বিপিনের সংসার – ৩
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
১
দিন দশেক পরে বিপিন বাড়ি হইতে স্ত্রীর চিঠি পাইয়া জানিল, তাহার ভাই বলাই রানাঘাট হাসপাতালে আর থাকিতে চাহিতেছে না। বউদিদিকে অনবরত চিঠি লিখিতেছে, দাদাকে বলো বউদিদি, আমায় এখান থেকে বাড়ি নিয়ে যেতে। আমার অসুখ সেরে গিয়েছে, আর এখানে থাকতে ভালো লাগে না।
স্ত্রীর চিঠি পাইয়া বিপিন খুব খুশি হইল না। ইহাতে শুধু কয়েকটি মাত্র সাংসারিক কাজের কথা ছাড়া আর কিছুই নাই। এমন কিছু বেশি দিন তাহাদের বিবাহ হয় নাই যে, দুই একটি ভালোবাসার কথা চিঠিতে সে স্ত্রীর নিকট হইতে আশা করিতে পারে না।
আজ বলিয়াই বা কেন, মনোরমা কবেই বা চিঠিতে মধু ঢালিয়াছিল? অবশ্য এ কথা খানিকটা সত্য যে, এতদিন সে বাড়িতেই ছিল, মনোরমার কোনো প্রয়োজন ঘটে নাই তাহাকে চিঠি লিখিবার। তবুও তো সে এক বৎসর পলাশপুরে চাকুরি করিতেছে, তাহার এই প্রথম স্ত্রীর নিকট হইতে দূরে বিদেশে প্রবাসযাপন, অন্য অন্য স্ত্রীরা কি তাহাদের স্বামীদের নিকট এ অবস্থায় এই রকম কাঠখোট্টা চিঠি লেখে?
বিপিন জানে না, এ অবস্থায় স্ত্রীরা স্বামীদের কি রকম চিঠি লেখে। কিন্তু তাহার বিশ্বাস, বিরহিণী স্ত্রীরা বিরহবেদনায় অস্থির হইয়া প্রবাসী স্বামীদের নিকট কত রকমে তাহাদের মনের ব্যথা জানায়, বার বার মাথার দিব্য দিয়া বাড়ি আসিতে অনুরোধ করে। নাটক-নভেলে সে এইরূপ পড়িয়াছেও বটে। প্রথম কথা, মনোরমা তাহাকে চিঠিই কয়খানা লিখিয়াছে এক বছরের মধ্যে? পাঁচ-ছয়খানার বেশি নয়। অবশ্য তাহার একটা কারণ বিপিন জানে, সংসারে পয়সার অনটন। একখানা খামের দাম চার পয়সা, সংসারের খরচ বাঁচাইয়া জোটানো মনোরমার পক্ষে সহজ নয়। সে যাক, কিন্তু সেই চার-পাঁচখানা চিঠিতেও কি দুই একটা ভালো কথা লেখা চলিত না? মনোরমার চিঠি আসে, টাকা পাঠাও, চাল নাই, তেল নাই, অমুকের কাপড় নাই, তুমি কেমন আছ, আমরা ভালো আছি। কখনও এ কথা থাকে না, একবার বাড়ি এস, তোমাকে অনেকদিন দেখি নাই, দেখিতে ইচ্ছা করে।
বিপিন চিঠি পাইয়া বাড়ি যাইবার উদ্যোগ করিতে লাগিল, স্ত্রীকে দেখিবার জন্য নয়, বলাইকে হাসপাতাল হইতে বাড়ি লইয়া যাইবার জন্য। ছোট ভাইটিকে সে বড় ভালোবাসে। রানাঘাটের হাসপাতালে পড়িয়া থাকিতে তাহার কষ্ট হইতেছে, বাড়ি যাইতে চায়, ভরসা করিয়া দাদাকে লিখিতে পারে নাই, পাছে দাদা বকে। তাহাকে বাড়ি লইয়া যাইতেই হইবে। সে পলাশপুর রওনা হইল।
তিন দিনের ছুটি চাহিতেই জমিদারবাবু বলিলেন, এই তো সেদিন এলে হে বাড়ি থেকে, আবার এখুনি বাড়ি কেন?
বিপিন জমিদারকে সমীহ করিয়া স্ত্রীর চিঠির কথা পূর্বে বলে নাই, এখন বলিল। ভাইকে হাসপাতাল হইতে লইয়া যাইবার কথাও বলিল।
অনাদিবাবু অপ্রসন্ন মুখে বলিলেন, যাও, কিন্তু তুমি বাড়ি গেলে আর আসতে চাও না। জামাই চলে গিয়েছেন, মানী এখানে রয়েছে, সামনের শনিবারে আবার জামাই আসবেন। রোজ দু-তিন টাকা খরচ। তুমি মহাল থেকে চলে এলে আদায়-পত্তর হবে না, আমি পড়ে যাব বিষম বিপদে; তিন দিনের বেশি আর এক দিনও যেন না হয়, বলে দিলাম।
মানীর সঙ্গে দেখা করিবার প্রবল ইচ্ছা সত্বেও বিপিন দেখিল, তাহা একরূপ অসম্ভব। সে থাকে বাড়ির মধ্যে, তাহাকে ডাকিয়া দেখা করিতে গেলে হয়তো মানীর মা সেটা পছন্দ করিবেন না।
যাইবার পূর্বমুহূর্তে কিন্তু বিপিন ইচ্ছাটা কিছুতেই দমন করিতে পারিল না। একটিমাত্র ছুতা ছিল, বিপিন সেইটাই অবলম্বন করিল। সে যাইবার পূর্বে একবার জমিদার-গৃহিণীর নিকট বিদায় লইতে গেল।
—ও মাসিমা, কোথায় গেলেন, ও মাসিমা?
ঝি বলিল, মা ওপরে পুজোয় বসেছেন, দেরি হবে নামতে, এই বসলেন।
বিপিন একবার ভাবিয়া একটু ইতস্তত করিয়া বলিল, তাই তো! বসবার তো সময় নেই! রানাঘাট হাসপাতালে যেতে হবে! একটা কথা ছিল, আচ্ছা আর কেউ আছে? কথাটা না হয় বলে যেতাম!
—দিদিমণিকে ডেকে দোব? দিদিমণি রান্না-বাড়িতে রয়েছে, দেখব?
—তা মন্দ নয়। তাই না হয় দাও, কথাটা বলেই যাই।
ঝি বাড়ির ভিতরে চলিয়া গেল এবং একটু পরে মানী বাহিরের রোয়াকে আসিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, এই যে বিপিনদা! কখন এলে?
