ফুসকুড়ি – প্রিয়া চক্রবর্তী
গ্যাস ওভেনের সুইচটা অন করে, লাইটারে একটা স্ট্রোক দিতেই মুহূর্তে জতুগৃহে পরিণত হল কাঠের তৈরি সুদৃশ্য রান্নাঘরটা। ডাইনিং স্পেস-সহ কুড়ি বাই কুড়ির ঘরটা দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল ওটার উদরস্থ সমস্তকিছু সমেত। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে চমকে উঠল বাগানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকজন। প্রথমটায় কিছু বুঝে উঠতে না পেরে স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে রইল ওই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে। কিছুক্ষণের মধ্যে ব্যাপারটা বুঝতে পারলেও আগুন নেভানোর কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে অসহায়ের মতো ছটফট করতে লাগল তারা। ঠিক যেমনভাবে ছটফট করছে রান্না ঘরের ভেতরে একটা জ্বলজ্যান্ত শরীর।
আজ অনেক দিন পর মনটা খুব ফুরফুরে লাগছিল। কারণ দীর্ঘ রোগভোগের পর একটু একটু করে সেরে উঠছিল রেবেকা। শারীরের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতেই মনটাও পরিষ্কার হচ্ছিল ধীরে ধীরে। সন্দেহ আর অবিশ্বাসের মেঘ কেটে উঁকি দিচ্ছিল ঝলমলে রোদের মতো একরাশ ভালোলাগা। এই প্রথমবার নিজের জন্মদিন পালন করতে ফার্ম হাউসে এসেছিল রেবেকা। ভেবেছিল আজ নিজের হাতে পায়েস রান্না করবে। ইচ্ছে ছিল নিজে সামনে বসে থেকে খাওয়াবে সবাইকে। তার প্রথমবারের এই চেষ্টাটাই শেষ বারের চেষ্টা হয়ে রয়ে গেল। তার চার বছরের বিবাহিত জীবনে এমন সুযোগ এর আগে কখনও আসেনি।
***
পায়ের পাতায় আঙুল ছোঁয়াতেই তীব্র যন্ত্রণায় চোখ মুখ কুঁকড়ে, কঁকিয়ে উঠল সুদেষ্ণা। দু-দিন আগে জিনিসটা প্রথম চোখে পড়েছিল, স্নান করার সময়ে। যত্ন করে সাবান মাখতে গিয়ে লক্ষ করেছিল ওর টুকটুকে ফর্সা ডান পায়ের পাতাটা। কখন যে তাতে পদ্ম ফুলের দুধে-আলতা রং ধরেছে সেটা আগে লক্ষই করেনি। সামান্য ফুলেও ছিল জায়গাটা। প্রথমে বুঝতে না পেরে, বডি স্পঞ্জ দিয়ে একটু জোরে ঘষা দিতেই শরীরটা ভেতর থেকে ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছিল সুদেষ্ণার। তখনই চোখে পড়েছিল ফুসকুড়ির ছোট্ট মুখটা। একটা বড়ো সাইজের ঘামাচির মতো জিনিসটা অতি সাধারণ হলে কী হবে? সুদেষ্ণার কাছে ওর শরীর সংক্রান্ত যে কোনো ছোটোখাটো সমস্যাই ওর দুশ্চিন্তার কারণ।
কোনোরকমে স্নান সেরে, চটপট গুগল করে সামান্য আস্বস্ত হল সুদেষ্ণা। নাহ্। খুব বিপদজনক কিছু নয়— ব্রণ জাতীয় কিছু একটা। দিন দুয়েকের মধ্যেই জিনিসটা পেকে ভেতর থেকে একটা ছোট্ট শাঁস বেরিয়ে যাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য রাখতে পারলে…. চিহ্ন হিসেবে একটা ছোট্ট গর্ত থাকবে দিন কয়েক। তারপর সেটাও মিলিয়ে যাবে ধীরে ধীরে। আর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলে … সেই অপরিপক্ক শাঁসটা চামড়ার নীচে কালো দাগ হয়ে থেকে যাবে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে। কথাগুলো ভেবে মনটা খারাপ হয়ে গেল সুদেষ্ণার। যদিও তখনই ঠিক করে ফেলল-জীবনে আরও একবার ধৈর্যের পরীক্ষা দেবে ও।
দেখতে দেখতে কেটে গেছে পুরো বারো-টা দিন। ফোলাটা পায়ের পাতা ছাড়িয়ে গোড়ালির ওপর পর্যন্ত ছড়িয়েছে। দুধে-আলতা পদ্মের রং পরিবর্তন হয়ে জায়গায় জায়গায় এখন রক্ত গোলাপের রং ধরেছে। ঘামাচির মতো ফুসকুড়ির মাথাটা এখন পুঁজ ভরে পাকা মটর দানার আকার নিয়েছে। সেই সঙ্গে দু-পায়ের পাতা জুড়েই জন্ম নিয়েছে শয়ে শয়ে ছোটো আঁচিলের মতো শক্ত মাংসের ঢিপি ও রং-বেরঙের ছোপ। পায়ের তলার চামড়া মোটা হয়ে তাতে দেখা দিয়েছে বড়ো বড়ো ফাটল। যন্ত্রণার থেকেও দুশ্চিন্তা বেশি করে গ্রাস করছে সুদেষ্ণাকে। প্রবল হতাশায় কোনো কোনো সময় আবার সব অনুভূতি ও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ওর পা-দুটো। এই ক-দিনে জনা পাঁচেক বড়ো বড়ো ডাক্তারের সঙ্গে কনসাল্ট করেছে। প্রত্যেকেই বার বার অষুধ বদলে, ওকে অবজার্ভেশনে রেখেছেন। যদিও কোনো ওষুধই সঠিক কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না সুদেষ্ণার। হবেই বা কী করে। কোনো ডাক্তার এখনও ধরতেই পারেননি আসল সমস্যাটা।
***
আজ বেলার দিকে পেটে ব্যথাটা একটু কম ছিল বলেই হয়তো অনেক দিন পর খিদের অনুভূতিটা বেশ জোরালো হয়েছিল। ক-দিন হল খিদে আর রুচি দুটোই একসঙ্গে ছুটিতে গেছে। তাই ইচ্ছেটাও কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। আজ খালি পেটে ছুঁচোটার ছটফটানি টের পেতেই খাওয়ার ইচ্ছেটাও জোর করে চেপে বসল সুদেষ্ণার মনে। কিন্তু মুস্কিল হল-ও কিছু খাবে না বলছিল… তাই শুভঙ্করের জন্যে সামান্য কিছু খাবার বানিয়ে, রান্নার মেয়েটা ছুটি নিয়ে চলে গেছে অনেক আগেই। অগত্যা! সুদেষ্ণা নিজেই কিচেনে ঢুকেছিল লাঞ্চের জন্যে কিছুটা বয়েল্ড চিকেন, কর্ন আর কিছু সবজি টস্ করে নেবে বলে। প্যানে সামান্য অলিভ ওয়েলে সব সামগ্রীগুলো দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে ওপর থেকে ছড়িয়ে দিচ্ছিল গোল মরিচ গুঁড়ো, সাদা ভিল, বিশেষ কিছু সস আর …
নাহ্, তখন থেকে অনেক চেষ্টা করেও সুদেষ্ণা কিছুতেই মনে করতে পারছে না ও প্যানে আরও কিছু দিয়েছিল কী না! ওর দৃঢ় বিশ্বাস ও আর কিছুই দেয়নি। কিন্তু সেই কথা মানতে নারাজ শুভঙ্কর। তার বক্তব্য সুদেষ্ণা অনামনস্কভাবে প্যানে এমন কিছু ছড়িয়েছিল যেটা দাহা। সেই কারণেই অনেকটা দূর থেকেও আগুন টেনে নিয়েছিল বস্তুটা। সেই কারণেই গ্যাসের ফ্লেম প্যানের ভেতরে ঘুরপাক খেতে খেতে প্রায় দু-ফুট ওপরে উঠে এসেছিল।
