জায়নাবের ডায়েরি – ১০
(১০)
জয়নাবের ডায়েরি
২৩শে ফেব্রুয়ারি, সন্ধে সাড়ে ছ-টা
সম্পর্কে ছোটোখাটো সারপ্রাইজ থাকলে সে সম্পর্ক সব থেকে সুন্দর হয়ে ওঠে। সুহেল আজ ডিউটি যায়নি, কাল যাবে শুনে ফতিমা শিশুর মতো লাফাতে লাফাতে আমাকে সে খবর দিতে চলে এসেছিল।
আমি বললাম, “মাশাল্লাহ, এ তো খুব ভালো খবর, তুমি আমার কাছে না এসে তোমার বরের কাছে যাও। আচ্ছা পাগলি তো তুমি।”
ফতিমা লজ্জা পেল, জিভ কাটল এবং আবার নিজের কোয়ার্টারের দিকে রওনা দিল। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। আমাদের জীবন থেকে এরকম রোম্যান্স করেই বিদায় নিয়েছে।
ওমর বাড়ি ফিরলে এই খবরটা শুনে একটা নীরস ‘ও আচ্ছা?’ বলা ছাড়া যে আর কিছু করবে না, সেটা আমার থেকে ভালো আর কে জানে?
আমার সময়টাই নেই, আমার কোনো কথাও শুনবে না। আজ ওমরের আম্মিও ফোন করেছিলেন। তিনি জানালেন এখনই আসতে পারবেন না। আমি অরফ্যানেজের কথাটা বলায় শুধু বললেন, আমরা যা ভালো বুঝে সিদ্ধান্ত নেব, উনি তাতেই খুশি। আমার মাঝে মাঝে ভীষণ কান্না পায়। সবাই কেমন আমার থেকে দূরে চলে যাচ্ছে।
আমি লাঞ্চের পর আবার মলে গিয়ে ঘুরলাম। এটা সেটা আজেবাজে জিনিস কিনলাম। একই বই, আমি জানি সেটা আমার কাছে আছে, আর একবার কিনে ফেললাম। প্রায় দু-ঘণ্টা একা একা ঘোরার পর কোয়ার্টারে ফিরতে গিয়ে আমাদের আর্মি কোয়ার্টারের রাস্তায় আসিফকে পেলাম। চিন্তিত মুখে একটা গাছের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কী যেন দেখছিল। ওকে গাড়িতে তুলে নিয়ে বললাম, “সত্যি করে বল তো আসিফ, তুমি কী আমাকে ফলো করছ? কোন খুফিয়া মিশন আছে তোমার?”
আসিফ বলল, “না, আজকে আমি ইসলামাবাদের গাছগুলো মন দিয়ে দেখছিলাম। তুমি খেয়াল করেছ জায়নাব, পাকিস্তানের অন্যান্য শহরে ইসলামাবাদের মতো এত গাছ নেই। কেন বলতো? প্ল্যান করে শহরটা হয়েছে বলে?”
আমি বললাম, “লাহোরেও অনেক গাছ আছে। তুমি লাহোর ভুলে গেলে কী করে তাই ভাবছি।”
আসিফ বলল, “লাহোর ভুলব তা কী করে হয়? তোমাকেও তো ভুলতে পারিনি। গাড়িটা দাঁড় করাও জায়নাব, তোমায় একটা কথা বলার আছে।”
আমি গাড়িটা দাঁড় করালাম। আমার অবচেতন বলছিল আসিফ আমাকে কিছু কথা বলতে চায়। ঠিক এই কারণেই আমি যেখানে গেছি, ওকে দেখতে পেয়েছি। ও ইচ্ছে করে আমার পথে চলে এসেছে বার বার।
বললাম, “বল কী বলবে।”
আসিফ চারদিকে দেখে নিয়ে বলল, “জায়নাব, আমরা দেশ হিসেবে খুব বড়ো একটা পাপ করছি।”
আমি অবাক হলাম, “মানে? মাঝরাস্তায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে হেঁয়ালি করছ কেন বল তো? কী ব্যাপার?”
আসিফ পকেট থেকে ওর ফোন বের করে একটা ফটো এগিয়ে দিল আমার দিকে। একটা ট্রাকে গবাদি পশুর মতো ছোটো ছোটো বাচ্চাকে গাদাগাদি করে বসিয়ে কোথাও নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাচ্চাগুলো কালো জামা পরে আছে।
আমি বললাম, “ঈশ, কী করুণ এই ছবিটা। এটা তুমি কোথায় পেলে?”
আসিফ বলল, “আমরা এই বাচ্চাদের ইন্ডিয়ান বর্ডারে পাঠাই, নিরস্ত্র। দু-পক্ষের গুলি চালাচালির মাঝে এই বাচ্চাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তান।”
আমি শিউরে উঠলাম, “সে কী?”