—এসেছি ঘণ্টা দুই হল। কর্তার কাছে কাজ ছিল, আমি তিন দিনের ছুটি নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি।
ঝি তখনও রোয়াকে দাঁড়াইয়া আছে দেখিয়া মানী বলিল, যা তো হিমি, ওপরে আমার ঘর থেকে কর্পূরের শিশিটা নিয়ে বামুন-ঠাকরুণকে রান্নাঘরে দিয়ে আয়।
ঝি চলিয়া গেল।
মানী বিপিনের দিকে চাহিয়া বলিল, দু’ঘণ্টা এসেছ বাইরে? কই, আমি তো শুনি নি! চা খেয়েছ?
—না।
—তুমি কখন যাবে? কেন, এখন হঠাৎ বাড়ি যাচ্ছ যে?
বিপিন এদিক ওদিক চাহিয়া নিম্নকণ্ঠে বলিল, সে কৈফিয়ৎ তোমার বাবার কাছে দিতে হয়েছে একদফা, তোমার কাছেও আবার দিতে হবে নাকি!
—নিশ্চয় দিতে হবে। আমি তো জমিদারের মেয়ে, দেবে না কেন?
—তবে দিচ্ছি। আমার ভাই বলাইকে তোর মনে আছে? সে একবার কেবল বাবার সঙ্গে এখানে এসেছিল, তখন সে ছেলেমানুষ। সে রানাঘাট হাসপাতালে—
তারপর বিপিন সংক্ষেপে বলাইয়ের অসুখের ব্যাপারটা বলিয়া গেল।
মানী বলিল, চা খেয়ে যাও। বস, আমি করে আনি।
বিপিন রাজি হইল না। বলিল, থাক মানী, আমায় অনেকটা পথ যেতে হবে এই অবেলায়। একটা কথা জিজ্ঞেস করি—যদি আমার আসতে দু-এক দিন দেরি হয়, কর্তাবাবুকে বলে ছুটি মঞ্জুর করিয়ে দিতে পারবি?
মানী বরাভয় দানের ভঙ্গিতে হাত তুলিয়া চাপা হাসিমুখে কৃত্রিম গাম্ভীর্যের সুরে বলিল, নির্ভয়ে চলে যাও, বিপিনদা। অভয় দিচ্ছি, দিন তিনের জায়গায় সাত দিন থেকে এস। বাবাকে শান্ত করবার ভার আমার ওপর রইল।
বিপিন হাসিয়া বলিল, বেশ, বাঁচলাম। দেবী যখন অভয় দিলে, তখন আর কাকে ডরাই! চলি তবে।
—না, একটু দাঁড়াও। কিছু না খেয়ে যেতে পারবে না। কোন সকালে ধোপাখালি থেকে খেয়ে বেরিয়েছ, একটু জল খেয়ে যেতেই হবে। আমি আসছি।
মানী উত্তরের অপেক্ষা না করিয়াই বাড়ির ভিতরে চলিয়া গেল এবং একটু পরে একখানা আসন আনিয়া রোয়াকের একপাশে পাতিয়া দিয়া বলিল, এস, বস উঠে।—বলিয়াই সে আবার ক্ষিপ্রপদে অদৃশ্য হইল।
মানীর আগ্রহ দেখিয়া বিপিন মনে কেমন এক ধরনের অপূর্ব আনন্দ অনুভব করিল। এ অনুভূতি তাহার পক্ষে সম্পূর্ণ নূতন, এমন কি সেদিন পোলাও খাওয়ানোর দিনও হয় নাই। সেদিন সে সে-ব্যাপারটাকে খানিকটা সাধারণ ভদ্রতা, খানিকটা মানীর রাঁধিবার বাহাদুরি দেখানোর আগ্রহের ফল বলিয়া ভাবিয়াছিল। কিন্তু আজ মনে হইল, মানীর এ টান আন্তরিক, মানী তাহার সুখদুঃখ বোঝে। বিপিনের সত্যই ক্ষুধা পাইয়াছে। ভাবিয়াছিল, রানাঘাটের বাজারে কিছু খাইয়া লইয়া তবে মিশন হাসপাতালে যাইবে। আচ্ছা, মানী কি করিয়া তাহা বুঝিল?
একটা থালায় মানী খাবার আনিয়া বিপিনের সামনে রাখিয়া বলিল, খেয়ে নাও। আমি চায়ের জল বসিয়ে এসেছি, দৌড়ে চা করে আনি।
থালার দিকে চাহিয়া বিপিনের মনে হইল, বাড়িতে এমন কিছু খাবার ছিল না, তেমন কৃপণই বটে জমিদার-গিন্নি! মানী বেচারী হাতের কাছে তাড়াতাড়ি যাহা পাইয়াছে—কিছু মুড়ি, এক থাবা দুধের সর, খানিকটা গুড়, এরই মধ্যে আবার দুইখানা থিন এরারুট বিস্কুট—তাহাই আনিয়া ধরিয়া দিয়াছে।
মানী ইতিমধ্যে একমালা নারিকেল ও একখানা দা হাতে ব্যস্তভাবে আসিয়া হাজির হইল। কোথা হইতে নারিকেল মালাটি খুঁজিয়া টানিয়া বাহির করিয়াছে এইমাত্র।
—নারকোল খাবে বিপিনদা? দাঁড়াও একটু নারকোল কেটে দিই। কুরুনিখানা খুঁজে পেলাম না। তোমার আবার দেরি হয়ে যাবে, কেটেই দিই, খাও। মুড়ি দিয়ে সর দিয়ে গুড় দিয়ে মাখ না। আস্তে আস্তে বসে খাও, আবার কখন খাবে তার ঠিক নেইকো। চা আনি।
একটু পরে চা হাতে যখন মানী আসিয়া দাঁড়াইল, তখন বিপিন যেন নূতন চোখে মানীকে দেখিল।
মানী যেন তাহার কাছে এক অননুভূতপূর্ব বিস্ময় ও তৃপ্তির বার্তা বহন করিয়া আনিল। এই আগ্রহভরা আন্তরিকতা, এই যত্ন বিপিন কখনও মনোরমার নিকট হইতে পায় নাই। মনোরমা যে তাহাকে তাচ্ছিল্য করিয়া থাকে, ভালোবাসে না—তাহা নয়। সে অন্য ধরনের মেয়ে, গোটা সংসারটার দিকে তাহার দৃষ্টি—মা, বীণা, ছেলেমেয়ে, এমন কি বাড়ির কৃষাণের দিকে পর্যন্ত। একা বিপিনের সুখদুঃখ দেখিবার অবকাশ তাহার নাই, বিপিন নিজের সংসারে পাঁচজনের মধ্যে একজন হইয়া মনোরমার যৌথ সেবার কিছু অংশ পাইয়া আসিয়াছে এতদিন। তাহাতে এমন তৃপ্তি কোনো দিন সে পায় নাই।
চা পান শেষ করিয়া বিপিন উঠিল। বলিল, মাসিমার সঙ্গে দেখা হল না, বলিস আমার কথা মানী, চললুম।
—এস। কিন্তু বেশি দিন দেরি করলে চাকরির জন্যে দায়ী আমি নয়, মনে থাকে যেন।
—খানিকটা আগে অভয় দিয়েছ দেবী, মনে আছে?