তবে কারণ যা-ই হোক না কেন, আচমকা অত আগুন দেখে কেমন যেন দিশেহারা হয়ে পড়েছিল সুদেষ্ণা। তাড়াহুড়ো করে পেছনে সরতে গিয়েই একটা কিচেন ফার্নিচারের কোণায় গুঁতো লেগেছিল সেই ডান পায়েই। সুদেষ্ণার মনে হয়েছিল ওর শরীরের সমস্ত অনুভূতিই যেন যন্ত্রণা হয়ে নেমে আসছে ওর পায়ে। অন্য কেউ হলে হয়তো হজম করে নিত ওই কষ্টটুকু কিন্তু সুদেষ্ণার ওই নরম, কোমল শরীরের পক্ষে আকস্মিক ওই আগুনের ঘটনা ও তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে এই আঘাতের অভিঘাত সহ্য করা রীতিমতো অসম্ভব।
ভাগ্যিস শুভঙ্কর তখন বাড়িতেই ছিল। সুদেষ্ণার চেঁচামেচিতে দৌড়ে এসে আগুন নিভিয়েছিল শুভঙ্করই। সুদেষ্ণাকে ধরে বেড রুমে নিয়ে যাওয়ার সময় শুভঙ্কর বার বার জিজ্ঞেস করছিল, “উষ্ণা তুমি হঠাৎ কিচেনে গিয়েছিলে কী করতে? রান্নার মেয়েটা কোথায় গেল? কীভাবেই বা হল এসব? ঠিক করে সব বল আমায়।” সুদেষ্ণা তখন একটা কথাও বলতে পারেনি। হতবুদ্ধি হয়ে বসেছিল। শুভঙ্করের মনে হয়েছিল ‘একেই অসুস্থ; তার ওপর আজকের অ্যাক্সিডেন্টে নিশ্চয়ই খুব মানসিক ধাক্কা পেয়েছে সুদেষ্ণা!’ সে সযত্নে অনেকক্ষণ স্ত্রী-র পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে, স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছিল। সুদেষ্ণা তাতেও কোনো কথা বলছে না দেখে… কপালে হালকা একটা চুমু এঁকে, ওকে শুইয়ে দিয়ে শুভঙ্কর বলেছিল, “এখন বিশ্রাম কর। তুমি আগে একটু সুস্থ হয়ে ওঠো, পরে কথা বলব এই নিয়ে।”
সুদেষ্ণা জানে শুভঙ্কর বুঝতেই পারেনি সমস্যাটা আসলে কতটা জটিল। সত্যি বলতে সুদেষ্ণা নিজেও বুঝতে পারছে না যে সমস্যাটা ঠিক কতটা জটিল। কারণ, ওই সময় যে ঠিক কী ঘটেছিল… সেটা বুঝিয়ে বলার মতো সত্যিই কিছু মনে করতে পারছে না সুদেষ্ণা।
শুভঙ্কর ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেই উঠে বসেছিল সুদেষ্ণা। ততক্ষণে খিদের জ্বালা আর ইচ্ছে দুটোই চাপা পড়েছে পায়ের জ্বালা যন্ত্রণার কাছে। আঙুলটাও ছোঁয়ানো যাচ্ছে না। অবশ্য হাতের তালু আঙুলের চামড়া কেমন যেন খসখসে, ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। সাদা ফ ধরা খোয়াটে নখগুলো দেখে সুদেষ্ণা আজকাল নিজেই চিনতে পারে না এত যত্নে লালিত ওর প্রিয় শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো। শুধু তাই-ই নয়; আঙুলগুলির অনুভূতিও কমে আসছে। বাধ্য হয়েই একটা মেক-আপ ব্রাশ দিয়ে নতুন অয়েনমেন্টা লাগাতে লাগাতে ও মনে মনে বলল, “শুভঙ্কর বাগচী আমার ওপরের সুন্দর, কোমল রূপের খোলস দেখে ভাবছে আমি বুঝি খুব নরম মনের একটা পুতুল। আসলে সুদেষ্ণা মিত্র যে ওইটুকু আগুন দেখে ভয় পাওয়ার মেয়ে নয়। সে-কথা শুভকে কোনোদিনও জানতে বুঝতে দেব না আমি!”
মলম লাগানো শেষ করে চোখ বুজে বসে মনে করার চেষ্টা করল রান্না করার সময় কেন অতটা ভয় পেয়েছিল। ও। কিছুক্ষণের ব্যর্থ চেষ্টা পর বিরক্ত সুদেষ্ণা স্বগতোক্তি করল, “কেন জানি না — কিছুতেই মন আর মগজের সংযোগ করতে পারছি না! যা দেখেছি বলে মনে হচ্ছে, জানি তা অস্তিত্বহীন। তাই তেমন কিছু দেখা অসম্ভব! তাহলে… তাহলে ঠিক কী দেখেছি আমি?”
মলমটা লাগানো শেষ হতেই একটা ঠান্ডা জ্বালাময় কুটকুটানি ছড়িয়ে পড়ল ওর পায়ের পাতা জুড়ে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই অনুভূতিটা যেন শিরদাঁড়া বেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলল মগজের দিকে। ভাবনাগুলো ছেড়া মেঘের মতো মিলিয়ে গিয়ে সেই জায়গা দখল করছে ঠান্ডা শিরশিরে অনুভূতিটা। সুদেষ্ণার মনে হল মগজ বেদখল হওয়ার আগে ওর ঘুমিয়ে পড়া উচিৎ। যদিও ঘুমোতে চাইলেই ঘুমোতে পারে না সুদেষ্ণা।
***
শুভঙ্কর যাই বলুক আর যতই ওর কানের কাছে একশ আটের ঘুম পাড়ানি নামতা পড়ুক না কেন – সুদেষ্ণা জানে কিছুতেই ঘুমের ইনজেকশন ছাড়া ঘুমাতে পারবে না ও। সেদিনের পর থেকে এক দিনও স্বাভাবিক ভাবে ঘুম আসেনি ওর। গত কয়েকমাস ধরে ওর ঘুমপরিরা বন্দি হছে আছে ওই ইনজেকশনের এম্পুলগুলোতে।
বিছানায় পা ছড়িয়ে বসে আছে সুদেষ্ণা। কিছুতেই নামতে ইচ্ছে করছে না বিছানা থেকে। একবার গলা তুলে শুভঙ্করকে ডাকল। সারা পেল না। তবে কিছুটা দূরে ল্যাবেই সে রয়েছে, সেটা ও দিব্যি টের পাচ্ছে। সুদেষ্ণা জানে, নিজের কাজে মশগুল শুভঙ্কর সহজে এদিকে আসবে না। কাজ পাগল লোকটার মনেই থাকবে না অসুস্থ স্ত্রী-র কথা। তাতে অবশ্য সুদেষ্ণার বিশেষ কিছু যায় আসে না। স্বামীসঙ্গ-র থেকেও নিজের সঙ্গে একলা যাপন ওর বেশি পছন্দ।
বেড সাইড ডেস্কের সিক্রেট চেম্বার থেকে একটা অ্যাম্পুল বার করল সুদেষ্ণা। কৌতূহল বশতঃ অন্য কারও জিনিসে হাত দেয় না শুভঙ্কর। এটা ওর বড়ো গুণ। ইনজেকশনটা রেডি করে থাইতে পুষ করতে যাবে, এমন সময়ে পেটের খিদেটা আবার মোচড় মেরে জ্বলে উঠল। এদিকে জিভের তামাটে স্বাদটা দিন দিন বেড়েই চলেছে, তাই যে-কোনো খাবারই আজকাল অখাদ্য মনে হয় সুদেষ্ণার। এমন অবস্থায় উচ্চ পুষ্টি গুণ সম্পন্ন খাবারই ভরসা। যা কোনোরকমে অল্প পরিমাণে পেটে গেলে শরীর আর সহজে ভাঙবে না।
সুদেষ্ণাকে এবার নামতেই হল বিছানা ছেড়ে। মেঝেতে পা রাখতেই ও আবার কঁকিয়ে উঠল। পা-টা আরও ফুলে উঠেছে। নিজের আলমারিটায় সবে চাবি ঢুকিয়ে ঘোরাতে যাবে, এমন সময় শুভঙ্করের জুতোর শব্দ সুদেষ্ণার কানে এল। ঠিক তার পরেই ওর গলা শোনা গেল। উত্তেজিত হয়ে ফোনে কথা বলছে কারও সঙ্গে।
দরজা খুলে একবার বাইরে উকি মেরে সুদেষ্ণা দেখল শুভঙ্কর কথা বলতে বলতে চলে যাচ্ছে বাড়ির পেছন দিকের বাগানে। এবার সুদেষ্ণা নিশ্চিন্তে আলমারি খুলে, জামাকাপড়ের ভেতর থেকে বার করে আনল একটা ছোট্ট শিশি।
গাঢ় খয়েরি রঙের কাচের শিশি থেকে একটা ক্যাপসুল গলায় ফেলেই খানিকটা জলের সঙ্গে ঢক করে গিলে নিল সুদেষ্ণা। জায়গামতো রেখে দেওয়ার আগে শিশিটা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখেতে লাগল—শিশিতে আর ক-টা ক্যাপসুল আছে?
