জায়নাবের ডায়েরি – ১
(১)
২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, সকাল ১০টা
ইসলামাবাদ ক্যান্টনমেন্ট
এই যুগে যে কেউ ডায়েরি লেখে, পাবলিক বিশ্বাসই করতে চায় না। ফতিমা কিংবা আলিয়ারা টিভি দেখে। ইন্সটাগ্রামে রিল বানায়, টিকটক করে।
আমি ডায়েরি লিখি। আমার ডায়েরি লিখতে ভালো লাগে। ওমর যেদিন থেকে প্রমোশন পেয়ে প্রেসিডেন্ট হাউজে পোস্টিং পেল, সেদিন থেকে আমার জীবন পালটে গেছে। ওমরকে আর ফ্যামিলি নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় থাকতে যেতে হয় না। আমরা ইসলামাবাদেই থাকতে পারি।
আজকেও একবার ডাক্তার আইরিনকে দেখাতে গেছিলাম। ডাক্তার আইরিন আমাকে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে বললেন ওমরের স্পার্ম কাউন্ট টেস্ট করানো দরকার। কথাটা আমি ঠিক করেছি ওমরের আম্মিকে দিয়ে ওমরকে বলাব। আমি বললে ওমর রেগে যেতে পারে।
ওমরের পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হলেও ও বাচ্চাদের মতো রাগ করে। বিশেষত আমার সঙ্গে। বাইরের গম্ভীর, অত্যন্ত সিরিয়াস লোকটা ঘরে এসে এমন বাচ্চাদের মতো করতে থাকে, আমারই কষ্ট হয়। এই লোককে কীভাবে আমি ওসব টেস্ট করার কথা বলতে পারি? ওমরের আম্মিকে ফোন করে আমি গ্রাম থেকে আসতে বলেছি। ভদ্রমহিলা কিছুতেই আসতে চান না। বলেন ইসলামাবাদের হাওয়া তাঁর ভালো লাগে না। তিনি বৃদ্ধা হলেও অবশ্য মানসিকতার দিক থেকে খুবই আধুনিক। আমাকে কোনোদিন খারাপ কথা বলেননি।
ওমরের সবই ঠিক আছে, অন্তরঙ্গ মুহূর্তে ওর মধ্যে কোনো অস্বস্তি আমি দেখতে পাইনি কোনোদিন, শুধু ডাক্তার আইরিন বলছেন ওমরের স্পার্ম কাউন্টে সমস্যা হতে পারে। আমি নাকি একদম ঠিক আছি।
সারাদিন প্রেসিডেন্ট হাউজে থেকে ওমর আর্মি কোয়ার্টারে ফেরে রাত আটটা। কোনো কোনোদিন ন-টাও হয়ে যায়। আগের প্রেসিডেন্টকে যখন সেনা সরিয়ে দিল, সেদিন ওমর ভীষণ ব্যস্ত ছিল। আমাকে জানিয়েছিল, সবটা নাকি সেনা ওর মাধ্যমেই করেছিল, ও একাই সবটা পরিচালনা করেছিল। আমার সেদিন খুব গর্ব হলেও একটা বিষয়ে খারাপ লেগেছিল। আগের প্রেসিডেন্ট সাহেবকে রাস্তার মধ্যে গুলি করে মারা হয়েছিল। ওমরকে আমি এই বিষয়ে আমার উম্মার কথা বলেছিলাম। ওমর একটা উত্তরই দিয়েছিল, “এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ এন্ড ওয়ার। প্রেসিডেন্ট সাহেব দেশবিরোধী কাজে জড়িত ছিলেন। সব জেনে আমরা কীভাবে তাকে বাঁচিয়ে রাখব? কাউকে জোর করে ক্ষমতায় রাখার কোনো মানে হয় না। আর সে দেশবিরোধী জেনে তাকে চেয়ারে বসিয়ে রাখা তো আরও অর্থহীন।”
ওমর দেশকে ভালোবাসে। আমাকেও ভালোবাসে। ইদানীং খুব দত্তক সন্তান নেবার কথা বলছে। বলছে জোর করে বাচ্চা নেবার দরকার কী? একজনকে দত্তক নিলেই তো হয়। রাওয়ালপিন্ডিতে উসমান চাইল্ড কেয়ারে নাকি আমাদের জন্য এক বাচ্চাকে রাখা আছে। আমি রাজি হলে ও আমাকে নিয়ে যাবে। আমি রাজি হইনি। আমি এখনই দত্তক সন্তান চাইনি। তমার বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে না। কেন আমি নিজে একবার চেষ্টা করব না?