—দু’মাস দেরি করলেও কি অভয় দেওয়া বহাল রইল? বাঃ রে, আমি বলেছি তিন দিনের জায়গায় সাত দিন, না হয় ধর দশ দিন।
—না হয় ধর এক মাস!
—না হয় ধর তিন মাস! সে সব হবে না, সোজা কথা শোন বিপিনদা, আমার তো বাবার কাছে বলবার মুখ থাকা চাই।
পরে গম্ভীরমুখে বলিল, কথা দিয়ে যাও, ক’দিনে আসবে। না, সত্যি, তোমার কথা আমার বিশ্বাস হয় না, আমি কি বলেছিলুম প্রথম দিন, মনে আছে?
বিপিন কৃত্রিম ব্যঙ্গের সুরে বলিল, হ্যাঁ, বলেছিলে, চাকরিতে টিকে থাকলে তুমি আমার ভালোর চেষ্টা করবে।
মানী হাসিয়া বলিল, মনে আছে তা হলে? বেশ, এখন এস তা হলে—বেলা গেল।
পথে উঠিয়াই মানীর কথা মনে করিয়া বিপিনের দুঃখ হইল। বেচারি ছেলেমানুষ, সংসারের কি জানে! জমিদারির যা অবস্থা, মানী কি উন্নতি করিয়া দিবে তাহার? দেনা ইতিমধ্যে প্রায় পাঁচ-ছয় হাজারে দাঁড়াইয়াছে রানাঘাটের গোবিন্দ পালের গদিতে। সদরে খাজনা দিবার সময় প্রতি বৎসর তাহার নিকট হ্যান্ডনোট কাটিতে হয়। ইহা অবশ্য বিপিন এখানে চাকুরিতে ভর্তি হইবার পূর্বের ঘটনা, খাতাপত্র দেখিয়া বিপিন জানিতে পারিয়াছে। গোবিন্দ পাল নালিশ ঠুকিলেই জমিদারি নীলামে চড়িবে।
মানী মেয়েমানুষ, বিষয়-সম্পত্তির কি বোঝে! ভাবিতেছে, সে মস্ত জমিদারের মেয়ে, চেষ্টা করিলেই বিপিনদাদার বিশেষ উন্নতি করিয়া দিতে পারিবে। বিপিনের হাসি পাইল, দুঃখও হইল। বেচারী মানী!
২
রানাঘাট হাসপাতালে বিপিন ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করিল। বলাই তাহাকে দেখিয়া কান্নাকাটি করিতে লাগিল বাড়ি লইয়া যাইবার জন্য। কিন্তু বিপিনের মনে হইল, ভাই যে সম্পূর্ণ আরোগ্য হইয়াছে তাহা নয়, এ অবস্থায় তাহাকে লইয়া যাওয়া কি উচিত হইবে?
বিপিন কৈবর্ত্যের মেয়ে সেই নার্সটিকে আড়ালে ডাকিয়া বলিল, আমার ভাই বাড়ি যেতে চাইছে, কান্নাকাটি করছে, ওকে এখন নিয়ে যেতে পারি?
নার্স বলিল, নিয়ে যাও বাবু, তোমার ভাই আমাকে পর্যন্ত জ্বালাতন করে তুলছে বাড়ি যাব বাড়ি যাব করে। নেফ্রাইটিসের রুগী, যা সেরেছে, ওর বেশি আর সারবে না। কেন এখানে মিথ্যে রেখে কষ্ট দেবে!
তাহার মনে হইল, নার্স যেন কি চাপিয়া যাইতেছে। সে বলিল, ও কি বাঁচবে না?
নার্স ইতস্তত করিয়া বলিল, না, তা কেন, তবে শক্ত রোগ। বাড়ি নিয়ে গিয়ে একটু সাবধানে রাখতে হবে। নিয়েই যাও বাড়ি, এখন তো অনেকটা সেরেছে।
বিপিনের মনটা খারাপ হইয়া গেল। সে গিয়া মিশনের বড় ডাক্তার আর্চার সাহেবের সঙ্গে দেখা করিল।
সন্ধ্যা হইয়া গিয়াছে। আর্চার সাহেব নিজের বাংলোর বারান্দায় ইজি-চেয়ারে চুপ করিয়া বসিয়া ছিলেন। বয়স প্রায় পঞ্চান্ন-ছাপ্পান্ন, দীর্ঘাকৃতি, সবল চেহারা। মাথার সামনে টাক পড়িয়া গিয়াছে। আজ ত্রিশ বৎসর এখানে আছেন, বড় ভালো লোক, এ অঞ্চলের সকলে আর্চার সাহেবকে ভালোবাসে।
বিপিন গিয়া বলিল, নমস্কার, ডাক্তার সাহেব।
আর্চার সাহেব বিপিনকে চেনেন না, বলিলেন, এস, আপনি কি বলছেন?
আর্চার সাহেব বাংলা বলেন বটে, তবে একটু ভাবিয়া, একটু ধীরে ধীরে, যেখানে জোর দেওয়া উচিত সেখানে জোর না দিয়া এবং যেখানে জোর দেওয়া উচিত নয় সেখানে জোর দিয়া।
বিপিন বলিল, আমার ভাই বলাই চাটুজ্জে ছ’ নম্বর ওয়ার্ডে আছে, নেফ্রাইটিসের অসুখ, তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারি? সে বড় ব্যস্ত হয়েছে বাড়ি যাবার জন্যে!
—হাঁ হাঁ, ওই ওয়ার্ডের ছোকরা রুগী। নিয়ে যান।
—সাহেব, ও কি সেরেছে?
—সে পূর্বের অপেক্ষা সেরেছে। কঠিন রোগ, একেবারে ভালো ভাবে সারতে এক বছর লাগবে। বাড়িতে নিয়ে গিয়ে যত্ন করবেন, মাংস খেতে দেবেন না।
—তা হলে কাল সকালে নিয়ে যাব?