মাত্র গোটা দশেক লাল সাদা ক্যাপসুল দেখে দুশ্চিন্তায় পড়ল সুদেষ্ণা। শুভঙ্করের অনুপস্থিতিতে ঘুমের ইনজেকশন ও নিজের ব্যক্তিগত প্রয়োজনের জিনিস অনলাইনে আনিয়ে নেয় সুদেষ্ণা। কিন্তু এই ক্যাপসুলটা শেষ হলে কীভাবে জোগাড় করবে? সেটাও সুদেষ্ণার দুশ্চিন্তার একটা বড়ো কারণ। কাচের শিশিটার গায়ে কোনো লেবেল নেই। শিশিটার কোথাও ওষুধটার নামও লেখা নেই। এই বিষয়ে কোনো কিছু শুভঙ্করকে জিজ্ঞেস করতেও পারবে না ও। জিজ্ঞেস করতে গেলে নিজেকেই অনেক পালটা প্রশ্নের শিকার হতে হবে, যে সব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে গেলে বেরিয়ে পড়তে পারে এমন কয়েকটা বিষয়…. যা সুদেষ্ণা অনেক সাবধানে লুকিয়ে রেখেছে নিজের মনের গুপ্ত কুঠুরিতে। যে কুঠুরির চাবিতে কারও হাত পড়লেই সর্বনাশ!
***
এ বাড়িতে আসার প্রথম দিনই এই ক্যাপসুলটার কথা শুভঙ্করের কাছ থেকেই জেনেছিল সুদেষ্ণা। শুভঙ্কর শিশিটা ওর হাতে দিয়ে প্রতিদিন সকালে একটা করে খেয়ে নিতে বলেছিল, অন্যান্য ওষুধ খাওয়ানোর আগে। আর বলেছিল, সারাদিনের নিউট্রেশনের ঘাটতি পূরণ করবে এই এক একটা ক্যাপসুল।
প্রায় পনেরো বছর নার্সিং পেশার সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে কম বেশি সব ধরনের ওষুধের সঙ্গেই পরিচয় আছে সুদেষ্ণার। ওর অভিজ্ঞতার কিছুটা খাতা-কলমে হলেও বেশিটাই হয়েছে হাতে-কলমে। অনেক রকম ভিটামিন, সাপ্লিমেন্ট-এর বিষয়েও জানা আছে ওর। তবে এই রকম ক্যাপসুল সম্বন্ধে কোনো ধারণাই ছিল না এতদিন।
দু-তিন দিনের মধ্যেই ক্যাপসুলের ভেলকি মুগ্ধ করেছিল শরীরটা ওষুধ নেওয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে যেন জীবন ওকে। এক এক দিন কোনো রকম ধুঁকতে থাকা পেশেন্টের ফিরে পেত। অনেকটা সুস্থ মতো হতো। কোনো কোনো দিন আবার ক্যাপসুল নেওয়ার পর একরকম অচেতন হয়েই পড়ে থাকত বিছানায়। কারও ডাক শুনে চোখ খুললেও এমনভাবে তার দিকে তাকিয়ে থাকত যেন সেই চোখে দৃষ্টি নেই। ওই রুগ্ন শরীরটা অত কষ্টের ধকল নিতে পারত না বেশিক্ষণ। তাই হয়তো মাঝে মাঝেই সে বেঁচে থাকার ইচ্ছা, চেষ্টা সবই ছেড়ে দিত।
সেই সময়ে ক্যাপসুলটার নাম, দাম বা কীভাবে সংগ্রহ করতে হয় সে সব নিয়ে কোনো প্রশ্ন করার প্রয়োজন মনে করেনি সুদেষ্ণা। ওষুধটা যে কিছুদিনের মধ্যে ওর নিজেরই দরকার পড়বে, সেটা ও কল্পনাও করতে পারেনি। ভাগ্যিস বুদ্ধি করে সেই সময়ে….
“শুভঙ্করকে কী ক্যাপসুলটার কথা একবার জিজ্ঞেস করব? ওকে এনে দিতে বলব আরও এক শিশি?” বেখেয়ালে কথাটা ভাবলেও… পরক্ষণেই কী যেন মনে করে শিউরে উঠল সুদেষ্ণা। কেবলমাত্র নিজের কানে পৌঁছানোর মতো নীচু গ্রামে, ধমক দেওয়ার সুরে ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এল, “না না… তা কী করে হয়! শুভঙ্কর যদি কিছু সন্দেহ করে?”
ক্যাপসুল জোগাড়ের ভাবনা, শরীরের কষ্ট… সব কিছু ছাপিয়ে হঠাৎই সুদেষ্ণার মন-মগজ দখল করতে শুরু করেছে একটা ভয়! একটা বিশেষ ভয়। কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে পড়ার ভয়। এই সবের মাঝেই ইনজেকশনটা পুশ করে ও বিছানায় ফিরে এল। এমনিতেই আজ ক্যাপসুলটা বাওয়ার পর থেকে ওর শরীর মন ভীষণ রকম অবসন্ন, অবসাদগ্রস্ত।
জনপ্রিয় কিছু ঘুমপাড়ানি গানের কলি মনে করতে করতে একটা সময়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল সুদেষ্ণা। ঘুমের মধ্যেই হঠাৎ মনে হল -প্রচণ্ড তাপের বলয় ঘিরে রেখেছে ওকে। বলয়টা ভ্রমণ ছোটো হচ্ছে। মনে হল, সেই আঁচে ওর শরীরটা পুড়তে শুরু করেছে। চুল ও মাংস পোড়া গন্ধে ভারী হয়ে উঠছে ঘরের বাতাস। অস্বস্তি বাড়ছে। হঠাৎই চমকে ঘুম ভেঙে চোখ খুলতেই সুদেষ্ণা আবার দেখল…..
