দ্য টুইসডে নাইট-ক্লাব – আগাথা ক্রিস্টি (অনুবাদ: ঋজু গাঙ্গুলি)
“অমীমাংসিত রহস্য!”
একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে, তৃপ্ত ভঙ্গিতে শব্দ দুটো আবার উচ্চারণ করল রেমন্ড ওয়েস্ট, “অমীমাংসিত রহস্য।” নিজের চারপাশে তাকিয়ে, পুরোনো ঘরটার ছাদের কড়িবরগা, প্রাচীন অথচ মজবুত আর সুন্দর আসবাব- এ-সব দেখে বেশ সন্তুষ্টই হল সে।
রেমন্ড একজন লেখক। আবহ-নির্মাণ ব্যাপারটা নিয়ে সে বড়োই খুঁতখুঁতে। তার পিসিমণি জেন মার্পলের চরিত্রের সঙ্গে তার বাড়িটা এত সুন্দর মানিয়ে যায় বলেই জায়গাটা তার এত ভালো লাগে। ফায়ারপ্লেসের অন্য প্রান্তের কাছে একটা ভারিক্কি চেয়ারে একদম সিধে হয়ে বসে থাকা পিসিকে সে ভালো করে দেখল।
জরি বসানো, সরু কোমর আর বুকের ওপর ঝরনার মতো নেমে আসা সুতোর কাজ করা একটা কালো রঙের পোশাক পরেছিলেন মিস মার্পল। তাঁর হাতে ছিল সুতোর দস্তানা। চুড়ো করে বাঁধা দুধসাদা চুলের ওপর ছিল কালো সুতোর একটা টুপি। সাদা আর নরম কিছু একটা বুনতে বুনতে, হালকা নীল রঙের নরম ও সদয় চোখজোড়া দিয়ে নিজের ভাইপো আর তার অতিথিদের দেখছিলেন তিনি।
একে-একে সবার ওপর দিয়েই মিস মার্পলের নজর ঘুরে এল। প্রথমেই তাঁর চোখ গেল বেশ ভেবেচিন্তে সাজগোজ করা ভাইপো রেনল্ডের ওপরেই। তারপরেই শিল্পী জয়েস লেমপ্রিয়ে নিজের ছোটো করে ছাঁটা কালো চুল আর সবজেটে বাদামি চোখজোড়া দিয়ে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিল। এরপর তাঁর চোখে ধরা দিলেন পরিপাটি পোশাক পরা অভিজ্ঞ ও দুনিয়াদার মানুষটি— অর্থাৎ স্যার হেনরি ক্লিন্দারিং। ঘরে আরও দু-জন ছিলেন। প্যারিশের পুরোনো যাজক ডক্টর পেন্ডার, আর ছোটোখাটো চেহারার, চশমার ওপর দিয়ে তাকানো উকিল মিস্টার পেথরিক— এই দু-জনের দিকেও একঝলক তাকিয়ে, ঠোঁটের ওপর আলগা হাসি ঝুলিয়ে রেখে সেলাইয়ে মনোযোগী হলেন মিস মার্পল।
“কী বললেন, রেমন্ড?” খুকখুকে একটা কাশি দিয়ে কথা শুরু করলেন পেথরিক, “অমীমাংসিত রহস্য! তার সঙ্গে আমাদের কী সম্পর্ক?”
“কিছুই না।” বলল জয়েস, “রেমন্ড আসলে নিজের বলা কথা শুনতে বড্ড পছন্দ করে।”
শাসন করার ভঙ্গিতে তার দিকে তাকাল রেমন্ড। জয়েসও ঠিক সেভাবেই রেমন্ডের দিকে তাকাল, তারপর হেসে বলল, “লোকটা বিস্তর বাজে বকে— তাই না, মিস মার্পল? আপনি নিশ্চয় সেটা জানেন।”
মিস মার্পল মৃদু হাসলেন, কিন্তু কোনো উত্তর দিলেন না।
“জীবন মানেই একটা অমীমাংসিত রহস্য।” গম্ভীর মুখে বললেন যাজকটি।
চেয়ারে সোজা হয়ে বসে, অধৈর্য ভঙ্গিতে হাতের সিগারেটটা আগুনে ছুড়ে দিল রেমন্ড, “সে-কথা বলিনি। দর্শন নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা নেই। একেবারে কেঠো আর কেজো জিনিসের কথা বলছি আমি- এমন কিছু ঘটনা, যার ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারেনি।”
“আমি ঠিক এইরকম একটা ঘটনার কথা জানি।” মিস মার্পল বলে উঠলেন, “এই তো… মিসেস ক্যারুথার্সের অদ্ভুত অভিজ্ঞতার কথাই ধরা যাক। গতকাল সকালে তিনি ইলিয়টের দোকান থেকে কুচো চিংড়ি কিনেছিলেন। অন্য দুটো দোকান ঘুরে নিজের বাড়িতে পৌঁছে তিনি দেখলেন, সঙ্গে চিংড়ির প্যাকেট-দুটো নেই! ইলিয়টের কাছে ফিরে গিয়েও চিংড়িগুলোর কোনো হদিশই পাওয়া গেল না। কীরম অদ্ভুত ঘটনা, ভাব!”