—আপনি রাত্রে কোথায় থাকবেন? আমার বাড়িতে থাকুন, আমার এখানে ডিনার খাবেন। মুকুন্দ, ও মুকুন্দ!
—আমার এখানে আত্মীয় আছেন সাহেব, তাদের বাড়ি বলে এসেছি, সেখানেই থাকব। আমার জন্যে ব্যস্ত হবেন না।
বিপিন রাত্রে বাজারের নিকট তাহার এক দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়ি থাকিয়া, পরদিন সকালে ঘোড়ার গাড়ি ডাকিয়া আনিয়া ভাইকে লইয়া স্টেশনে গেল।
বলাইয়ের বয়স বেশি নয়—কুড়ি-একুশ। রোগ হওয়ার পূর্বে তার শরীর খুব ভালো ছিল, বিপিনের সংসারের ক্ষেতখামারের অনেক কাজ সে একাই করিত।
মধ্যে যখন বিপিনের বদখেয়ালিতে পৈতৃক অর্থ সব উড়িয়া গেল, সংসারে ভয়ানক কষ্ট, সংসার একেবারে অচল, তখন বলাই আঠারো বছরের ছেলে। বলাই দেখিল, দাদার মতিবুদ্ধি তাহাদের অনাহারের ও দারিদ্র্যের পথে লইয়া চলিয়াছে, যদি বাঁচিতে হয় তাহাকে লেখাপড়া ছাড়িতে হইবে এবং বুক দিয়া খাটিতে হইবে।
নদীর ধারের কাঁঠাল-বাগান বাঁধা দিয়া সেই টাকায় সে একজোড়া বলদ কিনিয়া গরুর গাড়ি চালাইতে লাগিল নিজেই। লোকের জিনিসপত্র গাড়ি বোঝাই দিয়া অন্যত্র লইয়া যাইবার ভাড়া খাটিত, স্টেশনে সওয়ারী লইয়া যাইত। অনেকে নিন্দা করিতে লাগিল। একদিন বৃদ্ধ যদু মুস্তফি ডাকিয়া বলিলেন, হ্যাঁ হে বলাই, তুমি নাকি গরুরগাড়ির গাড়োয়ানি কর?
বলাই একটু ভয়ে ভয়ে বলিল, হ্যাঁ, জ্যাঠামশাই।
—সেটা কি রকম হল? বিনোদ চাটুজ্জের ছেলে হয়ে অমন বংশের নাম ডোবাবে তুমি! কাল শুনলাম, বাজারের নিবারণ সাহার বাড়ি তৈরি হচ্ছে, সেখানে আট-দশ গাড়ি বালি বয়েছ নদীর ঘাট থেকে সারাদিন, এতে মান থাকবে?
বলাই একটু ভীতু ধরনের ছেলে। বয়সে বড় ভারিক্কি মুস্তফি মহাশয়কে তাহার বাবা বিনোদ চাটুজ্জে পর্যন্ত সমীহ করিয়া চলিতেন। সেখানে সে আঠারো বছরের ছেলে কি তর্ক করিবে? তবুও সে বলিল, জ্যাঠামশাই, এ না করলে যে সংসার চলে না, মা বোন না খেয়ে মরে। দাদা তো ওই কাণ্ড করছে, দাদার ওপর আমি কিছু বলতে তো পারি না, মাঠের জমি, খাস জমি সব দাদা বিক্রি করছে আর মৌরুসী দিচ্ছে, মার হাতে একটা পয়সা রাখেনি—সব নেশাভাঙে উড়িয়ে দিয়েছে। আমরা কি খেয়ে বাঁচব বলুন তো? এতে তবুও দিন এক টাকা গড়ে আয় হচ্ছে। বালির গাড়ি ছ’ আনা করে ভাড়া নদীর ঘাট থেকে বাজার পর্যন্ত। কাল সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত এগারো গাড়ি বালি বয়েছি—ছেষট্টি আনা—চার টাকা দু আনা একদিনের রোজগার। এ অন্যভাবে আমায় কে দিচ্ছে বলুন?
সে দুর্দিনে বলাই মান-অপমান বিসর্জন দিয়া বুক দিয়া না পড়িলে সংসার অচল হইত। বলাই গরুরগাড়ির গাড়োয়ানি করিয়া লাঙ্গল করিল, জমি চাষ করিয়া ধান বুনিল, আটির মাঠে কুমড়া করিল এবং সেই কুমড়া কলিকাতায় চালান দিয়া সেবার প্রায় ত্রিশ-বত্রিশ টাকা লাভ করিল।
বিপিনকে বলিল, দাদা, বাগদি-পাড়ার নন্দ বাগদির গোলাটা কিনে আনছি, এবার ধান রাখবার জায়গা চাই, ধান হবে ভালো।
বিপিন বলিল, নন্দ বাগদির অত বড় গোলা এনে কি করবি, আমাদের তিন বিঘে জমির ধান এমন কি হবে যে তার জন্যে অত বড় গোলার দরকার! দামও তো বেশি চাইবে!
বলাই বলিয়াছিল, বারণ ক’র না দাদা। বড় গোলাটা বাড়ি থাকলে লক্ষ্মীশ্রী। আমার ওই গোলা দেখলে কাজে উৎসাহ হবে যে ওটা পুরিয়ে দিতেই হবে আসছে বছর। ওটাই আনি, কি বল দাদা?
সংসারের জন্য অনিয়মিত খাটিয়া খাটিয়া বলাই পড়িয়া গেল শক্ত অসুখে। কিছুদিন দেশেই রাখিয়া চিকিৎসা চলিল। সে চিকিৎসাও এমন বিশেষ কিছু নয়, গ্রাম্য হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার শরৎ দাঁ দিন পনরো সাদা শিশিতে কি ঔষধ দিতেন, তাহাতে কিছু না হওয়ায় গ্রামের অনেকের পরামর্শে বলাইকে রানাঘাটের হাসপাতালে আনা হয়।
বলাই এখনও ছেলেমানুষ, তাহার উপর অনেক দিন রোগশয্যায় শুইয়া থাকিবার পরে আজ দাদার সঙ্গে বাড়ি ফিরিয়া যাইবার আনন্দে সে অধীর হইয়া উঠিয়াছে। রেলগাড়িতে উঠিয়া একবার এ-জানালায় একবার ও-জানালায় ছুটাছুটি করিতেছে, কতকাল পরে আবার সে নীরোগ হইয়া মুক্ত স্বাধীন ভাবে চলাফেরা করিতে পাইয়াছে! নার্সের কথামতো আর ভয়ে ভয়ে চলিতে হইবে না। হাসপাতালের রান্না কি বিশ্রী! মাছের ঝোল না ছাই! মায়ের হাতের, বউদিদির হাতের রান্না আজ প্রায় চার মাস খায় নাই, বউদিদির হাতের সুত্তু নির তুলনা আছে?
