মায়ানিশি – তুষারকান্তি মাহাতো
(এক)
ঠিক রাত দুটোয় নাইট সার্ভিস বাসটা এসে থামল। মিনিটখানেক দাঁড়িয়ে সেটা হুস করে বেরিয়ে গেল শিলিগুড়ির দিকে। যোগেশের সামনে এখন নিস্তব্ধ, নিঃশব্দ প্রান্তর। না, একদমই ঠিক নিরালা বলা চলে না। মালদা জেলার অখ্যাত এই আঁধার প্রান্তরে কোনোক্রমে মাথা উচিয়ে জেগে আছে কেবল একটা পানগুমটি। তার ভেতর কম পাওয়ারের টিমটিমে আলোয় ঝিমুতে থাকা এক বৃদ্ধ দোকানদার। দোকানদার না বলে তাকে পাহারাদার বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত। যেন কোনো প্রাগৈতিহাসিক যুগের এক রহস্য মূর্তি। এক্ষুনি হয়তো বিকট শব্দে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। কিন্তু পড়ল না।
এদিকে জ্যোৎস্নার প্লাবন নেমেছে। জোয়ার উথলে পড়ে আলোর পৃথিবী ভাসিয়ে দেবে এখনই। সেই ফটফটে জ্যোৎস্নায় সর্বাঙ্গ ভিজে যায় যোগেশের। ভিজে সপসপে জামা-প্যান্টে লেপটে আছে শরীর। জ্যোৎস্নার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। বড়ো উৎকট সে গন্ধ। সর্বাঙ্গে বেশ ঝিম ধরায়। কেমন যেন ঘুম ঘুম পায় যোগেশের। ওমটির সামনে বাঁশের বেঞ্চিতে লম্বালম্বিভাবে শুয়ে পড়ে সে। কোনোরকমে কব্জি ঘুরিয়ে হাতঘড়িটা একবার দেখে নেয়। না, আরও ঘণ্টা চারেক বাকি দিনের আলো ফুটতে। ক্রমশ চোখের পাতা ভারি হয়ে আসে। এমনই হয়। জ্যোৎস্নায় তার খুব ঘুম পায়। কেন কে জানে!
কতক্ষণ এইভাবে কাটল জানে না। যখন চোখ খুলল দেখে পূব আকাশ ফর্সা হতে শুরু করেছে। দোকানের সামনে যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা কাগজ, প্লাস্টিকের টুকরোগুলোকে ঝাড়ু দিয়ে একত্রে করে তাতে আগুন জ্বালাবার প্রস্তুতি নিচ্ছে বৃদ্ধ দোকানদার। চোখাচোখি হতেই ফিক্ করে হেসে বলে, “ধন্যি সাহস তোমার বাবু!”
“কেন?”
“আরে বাবা, ফাঁকা জায়গায় রাত দুপুরে কেউ এভাবে পড়ে থাকে? চোর ডাকাতের ভয় নেই তোমার?”
“চোর-ডাকাত?”
মনের ভেতরে গিয়ে মুচকি হাসে যোগেশ। কী আছে ওর কাছে যে চোর চুরি করবে।
লোকটার মুখ এখন ভোরের আকাশের মতো, ভোরবেলার সোনালি রোদের মতো ঝকঝকে, নিষ্পাপ। অথচ গতরাতে কেমন যেন রহস্যময় শরীর নিয়ে দিব্যি এ ভূখণ্ড পাহারা দিয়ে গেল। তখন একটাও কথা বলেনি। আর এখন? এখন কী অবলীলায় কথার পর কথা গেঁথে বিশাল এক ইমারত খাড়া করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
যোগেশ উঠে দাঁড়ায়। দোকানের ভেতর চাইল। দেখে নিতে চাইল চা-টার বন্দোবস্ত রয়েছে কী না। আশ্বস্ত হল একটা কেটলিতে জল ফুটছে দেখে। আর ঠিক তখনই দোকানের ছোট্ট আয়নায় নিজেকে দেখল। নিজের বিধ্বস্ত রূপ দেখে মনে মনে হাসে। এই একটা রাতেই তার বয়স হঠাৎ কীরকম যেন বেড়ে গেছে। দোকানদার এবার যোগেশের সামনে এসে দাঁড়ায়। সরাসরি জিজ্ঞাসা করে, “কই যাবে গো।”
“নিত্যপুর।”
“ওখানে কোথায়?”
“পলিটেকনিক কলেজ।”
“নতুন ভরতি।”
“হুম।”
সকালের ঝিরঝিরে মুক্ত বাতাস এখন চারপাশে খেলা করে বেরাচ্ছে। এখানের বাতাস কত স্বচ্ছ, নির্মল। বড়ো রাস্তার ওপাশে বেশ ঘটা করে বড়ো বড়ো শাল গাছগুলো ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে। আর অকৃপণভাবে চরাচর শুদ্ধ মুক্ত বাতাস বিতরণ করে বেড়ায়। যোগেশের ভালো লাগে। হাঁ করে কিছুটা বাতাস গিলে ফেলে ও। আরে এমন একটা জায়গাই তো মনেপ্রাণে দেখতে চেয়েছিল সে। এরপর চা খেতে খেতে জেনে নিল দরকারি অনেক কিছু। যেমন নিত্যপুর কলেজ যাওয়ার রাস্তা, স্থানীয় বাজার-হাট ইত্যাদি।
এখান থেকে সোজা দক্ষিণ দিকে আন্দাজ দুই কিলোমিটার হেঁটে গেলে চয়নপুর বলে একটা গঞ্জ এলাকা পড়ে। একেবারে গঙ্গা নদীর ধার ঘেঁষে। ওখানে ফেরিঘাট আছে। নৌকা করে বেশ কিছুটা পশ্চিমে গিয়ে অন্য পাড়ে পৌঁছোলেই নিত্যপুর। বেশ বর্ধিষ্ণু গ্রাম। ওখানেই যোগেশের পলিটেকনিক কলেজ। ওমটিওয়ালার কথায় চয়নপুর থেকে নৌকায় নিত্যপুর পৌঁছাতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে।
দোকানদারের কাছ থেকে বিদায় নিতে নিতে সকাল দশটা বেজে গেল। বিদায়কালে পাঁচশো টাকা বকশিশ পেয়ে সে তো ভয়ানক খুশি। খুশি হওয়ারই কথা। এক কাপ চা, ডিম টোস্ট ও সামান্য কিছু ইনফরমেশনের মূল্য এ তল্লাটে অন্তত পাঁচশো ছাড়ায়নি এবং আগামী দশ বছরেও ছাড়াবে কী না সন্দেহ। টাকা পেয়ে এক টুকরো মরা হাসির বিদ্যুৎ যেন দেখা দিল ওর চোখে-মুখে এবং কিছুটা ব্যঙ্গ বিদ্রুপ নিজের অজান্তে মুখময় ছড়িয়ে বসে থাকল। হয়তো নিজের মনে বলল, “কলকাত্তাইয়া পোলার এখানে মন টেকে কীনা কে জানে!”
