গাজন – শ্রীজিৎ সরকার
(১)
কত বয়স হবে ভদ্রলোকের? বড়োজোর ষাট বা বাষট্টি। যদি আরেকটু টেনেটুনে বাড়ানও হয়, পঁয়ষটির বেশি তো কোনোভাবেই নয়। মহুয়াগাছের ছায়ায় বসে একমনে ঝুড়ি বুনছেন তিনি। বয়সজনিত কারণেই অল্প অল্প কাঁপছে তাঁর ঘাড়টা। তবে যে অনায়াস ভঙ্গিতে তাঁর হাত চলছে—তাতে আন্দাজ করা যাচ্ছে যে, দৃষ্টিহীন হয়ে পড়লেও হয়তো তাঁর কাজ করে যেতে অসুবিধা হবে না।
ক্লিক।
মুখ তুললেন ভদ্রলোক। আর এতক্ষণ পর, তাঁর চেহারাটা ভালোভাবে দেখার সুযোগ পেল মৌসুমি।
দীর্ঘদিন ধরে উষ্ণ আবহাওয়ায় বাস করলে মানুষের চামড়ায় যেমন স্থায়ী একটা তামাটে ছোপ পড়ে যায়, ভদ্রলোকের গাত্রবর্ণ ঠিক তেমন। চোখের নীচে আর কপালে কাটাকুটি খেলছে অজস্র রেখা। বোঁচা নাক আর চওড়া কপাল তাঁর চেহারায় একটা আফ্রিকান আদল এনে দিলেও, বাদ সেধেছে টানা টানা চোখদুটো। দুপুর রোদে ঝিকমিক করছে সেগুলো। মনে হচ্ছে, অনেক না-বলা কথা লুকিয়ে আছে সেখানে!
“আপনার কাজের বোধহয় খুব অসুবিধা করে দিলাম, তাই না?” ক্যামেরায় খুটখাট করতে করতে জিজ্ঞাসা করল মৌসুমি।
ভদ্রলোক মুখে কোনো কথা বললেন না। ভালোভাবে একটু দেখে নিলেন মৌসুমিকে। তারপর দু-পাশে মাথা নেড়ে তিনি জানিয়ে দিলেন যে, অজ্ঞাতপরিচয় তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি তার কাজে খুব একটা ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি।
ভদ্রলোক সম্ভবত আলাপী নন-কিংবা পূর্বপরিচিত মানুষ ছাড়া, অন্য কারওর সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বিশেষ আগ্রহী নন। তবু কিছুটা উপযাচক হয়েই জিজ্ঞাসা করল মৌসুমি, “এগুলো কী বানাচ্ছেন আপনি? ঝুড়ি?”
উপর-নীচে মাথা নাড়লেন ভদ্রলোক। যার অর্থ-হ্যাঁ।
“আপনি বুঝি এগুলো বিক্রি করবেন?”
ইতিবাচক উত্তর দেওয়ার জন্য আবারও ভেসে এল সেই একই ইশারা।
ভদ্রলোক আদৌ কথা বলতে পারেন কী না, সে ব্যাপারে একটু সন্দেহ হচ্ছিল মৌসুমির। তাই সামান্য ঝুঁকে ও জিজ্ঞাসা করল, “আমি একটা ঝুড়ি কিনতে চাই। কত করে দাম পড়বে এগুলোর?”
এবার একটু থমকে গেলেন ভদ্রলোক। বোধহয় তিনি বুঝে নিতে চাইলেন মৌসুমির কথার সুরটা একবার মুখ তুলে, তাকিয়ে দেখেও নিলেন ওর মুখটা। তারপর আবার নিজের কাজে ফিরে যেতে যেতে উত্তর দিলেন, “এগুলো পঞ্চাশ টাকা পিস। আর ঢাকনাওয়ালা যে ঝুড়িগুলো আছে, সেগুলো সত্তর টাকা পিস।”
“আমি ওই ঢাকনা দেওয়া ঝুড়িই নেব।” ক্যামেরাটা ব্যাগে ঢোকাতে ঢোকাতে বলল মৌসুমি।
“কিন্তু ওই ঝুড়িগুলো তো এখানে নেই। ওগুলো আমার বাড়িতে আছে।”
মনে মনে খুশি হল মৌসুমি। খুব সহজ গলায় ও বলল, “ বেশ তো। আমি আপনার সঙ্গে আপনার বাড়িতে যেতেই পারি। আপনার বাড়ি এখান থেকে কত দূর?”
ভদ্রলোকের চেহারা এবং ভাবভঙ্গি দেখে তাকে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দা বলেই মনে হচ্ছিল। তাছাড়া বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে, গাছতলায় এভাবে বসে কেউ কাজ করবে; যুক্তির বিচারে এটাও ঠিক গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছিল না মৌসুমির কাছে।
“আপনি কী ট্যুরিস্ট?” উত্তর দেওয়ার বদলে অন্য একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন মানুষটা।
“হ্যাঁ,” হাসিমুখে ঘাড় নাড়ল মৌসুমি, “তবে আমি যে শুধু ঘুরতেই এসেছি, তা নয়। আমার একটা কাজও আছে। আসলে আমি অনেকের মুখেই এখানকার বোলান গাজনের খুব নাম শুনেছি। বহুদিন ধরেই দেখতে আসার খুব ইচ্ছা ছিল। কাজের চাপে আর হয়েই উঠছিল না… ফাইনালি এবার হয়েছে।”
উত্তরটা শুনেই ভদ্রলোক এমন নির্লিপ্ত হয়ে গেলেন যে, স্পষ্ট বোঝা গেল – হয় বোলান গাজনের আকর্ষণে ছুটে আসা পর্যটক দেখার যথেষ্ট অভ্যাস তাঁর আছে, আর নয়তো নিজস্ব পৃথিবীর বাইরে অন্য কিছু নিয়ে তিনি ভাবনাচিন্তা করতে রাজি নন। তিনি মৌসুমির প্রতি আর কোনো আগ্রহ দেখালেন না। বরং আবার ডুবে গেলেন নিজের কাজে। এমনকী, তাঁকে দেখে মনে হল – তিনি যে কিছুক্ষণ আগেই মৌসুমিকে নিজের বাড়িতে যেতে বলেছিলেন— এরইমধ্যে সে কথা সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে গিয়েছেন!
পাছে ভদ্রলোক বিরক্ত হন, তাই কিছুক্ষণ আর কোনো কথোপকথনের মধ্যে গেল না মৌসুমি। বরং আশপাশে নিজের মনেই একটু ঘুরঘুর করল ও। কোটর থেকে মুখ বাড়াতে থাকা কাঠঠোকরার ছবি তুলল, গাছের বাকল ফুঁড়ে লেখা প্রেমপ্রস্তাবের অর্থোদ্ধার করল, শুকনো পাতার আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে থাকা গিরগিটির পিছনে ছুটল, কখনও আবার শুকনো অচেনা বুনো ফলও কুড়োল… তবে এতকিছুর মধ্যেও মৌসুমি নজর রেখে দিল ভদ্রলোকের দিকে, যাতে কোনোভাবেই তিনি ওর লক্ষের বাইরে চলে না যান।
আজ যখন একা একাই বেরোচ্ছিল মৌসুমি, সৌমেন খুব কাঁচুমাচু মুখ করে বলেছিল, “অচেনা জায়গায় একা বেরোবেন দিদি?”
“আরে, এসবের অভ্যাস আমার আছে। একা না হাঁটলে কোনো জায়গাকে এক্সপ্লোর করা যায় নাকি?” হেসে ফেলেছিল মৌসুমি, “তাছাড়া গ্রামের রাস্তায় হারিয়ে যাওয়া সহজ নয়।”
“সেটা ঠিকই,” অনিচ্ছাসত্ত্বেও সায় দিয়েছিল সৌমেন। “তবে এখানে আবার বনজঙ্গল আছে তো!”
“এমনভাবে বলছ, যেন তোমাদের বনে সিংহ আর অ্যানাকোন্ডা ঘুরে বেড়ায়।” হাসতে হাসতে বলেছিল মৌসুমি।
“তা নয়,” মাথা চুলকিয়েছিল সৌমেন, “তবে গত ক-বছর জঙ্গলে একটা জন্তু বেরোচ্ছে। যদিও সেটা রাতের দিকেই বেরোচ্ছে মূলত।”
“কী জন্তু?” ভয়ডরের বদলে, আগ্রহ ফুটে উঠেছিল মৌসুমির গলায়।
“সেটাই তো কেউ জানে না দিদি!” সৌমেন আমতা আমতা করে বলেছিল, “বোধহয় … বোধহয় নেকড়ে বা শিয়ালের পাল-টাল হবে…”
“সে কী! বছর খানেক ধরে তারা বেরোচ্ছে; অথচ এখনও জানাই যায়নি?” একটু অবাক হয়েছিল মৌসুমি, “এমনিতে এখানকার জঙ্গলে কোনো হিংস্র জন্তু আছে?”
“না দিদি। শুধু আমি কেন; আমার বাবাও নাকি কোনোদিন এখানে কোনো হিংস্র জন্তু-জানোয়ার দেখেনি! ওইজন্যই তো চিন্তাটা বেশি হচ্ছে।” দু-পাশে মাথা নেড়ে বলেছিল সৌমেন। তারপর একটু থেমে, নিজেই যোগ করেছিল, “ বোধহয় কোনো ঘা খাওয়া জানোয়ার হবে। হয়তো অন্য কোথাও থেকে পালিয়ে এসেছিল; তারপর এখানেই থেকে গেছে!”
“হ্যাঁ, সেটা হতেই পারে!” সায় দিয়েছিল মৌসুমি, “জন্তুটা অ্যাটাক করেছে নাকি কাউকে?”
“হ্যাঁ,” একটু ইতস্তত করে ঘাড় নেড়েছিল সৌমেন, “এখনও পর্যন্ত তিনজনকে অ্যাটাক করেছে। তিনজনই মারা গেছে।”
যেহেতু ইতিপূর্বে একবার ট্রেক করতে গিয়ে নেকড়ের মুখোমুখি হওয়ার পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে, সুতরাং বিষয়টাকে খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়নি মৌসুমির। তবে সৌমেনের দায়িত্বজ্ঞান দেখে খুশি হয়েছিল ও। ওর আবারও মনে পড়েছিল; সৌমেনের এই মানবিক গুণগুলোই ওদের দুজনকে একদিন কাছাকাছি নিয়ে এসেছিল। নয়তো তথ্যচিত্র বানাতে গিয়ে তো কত মানুষের সঙ্গেই আলাপ হয় মৌসুমির। কজনের সঙ্গেই বা হৃদ্যতাটা এতখানি দীর্ঘমেয়াদি হয়?