পাঁচিলের পশ্চিম কোণে বড় মানকচুটা সে নিজের হাতে পুঁতিয়াছিল। এখন না জানি কত বড় হইয়াছে! ভগবান যদি দিন দেন এবং তাহাকে খাটিতে দেন, তবে গাঙের ধারে কদমতলার বাঁকে ভালো জমি খাজনা করিয়া লইবে এবং তাহাতে শসা, বরবটি এবং পালংশাক করিবে।
হাসপাতালে থাকিতে নার্সের মুখে শুনিয়াছে, পালংশাক ও বরবটি নাকি খুব ভালো তরকারি। কলিকাতায় দামে বিক্রয় হয়।
বিপিনকে জিজ্ঞাসা করিল, দাদা, কাপালীপাড়ার রাইচরণের পিসির কাছে বলা ছিল, ওদের ঝাল হলে আমাদের সূর্যমুখী ঝালের বীজ দিয়ে যাবে। তুমি দেখ নি, সে ঝাল রাঙা টুকটুক করছে, এক-একটা এত বড়—বীজ দিয়ে গিয়েছিল, জান? আমি এবার চাট্টি ঝাল পুঁতে দেব আমড়াতলায় নাবাল জমিটাতে।
দাদার চাকুরি হওয়াতে বলাই খুব খুশি।
তখন সে একা খাটিয়া সংসার চালাইত। আজকাল দাদার মতিবুদ্ধি ফিরিয়াছে, দাদা আবার পুরনো জমিদার-ঘরে বাবার সেই পুরনো চাকুরি করিতেছে, ইহার অপেক্ষা আনন্দের বিষয় আর কি আছে!
দুই ভাইয়ে মিলিয়া খাটিলে সংসারের উন্নতি হইতে কত দেরি লাগিবে? সে নিজে বিবাহ করে নাই, করিবেও না। মা, বউদিদি, ভানু, বীণা—এরা সুখী হইলেই তাহার সুখ। গোলা দেখিলে মায়ের চোখ দিয়া জল পড়ে। মা বলে, কর্তার আমলে এর চেয়েও বড় গোলা ছিল বাড়িতে, আজকাল দুটো লক্ষ্মীর চিঁড়ে কোটার ধান পাই না।
মায়ের চোখের জল সে ঘুচাইবে। বাবার গোলা ছিল পনরো হাতের বেড়, সে গোলা বাঁধিবে আঠারো হাতের বেড়।
৩
বেলা এগারোটার সময় বিপিন ও বলাই বাড়ি পৌঁছিল।
ইহাদের আজই বাড়ি আসিবার কোনো সংবাদ দেওয়া ছিল না। বিশেষত বলাইকে আসিতে দেখিয়া বিপিনের মা ছুটিয়া গিয়া রুগ্ন ছেলেকে জড়াইয়া ধরিলেন। বীণা, মনোরমা, ভানু, টুনি—সকলেই বাহির হইয়া আসিয়া রোয়াকে দাঁড়াইল।
উঃ, সেই রানাঘাটের হাসপাতাল, আর এই বাড়ির তাহার প্রিয়জন সব—বউদিদি, মা, দিদি, খোকা, খুকি! বলাই আনন্দে কাঁদিয়াই ফেলিল ছেলেমানুষের মতো।
ভানু-টুনিও খুশিতে আটখানা। কাকাকে তাহারা ভালোবাসে। এতদিন পরে কাকাকে ফিরিতে দেখিয়া তাহাদেরও আনন্দের সীমা নাই। কাকার গলা জড়াইয়া পিঠের উপর পড়িয়া তাহারা তাহাদের পুরাতন কাকাকে খুঁজিয়া বাহির করিতে চাহিতেছে।
ঘরের মধ্যে ঢুকিয়া বিপিন পুঁটলি নামাইয়া রাখিতেছে, মনোরমা আসিয়া হাসিমুখে বলিল, তা হলে আমার চিঠি পেয়েছিলে? কই, উত্তর তো দিলে না?
বিপিন বলিল, উত্তর আর কি দোব, এলাম তো চলে বলাইকে নিয়ে।
—ভালোই করেছ। ঠাকুরপো তোমায় লিখতে সাহস করত না, কেবল আমায় চিঠি লিখত—আমায় বাড়ি নিয়ে যাও, আমায় বাড়ি নিয়ে যাও। আহা, ও কি সেখানে থাকতে পারে! ছেলেমানুষ, তাতে ওর প্রাণ পড়ে থাকে সংসারের ওপর। হ্যাঁগা, ওর অসুখ কেমন? ডাক্তারে কি বললে?
—বললে তো, এখন ভালোই। তবে সাবধানে রাখতে হবে। ওকে বেশি খেতে দেবে না। মাকে বলে দিও, যেন যা-তা ওকে না খেতে দেয়। মাংস খেতে একেবারে বারণ কিন্তু।
—তবেই হয়েছে! যা মাংস খেতে ভালোবাসে ঠাকুরপো, ওকে ঠেকিয়ে রাখা ভীষণ কঠিন! আর কি জান, বাড়ি এসেছে, এখন ওর আবদারের জ্বালায় ওকে মাংস না দিয়ে পারা যাবে? তুমি যে কদিন বাড়ি আছ, তারপর ও কি কারও কথা মানবে? নিজেই পাড়া থেকে খাসি কাটিয়ে ভাগাভাগি করে বিলি করে দিয়ে নিজের ভাগে দেড় সের মাংস নিয়ে এসে ফেলবে!
—না না, তা হতে দিও না, দিলেই অসুখ বাড়বে। ভয় দেখাবে যে, তোমার দাদাকে চিঠি লিখব, ওসব ছেলেমানুষি চলবে না।—বউদিদিকে দেখছি না?