“অদ্ভুত বলে অদ্ভুত।” গম্ভীর মুখে মন্তব্য করলেন স্যার হেনরি।
“এর অবশ্য অনেকরকম ব্যাখ্যা হয়।” উত্তেজনায় মিস মার্পলের গালগুলো গোলাপি দেখাচ্ছিল, “ধরা যাক, অন্য কেউ…।”
“পিসি গো!” সহাস্যে বলল রেমন্ড, “আমি এইরকম ঘটনার কথা বলতে চাইনি। বরং হত্যাকাণ্ড, অন্তর্ধান রহস্য- মানে যে-সব বিষয় নিয়ে স্যার হেনরি ঘণ্টার পর ঘণ্টা বলে যেতে পারেন- আমি সেগুলোর কথাই বলতে চাইছি।”
“কিন্তু আমি এ-সব নিয়ে কক্ষণও কিছু বলি না।” কিছুদিন আগে অবধিও স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কমিশনারের পদটি অলঙ্কৃত করা হেনরি নম্রভাবে মন্তব্য করলেন, “না। এগুলো নিয়ে আমি কিচ্ছু বলি না।”
“এমন অনেক খুনখারাপি নিশ্চয় হয়, যেগুলোর সমাধান পুলিশ করতে পারে না।” বলল জয়েস।
“এটা প্রতিষ্ঠিত সত্য, যতদূর জানি।” সায় দিলেন পেথরিক।
“আচ্ছা,” রেমন্ড ভাবালু হয়ে পড়ল, “এ-সব রহস্যের সমাধান করার জন্য ঠিক কী ধরনের মস্তিষ্ক থাকা প্রয়োজন? আমার তো সবসময়ই মনে হয় যে পুলিশের গড়পড়তা গোয়েন্দাদের মধ্যে কল্পনাশক্তির নিদারুণ অভাব আছে।”
“গড়পড়তা লোকজন তেমনই ভাবে বটে।” নির্বিকার মুখে বললেন হেনরি।
“এ-সব রহস্যের সমাধানের জন্য একটা কমিটি গড়া দরকার।” রেমন্ডের দিকে তাকিয়ে, কিঞ্চিৎ ব্যঙ্গাত্মক ভঙ্গিতে মাথা ঝুঁকিয়ে হেসে বলল জয়েস, “মনস্তত্ত্ব আর কল্পনার জন্য তাতে একজন লেখককে রাখা উচিত।”
‘লেখালেখি করতে গেলে মানবচরিত্র সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল হতেই হয়।” গম্ভীর গলায় বলল রেমন্ড, “তারা হয়তো এসব কাজের পেছনে এমন কোনো লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য খুঁজে পাবে, যা অন্যদের নজর এড়িয়ে যাবে।”
“তোমার বইগুলোতে বুদ্ধির ছাপ আছে বটে।” মিস মার্পল বললেন, “কিন্তু তুমি লোকজনকে যে-রকম খারাপ করে দেখাও, তারা কী সত্যিই অতটা খারাপ?”
“পিসি গো,” নরম গলায় বলল রেমন্ড, “লোকজনের সম্বন্ধে তোমার ধারণা যেমন আছে, তেমনই থাকুক। আমার লেখায় তাদের গায়ে আঁচড়ও যেন না পড়ে!”