খুব সাবলীলভাবে মৌসুমি বলেছিল, “আচ্ছা। তবে তুমি চিন্তা কোর না। আমি তো দুপুরের আগেই ফিরে আসছি।”
এখন যদি হঠাৎ কোনো হিংস্র জীবজন্তুর মুখোমুখি হয়ে যেতে হয়, তবে কী করা যেতে পারে— হাঁটতে হাঁটতে সেই কথাই ভাবছিল মৌসুমি। কখনও আবার গুগল লেন্সের সাহায্য না নিয়েই ও চেনার চেষ্টা করছিল বুনো ঝোপঝাড়গুলো আবার যখন উঁচু ডাল থেকে কুজন ভেসে আসছিল, তখন শুধু ডাক শুনেই পাখিটাকে শনাক্ত করার চেষ্টা করছিল ও কাজগুলো সহজ ছিল না মোটেই। তবু এসবের মধ্যেই ছোটোখাটো একটা অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পাচ্ছিল মৌসুমি।
প্রকৃতি দেখতে দেখতে বাস্তব থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল মৌসুমি। যখন একটা অচেনা ফুল দেখার জন্য কুঁরে পড়েছে, ঠিক তখনই বেজে উঠল ওর মোবাইলটা। আড়চোখে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল ও, ফুটে উঠেছে ‘Baba Calling…’ লেখাটা।
“বলো বাবা,” স্পিকারটা কানে চেপে ধরল মৌসুমি।
“কী করছ মাম?”
“এই তো, জায়গাটা একটু এক্সপ্লোর করতে বেরিয়েছি।”
“সৌমেনও আছে নাকি সঙ্গে?”
“না বাবা। ওদের জমিজায়গা সংক্রান্ত কী একটা কাগুজে ঝামেলা হয়েছে; ও সেটা মেটাতে মুহুরির কাছে গেছে। তবে দুপুরের মধ্যেই ফিরে আসবে বলল।” এরপর গড়গড় করে অনেক কথা বলে গেল মৌসুমি। কী কী ছবি ও তুলতে পেরেছে, আঞ্চলিক জীবনযাত্রার নতুন কোন বৈশিষ্ট্য ও আবিষ্কার করেছে; মূলত এসব নিয়েই কথা হল দু-পক্ষের মধ্যে। শেষে এটাও যোগ করল যে, ও একটা ঢাকনাওয়ালা হাতে বোনা ঝুড়ি কিনতে চলেছে।
“কিন্তু মাম; তুমি তো রান্নাবান্নাও করো না, আর সবজিও ধোও না! তবে ঝুড়ি নিয়ে কী করবে?” অবাক হল বাবা।
“কেন বাবা? জিনিস কিনলে কী সবসময় ব্যবহার করতেই হবে নাকি? স্যুভেনির হিসাবে তো সাজিয়েও রেখে দেওয়া যায়!”
“সেটা অবশ্য ঠিকই। কিন্তু রাখবে কোথায়, ভেবে দেখেছ? বাড়ি তো স্যুভেনিরেই ভর্তি করে ফেলেছ!”
“এত চিন্তা করছ কেন? যদি হই সুজন, তেঁতুল পাতায় ন-জন।”
বাবা হেসে উঠল হো-হো করে।
আরও কিছু কথাবার্তা বলার পর, ফোনটা রেখে দিল মৌসুমি। তারপর দ্রুতপায়ে ফিরে এল ও মহুয়াতলায়।
একা একা দাঁড়িয়ে ছিল গাছটা। ঝিরঝির করে হাওয়া বইছিল তার মধ্যে দিয়ে। কোনো জনপ্রাণীর চিহ্ন ছিল না আশপাশে।
নিজের উপরে নিজেই রেগে গেল মৌসুমি। কথা বলার ফাঁকে একজন মানুষের উপর নজর রাখাটা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়! অথচ কেন যে তখন এতটা অসাবধানী হল ও … . তবু মৌসুমি চোখ চালাল এদিক-ওদিক, হাঁটাহাঁটিও করল কিছুদুর। যেহেতু ভদ্রলোকের নামটুকুও অজানা ছিল ওর, তাই ডাকাডাকি করাটাও সম্ভব হচ্ছিল না। আর ফাঁকা জায়গায় “শুনছেন! কোথায় গেলেন?” জাতীয় অর্থহীন চিৎকার করাটা মৌসুমির কাছে অযৌক্তিকও মনে হচ্ছিল, এবং অস্বস্তিকরও।
মিনিট কুড়ি এলোমেলো অনুসন্ধানপর্ব চালানোর পর হাল ছেড়ে দিল মৌসুমি। দুপুরের খাওয়ার সময় হয়ে আসছিল, শরীর জুড়ে ক্লান্তিও নামছিল অল্প অল্প করে। অগত্যা, ঝুড়ি এবং ঝুড়িওয়ালার আশা ত্যাগ করে, বাসামুখো হল ও। তবে ফিরতে ফিরতে মৌসুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল; আজই সৌমেনের কাছে ও জিজ্ঞাসা করবে মানুষটার ব্যাপারে। সৌমেনই আপাতত ওর শেষ ভরসা।
*****
(২)
মৌসুমি পৌঁছোনোর কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এসেছিল সৌমেন। দুপুরে খেতে বসে সৌমেন এবং ওর বাড়ির বাকিরা যখন মৌসুমির একলা-ভ্রমণের ব্যাপারে নানান কথা জিজ্ঞাসা করছিল, তখন ইচ্ছা করেই ও ঝুড়িওয়ালার কথাটা উহ্য রেখেছিল। সেখানে বরং প্রাধান্য পেয়েছিল জঙ্গল আর ফুল-পাখি ইত্যাদি প্রাকৃতিক বিষয়গুলো। ও ভেবেই নিয়েছিল, বিকেলবেলা যখন শুধু ও আর সৌমেন চড়কতলায় গাজন দেখতে যাবে, তখন একান্তে ওর থেকে ব্যাপারটা জেনে নেবে।
মৌসুমির ধারণা ছিল, হয়তো ছবি দেখানোর পরও ওকে প্রচুর বিবরণ ইত্যাদি দিতে হবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে ক্যামেরাটাও ব্রে করতে হল না ওকে। মৌসুমির মুখ থেকে সামান্য বর্ণনা শুনেই মানুষটাকে চিনতে পারল সৌমেন, “আরে, ও তো গজুড়ো!”
মূল রাস্তা থেকে জঙ্গলের পথে নামতে নামতে মৌসুমি জানতে চাইল, “খুব বিখ্যাত মানুষ বুঝি?”
“তা বলতে পারেন দিদি,” হাসল সৌমেন, “ওকে চেনে না, এই তল্লাটে এমন মানুষ নেই। আমরা জ্ঞান হওয়ার থেকেই ওকে দেখছি। বুড়োর সাতকূলে কেউ নেই। সারাদিন এ-গাছের নীচে ও-গাছের নীচে বসে ঝুড়ি বানায় আর নয়তো একা একা বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। বুড়োর কোনো চাহিদা নেই, কারওর সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি নেই। সংসারের মধ্যে থেকেও বুড়ো যেন সন্ন্যাসী!”
মৌসুমী একটু আগ্রহী হল মানুষটার ব্যাপারে, “আচ্ছা, উনি একা একা বনবাদাড়ে ঘুরে বেড়ান কেন?”
“ওই কাঠকুটো কুড়োয়, ফলপাকড় পাড়ে, বনমুরগি ধরে…. এসব করলে জ্বালানিটাও সাশ্রয় হয় আবার খাবারদাবারেরও কিছুট সুরাহা হয়। যদি কখনও খরগোশ ধরতে পারেন কী ডেউয়া, ফলসা, নোনা; এসব বেশি করে পাড়তে পারেন; তখন বিক্রিও করে। এমনিতে বুড়োর হাতের কাজ খুব ভালো। কিন্তু ও একদম ব্যবসা বোঝে না। নয়তো ওর আবার অভাব হয়? থাকে তো ওই একা মানুষ!”
“আচ্ছা, বুঝলাম।” গজুবুড়োর ব্যাপারে আর কিছু বলল না মৌসুমি।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা পৌঁছে গেল গাছগাছালিতে ঘেরা একটা ফাঁকা জায়গায়, যেখানে বোলান গাজন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। ইতিমধ্যেই ভিড় জমতে শুরু করেছিল সেখানে। নানান বয়সী মানুষরা বিচিত্র স্বরে কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে; অত্যুৎসাহী বাচ্চারা লাফালাফি করছিল আপনমনেই; দুই-একজন ফেরিওয়ালা গলায় ঝাঁকা ঝুলিয়ে বাঁশি, বাদামভাজা, আলুকাবলি ইত্যাদি বিক্রি করছিল। সব মিলিয়ে, বেশ একটা উৎসবপ্রাঙ্গণের চেহারা নিয়েছিল গোটা চত্ত্বরটা।
সৌমেনের বাবা-মা যেহেতু আগেই পৌঁছে গিয়েছিল অকুস্থলে এবং দুজনের জায়গাও তারা রেখে দিয়েছিল, সুতরাং মৌসুমিদের বসতে অসুবিধা হল না।
দর্শকদের বেশভূষা দেখে এবং কথাবার্তা শুনে মৌসুমির মনে হল যে, এখানে একমাত্র ও-ই হয়তো বহিরাগত। অনেকেই অবাক চোখে তাকাচ্ছিল ওর দিকে; ফিসফাসও করছিল তারা নিজেদের মধ্যে। সম্ভবত ওর পরনের জিন্স-টিশার্ট আর গলায় ঝোলানো প্রমাণ মাপের ক্যামেরাটাই ছিল তাদের মনোযোগ আকর্ষণের প্রধান উপলক্ষ্য।
সন্ধ্যা ক্রমে ক্রমে আরও ঘন হয়ে উঠছিল। কালো হয়ে উঠছিল চারদিকের জঙ্গল। এক আশ্চর্য আদিম গন্ধে ঘন হয়ে উঠছিল বাতাস।
মৌসুমি ভেবেছিল, গাজন দেখার জন্য হয়তো বৈদ্যুতিক আলোর ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল যে, ব্যাপারটা আদপে সেরকম নয়। অন্ধকার জাঁকিয়ে বসতে না বসতেই চারটে খুঁটিতে বেঁধে দেওয়া চারটে বড়ো বড়ো মশাল। সেগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া মাত্র গনগন করে উঠল হলুদ আলো; আর নিমেষে বদলে গেল গোটা জায়গার চেহারাটা। মৌসুমির মনে হল; ও যেন টাইমমেশিনে চড়ে পৌঁছে গেছে প্রাচীন কোনো অ্যাম্ফিথিয়েটারে, যেখানে এখনই শুরু হবে অদৃষ্টপূর্ব কোনো ক্রিয়াকলাপ। সেইসঙ্গে সমস্ত কলরবও মৃদু হতে হতে একসময় যেভাবে থেমে গেল; তাতে মৌসুমির আর বুঝতে অসুবিধা থাকল না যে, বোলান পালা শুরু হতে আর বেশি দেরি নেই।
মৌসুমির আন্দাজ যে সঠিক ছিল, সেটা প্রমাণ হয়ে গেল অনতিকাল পরেই। দেখতে দেখতে বেজে উঠল নানান বাদ্যযন্ত্র, অস্পষ্ট স্বরে জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল দর্শকরা। আসরে প্রথমে ঢুকলেন দু-জন দলপতি; তাঁদের পিছু পিছু এসে দাঁড়াল রঙচঙ মাখা নর্তকের দল। প্রথামাফিক বন্দনা শেষ করে, নাচ-গান আরম্ভ করে দিল তারা।
আজকের পালার বিষয়— শিব ও দুর্গার প্রেম। সামাজিক এবং রাজনৈতিক ঘটনা নিয়ে বাঁধা সখী বোলানের পাশাপাশি, পৌরাণিক বিষয়ের উপর তৈরি এমন দাঁড় বোলানও আগে বেশ কয়েকবার দেখেছে মৌসুমি। স্থানভেদে বিষয়বস্তুর বিভিন্নতাও প্রত্যক্ষ করেছে ও। যদিও সেসব ওকে সন্তুষ্টি দিতে পারেনি। কিছুটা এইসব কারণেই, আজ থেকে বছর দেড়েক আগে যখন কথাপ্রসঙ্গে মৌসুমি জানিয়েছিল বোলান গাজন নিয়ে ওর তথ্যচিত্র তৈরির পরিকল্পনা; তখন সৌমেন বলেছিল তাদের গ্রামের বোলানের কথা। তাৎক্ষণিকভাবে অবশ্য খুব একটা আগ্রহ প্রকাশ করেনি মৌসুমি। ওর মনে হয়েছিল, ঐতিহ্য এবং জাঁকজমক হারাতে হারাতে হয়তো সব জায়গাতেই বোলানের মূল রূপ একইরকম হয়ে গেছে। তবে সৌজন্যর খাতিরে তাচ্ছিল্যও দেখায়নি ও। হাজার হোক; সৌমেন না থাকলে যে নকশিকাঁথার উপর তথ্যচিত্রটা ও কখনওই শেষ করতে পারত না, সে কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই!
