জায়নাবের ডায়েরি – ১৫
(১৫)
মুজফফরাবাদ:
সুহেল তাঁর সামনে চুপ করে বসে আছে। প্রবল ঠান্ডাতেও সুহেলের কপাল ঘামে ভিজে জবজব করছে।
সুলতান গলা তুললেন, “সুহেল।”
“জি জনাব।”
“আমার কাছে ইসলামাবাদ থেকে অর্ডার এসেছে, তোমাকে কোর্টমার্শাল করার অর্ডার আছে।”
সুহেল কেঁদে ফেলল, “কী অপরাধে জনাব?”
সুলতান বললেন, “এঁরা সন্দেহ করছেন তুমি খবর লিক করেছ।”
সুহেল বলল, “আপনি আমাকে জানেন জনাব। আমি এটা করতে পারি?”
সুলতান বললেন, “আটকে রেখেছি। ভেবো না। কারও একটা ক্যালাস কাজের দায় আমি নেবো না।”
সুহেল মাথা নীচু করে বলল, “আমি আমার স্ত্রী-কেও বলিনি। কাউকে কিচ্ছু বলিনি। আজীবন অত্যন্ত সততার সঙ্গে কাজ করে গেছি। তারপরেও কী করে এত বড়ো একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া হল জনাব…
সুলতান বললেন, “ধামাচাপা দিতে চাইছে। তুমি ভেবো না, আমি দেখছি কী করা যায়।”
সুহেল বলল, “কাউকে না কাউকে একটা স্কেপ-গোট করা হয়, এ-ক্ষেত্রে আমাকেই করা হল।”
সুলতান বললেন, “বাড়ি ফিরে কী কী করেছিলে?”
সুহেল ওমরের কথাটা বলল।
সুলতান বললেন, “তোমাকেই একা দোষ দেওয়া হচ্ছে, ওমরকে নয় কেন? ও ইসলামাবাদে পোস্টেড বলে? অবশ্য আমি ওমরকে চিনি। ওমর ভীষণ দায়িত্ববান অফিসার। এই কাজ ও করতে পারে না। না না, আমি কিছুতেই হিসেব মেলাতে পারছি না। যাক গে, তুমি বিশ্রাম কর। কোনো বোকামো কোর না, কাউকে ফোন করার দরকার নেই, আমি যদ্দিন বেঁচে আছি, কেউ তোমার গায়ে হাত দিতে পারবে না। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি।”
সুহেল উঠে দাঁড়াল, কৃতজ্ঞ কণ্ঠে বলল, “শুক্রিয়া জনাব।” সুহেল বেরোতেই সুলতান ওমরকে ফোন করলেন। ওমর ফোন ধরতে কড়া গলায় বললেন, “সুহেলকে কোর্টমার্শাল করার সিদ্ধান্ত কে নিয়েছে ওমর?”
ও-প্রান্তে একটু নীরবতা। পরক্ষণে ওমর বলল, “ওপরমহল নিয়েছে জনাব। আমি একজন মাঝারি মাপের অফিসার, এত বড়ো সিদ্ধান্ত কী আমি নিতে পারি? মেজর জেনারেল খবরটা পেয়েই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।”
সুলতান বললেন, “তার একটু ভেবে দেখা উচিত ছিল। অন্তত আমাকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল।”
ওমর চুপ করে রইল।
সুলতান বললেন, “আমি কিন্তু ঠিক খুঁজে বের করব যে এই কাজ কে করেছে। অনেকেই আমায় চেনে না, আমি কী করতে পারি জানে না। যদি আমি দেখি সুহেলকে অকারণে ফ্রেম করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাহলে আমি কাউকে ছাড়ব না।” ওমর বলল, “জনাবের গলা শুনে মনে হচ্ছে আপনি আমাকে সন্দেহ করছেন। আপনি কিন্তু আমাকে ভালো করে চেনেন। এই কাজ আমি করতে পারি না।”
“জনাব।”
বাইরে থেকে সিকিউরিটি ইন চার্জের কন্ঠস্বর ভেসে এল।
সুলতান ফোন কেটে দিয়ে বললেন, “আসুন।”
সিকিউরটি ইন চার্জ প্রবেশ করলেন, “জনাব, একজন সিপাহী ঘটনার দিন থেকেই গায়েব। তার গ্রামের বাড়ি ফয়সলাবাদে। খোঁজ নেওয়া হয়েছে। বাড়িতে কেউ নেই। সে ফেরেওনি।”
সুলতান সোজা হয়ে বসলেন, “কে সে?”
