার, মৈত্রী, করুণা এবং ন্যায়ের কথা প্রচার করেন তা কি শুধুই বাগাড়ম্বর? তার বাস্তব প্রয়োগ কোথায়? বরঞ্চ তার বিপরীত আচরণই বর্তমানে পুরমধ্যে প্রত্যক্ষ করা যাচ্ছে। অন্ধরাজাকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য দাসদাসীগণ পর্যন্ত মধ্যম পাণ্ডবের প্ররোচনায় তাঁর বাক্য অবহেলা করছে। তাঁর সাক্ষাতেই তারা নানাবিধ কটূক্তি দ্বারা হতভাগ্য এই বৃদ্ধ অন্ধরাজাকে যারপরনাই বিদ্ধ করছে। আপনারা বলতেই পারেন যে ঈদৃশ রাজনৈতিক সভা অন্তঃপুরের সমস্যাবলি আলোচনার স্থান নয়। কিন্তু অনুধাবন করুন এই অন্তঃপুরের সমস্যাবলিই কিন্তু বিগত মহাপ্লবের প্রত্যক্ষ কারণ ছিল। অতএব আজকের সমস্যাবলি যে ভবিষ্যতে কোনোপ্রকার দুঃখজনক অবস্থার সৃষ্টি করবে না একথা আমরা বলতে পারি না। বিশেষত দুঃখিনী বিধবা কৌরবরমণীরা যদি অনিবার্য কারণবশত কেউ কেউ, বা সদলে আত্মঘাতী হন তবে সেই ক্ষোভ এবং লজ্জা কি কুরুবিশ্বকে আলোড়িত করবে না? এই কারণে এই সভার নিকট প্রার্থনা, আপনারা সর্বপ্রথম রাষ্ট্রপুরুষগণের আচরণীয় জীবনযাপনের একটি সুনির্দিষ্ট মানদণ্ডের কথা চিন্তা করুন। ক্ষমতালাভ এবং ক্ষমতার ব্যবহার বিষয়ে একটি নির্দিষ্ট মূল্যায়ন রচিত হোক। বর্তমান সমাজ ইতোপূর্বের বর্ণাশ্রমী সমাজের মতো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচারে স্ব স্ব নির্দিষ্ট কর্মানুসারী নেই। এখন ব্রাহ্মণগণও ক্ষত্রবৃত্তি, ক্ষত্রিয়গণও ব্রাহ্মণ অথবা বৈশ্যবৃত্তি অথবা একবর্ণ অন্যবর্ণের বৃত্তির অনুসারী যে হচ্ছেন সে সত্য যথেষ্ট পরিদৃশ্যমান। যুগসন্ধিক্ষণে বর্ণসংকরত্ব ব্যাপকতা লাভ করে। এই সংঘট্টন ক্রমশই জটিল থেকে জটিলতর হচ্ছে। ফলত বর্ণ বিষয়ে শুদ্ধতা রক্ষণ আর সম্ভব হচ্ছে না। যদিচ অচ্যুতকৃষ্ণ বলেছেন যে স্ত্রীগণ দুষ্টা হলে বর্ণসংকরের জন্ম হয়। কিন্তু আমি তা বোধ করি না। বিশ্বাসও করি না। ভদ্রগণ, আমার কথাই যদি ধরেন, আমি একজন বর্ণসংকর অথবা আর্য বিদুর বা মহাত্মা সঞ্জয়, আমরা সকলেই বর্ণসংকর অর্থাৎ সূত। আমরা যে অর্থে বর্ণসংকর, আমার উরসপিতা এই অন্ধরাজা তাঁর উরস পিতা মহাত্মা বেদব্যাস, আমার এই খুল্লতাত পুত্র পাণ্ডবগণ অথবা বর্তমানে এই সভায় উপস্থিত যাবতীয় সভ্যবৃন্দ তাঁদের কে বর্ণসংকর নন বলুন তো? এই সভায় উপস্থিত যাবতীয় ব্যক্তিগণের মাতা, মাতামহী বা প্রমাতামহীদের দুষ্টতার জন্যই কি এমত বর্ণসংকরতা? তাঁরা যে যে পুঙ্গবদের পুংবীজ বহন করে আমাদের গর্ভে ধারণ করেছেন সেই সেই পুঙ্গবগণ সবাই কি এই উৎসৃজনের প্রক্রিয়ায় কামপরবশ হয়ে সমান দুষ্টতার নিদর্শন রাখেননি? অবশ্য অচ্যুত এবংবিধ কর্মকে কোথাও দুষ্টতা বলে বর্ণনা করেননি। তবে ‘স্ত্রীষু দুষ্টাসু’ এরকম শব্দবন্ধ কেন। আমি আমার মাতার নিকট জ্ঞাত হয়েছি কীভাবে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁকে সানুরাগে গ্রহণ করেছিলেন। ক্ষত্রিয়রাজ অন্তঃপুরে কোনো সৈরিন্ধ্রীর ঈদৃশ ব্যবস্থাপনা ব্যতিরেকে পুত্রলাভের জন্য অন্য কোনো উপায়ই তো বর্ণাশ্রমী সমাজ রাখেনি। কেননা, মদীয়া বৈশ্যামাতা মহারানি গান্ধারীর সৈরিন্ধ্রী বিধায় এবং তাঁর কোনো যোগ্য পুরুষের সহিত বিবাহিতা হওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা না থাকায় এবং রাজ্ঞীর সপত্নীগণের তথা তস্যা তস্যা সৈরিন্ধ্রীগণের কামোল্লাসাদি থেকে এই পুরুষকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্রেই আমা হেন বর্ণসংকরদের জন্ম পরিগ্রহ। ষড়যন্ত্রে যদি গান্ধারী ব্যর্থও হতেন তথাপি আমাদের মতো সংকরদের জন্ম অব্যাহতই থাকত। একথা সবাই অবশ্যই জানেন রাজত্ব প্রদানের পরিবর্তে কুরুকুল অমেয় যুবতী দাসী অমেয় পরিণীতা পত্নী এবং রত্নসম্ভারে এই অন্ধরাজাকে সন্তুষ্ট রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তথাপি তাঁর ক্ষমতার তৃষ্ণা মেটেনি। তবে ক্ষমতার তৃষ্ণা মেটেনি বলে তিনি রাজকীয় ভোগে যে আদৌ বিরত ছিলেন এমন নয়। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন এই যে অচ্যুত কথিত ‘স্ত্রীসু দুষ্টাসু’ ইত্যাদি বচন কি বর্ণসংকরের বিষয়ে আদৌ যথাযথ? অথবা হে মাননীয় সভাসদবৃন্দ যে বর্ণাশ্রমী সমাজ প্রতিষ্ঠাকল্পে অচ্যুত এই মহাবিপ্লবের অনুষ্ঠান স্ব হস্তে স্ব-মেধার বিশ্লেষণী চমৎকারিত্বে পরিচালনা করেছেন সেই বর্ণাশ্রমী সমাজের কোন শ্রেণিতে অথবা বিভাগে তাঁর নিজস্ব যাদবকুল স্থিত? তাঁর কুল কি প্রকৃত ক্ষত্রিয়কুল না সংকর? যাদবেরা কি শাস্ত্রসম্মত ক্ষত্রিয় অথবা এক বুদ্ধিমান মিশ্র জাতি? অথবা ক্ষত্রিয়ত্ব কি কোনো জাত্যর্থবোধক বিশেষ ধারণা অথবা পেশাগত অভিধা; অবশ্য যে অর্থে চাতুর্বর্ণ্যের সকলেই পেশাগতভাবে ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য এবং শূদ্র। তবে বর্তমান এই চাতুর্জাতিক বিভাজন আর সামাজিক চতুর্মাত্রায় থাকছে না। সেখানে বিবিধ সংকরত্ব নানান জাতির অভ্যুদয় ঘটাচ্ছে। সেক্ষেত্রে আমার বক্তব্য এই যে নৈকষ্যতা আর কোনো বর্ণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দ্রোণ, কৃপ, পরশুরাম প্রমুখ ব্যক্তিগণ যদি অস্ত্র ধারণ করে সংগ্রামে অগ্রগামী হতে পারেন অথবা এই পাণ্ডবদের যদি অস্ত্রধারণ রাজ্যলাভকরণ ধর্ম হয় তবে তা আমা হেন জনেদেরই বা নয় কেন? বিশেষত আমি যখন অবগত আছি যে বর্তমান সভায় উপস্থিত মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র স্বয়ং বেদব্যাস ঔরসজাত, মহাত্মা বেদব্যাস সত্যবতী ক্ষেত্রে মহর্ষি পরাশর বীর্যজাত, মহাত্মা পাণ্ডবেরা কুন্তী এবং মাদ্রীর ক্ষেত্রে অজ্ঞাত বীর্যসম্ভূত। এই ক্ষেত্রদ্বয় পাণ্ডুর।
যিনি বা যাঁরা অস্ত্র ধারণ করেন তাঁরা যদি সে অস্ত্র ন্যায়ের জন্য ধারণ করেন তবেই তিনি অথবা তাঁরা ক্ষত্রিয় হন। অন্যথা দস্যুতা তাদের একমাত্র অভিধা হয়। মহাশয়গণ, বর্তমান আর্যাবর্তীয় নৃপতিগণের ক্ষেত্রে ক-জন ক্ষত্রিয়পুঙ্গবকে আপনারা ন্যায়ের জন্য ধর্মের জন্য অথবা দণ্ডের জন্য অস্ত্রধারণ করতে অবলোকন করেন। বহুকাল ধরেই আমার অভিজ্ঞতা এই যে ক্ষত্রনরপতিগণ শুধুমাত্র রাজকোষে ধনাগম বৃদ্ধি হেতুই শস্ত্রসাধনায় তৎপর। নানান প্রস্তাবনায় সেই ধন সংগৃহীত হয়ে থাকে। যেমন রাজসূয় যজ্ঞ, অশ্বমেধ যজ্ঞ, বৈষ্ণব যজ্ঞ বা অনুরূপ অসুমার অভিচার। এই যজ্ঞের বৃহৎভাগ যেহেতু ব্রাহ্মণেরা লাভ করেন অতএব এইসব যজ্ঞ পুণ্যকর্ম। অতএব হে নৃপতিবৃন্দ তোমরা এতাবৎ যে সব পাপাচারণ করেছ তজ্জনিত পুণ্য সঞ্চয়ার্থে যজ্ঞাদির অনুষ্ঠান করো এবং ব্রাহ্মণগণ ধনলাভ করুন। এটাই ধর্ম। চমৎকার!
আমার অনুমান এই, মহারাজ যুধিষ্ঠির এতাদৃশ কর্মকে আর ধর্ম বলে অনুভব করতে পারছেন না বলেই তাঁর অধুনাতন বিষয়বিরাগতা। মহদাশয় ধর্মরাজ কুরুক্ষেত্র নিধন পরবর্তীকালে প্রথমত মহিম্ন সেই পুরুষ যিনি তাঁর দীর্ঘ জীবনের আনুকূল্যে বহুদর্শী এবং বিবিধ দর্শনে সম্যক ঋদ্ধ ছিলেন তাঁর উপদেশ লাভ করেছেন। সেই মহাত্মা গঙ্গাপুত্রের শেষ দিবসসমূহে তাঁর এবং তাঁর সন্নিকটে আগত ঋষিগণের নিকট যুধিষ্ঠির বিবিধ নীতিকথা তথা ইতিহাস শ্রবণ করেও বর্ণাশ্রমী তাবৎ ধারণার প্রতি নিবিষ্ট হতে সক্ষম হননি বলেই আমার বিশ্বাস। তিনি সমাজ ধর্ম রাজকর্ম তথা মোক্ষ সম্পর্কীয় তাবৎ বিষয়েই তত্ত্বান্বেষী শিষ্যের ন্যায় ক্রমাগত প্রশ্নের পর প্রশ্ন করে গেছেন এবং তার উত্তরে নানাবিধ তত্ত্ব ও কাহিনি শ্রবণ করেছেন। বক্তাগণ তাঁর এবংবিধ জ্ঞানবচন শ্রবণ শেষেও যখন দেখলেন যে তিনি স্থিতচিত্ত হলেন না তখন তার বাল্যচিত্ততা তথা অমনযোগিতা বিষয়ে তাঁকে তিরস্কার করে শুধু যন্ত্রবৎ অনুষ্ঠেয়কর্ম সম্পাদন করে যেতে অনুজ্ঞা করলেন। কিন্তু হায়, তাঁরা এই জিজ্ঞাসু নরপতির হৃদয়ের আকুলতা কেউই অনুধাবন করলেন না। কেউ জানতেও চাইলেন না তাঁর জিজ্ঞাসার স্বরূপ প্রকৃত অর্থে কী? তাঁর প্রকৃত বিপন্নতাই বা কী?
কেশব এবং আমাদের পিতামহ ব্যাস তাঁদের তত্ত্বানুযায়ী যে সমাজ সৃজনে আকাঙ্খী ছিলেন সেই তত্ত্বানুযায়ী তাঁরা পাণ্ডবভ্রাতাদের শিক্ষিতকরণে প্রয়াসী ছিলেন। ভীমসেন, নকুল এবং সহদেবের ক্ষেত্রে তাঁদের কোনো প্রযত্নের প্রয়োজন হয়নি। কারণ তারা এই তত্ত্বকে অধ্যয়ন না করেই অন্ধভাবে ধর্ম হিসেবে এর অনুসরণ করেছেন। অজুর্নের মধ্যে কিছু মানবিক প্রশ্নের সঞ্চার হলে কেশব তাঁর তত্ত্বের এক মহৈশ্বর্যশালী ব্যাখ্যানের মাধ্যমে তাঁকে যুদ্ধোদ্যোগী করে তুলতে সক্ষম হন। যুদ্ধকে কেশব তাঁর তত্ত্ব প্রতিষ্ঠাকল্পে এক অসামান্য যোগরূঢার্থে ব্যাখ্যান করেন তথা তাঁর সখা অর্জুনকে সেই যোগরূঢ় অভিচারের জন্য এক সর্বনাশন অকার্য কর্মে উদ্দীপ্ত করেন। অর্জুন কেশবের ধ্বংস নীতিরই শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন বলেই সৃজনের কালে তাঁর মুখে কোনো বাগবিস্মৃতি দেখি না। বিগত কেশব কালে তৃতীয় পাণ্ডব সর্বার্থেই যেন হতবীর্য এবং হতোদ্যম। কেশব ব্যতিরেকে তাঁর নিজস্ব কোনো প্রজ্ঞা নেই। কিন্তু যুধিষ্ঠির শেষ পর্যন্ত কোনো বিশেষ তত্ত্বের আশ্রয় গ্রহণ না করলে সকলেই যৎপরোনাস্তি বিরক্তি ভাব প্রকাশ করেছেন। এমনকী মহাত্মা ব্যাসদেব পর্যন্ত। সমবেত বুধমণ্ডলী আপনারা একবার আত্মস্থ হয়ে এই মহাত্মার কার্য-পরম্পরা অনুধ্যান করুন। আমাদের মহৎভাগ্যে এমন একজন পরম করুণাময় অনন্ত ক্ষমাশীল, শরণাগত বৎসল, পরিণত এবং প্রাজ্ঞ জাতককে নিজেদের জীবৎকালে লাভ করেছি। তাঁর ত্রুটি-বিচ্যুতির বিবরণ অবশ্যই আমি উল্লেখ করব। কিন্তু একথা অবশ্যই জানবেন যে সেইসব বিচ্যুতিসমূহ সম্পূর্ণ বহিঃশক্তির অভিচারক নিবন্ধ মাত্র। ধর্মরাজ যদি তাঁর পারিপার্শ্বিকতার সহায়তায় যথোচিত ঋদ্ধ হতে পারতেন তবে এই পৃথিবী আজ ভিন্নরূপে আমাদের সকলের সম্মুখে এক অসামান্য আকর্ষণীয়া রূপে বিরাজ করতেন। পৃথিবীর মন্দভাগ্য যে এমন এক মহীয়ান স্বামী লাভ করেও নিহিত স্বার্থের কূটৈষণার জাল ছিন্ন করে তাঁর অঙ্কশায়িনী হতে পারলেন না।
মিত্রগণ, আমি যুধিষ্ঠিরের দৌর্বল্যও জানি। অবশ্য এই মহাত্মার ভালোমন্দ সবটুকুই আমি অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে অবলোকন করেছি। ফলত তাঁর ভালোমন্দ আচার-আচরণ আমার ধারণায় অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে প্রোথিত হয়ে আছে। এই সহজ মানুষটি সর্ববিধ গুণে, জ্ঞানে এবং কর্মে অনন্য। কিন্তু তাঁর দ্যূতাসক্তি, অক্ষক্রীড়ার প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ বোধহয় তাঁর স্বভাবের এক গভীরতম গহ্বর। এই গহ্বর সম্পর্কে প্রাচীনকাল থেকেই অক্ষোপাসকেরা বিষণ্ণ উচ্চারণ করে এসেছেন।
‘বারয়েয়মহং দ্যূতং বহূন দোষান্ প্রদর্শয়মন
স্ত্রিয়ো অক্ষা মৃগয়া পানমেতৎ কামসমত্থিতম্।।
(বন ১৩;২, ১৩;৭)
বলেছেন, ইদং বৈ দেবনং পাপং নিকৃত্যা কিতবৈঃ সহ
ধর্মেন তু জয়ো যুদ্ধে তৎপরং ন তু দেবনম্
(সভা ৫৯; ১০)
অক্ষোপাসকেরা বিষণ্ণ উচ্চারণ করে এসেছেন ‘ভাবি আর অক্ষ ক্রীড়া করব না …কিন্তু সুন্দর পিঙ্গল অক্ষগুলি ছকের উপর অবস্থিত দেখলে সংবরণ করতে পারি না নিজেকে। …এই যে (সজ্জিত) ত্রিপঞ্চাশৎ গুটিকা দৃশ্যমান, সম্মিলিত হয়ে তাঁরা ছকের উপর প্রভান্বিত যেন ভাস্বর সবিতৃ। এঁরা কারও বশীভূত নন, রাজারা পর্যন্ত এঁদেরকে নমস্কার করে থাকেন। একথা বেদবর্ণিত।
মহাশয় সেই দ্যূতক্রীড়া নামক অনন্ত গহ্বরকে স্ব স্বভাবে ধারণ করে রেখেছিলেন। অথবা একেই কি নিয়তি বা দৈব বলা হয়? এই স্বভাবজ গহ্বরের জন্যই কি ঈদৃশ মহাশয়গণের কুরুক্ষেত্র নামক মহাধ্বংসের দায়ভাগ বহন করতে হয়? হায়, পবিত্র মানুষ যুধিষ্ঠির, তুমিও কতই না অসহায়। সমবেত সুধীগণ, আপনারা কি জানেন এই কুরুকুলে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি এই আমাকে অর্থাৎ এই বৈশ্যাপুত্র যুযুৎসুকে পর্যন্ত সম্মান জানিয়েছিলেন এই বলে যে-“মহাপ্রাজ্ঞ রাজপুত্র যুযুৎসু।”
রাজপুত্র? আমার এই অকিঞ্চিৎকর জীবনে আমি কদাপি ঈদৃশ সম্মান লাভ করিনি। যদিও আজ এই ব্যাপক বিনষ্টিরও দীর্ঘকাল পরবর্তী সময়ে অনুভব করি এ সম্মানও মনুষ্যের নিকট অতি তুচ্ছ, তথাপি কৌরব পাণ্ডবগণের অন্য কোনো ভ্রাতা তো আমাকে রাজপুত্র সম্ভাষণে আত্মীয়বোধে গ্রহণ করেনি। একমাত্র যুধিষ্ঠিরই তা করেছেন। একমাত্র তিনিই আমাকে ‘ ভ্রাতঃ’ বলে সম্ভাষণ করেছেন। যদিও আমি দুর্যোধনের জন্মের বৎসরকালের মধ্যেই জন্মেছি তথাপি কদাচ তাঁরা আমাকে নিয়ে ‘আমরা শত এক ভ্রাতা’ একথা বলেননি। তাঁরা সততই নিজেদের শতভ্রাতা বলেই পরিচয় দিতেন। আজ তাঁরা নেই বলেই আমি ধৃতরাষ্ট্রপুত্র নচেৎ কে আমাকে অন্তত সেই মর্যাদায় অভিহিত করেছেন? যুধিষ্ঠির করেছেন। কুরুকুলের কোনো অর্ধভ্রাতারাই দুই পুরুষ ধরে তাঁর নিকট অনাদৃত হননি। এখানেই মহারাজ যুধিষ্ঠিরের অন্যান্য কুরুবংশীয়দের সঙ্গে চারিত্রিক তথা দার্শনিক ভিন্নতা। তিনি তাঁর করুণাকাতর এক বৃহৎ হৃদয় জগতের তাবৎ আতপ্তদের জন্যই যেন বিছিয়ে রেখে বলেছেন,
‘মাতা যথা নিযং পুত্তং আয়ুসা একপুত্ত মনরুকখে
এবম্পি সব্বভূতেসু মান সম্ভাবয়ে অপরিমাণং’।
মা যেমন নিজ পুত্রকে স্নেহাভিষিক্ত করেন, সর্বমনুষ্যকে সর্বভূতকে সেমত স্নেহযত্ন সহকারেই অপরিসীম মমতায় সিক্ত করতে হবে।
কিন্তু সে কথা থাক, বর্তমান সভা যে বিষয়ে নির্ণয়াত্মক, সেই নির্ণয় বিষয়ে পর্যালোচনা সবিশেষ আবশ্যক। কিন্তু উপস্থিত বুধমণ্ডলী, সামন্তগণ, কুরুকুল বিদগ্ধগণ তথা প্রকৃতিপুঞ্জের জ্ঞাতার্থে আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করতে প্রয়াসী। আপনারা বর্তমান সভায় যে নির্ণয়াকাঙ্খী হয়ে উপস্থিত হয়েছেন সেই নির্ণয় বোধকরি আপনাদের প্রথাগত ইচ্ছানুযায়ী আদপেই ততটা সহজ বা সরল নয়। বিগত যুদ্ধ রাজনৈতিক বাতাবরণকে কিন্তু আদৌ যুদ্ধ পূর্ববর্তী সরল বিন্যাসে আর স্থিত রাখেনি। সেখানে এক মহাসমুদ্র গভীর ভিন্নতা পূর্বাবস্থার সঙ্গে বর্তমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। এই যুদ্ধকালকে সাতিশয় সংক্ষিপ্ত করে তার স্বাভাবিক গতির মাত্রাকে বহুগুণিত করেছে বলে উপস্থিত প্রাজ্ঞশীর্ষদের যে নির্ণয়, বোধ করি তা যথার্থ কালানুগ হবে না। বর্তমান নির্ণয়ে পরম্পরাগত ভাব বজায় রেখেই সুনিপুণ চাতুর্যে যুদ্ধোত্তরকালীন উদ্ভূত নতুন ভাবধারাকে প্রাধান্য দিতে হবে। সে ভাবধারা আমি পুনর্বার ঘোষণা করছি, প্রথাগত এতাবৎকালীন বর্ণাশ্রমী ভাবধারা নয়। বর্ণাশ্রমপদ্ধতি তার ধারা পরিবর্তন করে যে গতি অবলম্বন করেছে সেই গতিকে প্রত্যক্ষ করে তার বহমানতার খাতটি সংস্কারের মাধ্যমেই অতঃপরের সুষ্ঠু সামাজিক, ব্যক্তিক এবং রাজনৈতিক স্রোতবিন্যাস প্রয়োজন। পরম্পরা অবশ্যই এক অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিচার। কিন্তু তা কোনোক্রমেই অন্ধ পরম্পরা নয়। পরম্পরাজনিত গতির প্রত্যক্ষায়ণে নির্দিষ্ট বাঁকগুলোর নির্ণয়করণ তথা সেই বাঁকে উপস্থিত হয়ে সঠিকভাবে পরম্পরার স্বাভাবিক গতির অনুসরণ বোধকরি অতঃপর ধর্ম বলে বিবেচিত হবে। গতির স্বাভাবিকতাই তো ধর্মপদবাচ্য হওয়া কাম্য।