আসিফ বলল, “হ্যাঁ, এবং এই বাচ্চাগুলো কেউ বেঁচে থাকে না জায়নাব। গুলি খেয়ে বর্ডারে মরে পড়ে থাকে। একবার কল্পনা কর শুধু।”
আমার মাথা ঘোরাচ্ছিল। বললাম, “তুমি এগুলো কী করে জানলে?”
আসিফ বলল, “আমি ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় কাজ করি। শুধু এই খবরটা কভার করতে আমাকে পাঠানো হয়েছে। তোমার হাজব্যান্ডও যদি জানে আমি এই কাজে যুক্ত, তাহলেও আমার জীবন বিপন্ন হতে পারে।”
আমি বললাম, “না না, ওমর ওরকম লোকই না।”
আসিফ হাসল, বলল, “ওমরও যুক্ত আছে এই কাজে। হিউম্যান ট্র্যাফিকিং, হিউম্যান শিল্ড, বাচ্চাদের সুইসাইড বম্বার বানানোর কাজে… সব কিছুতেই জড়িত আছে।”
আমি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলাম। সত্যি বলতে কী, কথাগুলো ভাবলে এখনও আমার সমস্ত বোধবুদ্ধি শূন্য হয়ে যাচ্ছে।
বললাম, “আমার থেকে কী চাইছ তুমি?”
আসিফ বলল, “তোমার হাজব্যান্ডের গোপন ফাইলগুলো তোমাদের কোয়ার্টারেই থাকে।”
কথাটা বলে আসিফ চুপ করে গেল।
আমি রেগে গেলাম এবার। বললাম, “গাড়ি থেকে নেমে যাও আসিফ। তোমার উদ্দেশ্য একবারেই ভালো না।”
আসিফ কাতর মুখে বলল, “প্লিজ জায়নাব। ওমরের থেকে আমি পাকিস্তানকে কোনো অংশে কম ভালোবাসি না। তুমি নিজে একবার ভেবে দ্যাখো, ওই ছোটো বাচ্চাগুলোর কী দোষ? ওদের কী সেই বিচার বুদ্ধি হয়েছে যে ওরা সুইসাইড বম্বার হতে চলে যাচ্ছে? আমরা সব জেনে চুপ করে থাকলে তো ওদের খুনের দায়ে আমাদের হাতও রক্তাক্ত হয়ে যাচ্ছে, তাই না? উসমান অরফ্যানেজে গোটা দেশের বাচ্চাদের একত্রিত করা হয়। তারপর একটা করে লট ওরা কাশ্মীরে পাঠায়। কোনো অপারেশন এক মাস পর পর হয়। কোনোটা এক বছর। ওই বারো তেরো বছরের বাচ্চাগুলোর মধ্যে সাতজন বর্ডারে ইলেকট্রিক শক খেয়ে মারা গেছিল। ভাবো একবার।”
আমি সকালেই উসমান অরফ্যানেজে গেছিলাম। আসিফের কথা শুনে একটু চমকে উঠলাম। বললাম, “তুমি সত্যি বলছ, ওমর আছে এর মধ্যে?”
আসিফ বলল, “হ্যাঁ, শুধু ওমর না। এবার থেকে তোমার প্রতিবেশি সুহেলও প্রত্যক্ষভাবে এই কাজটা করবে। দেশ হিসেবে আমরা অনেকদিন আগেই সব যুদ্ধে হেরে গেছি। এই যুদ্ধটা আমরা যদি দেশের ভেতর থেকে ঠিক না করতে পারি, সেই হারের লজ্জা পুরো পাকিস্তানবাসীর হবে।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে, আমি ওমরের সঙ্গে এই ব্যাপারে আজকেই কথা বলব।”
আসিফ বলল, “একবারে না। ওমরকে এই কথা কোনোভাবেই বলে লাভ নেই। ওমররা এই সিস্টেমের অংশ। তুমি চেষ্টা করে দ্যাখো যদি কোনোভাবে উসমান অরফ্যানেজের কোনো ফাইল ওমরের থেকে পেতে পারো। যদি পাও, তাহলে বাচ্চাগুলোকে বাঁচাতে পারব। নইলে…”
আসিফ চুপ করে গেল।
আমার হাত-পা কাঁপছিল। একটু ‘আম্মি’ ডাক শুনব বলে আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি আর ওমর এত কিছু করে ফেলছে? ওর কী একবারও আমার কথা মনে হল না?
আসিফ বলল, “আমার নাম্বারটা সেভ করে নাও। যা পাবে আমাকে পাঠাবে। আর অবশ্যই সাবধানে পাঠিও। মনে রেখ, ওমর তোমাকে যতই ভালোবাসুক, ও যদি তোমার সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ করে, তোমাকে মেরে ফেলতে ওর এক মুহূর্তও লাগবে না।”
আমি শিউরে উঠলাম। আজ থেকে আমি এই ডায়েরিটা আমার লকারে রাখব। একটা দুপুর আমার জীবনটাকে এভাবে তছনছ করে দিতে পারে, আমি ভাবতেও পারিনি।
(১১)
“সুলতান সাহেবের জোকটা কেমন লাগল?”