“ওর নাম বরকত পাশা।”
সুলতান ভ্রু কুঁচকালেন, “সে তো খুব অ্যাক্টিভ সিপাহী ছিল। আরও খুঁজুন। যে পাতালে থাকুক, সেখান থেকে খুঁজে বের করে নিয়ে আসুন দরকার হলে।”
সিকিউরিটি ইন চার্জ মাথা নাড়লেন, “কোনো ট্রেস করা যাচ্ছে না জনাব।”
“ছবি দিন। লুক আউট নোটিস জারি করুন। এখনই।”
“জি জনাব।”
ইন চার্জ স্যালুট করে বেরিয়ে গেলেন। সুলতান ইসলামাবাদে ফোন করলেন। ও-প্রান্ত ফোন ধরতেই বললেন, “একজন সেপাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না ছবি তোলার দিন থেকে। নাম বরকত পাশা। আমি জানতাম সুহেল এ-কাজ করেনি। সেনায় কালো বাদুড় ঢুকেছে। খুঁজে বের করতে হবে সে বাদুড় কোথায় আছে।”
“ইন্টারেস্টিং! আপনাকে ফলো করেছিল সেদিন?”
“হতে পারে। এ-পাশ থেকে সবাই ও-পাশে যাচ্ছে, ও-পাশ থেকেও কেউ এ-পাশে আসতেই পারে। নাথিং ইজ ইম্পসিবল।”
“রাইট। খুঁজুন। খুঁজে জানান।”
“তবে এ-কাজ সে একা করেনি। ইসলামাবাদের মিডিয়া পারসোনেলদের তল্লাশি শুরু করুন। খবর হয়েছে এখন থেকেই।”
“আমি অলরেডি ওই ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া চ্যানেলট সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কে নিউজ করেছে বের করতে বেশিক্ষণ লাগার কথা না। পালিয়ে কোথায় যাবে?”
“গুড।”
“আপনি সুহেলকে….”
“আমাকে বুঝতে দিন। গুড নাইট।”
“গুড নাইট সুলতান।”
ফোন রাখলেন সুলতান। আহত বাঘের মতো পায়চারি শুরু করলেন। এত বড়ো সাহস হয়ে গেছে এদের?
পালিয়ে যাবে কোথায়! ধরা ওদের পড়তেই হবে।
(১৬)
জায়নাবের ডায়েরি
২৪শে ফেব্রুয়ারি, রাত এগারোটা পঁয়তাল্লিশ
ওমর এখনও ফেরেনি। কখন ফিরবে কিছুই বলেনি। আমাকে বারণ করেছে বলে আমি আর ফোন করতেও পারছি না।
বিদেশি চ্যানেলটাকে আমাদের টিভিতে আর দেখতে পারছি না। চ্যানেলটা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বুঝতে পারছি। খবরের কোনো চ্যানেলে এই বিষয়ে অন্য কোনো খবরও দেখাচ্ছে না। বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে ঘুমনোর চেষ্টা করে দেখেছি। ঘুম আসছে না।
আসিফকে ফোন করার চেষ্টা করিনি আর। আমার ওকে নিয়েও ভয় হচ্ছে। কেন জানি না আমার মনে হচ্ছে, এ-দেশে থাকলে আসিফের জীবন সংশয় হতে পারে। যেভাবে ও ঝাঁপিয়ে পড়ে খবরটা করেছে, এখন যদি কেউ জেনে যায় এর পেছনে আসিফ আছে, তাহলে কী হতে পারে?