সে মতে এই সভাকে আমি সনির্বন্ধ অনুরোধ জানাই হে সভাসদগণ, আপনারা বিগত সমাজ তথা রাষ্ট্রবিধান এবং তার ফলসমূহ চিন্তায় রেখে ভবিষ্য ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবনা করুন। ভ্রান্তি যেন ক্রমান্বয়ী না হয়। সভায় কাঙ্খিত সামাজিক বিধিনির্ণয় যেন প্রকৃতিপুঞ্জের কল্যাণে শান্তি হয়ে বিরাজ করে। আমার এই বাগবিস্তারে আমি কোনো ব্যক্তি মানুষের প্রতি যদি কিছুমাত্র কটাক্ষ করে থাকি এবং সেই কটাক্ষ যদি যুক্তিহীন দ্বেষ অথবা অসূয়াযুক্ত বলে কেউ মনে করেন তবে তা এই অসংস্কৃত বৈশ্যাপুত্রের স্বাধ্যায়-প্রমাদতাজনিত ত্রুটি বলেই ক্ষমা করবেন। আমি আদপেই কিছুমাত্র স্বাধ্যায়জনিত পরম্পরায় সংস্কৃত নই। একমাত্র মহাত্মা বিদুর এবং আমার পরমাদর্শ পুরুষ করুণাকরণ যুধিষ্ঠিরের জীবনচরিতই আমার তাবৎ বোধির আশ্রয়।
যুযুৎসুর ভাষণ সভাস্থলে বিষম আলোড়নের সৃষ্টি করল। কেউ তাঁর মতের পক্ষে, কেউবা বিপক্ষে সরবে বিতণ্ডা শুরু করলেন। ভীম নিতান্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে অর্বাচীন, অসংস্কৃত এবং অপরিণামদর্শী ক্ষমতালাভেচ্ছু বলে তিরস্কার করলেন। নকুল এবং সহদেব বৈশ্যাপুত্রের ঈদৃশ স্পর্ধায় সভার কী করণীয় সে বিষয়ে নানা বিতর্কের সূত্রপাত করলেন। শুধু অর্জুন এবং যুধিষ্ঠির নির্বাক রইলেন। অচ্যুতের প্রয়াণের পর অর্জুন বর্তমানে প্রায় জীবন্মৃত। তাঁর পূর্বেকার সেই তেজোদীপ্তি, প্রকৃত যোদ্ধাসুলভ আচরণ কিছুই আর পরিলক্ষিত হয় না। কোনো প্রকারে জীবনের শেষ প্রান্তের ভারটুকুই যেন তিনি বহন করছেন, এমন মনে হয়।
বিতণ্ডা চরমে পৌঁছলে আমি সকলকে সংযত করতে প্রয়াসী হলাম। যুযুৎসুর বক্তব্য আমার নিকট কিছুমাত্র অস্বাভাবিক বোধ হল না। তাঁর ভাষণের সারবত্তা আমি সম্যক উপলব্ধি করলাম। সভার উদ্দেশ্যে জানালাম যে এই সভা পূর্ববর্তী সমস্ত সভা থেকে চারিত্রিকভাবে ভিন্ন। কেননা যে সমস্যার জন্য এই সভার উদ্যোগ সেই সমস্যাটিও পূর্বেকার সমস্যা থেকে প্রকৃতিগতভাবেই পৃথক। এখানে বিভিন্ন মতের মানুষ তাঁদের ক্ষোভ বিচার তথা উপদেশাদি সরল সহজভাবে এবং নির্ভয়ে প্রকাশ করতে পারলেই সভার উদ্দিষ্ট নির্ণয় সুচারু হবে। অতএব সভা যেন কারও বক্তব্যেই ব্যক্তিগত উষ্মা প্রকাশ করে এই সহজতা বিনষ্ট না করে।
আমার এই বচন শ্রবণান্তর উপস্থিত ব্রাহ্মণগণ বিতণ্ডা তুললেন। জনৈক নারদীয় সংহিতাকার অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় প্রশ্ন করলেন, একজন বৈশ্যাপুত্র সূত জাতীয়ের এ কীদৃশ আচরণ? অহো! এ কী অন্যায় স্পর্ধা! সভাসদগণ, অবলোকন করুন, রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ণয় বিষয়ে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়কে অতিক্রম করে জনৈক বৈশ্যা দাসীপুত্র কীদৃশ অনধিকারজনিত মতামত সভাস্থলে উপস্থিত করছে। এ দ্বারাই প্রতিপন্ন হয় যে দ্বাপরযুগ অতিক্রান্ত এবং কলির সূত্রপাত ঘটেছে।
নারদীয় এই সংহিতাকার ব্রাহ্মণ, মহাত্মা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন এবং অচ্যুতের দ্বারা নিয়োজিত হয়ে আমি যখন রাষ্ট্রসংহিতা রচনা করি তখন আমার সহায়ক ছিলেন। তিনি প্রাচীন শাস্ত্রাদি বিষয়ে অসামান্য পণ্ডিত। নাম বিপুল সুজাত। বিপুল বললেন মহামান্য সভা, আমাদের রাষ্ট্রিক বিন্যাসে যে যে নীতি নির্ণায়ক সিদ্ধান্তের বিষয় আমরা এতকাল ধরে পরম্পরাগতভাবে সৃজন করে এসেছি অদ্য কি সেই সব বিষয়ের নির্ণয় নিমিত্ত বৈশ্য, শূদ্রাদি ইতরজনের পরামর্শ অনুযায়ী কর্ম করতে হবে? বর্তমান নির্ণায়ক নীতির সংরচন বিষয়ে কি এইসব বৈশ্য, শূদ্রাদি সূতমাগধাদি ব্যক্তিগণ স্ব স্ব মতামতের প্রকাশে ঈদৃশ স্বাধিকারপ্রমত্ততা প্রদর্শন করবে? আমরা জানি, যুযুৎসু ধৃতরাষ্ট্রনন্দন। কিন্তু সে তো বৈশ্যাপুত্র। সে কীভাবে এমত দাবি করতে পারে যে বর্তমান সমাজ যেহেতু পূর্বেকার অনুরূপ নয় অতএব নতুন নীতি নির্ধারণে তাঁদের মতামতকে গণনা করতে হবে। আমার মনে হয় ইতরজনের রাজনীতি ক্ষেত্রে এমন অধিকার প্রাপ্তি হলে ভবিষ্যতে সমাজ সৌগত অথবা লোকায়তিক সমতাবাদাশ্রয়ী হবে। সেক্ষেত্রে আমাদের এতাবৎকালের যজ্ঞাদি বিনষ্ট হবার সম্ভাবনা প্রবল। আমাদের নারদীয় ঋষিদের পরম্পরা যেভাবে রাষ্ট্রকার্যক্রম এবং সমাজবিন্যাসের শাস্ত্র সংসারে এতকাল প্রতিষ্ঠা করে এসেছেন তাকে সাময়িক ইদৃশ বিসদৃশ মতবাদ আশ্রয় করে সহসা উৎসৃষ্টকরণ উচিত কিনা সভা বিচার করুন। এইসব ইতরজাতীয় জনেদের মধ্যে সূত মাগধিগণ দীর্ঘকাল প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করে রাজনীতি বিষয়ে কিঞ্চিৎ ধারণা লাভ করেছেন, কিন্তু তা অবশ্যই পরম্পরার কষ্টিপাথরে বিশ্লেষিত হয়নি। ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়দের মেধার স্তরে পৌঁছোতে এই বর্ণ বা বর্ণসংকরদের বহু বহু যুগের অনুশীলনাদির প্রয়োজন হবে। শুধুমাত্র তাৎক্ষণিক বোধ বিচারের ভিত্তিকে আশ্রয় করে এবং কোনো প্লবতা পরবর্তী বিশৃঙ্খলাকে উপজীব্য করে বৃহৎ মানবসমাজের কল্যাণাদর্শ স্থাপিত করা যায় কিনা সেই বিষয়েও সভাকে ভাবিত হতে অনুরোধ করি। মহাত্মা বিদুরও যদিও শূদ্রীসূত, কিন্তু তাঁর বিচার সম্পূর্ণ গৃহীত সত্য। তিনি শূদ্রীপুত্র হলেও অপরিসীম তপস্যা এবং স্বাভাবিক মেধার নিমিত্ত বিরলতম এক উচ্চস্তরে উন্নীত হতে সক্ষম হয়েছেন। পরন্তু মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন স্বয়ং তাঁর পিতা। সভাসদগণ, কুরুবিশ্বে মহামতি বিদুরের এই প্রতিষ্ঠার পশ্চাতে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়নের পিতৃত্ব কী পর্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ তা আপনারা নিশ্চয়ই অনুধাবন করবেন। তিনি যদি বিগত মহারাজ বিচিত্রবীর্যের ঔরসে ওই শূদ্রার গর্ভজাত হতেন তবে বোধকরি তাঁর স্বাভাবিক মেধার স্ফুরণও এমত হত না এবং মহামন্ত্রিত্বের এই পদও তিনি লাভ করতেন না।
একথা সত্য যে মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ইচ্ছুক না হলে আমার এই কুলে মহামন্ত্রিত্ব পদ কিংবা এমন প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করার ক্ষমতা লাভ আদৌ সম্ভব হত না। আমার মহামন্ত্রিত্ব পদ লাভের মুহূর্তে কুরুকুলবেষ্টন করে যে ব্রাহ্মণবর্গ ছিলেন তাঁরা কম কোলাহল করেননি। আমার পিতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন তাঁর তর্জনী সংকেতেই তাঁদের স্তব্ধ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কেননা গোটা কুরুকুলই তাঁর বীর্যসম্ভূত। অতএব কে রাজা এবং কে মহামন্ত্রী হবেন এ বিষয়ে আমার জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম পর্যন্ত মহর্ষি বাদরায়ণির ইচ্ছার বিরুদ্ধতা করেননি বা করতে সাহস করেননি। ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়কুল যতই বজ্রগর্ভনিনাদে গগনবিদীর্ণ করুন তাঁরা জানেন যে মহাজননী সত্যবতী এবং তাঁর কানীন পুত্র কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বর্ণসংকরত্বকে আদৌ অবাঞ্ছিত মনে করতেন না বরঞ্চ তার আকাঙ্খাই করেছেন। কিন্তু তাঁদের কাঙ্খিত সংকরত্ব যদৃচ্ছ ছিল না। তা ছিল ক্ষেত্র বিচারাশ্রয়ী। যেমন, সত্যবতীর ক্ষেত্রে পরাশর রূপ বীজ, অম্বিকা, কৌশল্যা, ইত্যাদির ক্ষেত্রে কৃষ্ণদ্বৈপায়ন রূপ বীজ অথবা কুন্তীরূপ ক্ষেত্রে মহর্ষির নির্বাচিত পুঙ্গবদের বীজ। এই পর্যন্তই তাঁরা আগ্রহী। এর অতিরিক্ত অর্থাৎ যেখানে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ পৌঁছোয় না, সেখানে নয়। এর প্রমাণ আমার নিকট প্রতিভাত হয়েছে নানান সংঘটনে। একটিই উদাহরণ দিচ্ছি। আমার দয়িতা কুন্তীর কানীন অপত্য কর্ণ বিষয়ে তিনি অনবহিত ছিলেন না। মহর্ষি স্বয়ংই মহাজননীর কানীন পুত্র। অতএব কানীন পুত্র বিষয়ে তাঁর কোনো বিরূপ সংস্কার থাকার কারণ নেই। তথাপি অন্যান্য কুন্তীপুত্রদের ন্যায় তিনি কর্ণকে কুরুকুলে গ্রহণ করানোর নিমিত্ত আদৌ সচেষ্ট হননি। এ বিষয়টি যদিচ অতি বিলম্বে আমার জ্ঞানগোচর হয়েছে তথাপি আমি এর কোনো সরল তাৎপর্যের সন্ধান পাইনি। এর একটিই কারণ, যদিও অন্বীক্ষাক্রমে তা খুবই দুর্বল বলে আমার নিকট প্রতিভাত হয়েছে, তা হল যুগ পরিবর্তনে নিয়োগপ্রথা আদৃত হলেও সহোঢ় পুত্র সহ কোনো রমণীর পতিগৃহে আগমন তখন প্রশংসনীয় ছিল না। এ প্রসঙ্গে একটি গূঢ় কথা বলে রাখি, মহর্ষি এবং জ্যেষ্ঠতাত ভীষ্ম উভয়েই রাজ্ঞী কুন্তীকে স্বৈরিণীই মনে করতেন এবং কর্ণকে স্বৈরিণীজ। এই স্বৈরিণীজ সন্তানেরাই একসময় জারজ নামে অভিহিত হতে থাকে। যেমন আমার জন্মের বহুকাল পরে আমি এই আখ্যায় আখ্যাত হয়েছি। অথচ আমার বুদ্ধিতে কদাচ এমত বিচারের তাৎপর্য লভ্য হয় না যে একজন কামুক পুরুষ তাঁর অভিষ্ট সিদ্ধ করে যখন তাঁর ব্রাহ্মণত্ব মহর্ষিত্ব বা মহত্ত্ব থেকে পতিত হন না তখন কেন একজন নারীকে আজীবন এই কলঙ্কের ভাগিনী হতে হবে? তা সে অকামা কার্যব্যপদেশে বা স্বেচ্ছায়ই সকামা যদি হয়ও তথাপি।
এই ব্রাহ্মণ অর্থাৎ বিপুল সুজাত যে বিরোধ বর্তমানে উপস্থিত করলেন তার যথোচিত উত্তর প্রদানে আমি সমর্থ। আমি বলতেই পারি হে ব্রাহ্মণ, যদিচ মহর্ষির কৃপায় আমি বিদুর এই কুরুবিশ্বের মহামন্ত্রী কিন্তু মহর্ষি যদি এক্ষণে ইচ্ছা নাও করেন তথাপি আমার দীর্ঘকালীন মহামন্ত্রিত্ব এবং ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থানও যে একটি পরম্পরার বীজ উপ্ত করেছে আর সে বীজ অঙ্কুরিত হয়ে অনুকূল বর্ষণ আতপাদি ভোগে ঋদ্ধ হয়ে বর্তমানে মহীরুহ হতে চলেছে, এ সত্যের ব্যতিরেক হবে না। কাল এমনই চরৈবেতিরূপ চংক্রমণে সমাজকে নিত্য নূতন রূপে নির্মাণ করতে থাকে। এর গতিরোধ করা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। নারদীয় ঋষিগণের পরম্পরা বিশ্লেষণ করলেও দেখা যাবে যে প্রথম বা আদি নারদ এবং অদ্যকার এই বিপুল সুজাত নামক নারদের সংহিতাবৃত্তি এক বা অভিন্ন নয়। যুগ পরিবর্তনে যে যুগধর্ম তথা নীতি পরিবর্তিত হবে এ কিছু বিচিত্র নয়। একথা দেবর্ষি নিয়ত কীর্তনও করেছেন। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর এবং কলি এই চার যুগের নীতির ভিন্নতার কথা মহর্ষিগণ সদাই উপদেশ করে থাকেন। কিন্তু ব্রাহ্মণ্য নিহিতস্বার্থ, যুগসন্ধিক্ষণে এক অজ নিত্য শ্বাশ্বত পুরাণ যা ‘ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে’ এমন এক অস্তিত্বের উপস্থাপনা করতে সর্বদাই ব্যগ্র। কিন্তু অদ্যাবধি আমি এমন কোনো সত্তার অস্তিত্ব, কোনো ধারণার অথবা কোনো অনুভূতিকে স্বাভাবিক জ্ঞানবলক্রিয়ায় জ্ঞাত হইনি যা প্রকৃতই সনাতন বা শাশ্বত।
ব্রাহ্মণ বিপুল তাঁর বক্তব্য সমাপনান্তে আসন পরিগ্রহ করে উপবিষ্ট হয়েছেন। তদনুবর্তী ব্রাহ্মণগণ স্ব স্ব শিখা আন্দোলিত করে তাঁকে সমর্থনসূচক অভিধায় অভিহিত করলে আমি সমূহ প্রমাদ অনুভব করলাম। এ বিতর্ক যে কতদূর ব্যপ্তি পেতে পারে তার নির্ণয় আমার পক্ষে কদাচ দুরূহ নয়। কিন্তু এই সভায় আমি কোনো বিরোধের সপক্ষে ছিলাম না। এখন বিরোধ যখন উপস্থিত হল তার নিরাকরণার্থ আমাকে অবশ্যই যথোচিত কর্তব্য পালন করতে হবে। আমাকে অবশ্যই যুযুৎসুর অন্বিক্ষাকে প্রতিষ্ঠা দিতে হবে কেননা তা যুগানুগ যৌক্তিকক্রমে সিদ্ধ বলে আমি মনে করি। যুযুৎসুর কন্ঠে তো যুগই কথা বলছে।
সভা যখন এইভাবে আলোড়িত তখন অগ্রজকে নিবেদন করলাম তিনি যেন বর্তমান সমস্যার গতিপ্রকৃতি অনুধাবন করে সময়োচিত আলোচনা দ্বারা সংকটের নিরাময়কল্পে প্রয়াসী হন। মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র উপস্থিত বিশিষ্টদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। লোক, সমাজ তথা রাষ্ট্র চরিত্র বিষয়ে তাঁর জ্ঞানও সুদূরপ্রসারী। কিন্তু শোক এবং প্রাচীনতা জনিত ক্লেশে তিনি এতই ধ্বস্ত যে তাঁর পক্ষে দীর্ঘক্ষণ ভাষণ প্রদান নিতান্তই কষ্টসাধ্য। তথাপি তিনি তাঁর স্বভাবোচিত গাম্ভীর্যে জলদমন্দ্র কিন্তু ঈষৎ কম্পিত কন্ঠে তাঁর বক্তব্য বলতে লাগলেন। ধৃতরাষ্ট্র বললেন এই মহতী সভাকে সশিষ্টাচার সম্ভাষণ এবং নমস্কারাদি জ্ঞাপনান্তর আমি আমার কথন নিবেদন করছি। বস্তুত আমি জন্মান্ধতা নিবন্ধন কখনোই কোনো বিষয়ের ব্যাখ্যার প্রযত্ন করিনি। সারাজীবন শুধু প্রশ্নই করেছি এবং তার উত্তর সংগ্রহ করে গেছি। আপনারা জ্ঞাত আছেন আমার সেই চিরন্তন প্রশ্নমালার উত্তরদাতা হচ্ছেন আমার পরমপ্রিয়, পরমমিত্র এবং স্নেহাস্পদ কনিষ্ঠ বিদুর। বিদুর তাঁর মন্ত্রিত্বকালে সর্বতোভাবে আমার কল্যাণকামী হয়ে আমায় নানাবিধ মন্ত্রণায় তথা সদুপদেশে ধর্মপথ প্রদর্শনায় রত ছিলেন। কিন্তু দুরারোগ্য ব্যধিগ্রস্তের যেমন ঔষধ অথবা সুপথ্যে রুচি হয় না আমিও এই মহাত্মার উপদেশের প্রতি তেমনই ব্যাধিগ্রস্তের আচরণই করেছিলাম। আজ এই জীবনসায়াহ্নে শোকগ্রস্ত, ধ্বস্ত, এবং লাঞ্ছিত আমি শুধু একথাই বলতে পারি যে আমি মন্দভাগ্য। অথবা মনুষ্যমাত্রেই কালদ্বারা সৃজিত অসহায় এক ক্রীড়াপুত্তলিকা এবং কালই তার অমোঘ ক্রীড়ক।
মহাশয়গণ, আজ যখন প্রথম এবং অবশ্যই শেষ বারের মতো আপনারা আমাকে এই সংকটকালে কিছু রাষ্ট্রবিষয়ক নির্ণায়ক কথা বলতে অনুজ্ঞা করেছেন তখন সর্বাগ্রে আমি আমার স্বকৃতকর্মের সমালোচনা জ্ঞাপন করতে চাই। আপনারা বিরূপ হবেন না, কেননা এ সুযোগ আমি আর দ্বিতীয়বার হয়তো প্রাপ্ত হব না। অতএব, আমার আত্মকথা এবং আত্মদোষ সমাচার আমি এক্ষণে উপস্থিত করতে প্রয়াসী।
