জায়নাবের ডায়েরি – ৫
(৫)
জায়নাবের ডায়েরি
২২শে ফেব্রুয়ারি, দুপুর সাড়ে তিনটে
ওমর সকাল সকাল অফিস চলে যায়। অফিস যাবার আগে আমার যত ব্যস্ততা। গেলেই আমি ঝাড়া হাত-পা হয়ে যাই।
মজার কথা হল, ওমরের সকালে উঠেই আসিফের কথা মনে পড়েছে। আমি বেড টি নিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “জায়নাব, ওই ছেলেটার প্রতি তোমার কোনো সফট কর্নার ছিল?”
আমি হেসে ফেলেছি। এত উচ্চপদস্থ একজন অফিসার, সে আমাকে নিয়েও চিন্তা করে! আমি ওর মাথার চুল এলোমেলো করে দিয়ে বললাম, “তুমি এত হিংসুটে জানা ছিল না তো!”
ওমর বলল, “হিংসুটে না। এমনি। সিনেমায় দ্যাখো না, বলিউডের সিনেমায় বেশি দেখেছি, বউ পুরোনা বন্ধুকে ফিরে পেয়েছে, বর সময় দিতে পারছে না, আমি তো এমনিই তোমাকে সময় দিতে পারি না।”
আমি ওমরকে জড়িয়ে ধরে বলেছি, “আমি তো তোমাকে পেয়েছি। সময়টা দরকার নেই অতো।”
ওমর বলেছে, “আমি ছুটির অ্যাপ্লিকেশন দিচ্ছি। তোমাকে নিয়ে দুবাই, আবু ধাবি, এগুলো ঘুরে আসব। আমার মনে হয় তোমাকে সময় দেওয়া উচিত।”
এই সময়টা আমি ঠিক করতে পারছিলাম না ওমরকে টেস্টের ব্যাপারটা বলা ঠিক হবে নাকি। না বলাই ঠিক করলাম। কী দরকার? সকাল সকাল মুড ভালো আছে, সেটা না বিগড়োনোই উচিত। বেচারির ওপরে অনেক চাপ থাকে সেটা বোঝা যায়। অনেক রাত অবধি পড়াশুনা করতে হয়, মাঝে মাঝে ফাইল বাড়িতে নিয়ে আসে। ও তৈরি হয়ে অফিসে বেরোনোর পর কোয়ার্টারের রাস্তায় হাঁটতে বেরোতে দেখলাম ফতিমাদের কোয়ার্টারের সামনে গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। ফতিমা আমাকে দেখেই হাত নেড়ে ডাকল, “এই জায়নাব, সুহেল এসেছে, এস।”
সুহেলভাই ওমরেরই বয়সী। আমি ওদের শুভেচ্ছা জানালাম, পরক্ষণেই মনে হল বড়ো ভুল হয়ে গেছে। মল থেকে ওদের জন্য গিফট কেনার দরকার ছিল।
ফতিমা খুব যত্ন করে কোয়ার্টার সাজিয়ে রেখেছে। আমাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে জোর করে ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসিয়ে দিল।
সুহেল ওমরের ব্যাপারেই জিজ্ঞেস করল, “ভাবি, ভাইজান কী অফিস চলে গেছেন?”
আমি ঘাড় নেড়ে বললাম, “জি, ও কোনো কোনোদিন সাতটাতেও বেরিয়ে যায়।”
সুহেল ঘাবড়ে গিয়ে বলল, “সে কী? এত কাজের চাপ থাকে নাকি?”
আমি বললাম, “তা তো থাকেই। তা সুহেলমিয়া, ফতিমাভাবির জন্য কী কিনলে? গিফট কেনা হয়েছে না এখনও হয়নি?”