সুহেলের ব্যাপারেও কোনো খবর এল না। হতে পারে সুহেল আজ বেঁচে আছে। সকালে ছবিটা দেখার পর থেকে যতবার মনে পড়ছে, আমার বুক ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ওই ছোটো ছোটো বাচ্চাগুলোকে কী করে কেউ গুলি খাবার জন্য ছেড়ে দিতে পারে? যুদ্ধে জেতা এতটা গুরুত্বপূর্ণ?
এতকিছুর পর যদি জিতেও যায়, বাচ্চাগুলোই তো থাকবে না, বেঁচে থাকার জন্য পরবর্তী প্রজন্মটাই তো থাকবে না।
ওমর বলে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ছেলেদের উসমানের অরফ্যানেজে নিয়ে আসা হয়। এত বড়ো দেশ। তাও এত এতিম? দেশে এত এতিম কোত্থেকে আসছে?
নিষিদ্ধ পল্লী থেকে? রাস্তার ভিখারিদের বাচ্চাদের তুলে নিয়ে আসে না তো ওরা? যে ছেলেগুলো বেঁচে থাকে, ইন্ডিয়াতে গিয়ে তারা ঠিক কী করে? ওখানেও মানুষ মারে? একটা ইন্ডিয়ান চ্যানেলে দেখেছিলাম আজমল কাসভ নামের ছেলেটা ইন্ডিয়াতে গিয়ে গুলি করে কতজনকে মেরে দিয়েছিল। এরা তো সেরকমও কিছু করেনি। এত এত ছেলেকে খোলা বন্দুকের সামনে ফেলে দিয়েছে।
মেসেজ এল। ওমর।
…
ওমর মেসেজ করেছে, “আমার আলমারির চাবি কী তোমার কাছে আছে?”
আমার হাত পা কাঁপছে। লিখতে পারছি না আর…
…
উফ… ওমর ফোন ধরছে না। আমি লিখেছি, “না। কাছে নাই।”
আমি জানি ও কোথায় চাবি রাখে। সব জানি। কিন্তু কিছু বলা যাবে না। কিছু সমস্যা হয়েছে নিশ্চয়ই। সুহেলকে যেটা করছিল, ওমরকেও কী….?
…
আমি আসিফকে ফোন করলাম। আসিফ ফোন ধরল, অবাক গলায় বলল, “এত রাতে?”
আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ওমর আমাকে জিজ্ঞেস করছে আলমারির চাবি কোথায় থাকে আমি কী জানি? তার মানে ও আমায় সন্দেহ করছে।”
ফোন কেটে গেল। আবার ফোন করে দেখলাম ফোন সুইচড অফ বলছে। আমি আসিফকে ফোনে পেলাম না।
আসিফ আমাকে ঠকিয়েছে। নির্ঘাত ঠকিয়েছে। ছিঃ ছিঃ ছিঃ, আমি ওমরের নোটবুকের অতো গুরুত্বপূর্ণ জিনিসটা ওকে পাঠিয়েছি? এত বড়ো ভুল করে ফেললাম আমি?
…
রাত দেড়টা
ওমর ফেরেনি। ফোন ধরছে না। কোনো মেসেজের রিপ্লাই নেই। আমি কী করব বুঝতে পারছি না। এত রাতে কাউকে ফোন করবই বা কী করে? একবার টিভি চালিয়ে দেখলাম খবরে দেখাচ্ছে আর্মস ডিলে কী সব করাপশন হয়েছে। ওমরের নোটবুকে কি ওসব নিয়ে কিছু ছিল?