মহাশয়গণ, আমার চরিত্রে যে মহদ্দোষ অদ্য আমার নিকট প্রতিভাত তা হচ্ছে আমি পুত্ররূপ এবং আত্মরূপ শত্রু বিষয়ে মহাত্মা বিদুরের উপদেশের মান্যতা করিনি। শাস্ত্র বলেছেন, রাজা রাজকুমারদের জন্মাবধি রক্ষণে সচেষ্ট হবেন। তাদের প্রতি তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সতত জাগরূক থাকবে। কথিত আছে রাজপুত্রেরা সাধারণত কর্কটকের সমধর্ম বিশিষ্ট বলে স্ব স্ব জনকদের ভক্ষণকারী হতে পারে। কুলীরকেরা যেমন পিতৃভক্ষণকারী হয়ে জীবিত থাকে রাজপুত্রেরাও তদ্রূপ পিতৃভক্ষণকারী হয়ে ঐশ্বর্যভোগী হওয়ার আকাঙ্খায় আকাঙ্খী হয়। মহাত্মা দ্রোণ ভারদ্বাজ বলেছেন যে সব সন্তান জন্মলাভ করলে পিতা তাঁদের প্রতি স্নেহাকৃষ্ট হন না তাদেরকে গুপ্তভাবে হত্যা করা বাঞ্ছনীয়। মহাত্মা বিদুরও দুর্যোধনের বিষয়ে আমাকে প্রায় অনুরূপ মন্ত্রণা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, মহারাজ এই পুত্র আপনার অখ্যাতি আনয়নকারী, কুলের পক্ষে দোষস্বরূপ আপনি একে পরিত্যাগ করুন। নচেৎ এর থেকে আপনার কুলের মহাভয় উদ্ভব হবার আশঙ্কা। কিন্তু আমি তার প্রতি কদাপি স্নেহশূন্য হতে পারিনি বলে তাকে পরিত্যাগ বা হত্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি। অন্য আচার্যগণও নানাবিধ উপদেশ প্রদানে হয় তাকে পরিত্যাগ নয় হত্যা কিংবা দূরস্থানে নির্বাসন ইত্যাদি ব্যবস্থাগ্রহণ বিষয়ে আমাকে উপদেশ করেছেন। আমি কোনো কথাই শ্রেয়বোধে পালন করিনি। এমনকী আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় জ্যেষ্ঠতাত আচার্য কৌণপদন্ত ভীষ্মের পরামর্শে আমি তাকে তার মাতৃবান্ধবীদিগের নিকটও সমর্পণ করিনি। তিনি বলেছিলেন হত্যা, কারানিগ্রহ, সীমান্তবর্তী আটবিক অঞ্চলে অথবা ভিন্নরাজ্যে নির্বাসনাদির মতো করুণ ব্যবস্থা গ্রহণ না করে যদি মাতৃবান্ধবীদিগের গৃহে দুর্যোধনসদৃশ জাতককে স্থাপিত করা হয় তবে তৎকর্তৃক ভবিষ্যকালে আচরিত মহদ্ভয় নিবারিত হতে পারে।
রাজপুত্রগণ স্বভাবগুণে ত্রিবিধ, একথা শাস্ত্রে উক্ত আছে। যেমন, বুদ্ধিমান, আহার্যবুদ্ধি এবং দুর্বুদ্ধি। আচার্য কর্তৃক নির্দিষ্ট যে অপত্য কেবল ধর্ম ও অর্থ উপলব্ধি এবং আচরণ করে তাকে বুদ্ধিমান পুত্র বলা হয়। যে পুত্র ধর্ম ও অর্থ উপলব্ধি সত্ত্বেও তার উপযোগ করে না তাকে বলা হয় আহার্য বুদ্ধি, আর যে পুত্র সতত প্রমাদপরায়ণ হয় এবং ধর্ম ও অর্থের দ্বেষ করে তাকে বলে দুর্বুদ্ধি পুত্র। আমার প্রিয় ভ্রাতা এবং সুহৃদ বিদুর তথা অন্যান্য হিতার্থী উপদেষ্টাগণের মতে আমার দুর্যোধন দুর্বুদ্ধি পুত্র বলে আখ্যায়িত। এমত বলা হয় যে তার এবং একমাত্র তারই বুদ্ধিদোষে কুরুক্ষেত্র রূপ এই মহাআহব এবং ঈদৃশ লোকক্ষয়। আমি জানি যে দুর্যোধন সাতিশয় ক্ষমতা তথা রাজ্যপ্রেমী ছিল। কিন্তু তার পিতা হিসাবে আমি কদাপি তাকে এবিষয়ে দোষী বলে অনুভব করিনি। উপস্থিত মিত্রগণ, এখনও তাকে আমি এতাদৃশ বিষয়ে দোষী ভাবতে পারি না। মহাশয়গণ, আমি স্বয়ংই চরিত্রগতভাবে কী পর্যন্ত ক্ষমতাকামী এবং রাজ্যপদলোভী ছিলাম তা আপনারা সকলেই অবগত আছেন। আমার সেই চারিত্রিক গুণ বা দোষ যাই আখ্যা দিন আমার পুত্র দুর্যোধনের মধ্যে অনুশীলিত তথা পরিবর্ধিত হয়েছে। ক্ষত্রিয়চর্যাশ্রয়ী মনুষ্যগণের যাপিত জীবনে এ কিছু অভূতপূর্ব বা অনাচরণীয় স্বভাব বলে আমি মনে করি না। ক্ষত্রিয় নামধেয় মনুষ্য মাত্রেরই এই স্বভাব, এই তাদের স্বধর্ম। ক্ষত্রিয়বর্ণ অর্থই ক্ষমতা এবং ক্ষমতাশালী অর্থই ক্ষত্রিয়বর্ণ। এই বর্ণের সৃজনই এই কারণে ঘটেছে। একারণে কাউকেই ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করা উচিত কিনা আপনারা বিচার করুন।
আমার অগ্রজ যে এমত বাগ্মিতায় পটু পূর্বে তা কখনোই অনুভব করিনি। মহারাজ অতিরিক্ত পুত্রবৎসল অত্যন্ত অভিনয় পারঙ্গম এবং অন্তরে বাহিরে দ্বিবিধ সত্তার ব্যবহারে সুনিপুণ এমনভাবেই তাঁকে বুঝেছিলাম এবং তা কিছু মিথ্যেও নয়। তবে সততই তাঁকে অধিক প্রশ্নকারী এবং কদাচিৎ বাগ্মী রূপে প্রত্যক্ষ করেছি। কখনোই তিনি কোনো তত্ত্বগত বিষয়ে বাগবিস্তার করেননি। অথচ এই মহাসভায় আহুত হয়ে তিনি যে অসামান্য বিশ্লেষণী প্রক্রিয়ায় তাঁর নিজস্ব অন্বীক্ষার উপস্থাপনা করে চলেছেন তা অভূতপূর্ব। মহারাজ যেভাবে এই সভাস্থলে তাঁর বাগ্মিতার সুত্রপাত করলেন তাতে বোধ হচ্ছে তিনি আজ দীর্ঘ উন্মোচনে নিজেকে তখা এই ক্ষত্রসমাজকে উন্মোচিত করবেন। কিন্তু বার্ধক্যবশত অশক্ততায় ক্ষণে ক্ষণে তার বিরতির প্রয়োজন হচ্ছিল। মহারাজের বয়স এখন প্রায় নবতি অতিক্রান্ত। দেহে মনে যদিচ ঈদৃশ শ্লথতা স্বাভাবিকভাবে তাঁর আসত না, কিন্তু অসুমার শোক তাঁকে প্রায় শতবর্ষীয় বার্ধক্যে যেন উপনীত করেছে। প্রব্রজনান্তে ফিরে এসে দেখেছি মহারাজ তাঁর পূর্বেকার দ্বিবিধ আচরণী থেকে নিজেকে মুক্ত করেছেন অনেকটাই। তাঁর স্বভাবজ অভিনয় ক্রিয়া এখন তাঁর আচরণে আর ততটা দৃষ্ট হয় না যেমন পূর্বকালে হত। নিজের দুর্বহ ভার লাঘব করার জন্য মহারাজ যেন এখন অনেকটাই মোহশূন্য ভাবে নিজেকে উন্মোচিত করেই রেখেছেন। অথবা জাগতিক বন্ধন মুক্তিই কি এর কারণ? আমি প্রতিটি বক্তার বাগ্মিতা অনুপুঙ্খভাবে মস্তিষ্কে গ্রথিত করে যাচ্ছিলাম এবং অনুভব করছিলাম মহাকাল কীভাবে ক্রিয়াশীল হয়ে গ্রহণ-বর্জন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি এবং সমাজের রূপান্তর ঘটান। আমি মহাত্মা বাদরায়ণির দূরদর্শিতার কথাও স্মরণ না করে পারছিলাম না। কারণ মহাকালের এই রূপান্তরী লীলার যথাসাধ্য অনুলিপি সংরক্ষণের মহৎ প্রস্তাবনা তো তাঁরই। ভবিষ্য প্রজন্ম এই অনুলিপিতেই তাদের পরম্পরার পুরাণেতিহাস প্রাপ্ত হবে।
খানিক বিরামের পর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্র পুনরায় বলতে লাগলেন- উপস্থিত সভ্যবৃন্দ, ক্ষত্রিয় রাজপুরুষদের মন্ত্রণাদাতা ব্রাহ্মণ ঋষিগণ রাজ্যলাভ, রাজ্য প্রতিপালন, রাজ্য এবং আত্মসংরক্ষণ তথা দণ্ডাদির আচরণ বিষয়ে যে সংহিতা রচনা করেছেন সেই সব সংহিতা আমি দেবর্ষি নারদ, সনৎ সুজাতাদি ঋষি, মহাত্মা কৌণপদন্ত ভীষ্ম, আচার্য ভারদ্বাজ দ্রোণ এবং আমার সুপ্রিয় আনন্দবর্ধন ভ্রাতা বিদুরের নিকট শ্রবণ করেছি। সেইসব সংহিতাই আমা হেন ক্ষত্রচর্যাশ্রয়ী মনুষ্যগণের নিকট ধর্ম বলে এতকাল ধরে উদগীথ হয়েছে। সেই সব সংহিতায় আমরা কী শিক্ষালাভ করেছি? না, পুত্র কলত্র সম্বন্ধী ভ্রাতা বৈদ্য গণক ক্রীড়ক অথবা তাবৎ কাউকেই রাজা সরল বিশ্বাসে গ্রহণ করবেন না। আত্মরক্ষার প্রয়োজনে এদের যে কোনো ব্যক্তিকে যে কোনো উপায়ে হত্যা বা নির্বাসন দণ্ডে নিগৃহীত করবেন। এ নিয়ে প্রভূত উপদেশ নিয়মাবলি সংহিতায় উপস্থাপিত করা হয়েছে এবং ক্ষত্রনামধেয় পুঙ্গবেরা রাজচর্যাশ্রয়ী অথবা রাজচর্যাকাঙ্খী হলে যে এমন সংহিতা ধর্মচারীই হবেন এ নিয়ে বিস্তৃত বাকমালা সেখানে গ্রথিত রয়েছে। আমরা ক্ষত্রনামধেয় পুঙ্গবেরা সেই অনুশাসন মতে বাল্যাবধি এইসব ব্রাহ্মণ ঋষি কর্তৃক প্রশিক্ষিত হয়ে থাকি। পাণ্ডবেরা যে কোনো কারণেই হোক ঈদৃশ শিক্ষা খুব কমই লব্ধ হয়েছেন। অথবা এই শিক্ষা ব্যতিরেকেও এমন কিছু মহৎ শিক্ষা তাঁদের বিভিন্নকালীন বনব্রজতায় তাঁরা প্রাপ্ত হয়েছেন যা আমি বা আমার পুত্রগণ তাঁদের মতো স্বাভাবিকভাবে পাইনি। ফলত, কৌরবদের ধর্মবোধের সঙ্গে পাণ্ডবদের ধর্মবোধের এক অসুমার ব্যবধান সৃষ্ট হয়েছে। দুঃখের বিষয় এই যে বিগত মহাপ্লবের ফল যদিচ সর্বাধিকভাবে আমারই মহাশোকের কারণ হয়েছে তথাপি প্রকৃতিপুঞ্জ এবং তাবৎ সংসার একারণে আমাকে এবং আমার হতভাগ্য ওই পুত্রকেই দায়ী করেছে। ব্রাহ্মণ এবং ঋষিগণ তাঁদের সংহিতা রচনার জন্য কিন্তু আদৌ কোনো দায়িকতায় সমালোচিত হন না।
সভাসদ বুধগণ, আমি বহু মূল্য প্রদানে হৃতসর্বস্ব হয়ে আজ এক তত্ত্বমীমাংসায় উপনীত হয়েছি। সেই মীমাংসা বর্তমানকালীন ন্যায়াশ্রয়ে গ্রাহ্য অথবা অগ্রাহ্য তা আপনারাই বিবেচনা করবেন। আমার মীমাংসা এই যে স্বাধ্যায়াদি কর্মে নিজ স্বার্থ সংরক্ষণেচ্ছু ব্রাহ্মণ্যবর্গ বহুকালাবধি স্ববর্ণীয়দের পোষকতা নিমিত্ত সংহিতাসমূহের বিন্যাস করেছেন। সংহিতাকারগণ, ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রচর্যাশ্রয়ী মনুষ্যগণের স্বার্থই এইসব সংহিতায় সংরক্ষিত করেছেন। অর্থাৎ আচার্য মনু, বৃহস্পতি, ঐশনস বা শুক্রাচার্য, আচার্য পিশুন বা নারদ, আচার্য বিশালাক্ষ, আচার্য পরাশর এবং আচার্য বাহুদন্তিপুত্র ইন্দ্র ছাড়াও পরবর্তী ভারদ্বাজ কৌণপদন্ত-ভীষ্ম বাতব্যাধি প্রমুখের সংহিতা মন্ত্রের যে বিচার শ্রুতি মাধ্যমে আমার লব্ধ, তার নিষ্কর্ষে বলতে পারি যে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় ভিন্ন অন্য দুই বর্ণের স্বার্থ সামান্যভাবেই সেখানে সংরক্ষিত। কিন্তু যুগধর্মানুসারে এই চতুর্বর্ণীয় সমাজ ব্যতিরেকে যে নব উপসমাজ বর্ণসংকরতাবশত বাস্তবায়িত হয়েছে সে বিষয়ে এই সংহিতাকারগণ কদাপি সতর্কতা অবলম্বন করেননি। বিবিধ সাংকর্য যে সমাজে বহুকাল ধরে সংঘটিত হয়ে হয়ে এক বিশাল চাতুর্বর্ণীয় সমাজাতিরিক্ত অন্য এক অপবর্ণীয় সমাজ যা বৈশ্য শূদ্র বর্ণাপেক্ষা উৎকৃষ্ট অথবা ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়াদি জাতিকে বৌদ্ধিকভাবে অতিক্রমে সাহসী, এর উদ্ভব ঘটিয়েছে, তার সংবাদ তাঁরা যেন রেখেও রাখেননি। তাঁরা তাঁদের জাতি নির্ণয়ে সতর্ক থাকলেও এদের ক্ষমতার অগ্রগামিতা বিষয়ে জ্ঞাত হননি। যুযুৎসুর ভাষণ শুনে আমার এমনই ধারণা হয়েছে। আপনারা বিশ্বাস করুন আমি এই মহাপ্লব সংঘটনের পরবর্তী পর্যায়ে যুযুৎসুর বক্তব্যে কিছুমাত্র দোষ বা অন্যায় অবলোকন করছি না। আমি এর মধ্যে মহাকালের অবধার্য নূপুরশিঞ্জনই শ্রবণ করছি। মহাকাল এদের নিতান্ত বিশেষ প্রয়োজনেই যেন সৃজন করেছেন।
সমবেত স্বদেশজ আত্মজন, আপনারা এই হতভাগ্য শোকগ্রস্ত শতপুত্রের নিধনে বাতুলতাপ্রাপ্ত অন্ধ মানুষটিকে আজকে আর যেন রাজ্যকামুক ক্ষমতালুব্ধ, ষড়যন্ত্রকামী না ভাবেন, এই প্রার্থনা। আজ আমার আর কোনো ভোগস্পৃহা থাকার স্বাভাবিক কোনো নির্বন্ধ নেই। আমি এখন প্রাকৃত প্রকরণে কামক্রোধ এবং অসূয়াদি রিপুবিরহিত এক শুদ্ধমাত্র সর্বসাধারণের করুণাভিখারি মনুষ্য। যদিচ মহারাজ যুধিষ্ঠির এই কুরুবিশ্ব বিজয়ান্তর এর সার্বিক ক্ষমতা আমাতে আরোপিত করেছেন তথাপি আপনারাই বলুন এখন আমার ঈদৃশ ক্ষমতার প্রয়োজনীয়তা কি থাকে? আমার একমাত্র জীবিত পুত্র বৈশ্যাদাসী গর্ভজাত বিধায় যতই স্বাধিকারকামী হোন, তাঁর আকাঙ্খা এবং তাত্ত্বিক নির্ণয় যে সহজেই এক অধিকারে অচিরেই স্থায়িত্ব পাবে এমত আমি মনে করি না। সমবেত সতীর্থ এবং বৎসগণ, কোনো যুগ নির্বন্ধের অবসান কোনো অকস্মাৎ প্লবতায় সার্বিক মুক্তি যে পায় না, এ আমার নিকট এক প্রত্যক্ষ সত্য। আপনারা সকলেই জানেন যে প্রত্যক্ষ প্রমাণ জ্যেষ্ঠ। অতএব তার নিরাকরণ প্রচেষ্টা বৃথা। সর্বপ্রকার বিবর্তনের এক নির্দিষ্ট কাল থাকে। সেই কাল উপস্থিত না হলে বিবর্তনের স্ফুরণ হয় না। আবার বিবর্তিত অবস্থা প্রাক্তনকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিতেও পারে না।
অগ্রজ পুনর্বার মৌনতা অবলম্বন করলে আমি যুধিষ্ঠিরকে জনান্তিকে জিজ্ঞেস করলাম বৎস, তোমার জ্যেষ্ঠতাত যা যা বলছেন সে বিষয়ে তুমি এই বক্তব্যের আন্বীক্ষিকী বৃত্তে অবস্থান করছ তো। কেননা, নচেৎ নানাবিধ উপসর্গ সভাশেষে অনির্ণেয় থাকতে পারে। আর তার নির্ণয়তা ভবিষ্যতে বড়োই কষ্টসাধ্য হবে। যুধিষ্ঠির তাঁর শিরশ্চালনায় জানালেন যে তিনি সবই অনুধাবন করছেন।
মহারাজের বক্তব্যে সারগর্ভতা যথেষ্ট থাকলেও সংহিতা বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা আমার নিকট একদেশদর্শী বোধ হল। যেসব আচার্যগণের উল্লেখ তিনি করলেন তাঁদের সৃষ্ট সংহিতা ছাড়াও লোকায়তিক প্রবক্তাগণের ভাষ্যাদিও তাঁর নিকট আমি কীর্তন করেছি। সেখানেও তাঁর অনেক কিছুই গ্রহণীয় ছিল কিন্তু তিনি ব্রাহ্মণ্য প্রভাবেই সম্ভবত সে সব বিষয়ে মনোযোগী ছিলেন না। একথা সত্য পাণ্ডবগণ বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁদের সুদীর্ঘ বনব্রজতা তথা নানাবিধ সংকুল পরিস্থিতিতে নাগরিক ক্ষত্রধর্মাচরণ ব্যতিরেকেও অন্য অনেকবিধ বহুমূল্য শিক্ষা লাভ করেছেন। সেই সব শিক্ষা যে অগ্রজ এবং তাঁর সন্তানেরা তাত্ত্বিকভাবে পাননি তা নয়। বিশেষত ধর্মবিষয়ে অগ্রজকে সেই সব শিক্ষার সারগর্ভতা আমি সবিশেষ কীর্তন করেছি। কিন্তু পার্থক্য এই যে তাত্ত্বিকভাবে শ্রুত শিক্ষা আর আচরিত তত্ত্বে যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা এক বস্তু নয়। পাণ্ডবগণ জীবনের প্রয়োজনে যে বিভিন্ন লোকব্যবহারে ঋদ্ধ, কৌরবগণের নিয়ত ক্ষত্রচর্যার ভোগবৃত্তে সেই আচরিত শিক্ষার ঋদ্ধি লাভ করা শুধুমাত্র তত্ত্বশ্রবণে সম্ভব ছিল না। অগ্রজের বক্তব্যে একারণেই একদেশদর্শিতা পরিলক্ষিত হচ্ছে। বস্তুত সংহিতাসমূহে রাজধর্ম বিষয়ক যে যে তত্ত্বাদি উপস্থাপিত করা হয়েছে তদনুসারে প্রায় কোনো রাজন্যই রাজ্যপালন বা প্রজাপালন করেন না। ব্রাহ্মণগণ ধূর্ত অবশ্যই এবং স্বস্বার্থকামীও। কিন্তু রাজন্যবর্গও যে বদ্ধমস্তক এবং সামান্য সুযোগেই স্বৈরাচারপ্রবণ এ কথাও ভুললে চলবে না। আমরা বর্তমান যুগে যাকে ধর্ম বলে মনে করি তা যতটা শ্রবণীয় তার অনেকগুণ অধিকই হচ্ছে আচরণীয়। ক্ষমতাসীন নাগরিক ক্ষত্রিয়কুল বিধিবদ্ধভাবে যে তত্ত্বকথা শ্রবণ করে থাকেন আচরণে তার সহস্র যোজন দূরে থাকেন। তপোবনে তত্ত্ব এবং যাপিত জীবন একই সমান্তরালে বিন্যস্ত থাকে বলে তপোবনবাসীরা প্রাকৃতিক জীবনধর্মে বড়ো সহজ সরল পন্থায় থাকেন। তত্ত্বের শ্রবণ এক বস্তু আর তার আচরণ অন্য। শ্রবণ কখনোই আচরণের তুল্য যথেষ্ট হতে পারে না। তা ছাড়া লোকায়তিকগণ দুর্যোধনের মনোযোগ আকর্ষণকারী হলেও ব্যাপক কৌরবকুল তাঁদের ব্রাহ্মণ্য বর্ণাশ্রমিক অভ্যাসেই অভ্যস্ত ছিলেন। দ্বন্দ্ববোধ নিশ্চিতই ছিল। কিন্তু পারিপার্শ্বিক পরিমণ্ডল ছিল ব্রাহ্মণ্যপক্ষে অধিক ক্ষমতাশালী। সে যা হোক তত্ত্বাদির প্রয়োগে অগ্রজ এবং তৎপুত্রগণ এই আচরণীয় বিষয়টিকে মূল্য না দিয়ে শুধুমাত্র তত্ত্বার্থ-শ্রবণে সময় ব্যয়িত করেছেন। আর আচরণের ক্ষেত্রে স্থূল ক্ষত্রধর্মের অনুশীলন করে তাকেই ধর্ম আখ্যায় আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু সে ব্যাখ্যা থাক। এক্ষণে মহারাজ যা বলেছেন তার মধ্যেও যে সত্যতা আছে তাকে মর্যাদা দিয়ে তাঁর বাকি বক্তব্য শ্রবণ করি।
মহারাজ বললেন, বিগত বিপ্লব যদিচ এই অপবর্ণীয় সমাজকে এক সুবিধাজনক ভিত্তিভূমিতে স্থায়িত্ব প্রদান করেছে, তথাপি এই বর্ণীয় সমাজ যে অচিরেই ক্ষমতার শীর্ষশাসন করতে সমর্থ হবে আমি এমন মনে করি না। প্লবপরবর্তী জীবিত ক্ষত্রিয়গণ অবশ্যই ক্ষীণ শক্তি হয়েছেন, কিন্তু যত দিন ব্রাহ্মণগণ তাঁদের সহায় আছেন ততদিন যে সূতমাগধিগণ চুড়ান্ত কোনো অধিকার লাভ করবেন না এ সত্য আপনারা ধ্রুব জানবেন। সে কারণে পুত্র যুযুৎসুকে আমি সাময়িকভাবে সংহত হবার জন্য উপদেশ করব। আপনারা বিভিন্ন বর্ণের মানুষ এখানে উপস্থিত আছেন। অনুগ্রহ করে বৃদ্ধ এই অন্ধরাজার আকুতি আপনারা শ্রবণ করুন। সমস্ত প্লবতার মতোই বিগত প্লবতা প্রকৃতিপুঞ্জের মধ্যে এক সাময়িক সমতার সৃষ্টি করেছে। এখনও নিহিত স্বার্থ নতুন করে এই সমতার অবস্থান্তর ঘটাতে সক্ষম হননি। তবে তার যে অধিক বিলম্ব আছে এমন নয়। আমি বলি আপনারা যাঁরা শুভবুদ্ধির মানুষ, যাঁরা যুদ্ধ এবং প্লবতাকে পরিত্যাগে আগ্রহী, তাঁরা বর্তমানে এই সমতাকে আশ্রয় করে যতদূর পর্যন্ত মনুষ্যত্বের ব্যাপ্তিকে প্রসারণ করা সম্ভব, তার জন্যে সচেষ্ট হোন। ভগবান মহাকাল বোধকরি আমাদের সকলের নিকট নিয়ত এই আদেশই প্রদান করে থাকেন। কালের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আপনারা বর্তমান সংকটকে অতিক্রমে উদ্যোগী হোন, এই প্রার্থনাই আমি করব।