সুহেল লজ্জা পেয়ে বলল, “না না ভাবি, কিছু কেনা হয়নি এখনও, এই তো বিকেলে দু-জনে বেরিয়ে কিনে নিয়ে আসব। আপনি কিন্তু দুপুরে আমাদের সঙ্গে খাবেন। আর ভাইজানকেও আমি ফোন করে দিচ্ছি, যদি আসতে পারে, তাহলে তো খুবই ভালো হবে, নইলে ডিনারও আপনি আমাদের এখানেই করবেন।”
ফতিমাও খুব করে জোর করল বলে আর বারণ করতে পারলাম না। আমরা তো একাই থাকি সারাদিন। তাছাড়া ওমরও সুহেলকে খুব পছন্দ করে।
কোয়ার্টারে ফিরে ওমরকে ফোন করে সবটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই ওমর বলল, “ঠিক আছে, আমি দুপুরে খেতে যাব, তুমি একটা কাজ কর, ওদের জন্য কিছু কিনে এনো।”
আমারও এটাই মনে হচ্ছিল। ফোন রেখে তৈরি হয়ে মলে গিয়ে ওদের জন্য বেশ কিছু ঘর সাজানোর জিনিস কিনে বেরোতে গিয়ে আবার আসিফের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। এবার আসিফ মলের বাইরের একটা দোকানে বসে কফি খাচ্ছিল। আমি আসিফের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি কী এখানেই বাড়ি টাড়ি করে থাকা শুরু করে দিয়েছ নাকি?”
আসিফ হেসে উঠে বলল, “আরে বস বস। না, তা না। এক পরিচিতর আসার কথা আছে। সে কারণেই অপেক্ষা করছি।”
আমি বললাম, “পরিচিত না পরিচিতা? ডেট আছে নাকি?”
আসিফ মাথা নাড়ল, “আরে না না। তা না। আমার এক বন্ধু আসবে। কম সময়ের জন্য দেশে আসি তো, সবার সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করেনি যতটা পারা যায়। সমস্যা হল সে বন্ধু একটু আগেই ফোন করে বলেছে আসবে না। আমি কী করব, একটু নিজের সঙ্গেই সময় কাটাচ্ছি। তুমি কী ব্যাপারে এলে?”
আমি ফতিমাদের ব্যাপারটা বলায় আসিফ বলল, “ওহ, তাহলে আর তোমাকে বিরক্ত করব না। তুমি বরং সাবধানে ফিরে যাও।”
আমারও মনে হল আসিফ ঠিকই বলছে। কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। ওর থেকে বিদায় নিয়ে আমি কোয়ার্টারে ফিরে এলাম। ওমর দুপুর নাগাদ এল।
আমার কেনা গিফট দেখে বলল, “এগুলো একটু কমদামি হয়ে গেল না?”
আমি অপ্রস্তুত হলাম, “তা হয়েছে, আমার মনে হল বেশি দামের জিনিস কিনলে তুমি যদি রেগে যাও।”
ওমর হাসল, “না না, আরে সুহেল আর ফতিমাকে দেওয়াই যায়। ঠিক আছে, আমি ওদের জন্য আবার রাতে কিছু কিনে আনব। এখন গিফটটা দেবার দরকার নেই। ওগুলো আমরাই ইউজ করি।”
আমি আর কিছু বললাম না। ওমর ঠিকই বলেছে। ওমর এখন বড়ো পোস্টে চাকরি করে। কমদামি কিছু দেওয়া ঠিক দেখাবে না।
সুহেল আর ফতিমা অবশ্য খুবই যত্ন করে খাওয়াল। ওদের ছেলে আরিয়ানকে দেখে আমার মন খারাপ হয়। আমারও যদি ওর মতো একটা ছেলে থাকত…. ওমরকে এই বিষয়ে কিছু না বললেও ওমর বুঝে গেল।
কোয়ার্টারে ফিরে আমাকে বলল, “জুম্মার দিনে তোমায় রাওয়ালপিন্ডি নিয়ে যাব। তোমার যদি মনে হয়, তাহলে কাউকে অ্যাডপ্ট করা যেতে পারে।”
আমি শুধু ঘাড় নাড়লাম। একবার মনে হল টেস্টের কথাটা বলি।
তারপর মনে হল এখন আবার অফিস যাবে, থাক এসব অপ্রিয় কথা বলার দরকার নেই এখন…
(৬)
ওমরের সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগছিল সুহেলের। লাঞ্চের পর ওমর কোয়ার্টারে ফেরার আগে তাদের আলাদা করে কয়েক মিনিট কথা হল। ওমর সুলতান সাহেবের কথাই জিজ্ঞেস করল প্রথমে, “সুলতান স্যার ঠিক আছেন তো?”