“আমার কিন্তু মনে হয়…” ভ্রুজোড়া অল্প কুঁচকে সেলাইয়ের ঘরগুলো গুনতে গুনতে মিস মার্পল বললেন, “অধিকাংশ মানুষই ভালো বা খারাপ নয় বরং খুব বোকা।”
পেথরিক আবার খুক… খুক্… করে কেশে বললেন, “আচ্ছা রেমণ্ড, আপনার কী মনে হয় না যে আপনি লেখার সময় কল্পনাশক্তিকে বড্ড বেশি গুরুত্ব দিয়ে ফেলেন? কল্পনা যে কতখানি বিপজ্জনক জিনিস তা আমরা, মানে উকিলরা হাড়ে হাড়ে জানি। তথ্যপ্রমাণকে যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হলে, আর সঠিকভাবে তথ্যকে চিহ্নিত করতে পারলে তবেই সত্যের নাগাল পাওয়া যায়। অন্তত আমার কাছে সেটাই এ-সব ক্ষেত্রে একমাত্র যৌক্তিক পদ্ধতি বলে মনে হয়। নিজের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলতে পারি, একমাত্র ওই পদ্ধতিতেই কাজ হয়।”
“ধুর!” মাথাটাকে পেছন দিকে হেলিয়ে দিয়ে বিরক্ত ভঙ্গিতে বলল জয়েস, “বাজি রেখে বলতে পারি, এই নিয়ে খেলা হলে আমি আপনাদের সবাইকে হারিয়ে দেব। আমি শুধু একজন নারীই নই, আর সে আপনারা যাই বলুন, সত্যিটাকে বুঝে নেওয়ার ব্যাপারে নারীদের একটা সহজাত ক্ষমতা আছে— তার সঙ্গে আমি একজন শিল্পীও বটে। আমি এমন কিছু দেখতে পাই, যা আপনারা পান না। শিল্পী হিসেবে আমি বিচিত্র মানুষদের সান্নিধ্যে এসেছি, আর অদ্ভুত সব অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছি। জীবনকে আমি যেভাবে চিনি-জানি তা আমাদের সবার আদরের মিস মার্পলের পক্ষে জানা হয়তো সম্ভবও নয়।”
“এটা বলা কঠিন গো।” মিস মার্পল বললেন, “গ্রামেও মাঝেমধ্যে খুব যন্ত্রণাদায়ক আর বিশ্রী ঘটনা ঘটে।”
“আমি কিছু বলতে পারি?” সহাস্যে বললেন পেন্ডার, “জানি, ইদানীং কথায়-কথায় যাজক আর পুরোহিতদের মুণ্ডপাত করাটাই দস্তুর। তবে আমরা অনেক কিছু শুনতে পাই। মানবচরিত্রের এমন একটা দিক সম্বন্ধে আমরা জানতে পারি, যেটা বাকি দুনিয়ার কাছে অদৃশ্যই শুধু নয়, একেবারে অগম্য।”
“তাহলে….” জয়েস বলল, “এখানে তো মনে হচ্ছে সব ধরনের দ্রষ্টাই আছেন। আমরা একটা ক্লাব বানালে কেমন হয়? আচ্ছা, আজকের দিনটা কী যেন… মঙ্গলবার? তাহলে আমরা ক্লাবটাকে ‘মঙ্গলবার রাতের আড্ডা’ বলব। প্রত্যেক সপ্তাহে আমরা আসর বসাব। এক-একদিন এক-একজন সদস্য এমন একটা করে সমস্যা বা রহস্যের কথা বলবেন, যার সম্বন্ধে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ওয়াকিবহাল, আর যার সমাধানটাও তিনি জানেন। ক-জন আছি আমরা? এক, দুই, তিন, চার, পাঁচ। কিন্তু ছ-জন না হলে তো ব্যাপারটা ঠিক…”
“তুমি আমাকে ভুলে যাচ্ছ যে!” হাস্যোজ্জ্বল মুখে বলে উঠলেন মিস মার্পল।
জয়েস একটু অবাকই হয়ে গেল। তবে সেই ভাবটা চটপট সামলে নিয়ে সে বলল, “তাহলে তো দারুণ হয়, মিস মার্পল। আসলে আমি ভাবিইনি যে আপনি এই খেলায় যোগ দেবেন।”
“ব্যাপারটা খুব চিত্তাকর্ষক হবে বলে মনে হচ্ছে।” মিস মার্পল বললেন, “এতজন চালাক-চতুর মানুষ থাকবেন এই আসরে। আমি খুব একটা চালাক নই। তবে সেন্ট মেরি মিড-এ এত বছর ধরে একা একা থাকার ফলে মানবচরিত্র সম্বন্ধে কিছুটা জ্ঞানগম্যি তো হয়েইছে।”
“আমি নিশ্চিত যে এক্ষেত্রে আপনার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।” মার্জিত ভঙ্গিতে বললেন হেনরি, “তাহলে কে শুরু করবে?”
“এই নিয়ে কোনো সংশয় থাকতেই পারে না।” বললেন পেন্ডার, “স্যার হেনরির মতো এমন একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যখন আমাদের মধ্যেই আছেন….”