মহাশয়গণ, অত্র সভাস্থলে উপস্থিত তাবৎ বুদ্ধিমান রাজন্যবর্গ তথা তদনুসারী ক্ষত্রচর্যাশ্রয়ী যোদ্ধাগণ সকলেই তাঁদের জীবনের কোনো-না-কোনো সময়ে ‘এই ক্ষত্রচর্যাকে ধিক’ বলে স্ব-অস্ত্র অবনমিত করতে অভিলাষী হয়েছেন। আমি জ্ঞাত আছি অশ্বমেধ উদ্যোগকালে মহাবীর অর্জুনকে নিজপুত্র চিত্রাঙ্গদানন্দন বভ্রুবাহনের সঙ্গেও সংগ্রাম করার প্রয়োজন হয়েছিল। প্রয়োজন এবং দুর্ভাগ্য হয়েছিল স্বভাগিনেয় সুরথের আতঙ্ক-জনিত মৃত্যুর কারণ হতে। সেকারণে আমার আর্তি, আপনারা কেউই আর যেন আমাদিগের ইতিপূর্বের বিধ্বংসী পন্থাসমূহ কোনো প্রয়োজনেই অবলম্বন না করেন। বরঞ্চ আমাদের প্রকৃত যারা স্বজন এই অনাকাঙ্খিত যুদ্ধফল ভারাক্রান্ত ধ্বস্ত এবং আমাদের স্বার্থের কারণে বিপর্যস্ত এই প্রকৃতিপুঞ্জকে রক্ষাকল্পে আপনারা বর্ণবৈষম্যরূপ দ্বেষকে ভূমিকামুকতা রূপ লোভকে এবং পরশ্রীকাতরতা রূপ অসূয়াকে নির্ণীত করুন। আপনারা তখনই পরম কল্যাণপ্রাপ্ত হবেন যখন এই দুঃখী প্রকৃতিপুঞ্জ সর্বপ্রকার অনাচারকে অতিক্রম করে এক সুস্থ এবং কাঙ্খিত গার্হস্থ্যে স্বপ্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হয়ে স্বস্থ হবে।
মহাশয়গণ, আমি এবং এই কৌরবকুল মহাভ্রমে নিপাতিত হয়ে সর্বনাশ সমুৎপত্তির কারণ হয়েছি। অবশ্য এই সর্বনাশের দায়িকতা পাণ্ডবদের বা যদু, মৎস্য, সৃঞ্জয়, পঞ্চাল, সাত্বত, সোমক বা অনুরূপ অন্যান্যদের নেই একথা যদি কেউ বলেন আমি সহমত হব না। আমরা এই কৌরবেরা এই প্লবতার জন্য দায়িক বটি, তবে প্রতিপক্ষও নির্দায়িকতা দাবি করতে পারেন না।
অগ্রজ খুবই চমৎকার ভাবে তাঁর বক্তব্য নিবেদন করছেন। তাঁর বক্তব্যের ধারা যে পথে প্রবাহিত হচ্ছে তাতে বোধগম্য হচ্ছে না তিনি কোথায় গিয়ে তাঁর তর্কের শেষ মীমাংসায় পৌঁছোবেন। কিন্তু তাঁর ভাষণ এবং যুক্তিজাল যথাযথই সময়ানুগ এবং বাস্তব বলে আমি অনুভব করছি। বোধ হচ্ছে বিগত প্লবতা মহারাজকে এক অসামান্য প্রজ্ঞায় উপনীত করেছে। এও মহাকালের এক মহিমা। যে বদ্ধমস্তক নৃকুল কোনোভাবেই সাধারণের মঙ্গলবিষয়ে এতকাল চিন্তামাত্র করেননি, তাঁদেরই একজন হয়ে যদি মহারাজ আজ যুদ্ধ-বিরোধী বর্ণাশ্রমবিরোধী এক শুভ চিন্তার গ্রাহক হন তবে এই পরিবর্তনকে স্বাগত না করার কোনো কারণ থাকতে পারে না।
ধৃতরাষ্ট্র বলতে লাগলেন, ভদ্রগণ, আপনারা সমগ্র পরিস্থিতি পূর্বাপর বিচার করুন। বিচার করে গ্রহণ করুন, বিচার করেই বর্জন করুন। লোকশ্রুতি অথবা প্রচারকে চূড়ান্ত সত্য বলে যেন গ্রহণ না করেন। আমি জানি বিগত যুদ্ধের প্রাথমিক দায়িকতা আমার প্রতি আরোপিত হয়েছে। এমন প্রচার আছে যে এই যুদ্ধ নিবৃত্তিকল্পে আমি আমার ভুমিকা সৎভাবে পালন করিনি। এক্ষেত্রে সাধারণত ধার্তরাষ্ট্র এবং পাণ্ডবগণের পারিবারিক কলহকেই সকলে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিচার করেন। এই কলহ এই ঈর্ষার কথা আমি অস্বীকার করি না। কিন্তু কুরুবংশের একদা শত্রু পাঞ্চাল এবং মৎস্যগণ কি মহাত্মা বলদেবের কল্যাণকামী উপদেশকে অবহেলা করে তাঁর জ্ঞাতিশত্রু শিনিপুত্র সাত্যকীর উগ্রপন্থাকে সমাদর করেননি? বলদেব, শুনেছি অভিমন্যুর বিবাহসময়ে মৎস্য রাজধানীতে উপদেশ করেছিলেন যে একজন ব্যক্তিকে এক্ষণে এইস্থান থেকে হস্তিনাপুরে প্রেরণ করা হোক। সে যেন অবনত ভাবেই ধৃতরাষ্ট্রের নিকট বহু অনুনয়যুক্ত বাক্য বলে। তা হলেই দুর্যোধনকে যুধিষ্ঠিরের প্রয়োজনসাধনে বাধ্য করা যাবে।
মহাত্মা বলদেব তৎপ্রিয়শিষ্য দুর্যোধনের স্বভাব এবং স্বধর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন বলেই ঈদৃশ উপদেশ প্রদান করেছিলেন। সেক্ষেত্রে দুর্যোধনের অহং সন্তুষ্টির বিষয়ে তিনি একটি সুন্দর নিদান উপদেশ করেছিলেন। সভ্যবৃন্দ, বিস্মৃত হবেন না যে মদীয় জ্যেষ্ঠপুত্র স্বভাবে অত্যন্ত অভিমানী এবং তাঁর অভিমানকে রাজসূয় যজ্ঞকালে অত্যন্ত কুৎসিতভাবে আহত করা হয়েছিল। আমি বলি, দ্রৌপদীর উপহাস নয়, পাণ্ডবভ্রাতাদের অসহ্য বাকনিপীড়নই আমার পুত্রের মনঃকষ্টের কারণ হয়েছিল। যুধিষ্ঠির ব্যতীত অন্য চার পাণ্ডব ভ্রাতাদের কুৎসিত আচরণে নিতান্ত অভিমানাহত হয়ে আমার পুত্র হস্তিনাতে এসে প্রায়োপবেশনে প্রাণ ত্যাগ পর্যন্ত সঙ্কল্প করলেই আমি দ্যূতক্রীড়া রূপ কৌশলে সম্মতি দিয়েছিলাম। আমি আমার পুত্রের অনশন আত্মাহুতি চাইনি। পরবর্তী কাহিনি আপনারা জানেন।
জ্ঞাতিই জ্ঞাতির পরম শত্রু। এ সত্য যখন স্বাভাবিক তখন কুটুম্বগণের অবশ্যকর্তব্য এই শত্রুতার যথাসাধ্য নিরাকরণ। বলদেব তাঁর অভীপ্সসম্মত প্রচেষ্টা এ বিষয়ে যথার্থভাবে করতে উদ্যোগী হলে, শীনিপুত্র সাত্যকী তাঁর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।
আর আপনারা দেখুন, রাজন্যগণ বলদেবের এই চমৎকার নিদান অগ্রাহ্য করে, স্ব স্ব পূর্ববৈরিতা স্মরণপূর্বক যুদ্ধের উদ্যোগ করতে আগ্রহী হলেন। দেখুন, দুর্যোধনের স্বভাব একরূপ, তা মন্দ অথবা ভদ্র, সে বিচারে না গিয়েও একথা বলতে পারি যে সে স্বভাবকে সংযত করার বা সংশোধন করার দায় পিতামাতা হিসেবে আমাদের থাকা সত্ত্বেও, পারিপার্শ্বিকজনেদের কিছুমাত্র ছিল না, এ কিন্তু সত্য নয়। প্রতিবাসী হিসেবে তাঁকে অসূয়া বা দ্বেষে উত্তেজিত না করার এক প্রগাঢ় কর্তব্যও এক্ষেত্রে সমধিক উল্লেখ্য। রাজসূয় কালে এ বিধি পালিত না হওয়ায় এই মহৎ বিপত্তির সূত্রপাত হয়েছিল বলে আমি মনে করি।
মহাশয়গণ, আমি যেমন দুর্যোধনের স্বভাব জানতাম তথাপি এককভাবে কোনো প্রতিকার করতে পারিনি, তেমনি এই যুধিষ্ঠিরের স্বভাবও আমি জানি এবং কোনো প্রতিকার করতে সক্ষম হচ্ছি না। তাঁর অন্য ভ্রাতাদিগের বিষয়ে কিছু বলছি না, কিন্তু যুধিষ্ঠির স্বভাবধর্মে আজ যেখানে উপনীত হয়েছেন, যুদ্ধপূর্বাবস্থায় তিনি যদি সেই সত্তায় বিরাজিত হতেন তবে মহৎ লাভ হত, এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। জ্ঞাতি হিসেবে আমি, সেই সময়, উপপ্লব্য নগরে যুদ্ধ আয়োজনে ব্যস্ত যুধিষ্ঠিরের নিকট এই উদ্দেশ্যে মহাত্মা সঞ্জয়কে দূত হিসেবে শান্তি কামনা করে প্রেরণ করেছিলাম। সঞ্জয় তাঁকে বলেছিলেন, মহারাজ, যে বস্তু বাতপিত্তকফের বৈষম্যে জন্মে না, যা কটুস্বাদযুক্ত, শিরঃপীড়াদায়ক, যশোনাশকারী, পাপোৎপন্নকারী, যে বস্তু সজ্জনেরাই একমাত্র পান করতে সক্ষম এবং দুর্জনেরা নয়, হে মহারাজ আপনি সেই বিষবৎ ক্রোধকে পান করুন এবং শান্ততায় স্থায়ী হোন। একথা যুধিষ্ঠিরকে বলার জন্য আমি সঞ্জয়কে উপদেশ করেছিলাম। কারণ আমি তাঁর স্বভাব এবং স্বধর্ম বিষয়ে জ্ঞাত ছিলাম। যুদ্ধ ভীম-অর্জুনাদি ভ্রাতৃগণের স্বধর্ম হলেও পৃথানন্দন যুধিষ্ঠিরের যে তা উপজীব্য নয় এ তত্ত্ব আমি জ্ঞাত ছিলাম। কিন্তু হায় অবশ্যম্ভাবিতা! যুধিষ্ঠির পর্যন্ত তাঁর ভ্রাতা কুটুম্ব তথা সম্বন্ধীগণের প্ররোচনায় স্বধর্মচ্যুত হলেন। আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্বোচ্চভাবে মানবিকধর্মের অনুশীলনে ঋদ্ধ তিনিও এই উদগ্র ক্রোধকে পান করতে পারলেন না। প্রাচীনকালে লোকহিতব্রত মহাত্মা শঙ্কর দেব এবং অসুর জাতির ক্রোধজনিত কালকূট পান করে জগতে নীলকন্ঠ রূপ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন এবং বিশ্ববিধানে এক সমতার বাতাবরণ সৃজন করেছিলেন। সেই আদলে যুধিষ্ঠির মর্ষকামী হয়েও কেন নীলকন্ঠ হলেন না এ বড়ো বিস্ময়! তা হলে কি একথাই বলব, যে ব্রাহ্মণ্য সমাজের কুটিলতা এই মহাত্মাকেও প্ররোচিত করতে সক্ষম হয়েছে? ভগবান মনু বলেছেন, বরং স্বধর্মো বিগুণো ন পারক্যস্বনুষ্ঠিঃত। পরধর্মেণ জীবন্ হি সদ্যঃপততি জাতিতঃ। যুধিষ্ঠির যুদ্ধ অথবা যুদ্ধোদ্যোগকালীন পর্বে এই স্বধর্মের সার্বিক বা আংশিক কোনোবিধ আচরণেই প্রযুক্ত ছিলেন না। যুদ্ধ যুধিষ্ঠিরের ক্ষেত্রে নিতান্তই পরধর্ম। তথাপি তিনি কেন যে তাই আশ্রয় করলেন! হায়! যিনি অশংস্যকে বলেন প্রধান ধর্ম, প্রার্থনাকে বিষ বলে যিনি গণ্য করেন, মনোমল পরিত্যাগকে বলেন স্নান, প্রাণরক্ষণকে যিনি দান হিসেবে চিহ্নিত করেন আর সার্বজনিক সুখকামনাকে বলেন দয়া, তখন তাঁকে কীভাবে আমরা একজন যুদ্ধকামী ক্রুদ্ধ মনুষ্য বলে বিবেচিত করব? আমাদের জীবৎকালে এই একটি মাত্র মানুষকেই তো আমরা প্রগাঢ় করুণাময় হিসেবে পেয়েছিলাম, কিন্তু হায় সে কেন স্বধর্মচ্যুত হল, সঞ্জয় বলেছিলেন, যুদ্ধ আপনার সাজে না। আপনি যদি স্বাভাবিক কারণে রাজ্যলাভ নাও করেন, তবে হে রাজন, আপনি বরং অন্ধক, বৃষ্ণি বা অন্যান্য যাদবদের নগরে গিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করুন, সে আপনার স্বধর্ম হবে। যুদ্ধ আপনার কদাপি স্বধর্ম নয়। এ যুদ্ধে জয় বা পরাজয়ের কোনো আত্যন্তিক ফল হবে না। বিজয়ী এবং বিজেতা উভয় পক্ষই সমান দুঃখিত হবে। ভদ্রগণ, আপনারা অদ্যকার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলুন তখন সঞ্জয় সঠিক বক্তব্য বলেছিলেন কিনা?
অগ্রজ এক নিঃশ্বাসে এত সব বৃত্তান্ত বর্ণন করে ক্লেশ নিবন্ধন পুনরায় মৌন হলেন। ভীমসেন অত্যন্ত বিসদৃশভাবে সচিৎকারে বৃদ্ধ রাজার বক্তব্যের প্রতিসমালোচনামূলক ভাষ্য বলতে লাগলেন। সভাস্থল পুনরায় কোলাহলমুখর হল। এইসব উত্থিত বাদবিতণ্ডার প্রতি দৃকপাত না করে অগ্রজ তাঁর বক্তব্যে প্রত্যাবৃত্ত হলেন।
মহারাজ বলতে লাগলেন, সুধী সভাসদবৃন্দ, আপনারা সকলেই জ্ঞাত আছেন যে এই প্লবতার জন্য যুধিষ্ঠিরই একমাত্র কম দায়িক। তথাপি যুদ্ধশেষে তিনিই গান্ধারীকে এসে বলেছিলেন, দেবি, আমি আপনার পুত্রহন্তা, আমি মিত্রদ্রোহী ও মূঢ়, আমিই এই পৃথিবী নাশের মূল হেতু। আপনি আমাকে অভিশাপ দিন। এই মহাত্মা এভাবেই আমাদের উভয়পক্ষীয় তাবৎ হন্তারকদের দ্বারা অনুষ্ঠিত পাপের দায় স্ব-স্কন্ধে তুলে নিলেন। আমরা এখানে সমবেত জনেরা সকলেই এই যুদ্ধ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত। সকলেই আমরা পুত্র পরিজন এবং স্বজনদের হারিয়েছি। কিন্তু যুধিষ্ঠির এই সমস্ত ক্ষতি ব্যতিরেকেও হারিয়েছেন তাঁর এক অমূল্য নিধি, যার স্বরূপ আমরা অনেকেই এখানে জানি না, তা হচ্ছে তাঁর ধর্ম। এ কারণেই বলছিলাম যুদ্ধ তাঁর স্বধর্ম ছিল না। অদ্য তাই তিনি সম্পূর্ণ নির্বেদপ্রাপ্ত গার্হস্থ্যে অনাসক্ত এক ভিক্ষুপ্রায় মনুষ্য। কিন্তু এও তাঁর স্বধর্ম নয়। একদা তিনি ধর্মকে রক্ষা করেননি বলে ধর্ম তাঁকে পরিত্যাগ করেছেন। এখন সেই ধর্মের পুনরনুশীলনে অযত্নশীল হয়ে তিনি যে ব্যক্তিক পরিত্রাণের চিন্তায় মগ্ন হয়েছেন, তাও অনর্থের উদ্ভব ঘটাবে বলেই বোধ করি। তাই যুধিষ্ঠিরকে বলি, বৎস, যা ঘটে গেছে তার থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে তুমি স্বভূমিতে প্রত্যাবর্তন করো। প্রকৃতিপুঞ্জের সংরক্ষণে এবং প্রতিপালনে ব্রতী হও। পৃথিবীতে পাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ব্যক্তিক নির্বাণের কাঙ্খায় সেই পাপের দাহ তুমি অতিক্রম করতে পারবে না। তোমার ধর্মানুচরণের মাধ্যমেই এই পাপের মধ্য থেকে উত্থিত হবে এক অমল পৃথিবী। সেই কর্ম থেকে নিবৃত্ত হোয়ো না। বৎস, তুমিই একমাত্র প্রকৃত মানবিক বোধে বুদ্ধ সেই মানুষ যাঁর ক্ষমতা আছে পাপের প্রায়শ্চিত্ত করার। সব মানুষের হয়ে এই প্রায়শ্চিত্ত তোমাকেই করতে হবে এবং তা না হলে পৃথিবী তাঁর হৃত স্বাস্থ্য ফিরে পাবেন না।
সভাসদমণ্ডলী, বার্ধক্য এবং ক্লেশজনিত কারণে অধিক্ষণ বাক চালনা করার শক্তি আমার নেই। আপনারা আমাকে এবং আমার এই উভয় কুলের সন্তান তথা বান্ধবগণকে অন্তর থেকে মার্জনা করুন। আমি এক্ষণে শতবর্ষসমীপ পরলোক যাত্রী এক ধ্বস্তপ্রাণ অন্ধ বৃদ্ধ। আমার বর্তমান অভীপ্সা সকাতরে আপনাদের গোচর করছি। আমি আর এই নাগরিক কেন্দ্রস্থ অভিজাত জীবনে আগ্রহী নই। কল্যাণে অকল্যাণে, শান্ততায় তথা রাষ্ট্রবিপ্লবে, সর্বপ্রকার পরিস্থিতিতেই আপনারা আমাকে অনুগ্রহ করেছেন। কোনোভাবেই আপনারা আমাকে পরিত্যাগ করেননি, আমিও আপনাদিগকেই স্বজন স্বদেশ বোধে আশ্রয় করে সুখে সম্পদে, দারিদ্র্যে লাঞ্ছনায় বহুকাল ধরে এই পৃথিবীর রস গ্রহণ করে ধন্য হয়েছি। যেহেতু তৃপ্ততার কথা আত্যন্তিক বোধে কেউই বলতে পারে না। তাই ‘তৃপ্ত হয়েছি’ এমন বাক্য উহ্যই থাকুক। আমার দেহ, মন, চিন্তা কিছুই আর সমাজের কোনো প্রয়োজনের সামগ্রী নয়। অতএব এক্ষণে সব কিছু পরিত্যাগ করে আমার অরণ্যাশ্রম আশ্রয় করা সঙ্গত হয়। বৎস যুধিষ্ঠির, তুমি আমাকে অনুমতি না করলে আমার ঈদৃশ আকাঙ্খা পূর্ণতা পায় না। আমি এক্ষণে ক্ষীণ এবং পুরাতন, আমার নবোত্থানে উজ্জীবন সম্ভব না। আমি এক্ষণে তৈলহীন প্রদীপের ন্যায় নির্বাণ প্রাপ্ত হব। বৎস যুধিষ্ঠির, এই সেই সময় যখন মানুষ অরণ্যের আহ্বান শুনতে পায়। বৎস আমি প্রত্যহই অতি দূরবর্তী অরণ্য থেকে যেন এক ‘আয় আয়’ ধ্বনি শুনতে পাচ্ছি। মানসনেত্রে দেখতে পাচ্ছি এক হিরণ্যপ্রভ অগ্নি যেন আমাকে ক্রতুকৃতমের মন্ত্রে যজমান হতে আদেশ করছে। সেই বৃহৎ অগ্নিকে তারপর সমগ্র অরণ্য যেন আলিঙ্গন করে আমাকে এবং আরও কত জনকে দগ্ধ করে কোথায় কোন পর্বতের শিখরে উড্ডীন হয়ে মিলিয়ে গেল। বৎস, আমাকে এবার বিদায় দাও। আমি বাকি দিনগুলি প্রকৃতির স্নেহময় ক্রোড়ে যাপন করে আমার এই স্বপ্নের নির্বাণ প্রাপ্ত হই।
অগ্রজ এক নিশ্বাসে এইসব কথন সমাপন করে নির্জীব উদ্ভিদের মতো কণ্ডয়িত হলেন। মনে হল, তাঁর এইসব কথা এবং কাঙ্খা সাতিশয় হার্দিক এবং তাঁকে আর এই গার্হস্থ্য জগতে আবদ্ধ রাখার কোনো অর্থই নেই। জনান্তিকে যুধিষ্ঠিরকে বলি, বৎস, কাল যাকে স্মরণ করেন, তাঁর অনুভূতি অবশ্য ঈদৃশ। মহারাজ খাণ্ডবদাহনাগ্নির প্রায়শ্চিত্ত স্বয়ং করতে চান। তুমি তাঁকে এই অভীপ্সা থেকে নিবৃত্ত করতে সচেষ্ট হোয়ো না। একদিন তোমাকে অথবা তোমাদের ভ্রাতাপঞ্চক এবং যাজ্ঞসেনীকেও এই আহ্বান শুনতে হতে পারে। মহারাজ, আমি অবশ্যই এই অন্ধরাজার অনুগামী হব এ সত্য ধ্রুব বলে জেনো। আমিই তার একান্ত দার্শনিক আশ্রয় হিসেবে এতকাল তার প্রায় ছায়া সহচর হয়ে কাল অতিবাহিত করেছি। এ পর্যায়ে, মহারাজ যখন আরণ্যকী শান্ততার শেষ স্নিগ্ধতার কাঙ্খী তখন তাঁর সাহচর্যে অনুপস্থিত থাকা আমার অধর্ম হয়। বৎস, তুমি অনুমতি না করলে, এই শেষ স্নিগ্ধতা বা শান্ততা লাভ সম্ভব হবে না। শোক এবং আক্ষেপ পরিত্যাগ করো। তোমাদেরও অনুরূপ পন্থা চয়ন করার দিন অধিক দূরবর্তী নয়।