সেই থেকে অনুরোধ করে চলেছিল সৌমেন, “আসুন না দিদি আমাদের গ্রামে! দেখবেন, আপনার ভালো লাগবে।”
বারবার কাটিয়ে গেলেও, শেষমেশ মৌসুমির মনে হয়েছিল যে, অন্তত সৌমেনের অনুরোধের মূল্য দিতে ওর একবার আসা উচিত। তাছাড়া ফাঁকতালে অজানা কোনো বোলানগানের সন্ধান পেয়ে যাওয়ার ক্ষীণ একটা আশাও ছিল ওর মনের মধ্যে।
এখানে আসার জন্য বছরের এইসময়টাকে বেছে নেওয়ার প্রস্তাবটাও দিয়েছিল সৌমেনই। ও-ই বলেছিল, “এখন তো আর আগের মতো বাড়ি বাড়ি ঘুরে বোলান হয় না দিদি। হবেই বা কী করে? লোকে যা পয়সা দেয়, তাতে ওদের পোষায় না! একটা দল পোষা কী কম খরচ। তাই ওরা একদিন রাতে একজায়গায় নাচ-গান করে; গ্রামের লোকেরা সবাই মিলে চাঁদা তুলে কম-বেশি যাহোক কিছু দিয়ে দেয়।”
আজকের পালাটা মৌসুমির পূর্বপরিচিত। সুতরাং, প্রথম প্রথম বিশেষ আগ্রহ বোধ করছিল না ও। বরং কীভাবে সময়টা কাটানো যায়, সেটা ভেবেই চিন্তিত হয়ে পড়ছিল ও। কিন্তু কিছুক্ষণ কাটতে না কাটতেই বদলে গেল মৌসুমির অনুভূতিটা। যেহেতু এমন বন্য পরিবেশে, মশালের আলোয় বোলান গাজন দেখার মধ্যে কিছুটা নতুনত্ব ছিল; তাই বেশ কিছু ছবি এবং ভিডিও তুলল ও। তারপর কিছুক্ষণ নাচ-গান দেখে, কিছুক্ষণ মোবাইল ঘেঁটে, আবার কিছুক্ষণ আকাশ-পাতাল চিন্তা করে মৌসুমি কাটিয়ে দিল সময়টা।
এসবের মধ্যে বারকয়েক সৌমেনের সঙ্গে কথা বলারও চেষ্টা করল মৌসুমি। কিন্তু আনুষঙ্গিক শব্দের দাপট এত প্রবল ছিল যে, ব্যর্থ হতে হতে একসময় হাল ছেড়েই দিতে হল ওকে। তাছাড়া সৌমেন যে গোটা বিষয়টা অত্যন্ত উপভোগ করছিল; সেই ছাপ ফুটে উঠছিল তার চেহারায়। সম্ভবত শিকড়ের টানই তাকে জুড়ে রেখেছিল এই প্রাচীন পালার সঙ্গে। এসব দেখে, মৌসুমিরও আর ইচ্ছা করছিল না তাকে বিরক্ত করতে।
অবশেষে পালা যখন সাঙ্গ হল, তখন ঘড়ির কাঁটা একটা ছুই ছুই। তবে সব শেষ যে সত্যিই পরিসমাপ্তি নয়, সেটা টের পাওয়া গেল একটু পরেই।
এতক্ষণ যে দু-দল পালা করে নাচ-গান করছিল এবং ধুয়ো তুলছিল; তারা আসর ছেড়ে বেরিয়ে যেতে না-যেতেই সেখানে প্রবেশ করলেন লম্বা-চওড়া একজন মানুষ। তাঁর সাজ ছিল আরও উগ্র; তবে শারীরিক অভিব্যক্তির বিচারে তিনি ছিলেন অনেক সমাহিত। মনে হচ্ছিল, এতক্ষণ ধরে চলা প্রলয়নাচনের গনগনে আমেজে শান্তিজল ছিটিয়ে দিতেই আগমন হয়েছে তাঁর।
সমস্ত বাজনা থেমে গিয়েছিল। থমথম করছিল চতুর্দিক।
“দিদি, পোড়ো বোলান দেখাবে এবার,” নীরবতার অবসরে ফিসফিস করে বলে উঠল সৌমেন।
ঝট্ করে একটু চমকে উঠল মৌসুমি। এতটাও আশা করে আসেনি ও। যে সামান্য একঘেয়েমি জাঁকিয়ে বসছিল আস্তে আস্তে, দ্রুত কেটে গেল সেটা। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ওর হাতে উঠে এল ক্যামেরা, চোখ স্থির হল মানুষটার উপরে; চোখ বন্ধ করে যে তখন আউড়ে চলেছিলেন অজানা কোনো মন্ত্র।
নতুন উপস্থাপকের একহাতে ধরা ছিল একটা খুলি আর আরেক হাতে ছিল ফিমারের মতো বড়োসড় একটা হাড়। বস্তু দুটো আসল নাকি নকল; তা বোঝার উপায় ছিল না এত দূর থেকে। তবে মশালের কাঁপা কাঁপা আলো, নিঝুম বনভূমি, উন্মুক্ত আকাশ, আর এইসব কিছুর মাঝখানে অস্থি-করোটি হাতে এক আশ্চর্য মানুষ— রোমাঞ্চ জাগানোর পক্ষে এই প্রেক্ষাপটটুকুই ছিল যথেষ্ট!
সম্ভবত রাত যথেষ্ট হয়েছিল বলেই বেশিক্ষণ চলল না গৌরচন্দ্রিকা। মানুষটা নানারকম অঙ্গভঙ্গি করতে শুরু করে দিলেন হাতের জিনিস দুটো নিয়ে। কৌশলগুলো যে এমনকিছু চমকপ্রদ ছিল, তা নয়; তবে তার মধ্যে ছিল মামুলি কিছু জাদুও; কখনও খুলিটা ভেসে উঠছিল তালুর থেকে দু-আঙুল উপরে, কখনও হাড়টা অবলম্বনহীন অবস্থায় দাঁড়িয়েছিল খুলির ঢালু অংশে, আবার কখনও দুটোই ভাসমান অবস্থায় দুলছিল শুধু আঙুলের ইশারায়…
খেলাগুলোর মধ্যে অসাধারণত্বের ছিটেফোঁটাও ছিল না! তবে পরিবেশনের গুণে হোক পরিবেশের মাহাত্ম্যে, বেশ উপভোগ করছিল মৌসুমি। তাছাড়া আগে কখনও পোড়ো বোলান দেখার সুযোগ হয়নি ওর। সুতরাং প্রথমবার যে কোনো অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হওয়ার যে অবর্ণনীয় রোমাঞ্চ; উত্তেজনা বাড়িয়ে তুলতে সেটাও অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছিল।
পোড়ো বোলানের স্থায়িত্ব হল সাকুল্যে কুড়ি-পঁচিশ মিনিট। প্রায় পুরোটাই ভিডিও করল মৌসুমি এবং এই ভেবে আনন্দিত হল যে, ডকুমেন্টারির জন্য অবশেষে খুব অভিনব একটা উপাদান ও খুঁজে পেয়েছে!