জিনিসটা কিন্তু কোনো ভৌতিক গল্পের চরিত্রের মতো আচমকা দেখা দিয়ে, বিভ্রান্তি কাটার আগেই মিলিয়ে গেল না! বরং সেটা স্থির হয়ে ওর মুখের সামনে ভেসে রইল বেশ কিছুক্ষণ। সুদেষ্ণা সহজে ভয় পাওয়ার মানুষ নয়। তবুও এবার কিছুটা ভয় পেল। ভয়ের থেকেও বেশি বিস্ময়ে চিৎকার করার কথা ভুলেই গেল। হঠাৎ এসিটা চালু হল দীর্ঘশ্বাসের শব্দে একরাশ গুমোট হাওয়া বার করে। সেই শব্দেই চোখের পলক পড়ল এবং তাতেই আচ্ছন্ন ভাবটা কাটল সুদেষ্ণার। সেই ফাঁকে চোখের সামনে থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল জিনিসটা। ‘এতক্ষণ লোডশেডিং ছিল বলেই ওর সারা শরীর অসহ্য জ্বালাপোড়া করছিল’— অন্য সময়ে হয়তো এটাই ভাবত সুদেষ্ণা। কারণ ছোটো থেকেই একদম গরম সহ্য করতে পারে না ও। গরমের পাশাপাশি লোকের কথাও খুব জ্বালিয়েছে ওকে। সবাই ব্যঙ্গ করে বলত, ‘ভিখারীর ঘরের রাজকুমারী।’ কিন্তু আজ ও কিছুতেই এই সহজ ভাবনাটাকে মনে জায়গা দিতে পারল না।
***
কারেন্ট এসেছে অনেকক্ষণ। যদিও সুদেষ্ণার কপালে ঘামের বিন্দুগুলো শুকোনোর বদলে আরও ভারী হয়ে, গড়িয়ে এসে বালিশ ভেজাচ্ছে। গায়ের গাউনটাও ভিজে উঠেছে। সুদেষ্ণা রিমোট টিপে আরও দু-ঘাট কমিয়ে, ষোলোতে করে দিল এসিটা। ইনজেকশনের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি এখনও, তাই আবার তন্দ্রাচ্ছন্ন হল সুদেষ্ণা।
তন্দ্রা ভাঙল দরজায় টক্ টক্ শব্দে। ঘুম জড়ানো গলায় সুদেষ্ণা বলল, “খোলাই আছে।” দরজা ঠেলে ঘরের ভেতরে পা দিতেই কেঁপে উঠল শুভঙ্কর। বলল, “কী সর্বনাশ! মনে হচ্ছে লাদাখে চলে এলাম!” হাতের ট্রে-টা বেড-সাইড টেবিলে নামিয়ে, আগে লাইট জ্বালাল। তারপর এসি অফ করে স্ত্রী-র পাশে বসল শুভঙ্কর। বরের ওই আধা তরলের ধাতব স্বাদে বমি উঠে এল সুদেষ্ণার। মন রাখতে ওর আনা দু-চামচ গরম স্যুপ মুখে তুলতেই
আজ অনেকটা ঘুমিয়ে শরীর কিছুটা ঝরঝরে লাগছে। রাতে যে আর ঘুম হবে না, সেই ব্যাপারে সুদেষ্ণা নিশ্চিত। তাই কানে ইয়ার প্লাগ গুঁজে ফোনে একটা সিরিজ দেখবে ভাবছে… ঠিক তখনই হাতের বইটা বন্ধ করে কিছুটা জোরের সঙ্গেই তাকে কাছে টেনে নিলো শুভঙ্কর। এরকম আচরণে সুদেষ্ণা কেবল ব্যথাই পেল না; রীতিমতো বিস্মিতও হল।
ওদের রেজেস্ট্রি ম্যারেজ হয়েছে প্রায় তিনমাস। যদিও সুদেষ্ণা শুভঙ্করকে নিজের বিছানায় টেনেছে আরও ছ-মাস আগে। তবে আজকের মতো এরকম মুডে শুভঙ্করকে এর আগে কখনও দেখেনি ও। লাইট অফ না করেই নিজেকে রাত পোশাক থেকে উন্মুক্ত করতে শুরু করল শুভঙ্কর। এতদিনে এই প্রথমবার। এমনকি ফুলস্লিভ ইনারটাও খুলে ফেলল সে। যেটা স্নানের সময় ছাড়া সর্বক্ষণ তার গায়ে লেগে থাকে আর এক পরত চামড়ার মতো। অনেক অনুরোধ সত্ত্বেও এতদিনে সুদেষ্ণার সামনে সেটা খোলেনি শুভঙ্কর। সম্ভবত এক ধরনের হীনমন্যতা থেকেই কারও সামনে নিজের শরীর অনাবৃত করতে পারে না। তাহলে আজ হঠাৎ…’ কথাটা মাথায় এলেও আর বেশি কিছু ভাবার আগেই শুভঙ্করের সম্পূর্ণ উন্মুক্ত শরীরটা দেখে আবারও গা গুলিয়ে উঠল সুদেষ্ণার। ও তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে মুখ ঢেকে বমি চাপার চেষ্টা করল।
***
আজ যদিও কষ্ট কিছুটা কমই হল প্রথম দিনের তুলনায়। এই বাড়িতে আসার কদিন পরের কথা। বিশেষ ওই দিনটার কথা কোনো দিনই সুদেষ্ণার পক্ষে ভোলা সম্ভব নয়। সেদিন শুভঙ্কর যখন স্নান সেরে বাথরুম থেকে বেরোচ্ছিল, তখন ইচ্ছে করেই কৃত্রিম ব্যস্ততা নিয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছিল সুদেষ্ণা। উদ্দেশ্য ছিল শুভঙ্করের নজরে পড়া। তখনই শুভঙ্করের খোলা বুক পিঠ দেখে, মুখ কুঁচকে চোখ বুজে নিয়েছিল সুদেষ্ণা। ওরকম ভয়ংকর সোরাইসিস ও আগে কখনও কারও শরীরে দেখেনি। ওরকম দগদগে ঘেয়ো শরীরটা দেখে পেটের নাড়িভুড়ি ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছিল সুদেষ্ণার।
অপ্রস্তুত শুভঙ্কর তাড়াহুড়ো করে বাথরোবটা গায়ে জড়িয়ে পরিস্থিতি সামলে ওঠার আগেই, নিজেকে সামলে নিয়েছিল সুদেষ্ণা। নিতেই হতো— কারণ শুভঙ্করের সামাজিক প্রতিপত্তি ও ব্যাংক ব্যালেন্সের সামনে তার এই চর্মরোগ যে খুবই তুচ্ছ বিষয়, সেই হিসেবটা অত অল্প সময়েই কষে ফেলেছিল সুদেষ্ণা। তাছাড়া… জীবনে কিছু পেতে হলে, বদলে যে কিছু বলিদান দিতেই হয়। এই চিরন্তন সত্যটা সঠিক সময়ে উপলব্ধি করতে কখনওই ভুল করে না সুদেষ্ণার মতো সুযোগসন্ধানী মেয়েরা।
শুভঙ্কর ব্যস্ত ও বিস্মিত হয়ে যখন সুদেষ্ণার মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চেয়েছিল, “হঠাৎ কী এমন দরকার পড়েছে যে আপনি এভাবে সোজা আমার বেডরুমে চলে এসেছেন?” সুদেষ্ণার চোখে তখন একরাশ মুগ্ধতা। শুভঙ্কর নিজের প্রতি এরকম মুগ্ধ দৃষ্টি শেষবার দেখেছিল প্রথম যৌবনে, কলেজ জীবনে। এরপর তার জীবনে গ্রহণ হয়ে দেখা দিয়েছিল এই চর্মরোগ। শুরুটা হয়েছিল কোমরের নীচ থেকে। ধীরে ধীরে বুক, পিঠ ছাপিয়ে গলার কাছে উঠে এসেছে বিরক্তিকর প্যাচটা। নিয়মিত অষুধ প্রয়োগে মাঝে মাঝে বাগে আনা গেলও রোগটা যে একেবারে নির্মূল করা কোনো ওষুধের কাজ নয়, সেটা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন ডজন খানেক চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ। এমনকি মাঝে মাঝে এর লাগাম ছাড়া বাড়বাড়ন্তও যে সারাজীবন মেনে নিতে হবে, সে কথা জেনে প্রথম দিকে খুবই মনমরা হয়ে পড়েছিল সদ্য যৌবনে পা রাখা ছেলেটা।
শুভঙ্করের সাফল্য, প্রতিষ্ঠা একধারে যেমন মানুষের প্রশংসার কারণ, অন্যদিকে সেটাই আবার ঈর্ষারও কারণ। তা সত্ত্বেও তার পেছনে যে সবাই নাক সিটকায়… সে কথাও শুভঙ্কর খুব ভালো করেই জানে। এমনকি তার দিকে সরাসরি কেউ তাকায় না পর্যন্ত! তাই এটাই শুভঙ্করের জীবনের সবচেয়ে বড়ো হতাশা ও দুঃখের কারণ।
শুভঙ্কর আরও একবার প্রশ্নটা রিপিট করার পর, কৃত্রিম মুগ্ধতার পরতটা চোখ থেকে সরিয়ে… একটি ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া ভেজা বিড়ালের মতো অসহায় আদো আদো গলায় সুদেষ্ণা বলেছিল, “না মানে… স্যার আপনাকে অনেকবার আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী করব? মানে ওই, রিং করেছি। ফোনে না পেয়ে কিছুটা বাধ্য হয়েই… আসলে ম্যাডামকে আমি ঠিক… আপনি একটু আসুন প্লীজ!”