—দিদি তো এখানে নেই। তাঁকে উলোর পিসিমা নিয়ে গেছেন আজ দিন পনেরো হল। তিনি এসেছিলেন গঙ্গাচ্চান করতে কালীগঞ্জে, আমাদের এখানেও এলেন, সঙ্গে করে নিয়ে গেলেন যাবার সময়ে।
বিপিন এ সংবাদে খুব খুশি হইল না। বলিল, নিয়ে গেলেন মানে তো তাঁর সংসারে দাসীবৃত্তি করার জন্যে নিয়ে যাওয়া। ওসব আমি পছন্দ করি না।
মনোরমা বলিল, পছন্দ তো কর না, কিন্তু এখানে খায় কি তা তো দেখতে হবে। তুমি চলে গেলে পলাশপুরে, আমাদের হাতে তো একটি পয়সা দিয়ে গেলে না। একদিন এমন হল—দুটিখানি পান্তা-ভাত ছিল, ভানু-টুনিকে দিয়ে আমরা সবাই উপোস করে রইলাম। কাউকে কিছু বলতেও পারি না, জাত যায়। পাড়ায় রোজ রোজ কে ধার চাইতে গেলে দেয় বল দিকি? আমি তো বললুম, উপোস করে মরি সেও ভালো, কারও বাড়ি, কি রায়গিন্নির কাছে, কি দুলুর মার কাছে, কি লালু চক্কত্তির মার কাছে চাইতে যেতে আমি পারব না।
কথাগুলি ন্যায্য এবং মনোরমা যে মিথ্যা বলিতেছে না, বিপিন তাহা বুঝিল। বুঝিলেও কিন্তু এসব কথা বিপিনের আদৌ ভালো লাগিল না।
যেমনই বাড়িতে পা দিয়াছে, অমনই সতরো গণ্ডা অভাব-অভিযোগের কাহিনী সাজাইয়া মনোরমা বসিয়া আছে। এও তো এক ধরনের তিরস্কার! সে কেন খালি হাতে সকলকে রাখিয়া গিয়াছিল, কেন একশো টাকার থলি মনোরমার হাতে দিয়া বাড়ির বাহির হয় নাই! স্ত্রীর মুখে তিক্ত তিরস্কার শুনিতে শুনিতেই তাহার জীবন গেল! স্ত্রী কি একটুও বুঝিবে না? স্বামীর অক্ষমতার প্রতি কি সে এতটুকু অনুকম্পা দেখাইতে পারে না?
৪
বৈকালে বিপিন গ্রামের উত্তরে মাঠের দিকে বেড়াইতে গেল। মাঠের ওপারেই একটি ছোট মুসলমান গ্রাম, নাম বেলতা। সন্ধ্যার এখনও অনেক দেরি আছে দেখিয়া সে ভাবিল, না হয় এক কাজ করি, আইনদ্দি চাচার বাড়ি ঘুরে যাই। অত বড় গুণী লোকটা, বলাইয়ের অসুখ সম্বন্ধে একটা পরামর্শ করে দেখি, যদি কিছু করতে পারি। অনেক মন্তরতন্তর জানে কিনা।
আইনদ্দি বাড়ির সামনে বাঁশতলায় বসিয়া মাছ-ধরা-ঘূর্ণির বাখারি চাঁচিতেছিল। চোখে সে ভালো দেখে না, বিপিনের গলার স্বর শুনিয়া চিনিতে পারিয়া বলিল, আসুন, বাবাঠাকুর, আসুন। কবে আলেন বাড়ি? এইখানা নিয়ে বসুন।—বলিয়া একখানা খেজুরপাতার চেটাই আগাইয়া দিল।
বিপিন বলিল, চাচা, তোমাকে তো কক্ষণও বিনি কাজে থাকতে দেখি না, চোখে ঠাওর হয়?
—না বাবাঠাকুর, ভালো আর কনে! হ্যাদে, একখানা চশমা এনে দিতি পার? চশমা ন’লি আর চকি ভালো ঠাওর পাই নে ঝে!
—বয়েস তোমার তো কম হল না চাচা, চোখের আর দোষ কি বল?
—তা একশো হয়েছে। যেবার মাৎলার রেলের পুল হয়, তখন আমি গরু চরাতি পারি। আপনি এখন হিসেব করে দেখ।
এ দেশে সবাই বলে আইনদ্দির বয়স একশো। আইনদ্দি নিজেও তাই বলে। আবার কেহ কেহ অবিশ্বাস করে। বলে, মেরে-কেটে নব্বুই বিরেনব্বুই। একশো! বললেই হল বুঝি?
মাৎলার পুল কত সালে হয় বিপিন তাহা জানে না, সুতরাং আইনদ্দির বয়সের হিসাব তাহার দ্বারা হইবার কোনো সম্ভাবনা নাই বুঝিয়া সে অন্য কথা পাড়িল। বলিল, চাচা, তুমি অনেক রকম মন্তরতন্তর জান, এ কথাটা তো শুনে আসছি বহুদিন!
বিপিন এই একই কথা অন্তত বিশ বার আইনদ্দিকে জিজ্ঞাসা করিয়া আসিতেছে গত দশ বৎসরের মধ্যে। আইনদ্দিও প্রত্যেক বারেই একই উত্তর দেয়, একই ভাবে হাত পা নাড়িয়া। আজও সে সেই ভাবেই বেশ একটু গর্বের সহিত বলিল, মন্তর! তা বেশি কথা কি বলব, আপনাদের বাপ-মার আশীর্বাদে মন্তর সব রকম জানা ছেল। সেসব কথা বলে কি হবে, এদিগরের কোন লোকটা জানে না আমার নাম? তবে এই শোন, শূন্যভরে যাব, আগুন খাব, কাটামুণ্ডু জোড়া দেব—
বিপিন এ কথা আইনদ্দির মুখে অনেকবার শুনিয়াছে, তবুও বৃদ্ধকে ঘাঁটাইয়া এ সব কথা শুনিতে তাহার ভালো লাগে। বিপিনের হাসি পায় এ কথা শুনিলে, কিন্তু আশ্চর্য এই যে, আইনদ্দির উপর শ্রদ্ধা তাহাতে কিন্তু কমে না। বিপিন যুবক, এই শতবর্ষজীবী বৃদ্ধের প্রত্যেক কথা হাবভাব তাহার কাছে এত অদ্ভুত রহস্যময় ঠেকে! এইজন্যই সে বাড়ি থাকিলে মাঝে মাঝে ইহার নিকট আসিয়া খানিকক্ষণ কাটাইয়া যায়। এ যে জগতের কথা বলে, বিপিনের পক্ষে তাহা অতীতকালের জগৎ। বিপিনের সঙ্গে সে জগতের পরিচয় নাই, নাই বলিয়াই তাহা রহস্যময়।
আইনদ্দি তামাক সাজিয়া হাতখানেক লম্বা এক খণ্ড সোলার নীচের দিকে বাঁশের সরু শলার সাহায্যে একটা ফুটা করিয়া বিপিনের হাতে দিয়া বলিল, তামাক সেবা কর বাবাঠাকুর।
বিপিন বলিল, চাচা, তুমি কানসোনার কুঠি দেখেছ?