সুহেল মাথা নেড়েছে, “জি। তোমার কথাই বলছিলেন কাল রাতে। ওমর প্রিয় ছাত্র ছিল, ইত্যাদি।”
ওমর খুশি হয়ে বলল, “নিশ্চয়ই আমার পোস্টিঙের ব্যাপারেও বলছিলেন। ওঁকে জানিও, আমি কোন লবি ইউজ করে ও জায়গায় যাইনি। ওপর মহল আমাকে কাবিল ভেবেছিলেন।”
সুহেল বলল, “সুলতান স্যার কিংবা আমি, আমরা দু-জনেই জানি তুমি যথেষ্ট কাবিল। আর কে কী ভাবুক সেটা বড়ো কথা না। আমরা তা ভাবি না।”
ওমর শ্বাস ছাড়ল, “তা না সুহেল, তুমি জানো না এখানে কত রকমের পলিটিক্স চলে। প্রেসিডেন্ট হাউজে থাকা মানে তুমি পলিটিক্সের মধ্যমণি হয়ে গেলে। তোমায় প্রেসিডেন্ট একবার ডেকেছেন, কথা বলেছেন মানে ব্যস, হয়ে গেল। সবার মুখ গোমড়া হয়ে গেল। এদিকে প্রেসিডেন্ট সাব যে আমায় পছন্দ করছেন, তাতে কী আমার কোনো দোষ আছে?”
সুহেল বলল, “তা তো একশোবার। তোমার আরও উন্নতি হোক। সুলতান সাহেবেরও অবশ্য রিটায়ারমেন্টের সময় এগিয়ে এল।”
ওমর চারদিকে তাকিয়ে নিয়ে বলল, “ওই কাজটা কী তোমাকে দেওয়া হয়েছে?”
সুহেল মাথা নাড়ল, “আমি বুঝতে পারছি তুমি কোন কাজের কথা বলছ। ভাঙা বাড়ি তো?”
ওমর বলল, “ইয়েস। খুব সাবধান সুহেল, এটার কথা তুমি ফতিমাকেও বলবে না। আশা করি বলনি।”
সুহেল বলল, “না না। আমি কাউকে বলিনি। তুমি এটা নিয়ে ভেবোই না। সুলতান সাব আমাকে সবটা ব্রিফিং দিয়ে দিয়েছেন।”
ওমর খুশি হল, “গুড। তোমাকে যাতে বর্ডারে না যেতে হয়, সেটা আমি দেখে রাখছি। ইন্ডিয়ানদের কোনো ভরসা নেই। কখন গুলিটুলি চালিয়ে দেয়, কোনো ঠিক নেই।”
সুহেল বলল, “বর্ডার নিয়ে আমরা ভাবি না, ওটা ইন্ডিয়ানদের ভাবনার জিনিস। কখন আমরা আবার অ্যাটাক করব, সেটা নিয়েই ওদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। এমনিতেই কাশ্মীর ওদের মোটেও হোম গ্রাউণ্ড না। ওখানে আমাদের সমর্থ প্রচুর।”
ওমর বলল, “আছে, তবু সাবধান হওয়া ভালো। আমি বেরোই এখন, রাতে হুইস্কি সহযোগে আড্ডা হবে না হয়।”
সুহেল খুশি হল, “বেশ। আমি কিনে রাখব।”
ওমর বলল, “না, এই ট্রিটটা আমি দেব। এই নিয়ে আমি কোনো আপত্তি শুনব না।”
সুহেল আর আপত্তি করল না। ওমর বেরিয়ে যাবার পর ফতিমা বলল, “আচ্ছা সুহেল, তুমি ওমরের মতো ইসলামাবাদে পোস্টিং পেতে পারো না?”