আমার প্রান্তিক বক্তব্য শ্রবণান্তর যুধিষ্ঠির জানালেন যে তিনিও তাঁর বা তাঁদের আত্যন্তিক পন্থা বিষয়ে সিদ্ধান্ত চিন্তায় রেখেছেন। যথাসময়ে তিনি তা ব্যক্ত করবেন। এইভাবে আহৃত সভার প্রথম দিবস অতিক্রান্ত হল। পরবর্তী সভার কার্যক্রম ধার্য হল এই সভার দিন থেকে চতুর্থ দিবসে। সভা নির্দেশ করল যে এই সময় ক্ষেপণের মধ্যে অমাত্যগণ এবং অদ্যকার সভার স্বাভাবিক মন্ত্রকগণ আলোচনা করে কুরুবিশ্বে আমার রচিত সংহিতানুযায়ী শাসনক্রমের পুনর্বিন্যাস বিষয়ে কর্ম করবেন। যাবতীয় রাজাদেশাদি, মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের নামেই প্রচারিত হবে। মহারাজের অরণ্যবাসেচ্ছা অথবা নগরজীবন পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত এক্ষুনি সাধারণ্যে প্রচারিত হবে না। এভাবেই প্রথমদিবসের এই নির্ণায়ক সভার সমাপন ঘটল।
পূর্বনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কোনো কর্মই সম্ভবত আনুপূর্ব সম্পাদন করা যায় না। যে বিশেষ নির্ণয় উপলক্ষে মহাসভা আরম্ভ হয়েছিল, সভার গতিপ্রকৃতি তা অতিক্রম করে অন্যবিধ অনেক বাস্তব সমস্যার উদঘাটন করতে শুরু করেছে। তার মধ্যে একদিকে যুযুৎসু উপস্থাপিত সূতমাগধীগণের বর্তমান আকাঙ্খা, অপরদিকে মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের এবং যুধিষ্ঠিরের কর্মমার্গ থেকে ক্রমশ নিবৃত্তি এই দুটি বিষয়ই প্রধান। এ সত্যও অস্বীকার করতে পারি না যে আমার অন্তরস্থ আকাঙ্খাও অনুরূপ সিদ্ধান্তের অনুকূল। মনে হয়, এক্ষেত্রেও কালই তাঁর সূক্ষ্ম ক্রিয়া দ্বারা সকলকে চালিত করছেন। এক্ষণে সমগ্র পুরুষকার যেন কালের নির্দেশেই শম্বুকের ধর্ম আচরণ করছে। বিগত সমগ্র জীবনব্যাপী আমরা যে শোক, তাপ, সুখ, দুঃখ এবং জীবনের যাবতীয় কোমল অনুলেপ তথা তীব্র কষাঘাত আমাদের শরীরে মনে গ্রহণ করেছি, তার ফল হিসেবে এই শরীর এবং মনের যাবতীয় অনুভব শক্তি এখন লুপ্তপ্রায়। আমাদের শরীর এখন শম্বুক শরীর এবং মন চিন্তনক্রিয়াবর্জিত। তথাপি আরব্ধ কর্ম পরিহার করে কর্মক্ষেত্র থেকে নির্বাসন গ্রহণ সম্ভব নয়, বা তা কালের অভিরুচিও নয় বোধকরি।
আগামী কল্যই সভার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। অতএব, তারপরেই কর্মনিবৃত্তির বিষয় বিবেচিত হতে পারে। ইতোমধ্যে যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে ব্যাপক আলাপন হয়েছে। তিনি এখনও যেন সমস্ত কিছুতেই সম্পৃক্ত থেকেও কিছুতেই সম্পৃক্ত নেই। এই ভাবটি আমারও সম্যক অধিগত। আমি যেহেতু জ্ঞানলাভাবধি অন্তরে এক নিয়ত বিষাদ বহন করে চলেছি, সেহেতু ঈদৃশ বিষয়বিযুক্ত সম্পৃক্তি আমার স্বভাবজ। আমি স্ব বিষয়ে নানাবিধ বক্তব্যই ইতোপূর্বে বলেছি। তথাপি আরও অনেকই যেন অনুক্ত আছে। যেহেতু সার্বিক সংঘটন বিষয়ে আমার অনেক কিছুই এখনও তথ্যবদ্ধ করার আবশ্যকতা আছে, অতএব নিজ বিষয়েও বহু তথ্যই বলতে হবে। আমার জীবন অতিশয় শান্ত। এই শান্ততা কুরু ক্ষত্রিয়কুলের জন্যে এক নিষ্কর্ষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হল না। আমি আত্মপ্রশংসা না করেই বলছি, তাঁদের সদা-অশান্ত জীবনের প্রদাহে আমার এই স্বভাবজ শান্ততা আরোগ্য প্রদান করতে সক্ষম ছিল। কিন্তু আমার সেই ভাবটি তাঁদের গোচর বহির্ভূতই রয়ে গেল। জীবনের সমস্ত বিক্ষোভ এবং সন্তাপ থেকে বহু যত্নে নিজেকে আত্মস্থ রাখার তপস্যা আমার চরিত্রে এক সময় স্বাভাবিক নিয়মে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলত কোনোকিছুতেই আমি বাহ্যত চঞ্চল হই না, ব্যাকুল হই না বা উদ্বেল হই না। আমার কৈশোর এবং প্রাথমিক যৌবনে সর্বাঙ্গ সুস্থ কুমার হয়েও শুধুমাত্র মাতার একদা দাসীত্ববশত যে আমি রাজত্ব বিষয়ে কোনো অধিকারের আধিকারিক হইনি, তৎসংক্রান্ত নৈরাশ্য আমার অবশ্যই বহু কালাবধি ছিল। বাস্তব সামাজিক বিন্যাসকে প্রত্যক্ষ করে এক সময় আমার সে নৈরাশ্য এক দার্শনিক বিষণ্ণতায় রূপান্তরিত হলে, পরবর্তী যাপিত জীবন এমন শান্ততাশ্রয়ী তথা বিষয়বিযুক্ত সম্পৃক্ততাধর্মী হয়ে গড়ে উঠেছে। লোভ আমার কদাপি ছিল না। ছিল অভিমান। প্রব্রজ্যা প্রত্যাগত অবস্থায় আজ অনুভব করছি সেই অভিমানও কখন যেন কালের অধ্যাপনায় নিরাকৃত হয়েছে। যখন কুরুবংশের মহামন্ত্রীত্ব পদে আদৃত হয়েছিলাম, তখনও ওই অন্ধ অগ্রজকে সদা সর্বক্ষণ প্রত্যক্ষ করে মনে খেদ হত, যে, কী সেই ঋদ্ধি যা তাঁর আছে অথচ আমার নেই? আবার বিগত মহারাজ পাণ্ডুর নপুংসকতা তথা পাণ্ডুরোগগ্রস্ততা সত্ত্বেও, যখন তিনিই রাজা হলেন, তখনও এই অভিমানই আমাকে দীর্ঘকাল ধরে নিগৃহীত করেছে, যে কেন সে, কেন আমি নই? অথচ আমরা তিন জনই তো একই পিতার সন্তান। মাতা বিভিন্না। আদিম দাস বা অনার্য ধীবর কন্যার কানীনপুত্র আমাদের তিনজনারই পিতা। তিনি পরাশর পুত্র বলে ব্রাহ্মণ, মাতা যেই হোন, আর আমি দাসীগর্ভজ বলে শূদ্র। পিতা বাদরায়ণি বলেছিলেন, বৎস বর্ণাশ্রমী সমাজ ক্রমশ বর্গবিভক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। শুধুমাত্র মনুকথিত অনুশাসনেই তার যাথার্থ্য নির্ণয় হবে না। রূপান্তরকেও অনুধাবন করতে হবে। আমি জানি এই রূপান্তরিত বিন্যাস মহাকালের, মহৎক্রীড়ায় সততই ঘটমান। কিন্তু কোনো বর্ণীয় ব্যক্তিকে অতিক্রম করে বর্গে বিস্তৃতিশীল ঈদৃশ গূঢ় কালশ্চরতা বিষয়ে আমার কোনো ধারণা ছিল না। সমাজের বর্ণ ভিত্তিকতাকে চূড়ান্ত ধরে রূপান্তরী বিষয়ের বিশ্লেষণে এতকাল তর্কশীল ছিলাম। বর্ণ বিষয়ে কদাপি কোনো চিন্তা বা বিশ্লেষণ প্রচেষ্টার কারণ ঘটেনি। মহাত্মা বাদরায়ণি এই বর্গ বিষয়ের বিকাশের সংবাদ আমাকে প্রদান করেছিলেন বহুকাল পূর্বে। তখন সদ্য সদ্য খাণ্ডবদাহ সমাপ্ত হয়েছে। পাণ্ডবেরা সামান্য একটা উপনগরীকে অপরিসীম স্পর্ধায় এক মহানগরীতে রূপান্তরে উদ্যোগী। ধার্তরাষ্ট্রগণ কর্তৃক নির্যাতিত পাণ্ডবেরা বর্ণে কুরুকুল ক্ষত্রিয় হলেও, সেইক্ষণে অপবর্ণ এবং নিম্নবর্গীয়। খাণ্ডববননিবাসী অনার্যকুল পাণ্ডবগণ কর্তৃক সম্পূর্ণ উৎসাদিত হওয়ার পরই অনুভব করেছিল যে এরা বর্গ-সম্মতভাবে তাদের অনুযায়ী হওয়া সত্ত্বেও বর্ণাভিমানে অন্যত্রস্থিত। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পর্যন্ত এই বর্গ এবং বর্ণের দ্বন্দ্ব সেকারণে প্রাধান্য লাভ করেছিল। অথবা বহু পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত এই দ্বন্দ্ব চলতে থাকবে, এই আমার ধারণা।
একারণেই আমার বোধহয়, যুযুৎসু তাঁর বক্তব্যে যা বর্ণনা করেছেন তার যাথার্থ্য অগ্রাহ্য করা যায় না। আর্যবর্ণীয়রা ক্রমশ অপবর্গীয় সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেমন সংখ্যায় বিপুল হচ্ছেন, তেমনই ক্ষমতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠিত অপবর্ণীয়রা আবার এই সংখ্যাধিক্যতাকে আশ্রয় করে স্বাধিকার বিষয়ে সচেতনতা লাভ করছেন। ক্রমশ তাঁরা এক সময় হয়তো-বা নিশ্চিতই পূর্ণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হবেন। বোধহয় কালের নির্দেশও তাই। সেকারণে সভায় নির্ণেয় শাসনবিন্যাসে কালের এই গতির প্রতি উপযুক্ত সম্মান এবং সমাদর প্রদর্শন করতে হবে।
যুধিষ্ঠিরের সহিত আলাপন কালে এসব বিষয় নিয়েই বিচার হয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে যুধিষ্ঠির বললেন, পিতৃব্য, ভূমি এবং পশু বর্তমান রাজন্যদের অর্থাগমের প্রধান উপায়। বাণিজ্য শুল্ক, যুদ্ধাদিক্রমে লব্ধ লুন্ঠিত সম্পদ ইত্যাদিও রাজন্যকুলের ধনবৃদ্ধি ঘটায় এইসব কারণেই আমাদের সমাজে নিত্য সংঘর্ষ। খাণ্ডব দাহকালে আমরা প্রাথমিকভাবে প্রয়াসী ছিলাম পতিত ভূমি উদ্ধার করে কৃষিক্ষেত্রের বিস্তৃতি ঘটাতে। কিন্তু কার্যত দেখা গেল খাণ্ডবের অগ্নি মূলত আমাদের লোভের অগ্নিতে পর্যবসিত হয়েছে। আপনি জানেন এই লোভরূপ অগ্নিদেবের হবি আহরণের নিমিত্তই অতঃপর আমাদের অস্ত্র সংগ্রহ, সংঘর্ষ, অগণিত লোক এবং প্রাণীক্ষয়। হে তাতকল্প যেদিন আমরা পঞ্চভ্রাতা আমাদের মাতা কুন্তীসহ বারণাবত অগ্নিকাণ্ড থেকে অব্যাহতি পাবার প্রযত্ন করলাম, সেই দিনটি থেকেই ধ্রুবত আমরা পাপ আশ্রয় করেছিলাম। একথা আজ আমি সবিশেষ নিবেদন করতে চাই একারণে যে ধার্তরাষ্ট্রগণের পাপাচার বিষয়ে বহুকথন প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু আমাদেরও যে অনুরূপ পাপাচারের ক্রমান্বয় আছে একথা যদি এখনও ব্যক্ত না হয়, তবে পাপাচারের মাত্রা বৃদ্ধিই পায় এবং তা অনুরূপ পাপাচরণকে প্রায় ধর্মাচরণ হিসেবেই সমাজে প্রতিষ্ঠা করে। আপনি অবশ্যই এই অন্বিক্ষাকে গ্রাহ্যসত্য বলে গ্রহণ করবেন। আগামী কল্যের সভায় যদি আমাকে কিছু বলতে বলেন, তবে অবশ্যই আমি এইসব বিষয়ের অবতারণা করব। কিন্তু আমার অভিমত এই আপনি যদি স্বয়ং মূলনীতি নির্ণয়ের জন্য বাগ্মিতা করেন, আমার পক্ষে তা অতিশয় স্বস্তির কারণ হয়। কেননা, আমার বাগ্মিতা বিষয়ে আমি নিজেই যথেষ্ট নিরুদ্বিগ্ন নই, বরং এক্ষণে আপনি আমার বিচার শ্রবণান্তর যথাসময়ে স্বকীয় ভাষণে সভার উদ্দিষ্টানুযায়ী সিদ্ধান্ত নিরূপণ করবেন। মহাশয়, সভাস্থলে কোনো কূট প্রশ্ন উত্থাপিত হলে আমি কোনোভাবেই তার উপযুক্ত উত্তর প্রদানে সমর্থ হব না। যেহেতু স্বভাবজ গুণে আমি যথেষ্ট বাকপটু নই, অধিকন্তু আপনারা সকলেই জ্ঞাত আছেন যে আমি আদৌ দৃঢ়মনস্ক ব্যক্তিও নই। আমি সহজেই নমনীয় এবং আমাকে দিয়ে যে কোনো কাজ করিয়ে নেওয়া কারও পক্ষেই বোধকরি অসম্ভব নয়। আপনি জানেন, বাল্যাবধি আমি এমন আচরণেই অভ্যস্ত। আমি নিজেই বিশ্বাস করি যে আমি সরল স্বল্পবাক এবং এক সাধারণ কৃষকহৃদয় মনুষ্য। যেকোনো সাধারণ কৃষিবল যেমন তার স্বাভাবিক গার্হস্থ্যে তৃপ্ত, আমার স্বভাবও সেইমতো। কোনো প্রকার কৌটিল্যই, আমার ক্ষেত্রে স্বাভাবিক নয়। সে কারণে আমার রাজন্যপদাবৃত হওয়াও বিধর্ম। আমার জীবনের অভিশাপ এই যে আমি বারবার স্বভাবধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্মে প্ররোচিত হয়েছি এবং পাপের অনুষ্ঠান করেছি। বারণাবত অগ্নির কার্যক্রমে আমি প্রথম আমার স্বভাবধর্ম-বিরোধী এক পাপের আস্বাদ অনুভব করেছিলাম। হে মহাত্মা বিদুর, আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে এ হেন পাপের স্বাদ নিতান্ত সরলপ্রাণ, পরচিকীর্ষু কৃষকহৃদয়ের নিকটেও বড়ো মধুর বলে প্রতীয়মান হয়। আপনি অনুভব করুন যে অতিথি নিষাদ রমণী তার পঞ্চপুত্রসহ ওই জতুগৃহে ভস্মীভূত হল তারা ব্যক্তিগতভাবে আমাদের কোনো অনিষ্ট কোনোদিন করেনি। তারা নিতান্তই ক্ষুধার অন্নপ্রত্যাশী হয়ে আমাদের অতিথি হিসেবে এসেছিল। এই নিষাদ রমণী এবং তার পঞ্চপুত্র যেদিন আমাদের আতিথ্য গ্রহণ করেছিল, তার অনেক আগেই কিন্তু আমরা আপনার প্রেরিত গূঢ় পুরুষের নিকট থেকে পুরন্দর কর্তৃক অগ্নিসংযোগের দিনক্ষণ এবং যাবতীয় বৃত্তান্ত অবগত ছিলাম। আমরা, এ তথ্যও জ্ঞাত ছিলাম যে ওই নিষাদ-রমণী এবং তার পঞ্চপুত্রর ওই দিনেই আতিথ্য গ্রহণের পশ্চাতে আপনার গূঢ় পুরুষগণের সক্রিয়তাই কার্যশীল। কিন্তু তা আমাদের প্রতি আপনার স্নেহ প্রকাশ করলেও, তারা নিতান্তই অকারণে, বিনা অপরাধে মৃত্যু বরণ করল। অগ্নিসংযোগ তো আমরাই করেছিলাম।
তাদের আত্মোৎসর্গে আমাদের জীবন মুক্তি পেল। আমরা কিন্তু এই পাপের নিমিত্ত সামান্যতম খেদ প্রকাশ পর্যন্ত করলাম না। আপনি যে বর্গসমাজের কথা বললেন, আমরা সেই ক্ষণে একই বর্গে বিরাজিত ছিলাম। কর্ম যাই-ই হোক। মহাশয়, আপনি সবিশেষ জানেন যে আমাদের বর্ণও যথাযথ নয়। শুধু লোকশ্রুতি। তাত, আমি জানি কৌরবেরা মূলত আমাদের স্ববর্ণে গ্রহণ করতে পারেনি বলেই আমাদিগের প্রতি তাদের ঈদৃশ দ্বেষ ছিল। অবশ্য আমাদের জ্যেষ্ঠতাত এবং তাঁর পুত্রগণও বর্ণ বিষয়ে যে কোন পর্যায়ভুক্ত, সে প্রশ্ন আমরা করতেই পারতাম। তথাপি, যেহেতু আমরা পঞ্চভ্রাতা অজ্ঞাতবীর্যোদ্ভব, সেকারণেই আমাদের অধিকার বিষয়ে কুরুকুলে ঈদৃশ বিতণ্ডা তথা সর্বশেষ ফল এই অষ্টাদশ দিবসব্যাপী যুদ্ধ এবং সমূলে বিনাশ। কিন্তু সে যাহোক, আমাদের এই পঞ্চভ্রাতার পাপের সূত্রপাত হয়েছিল এমনই এক নির্বন্ধে যাকে কাকতালীয় বলে স্তব্ধ করা যায় না। মহাশয়, আমি অনুমান করতে পারি যে বারণাবত অগ্নি-ধ্বংস থেকে আপনি কেন আমাদেরকে উদ্ধারে প্রচেষ্ট হয়েছিলেন অথবা ওই পঞ্চ নিষাদভ্রাতাসহ তাদের মাতা অলৌকিকভাবে কেন সেখানে অকারণে দগ্ধ হয়ে আমাদের মৃত্যু সংবাদ নিশ্চিত করল। কিন্তু সব সত্য প্রকাশিতব্য নয় বলে, সে বিষয়ে আমি নির্বাকই থাকলাম। শুধু একটি বিষয়ে পুনরায় বলি, ওই সেই গৃহ, যাকে সকলে জতুগৃহ বা দাহ্যগৃহ বলে জেনেছে এবং কুৎসিত উদ্দেশ্য রচিত যে গৃহ প্রকৃতই দাহযোগ্য, সেই গৃহেই আমাদেরও পাপের প্রথম অনুপ্রবেশ ঘটেছিল। এই একটি স্থান যেখানে কৌরবদের লোভের আগুন, পাণ্ডবদের লোভের আগুনের সঙ্গে একত্রিত হয়ে এক অন্য আগুনের উন্মেষ ঘটিয়েছে। বোধকরি আপনার কথিত বর্গস্বার্থ এভাবেই তার প্রতিষ্ঠা পেয়ে থাকে। বর্গীয় আচরণের বিষয় এস্থলে গ্রাহ্য নয়। কেন গ্রাহ্য নয় সে বিষয়ে বলি। আপনার কথিত বর্গসমাজে যাঁরা শীর্ষবর্গী, তাঁদের মধ্যেও দ্বন্দ্ববিরোধ যে নিয়ত বাস্তব সে তো প্রত্যক্ষ সত্য। কিন্তু এই দ্বন্দ্ববিরোধের অন্তিম মূল্য দিতে হয় অপবর্গী মনুষ্যদেরই। কেননা দেখুন, ওই পঞ্চপুত্রসহ নিষাদ রমণী জানতেই পারল না যে তারা কেন অকারণে দগ্ধ হয়ে মরবে এবং আমরাই বা কেন সেই মৃত্যুকে প্রয়োজন-সাধক করে স্বপ্রাণ রক্ষা করব, তথা নানাবিধ স্বকীয় প্রকরণে সেই মৃত্যুকেও অস্ত্রবৎ ব্যবহার করব। মহাশয়, এই সব সংঘটনসমূহ আদৌ আকস্মিক নয়। আমাদের বর্গ অভ্যন্তরস্থ বিরোধে এমন নিয়তই ঘটে যে বিবদমান পক্ষদ্বয় একে অন্যের উদ্দিষ্ট ক্ষতি সাধনে সমর্থ না হলেও তাতে যেন তাদের উভয়ের সাধারণ শত্রুরা নির্জিত হয়। কী প্রকরণে যে পরস্পরবিরোধী স্বার্থদ্বন্দ্বী শীর্ষবর্গীয়দের এমন কার্যবিন্যাস প্রস্তুত হয়, সে তত্ত্ব জানা নেই। এ যেন এক অলৌকিক সম্ভাব্যতা বলেই মনে হয়।
আমি ভাবি এ চিন্তাও তো আমারই চিন্তা। আমি পূর্বেই বলেছি, যে যুধিষ্ঠির আমার ঔরসপুত্র। পুত্র এবং পিতার সত্তা কি সংস্কার এবং বিজ্ঞানের পরম্পরার সূত্র অভিন্নভাবে বহন করে? অথবা যুধিষ্ঠির এবং আমি কি কোনো অর্থে এক ও অভিন্ন? অথবা পঞ্চস্কন্ধশীল জীবন কি এমনই পুনর্জন্ম প্রাপ্ত হয়? এইসব প্রশ্ন আমার মনে জাগরিত হলে আমি জিজ্ঞেস করি, পুত্র, তুমি কি বৈদিক কর্মকাণ্ডে আর কিছুমাত্র আস্থাশীল নও? যে সব যজ্ঞাদি কর্ম তুমি সম্পাদন করে অদ্য এই ঋদ্ধিপ্রাপ্ত হয়েছ, চক্রবর্তী সম্রাট হয়েছ, তার নিমিত্ত তোমার কি কোনো স্বকীয় চিত্তবৃত্তি, আপেক্ষিক অথবা পরম্পরাগত বিশ্বাস ক্রিয়াশীল ছিল না?
