বিপিনের সংসার – ৪
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
১
বিপিনের একজন বন্ধু আছে এখান হইতে দুই ক্রোশ দূরে ভাসানপোতা গ্রামে। বন্ধুটির নাম জয়কৃষ্ণ মুখুজ্জে। বয়সে জয়কৃষ্ণ বিপিনের চেয়ে বছর ছয়-সাতের বড়। কিন্তু ভাসানপোতার মাইনর স্কুলে উহারা দুইজনে এক ক্লাসে পড়িয়াছিল। জয়কৃষ্ণ বর্তমানে উক্ত গ্রামের সেই স্কুলেই হেড-মাস্টারের কাজ করে। বি.এ. পর্যন্ত পড়াশোনা করিয়াছিল।
এমন একজন লোক এখন বিপিনের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে, যাহার কাছে সব কথা খুলিয়া বলা যায়। না বলিলে আর চলে না।—বিপিন মনের মধ্যে এসব আর চাপিয়া রাখিতে পারে না।
তাই পরদিন সে ভাসানপোতায় বন্ধুর বাড়ি গিয়া হাজির হইল। জয়কৃষ্ণ এ গ্রামের বাসিন্দা নয়, তবে বর্তমানে কর্ম উপলক্ষে এই গ্রামের সতীশ কর্মকারের পোড়ো বাড়িতে বাহিরের দুইটি ঘর লইয়া বাস করিতেছে।
স্কুলের ছুটির পর জয়কৃষ্ণ নিজের ঘরে ফিরিয়া উনুন জ্বালাইয়া চা তৈয়ারির যোগাড় করিতেছে, বিপিনকে হঠাৎ এ সময়ে দেখিয়া বলিল, আরে বিপনে যে! আয় আয়, বস! কবে এলি রে বাড়িতে?
বিপিন দেখিল, জয়কৃষ্ণ একা নাই—ঘরের মধ্যে বসিয়া আছে মাইনর স্কুলের দ্বিতীয় পণ্ডিত বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী। বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তীর বয়স প্রায় সাঁইত্রিশ-আটত্রিশ, এ গ্রামের স্কুলে আজ প্রায় আট দশ বছর মাস্টারি করিতেছে, থাকে জয়কৃষ্ণের বাসায় অন্য ঘরটিতে, কারণ জয়কৃষ্ণ স্ত্রীপুত্র লইয়া এখানে বাস করে না; বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তীই উপরওয়ালা হেড-মাস্টারের এক রকম পাচক ও ভৃত্য উভয়ের কাজই করে। বিনিময়ে জয়কৃষ্ণ তাহাকে খাইতে দেয়।
এসব কথা বিপিন জানিত, কারণ সে আরও বহুবার ভাসানপোতায় আসিয়াছে জয়কৃষ্ণের সঙ্গে দেখা করিতে। বলা বাহুল্য, বিপিন ও জয়কৃষ্ণ যখন এই স্কুলের ছাত্র, বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী তখন স্কুলের মাস্টার ছিল না, উহারা পাস করিয়া বাহির হইয়া যাইবার অনেক পরে সে আসিয়া চাকুরিতে ঢোকে।
চা পান শেষ করিয়া বিপিন জয়কৃষ্ণকে ডাকিয়া ঘরের বাহিরে লইয়া গিয়া মানীর কথা তাহাকে বলিতে লাগিল। বেশ সবিস্তারেই বলিতে লাগিল।
বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী একটু দূরে বসিয়া উৎকর্ণ হইয়া ইহাদের কথা শুনিবার চেষ্টা করিতেছে দেখিয়া বিপিন গলার সুর আরও একটু নিচু করিল।
বিশ্বেশ্বর দাঁত বাহির করিয়া হাসিয়া বলিল, আমরা কি শুনতে পাব না কথাটা, ও বিপিনবাবু?
—এ আমাদের একটা প্রাইভেট কথা হচ্ছে।
—প্রাইভেট আর কি! কোনো মেয়েমানুষের কথা তো? বলুন না, একটু শুনি।
বিশ্বেশ্বর অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে কথাগুলি বলিল দেখিয়া বিপিন একটু মজা করিবার জন্য কহিল, আসুন না এদিকে, বলছি!
তারপর সে এক কাল্পনিক মেয়ের সঙ্গে তাহার কাল্পনিক প্রেম-কাহিনী সবিস্তারে শুরু করিল। একবার ট্রেনে একটি সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে তাহার আলাপ হয়। মেয়েটির নাম বিজলী।
তাহার বাবা ও মায়ের সঙ্গে সে কলিকাতায় মামার বাসায় যাইতেছিল। বিজলী কলিকাতায় মামার বাসার ঠিকানা দিয়া তাহাকে যাইতে বলে। বিপিন অনেকবার সেখানে গিয়াছিল, বিজলী কি আদরযত্ন করিত! বার বার আসিতে বলিত! একদিন বিপিন তাহার বাপ-মাকে বলিয়া বিজলীকে আলিপুর চিড়িয়াখানা দেখাইতে লইয়া যায়। সেখানে বিজলী মুখ ফুটিয়া বলে, বিপিনকে সে ভালোবাসে।
বিশ্বেশ্বর সাগ্রহে বলিল, এ কতদিনের কথা?
—তা ধরুন না কেন, বছর ছ-সাত আগের ব্যাপার হবে।
—এখন সে মেয়েটি কোথায়?
—এখন তার বিয়ে হয়ে গেছে। শ্বশুরবাড়ি থাকে।
—আপনার সঙ্গে আলাপ আছে?
—আলাপ আবার নেই! দেখা হয় মাঝে মাঝে তার সেই মামার বাসায়, তখন ভারী যত্ন করে।
—কি রকম যত্ন করে?
—এই গল্পগুজব করে, উঠতে দেয় না, বলে, বসুন বসুন। খুব খাওয়ায়। এর নাম যত্ন আর কি। আমায় কত চিঠি লিখেছে লুকিয়ে।
—বলেন কি! চিঠিপত্র লিখেছে!
বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী একেবারে অভিভূত হইয়া পড়িল। ইহা সে কল্পনাও করিতে পারে না। মেয়েমানুষ লুকাইয়া যে চিঠি লেখে—সে চিঠি যে পায়, তাহার কি সৌভাগ্য না জানি! বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তীর অত্যন্ত ইচ্ছা হইল, সেসব চিঠিতে কি লেখা আছে জিজ্ঞাসা করে; কিন্তু নিতান্ত ভদ্রতাবিরুদ্ধ হয় বলিয়া, বিশেষত যখন বিপিনের সঙ্গে তাহার খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা নাই, সেকথা বলিতে পারিল না। শুধু বিস্ময়ের দৃষ্টিতে বিপিনের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
জয়কৃষ্ণ বলিল, বিশ্বেশ্বরবাবু, আপনার জীবনে এ রকম কখনো কিছু নিশ্চয় হয়েছে, বলুন না শুনি।
বিশ্বেশ্বর নিতান্ত হতাশ ও দুঃখিত ভাবে খানিকটা আপনমনেই বলিল, আমাদের এ রকম কখনও কেউ চিঠি লেখে নি, চিঠি লেখা তা দূরের কথা, কখনও কোনো মেয়ে কিছু বলেও নি, সাহস করে কাউকে কখনও কিছু বলতেও পারি নি মাস্টারবাবু, সত্যি বলছি, এই এত বয়স হল।
—বিয়েও তো করলেন না।
—বিয়ে কি করে করব মাস্টারবাবু, দেখতেই পাচ্ছেন সব। পঁচিশ টাকা মাইনে লিখি স্কুলের খাতায়, পাই পনরো টাকা। ন মাতা ন পিতা, মামার বাড়ি মানুষ হয়েছি দুঃখে-কষ্টে। তেমন লেখাপড়াও শিখিনি। মামাদের দোরে তাদের চাকরগিরি করে, হাটবাজার করে অতিকষ্টে ছাত্রবৃত্তি পাস করি।
জয়কৃষ্ণ বলিল, বিয়ে করলে আপনার লোক পেতেন বিশ্বেশ্বরবাবু। এর পরে দেখবেন, একজন মানুষ অভাবে কি কষ্ট হয়!
বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী বলিল, এর পর কেন, এখনই হয়। সত্যি বলছি মাস্টারবাবু, একটা ভালো কথা কখনও কেউ বলে নি, বড় দুঃখে এ কথা বলছি, কিছু মনে করবেন না, কারও মুখে একটা ভালোবাসার কথা, এই উনি যেমন বলছেন, এ তো কখনও শুনিই নি, কাকে বলে জানিও না। তাই এক এক সময় ভাবি, জীবনটা বৃথায় গেল মাস্টারবাবু, কিছুই পেলাম না।
বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী এমন হতাশ সুরে এ কথা বলিল যে, সে যে অকপটে সত্য কথা বলিতেছে, এ বিষয়ে বিপিনের কিছুমাত্র সন্দেহ হইল না। সে যে কিছুদিন আগেও ভাবিত, তাহার তুল্য অসুখী মানুষ দুনিয়ায় কেহ নাই, ইহার বৃত্তান্ত শুনিয়া বিপিনের সে ধারণা দূর হইল।
এই ভাগ্যহত দরিদ্র স্কুল-মাস্টারের উপর তাহার যেন একটা অহেতুক ভালোবাসা জন্মিল।
হঠাৎ মনে হইল, জয়কৃষ্ণ তাহার এতদিনের বন্ধু বটে, কিন্তু জয়কৃষ্ণের চেয়েও এই অর্ধপরিচিত বিশ্বেশ্বর চক্রবর্তী যেন তাহার অনেক আপন। ইহা দরিদ্রের প্রতি দরিদ্রের সমবেদনা নয়, দরিদ্রের প্রতি ধনীর করুণা।
কারণ বিপিন এখন ধনী। আজই এইমাত্র বিপিন ভালো করিয়া বুঝিয়াছে যে, সে কত বড় ধনী।
২
বাড়িতে আসিয়া প্রথম দিন পাঁচ-ছয় বলাই বেশ ভালো ছিল। বিপিন চাকুরিস্থলে চলিয়া গেলে সে একদিন গ্রামের নবীন রায় মহাশয়ের বাড়িতে বসিয়া আছে—নবীন রায়ের ছেলে বিষ্ণু বলিল, বলাইদা, মাংসের ভাগ নেবে? আমরা উত্তরপাড়া থেকে ভালো খাসি আনিয়েছি, এবেলা কাটা হবে। সাত আনা করে সের পড়তা হচ্ছে।
বলাই অতিরিক্ত মাংস খাওয়ার ফলেই অসুখ বাধাইয়াছিল। মাংস খাওয়া তাহার বারণ আছে, এবং দাদা বাড়ি থাকার জন্যই সে বিশেষ কিছু বলিতেও সাহস করে নাই। কিন্তু এখন আর সে ভয় নাই।
মনোরমা বারণ করিয়াছিল। বলাই বৌদিদিকে তত আমল দেয় না, ফলে তাহার মাংস খাওয়া কেহ বন্ধ করিতে পারিল না।
দুই তিন দিনের মধ্যে বলাই আবার অসুস্থ হইয়া পড়িল। বিপিন অসুখের খবর পাইয়াও বাড়ি আসিতে পারিল না, জমিদার অনাদিবাবু কিস্তির সময় ছুটি দিতে চাহিলেন না।
দিন কুড়ি পরে বিপিন বাড়ি আসিয়া দেখিল, বলাই একটু সুস্থ হইয়া উঠিয়াছে। বলাই বাড়ির সকলের হাতে পায়ে ধরিয়া দাদাকে মাংস খাওয়ার কথা বলিতে বারণ করিয়া দিয়াছিল। সুতরাং বিপিনের কানে সে কথা কেহ তুলিল না।
বিপিন এক দিন থাকিয়াই চলিয়া গেল। বলাই আবার কুপথ্য শুরু করিয়া দিল। কখনও লুকাইয়া, কখনও বা বাড়ির লোকের কাছে কান্নাকাটি করিয়া, আবদার ধরিয়া।
মাস দুই এইভাবে কাটিবার পরে বিপিন পাঁচ ছয় দিনের ছুটি লইয়া বাড়ি আসিল। তাহার বাড়ি আসিবার প্রধান কারণ, পৈতৃক আমলের ভাঙা চণ্ডীমণ্ডপটি এবার খড় তুলিয়া ভালো করিয়া ছাইয়া লইবে। এ সময় ভিন্ন খড় কিনিতে পাওয়া যাইবে না পাড়াগাঁয়ে।
বাড়ি আসিয়া প্রথমেই বলাইকে দেখিয়া বিপিনের বাড়ি আসিবার আনন্দ-উৎসাহ এক মুহূর্তে নিবিয়া গেল। একি চেহারা হইয়াছে বলাইয়ের! চোখ মুখ ফুলিয়াছে, রঙ হলদে, পায়ের পাতাও যেন ফুলিয়াছে মনে হইল; অথচ নেফ্রাইটিসের রোগী দিব্য মনের আনন্দে নির্বিচারে পথ্য-অপথ্য খাইয়া চলিয়াছে।
বিপিন কাহাকেও কিছু বলিল না, তাহার মন ভয়ানক খারাপ হইয়া গেল ভাইটার অবস্থা দেখিয়া। সেবার কিছু সুস্থ দেখিয়া গিয়াছিল, কোথায় সে ভাবিতেছে, এবার গিয়া দেখিবে, ভাইটি বেশ সারিয়া সামলাইয়া উঠিয়াছে—সারিয়া ওঠা তো দূরের কথা, রানাঘাট হাসপাতালে সেবার লইয়া যাওয়ার পূর্বে যা চেহারা ছিল তাহার চেয়েও খারাপ হইয়া গিয়াছে।
দুই দিন পরে বিপিন নদীর ধারে মাছ ধরিতে যাইবে, বলাই বলিল, দাদা, আমিও যাব তোমার সঙ্গে? বল তো যুগীপাড়া থেকে আর দু’খানা ছিপ নিয়ে আসি?