অনেকক্ষণ ধরেই দপদপ করছিল মশালগুলো। নতুন করে আর কেউ সেগুলোকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল না। খেলা শেষ হতে না-হতেই নিভে গেল দুটো মশাল, আর বাকি দুটোর জোরও যেন একেবারে কমে গেল। হঠাৎ করেই আলোর পরিমাণ অনেকটা হ্রাস পাওয়ায় জায়গাটা যেন আরও রহস্যময় হয়ে উঠল।
একবার সেই অজানা জন্তুটার কথা মনে পড়ল মৌসুমির। অন্ধকার গাছগুলোর দিকে চোখ পড়তেই একটু যেন শিরশির করে উঠল ওর বুকের ভিতরটা… কিন্তু পরক্ষণেই, এতজন মানুষের মধ্যে বসে, সম্পূর্ণ অমূলক একটা বিষয় নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার জন্য নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করল ও। এক এক করে উঠে পড়ছিল সবাই। কেউ কেউ ঘুমন্ত বাচ্চাকে কোলে নিয়েই পা বাড়াচ্ছিল বাড়ির পথে।
একজন গড়িমসি করতে করতে বলল, “ভালোই দেখলাম যা হোক। তবে পোড়ো বোলান বলো যদি তো…
বাকি কথাটা খুট করে বিধে গেল মৌসুমির মাথায়। বক্তার সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে কথা বলা সম্ভব ছিল না। তবে ওর ইচ্ছে করছিল তখনই সৌমেনকে একটু জিজ্ঞাসাবাদ করে দেখতে। কিন্তু স্থান, কাল, পাত্র ইত্যাদি বিবেচনা করে শেষমেশ নিজেকে সম্বরণ করল মৌসুমি। বরং ও ভেবে নিল, আগামীকাল সকালে বিষয়টা নিয়ে অবশ্যই খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করবে।
সৌমেন, ওর মা, বাবা আর মৌসুমিও উঠে পড়ল শেষমেশ। গল্প করতে করতে ফেরার পথ ধরল ওরা।
সবাই-ই অল্পবিস্তর কথা বলছিল নিজেদের মধ্যে। সেই সম্মিলিত ধ্বনি যেন মৌমাছির গুঞ্জনের মতো শোনাচ্ছিল নির্জন বনের মধ্যে। নর্তকদের চিহ্নমাত্র দেখা যাচ্ছিল না কোথাও। তারা যে কোন পথে এসেছিল আর কোন পথে চলে গেল; ভেবে আশ্চর্য হচ্ছিল মৌসুমি। সেইসঙ্গে চাররকম বোলানের মধ্যে তিনরকমেই সাক্ষী হতে পারার তৃপ্তি যেমন ভরিয়ে তুলছিল ওর মনটাকে, তেমনই চতুর্থ বোলানটা না দেখতে পাওয়ার খেদ চিনচিনে যন্ত্রণাও জাগিয়ে তুলছিল। কিছুটা অন্যমনস্কের মতোই গল্পে যোগদান করছিল ও।
জঙ্গল থেকে ঠিক বেরোনোর মুখে যখন পিছু ফিরল মৌসুমি, তখনও শেষ মশালদুটো জ্বলছিল ধিকধিক করে। মনে হচ্ছিল, অনেক দূরে যেন হলুদ দুটো জোনাকি সেরে নিচ্ছে রাতের অভিসার।
বোধহয় নিভে যাওয়ার সময় হয়ে এসেছিল তাদের। দপ্ করে জ্বলে উঠল শিখাগুলো। মৌসুমির মনে হল, গজুবুড়োর ঝকঝকে চোখদুটো বোধহয় ছুঁড়ে দিল অলীক ইশারা! একবার ঢোঁক গিলল ও।
*****
(৩)
পরবর্তী দিনটার বড়ো একটা অংশ মৌসুমি কাটিয়ে ফেলল টেকনিশিয়ান, এডিটর, সিনেম্যাটোগ্রাফার প্রমুখদের নিয়ে একটা অনলাইন কনফারেন্স সারতে সারতে। কোনোরকমে স্নান আর দুপুরের খাওয়াদাওয়া সেরেই ও আবার বসে পড়ল ল্যাপটপ নিয়ে। ক্যামেরার মেমরি পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল ইতিমধ্যেই। সুতরাং সমস্ত ছবি, ভিডিও ইত্যাদি ল্যাপটপে আপলোড করে নেওয়াটার আশু প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। এসব সামলে মৌসুমি যখন বাবার কাছে ফোন করতে পারল, তখন বিকেল গড়িয়ে গেছে।
ফোন ধরেই বাবা প্রথম জানতে চাইল গতদিনের অভিজ্ঞতার কথা। পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করতে না পারলেও, যতটা সম্ভব বিশদভাবে ব্যাখ্যা করল মৌসুমি। বিশেষ করে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে পোড়ো বোলান দেখতে পেয়ে যে ওর উচ্ছ্বাসের মাত্রা কতটা বৃদ্ধি পেয়েছে; সে কথা জানাতে ভুলল না ও।
কথা বলতে বলতে মৌসুমি বুঝতে পারছিল বাবার উত্তেজনাটাও। সত্যি বলতে কী, বোলানের কথাটা তো ও বাবার থেকেই প্রথম জানতে পেরেছিল। ওর বাবার ইচ্ছা ছিল প্রায় হারিয়ে যেতে বসা এই রীতিটা নিয়ে বিশদে একটা থিসিস লেখার। কিন্তু ততদিনে বাবা চাকরিতে ঢুকে পড়েছিল আর তার ট্রান্সফারও হয়ে গিয়েছিল ভিনরাজ্যে, উপরন্তু গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো চেপে বসেছিল মৌসুমির মায়ের অসুস্থতা; ফলে সেই পরিকল্পনা আর বাস্তবায়িত হতে পারেনি। অনেক পরে বাবা যখন অখণ্ড অবসর পেল, ততদিনে ঘুরে ঘুরে তথ্য সংগ্রহের মতো শক্তি আর উদ্দীপনা তার ভিতর থেকে ফুরিয়ে গেছে। আজ যেন বাবার কথার মধ্যে তারুণ্যের ছাপ খুঁজে পাচ্ছিল মৌসুমি। অনেকক্ষণ ধরেই ওরা আলোচনা করল আসন্ন ডকুমেন্টারি নিয়ে। এমনকি ভয়েস ওভার আর্টিস্ট হিসাবে কাকে প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে; সেই নিয়েও কথাবার্তা হল দু-জনের মধ্যে। তারপর ফোন রাখার আগে ওর বাবা হঠাৎ বলল, “সব না-হয় হল মাম। কিন্তু তোমার সেই স্যুভেনিরের খবর কী?”
কথাটা চট্ করে বুঝতে পারল না মৌসুমি। ও জিজ্ঞাসা করল, “কোন স্যুভেনির?”
“সেই যে; ঢাকনা দেওয়া স্পেশাল ঝুড়ি…”
“ওহো! দেখেছ তো; এসব উত্তেজনায় ওটার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম!” জিভ কাটল মৌসুমি, “ঠিক মনে করেছ। ঝুড়িটা নিতে হবে।”
“আর কবে নেবে মাম? কাল সকালেই তো তুমি ফিরে আসছ!”
“কেন বাবা? আজ রাতটা তো আছে,” বলল মৌসুমি, “আমি এক্ষুনি সৌমেনকে বলছি।”
ফোন রেখে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে এল মৌসুমি। তবে সৌমেনের দরজা পর্যন্ত পৌঁছোতে হল না ওকে; তার আগেই তার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল মৌসুমির। সে তখন বেরোচ্ছিল তৈরি হয়ে।
“সৌমেন, একটু শোনো,” ডাকল মৌসুমি।
ঘুরে দাঁড়াল সৌমেন, “হ্যাঁ দিদি, বলুন।”
“আমাকে একটা সাহায্য করতে পারবে?”
“হ্যাঁ হ্যাঁ দিদি, নিশ্চয়ই,” ঘাড় হেলাল সৌমেন, “বলুন না কী করতে হবে…’
“আমাকে একটু গজুবুড়োর বাড়ি নিয়ে যেতে পারবে?”
একটু চমকে উঠল সৌমেন। মনে হল, এতটা আশ্চর্য ও বহুদিন পরে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর, বিস্ময়ের প্রাথনিক ধাক্কাটা একটু সামলে নিয়ে ও বলল, “গজুবুড়োর বাড়ি যাবেন? হঠাৎ? কিছু হয়েছে দিদি?”
সৌমেনের মুখে একটা আশঙ্কার ছায়া স্পষ্ট হয়ে উঠছিল। যদিও সেটার কারণ অস্পষ্ট ছিল মৌসুমির কাছে, তবু তাকে আশ্বস্ত করার জন্য ঝুড়ি-বৃত্তান্ত খুলে বলতেই হল ওকে।
“ওহ, এই ব্যাপার!” সবটা শোনার পর হাঁপ ছাড়ল সৌমেন। তারপর একগাল হেসে ও বলল, “ঝুড়ি নেবেন তো দিদি? চলুন না, আমি ভালো ঝুড়িওয়ালার কাছে নিয়ে যাচ্ছি। যতরকম ঝুড়ি চান, সব পাবেন।”
“না সৌমেন,” দু-পাশে মাথা নাড়ল মৌসুমি। “আমি তোমাদের গজুবুড়োকে কথা দিয়েছি যে, আমি তাঁর থেকেই ঝুড়ি কিনব। সুতরাং আমি তাঁর কাছেই আগে যাব। যদি সেখানে না পাই; তখন তুমি যাঁর কাছে নিয়ে যাবে, তাঁর কাছেই যাব।”
মুখ দেখে মনে হল, সৌমেন একটু বিরক্ত হয়েছে। কিছুটা অসন্তুষ্ট গলায় ও বলল, “আসলে আমি তো এখন একটু স্টেশনের দিকে যাচ্ছিলাম দিদি। কিছু বাজার করার আছে, বাবার প্রেশারের ওষুধটাও ফুরিয়ে গেছে, কলের মিস্ত্রির সঙ্গেও একটু কথা বলার আছে…”
“ঠিক আছে। উনি কোথায় থাকেন, তুমি না হয় সেটুকু আমাকে বলে যাও। আমি জিজ্ঞাসা করে করে ঠিক পৌঁছে যাব।”
মৌসুমির মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল সৌমেন হয়তো সামান্য একটা ঝুড়ির জন্য মৌসুমির এমন নাছোড়বান্দাভাব অবাক করছিল ওকে। একটু চিন্তা করে নিয়ে ও বলল, “গজুবুড়োর বাড়িটা স্টেশনের পথেই পড়বে। আপনি না হয় আমার সঙ্গেই চলুন দিদি। যাওয়ার সময় আমি আপনাকে দেখিয়ে দেব’খন। তারপর ঝুড়ি কিনে আপনি আপনার মতো ফিরে আসবেন। আপনি রেডি হয়ে আসুন; আমি ততক্ষণ দাঁড়িয়ে যাচ্ছি।”
সাজগোজ ব্যাপারটায় মৌসুমির চিরকালই অনীহা। আর, যেহেতু বহু গ্রামীণ পরিবারেই এখনও নানারকম সংস্কার আছে; বিশেষত মেয়েদের চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছদ ইত্যাদি সম্বন্ধীয় বিধিনিষেধ আজকের যুগেও মেনে চলা হয়, তাই এখানে এসে থেকে বাড়িতে থাকাকালীনও চুড়িদার কুর্তা ইত্যাদিই পরছে ও। সুতরাং, নতুন করে তৈরি হওয়ার তেমন কিছু ছিল না। নিয়মমাফিক মাথায় একবার চিরুনি বুলিয়ে নিল ও। তারপর সাইডব্যাগ, মোবাইল আর ক্যামেরাটা নিয়ে, সৌমেনের সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল মৌসুমি।
সূর্য ডুবে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাস্তায় লোকজনের চলাচল কমে এসেছিল। পাখিরা ফিরে যাচ্ছিল বাসায়, যেখানে হয়তো তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল বাচ্চারা। শিরিষ গাছের পাতাগুলো বুজে আসছিল ঘুমন্ত চোখের মতো।
“আচ্ছা সৌমেন, তোমাকে যদি একটা কথা জিজ্ঞাসা কবি: ঠিক ঠিক উত্তর দেবে?” হাঁটতে হাঁটতেই জিজ্ঞাসা করল মৌসুমি।
“হ্যাঁ দিদি,” একটু সন্দিগ্ধভাবে ঘাড় নাড়ল সৌমেন, “বলুন না।”
“গতকাল যখন পোড়ো বোলান শেষ হল, তোমাদের গ্রামের একজনকে একটা কথা বলতে শুনলাম।”
“কী বলুন তো দিদি?” মৌসুমির মুখের দিকে একঝলক তাকিয়ে বলল সৌমেন। ওর চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল কৌতূহল।
“সে বলছিল, একসময় গজুবুড়ো নাকি পোড়ো বোলানে যে খেলা দেখাত, কালকের খেলাটা তার কাছে কিছুই নয়! এই ব্যাপারটা কী?”