যোগেশ হয়তো শুনতে পায়নি। না পাওয়ারই কথা। যোগেশ ঘোষ খাস কলকাতার বাসিন্দা। গ্রাম কী জিনিস এতদিন দেখেনি। গল্প নয় সত্যি। এই বাইশটা বসন্ত পার করে এসেও কত কিছুই দেখেনি সে। পাহাড়, জঙ্গল, নদী, সমুদ্র কিচ্ছু না। তবে দেখবার যে চেষ্টা করেনি তা কিন্তু না। এই তো মাধ্যমিকের পর স্কুলের সব বন্ধুরা মিলে ঠিক করল সুন্দরবন যাবে। কিন্তু নিয়তি বাধ সাধল। বেরোনোর ঠিক আগের দিন ধুম জ্বর। অগত্যা যাওয়া ক্যান্সেল। আর একবার টিউশনির বন্ধুদের সঙ্গে প্ল্যান হল টাকি-বসিরহাট যাওয়ার। সেবার বেরোনোর মুখে চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে ডান পায়ের কড়ে আঙুল ভেঙে সে এক দফারফা কাণ্ড। বস্তুত, যখন যখন শহর কলকাতা ছাড়িয়ে অন্যত্র যাওয়ার চেষ্টা করেছে তখনই কোনো না-কোনোভাবে নিয়তি বাধ সেধেছে— কাকতালীয় হলেও এটা ঘটনা!
*****
(দুই)
যোগেশ চয়নপুর অভিমুখে এগিয়ে চলে। পথটা বড়ো অদ্ভূত। দু-পাশে সার দিয়ে বাঁশের ঝাড়। একেবারে ঘন হয়ে বসে আছে। চারিদিকে মলিন ধূসরতার ছাপ। থেকে থেকে ঝিঁঝির ডাক। জায়গাটা জঙ্গুলে বলেই হয়তো সূর্যের আলো এই সকাল এগারোটাতেও প্রবেশাধিকার পায়নি। দু-পাশের বাঁশঝাড় নুইয়ে এসে রাস্তাটিকে দখল করে বসে আছে। ট্রেসপাসের অপরাধে অনায়াসে তাদের দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যেতে পারে। সে সবকে সযত্নে এড়িয়ে এগিয়ে যায়। একেক সময় তার মনে হয় এই পথ দিয়ে হেঁটে চলা সেই শেষতম পথিক। এরপর কোনো এক অজানা কারণে বাঁশবনের বুক চিরে এই এক ফালি পথ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে, মানচিত্র থেকে বেমালুম মুছে যাবে। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে সে সত্যিই ভাগ্যবান। এই পথ, দু-পাশের বেয়াদব বাঁশগাছকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে চলার রোমাঞ্চকে প্রাণ ভরে আস্বাদ করে নিতে এতটুকু কার্পণ্য করে না সে। এই সময় তার মন হঠাৎ কঠিন এক আবিষ্কারের নেশায় মাতোয়ারা হয়ে ওঠে। হ্যাঁ ঠিকই তো, আরে এরকম পথ সে কতবার শয়নে স্বপনে দেখেছে। দেখেছে অনন্তকাল ধরে এই পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে সে। আর গন্তব্যস্থলটি কোনো এক অজানা কারণে একটু একটু করে দূরে সরে যায়, মরীচিকার মতো।
বাঁশবন ছাড়িয়ে পথ গিয়ে পড়ল ছোট্ট একটা গ্রামে। এখানে বেশিরভাগ ঘর মাটির। ছোটো একটা পুকুরে একদঙ্গল হাঁস চরে বেড়াচ্ছে। গ্রামের মানুষ ইতি-উতি ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু যোগেশের উপস্থিতিতে সেরকম কেউ গা করল না। অথচ এতদিন সে জেনে এসেছে গাঁয়ে নতুন কেউ এলে নাকি সবাই কেমন কৌতূহলী দৃষ্টিতে আগন্তুকের দিকে চেয়ে থাকে। কত কিছু শুধোয়। কিন্তু না, সে সবকিছুই হল না। শহুরে নির্লিপ্ততা হয়তো গ্রাম বাংলাকে স্পর্শ করেছে। যুগের নিয়ম। তবে তার বহুদিনের স্বপ্নপূরণ হয়েছে এটাই সবচেয়ে আসল ব্যাপার। এবার আর মানসচক্ষুতে নয়, রীতিমতো একজোড়া চর্মচক্ষুতে গ্রাম জিনিসটাকে পুরোপুরি আত্মস্থ করার সুযোগ ঘটল।
রাস্তা জুড়ে গাঁয়ের কচি-কাচার দল। যোগেশকে তারা কেউ গ্রাহ্য করল না। বাচ্চারা গোল হয়ে বসে কাচের মার্বেল খেলছে। যোগেশ থমকে দাঁড়ায়। চারপাশে দৃষ্টি ছুড়ে ছুড়ে কিছু একটা দেখে নিতে চাইছে। পাশেই একটা খড়ের গাদা। খড়ের গাদার ডানদিকে একটা সজনে গাছের সঙ্গে একটা গরু দড়ি দিয়ে বাঁধা। পুরো ছবিটা যেন ওর মুখস্থ। আর একটা… আর একটা জিনিস এখানে থাকার কথা। হ্যাঁ, ওই তো। ঘাড় উঁচিয়ে কিছুক্ষণ চাইতেই নজরে আসে। সজনে গাছের ঠিক কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা ঝাঁকড়া অশ্বত্থ গাছটা দৃষ্টিসীমাকে এতক্ষণ বিশ্রীভাবে অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। তাই দেখতে পায়নি। দু-পা বাড়াতেই মনে খুশির ঝলক। এক প্রৌঢ় মাটিতে পড়ে থাকা খণ্ডিত গাছের গুঁড়িকে কুড়ুল দিয়ে চোট মারার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর তার ঠিক পেছনে দড়ির খাটে শুয়ে এক হেঁপো রোগী ঘড়ঘড় শব্দে শ্বাস টানে। সবকিছু যেন ছবির মতো মিলে যায়। স্বপ্নে দেখা দৃশ্যগুলো কীভাবে যেন পরপর সাজানো থাকে। সে তো কোনোদিন এই গ্রামে আসেনি। তবে? নাকি এ-দৃশ্য বাংলার প্রতিটি গ্রামের অতি পরিচিত?
