Close Menu
এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    What's Hot

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)
    • 📙
    • লেখক
    • শ্রেণী
      • ছোটগল্প
      • ভৌতিক গল্প
      • প্রবন্ধ
      • উপন্যাস
      • রূপকথা
      • প্রেমকাহিনী
      • রহস্যগল্প
      • হাস্যকৌতুক
      • আত্মজীবনী
      • ঐতিহাসিক
      • নাটক
      • নারী বিষয়ক কাহিনী
      • ভ্রমণকাহিনী
      • শিশু সাহিত্য
      • সামাজিক গল্প
      • স্মৃতিকথা
    • কবিতা
    • লিখুন
    • চলিতভাষার
    • শীর্ষলেখক
      • রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
      • বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
      • শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
      • বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
      • সত্যজিৎ রায়
      • সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
      • বুদ্ধদেব গুহ
      • জীবনানন্দ দাশ
      • আশাপূর্ণা দেবী
      • কাজী নজরুল ইসলাম
      • জসীম উদ্দীন
      • তসলিমা নাসরিন
      • মহাশ্বেতা দেবী
      • মাইকেল মধুসূদন দত্ত
      • মৈত্রেয়ী দেবী
      • লীলা মজুমদার
      • শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
      • সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
      • সমরেশ মজুমদার
      • হুমায়ুন আহমেদ
    • English Books
      • Jules Verne
    • 🔖
    • ➜]
    Subscribe
    এক পাতা গল্প বাংলা গল্প | Bangla Golpo | Read Best Bangla Stories @ Ekpatagolpo (Bangla)

    বিপিনের সংসার – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এক পাতা গল্প268 Mins Read0
    ⤶ ⤷

    বিপিনের সংসার – ৭

    সপ্তম পরিচ্ছেদ

    ১

    বেলা পড়িলে বিপিন পলাশপুরে পৌঁছিল।

    বাহিরের বৈঠকখানায় শ্যামহরি চাকর ঝাঁট দিতেছিল, বিপিন বলিল, বাবু কোথায় রে?

    —রানাঘাট গিয়েছেন আজ সকালবেলা। সন্দের সময় আসবেন বলে গিয়েছেন।

    —রানাঘাটে কেন?

    —উকিলবাবু পত্তর দিয়েছেন, বলছিলেন গিন্নিমাকে—কি মামলার কথা আছে। আপনার কথাও হচ্ছিল।

    —আমার কথা?

    —হ্যাঁ, বাবু বলছিলেন, ধোপাখালির কাছারি থেকে আপনি টাকা নিয়ে এলি আপনাকে রানাঘাট পাঠাবেন। টাকার বড্ড দরকার নাকি—

    —বাড়িতে কে কে আছেন?

    —গিন্নিমা আছেন, দিদিমণি আছেন। দিদিমণিকে নিতে আসবেন কিনা জামাইবাবু, তাই বাবু বলছিলেন আপনার নাম করে, আপনি এই সময় টাকা নিয়ে এসে পড়লে ভালো হয়, খরচপত্তর আছে।

    —ও। তা এর মধ্যে আসবেন বুঝি?

    —আজ্ঞে, পরশু বুধবারে তো শুনছিলাম আসবেন।

    —বেশ বেশ, খুব ভালো কথা। জামাইবাবুর সঙ্গে দেখাটা হয়ে যাবে এখন এই সময় তা হলে। তুই যা দিকি বাড়ির মধ্যে। গিন্নিমাকে বল, আমি এসেছি। আর আমার সঙ্গে টাকা রয়েছে কিনা—সেগুলো কি তাঁর হাতে দোব, না বাবু এলে বাবুকে দোব, জিজ্ঞেস করে আয়।

    শ্যামহরি বাড়ির মধ্যে ঢুকিবার একটু পরেই স্থানীয় পুরোহিত বটুকনাথ ভট্টাচার্য আসিয়া হাজির হইলেন। তিনি বৈঠকখানায় উঁকি দিয়া বলিলেন, কে বসে? বিপিন? বাবু কোথায়?

    বিপিন আশা করিতেছিল এই সময় অনাদিবাবু বাড়ি নাই, মানী তাহার আসিবার খবর শুনিয়া বৈঠকখানায় আসিতে পারে। কিন্তু মানীর পরিবর্তে বৃদ্ধ বটুক ভটচাজকে দেখিয়া বিপিনের সর্বশরীর জ্বলিয়া গেল।

    মুখে বলিল, আসুন ভটচাজ মশাই, বাবু নেই, রানাঘাটে গিয়েছেন মামলার তদারক করতে। কখন আসবেন ঠিক নেই, আজ বোধ হয় আসবেন না।

    এই উত্তর শুনিয়া বুড়া চলিয়া যাইবে এই আশা করাই স্বাভাবিক, কিন্তু তাহা না গিয়া সে দিব্য জাঁকিয়া বসিয়া গেল। বিপিন প্রমাদ গনিল, বৃদ্ধ অত্যন্ত বকবক করে সে জানে, বকুনি পাইলে উঠিতে চায় না—মাটি করিল দেখিতেছি! বাহিরের ঘরে অন্য লোকের গলার আওয়াজ পাইলে মানী সেখানে পা দিবে না। অনাদিবাবু বাড়ি নাই—এমন ঘটনা ক্বচিৎ ঘটে, সাধারণত তিনি কোথাও বাহির হন না। মানীও চলিয়া যাইতেছে, এমন একটা সুবর্ণ-সুযোগ যদি বা ঘটিল তাহার সহিত নির্জনে দুইটা কথা বলিবার, তাহাও যাইতে বসিয়াছে! বটুক ভটচাজ বলিল, মামলা? কিসের মামলা?

    বিপিন উদাস নিস্পৃহ সুরে বলিল, আজ্ঞে তা ঠিক বলতে পারছি না। শুনলাম, উকিল সুরেনবাবু চিঠি লিখেছিলেন!

    —সুরেন উকিল? কোন সুরেন? সুরেন মুখুজ্জে?

    —আজ্ঞে না, সুরেন তরফদার।

    —কালী তরফদারের ছেলে? সুরেন আবার কি হে, ওকে আমরা পটলা বলে জানি। ছেলেবেলা থেকে ওদের বাড়িতে আমার যাতায়াত, অবিশ্যি আমি ক্রিয়াকর্ম কখনও করি নি ওদের বাড়ি। শূদ্রযাজক হতে পারতাম যদি, তা হলে আজ এ দুর্দশা ঘটত না। কিন্তু আমার কর্তা মশায়ের নিষেধ আছে। তিনি মরবার সময় বলে গিয়েছিলেন, বটুক না খেয়ে কষ্ট যদি পাও সেও ভালো, কিন্তু নারায়ণ-শিলা-হাতে শুদ্দুরের বাড়ি কখনও ঢুকো না। আমাদের বংশে ও কাজ কখনও কেউ করে নি, বুঝলে?

    বিপিন বলিল, হুঁ।

    —তা সেই পটলা আজ উকিল হয়েছে, কালী তরফদার মারা যাওয়ার পর হাতে কিছু টাকাও আজকাল পেয়েছে শুনেছি। তা ছাড়া টাকা জমাতে কি করে হয়, তা ওরা জানে। হাড়কঞ্জুষ ছিল সেই কালী তরফদার, তার ছেলে তো? ওদের আদি বাড়ি শান্তিপুর, তা জান তো? ওর জ্যাঠামশায় এখনও শান্তিপুরের বাড়িতেই থাকে। জমিজমা আছে শান্তিপুরে। বেশ বড় বাড়ি, দোমহলা।

    —ও।

    —অনেকদিন আগে একবার শান্তিপুর গিয়েছি রাস দেখতে, ভারি যত্ন-আত্যি করলে আমাদের। শান্তিপুরের রাস দেখেছ কখনও? দেখবার মতো জিনিস; অত বড় মেলা এ দিগরে হয় না কোথাও।

    —ও।

    —এখানে তামাক-টামাক দেবার কেউ নেই? বল না একটু ডেকে! আর একটু চা যদি হয়, কাউকে বলে পাঠাও না! আমি এসেছি শুনলেই বউমা চা পাঠিয়ে দেবেন। তবে শোন, একটা রাসের মেলার গল্প করি। সেবার হল কি জান—ওই যে চাকরটা যাচ্ছে—ও শ্যামহরি, শোন একবার এদিকে বাবা, বাড়ির মধ্যে যা তো, বলগে, ভটচাজ্যি মশাই একটু চা খেতে চাইছেন, আর একবার এক কলকে তামাক দিয়ে যা তো বাবা! বিপিন চা খাবে কি? ও কি, উঠছ কোথায়? বস, বস!

    —আজ্ঞে, আপনি বসে চা খান, আমি একটু তাগাদায় যাব ওপাড়ায়, বাবু বলে গিয়েছেন, কিছু টাকা পাওয়া যাবে, এখন না গেলে হবে না, সন্ধে হয়ে এল। আমি আসি।

    বিপিন বাহির হইয়া পড়িল। বটুক ভটচাজের সঙ্গে বসিয়া গল্প করা বর্তমানে তাহার মনের অবস্থায় সম্ভব নয়।

    সব নষ্ট হইয়া গেল। অনাদিবাবু সন্ধ্যার পরই আসিয়া পড়িবেন। তাহাকে তাঁহার সঙ্গে বসিয়া মুখ বুজিয়া খাইতে হইবে; তাহার পর বৈঠকখানায় আসিয়া চুপচাপ শুইয়া পড়িতে হইবে। হয়তো সে সময়ে অনাদিবাবু গড়্গড়া হাতে বাহিরে আসিয়া তাহাকে জমিদারি সংক্রান্ত কিছু উপদেশ দিবেন, তাহাও শুনিতে হইবে। তারপর কাল সকালে আর সে কোন ছুতায় পলাশপুরে বসিয়া থাকিবে? তাহার তো আসার কথাই ছিল না, টাকা আনিবার ছুতায় সে আসিয়াছে। টাকা ইরশালে ধরা হইয়া গিয়াছে, তাহার কাজও শেষ হইয়াছে। যাও চলিয়া ধোপাখালির কাছারি—মিটিয়া গেল।

    বিপিন উদভ্রান্তের মতো কিছুক্ষণ রাস্তায় রাস্তায় পায়চারি করিয়া বেড়াইল। সন্ধ্যার বেশি দেরি নাই, হয়তো এতক্ষণ অনাদিবাবু আসিয়া পড়িয়াছেন। আচ্ছা, সে একটু দেরি করিয়াই যাইবে।

    সন্ধ্যার অন্ধকার ঘোর-ঘোর হইতে বিপিন ফিরিল। উঁকি মারিয়া দেখিল, বটুক ভটচাজ বৈঠকখানায় বসিয়া আছে কিনা। না, কেহই নাই। অনাদিবাবুও আসেন নাই, কারণ উঠানে তাহা হইলে গরুরগাড়ি থাকিত। বাড়ির গরুরগাড়ি করিয়া গিয়াছেন, তাহাতেই ফিরিবেন।

    গাড়ি উঠানে না দেখিয়া বিপিন যে খুব আশ্বস্ত হইল, তাহা নয়। আসেন নাই বটে, কিন্তু আসিলেন বলিয়া। আর বেশি দেরি হইবার কথা নয়, দুই ক্রোশ পথ গরুরগাড়ি আসিতে।

    বিপিন বৈঠখানায় ঢুকিয়া গায়ের জামাটা খুলিবার আগে একটুখানি বিশ্রাম করিতেছে, এমন সময় অন্দরের দিকের দরজায় আসিয়া দাঁড়াইল মানী।

    বিপিনের সারা দেহে যেন বিদ্যুতের মতো কি একটা খেলিয়া গেল। সে কিছু বলিবার পূর্বেই মানী বলিল, আচ্ছা, কি কাণ্ড বল তো বিপিনদা? এলে সেই ধোপাখালি থেকে তেতেপুড়ে—শ্যামহরি চাকর গিয়ে বললে—চা করে নিয়ে আসছি, এসে দেখি ভটচাজ জ্যাঠামশাই বসে আছেন, তুমি নেই! ভটচাজ জ্যাঠামশাই বললেন, কোথায় তাগাদায় বেরুলে এইমাত্র। তারপর দু’বার এসে খুঁজে গেলাম—কোথায় কে? এলে—চা খাও, জিরোও, তারপর তাগাদায় গেলে হত না কি? প্রজারা পালিয়ে যাচ্ছে না তো!