দাঁড়িয়ে পড়ল সৌমেন। জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল ও ঢোঁক গিলল বার কয়েক। অল্প আলোতেও মৌসুমি স্পষ্ট বুঝতে পারল; সৌমেনের চোখে-মুখে এক অদ্ভূত অস্বস্তি ফুটে উঠছে, যা ওর স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। সৌমেনের অস্বাচ্ছন্দ্য আরও বাড়িয়ে দিল মৌসুমির কৌতূহল। ও বলল, “কী হল সৌমেন? তুমি এত হেজিটেট করছ কেন? ইজ দেয়ার সামথিং আনইউজুয়াল?”
“আসলে দিদি, ব্যাপারটা ঠিক….” একটু মাথা চুলকাল সৌমেন। তারপর নীচু গলায় বলল, “ঘটনাটা হয়তো আপনাকে আরও আগে জানিয়ে দিলেই ভালো হত। যা-ই হোক… হ্যাঁ, পোড়ো বোলানের কথাটা আপনি ঠিকই শুনেছেন। গজুবুড়ো সত্যিই একসময় দারুণ জাদুর খেলা দেখাত। সে খেলা এমন ছিল যে, সবাই এও বলাবলি করত- বুড়ো যে খুলিটা নিয়ে খেলা দেখায়, সেটা স্বাভাবিক নয়! আমি অবশ্য সে জিনিস দেখিনি, বা দেখে থাকলেও, মনে নেই। তবে বাবা-মায়ের মুখে অনেক শুনেছি।”
“ একমিনিট,” সৌমেনকে মাঝপথেই থামিয়ে দিল মৌসুমি, “তোমরা সবাই বারবার পাস্ট টেন্সে কথা বলত কেন? উনি কী এখন আর একেবারেই পোড়ো বোলান দেখান না?”
দুপাশে মাথা নাড়ল সৌমেন, “না দিদি।”
“কেন? দেখে তো সুস্থ-সবলই মনে হয়!”
“বলছি সে কথা…”
“বলো বলো। আমি আর বাধা দেব না।”
হাঁটতে হাঁটতে আবার বলতে আরম্ভ করল সৌমেন, “কেউ বলত, খুলিটা কোনো পিশাচসিদ্ধ সাধকের, মরার আগে সে গজুবুড়োকে ওটা নিয়ে খেলা দেখানোর অনুমতি দিয়ে গিয়েছিল। আবার কেউ বলত, বুলিটা গড়বুড়োর দাদুর, পুড়ে ছাই হওয়ার আগেই, তার চিতা থেকে গজুবুড়ো ওটাকে টেনে বের করে নিয়েছিল। কেউ কেউ আবার এমনও বলত যে; খুলিটা নাকি স্বপ্নে পাওয়া, কোনো এক অতৃপ্ত আত্মা মুক্তি পাওয়ার আগে ওটা গজুবুড়োকে দিয়ে গিয়েছিল। তবে খুলিটা যারই হোক আর গজুবুড়ো ওটাকে যেভাবেই পাক, পোড়ো বোলান দেখানোয় ওর ধারেকাছে তখনও কেউ ছিল না, আর আজও কেউ নেই। এরপরই ঘটেছিল এক ঘটনা!”
মৌসুমি এক আশ্চর্য রোমাঞ্চের ঢেউ টের পাচ্ছিল নিজের ভিতর। কোনোরকমে জিজ্ঞাসা করল ও, “কী ঘটনা?”
“এই গ্রামে তখন একটা দল ছিল, যারা শ্মশান বোলান দেখাত। গজুবুড়ো সাধারণত তাদের সঙ্গে সঙ্গেই ঘুরত। অনেক কথাও রটেছিল ওদের নিয়ে। যেমন, ওরা সব প্রেতসিদ্ধ, ওরা একসঙ্গে মিলে অলৌকিক ক্রিয়াকলাপ করে, ওরা তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারে যারা এই পৃথিবীর বাসিন্দাই নয়… গ্রামের ব্যাপার সব; বুঝতেই তো পারছেন! তবু বোলান দেখানোর সুনাম ওদের এমন ছিল যে, বায়নার অভাব হত না। তো এরকমই একদিন দূর গ্রাম থেকে ওরা বোলান গেয়ে ফিরছিল। তখন অনেক রাত। বনের পথ ধরে আসছিল ওরা। সেইসময় যে ঠিক কী হয়েছিল, কেউ জানে না। তবে শ্মশান বোলানের সেই দলটাকে তার কেউ কোনোদিন দেখতে পায়নি। আর পরদিন সকালে গজুবুড়োকে বনের মধ্যে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। এমনিতে তার কোনো ক্ষয় ক্ষতি হয়নি; তবে এরপর থেকে মাথাটা একেবারেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। আগের দিন রাতে যে ঠিক কী হয়েছিল, সেই কথাটা পর্যন্ত পরিষ্কারভাবে বলতে পারেনি সে। আর তার খুলিটাকেও কিন্তু আর কখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি।”
“মাথা খারাপ বলতে কীরকম বোঝাচ্ছ সৌমেন?”
“ওই রাতের কথাগুলো বেমালুম ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা বাদ দিলে, এমনিতে ঠিকঠাক। কিন্তু গজুবুড়ো তারপর থেকে আর সেভাবে বাড়িতে থাকে না। সারাদিন গাছতলায় বসে বসে ঝুড়ি বোনে; তারপর বেলার দিকে বাড়ি ফিরে একটু সেদ্ধ-ভাত রান্না করে, খেয়েদেয়ে দাওয়ায় শুয়েই ঘুমায়, তারপর সন্ধ্যা নামলেই আবার বেরিয়ে পড়ে… এমনকি সারারাত ও জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ায়। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে বলে, ও নাকি ঠিকঠাক একটা খুলি খুঁজে বেড়াচ্ছে। খুলিটা পেলেই নাকি ও আবার পোড়ো বোলান দেখাতে পারবে।”
“ইন্টারেস্টিং,” নিজের মনেই বলল মৌসুমি, “কেউ কখনও ভদ্রলোকের চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি?”
“ওঁর তো কেউ-ই নেই দিদি! কে আর কতটুকু করবে?” সখেদে জানাল সৌমেন, “ওই গ্রামে যা হয়, সবাই উদ্যোগ করে এক দু-বার ওঝা ডেকে ঝাড়ফুঁক করানো হয়েছিল— ব্যস! ওতে কী আর কিছু হয়?”
“আর যারা হারিয়ে গিয়েছিল, তাদের নামে মিসিং ডায়েরি করা হয়নি?”
“হ্যাঁ দিদি, তা হয়েছিল” মাথা নাড়ল সৌমেন, “তবে ওই কেসের কিনারা হয়নি। তবে অনেকে বলে…” থেমে গেল সৌমেন। মনে হল, বাকি কথাটুকু হয়তো বলাটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে ওর জন্য।
“অনেকে কী বলে সৌমেন?”
“অনেকে বলে, খুলিটা গজুবুড়োকে যে দিয়েছিল, সে-ই ওটা ফেরত নিয়ে গিয়েছিল। হয়তো শ্মশান বোলানের দলটা তাকে বাধা দিতে গিয়েছিল বা তার পথে কোনো বাধা তৈরি করেছিল, তাই যাওয়ার আগে সে তাদের নিশ্চিহ্ন করে দিয়ে গিয়েছিল!”
“তুমিও কী এটাই বিশ্বাস করো সৌমেন?”
“না দিদি,” মাথা নাড়ল সৌমেন, “আমার ধারণা, ওই শ্মশান বোলানের দলটা গজুবুড়োর খুলিটা নিয়ে দুরে কোথাও পালিয়ে গিয়েছিল। আর যাওয়ার আগে হয়তো বুড়োকে এমন কোনো ড্রাগ বা ওইধরনেরই কিছু দিয়ে গিয়েছিল, যার প্রভাবে ওর এই অবস্থা হয়েছে।”
কথায় কথায় একটা আমবাগানের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল ওরা। ধূসর অন্ধকার মাকড়সার জালের মতো জমাট হয়ে ছিল পাতার ফাঁকে ফাঁকে। গাছগাছালির আড়ালে দেখা যাচ্ছিল টিনের ছাউনি দেওয়া বাড়ির আভাস।
আঙুল তুলে দেখিয়ে দিল সৌমেন, “ওই যে __ গজুবুড়োর বাড়ি।”
“থ্যাঙ্কিউ সৌমেন। তুমি এবার তোমার কাজে যেতে পারো। আমি ঝুড়ি কিনে, নিজেই ফিরে যেতে পারব।”
“তাড়াতাড়ি ফিরবেন দিদি,” পা চালাতে চালাতে সাবধান করে দিল মৌসুমি-কে, “নয়তো অন্ধকার নাম অসুবিধায় পড়ে যাবেন।”
“তুমি কোনো চিন্তা কোরো না। আমি ঠিক কি কথা বলতে বলতেই রাস্তা ছেড়ে বাগানে নেমে প মৌসুমি।
*****
(৪)
আমগাছের ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়তেই একঝাঁক স্মৃতি ঘিরে ধরল মৌসুমিকে। মামারবাড়ির কথা মনে পড়ছিল ওর। সেখানেও এমন আমবাগান ছিল। ছেলেবেলার সেই বাগানে মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে কম দৌরাত্ম্য-ও করেনি… তাছাড়া শীতের দুপুরে গাছের ছায়ায় পিকনিক করা বা গ্রীষ্মের বিকেলে আম জারিয়ে খাওয়া তো ছিলই।
এই গাছগুলোও ভরে ছিল ছোটো ছোটো গুটিতে। যদিও আমগুলো যে ঠিক কোন প্রজাতির, বুঝতে পারছিল না মৌসুমি। তবে ওর খুব ইচ্ছা করছিল ফলগুলো একটু ছুঁড়ে ছুঁয়ে দেখতে। যদিও সেগুলো বেশ উঁচু ডালে থাকায়, ওর পক্ষে নাগাল পাওয়া সহজ হচ্ছিল না। তাছাড়া আমগাছে যে প্রায়শই মৌচাকে মৌমাছি ঘাপটি মেরে থাকে এবং কোনোভাবে আঘাত লাগলে যে সেখান থেকে ঠিক কী ধরনের প্রত্যুত্তর আসতে পারে— সেসব সম্পর্কিত পূর্ব অভিজ্ঞতাও নিরস্ত করছিল মৌসুমিকে।
রাস্তা থেকে গজুবুড়োর বাড়ি পৌঁছোনোর পথটুকু বেশি নয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই মৌসুমি হাজির হল উঠোনে, আর সঙ্গে সঙ্গে আরেকটা চিন্তা মাথা উঁচু করে দাঁড়াল এর মনের মধ্যে। যেহেতু বাড়ির কোনো দরজা-জানালাতেই আলোর ছিটেফোঁটা নিশানাটুকুও দেখা যাচ্ছিল না, তাই গজুবুড়োর উপস্থিতি নিয়ে একটু সন্দিহান হয়ে পড়ল মৌসুমি। বারবার ওর মনে পড়তে লাগল সৌমেনের কথাটা, ‘গজুবুড়ো আর সেভাবে বাড়িতে থাকে না।”
যত যা-ই হোক, জায়গাটা অচেনা এবং মৌসুমি এখানে বহিরাগতর থেকে বেশি কিছু নয়। সুতরাং গলা উঁচু করে ডাকাডাকি করতে একটু দ্বিধাই হচ্ছিল ওর। আশেপাশে কাউকে দেখাও যাচ্ছিল না, যার কাছে মানুষটার ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে। অবশ্য সেই সম্ভাবনাও যে ছিল না; সে কথাও সৌমেন আগেই জানিয়ে দিয়েছিল। বারকয়েক জোরে জোরে গলাখাঁকারি দিল মৌসুমি। আর তারপরই, যখন একটু সংশয় নিয়ে ভাবছে মৌসুমি দরজায় নক করার কথা, তখনই ভেসে এল গজুবুড়োর গলা, “এসেছেন?”