গুটিকতক ঘর-বাড়ি, দুটো বড়ো বড়ো পুকুর, চারটে ডোবা পেরোতে পাক্কা একটা ঘণ্টা লেগে গেল। যোগেশ এবার ধু ধু ফাঁকা মাঠের মাঝে দাঁড়িয়ে। মাঠের মাঝখান দিয়ে শুরু এক ফালি রাস্তা এঁকেবেঁকে এগিয়ে গেছে। এবার তার মনে হল ঠিক এইখানে একটা পাগলের উপস্থিতি খুব দরকার। মনের ভেতর থেকে এই জরুরি কথাটা প্রবল বেগে ঠেলে ওঠে। অথচ কেন এমন হচ্ছে তা সে জানে না। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা বিকট হাসি। সশব্দে বেজে উঠল। খুব তীক্ষ্ণ আর গভীর। যেন মাঝরাতে কাচ ভাঙার মতো ধারালো সে আওয়াজ। যোগেশ চমকে ওঠে। কখন যেন নিঃশব্দে তার ঠিক পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে একটা লোক। চেহারায় দু-পয়সার ছিরি নেই। উস্কোখুস্কো। মলিন বেশবাস। জামাটা শতাব্দী প্রাচীন মনে হল। তার জায়গায় জায়গায় ছেঁড়া। আসল রং উবে গিয়ে ধূসরতার ছোপ লেগেছে। প্যান্টের নিম্নাংশ হাঁটুর ওপর গোটানো। সরু নাইলনের দড়ি দিয়ে কোমরের সঙ্গে আঁট করে বাঁধা। চুলে শেষ কবে তেল পড়েছে তা একমাত্র ঈশ্বরই বলতে পারবেন। হাসি থামিয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে লোকটি বলে, “গন্তব্য কোথায়?’
“চয়নপুর।” বলেই যোগেশ তাড়াতাড়ি পা চালাতে শুরু করে। জানে এই ধরনের লোকের সঙ্গে বাক্যালাপে যথেষ্ট ঝুঁকি আছে। এ-ব্যাপারে যোগেশের অভিজ্ঞতা বেশ তিক্ত। স্কুলের বাইরে সেই পাগলটাকে মনে পড়ে। মধু ক্ষ্যাপা।
মধু দিনভর কেবল একটা কথায় আউড়ে যায়। কথাটা হল,
“যা, চান করে ভাত খা গা।”
স্কুল যাওয়া আসার পথে রোজ দেখে, রোজ শোনে। তবু গা করে না। একদিন কী মনে হল কিছুটা কৌতূহলবশে মধুকে এ-কথার কারণ জিজ্ঞাসা করে। কিছু বোঝার আগেই মধু ক্ষ্যাপা যোগেশের গালে সটান একটা চড় কষিয়ে দেয়। তারপর রাগত স্বরে বলে, “স্কুলে কী করতে আসিস হতভাগা? জানিস না চান না করে খেলে বদহজম হয়। এই কথাটা বারেবারে তোদের বোঝানোর চেষ্টা করি। তবু তোরা শুনবি না বাঁদরের দল।”
সেই থেকে পাগল দেখলে এড়িয়ে চলে। অথচ কী না একটা পাগলকে এই সময় দেখতে চেয়েছে এবং কী আশ্চর্য সে সাধও অবলীলায় পূরণ হয়। একে কী-ই বা বলবে! সত্যি সব কিছু স্ক্রিপ্ট অনুযায়ী মিলে যাচ্ছে। কিন্তু কেন?
এদিকে পাগল লোকটা প্রায় দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে থাকা যোগেশকে ধরে ফেলে। তারপর হাঁপাতে হাঁপাতে বলে, “চয়নপুর তো এখান থেকে অনেক দূর! বলতে গেলে পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে। পায়ে হেঁটে কেমনে পৌঁছোবে পার্টনার?”