সেই দিনের পর থেকে আজ পর্যন্ত সুদেষ্ণার জীবনটা যেন একটা রূপকথার গল্প। না রূপকথা নয় বরং বলা ভালো, উঁচু নীচু পথে সবেগে ছুটতে থাকা রোলার কোস্টারের মতো গতিময় একটা টান-টান থ্রিলার গল্প।
***
পূর্বরাগের অন্তিম পর্যায়ে এসে রমনে প্রস্তুত শুভঙ্করের শরীরটা যখন তার স্ত্রীর শরীর পিষছে, সুদেষ্ণার অধরের আকর্ষণে শুভঙ্করের মাথা আরও একবার নেমে এসেছে… ঠিক তখনই আবার চিৎকার করে উঠল সুদেষ্ণা। ঠিক দুপুরের মতো। দুই শরীরী আকর্ষণ মুহূর্তেই বিকর্ষণে বদলে গেল। হতচকিত শুভঙ্করের শরীরটা মুহূর্তেই ছিটকে গেল সুদেষ্ণার ওপর থেকে। নিজের সাবলীলতা হারিয়ে, অপ্রস্তুত শুভঙ্কর জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে ঊষ্ণা? কী হয়েছে বলো আমায়। এভাবে চিৎকার করলে কেন?” একবার নয় বারবার একই প্রশ্ন করেও ঠিকঠাক কোনো উত্তর পেলো না শুভঙ্কর, সুদেষ্ণার কাছ থেকে। অগত্যা… কিছুটা বিরক্তি ও অভিমান নিয়ে পাশ ফিরল সে। তারপর ঘুমিয়েও পড়ল কয়েক মিনিটের মধ্যে।
“যা দেখে আমি বার বার ভয় পাচ্ছি, সেই বিষয়টা কী শুভঙ্করকে বলা ঠিক হবে? ও কী আদৌ বিশ্বাস করবে আমার কথা? কেনই বা করবে? একটা আগুনের মুখ বার বার আচমকা দেখা দিচ্ছে আমাকে। কেবল দেখাই নয়; রীতিমতো সেই তাপ অনুভব করছি আমি! এসব তো আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না। কীভাবে আশা করি যে শুভঙ্কর আমার কথা বিশ্বাস করবে? সেই শুভঙ্কর… যার দিনের সিংহভাগ সময় কাটে কলেজ আর নিজের ল্যাবে, নানা রকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে! আমার মনে হয় অসুস্থ শরীর আমার মনটাও দুর্বল করে দিয়েছে! সেই সুযোগে মনে সিঁদ কাটছে এসব আবোল-তাবোল ভাবনাগুলো!”
সুদেষ্ণা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ঠিক করল, “কোনো রকম উলটো পালটা চিন্তার জায়গা দেব না মাথায়। কিছুতেই না!” মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গেল। জোর করে চোখ বুজে পড়ে রইল বিছানায়। ও যদিও ভালো করেই জানে এটা ঘুমিয়ে পড়ার ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়! সিনেমা বা অন্য কিছু দেখার ইচ্ছেটা আগেই নষ্ট হয়ে গেছে।
সুদেষ্ণার খুব ইচ্ছে করল কিছুক্ষণ ব্যালকনিতে গিয়ে চুপ করে একা বসে থাকতে। যদিও ভালো করেই বুঝতে পারছে, ওই পর্যন্ত শরীরটাকে টেনে নিয়ে যাওয়ার মতো ক্ষমতা ওর নেই। তাও বিছানায় বেশিক্ষণ আর পড়ে থাকতে পারল না সুদেষ্ণা। ওর পেটের ভেতরে যন্ত্রণা সহ্যের সীমা ছাড়িয়েছে। সেই সঙ্গে অনুভব করছে ঊর্ধ্বমুখী ও নিম্নমুখী বেগ। অনেক কষ্ট বিছানা ছেড়ে উঠতে গিয়ে বুঝতে পারছে ওর হাত এবং পা-এর পাশাপাশি সারা শরীর প্রায় অসাড় হয়ে গেছে। দু-একবার নাম ধরে ডাকার চেষ্টা করল শুভঙ্করকে কিন্তু তার নাকের ডাক ছাপিয়ে সুদেষ্ণার ডাক সে শুনতে পেল না। সুদেষ্ণা জানে শুভঙ্করের কাঁচা ঘুম ভাঙানো সহজ কথা নয়। তাই আর সময় নষ্ট না করে ও নিজেই বাথরুমে যাওয়ার চেষ্টা করল।
***
“নার্সের পেশায় থাকাকালীন নিজের মহামূল্য পুঁজি—রূপ এবং যৌবনের বদলে অনেক প্রতিষ্ঠিত ডাক্তারকে সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেছি, নিজের বিলাসবহুল জীবন যাপনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ ও ভবিষ্যত সুরক্ষিত করার চেষ্টায়। যদিও সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে বার বার। যে কয়েকজন স্বেচ্ছায় সিঁড়ি হয়েছিল, সেই সিঁড়িগুলোর উচ্চতা ছিল বিছানা পর্যন্ত।
বছরখানেক আগের একটা অতি সাধারণ দিনের অতীব সাধারণ ফোনকল বদলে দিয়েছিল আমার ভাগ্য। পঁয়তাল্লিশ ঊর্ধ শুভঙ্করের অসুস্থ স্ত্রী-র দেখাশোনার জন্যে একজন দক্ষ নার্স হিসেবে ডাক পড়েছিল আমার। ওর অসুখটা আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না একজন অভিজ্ঞ নার্স হয়েও। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই ওকে বড্ড অসহা লাগতে শুরু করেছিল। সারাদিন পেটে ব্যথা, মাথা ব্যথা, গলা বুক জ্বালা, অক্ষুধা, অরুচি, স্মৃতিভ্রম, মতিভ্রম, রুক্ষ, রুগ্ন, খিটখিটে.. উফ্! আরও যে কত কী! যদিও একজন নার্সের কাছে তার পেশেন্টের সমস্যা কখনওই ব্যক্তিগত বিরক্তির কারণ হওয়া উচিত নয়! সসম্মানে এতকাল সেই নিয়মই মেনে চলেছি। এত বছরের সেই নিয়ম-নিষ্ঠায় ফাটল দেখা দিল এখানে এসে। ওর সেবা করতে গিয়ে। যা এর আগে কখনও হয়নি। তেমন কিছু হলে নিশ্চয়ই পেশাগত দিক থেকে আমার এতটা সুনাম থাকত না! এত বড়ো বড়ো ডাক্তাররা পেশেন্ট পার্টিকে ব্যক্তিগতভাবে আমার রেফারেন্সও দিতেন না!
