বিপিনের সংসার – ২
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
১
রাত্রে বিপিনের ভালো ঘুম হইল না। মানীর সঙ্গে দেখা হওয়াতে তাহার মনের মধ্যে কেমন যেন সব গোলমাল হইয়া গিয়াছে। মানী তাহার সঙ্গে কথা বলিবার জন্যই জানালার ধারে দাঁড়াইয়া ছিল, তাহা হইলে সে আজও মনে রাখিয়াছে!
—তবে যে বলে, বিয়ে হলেই মেয়েরা সব ভুলে যায়?
বিপিনের পৌরুষগর্ব একটু তৃপ্ত হইয়াছে। মানী জমিদারের মেয়ে, সে গরিব, লেখাপড়া এমন কিছু জানে না, দেখিতেও খুব ভালো নয়, তবু তো মানী তাহারই সঙ্গে নির্জনে কথা বলিবার জন্য লুকাইয়া জানালায় দাঁড়াইয়া ছিল।
দুই-তিন দিনের মধ্যে মানীর সঙ্গে আর দেখা হইল না। অনাদিবাবু তাহাকে লইয়া হিসাবপত্র দেখিতে বসেন, রোকড় আজ দুই মাস লেখা হয় নাই, খতিয়ান তৈয়ারি নাই, মাসকাবারি হিসাবের তো কাগজই কাটা হয় নাই। খাইবার সময় বাড়ির মধ্যে যায়, খাইয়া আসিয়াই কাছারি বাড়িতে গিয়া জমিদারবাবুর সামনে বসিয়া কাজ করিতে হয়।
অনাদিবাবু লোক খারাপ নন, তবে গম্ভীর প্রকৃতির লোক, কথাবার্তা বেশি বলেন না। জমিদারির কাজ খুব ভালো বোঝেন, তিনি আসনে বসিয়া থাকিলে কাজে ফাঁকি দেওয়া শক্ত।
—বিপিন, গত মাসের প্রজাওয়ারী হিসেবটা একবার দেখি!
বিপিন ফাঁপরে পড়িল। সে-খাতায় গত তিন মাসের মধ্যে সে হাতই দেয় নাই।
—ও খাতা এখন তৈরি নেই।
—তৈরি নেই, তৈরি কর! কিস্তির আর দেরি কি, এখনও যদি তোমার সে হিসেব তৈরি না থাকে—
তারপরে আছে নানা ঝঞ্ঝাট। জেলেরা কোমড়-জাল ফেলিয়াছিল পুঁটিখালির বাঁওড়ে, বিপিনই জাল পিছু পাঁচ টাকা হিসাবে তাহাদের বন্দোবস্ত দিয়াছিল; আজ চার মাস হইয়া গেল, কেহ একটি পয়সা আদায় দেয় নাই। সেজন্যও জমিদারবাবুর কাছে কৈফিয়ৎ দিতে দিতে প্রাণ গেল।
আজই অনাদিবাবু বলিলেন, তুমি খেয়ে-দেয়ে বীরু হাড়িকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই একবার ঘোষপুরে যাও, আজ কিছু বেটাদের কাছ থেকে আনতেই হবে। মেয়ে-জামাই এখানে রয়েছে, খরচের অন্ত নেই। আজ অন্তত কুড়িটি টাকা নিয়ে এস।
এই রৌদ্রে খাইয়া উঠিয়াই ঘোষপুরে ছুটিতে হইবে! নায়েব গোমস্তা প্রজাবাড়ি তাগাদা করিতে দৌড়ায় কোনো জমিদারিতে! ইঁহাদের এখানে এমনই ব্যবস্থা। পাইক-পেয়াদার মধ্যে বীরু হাড়ি এক হইয়াও বহু এবং বহু হইয়াও এক। বাজে পয়সা খরচ ইঁহারা করিবেন না, সুতরাং আদায়ের অবস্থাও তথৈবচ।
সন্ধ্যার সময় ঘোষপুর হইতে সে ফিরিল।
জেলেদের পাড়ায় আজ দুই তিন মাস হইতে ঘোর ম্যালেরিয়া লাগিয়াছে। কেহ কাজে বাহির হইতে পারে নাই। কোমড়-জাল যেমন তেমনই জলে ফেলা রহিয়াছে। তবুও সে নিজে গিয়াছিল বলিয়া তাহার খাতিরে টাকা চারেক মাত্র আদায় হইয়াছে।
২
রাত্রে অনাদিবাবু ডাকিয়া পাঠাইলেন বাড়ির মধ্যে। গিন্নিও সেখানে ছিলেন।
—কত আদায় করলে বিপিন?