—খুব। তখন তো আমার অনুরাগ বয়েস। কুঠির মাঠে নীলের চাষ দেখিছি। এই শোনবা? আমার সম্বন্ধির ছেলে জহিরদ্দি তখন জন্মায়, তিনি বড় চাকরি করত, এখন কুড়ি টাকা করে পেন্সিল খাচ্ছে। তা ভাব তবে সে কত দিনের কথা!
বিপিন বলিল, কি চাকরি করত?
—কি চাকরি আমি জানি বাবাঠাকুর? পেন্সিল খাচ্ছে যখন, তখন বড় চাকরিই হবে।
—চাচা, একটা কবিতা বল তো শুনি? মনে আছে?
আইনদ্দি একগাল হাসিয়া বলিল, আ আমার কপাল! কবিতা শোনবা? রামায়ণ মহাভারত মুখস্থ ছেল, এখন আর কি মনে থাকে সব কথা বাবাঠাকুর? এই শোন—
সূর্য যায় অস্তগিরি আইসে যামিনী।
হেনকালে তথা এক আইল মালিনী।।
কথায় হীরার ধার হীরা তার নাম।
দাঁত ছোলা মাজা দোলা হাস্য অবিরাম।।
গালভরা গুয়াপান পাকি মালা গলে।
কানে কড়ে কড়ে রাঁড়ী কথা কত ছলে।।
চূড়াবান্ধা চুল পরিধান সাদা শাড়ী
ফুলের চুপড়ী কাঁধে ফিরে বাড়ি বাড়ি।।
বিপিন বাংলা সাহিত্যের তেমন খবর না রাখিলেও এটুকু বুঝিল যে, ইহা বিদ্যাসুন্দরের কবিতা। বলিল, এ কবিতা তোমার মুখে কখনও শুনিনি তো চাচা? রামায়ণ-মহাভারতের কবিতাই তো বল, এ কোথায় শিখলে?
—আমার যখন অনুরাগ বয়েস, তখন বিদ্যেসুন্দরের ভারী দিন ছেল ঝে! বিদ্যেসুন্দরের যাত্রা হত, গোপাল উড়ের নাম শুনিছিলে? সেই গাইত বিদ্যেসুন্দর। আমরা সমবয়সী কজন পরামর্শ করে বিদ্যেসুন্দরের বই আনালাম। ভারতচন্দ্র রায়গুণাকর কবিওয়ালার বই। বড় ভালো লেগে গেল। তারপর আনালাম অন্নদামঙ্গল। বিদ্যেসুন্দর বই ভালো, তবে বড্ড হে-পানা—
—কি পানা চাচা?
—বড্ড হে-পানা। আপনাদের কাছে আর কি বলব, ছেলেছোকরা মানুষ তোমরা, আপনাদের কাল হতি দেখলাম, সে আর আপনি শুনে কি করবা? ওই বিদ্যে বলে এক রাজকন্যে, তার সঙ্গে সুন্দর বলে এক রাজপুত্তুরের আসনাই হয়—এই সব কথা। পড়ে দেখো। বিদ্যের রূপ শোনবা কেমন ছেল?
বিনানিয়া বিনোদিয়া বেণীর শোভায়।
সাপিণী তাপিনী তাপে বিবরে লুকায়।।
কে বলে শারদশশী সে মুখের তুলা।
পদনখে পড়ে তার আছে কতগুলা।।
কি ছার মিছার কাম ধনুরাগে ফুলে।
ভুরুর সমান কোথা ভুরুভঙ্গে ভুলে।।
কাড়ি নিল মৃগমদ নয়নহিল্লোলে।
কাঁদেরে কলঙ্কী চাঁদ মৃগ করি কোলে।।
কবিবর ভারতচন্দ্র স্বর্গ হইতে যদি দেখতে পাইতেন, তবে এই বিংশ শতাব্দীতে কত নবীন প্রতিভার প্রভাবের মধ্যেও তাঁহার এইরূপ একজন মুগ্ধ ভক্তের মুখে তাঁহার নিজের কবিতার উৎসাহপূর্ণ আবৃত্তি শুনিয়া নিশ্চয়ই খুব খুশি হইতেন।
বিপিনের এ কথা অবশ্য মনে হইল না, কারণ সে সাহিত্যরসিক নয়, বা কি প্রাচীন, কি আধুনিক কোনো বাংলা কবির সহিতই তাহার পরিচয় নাই। কিন্তু বিদ্যার রূপের বর্ণনা শুনিয়া তাহার কেন যে মানীর কথা মনে হইল হঠাৎ, তাহা সে নিজেই বুঝিতে পারিল না। বিদ্যা তো নয়—মানী। কবি যেন তাহাকে চক্ষের সামনে রাখিয়াই এ বর্ণনা লিখিয়াছেন। মানী কাছে আসিলে তাহাকে খুব সুন্দরী বলিয়া বিপিনের মনে হয় নাই, কিন্তু দূরে গেলেই মানীকে সর্বসৌন্দর্যের আকর বলিয়া মনে হয়। তাহার চোখ যতটা ডাগর, তাহার চেয়েও ডাগর বলিয়া মনে হয়, রঙ যতটা ফর্সা তাহার চেয়েও ফর্সা বলিয়া মনে হয়, মুখশ্রী যতটা সুন্দর, তাহার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর বলিয়া মনে হয়।
আইনদ্দির বাড়ির পশ্চিমে বেলতার মাঠ, অনেক দূর পর্যন্ত ফাঁকা, মাঠের ওপারে হরিদাসপুর গ্রামের বাঁশবন। সূর্য পশ্চিমে হেলিয়া পড়িলেও এখনও বেলা আছে, মাঠের মধ্যে ফুলে ভরা বাবলা গাছের ডালে ডালে শালিক ও ছাতারে পাখির দল কলরব করিতেছে। নিকটে চাঁদমারির বিল থাকাতে বৈকালের হাওয়া বেশ ঠাণ্ডা।
বিপিনের মন কেমন উদাস হইয়া গেল।
জীবনে তাহার সুখ নাই, একমাত্র সুখের মুখ সে সম্প্রতি দেখিতে পাইয়াছে, অকস্মাৎ এক ঝলক স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নার মতো মানীর গত কয় দিনের কার্যকলাপ তাহার অন্ধকার জীবনে আলো আনিয়া দিয়াছে।
কিন্তু মানী তাহার কে?
কেহই নয়, অথচ সে-ই যেন সব বলিয়া আজ মনে হইতেছে।
অথচ মানী অপরের স্ত্রী—বিপিনের কি অধিকার আছে সেখানে? ইচ্ছা করিলেই কি তাহার সঙ্গে যখন-তখন দেখা করিবার উপায় আছে?