পার্টনার? কথাটা শুনে যোগেশ ক্রুদ্ধ হয়। বলে কী লোকটা? সে-ও কী তাকে নিজের মতোই পাগল টাগল ভাবছে নাকি? কিন্তু কেন? তার মধ্যে তো কোনো অস্বাভাবিকত্ব নেই? তবে? গোটা দুনিয়া থেকে পাগল নিকেশ করার শপথ মনে মনে নিয়ে ফেলে। পাগলদের এই একখানা দোষ। তারা তামাম দুনিয়াশুদ্ধ লোককে নিজেদের মতো ভাবে।
তবে ভাবনার মাঝে আচমকা হোঁচট খায়। চয়নপুর পৃথিবীর অন্য গোলার্ধে না হোক এখান থেকে তার যে দূরত্ব অনেকখানি সেটা তো হতে পারে। হোক না লোকটা পাগল। কিন্তু তার এই সাবধানবাণী মনের খচখচানিকে বাড়ালো বই কমাল না। স্রেফ একটা পানগুমটিওয়ালার কথায় এতটা বিশ্বাস করাটা বোধহয় ঠিক হল না। গাঁয়ের লোকদের বিশেষ একটা বদদোষ সে ইতিপূর্বে শুনে এসেছে। কখনও কোনো জায়গার সন্ধান চাইলে গ্রামের লোক দিব্যি তর্জনী উঁচিয়ে মাছি মারার ভঙ্গিতে বলে, “ওই হেথায়, মাত্তর একটুখানি পথ।”
অথচ বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় সে পথ বহুখানি। তবে কী চয়নপুর পৌঁছাতে আস্ত একটা গোটা জীবন লেগে যাবে? মাত্র একজনের কথায় এতটাই নিশ্চিন্ত মনে হাঁটছিল যে অন্য কাউকে জিজ্ঞাসা করে তার সত্যতা যাচাই করার সম্ভাবনা মাথায় আসেনি। সত্যি পাগলেরা মাঝে মাঝে এমন কিছু বলে ফেলে যা অতি স্বাভাবিক মানুষের কপালেও ভাঁজ ফেলে দেয়। তাই সারা দুনিয়া থেকে পাগল নিধনের কঠিন পণকে আপাতত মুলতুবি রাখে সে। একবার ঘাড় ফিরিয়ে পেছনের দিকে চাইল পাগলের অবস্থান বুঝতে। সে লোক তখন বিপরীত অভিমুখে চোঁ চোঁ করে ছুটে যাচ্ছে। যা-ই হোক, এইভাবে প্রায় আধঘণ্টা হাঁটার পর চয়নপুর বাজারের দেখা মিলল। পাগল ও দোকানদারের কথা কিছুটা মিলল, কিছুটা মিলল না।
*****
(তিন)
বাজারে ব্যস্ততা চরমে। সূর্য ঠিক মাথার ওপর। গনগনে রোদের দাপটে গেল-রাতের জ্যোৎস্না মাখা শরীরের মায়াবী গন্ধটা এইবার বুঝি উবে যেতে চায়।
একটা খাবার হোটেলে গিয়ে পেট পুরে ভাত খেয়ে নেয় যোগেশ। সামনে নদী থাকার জন্য মাছের হরেক আইটেম। মন দিয়ে মাছের কাঁটা বাছতে বাছতে হোটেলওয়ালাকে নিত্যপুর যাওয়ার কথা বলে। হোটেলওয়ালা বলে, “নিত্যপুর যাওয়ার জন্য নৌকা ছাড়তে আর বেশি দেরি নেই। তাড়াতাড়ি করেন। বলছি ভাই, আপনারা তো শহর কলকেতার মানুষ, দেখুন তো সরকার থেকে যদি একটা ব্রিজ বানিয়ে দেয় তবে বেশ হয়। তাহলে নিত্যপুর যাওয়ার ঝক্কিটা অন্তত কমে আর কী।”
যোগেশ বাধ্য ছেলের মতো এক পাশে ঘাড় কাত করে। ব্লাবাহুল্য, যোগেশের এটা ভেবে নিতে অসুবিধা হয় না যে সেই একমাত্র ব্যক্তি নয়, আরও অনেকের কাছে এই ব্রিজের আব্দার করে আসছে হোটেলওয়ালা। ভবিষ্যতে আরও অনেকের কাছে হয়তো করবে। তারপর একটা সময় ক্লান্ত হয়ে পুরোপুরি চুপ করে যাবে। এইভাবে পৃথিবীর অর্ধেক মানুষ ধীরে ধীরে চুপ হয়ে যায়। মানে হয়ে যেতে বাধ্য হয়। এই চুপকথারা ফিশফিশ করে নীরবে কত কথায় না শুনিয়ে যায়।
যোগেশের আজ দিনটা কেন কে জানে বড্ড গোলমেলে। ঘাটে গিয়ে শুনল প্রায় পাঁচ মিনিট হল নিত্যপুরগামী নৌকা বেরিয়ে গেছে। পরবর্তীটা ছাড়বে ঠিক বিকেলে। ঝটপট জেটিতে নেমে দৃষ্টি ছুড়ে ছুড়ে কিছু একটা কয়েদ করতে চাইল। হ্যাঁ ওই তো, একটু দূরে একটা নৌকা, তাতে বেশ কিছু লোকজন ও মালপত্র চাপানো, দিব্যি তরতর করে এগিয়ে চলেছে। যত সময় যায় নৌকা সাইজে ছোটো হতে থাকে। তারপর একটা সময় মিলিয়ে যায়। বোবা কান্নার ব্যথা পেল যোগেশ। আজকেই কলেজে ভরতির ডেট। মোটে একটা দিন। পেরিয়ে গেলে বড্ড মুশকিল। বিশেষ অনুরোধে আগামীকাল হয়তো করে দেবে, কিন্তু সেক্ষেত্রে অনেক কৈফিয়ত দিতে দিতে জান একেবারে কয়লা হয়ে যাবে।
এইবারে কাঠের ঠোকাঠুকির আওয়াজ শুনতে পেল। অনেক আগের থেকে শুনে আসছে কিন্তু এতক্ষণ বিশেষ মাথা ঘামায়নি। এবার থামাল। খানিক তফাতে একটা নৌকার ভেতর কাঠের পাটাতনে লম্বা লম্বা পেরেক গুঁজে তার মাথায় দমাদম হাতুড়ি পিটিয়ে যাচ্ছে জনৈক মিস্ত্রী। আর তার ঠিক পাশে বসা কালো মুশকো চেহারার একটা লোক তাকে জলদি কাজ শেষ করার তাগাদা দিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না এ নৌকার মাঝি। তার মাত্রাতিরিক্ত ছটফটানি, মিস্ত্রির ওপর চোটপাট- এসব প্রমাণ করে খুব শিগগিরি নৌকা ছাড়বে। কিন্তু কোথায় যাবে সেটাও একটা প্রশ্ন। যদি নিত্যপুর যায় তবে তো মার দিয়া কেল্লা। যোগেশের মনে অতি ক্ষীণ একটা আশার প্রদীপ টিমটিম করে জ্বলতে শুরু করে। নৌকার আরও কাছে ঘনিয়ে এসে মাঝিকে শুধোয়, “নৌকা কোথায় যাবে?”