এই বাড়িতে কয়েকদিন কাটতে না কাটতেই এক অদ্ভুত রকম অস্বস্তি শুরু হল। প্রথটায় ধরতে না পারলেও, কদিনের মধ্যেই আমি বেশ বুঝলাম— নিজের শূন্যতা থেকেই আমার মনে এক ধরনের ঈর্ষা জন্ম নিয়েছে যা খুব কষ্ট দিচ্ছে, কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে আমায়। আরও কষ্টকর হল, ঈর্ষার কারণটা দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবার সামনে এসে আমার মনের ভেতরে জ্বলন্ত টিকের আগুনটাকে উস্কে দিয়ে যাচ্ছিল।
এই বয়সেও শুভঙ্করের পৌরুষে একটুও ভাটা পড়েনি। নিজে জাহির না করলেও সেটা ওর আচরণ, ওর শরীরী ভাষায় আপনা থেকেই আমার চোখে ধরা পড়ছিল। তাছাড়া যেখানে শুভঙ্করের মতো সুদর্শন পুরুষ এখনও দিব্যি অষ্টাদশী যুবতীদের রাতের ঘুম ওড়াতে পারে— সেখানে সেই শুভঙ্করের পাশে ওর অসুস্থ স্ত্রীকে একেবারেই বেমানান মনে হতো! কষ্ট হতো! খুব কষ্ট…
আরও কষ্ট হতো এই ভেবে যে আমি যেখানে রূপে, শুনে শুভঙ্করের জীবনসঙ্গিনী হওয়ার যোগ্যতায় ওর স্ত্রী-র থেকে অনেক কদম বেশি এগিয়ে…. সেখানে কী না আমি সেই অসুস্থ মহিলার সেবিকা মাত্র। আর তার কারণ কেবল আমার দুর্ভাগ্য! হ্যাঁ, দুর্ভাগ্য বৈ আর কী? আমি তো বরাবরই নিজের ভাগ্যের হাতে পরাস্ত।
শুধু যে যৌন ঈর্ষা, তা নয়! শুভঙ্করের সামাজিক ও আর্থিক অবস্থানও আমায় আকর্ষণ করছিল। আমার মনে হয়েছিল, যে-কোনো উপায়ে শুভঙ্করের নেক নজরে পড়তে পারলে বাকি জীবনটা আমি নিশ্চিন্তে কাটাতে পারব, ঠিক যেমন একটা জীবন আমার বরাবরের স্বপ্ন। আরও একটা বিষয়, যেটা কেবল আমিই নই— প্রতিটা মেয়ের কাছেই অত্যন্ত সৌভাগ্যের … সেটা হল-স্ত্রীর প্রতি স্বামীর যত্ন ভালোবাসা।
আমার আরও মনে হয়েছিল, রূপে, গুণে যে শুভঙ্করের নখের যোগ্য নয়; এমন একজন অসুস্থ মহিলার প্রতি যে ব্যক্তির এতটা আবেগ, কর্তব্যবোধ… সেই মানুষটা আমার মতো একজন সুন্দরী বুদ্ধিমতি সুস্থ যুবতীকে তাহলে কতটা ভালোবাসতে পারে? সেদিনই মনে মনে ঠিক করে ফেলেছিলাম— পৃথিবীর সমস্ত সুখ পেতে হলে আমায় ঠিক কী করতে হবে!”
আজ এই পর্যন্ত লিখে ডায়েরিটা বন্ধ করল শুভঙ্কর। ইদানিং দিনের বেশিটা সময় সুদেষ্ণার সঙ্গেই কাটায় সে। নিজের হাতেই অসুস্থ স্ত্রী-র সেবা করে। এবার আর ভরসা করে কোনো সেবিকাকে বাড়িতে রাখেনি সে। ঘর পোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয়ে সাবধান হয়! তেমনই শুভঙ্কর স্ত্রী-র সেবা করতে আর কোনো নার্সকে বাড়িতে রাখতে ভয় পায়। সে নিজেই সর্বক্ষণ স্ত্রী-র সেবায় হাজির থাকে। এমনকি প্রায় সারারাত শুভঙ্কর সুদেষ্ণার পাশে একটা ছোট্ট রাইটিং ডেস্ক টেবিলে বসে, লেখালেখি করেই কাটিয়ে দেয় ততক্ষণ, যতক্ষণ না সুদেষ্ণা ঘুমিয়ে পড়ে। কিছুদিন যাবত একটা নতুন শখ শুভঙ্করকে নিজের অসুখী দাম্পত্যজীবনটা ভুলিয়ে রাখতে সাহায্য করছে। সেটা হল গল্প লেখার সখ। শখটার জন্মও হয়েছে খুবই অদ্ভুত একটা পরিস্থিতিতে।
বেশ কিছুদিন ধরে সুদেষ্ণার হার্ট, লিভার, কিডনি, ত্বকের মতো বিভিন্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গের পাশাপাশি মস্তিষ্কটাও ঠিকঠাক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। যে-টুকু কাজ করছে, সেটুকু ওকে সাহায্য করে স্মৃতিচারণ করতে।
নিখাদ অনুশোচনা ও তীব্র অপরাধবোধ থেকে সারাদিন অসংলগ্ন কথাবার্তা যেটুকু যা বলে… তাতে অতীতের কেচ্ছা ও কুকীর্তির কথাই বেশি।
প্রথম কদিন শুভঙ্কর রাইস টিউবের সাহায্যে তরল খাবার খাওয়ানোর সময় সুদেষ্ণার অস্পষ্ট এলোমোলো কথাগুলোয় কান না দিলেও, বার বার একই কথা শুনতে শুনতে বিষয়টা আস্তে আস্তে পরিষ্কার হচ্ছিল তার কাছে। কথাগুলো ঘটনা পরম্পরায় সাজিয়ে একে একে দুই আর দুয়ে দুয়ে চার করতে কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না বিদ্বান প্রফেসারের। এসবের মধ্যেই হঠাৎ একদিন জন্ম নিল এই গল্প লেখার সখটা। সেদিন থেকেই সুদেষ্ণার বলা কথাগুলো গল্পের মতো করে রাকে লিখে রাখছে শুভঙ্কর। নামগুলো একই রয়েছে আপাতত। সম্পূর্ণ স্টেটমেন্ট লিপিবদ্ধ করার পর সময় নিয়ে সেটাকে একটা পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের আকার দেবে ঠিক করেছে। সেই সময় পছন্দমতো চরিত্রগুলোর নাম ও পরিচয় পালটে দেবে।
ডায়েরি বন্ধ করে মুখে একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে আড়মোড়া ভাঙল শুভঙ্কর। সুদেষ্ণা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে বিছানায়। ঘুমিয়েছে না জ্ঞান হারিয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। বিন্দুমাত্র বোঝার তাগিদ অনুভব না করে, প্রতিদিনের মতো বিছানায় পড়েই ঘুমে তলিয়ে গেল শুভঙ্কর।
***
রাত প্রায় শেষ। অনেক রাত পর্যন্ত ডায়েরি লিখে এখন গভীর ঘুমে শুভঙ্কর। ওর নাকের ডাক ক্রমশ গম্ভীর হচ্ছে। সেই ডাক ছাপিয়ে দুয়েকটা পাখির ডাক কানে আসছে সুদেষ্ণার। যদিও পাখির ডাকটা সত্যি নাকি ওর মনের ভুল সেই ব্যাপারে নিশ্চিত নয় ও! সুদেষ্ণার এবার বিরক্ত লাগছে। শরীরের অবস্থার উন্নতি তো দূরের কথা, উলটে প্রতিদিন যে একটু একটু করে ওর প্রাণ প্রদীপের তেল ফুরিয়ে আসছে… সেটা ভালোই বুঝতে পারছে সুদেষ্ণা।
ক্যাপসুল শেষ হয়ে যাওয়ার পর খুব চিন্তায় পড়েছিল। অনেক দোনোমনো করে ঠিক করেছিল নিজেই শুভঙ্করকে বলবে ক্যাপসুল এনে দেওয়ার কথাটা। ওর মনে হয়েছিল, “আগে তো সুস্থ হয়ে উঠি; তারপর না হয় কিছু বুঝিয়ে সুঝিয়ে সামলে নেব শুভঙ্করকে।”
অকারণই এত ভয় পাচ্ছিল সুদেষ্ণা। ওকে অবাক করে শুভঙ্কর নিজেই এনে দিয়েছিল একটা নতুন ফাইল। শিশিটা ওর হাতে দিয়ে মোটামুটি একই কথা বলেছিল, “প্রতিদিন সকালে একটা করে খাবে। একদিন লাল ক্যাপসুল আর একদিন সাদা ক্যাপসুল। অল্টারনেটিভ ডে-তে অল্টারনেটিভ কালার…”
কথাগুলো শুনে ওর মুখের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়েছিল সুদেষ্ণা। ভয় পাচ্ছিল, এই বুঝি শুভ ওকে আগের শিশিটার কথা জিজ্ঞেস করে ফেলে। কিন্তু না। তেমন কিছুই হয়নি। বরং ওকে আবারও অবাক করে দিয়ে খুব যত্নে ওর মাথায় হাত রেখে, খুব নরম গলায় শুভঙ্কর বলেছিল, “মনে থাকবে? আচ্ছা বেশ, তোমাকে অত কষ্ট করে মনে করতে হবে না। আমিই তোমাকে রোজ সময়মতো খাইয়ে দেব।” সুদেষ্ণার চোখ জলে ভরে গেছিল। শুভঙ্করের মুখ দেখে মনে হয়েছিল ওই শিশিটার কথা ওই সিধেসাদা আত্মভোলা মানুষটার মনেই নেই।
সেদিন শুভঙ্কর ঘরে থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর নিঃশব্দে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল সুদেষ্ণা। অনুশোচনা হয়েছিল নিজের নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের জন্য। অনুতপ্ত হয়েছিল কৃতকর্মের জন্য। হিংসা আর লোভ খুব ছোটো করে দিয়েছিল ওকে নিজেরই নজরে। এত ভালো স্বামী পাওয়া সত্ত্বেও তার সঙ্গে সুখে সংসার করতে না পারাটা যে ওর নিজেরই পাপের ফল— সুদেষ্ণার এই বিশ্বাসটা দিন দিন দৃঢ় হচ্ছিল।
***
“আমি ভেবেছিলাম লাল সাদা ক্যাপসুলটা দেওয়া বন্ধ করে দিলে পুষ্টির অভাবে ও আরও তাড়াতাড়ি মরবে। আমার কাজ অনেক কমে যাবে। তাই শুভঙ্করকে কিছু বুঝতে না দিয়ে শিশিটা লুকিয়ে রাখলাম আমার কাছে। কিন্তু এখানেও বাধ সাধলো আমার ভাগ্য। খারাপ হওয়ার বদলে ওর শরীর একটু একটু করে ভালো হতে শুরু করল। সম্ভবত নতুন ডাক্তার রোগটা ধরতে পেরে সঠিক ওষুধ দিয়েছিল। ওতেই কাজ হচ্ছিল।
ও সুস্থ হয়ে উঠলে আমাকে আবার ফিরে যেতে হতো আমার পুরোনো ঠিকানায়। একবার যে নরক থেকে বেরিয়ে আসতে পেরে, সেখানে আর ফিরব না ঠিক করে ফেলেছিলাম। চিন্তায় আমার ঘুম উড়ে গেল। দিন রাত ভাবতে লাগলাম— রাত ভাবতে লাগলাম ভাবনা ভেঙে সাপটা মারা যায়?