বিপিন মাথা চুলকাইতে চুলকাইতে বলিল, চার টাকা।
অনাদিবাবু গুড়গুড়ির নল ফেলিয়া তাকিয়া ছাড়িয়া সোজা হইয়া বসিলেন। চার টাকা মোটে! বল কি! এঃ, এর নাম আদায়? তবেই তুমি মহালের কাজ করেছ!
গিন্নি বলিয়া উঠিলেন, জেলেদের মহালে গেলে বাপু, এক-আধটা বড় মাছই না হয় নিয়ে এস। মেয়ে-জামাই এখানে রয়েছে, তা তোমার কি সে হুঁশ-পব্ব আছে? সেদিন বললাম ধোপাখালির হাট থেকে মাছ আনতে, না আড়াই সের এক কাৎলা মাছ পয়সা দিয়ে কিনে এনে হাজির!
বিপিনের ভয়ানক রাগ হইল। একবার ভাবিল, সে বলে, বেশ, এমন লোক রাখুন, যে প্রজা ঠেঙিয়ে বিনি পয়সায় মাছ আপনাদের এনে দিতে পারবে। আমি চললুম, আমার মাইনে যা বাকি পড়েছে আজই চুকিয়ে দিন। কিন্তু অনেক কষ্টে সামলাইয়া গেল। কেবল বলিল, মাছ কেউ এখন ধরছে না মাসিমা। সবাই মরছে ম্যালেরিয়ায়, মাছ ধরবার একটা লোকও নেই।…বিপিন সামলাইয়া গেল মানীর কথা মনে করিয়া। মানী এখানে থাকিতে তাহার বাপ-মায়ের সঙ্গে সে অপ্রীতিকর কিছু করিতে পারিবে না।
জমিদার-গিন্নি বলিলেন, আর বার-বাড়িতে যাচ্ছ কেন, একেবারে খেয়ে যাও!
ইহাদের বাড়িতে রাঁধুনী আছে—এক বৃদ্ধা বামুনের মেয়ে। সে রাত্রে চোখে দেখিতে পায় না বলিয়া গিন্নি নিজেই পরিবেশন করেন। জামাইবাবুও একসঙ্গেই বসিয়া খান, তবে তিনি নরলোকের সঙ্গে বড় একটা কথাবার্তা বলেন না। আজও বিপিন দেখিল, একই জায়গায় খাইতে বসিয়া জামাইয়ের পাতে পড়িল মিষ্টি পোলাও, তাহার পাতে দেওয়া হইল সাদা ভাত। তবে একসঙ্গে বসাইবার মানে কি? সেদিনও ঠিক এমন হইয়াছে সে জানে, ইঁহারা কৃপণের একশেষ, জামাইয়ের জন্য কোনো রকমে ক্ষুদ্র হাঁড়ির এক কোণে দুটি পোলাও রাঁধিয়াছেন, তাহা হইতে তাহাকে দিতে গেলে চলিবে কেন? তবু রোজ পোলাওয়ের ব্যবস্থা করিয়া বড়মানুষি দেখানো চাই। খাওয়ার পরে সে চলিয়া আসিতেছে বাহির-বাড়িতে, জানালায় মানী দাঁড়াইয়া তাহাকে ডাকিল, ও বিপিনদা!
—এই যে মানী, কদিন দেখি নি!
—তুমি কখন যাও, কখন খাও, তোমার নিজেরই হিসেব আছে? আজ পোলাও কেমন খেলে?
—বেশ।
—না, সত্যি বল না। ভালো হয়েছিল?
—কেন বল তো?