বাক্য অসম্পূর্ণ রেখে, সসম্মানে হেনরির উদ্দেশে একটা সেলাম পেশ করলেন তিনি।
মিনিট-দুয়েক চুপ করে বসে রইলেন হেনরি। অবশেষে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, নিজের পা দুটো আবার আড়াআড়িভাবে রেখে বলতে শুরু করলেন তিনি।
“আপনারা ঠিক যেমন জিনিস চাইছেন, তেমন কিছু খুঁজে বের করা আমার পক্ষে কঠিন। তবে একটা ঘটনার কথা আমি জানি যা এই শর্তগুলো পূরণ করবে। বছরখানেক আগের কাগজে আপনারা ঘটনাটার সম্বন্ধে পড়ে থাকতেও পারেন। সেই সময় ব্যাপারটাকে ওই ‘অমীমাংসিত রহস্য’ বলেই দাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে তার সমাধানটা এই ক-দিন আগেই জানতে পেরেছি।
মূল তথ্যগুলো খুবই সহজ ও সরল। তিনজন ব্যক্তি রাতের খাবার খেতে বসলেন। তাতে অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে টিনবন্দি গলদা চিংড়িও ছিল। রাত গভীর হলে তিনজনেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ঝটপট ডাক্তার ডাকা হল। দু-জনকে বাঁচানো গেল, কিন্তু একজন মারা গেলেন।”
“চমৎকার!” সন্তুষ্ট মুখে মন্তব্য করল রেমন্ড।
“আগেই বলেছি, মূল তথ্যগুলোতে কোনো জটিলতা ছিল না। মৃত্যুর কারণ হিসেবে টোমেইন-জনিত বিষক্রিয়াকে চিহ্নিত করা হল। সেই মর্মে একটা সার্টিফিকেটও দেওয়া হল। মৃত ব্যক্তিটিকে কবরও দেওয়া হল। কিন্তু ঝামেলা শেষ হল না।”
“নিশ্চয় এই নিয়ে গুজব রটেছিল।” মিস মার্পল মাথা নাড়িয়ে বললেন, “সচরাচর এমনটাই হয়।”
“এবার আমাকে এই ছোট্ট নাটকের কুশীলবদের পরিচয় দিতেই হচ্ছে। স্বামী আর স্ত্রী-কে আমি যথাক্রমে মিস্টার আর মিসেস জোন্স বলব। স্ত্রী-র সঙ্গিনীটিকে মানে তৃতীয়জনকে বলব মিস ক্লার্ক। মিস্টার জোন্স একটি কেমিস্ট সংস্থার হয়ে নানা জায়গায় ঘুরে জিনিসপত্র বিক্রি করতেন। বয়স পঞ্চাশ একটু থলথলে, ভারিক্কি চেহারার হলেও ভদ্রলোক মোটের ওপর সুদর্শনই ছিলেন। তাঁর স্ত্রী-র বয়স পঁয়তাল্লিশ, খুবই সাদামাটা চেহারা ও স্বভাব। তাঁর সঙ্গিনী মিস ক্লার্কের বয়স ষাট হলেও চেহারা বেশ গোলগাল আর মজবুত, স্বভাবটাও হাসিখুশি। এঁদের কাউকেই খুব একটা উল্লেখযোগ্য বলা চলে না।
ঝামেলার সূত্রপাত হয়েছিল ভারি অদ্ভুতভাবে। ঘটনার আগের রাতে মিস্টার জোন্স বার্মিংহাম-এর একটা ছোট্ট হোটেলে ছিলেন। সেদিনই ব্লটিং পেপারের প্যাডে নতুন কাগজ রাখা হয়েছিল। ঘরদোর সাফ করার দায়িত্বে থাকা মেয়েটি সময় কাটানোর মতো আর কিছু না-পেয়ে ব্লটিং পেপারটাকে আয়নার সামনে ধরে, মিস্টার জোন্সের সদ্য লেখা একটা চিঠির কিছু অংশ পড়েছিল। মিস্টার জোন্স সম্ভবত একটু বেশি চাপ দিয়ে লেখার ফলে চিঠির ছাপ ব্লটিং পেপারের উপর পড়েছিল। তার ক-দিন পর কাগজে বিষক্রিয়ার ফলে মিসেস জোন্সের মৃত্যুর খবর পড়ে সে তার সহকর্মীদের বলে, ব্লটিং পেপারে সে কয়েকটা কথা পড়তে পেরেছিল। কথাগুলো ছিল— ‘পুরোপুরি স্ত্রী-র ওপর নির্ভরশীল…’, ‘সে মারা গেলে আমি অবশ্যই…’, ‘শত-সহস্র…’।
আপনাদের হয়তো মনে থাকবে, তার কিছুদিন আগেই এক স্বামী-র তাঁর স্ত্রী-কে বিষ খাওয়ানো নিয়ে হইচই হয়েছিল। হোটেলের কর্মচারীদের কল্পনা, যাকে বলে, উদ্দীপ্ত হয়ে উঠতে বেশি সময় লাগেনি। নির্ঘাত মিস্টার জোন্স নিজের স্ত্রী-কে খুন করে শত-সহস্র পাউন্ডের মালিকানা পাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন! এক কর্মচারীর আত্মীয়রা জোন্সদের এলাকাতেই থাকত। তাদের মধ্যে এরপর চিঠি চালাচালি হয়। তাতেই জানা যায়, মিস্টার জোন্স নাকি স্থানীয় ডাক্তারের মেয়েটির প্রতি একটু বেশিই আকৃষ্ট ছিলেন। মেয়েটির বয়স তেত্রিশ, তার সুন্দরী। ব্যস, আর যায় কোথায়!