যদিও ধীরে ধীরে আমারও মনে হচ্ছে আর দেরি করা যাবে না। একজন বাচ্চাকে নিয়ে এসে তো বড়ো করতে হবে। এবার হয়তো ওর কথায় মেনে নিতে হবে।
ফতিমা আমার পাশের কোয়ার্টারে থাকে। একগাদা গোস্ত দিয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগে। ওর হাসব্যান্ড সুহেল কাশ্মীরে পোস্টেড।
আসার সময় একগাদা আখরোট নিয়ে আসে। ওমর সুহেলকে পছন্দ করে। ফতিমা আমাকে ইনিয়ে-বিনিয়ে বহুবার বলার চেষ্টা করেছে ওমরকে বলে সুহেলকে ইসলামাবাদে যেন পোস্টিং-এর ব্যবস্থা করি আমি।
ওমরকে বলেছিলাম। ওমর খুব একটা পাত্তা দেয়নি আমায়। এই জন্য আমি ওমরকে কিছু বলতে চাই না। আমার কথা কেউ না শুনলে আমার কষ্ট হয়। চোখের কোণ জলে ভিজে ওঠে। যে লোকটাকে আমি এত ভালোবাসি, সে আমার একটা অনুরোধ রাখতে পারবে না? ওমর বলে অফিসের কথা ঘরে কিছুতেই শুনবে না। কেউ আমার কাছে কী দরবার করবে, তা শোনার কাজ নাকি ওর না।
ওমর আরও কিছু কথা বলেছে আমাকে। আমাদের কোয়ার্টারের সামনে কোনো লোক ঘোরাফেরা করলে সঙ্গে সঙ্গে যেন ওকে খবর দিই। ওমর এমন একটা দফতরে আছে যেখানে অনেকরকম গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের কাজ চলে। কাউকে বিশ্বাস করা যাবে না।
(২)
মুজফফরাবাদ। ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
লাঞ্চ চলছে। সুহেল রুটি মাংস নিয়ে খেতে বসেছে। ব্রিগেডিয়ার সুলতান এসে তার পাশে বসলেন।
সুহেল বলল, “দুটো ট্রাক আসার কথা ছিল জনাব। এখনও আসেনি।”
সুলতান বললেন, “চলে আসবে। রাস্তায় দাঁড়িয়েছে নিশ্চয়ই। পাহাড়ি রাস্তা। সময় তো লাগে।”
সুহেল খেতে শুরু করল। সুলতান বললেন, “আজ রাতে যে সেক্টর থেকে ইন্ডিয়ান ফৌজের মাথা খারাপ করা হবে, সে লোকেশনটা আমি ওদের পরে ডিজক্লোজ করব। এখানে এখনই কিছু বলব না। তবে তুমি বর্ডারে যারা আছে, তাদের জানিয়ে রাখবে সেক্টর সেভেন্টিন খালি রাখে যেন। আমরা ওদিক থেকে ইনফিস্ট্রেট করাব।”
সুহেল বলল, “জি জনাব। আপনি যা বলবেন।”
খেয়ে উঠে ক্যাম্পের দিকে রওনা হবার আগেই ট্রাকদুটো চলে এল। সুলতানের খাওয়া তখনও বাকি ছিল। তিনি প্লেট রেখেই ট্রাকদুটোর দিকে ছুটলেন।
ট্রাক দাঁড় করানোর পর পেছনের দরজা খোলা হল। কালো টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে একগাদা ছেলে ট্রাকের ভেতরে গাদাগাদি করে বসেছিল। সুলতান তাদের ট্রাক থেকে নামিয়ে লাঞ্চে পাঠালেন। ট্রাক পুরো খালি হবার পর সুহেল বলল, “আমার ছেলের বয়সীই হবে এরা।”
সুলতান বললেন, “আমার ছেলে এদের থেকে একটু বড়ো। দেশের কাজ করতে যাচ্ছে এরা। এদের গর্বিত হওয়া উচিত। আমি আজ একটা স্পিচ দেব।”
সুহেল বলল, “চল্লিশটা মুজাহিদিন, চল্লিশজন শিক্ষার্থী। ওদের চোখগুলো আমাকে ইন্সপায়ার করছে জনাব।”
সুলতান খুশি হলেন, “তা করারই মতো। ওদের সব থেকে কড়া ট্রেনিং-এ রাখা হয়। এই বছরই তো কতগুলো ছেলে জন্নতে গেছে। ওদের জন্য আমার গর্ব হয়।”
সুহেল বলল, “এরা কী সব রাওয়ালপিন্ডির?”