আসিফ একটা মেসেজ করেছে, ‘সরি’ লিখে। ফোন করে দেখতে গেলাম, ফোন আবার সুইচড অফ বলছে। আমি একটু আগেও থরথর করে কাঁপছিলাম। বাইরে গাড়ির শব্দ পাচ্ছি, ওমর ফিরছে মনে হয়। ডায়েরিটা এখনই লুকিয়ে রাখি…
(১৭)
রাত দেড়টা।
“আমার একটা ধারণা ছিল, আমি ভরসা করেছিলাম ইয়ং ব্লাডের ওপরে। আমি ভাবতাম এই দেশের নতুন প্রজন্মর ওপরে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে আমরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারব। কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমি ভাবতে পারিনি, যার ওপরে এত বড়ো ভরসা করছিলাম, সে আমেরিকান ডলারের লোভে আমাদের গোপন তথ্য কাউকে বেচে দিতে পারে।”
ওমরকে চেয়ারে বেঁধে রাখা হয়েছে। আই.এস.আই. চিফ তার সামনে বসে কথাগুলো বললেন।
ওমর বলল, “বিশ্বাস করুন জনাব, আমি কাউকে কিচ্ছু আমার বেচিনি। আপনাদের কোথাও একটা ভুল হচ্ছে।”
“ভুল হচ্ছিল। সুহেলকে সন্দেহ করে ভুল হচ্ছিল। যতক্ষণ আমরা কাশ্মীর নিয়ে বিব্রত ছিলাম, আমাদের ধারণা ছিল এর মধ্যে আর কেউ নেই। কিন্তু যখনই ওরা আর্মস ডিল নিয়ে নিউজটা ছড়াতে শুরু করেছে, আমরা বুঝে গেছি এটা তোমার কাজ।”
ওমর বলল, “জনাব, বিশ্বাস করুন, আমি আমার দেশকে নিজের থেকেও ভালোবাসি…”
“করাচির ওরাঙ্গি টাউনে, লাহোরের জিন্না মিউজিয়ামে, ফয়সলাবাদের ক্লক টাওয়ারের কাছে উস্তাদের ড্রাই ফ্রুটসের দোকানে, লস্করের লোক সওদা করতে আসে, এই তথ্য আমি ছাড়া শুধু তোমার কাছে ছিল। তাই না?”
ওমর মাথা নাড়ল, “জি জনাব। এই খবর আর কারও কাছে থাকা সম্ভব না।”
“তাহলে?”
ওমর বলল, “আমি নিজে এই ডিলে কাজ করি জনাব, এই তথ্য আমি কেন বাইরে দিতে যাব?”
“তাহলে তুমি কী বলতে চাইছ? আমি দিয়েছি?”
ওমর বলল, “আমি বাড়ি ফিরব জনাব। আমার বিশ্রাম দরকার।”
চিফ হেসে উঠলেন, “সিরিয়াসলি ওমর? তোমার বিশ্রাম দরকার? এত বড়ো ক্ষতি করে তুমি এখন বিশ্রাম চাইছ?”
ওমর হাল ছেড়ে দেওয়া ক্লান্ত কণ্ঠে বলল, “আমার মনে হয় আমি জানি খবরটা কীভাবে বেরিয়েছে। আপনি কী শুনবেন?”
চিফ বললেন, “বল। বল। আমি তো শোনার জন্যই অপেক্ষা করছি। দয়া করে নতুন কোনো গল্প তৈরি করবে না। সরাসরি বল যা বলবে।”
ওমর বলল, “জি, আমি সরাসরিই বলছি। আমার নোটপ্যাডে আমি এগুলো লিখে রাখতাম। আমার স্ত্রী ছাড়া আমার নোটপ্যাড কেউ অ্যাক্সেস পাবে না। কিন্তু ওর পরিবার পাকিস্তানের অনেক পুরোনো এবং বিশ্বস্ত পরিবার জনাব…
চুপ করে গেল ওমর।
চিফ চোখ ছোটো করলেন, “এই জন্যই তুমি ফিরতে চাইছ?”