রাত ন-টা। কলিং বেলের শব্দ শুনে দরজা খুলে সুহেল দেখল বাইরে ওমর দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা স্কচের বোতল।
সুহেল হেসে বলল, “এস, এরকম সারপ্রাইজ পাব, আমি ভাবতেই পারিনি।”
ওমরকে নিয়ে স্টাডিরুমে ঢুকল সুহেল।
টেবিলে বোতলটা রেখে ওমর বলল, “আমাকে সুলতান সাহেব ফোন করেছিলেন। তোমাকে আর একবার ব্রিফ করে দিতে বললেন।”
সুহেল বলল, “আমি যতটা বুঝেছি, বলি?”
“গো অ্যাহেড।”
“উসমান সাহেবের অ্যাসাইনমেন্ট পাঠাবেন, আমরা তাদের বর্ডারে পাঠাব লোকেশন অনুযায়ী, পরদিন মৌলানার সঙ্গে দেখা করতে হবে। ঠিক বলছি?”
ওমরের মুখে হাসি ফুটে উঠল, “টু হান্ড্রেড পারসেন্ট। এবং এই ওপেন সিক্রেটটা কোথাও আলোচনা করা যাবে না। আমরা খুব বড়ো একটা কিছু প্ল্যান করছি সুহেল।”
সুহেল বলল, “সেটা কী আমি এখন জানতে পারব? না সময়ে জানানো হবে?”
ওমর বলল, “আমরা যত কম জানতে পারব, আমাদের জন্য সেটা তত ভালো হবে। বুঝতেই পারছ, কাশ্মীর ইস্যুটা আমাদের কাছে কতটা সেনসিটিভ।”
সুহেল বলল, “তা আর বলতে। এই বিষয়টা কী আমাদের ওপর মহল…”
ওমর বলল, “সবাই জানে। এটা একটা সিক্রেট অপ। কাশ্মীরে পাকিস্তান এই মুহূর্তে অনেকটাই ব্যাকফুটে আছে। ইন্ডিয়া নতুন নতুন কনস্ট্রাকশন করছে, আম কাশ্মীরিদের অনেক রকম প্রলোভন দেখাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমরা যদি হস্তক্ষেপ না করি, তাহলে ভবিষ্যতে কাশ্মীর থেকে আমাদের হাত ধুয়ে ফেলতে হবে।”
সুহেল গ্লাসে স্কচ ঢালল। বরফ আনতে গিয়ে দেখল ফতিমা থমথমে মুখে বসে আছে। সে গলা নামিয়ে বলল, “খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা হচ্ছে। রাগ কর না প্লিজ।”
ফতিমা বলল, “হ্যাঁ, দেখতে পাচ্ছি কত গুরুত্বপূর্ণ কথা বলছ। মদ খাবে বলে বরফ নিতে এসেছ।”
সুহেল কথা না বাড়িয়ে স্টাডিতে ঢুকে গেল।
ওমর গ্লাসে চুমুক দিয়ে বলল, “ওপাশে আমাদের জিনিসপত্র স্টোর করার কাজ শুরু হয়েছে। অস্ত্র, আর ডি এক্স… সব। এ-প্রান্ত থেকে রিসোর্স না পাঠালে ও-পারে আমাদের লোক কাজ করবে কী করে? অ্যালারমিং একটা বিষয় হল আগে কাশ্মীরের ওদিক থেকে অনেক যুবক এ-পারে ট্রেনিং নিতে আসত। এখন সংখ্যাটা কমছে। দিল্লি ওদের অনেক রকম লোভ দেখাচ্ছে। আগেরদিন প্রেসিডেন্ট সাহেব বলছিলেন দিল্লির এই লোভ দেখানোটাই বন্ধ করতে হবে। বাই দ্য ওয়ে, প্রেসিডেন্ট সাহেব কিন্তু তোমার নাম জানেন। আমি ওকে তোমার কথা বলেছি। সুলতানের উত্তরসুরি নিয়ে উনি চিন্তিত ছিলেন। আমি বুঝিয়েছি তোমাকে আমি অনেকদিন ধরে চিনি। তুমি সুলতানের থেকেও অনেক ভালোভাবে কাজটা করতে পারবে।”
সুহেল কৃতজ্ঞ বোধ করল, বলল, “অনেক শুক্রিয়া তোমাকে।”
ওমর বলল, “আমাদের কাজের সব থেকে বড়ো কথা হল গোপনীয়তা। মনে রাখবে, তুমি যখন মৌলানার সঙ্গে দেখা করতে যাবে, তখন তুমি একা যাবে। তোমার সঙ্গে যেন কেউ না যায়। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে লক্ষ রাখবে তোমাকে কেউ ফলো করছে নাকি। যদি ফলো করে, তবে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেবে।”
সুহেল বলল, “ঠিক আছে, এভাবেই আমি কাজ করব। আমি জানি, আমি পারব।”
ওমর হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, “আমি এবার উঠি। মনে রেখ, এই কাজটা সফলভাবে করতে পারলে ভবিষ্যতে তোমার অনেক লাভ হবে।”
সুহেল বলল, “ইন্ডিয়া যখন এই ছেলেগুলোকে ধরবে, ওদের মধ্যে যদি কেউ বলে দেয় আমরা এভাবে ওদের পাঠাচ্ছি?”