সুলতান বললেন, “হু। তবে রাওয়ালপিন্ডি ছাড়াও অনেক জায়গা থেকেই মুজাহিদিন আসে। কিছুদিন ট্রেনিং ক্যাম্পে থাকে। সুহেল, আমি একটু পরে বেরবো, তুমি একটু দেখবে কেউ যেন বেগড়বাই না করে। কেউ কেউ আছে খুব কান্নাকাটি করে। দরকার হলে ওদের কার্টুন দেখতে বসিয়ে দেবে।”
সুহেল বলল, “জনাব, কিছু মনে না করলে একটা কথা বলি?”
সুলতান বললেন, “শিওর। তুমি একজন নওজোয়ান, তুমি অবশ্যই আমাকে প্রশ্ন করতে পারো। শ্যুট।”
সুহেল বলল, “আপনি মাঝে মাঝেই একা একা জিপ নিয়ে বেরোন, আমি একটু ঘাবড়ে যাই। আপনার ভয় লাগে না?”
সুলতান জোরে হেসে উঠলেন, “ওহ, তা কী করব বল, ওখানে আমাকে একাই যেতে হয়। বেশ তো, তুমিও চল আমার সঙ্গে। তোমার খাওয়া হয়ে গেছে তো, চল দেখি, ঘুরে আসি। আমি আসফাককে বলে দিচ্ছি বাচ্চাদের খেয়াল রাখবে।” একটু থমকে সুলতান বললেন, “এছাড়া আমার মনে হয় তোমার এটা জানা উচিত। চল।”
সুহেল বলল, “যাব?”
সুলতান ঘাড় নাড়লেন, “ইয়েস। চল।’
সুলতানের সঙ্গে সুহেল গাড়িতে উঠল। আর্মি ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে সুলতান বললেন, “মনে রাখবে সুহেল, পাকিস্তান আর্মি একা কাজ করে না। তাদের সাহায্য করার জন্য অনেক সংগঠন আছে। এই সংগঠনগুলো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ইন্ডিয়ার অত্যাচারে অত্যাচারিত মানুষেরা মিলে এই সংগঠনগুলো তৈরি করেছে। পাক সেনার কাজ হল এদের দানাপানি দেওয়া, এদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা।”
সুহেল বলল, “সে ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ নেই জনাব। এল-ও-সি তে থাকাকালীন আমরা একসঙ্গেই কাজ করতাম।”
গাড়ি মুজফফরাবাদ থেকে বেরিয়ে গ্রামের রাস্তা ধরল, সুলতান বললেন, “এল-ও-সি তে যারা আছে, তারা গ্রাসরুটে কাজ করে। আর তুমি আর্মিতে যত ওপরের পোস্টে উঠবে, তত তোমাকে স্ট্যাটেজি নিয়ে ভাবতে হবে। এই সংগঠনগুলো যারা চালায়, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলতে হবে। আমি জানি, তুমি আমার সার্থক উত্তরসুরি, তোমার পক্ষে এগুলো ধরতে বেশিক্ষণ লাগবে না।”
সুহেল কৃতজ্ঞতায় মাথা নোয়াল, “আপনি আমাকে এত যোগ্য মনে করেন, তার জন্য শুক্রিয়া জনাব।”
একটা ভাঙাচোরা দোতলা বিল্ডিং-এর কাছে এসে সুলতান গাড়ি দাঁড় করালেন।
সুহেল বিস্মিত কণ্ঠে বলল, “এখানে?”