সুহেল বলল, “আমি চেষ্টা করছি ফতিমা। কিন্তু ওখানে আমার ওপরে অনেক দায়-দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়েছে, চাইলেই আমি এখানে চলে আসতে পারি না।”
ফতিমা মন খারাপ করল। তাদের ছেলে আরিয়ান ড্রইংরুমে খেলছিল। সুহেল ফতিমাকে বেডরুমে ডেকে নিয়ে বলল, “শোনো, তোমাকে একটা মজার জিনিস দিচ্ছি। তোমার কাছে রাখো, আর খবরদার, ভুল করে হলেও কাউকে দেখাবে না। জায়নাবভাবিকে দেখানোরও দরকার নেই।”
ফতিমা অবাক হল, “কী এমন জিনিস যেটা কাউকে দেখানো যাবে না?”
সুহেল ডলারগুলো ফতিমাকে দিল।
ফতিমা চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “ইয়া আল্লাহ, এগুলো কোত্থেকে পেলে তুমি?”
সুহেল বলল, “পেয়েছি, মুজফফরাবাদে থাকলে আরও পাব। এবার বল, আমাকে ইসলামাবাদে দরকার না মুজফফরাবাদে?”
ফতিমা বলল, “সত্যি করে বল সুহেল, এগুলো সৎপথের রোজগার তো?”
সুহেল হেসে ফেলল, “আরে হ্যাঁ রে, আবার কী? আমি কী চোর না ডাকাত? এগুলো কাজের ইনাম।”
ফতিমা প্রশ্ন শুরু করল, “কিন্তু কে দিয়েছে এগুলো?”
সুহেল বলল, “তুমি এত প্রশ্ন করলে আমি উত্তর দিতে পারব না ফতিমা। আপাতত আলমারিতে রাখো। পরে যখন আরও পাব, তখন লকারেই রেখ। এ ডলারগুলো আমি ভাঙিয়ে নেব সময় করে। তবে ভাঙাতে ইচ্ছেও করছে না। এগুলোর পরে আরও দাম বাড়বে। তুমি এখানেই রেখে দাও।”
ফতিমা বলল, “আমার ভয় হচ্ছে। ভয়ের কিছু না হলেই হল।”
সুহেল হেসে উড়িয়ে দিল, “ধুস, তুমি শুধু ভয় পাও। নিশ্চিন্তে থাকো, ভয়ের কিছুই নেই। এসব হয়। চল আমরা বরং মল থেকে ঘুরে আসি। জুনিয়রের জন্য কিছু খেলনা কিনে আনা যাক।”
(৭)
জায়নাবের ডায়েরি
রাত দশটা ২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪
আমার রাগ হচ্ছে। ওমরের ওপর খুব রাগ হচ্ছে। লোকটা এমনিতেই ঘরে থাকে না। সারাক্ষণ কাজ কাজ করে মাথা খারাপ করে ফেলে। অথচ কয়েকদিন ধরে বাড়ি ফিরছে যখন, মাতাল হয়ে ফিরছে।
আজকেও ফতিমাদের বাড়িতে দিব্যি সময় কাটছিল, একটা সময় দেখলাম সুহেল ভাইয়ের সঙ্গে মদ খাওয়া শুরু করল।
ওদের ছেলে আছে বাড়িতে। যতই আর্মি কালচার হোক, আমি তো একটু রক্ষণশীল পরিবারের মেয়ে, ওমররাও যে খুব আধুনিক পরিবারের, তা বলা যায় না। ওর মা থাকলে এভাবে মদ খেতে পারত না।
আমি ফতিমাকে বলায় দেখলাম ও নিজেও ব্যাপারটা ভালোভাবে নেয়নি। শুধু বলল, “কী বলব ভাবী, বেশি কিছু বললেই তখন বলে এগুলো আর্মি কালচার, তুমি বুঝবে না। কেন বুঝব না বল তো? আর্মি কালচারের নামে আজেবাজে কাজ করে আসবে, আর কিছু বলা যাবে না?”