বলাই উঠিয়া হাঁটিয়া খাইয়া-দাইয়া বেড়াইত বলিয়া বাড়ির লোকে হয়তো ভাবে, তবে অসুখ এমন কঠিন আর কি! কারণ পাড়াগাঁয়ের ব্যাপার এই যে, শয্যাশায়ী এবং উত্থান-শক্তিরহিত না হওয়া পর্যন্ত কাহাকেও অসুস্থ বলিয়া ধারণা করিবার মতো বুদ্ধি সেখানে খুব কম লোকেরই আছে।
মাছ ধরিতে গিয়া দুইজনে নদীর ওপারে গিয়া বসিল, কারণ এপারে জলে শেওলার দাম বড় বেশি।
চার করিয়া ছিপ ফেলিয়া বিপিন বলিল, বলাই, একটু তামাক সাজ তো কল্কেটায়। আর মাঠ থেকে একটু গোবর কুড়িয়ে নিয়ে আয়, বড্ড চিংড়িমাছ জ্বালাচ্ছে, একটু ছড়িয়ে দিই।
বলাই বলিল, দাদা, গোবর দিলে চিংড়ি মাছ বেশি করে আসবে।
—তুই তো সব জানিস, দে আগে তামাকটা সেজে।
বেলা পড়িতে বেশি দেরি নাই। অনেকক্ষণ বিপিন ছিপ ফেলিয়া একমনে বসিয়া আছে, বলাইও তাহার পাশেই কিছু দূরে ছিপ ফেলিয়াছে। উভয়ের ছিপের ফাতনা নিবাতনিষ্কম্প প্রদীপের মতো স্তব্ধ। হঠাৎ বিপিন মুখ তুলিয়া ভাইয়ের দিকে চাহিতেই দেখিল, বলাইয়ের চোখ ছিপের ফাতনার দিকে নাই। সে গভীর মনোযোগের সঙ্গে একদৃষ্টে ওপারের দিকে চাহিয়া আছে। চাহিয়া চাহিয়া কি যেন দেখিতেছে।
কি দেখিতেছে বলাই?
বিপিন কৌতূহলী হইয়া ভাইয়ের দৃষ্টি অনুসরণ করিয়া ওপারের দিকে চাহিল। সঙ্গে সঙ্গে তাহার বুকের মধ্যে ছাঁৎ করিয়া উঠিল।
সে এতক্ষণ লক্ষ করে নাই, ওপারেই চটকাতলার শ্মশান। ওপারের জঙ্গলের বহু গাছপালার মধ্যে বিপিন লক্ষই করে নাই যে, তাহারা শ্মশানতলীর বুড়ো চটকাগাছটার ঠিক এপারে আসিয়া বসিয়াছে, সেদিকে মন দিবার কোনো কারণও ছিল না এতক্ষণ।
কিন্তু বলাই ওদিকে অমন ভাবে চাহিয়া আছে কেন?
বলাই যেন উদাস, অন্যমনস্ক। দাদা যে তাহার দিকে চাহিয়া দেখিতেছে, এ খেয়ালও তাহার নাই।
বিপিন বলিল, ওদিকে অমন করে কি দেখছিস রে?
বলাই চকিতে ওপারের দিক হইতে চোখ ফিরাইয়া লইয়া বলিল, না, কিছু না, এমনই।
বিপিন যেন খানিকটা আশ্বস্ত হইল, অথচ কেন যে আশ্বস্ত হইল, কি ভয়ই বা করিতেছিল, তাহা তাহার নিজের নিকট খুব যে স্পষ্ট হইয়া উঠিল, তাহা নহে। তবুও মনে মনে ভাবিল, কিছু না, এমনই চেয়ে ছিল।
কিন্তু কিছুক্ষণ ছিপের ফাতনার দিকে লক্ষ রাখিবার পরে ভাইয়ের দিকে আর একবার চোখ ফেলিতেই সে দেখিল, বলাই আবার পূর্ববৎ অন্যমনস্কভাবে ওপারের দিকে একদৃষ্টে চাহিয়া আছে।
বিপিন উদ্বিগ্নস্বরে জিজ্ঞাসা করিল, কি রে? কি দেখছিস বল তো?