সুলতান বললেন, “জি, এসো।”
মৌলানা সামসুদ্দিনকে আগে দেখেছে সুহেল, তবে দূর থেকে। কুটনে একটা ক্যাম্প থেকে মুজাহিদিন ছেলেদের আনার সময় দেখেছিল।
সুলতান যখন তার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, সুহেলের মনে হল মৌলানার বয়স খুব বেশি হলে সাতচল্লিশ থেকে পঞ্চাশের মধ্যে হবে। কাঁচা পাকা দাড়ি, চোখের মধ্যে একটা ঘুম ঘুম ভাব আছে। তার নাম বলতেই মৌলানা তার দিকে স্নেহভরা দৃষ্টিতে দেখে বলল, “জনাব, আপনার বীরত্বের কথা আমি আগেই শুনেছি। আপনারাই তো পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ। আমি সুলতান সাহেবকে শুক্রিয়া জানাচ্ছি আপনাকে আমার কাছে নিয়ে আসার জন্য। ছেলেরা আজকে ঠিক ঠাক সময়ে চলে এসেছে তো?”
সুহেল ঘাড় নাড়ল, “জি জনাব। ওরা এখন কার্টুন দেখছে। সেরকম ব্যবস্থা করেই আনা হয়েছে।”
মৌলানা বলল, “ওরা কিছু খেতে চাইলে, ওদের খাবার ব্যবস্থাও করে দেবেন। অতোগুলো ছেলের মধ্যে বেশিরভাগই তো আজকে জন্নতে যাবে। সুতরাং…”
সুহেল বলল, “সবাইকে একসঙ্গে বর্ডারে পাঠানোর…”
সুহেলের কথা শেষ হবার আগেই সুলতান বললেন, “তুমি বুঝবে না। মৌলানা ভেবেচিন্তেই কাজটা করছেন।”
মৌলানা বলল, “শুধু ওরাই তো যাচ্ছে না।”
সুহেল এবার একটু অবাক হল। সুলতান সাহেব তো আর কারও কথা তাকে বলেননি।
সুলতান বলে উঠলেন, “আমি সুহেলকে একটু একটু করে সব শিখিয়ে দেব জনাব। আপনি ভাববেন না। এই ব্রিফকেসটা আপনার জন্য ইসলামাবাদ পাঠিয়েছে জনাব।”
একটা ব্রিফকেস নিয়ে এসেছিলেন সুলতান। সেটা মৌলানার দিকে এগিয়ে দিলেন। মৌলানা ব্যাগটা খুলল। ব্যাগের ভেতরটা আমেরিকান ডলারে ভরতি দেখে খুশি হয়ে দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, “শুক্রিয়া জনাব। আপনি যে আপনার উত্তরসূরি সুহেল সাহেবের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন, তা জেনেও ভালো লাগল।”
সুলতান উঠে দাঁড়ালেন, “আজ তবে আসি জনাব।”
মৌলানা মাথা নাড়ল।
দু-জনে বেরিয়ে বাইরে এল। সুহেল বলল, “আমি ড্রাইভ করি জনাব?”
সুলতান বললেন, “না না, আমিই চালাচ্ছি। তুমি বস।”
সুহেলকে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ি স্টার্ট করলেন সুলতান। মুজফ্ফরাবাদ শহরের আগে নীলম ভিউ পয়েন্টে গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললেন, “এসো, সিগারেট খাওয়া যাক।”
সুহেল একটু কুণ্ঠা বোধ করল, “আপনার সঙ্গে?”