ওমর বলল, “জি জনাব। আমাকে একটু সময় দিন।”
চিফ মাথা নাড়লেন, “তোমাকে একা আমি ছাড়তে পারব না। চল, এই কে আছ? ওমরকে খুলে দাও। আর ফোর্স নিয়ে চল।”
ওমরকে নিয়ে চিফ রওনা হলেন, রাতের ইসলামাবাদের রাস্তায় দ্রুত কনভয়টা এগিয়ে চলল ওমরের কোয়ার্টারের দিকে।
চিফ সিগারেট ধরিয়েছেন। ওমরকে বললেন, “তোমার স্ত্রী কার কার সঙ্গে মিশছিল এর মধ্যে?”
ওমর বলল, “আমাকে বলেছিল, আসিফ বলে একটা ছেলে ওদের লাহোরের বাড়িতে যেত। সে তাও অনেকদিনের কথা।”
চিফ বললেন, “হু, পূর্ব প্রেম, অনেক কিছু ছিল, তোমাকে ফ্রেম করে বিয়ে দিয়েছিল হয়তো, তাও ভালো, ওদের সন্তানকে তুমি বড়ো করছ না। সেক্স হয়নি তার মানে, তুমি তো নিঃসন্তান!”
ওমর গলা তুলল, “কী আজেবাজে কথা বলছেন আপনি?”
চিফ বললেন, “তোমাকে কী এই ট্র্যাপগুলো নিয়ে নতুন করে বলতে হবে?”
ওমরের কান মাথা ঝাঁঝাঁ করছিল। সে চুপ করে গেল।
কোয়ার্টারের সামনে গাড়ি দাঁড়াতেই সে লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নামল। তার কোয়ার্টারের দরজা ধাক্কা দিতেই খুলে গেল। সে ঘরে ঢুকে গলা তুলল, “জায়নাব, জায়নাব!”
কোনো সাড়া মিলল না। চিফ ঘরে ঢুকে শান্ত কণ্ঠে বললেন, “পালিয়েছে মনে হচ্ছে। কনগ্র্যাচুলেশনস ওমর। তোমাকে তোমার স্ত্রী বোকা বানিয়েছে।”
ওমর জায়নাবের আলমারি খুলল। লকার বন্ধ। সে রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিফকে বলল, “এই লকারটা খোলার ব্যবস্থা করুন জনাব। এখানে ওর ডায়েরি থাকার কথা। ওটা পাওয়া গেলে কিছু ক্লু পাওয়া যেতে পারে।”
চিফ কম্যান্ডোদের ইশারা করলেন। মিনিট সাতেক লাগল লকার খুলতে।
ডায়েরিটা লকারেই আছে।
ওমর শ্বাস ছাড়ল, বলল “আমাকে দেবেন জনাব? আমি কী একবার পড়তে পারি?”
(১৮)
কোয়ার্টারে মাঝরাতে সুলতানের ফোন বেজে উঠেছে।
সুলতান ঘুমোতে পারেননি। মুজফফরাবাদের প্রবল শীতে জেগেই বসে ছিলেন।
ফোন বাজার সঙ্গে সঙ্গে ধরতেই ও-প্রান্ত থেকে ভেসে এল, “সুহেল ইজ ইনোসেন্ট। ইউ ক্যান অ্যাবর্ট হিস কোর্টমার্শাল।”
সুলতান বললেন, “ওকে ঘুম পাড়িয়ে আমি লোডেড রিভলভার নিয়ে বসেছিলাম। আপনি কনফার্ম করলে ওকে মেরে আমি নিজে মরতাম। প্রথমবার নিজের সিদ্ধান্তের ওপর এতখানি সন্দেহ হয়েছিল আমার। এত অবিশ্বাস্য। নিজের হাতে তৈরি করা ছাত্র গদ্দার বেরোবে? আপনি বুঝতে পারছিলেন আমার মধ্যে কী চলছিল?”