মাঝি মুখ তুলে চাইল এবং বলাই বাহুল্য রাজ্যের বিরক্তিতে তার মুখ ছেয়ে গেল। সে পাঁচন খাওয়া মুখ নিয়ে বলে “কাজের সময় ঝামেলা ভালো লাগে না। যাও তো বাপু।”
যোগেশ একটুও না দমে বলে, “নিত্যপুর যাবে তো?”
এইবার মাঝি চমকাল। তবে সেটা ক্ষণিকের।
“তোমায় কে বলল?”
“আমার মনে হল তাই বললাম। যদি যাও তো আমায় নিয়ে নিও। নিত্যপুর যাওয়াটা খুব জরুরি।”
মাঝি লোকটা ততটা বোধহয় নিষ্ঠুর টাইপের না, যতটা ভেবেছিল যোগেশ। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে বলল, “ওখানে কাজ কী তোমার? এদিকের লোক নও মনে হচ্ছে তুমি।”
“আমি আসছি কলকাতা থেকে। নিত্যপুর পলিটেকনিক কলেজে নতুন ভরতি হব। আজকেই ভরতির ডেট, এদিকে কোনো যোগাযোগ নেই।”
“বুঝলুম। আর মিনিট পনেরো কুড়ি পরেই ছাড়বে। তবে আমাদের সঙ্গে আরও একজন যাবে।”
“মানে মোটে তিনজন? এত কম লোক কেন?”
“এটা পেরাইভেট নৌকা যে।”
নৌকায় পাক্কা একটা ঘণ্টা কেটে গেল। সেই তৃতীয় ব্যক্তির আগমন তবু ঘটল না, অথচ সে না এলে নৌকা নাকি ছাড়বে না। যোগেশ চরম বিরক্তিতে উসখুস করে। মুখে কিছু বলে না। বারবার হাতঘড়ি দেখে।
*****
(চার)
ঠিক আড়াইটেতে নৌকা ছাড়ল। ছাড়ল মানে কেমন যেন ছাড়া ছাড়া ভাবে ছাড়ল, যেন কোথাও যেতে তার বড্ড গরজ। যেতে হয় তাই যাচ্ছে। মাঝি লোকটার নাম সহদেব। সে প্রবল বিক্রমে দাঁড় টেনে চলেছে। দেহের আন্দোলনে শরীরের প্রত্যেকটি মাংসপেশির অদ্ভুত নড়াচড়া শুরু করে দিল। তাতে তার বয়স যেন আরও কমে গেল। একটু আগেই রহস্যময় ভঙ্গিতে সে বলেছিল, “আমি জলে জলে মানুষ। জলে জলে বয়স আড়াই কুড়িতে ঠেকল। কেউ বলবে?”
বলার লোক তখন অবাক বিষয়ে সব কিছুকে দেখে চলেছে। জলের সংস্পর্শে থাকা মানুষের বয়স কী কোনো কারণে এক জায়গায় আটকে থাকে? হয়তো নিত্যদিন জলের সঙ্গে লড়াই করতে করতে মানুষ তার বয়সখানি যতটা পারে কমিয়ে রাখে, মানে রাখতে বাধ্য হয় আর কী।
দুপুরের ঠা-ঠা রোদ নৌকার ছইয়ে পড়ে বহুবিভক্ত হয়ে কুচিকুচি হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে। যোগেশের একেবারে গা ঘেঁষে বসেছে একজন। তার চোখের আবিষ্ট চাউনি ও গানের অপূর্ব রেশ চমকে দিচ্ছে। চমকে দিচ্ছে এইজন্য যে, না হলে সহদেব মাঝি দাঁড় টানা থামিয়ে কেন বলে উঠবে,
“ও কেয়া বাত! কেয়া বাত!”
সুরে সুরে গানে গানে জলপথ মায়াময় হয়ে উঠল।
“ভ্রমর কইয়ো গিয়া
শ্রীকৃষ্ণ বিচ্ছেদের অনলে
অঙ্গ যায় জ্বলিয়া রে…”
সুরের আবেশে যোগেশকে যেন পুরোপুরি মোহবিস্তারের জালে কয়েদ করে নিতে চাইল দোলন। হ্যাঁ, মহিলাটির নাম দোলন। কত বয়স হবে? ত্রিশ কি বত্রিশ। সধবা। মাথায় সিঁদুরে সিঁথি জ্বলজ্বল করছে। হাতে শাঁখা-নোয়া। কৃষ্ণসারিনীর মতো চটুল চোখে যোগেশের দিকে চেয়ে থেকে একটার পর একটা সুর ভেঁজে চলে। ত্রিশের কোঠা পেরোলেও যৌবন যেন এতটুকু ক্ষয় হয়নি এখনও। সমাপ্তি ঘটেনি সৌন্দর্যের। বরং ভরপুর রসোদীপ্ত যুবতী দেহ। একখানা জরির কাজ করা পাতলা ফিনফিনে শাড়ি সুস্পষ্ট দেহের নিম্নভাগ থেকে ওপরে উঠেছে, যেন গাছের কাণ্ডে পাক খাওয়া একটা মায়াবী ময়াল। দেহের প্রতিটি লোলুপ বক্। যোগেশের স্পর্শ সুখ নিতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু অজগরের গায়ে বেমক্কা হাত পড়লে কী হতে পারে ভেবে নিয়ে নিজেকে গুটিয়ে নেয়।
ধুসর একটা বাতাস বইছে। নৌকা ছাড়া ছাড়া গতিতে ধীরে সুস্থে এগিয়ে যায়। সঙ্গী হয় বাতাস চিরে চিরে এগিয়ে চলা খিলখিলে চটুল হাসির ঝলক। এর মাঝে দোলন শুধোয়, “কই গো মাঝি, আজ বড্ড দেরি করছ যে? কাজে ফূর্তি কৈ?”