সুলতান বললেন, “আবার কী? আর্মিতে আবার এসব আড়াল কবে থেকে শুরু হল? এ নাও।”
সুলতান মার্লবোরোর প্যাকেটটা সুহোলের দিকে এগিয়ে দিলেন। সুহেল একটা সিগারেট নিল। সুলতান সিগারেট ধরিয়ে বললেন, “আমার আর ছ-মাস সুহেল। এরপরে তোমাকে কাশ্মীর সামলাতে হবে। পাকিস্তানের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা কাশ্মীর। হ্যাঁ, বালোচিস্তান এখন গরম হচ্ছে, কিন্তু সেটাও এতটা সেনসিটিভ না। মৌলানার সঙ্গে যখন আমাকে প্রথম ডিল করতে হয়েছিল, আমি কিছুটা ভয় পেয়েছিলাম। পরে বুঝেছিলাম, মৌলানা তো আমাদের স্বাভাবিক মিত্র, ভয় পাবার কোনো কারণ তো নেই। দিনে দিনে এসবই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে।” রিটায়ারমেন্টের পর আমি আর কাশ্মীরে থাকব না, তখন তোমাকেই সবটা সামলাতে হবে। বুঝতেই পারছ তোমার গুরুত্ব কতখানি। আমি অনেকদিন ধরে তোমাকে নোটিস করার পরেই তোমাকে কাজটা দেবার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই সিদ্ধান্তে ইসলামাবাদের সিলমোহরও আছে।”
সুহেল বলল, “এই টাকাটা আপনাকে কে দিল জনাব?”
সুলতান বললেন, “কোটা? মৌলানাকে যেটা দিলাম?”
সুহেল মাথা নাড়ল, “জি, এত আমেরিকান ডলার জনাব।
ইসলামাবাদ থেকে এই নোটগুলো নিয়ে আসাও তো খুব ঝুঁকির কাজ।”
সুলতান হাসলেন, “তোমাকে কে বলেছে এগুলো আমি ইসলামাবাদ থেকে নিয়ে এসেছি?”
সুহেল বলল, “তবে? কোথা থেকে এগুলো এসেছে?”
সুলতান সিগারেটে টান দিয়ে বললেন, “তোমাকে আরও ভালো করে সব কিছু নজর রাখতে হবে সুহেল। তুমি ভালো, খুবই ভালো। কিন্তু আরও ভালো হতে হবে….”
সুলতানের কথা শেষ হবার আগেই সুহেল বলল, “এগুলো তবে ওই বাচ্চাদের…
সুলতানের মুখে হাসি ফুটল, “রাইট। আমাদের কাজ খুব বেশি না। ওখান থেকে টাকা আর বাচ্চাদের রিসিভ করা, মৌলানার কাছে টাকা দিয়ে আসা, আর বাচ্চাদের ওপাশে পাঠানো।”
সুহেল বলল, “জনাব… এতগুলো বাচ্চা শুধু হিউম্যান শিল্ড হিসেবে?”