    বিপিনের মাথার মধ্যে সব কেমন গোলমাল হইয়া গিয়াছিল মানীকে দেখিয়া, আমতা আমতা করিয়া বলিল, না, সে জন্যে নয়—তা বেশ ভালো—মেসোমশাই কি রানাঘাটে—

    মানী বলিল, দাঁড়াও, আগে তোমার চা আর খাবার আনি।

    মানী কথাটা ভালো করিয়া শেষ না করিয়াই চলিয়া যাইতে উদ্যত হইল।

    বিপিন দাঁড়াইয়া বলিয়া উঠিল, মানী, শোন শোন যাস নি, দুটো কথা বলি আগে দাঁড়া।

    মানী বলিল, দাঁড়াচ্ছি, চা-টা আনি আগে। কতক্ষণ লাগবে! স্টোভ ধরাব আর করব। আগে যে চা করেছিলুম, তা তো জুড়িয়ে জল হয়ে গেল!

    আবার সে চলিয়া যায়। এদিকে অনাদিবাবুও আসিয়া পড়িলেন বলিয়া। হঠাৎ বিপিন বেদনাপূর্ণ আকুল মিনতির সুরে বলিল, মানী, চা আমি খাব না। তুই যাস নি, একবার আমার কথা শোন। তুই চা আনতে যাস নি।

    মানী বিস্মিত হইয়া বিপিনের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, কেন বিপিনদা? চা খাবে না কেন? কি হয়েছে তোমার? অমন করছ কেন?

    বিপিন লজ্জায় অভিভূত হইয়া পড়িল, সত্যই তাহার কণ্ঠস্বরটা তাহার নিজের কানেই স্বাভাবিক শোনায় নাই! কিন্তু সে কি করিবে? মেয়েমানুষ কি কথা শোনে? চা আনিবার ঝোঁক যখন করিয়াছে, তখন চা সে আনিবেই। ধোপাখালি হইতে পথ হাঁটিয়া বিপিন এখানে চা খাইতে আসিয়াছিল?

    নিজেকে খানিকটা সংযত করিয়া লইয়া বলিল, মানী যাস নি।

    মানী চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল।

    —অনেকদিন তোকে দেখি নি, কথাও বলি নি, এলি আর চলে যাবি চা করতে? চা কি এত ভালো জিনিস যে, না খেলে দিন যাবে না? আমি যেতে দোব না তোকে। এখানে দাঁড়িয়ে থাক।

    মানী শান্তসুরে মৃদু হাসিমুখে বলিল, বিপিনদা, মেয়েমানুষের একটা কর্তব্য আছে। তুমি তেতে-পুড়ে এসেছ রাস্তা হেঁটে, আর আমি তোমার মুখে একটু জল দেবার ব্যবস্থা না করে সঙের মতো তোমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকব—এ হয় না। তুমি একটু বস, আমি আগে চা আনি, খেয়ে যত খুশি গল্প ক’র। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। আমারও কি ইচ্ছে নয় তোমার সঙ্গে দুটো কথা কইবার?

    মিনিট পনরো—প্রত্যেক মিনিট এক-একটি দীর্ঘ ঘণ্টা—কাটিয়া গেল। মানীর তবুও দেখা নাই।

    অনাদিবাবু কি আসিলেন? বাহিরে গরুরগাড়ির শব্দ হইল না? না, কিছু নয়। অন্য গরুরগাড়ি রাস্তা দিয়া যাইতেছে।

    প্রায় পঁচিশ মিনিট পরে মানী আসিল। একটা থালায় খানকতক পরোটা, একটু আলুচচ্চড়ি, একটু গুড়। বিপিনের সামনে থালা রাখিয়া বলিল, ততক্ষণ খাও, আমি চা আনি। কতক্ষণ লাগল, এই তো গিয়ে মেখে বেলে ভেজে নিয়ে এলুম! চায়ের জল ফুটছে, এখুনি আনছি করে। সব কখানা কিন্তু খাবে, নইলে রাগ করব, আস্তে আস্তে খাও।

    বিপিনের সত্যই অত্যন্ত ক্ষুধা পাইয়াছিল। পরোটা ক’খানা সে গোগ্রাসে খাইতে লাগিল।

    অনাদিবাবু বুঝি আসিলেন? গরুর গাড়ির শব্দ না?

    চা করিতে এত সময় লাগে? কত যুগ ধরিয়া মানী কেটলিতে চায়ের জল ফুটাইতেছে—যুগ-যুগান্তর ধরিয়া চায়ের জল ফুটিতেছে!

    মানী আসিল। এক পেয়ালা চা এক হাতে, অন্য হাতে একটি ছোট খাগড়াই কাঁসার রেকাবে পান।

    —কই, দেখি কেমন সব খেয়েছ? বেশ লক্ষ্মী ছেলে! এই নাও চা, এই নাও পান।

    বিপিন হাসিয়া বলিল, ভারি খিদে পেয়েছিল, সত্যি বলছি। আঃ, চা-টুকু যে কি চমৎকার লাগছে!

    মানী বলিল, মুখ দেখে বুঝতে পারি বিপিনদা। তোমার যে অনেকক্ষণ খাওয়া হয়নি, তা যদি তোমার মুখ দেখে বুঝতে না পারলুম, তবে আবার মেয়েমানুষ কি?

    —দাঁড়িয়ে কেন, বস এই চেয়ারখানায়। ভালো কথা, মেসোমশাই তো এখনও এলেন না?

    —বাবা বলে গিয়েছিলেন কাজ সারতে পারলে আজ আসবেন, নয়তো কাল আসবেন। বোধ হয় আজ এলেন না, এলে এতক্ষণ আসতেন।

    ওঃ, এত কথা মানীর পেটে ছিল! মানী জানিত যে বাবা আজ ফিরিবেন না, তাই সে নিশ্চিন্ত মনে চা ও খাবার করিতে গিয়াছিল! আর মূর্খ সে ছটফট করিয়া মরিতেছে!

    সে বলিল, মানী, তুই অমন ভাবে চিঠি আর আমায় পাঠাসনে। পাড়াগাঁ জায়গার ভাব তুমি জান না, থাক কলকাতায়, যদি কেউ দেখে ফেলে বা জানতে পারে, তাতে নানা রকম কথা ওঠাবে। তোমার সুনাম বজায় থাকে এটা আমি চাই। কেউ কোনো কথা তোমাকে এই নিয়ে বললে আমি সহ্য করতে পারব না মানী।

    মানী বলিল, আমাদের চাকরের হাতে দিয়েছিলুম, সে নিজে চিঠি পড়তে পারে না। তার কাছ থেকে নিয়েই বা কে পড়বে পরের চিঠি, আর তাতে ছিলই বা কি?

    —তুমি আমায় আসতে বলছ এ কথাও আছে। যদি কেউ সে চিঠি দেখত, ওর অনেক রকম মানে বার করত। দরকার কি সে গোলমালের মধ্যে গিয়ে?

    মানী চুপ করিয়া শুনিল, তারপর গম্ভীর মুখে বলিল, শোন বিপিনদা, আমিও একটা কথা বলি। যদি কেউ সে চিঠি দেখত, তার কি মানে বার করত আমি জানি। তারা বলত, আমি তোমায় দেখতে চেয়েছি, তোমায় নিশ্চয়ই ভালোবাসি তবে, এই তো?

    বিপিন অবাক হইয়া মানীর মুখের দিকে চাহিল। মানী এমন কথা মুখ ফুটিয়া কোনো দিন বলে নাই। কোনো মেয়ে কখন বলে না। ‘তোমাকে ভালোবাসি’ অতি সংক্ষিপ্ত, অতি সামান্য কয়েকটি কথা, কিন্তু এই কথা কয়টির কি অদ্ভুত শক্তি, বিশেষত যখন সেই মেয়েটির মুখ হইতে এ কথা বাহির হয়, যাহাকে মনে মনে ভালো লাগে। প্রণয়পাত্রীর মুখে এই স্পষ্ট সহজ উক্তিটি শুনিবার আশ্চর্য ও দুর্লভ অভিজ্ঞতা বিপিনের জীবনে এই প্রথম হইল।

    মানীর উপরে সঙ্গে সঙ্গে একটা অদ্ভুত ধরনের স্নেহ ও মায়া হইল। এতদিন যেন সেটা মনের কোণেই প্রচ্ছন্ন ছিল, কিন্তু বাহিরে ফুটিয়া প্রকাশ পায় নাই। ওগো কল্যাণী, এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতা তোমারই দান, বিপিন সেজন্য চিরদিন তোমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকিবে।

    মানী বলিল, বিপিনদা, কথা বললে না যে? ভাবছ বোধ হয় মানীটা বড্ড বেহায়া হয়ে উঠেছে দেখছি, না?

    বিপিন তখনও চুপ করিয়া রহিল। সে অন্য কথা ভাবিতেছিল, মানীর বিবাহিত জীবন কি খুব সুখের নয়? স্বামীকে কি তাহার মনে ধরে নাই?

    খুব সম্ভব। বেচারি মানী! অনাদিবাবু বড় ঘরে বিবাহ দিতে গিয়া মানীর ভালো লাগা না-লাগার দিকে আদৌ লক্ষ করেন নাই, মেয়েকে ভাসাইয়া দিয়াছেন হয়তো ধনীর সহিত কুটুম্বিতার লোভে।

    মানী মৃদু হাসিমুখে বলিল, রাগ করলে বিপিনদা?

    বিপিন বলিল, রাগের কথা কি হয়েছে যে রাগ করব? কিন্তু আমি ভাবছি মানী, তোর মতো মেয়ে আমার ওপর—ইয়ে—একটুও স্নেহ দেখাতে পারে, এর মানে কি? আমার কোন কথা তোর কাছে না বলেছি! কি চরিত্রের মানুষ আমি ছিলাম, তুই তো সব জানিস। সে হীনচরিত্রের লোককে তোর মতো একটা শিক্ষিতা ভদ্র মেয়ে যে এতটুকু ভালো চোখে দেখতে পারে, সেইটেই আমার কাছে বড় আশ্চর্য মনে হয়!

    মানী বলিল, থাক ও কথা বিপিনদা।

    বিপিনের যেন ঝোঁক চাপিয়া গিয়াছিল, আপনমনে বলিয়াই চলিল, না মানী, আমার মনে হয়, আমার সব কথা তুই জানিসনে। কি করেই বা জানবি, ছেলেবেলার পর আর তো দেখা হয়নি! তোকে সব কথা বলি—শুনেও যদি মনে হয়, আমি তোর স্নেহের উপযুক্ত, তবে স্নেহ করিস, ধন্য হয়ে যাব। আর যদি—

    মানী বলিল, আমি শুনতে চাইছি বিপিনদা?

    —না, তোকে শুনতে হবে। তুমি আমাকে ভারি সাধুপুরুষ ভেবে রেখেছ, সেটা আমি বরদাস্ত করতে পারব না। রানাঘাটে বা বনগাঁয়ে এমন কোনো কুস্থান নেই, যেখানে আমি যাতায়াত করিনি। মদ খেয়ে বাবার বিষয় উড়িয়েছি, স্ত্রীর গায়ের গহনা বন্ধক দিয়ে অন্য মেয়েমানুষের আবদার রেখেছি। যখন সব গেল, মদ জোটেনি, তাড়ি খেয়েছি, হয়তো চুরি পর্যন্ত করতাম, কিন্তু নিতান্ত ভদ্রবংশের রক্ত ছিল বলেই হোক বা যাই হোক, শেষ পর্যন্ত করা হয়নি! তাও অন্য কিছু চুরি নয়, একখানা শাড়ি। শামকুড় পোস্ট-আপিসের বারান্দায় শাড়িখানা শুকুতে দেওয়া ছিল, বোধ হয় পোস্ট-মাস্টারের স্ত্রীর। আমার হাতে পয়সা নেই, শাড়িখানা নতুন আর বেশ ভালো, একজনকে দিতে হবে। সে চেয়েছিল, কিন্তু কিনে দেবার ক্ষমতা নেই। চুরি করবার জন্যে অনেকক্ষণ ধ’রে ঘুরলাম, পাড়াগাঁয়ের ব্রাঞ্চ পোস্ট-আপিস, পোস্ট-মাস্টার আপিস বন্ধ করে ছেলে পড়াতে গিয়েছে। কেউ কোনো দিকে নেই। একবার গিয়ে এক দিকের গেরো খুললাম—

    মানী চুপ করিয়া শুনিতেছিল, এইবার অধীরভাবে বলিয়া উঠিল, তুমি চুপ করবে, না আমি এখান থেকে চলে যাব?