ওমর বলল, “বলবে না। এই ছেলেদের সেভাবেই তৈরি করা হয়। হয় ওরা মরবে, নয় মারবে। ছোটো থেকে ওদের ওভাবেই তৈরি করা হয়।”
সুহেল বলল, “যাক, তাহলে আর চিন্তার কিছু নেই। ইন্ডিয়া এবার বুঝবে, পাকিস্তান কী করতে পারে।”
ওমর বলল, “আর কাউকে….”
সুহেল ওমরের কথা শেষ হবার আগেই বলল, “বলব না। কোনো প্রশ্নই ওঠে না কাউকে কিছু বলার।”
ওমর শুভরাত্রি বলে বেরিয়ে গেল। ঘরের বাইরে গিয়ে সুহেল দেখল ফতিমা বিরক্ত মুখে বসে আছে। তাকে দেখে বলল, “প্রতিদিন মদ খাওয়াটা আমি পছন্দ করছি না।”
সুহেল কান ধরল, “আর হবে না। নিশ্চিন্ত থাকো তুমি।”
(১২)
জায়নাবের ডায়েরি
২৪শে ফেব্রুয়ারি, সকাল দশটা
সারারাত আমি ঘুমোতে পারিনি। আসিফকে আমি আজ থেকে দেখছি না। আমাদের বাড়িতে যখন বাবার কাছে ছেলেটা আসত, তখন থেকেই জারনালিজমের প্রতি ওর ভালোবাসার কথা বলত। তবু একবার আমার আপাকে ফোন করেছিলাম কাল রাতে। আপাকে তো সরাসরি আসিফের কথা বলা যায় না, এ-কথা সে-কথা বলে তারপর হঠাৎ করে বলেছি, “শোন না আপা, তোর আসিফকে মনে আছে? আমাদের বাড়ি আসত?”
আপা বলল, “হ্যাঁ, কেন মনে থাকবে না? কী হয়েছে?”
আমি বললাম, “ওর সঙ্গে দেখা হয়েছিল এখানে। ও কিছুদিনের জন্য দেশে এসেছে। এখন বাইরে থাকে।”
আপা বলল, “বাঃ। লাহোর আসবে না? আবার দেখা হলে আমাদের সঙ্গে দেখা করে যেতে বলবি। আম্মি খুব খুশি হবে।”
আমি বললাম, “আচ্ছা আপা, তোর ওকে কেমন ছেলে বলে মনে হয়?”
আপা অবাক হয়ে বলল, “এ কেমন প্রশ্ন? কেমন ছেলে বলে মনে হবে মানে?”
আমি বললাম, “মানে বল না, কেমন বলে মনে হয়? ভালো? বিশ্বস্ত?”
আপা বলল, “কী হয়েছে বল না?”
আমি লজ্জা পাবার ভান করে বললাম, “আমার মনে হত ও আমাকে ভালোবাসে।”
আপা বলল, “ধুস, না না। ও বিশ্বস্ত ছেলে, ওসব ছিল না। ভাবিস না। কেন তোর আবার এখন এসব মাথায় আসছে নাকি?”