ক্রমশ গাঢ় হতে থাকা অন্ধকারের সঙ্গে প্রায় মিশে গিয়েছিলেন গজুবুড়ো। মানুষ নয়, যেন বাতাসের সঙ্গে শরীর মিশিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল কোনো প্রেত! তবে তাঁর জ্বলজ্বলে চোখদুটো আজও মনে করিয়ে দিচ্ছিল নিভন্ত মশালের কথা।
ঘটনার আকস্মিকতায় প্রথমে একটু চমকে উঠেছিল মৌসুমি। তবে ওর স্নায়ু যথেষ্ট শক্ত। সুতরাং, ঝটপট নিজেকে সামলে নিয়ে, একটু হেসে ও বলল, “হ্যাঁ, এসেই পড়লাম। সেই যে, সেদিন মহুয়াতলায় আপনি বসেছিলেন আর আমি ঢাকনাওয়ালা ঝুড়ি নেব বলেছিলাম, মনে আছে আপনার?”
“হ্যাঁ,” ঘাড় নাড়লেন গজুবুড়ো।
“কোথায় আপনার ঝুড়ি? দেখি….”
“একটু দাঁড়ান।”
বাড়ির পিছন দিকে চলে গেলেন গজুবুড়ো।
মৌসুমি ভেবেছিল, হয়তো মিনিট দশেক একা একা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে ওকে। তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন যে, শেষমেশ আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না ওকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই গজুবুড়ো ফিরে এলেন নানারকমের একবোঝা ঝুড়ি নিয়ে। আবছা অবয়ব দেখে আন্দাজ করা যাচ্ছিল, সব ঝুড়িগুলোর সঙ্গেই ছিল ঢাকনা, তবে কোনো ঝুড়ি ছিল ছোটো, কোনোটা বড়ো, কোনো ঝুড়ি ছিল চৌকো তো কোনোটা গোল…
“নিন, এগুলোর থেকে আপনার পছন্দমতো একটা বেছে নিন।”
এরইমধ্যে আলো একেবারেই মুছে গিয়েছিল— দূর থেকে ভেসে আসছিল শঙ্খধ্বনি। বাছাবাছি তো দূর অস্ত, একহাত দূরের জিনিস পর্যন্ত দেখা সম্ভব হচ্ছিল না ঠিকঠাকভাবে। তবু মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে একটা ঝুড়ি পছন্দ করল মৌসুমি। এসব জিনিস কিনতে ও অভ্যস্ত নয়। তবু উলটে পালটে, যথাসম্ভব সচেতনভাবে পরীক্ষা করে দেখে নিল জিনিসটায় কোনো ত্রুটি আছে কিনা!
পাছে ভাঙানির সমস্যায় পড়তে হয়; সেই আন্দাজ করে খুচরো টাকাটা সঙ্গেই এনেছিল মৌসুমি। তবে দাম মেটানোর সময় এটা দেখে ও অবাক হল যে, গজুবুড়ো টাকাটা গুনে পর্যন্ত নিলেন না। একেবারে হেলাফেলা করে নোটগুলো গুঁজে রাখলেন তিনি কোমরের কশিতে।
“টাকাটা গুনে নিলেন না?” জিজ্ঞাসা করেই ফেলল মৌসুমি।
“এখন সময় নেই। এখন এক জায়গায় যেতে হবে, অন্যমনস্কভাবে বললেন গজুবুড়ো। “পরে ফিরে এসে গুনব।”
“ওহো! কোথাও বেরোচ্ছিলেন?” একটু দুঃখপ্রকাশ করল মৌসুমি, “স্যরি, আমি বোধহয় দেরি করিয়ে দিলাম….”
মৌসুমির চোখে চোখ রাখলেন গজুবুড়ো, “আজ বেরোবো না, তাই কী হয়? আজ তো বোলান আছে।”
“সেকি!” আশ্চর্য হল মৌসুমি, “বোলান তো গতকালই হয়ে গেল। আজ আবার….”
মৌসুমির কথা শেষ হওয়ার আগেই, খুব ঠান্ডা গলায় বলে উঠলেন গজুবুড়ো, “আজ শ্মশান বোলান।”
অবশিষ্ট ঝুড়িগুলো নিয়ে আবার বাড়ির পেছনদিকে চলে গেলেন গজুবুড়ো। কিন্তু মৌসুমি দাঁড়িয়ে থাকল বজ্রাহতের মতো। যদিও সৌমেন ওকে গজুবাবুর মানসিক ভারসাম্যহীনতার কথা বলেছিল এবং ভদ্রলোককে দেখলে সেটা কিছুটা আন্দাজও করা যায়; তবু তাঁর কথাগুলো মৌসুমি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারছিল না। বিশেষত ‘শ্মশান বোলান’ শব্দটা যেন হিংস্র পাখির মতো ঠুকরে চলেছিল ওকে!
শ্মশান বোলান… শ্মশান বোলান… শ্মশান বোলান…
চাররকম বোলানের মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয়, সবচেয়ে ভয়ংকর এবং সবচেয়ে দুর্লভ রীতি! আজ পর্যন্ত মৌসুমি এমন কারওর খোঁজ পায়নি; যে ওকে শ্মশান বোলানের আদিম রূপটা দেখাতে পারার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বরং, কেউ বলেছে, “বহুদিন হল, আমাদের অঞ্চলে ও জিনিস পুরোপুরি উঠেই গেছে।” আবার কেউ বলেছে, “আপনি যে জিনিস খুঁজছেন, ও আর আজকাল দেখাবে কে? এই বীভৎস রীতিনীতি দেখানো কবেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।” অথচ মৌসুমি জানে যে, কোনোভাবে ও যদি শ্মশান বোলানের প্রামাণ্য নদি নিজের তথ্যচিত্রের অন্তর্ভুক্ত করতে পারে; তবে সেটার মান এবং গ্রহণযোগ্যতা, দুটোই একধাপে অনেকটা বেড়ে যাবে। এমনকি আন্তর্জাতিক খ্যাতি জুটে যাওয়াটাও আশ্চর্যের নয়।
সেই শ্মশান বোলান দেখানো হবে এখানে? মৌসুমির নাগালের মধ্যে?
একটা দ্বিধায় ভুগছিল মৌসুমি। একবার ওর মনে হচ্ছিল, এই সুযোগ কোনোমতেই হাতছাড়া করা উচিত হবে না। আবার আরেকবার মনে হচ্ছিল, গজুবুড়োর কথায় ভরসা করা আর অন্ধকার তির ছুঁড়ে লক্ষ্যভেদ করা একই ব্যাপার। সুতরাং, ঝুড়ি নিয়ে গুটিগুটি পায়ে ফিরে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। এরইমধ্যে আবার সৌমেনকে ফোন করে নেওয়ার কথাও ভাবছিল মৌসুমি। দোলাচলের বহুমুখী আক্রমণে যখন জেরবার হয়ে যাচ্ছে মৌসুমি, তখন গজুবুড়োর গলা শোনা গেল আবার, “আপনি এখনও দাঁড়িয়ে আছেন? অন্ধকার হয়ে এল তো!”
অন্ধকারের মধ্যে, কারণহীনভাবে, একহাতে জ্বলন্ত ফ্ল্যাশলাইট আর অন্য হাতে ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটা খুব একটা উপযুক্ত কথা নয়। ফলে একটু অপ্রস্তুত হল মৌসুমি। একটু আমতা আমতা করে ও বলল, “হ্যাঁ! আসলে ওই… মানে বোলান…”
এই প্রথম গজুবুড়োকে হাসতে দেখল মৌসুমি, আর দেখল তাঁর গলায় ঝোলানো ঢোলের মতো বাদ্যযন্ত্রটাকেও। নতুন এই সংযোজন এক অদ্ভুত আদিমতা যোগ করেছিল তাঁর উপস্থিতিতে।
“বুঝেছি” মাথা নেড়ে বললেন গজুবুড়ো। তারপর সামান্য কৌতুকের সুরে একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন, “শ্মশান বোলান দেখতে ইচ্ছে করছে— তাই তো?”
একেবারেই অস্বীকার করার চেষ্টা করল না মৌসুমি। মাথা নেড়ে ও জানাল, “হ্যাঁ। ঠিকই বুঝেছেন। আসলে অনেক নাম শুনেছি ওটার। কিন্তু বহু খোঁজ করেও, যা চেয়েছি, তা দেখার সুযোগ কোথাও পাইনি।”
“পাবেন কীভাবে? ও জিনিস কী আর সবাই দেখাতে পারে!”
“সেটাই!”
“দেখবেন নাকি আজ?” ফ্যাসফ্যাসে পুত্র করলেন।
ধুকপুক করে উঠল মৌসুমির বুকটা। __ কাঁপছিল ওর, কপালে ফুটে উঠছিল ঘামের ফোঁটা __ তৎক্ষনাৎ উৎসাহের গোড়ায় লাগাম পরিয়ে ফেলল। একবার ঢোঁক গিলে নিয়ে বলল, “সত্যি সত্যি কথা __ সেই শ্মশান বোলান হয়? তবে যে শুনেছিলাম, সেসব নাকি অনেক আগেই নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।”
“দিনের পৃথিবী আর রাতের পৃথিবীর ফারাক অনেক। দিনেরবেলা যা অবাস্তব, রাতে তাই-ই যা বাস্তব, দিনে তাই-ই কল্পনা।”
“আচ্ছা,” প্রায় দমবন্ধ করে জিজ্ঞাসা করল “আপনি যেখানে যাচ্ছেন, সেখানে গৃধিনীবিশাল হয়?”