    —না শোন, ঠিক সেই সময় একটা ছোট মেয়ে সেখানে এসে দাঁড়াল। সামনেই একটা বাঁধানো পুকুরঘাট। মেয়েটাকে দেখে আমি ডাকঘরের রোয়াক থেকে নেমে বাঁধাঘাটে গিয়ে বসলাম। মেয়েটা চলে গেল, আমি আবার গিয়ে উঠলাম রোয়াকে। এবারে কাপড় নেবোই এই রকম ইচ্ছে। হঠাৎ মনে হল, ছিঃ আমি না বিনোদ চাটুজ্জ্যের ছেলে? আমার বাবা কত গরিব-দুঃখী লোককে কাপড় বিলিয়েছেন আর আমি কিনা একখানা অপরের পরনের কাপড় চুরি করছি! তখন যেন ঘাড় থেকে ভূত নেমে গেল, ঠিক সেই সময় বাড়ির মধ্যে থেকে একটা ছেলে বা হয়ে এসে বললে, কাকে চান? বললাম, খাম কিনতে এসেছি। খাম পাব? ছেলেটা বললে, না, ডাকঘর বন্ধ হয়ে গিয়েছে। তখন চলে এলাম সেখান থেকে।

    মানী বলিল, বেশ করেছিলে, খুব বাহাদুরি করেছিলে। নিজে আর নিজের গুণ ব্যাখ্যায় দরকার নেই, থাক। আমার দেওয়া বইগুলো পড়েছিলে?

    —ওই যে বললাম, সব পড়া হয় নি। ‘দত্তা’খানা পড়েছি, বেশ চমৎকার লেগেছে।

    —‘শ্রীকান্ত’ পড়নি?

    —সময় পাইনি। সেখানা আনিওনি সঙ্গে, এর পর পড়ব বলে রেখে এসেছি কাছারিতে। ‘দত্তা’খানা ফেরত এনেছি।

    —তোমার কাছে সবই রেখে দাও না, মাঝে মাঝে পড়। একলাটি থাক কাছারিতে। আমার সঙ্গে আরও যে সব বই আছে, যাবার সময় তোমার কাছে রেখে যাব। তুমি সেখানে পড় বসে। আচ্ছা, বল তো বিজয়া কে?

    বিপিন হাসিয়া বলিল, ও! একজামিন করা হচ্ছে বুঝি? মাস্টারনী এলেন আমার।

    মানী কৃত্রিম রাগের সুরে অথচ ঈষৎ লাজুক ভাবে বলিল, আবার! উত্তর দাও আমার কথার!

    —বিজয়া তোমার মতো একটি জমিদারের মেয়ে।

    —তারপর?

    —তারপর আবার কি? নরেনের সঙ্গে তার ভালোবাসা হল।—কথাটা বলিয়াই বিপিনের মনে হইল, মানী পাছে কি ভাবে, কথাটা বলা উচিত হয় নাই, মানীও তো জমিদারের মেয়ে! ‘তোমার মতো’ কথাটা না বলিলেই চলিত। কিন্তু মানীর মুখ দেখিয়া বোঝা গেল না। সে বেশ সহজ ভাবেই বলিল, মনে হচ্ছে, পড়েছ। ভালো, পড়লে মানুষ হয়ে যাবে। এইবার রবি ঠাকুরের ‘চয়নিকা’ বলে কবিতার বই আছে, সেখানা থেকে কবিতা মুখস্থ কর। খুব ভালো ভালো কবিতা।

    বিপিন খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল, কবিতা আবার মুখস্থও করতে হবে। উঃ, তুই হাসালি মানী! পাঠশালায় ইস্কুলে যা কখনও হল না, উঃ, এই বুড়ো বয়সে বলে কি না, হি-হি বলে কি না—

    —হ্যাঁ, মুখস্থ করতে হবে। আমার হুকুম। শুনতে বাধ্য তুমি। মানুষ বলে যদি পরিচয় দিতে চাও তবে তা দরকার। যা বলি তাই শোন, হাসিখুশি তুলে রাখ এখন—

    কিন্তু অত্যন্ত কৌতুকের প্রাবল্যে বিপিনের হাসি তখনও থামিতে চায় না। মানী মাস্টারনী সাজিয়া তাহাকে কবিতা মুখস্থ করাইতেছে—এই ছবিটা তাহার কাছে এতই আমোদজনক মনে হইল যে সে হাসির বেগ তখনও থামাইতেই পারিল না।

    এবার মানীও হাসিয়া ফেলিল। বলিল, বড্ড হাসির কথাটা কি যে হল তা তো বুঝিনে। আমার কথাগুলো কানে গেল, না গেল না?

    —খুব গিয়েছে। আচ্ছা, তোর কবিতা মুখস্থ আছে?

    —আছেই তো, ‘চয়নিকা’র আদ্ধেক কবিতা মুখস্থ আছে।

    —সত্যি? একটা বল না?

    —এখন কবিতা বলবার সময় নয়। আর বললেই বা তুমি বুঝবে কি করে হয়েছে কি না? তুমি তো জান ঢেঁকি, কি করে ধরবে?

    —তাতেই তো তোর সুবিধে, যা খুশি বলবি, ধরবার লোক নেই।

    মানী মুখে কাপড় দিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া বলিল, ওমা কি দুষ্টুবুদ্ধি!

    —তা বল একটা শুনি।

    —শুনবে? তবে শোন। দাঁড়াও, কেউ আসছে কিনা দেখে আসি, আবার বাইরের ঘরে দাঁড়িয়ে কবিতা বলছি শুনলে কে কি মনে করবে!

    একটু পরে ফিরিয়া আসিয়া মানী স্কুলের ছাত্রীর মতো কবিতা আবৃত্তির ভঙ্গিতে দাঁড়াইয়া শুরু করিল—

    ‘অত চুপি চুপি কেন কথা কও, ওগো মরণ হে মোর মরণ!’

    বিপিন হাসিয়া গড়াইয়া পড়ে আর কি! মানীর কি চোখমুখের ভাব, কি হাত-পা নাড়ার কায়দা! যেন থিয়েটারের অ্যাকটো করিতেছে। অথচ হাসিবার জো নাই, মুখ বুজিয়া বসিয়া থাকিতে হইবে শান্ত ছেলেটির মতো। এমন বিপদেও মানুষ পড়ে। মানীটা চিরদিনই একটু ছিটগ্রস্ত!

    কিন্তু খানিকটা পরে মানীর আবৃত্তি বিপিনের বড় অদ্ভুত লাগিতে লাগিল।—

    ‘যবে বিবাহে চলিলা বিলোচন, ও গো মরণ হে মোর মরণ!’

    এই জায়গাটাতে যখন মানী আসিয়া পৌঁছিয়াছে, তখন বিপিনের হাসিবার প্রবৃত্তি আর নাই, সে তখন আগ্রহের সঙ্গে মানীর মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। বাঃ, বেশ লাগিতেছে তো পদ্যটা! মানী কি চমৎকার বলিতেছে! অল্পক্ষণের জন্য মানী বদলাইয়া গিয়াছে, তাহার চোখে মুখে অন্য এক রকমের ভাব। কবিতা যে এমন ভাবে বলা যাইতে পারে, তাহা সে জানিত না, কখনও শোনে নাই।

    —বাঃ, বেশ, খাসা! চমৎকার বলতে পারিস তো?

    মানী যেন একটু হাঁপাইতেছে। নিশ্বাস ঘন ঘন পড়িতেছে, বড় কষ্ট হয় পদ্য আবৃত্তি করিতে, বিশেষত অমনি হাত-পা নাড়িয়া। ভারি সুন্দর দেখাইতেছে মানীকে। মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমিয়াছে, একটু রাঙা হইয়াছে মুখ, বুক ঈষৎ উঠিতেছে নামিতেছে। এ যেন মানীর অন্য রূপ, এ রূপে কখনও সে মানীকে দেখে নাই।

    —নেবু খাবে বিপিনদা?

    —কি নেবু?

    —কমলানেবু, সেদিন কলকাতা থেকে এক টুকরি এসেছে। দাঁড়াও, নিয়ে আসি।

    —যাস নি মানী, তুই চলে গেলে আমার নেবু ভালো লাগবে না।

    মানী যাইতে উদ্যত হইয়াছিল, ফিরিয়া দাঁড়াইয়া বলিল, বাজে কথা ব’ল না বিপিনদা!

    বিপিন হতবুদ্ধি হইয়া বলিল, বাজে কথা কি বললাম?

    —বাজে কথা ছাড়া কি! যাক, দাঁড়াও, লেবু আনি।

    মানী একটু পরে দুইটি বড় বড় কমলালেবু ছাড়াইয়া একটা চায়ের পিরিচে আনিয়া যখন হাজির করিল, বিপিনের তখন লেবু খাইবার প্রবৃত্তি আদৌ নাই, অভিমানে তাহার মন বিমুখ হইয়া উঠিয়াছে।

    সে শুষ্ককণ্ঠে বলিল, নেবু আমি খাব না, নিয়ে যা।

    —কি, রাগ হল অমনিই? তোমার তো পান থেকে চুন খসবার জো নেই, হল কি?

    —না না, কিছু হয় নি, তুই যা। মিটে গেল গণ্ডগোল।

    —কেন, কি হয়েছে বল না?

    —আমার সব কথা বাজে। আমার কথা তোর কি শুনতে ভালো লাগে! আমি যখন বাজে লোক তখন তো বাজে কথা বলবই। তবে ডেকে এনে অপমান করা কেন?

    মানী কিছুক্ষণ চুপ করিয়া রহিল। পরে গম্ভীর সুরে বলিল, দেখ বিপিনদা, আমি যা ভেবে বলেছি, তা যদি তুমি বুঝতে পারতে, তবে এমন কথা ভাবতে না বা বলতেও না। তোমার কথাকে কেন বাজে কথা বলেছি, তা বুঝবার মতো সূক্ষ্ম বুদ্ধি তোমার ঘটে থাকলে কথায় কথায় অত রাগও আসত না।

    বিপিন চুপ করিয়া থাকিবার পাত্র নয়, বলিল, জানিস তো আমার মোটা বুদ্ধি, তবে আর—

    মানী পূর্ববৎ গম্ভীর সুরে বলিল, তোমার সঙ্গে কথা-কাটাকাটি করবার সময় নেই এখন আমার, তুমি বস। কমলালেবু এই রইল, খাও তো খেও, না খাও রেখে দিও, শ্যামহরি এসে নিয়ে যাবে, আমি চললুম।

    কথা শেষ করিয়া মানী এক মুহূর্তও দাঁড়াইল না।

    ২

    বিপিন কিছুক্ষণ গুম হইয়া বসিয়া রহিল। কিছুক্ষণ পূর্বের তাহার মনের সে আনন্দ আর নাই, জগৎটা যেন এক মুহূর্তে বিস্বাদ হইয়া গেল। মানী এমন ধরনের কথা কখনও তাহাকে বলে নাই। মেয়েমানুষ সবাই সমান, যেমন মানী তেমনই মনোরমা। মিছামিছি মনোরমার প্রতি মনে মনে সে অবিচার করিয়াছে। মানীও রাগী কম নয়, এখন দেখা যাইতেছে। স্বরূপ কি আর দুই-একদিনে প্রকাশ হয়, ক্রমে ক্রমে প্রকাশ হয়। যাক ওসব কথায় দরকার নাই। সে আজই—এখনই ধোপাখালি কাছারিতে ফিরিবে। কত রাত আর হইয়াছে। সাতটা হয়তো। দুইঘণ্টা জোর হাঁটিলে রাত নয়টার মধ্যে খুব কাছারি পৌঁছানো যাইবে। কমলালেবু খাওয়ার দরকার নাই আর।

    কিন্তু একটা মুশকিল হইয়াছে এই, অনাদিবাবু এখনও রানাঘাট হইতে ফিরিলেন না। সঙ্গে যে টাকা আছে, তাহা ইরশাল না করিয়া কি ভাবে যাওয়া যায়? সে আসিয়া কেন চলিয়া গেল হঠাৎ, না খাইয়া রাত্রিবেলাতেই চলিয়া গেল, একথা যদি অনাদিবাবু জিজ্ঞাসা করেন, তখন সে কি জবাব দিবে? তাঁহার মেয়ের সঙ্গে ঝগড়া করিয়া চলিয়া আসিয়াছে—একথা বলিতে পারিবে না!