উপায়টা হল শুভঙ্করের দৌলতেই। কদিন পর ওর স্ত্রী-র জন্মদিনে একটা সারপ্রাইজ পাটির ব্যবস্থা করল শুভঙ্কর। অনেকদিন ধরেই ডাক্তার বলছিল, “এবার একদিন কাছাকাছি কোথাও ঘুরিয়ে নিয়ে আসুন, দেখবেন আরও তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠবে আমার পেশেন্ট।”
ডাক্তারের কথা মাথায় রেখেই শুভঙ্কর বউয়ের জন্মদিন পালন করতে, ঠাকুর, চাকর-সহ আমাদের নিয়ে গেল শহর থেকে কয়েক ঘন্টার দূরত্বে… ওদের ফার্ম হাউসে। ভেবেছিল, রথ দেখা কলা বেচা দুই-ই হবে একসঙ্গে। সেখানে গিয়ে ওর স্ত্রী হঠাৎই অদ্ভূত বায়না জুড়ে বসল। জীবনে প্রথম নিজের হাতে পায়েস রান্না করার বায়না। বার কয়েকের আপত্তিতে পরাস্ত হয়ে অবশেষে রাজি হল শুভঙ্কর।
স্ত্রী-র আরও একটা বায়নায় রাজি হয়ে… বাগানের ভেতরের কাঠের ভেতরের কাঠের রান্নাঘরটায় পায়েসের সব সামগ্রী ওছিয়ে দিয়ে, ঠাকুরকে বাড়ির ভেতরের রান্নাঘরে চটপট রান্না সেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল শুভঙ্কর।
বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো আমার মাথাতেও বুদ্ধিটা এসেছিল আচমকাই। ঠাকুরকে বলেছিলাম, “তুমি চটপট ভেতরের কাজ সারো। নইলে অনেক দেরি হয়ে যাবে। দুপুরের ওষুধগুলি খাওয়ানোর সময়ও পার হয়ে যাবে। আমি বরং ওদিকে সব গুছিয়ে ম্যাডামকে ডেকে পাঠাচ্ছি।”
আমার প্রস্তাবে যে ঠাকুর খুব খুশি হয়েছিল, সে কথা বলাই বাহুলা। ওই সুযোগে গ্যাসের পাইপটা ওভেন থেকে খুলে রেখেছিলাম। আমি জানতাম রান্না ঘরে ঢুকে গ্যাসের গন্ধ টের পাবে না কারণ ততদিনে আমার পেশেন্টের স্বাদ গন্ধের বোধ একদম নষ্ট হয়ে গেছিল।
ওকে রান্নাঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে শুভঙ্করের কাছে বাগান ঘুরিয়ে দেখানোর আবদার করালাম। মুখে প্রকাশ না করলেও আমার প্রতি যে ও একটু একটু করে দুর্বল হয়ে পড়ছে সেটা অনেক আগেই বুঝতে পেরেছিলাম। সেই জন্যেই হয়তো এতটা বেপরোয়া হওয়ার সাহস যোগাতে পেরেছিলাম।
শুভঙ্কর এক কথায় রাজি হয়েছিল। হয়তো আমার সান্নিধ্য পাওয়ার লোভেই। আমরা যখন বাগানে ঘুরে পাকা পাকা ফল পাড়ছি… তখনই শুনলাম সিলিন্ডার ফাটার শব্দটা। কিছু না বোঝার ভান করে সবার আগে সেদিকে ছুটে গেছিলাম আমিই।
ভয় হয়েছিল পুলিশি তদন্তে হয়তো সব ধরা পড়ে যাবে। কিন্তু কিছুই ধরা পড়েনি। শুভঙ্কর অতদূর জল গড়াতেই দেয়নি। এর পর আমার দিনগুলো কাটছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু আমার কপাল তো! সহা হল না….” লেখাটুকু শেষ করতে পারল না শুভঙ্কর। বিরক্ত হলেও বাধ্য হয়ে ডায়েরিটা বন্ধ করতে হল তাকে। সুদেষ্ণা আজ ঘুমায়নি। চিরঘুমে যাওয়ার অপেক্ষায় জড় পদার্থের মতো পড়ে আছে বিছানায়। মাছের খাবি খাওয়ার মতো ওর গলার কাছ থেকে একটা অদ্ভুত কপ কপ শব্দ বেরচ্ছে। শূন্য দৃষ্টিতে ফ্যাল ফ্যাল করে সুদেষ্ণা তাকিয়ে আছে শুভঙ্করের দিকে। মুখে ওর নিজস্ব মিষ্টি হাসিটা নিয়ে শুভঙ্করও তাকিয়ে আছে স্ত্রী-র দিকে। দ্বিতীয় স্ত্রী-র দিকে। যেন শুভদৃষ্টি ….
***
শুভঙ্করের লেখার শখ ও প্রথম উপন্যাসের প্লট… দুটোই জুগিয়েছে সুদেষ্ণা। তাই শুভঙ্করের মনে হল ছাপা অক্ষরে বইটা পড়তে না পারলেও গল্পটার ক্লাইম্যাক্স, প্লট টুইস্ট… এসব জানার অসম্পূর্ণ অধিকার আছে সুদেষ্ণার। হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে সমস্ত পোশাক থেকে উন্মুক্ত করে, নিরাবরণ করে দিল সুদেষ্ণাকে। তারপর ওর কাছে এসে শুভঙ্কর বলল, “উষ্ণা…. ভালো করে চোখ মেলে আমায় দেখে বলো তো, এখনও কী তোমার বমি পাচ্ছে আমায় দেখে? আমার কিন্তু তোমার এই বীভৎস শরীরটা দেখে একটুও বমি পাচ্ছে না। রেবেকার পোড়া-গলা শরীরটা দেখেও বমি পায়নি। কী করে পাবে বলো… আমি তো ওকে ভালোবেসেছিলাম। তোমাকেও ভালোবাসি। খুব ভালোবাসি। কিন্তু আমি জানি তুমি আমার সম্পত্তি ও বাকি সব কিছুকে ভালোবাসলেও আমাকে কোনোদিনও নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসতে পারোনি। যেমন পারেনি রেবেকা। খালি ঘেন্না করেছে। একটা দিনের জন্যেও ওর কাছে আসতে দেয়নি আমায়। সেই জন্যই তো…”
হতবুদ্ধি সুদেষ্ণা চোখ বুজে নিলো। জল গড়িয়ে পড়ল দুই চোখের কোল বেয়ে। শুভঙ্কর ওর পাশে বসে পড়ে গালে চাপড় মেরে বলল, “মোরো না; প্লিজ আর একটু বেঁচে থেকে আমাকেও একটা সুযোগ দাও নিজের গল্পটা শোনানোর। প্লিজ উষ্ণা প্লিজ….”