গুজবের রথ গড়গড়িয়ে চলতে শুরু করল। স্বরাষ্ট্র বিভাগের সচিবের কাছে পিটিশন গেল। অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের লেখা চিঠিতে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ডুবে যাওয়ার উপক্রম হল। সবারই বক্তব্য- মিস্টার জোন্স বিষ খাইয়ে নিজের স্ত্রী-কে খুন করেছেন। স্পষ্ট করেই বলি, আমরা ও-সব কথায় পাত্তা দিইনি। মনে হয়েছিল, গ্রামের লোকজন খেয়েদেয়ে করার মতো আর কিছু না-পেয়ে এইসব কেচ্ছা রটাচ্ছে। কিন্তু তাদের শান্ত করার জন্যই কবর থেকে মৃতদেহ তুলে সেটা পরীক্ষা করার আদেশ দেওয়া হল। তারপর দেখা গেল, আপাতদৃষ্টিতে আগুনের চিহ্ন দেখা না গেলেও অত ধোঁয়ার পেছনে সত্যিই একটা আগুনে গল্প ছিল। অটোন্সিতে বোঝা গেল, মহিলার মৃত্যু হয়েছে আর্সেনিকজনিত বিষক্রিয়ার ফলে। বলা হল, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকে স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে অনুসন্ধান চালিয়ে বের করতে হবে, মিসেস জোন্সের দেহে এই আর্সেনিক কে কীভাবে প্রবেশ করাল।”
“এইত্তো!” বলে উঠল জয়েস, “আমি এই জিনিসের কথাই বলছিলাম।”
“স্বাভাবিকভাবেই স্বামীটিই আমাদের প্রধান সন্দেহভাজন ছিলেন। স্ত্রী-র মৃত্যুতে তিনিই লাভবান হয়েছিলেন। শত-সহস্র না হলেও আট হাজার পাউন্ড পেয়েছিলেন তিনি। ভদ্রলোকের নিজের রোজগার ছাড়া কোনো সম্পত্তি ছিল না। মহিলাদের আপ্যায়নে একটু বেশিই উৎসুক ছিলেন বলে তাঁর মাইনের টাকাতেও টানাটানি হত। ডাক্তারের মেয়ের ব্যাপারটাও আমরা যথাসম্ভব সন্তর্পণে খতিয়ে দেখলাম। জানা গেল, একসময় দু-জনের মধ্যে প্রগাঢ় বন্ধুত্ব থাকলেও ঘটনার মাসদুরেক আগে সেটা একেবারে দুম্ করে শেষ হয়ে যায়। তারপর থেকে তাঁরা একে অপরের সঙ্গে দেখাও করেননি।
বয়স্ক ডাক্তারটি নিজে সহজ-সরল, আর বড়োই খোলা মনের মানুষ। অটোপ্সির ফলাফল জেনে তিনি একেবারে স্তম্ভিত হয়েছিলেন। মাঝরাত্তিরে ডাক পেয়ে তিনি এসে দেখেছিলেন, তিনটি মানুষ ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে মিস জোন্সের অবস্থা যে সবচেয়ে খারাপ এটা বুঝে তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের ডিসপেন্সারি থেকে কটা আফিমের পিলও আনতে পাঠিয়েছিলেন, যাতে তাঁর যন্ত্রণা কমানো যায়। তবে যথাসাধ্য চেষ্টা করেও মিস জোন্সকে বাঁচানো যায়নি। কিন্তু এর সঙ্গে বিষক্রিয়ার কোনো সম্পর্ক আছে বলে তিনি ভাবেনইনি। ডাক্তারের দৃঢ় ধারণা ছিল, মৃত্যু হয়েছে এক ধরনের বটুলিজমের ফলে।
সেই রাতে খাবার হিসেবে ছিল টিনভরতি গলদা চিংড়ি, স্যালাড, ট্রিফল—মানে ক্রিম কাস্টার্ড-জেলি দেওয়া কেক, পাউরুটি, আর চিজ। দুঃখের বিষয় হল, গলদা চিংড়ির কিছুই বাঁচেনি। সবটাই খাওয়া হয়ে গেছিল, তারপর টিনটা ফেলেও দেওয়া হয়েছিল। বাড়ির কমবয়সী কাজের মেয়ে গ্ল্যাডিস লিঞ্চকে এই নিয়ে রীতিমতো জেরা করেছিলেন ডাক্তার। মেয়েটি একেবারে অস্থির হয়ে গেছিল আর ভীষণ কান্নাকাটি করছিল। তার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতে হিমসিম খেয়েছিলেন ভদ্রলোক। তবে মেয়েটি একেবারে জোর গলায় বলেছিল যে টিনটা কোনোভাবেই ফুলে-ফেঁপে যায়নি। গলদার চেহারা দেখেও তার মনে হয়েছিল যে সেটা একদম ঠিকঠাক আছে।
আমাদের হাতে এগোনোর মতো তথ্য বলতে এটুকুই ছিল। জোন্স যদি শয়তানি করে নিজের স্ত্রী-কে আর্সেনিক খাইয়েও থাকে, এই জিনিসগুলোর মাধ্যমে সেটা হওয়া সম্ভব ছিল না। তিনজনেই ওই একই খাবার খেয়েছিলেন। তাছাড়া আরও একটা জিনিস মাথায় রাখতে হচ্ছিল। একেবারে টেবিলে খাবার সাজানোর সময়েই জোন্স বার্মিংহাম থেকে ফিরেছিলেন ফলে আগে থেকে খাবারে কিছু মেশানোর সুযোগ ছিলই না তাঁর কাছে।”
“ওই সঙ্গিনীটি,” জয়েস বলে উঠল, “মানে গোলগাল, হাসিখুশি মুখের মহিলার সম্বন্ধে কিছু জানতে পারেননি?”