    বিপিন ঠিক করিল, আর একটু অপেক্ষা করিয়া সে দেখিবে অনাদিবাবু আসেন কিনা। দেখিয়া যাওয়াই ভালো। বাড়ির মধ্যে মানীর মায়ের কাছে টাকা দেওয়া চলে না, তিনি জিজ্ঞাসা করিবেন এত রাত্রে সে না খাইয়া কেন কাছারি ফিরিবে? যাইতে দিবেন না, পীড়াপীড়ি করিবেন। সব দিকেই বিপদ।

    মানী কেন ও কথা বলিল? বড্ড হেঁয়ালি ধরনের কথাবার্তা বলে আজকাল। কি গূঢ় অর্থ না জানি উহার মধ্যে নিহিত আছে! আছে থাকুক, গূঢ় অর্থ মাথায় থাকুক, সে এখন চলিয়া যাইতে পারিলে বাঁচে।

    কিন্তু অনেকক্ষণ অপেক্ষা করিয়াও অনাদিবাবু আসিলেন না। রাত নয়টা বাজিয়া গেল, পল্লীগ্রামে ইহারই মধ্যে খাওয়া-দাওয়া চুকিয়া যায়। একবার শ্যামহরি চাকর আসিয়া বলিল, মা বলে পাঠালেন আপনি একা খেয়ে নেবেন, না বাবু এলে খাবেন?

    বিপিন বলিল, বলগে বাবু এলে খাব এখন একসঙ্গে। কিন্তু রাত দশটা বাজিয়া গেল, তখনও অনাদিবাবুর দেখা নাই। অগত্যা সে বাড়ির মধ্যে একাই খাইতে গেল।

    মানীর মা পরিবেশন করিতেছিলেন, মানী সেখানে নাই। বিপিনের মন ভালো ছিল না, সে অন্যমনস্কভাবে তাড়াতাড়ি খাইতে লাগিল। যেন খাওয়া শেষ করিতে পারিলে বাঁচে।

    মানীর মা বলিলেন, বিপিন, টাকাকড়ি কিছু এনেছ নাকি?

    —আজ্ঞে হ্যাঁ মাসিমা, মেসোমশাই তো এলেন না রানাঘাট থেকে, আমি কাল খুব ভোরে চলে যাব ধোপাখালি কাছারি। টাকা আপনি নিয়ে রাখুন। খেয়ে উঠে আপনাকে বুঝিয়ে দিচ্ছি।

    —কাল সকালেই কাছারি যাবে কেন? কর্তার সঙ্গে দেখা করে যাবে না? তিনি বলেই গিয়েছিলেন, আজ যদি না আসেন, কাল নিশ্চয়ই আসবেন সকাল আটটার মধ্যে।

    —আমার থাকা হবে না মাসিমা, কাজ আছে।

    —কাল জামাই আসবেন মানীকে নিতে, এদিকে দেখ বাবা মেয়ের কি হয়েছে সন্ধের পর থেকে—ওপরে শুয়ে আছে, খায়নি দায়নি। ওর আবার কি যে হল! এদিকে কর্তা নেই বাড়ি, তুমি যাচ্ছ চলে, আমি আথান্তরে পড়ে যাব তা হলে।

    বিপিন ভাতের গ্রাস হাতে তুলিয়াছিল, মুখে না দিয়া সেই অবস্থাতেই মানীর মায়ের মুখের দিকে চাহিয়া কথাটা শুনিতেছিল। কথা শেষ হইতে বলিল, কি হয়েছে মানীর?

    —কি হয়েছে কি জানি বাবা! দুবার ওপরে গেলাম, বালিশে মুখ গুঁজে পড়ে আছে, উঠলও না। বললে, আমার শরীর ভালো না, রাত্তিরে খাব না কিছু। বললুম, একটু গরম দুধ খাবি? বললে তাও খাবে না। কি জানি বাবা, কিছুই বুঝলুম না। একালের ধাতের মেয়ে, ওদের কথা আদ্ধেক থাকে পেটে, আদ্ধেক মুখে, কি হয়েছে না হয় বল, তাও বলবে না।

    বিপিন আহারাদি শেষ করিয়া বাহিরের ঘরে আসিয়া বসিল বটে, কিন্তু নিদ্রা যাইবার এতটুকু ইচ্ছা মনে জাগিল না। মানীর মনে নিশ্চয়ই সে কষ্ট দিয়াছে, মানীর অসুখবিসুখ কিছুই নয়, বাহিরের ঘর হইতে গিয়াই সে উপরের ঘরে শুইয়া পড়িয়াছে। কেন? কি বলিয়াছিল সে মানীকে? সে চলিয়া গেলে লেবু ভালো লাগিবে না—এই কথার মধ্যে প্রেমনিবেদনের গন্ধ পাইয়া কি মানী নিজেকে অপমানিতা মনে করিয়াছে? কিন্তু এ ধরনের কথা সে তো ইতিপূর্বে আরও কয়েকবার মানীকে বলিয়াছে, তাহাতে তো মানী চটে নাই!

    বিপিনের মন বলিল এ কারণ আসল কারণ নয়। অন্য কোনো ব্যাপার আছে ইহার মধ্যে। তা ছাড়া মানীর অত যত্নে দেওয়া লেবু সে খাইতে চাহে নাই, রাগের মাথায় অত্যন্ত রূঢ়ভাবে মানীর সঙ্গে কথাবার্তা বলিয়াছিল। ছিঃ, কি অন্যায় সে করিয়া বসিয়াছে! মানীর মতো তাহার শুভাকাঙ্ক্ষিণী জগতে খুব বেশি আছে কি?

    রাত তিনটে পর্যন্ত বিপিনের ঘুম হইল না। মানীর সঙ্গে যদি এখনই একবার দেখা হইত! সত্যই, সে বড় আঘাত দিয়াছে মানীর মনে। মানীর নিকট ক্ষমা না চাহিয়া সে ধোপাখালি যাইতে পারিবে না। কে জানে হয়তো এই মানীর সঙ্গে শেষ দেখা! এ চাকুরি কবে আছে, কবে নাই। আজ সে অনাদিবাবুর নায়েব, কালই সে অন্যত্র চলিয়া যাইতে পারে। মানী হয়তো কতদিন এখন আর আসিবে না। অনুতাপের কাঁটা চিরদিনই ফুটিয়া থাকিবে বিপিনের মনে।

    সকাল হইলে যে-কোনো ছুতায় মানীর সঙ্গে দেখা করিতেই হইবে। না হয়, দুপুরে আহারাদি করিয়া কাছারি রওনা হইলেই চলিবে এখন। মানীর মনের কষ্ট না মুছাইয়া সে এ স্থান ত্যাগ করিবে না।

    ৩

    কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর। শেষরাত্রের দিকে বিপিনের ঘুম আসিয়াছিল, কাহাদের ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে তাহার ঘুম ভাঙিয়া গেল। চোখ মুছিতে মুছিতে উঠানের দিকে চাহিয়া দেখিল, একখানা গরুর গাড়ি দাঁড়াইয়া আছে, গাড়োয়ান একটা হ্যারিকেন লণ্ঠন উঁচু করিয়া হাঁকডাক করিতেছে, অনাদিবাবু ছইয়ের ভিতর হইতে নামিতেছেন।

    শ্যামহরি চাকরও বৈঠকখানায় শোয়, বিপিন তাহাকে জাগাইয়া তুলিল। অনাদিবাবু বিপিনকে দেখিয়া বলিলেন, এই যে বিপিন! তোমার কথাই ভাবছিলাম। বড্ড জরুরী কাজে রানাঘাট যেতে হবে তোমাকে কাল সকালেই। আজ রাত্রেই তোমায় কাগজপত্র দিয়ে দিই, কাল বেলা আটটার মধ্যে উকিল-বাড়ি দাখিল করে দিতে হবে। ভাবছিলাম কাকে দিয়ে পাঠাই! তুমি এ সময়ে এসে পড়েছ, খুব ভালো হয়েছে। বস, আমি আসছি ভেতর থেকে। সেখান থেকে বেরিয়েছি রাত দশটার পরে। নতুন গরু, চলতে পারে না পথে, এখন রাত তো প্রায়—আঃ, কি কষ্টই গিয়েছে সারারাত!

    বাড়ির ভিতর হইতে তখনই ফিরিয়া অনাদিবাবু বিপিনকে কাগজপত্র বুঝাইয়া দিলেন। বলিলেন, আমি গিয়ে শুয়ে পড়ি, তুমিও শোও। এখনও ঘণ্টা দুই রাত আছে। ভোরে উঠে চলে যেও। যদি উকিলবাবু ছেড়ে দেন, তবে কালই ওখানে খাওয়াদাওয়া করে বিকেল নাগাদ এখানে চলে এস। কাল আবার আমার মেয়েকে নিতে জামাই আসছেন কলকাতা থেকে, পার তো কিছু মিষ্টি এনো সাধুচরণ ময়রার দোকান থেকে। এই একটা টাকা নিয়ে যাও।

    খুব ভোরে উঠিয়া বিপিন রানাঘাট রওনা হইল। যাইবার সময় সারাপথ দেখিল, খুব ভোরে উঠিয়া চাষারা জমি নিড়াইতেছে। এবার বৈশাখের প্রথমে বৃষ্টি হইয়া ফসল বুনিবার সুবিধা করিয়া দিয়াছিল, এখন বৃষ্টি আদৌ নাই, জমিতে জমিতে নিড়ানি দেওয়া চলিতেছে। হয়তো এবার জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি বর্ষা নামিবে—এই ভয়ে চাষীরা শীঘ্র শীঘ্র ছাঁটার কাজ শেষ করিতে চায়। সারাপথ দুইধারে মাঠে ধান-পাটের ক্ষেতে চাষারা জমি নিড়াইতেছে।

    ভোরের অতি সুন্দর মিষ্টি বাতাস। মাঠে ও পথের ধারে ছোট বড় গাছে সোঁদালি ফুলের ঝাড় ঝুলিতেছে, বিশেষ করিয়া কানসোনার মাঠে। রেলের ফটক পার হইয়া আবাদ তত নাই, ফাঁকা মাঠের মধ্যে চারিধারে শুধু সোঁদালি ফুলের গাছ।

    কলাধরপুরের বিশ্বাসদের বাড়ির চণ্ডীমণ্ডপে বিপিন একবার তামাক খাইবার জন্য বসিল। প্রতিবার রানাঘাট হইতে যাতায়াতের পথে এইটা তাহার বিশ্রামের স্থান। বিশ্বাসদের বাড়ির সকলেই বিপিনকে চেনে। বিশ্বাসদের বড়কর্তা রাম বিশ্বাস চণ্ডীমণ্ডপের সামনে পাটের দড়ি পাকাইতে ব্যস্ত ছিলেন। বিপিনকে দেখিয়া বলিলেন, এই যে আসুন চাটুজ্জে মশায়, প্রণাম হই। আজ যে বড্ড সকালে রানাঘাট চলেছেন, মোকদ্দমা আছে নাকি? উঠে বসুন ভালো হয়ে, একটু চা করে দিক!