যুধিষ্ঠির বললেন, হে পিতৃব্য, আপনি যে ঋদ্ধির কথা বললেন, সে ঋদ্ধির স্বরূপ কী, তা কি আপনি প্রত্যক্ষ করছেন সব? আমি কদাচ আমার স্ব-আকাঙ্খানুযায়ী কর্ম করিনি। আমার বর্গ তার স্বভাবধর্ম প্রাবল্যে আমাকে শুধু সেইসব কর্মে বাধ্য করেছে। কিন্তু আমি তো কদাচ আমার বর্গে অধিষ্ঠিত থেকেছি, আমিও জ্ঞান প্রাপ্তাবধিই এক সামান্য গৃহস্থাশ্রমী মনুষ্য মাত্র। আমি নিরন্তর এক সামান্য কৃষিবলের মতো শ্রমের অন্ন সংগ্রহ করে, মাতা, ভ্রাতৃদের তথা পরবর্তীকালে পরিণীতা যাজ্ঞসেনীকে নিয়ে এক নিরুপদ্রব, শান্তিময় জীবনের আকাঙ্খায় আকাঙ্খিত ছিলাম। এই জীবনই আমার পরম প্রাপ্তির স্থল ছিল। অধিকন্তু হিসেবে শুধু তত্ত্বজিজ্ঞাসা এবং শ্রবণ ছিল আমার পরম আকাঙ্খার বস্তু। রাজ্য, ক্ষমতা, প্রভুত্ব ইত্যাদির তাবৎ ক্ষত্রজনোচিত বিষয় আমি কোনো দিনই অন্তর থেকে আকাঙ্খা করিনি। আমার আকাঙ্খাই ছিল এই যে অপ্রবাসী, অঋণী থেকে দিনে যদি একবারই শাকান্ন ভোজন করে নির্বিরোধ নিরুত্তাপ জীবন যাপন করা যায় তবে তার অধিক কিছুই কাম্য নয়। দেখুন, আমাদের বিধিলিপি। আমরা পাণ্ডব ভ্রাতৃগণ জীবনের ব্যাপক ভাগই প্রবাসী জীবন যাপন করেছি। ব্যক্তিগতভাবে আমি কদাচ ঋণী। একারণেই এই আদর্শ আমার অনুকরণীয় বলে বোধ হয়েছে। কিন্তু দেখুন, লোভ রূপ অগ্নি তার চিরশত্রু জলের সঙ্গে সৌহার্দ্য করে আমার জীবনকে কেমন পাপময় করেছে। বারণাবতের আগুন যখন খাণ্ডবদাহের অগ্নি হিসেবে শরীরী হল, তখন লোভের অনুষঙ্গ রূপে কামনা এবং ক্রমান্বয়ে তার অনুষঙ্গে ক্রোধ, অসূয়া, মাৎসর্য ইত্যাদি রিপুরা আমাদের চরিত্রে আশ্রয় গ্রহণ করে নানাবিধ পাপের পথ আমাদের সম্মুখে উন্মুক্ত করে দিল। এই পথ ধরেই তখন দ্যূতক্রীড়া, অস্ত্রসমাগম, ঐশ্বর্য, অধিক স্ত্রী গ্রহণ, ইত্যাকার প্রদর্শনীর নাট্যোৎসব শুরু হলে আমি সেই স্রোতে ভাসমান হলাম। হে সুজাত, খাণ্ডব কি আমাদের দ্বারা যদৃচ্ছ ধর্ষিত নয়? খাণ্ডবদাহের কৃত্যাদিকে কি লোভাগ্নির ক্রমপ্রসারণ বলে আপনি মনে করেন না? আপনি জানেন, প্রকৃতি স্বীয় তপশ্চর্যা দ্বারা এই সংসারকে স্থাবর, জঙ্গমাদি আভূষণে এক অনুপম আশ্চর্য সুখকর স্থান হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। দার্শনিকগণ যাঁকে ব্রহ্ম বলেন, যিনি তাঁদের কল্পিত সব থেকে সূক্ষ্ম অথচ বিরাট অস্তিত্বরূপে অনন্ত কাল, সেই ব্রহ্ম থেকে স্তম্বশীর্ষের শিশিরবিন্দু অবধি অথবা অন্যভাবে যদি বলি, প্রকৃতির বিচ্ছিন্ন লীলাচাপল্যে যে সমস্ত প্রাণ, অপপ্রাণ, উপপ্রাণ অথবা মৌল বস্তুসমূহ ক্রমান্বয় বিকাশে চলমান, তার সমুদয় যথাযথ সংরক্ষিত না হলে এই প্রাকৃতকল্পে যে বিপর্যয় ঘটে সেই বিপর্যয়ও এক মহাপাপ। কেননা প্রকৃতি তাঁর এবংবিধ সৃষ্টি দ্বারা এক মহৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করছেন। আপনি অবশ্যই সৃষ্টির এই গূঢ় উদ্দেশ্য লক্ষ করে থাকবেন যে, বায়ু, পিত্ত, কফাদির নির্দিষ্ট সংস্থানের তারতম্য হলে যেমন প্রাণীদেহ রোগগ্রস্ত হয়, তেমনই প্রাকৃতিক ভারসাম্যে বিপর্যয় ঘটলে, প্রকৃতি রোগগ্রস্ত হয়ে প্রকৃতিপুঞ্জকেও অসুস্থ করে। আমার বিশ্বাস খাণ্ডববন দহনকালে আমরা প্রকৃতিকে এমনই এক সন্তাপে বিপর্যস্ত করেছি যদ্বারা প্রকৃতিবিশ্ব এক ভয়াবহ আধ্যাত্মিক তথা আধিভৌতিক দূষণে স্বয়ং রোগগ্রস্ত হয়ে তাঁর উপজকুলের নিমিত্ত দুরারোগ্য ব্যাধিরূপ বীজ প্রসব করেছেন। মহাশয়, আমি মনে করি এই বীজ কদাচ বিনষ্ট হবে না। পাপ কখনো সমূলে বিনষ্ট হয় না। সে অমোঘ প্রতাপে পুণ্যকে দগ্ধ করার নিমিত্ত, নানান বিকারের উদ্ভব ক্রমান্বয়ী করে চলে।
এক পাপ অপর পাপের জন্য পথ প্রস্তুত করে থাকে! যেমন দেখুন জতুগৃহে অনুষ্ঠিত পাপ খাণ্ডবদাহের এবং খাণ্ডবদাহরূপ পাপ রাজসূয়রূপ পাপে বিকশিত হল। আর অবশ্যই রাজসূয়রূপ পাপের বলয় পূর্ণ হল কুরুক্ষেত্র এবং প্রভাসের প্লবতায়। রাজসূয় যজ্ঞানুষ্ঠানের কথাই যদি বলি, ওরকম একটি প্রদর্শনীমূলক যজ্ঞানুষ্ঠান, যা জ্ঞাতিদের অসূয়া বৃদ্ধিকারী এবং সর্বোপরি সমূহ রাজন্যবর্গের তথা প্রকৃতিপুঞ্জের নির্যাতন ও শোষণে অনুষ্ঠেয়, তা কি কোনোক্রমেই সার্বিক মৈত্রীর অনুকূল? আমার বিচার এই যে এই রাজসূয় আমার স্বধর্মের বিপরীত এবং এর অনুষ্ঠানের মাধ্যমেই আমাদের পাণ্ডব ভ্রাতাগণের চূড়ান্ত পাপকর্ম আরব্ধ হল। মহাশয়, সম্পদ, মনুষ্য সমাজে অবশ্য প্রয়োজন। রাজনদের এই সম্পদ সংগ্রহকরণও অত্যন্ত আবশ্যক কাজ। কিন্তু সম্পদের ব্যক্তিগত সংগ্রহণ, ব্যবহার এবং তার প্রদর্শনী যে নিতান্তই অনভিপ্রেত তথা দূষণীয়, এ বিষয়ে তখন আমরা অবহিত ছিলাম না। হায়! কত অধর্মই না আমরা ধর্মবোধে অনুষ্ঠিত করেছি!
হে ধর্মকল্প, আপনি তো আমাদের তাবৎ পরিচয় জানেন, আপনিই বলুন, রাজসূয় কি লোভের যজ্ঞ ছিল না? যজ্ঞস্থলের যাবতীয় সংঘট্টন কি ধার্তরাষ্ট্রগণের প্রতি স্পর্ধা প্রদর্শনকল্পে অনুষ্ঠিত হয়নি? আমরা কি রাজ্য বিভাজনান্তর অতি দ্রুত আমাদের সম্পদাদি বর্ধিত করার মানসেই ওই রাজসূয়রূপ প্রদর্শনী তথা সম্পদ সংগ্রহকারী এক লোভময় প্রচেষ্টা সিদ্ধান্তে রেখেই এই কর্মের অনুষ্ঠানে ব্রতী হইনি?
দিগ্বিজয়ে সার্থক পাণ্ডবভ্রাতৃগণ কি আর্যাবর্তীয় বিভিন্ন রাজ্য তথা প্রকৃতিপুঞ্জকে নির্জিত করেই যজ্ঞার্থে অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ করেননি? বিশেষত সেই যজ্ঞকল্পে তথা যজ্ঞকালে যে হত্যাদির অনুষ্ঠান হয়েছিল, তা কি তাদের সাধু কর্ম বা শাস্ত্রসম্মত?
মহাত্মা অচ্যুতকে নানাবিধ জ্ঞানের আকর বলে আমরা এতকাল জেনেছি। কিন্তু মাতা গান্ধারী বা যুযুৎসুর অন্বীক্ষা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ নয় কি! আপনার কি এমত বোধ হয় না যে অচ্যুতকে আমরা যতটা নিস্বার্থ লোকহিতৈষী বলে পূজা করেছি, তিনি প্রকৃতই সেই পরিমাণে পূজ্য নন? তাঁর নানাবিধ আচরণ, আমাদের স্বার্থে প্রযুক্ত হলেও কি তাবৎ মনুষ্যের কল্যাণের জন্য তা শাশ্বত? অচ্যুত কি আদপেই বিগত সংঘটনে নিরপেক্ষ ছিলেন?
হে পিতৃব্য, কুরুক্ষেত্রের সংঘটনের অব্যবহিত পূর্বে মহাত্মা বলদেব যে পন্থা গ্রহণ করেছিলেন আপনি তা জ্ঞাত আছেন। তিনি অত্যন্ত সরলহৃদয়, আমাদের উভয়কুলের কল্যাণকামী, যুদ্ধবিরোধী এক মহাপ্রাণ। অচ্যুতের কর্ম তিনি উচিত মনে করতে পারতেন না বলে মধ্যে মধ্যে তাঁর প্রকৃত সংকট হত। আপনি জানেন যাদবগণের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে মূলত দুটি বিভাগ ছিল। তার একটি ভাগ বলদেবের অনুগামী। অচ্যুতকেশবের প্রতি অপরিসীম স্নেহবশত তিনি কদাচ কোনো গোষ্ঠী বিরোধকে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রশ্রয় দিতেন না। স্বয়ং সংকটসমূহকে অচ্যুতের ইচ্ছানুযায়ী নিরাকরণ করে তাঁর প্রসন্নতা প্রতিপাদন করতেন। কুরুক্ষেত্রের প্লবতা বিষয়ে তাঁর ইপ্সিত সমাধান যখন যাদব সমাজে গ্রাহ্য হল না তখন তিনি আপনারই মতো প্রব্রজ্যা নিলেন। মহাশয় হয়তো ভেবেছিলেন যখন শেষ রক্ষা সম্ভবই নয় তখন নিমিত্ত হয়ে পাপভাগ বহন করার অপেক্ষা তীর্থ পর্যটনে মানসিক স্থৈর্য তথা শান্ততার অনুশীলন অধিক ফলপ্রদ এবং শ্রেয়।
আমি জানি মহাত্মা বলদেব দুর্যোধনাদির প্রতি যথেষ্ট স্নেহপ্রবণ ছিলেন। যুদ্ধোদ্যোগকালে যখন মৎস্যরাজসভায় যুদ্ধবিষয়ে আলোচনা হয়েছিল, মহাত্মা বলদেব বলেছিলেন,
‘আপনারা কৌরবগণের শান্তি কামনা করুন এবং সানুনয় বাক্যেই দুর্যোধনকে আহ্বান করুন। কারণ সানুনয় বাক্যদ্বারা সাধিত বিষয়ই প্রয়োজন সাধক হয়; কিন্তু যুদ্ধে অন্যায় হবে এবং সে অন্যায় প্রয়োজনসাধক হবে না।’ একথা অতীব সত্য যে যুদ্ধে অন্যায় সংঘটনের সম্ভাবনা সাতিশয় প্রকট। যে পক্ষ যুদ্ধকর্মে বাধ্য বিধায় যুযুধান, তার পক্ষেও যুদ্ধকামী পক্ষের মতোই অন্যায় কর্মে প্রবৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকেই। কারণ, সমস্যার নিরাকরণে যুদ্ধ প্রকৃতই এক অপকৃষ্ট পন্থা। দোষগুণ বিচারে প্রবেশ না করে, তাই যুদ্ধকে সমাধানের উপায় হিসেবে গ্রহণ না করাই সঙ্গত। বলপ্রয়োগে সমস্যার সমাধান বর্বরতারই নামান্তর। কিন্তু সামাজিক প্রক্রিয়ায় ‘বলপ্রয়োগ’ এমন একটা স্থান অধিকার করে আছে যেখানে যুক্তি, তর্ক বা সদপুদেশ স্থান পায় না। একারণেই বলদেবের প্রশান্ত বাক্যও ব্যর্থ হয়। পিতৃব্য, বলদেবের ঈদৃশ বাক্যে সাত্যকি প্রভৃতি যাদবগণ এবং আমাদিগের শ্বশুর দ্রুপদ, শ্যালক ধৃষ্টদ্যুম্ন প্রভৃতি পাঞ্চালগণ যৎপরোনাস্তি ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে উপেক্ষা করলেন। আমরাও তখন স্বপক্ষে প্রভূত সমর্থক প্রাপ্ত হয়ে ওই মহাত্মার কথায় কিছুমাত্র গুরুত্ব আরোপ করিনি। ফলত উপপ্লব্য নগর থেকে মহারাজ দ্রুপদের বৃদ্ধ পুরোহিতকে আমরা হস্তিনায় প্রেরণ করলাম। তিনি আমাদের নির্দেশমতো অত্যন্ত কর্কশবাক্যে কৌরবদের যুদ্ধ ও শান্তি উভয় বিষয়ে প্ররোচনামূলক বাক্যে আমাদের প্রকৃত আকাঙ্খা জ্ঞাপন করলেন। তাঁর বাক্য এতই তীক্ষ্ণ ছিল, যে শান্তনুনন্দন ভীষ্ম, যিনি আমাদের প্রতি কদাপি দ্বেষ পরতন্ত্র ছিলেন না, তিনি পর্যন্ত সেই ভাষার তীক্ষ্ণতার প্রশংসা করতে পারেননি। বিশেষত, একথা নিশ্চয়ই আপনাকে বলার প্রয়োজন হয় না যে পাঞ্চাল পুরোহিত দৌত্যকার্যের নিমিত্ত কৌরবসভায় আদৌ কাঙ্খিত ব্যক্তি হতে পারেন না। কেননা, পাঞ্চাল এবং কুরুকুল বহুকালাবধি পরস্পরের জন্মশত্রু। বিষয়টি যদি তাঁদের পারস্পরিক বিবাদের সম্পর্কে হত, দোষ ছিল না। কিন্তু কুরুপাণ্ডবদের নিজস্ব অন্তর্বিরোধ উপলক্ষে যাদব পাঞ্চালগণের ঈদৃশ ধৃষ্টতাপূর্ণ মধ্যস্থতা কৌরব বীরগণ আদপেই প্রশংসার চক্ষে দেখেননি, দেখার কথাও নয়। আমার মনে হয় আমরা সেক্ষেত্রে এমত এক গূঢ় কর্মে পাঞ্চাল পুরোহিতকে প্রেরণ করে যথার্থই ভুল করেছি। বোধকরি এই দৌত্যকার্য যদি মহাত্মা বলদেবকে প্রদান করা হত, তবে দুর্যোধন তথা সমগ্র কৌরবগণ যুদ্ধ বিষয়ে অন্যরূপ চিন্তা করতে বাধ্য হতেন। পিতৃব্য, আমি বলতে চাই যে আমরা প্রথমেই যুদ্ধকে অবধার্য ধরে নিয়ে শঠতাপূর্বক ওই ব্রাহ্মণকে দূত হিসেবে প্রেরণ করেছিলাম। আমরা জানতাম যে এই পাঞ্চাল ব্রাহ্মণ তাঁর স্বভাববশতই কুরুসভায় পরুষ বাক্য ব্যবহার করে প্ররোচনার বাতাবরণ সৃষ্টি করবে। মানী দুর্যোধন যুদ্ধে আহুত হলে কদাচ সন্ধি বিষয়ে কর্ণপাত করবেন না। মহান পিতৃব্য, একথা না বলা সত্যের অপমান যে মৌখিক প্রস্তাবনায় যে যাই বলুন, দ্রুপদ, ধৃষ্টদ্যুম্ন, সাত্যকি প্রমুখ যাঁরা আমাদের হিতার্থী ছিলেন তাঁরা সকলেই যুদ্ধকামী ছিলেন। কিন্তু হায়, অনেক, অনেক পরেই আমি বুঝতে পারলাম যে বলদেবই একমাত্র ব্যক্তি যিনি আপনি এবং সঞ্জয় ছাড়া প্রকৃত যুদ্ধবিরোধী উভয়পক্ষে আর কেউই ছিলেন না। হে তাতকল্প, আমি নিতান্তই অপরিণত বুদ্ধি এবং নিয়ত পরমত চালিত হয়েছি বলে আমার মনে হয়, বস্তুত আমার যুদ্ধবিরোধী স্বভাব, আমার তাবৎ কৃতকর্মের সঙ্গে সঙ্গতিযুক্ত নয়। আমার স্বভাব যুদ্ধবিরোধী হলেও আমি যেহেতু পরমত চালিত এবং যুদ্ধকামী ব্যক্তিরাই যেহেতু সর্বদা আমাকে পরিপোষণ করেছে, সেহেতু, আমি স্বধর্ম পালনে সক্ষম হইনি। আমি কদাপি দৃঢ় চিত্ত ব্যক্তি নই।
হে পিতৃব্য, আমি যে আদৌ দৃঢ়চিত্ত নই, এ বিষয়ে উদাহরণের কোনো প্রয়োজন হয় না। বিশেষত আমার দ্যূতাসক্তির কথাই যদি বলেন, সে ক্ষেত্রে দেখবেন আমি এই মোহ থেকে কখনোই মুক্তি পাইনি। এমনকী অজ্ঞাতবাস পর্বেও আমি কঙ্ক নামধেয় হয়ে মৎস্যরাজের অক্ষ সখা রূপে জীবন নির্বাহ করেছি। অতঃপর সংঘট্টনে যেহেতু দ্যূতক্রীড়ার কোনো নির্বন্ধ আর ছিল না, সেকারণে সেই সংঘট্টন আর প্রত্যক্ষ হয়নি। তবে অন্তরের আকাঙ্খা কদাপি নির্মূল হয়নি। তাই শেষ অক্ষক্রীড়ায় আজ ধর্মকেই পণ করে বসে আছি। কেননা ধর্মের সনাতনত্বে আমার আর প্রত্যয় থাকছে না। আমার বর্তমান অক্ষক্রীড়া আদৌ প্রত্যক্ষ হবে না, তবে আন্তরিকভাবে আমি এই খেলা খেলছি। হয়তো এখানেই আমার বিনাশ, অথবা এখানেই সদগতি। সদগতি অথবা বিনাশের পর মানুষের চৈত্যনের অবস্থা কী হয় তা কেউ বলতে পারে না। আমার বোধ বলে সব কিছুই শূন্যে নির্বাণ পায়। সবই শূন্য থেকে হয় এবং শূন্যেই বিলুপ্ত হয়। চৈতন্য বোধকরি দেহধর্মেরই বিকার। আত্মা বলে পঞ্চস্কন্ধশীল এই দেহ ছাড়া অতিরিক্ত কিছু নেই।
মহান গার্হস্থ্য জীবনের মাধুর্যকে ভালোবেসে সহজ সরল অনাড়ম্বর এবং নির্বিরোধ এক শান্ত জীবন আমার কাম্য ছিল। সেই কামনায় এক সময় রাজ্য রাজপদ লাভ করার বাঞ্ছা করেছি। আমার অক্ষক্রীড়ার উদ্যোগও সেই কামনারই প্রকাশ। অক্ষে আমার আসক্তির জন্য যথেষ্ট নিন্দার ভাগীও আমি হয়েছি। কিন্তু রক্তক্ষয় নিবারণকল্পেই যে আমি দ্যূতক্রীড়ার আশ্রয় গ্রহণ করেছিলাম এ সত্য আমি ছাড়া আর কেই-বা জানে? এই ক্রীড়ায় কৌরবদের দুর্বুদ্ধি যে স্তরে কৌটিল্যের অবতারণা করল, আমার সরল বুদ্ধি সেই স্তরে কদাপি বিচরণ করে না। আমার পক্ষ যদিও শকুনিকে কপট কৈতবাদি আখ্যায় আখ্যায়িত করেছে, কিন্তু বলদেবের ন্যায় আমিও বিশ্বাস করি : ‘শকুনি খেলা করিতে প্রবৃত্ত হইয়া ইঁহার সহিত প্রতিপক্ষভাবে খেলা করেন; তখন পাশাসকল সর্বদাই যুধিষ্ঠিরের প্রতিকূলভাবে পড়িতে থাকে; তাতে যুধিষ্ঠির ক্রুদ্ধ হইলেও শকুনি তাকে যেন বলপূর্বক জয় করেন; অতএব তাতে শকুনির কোনো অপরাধ ছিল না।’ গূঢ় পুরুষের সমাচারে আমি জ্ঞাত হয়েছি যে কৌটিল্যমনস্ক শকুনি পর্যন্ত দুর্যোধনকে যুদ্ধবিরোধী পরামর্শ প্রদান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, পাণ্ডবগণের ঐশ্বর্য দেখে তোমার ব্যথিত বা ঈর্ষিত হওয়া উচিত নয়। তুমি অসহায় নও, পাণ্ডবরা যেমন দুরূহ কর্মদ্বারা এই ঐশ্বর্য অর্জন করেছেন, তুমিও তোমার সপক্ষীয় মহাধনুর্ধর দ্রোণ, অশ্বত্থামা, সূতপুত্র কর্ণ, কৃপাচার্য, তোমার ভ্রাতৃগণ এবং আমাকে আশ্রয় করে সমগ্র বসুন্ধরা জয় করতে পার। গূঢ় পুরুষ আমায় জানিয়েছিল যে ওই সময়েই শকুনি দুর্যোধনকে বলেছিল, যুদ্ধ নয়, অন্য উপায়ে পাণ্ডবদের জয় করার কথা চিন্তা করতে হবে। যুধিষ্ঠির দ্যূতক্রীড়াসক্ত। কিন্তু ক্রীড়ায় আদৌ দক্ষ নয়। তাঁর এমত এক প্রতিজ্ঞা আছে যে কেউ অক্ষক্রীড়ায় আহ্বান করলে, সে তাকে প্রত্যাখ্যান করে না। অন্যপক্ষে, আমি অক্ষ ধুরন্ধর। আমি গান্ধারবাসী, কৈতব-শাস্ত্রে আমা হেন সুপণ্ডিত কদাচ লভ্য নয়। আমি অক্ষবলের সাহায্যে বিনা রক্তপাতে তোমাকে সমগ্র পাণ্ডব ঐশ্বর্য প্রদান করব। তুমি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি নাও।