আমি বললাম, “না না। ধুস। কী যে বলিস। এমনি জিজ্ঞেস করলাম। সিস্টার টু সিস্টার টক। এমনি জানতে চাইলাম। টিনেজের কৌতূহল ছিল তো, তাই আর কী। তখন লজ্জা পেতাম।”
আপা বলল, “না না ওসব কিছু ভাবিস না। ও ভালো ছেলে। লাহোরেই থাকত, আব্বু ওকে খুব বিশ্বাস করত। ওরকম কিছু না।”
আমি আশ্বস্ত হলাম। আমারও আসিফকে কোনোদিন খারাপ ছেলে বলে মনে হয়নি। আসিফের কথা অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিল না।
আবার ওমরকেও বা কী করে অবিশ্বাস করি? প্রথম যেদিন ওমরকে দেখেছিলাম, সেদিনই ওর প্রেমে পড়েছিলাম। অসম্ভব হ্যান্ডসাম, পেটানো চেহারা, বলিউডের যে কোনো হিরো ওর কাছে প্রতিযোগিতায় যে-কোনো দিন হেরে যাবে। ওর চোখ দুটোর মধ্যে এক আশ্চর্য মাদকতা ছিল। আমার মনে হত বাকি জীবনটা আমি ওর চোখের দিকে তাকিয়েই কাটিয়ে দিতে পারি।
ও আর্মিতে না গিয়ে শায়েরও হতে পারত। চোখ দুটো যে কাউকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখে। এমন ছেলেটা এরকম কাজ করছে ভাবতে আমার কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু আমি জানি, ওমর এই কাজ করতে পারে। ওই কবির মতো চোখ দুটোয় আমি নিষ্ঠুরতা দেখেছি।
যে সেনাবাহিনীকে আমরা এত শ্রদ্ধা করি, যে কাজকে এর অ্যাডভেঞ্চারাস ভাবতাম, এত রোম্যান্টিসিজম ছিল আমার যার ওপরে, তারা কী করতে পারে আমি কাশ্মীরে দেখেছি। এক সতেরো আঠেরো বছরের ছেলেকে আমার চোখের সামনে ওমরের নির্দেশে গুলি করে মারা হয়েছিল সেদিন।
ওমর ধীর স্থির শান্ত প্রকৃতির ছেলে। ওর চোখে প্রেমের পরিবর্তে সেদিন ভয়ংকর এক খুনিকে দেখতে পেয়েছিলাম আমি।
খুন যাকেই করা হোক, সে যতই দেশদ্রোহী হোক, যে খুনি, তার চোখ অন্যদের মতো হবে না। আলাদাই হবে।
ওমরকে আমি সেদিন থেকেই ভয় পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু আসিফের কথা শুনে আমার মনের কোণে একটু একটু করে ঘৃণাও জন্মাচ্ছে। শুধু ওমরের ওপরে না, আমার দেশের ওপরে না, এই সমস্ত কিছুর ওপরে, যেখানে একজন একরত্তি ছেলেকে ওরা মরতে পাঠিয়ে দিচ্ছে তাদের অজান্তেই।
রাতে সুহেলের কোয়ার্টার থেকে ও যখন এসেছিল, আমি শোয়ার ভান করে বিছানায় পড়েছিলাম। ওমর আমাকে ডাকলও না। নিজের আলমারি খুলে কাগজপত্র বের করে অনেকক্ষণ কাজ করে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল।
ওমর কোথায় ওর আলমারির চাবি রাখে, আমি জানি। ওমর ওর লকারের পাস কোড কাউকে বলে না, তবে আমি সেটাও জানি। কৌতূহলবশতঃ ও যখন ছিল না, একবার লকার খুলে দেখেওছিলাম। একটা নোটপ্যাডে সাঙ্কেতিক কিছু লেখা ছিল। আর্মি কোড বা ওই ধরনের কিছু হবে বুঝে আমি বেশি না ঘেঁটেই রেখে দিয়েছিলাম। ঠিক করলাম ওগুলোরই ছবি তুলে আসিফকে পাঠাব। ওতে যদি কিছু বাচ্চার প্রাণ বাঁচে, তো বাঁচুক। এতে যদি আমি দেশদ্রোহী হই, তো হলাম। আমার কিছু যায় আসে না।
ওহ, আর একটা কথা লিখতে ভুলে গেছিলাম, আমি ব্রেকফাস্টের সময় ওমরকে বলে দিয়েছি বাচ্চাটা যেন তাড়াতাড়ি দত্তক নেওয়া হয়। নিজের মনেই বার বার একটা কথা ঘুরে বেড়াচ্ছে কাল থেকে। দত্তক না নিলে যদি ওরা ওই বাচ্চাটাকেই মরতে পাঠিয়ে দেয়?
(১৩)
২৪শে ফেব্রুয়ারি, মুজফফরাবাদ, পাক অধিকৃত কাশ্মীর
দুপুর বারোটা।
লাঞ্চ শুরু হয়েছে। সুহেল সুলতানের সঙ্গে খেতে বসেছে।
সুলতান বললেন, “বউয়ের কাছে ফিরে কেমন লাগল?”
সুহেল বলল, “ভালো লেগেছে জনাব।”
সুলতান বললেন, “আর এখন মন খারাপ?”
সুহেল হাসল, “না না জনাব। মন খারাপ কেন হবে? মন খারাপ করার উপায়ই নেই। এখানে তো সবাই আছে। মন খারাপ কেন হবে?”
সুলতান বললেন, “ঠিক। কাজের জায়গায় কোনো মন খারাপ নেই। সবটাই আমাদের কর্তব্য। ওমরের সঙ্গে কথা হয়েছে?”
সুহেল বলল, “জি জনাব। আমাকে সব নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সবাই আপনার অবসর নিয়েই চিন্তিত। আপনি এত কাবিল একজন অফিসার ছিলেন।”
শেষের কথাগুলো সুহেল সুলতানকে খুশি করতেই বলল। সুলতান খুবই খুশি হলেন, “সে যা-ই হোক, আমি আমার ব্যাটন একজন আমার মতোই কাবিল অফিসারকে দিয়ে যাচ্ছি, এতেই আমি সন্তুষ্ট। উসমানের সঙ্গে টিউনিংটা ঠিক রেখ। উসমান খুব কঠিন একটা কাজ করছে।”
সুহেল বলল, “অবশ্যই জনাব।”
সুলতানের ফোন বেজে উঠল, সুলতান ফোনে কথা বলতে বলতেই উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন। মিনিট খানেক পর ফোন রেখে এসে সুহেলকে বললেন, “তুমি কী এই ব্যাপারে কাউকে কিছু বলেছ?”