“আরে দূর, জলের টান দেখছিস না।”
“এ আর নতুন কী। আজ তো পেথম যাচ্ছি না।”
দিকে তাকিয়ে এইমাত্র দোলনের গাওয়া গানটা গুনগুন মাঝি এবার দূরে ভেসে যাওয়া একটা ডিঙ্গি নৌকার দিকে তাকিয়ে এইমাত্র দোলনের গাওয়া গানটা গুনগুন সুরে গাইবার চেষ্টা করে। দোলন আর এক প্রস্থ ছেনালী হাসি নিক্ষেপ করে বলে, “সহদেবদা তুমি বুড়ো হচ্ছ। এবার অফিস বাবুদের মতো রিটায়ার করো দিকিনি।”
“বাবা, তুই কত কিছু জানিস দেখছি। তা রিটায়ার করে কী করব? খাব কী?”
“তার আমি কী জানি? আমি কী তোমার বে করা বউ যে এত কিছু ভাবব।”
“একটা কথা শুনবি দোলন?”
“কী?”
যোগেশকে কেউ গুরুত্বই দিচ্ছে না। বছর বাইশের একটা জলজ্যান্ত স্বাস্থ্যবান তরুণ যে কাছেই রয়েছে, তাতে যেন কারুর তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। যোগেশের নিজেকে নির্বান্ধব, অসহায় লাগে। তবে দোলন নামের মহিলাটি যে তার যৌবনকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করেছে তা কিন্তু নয়। এই তো বেশ কিছুক্ষণ আগেকার ঘটনা। রতিবিলাসকামী কৃষ্ণসারিনীর মতো তন্ময় বিহ্বল দৃষ্টিকে সঙ্গে নিয়ে দোলন তখন বলেছিল,
“বাব্বা, তুমি তো বেশ গায়ে গতরে! তোমার ছাতিতে মাথা ছোয়াতে দাও না গো সোনা।” যোগেশ কিছু একটা বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করেছিল, কিন্তু তা আর বলা হল না। হঠাৎ সহদেব মাঝি হুংকার দিয়ে ওঠে। হাতের দাঁড়টা অস্ত্র বানিয়ে মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে, “কচি ছেলের মাথা একদম খাবি নে দোলন। না হলে…”
“না হলে কী?”
“তোর মাথা ভেঙে দেব।”
খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে দোলন। বলে, “এতই সোজা?” তারপর ভ্রু নাচিয়ে মুখে বিচিত্র অঙ্গভঙ্গি করে বলে, “ও তুমি পারবে না। তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছ।” সহদেব মাঝি তখন দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে ওঠে। বোধ করি সে এই কথাটি শোনার অপেক্ষাতেই ছিল। না হলে কেন দুম করে দুটো কথা শুনিয়ে মায়াভরা জলপথকে একেবারে বিষাদময় ভারী করে তুলবে।
“আমি হলাম বুড়ো, তাইতো? আর তোর পেয়ারের নিত্যপুরের সরকারবাবু যেন কত ইয়াং! শালা তিনকুলে গিয়ে এককুলে ঠেকেছে। রাতে মাগী নিয়ে ফূর্তি করবে বুড়ো, আর যত ঝামেলা শালা এই সহদেবের।”
যোগেশ এতক্ষণ চুপচাপ, শ্মশানের পোড়া কাঠের মতো পড়েছিল। এইবার বোধ করি সচকিত হল। যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে জোরালো একটা ঝটকা খেল। সেই সঙ্গে এটাও দেখল দোলন বলে মহিলাটি প্রায় তেড়ে ফুঁড়ে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু কী এক অজ্ঞাত কারণে চুপসানো বেলুনের মতো মিইয়ে গেল। স্নিগ্ধ যৌবন মুখে নামছে রুগ্ন বিষণ্ণতা। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে রাখল। আর চোখে চোখ রাখতে পারছে না মেয়েটি। কেমন যেন অস্বস্তিতে কুঁচকে যেতে শুরু করল। হয়তো গূঢ় কথাটা যোগেশের মতো বাইরের কেউ শুনে ফেলার জন্য। এদিকে যোগেশের কেন জানি না মনে হল এইবার দোলন কিছু কথা খুঁজে না পেয়ে গান গাইবে। এছাড়া তার আর কিছু করার নেই এবং কী আশ্চর্য সেটাই ঘটল। দোলন গাইতে শুরু করল-
“কী করে পাব তোমারে
তাই ভেবে দিন-রজনী
মনের কথা প্রকাশ করি
কথায় দিয়ে রাগিনী
এস্কে দিল-দরিয়ার পানি
ভাটি ছেড়ে বয় উজান….”
নিত্যপুর ঘাটে নৌকা যখন পৌঁছাল, তখন বিকেল হয় হয়। সহদেব মাঝি কী মনে করে নৌকা ঘাটে ভিড়াল না। বরং নৌকার ওপর আরও জাঁকিয়ে বসল। তাই না দেখে দোলন অবাক বিস্ময়ে বলে, “ঘাটে নাও বাঁধলে না কেন? মতলব কী তোমার?”