মহাত্মা আমাদের জ্যেষ্ঠতাত এই প্রস্তাবনা অনুমোদন করে যখন আপনাকে ইন্দ্রপ্রস্থে অক্ষক্রীড়ায় আমন্ত্রণকারী দূত হিসেবে প্রেরণ করলেন, তখনকার সমাচার আপনি নিশ্চয়ই বিস্মৃত হননি। আমি বলেছিলাম, দ্যূত থেকে কলহ উৎপন্ন হয়, বুদ্ধিমান ব্যক্তির তা রুচিকর নয়। আপনার কী মত? আপনি বললেন, বৎস, আমি জানি দ্যূত অনর্থের মূল, তার নিবারণের চেষ্টাও আমি করেছিলাম, তথাপি ধৃতরাষ্ট্র আমায় পাঠিয়েছেন। তুমি বিদ্বান, যা শ্রেয় তাই কোরো।
আমি অবশ্যই স্মরণ করতে পারছি সেইসব বার্তালাপ। যদিচ যুধিষ্ঠিরকে আমি সম্যক জানতাম এবং আমার এই দ্যূতক্রীড়ার বিষয়ে আদৌ প্রসন্ন সম্মতি ছিল না তথাপি সমস্যার নির্ধারণ আমি তার উপরেই ন্যস্ত করেছিলাম। আমার উপায় ছিল না যে পরিষ্কারভাবে কৌরবগণের কৌটিল্য বিষয়ে তাকে উপদেশ দান করি। যুধিষ্ঠিরেরও ধৃতরাষ্ট্রের আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করার কোনো আপাতগ্রাহ্য কারণ ছিল না।
অক্ষক্রীড়া এবং কৈতব অঙ্গাঙ্গী জড়িত। এই ক্রীড়ায় যদ্যপি নির্দিষ্ট নিয়মাবলি প্রচলিত আছে কিন্তু ক্রীড়াস্থলে সেইসব নিয়ম কদাপি অনুসৃত হয় না। অক্ষবাটে উপবিষ্ট পরস্পর প্রতিদ্বন্দ্বীরা কদাচ কৈতব বৃত্তি পরিহারে সক্ষম হয়। ফলত কৈতব আর অক্ষক্রীড়া প্রায় অভিন্নার্থক। বহু প্রাচীনকাল থেকেই এর সমাদর এবং বিরূপতা সমাজে প্রচলিত। তথাপি এই ক্রীড়ার প্রচলন আছে এবং বোধকরি কোনোদিনই তা সমূহ বিলুপ্তি পাবে না। আমার স্মরণ আছে যে ক্রীড়োপবিষ্ট যুধিষ্ঠির এবং শকুনি ক্রীড়ারম্ভের প্রাক্কালে যে সব আলাপন করেছিলেন তার কথা। যুধিষ্ঠির বলেছিলেন, আমি শঠতা দ্বারা সুখ বা ধন লাভ করতে চাই না, ধূর্ত দ্যূতকারের শঠতা প্রশংসনীয় নয়। শকুনি বলেছিলেন, যুধিষ্ঠির, বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণ ও বিদ্বানরাও শঠতার দ্বারা পরস্পরকে হেয় করতে চেষ্টা করেন, এ প্রকার শঠতা নিন্দনীয় নয়। তবে তোমার যদি আপত্তি বা ভীতি থাকে তবে খেলো না। শকুনি তাঁর অবস্থানের দিক থেকে পরিচ্ছন্ন কথাই বলেছিলেন। যুধিষ্ঠির সেই সুযোগ গ্রহণ করে যখন নিবৃত্ত হলেন না তখন শকুনিকে অতঃপর কৈতব বা শঠতাশ্রয়ী বলে অবশ্যই নিন্দা করা অযৌক্তিক। যুধিষ্ঠির এখন সেই সত্য বিবৃত করছেন।
যুধিষ্ঠির বললেন, ক্ষত্তা, কৈতবের দ্বারা যে আমি পরাজিত হয়েছিলাম একথা তর্কসাপেক্ষ। কৌরবগণ এই ক্রীড়াকে আশ্রয় করেই যে আমাদের সর্বনাশ করেছে এমন নয়। কিন্তু পাশকক্রীড়া বিষয়ে কৌরবগণের কৌটিল্য অন্যভাবে অবশ্যই বিচারিত হবার যোগ্য। দেখুন, আমরা কুরুপ্রধানগণের সিদ্ধান্ত শিরোধার্য করেই ইন্দ্রপ্রস্থের যাবতীয় শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়েছিলাম। খাণ্ডবদাহাদি কর্মে আমরা অবশ্যই অনেকের প্রতি অন্যায় আচরণ করেছি, কিন্তু তা কোনোক্রমেই কৌরবদের স্বার্থহানিকর ছিল না। রাজসূয় উপলক্ষে আমার ভ্রাতৃগণ দিগ্বিজয় করে যে সব সমৃদ্ধির আয়োজন করেন তাতে কৌরবপক্ষের প্রতি কোনো অহিতাচার ঘটেনি। তথাপি দুর্যোধনের অসূয়া বৃদ্ধি পেল, ফলত দ্যূতসভার আয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের স্বোপার্জিত সম্পদের প্রতি লুব্ধতাই তার এই দ্যূতনাটকের উপলক্ষ। তাদের কৌটিল্যের উৎস এখানেই।
তথাপি আমি নিজেকে নির্দায়িক মনে করি না। আমি স্বপক্ষ এবং বিপক্ষ উভয়েরই বিষয় আপনাকে বললাম। সভায় এতসব বার্তালাপ শোভন হবে না ভেবেই আমার এই উন্মোচন। এখন আপনি আগামীকল্যের সভায় সমুচিত বাগ্মিতা প্রদানে যদি সমস্যা নিরাকরণে প্রচেষ্ট হন, তবেই সর্ববিধ স্বস্তি জানবেন। আপনি যেমন অনুজ্ঞা করবেন, আমি সেই মতো আচরণেই অতঃপর কার্য সম্পাদন করব। কৃপা করে আমায় আমার অভিরুচি বিরুদ্ধ কর্মে প্রযুক্ত করবেন না। তেমন কর্ম যথেষ্ট করেছি, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই কাঙ্খিত ফললাভ করিনি। এক্ষণে জীবনের শেষ অক্ষপাত করে এই অদৃশ্য অক্ষবাটে বসে আছি। এখন ধর্মই আমার পণ। ধর্ম প্রকৃত প্রস্তাবে অস্তিত্ববান কোনো সত্তা কিনা এই গূঢ়ার্থ চয়ন করে আমি আমার শেষ কর্তব্য নিরূপণ করব। সে কর্তব্যে যদি ভ্রাতৃগণ অনুগামী হন, অহোভাগ্য, নচেৎ এ হবে আমার একক পরিক্রমা। আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই, আমার দর্শন সর্বতোভাবে ভিন্ন। তা সৌগতপন্থী, বৈদিক অথবা তৈর্থিক নয়। কিন্তু সে বিচার পরবর্তী সময়ের জন্য নির্দিষ্ট রাখলাম। আপনি সমূহ বাস্তব বিষয়ে আগামী কল্যের সভায় স্ব-বিচার বোধে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
পরবর্তী দিবসের সভায় প্রথম এবং শেষ বক্তা আমিই ছিলাম। যুধিষ্ঠিরের সঙ্গে আমার পূর্বোক্ত কথা ছাড়াও বহুবিধ আলোচনা হওয়ার পর সঞ্জয়ের সঙ্গেও যথেষ্ট পরামর্শ করে আমি এই সভায় প্রদেয় ভাষণ বিষয়ে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম। সঞ্জয় বলেছিলেন, প্রাজ্ঞ, বিতর্কে এবং বিশ্লেষণে বিষয়ের কলেবর বৃদ্ধি পায়। আপনি, যুধিষ্ঠির এবং আমি স্বভাবত অতিমাত্রায় তত্ত্বানুসন্ধানী তথা সূক্ষ্ম বিচারাশ্রয়ী। প্রকৃতিপুঞ্জ অথবা আমাদের কর্মাধ্যক্ষগণ ঈদৃশ তত্ত্ব বা বিচার বিষয়ে আগ্রহী হওয়ার মানসিকতা অথবা অবসর লাভে সক্ষম হন না। অর্থাৎ সংসারকে যাঁরা প্রকৃত পরিচালনা করেন, তাঁরা প্রধানত কালের স্রোতকেই অবলম্বন করে চলার বাধ্যতা স্বীকার করে নেন। সেটাই একসময় তাঁদের স্বধর্ম হয়। আমাদের আচরিত তত্ত্বাদি বা আন্বীক্ষিকী তাঁদের এইসব কর্মের অভ্যন্তরে গূঢ় আশ্রয়ে থেকে ক্রমশ প্রক্রিয়মাণ হয়। সামাজিক কর্মস্তরে এই তত্ত্বাদি কদাচ আরোপিত হয়ে কর্মের গতি বা উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে সক্ষম হয়। এ এক অতি গূঢ় প্রক্রিয়া। অতএব, স্থূলভাবে কিছু নির্ণয় প্রচেষ্টাই বর্তমান সভার পক্ষে প্রয়োজনীয় বলে অনুমান হয়। হে মহান, কোনো গৃহে অগ্নির আক্রমণ কালে, গৃহস্থ যদি অগ্নির স্বরূপ নির্ধারণে অধিক আগ্রহী হয়ে তার নির্বাপণ বিষয়ে উদাসীন থাকে, তবে সেই গৃহই ভস্মীভূত হবে। অগ্নি বিষয়ে তাবৎ তত্ত্বজ্ঞান লব্ধ হলেও অগ্নি নির্বাপিত হবে না অথবা গৃহও সংরক্ষিত হবে না। অতএব, আমাদের বর্তমান প্রচেষ্টা এই রাজ্য এবং প্রকৃতিপুঞ্জের সংরক্ষণ, সুশাসন তথা স্থায়িত্ব বিষয়ক প্রকল্পানুযায়ী হওয়াই বাঞ্ছনীয়।
এ কারণে আমি সভায় এক সুচিন্তিত প্রস্তাবনা উপস্থিত করলাম। আমার ভাষণ অতি সংক্ষিপ্ত ছিল। কোনোপ্রকার তত্ত্বদর্শনাদির মধ্যে প্রবেশ না করে আমি কিছু বাস্তব কর্ম সমাধান বিষয়ে সকলকে অবহিত করলাম। আমি সভাকে জানালাম, অতঃপর কুমার পরীক্ষিৎ যিনি এক্ষণে কৈশোর অতিক্রান্ত, তাঁকে তাবৎ রাজকর্ম বিষয় এবং অস্ত্রশিক্ষায় সুশিক্ষিত করতে হবে। আগামী বর্ষচতুষ্টয়ের মধ্যে সে যখন যৌবনবাস্থায় উপনীত হবে তখন তার প্রতি রাজ্যভার অর্পণ করে যুধিষ্ঠিরাদি স্বসিদ্ধান্তানুযায়ী পন্থা অবলম্বন করবেন। কুরুরাজ ধৃতরাষ্ট্র তাঁর অভীপ্সিত বনব্রজতা অবলম্বন অবশ্যই করতে পারেন, কিন্তু তার জন্য তাঁকে আরও কিছুকাল অপেক্ষা করতে আমরা অনুরোধ করব। তিনি বনব্রজতা অবলম্বন করলে, যুধিষ্ঠিরাদি কুমারকে সম্পূর্ণ স্থায়িত্বে আসীন করেই আকাঙ্খিত মার্গ অবলম্বনের আধিকারিক হবেন। রাজ্যের যাবতীয় অমাত্য কর্ম প্রশাসনাদি ব্যবহার পূর্ব নিয়মেই পরিচালিত হবে। যুযুৎসু এবং অন্যান্য সূতকুলোদ্ভবগণ স্ব স্ব মেধা এবং ক্ষমতানুযায়ী কুমারের রাজত্বপ্রাপ্তির কাল থেকে শিক্ষার সঙ্গে সংহিতাসম্মতভাবে রাষ্ট্রকর্ম সম্পাদন করবেন। বেদবিরোধী সম্প্রদায়ের প্রতি কোনো নির্যাতন চলবে না। ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়গণ, অতঃপরের অসহিষ্ণুতা এবং ক্রোধ যথাসম্ভব পরিহার করে চাতুর্বর্ণ্য বিধি পালনে সচেষ্ট হবেন।
আমি বললাম, ভদ্রগণ, আপনারা বর্তমানে লোকসমাজে যে বর্ণবিপর্যয় প্রত্যক্ষ করছেন, তা নিতান্তই কালানুগ বলেই গ্রহণ করবেন। কোনো ব্যবস্থাই শাশ্বত হয় না। কালের ধর্ম চলমানতা এবং বিবর্তন। এই বিবর্তনই সনাতন বা শাশ্বত জানবেন। কোনো নৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজকৃত্য অথবা ব্যক্তিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে এমন কোনো শাশ্বত বিধি থাকতে পারে না যা এই সনাতন ধর্মকে, অর্থাৎ কালের চলমানতা বা বিবর্তনধর্মকে অতিক্রম করতে পারে। অতএব, আপনারা সকলেই বর্ণ, বর্গ, জাতি বা সম্প্রদায়ভেদে এই কালধর্মকে আশ্রয় করুন। হে মহোদয়গণ, আপনারা অনুগ্রহ করে কালের ধ্বংস প্রত্যক্ষ করুন এবং তার সৃজনকেও। দেখুন, বিগত মহাযুদ্ধে যেসব রথী, মহারথীরা বীরশয্যা গ্রহণ করেছেন, তাঁরা নিজ নিজ বিচার, সিদ্ধান্তকে কদাপিই নশ্বর বলে অনুভব করেছেন। তাঁদের চিন্তনে ছিল যে, তাঁরা পুত্রপৌত্রাদিক্রমে, স্ব স্ব চিন্তাধারা অনুযায়ী যাবচ্চন্দ্র দিবাকরেই পরম্পরায় জয়ী হবেন। কিন্তু তা কখনো কালের ধর্ম নয়। সেকারণেই তাঁরা বিগত।
কিন্তু তত্ত্ব তথ্য বচন পরিত্যাগ করে আমি এই মহান অজমীঢ় বংশীয়দের কুলের বিষয় নিয়ে আপনাদের নিকট কিছু নিবেদন করতে চাই। আপনারা অনুগ্রহপূর্বক আমার সেই কথন অবধান করুন। এই বংশ অতিশয় প্রাচীন। উত্তর কুরু থেকে আগত এই কুলের পূর্বতম পুরুষগণ বহুযত্নে যমুনা তীরবর্তী এই প্রদেশকে মুক্ত করে এখানে স্বরাজ্য স্থাপন করেন। এই কার্যে বহুযুগ তাঁরা ব্যয়িত করেছিলেন। অজমীঢ় সেইসব পুরুষগণের অন্যতম। ভদ্রগণ, যতদূর পর্যন্ত এই বংশধারাবলি আমার আয়ত্ত তাতে দেখি যে এই বৃহৎ বংশ একদা হস্তী নামক একজন মহৎ সন্তান প্রাপ্ত হয়েছিল যাঁর আগমন ঘটেছিল উত্তর কুরু থেকে। মহারাজ হস্তীই সম্ভবত এই কুরুজাঙ্গাল নামক স্থানের প্রথম আবাদকারী। তাঁর নামানুসারেই এই হস্তিনাপুর নগরী। এই হস্তীরই পুত্র অজমীঢ়। তিনি বহুবংশের স্থাপয়িতা। বর্তমানে আমি শুধু তাঁর পুত্র ঋক্ষ, তৎপুত্র সংবরণ এবং তস্য পুত্র কুরুরই উল্লেখ করছি। কুরুই কুরুক্ষেত্রের আবাদকারী সেই মহাকৃষিবল। তাঁরই নামে এই বংশের নামায়ন। মহারাজ হস্তী এবং তৎপরে মহারাজ কুরু যখন রাজ্য তথা ভূমির বিস্তৃতিকল্পে বৃহৎ অটবীসমূহ ধ্বংসে ব্রতী হন, তখন নাগ, পক্ষী, কূর্ম এবং নিষাদ প্রভৃতি গোত্রীয় আদি মনুষ্যগণ, তথা ধীবরাদি মৎস্যকুলীয়গণের সঙ্গে যে ঘোর সংগ্রাম সংঘটিত হয়েছিল সে বিষয়ে আমি প্রায় নিঃসন্দেহ। সেইসব সংগ্রামের কাহিনি শ্রুতি স্মৃতি পরম্পরায়, ভট্টব্রাহ্মণদের দ্বারা যুগ যুগ ধরে গীত এবং কথিত হয়ে হয়ে আজ পুরাণকথারূপে, ধর্ম ও দর্শনাদির আকর রূপে আমাদের বিভিন্ন সামাজিক, ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটে সংহিতার কার্য করছে। অধুনাতম লভ্য আমাদিগের যাবতীয় সংস্কার সংস্কৃতির, কাব্য নিরুক্তি, ব্যাকরণ অথবা নীতিনৈতিকতা তথা লোকজীবন নগর জীবনের সমূহ তত্ত্বাদির মূলাধার সেই বহিরাগত এবং ভূমিপুত্রদের সংগ্রাম-ইতিহাস। খাণ্ডবদাহের সময় যেমন অগ্নির তাণ্ডব ঘটেছিল এবং তৎসহ কৃষ্ণার্জুনের তীক্ষ্ণ শস্ত্রক্ষেপণ, কুরুজাঙ্গাল আবাদ কালেও সেই ঘটনাই ঘটেছিল। এই স্থানের সেই প্রাচীন নিবিড় অটবিতে সতত শান্ততাশ্রয়ী অরণ্যপুত্রেরা অকস্মাৎ বহিরাগত এই হিরণ্যবর্ণ পুরুষগণের অকরুণ আক্রমণে হতভম্ব, ছিন্নভিন্ন, ত্রস্ত এবং ক্রমশ পলায়মান হল। তাদের নিকট এই অনাকাঙ্খিত, অকল্পিত এবং অকস্মাৎ আক্রমণ প্রতিহতকরণের কোনো উপায়ই ছিল না। তারা তাদের স্ব স্ব বিভাগে, স্ব স্ব গোষ্ঠীপ্রধানের নেতৃত্বে এক সরল, শান্ত জীবনে অভ্যস্ত ছিল। প্রয়োজনানুগ কৃষিকর্ম, অপরিমেয় বন্য মৃগাদির শিকার, পশুপালন ইত্যাদির অবলম্বনে জীবন যাপন করত তারা। তাদের এই শান্ত জীবনে এমন তাণ্ডব তারা কখনো চিন্তা করেনি। তাই অটবি-আশ্রয়বিচ্যুত এই অরণ্যপুত্রেরা ক্রমাপসরমাণ হল খাণ্ডবারণ্যের দিকে। যারা যুযুধান ছিল তাদের রক্ত, মেদ, বসা এবং অস্থি কুরুক্ষেত্রের ভূমির উর্বরতা বৃদ্ধি করল।
মহারাজ হস্তী অথবা মহারাজ কুরু ততদিনে যে রাজন্য আখ্যা প্রাপ্ত তাও তো এক বহুমান্য ইতিহাস। উত্তর কুরুতে তাঁরা ছিলেন পশুপালনকারী এক গোষ্ঠীমাত্র। ক্রমশ স্বভূমি পরিত্যাগ করতে বাধ্য হলেন প্রাকৃতিক নির্বন্ধেই। গোষ্ঠীর পরিবর্ধন, পশুপালনজনিত সংকীর্ণ উৎপাদনী অর্থনৈতিক সমস্যা, গোচারণভূমির বিস্তৃতায়ন, একারণে আবশ্যিক যাযাবরত্ব। অতএব চরৈবেতি চরৈবেতি। এই চরৈবেতির চংক্রমণে এক সময় ক্লান্ত হয়ে এই যাযাবর দেখে, আহৃত ফলের বীজ থেকে জাত এক বৃক্ষ ফলবান। মহাশয়গণ, এভাবেই তাঁরা কৃষির বীক্ষণ, এবং দীক্ষায় চরৈবেতির চরণ শ্লথ এবং পথ দীর্ঘ করেন। দীর্ঘ যাযাবরত্বের আদি বৈদিক প্রজ্ঞান থেকে কৃষি জৈবিকতার ঔপনিষদিক প্রজ্ঞায় তাঁরা উপনীত হলে এই প্রজ্ঞাই তাঁদের গৃহস্থ করে। এই প্রজ্ঞায় তাঁরা রাজ্য সাম্রাজ্য স্থাপনার উদ্দীপনা লাভ করেন, এর দ্বারাই তাঁরা ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষাদি চতুর্বর্গের সন্ধান পান। এই প্রজ্ঞায়ই আবার নিহিত থাকে তাঁদের ঈদৃশ অগ্রগামিতার মরণবীজ যা লোভ এবং অসূয়া নামে এই প্রজ্ঞা দ্বারাই আয়ত্ত ক্ষমতার মধ্যে গুপ্ত থেকে তাঁদের যাবতীয় লব্ধধন বিনাশের আয়োজন করে। ভগবান মহাকালের এ এক আশ্চর্য লীলা এবং এই একটিমাত্র ক্ষেত্রেই মহাকালকে আমার একজন কুটিলচরিত্র জীবন্ত ব্যক্তি বলে ভ্রম হয়। কিন্তু তত্ত্ব থাক, ইতিহাস বলি। একথা বলাই বাহুল্য গোষ্ঠীনেতৃত্ব যখন একস্থান থেকে অন্যস্থানে গমন করেন এবং একবৃত্তি থেকে অন্যবৃত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হন, তাঁদের অনুসারী তাবৎ মনুষ্যকুলও সেই ধারাবাহী হয়। এই নেতৃত্ব যেহেতু ক্ষত্রিয়কুল এবং ব্রাহ্মণগণের করধৃত অতএব সমগ্র সমাজ তাঁদের প্রকল্প অনুযায়ীই গঠিত হয়, এ তো স্বাভাবিক। এই কৃষকজীবনই একসময় তাঁদের চিত্তে এক গভীর ভাবের রূপ সৃজন করে, তখন তাঁরা ভাবতে এবং আকাঙ্খা করতে পারে এমত-
যো বৈ ভূমা তৎসুখম্
নাল্পে সুখমস্তি ভূমৈব সুখম্
ভূমৈব বিজিজ্ঞাসিতব্য-ইত্যাদি
হে ভদ্রগণ, আপনারা, যাঁরা এই সভায় আসীন, তাঁরা নিশ্চয় জানবেন যে যাঁরা কৃষিবল, তাঁদের আমরা, অন্য কৃতাবলম্বীগণ অধুনা কদাচ আর্য মনুষ্য বলে সমাদর করি। অথচ একদা মহারাজ হস্তী অথবা মহারাজ কুরু, নিজেরাই কৃষিবল রূপে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করেছেন। বিদেহ রাজকুল তো তাঁদের কৃষিপ্রজ্ঞা বিষয়ে অসামান্য কিংবদন্তি। তাঁরা একদা হলকর্ষণ করেই তো রমণ জনিত চরম রতিহর্ষ লাভ করেছেন। আর একথাও মিথ্যে নয় যে, অধুনাতন কৃষিবলগণ, কর্ষণ বপন এবং রোপণে, সেই সুখই অনুভব করে থাকেন, যা তারা তাদের রমণীগণের নিকটেও প্রাপ্ত হন।