“গৃধিনীবিশাল ছাড়া কী শ্মশান বোলান হয়? আমি যেখানে যাচ্ছি, সেখানে আসল গৃধিনীবিশাল হয়, ঠিক যেমনটা হওয়া উচিত। বাকিরা সহ্য করতে পারলেই হল।”
অজানিত রোমাঞ্চে শিরশির করে উঠল শরীরটা। ওর মনে হল; সামনে দাঁড়ানো আর মানুষটা একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন ওর দিকে। আর দ্বিরুক্তি করল না মৌসুমি। জোর গলায় বলল ও আমিও আপনার সঙ্গে যাব।”
“আসুন তবে।”
মূল রাস্তার বদলে আমবাগানের পিছনদিকের পথ ওরা। যেতে যেতে আরেকবার মৌসুমির মনে হ সৌমেনকে ফোন করার কথা। কিন্তু গজুবুড়ো ন অতিথি জোটানোটাকে কেমন চোখে দেখবেন, তাই নিয়ে একটু সংশয় ছিল ওর মধ্যে। অতএব, ফোন করে পরিকল্পনা মুলতুবিই থাকল আপাতত। বরং মৌসুমি ভেবে রাখল যে, অকুস্থলে পৌঁছেই চুপিসাড়ে সৌমেনকে একটা মেসেজ পাঠিয়ে রাখবে ও।
কিছুটা যেতে না-যেতেই ফুরিয়ে গেল আমবাগান। স একটা আলপথ পেরিয়ে, ওরা হাঁটতে লাগল একটা বিরাট মাঠের মধ্যে দিয়ে। অনেকদূরে দেখা যাচ্ছিল গাছগাছালির আবছা আভাস। কাছেপিঠেই কোথাও একঘেয়ে সূরে ডাকছিল ঝিঝিপোকারা। হঠাৎ আলো দেখে, সন্ত্রস্ত হয়ে পালিয়ে যাচ্ছিল ইঁদুর আর ছুঁচোর দল। দু-জনের কেউ-ই কোনো কথা বলছিল না। মনে হচ্ছিল, ওরা যেন গোপন অভিসারে বেরিয়েছে।
গজুবুড়ো অন্ধকারের মধ্যেও এত দ্রুত হাঁটছিলেন যে আলোর সাহায্য নিয়েও তাঁর সঙ্গে ঠিকঠাক তাল মেলাতে পারছিল না মৌসুমি। বোঝাই যাচ্ছিল, রাতের অন্ধকারেও এই পথে আসা-যাওয়া করার অভ্যাস তাঁর যথেষ্টই আছে।
অস্বস্তির ভাবটা কাটানোর জন্য মৌসুমিই প্রথম কথা বলল, “আজও কী তারাই বোলান দেখাবে, যারা গতকাল দেখিয়েছিল?”
“ওরা! ওরা কীভাবে দেখাবে?” একটু তাচ্ছিল্যের সুরে উত্তর দিলেন গজুবুড়ো, “কোমর বেঁকিয়ে নাচ করা ছাড়া আর কিছু জানে নাকি ওরা?”
“তবে কী আজ কোনো নতুন দল আসবে?”
“নতুন ছেলেরা এসব কী করে পারবে?” সামান্য উম্মা ফুটে উঠল গজুবুড়োর স্বরে, “যারা এতকাল শ্মশান বোলান দেখিয়ে এসেছে, আজও তারাই দেখাবে!”
“আমরা কী নদীতীরের শ্মশানে যাচ্ছি?”
“না। শ্মশানে গিয়ে কী হবে? যেখানে শ্মশান বোলান হবে, সেটাই শ্মশান হয়ে যাবে।” আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন গজুবুড়ো।
“তবে কী আমরা গাজনতলায় যাচ্ছি?”
“উহুঁ। গাজনতলায় যাব কেন? যেখানে বোলান গাজন হবে, সেটাই তো গাজনতলা হয়ে যাবে।” দৃঢ় প্রত্যয় ধ্বনিত হল গজুবুড়োর বাচনভঙ্গিতে।
“তবে কোথায় যাচ্ছি আমরা?”
হাঁটার গতি আরও একটু বাড়াতে বাড়াতে গজুবুড়ো বললেন, “মহুয়াতলায়।”
*****
(৫)
রাতের অন্ধকারে সব জায়গাই একইরকম মনে হয়। বিশেষত, সে যদি হয় অচেনা জায়গা— তবে তো কথাই নেই! সুতরাং এই জায়গাটাও সেদিনের সেই মহুয়াতলা নাকি অন্য কোথাও, বুঝতে পারল না মৌসুমি।
“আলোটা নিভিয়ে দিন।” বললেন গজুবুড়ো।
“কিন্তু এখানে তো বড্ড অন্ধকার” একটু অস্বস্তি বোধ করতে করতে বলল মৌসুমি, “তাছাড়া সাপ-টাপ কিছু আছে কী না…
“এখানে কিছু আসবে না। আর অন্ধকার বেশিক্ষণ থাকবেও না। আমি এখনই আলোর বন্দোবস্ত করছি।”
এমনিতে মৌসুমি যথেষ্ট সাহসী; একা একা ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ঘোরাফেরা করার সুবাদে এবং বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার দরুণ, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাও আছে যথেষ্ট। তবু, আলো নেভাতেই আজ যেন গা ছমছম করে উঠল ওর। তবে সেটার জন্য যে কী দায়ী, অজানিতের ভর নাকি ব্যাখ্যাতীত অস্বস্তি— সেটা পরিষ্কার বুঝতে পারল না ও।
তবে সৌমেনকে মেসেজ করতে না পেরে একটু অস্বস্তিতে ভুগছিল মৌসুমি। কাজটা অবশ্য এমন কিছু কঠিন ছিল না, সময়সাপেক্ষ তো নয়ই। কিন্তু মেসেজটা পাঠানোর জন্য মোবাইলে আলো জ্বলে ওঠা আবশ্যিক ছিল; আর সেই আলো দেখে যে গজুবুড়োর প্রতিক্রিয়া কী হবে— সেটা আন্দাজ করতে না পারার দরুণ, কাজটা করে উঠতে পারছিল না ও।
অন্ধকারটা চোখে একটু সয়ে আসার পর মৌসুমি বুঝল, গজুবুড়ো এদিক-ওদিক যাতায়াত করছেন। সম্ভবত কিছু জড়ো করছিলেন তিনি।
অনেকক্ষণ ধরেই একটা প্রশ্ন করার ইচ্ছা খচখচ করছিল মৌসুমির মনে। একটু ইতস্তত করে, এবার ও জিজ্ঞাসা করেই ফেলল কথাটা, “আচ্ছা, শুনেছি একবার নাকি একটা বোলানের দল এই বনের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। তাদের সঙ্গে নাকি আপনিও ছিলেন। এ কথা কী সত্যি?”
“হ্যাঁ।” অন্ধকারের মধ্যে থেকেই ভেসে এল গজুবুড়োর স্বর।
“মনে আছে আপনার সেসব কথা?”
“কেন থাকবে না?”
“তবে যে গ্রামের সবাই বলে, আপনি নাকি কিছুই মনে করতে পারেন না!” একটু বিস্মিত হয়ে বলল মৌসুমি। “সবার সবকিছু জেনে কী হবে? তাই কারওর কারওর কাছে না জানার ভান করে থাকতে হয়।”
পরের প্রশ্নটা আপনা-আপনিই বেরিয়ে এল মৌসুমির মুখ থেকে, “কী হয়েছিল তাদের?”
কয়েক মুহূর্ত কাটল নীরবতায়। মৌসুমির মনে হল, গজুবুড়ো হয়তো স্মৃতি হাতড়ে দৃশ্যগুলো তুলে আনতে চাইছেন…. হয়তো এখনই তিনি বলবেন, সেই রাতে তিনি আদৌ ওখানে ছিলেনই না বা তাঁর কিছু মনেই নেই….
কিন্তু মৌসুমির ধারণা যে ভুল, তা প্রমাণ হয়ে গেল একটু পরেই, যখন দৃঢ় গলায় গজুবুড়ো বললেন, “শুনবেন আপনি? বিশ্বাস হবে?”
“হবে। আপনি বলুন।”
ভারী গলায় বলতে শুরু করলেন গজুবুড়ো, “সেদিন আকাশে মেঘ ছিল না। আবহাওয়া ছিল আজকের মতোই পরিষ্কার। অল্প অল্প হাওয়াও বইছিল। অনেক দূর থেকে ফিরছিলাম আমরা। সঙ্গে কিছু পয়সাকড়ি ছিল বলে খুব সতর্ক হয়ে পথ চলছিলাম। ঠিক এই মহুয়াতলায় যখন আমরা পৌঁছিয়েছিলাম, তখন খুব জোর একটা বাজ পড়েছিল। সে কী শব্দ আর আলো। চারদিকে যেন চিতা জ্বলে উঠেছিল! আমার সঙ্গে যারা ছিল, তারা ওই বাজের মধ্যে বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। হয়তো আমার পরিণতিও ওদের মতই হত…”
“তাহলে আপনি বেঁচে গিয়েছিলেন কীভাবে?”
“যে খুলিটা দিয়ে আমি পোড়ো বোলান দেখাতাম, ও-ই আমাকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল। বাজটার অনেকগুলো ঝলক ছিল; ঠিক জিভের মতো দেখতে ছিল তাদের। একেকটা জিভ একেকজনকে টেনে নিচ্ছিল… তাদেরই একটা যখন আমাকে নিতে এসেছিল; তখন আমার বদলে খুলিটা তার সঙ্গে চলে গিয়েছিল। সেই থেকেই তো আমি আর খেলা দেখাতে পারি না!”
শহুরে যুক্তির বিচারে গল্পটার বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল খুব কম। তা সত্ত্বেও মৌসুমি যেন পুরোপুরি অবিশ্বাসও করে উঠতে পারছিল না। ও জিজ্ঞাসা করল, “আপনি আরেকটা খুলি জোগাড় করে নিতে পারলেন না?”
“যে কোনো খুলি দিয়ে থোড়াই খেলা দেখানো যায়! ওই খুলিটা ছিল এমন একজন মানুষের, যাকে শকুনে ঠুকরে খেয়েছিল। তারপর তার শরীরে উপর বাজ পড়েছিল; যার ঘায়ে চিরে গিয়েছিল খুলিটার কপাল। ওরকম একটা খুলি যেদিন পাব, সেদিন আমি আবার খেলা দেখাতে পারব।”
“আপনি কী জঙ্গলে ওরকম খুলি খুঁজে বেড়ান?”