বলাই বলিল, না, কিছু দেখছি না।—বলিয়াই সে যেন দাদার কাছে ধরা পড়িয়া যাওয়াটা ঢাকিয়া লইবার আগ্রহে অত্যন্ত উৎসাহের সহিত ছিপ তুলিয়া বঁড়শিতে নূতন কেঁচোর টোপ গাঁথিতে ব্যস্ত হইয়া পড়িল।
আবার খানিকক্ষণ কাটিয়া গেল। বেলা একদম পড়িয়া গিয়াছে। ওপারের বড় বড় শিমূল, শিরীষ বা তেঁতুল গাছের মগডালে পর্যন্ত একটুও রাঙা রোদের আভা নাই। মাঠের যেখানে তাহারা বসিয়াছে, তাহার আশেপাশে চিচ্চিড়ে ফলের বনে সারাদিনের রোদ পাইয়া রোদপোড়া ফলের শুঁটিগুলি পিড়িক পিড়িক শব্দ করিয়া ফাটিতেছে। এই সময়টা মাছ খায়, সুতরাং বিপিন ভাবিল, অন্তত আর আধ ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়া যাইবে।
হঠাৎ তাহাদের সামনে জলের মধ্যে একটা প্রকাণ্ড কচ্ছপ নিঃশব্দে ভাসিয়া উঠিয়া চার পা নাড়িয়া সাঁতার দিতে দিতে বলাইয়ের ছিপের দিকে লক্ষ করিয়াই যেন আসিতে লাগিল।
বিপিন বলাইকে কথাটা বলিতে গিয়া মুখ ফিরাইতেই দেখিল কচ্ছপটা যে ভাসিয়া উঠিয়াছে বা তাহারই ছিপের দিকে সাঁতারাইয়া আসিতেছে, বলাইয়ের সেদিকে দৃষ্টিই নাই, সে আবার সেই ভাবে ওপারের দিকে চাহিয়া আছে।
বিপিন ধমক দিয়া বলিল, এই! কি দেখছিস ওদিকে অমন করে? ওদিকে তাকাস নে।
কথাটা বলিয়া ফেলিয়াই বিপিনের মনে হইল, এ কথা বলাইকে এ ভাবে বলা ভালো হয় নাই। সঙ্গে সঙ্গে যে সন্দেহটা অমূলক বা অস্পষ্ট ছিল, সেটা যেন আরও স্পষ্ট হইয়া উঠিল।
বিপিনের হাতে পায়ে যেন বল কমিয়া গেল, মন বেজায় দমিয়া গেল। প্রায়ান্ধকার সন্ধ্যায় ওপারের চটকাতলার শ্মশানের মড়ার বাঁশ ও ফুটা কলসিগুলা যেন কি ভয়ানক অমঙ্গলের বার্তা প্রচার করিতেছে! ভাসমান কচ্ছপটাও! সে তাড়াতাড়ি ছিপ গুটাইয়া ভাইকে বলিল, নে, চল বাড়ি চল। সন্ধে হল। আমি ছিপগুলো বেঁধে নিই। তুই ততক্ষণ বাঁশতলার ঘাটে গিয়ে পারের নৌকো ডাক দে।
অসুস্থ ভাইটাকে শ্মশানের সান্নিধ্য হইতে যত তাড়াতাড়ি হয় সরাইতে পারিলে সে যেন বাঁচে।
বিপিনের মন কয়দিন যেমন হাল্কা ছিল, সর্বদা যেমন কি এক ধরনের আনন্দে ভরপুর ছিল, আজ আর তেমন অনুভব করিল না। কাহারও সহিত কথাবার্তা কহিতে ভালো লাগিল না, সকাল সকাল খাওয়া-দাওয়া সারিয়া সে নিজের ঘরে ঢুকিল।
পৈতৃক আমলের কুঠরির মেঝেতে সিমেন্ট চটিয়া উঠিয়া গিয়াছে বহুকাল, জানালার কবাট আলগা, ছেঁড়া নেকড়া ও কাঁঠাল কাঠের পিঁড়ি দিয়া উত্তরের জানালাটা আটকানো। জানালায় ঠেসানো আছে একগাদা শাবল, কুড়ুল, গোটা দুই পুরনো হুঁকো, একটা পুরনো টিনের তোরঙ্গ, সেজন্য ওদিকের জানালা খোলাই যায় না।
ঘরে খাট নাই, যে কয়খানা খাট ছিল, পূর্ববৎসর দারিদ্র্যের দায়ে বিপিন সস্তাদরে বিক্রয় করিয়া ফেলিয়াছিল। মায়ের ঘরে একখানা মাত্র জাম কাঠের সেকেলে তক্তপোশ ছিল, সম্প্রতি বলাইয়ের অসুখ বাড়িবার পর হইতে সেখানা বলাইয়ের জন্য দালানে পাতিয়া দেওয়া হইয়াছে। সুতরাং বিপিন নিজের ঘরে মেঝের উপর বিছানা পাতিয়াই শোয় আজ তিন বৎসর।
এক দিকে মাদুরের উপর কাঁথা পাতিয়া বিছানা করা, মনোরমা সেখানে খোকাখুকিকে লইয়া শোয়। ঘরের অন্য দিকে একখানা পুরনো তুলো-বার-হওয়া তোশক পাতিয়া বিপিনের জন্য বিছানা করা হইয়াছে; মশারি নাই, এতদিন অর্থাভাবে কেনা যায় নাই, চাকুরি হওয়ার পর হইতেও এমন কিছু বিপিন থোক টাকা কোনোদিন হাতে করিয়া বাড়ি আসে নাই, যাহা হইতে সংসার-খরচ চালাইয়া আবার মশারি কেনা যাইতে পারে।
সমস্ত রাত্রি মশায় ছিঁড়িয়া খায় বলিয়া মনোরমা সন্ধ্যাবেলা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করিয়া ঘুঁটের ও তুষের ধোঁয়ার সাঁজাল দেয়, যেমন গোহালে দেওয়া হয় তেমনই। আজও দিয়াছিল, এখনও ঘুঁটের মালসা ঘরের মেঝেতে বসানো, অল্প অল্প ধোঁয়া বাহির হইতেছে।
বিপিন শৌখিন মেজাজের লোক, ঘরে ঢুকিয়া ঘুঁটের মালসা দেখিয়াই চটিয়া গেল। অপর বিছানায় ভানু শুইয়া ছিল, তাহাকে ডাকিয়া বলিল, তোর মাকে ডেকে নিয়ে আয়।
মনোরমা ঘরে ঢুকিতেই বিরক্তির সুরে বলিল, এত রাত পর্যন্ত ঘুঁটের মালসা ঘরে? বলি এখানে মানুষ শোবে না এটা গোয়াল? নিয়ে যাও সরিয়ে!
মনোরমা বলিল, তা কি করব বল! ও দিলে তবুও মশা একটু কমে, নইলে শোয়া যায়! একদিন ধোঁয়া না দিলে মশায় টেনে নিয়ে যায় যে! অন্য কি উপায় আছে দেখিয়ে দাও না।
স্ত্রীর এই কথার মধ্যে তাহার মশারি কিনিবার অক্ষমতার প্রতি প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতের অস্তিত্ব অনুমান করিয়া বিপিন জ্বলিয়া উঠিল। বলিল, উপায় কি আছে না আছে এখন দেখবার সময় নয়। তুমি দয়া করে মালসাটা সরিয়ে নিয়ে যাবে?