—আগে বল না, কেমন হয়েছিল?
—বললুম তো, বেশ হয়েছিল।
—আমি রেঁধেছি। তুমি মিষ্টি পোলাও খেতে ভালোবাসতে, মনে আছে?
—খুব মনে আছে। আচ্ছা, আমি যাই মানী, রাত হয়ে গেল খুব।
মানী একটু ইতস্তত করিয়া বলিল, মা তোমাকে পেটভরে খেতে দিয়েছিল তো পোলাও? আমি ওখানে যেতাম, কিন্তু—
বিপিন বুঝিতে পারিল, মানীর স্বামীও সেখানে, এ অবস্থায় মায়ের সামনে পল্লীগ্রামের রীতি অনুসারে মানীর যাওয়াটা অশোভন।
—হ্যাঁ, সে সব ঠিক হয়েছিল—আমি যাই।
মানী বুদ্ধিমতী মেয়ে। মায়ের হাত সে খুব ভালো রকমই জানে, জানে বলিয়াই সে এ প্রশ্ন বিপিনকে করিল। কিন্তু বিপিনের উড়ু-উড়ু ভাব দেখিয়া সে একটু বিস্মিত না হইয়া পারিল না। বিপিনদা তো কখনও তাহার সঙ্গে কথা বলিবার সময় এমন যাই-যাই করে না! হয়তো ঘুম পাইয়াছে, রাত কম হয় নাই বটে!
ইহার পর দুই দিন সে জমিদারবাবুর হুকুমে জেলেদের খাজনার তাগাদা করিতে ঘোষপুর গিয়া রহিল। ওখানকার মাতব্বর প্রজা রাইচরণ ঘোষের চণ্ডীমণ্ডপে ইহার পূর্বেও সে কিস্তির সময় কয়েকদিন ছিল। নিজেই রাঁধিয়া খাইতে হয়, তবে আদর-যত্ন যথেষ্ট। সঙ্গতিপন্ন গোয়ালবাড়ি, দুধ-দই ঘিয়ের অভাব নাই। জমিদারের ব্রাহ্মণ নায়েব বাড়িতে অতিথি, বাড়ির সকলে হাতজোড়, তটস্থ।
কিন্তু বিপিন মনে মনে ভাবে, এতে কি জমিদারের মান থাকে? এমন হয়েছেন আমাদের জমিদার, যে একখানা কাছারি-ঘর করবেন না! অথচ এই মহালে সালিয়ানা আড়াই হাজার টাকা আদায়। একখানা দো-চালা ঘর তুলে রাখলেও তো হয়; কিন্তু তাতে যে পয়সা খরচ হয়ে যাবে! ওরে বাবা রে!
তিন দিনের দিন রাত্রে বিপিন জমিদার-বাড়ি ফিরিল। যাহা আদায়-পত্র হইয়াছে অনাদিবাবুকে তাহার হিসাব বুঝাইয়া দিয়া একটু বেশি রাত্রে বাড়ির ভিতর হইতে খাইয়া ফিরিতেছে, জানালায় দাঁড়াইয়া মানী ডাকিল, বিপিনদা!
—এই যে মানী, কেমন? তোর নাকি মাথা ধরেছিল শুনলুম, মাসিমার মুখে?
মানী সে কথার কোনো উত্তর দিল না। বলিল, দাঁড়াও, একটা কথা বলি।
—কি রে?
—তুমি সেদিন মিথ্যে কেন বলে গেলে আমার কাছে? তুমি পোলাও খেয়েছিলে সেদিন?
মেয়েমানুষ তুচ্ছ কথা এতও মনে করিয়া রাখিতে পারে! বাসী কাসুন্দি ঘাঁটা ওদের স্বভাব! দুই দিনের আদায়পত্রের ভিড়ের মধ্যে, কাছারির কাজের চাপে তাহার কি মনে আছে, সেদিন কি খাইয়াছিল, না খাইয়াছিল! মানীর যেমন পাগলামি!
বিপিন মৃদু হাসিয়া বলিল, কেন, খাই নি, তাতে কি?