অধুনা আর্য ক্ষত্রিয় নামধারীগরণ হয়তো তাঁদের পূর্বজদের এই বৃত্তির প্রতি নিষ্ঠা এবং শ্রদ্ধার কথা বিস্মৃত হয়েছেন। যেহেতু তারা এখন রাজা। তাঁরা এক্ষণে এই কর্মকে হীনকর্ম বলে অনুমান করেন। কিন্তু আমি বলছি, মহাত্মা কুরু কিন্তু প্রকৃতই একজন কৃষক, তিনি স্বয়ং ক্ষেত্র কর্ষণ করতেন। আর্য ক্ষত্রিয়াভিমানী মনুষ্যগণ অধুনা এ সত্য স্বীকার করেন না, তাঁরা ভাবেন ঈশ্বর তাঁদের এই সদাসুখময় অঙ্গাবরণটি পরিয়ে তাঁদেরকে এইসব রত্নময় আসনে আসীন থাকার জন্যই ধরাধামে প্রেরণ করেছেন এবং এখানে তাঁরাই ঈশ্বরের নবরূপ। যেন তারা আবহমানকালই রত্নময় সিংহাসনে উপবিষ্ট থেকে কর্ষকদের শ্রম আহরিত ফলের অধিকার ভোগ করে এসেছেন। তত্ত্বজ্ঞানী এবং শাসককুলের এবম্বিধ প্রত্যয়ই সমাজের নিয়ত অপরিমিত দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটাচ্ছে।
তবে সেইসব ক্রমান্বয়ী সংঘটন বিষয়ে অধিক কিছু জ্ঞাপন করা এখন নিরর্থক। বরঞ্চ বর্তমান সমস্যার আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করা এখন সর্বতোভাবে কাম্য। এতদবৃত্তান্তের হেতু এই যে পশ্চাৎ না জানলে কেউই অগ্রবিবেচনার প্রকৃতি নির্ণয়ে সক্ষম হয় না। যুযুৎসুর কালোচিত বাক্যে, সভাস্থলে ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় শাসককুলে যে প্রতিক্রিয়া আমার দৃষ্টিগোচর হল, তা নিতান্তই ইতিহাসপুরাণ অনভিজ্ঞ মনুষ্যের পক্ষেই প্রদর্শন করা সম্ভব। এ দ্বারা প্রমাণ হয় যুগান্তের বর্তমান চিহ্নসমূহ তাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে না। সমাজ এখন যে পরিবস্থার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত, সেই পরিবস্থার নূতনত্ব বিষয়ে তাঁরা কিছুমাত্র অবহিত নন। তাঁরা পূর্বতন সমাজের ধারা এবং বিন্যাসের অভ্যস্ততায় এখনও অনড়। কিন্তু আমি বলি, আপনারা যুগান্তের চিহ্নসমূহ অবলোকন করুন, নতুনকে যুক্তিগ্রাহ্যতায় গ্রহণ করুন, পুরাতন লোক-অহিতকর অভ্যাসসমূহকে বর্জন করুন। ধীমান যুযুৎসুর বক্তব্যকে কালোচিত মনে করে আমি বলতে চাই যে বর্তমান রাজন্যকুল যেন তাঁদের অর্ধভ্রাতাদের সঙ্গে ক্রমশ তাঁদের অধিকার বিভক্ত করে নেন। সমাজে সৌগত মতবাদাদির প্রাধান্য যেরকম বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে কোনো বর্ণ অথবা বর্গই আর অধিক কাল অবদমিত থাকতে অথবা কৃপাপাত্র রূপে বিবেচিত হতে আগ্রহী থাকবে না। স্মরণ রাখবেন, প্রকারান্তরে আপনাদের এই সূতমাগধী অর্ধভ্রাতৃগণই প্রাচীনকাল থেকে নানাবিধ রাজকীয় দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে নিষ্পন্ন করে এসেছেন। একমাত্র মহামন্ত্রিত্ব তথা বিভিন্ন মন্ত্রকাদির দায়িত্ব ব্রাহ্মণ বর্ণের উপর ন্যস্ত ছিল। কিন্তু বিগত মহারাজ পাণ্ডুর কাল থেকেই, অবধান করুন, আমা হেন শূদ্রাণীপুত্রও মহামন্ত্রিত্ব পরিচালনায় অংশগ্রহণকারী এবং মহাত্মা গবলগণ পুত্র মহামতি সঞ্জয় সূতপুত্র হয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রকের সুষ্ঠু পরিচালনা করে আসছেন। কিন্তু এসব সামান্য উদাহরণকে তুচ্ছ করেও সর্বোচ্চ যে দৃষ্টান্ত আপনারা অদ্যাবধি প্রত্যক্ষ করে আসছেন, সে কথাই যদি গণনা করেন, তবে দেখুন পরাশর-সত্যবতী তনয় মহাত্মা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন প্রকৃত অর্থে সংকরবর্ণ হওয়া সত্ত্বেও যে শুধু আর্যাবর্তের শ্রেষ্ঠ ক্ষমতাশালী ব্যক্তিত্ব তাই নয়, তিনি কিন্তু ব্রাহ্মণ সমাজেও মুনিশ্রেষ্ঠ। তিনি বিরূপ হলে উপস্থিত কোন কোন ক্ষত্রিয়পুত্র স্ব স্ব রাষ্ট্রে নির্দিষ্ট শাসন বজায় রাখতে সক্ষম হবেন সে বিষয়েও সকলে যদি কিছু চিন্তা করেন তবে এ আলোচনা প্রয়োজনানুগ হয়।
মহাশয়গণ, শাস্ত্র এবং শস্ত্র এই দ্বিবিধ উপায় অবলম্বনে বহুকালাবধি ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয়বর্ণীয়রা রাষ্ট্রিক ক্ষমতা, সামাজিক প্রতিপত্তি এবং জাগতিক সুখ সম্পদ ভোগাদি লব্ধ হয়ে আসছেন। ইতিপূর্বে সামান্য ইতিহাসচর্চার যতটুকু বর্ণনা করলাম, তার নিষ্কর্ষে আপনারা অবশ্যই অবগত হয়েছেন যে অজমীঢ়, কুরু ইত্যাদি জনেরা যেমন যাপিত জীবনে অভ্যস্ত ছিলেন আপনারা, বর্তমান নৃকুল সেইমতো জীবন যাপনে অভ্যস্ত নন। এই সভায় উপস্থিত কোনো রাজন্য গর্বভরে বলতে পারবেন যে তিনি স্বহস্তে হলকর্ষণ করেন? অথবা হলকর্ষণ যে এক মহৎ বৃত্তি এবং হলধরগণ যে অসামান্য সম্ভ্রান্ত তথা আদরণীয় সে কথা কোন কোন নৃপতি এক্ষণে স্ব-প্রজ্ঞায় গ্রাহ্য মনে করেন? আমি জানি এখানে এমন কোনো নরেশ উপস্থিত নেই, যিনি ক্ষেত্রকর্ষণ সম্পর্কীয় বিদ্যার সামান্যতম বিধিনিয়ম বিষয়েও প্রাজ্ঞ। উপস্থিত নৃ-বৃন্দ, আপনাদের মধ্যে কেউ কি জানেন, যে কী প্রকরণে ধান্যকৃত, গোধূম, মুগদ অথবা ইক্ষুদণ্ডাদির সৃজন হয়? আপনাদের বীজপুঙ্গবেরা কিন্তু এ বিষয়ে যথার্থ প্রাজ্ঞ ছিলেন। আপনারা কি আদৌ কোনোদিন চিন্তা করেছেন হলশীর্ষ এবং মৃত্তিকার পরস্পর সম্মিলনে এক অভাবনীয় রতিহর্ষের উদ্ভব হয়, যা একমাত্র হলধরেরই অনুভবে গ্রাহ্য, যা, অবরোধের সমগ্র কামিনীগণের সঙ্গে যথেচ্ছ রমণেও লভ্য নয়। আমি জানি, এই অনুভব আপনাদের নেই, থাকার কথাও নয়। উপস্থিত মহান নৃপতিবৃন্দ, কৃষিকর্ম এক মহৎ শাস্ত্র। তার অধ্যয়ন; অনুশীলন তথা সৎকার একজন প্রকৃত রাজার অবশ্যকর্তব্য। কিন্তু আপনারা সে বিষয়ে যেমন কিছুই জ্ঞাত নন, তেমনই এসব কর্মে আপনাদের রুচিও নেই। অথচ দেখুন, জনক, কুরু ইত্যাদি রাজন্যগণ, যাঁরা অদ্য রাজর্ষি বিধায় আদরণীয়, তাঁরা এই কর্মেই প্রধানত ঋদ্ধিবান, এরপর সেই ঋদ্ধির আত্মা থেকে উৎসারিত তাবৎ দর্শনাদির স্রষ্টা এবং গ্রাহক। কিন্তু বহুকাল বিগত হয়েছে, আপনারা আর এতদ্বিষয়ে স্বমেধা বা পেশির ব্যবহারে আগ্রহী হলেন না। আপনারা শাস্ত্র পরিহার করে শুধুমাত্র শস্ত্রের ব্যবহারী হলেন এবং অত্যন্ত তুচ্ছ কারণেও যুদ্ধকে আবশ্যকীয় তথা স্বধর্ম করে তুললেন। যুদ্ধই একটা পর্যায়ে ক্ষত্রিয়গণের স্বধর্ম বলে প্রতিষ্ঠিত হল। কিন্তু আমার বিচার এই যে, মূলত ক্ষত্রিয় রাজণ্যগণের স্বভাবধর্ম হওয়া উচিত ছিল কৃষিকর্ম। মহাত্মা বলদেব এই তত্ত্ব জ্ঞাত ছিলেন বলেই চিরকাল হলধর রাম হিসেবেই প্রতিষ্ঠাকামী ছিলেন। চক্রী অচ্যুতের চক্রের বিপরীতে তাঁর হলাগ্রকে মানবকল্যাণের ধ্বজা রূপে প্রচার করার নিমিত্ত সর্বদা এই হলচিহ্নটি বহন করতেন। আপনারা অবগত আছেন মহাত্মা পরম কৃষক পরম লোকহিতৈষক এবং পরম শান্তি বৎসল রাম, বিগত যুদ্ধকালে, তীর্থপর্যটনে বহির্গত হয়েছিলেন। আমার নিকট সংবাদ আছে যে মহাশয়, এই পর্যায়ে এমনকী তাঁর নিত্যপ্রিয় বারুণী পর্যন্ত গ্রহণে পরাঙ্মুখ ছিলেন। কিন্তু হায় যুদ্ধ রুদ্ধ না হলে, পরম উদার, পরম লোকবৎসল এবং পরম ন্যায়প্রিয় এই মহাত্মা যে কী পর্যন্ত সন্তাপে সন্তাপী হয়েছিলেন মদীয় প্রব্রজ্যাকালে শ্রীমৎ উদ্ধবের নিকট আমি তা সবিস্তারে জ্ঞাত হয়েছি।
এখন অবশ্য এসব বিষয়ের পর্যালোচনার কোনো বিশেষ মূল্য নেই। আপনারা, যাঁরা আর্যাবর্তের বর্তমান নরেশ তাঁরা যে, এর মূল্য অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন অথবা, এতদনুরূপ জীবনবীক্ষায় নিজেদের ঋদ্ধ করবেন এমত আকাঙ্খা দুরূহ। তথাপি এ প্রসঙ্গের অবতারণা এ কারণে যে যদি কোনো উপযুক্ত মেধাভাণ্ড এই তত্ত্ব গ্রহণ করে এবং তার অনুশীলনে যত্নশীল হয়, তবে সেটুকুই চরম লাভ বলে গণ্য করব।
মহাশয়গণ, এক্ষণে আমার বক্তব্য সমাপন করব। বর্তমান পরিস্থিতিতে হস্তিনাপুর এবং ইন্দ্রপ্রস্থ, এই দুই নগরী, শ্রীমান পরীক্ষিৎ এবং শ্রীমান বজ্রের নেতৃত্বের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁরা এখনও স্বাধীনভাবে এই মহতী রাজ্যদ্বয়ের শাসনক্রম পরিচালনার উপযুক্ত নন। ভবিষ্যতের গর্ভে কী নিহিত আছে আমরা কেউই তা জ্ঞাত নই। আমরা অর্থাৎ, পূর্বতন শাসক অমাত্যাদি, যাঁরা এখনও কিছু পরিমাণ কর্মক্ষম আছি; আমাদের আশু কর্তব্য হচ্ছে যুগানুযায়ী নির্বন্ধে এই কুমারদ্বয়ের প্রতিষ্ঠাকে সুদৃঢ়করণ। ধীমান যুযুৎসু এই উভয় নগরীর মহামন্ত্রক হিসেবে স্ব কর্তব্য পালন করবেন। ঋষিগণ কালানুযায়ী ধর্মের অনুশীলনে রাজা এবং প্রকৃতিপুঞ্জের কল্যাণে ব্রতী হবেন। এক্ষণে, সকলে যদি প্রকৃতিপুঞ্জের হিতৈষণায় সর্বপ্রকারে উদ্যোগী হন, তবেই পৃথিবী আবার আয়ুষ্মতী হবেন, প্রকৃতি মধুক্ষরা এবং মানবজীবন মধুময় হবে।
এভাবেই আমার বক্তব্য সমাপন করলাম। আরও কিছু আবশ্যকীয় বার্তা সভায় জ্ঞাপন করলাম, যে বার্তা ভবিষ্যতে রাজনৈতিক প্রয়োজনে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অন্তরে উপলব্ধি করলাম যে উপস্থিত ক্ষত্রিয়বর্গ আমার কথার যাথার্থ্য বিশেষ কিছুই নিবিড় চিত্তে গ্রহণ করলেন না। কালের নিয়ম বোধকরি এমনই। এই রাজকুল কালের প্রকোপে পতিত। এঁদের উদ্ধারের কোনো উপায় নেই। নতুন কোনো ব্যবস্থা হয়তো আসছে। কিন্তু বোধকরি সেকারণে আরও আগুন এবং বিষের, জল এবং শস্ত্রের তাণ্ডব ঘটবে। এইসব রাজন্যেরা ক্ষমতারূপ মদের নেশায় আরও হয়তো বহুকাল সাধারণের অভিসম্পাত আহরণ করবেন। এভাবেই একদিন যে তাঁরা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হবেন, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। আমার দীর্ঘ প্রব্রজ্যা এবং লোকায়ত জীবনবীক্ষায় আমি এসত্য নিশ্চয় করে জেনেছি যে কোনোকিছুই শাশ্বত নয়। প্রকৃতির বিষয়ে প্রাজ্ঞজনেরা জানেন যে অগ্নি যদি অকারণে প্রদাহী হয় তবে বায়ু বা পবন ক্ষুব্ধ হন, এবং পবনের ক্ষুব্ধতা জলাধীশ বরুণকে ক্রুদ্ধ করে। এসত্য আমরা প্রভাস বিপর্যয়ে সম্যক উপলব্ধি করেছি। যাদবগণ যখন গৃহযুদ্ধে উন্মত্ত হয়ে অগ্নির যথেষ্ট ব্যবহারে বিচারহীনতার পথ গ্রহণ করল, তখন জলাধীশ বরুণ সমুদ্রকে উচ্ছৃত করে তাবৎ দ্বারাবতীকে প্লবতায় মগ্ন করলেন। আর একথা কে না জানে যে অগ্নি এবং বরুণ পরস্পরের প্রতিস্পর্ধী? পবন যদিও অগ্নির অনুগামী, তথাচ বরুণের সঙ্গে তার প্রীতিবন্ধন সুপ্ত হলেও অবৈধ নয়। প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় অগ্নি, মরুৎ এবং বরুণ এভাবেই ক্রীড়াশীল। কিন্তু এই ক্রীড়া মানবসমাজের জন্য যে পীড়ার উদ্রেক করে তার নিমিত্ত মানব অভিচারই তো দায়িক। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে যেসব অনৈতিক অস্ত্র ব্যবহার হয়েছে, যে পরিমাণ আগ্নেয় ব্যবহারের সংঘটন ঘটেছে তার পরিণাম, তথা মৌষল ক্রমের যাবতীয় অভিচারের ফলশ্রুতিতে দ্বারকা যে জলমগ্ন হবে তা কিছু অসম্ভব নয়। বর্তমান হস্তিনাপুরখণ্ডে যে প্রাকৃতিক, সামাজিক তথা নৈতিক বিপর্যয় আমরা এখন প্রত্যক্ষ করছি তাও এইসব ভয়ানক শস্ত্রাভিচারের ফল বলেই আমি মনে করি।
শস্ত্রের কী অসীম ভয়াবহতা! সম্মুখসমরে যারা শস্ত্রাঘাতে নিহত হয়, তারা নাকি স্বর্গলাভ করে। কিন্তু যে শস্ত্র গর্ভস্থ শিশুকে পর্যন্ত নিপীড়িত করে, যে শস্ত্রের প্রকোপে প্রকৃতি কূপিতা হয়ে প্লাবতা ঘটান, সে শস্ত্রের ব্যবহারে কোন স্বার্থ সংরক্ষিত হতে পারে? আমি ভাবি, মানুষ যেন শস্ত্র বিষয়ে আর প্রজ্ঞানী না হয়। এক ব্যক্তি শত্রুতাবশত যে অন্য এক ব্যক্তিকে হত্যা করে তার অর্থ বুঝি। সকল মনুষ্য ক্রোধ পান করার মতো তপঃফলের অধিকারী নয়। কিন্তু সমষ্টি, গোষ্ঠী জাতি যদি একে অপরের প্রতি বিদ্বিষ্ট হয়ে ভবিষ্য প্রজন্মকেও আঘাত করে, এমনকী যদি প্রকৃতির জরায়ুতেও তারা বিষ বিস্তারে প্রয়াসী হয়, তবে ভবিষ্য সৃষ্টি প্রবহণের কীই-বা উপায় থাকে? মানুষ ক্রোধান্ধ স্বার্থান্ধ হয়ে এভাবে প্রকৃতি ধর্মের বিপর্যয়কে কেন অবশ্যম্ভাবী করবে? কিন্তু এ সন্তাপ শুধু আমি বা আমার ঔরস পুত্র যুধিষ্ঠির ব্যতিরেকে কাকেই বা দগ্ধ করে, আর কাকেই বা তা বোঝাতে পারব।
বর্তমান সভায় আগত রাজন্যকুল এ বিষয়ে কিছুমাত্র বোধের আধিকারিক বলে আমি মনে করি না। তাঁরা উত্তরাধিকারে রাজ্য লাভ করেছেন। প্রাচীন নৃ-কুলের মতো রাজ্য রাজত্ব কিছুই অর্জন বা আবাদ করেননি। তাঁরা ভোগবৃত্ত বিলাসের পরিক্রমায় কামনা, ক্রোধ, লোভ, মোহ, অসূয়া বা মাৎসর্যের চংক্রমণে সদাই ঘূর্ণিত। যে সত্য দর্শনে আমার এবং যুধিষ্ঠিরের নিয়ত অনিদ্রা, ক্লেশ, সন্তাপ এবং সমূহ বিপন্নতা বোধ, সেসবের দ্বারা এই নৃকুল কদাচ স্পর্শিত। সৃষ্টির সংরক্ষণের বিপন্নতাজনিত কিছুমাত্র অনুভব তাঁদের মেদস্ফীত মস্তিষ্ককে চঞ্চল করে না। এমনকী মনুষ্য সামগ্রিকভাবে, তার এত কালের সাধনায় যে মহৎ বোধি অর্জন করেছে, যা আমার পুত্র যুধিষ্ঠিরের জীবনচর্যায় নিয়ত ওতপ্রোত সেই বোধির নির্যাস, যথা ক্ষমা, করুণা বা সর্বপ্রাণীর প্রতি প্রগাঢ় হিতৈষণা ইত্যাদি বিষয়ে তাঁরা কিছুমাত্র শ্রদ্ধাশীল অথবা অনুরাগী নন। আমার এক্ষণে যে বোধ মস্তিষ্কে এবং হৃদয়ে ক্রিয়াশীল, তার প্রসাদে আমি মনে করি, মানুষ যদি সর্বান্তকরণে একজন প্রকৃত কৃষকের অনুভব হৃদয়ে গ্রথিত করতে না পারে, তবে এই বোধি তাকে কখনোই আশ্রয় করবে না। যে সালংকারা পৃথিবীকে আমরা কুরুক্ষেত্রে অথবা তৎপূর্ববর্তী অযুত যুদ্ধক্ষেত্রে নিষ্পেষিতা এবং ধর্ষিতা করেছি, তার প্রাক অবস্থার তারুণ্য আর কখনোই আমাদের লভ্য হবে না। মানুষের হৃদয় ক্রমশ এক লোভের রণক্ষেত্র থেকে অন্য লোভের রণক্ষেত্রে প্রধাবিত হতে থাকবে। উচ্চ-অপ-বর্ণ-বর্গ নির্বিশেষে এই লোভের অগ্নি প্রাকৃতিকভাবেই যেন যুদ্ধ, প্লবতা, মারী এবং অন্যান্য উৎসৃজনী অপশকুনের উদ্ভব ঘটাবে। মানুষ হয়তো এই প্রকৃতির প্রতিস্পর্ধী হয়ে, নানা প্রকার বৌদ্ধিক উপায় উদ্ভাবন করে এই ধ্বংসকে প্রতিহত করার প্রয়াস পাবে, কিন্তু আমার যেন বোধ হচ্ছে যে প্রকৃতিই অন্তিম কথা বলবে, মানুষ নয়। তাই, এই মৌল রিপুটি বিদূরিত করতে না পারলে শুদ্ধুমাত্র বৌদ্ধিক তথা উদ্ভাবনী কুশলতায় মানুষ কখনোই সামগ্রিক কল্যাণে স্থিত হবে না-এ সত্য আমার ধ্রুব বলেই মনে হয়। ফলত, একসময়ে সে নিশ্চয়ই এই কুরুক্ষেত্রের অন্তিম শব সৎকারের ক্রতুকৃতম্ শুনতেই থাকবে-
ওঁ ক্রতোঃ স্মর কৃতং স্মর।
ক্রতোঃ স্মর কৃতংস্মর।।
এবং এভাবেই আমাদের এই সুন্দর আনন্দময় গ্রহটি একদা নির্মানুষ, নিষ্প্রাণী, নিষ্পাদপ তথা নীরপঃ অর্থহীন এক বস্তুপিণ্ড হয়ে পড়ে থাকবে। তখন আবার কী অন্ধকার অন্ধকারের দ্বারা আচ্ছন্ন থাকবে? যা ছিল, তাও থাকবে না, যা নেই তাও থাকবে না। সৎও থাকবে না, অসৎও থাকবে না। তখন তাহলে কী শুধু অন্ধকারই অন্ধকারকে আবৃত করে থাকবে? আমি যেন কোনোকিছুই বিচারে আনতে পারছি না। জানতে পারছি না।
ইয়ং বিসৃষ্টিঃ কুত আবভূব?
জানতে পারছি না, বুঝতেও পারছি না-এই সৃষ্টি কোথায় যাবে তাহলে?
***