সুহেল মাথা নাড়ল, “না জনাব। আমার স্ত্রী-ও এই ব্যাপারে কিচ্ছু জানে না।”
সুলতান সুহেলের কলার চেপে ধরল, “সত্যি করে বল। মনে রেখ, তুমি মিথ্যে বললে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না।”
সুহেল অসহায় কণ্ঠে বলল, “বিশ্বাস করুন জনাব, আমি কাউকে কিছু বলিনি। আপনি আমাকে খুব ভালো করে চেনেন, এতগুলো অপে আমি আপনার সঙ্গে কাজ করেছি। কখনও মনে হয়েছে আমি মন্ত্রগুপ্তি ভাঙতে পারি?”
সুলতান সুহেলের কলার ছেড়ে দিলেন। হাত ধুয়ে এসে বললেন, “আজ আর খাওয়া হবে না।”
সুহেল বলল, “কিন্তু কী হয়েছে জনাব?”
সুলতান বললেন, “ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় ইন্ডিয়া থেকে দাবী করা হয়েছে আমরা এখানে চাইল্ড ট্র্যাফিকিং করছি। তুমি সবে আমার থেকে কাজটার হ্যান্ডওভার পেলে আর এখনই এটা নিউজ হতে হল?”
সুহেলের মুখ সাদা হয়ে গেল, “বিশ্বাস করুন জনাব, এটা বড়ো কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ। আপনি আমার ফোন চেক
করুন, সব কিছু মিলিয়ে দেখুন, আমি আমার দেশের সঙ্গে এত বড়ো গদ্দারি কিছুতেই করতে পারব না।”
সুলতান থমথমে মুখে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে বেরিয়ে নিজের চেম্বারে গেলেন। আই.এস. আই. চিফের ফোন আসছে। ফোন ধরে বললেন, “জনাব।”
“আপনি সুহেলকে সরিয়ে দিন। ও যে কেপেবল না, ও প্রমাণ করে দিয়েছে। শুট হিম।”
সুলতান বললেন, “জনাব, আমাকে একটু সময় দিন। আমি বিশ্বাস করি না সুহেল এই কাজ করতে পারে। আমার মনে হয় অন্য কেউ আছে। ও যথেষ্ট দায়িত্ববান অফিসার। আমি ওর গ্যারান্টি নিচ্ছি।”
‘এক দিন। এর মধ্যে আপনি খুঁজে বের করুন কোত্থেকে খবর লিক হয়েছে। ওরা ছবি পেল কী করে? আপনি আপনাদের ক্যাম্পের ভেতরেই তো আনলোডিং করেছিলেন?”
“জি জনাব।”
“তাহলে আপনাদের ক্যাম্প থেকেই খবর লিক হয়েছে। রিপোর্ট মি এসাপ!”
“রাইট জনাব।”
ফোন কেটে গেল। সুলতানের চোখ লাল হয়ে গেছে। এতদিন ধরে নির্বিঘ্নে এত বড়ো কাজ করে এসেছেন, এর মধ্যে খবর লিক হয়ে গেল? একদিনের মধ্যে কী-ই বা করবেন তিনি?
ফোন তুলে ক্যাম্পের সিকিউরিটি অফিসারকে ডেকে পাঠালেন। ভদ্রলোক তার চেম্বারে প্রবেশ করামাত্র তিনি বললেন, “এই ক্যাম্পের প্রত্যেকের ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করা শুরু করেন। যাকে সন্দেহ হবে, লোকাল ইনফরমারদের সঙ্গে কন্ট্যাক্ট করে জানার চেষ্টা করুন এরা সত্যিই ওই এলাকার ছেলে নাকি।”
সিকিউরিটি অফিসার চোখ উলটে বললেন, “জনাব, এই ক্যাম্পে অন্তত তিন হাজার জওয়ান আছে। এতজনের মধ্যে কাউকে খোঁজা সম্ভব?”
সুলতান বললেন, “সেটা আপনার মাথাব্যথা। আপনি খুঁজে বের করুন কীভাবে কী করবেন। এই ক্যাম্প থেকে ছবি লিক হয়েছে। ক্যাম্পের ছবি বাইরে পাঠানো হয়েছে। কী করে হয়েছে, বের করুন।”
কাঁচুমাচু মুখে সিকিউরিটি ইন চার্জ কাতর কণ্ঠে বললেন, “আপনি যেমন বলবেন জনাব!”