মানী বিপিনের কথার সুরে কৌতুকের আভাস পাইয়া ঝাঁঝালো সুরে বলিয়া উঠিল, তাতে কিছু না, কিন্তু তুমি মিথ্যে কথা কেন বলে গেলে? বললেই হত, খাই নি? আমি তোমায় ফাঁসি দিতাম?
বিপিন পুনরায় মৃদু হাসিমুখে বলিল, সেইটেই কি ভালো হত? তোর মনে কষ্ট দেওয়া হত না?
মানী সে কথার কোনো উত্তর না দিয়া জানালা হইতে সরিয়া গেল।
বিপিন হতবুদ্ধির মতো কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া বলিল, ও মানী, রাগ করবার কি আছে এতে! শোন না, ও মানী!
কোনো সাড়াশব্দ না পাইয়া বিপিন বাহির-বাড়ির দিকে চলিল। মনে মনে ভাবিতে ভাবিতে চলিল, মেয়েমানুষ সব সমান—যেমন মনোরমা, তেমনিই মানী। আচ্ছা কি করলাম, বল তো? দোষটা কি আমার?
মনে মনে, কি জানি কেন, বিপিন কিন্তু শান্তি পাইল না। মানীটা কেন যে তাহার উপর রাগ করিল? করাই বা যায় কি? মানীর তাহার প্রতি এতটা টান, তাহা বিপিন কি জানিত? জানিয়া মনে মনে যেমন একটু বিস্মিতও হইল, সঙ্গে সঙ্গে খুশি না হইয়াও পারিল না।
৩
পরের দিন সকালে বিপিন বাড়ির মধ্যে খাইতে বসিয়াছে, জমিদার-গিন্নি আসিয়া বলিলেন, হ্যাঁ বাবা বিপিন, সেদিন আমি তোমাকে কি পোলাও দিই নি?
বিপিন আকাশ হইতে পড়িয়া বলিল, কোন দিন?
—সেই যেদিন রাত্রে তুমি আর সুধাংশু একসঙ্গে খেলে?
—কেন বলুন তো?
—মেয়ে তো আমায় খেয়ে ফেলছে কাল থেকে, একসঙ্গে খেতে বসেছিলে দুজনে, তোমায় পোলাও দিই নি কেন, তাই নিয়ে। তোমায় কি পোলাও দিই নি, বল তো বাবা?
—কেন দেবেন না? আমার তো মনে হচ্ছে, আপনি দু হাতা, আমার ঠিক মনে হচ্ছে না মাসিমা, একমনে খেয়ে যাই, কত কাজ মাথায়, অতশত কি মনে থাকে? কিন্তু আপনি যেন দু হাতা কি তিন হাতা—
জমিদার-গৃহিণী রান্নাঘরের দোরের কাছে সরিয়া গিয়া ঘরের ভিতর কাহার দিকে চাহিয়া বলিয়া উঠিলেন, ঐ শোন, নিজের কানে শোন। ও খেয়ে তো মিথ্যে কথা বলবে না। কার মুখে কি শুনিস, আর তোর অমনিই মহাভারতের মতো বিশ্বাস হয়ে গেল। আর এত লাগানি-ভাঙানিও এ বাড়িতে হয়েছে! এ রকম করলে সংসার করি কি করে?
সেদিন রাত্রে খাইবার সময় বিপিন সবিস্ময়ে দেখিল, ভাতের পরিবর্তে মিষ্টি পোলাও পাতে দেওয়া হইয়াছে। ভোজনের আয়োজনও প্রচুর। এবেলা জামাই সঙ্গেই খাইতে বসিয়াছে, বিপিন কোনো কিছু জিজ্ঞাসা করা সঙ্গত মনে করিল না। তাহার ইহাও মনে হইল, জমিদার-গৃহিণী যে ওবেলা মানীর রাগের কথা তুলিয়াছিলেন, সে কেবল সেখানে জামাই ছিল না বলিয়াই।
জামাই প্রতিদিনই আগে খাইয়া দোতলায় চলিয়া যায়। বিপিন একটু ধীরে ধীরে খায় বলিয়া রোজই তাহার দেরি হয় খাইতে। বিপিন খাওয়া শেষ করিয়া বহির্বাটিতে যাইবার সময় দেখিল, মানী তাহারই অপেক্ষায় যেন জানালার ধারে দাঁড়াইয়া আছে। তাহাকে দেখিয়া হাসিমুখে বলিল, কেমন হল, বিপিনদা?