মনোরমা আর বাক্যব্যয় না করিয়া হেতুভূত দ্রব্যটিকে ঘরের বাহিরে লইয়া গেল। সে একটা ব্যাপার আজ কয়েকদিন ধরিয়া বুঝিবার চেষ্টা করিতেছে। পলাশপুরে চাকরি হইবার পর হইতেই স্বামীর কেমন যেন রুক্ষ মেজাজ, আগে তাহার নানারকম বদখেয়াল ছিল, নেশাভাঙ করিত; বিষয়-আশয় উড়াইয়া দিয়াছে বটে, কিন্তু মনোরমা যখন তিরস্কার করিত, তখন সে শুনিয়া যাইত, মৃদু প্রতিবাদ করিত, দোষক্ষালনের চেষ্টা করিত, কিন্তু রাগিত না, বরং ভয়ে ভয়ে থাকিত।
আজকাল হইয়াছে উল্টা। মনোরমা কিছু করিলেও দোষ, না করিলেও দোষ। বিপিন যেন তাহার সব কিছুতেই দোষ দেখে। সামান্য ছুতা ধরিয়া যা-তা বলে। কেন যে এমন হইল, তাহা মনোরমা ভাবিয়া পায় না।
৩
মনোরমা আর এক বিপদে পড়িয়াছে।
বীণা-ঠাকুরঝি বয়সে তাহার অপেক্ষা দুই বছরের ছোট। বিধবা হওয়ার পরে এই সংসারেই আছে, শ্বশুরবাড়ি যায় না, কারণ শ্বশুরবাড়িতে এমন কেহ আপনার জন নাই যে তাহাকে লইয়া যায়। উনিশ বছর বয়সে বিধবা হয়, এখন বছর একুশ-বাইশ বয়স। মনোরমার নিজের বয়স চব্বিশ।
সে কথা যাক।
এখন বিপদ হইয়াছে এই, আজ প্রায় ছয় সাত মাস ধরিয়া মনোরমা লক্ষ করিতেছে, গ্রামের তারক চাটুজ্জের ছেলে পটল যখন-তখন ছুতা নাতায় এ বাড়িতে যাতায়াত করে এবং বীণার সঙ্গে মেলামেশা করে।
ইহাতে মনোরমা প্রথমে কিছু মনে করে নাই, সে শহর-বাজারের মেয়ে, তাহার বাপের বাড়িতেও বিশেষ গোঁড়ামি নাই ও-বিষয়ে। ছেলে আর মেয়ে একসঙ্গে মিশিলেই যে খারাপ হইয়া যাইবে, সে বিশ্বাস তাহার জ্যাঠামশায়ের নাই সে জানে। মনোরমা বাবাকে দেখে নাই, জ্যাঠামশায়ই তাহাকে মানুষ করিয়াছেন।
কিন্তু এ ঠিক সে রকমের নয়।
সন্দেহ একদিনে হয় নাই। একটু একটু করিয়া বহুদিনে হইয়াছে।
বিবাহ হইবার পরে এ বাড়িতে আসিয়া মনোরমা পটলকে এ বাড়িতে তত আসিতে দেখিত না, যত সে দেখিতেছে আজ প্রায় বছরখানেক। তাহার মধ্যে ছয়-সাত মাস বাড়াবাড়ি। বীণা-ঠাকুরঝিও আজকাল যেন পটল আসিলে কি রকম চঞ্চল হইয়া উঠে। রাঁধিতে বসিয়াছে, হয়তো পটলের গলার স্বর শোনা গেল দালানে, শাশুড়ির সঙ্গে কথা কহিতেছে। এদিকে বীণা হয়তো এক ঘণ্টার মধ্যে রান্নাঘর হইতে বাহির হয় নাই, কোনো না কোনো ছুতা খুঁজিয়া সে রান্নাঘর হইতে বাহির হইবেই। দালানে যাইয়া পটলের সঙ্গে খানিকটা কথা কহিয়া আসিবেই। এ মাত্র একটা উদাহরণ, এ রকম অনেক আছে।
ইহাও না হয় মনোরমা না ধরিল।
একদিন সিঁড়ির পাশে অন্ধকারে সন্ধ্যাবেলায় দাঁড়াইয়া সে দুইজনকে চুপি চুপি কি কথাবার্তা বলিতে দেখিয়াছে। শাশুড়ি সন্ধ্যার পর চোখে ভালো দেখেন না, নিজের ঘরে খিল দিয়া জপ-আহ্নিক করেন ঘণ্টাখানেক কি তাহারও বেশি, সে নিজেও এই সময়টা ছেলেমেয়ের তদারক করিতে, রাত্রের রান্নার যোগাড় করিতে ব্যস্ত থাকে, আর ঠিক কিনা সেই সময়েই ওই পোড়ারমুখো পটল চাটুজ্জে!