“আমরা তাঁকে উপেক্ষা করিনি। এ বিষয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।” সায় দিলেন হেনরি, “মুশকিল হল, এই খুনে তাঁর কী স্বার্থ থাকতে পারে, তা বোঝা যাচ্ছিল না। মিসেস জোন্স তাঁর জন্য কিছুই রেখে যাননি। বরং এই মৃত্যুর ফলে তাঁকে এই বয়সে নতুন করে একটা কাজ খুঁজতে হয়েছিল।”
“তাহলে অবশ্য তাঁকে বাদই দিতে হচ্ছে।” চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল জয়েস।
“আমাদের একজন ইন্সপেক্টর অবশ্য একটা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আবিষ্কার করেছিল।” বলে চললেন হেনরি, “রাতের খাওয়ার পর মিস্টার জোন্স নাকি রান্নাঘরে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁর স্ত্রী ভালো বোধ করছেন না- তাই তাঁর জন্য একবাটি কর্নফ্লাওয়ার লাগবে। গ্ল্যাডিস লিঞ্চ সেটা বানিয়ে না-দেওয়া অবধি তিনি নাকি রান্নাঘরেই অপেক্ষা করেছিলেন। তারপর নিজে হাতে সেটা স্ত্রী-র ঘরে দিয়ে এসেছিলেন। আমাদের কাছে এটুকু যথেষ্ট বলে মনে হয়েছিল।”
“স্বার্থ।” হাতের একটা-একটা করে আঙুল গুণে সায় দিতে লাগলেন পেথরিক, “সুযোগ। কেমিস্টের সংস্থায় চাকরি করার সুবাদে সহজেই বিষ জোগাড় করতে পারা।”
“শিথিল নৈতিক চরিত্রের কথাটাও ভুললে চলবে না।” যোগ করলেন পেন্ডার।
“দাঁড়ান-দাঁড়ান।” রেমন্ড বড়ো বড়ো চোখে হেনরির দিকে তাকিয়ে বলল, “এখানে কিছু একটা ব্যাপার আছে। আপনারা লোকটাকে গ্রেফতার করলেন না কেন?”
“এটাই এই মামলার সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক দিক।” দুঃখিত ভঙ্গিতে হাসলেন হেনরি, “তখনও অবধি সবকিছু মসৃণভাবে চলেছিল। কিন্তু এর পরেই আমরা আটকে গেলাম। জোন্সকে গ্রেফতার করা গেল না মিস ক্লার্কের জন্য। জেরার উত্তরে মিস ক্লার্ক বলেছিলেন, ওই একপাত্র কর্নফ্লাওয়ার মিসেস জোন্সের বদলে তিনিই নাকি খেয়েছিলেন।
রাতে শোয়ার আগে রোজকার মতো সেদিনও মিসেস জোন্সের ঘরে গেছিলেন মিস ক্লার্ক। মিসেস জোন্স বিছানায় বসে ছিলেন। কর্নফ্লাওয়ারের পাত্রটা তাঁর পাশেই রাখা ছিল। তিনি নাকি বলেছিলেন, ‘আমার শরীরটা ভালো লাগছে না, মিলি। অবশ্য রাতে গলদা চিংড়ি খাওয়ার শাস্তি তো পেতেই হবে। একবাটি কর্নফ্লাওয়ারের জন্য অ্যালবার্টকে বলেছিলাম বটে, কিন্তু এখন আর সেটা খেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘ইশ!’ মিস ক্লার্ক বলে উঠেছিলেন, ‘জিনিসটা খুব ভালোভাবে বানানোও হয়েছে। কোথাও কিছু দলা পাকিয়ে যায়নি। প্ল্যাডিস সত্যিই ভালো রাঁধুনি। আজকাল খুব কম মেয়েই কর্নফ্লাওয়ার ঠিকমতো বানাতে পারে। আমার তো জিনিসটা দেখে এতই ভালো লাগছে যে বেশ খিদে পেয়ে যাচ্ছে!’