—চমৎকার হয়েছে। সত্যি, সুন্দর পোলাও হয়েছিল! খুব খাওয়া গেল! কে রেঁধেছিল, তুই?
মানী মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিল, বল না, কে?
—তুই।
—ঠিক ধরেছ। তা হলে আজ খুশি তো? মনে কোনো কষ্ট থাকে তো বল।
—খুশি বইকি, সেদিন যে কাঁদতে কাঁদতে যাচ্ছিলুম পোলাও না খেতে পেয়ে—তবে কষ্ট একটা আছে।
—কি, বল না?
—কাল তুই অত রাগ করলি কেন আমার ওপরে হঠাৎ? আমার কি দোষ ছিল?
মানী স্থিরদৃষ্টিতে বিপিনের দিকে চাহিয়া বলিল, বলব? বলতাম না, কিন্তু যখন বলতে বললে, তখন বলি। আমার কাছে কখনও কোনো কথা গোপন করতে না বিপিনদা, মনে ভেবে দেখ। বাবার হাত-বাক্স থেকে চাকু-ছুরি পড়ে গিয়েছিল, তুমি কুড়িয়ে পেয়ে কাউকে বল নি, শুধু আমায় বলেছিলে, মনে আছে?
—উঃ, সে কতকালের কথা! তোর মনে আছে এখনও!
মানী সে কথার কোনো উত্তর না দিয়া বলিয়াই চলিল, সেই তুমি জীবনে এই প্রথম আমার কাছে কথা গোপন করলে! এতে আমায় যে কত কষ্ট দিলে তা বুঝতে পার? তুমি দূরে রেখে চলতে পারলে যেন বাঁচ!
—ভুল কথা মানী। সেজন্যে নয়, কথাটা তোমার মার বিরুদ্ধে বলা হত নয় কি? ছেলেমানুষি করো না, অন্য কথা গোপনে আর এ কথা গোপনে তফাৎ নেই?
মানী হাসিমুখে কৃত্রিম বিদ্রূপের সুরে বলিল, বেশ গো ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির, বেশ! এখন যা বলি, তাই শোন।
এই সময়ে ভেতরের রোয়াকে জমিদার-গৃহিণীর সাড়া পাইয়া বিপিন চট করিয়া জানালার ধার হইতে সরিয়া গেল।
৪
পরদিনই বিপিনকে ধোপাখালির কাছারিতে ফিরিতে হইল।
আজকাল বেশ লাগে পলাশপুরে জমিদার-বাড়ি থাকিতে, বিশেষত মানীর সঙ্গে পুনরায় আলাপ জমিবার পর হইতে সত্যই বেশ লাগে।
কিন্তু সেখানে বসিয়া থাকিবার জন্য অনাদি চৌধুরী তাহাকে মাহিনা দিয়া নায়েব নিযুক্ত করেন নাই।
সমস্ত দিন মহালের কাজে টো টো করিয়া ঘুরিয়া সন্ধ্যাবেলা বিপিন কাছারি ফিরিয়া একা বসিয়া থাকে। ভারী নির্জন বোধ হয় এই সময়টা। পৃথিবীতে যেন কেহ কোথাও নাই। কাছারির ভৃত্যটি রান্নার যোগাড় করিতে বাহির হয়, কাঠ কাটে, কখনও বা দোকানে তেল-নুন কিনিতে যায়। সুতরাং বিপিনকে থাকিতে হয় একেবারে একা।
এই সময় আজকাল মানীর কথা অত্যন্ত মনে হয়।
সেদিন পোলাও খাওয়ানোর পর হইতেই বিপিন মানীর কথা ভাবে। এমন একদিন ছিল, যখন মানী ছিল তাহার খেলার সাথী। সে কিন্তু অনেক দিনের কথা। যৌবনের প্রথমে বদখেয়ালের ঝোঁকে অন্ধকার রাত্রে পথের ধারে ঘাসের উপর অর্ধচেতন অবস্থায় শুইয়া মানীর মুখ কতবার মনে পড়িত।
আর একবার মনে পড়িয়াছিল বিবাহের দিন। উঃ, বড় বেশি মনে পড়িয়াছিল। নববধূর মুখ দেখিয়া বিপিন ভাবিয়াছিল, মানীর মুখের কাছে এর মুখ! কিসের সঙ্গে কি!