(১৪)
জায়নাবের ডায়েরি
চব্বিশে ফেব্রুয়ারি, রাত আটটা
আজ অনেক কিছু হল। অনেক কিছু…
বারোটা নাগাদ ঘামতে ঘামতে ওমর এসে হাজির হয়েছে।
দরজা খুলে ওকে দেখে বিধ্বস্ত মনে হল।
আমি বললাম, “কী হয়েছে?”
ওমর চোয়াল শক্ত করে মাথা নেড়ে বলল, “কিছু হয়নি। স্নান করতে হবে।”
বলে সরাসরি বাথরুমে ঢুকে গেল। টেবিলের ওপর ওর ফোন রাখা ছিল। ফোনের রিংটোন বাজতে শুরু করে দিয়েছে। ওমর বাথরুমে থাকলে আমি ফোন ধরি না। তবে টেবিলের কাছে গিয়ে দেখলাম প্রেসিডেন্ট হাউজ থেকে ফোন আসা শুরু হয়েছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ও ফোন ধরে ওর ঘরে চলে গেল। মিনিট খানেক পরে বেরিয়ে এসে ড্রইংরুমে টিভি চালাল। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ায় বাচ্চাদের ছবিটা দেখানো হচ্ছে।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”
ওমর চোখ মুখ কুঁচকে বলল, “কিছু হয়নি। ফালতু কতগুলো মিডিয়া, কোনো খবর নেই। ফালতু জিনিস দেখাতে শুরু করেছে।”
পরক্ষণেই শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বলল, “ওই সুহেল আজ ভোরেই বেরিয়ে গেছে না?”
আমি বললাম, “জি, গাড়ি আসতে দেখেছিলাম তো! তারপর অবশ্য ফতিমার সঙ্গে কোনো কথা হয়নি। কেন বল তো?”
ওমর বলল, “ফালতু ছেলে। একটা কাজ দেওয়া হয়েছিল। সেটাও ভালো করে করতে পারল না। এই জন্য বলে এই সব করাচির ছেলেদের ওপর বিশেষ ভরসা করতে নেই। লোকাল ট্রেনে পকেটমারি আর ছিনতাইয়ের কাজই এরা ভালো জানে। আর্মি-ফার্মি এদের জন্য না।”
আমি বললাম, “এভাবে বলছ কেন? ওরা তো খুবই ডিসেন্ট ফ্যামিলি।”
ওমর আমাকে চমকে দিয়ে চিৎকার করে উঠল, “ডিসেন্ট? কীসের ডিসেন্ট? একবারে ফালতু, ডিসেন্টের ধারে কাছ দিয়ে কেউ যায় না। আমাদের সিক্রেট খবর মিডিয়ায় লিক করে দিয়েছে বুঝেছ? এবার ওর কোর্টমার্শাল হবে। দ্যাখো, দুপুরের মধ্যেই ওকে গুলি করে লটকে দেওয়া হবে।”
আমি শিউরে উঠলাম, “সেকী! কোর্টমার্শাল হবে এর জন্য?”
ওমরের সেই চোখটা দেখতে পেলাম আমি, “ইয়েস, কোর্টমার্শাল হবে। পাকিস্তান আর্মি ইজ নট এ জোক। যারা এখানে কথা পেটে রাখতে পারে না, তাদের এভাবেই ট্রিট করা হয়। ফতিমাকে এখনই কিছু বলার দরকার নেই। খবর ওখান থেকেই আসুক। তুমি বরং মলে ঘুরে টুরে এসো। এখন ঘরে থাকার দরকার নেই। তাহলে তোমাকে আবার ওর কাছে সান্ত্বনা দিতে যেতে হবে। আমি চাই না তুমি ওখানে যাও। হলে ওরা আমাকেও সন্দেহ করতে পারে।”
শেষের দিকে ওমরের গলায় ভয়ের চিহ্ন দেখতে পেলাম আমি।
আমার বুকটা কেঁপে উঠল। আমি আসিফকে শুধু ওই ডায়েরির ছবি পাঠিয়েছি, তারপর এত কিছু হয়ে গেল? এটা তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আসিফের কাজ। আমার জন্য ফতিমার এত বড়ো ক্ষতি হয়ে যাবে? ওদের বাচ্চাটা! ওদের ফ্যামিলি। ওহ আল্লাহ, আমি এটা কী করে ফেললাম?
আমি ভেতরে ভেতরে নড়ে যাচ্ছিলাম।
ওমর অস্থিরভাবে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “রেডি হও। আমরা বেরোব।”
আমি ভয় পাচ্ছিলাম, ভীষণ ভয় পাচ্ছিলাম। আতঙ্ক আমাকে পুরোপুরি গ্রাস করে ফেলছিল।
কাঁপতে কাঁপতে বেডরুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে আসিফকে ফোন করলাম। আসিফের ফোন সুইচড অফ বলছে। আমি ফোন রেখে তৈরি হয়ে নিলাম।
কয়েক সেকেন্ড পরেই দরজা ধাক্কাতে শুরু করল ওমর, “আরে তাড়াতাড়ি কর, বেরোতে হবে।”
আমি তৈরি হয়ে বেরোলাম। গাড়িতে উঠে ওমর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলল, “তোমাকে মলে নামিয়ে আমি অফিস যাচ্ছি। তুমি সন্ধের আগে কোয়ার্টারে ফিরবে না। সিনেমা দেখতে ঢুকে যাও। আমি তোমাকে ফোন করব। কনফার্ম করলে ফিরবে। ঠিক আছে?”