    —না না, চায়ের দরকার নেই। একটু তামাক খাই বরং।

    —আরে, তামাক তো খাবেনই, চা একটু খান। অত সকালে তো চা খেয়ে বেরোননি? এখন সাতটা বাজে, আমিও তো চা খাব। বসুন, চার ক্রোশ রাস্তা হেঁটেছেন এর মধ্যে, কষ্ট কম হয়েছে? একটু জিরোন।

    মানীর সঙ্গে ফিরিয়া আজ দেখা হইবে কি? আর দেখা হওয়া সম্ভবও নয়। দেখা হইলেও কথাবার্তা তেমনভাবে হইবে না। জামাইবাবু আসিবেন, কর্তা বাড়ি রহিয়াছেন। তবুও একবার চেষ্টা করিয়া দেখিতে হইবে।

    বিশ্বাস মহাশয় চা ও মুড়ি আনিয়া দিলেন। বিপিন খাইতে খাইতে বলিল, এবার পাট ক’বিঘে বুনলেন বিশ্বেস মশায়?

    —তা ধরুন, প্রায় বারো-চোদ্দ বিঘে হবে। বুনলে কি হবে, খরচা পোষায় না, দশ টাকা করে দুটো কিষাণ, তা বাদে জন-মজুর তো আছেই। পাটের দর তো উঠল না। ওই দেখুন ছত্রিশ সালে পাটের দর ভালো পেয়ে উত্তরের পোতায় বড় ঘরখানা তুলতে গিয়েছিলাম, আদ্ধেক গাঁথুনি হয়ে দেখুন পড়ে আছে, আর দর পেলাম না, তা কি হবে?

    —আপনার বড়ছেলে কোথায়?

    —সে ওই বীজপুরের কারখানায় ত্রিশ টাকা মাইনেয় ঢুকেছে, রং-মিস্ত্রী। আমি বলি, ও কেন, বাড়িতে এসে ফলাও করে চাষ-বাস লাগা। মেসে খায়, একটু দুধ-ঘি পেটে যায় না, শরীর মাটি। ওমাসে বাড়ি এসেছিল, আমার স্ত্রী এক বোতল ঘরের গাওয়া ঘি সঙ্গে পাঠিয়ে দিলে আবার। ওই খাটুনি, দুধ ঘি না খেলে শরীর থাকে? উঠলেন? ফিরবার পথে পায়ের ধুলো দিয়ে যাবেন। না হয় এখানেই ফিরবার সময় দুটো স্বপাকে আহার করে যাবেন এখন।

    —না না, আমি সেখানেই খাব। উকিলের কাজ মিটতে বেলা এগারোটা বাজবে। তারপর হয়তো একবার কোর্টেও যেতে হবে স্ট্যাম্পভেন্ডারের কাছে। ফিরতে তো তিনটের কম হবে না। আচ্ছা, আসি।

    —আজ্ঞে আসুন, প্রণাম হই।

    রানাঘাট কোর্টে বিপিনের স্বগ্রামের নিবারণ মুখুজ্জের সঙ্গে দেখা। নিবারণ মুখুজ্জে বিপিনকে দূর হইতে দেখিয়া কাছে আসিলেন, বিপিন প্রথমে তাঁহাকে দেখিতে পায় নাই।

    —কে, বিপিন? কোর্টে কাজে এসেছিল বুঝি?

    —আজ্ঞে হ্যাঁ, কাকা। আপনি?

    —আমিও এসেছিলাম একবার একটা কাগজের নকল নিতে। আমার আবার একটু ব্রহ্মোত্তর জমি নদীয়ার এলাকায় পড়ে কিনা, সেজন্যে রানাঘাট ছুটোছুটি করতে হয়। হ্যাঁ, তোমার সঙ্গে একটা জরুরি কথা আছে বাবা। দেখা হল ভালোই হল। একটু আড়ালের দিকে চল যাই, গোপনীয় কথা।

    বিপিন একটু কৌতূহলী হইয়া নিবারণ মুখুজ্জের সহিত লোকজন হইতে একটু দূরে গেল।

    —বাবা, কথাটা খুব গুরুতর। তোমার বাড়ির সম্বন্ধেই কথা। তুমি থাক বার মাস বিদেশে, নিশ্চয়ই তোমার কানে এখনও ওঠেনি। বড্ড গুরুতর কথা আর বড় দুঃখের কথা।

    বিপিন আশঙ্কায় উদ্বেগে কাঠ হইয়া গেল। বাড়ির সম্বন্ধে কি গুরুতর, আর কি দুঃখের কথা! প্রথমেই তাহার মুখ দিয়া আপনা-আপনি বাহির হইয়া গেল—কাকাবাবু, বেঁচে আছে তো?

    তাহার বুকের মধ্যে কেমন ধড়াস ধড়াস করিতেছে, জজের মুখে ফাঁসির হুকুম শুনিবার ভঙ্গিতে সে আকুল ও শঙ্কিত দৃষ্টিতে নিবারণ মুখুজ্জের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।

    নিবারণ মুখুজ্জে বলিলেন, না না, সে সব কিছু নয়। ব্যাপারটা একটু অন্যরকম। বলেই ফেলি। এই গিয়ে তোমার বোনকে নিয়ে গাঁয়ে কথা উঠেছে—মানে ওপাড়ার পটলের সঙ্গে সর্বদাই মেলামেশা করে আসছে তো অনেকদিন থেকেই—সম্প্রতি একদিন নাকি সন্দেবেলা তোমাদের বাড়ির পেছনে বাগানে কাঁটালতলায় দুজনকে একসঙ্গে দেখা গিয়েছিল—যে দেখেছিল সে-ই বলেছে। এই নিয়ে গাঁয়ে খুব কথা চলছে। এই সময় তোমার একবার যাওয়া খুব দরকার বলে মনে করি।

    বিপিন শুনিয়া অবাক হইয়া গেল—তাহার বোন অসঙ্গত কিছু করিতে পারে ইহা তাহার মাথায় আসে না। তাহাকে বিপিন নিতান্ত ছেলেমানুষ বলিয়া জানে—আচ্ছা, যদি পটলের সঙ্গে কথাই বলিয়া থাকে তাহাতে দোষ বা কি আছে?

    পরক্ষণেই তাহার মনে হইল বাড়ি যাওয়াটা খুব দরকার বটে এসময়। পলাশপুরে এমন কোনো জরুরি দরকার নাই যে আজ না ফিরিলেই চলিবে না। বরং একবার বাড়ি ঘুরিয়া আসা যাক।

    ৪

    বৈকালের দিকে বিপিন গ্রামে পৌঁছিল। বাড়ি ঢুকিতেই প্রথমে মনোরমার সঙ্গে দেখা। স্বামীকে হঠাৎ এভাবে আসিতে দেখিয়া সে যেন একটু অবাক হইয়া গেল। বলিল—কখন এলে, কোন গাড়িতে? চিঠি তো দাও নি? ভালো আছ তো?

    বিপিন পুঁটুলিটা স্ত্রীর হাতে দিয়া বলিল—ধরো এটা। মার জন্যে বাতাসা আছে, ভেঙে না যায় দেখো। নেবেঞ্চুস আছে, ছেলেপিলেদের ডেকে দাও। তোমরা কেমন আছ? বলাই কোথায়?

    —বলাই গিয়েছে মাছ ধরতে।

    —কেমন আছে সে?

    মনোরমা চুপ করিয়া রহিল।

    —কেমন আছে বলাই?

    —ভালো না। আমার কথা কেউ তো শোনে না, যা পাচ্চে তা খাচ্চে, রোজ নদীর ধারে মাছ ধরতে গিয়ে জলের হাওয়ায় বসে থাকে। জ্বর হয় রোজ রাত্তিরে—তার ওপর খায় দায়। ওষুধবিষুধ কিছুই না।

    —মুখ হাত পা কেমন আছে?

    —বেজায় ফোলা। এলেই দেখে বুঝতে পারবে। আজ একটা কথা শুনেচ?

    —হ্যাঁ, নিবারণ কাকার মুখে শুনলাম রানাঘাটে। কি ব্যাপার বলো তো?

    —যা শুনেছ, সব সত্যি। আমার কথা ঠাকুরঝি একেবারে শোনে না—কতদিন বারণ করেছি। মাকেও বলে দিইছি, মা শুনেও শোনেন না। এখন গাঁয়ে ঢি-ঢি পড়ে গিয়েছে—এখন আমার কথা হয়তো তোমাদের ভালো লাগলেও লাগতে পারে। দাসী-বাঁদীর মতো এ বাড়িতে আছি বই তো নয়!

    বিপিন বিরক্ত হইয়া বলিল—আঃ, যা জিজ্ঞেস করছি তার উত্তর দাও না আগে! তুমি নিজের চোখে কিছু দেখেছ?

    —কত দিন। তোমাকে বললেই তুমি রেগে যাবে বলে কিছু বলিনি—মাকে বলে কি হবে—বলা না বলা দুই সমান।

    —আচ্ছা থাক। বীণাকে একবার ডেকে দাও—আমি তাকে দু-একটা কথা বলি। তুমি এ ঘর থেকে যাও।

    কিন্তু মনোরমা ঘর হইতে চলিয়া গেলেও বীণার আসিতে বিলম্ব হইতে লাগিল। এ ব্যাপার লইয়া সে কি বলিবে? বীণা তাহার ছোট বোন, কখনও তাহাকে সে রূঢ় কথা জীবনে বলে নাই—বিশেষ করিয়া বীণা বিধবা হইবার পরে বিপিন সাধ্যমতো চেষ্টা করে ছেলেমানুষ বীণাকে কি করিয়া একটুখানি সুখী করা যায়। বিপিন ভাবিতে লাগিল—বীণার দোষ কি? অল্প বয়সে বিধবা—ওর মনের কোন সাধই বা পুরেছে? পটলকে হয়তো ওর চোখে ভালো লেগেছে—সম্পূর্ণ সম্ভব। ছেলেবেলা থেকেই পটলের সঙ্গে ওর ভাব ছিল, আর কেউ না জানুক, আমি জানি। যদি পটলের সঙ্গে দুটো কথা কয়ে ওর তৃপ্তি হয়—তা আমি বারণ করি বা কি ভাবে!…তবে বীণা ছেলেমানুষ, সংসারের কি-ই বা জানে! কত বিপদ আছে কত দিকে, সে কি তার খবর রাখে? না—আমার কাজ নয়, মনোরমাকে দিয়ে বলাতে হবে।

    হঠাৎ তাহার মনে আসিল মানীর কথা।

    সেও তো এই রকম ছেলেবেলার বন্ধুত্ব। মানী বিবাহিতা, তার স্বামী শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র যুবক। তবে মানী কেন তাহার সহিত কথা বলিতে আসে? কেন তাহাকে দেখিবার জন্য মানীর এত আগ্রহ?

    এসব কথার কোনো মীমাংসা নাই। মীমাংসা হয় না। এই যে সে আজ বাড়ি আসিয়াছে—সারা পথ সারা ট্রেনে কাহার কথা সে ভাবিয়াছে?

    নিজের মনকে চোখ ঠারা চলে না। ছেলেমানুষ বীণাকে সে কি দোষ দিবে? তাহার বাবা কি করিয়াছিলেন?

    যাক ওসব কথা। মনোরমাকে দিয়া বীণাকে বলাইতে হইবে। গ্রামে কোনো কুৎসা রটে বীণার নামে—তাহা কখনই হইতে দেওয়া চলিবে না। আবশ্যক হইলে বীণাকে এখান হইতে সরাইয়া ধোপাখালি কাছারিতে নিজের কাছে কিছুদিন না হয় রাখিবে।

    এই সময় বীণা ঘরে ঢুকিয়া বলিল—ডাকছিলে দাদা?