এ কথা সত্য, মানীর ষোল বছরের সে লাবণ্যভরা মুখশ্রী আর নাই। এবার কয়েকদিন পরে মানীকে দেখিয়া বুঝিল যে মেয়েদের মুখে পরিবর্তন যত শীঘ্র আসে, বয়স তাহার বিজয়-অভিযানের দৃপ্ত রথচক্ররেখা যত শীঘ্র আঁকিয়া রাখিয়া যায় মেয়েদের মুখে, পুরুষদের মুখে তত শীঘ্র পারে না।
কিন্তু তাহাতে কিছু আসে যায় না, সেই মানী তো বটে।
বিপিন ভালোই জানিত, জমিদারের মেয়ে মানীর সঙ্গে তাহার বিবাহ হইতে পারে না, সে জিনিসটা সম্পূর্ণ অসম্ভব; তবুও মানীর বিবাহের সংবাদে সে যেন কেমন নিরাশ হইয়া পড়িয়াছিল, আজও তাহা মনে আছে।
তখন বিপিনের বাবা বাঁচিয়া ছিলেন। মনিবের মেয়ের বিবাহের জন্য তিনি গ্রামের গোয়ালাপাড়া হইতে ঘি কিনিয়া টিনে ভর্তি করিতেছিলেন। গাওয়া ঘি বিপিনদের গ্রামে খুব সস্তা, এজন্য অনাদিবাবু নায়েবকে ঘি যোগাড় করিবার ভার দিয়াছিলেন। বিবাহের পূর্বদিন বৈকালের ট্রেনে বিপিনের বাবা তিন টিন গাওয়া ঘি, তিন টিন ঘানি-ভাঙা সরিষার তৈল, তরিতরকারি, কয়েক হাঁড়ি দই লইয়া জমিদার-বাড়ি রওনা হইলেন। বিপিন কিছুতেই যাইতে চাহিল না দেখিয়া তাহার বাবা ও মা কিছু আশ্চর্য হইয়াছিলেন। বিপিন তখন গ্রামের মাইনর স্কুলে তৃতীয় পণ্ডিতের পদে সবে ঢুকিয়াছে, মাত্র কুড়ি বছর বয়স।
তারপর সব একরকম চুকিয়া গিয়াছিল। আজ সাত বছর আর মানীর সঙ্গে তাহার দেখাশুনা হয় নাই। তারপর কত কি পরিবর্তন ঘটিয়া গেল তাহার নিজের জীবনে। তাহার বাবা মারা গেলেন, কুসঙ্গে পড়িয়া সে কি বদখেয়ালিটাই না করিল! বাবার সঞ্চিত কাঁচা পয়সা হাতে পাইয়া দিনকতক সে ধরাকে সরা দেখিয়া বেড়াইতে লাগিল। তারপর তাহার নিজের বিবাহ হইল, বিবাহের বছরখানেক পরে বিপিন হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করিল যে সে সম্পূর্ণরূপে নিঃস্ব, না আছে হাতে পয়সা, না আছে তেমন কিছু জমিজমা। সে কি ভয়ানক অভাব-অনটনের দিন আসিল তারপরে!