“হুঁ” বললেন গজুবুড়ো “কখনও কখনও পেয়েও যাই। কিন্তু রাখতে পারি না…” ইঙ্গিতপূর্ণভাবে থেমে গেলেন গজুবুড়ো। মৌসুমিও আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না। যা শুনেছিল, ওর কাছে সেটুকুই ছিল অস্বস্তি জাগানোর পক্ষে যথেষ্ট! তবে ও সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল যে, তথ্যচিত্রে এই গল্পটা ও অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত করবে।
গজুবুড়ো কোত্থেকে কাঠকুটো টেনে টেনে আনতে লাগলেন। তারপর পিরামিডের আকারে সাজালেন সেগুলো। এরকম মোট দুটো স্তুপ তৈরি হল। সম্ভবত আগুন জ্বালানোর সমস্ত উপকরণ সঙ্গেই এনেছিলেন তিনি সেগুলোর সাহায্যে কাঠের স্তূপে অগ্নিসংযোগ করলেন গজুবুড়ো।
প্রথমে অন্ধকারের বুকে একটা-দুটো ফুলকি দেখা গেল। তারপর দেখতে না-দেখতে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল শুকনো কাঠ। নিমেষে পাণ্ডুর আলোয় ঝলসে উঠল চারদিক; আর ক্ষণিকের জন্য ধাঁধিয়ে গেল অন্ধকারে অভ্যস্ত হয়ে ওঠা মৌসুমির চোখদুটোও!
আলোটা সয়ে যেতে মৌসুমি দেখতে পেল, ঢোলের মতো জিনিসটাকে গজুবুড়ো কোন ফাঁকে মাটিতে নামিয়ে রেখেছিলেন। এবার সেটা গলায় ঝুলিয়ে নিলেন তিনি। চকচকে চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন আগুনের দিকে। তারপর অভ্যস্ত হাতে বোল তুললেন:
গুড় গুড় গুড়
গুড় গুড় গুড়..
মৌসুমির মনে হল, বাতাসের মিহি শরীরে যেন কাঁপন ধরেছে। এ কোনো ঝড় নয়, কোনো বায়ুপ্রবাহ নয়; এ বাতাসের একান্ত নিজস্ব দেহবিভঙ্গ। মাতাল নাচিয়েদের শরীরে যেমন একটু একটু করে দোলা জাগে, তেমন তার শরীরেও জাগছে স্পন্দন। ও এত আশ্চর্য হল যে, ক্যামেরা চালু করার কথাটা পর্যন্ত একবারও মনে পড়ল না।
একটু পরেই বদলে গেল বাজনার শব্দটা।
ধিং ধিং ধিং
ধিং ধিং ধিং
তিনাক্ তিনাক্ তিনাক্ তিনাক্… এবার কেঁপে কেঁপে উঠতে থাকল আগুনের শিখাগুলে তন্বী নর্তকীদের নির্মেদ কোমরের মতো। অনায়াস ভঙ্গিতে নকশা রচনা করতে লাগল তারা। আর মৌসুমি দেখতে পেল, আগুনের ভিতর থেকে উঠে আসছে নর্তকের দল। তাদের মুখ ঢাকা ছিল রাক্ষুসে কোনো পাখির আদলে তৈরি লাল-কালো উৎকট মুখোশে, পরনে ছিল কালো পোশাক দু-কাঁধ থেকে ঝুলছিল কাপড়ের ডানা… কেউ না বললেও, ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে জানিয়ে দিল যে, হয়তো এরাই সেই হারিয়ে যাওয়া নাচিয়ের দল!
মাটিতে পা দিয়েই, মুখ দিয়ে এমন এক বিষণ্ণ অথচ তীক্ষ্ণ আওয়াজ তারা করে উঠল যে, মৌসুমির অন্তরাত্মা পর্যন্ত কেঁপে উঠল! ওর মনে হল; মাত্র হাতকয়েক দূরে দাঁড়িয়ে যারা শরীর দুলিয়ে জমিয়ে তুলছে নাচের আমেজ, তারা মানুষ নয়। পরক্ষণেই অবশ্য নিজেই নিজেকে ভর্ৎসনা করল মৌসুমি। নিজেকে বোঝাল ও, নিশ্চয়ই ওরা গাছের পিছন থেকে বা বনের আরও গভীর থেকে বেরিয়ে এসেছে। অচেনা পরিবেশ, আলোর আকস্মিকতা এবং অশ্রুতপূর্ব বাজনা মিলে এমন এক বিভ্রম তৈরি করেছিল যে, তারই বশে নর্তকদের অগ্নিসম্ভূত বলে ভুল হচ্ছে। বাজনায় আবার ফিরে এসেছিল পুরোনো সেই গুড়-গুড়-গুড় শব্দ, আর সেইসঙ্গে বেড়ে গিয়েছিল নর্তকদের উত্তেজনাও। আরও দ্রুত নাচছিল তারা, আরও ক্ষিপ্রবেগে দুলিয়ে চলেছিল শরীরটাকে। তাদের হাতে-পায়ে যেন আছড়ে পড়ছিল উদ্দীপনার ঢেউ। গজুবুড়োও চোখ বন্ধ করে বাজিয়ে চলেছিলেন একমনে।
আর কোনো দর্শক নেই কেন, এ-কথা একেকবার মনে হচ্ছিল মৌসুমির। কিন্তু পরক্ষণেই ও আবার ডুবে যাচ্ছিল নাচ-গানে।
আবার বদলে গেল বাজনার ভাষা:
ধিং তিনা তিনা তিং
ধিং তিনা তিনা তিং …
পিঠ বেঁকিয়ে এমনভাবে কাঁধ কাঁপাচ্ছিল নাচিয়েরা আর এমনভাবে সুললিত ভঙ্গিতে ঝুলন্ত কাপড়গুলো নাচিয়ে তুলছিল, মনে হচ্ছিল, হয়তো সত্যিই ওগুলো এবার ডানার মতো নড়ে উঠবে! তারপর মাটি ছেড়ে এরা ভেসে উঠবে বাতাসে।
মোবাইলটা আস্তে আস্তে আনলক করার চেষ্টা করল মৌসুমি। কিন্তু ওর ভাগ্য সহায় হল না এ-ক্ষেত্রে। সম্ভবত দীর্ঘক্ষণ ফ্লাশলাইট জ্বালিয়ে রাখার সুবাদেই, ফোনের চার্জ ফুরিয়ে গিয়েছিল মৌসুমির অজান্তেই, আর সেই সুযোগেই দেহ রেখেছিল সবচেয়ে জরুরি যন্ত্রটা। নিজের উপর নিজেরই রাগ হয়ে গেল ওর।
বিফলমনোরথ হয়ে অগত্যা ক্যামেরাটাই চালু করল মৌসুমি। কিন্তু লেন্সে চোখ রাখতেই চমকে উঠল ও! নাচের তালে তালে নর্তকরা এগিয়ে আসছিল সামনের দিকে। তাদের অঙ্গভঙ্গিতে ফুটে উঠছিল ক্ষিপ্র শিকারীর আগ্রাসন। পাল্লা দিয়ে বাজনাও দ্রুত হচ্ছিল একটু একটু করে। তবে সবচেয়ে বড়ো বিপদ ছিল; বহু চেষ্টা করেও পিছিয়ে যেতে পারছিল না মৌসুমি! খুব বলশালী কেউ যেন ওর পা দুটো চেপে ধরেছিল শুকনো মাটির সঙ্গে।
তিনাক্ তিং তিনাক্ তিং…
ধিং ধিনাধিং ধিধিং ধিধিৎ….
মৌসুমির আর্তনাদ চাপা পড়ে গেল বাজনার নীচে। তারা ওকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গেল নাচের জায়গায়। ক্যামেরা, মোবাইল, ঝুড়ি— সব ছিটকে গেল এদিক-ওদিকে। পরনের পোশাক ছিঁড়েখুঁড়ে গেল জায়গায় জায়গায়।
এমন সময় শুরু হল অতিদ্রুত লয়ে গুড়-গুড়-গুড় শব্দে লহবা বাজানো। আর চারদিক থেকে শরবর্ষণের মতো ধেয়ে আসতে থাকল অসংখ্য ধারালো ঠোঁট। নির্মমভাবে তারা গেঁথে যেতে থাকল পাতলা চামড়া ভেদ করে।
“ছেড়ে দাও। আমাকে ছেড়ে দাও। কে আছো, বাঁচাও আমাকে!” দু-হাত দিয়ে মুখটা ঢেকে ফেলল মৌসুমি। কিন্তু পরক্ষণেই আর্তনাদ করে উঠল ও যন্ত্রণায়। কারণ, গৃধিনীবিশালের রীতি অনুযায়ী নর্তকরা কাঁচা মাংস ছিঁড়ে খাওয়ার অভিনয় করছিল না; তারা প্রকৃতই খুবলে খুবলে খাচ্ছিল মৌসুমিকে।
যখন লহবা শেষ হল, অকুস্থলে ততক্ষণে শুধু হাড়গোড় আর রক্ত ছাড়া অন্য কিছু পড়ে ছিল না। নর্তকরা খুশি হয়েছিল অনেকদিন পর প্রকৃত গৃধিনীবিশাল নাচতে পেরে। খুশি হয়েছিলেন গজুবুড়োও, খুলিটা একটানে ছাড়িয়ে নিতে পেরে। আবার পোড়ো বোলান দেখানোর জন্য তাঁর আর তর সইছিল না! তিনি এবার জঙ্গল কাঁপিয়ে তুললেন বিদায়ীর সুরে-
তিং নাতিং তিং নাতিং
নাতিং তিং…
অষ্টমবার যখন বাদ্য ছুঁল তাঁর আঙুল, তক্ষনই আকাশ ফুঁড়ে নেমে এল এক লেলিহান বিদ্যুৎ। লকলক করে উঠল তার নীলচে জিভগুলো; লহমায় তারা টেনে নিল নর্তকদের। গজুবুড়োর হাত থেকে আজও খুলিটা চলে গেল তাঁর প্রাণ রক্ষা করে, বিগত চারবারের মতোই। তিনি দাঁড়িয়ে থাকলেন একা! হতাশা নেমে আসছিল আস্তে আস্তে। গজুবুড়ো বুঝতে পারছিলেন যে, তাঁর আর কখনও হয়তো পোড়ো বোলান দেখানো হবে না! বাকি জীবনটা তাঁকে কাটিয়ে দিতে হবে এদের সঙ্গে বাজিয়ে বাজিয়েই…
একটা কথা শুধু গজুবুড়ো ছাড়া আর কেউ জানল না; সেদিনের মতোই, আজকের বিদ্যুৎটাও দেখতে ছিল অবিকল এক অতিকায় শকুনের মতো!