    বিপিন চোখ তুলিয়া বীণার দিকে চাহিল। অনেক দিন ভালো করিয়া সে বীণাকে দেখে নাই। বীণার মুখশ্রী আজকাল এত সুন্দর হইয়া উঠিয়াছে! কি সুন্দর দেখিতে হইয়াছে বীণা! চোখ দুটি যেমন ডাগর, তেমনি স্নিগ্ধ। মুখখানি এখনও ছেলেমানুষের মতোই। এ চোখে ও মুখে কোনো পাপ থাকিতে পারে?

    বিপিন বলিল—বলাই কোথায়?

    —ছোড়দা মাছ ধরতে গিয়েছে।

    —তোর শরীর ভালো আছে তো?

    —হ্যাঁ। তুমি হঠাৎ চলে এলে যে?

    —এমনি। রানাঘাটে এসেছিলাম কাজে—ভাবলুম একবার বাড়ি ঘুরে যাই। হ্যাঁ, মা কোথায়?

    —মা বড়ির ডাল ধুতে গিয়েছেন পুকুরের ঘাটে। ডেকে আনব?

    —থাক এখন ডাকার দরকার নেই, তোর সঙ্গে একটা কথা ছিল।

    —কি বল না?

    —তুই পটলের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করিস নে। গাঁয়ে ওতে পাঁচরকম কথা উঠছে—আমরা গরিব লোক, আমাদের পক্ষে সেটা ভালো নয়।

    বিপিন কথাটা মরীয়া হইয়া বলিয়াই ফেলিল। সঙ্গে সঙ্গে ইহাও লক্ষ না করিয়া পারিল না, পটলের কথা বলিতেই বীণার চোখমুখের ভাব যেন কেমন হইয়া গেল—যে ভাব সে বীণার মুখে-চোখে কখনও দেখে নাই।

    মনোরমার কথা তাহা হইলে মিথ্যা নয়—নিবারণ মুখুজ্জেও বাজে কথা বলেন নাই! পূর্বে হইলে হয়তো বিপিন বীণার এ পরিবর্তন লক্ষ করিত না—কিন্তু গত কয়েক মাসের বক্তিগত অভিজ্ঞতার ফলে বিপিন এসব লক্ষণ বুঝিতে পারে এখন।

    বীণা কিন্তু অতি অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে যেন সামলাইয়া লইয়া সহজ ভাবেই বলিল—যা বলো দাদা, পটলদা আসে, কথাবার্তা বলে—তাই বলি। না হয় আর বলব না।

    বিপিন বুঝিল ইহা মিথ্যা আশ্বাস। বীণা ছলনা করিতেছে—পটলের সঙ্গে তাহার কিছুই নাই, ইহা সে দেখাইতে চায়—আর একটা খারাপ লক্ষণ, ছেলেমানুষ বীণা ভাবিয়াছে ইহাতেই দাদার চোখে ধুলা দেওয়া যাইবে—যাইতও যদি মানীর সঙ্গে পলাশপুরের বাড়িতে তাহার দেখা না হইত!

    ইহা ঠিকই যে বীণা মিথ্যা কথা বলিতেছে। পটলের সঙ্গে কথাবার্তা সে বন্ধ করিবে না। লুকাইয়া দেখা করিবার চেষ্টা করিবে। বিপিন বুঝিল, সে বীণা আর নাই, তাহার ছোট বোন সরলা ছেলেমানুষ বীণা এ নয়, এ প্রেমমুগ্ধা তরুণী নারী, প্রেমিকের সহিত মিশিবার সুবিধা খুঁজিতে সব রকম ছলনা এ অবলম্বন করিবে। সহোদরা বটে, কিন্তু বীণাকে আর বিশ্বাস নাই। বীণা দূরে সরিয়া গিয়াছে।

    বিপিন তবুও হাল ছাড়িল না। বীণাকে কাছে বসাইয়া তাহাদের বংশের পূর্ব-গৌরব সবিস্তারে বর্ণনা করিল। গ্রাম্য কুৎসা যে ভয়ানক জিনিস, তাহাতে একটি গৃহস্থের ভবিষ্যৎ কি ভাবে নষ্ট হইয়া যাইতে পারে, দু-একটা কাল্পনিক দৃষ্টান্ত দিয়া তাহা বুঝাইবার চেষ্টা করিল। বীণা খানিকক্ষণ মন দিয়া শুনিল—কিন্তু ক্রমশ সে যেন অধীর হইয়া পড়িতেছে, দু-একবার উঠিবার চেষ্টা করিয়াও সে সাহস পাইতেছে না—দাদার সম্মুখ হইতে চলিয়া যাইতে পারিলে যেন বাঁচে, এরূপ ভাব তাহার চোখে মুখে ফুটিয়া উঠিয়াছে।

    ৫

    এই সময়ে বলাই আসিয়া পড়াতে বিপিনের বক্তৃতা আপনা-আপনিই বন্ধ হইয়া গেল। বলাই ঘরে ঢুকিয়া বলিল—দাদা কখন এলে? মাছ ধরে এনেছি দেখবে এস—মস্ত একটা শোল মাছ আর দুটো ছোট ছোট বান—

    বিপিন বলাইয়ের চেহারা দেখিয়া চমকিয়া উঠিল। মুখ আরও ফুলিয়াছে, শরীরে রক্ত নাই—পায়ের পাতা বেরিবেরি রোগীর মতো দেখিতে, চোখের কোণ সাদা। অথচ এই চেহারা লইয়া বলাই দিব্য মনের আনন্দে মাছ ধরিয়া বেড়াইতেছে, খাওয়া-দাওয়া করিতেছে।

    ভগবান এ কি করিলেন? চারিদিক হইতে তাহার জীবনে বিপদ ঘনাইয়া আসিতেছে, তাহা বুঝিতে বাকি নাই। বলাই বাঁচিবে না—নেফ্রাইটিসের রোগীর শেষ অবস্থা তাহার চেহারায় পরিস্ফুট—অথচ সে সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত আছে তাহার ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে।

    বিপিন বলাইকে কিছু বলিল না। বলিয়া কোনো ফল নাই—যেমন বীণাকে বলিয়া কোনো ফল নাই। কেহই তাহার কথা শুনিবে না। সে চাকুরি করিতে বাহির হইলেই উহারা যাহা খুশি তাহাই করিবে। এ জগতে কেহ কাহারও কথা শোনে না—সবাই স্বার্থপর, যাহার যাহা ভালো লাগে সে তাহাই করে, অন্য কারো মুখের দিকে চাহিবার অবসর তখন তাহাদের বড় একটা থাকে না। সে নিজে সারাজীবন তাহাই করিয়া আসিয়াছে—এখনও করিতেছে—অপরের দোষ দিয়া লাভ কি?

    দুপুরের পর সে নিজের ঘরে বিশ্রাম করিতেছে, মনোরমা ঘরে ঢুকিয়া বলিল—ঘুমুলে নাকি?

    —না ঘুমুই নি, বসো।

    মনোরমা বিছানার এক কোণে বিপিনের মাথার কাছে বসিল। একটু ইতস্তত করিয়া বলিল—বীণাকে বল্লে কিছু নাকি?

    —বলেছি।

    —ও কি বললে?

    —বললে পটলের সঙ্গে আর কথা বলবে না।

    —একটা কথা বলি শোন। ওরকম করলে হবে না কিছু। বীণা ঠাকুরঝি যাই বলুক, পটলের সঙ্গে দেখা না করে পারবে না। তুমি বাড়ি থেকে বেরুতে যা দেরি। তার চেয়ে এক কাজ করো, পটলকে একবার বলে যাও কথাটা। ওকে ভয় দেখাও, বাড়ি আসতে বারণ করে যাও—তাতে কাজ হবে। বুঝলে আমার কথা?

    বিপিন মনে মনে মনোরমার বুদ্ধির প্রশংসা না করিয়া পারিল না। মেয়েমানুষের মন সে অনেক বেশি বোঝে তাহার নিজের চেয়ে।

    মনোরমা আবার বলিল—না হয় পাড়ার পাঁচজনকে ডেকে তাদের সামনে পটলকে দুকথা বল। এ বাড়ি আসতে মানা করে দাও। তাতে দুকাজই হবে। গাঁয়ের লোক জানুক তুমি বাড়ি এসে দুজনকেই শাসন করে দিয়েছ—পটলের একটা ভয় আর লজ্জা হবে—সে হঠাৎ এ বাড়িতে আসতে পারবে না।

    —কিন্তু তাতে একটা বিপদ আছে। গাঁয়ের লোকের কথা আমিই বা অনর্থক গায়ে মেখে নিতে যাই কেন? তাতে উল্টো উৎপত্তি হবে না?

    —কিছু উল্টো উৎপত্তি হবে না। বেশ, ভয় দেখিয়ে না হয়, মিষ্টি কথায় বুঝিয়ে বলো পটলকে—যখন এরকম একটা কথা উঠেছে—তখন ভাই আমাদের বাড়ি আর তোমার যাওয়া আসাটা ভালো দেখায় না—এই ভাবে বল।

    —তাই তবে করি। এদিকে আর একটা কথা বলি শোনো। বলাইয়ের অবস্থা ভালো নয়। আজ দেখে বুঝলাম, ও আর বেশি দিন নয়।

    —বল কি গো? অমন বলতে নেই।

    —আর বলতে নেই! মনোরমা, সামনে আমার অনেক বিপদ আসছে আমি বুঝতে পেরেছি। এই বীণার ব্যাপার, বলাইয়ের চেহারা—এ সব দেখে তোমারই বা কি মনে হয়? আমার এখন পলাশপুরে যাওয়া হয় না।….

    সেই রাত্রেই বিপিনের আশঙ্কা বাস্তবে পরিণত হইল। শেষরাত্রি হইতে বলাই হঠাৎ যন্ত্রণায় অস্থির হইয়া পড়িল, মাঝে মাঝে চিৎকার করে, মাঝে মাঝে ছুটিয়া বাহির হইতে যায়। প্রতিবেশীরা অনেকে দেখিতে আসিলেন—নানারকম টোটকা ওষুধের ব্যবস্থা করিলেন—কিছুতেই কিছু হইল না। যত বেলা বাড়িতে লাগিল, বলাই-এর মুখের বুলিই হইল—জ্বলে, গেল, জ্বলে গেল!….যন্ত্রণায় বলাই যেন পাগলের মতো হইয়া উঠিল, মুখে যাহা আসে বকে, হাত-পা ছোঁড়ে, আর কেবলই ছুটিয়া বাহির হইতে যায়।

    তিন দিন তিন রাত্রি একই ভাবে কাটিল। কত রকম তেল-পড়া, জল-পড়া, ঝাড়-ফুঁক, যে যাহা বলে তাহাই করা হইল। কিছুতেই কিছু হইল না। চতুর্থ দিন সকাল আটটার সময় হইতে বলাইয়ের অবস্থা ক্রমশ খারাপ হইয়া আসিতে লাগিল।

    বিপিন স্ত্রীকে ডাকিয়া বলিল—কি করচো?

    মনোরমার চক্ষু রাত জাগিয়া লাল, চোখের নীচে কালি পড়িয়াছে———বৃদ্ধা শাশুড়ি রাত জাগিতে পারেন না———বিপিনও আয়েসি লোক, রাত একটা পর্যন্ত কায়ক্লেশে জাগিয়া থাকে———তারপর গিয়া শুইয়া পড়ে। মনোরমা সারারাত জাগিয়া থাকে রোগীর পাশে আর থাকে বীণা।

    মনোরমা বলিল—গোয়ালে আজ চারদিন ঝাঁট পড়েনি, গোয়ালটা একটু ঝাঁট দিচ্ছি।

    বিপিন বলিল—গোয়াল-ঝাঁট থাকুক। সকাল সকাল নেয়ে এসে দুটো যা হয় রেঁধে ছেলেপিলেদের খাইয়েদাইয়ে নাও—বীণাকে আর মাকে খাইয়ে দাও। বলাইয়ের অবস্থা দেখে বুঝতে পারছ না?