সচ্ছল গৃহস্থের ছেলে বিপিন, তেমন অভাব কখনও কল্পনা করে নাই। ধাক্কা খাইয়া বিপিন প্রথম বুঝিল যে, সংসারে একটি টাকা খরচ করা যত সহজ, সেই টাকাটি উপার্জন করা তত সহজ নয়। টাকা যেখানে-সেখানে পড়িয়া নাই, আয় করিয়া তবে ঘরে আনিতে হয়।
কিছুকাল কষ্টভোগের পর বিপিন প্রতিবেশীদের পরামর্শে বাবার পুরনো চাকুরিস্থলে গিয়া উমেদার হইল। অনাদিবাবু বিপিনের বাবাকে যথেষ্ট ভালোবাসিতেন, এক কথায় বিপিনকে চাকুরি দিলেন।
আজ প্রায় এক বছরের উপর বিপিন এখানে চাকুরি করিতেছে। কিন্তু তাহার এ চাকুরি আদৌ ভালো লাগে না। যত দিন যাইতেছে, ততই বিপিনের বিতৃষ্ণা বাড়িতেছে চাকুরির উপর। ইহার অনেক কারণ আছে,—প্রথম ও প্রধান কারণ, অনাদিবাবু ও তাঁহার স্ত্রীর টাকার তাগাদায় তাহার রাত্রে ঘুম হয় না। রোজ টাকা আদায় হয় না—ছোট জমিদারি, তেমন কিছু আয়ের সম্পত্তি নয়, অথচ তাঁহাদের প্রতিদিনের বাজার খরচের জন্যও নায়েবকে টাকা পাঠাইতে হইবে। কেবল টাকা পাঠাও, টাকা পাঠাও—এই বুলি।
রাত্রে ঘুমাইয়া সুখ হয় না, কাল সকালেই অনাদিবাবুর চিরকুট লইয়া বীরু হাড়ি পলাশপুর হইতে আসিয়া হাজির হইবে। খাইয়া ভাত হজম হয় না উদ্বেগে।
আর একটি কারণ, ধোপাখালির এই কাছারিতে একা বারো মাস থাকা তাহার পক্ষে ভীষণ কষ্টকর।
বিপিন এখনও যুবক, চার-পাঁচ বছর আগেও সে বাপের পয়সা হাতে পাইয়া যথেষ্ট স্ফূর্তি করিয়াছে, সে আমোদের রেশ এখনও মন হইতে যায় নাই। বন্ধুবান্ধব লইয়া আড্ডা দেওয়ার সুখ সে ভালোই বোঝে, যদিও পয়সার অভাবে আজ অনেক দিন হইল সে সব বন্ধ আছে, তবুও গল্পগুজব করিতেও তো মন চায়, তাহাতে তো পয়সা লাগে না। বাড়িতে থাকিতে বাড়িতেই দুই বেলা কত লোক আসিত, গল্প করিত। এই দুরবস্থার উপরও বিপিন তাহাদিগকে চা খাওয়ায়, তামাক খাওয়ায়, বন্ধুবান্ধবদের পান খাওয়ানোর জন্য প্রতি হাটে তাহার এক গোছ পান লাগে। অত পান সাজিতে হয় বলিয়া মনোরমা কত বিরক্তি প্রকাশ করে; কিন্তু বিপিন মানুষ-জনের যাতায়াত বড় ভালোবাসে, তাহাদের আদর-আপ্যায়ন করিতে ভালোবাসে। দুরবস্থায় পড়িলেও তাহার নজর ছোট হয় নাই, জমিদারবাবু ও তাঁহার গৃহিণীর মতো।
ধোপাখালি গ্রামে ভদ্রলোকের বাস নাই, যত মুচি, গোয়ালা, জেলে প্রভৃতি লইয়া কারবার। তাহাদের সঙ্গে যতক্ষণ কাজ থাকে, ততক্ষণই ভালো লাগে। কাজ ফুরাইয়া গেলে তাহাদের সঙ্গ বিপিনের আর এতটুকুও সহ্য হয় না। অথচ একা থাকাও তাহার অভ্যাস নাই। নির্জন কাছারি-ঘরে সন্ধ্যাবেলা একা বসিয়া থাকিতে মন হাঁপাইয়া উঠে। এমন একটা লোক নাই, যাহার সঙ্গে একটু গল্প-গুজব করা যায়। আজকাল এই সময়ে মানীর কথাই বেশি করিয়া মনে পড়ে। কাছারির চাকর ছোকরা ফিরিয়া আসে, কোনো কোনো দিন তাহার সঙ্গে সামান্য একটু গল্প-গুজব হয়। তারপর সে রান্নার যোগাড় করিয়া দেয়, বিপিন রাঁধিতে বসে। কাছারির বাদাম গাছটার পাতায় বাতাস লাগিয়া কেমন একটা শব্দ হয়, ঝোপে-ঝাড়ে জোনাকি জ্বলে, জেলে-পাড়ার গদাধর পাড়ুইয়ের বাড়িতে রোজ রাত্রে পাড়ার লোক জুটিয়া হরিনাম করে, তাহাদের খোল-করতালের আওয়াজ পাওয়া যায়, ততক্ষণ রান্না-বাড়া সারিয়া বিপিন খাইতে বসে।
৫
এক-একদিন এই সময় হঠাৎ কামিনী আসিয়া উপস্থিত হয়। হাতে একবাটি দুধ। রান্নাঘরে উঁকি মারিয়া বলে, খেতে বসলে নাকি বাবা?