বীণা-ঠাকুরঝিও যেন লুকাইয়া দেখা করিতে আগ্রহ দেখায়, ইহার প্রমাণ সে পাইয়াছে। অথচ পটলের বয়স ত্রিশ-বত্রিশ কি তারও বেশি; পটল বিবাহিত, তার ছেলেমেয়ে চার-পাঁচটি। তাহার কেন এত ঘন ঘন যাওয়া-আসা এখানে, একজন অল্পবয়সী বিধবার সঙ্গে এত কথাবার্তাই বা তাহার কিসের? বিশেষ যখন বাড়িতে কোনো পুরুষমানুষ আজকাল থাকে না। বলাই তো এতদিন হাসপাতালেই ছিল, শাশুড়ি চোখে দেখেন না, তাঁহার থাকা না-থাকা দুই সমান।
বীণা-ঠাকুরঝির সঙ্গে এ কথা কহিয়া কোনো লাভ নাই, মেয়েমানুষের মন দিয়া মনোরমা তাহা বুঝিয়াছে। বীণা কথাটা উড়াইয়া দিবে, অস্বীকার করিবে, পরে রাগ করিবে, ঝগড়া করিবে।
শাশুড়িকে বলিয়াও কোনো লাভ নাই। তিনি অত্যন্ত সরল, বিশ্বাস করিবেন না, বিশেষ করিয়া তিনি নিরেট ভালোমানুষ, তাঁহার কথা ঠাকুরঝি শুনিবেও না। বরং বউদিদির কথা শুনিলেও শুনিতে পারে, কিন্তু মার কথা সে গায়ে মাখিবে না।
অতিরিক্ত আদর দিয়া শাশুড়ি বীণা-ঠাকুরঝির মাথাটি খাইয়াছেন।
মনোরমার ইচ্ছা ছিল বিপিনকে কথাটা বলিবার। কিন্তু স্বামীর মেজাজ আজকাল যেন সর্বদাই চটা, এ কথা বলিলে যদি আরও চটিয়া যায়, মনোরমাকেই গালাগালি করে, এজন্য তাহার ভয় করে কথাটা পাড়িতে।
মনোরমা সংসারী ধরনের মেয়ে। তাহার সমস্ত মনপ্রাণ সংসারে পড়িয়া থাকে। জ্যাঠামশায় যখন তাহার বিবাহ দেন এ বাড়িতে তখন ইহাদের অবস্থা সচ্ছল ছিল। শ্বশুর চোখ বুজিতেই সব গেল। স্বামীকে বুঝাইয়া বলিবার বয়স তখন হয় নাই মনোরমার। স্বামী বিষয়-আশয় উড়াইয়া দিয়া এমন অবস্থা করিল সংসারের যে, অমন দুর্দশার অভিজ্ঞতা কখনও ছিল না অবস্থাপন্ন গৃহস্থের মেয়ে মনোরমার। তাহার জ্যাঠামশায় একজন অবসরপ্রাপ্ত সাবজজ, জাঠতুতো ভাইয়েরা কেহ উকিল, কেহ ডাক্তার। জ্যাঠামশায় যখন বারাসতের মুন্সেফ তখন এখানে তাহার বিবাহ দেন। সে শুধু বিনোদ চাটুজ্জের নামডাকের জোরে। তখন ভাবিয়াছিলেন, পাড়াগাঁয়ের সচ্ছল গৃহস্থের ঘর, ভাইঝি সুখেই থাকিবে। মনোরমার গায়ে গহনা কম দেন নাই জ্যাঠামশায় বিবাহের সময়, তাহার কিছুই অবশিষ্ট নাই, দুইগাছা রুলি ছাড়া। পাছে কেহ কিছু মনে করে বলিয়া মনোরমা বাপের বাড়ি যাওয়াই ছাড়িয়া দিয়াছে। এত করিয়াও স্বামীর মন পাইবার জো নাই। সবই তাহার অদৃষ্ট।
শাশুড়ির বাতের বেদনা আছে। খাওয়া-দাওয়া সারিয়া সে শাশুড়ির ঘরে তাপ-সেক করিতে লাগিল। বিপিনের মা পুত্রবধূকে অত্যন্ত ভালোবাসেন। মনোরমা যে ভাবে শাশুড়ির সেবা করে, বীণার নিকট হইতেও তিনি তাহা পান না; যদিও এ কথা বলা চলে না যে, বীণা মায়ের সম্বন্ধে উদাসীন। বীণা নিজের ধরনে মায়ের যত্ন করে। সে সংসার তেমন করিয়া কখনও করে নাই, অল্প বয়সে বিধবা হইয়াছে, ছেলেপুলে নাই; মনেপ্রাণে সে যেন এখনও অবিবাহিতা বালিকা। তাহার ধরনধারণ বালিকার মতোই, গোছালো-গাছালো সংসারী ধরনের মেয়ে সে কোনো কালেই নয়, হইবেও না। মেয়ের উপর বিপিনের মায়ের অত্যন্ত দরদ—ছোট মেয়ের উপর মায়ের যেমন স্নেহ থাকে তেমনই। বিপিনের মা বোঝেন, বীণার জীবনের শূন্যস্থান তিনি কোনো কিছু দিয়াই পুরাইতে পারিবেন না; এখনও সে ছেলেমানুষ, ঠিকমতো হয়তো বোঝে না তাহার কি হইয়াছে, কিন্তু যত বয়স বাড়িবে, মা চলিয়া যাইবে, মুখের দিকে চাহিবার কেহ থাকিবে না, তখন সে নিজের স্বামী-পুত্রহীন জীবনের শূন্যতা উপলব্ধি করিবে। তারপর যতদিন বাঁচিবে, সম্মুখে আশাহীন, আনন্দহীন, ধূ-ধূ মরুভূমি। তাহার মধ্যবয়সের সে শূন্যতা পূরিবে কিসে? তবুও যে দুইদিন হতভাগী নিজের অবস্থা বুঝিতে না পারে, সে দুইদিনই ভালো। তা ছাড়া কি সুখের মধ্যেই বা সে এখন আছে?
মা মধ্যে মধ্যে তাহাও ভাবেন।
বীণা শ্বশুরবাড়ি হইতে আনিয়াছিল খানকতক সোনার গহনা ও নগদ দেড়শো টাকা। বিপিন ব্যবসা করিবে বলিয়া বোনের টাকাগুলি চাহিয়া লইল, অবশ্য তাহার উদ্দেশ্য ভালোই ছিল, কিন্তু টাকা বাকি পড়িয়া মুদিখানার দোকান ডুবিয়া গেল। বীণার টাকাগুলিও ডুবিল সেই সঙ্গে।
ইহার পরও বীণার দুইখানা গহনা বিপিন চাহিয়া লইয়া বিক্রয় করিয়া বলাইকে লাঙল গরু কিনিয়া দিয়াছিল চাষবাসের জন্য। তখন সংসারের ভয়ানক দুরবস্থা যাইতেছিল, সকলে পরামর্শ দিল, জমি এখনও যাহা আছে, নিজেরা লাঙল রাখিয়া চাষ করিলে ভাতের ভাবনা হইবে না। বলাইও ধরিল, দাদা আমাকে লাঙল গরু করে দাও, সংসারের ভার আমি নিচ্ছি।
বিপিন স্ত্রীকে বলিল, ওগো, শোন একটা কথা। বীণাকে বল না ওর হারগাছটা দিতে। আমি এখন বেচে বলাইকে গরু কিনে দিই, তারপর বীণাকে আবার গড়িয়ে দোব।
মনোরমা বলিল, তুমি বেশ মজার মানুষ তো! একবার ওর দেড়শো টাকা নিলে, আর উপুড়-হাত করলে না—আবার চাইছ গলার হার! ওর ওই সামান্য ব্যাঙের আধুলি পুঁজি, শেষে ওকে কি পথে দাঁড় করাবে? আমি ও কথা বলতে পারব না।
অগত্যা বিপিনই গিয়া বীণাকে কথাটা বলিল।
—তোর কোনো ভাবনা নেই আমি যতদিন আছি। বলাইকে লাঙল গরু কিনে দিই ওই হারগাছটা বেচে, তারপর তোকে গড়িয়ে দোব এর পরে। তোর আগের টাকাও আস্তে আস্তে শোধ দোব। কিছু ভাবিস নি তুই।
বীণা বলিল, আমার আবার ভাবাভাবি কি, হার দরকার হয় নাও না, তবে বলে দিচ্ছি, বাবার আমলে যেমন গোলা ছিল অমনই গোলা তুলতে হবে কিন্তু বাইরের উঠোনে। গোলা চলে গিয়ে চণ্ডীমণ্ডপের সামনের উঠোনটা ফাঁকা ফাঁকা দেখাচ্ছে। আর আমি, বৌদি, মা, তুমি, বলাই—সবাই মিলে নৌকো করে একদিন কালীতলায় বেড়াতে যাব, কেমন তো?