মানী কেন দুই দিনের যত্ন দেখাইয়া তাহাকে এমন ভাবে বাঁধিল!
আইনদ্দি বলিল, একখানা কুমড়ো খাবে তো চল আমার সঙ্গে। বিলির ধারে জলি ধানের ক্ষ্যাতে আমার নাতি বসে পাখি তাড়াচ্চে, সেখানথে দেব এখন। ডাঙার ওপারেই কুমড়োর ভুঁই।
চাঁদমারির বিলের ধারে ধারে দীর্ঘ জলজ পাতিঘাসের মধ্য দিয়া সুঁড়িপথ। পড়ন্ত বেলার আধশুকনো ঘাসের রোদপোড়া গন্ধের সঙ্গে বিলের জলের পদ্মফুলের গন্ধ মিশিয়াছে। বিলের এপারে সবটাই জলি ধানের ক্ষেত। মাঝে মাঝে ছোট ছোট বাঁশের মাচায় বসিয়া লোকে টিনের কানেস্তারা বাজাইয়া বাবুই পাখি তাড়াইতেছে।
আইনদ্দির নাতির নাম মাখন। এ দেশের মুসলমানদের এ রকম নাম অনেক আছে—এমন কি ভুবন, নিবারণ, যজ্ঞেশ্বর পর্যন্ত আছে।
মাখনের বয়স চল্লিশের কম নয়, চুলে পাক ধরিয়াছে। তাহার বাবার বয়স প্রায় বাহাত্তর-তিয়াত্তর। মাখন বেশ জোয়ান লোক, শুধু জোয়ান নয়, এ অঞ্চলের মধ্যে একজন ভালো গায়ক বলিয়া তাহার খ্যাতি আছে।
ঠাকুরদাদাকে আসিতে দেখিয়া মাখন বলিল, মোর জলপান কনে, হ্যাঁ দাদা?
পিছনে বিপিনকে আসিতে দেখিয়া সে তাড়াতাড়ি মাচা হইতে নামিয়া আসিয়া বলিল, ‘দাদাবাবু যে কখন আলেন? আপনি সেই কোথায় নায়েবি করচ শুনেলাম, তাই ইদিকি বড় একটা যাওয়া আসা কর না বুঝি?
আইনদ্দি বলিল, বাবাঠাকুরকে একটা বড় দেখে কুমড়ো এনে দে দিকি। ওই পুবির বেড়ার গায়ে যে কটা বড় কুমড়ো আছে, তা থেকে একটা আন।
—হ্যাদে, দূর দূর, ওই দেখ বাবাঠাকুর, এক ঝাঁক বাবুই এসে জুটল আবার! সুমুন্দির পাখিগুনো তো বড্ড জ্বালালে দেখচি!—বলিয়া আইনদ্দি নিজেই টিনের কানেস্তারা বাজাইতে লাগিল।
বেলা পড়িয়া রাঙা রোদ কতক জলি ধানের বিস্তীর্ণ ক্ষেতে, কতক বিলের বাবলা-বনে পড়িয়াছে, আইনদ্দির নাতি বিলের উপরের ডাঙায় কুমড়ো-ক্ষেত হইতে সুকণ্ঠে গাহিতেছে—
যখন ক্ষ্যাতে ক্ষ্যাতে বসে ধান কাটি
ও মোর মনে জাগে তার লয়ান দুটি—
বাবুইপাখির ঝাঁক বোধ হয় বুঝিতে পারিয়াছে বৃদ্ধ আইনদ্দি তাহাদের কিছুই করিতে পারিবে না, সুতরাং তাহারা নির্বিবাদে আবার আসিয়া জুটিতে লাগিল।
আইনদ্দির নাতির গানের কয়টি চরণ শুনিয়াই বিপিন আবার অন্যমনস্ক হইয়া গেল। সেই দিগন্তবিস্তীর্ণ মাঠে, বিল ও বিলের ধারে ধারে সবুজ জলি ধানের ক্ষেত, উপরে এবং নীচে নাচের ধরনে উড্ডীয়মান বাবুইপাখির ঝাঁক, বিলের ধারের জলে সোলাগাছের হলদে ফুলের রাশি, হরিদাসপুরের বাঁশবনের মাথায় হেলিয়া-পড়া অস্তমান সূর্য, সব মিলিয়া তাহার মনে এক অপূর্ব ব্যথাভরা অনুভূতির সৃষ্টি করিল।
যেন মনে হইল, মানীকে এ জগতে বুঝিবার ভালোবাসিবার লোক নাই। মানী যাহার হাতে পড়িয়াছে, সে মানীর মূল্য বোঝে নাই। মানীর জীবনকে ব্যর্থতার পথ হইতে যদি কেহ রক্ষা করিতে পারে, তাহার মুখে সত্যকার আনন্দের হাসি ফুটাইতে পারে, তবে সে বিপিন নিজেই। বিস্তীর্ণ সংসারে মানী হয়তো বড় একা, যেমন সে নিজেও আজ একা।
বিপিন কখনও প্রেমে পড়ে নাই জীবনে। প্রেমে পড়িবার অভিজ্ঞতা তাহার কখনও হয় নাই, মানীর সঙ্গে এই কয়দিনের ঘটনাবলীর পূর্বে। এখন সে বুঝিয়াছে, আজ মানী তাহার যতটা কাছে অতটা কাছে কেহ কখনও আসে নাই। বিপিন লেখাপড়া মোটামুটি জানিলেও এমন কিছু বেশি নভেল নাটক বা কবিতা পড়ে নাই, প্রেমের কি লক্ষণ কবি-ঔপন্যাসিকেরা লিখিয়া গিয়াছেন, তাহা সে জানে না; কিন্তু সে মাত্র এইটুকু অনুভব করিল, মানী ছাড়া জগতে আর কেহ আজ যদি তাহার সামনে আসিয়া দাঁড়ায়, তাহার মনের এ শূন্যতা পূর্ণ হইবার নয়।
ইহাকেই কি বলে ভালোবাসা?
হয়তো হইবে।
যে কোনো কথাই সেই একটি মাত্র মানুষের কথা মনে আনিয়া দেয়—বিপিনের জীবনে ইহা একেবারে নূতন।
সে যে ভাইয়ের অসুখের সম্বন্ধে আইনদ্দির সঙ্গে পরামর্শ করিতে গিয়াছিল, এ কথা বেমালুম ভুলিয়া গিয়া কুমড়াটি হাতে লইয়া বিপিন সন্ধ্যার সময় বাড়ি ফিরিল।