আমাকে ফতিমা যত্ন করে খাওয়াল, ওমর বলল ও এখন আসবে না। আমিই রেগে মেগে আমার কোয়ার্টারে চলে এসেছি। বিয়ের প্রথম প্রথম এরকম ছিল না, বিভিন্ন জায়গায় আমরা গেছি। ওমর কাজে ব্যস্ত থাকলেও মদ ছুঁত না। এখন কিছু হলে বলে হাই সোসাইটির লোকজনের সঙ্গে দেখা হলে মদ খেতেই হয়। ওরা নাকি চায়ের মতো মদ খায়। আমার আব্বু এমনিতে আধুনিক হলেও খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট ধর্মপ্রাণ মানুষ ছিলেন, এসব একবারে পছন্দ করতেন না। আব্বু জানলে রাগ করতেন।
অথচ বিকেলটা কিন্তু ভালো কেটেছে। আমরা বেরিয়ে ওদের জন্য ভালো গিফট কিনে এনেছিলাম। মাইক্রোওয়েভ ওভেন। ফতিমা আর সুহেলভাই খুবই অবাক হয়ে গেছে, খুশিও হয়েছে।
পরে ওমর তাল কেটে দিল।
আমার মনে হয় গরীব থাকাই ভালো। একটু সময় খারাপ থাকবে, কিন্তু তখন পরস্পরের মধ্যে অন্তত ভালোবাসাটুকু থাকবে। ওমর যেভাবে এখন মদ খাচ্ছে, রাতে কোয়ার্টারে ফিরে কোনো কোনো দিন না খেয়ে শুয়ে পড়ছে, আমার খুবই খারাপ লাগছে। অন্তত একটা সন্তান হলে ভালো হত। জানি না ওমর সেটা কোনোদিন বুঝবে নাকি।
(৮)
২৩শে ফেব্রুয়ারি, সকাল দশটা
ভোর পাঁচটায় ঘুম ভেঙেছে আজ। ওমর দেখলাম ফজরের নামাজ সেরে এসেছে। আমি চোখ খুলে দেখি ও আমার দিকেই তাকিয়ে আছে। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হল?”
ওমর বলল, “তৈরি হয়ে নাও, আমরা রাওয়ালপিন্ডি যাব।”
আমি আর প্রশ্ন করলাম না। আমি জানি, যতই আমি দত্তক নেবার ব্যাপারে না করি, আমাদের পরিবারে ওমর যা সিদ্ধান্ত নেবে, আমাকে সেটাই মেনে চলতে হবে।
রাওয়ালপিণ্ডির অনাথালয়টা খুবই পুরোনো। অনেক বাচ্চা আছে ওখানে।
উসমান সাহেব আমাদের তার ভাঙাচোরা ঘরে বসিয়ে একটা তিন বছরের ছেলেকে নিয়ে এলেন। বাচ্চাটাকে দেখে কেন জানি না আমার দু-চোখে জল চলে এল। ওমর বলল, “ওর নাম আতিফ। উসমান সাহেবকে বলাই ছিল। তোমাকে বলেছিলাম না একজন বাচ্চাকে উসমান সাহেব আমাদের জন্য আলাদা করে রেখেছেন?”