‘বোকা-বোকা কাজ করলে খিদে থেকে যাওয়াই স্বাভাবিক।’ বলেছিলেন মিসেস জোন্স।
এই প্রসঙ্গে বলি, মিস ক্লার্ক তাঁর ক্রমবর্ধমান স্থূলত্বের কথা ভেবে নিজের খাওয়া-দাওয়ার ওপর নানারকম নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিলেন। মিসেস জোন্স নাকি ডায়েটিং-এর প্রসঙ্গ তুলে সেই রাতে তাঁকে বলেছিলেন, ‘ওইভাবে খাওয়া-দাওয়া কমানো ভালো নয়, মিলি। ঈশ্বর যদি তোমাকে মোটাসোটা করেই বানিয়ে থাকেন, তাহলে তোমার তেমনই থাকা উচিত। তুমি এই একবাটি কর্নফ্লাওয়ার খেয়ে নাও তো! ওতে তোমার ভালোই হবে।
ব্যস, মিস ক্লার্ক এরপর ওখানে দাঁড়িয়েই একবাটি কর্নফ্লাওয়ার সাফ করে দিয়েছিলেন। তারই সঙ্গে ধুয়েমুছে গেছিল মিস্টার জোন্সের বিরুদ্ধে সযত্নে খাড়া করা আমাদের কেসটিও। পরে আমাদের জেরার সামনে মিস্টার জোন্স ব্লটিং পেপারে ছাপ রেখে যাওয়া চিঠিটার ওই শব্দগুলোরও ব্যাখ্যা দিতে পেরেছিলেন। তিনি নাকি তাঁর অস্ট্রেলিয়া-নিবাসী ভাইয়ের কাছ থেকে অর্থসাহায্য চেয়ে একটা চিঠি পেয়েছিলেন। উত্তরে তিনি লিখেছিলেন, আর্থিক বিষয়ে তিনি পুরোপুরি স্ত্রী-র ওপরেই নির্ভরশীল। স্ত্রী-র মৃত্যু হলে তিনি টাকা-পয়সার ওপর নিয়ন্ত্রণ পাবেন। তখন তিনি নিশ্চয় নিজের ভাইকে সাহায্য করবেন। জোন্স এ-ও লিখেছিলেন যে বিশ্বজুড়ে শত-সহস্র মানুষকে এইরকম দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।”
“কেস একেবারে চুরমার হয়ে গেল তাহলে?” জানতে চাইলেন পেন্ডার।
“এক্কেবারে।” গম্ভীর মুখে হেনরি বললেন, “হাতে কিছুই ছিল না বলে আমরা জোন্সকে গ্রেফতার করতেই পারিনি।” সবকিছু চুপচাপ হয়ে রইল বেশ কিছুক্ষণ। তারপর জয়েস জিজ্ঞেস করল, “ব্যস? এটুকুই?”
“গত একবছর ধরে ব্যাপারটা এখানেই থেমে ছিল। তবে এই রহস্যের প্রকৃত সমাধান এখন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের হাতে এসেছে। আর দু থেকে তিন দিনের মধ্যেই আপনারা খবরের কাগজে সবটা জানতে পারবেন।”
“প্রকৃত সমাধান।” থেমে থেমে বলল জয়েস, “আচ্ছা, বেশ। আমরা সবাই পাঁচ মিনিট এই নিয়ে ভাবি, তারপর বলি, কেমন?”
রেমন্ড মাথা নেড়ে সায় দিয়ে ঘড়িতে সময়টা দেখে নিল। ঠিক পাঁচ মিনিট কেটে যাওয়ার পর সে পেন্ডারের দিকে তাকিয়ে বলল, “আপনিই কী প্রথম বলবেন?”
বৃদ্ধ যাজকটি মাথা নেড়ে বললেন, “আমি একেবারে…. যাকে বলে… বিভ্রান্ত হয়ে গেছি। মনে হচ্ছে যে স্বামীটিই অপরাধী। কিন্তু সে খুনটা করল কীভাবে? সে নির্ঘাত এমন কোনো উপায়ে বিষপ্রয়োগ করেছিল, যেটা কেউ ধরতে পারেনি। তাহলে এতদিন পর সেটা সামনে এল কেন?”
“জয়েস?”
“ওই সঙ্গিনী মহিলা!” দৃঢ়, নিশ্চিত ভঙ্গিতে বলে উঠল জয়েস, “প্রত্যেক ধাপে ওই সঙ্গিনীকে পাচ্ছি আমরা। আচ্ছা, আমরা কী করে ধরে নিচ্ছি যে তাঁর কোনো স্বার্থ ছিল না? বয়স্ক হোন, মোটা হোন, কুরূপা হোন, তিনি তো জোন্সকে ভালোবেসে থাকতেই পারেন! বা, হয়তো তিনি মিসেস জোন্সকে অন্য কোনো কারণে ঘেন্না করতেন। একবার ভাবুন, সঙ্গিনী হিসেবে তাঁকে তো নিজের যাবতীয় রাগ আর আবেগ চেপে রেখে, সবসময় ভদ্র আর নরম হয়ে থাকতে হত, তাই না? একদিন তিনি আর এ-সব নিতে না পেরে হয়তো মিসেস জোন্সকে খুনই করে ফেললেন। হয়তো তিনিই কর্নফ্লাওয়ারে আর্সেনিক মিশিয়েছিলেন, আর বাটিভরতি কর্নফ্লাওয়ার খেয়ে ফেলার গল্পটা স্রেফ মিথ্যে।”
“মিস্টার পেথরিক?”