    মনোরমা স্বামীর মুখের দিকে চাহিয়া থাকিয়া বলিল, কেন গো—ঠাকুরপোর অবস্থা খারাপ?

    —তা দেখে বুঝতে পারছ না? আজই হয়ে যাবে। আর দেরি নেই। শীগগির করে ঘাটে যাও।

    মনোরমা নিঃশব্দে কাঁদিতে লাগিল। বিপিন বলিল—কেঁদে কি হবে, এখন যা করবার আছে করে ফেল। মায়ের সামনে যেন কেঁদো না, ঘাটে যাও চলে।

    মনোরমার একটা অভ্যাস সংসারের মধ্যে যে যে আছে তাহাদের সকলকেই সে ভালোবাসে, স্নেহ করে—মা, বীণা ঠাকুরঝি, ঠাকুরপো—সকলেরই সুখসুবিধা দেখা তাহার চিরকালের অভ্যাস। এই সাজানো সংসারের মধ্য হইতে বলাই ঠাকুরপো চলিয়া গেলে সংসারের কতখানি চলিয়া যাইবে!…সে চিন্তা মনোরমার পক্ষে অসহ্য।

    বিপিন ভাইয়ের সামনে গিয়া বসিল। বীণাকে বলিল—যা বীণা ঘাটে যা—আমি আছি বসে। মাকে নিয়ে যা।

    সত্যি, এতটুকু মেয়ে বীণা কয়দিন কি অক্লান্ত পরিশ্রম করিতেছে, সমানে রাত জাগিতেছে মা ও উহার বৌদিদির সঙ্গে। দেবীর মতো সেবা করিতেছে ভাইয়ের, অথচ কি অভাগিনী! জীবনে সে কখনো যাহা পায় নাই—অথচ যার জন্য তার বালিকা-মন বুভুক্ষু, অপরের নিকট হইতে তারই এককণা পাইবার নিমিত্ত অভাগিনীর কি ব্যর্থ আগ্রহ! নিজেকে দিয়া বিপিন বোঝে এ নিদারুণ বুভুক্ষা।

    সকলে আহারাদি শেষ করিয়া লইয়া বলাইয়ের কাছে বসিল। বলাইয়ের গত দুই দিন কোনো জ্ঞান ছিল না—যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাঝে মাঝে কিন্তু মানুষ চিনিতে পারে না। বিপিনের মা খুব শক্ত মেয়ে—তিনি সবই বুঝিয়াছিলেন, অথচ এ পর্যন্ত তাঁহার চোখে জল পড়ে নাই—বরং বীণা ও মনোরমা কাঁদিলে তিনি কালও বুঝাইয়াছেন। আজ কিন্তু দুপুরের পর হইতে তিনি অনবরত কাঁদিতেছেন। বীণা ডোবার ধারে বাসন লইয়া গিয়াছিল।

    ডোবার ওপারের ঘাটে রায়-বৌ ও নিবারণ মুখুজ্জের বড়মেয়ে নলিনী কথা বলিতেছিল। নলিনী হাত-পা নাড়িয়া বলিতেছে—তা হবে না ওরকম? বাড়িতে বিধবা মেয়ের ওই রকম অনাচার ভগবান সহ্যি করেন? জলজ্যান্ত ভাইটা ধড়ফড় করে মরল চোখের সামনে! এখনও চন্দ্র-সূর্য আছেন—অনাচার ঢুকলে সে সংসারে মঙ্গল হয় কখনো?

    বীণা জলে নামিতে পারিল না—জলের ধারে কাঠের মতো দাঁড়াইয়া রহিল।

    উহারা বীণাকে দেখিতে পায় নাই—বীণা কিছুক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিয়া বাসন লইয়া চলিয়া আসিল—চোখের জল সামলাইতে পারিল না ফিরিবার সময়। পটলদা’র সঙ্গে কথা বলা অনাচার! এ ছাড়া আর কি অনাচার সে করিয়াছে? ভগবান তো সব জানেন। তাহারই পাপে ছোড়দা মরিতে বসিয়াছে—একথা যদি সত্য হয়—সে পিতল-কাঁসা-হাতে শপথ করিয়া বলিতেছে, আর কোনো দিন সে পটলদার মুখ দেখিবে না। ভগবান ছোড়দাকে বাঁচাইয়া দিন।

    কিন্তু ভগবান তাহার অনুরোধ রাখিলেন না। বৈকাল পাঁচটার সময় বলাই মারা গেল।

    ⤶ ⤷
    1 2 3 4 5 6 7 8 9 10 11 12 13
    Share. Facebook Twitter Pinterest LinkedIn Tumblr Email Reddit VKontakte Telegram WhatsApp Copy Link
    Previous Articleমানুষের গড়া দৈত্য – হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Next Article সুড়ঙ্গ রহস্য – শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়

    Related Articles

    ছোটগল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    কাদা kada

    August 11, 2025
    ছোটগল্প বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    অসাধারণ | Ashadharon

    April 3, 2025
    উপন্যাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    আরণ্যক – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    February 27, 2025
    উপন্যাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    চাঁদের পাহাড় – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    February 27, 2025
    উপন্যাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    পথের পাঁচালী – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    February 27, 2025
    উপন্যাস বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    অপরাজিত – বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