দিনকতক চাষবাস চলিয়াছিল ভালো। বলাই নিজে দেখিত শুনিত, গরুরগাড়ি নিজে হাঁকাইত। হঠাৎ বলাইয়ের অসুখ হইয়া সে সব গেল। চিকিৎসার জন্য গরু-জোড়া বিক্রয় করিতে হইল। সুতরাং বীণার হারছড়াটাও গেল।
তারপর এই দুর্দশার সংসারে বীণা পেট ভরিয়া খাইতে পায় না, ছেঁড়া কাপড় সেলাই করিয়া পরে, রাত্রে একমুঠা চাল চিবাইয়া জল খাইয়া সারারাত কাটায়। ছেলেমানুষ—একটা সাধ নাই, আহ্লাদ নাই, মা হইয়া তিনি সবই তো দেখিতেছেন।
বীণা টাকা বা গহনার জন্য কখনও দাদাকে কিছু বলে নাই, তেমন মেয়ে সে নয়। এখনও গাছকতক চুড়ি অবশিষ্ট আছে, দাদা চাহিলে সে দিতে আপত্তি করিত না, কিন্তু বিপিন লজ্জায় পড়িয়াই বোধ হয় চাহিতে পারে নাই।
বীণার কি হইবে ভাবিয়া তাঁহার রাত্রে ঘুম হয় না। তিনি নিজের ঘরে নিজের বিছানায় বীণাকে বুকে করিয়া শুইয়া থাকেন। বীণা যে এখনও কত ছেলেমানুষ আছে, ইহা তিনি ভিন্ন আর কে বোঝে? স্বামীর ঘর কয়দিন করিয়াছিল সে? তখন তাহার বয়সই বা কত?
এক এক দিন তিনি একটু আধটু রামায়ণ মহাভারত শুনিতে চান। নিজে চোখে আজকাল তেমন দেখিতে পান না রাত্রে, মনোরমা যদি অবসর পায়, সে-ই আসিয়া পড়িয়া শোনায়, নয় তো বীণাকে বলেন, বউমা আজ ব্যস্ত আছে, একটুখানি বই পড় তো বীণা!
বীণা একটু অনিচ্ছার সহিত বই লইয়া বসে। সে পড়িতে পারে ভালোই, কিন্তু পড়িয়া শুনাইতে তাহার ভালো লাগে না। মনে মনে নিজে পড়িতে ভালোবাসে। আধ ঘণ্টাটাক পড়িয়া শুনাইবার পরে বই হঠাৎ সশব্দে বন্ধ করিয়া বলে, আজ থাক মা, আমার ঘুম পাচ্ছে।
আজকাল বিপিনের চাকুরি হওয়া পর্যন্ত রাত্রে এক পোয়া আটার রুটি হয় বীণার জন্য। আগে এমন একদিনও গিয়াছে বীণা কিছু না খাইয়া রাত কাটাইয়াছে, আটা ময়দা কিনিবার পয়স তো দূরের কথা, বাড়িতে এক মুঠো চাল থাকিত না যে ভাজিয়া খায়। আজকাল মনোরমাই এ বন্দোবস্ত করিয়াছে, একসঙ্গে আটা আনিয়া রাখে, বীণার যাহাতে এক সপ্তাহ চলে। শাশুড়ি রাত্রে একটু দুধ ছাড়া কিছু খান না, সহ্য হয় না। বীণা রাত্রে না খাইয়া কষ্ট পাইত, মনোরমা তাহা সহ্য করিতে পারিত না। সে অত্যন্ত গোছালো সংসারী মানুষ, তাহার সংসারে কেহ কষ্ট পায়, ইহা সে দেখিতে পারে না। তবে আজকাল আবার বলাইয়ের অসুখ হইয়া মুশকিল বাধিয়াছে, বীণার জন্য তোলা আটায় তাহাকেও রুটি করিয়া দিতে হয় রাত্রে। অথচ বেশি করিয়া আনিবার পয়সা নাই। বিপিন যে টাকা পাঠায় তাহাতে সবদিকে সঙ্কুলান হওয়া দুষ্কর। বেশি পয়সা চাহিলেও বিপিন দিতে পারে না।
মনোরমা যে ভাবে সংসার গুছাইয়া রাখিতে চায়, নানা কারণে তাহা ঘটিয়া উঠে না। সবাই সুখে থাকুক, মনোরমার সেদিকে অত্যন্ত নজর। পটলের সহিত বীণার মেলামেশা ঠিক এই কারণেই তাহার মনে উদ্বেগের সৃষ্টি করিয়াছে। কি হইতে কি হইবে, সংসারটি ওলট-পালট হইয়া যাইবে মাঝে পড়িয়া, এসব পাড়াগাঁয়ে একটুখানি কোনো কথা লোকের কানে গেলে ঢি-ঢি পড়িয়া যাইবে, সে তাহা খুব ভালোই বোঝে। এখন কি করা যায়, তাহাই হইয়া উঠিয়াছে মনোরমার মস্ত সমস্যা। আজ সাহস করিয়া মনোরমা কথাটা বিপিনের কাছে পাড়িবে ভাবিয়া বলিল, শোন, একটা কথা বলি!
বিপিনের মেজাজ ভালো ছিল না। বিরক্তির সুরে বলিল, কি কথা?