ও-পাশ থেকে হাসির শব্দ এল, “আপনি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। এই বয়সে এসে অবশ্য এরকম আবেগ আসে। ইউ মে জয়েন আস, আফটার ইওর রিটায়ারমেন্ট। যাক গে, ওমরের স্ত্রী-র কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। ওর ডায়েরি থেকে জানা গেছে আসিফ নামের একটা ছেলে এর পেছনে আছে। ছেলেটা ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়ার কোনো চ্যানেলে আছে। খোঁজ নিচ্ছি। দেখা যাক।”
সুলতান বললেন, “ওহ, আমি কেন সারপ্রাইজড হচ্ছি! হলে এরকমই তো হয়। খামোখা মাথা খারাপ করছিলাম। যা-ই হোক, তাকে খোঁজার দায় আপনার। আর ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াতে যে ছবিগুলো বেরিয়েছে, সেগুলোকে অনেক কিছু বলেই ডিফেন্ড করা যায়, আপনি সেটা দেখে নিন।”
“ছবি ছাড়াও আরও অনেক কিছু ছিল ওমরের ডায়েরিতে। আপাতত সেগুলো আমি ফোনে বলতে পারব না। ওমরার আটক করছি আমরা।”
“ওমর একজন বিশ্বস্ত অফিসার। অকারণ আটক না করে ওর মাধ্যমেই ওর স্ত্রী আর আসিফকে খোঁজার চেষ্টা করুন। নইলে এর থেকে বেশি ড্যামেজ হতে পারে। আমিও দেখছি আমার বাঘের গুহা থেকে যে ছেলেটা ফটো তুলেছিল, সে কোন্ গর্তে লুকিয়ে আছে। যেখানেই থাকুক, সেখান থেকে বের করে ওর বারোটা না বাজানো অবধি আমি শান্তি পাবো না।”
“হুম। ঠিক আছে জনাব, আপনার উপদেশ শিরোধার্য, তাই করা হবে। গুড নাইট।”
“গুড নাইট।”
ফোন রেখে ঘরের বাইরে গেলেন সুলতান। বাইরে প্রবল ঠান্ডা হাওয়া বইছে।
জিপে গিয়ে বসলেন তিনি। গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বেরোলেন।
রাতের শহর পেরিয়ে মৌলানার ডেরায় পৌঁছতে বেশিক্ষণ লাগল না। মৌলানা বিল্ডিং-এর বাইরেই অপেক্ষা করছিল।
সুলতান গাড়ি থেকে নামতে বিরক্ত কণ্ঠে বলে উঠল, “আপনাদের আর্মি আর আই.এস.আই.-এর ওপরে আমি ভীষণ রেগে আছি জনাব। এত বড়ো খবর বাইরে চলে যেতে পারে, আমার জানা ছিল না। এর আগে এতগুলো ডিল হল, সেখানে তো এরকম কিছু হয়নি।”
সুলতান বললেন, “সে জন্যই আপনার সাহায্য চাই মৌলানা। একটা ছেলে আমাদের সেনায় থেকে ছবিগুলো বাইরে বের করেছে। এই দেশেই আছে। আর একটা ছেলে ওমরের বউকে ম্যানিপুলেট করেছে। এদের দু-জনকে আমি আমার কাছে চাই। কোনো ইসলামাবাদ না, কোনো আই.এস. আই. দফতর না। এই দু-জনকে আমি মুজফফরাবাদে চাই।”
মৌলানার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটল, সুলতানের কাঁধে হাত রেখে বলল, “আপনার কাছে আমার এই উম্মিদই ছিল সুলতান সাব। আমরা দু-জন একই পথের পথিক। এদের আমরা বিচার করব। এখানে বিচার হবে। ওমরের স্ত্রী-র ডায়েরি পাওয়া গেছে শুনেছি। সেই মেয়ের পক্ষেও এত তাড়াতাড়ি দেশ ছাড়া সম্ভব না।”
সুলতান বললেন, “না। ও পাকিস্তানেই আছে। যে ছেলেটা ওকে এই বিশ্বাসঘাতকতা করতে বাধ্য করেছে, সে-ও পাকিস্তানেই আছে। কোথায় যাবে?”