আমি ঘাড় নাড়লাম, “জি।”
মলের সামনে নামিয়ে দিয়ে ওমরের গাড়ি বেরিয়ে গেল। আমি গেট থেকে মলের ভেতর ঢুকতে যাচ্ছি, এমন সময় আমার ফোন বেজে উঠল, ধরলাম, ও-প্রান্ত থেকে আসিফের গলা ভেসে এল, “তুমি আমাকে ফোন করেছিলে?”
আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমি এসব কী শুনছি? আমার জন্য সুহেলের কোর্টমার্শাল….?”
আসিফ বলল, “তুমি এখন কোথায় আছ?”
আমি মলের নাম বললাম।
আসিফ বলল, “পারকিং-এ এসে দাঁড়াও। আমি তোমাকে তুলছি।”
আমি বললাম, “ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণের মধ্যেই আসিফ গাড়ি নিয়ে হাজির হল।
আমাকে গাড়িতে উঠতে বলল।
আমি গাড়ির পেছনের সিটে বসলাম।
আসিফ মলের অনেকটা পেছনে একটা ফাঁকা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করিয়ে বলল, “শোনো জায়নাব, একটা সিস্টেম দিনের পর দিন নিরীহ বাচ্চাদের বলি চড়িয়ে গেছে, তাদের মেরেছে। ভবিষ্যতেও মারবে। সব কিছু জেনে শুনে আমরা চুপ থাকব?”
আমি বললাম, “কিন্তু সুহেল …?”
আসিফ বলল, “সুহেলও করবে এই কাজ। আগে অন্য কারও নির্দেশে করেছে, এখন নিজে করবে। এটাকে কোল্যাটেরাল ড্যামেজ হিসেবে দ্যাখো। মানুষ হিসেবে আমাদের কিছু কর্তব্য আছে। সুহেলকে যদি কোর্টমার্শাল করাও হয়, ওর পরিবার অনেক কিছু পাবে। ওদের কোনো ক্ষতি হবে না। ওর বউয়েরও দু-দিন পরে ভালো জায়গায় বিয়ে হবে। তুমি অন্য দিকে বাচ্চাগুলোর কথা ভাবো…. ঠিক?”
আসিফ ঠিক বলেছে। আমার চোয়াল শক্ত হল, বললাম, “তুমি ঠিক আসিফ। আমার এই মেন্টাল সাপোর্টটার দরকার ছিল। আর কিছু বোঝাতে হবে না। আমাকে নামিয়ে দাও।”
আসিফ বলল, “তুমি কী ওই নোটবুকটা ছাড়া আর কিছুই পাওনি?”
আমি বললাম, “না। আর তোমার কাজ তো হয়ে গেছে। আর কিছু চেও না।”
আসিফ থমকে গিয়ে বলল, “ওহ, ঠিক। থ্যাঙ্ক ইউ জায়নাব। তুমি যা করলে, তার জন্য ভবিষ্যতের আলোকময় পাকিস্তান তোমাকে অনেক শুক্রিয়া জানাবে।”
আমি গাড়ি থেকে নেমে গেলাম।
সিনেমা দেখতে দেখতে দেখলাম ফতিমা ফোন করছে। ধরিনি।
আমার মনে হচ্ছে প্যানিক অ্যাটাক হবে। আমার আম্মুর প্যানিক অ্যাটাক হত। আমারও সেরকম হবে মনে হচ্ছে।
যতবার ভাবছি, ততবার অস্বস্তি হচ্ছে।
আরিয়ানের কথাও মনে পড়ছে। ছেলেটা এত কম বয়সে তার আব্বুকে হারাবে? একটা পরিবার থেকে আব্বুর ছায়া সরে গেলে কী হতে পারে, ভাবলেই আমার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে। এ সব কিছুর জন্য আমি নিজেকে দায়ী করছি বার বার। হল থেকে বেরিয়ে কোয়ার্টারে ফিরে দরজা বন্ধ করে ডায়েরি লিখে যাচ্ছি। ফেরার সময় দেখেছি ওদের কোয়ার্টারের সামনে কেউ নেই। দরজাও বন্ধ দেখে এসেছি মনে হচ্ছে।
কোথায় যেতে পারে। একবার ওমরকে ফোন করলাম। ওমর ফোন না ধরে মেসেজ করেছে “ইমপরট্যান্ট মিটিঙে আছি। ফোন কোর না।”
আমি আর ফোন করিনি। জানি না কী হবে।