মনোরমা ভয় পাইল। বিপিনের মেজাজ সে খুব ভালোই বোঝে। আজ এইমাত্র সন্ধ্যাবেলা তো আগুনের মালসা লইয়া একপালা হইয়া গিয়াছে, থাক গে, কাল কি পরশু কি আর একদিন—এত তাড়াতাড়ি কথাটা স্বামীকে শুনাইবার কোনো কারণ উপস্থিত হয় নাই। আজ অন্তত দরকার নাই।
৪
কিন্তু পরদিনই একটা ঘটনায় মনোরমার সন্দেহ বাড়িয়া গেল। সন্ধ্যার কিছু পরে তাহার হঠাৎ মনে পড়িল, ছাদে একখানা কাঁথা রোদে দিয়াছিল, তুলিতে ভুলিয়াছে। সিঁড়ি দিয়া উপরে উঠিবার সময়ে সিঁড়ির পাশের ঘুলঘুলি দিয়া দেখিল, বাড়ির পাশে কাঁঠালতলায় কে যেন দাঁড়াইয়া আছে। চোখের ভুল ভাবিয়া সে সরাসরি উপরে উঠিয়া গেল এবং ছাদের আলিসা হইতে কাঁথাখানা লইয়া যখন নীচে নামিতেছে, তখন মনে হইল, চিলে-কোঠার আড়ালে যেন কিসের শব্দ হইল। মনোরমা ঘুরিয়া গিয়া দেখিল, চিলে-কোঠার আড়ালে তাহার দিকে পিছন ফিরিয়া দাঁড়াইয়া আছে বীণা, এবং যেন নীচে বাগানের দিকে চাহিয়া আছে। বউদিদির পায়ের শব্দে বীণা চমকিয়া পিছন দিকে চাহিল। মনোরমা বলিল, বীণা-ঠাকুরঝি এখানে দাঁড়িয়ে একলাটি?
বীণা নীরস সুরে বলিল, হ্যাঁ, এমনিই দাঁড়িয়ে আছি।
—এস নীচে নেমে। অন্ধকার সিঁড়ি, এর পর নামতে পারবে না।
—খুব পারব। তুমি যাও, বড্ড অন্ধকার এখনও হয় নি। যাচ্ছি আমি।
মনোরমা সিঁড়ি দিয়া নামিতে নামিতে ঘুলঘুলি দিয়া কি জানি কেন একবার চাহিয়া দেখিল, এবং সঙ্গে সঙ্গে তাহার চোখে পড়িল, বাড়ির বাহিরের দিকের দেওয়াল ঘেঁষিয়া কে একজন আসশেওড়ার ঝোপের মধ্যে গুঁড়ি মারিয়া বসিয়া আছে।
মনোরমার ভয় হইল। চোর বা কোনো বদমাইশ লোক নিশ্চয়ই। সে কাঠের মতো আড়ষ্ট হইয়া লোকটার দিকে চাহিয়া আছে, এমন সময় লোকটা উঠিয়া দাঁড়াইল। মনোরমা দেখিল, সে পটল চাটুজ্জে। পটল টের পায় নাই যে মনোরমা ঘুলঘুলি দিয়া চাহিয়া আছে, সে ছাদের দিকে চোখ তুলিয়া একবার হাসিয়া নিম্নসুরে বলিল, চললাম আজ, সন্ধে হয়ে গেল। কাল যেন দেখা পাই, কথা আছে।
মনোরমার মাথা ঘুরিয়া গেল। এসব কি কাণ্ড! চাটুজ্জের এরকম লুকাইয়া দেখা করিবার হেতু কি? সন্ধ্যার অন্ধকারে মশার কামড়ের মধ্যে শেওড়াবনে গুঁড়ি মারিয়া লুকাইয়া বীণা-ঠাকুরঝির সঙ্গে কথা বলিবার কোনো কারণ নাই, যখন সে সোজা বাড়ির মধ্যে আসিয়া প্রকাশ্যভাবেই বীণার সঙ্গে আলাপ করিতে পারে! তাহাকে তো কেউ বাড়ি ঢুকিতে নিষেধ করে নাই!
সেই রাত্রেই মনোরমা বিপিনকে কথাটা বলিবে ঠিক করিল। কিন্তু হঠাৎ রাত দশটার সময় বলাইয়ের অসুখ বড় বাড়িল। ঠিক যখন সকলে খাওয়া-দাওয়া সারিয়া শুইতে যাইবে, সেই সময়। বলাই রোগের যন্ত্রণায় চিৎকার করিতে লাগিল আর কেবলই বলিতে লাগিল, সর্বশরীর জ্ব’লে গেল, ও মা!…পাড়ার প্রবীণ লোক গোবর্ধন চাটুজ্জে আসিলেন। পাশের বিপিনদের জ্ঞাতি ও সরিক ধনপতি চাটুজ্জে আসিলেন। পাড়ার ছেলেছোকরা এবং মেয়েরা কেহ কেহ আসিল। প্রকৃত সাহায্য পাওয়া গেল গোবর্ধন চাটুজ্জের কাছে। তিনি পুরনো তেঁতুলের সঙ্গে কি একটা মিশাইয়া বলাইয়ের সারা গায়ে লেপিয়া দিতে বলিলেন। তাহাতেই দেখা গেল, যন্ত্রণার কিছু উপশম ঘটিল। সারারাত বিপিনের মা রোগীর বিছানায় বসিয়া তাহাকে পাখার বাতাস দিতে লাগিলেন। বীণা রাত একটা পর্যন্ত জাগিয়া রোগীর কাছে বসিয়া ছিল, তাহার মায়ের বারবার অনুরোধে অবশেষে সে শুইতে গেল।
মনোরমা প্রথমটা এ ঘরে বসিয়া ছিল, কিন্তু তাহার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে মায়ের কাছ ছাড়া হইলেই রাত্রে কাঁদে, বিশেষ করিয়া ভানুটা। বিপিনের মা বলিলেন, বউমা, তুমি ছেলেদের নিয়ে শোও গে, তবুও ওরা একটু চুপ করে থাকবে। সবাই মিলে চেঁচালে বাড়িতে তিষ্ঠনো যাবে না। তুমি উঠে যাও।
বিপিন একবার করিয়া একটু শোয়, আবার একটু রোগীর কাছে বসে; এই ভাবে রাত কাটিয়া গেল।