—এস মাসি, এস। এই সবে বসলাম খেতে।
—এই একটু দুধ আনলাম। ওরে শম্ভু, বাবুকে বাটিটা এগিয়ে দে দিকি। আমি আর রান্নাঘরের ভেতর যাব না।
—না, কেন আসবে না মাসি? এস তুমি। বস এখানে, খেতে খেতে গল্প করি।
কামিনী কিন্তু দরজার চৌকাঠ পার হইয়া আর বেশি দূর এগোয় না। সেখান হইতে গলা বাড়াইয়া বিপিনের ভাতের থালার দিকে চাহিয়া দেখিবার চেষ্টা করিয়া বলে, কি রাঁধলে আজ এবেলা?
—আলুভাতে, আর ওবেলার মাছ ছিল।
—ওই দিয়ে কি মানুষ খেতে পারে? না খেয়ে খেয়ে তোমার শরীর ওইরকম রোগাকাঠি! একটু ভালো না খেলে-দেলে শরীর সারবে কেমন করে? তোমার বাবার আমলে দুধ-ঘিয়ের সোত বয়ে গিয়েছে কাছারিতে। এই বড় বড় মাছ! তরিতরকারির তো কথাই—
বিপিন জানে, কামিনী মাসি বাবার কথা একবার উঠাইবেই কথাবার্তার মাঝখানে। সে কথা না উঠাইয়া বুড়ি যেন পারে না। সময়ের স্রোত বিনোদ চাটুজ্জে নায়েবের পর হইতেই বন্ধ হইয়া স্থির হইয়া দাঁড়াইয়া গিয়াছে, কামিনী মাসির পক্ষে তাহা আর এতটুকু অগ্রসর হয় নাই।
পৃথিবী নবীন ছিল, জীবনে আনন্দ ছিল, আকাশ-বাতাসের রং অন্য রকমই ছিল। দুধ ঘি অপর্যাপ্ত ছিল, কাছারির দাপট ছিল, ধোপাখালিতে সত্যযুগ ছিল—ঁবিনোদ চাটুজ্জে নায়েবের আমলে।
সেসব দিন আর কেহ ফিরাইয়া আনিতে পারিবে না। বিনোদ চাটুজ্জের সঙ্গে সঙ্গে সব শেষ হইয়া গিয়াছে।
ভোজনের উপকরণের স্বল্পতার জন্য কামিনী মাসির অনুযোগ এক প্রকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। তাহা ছাড়া, কামিনী মাসি প্রায়ই দুধটুকু, ঘিটুকু, কোনো দিন বা এক ছড়া পাকা কলা খাইবার সময় লইয়া হাজির হইবেই।
খানিকটা আপনমনে পুরনো আমলের কাহিনীর বর্ণনা করিয়া বৃদ্ধা উঠিয়া চলিয়া যায়। সে বর্ণনা প্রায় প্রত্যহ সন্ধ্যায় বিপিন শুনিয়া আসিতেছে আজ এক বছর। তবুও আবার শুনিতে হয়, তাহারই পরলোকগত পিতার সম্বন্ধে কথা, না শুনিয়া উপায় কি?