“মতলব আছে বৈ কী। সরকারবাবু আমায় কিছু টাকা দিয়ে বলেছেন ভালো জাতের বিদেশি দারু আনতে। এখন কথা হচ্ছে নিত্যপুরে তো এ-জিনিস মিলবে না। আনতে হবে সেই সুন্দরগঞ্জ থেকে। তাই আমাকে সুন্দরগঞ্জ একবার যেতে হবে।”
দোলন অমনি হাই তুলে বলে, “ও বুঝলুম। চলো আমিও যাই।”
সহদেব এবার যোগেশের দিকে চাইল। যোগেশ ঝট করে কবজি উলটে একবার হাত ঘড়িটা দেখে নেয়। বলে, “টাইম তো পেরিয়ে গেল। কালকেই না হয় কলেজের কাজ সারব। চলো দেখি তোমাদের সুন্দরগঞ্জ কেমন জায়গা।”
*****
(পাঁচ)
ঝুপ করে সন্ধ্যা নামল। কালো জলে ছলাৎ ছলাৎ করে নৌকা এগিয়ে যায়। হাজারো বিপন্ন বিস্ময়কে নৌকায় চাপিয়ে সহদেব মাঝি দাঁড় টানতে শুরু করে। একটা সময় নৌকার ভেতরটা অন্ধকারে ডুবে যায়। আজ তারাদের রাজ্যে মেঘের উৎপাত বেশ, তাই চাঁদের আলো অবরুদ্ধ। নৌকার ভেতরে কালো, বাইরে কালো, জলের রং কালো, দোলনের মনের মাঝে বিষণ্ণতার রং কালো-শুধু কালো আর কালো। যোগেশ এই কালোয় হাঁপিয়ে ওঠে। একটুখানি আলো পেতে চায়।
বেশ কিছুক্ষণ পর নৌকার ছইয়ের মধ্যে একটা আঁকশিতে ঝোলানো হ্যারিকেনকে নীচে নামিয়ে এনে জ্বেলে ফেলল দোলন। কিন্তু আলো ছড়াচ্ছে কৈ? হ্যারিকেনের কাচে কালোর ছোপ লেগেছে। দোলন হ্যারিকেন নিভিয়ে ছোটো একটা কাপড় টুকরো দিয়ে কাচ মুছতে শুরু করল। যোগেশ অন্ধকারের মধ্যেও দোলনকে নিরীক্ষণ করে। মহিলাটি কালোকে মুছে ফেলতে মরিয়া। কী সুন্দরভাবে পরমযত্নে কাচে জমে থাকা কালিকে সরিয়ে ফেলছে। যেন আপন সংসারে গৃহকর্মে নিয়োজিত এক বধূ। প্রতিটি মেয়ের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক নিবিষ্ট সংসারী ভাব। তা সে নিজের সংসার হোক বা পরের। দোলনের জন্য যোগেশের দুঃখ হয়। খুব। মেয়েটা কেন পারছে না নিজের সবটুকু কালিমাকে মুছে ফেলতে? হয়তো নিজের ফুটিফাটা সংসারকে কোনোক্রমে গ্যাটিস মেরে চালিয়ে নিয়ে যেতে চায়। এছাড়া আর কোনো উপায় নেই হয়তো।
সুন্দরগঞ্জ বাজারটা বেশ বড়ো। বড়ো মানে বেশ ভালোই। সহদেব মাঝি অতি দ্রুততার সঙ্গে কিনে ফেলল সরকারবাবুর জন্য দামি ব্র্যান্ডের নিষিদ্ধ পানীয়। দোলন একটা কসমেটিকস দোকান থেকে নিয়ে নিল বিশেষ এক ধরনের পারফিউম। এটা নাকি সরকারবাবুর বিশেষ পছন্দের। আর যোগেশ? কেনাকাটা ব্যাপারটা বিশেষ সংক্রামক। এদিকে সহদেব মাঝির কড়া হুকুম, “যা করতে হবে তাড়াতাড়ি। সরকারবাবুর মুড একেবারে চলে গেলে আমাদের শেষ করে দেবে।”
যোগেশের কেবলই মনে হতে লাগল একটা বাসন কোসনের দোকান সামনেই থাকবে। মিলেও গেল। সেখান থেকে নিয়ে নিল একটা হাঁড়ি। অথচ তার খুব ইচ্ছে ছিল হাঁড়ির তলায় লেপ্টে থাকবে জমাট কালি। কিন্তু সে ধরনের হাঁড়ি তো কেউ বিক্রি করে না, এক পাগল ছাড়া।
নৌকা এবার তীরবেগে ছুটে যাচ্ছে নিত্যপুর ঘাটের দিকে। যোগেশের কেনা হাঁড়ি নিয়ে রীতিমতো মস্করার মজলিস বসল নৌকায়। সহদেব বলে, “এর মধ্যে বউ ঠিক করে ফেললে নাকি বাবুমশাই?”