“একটা কথা আমাকে বলুন সুলতান সাহেব, শুধুমাত্র এই কথা বলতে আপনি ক্যাম্প থেকে মাঝরাতে গাড়ি চালিয়ে এতদূরে আসেননি। কারণটা ঠিক কী?”
সুলতান মাথা নীচু করলেন, “ওমর আমাদের এখানেও ছিল জনাব। আর ওর নোটপ্যাডটা খোয়া গেছে বা কমপ্রোমাইজড হয়েছে। ওমর এখানে আর্মস রুটটা দেখত, এই রুটের কথা ওর নোটপ্যাডে থাকতে পারে।”
মৌলানা সামসুদ্দিন হাত নাড়ল, “ভাবছি না। এসব নিয়ে আমি আর কিচ্ছু ভাবছি না। দরকার হলে আর্মস রুট চেঞ্জ করব, এটা আমার দেশ, আমি সব কিছু করতে পারি। কে কী বলল, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। ওসব মিডিয়া টিডিয়া নিয়ে আমি কাজ করি না। আপনারা করেন। পাকিস্তানের লস্করকে দরকার। লস্করের পাকিস্তানকে দরকার নেই। এসব গু-মুত আপনারা পরিষ্কার করুন। খুদা হাফেজ।”
মৌলানা রাগী মুখে বিল্ডিঙের দিকে রওনা দিল। সুলতান চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে রইলেন…
(১৯)
“তোমার দাম্পত্য জীবন নিয়ে অনেক কথা লেখা আছে দেখছি। তোমার স্পার্ম কাউন্ট কম ছিল?”
আই.এস.আই. চিফ শ্লেষাত্মক কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন। ওমর বলল, “এই নিয়ে আমার সঙ্গে কোনোদিন কথা বলেনি। ডাক্তাররা ওকে কী বলেছে, তা আমি জানি না।”
“হু। বোঝা যাচ্ছে দাম্পত্য জীবনে তুমি তাকে সেরকম সুখ দিতে পারোনি। সময়ও দিতে না। ফলে জায়নাবের জীবনে অন্য পুরুষ আসায় ও ভেসে গেছে।”
ওমরের চোখ মুখ লাল হয়ে গেল। সে শুধু বলল, “জায়নাব ভেসে গেছে বলাটা ঠিক হবে না জনাব। ও ট্র্যাপড হয়েছে। আর এগুলো তো সাধারণ দাম্পত্যের কথা। আমরা যারা এত চাপের ডিউটি করি, তারা কতজন আর স্ত্রী-কে সময় দিতে পারি? ও একটা বাচ্চা চেয়েছিল। আমি তো উসমানের কাছে ওকে নিয়েও গেছিলাম। একটা বাচ্চা দত্তক নিয়ে নিতাম আমরা খুব তাড়াতাড়ি। আমার মনে হয় এই ব্যাপারটা নিয়ে চর্চা কম করলেই ভালো হয়।”
চিফ বললেন, “ওকে, তাহলে তুমি, যে কী না একটা সামান্য সিক্রেট রাখতে পারোনি, সে এখন আমাকে জ্ঞান দেবে কোন্টা নিয়ে আমি চর্চা করব আর কোটা নিয়ে করব না, তাই তো?’
ওমর বলল, “না না, ব্যাপারটা ঠিক তা নয় জনাব। আমার মনে হয় এখন ওই আসিফ ছেলেটাকে খুঁজে বের করতে পারলে আমাদের লাভ হত।”
“ঠিক আছে, এবার মনে করে বল আসিফের ব্যাপারে তুমি কী কী জানো? মানে জায়নাব ঠিক কী বলেছিল তোমাকে?”