আমি আতিফকে জড়িয়ে ধরলাম। ওমরকে বললাম, “ওকে নিয়ে চল। আমি বড়ো করব ওকে।”
উসমান সাহেব বললেন, “এখনই না বেটি। আমি কিছু পেপার ওয়ার্কসের কাজ করে তারপর নিজে তোমাদের কাছে ওকে দিয়ে আসব।”
ফেরার পথে ওমরকে শুধু বললাম, “শুক্রিয়া।”
ওমর বলল, “তুমি নিতে চাইছিলে না। আমি জানতাম, এখানে এলে তুমি তোমার মত পালটাবেই। এত এত এতিম বাচ্চা এখানে।”
আমি বললাম, “আমরা আর একবার চেষ্টা এরপরেও করতে পারি না?”
ওমর বলল, “না হলে থাক না জায়নাব। কী দরকার? ওপরওয়ালা আমাদের প্রত্যেককে একটা দায়িত্ব দিয়ে এই পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। ধরে নাও আমাদের দায়িত্ব আতিফকে বড়ো করা।”
আমি বললাম, “তখন মদ খাওয়াটা কমিও। কাল ওদের বাড়িতে বাচ্চাটার সামনে তোমরা মদ খাচ্ছিলে, আমার দেখতে একটুও ভালো লাগেনি।”
ওমর হেসে ফেলল, “আচ্ছা, তাই হবে।”
(৯)
ফতিমার কান্না পাচ্ছিল। সুহেল মাত্র একদিনের জন্য এসেছিল। গাড়িতে উঠে সুহেল হাত নাড়ল। ফতিমার চোখে জল দেখে সে ইশারা করল না কাঁদার জন্য।
মিনিট দশেক পর তার গাড়ি মুজফফরাবাদ হাইওয়ে ধরবে। তাদের অফিসার্স কোয়ার্টারের প্রেমিসেসের বাইরে গাড়ি বেরোতে তার ফোন বেজে উঠল। সুহেল দেখল সুলতান সাহেব ফোন করছেন। সঙ্গে সঙ্গে ধরল সে, “জি জনাব।”
“সুহেল, তুমি কী বেরিয়ে গেছ?”
“জি জনাব।”
“আমার একটা কাজ করে দাও। আমি একটা মেসেজ পাঠাচ্ছি তোমায়, নিজে গিয়ে সেটা উসমান অরফ্যানেজে দিয়ে এস। তারপর ইচ্ছে করলে আজ না এসে কালও ক্যাম্প জয়েন করতে পারো। আমি দেখে নেবো।”
সুহেল অবাক হল, “খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু জনাব?”
“হ্যাঁ, তুমি নিজে যাও।”
“ঠিক আছে জনাব।”
ফোন কেটে দিলেন সুলতান। পরক্ষণেই সুহেলের ফোনে একটা মেসেজ এল। মেসেজটা কিছুই বুঝতে পারল না সে। ড্রাইভারকে বলল, “রাওয়ালপিন্ডি চল। আজ আর মুজফফরাবাদ যেতে হবে না।”
ড্রাইভার অবাক হলেও কোনো প্রশ্ন না করে রাওয়ালপিণ্ডির রাস্তা ধরল।
সুহেল মেসেজটা আবার দেখল, ইংরেজিতে লেখা সাতটা অক্ষর। হাল ছেড়ে দিল, আর বোঝার চেষ্টা করল না সে। ঠিক করল সুলতান না বললে আর জিজ্ঞেস করবেও না।
সুহেল অরফ্যানেজের কাছে গিয়ে ড্রাইভারকে বাইরে অপেক্ষা করতে বলে সে অরফ্যানেজের ভেতরে ঢুকল। বিরাট বড়ো তিনতলা বিল্ডিং, স্কুল ঘরের মতো ঘেরা জায়গা, ক্লাস চলছে, ক্লাস থেকে বাচ্চাদের পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। সুহেল এদিক সেদিক ঘুরে উসমানের খোঁজ করল, তাকে উসমানের অফিসে বসানো হল। কিছুক্ষণ পর উসমান এসে বললেন, “ওহ, সুহেল স্যার। আপনার কথা সুলতান আমাকে বলেছেন।”