“কেন বলতো?” যোগেশ পালটা প্রশ্ন করে।
“আরে হাঁড়ি কুড়ি কিনে সংসার পাতার মতলব আছে নাকি?” সহদেব মাঝি বলল।
লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠে যোগেশ বলে, “কী যে বলো।”
“তা বউটি কে? দোলন সুন্দরী নয় তো?” যোগেশ কিছু একটা বলতে চাইল, পারল না। তার হঠাৎ ঘুম পেতে শুরু করেছে। ঘুম পাওয়ার অবশ্যই যথেষ্ট কারণ আছে। কারণ মেঘ সরে গিয়ে আকাশে নক্ষত্র ফুটল কুচি কুচি। চাঁদ উঠেছে। যোগেশ ঢুলতে শুরু করে। সে অবস্থায় দোলনের বাতাস চিরে ফেলা ছেনালী হাসি শুনতে পায়, স্পষ্টভাবেই,
“বলো কী গো মাঝি। কী আপদ, শেষে কী না হাঁটুর বয়সী এক ছোকরার সঙ্গে…”
ঘুমে জড়িয়ে থাকা যোগেশ ঘুমরঙা ক্যানভাসে কটা শব্দ নীরবে আঁকে। এতটাই চুপি চুপি যে কেউ জানতে পারল না।
“দোলন, দোহাই তোমার। এসব ছেড়ে তুমি ঘোরতর সংসারী হও। আমি স্পষ্ট দেখেছি নিবিড় সংসারীভাব তোমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। তাই তো তোমায় কালিঝুলি মাখা হাঁড়ি উপহার দিতে চেয়েছিলাম। পেলাম না যখন তখন এই নতুনটাই নিও। এ দিয়ে চারটে সংসারী ভাত রেঁধো। দরকার হলে শুধু নুন ভাত খাও, তবু…”
এদিকে দোলন পারফিউমের বোতল থেকে কিছুটা অংশ তালুতে ঢেলে তার গন্ধ শোঁকে। তারপর তেতো মুখে বলে, “ম্যাগো, ছিঃ ছিঃ! কী সব জিনিস পছন্দ সরকারবাবুর।”
সহদেব মাঝি দাঁড় টানতে টানতে শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে বলে, “উপায় নেই সুন্দরী।”
সহদেবের কথায় যোগেশের স্বপ্ন-ক্যানভাস ভয়ানকভাবে কাঁপতে শুরু করে। পারলে সব রং ছিটকে গড়িয়ে যায়। যোগেশ স্পষ্ট দেখতে পায় সরকারবাবু প্রগাঢ় আগ্রহে দোলনকে বুকের কাছে টেনে নেয়। দোলনের হিলহিলে সরু কোমরে হাতের একটা পাক দিয়ে সজোরে জড়িয়ে ধরে টেনে শুইয়ে দিতে দিতে বলে, “বড্ড ওয়েট দিতে বলে, “বড্ড ওয়েট করিয়েছিস মাগী। আর একটু হলেই তো সব ফিনিশ হয়ে যেত।”
তারপর খুশিয়াল একজোড়া সাপের মতো আনন্দের আবেশে ডুবে যায় ওরা। অকল্পের সুখের মুখোশ দোলনের মুখে। যোগেশের প্রতিটি স্নায়ু নিংড়ে একটা জমাট বিষবাষ্পের উদ্ভব ঘটে। আর সেই বিষবাষ্প ঘুমন্ত শরীর-মনে জ্বালা ধরায়।
জোৎস্নার ঝড় উঠেছে। যোগেশ ঘুমোচ্ছে। রাতের স্তব্ধতা ভেঙে খিলখিল করে হেসে ওঠে দোলন-সুন্দরী। তখন মনে হয় পৃথিবীর এখনও অনেক লজ্জা পাওয়া বাকি আছে। লজ্জার ঘড়া কানায় কানায় পূর্ণ হলে বুঝি সব ভেঙে গুঁড়িয়ে গিয়ে আবার নতুন দিনের সূচনা ঘটে।
নৌকা চলেছে। বাতাস চিরে চিরে ছুটে চলেছে। নিত্যপুর বাজারের দশ-দশটা চালকলের মালিক সরকারবাবু ভোর রাত অবধি অপেক্ষা করে মাঝি ও মাগীকে একগাদা শাপ-শাপান্ত করে হতাশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। আসলে এ-নৌকা কোথায় গিয়ে থামবে তা কেউ জানে না। নিত্যপুর ও আরও অনেক ঘাট পেরিয়ে আদি-অনন্তকাল ধরে ছুটে মরবে। এই রাত রহস্যময়। এই রাত সফলতার। এরকম আরও অনেক সফল রাতের প্রত্যাশী যোগেশ।
বেশ কিছুকাল আগেকার কথা। পরপর তিনবার পলিটেকনিকে ভরতি হওয়ার এন্ট্রান্স পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার দরুণ যোগেশ রীতিমতো মুষড়ে পড়ে। সত্যি কথা বলতে কী, পলিটেকনিকে ভরতি হওয়া তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল। স্বপ্ন ছিল মফস্বলের কোনো গ্রাম ঘেঁষা জায়গার একটা কলেজে সে পড়তে যাবে। তারপর ছুটির দিনগুলোতে ইচ্ছেমতো ঘুরে বেড়াবে কলেজ পার্শ্ববর্তী নদী, জঙ্গল, পাহাড়ে, আরও কত জায়গায়। সেই সঙ্গে দুর্দান্ত রেজাল্ট করে কোর্সটা কমপ্লিট করবে। কিন্তু তা আর হল কৈ? এরপর পলিটেকনিক বাদে অন্যান্য পরীক্ষাতে বসলেও সেই একই ফলের পুনরাবৃত্তি। চাকরিবিহীন দীর্ঘ বেকার জীবনের দম-বন্ধ করা পরিবেশে ক্রমশ হাঁফিয়ে উঠছিল সে। মাঝখান থেকে একগাদা স্বপ্নের অপমৃত্যুতে যোগেশের মাথার দু-চারটে নাট বল্টুর প্যাঁচ ঢিলে হতে শুরু করে। অগত্যা এক মনোবিদের দ্বারস্থ হতে হয়। ডাক্তারবাবু এক সিটিংয়ে বেশ মিষ্টি করে যোগেশকে বলেছিলেন, “নিজের ইচ্ছে মতো স্বপ্নের জন্ম দিস। তারপর তাদের পরম যত্নে লালন পালন করিস। সেই স্বপ্নে যেন গ্রাম, নদী, জঙ্গল থাকে। সেই পলিটেকনিক কলেজ থাকে। তুই থাকিস, আমি থাকি, আমরা সবাই থাকি। স্বপ্নগুলোকে বারবার নাড়াচাড়া করলেই সব আগের মতো ঠিক হয়ে যাবে।”