“সেরকম কিছুই জানি না জনাব। জায়নাবের বাড়ির লোক ভালো বলতে পারবে। ওদের বাড়িতে তো ও যেত।”
“হু। সে ছেলে এমন একটা মিডিয়ায় জয়েন করেছে, যারা দেশবিরোধী কাজ করলেও ওর কোনো যায় আসে না। আমি ওই চ্যানেলে খোঁজ নিয়েছি, ছেলেটা পাকিস্তানেরই ছেলে। কিন্তু এর বেশি কোনো তথ্য ওরা দেবে না। লন্ডনে আমির আছে, ও হয়তো দু-তিন দিনে ছেলেটার ডি.এন.এ. রিপোর্ট অবধি বের করে দেবে, কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যাবে। আর্মস ডিলের ব্যাপারেও খবর লিক হয়ে গেছে, বুঝতে পারছ এটা কত বড়ো ড্যামেজ হয়েছে? টার্কি ডিল নিয়ে কিছু লিখেছিলে নোটপ্যাডে?”
ওমর ফ্যাকাসে মুখে বলল, “ড্রোন ডিলের ডেটটা লেখা ছিল, ভেনু লিখিনি।”
চিফ মাথা নাড়লেন, “আমি জানি না ওমর, তুমি এত বড়ো ব্লান্ডার করে ফেললে, আমি জানি না কী করব এবার তোমাকে নিয়ে। বালোচ ডিভিশনে ট্রান্সফার করতে হবে হয়তো। ঠিক আছে, টেক রেস্ট, আমরা এবার বেরোচ্ছি। আশা করি জায়নাবকে দেখা মাত্র গুলি করার অর্ডার দিলে তুমি রাগ করবে না?”
ওমর চুপ করে বসে রইল। চিফ বললেন, “আমি চেষ্টা করব যাতে ওকে অন্তত বাঁচিয়ে রাখা যায় ইন্টারোগেট করার জন্য। জানি না কতদূর কী করতে পারব। মৌলানার চক্ষুশূল হয়ে গেলে কী করে আর বাঁচানো যাবে… ওয়েল, তুমি বরং আর একটা বিয়ে করে ফেলো। এ-বউয়ের কথা মাথা থেকে বের করে দাও।”
ওমর অসহায় মুখে বলল, “এটা কী এতই সহজ জনাব? চাইলেই মাথা থেকে বের করে দেওয়া যায়? যে ছেলেটার জন্য এত কিছু হল, তাকে না ধরে আমি বালোচ ডিভিশনে চলে যাব? আমার ওপর কী আপনার এটুকু ভরসা নেই?”
চিফ বললেন, “ওকে, তুমি বল, কী করে ধরব এদের?”
“যত রকম একজিট পয়েন্ট আছে, সব সিজ করে দেওয়া যায়। নাকা চেকিং করা যায়, কোথায় পালাবে?”
“আমার কাছে ইন্সট্যান্স আছে ওমর, এই শহরে, আমার নাকের ওপরে কোন আন্ডারগ্রাউন্ড চেম্বারে এক এজেন্ট সাড়ে সাত বছর লুকিয়ে ছিল, কেউ ধরতে পারেনি।”
ওমর বলল, “পারবে না জনাব, কোথাও পালিয়ে বাঁচতে পারবে না, আমি ঠিক বের করে আনব।”
চিফ ব্যাঙ্গের হাসি হেসে বললেন, “গুড নাইট ওমর। তোমার কোয়ার্টারের সামনে আমাদের লোক থাকবে। কোথাও পালানোর কথা ভেবো না। আমি এখন অবধি তোমাকে বিশ্বাস করছি বলে তোমাকে অ্যারেস্ট করলাম না। টেক কেয়ার।”
ওমর কাতর কণ্ঠে বলল, “জনাব, আমি নির্দোষ। প্লিজ জনাব।”
চিফ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