কোনোরকমে চোখ খুলল সুদেষ্ণা। তাই দেখে খুশি আর উত্তেজনায় চক্ চক করে উঠল শুভঙ্করের চোখ। আর কোনো রকম ভণিতা করে সময় নষ্ট না করে শুভঙ্কর বলতে শুরু করল ওর উপন্যাসের শেষ অংশ। এর জীবনের গল্প।
“আমার প্রফেসারি প্রতিষ্ঠা প্রতিপত্তি পৈতৃক সম্পত্তির লোভে রেবেকা আমায় হাসি মুখে বিয়ে করলেও সাড়ে তিন বছরে ও আমাকে একদিনও ভালোবাসেনি। সুযোগ পেলেই অপমান করত। আমাকে দেখে নাকি ওর ঘেন্না করত। আমার টাকায় ফূর্তি করতে অবশ্য কোথাও বাঁধত না।
আমার দীর্ঘ রিসার্চের ফসল – ইনঅর্গানিক আর্সেনিকের এমন একটি যৌগ যেটা শরীরে প্রবেশ করে খুব ধীরগতিতে তীব্র ক্ষতি করে। সেটার প্রথম ডোজ সামান্য বেশি মাত্রায় খাইয়েছিলাম ওর মর্নিং জুসের সঙ্গে। তারপর থেকেই ধীরে ধীরে সমস্যা শুরু….
হোমিওপ্যাথি ওষুধের বাহক ল্যাক্টোস পাউডারের সঙ্গে আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইড খুব অল্পমাত্রায় মিশিয়ে তৈরি ডিএমএসএ ওই একইভাবে ল্যাক্টোসের সঙ্গে মিশিয়ে করেছিলাম ওই লাল ক্যাপসুল। আর তার প্রতিষেধক তৈরি করেছিলাম সাদা ক্যাপসুল। এই রকম অল্টারনেটিভ প্রয়োগের ফলে চূড়ান্ত ক্ষতিটা এতটাই ধীর গতিতে হতো যে সেটা আর্সেনিক প্রয়োগের ফল বলে কেউ সন্দেহই করতে না। ঠিক যে কারণে কোনো ডাক্তার রেবেকার সমস্যার কারণগুলো ধরতে পারছিল না।
উষ্ণা, তুমি যদি ক্যাপসুলের শিশিটা না সরাতে তাহলে তোমার কাজটা অনেক সহজ হয়ে যেত। কোনোরকম অপরাধ না করেই তোমার কার্যসিদ্ধি হত। কিন্তু জানো তোমার মতো কিছু কিছু লোক পৃথিবীতে আসে শুধু এবং শুধুমাত্র অন্য লোকের উপকার করতে। ইচ্ছাকৃত না করলেও তাদের দ্বারা মানুষ কেবল উপকারই পায়। যেমন রেবেকাকে আগুনে পুড়িয়ে তুমি নিজের অজান্তেই আমার চূড়ান্ত উপকার করেছিলে। তুমি যদি ওকে অন্য কোনোভাবে মারতে তাহলে আমার বিপদে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা ছিল।
ক্যাপসুল প্রয়োগের ফলে মারা গেলে রেবেকার মৃত্যুটা দীর্ঘ রোগভোগের পর স্বাভাবিক মৃত্যু বলেই মনে হতো। কিন্তু ও যদি অতিষ্ঠ হয়ে আত্মহত্যা করত কিংবা তুমি ওকে অন্য কোনো উপায়ে হত্যা করতে তাহলেই পোস্টমর্টেম হতো। আর তাতেই স্টমাক, নখ ও চুল পরীক্ষা করে ওর শরীরে আর্সেনিকের অস্তিত্ব প্রমাণ করা যেত।
রেবেকার ওই রূপ-যৌবন জ্বলে পুড়ে ছাই হতে দেখে যে আমি কতটা খুশি হয়েছিলাম, তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। তুমি অপরাধবোধ থেকে ট্রমায় চলে না গেলে বুঝতে পারতে রেবেকার শরীরটা ভালো করে পুড়ে যাওয়ার পরেই আমি দমকল ডেকেছিলাম। যাতে ওর কার্বনে পরিণত স্টমাকেও সহজে আর্সেনিকের ট্রেস না মেলে।”
নির্বিকার সুদেষ্ণার ভেজা চোখের চাউনিতে যেন স্পষ্ট প্রশ্ন চিহ্ন দেখতে পেল শুভঙ্কর। সুদেষ্ণার মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ধরেছ উষ্ণা। প্রথম যেদিন তুমি চালাকি করে না বলে আমার ঘরে ঢুকে এলে…. আর তার পর আমার খালি গা দেখে তোমার বমি উঠে এল… সেদিনই ঠিক করে ফেলেছিলাম যে রেবেকার মতো তোমার শরীরেরও এমন অবস্থা করব যে তোমার নিজেকে দেখেই ঘেন্না হবে। বমি পাবে।
তবে বিশ্বাস করো… তোমাকে আমি এত তাড়াতাড়ি মারতে চাইনি। আমাদের তিনমাস পূর্তির দিন তোমার পুডিংয়ে এতটাই কম ডোজ দিয়েছিলাম যে…
কিন্তু মাঝখান থেকে সমস্যা করল সেই তোমার পোড়া কপাল। সেই পোড়া কপালের ফল হয়ে দেখা দিল পায়ের ফুসকুড়িটা। তোমার অরুচি, খিদে না হওয়া, ভুলে যাওয়া, হ্যালুসিনেশন … এই সমস্যাগুলো ওই পুডিংয়েরই সাইড এফেক্ট। তবে আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইডই নিশ্চয়ই বুস্টআপ করেছিল ফুসকুড়িটাকে। তুমিও শুরু করে দিলে চূড়ান্ত বাড়াবাড়ি। তার ওপরে তোমার ট্রমা। এমনিতেই তোমার মনটা লরঝরে করে দিয়েছিল ততদিনে।”
এই পর্যন্ত বলে মুখ থেকে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ বার করে এক হাত কোমরে আর ও অন্য হাত মাথায় রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে, পেছন ফিরে কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল শুভঙ্কর। তারপর সামান্য নমনীয় গলায় বলল, “বিশ্বাস করো তোমাকে এত তাড়াতাড়ি আমি হারাতে চাইনি। আবারও একলা হয়ে যেতে চাইনি! আমি বুঝতে পারছিলাম তুমি একদিন না একদিন আমার শরীরটাকেও ঠিক মেনে নেবে। আর ঘেন্না পাবে না আমাকে দেখে। কিন্তু তোমার কপাল… আমার পেছনে তুমি নিজের যা ক্ষতি করার করেই ফেলেছিলে।
রেবেকাকে সুস্থ হয়ে উঠতে দেখে বুঝেছিলাম যে তুমি ওকে ক্যাপসুল দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছ। তাই ওর জন্মদিনে ওকে ফাইনাল ডোজ দেব ঠিক করে রেখেছিলাম। কিন্তু তার আগেই…..
উফ্! তুমি যে লুকিয়ে লুকিয়ে ওগুলো খাচ্ছ সেটা যদি আগে….
যখন বুঝলাম তখন যা হওয়ার তা হয়েই গেছে। তাই ভাবলাম তোমাকে আর বেশি কষ্ট না দিয়ে তাড়াতাড়ি…” কথা বলতে বলতেই সুদেষ্ণার দিকে তাকিয়ে আর মুখের কথা শেষ করতে পারল না শুভঙ্কর। সুদেষ্ণার স্থির চোখে তখন সব প্রশ্ন-উত্তরের শেষে ফাইনাল রেজাল্ট…