সুলতান গম্ভীর হয়ে গেলেন, সিগারেটে বেশ কয়েকটা টান মেরে বললেন, “এই ব্যাপারে আমি তোমার সঙ্গে পরে ডিসকাস করব।”
(৩)
জায়নাবের ডায়েরি
২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪, রাত আটটা
ওমর আমাকে বার বার একটা কথাই বলে, “ঘরে বসে থেক না। মলে ঘুরে এস। কিছু কেনাকাটা কর। ঘরে বসে বসে বোর হয়ে যাবে।”
আমি ঠিক করেছিলাম একাই বেরবো।
ওমরকে প্রথমে ফোন করেছিলাম, ধরেনি। বুঝেছিলাম প্রচণ্ড ব্যস্ত ছিল। বিরক্ত না করে একটা মেসেজ করে বেরিয়েছিলাম।
গিগা মল আমাদের ক্যান্টনমেন্টের কাছেই। আমি কোথাও গেলে ড্রাইভ করেই যাই। গাড়ি নিয়ে যেতে বেশিক্ষণ লাগল না। দুপুরের দিকটা বেশি ভিড় থাকে না। আমার বন্ধুদের একবার ভেবেছিলাম বলব, পরে মনে হল থাক। একটু ‘মি টাইম’ দরকার আমার। নিজের সঙ্গে সময় কাটানো হয় না। শপিং মলের আলোতে অনেকগুলো সেলফি তুললাম, বেশ কয়েকটা কুর্তা কিনে ফুড কোর্টে গিয়ে বসেছি, এমন সময় আসিফের সঙ্গে দেখা। আসিফ আমাদের লাহোরের বাড়িতে প্রায়ই আসত। ইদানীং দুবাইতে চাকরি করতে যাবার পর আর দেখা হয়নি। ওমরকে আসিফের কথা বললে ওমর রেগে যেত। ওর ধারণা আসিফের আমার প্রতি সফট কর্নার ছিল। আমার অবশ্য কোনোদিন সেটা মনে হয়নি। আমার আব্বু মুক্তমনা মানুষ ছিলেন। অনেক লোক আসতেন আমাদের বাড়িতে। কারও সঙ্গে কথা বলতে বারণ করেননি কোনোদিন। আর সত্যি বলতে কী আমি আসিফকে কোনোদিনই বন্ধুর বাইরে কিছু ভাবিনি। ছোটো থেকেই আমার স্বপ্ন ছিল আর্মির কাউকে বিয়ে করব। আব্বু সেটা জানতেন। আসিফও।
আমি আসিফকে দেখেই খাবার ফেলে উত্তেজনায় ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, “কী ব্যাপার জনাব, তুমি ইসলামাবাদে কবে এলে?”
আসিফ অবাক হয়ে আমাকে দেখে সত্যিকারের খুশি হল, “আরে জায়নাব? তুমিই বা এখানে কী করে?”
আমি সব বললাম। আসিফ মজা করে বলল, “বাঃ, আমি তো ভেবেছিলাম দুবাই থেকে ফিরে তোমাকে প্রোপোজ করব, আর তুমি এখন বিয়েই করে নিলে।”
বলেই আসিফ কপট দুঃখ দেখাতে গিয়ে হেসে ফেলল। আমিও হাসলাম, “কী আর করা, আমিও তো ভেবেছিলাম তোমার জন্য অপেক্ষাই করব, তুমি এত দেরি করবে আমি কী করে জানব? যা-ই হোক, বার্গার খাবে?”
আসিফ বলল, “কাবাব খাব। বস। তোমাকেও খাওয়াই।”
আমার হাজার আপত্তি সত্ত্বেও আসিফ কাবাব আর কোক নিয়ে এল। খেতে খেতে বলল, “তোমার হাজব্যান্ডের সঙ্গে পরিচয় করিও। নইলে ভদ্রলোক খামোখাই সন্দেহ করবেন।”
আমি বললাম, “ভদ্রলোকের সন্দেহ করারও সময় নেই আসিফ। সারাক্ষণ কাজে ব্যস্ত। কোনো কোনো দিন রাতে বাড়ি ফিরতেও দেরি হয়। আমার ছোটোবেলা থেকে স্বপ্ন ছিল আর্মির লোককে বিয়ে করব, কিন্তু বিয়ে করার পর আবার জীবনের একেবারে বারোটা বেজে গেছে। নেহাত শাশুড়ি মানুষটা ভালো, নইলে যে কী হত! তোমার কথা বল, দুবাইতে বিয়ে টিয়ে করলে?”
আসিফ বলল, “মাঝখানে বিয়ের পোকা যে নড়েনি, তা অস্বীকার করতে পারব না, কিন্তু সমস্যা হল, যে মেয়েকে পছন্দ হয়েছিল, সে একজন ইন্ডিয়ান। ও যখন বাড়িতে আমার কথা বেচারি জানালো, ওর বাড়ির সবাই এমন করে বারণ করল, দুবাইতেই থাকতে পারল না। ট্রান্সফার নিয়ে ইন্ডিয়া চলে যেতে হল। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরা পাকিস্তানিরা কী এতটাই খারাপ?”