    February 27, 2025
    Add A Comment
    Leave A Reply Cancel Reply

    Ek Pata Golpo
    English Books
    অনিরুদ্ধ সরকার
    অনীশ দাস অপু
    অন্নদাশঙ্কর রায়
    অভিষেক চট্টোপাধ্যায়
    অভীক সরকার
    অমিতাভ চক্রবর্তী
    অমৃতা কোনার
    অসম্পূর্ণ বই
    আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথা
    আয়মান সাদিক
    আর্নেস্ট হেমিংওয়ে
    আশাপূর্ণা দেবী
    আহমদ শরীফ
    আহমেদ রিয়াজ
    ইউভাল নোয়া হারারি
    ইন্দুভূষণ দাস
    ইন্দ্রনীল সান্যাল
    ইভন রিডলি
    ইমদাদুল হক মিলন
    ইয়স্তেন গার্ডার
    ইয়ান ফ্লেমিং
    ইলমা বেহরোজ
    ইশতিয়াক খান
    ইশতিয়াক হাসান
    ইশরাক অর্ণব
    ইসমাইল আরমান
    ইসমাঈল কাদরী
    ঈশান নাগর
    ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
    উইলবার স্মিথ
    উইলিয়াম শেক্সপিয়র
    উচ্ছ্বাস তৌসিফ
    উৎপলকুমার বসু
    উপন্যাস
    উপাখ্যান
    উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
    ঋজু গাঙ্গুলী
    এ . এন. এম. সিরাজুল ইসলাম
    এ পি জে আবদুল কালাম
    এ. টি. এম. শামসুদ্দিন
    এইচ জি ওয়েলস
    এইচ. এ. আর. গিব
    এইচ. পি. লাভক্র্যাফট
    এডগার অ্যালান পো
    এডগার রাইস বারুজ
    এডিথ নেসবিট
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাশ
    এনায়েতুল্লাহ আলতামাস
    এম আর আখতার মুকুল
    এম. এ. খান
    এম. জে. বাবু
    এ্যারিস্টটল
    ঐতিহাসিক
    ও হেনরি
    ওবায়েদ হক
    ওমর খৈয়াম
    ওমর ফারুক
    ওয়াসি আহমেদ
    কনফুসিয়াস
    কবীর চৌধুরী
    কমলকুমার মজুমদার
    কর্ণ শীল
    কল্লোল লাহিড়ী
    কহলীল জিবরান
    কাজী আখতারউদ্দিন
    কাজী আনোয়ার হোসেন
    কাজী আনোয়ারুল কাদীর
    কাজী আবদুল ওদুদ
    কাজী ইমদাদুল হক
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী নজরুল ইসলাম
    কাজী মায়মুর হোসেন
    কাজী মাহবুব হাসান
    কাজী মাহবুব হোসেন
    কাজী শাহনূর হোসেন
    কাব্যগ্রন্থ / কবিতা
    কার্ল মার্ক্স
    কালিকারঞ্জন কানুনগো
    কালিকিঙ্কর দত্ত
    কালিদাস
    কালী প্রসন্ন দাস
    কালীপ্রসন্ন সিংহ
    কাসেম বিন আবুবাকার
    কিশোর পাশা ইমন
    কুদরতে জাহান
    কৃত্তিবাস ওঝা
    কৃষণ চন্দর
    কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী
    কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাস
    কেইগো হিগাশিনো
    কোজি সুজুকি
    কোয়েল তালুকদার
    কোয়েল তালুকদার
    কৌটিল্য / চাণক্য / বিষ্ণুগুপ্ত
    কৌশিক জামান
    কৌশিক মজুমদার
    কৌশিক রায়
    ক্যাথারিন নেভিল
    ক্যারেন আর্মস্ট্রং
    ক্রিস্টোফার সি ডয়েল
    ক্লাইভ কাসলার
    ক্ষিতিমোহন সেন
    ক্ষিতিশ সরকার
    ক্ষিতীশচন্দ্র মৌলিক
    খগেন্দ্রনাথ ভৌমিক
    খন্দকার মাশহুদ-উল-হাছান
    খাদিজা মিম
    খায়রুল আলম মনি
    খায়রুল আলম সবুজ
    খুশবন্ত সিং
    গজেন্দ্রকুমার মিত্র
    গর্ডন ম্যাকগিল
    গাজী শামছুর রহমান
    গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস
    গোলাম মাওলা নঈম
    গোলাম মুরশিদ
    গোলাম মোস্তফা
    গৌতম ভদ্র
    গৌরকিশোর ঘোষ (রূপদর্শী)
    গ্যেটে
    গ্রাহাম ব্রাউন
    গ্রেগরি মোন
    চণ্ডীদাস
    চলিত ভাষার
    চাণক্য সেন
    চার্লস ডারউইন
    চার্লস ডিকেন্স
    চিত্তরঞ্জন দেব
    চিত্তরঞ্জন মাইতি
    চিত্রদীপ চক্রবর্তী
    চিত্রা দেব
    ছোটগল্প
    জগদানন্দ রায়
    জগদীশ গুপ্ত
    জগদীশচন্দ্র বসু
    জন ক্লেল্যান্ড
    জন মিল্টন
    জয় গোস্বামী
    জয়গোপাল দে
    জয়দেব গোস্বামী
    জরাসন্ধ (চারুচন্দ্র চক্রবর্তী)
    জর্জ অরওয়েল
    জর্জ ইলিয়ট
    জর্জ বার্নাড শ
    জলধর সেন
    জসীম উদ্দীন
    জসীম উদ্দীন
    জহির রায়হান
    জহীর ইবনে মুসলিম
    জাইলস ক্রিস্টিয়ান
    জাকির শামীম
    জাফর বিপি
    জাভেদ হুসেন
    জাহানারা ইমাম
    জাহিদ হোসেন
    জি. এইচ. হাবীব
    জিতেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
    জিম করবেট
    জীবনানন্দ দাশ
    জীবনানন্দ দাশ
    জুনায়েদ ইভান
    জুবায়ের আলম
    জুল ভার্ন
    জুলফিকার নিউটন
    জে অ্যানসন
    জে ডি সালিঞ্জার
    জে. কে. রাওলিং
    জেমস রোলিন্স
    জেমস হেডলি চেজ
    জেসি মেরী কুইয়া
    জোনাথন সুইফট
    জোসেফ হাওয়ার্ড
    জ্ঞানদানন্দিনী দেবী
    জ্যাঁ জ্যাক রুশো
    জ্যাক হিগিনস
    জ্যোতিভূষণ চাকী
    জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী
    টম হারপার
    টেকচাঁদ ঠাকুর (প্যারীচাঁদ মিত্র)
    ডার্টি গেম
    ডিউক জন
    ডেভিড সেলজার
    ডেল কার্নেগি
    ড্যান ব্রাউন
    ড্যানিয়েল ডিফো
    তপন বন্দ্যোপাধ্যায়
    তপন বাগচী
    তপন রায়চৌধুরী
    তমোঘ্ন নস্কর
    তসলিমা নাসরিন
    তসলিমা নাসরিন
    তারক রায়
    তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়
    তারাপদ রায়
    তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়
    তিলোত্তমা মজুমদার
    তোশিকাযু কাওয়াগুচি
    তৌফির হাসান উর রাকিব
    তৌহিদুর রহমান
    ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায়
    দক্ষিণারঞ্জন বসু
    দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার
    দয়ানন্দ সরস্বতী
    দাউদ হায়দার
    দাশরথি রায়
    দিব্যেন্দু পালিত
    দিলওয়ার হাসান
    দিলীপ মুখোপাধ্যায়
    দীনেশচন্দ্র সিংহ
    দীনেশচন্দ্র সেন
    দীপঙ্কর ভট্টাচার্য
    দীপান্বিতা রায়
    দুর্গাদাস লাহিড়ী
    দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
    দেবারতি মুখোপাধ্যায়
    দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়
    দেবেশ ঠাকুর
    দেবেশ রায়
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বর্মন
    দ্বিজেন্দ্রনাথ বৰ্মন
    ধনপতি বাগ
    ধীরাজ ভট্টাচার্য
    ধীরেন্দ্রলাল ধর
    ধীরেশচন্দ্র ভট্টাচার্য
    নচিকেতা ঘোষ
    নজরুল ইসলাম চৌধুরী
    নবনীতা দেবসেন
    নবারুণ ভট্টাচার্য
    নসীম হিজাযী
    নাগিব মাহফুজ
    নাজমুছ ছাকিব
    নাটক
    নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
    নারায়ণ সান্যাল
    নারী বিষয়ক কাহিনী
    নাসীম আরাফাত
    নিক পিরোগ
    নিমাই ভট্টাচার্য
    নিয়াজ মোরশেদ
    নিরুপম আচার্য
    নির্বেদ রায়
    নির্মল সেন
    নির্মলচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়
    নির্মলেন্দু গুণ
    নিল গেইম্যান
    নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
    নীল ডিগ্র্যাস টাইসন
    নীলিমা ইব্রাহিম
    নীহাররঞ্জন গুপ্ত
    নীহাররঞ্জন রায়
    নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী
    পঞ্চানন ঘোষাল
    পঞ্চানন তর্করত্ন
    পপি আখতার
    পরিতোষ ঠাকুর
    পরিতোষ সেন
    পাওলো কোয়েলহো
    পাঁচকড়ি দে
    পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়
    পার্থ চট্টোপাধ্যায়
    পার্থ সারথী দাস
    পিয়া সরকার
    পিয়ের লেমেইত
    পীযুষ দাসগুপ্ত
    পূরবী বসু
    পূর্ণেন্দু পত্রী
    পৃথ্বীরাজ সেন
    পৌলোমী সেনগুপ্ত
    প্রচেত গুপ্ত
    প্রণব রায়
    প্রতিভা বসু
    প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত
    প্রফুল্ল রায়
    প্রফেসর ড. নাজিমুদ্দীন এরবাকান
    প্রবন্ধ
    প্রবীর ঘোষ
    প্রবোধকুমার ভৌমিক
    প্রবোধকুমার সান্যাল
    প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
    প্রভাবতী দেবী সরস্বতী
    প্রমথ চৌধুরী
    প্রমথনাথ বিশী
    প্রমথনাথ মল্লিক
    প্রমিত হোসেন
    প্রশান্ত মৃধা
    প্রশান্তকুমার পাল
    প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
    প্রিন্স আশরাফ
    প্রিন্সিপাল ইবরাহীম খাঁ
    প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়
    প্রীতিলতা রায়
    প্রেমকাহিনী
    প্রেমময় দাশগুপ্ত
    প্রেমাঙ্কুর আতর্থী
    প্রেমেন্দ্র মিত্র
    প্লেটো
    ফররুখ আহমদ
    ফরহাদ মজহার
    ফারুক বাশার
    ফারুক হোসেন
    ফাল্গুনী মুখোপাধ্যায়
    ফিওডর দস্তয়েভস্কি
    ফিলিপ কে. হিট্টি
    ফ্রাঞ্জ কাফকা
    ফ্রানজ কাফকা
    ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
    বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    বদরুদ্দীন উমর
    বদরুদ্দীন উমর (অসম্পূর্ণ)
    বন্যা আহমেদ
    বরাহমিহির
    বর্ণালী সাহা
    বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় (বনফুল)
    বশীর বারহান
    বাণী বসু
    বানভট্ট
    বাবুল আলম
    বামনদেব চক্রবর্তী
    বারিদবরণ ঘোষ
    বার্ট্রান্ড রাসেল
    বিজনকৃষ্ণ চৌধুরী
    বিজনবিহারী গোস্বামী
    বিদায়া ওয়ান নিহায়া
    বিদ্যুৎ মিত্র
    বিনয় ঘোষ
    বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিনোদ ঘোষাল
    বিপুল কুমার রায়
    বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিভূতিভূষণ মিত্র
    বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়
    বিমল কর
    বিমল মিত্র
    বিমল মুখার্জি
    বিমল সেন
    বিশাখদত্ত
    বিশ্বজিত সাহা
    বিশ্বরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়
    বিশ্বরূপ মজুমদার
    বিষ্ণু দে
    বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী
    বিহারীলাল চক্রবর্তী
    বুদ্ধদেব গুহ
    বুদ্ধদেব বসু
    বুদ্ধেশ্বর টুডু
    বুলবন ওসমান
    বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
    বেঞ্জামিন ওয়াকার
    বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দী
    ব্রততী সেন দাস
    ব্রাম স্টোকার
    ভগৎ সিং
    ভগিনী নিবেদিতা
    ভবানীপ্রসাদ সাহু
    ভবেশ রায়
    ভরতমুনি
    ভারতচন্দ্র রায়
    ভাস
    ভাস্কর চক্রবর্তী
    ভিক্টর ই. ফ্রাঙ্কেল
    ভিক্টর হুগো
    ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
    ভেরা পানোভা
    ভৌতিক গল্প
    মঈদুল হাসান
    মখদুম আহমেদ
    মঞ্জিল সেন
    মণি ভৌমিক
    মণিলাল গঙ্গোপাধ্যায়
    মণীন্দ্র গুপ্ত
    মণীন্দ্র দত্ত
    মতি নন্দী
    মনজুরুল হক
    মনোজ মিত্র
    মনোজ সেন
    মনোজিৎ কুমার দাস
    মনোজিৎকুমার দাস
    মনোরঞ্জন ব্যাপারী
    মন্দাক্রান্তা সেন
    মন্মথ সরকার
    মরিয়ম জামিলা
    মরিস বুকাইলি
    মহাভারত
    মহালয়া
    মহাশ্বেতা দেবী
    মহিউদ্দিন আহমদ
    মহিউদ্দিন মোহাম্মদ
    মাইকেল এইচ. হার্ট
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাইকেল মধুসূদন দত্ত
    মাওলানা আজিজুল হক
    মাওলানা মুজিবুর রহমান
    মাকসুদুজ্জামান খান
    মাকিদ হায়দার
    মানবেন্দ্র পাল
    মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়
    মারিও পুজো
    মার্ক টোয়েন
    মার্থা ম্যাককেনা
    মার্সেল প্রুস্ত
    মাহমুদ মেনন
    মাহমুদুল হক
    মাহরীন ফেরদৌস
    মিচিও কাকু
    মিনা ফারাহ
    মির্চা এলিয়াদ
    মিলন নাথ
    মিহির সেনগুপ্ত
    মীর মশাররফ হোসেন
    মুজাফফর আহমদ
    মুজাহিদ হুসাইন ইয়াসীন
    মুনতাসীর মামুন
    মুনীর চৌধুরী
    মুরারিমোহন সেন
    মুহম্মদ আবদুল হাই
    মুহম্মদ জাফর ইকবাল
    মেল রবিন্স
    মৈত্রেয়ী দেবী
    মোঃ ফুয়াদ আল ফিদাহ
    মোঃ বুলবুল আহমেদ
    মোজাফ্‌ফর হোসেন
    মোতাহের হোসেন চৌধুরী
    মোস্তফা মীর
    মোস্তফা হারুন
    মোস্তাক আহমাদ দীন
    মোহাম্মদ আবদুর রশীদ
    মোহাম্মদ আবদুল হাই
    মোহাম্মদ নজিবর রহমান
    মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিন
    মোহাম্মদ নাসির আলী
    মোহাম্মদ শাহজামান শুভ
    মোহাম্মদ হাসান শরীফ
    রকিব হাসান
    রবার্ট লুই স্টিভেনসন
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
    রাজশেখর বসু (পরশুরাম)
    লীলা মজুমদার
    লেখক
    শংকর (মণিশংকর মুখোপাধ্যায়)
    শক্তি চট্টোপাধ্যায়
    শক্তিপদ রাজগুরু
    শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়
    শান্তিপ্রিয় বন্দ্যোপাধ্যায়
    শিবরাম চক্রবর্তী
    শীর্ষেন্দু মুখােপাধ্যায়
    শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
    শ্রেণী
    ষষ্ঠীপদ চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জয় ভট্টাচার্য
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়
    সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
    সত্যজিৎ রায়
    সত্যজিৎ রায়
    সমরেশ বসু
    সমরেশ মজুমদার
    সমুদ্র পাল
    সামাজিক গল্প
    সুকুমার রায়
    সুচিত্রা ভট্টাচার্য
    সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
    সুভাষচন্দ্র বসু
    সুমনকুমার দাশ
    সৈকত মুখোপাধ্যায়
    সৈয়দ মুজতবা আলী
    সৌভিক চক্রবর্তী
    সৌমিত্র বিশ্বাস
    সৌরভ চক্রবর্তী
    স্টিফেন হকিং
    স্বামী বিবেকানন্দ
    স্যার আর্থার কোনান ডয়েল
    হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়
    হাসান খুরশীদ রুমী
    হাস্যকৌতুক
    হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
    হুমায়ূন আহমেদ
    হেমেন্দ্রকুমার রায়
    Generic selectors
    Exact matches only
    Search in title
    Search in content
    Post Type Selectors
    Demo

    Your Bookmarks


    Reading History

    Most Popular

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Demo
    Latest Reviews

    বাংলা গল্প শুনতে ভালোবাসেন? এক পাতার বাংলা গল্পের সাথে হারিয়ে যান গল্পের যাদুতে।  আপনার জন্য নিয়ে এসেছে সেরা কাহিনিগুলি, যা আপনার মন ছুঁয়ে যাবে। সহজ ভাষায় এবং চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায়, এই গল্পগুলি আপনাকে এক নতুন অভিজ্ঞতা দেবে। এখানে পাবেন নিত্যনতুন কাহিনির সম্ভার, যা আপনাকে বিনোদিত করবে এবং অনুপ্রাণিত করবে।  শেয়ার করুন এবং বন্ধুদের জানাতে ভুলবেন না।

    Top Posts

    হর্ষবর্ধনের বাঘ শিকার

    January 4, 2025

    দোকানির বউ

    January 5, 2025

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026
    Our Picks

    মৃত কৈটভ ৩ (হলাহল বিষভাণ্ড) – সৌরভ চক্রবর্তী

    February 19, 2026

    রক্ত পাথার – অনুবাদ : ঋজু গাঙ্গুলী

    February 19, 2026

    পেত্নি সমগ্র – অমিতাভ চক্রবর্তী

    February 18, 2026
    Facebook X (Twitter) Instagram Pinterest
    • Home
    • Disclaimer
    • Privacy Policy
    • DMCA
    • Contact us
    © 2026 Ek Pata Golpo. Designed by Webliance Pvt Ltd.

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.

    • Login
    Forgot Password?
    Lost your password? Please enter your username or email address. You will receive a link to create a new password via email.
    body::-webkit-scrollbar { width: 7px; } body::-webkit-scrollbar-track { border-radius: 10px; background: #f0f0f0; } body::-webkit-scrollbar-thumb { border-radius: 50px; background: #dfdbdb }