সুহেল উঠে দাঁড়াল, “সুলতান স্যারের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা মেসেজ আপনাকে দেবার আছে।”
সে শশব্যস্ত হয়ে ফোনটা বের করতে গেল। উসমান হো হো করে হেসে উঠলেন, “ওহ জনাব, সুলতান স্যার আপনার লেগ পুল করেছেন। উনি আমাকে কোনো কোড পাঠাননি। আপনাকে পাঠিয়েছেন আমার সঙ্গে পরিচিত হতে।”
সুহেল অবাক হয়ে ফোনের মেসেজটা বের করে উসমানকে দেখাল, উসমান হাত-টাত নেড়ে বললেন, “না জনাব। এটা একটা প্র্যাক্টিকাল জোক ছিল। ইসলামাবাদের সঙ্গে মুজফফরাবাদের একটা ব্রিজ ছিলেন সুলতান সাহেব। এবার আপনি এই বিষয়টা হ্যান্ডেল করবেন। এই জন্যই আপনাকে এখানে পাঠানো হয়েছে।”
সুহেল হেসে ফেলল, “আমার বোঝা উচিত ছিল।”
উসমান বললেন, “জি, সুলতান সাহেব খুবই মজার মানুষ। আসলে আমার কাছে পাকিস্তানের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেলেরা আসে, তাদের আমিই শিক্ষিত করি, ওদের শেখাই জেহাদের আসল অর্থ কী। বুঝতেই পারছেন কতটা কঠিন কাজ। এর আগের অ্যাসাইনমেন্টের কথাই ধরুন। আমি না থাকলে কে পাঠাত এতগুলো ছেলে?”
সুহেল বলল, “তা ঠিক। আমিও সেটাই ভাবছিলাম, এত বড়ো প্রতিষ্ঠান না-হলে এই কাজটা একবারেই অসম্ভব ছিল।”
উসমান গর্বের সঙ্গে বলল, “জি, দেশ গড়ার জন্য কিছু আত্মবলিদান তো দরকার। যে কোনো দেশ একদিনে গড়ে ওঠে না। পাকিস্তান তখনই সফল হবে, যখন ইন্ডিয়াকে আমরা সব থেকে বেশি পরিমাণ আঘাত করতে পারব। আমাদের কাশ্মীরি ভাইবোনদের ওপর ইন্ডিয়া যে দমননীতি নিয়েছে, সেখানে আমরা তাদের এটুকু উপহার দিতেই পারি।”
জোরে হেসে উঠলেন উসমান।
সুহেলও হাসল, “তাহলে আমি কী এখন যেতে পারি উসমান ভাই?”
উসমান বললেন, “অবশ্যই। দিন পনেরো পরে নেক্সট অ্যাসাইনমেন্ট আছে। আপনি জানলে খুশি হবেন, আমাদের এই অ্যাসাইনমেন্ট সফল হয়েছে। মৌলানা যাদের ওপারে পাঠাতে চেয়েছিলেন, পাঠাতে পেরেছেন।”
সুহেল খুশি হয়ে বলল, “আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। আপনিই আসল কাজ করছেন।”
উসমান বললেন, “লস্কর সামলাচ্ছি জনাব, কাজ তো করতেই হবে।”
অরফ্যানেজ থেকে বেরিয়ে সুহেল গাড়িতে উঠল।
কোয়ার্টারে ফিরে কলিং বেল বাজাতে ফতিমা দরজা খুলে তাকে দেখে ভীষণ খুশি হল। এই সারপ্রাইজটা দেবে বলেই সে আগে থেকে ফতিমাকে জানায়নি কিছু…