আমি হাসতে হাসতে বললাম, “এ আবার কেমন কথা? আমার অনেক বন্ধুই বাইরে সেটলড, ওদের কেউ ইন্ডিয়ান বিয়েও করেছে, কই, তাদের তো কোনো সমস্যা হয়নি!”
আসিফ বলল, “ওরা ওখানে সেটল করে গেছে বলেই সমস্যা নেই। আমাদের মতো যারা আধা সেটলড, তাদের কাছে দেশ একটা বড়ো ফ্যাক্টর। যা-ই হোক, সে মেয়ের বিয়েও হয়ে গেছে, তোমারই মতো। আমার জীবনে কোনো মেয়েই টিকবে না, নসীবেই নেই যা বুঝতে পারছি।”
আমি বললাম, “দিল ছোটা মত কর, ঠিক কেউ না কেউ তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।”
আরও অনেক কথা হল আসিফের সঙ্গে। আসিফ স্বচ্ছ মনের ছেলে। আমার সময়টা ভালো কাটল। ফেরার সময় আমাকে গেটের বাইরে নামিয়েও দিয়ে গেল। রাতে ওমরকে আসিফের কথাটা বলায় বলল, “সাবধানে। সবার সঙ্গে কথা না বলাই ভালো। এগুলো ট্র্যাপ হতে পারে।”
আমি আকাশ থেকে পড়লাম, “ট্র্যাপ মানে? ওকে আমি লাহোর থেকে চিনি।”
ওমর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “তাহলে ঠিক আছে। তবু, একটু চোখ কান খুলে।”
আমি শুধু বলেছি, “ঠিক আছে।”
সবসময় এত সন্দেহপ্রবণ হয়ে বেঁচে থাকা আমার ভালো লাগে না বাপু।
(৪)
রাত ন-টা। বাচ্চাগুলো খুব লাফালাফি করেছে ক্যাম্পের ভেতর। ওদের খাইয়ে-দাইয়ে আবার ট্রাকে তুলে দিয়ে সুহেল তার ক্যাম্পে এসে বসল।
বাইরে থেকে সুলতানের গলা শোনা গেল, “সুহেল, আছো?”
সুহেল সঙ্গে সঙ্গে তটস্থ হয়ে উঠে দাঁড়াল, “জি জনাব। আসুন প্লিজ।”
সুলতান ক্যাম্পের ভেতরে এসে বসলেন, “মৌলানার সব থেকে প্রিয় দুই ছাত্র আজ ইন্ডিয়ায় ঢুকবে ইনশাল্লাহ। মৌলানা আজ তোমাকে দেখে খুব খুশি হয়েছেন। বলেছেন পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হাতেই যেতে চলেছে।”
সুহেল বলল, “শুক্রিয়া জনাব। আজ তো এল-ও-সি তে গুলিও চলবে। আগে ইন্ডিয়ান আর্মিকে ব্যস্ত করে তারপর বাচ্চাগুলোকে এগিয়ে দেওয়া হবে এবং তারপর মৌলানার ছাত্র দু-জন ঢুকবে। তাই তো?”
সুলতান খুশি হলেন, “রাইট। তুমি খুব তাড়াতাড়ি ধরে নিয়েছ দেখে ভালো লাগল। চল্লিশটার মধ্যে সাত আটটা যা বাঁচবে, তাদের ওপারে রিসিভ করে নেওয়া হবে। ইন্ডিয়া তখন আরও জলওয়া দেখতে পাবে।”
বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন সুলতান।
সুহেল বলল, “বড়ো কিছু প্ল্যান আছে জনাব?”
সুলতান বললেন, “হ্যাঁ। প্ল্যান তো আছেই। তবে সব প্ল্যানও আবার ওরা আমাদের বলে না। আই.এস.আই. যেভাবে ইন্সট্রাকশন দেয়, আমাদের সেভাবে চলতে হয়। এই সময় উপত্যকায় বরফ আছে, বেশ কিছু এরিয়া আছে যেখানে আমরা টার্গেট করলে এখনও ছেলেদের ঢুকিয়ে দিতে পারি। এরপর ওপারের কাশ্মীরিদের মেহমান হয়ে থাকবে। এ-পার আর ও-পারের মানুষদের কেই বা আলাদা করতে পারে? অতো সহজও না। আমাদের কাজ হল সবাইকে দেশের কাজে লাগানো। দেশই তো আসল, তাই না?”
সুহেল বলল, “জি জনাব।”
সুলতান পকেট থেকে বেশ কয়েকটা ইউ.এস. ডলার বের করে সুহেলের দিকে এগিয়ে দিলেন, “এটা রাখো। মৌলানা তোমার জন্য পাঠিয়েছেন।”
সুহেল সিঁটিয়ে গেল, “আমি এটা কী করে নেবো জনাব?”
সুলতান বললেন, “নাও। এগুলোকে আমরা গুড লাক গিফট বলি। আমরা তো একটা ভালো কাজ করলাম। ইন্ডিয়ার যত ক্ষতি করতে পারব, আমরা দেশ হিসেবে তত এগিয়ে যাব। লড়াই তো শুধু বর্ডারে হয় না। এগুলিও লড়াই।”
সুহেল ডলারগুলো নিয়ে পকেটে রাখল। সুলতান বলছেন, “এখানে কাউকে দেখানোর দরকার নেই। ইসলামাবাদে গিয়ে ভাঙিয়ে নিও। আমার স্ত্রী আবার এগুলো জমায়। বলে চাকরির পর বিদেশে গিয়ে থাকবে, তখন এগুলো কাজে আসবে। আমিও আর বাধা দিই না। কতদিন আর এখানে পড়ে থাকব ছেলে মেয়েগুলো বড়ো হচ্ছে।”
সুহেল একটু ইতস্তত করে বলল, “জনাব, আপনাকে বলেছিলাম আমি এই সপ্তাহে দু-দিন ছুটি নেব। মানে আমাদের বিয়ের সালগিরা… ফতিমা আপনাকেও বলতে বলে দিয়েছে।”
সুলতান বললেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার মনে আছে। নিশ্চিন্তে যাও। আমি যেতে পারব না, তবে আমার জন্য খাবার বেঁধে নিয়ে আসবে।”
সুহেল বলল, “নিঃসন্দেহে জনাব। ফতিমা তো এসবের ব্যাপার ওস্তাদ। ও আজ থেকেই রান্না শুরু করে দিয়েছে।”
সুলতান বললেন, “ওমর তোমার প্রতিবেশি না?”
সুহেল বলল, “জি জনাব। কেন বলুন তো?”
সুলতান বললেন, “ওমর এককালে এখানেই ছিল। তারপর লবি ইউজ করে ইসলামাবাদ পোস্টিং নিয়েছে। কোনো দরকার ছিল না। ওর সঙ্গে মৌলানার ভালো সম্পর্ক ছিল। ও থাকলে হয়তো তোমার পরিবর্তে ওকেই আমায় মৌলানার কাছে নিয়ে যেতে হত। ওমরের পরিচিতি অনেক দূর অবধি।”
সুহেল বলল, “আমিও সেরকম শুনেছিলাম জনাব। তবে ইসলামাবাদেও তো কাবিল অফিসার দরকার জনাব।”
সুলতান হাত দিয়ে কথাটা তুচ্ছ করে দেবার ভাব করলেন, “মনে রেখ সুহেল, আসল লড়াই হয় গ্রাউণ্ডে। ওসব প্রেসিডেন্ট হাউজে যে খেলা হয়, তাতে কী জানের ভয় থাকে? থাকে না।”
সুহেল মাথা নেড়ে বলল, “তা ঠিক জনাব।”
সুলতান বললেন, “তবে আজ রাতটা আমার ভালো কাটবে না সুহেল। এরকম কোনো রাতই ভালো কাটে না। না ঘুমিয়ে বসে থাকব, অতোগুলো শিশু…”
সুহেল চুপ করে গেল। সুলতানের কথার উত্তর কী দেবে সে কিছুই বুঝতে পারল না।