নিজের দু-হাতের আঙুলগুলো একসঙ্গে এনে উকিলটি পেশাদারি ভঙ্গিতে বলে উঠলেন, “আমি কিছু বলতে চাইছি না। যেটুকু জেনেছি তার ভিত্তিতে আমার কিছু বলা উচিতই নয়।”
“কিন্তু বলতে তো আপনাকে হবেই, মিস্টার পেথরিক।” বলল জয়েস, “এখানে আপনি ‘বিবেচনাধীন’, ‘নিরপেক্ষতার খাতিরে … এইসব আইনি কথার আড়ালে আশ্রয় নিতে পারবেন না। এখানে আপনাকে খেলাটা খেলতেই হবে।”
“যতটুকু শুনলাম,” পেথরিক বললেন, “তাতে কিছুই বলার নেই। তবে ব্যক্তিগতভাবে এই ধরনের অজস্র কেস দেখেছি বলে বলতে পারি, স্বামীটিই অপরাধী। মিস ক্লার্ক অথবা অন্য কেউ সচেতনভাবে তাঁকে বাঁচানোর ফলেই ব্যাপারটা আমাদের কাছে এইরকম হয়ে ধরা দিয়েছে। হয়তো সেই ব্যক্তিটির সঙ্গে মিস্টার জোন্স কোনো আর্থিক বোঝাপড়া করেছিলেন। তিনি জানতেন যে পুলিশ সবচেয়ে আগে তাঁকেই সন্দেহ করবে। এদিকে মিস ক্লার্কের ভবিষ্যৎ মোটেই সুরক্ষিত বা স্বচ্ছল ছিল না। হয়তো সেজন্যই তিনি মোটা টাকার বিনিময়ে ওই কর্নফ্লাওয়ার খাওয়ার গল্পটা পুলিশকে শুনিয়েছিলেন। এমন কিছু হয়ে থাকলে সেটা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। এ ঘোর অন্যায়!”
“আমি আপনাদের কারও সঙ্গে একমত নই।” ঘোষণা করল রেমন্ড, “আপনারা সবাই একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন। ডাক্তারের মেয়ে! বরং আমি যেভাবে ব্যাপারটা দেখেছি, সেটা আপনাদের বলি। টিনবন্দি গলদা চিংড়িটা খারাপ হয়ে গেছিল। তার ফলেই ওই বিষক্রিয়ার লক্ষণগুলো দেখা গিয়েছিল। ডাক্তার ডাকা হল। তিনি এসে দেখলেন, অন্যদের থেকে বেশি পরিমাণে জিনিসটা খাওয়ার ফলে মিসেস জোন্সই সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন। তিনি নিজের সংগ্রহ থেকে কয়েকটা আফিমের পিল আনানোর ব্যবস্থা করেন। ডাক্তার নিজে যাননি, বরং কাউকে পাঠিয়েছিলেন। এবার এই বার্তাবাহককে সেই পিলগুলো কে দেবে? নিঃসন্দেহে তাঁর মেয়ে। নিঃসন্দেহে ওষুধপত্র দেওয়ার অভিজ্ঞতা আর প্রশিক্ষণ তার আছে। মেয়েটি জোন্সকে ভালোবাসে। সেই সময়, মুহূর্তের জন্য হলেও, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা খারাপ প্রবণতাগুলো মাথা তুলেছিল। সে বুঝতে পেরেছিল, প্রতিদ্বন্দ্বীকে চিরতরে দূর করে দেওয়ার উপকরণ রয়েছে তার হাতের মুঠোয়। তাই আফিমের বদলে সে বার্তাবাহকের হাত দিয়ে যা পাঠিয়েছিল তা হল বিশুদ্ধ, দুধসাদা আর্সেনিক! এটাই আমার ব্যাখ্যা।”
“এবার তাহলে সঠিক সমাধানটা আমাদের বলুন, স্যার হেনরি।” উদ্গ্রীব হয়ে বলল জয়েস।
“এক মিনিট।” বললেন হেনরি, “মিস মার্পল এখনও কিছু বলেনি।”
“এই যাহ!” দুঃখিত ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন মিস মার্পল, “গল্পটাতে এমনই মজে গেছিলাম যে আমি আবার একটা ঘর বাদ দিয়ে গেছি। ঘটনাটা বড়োই দুঃখজনক। ওটা শুনতে-শুনতে মাউন্ট-এর পুরোনো চার্চওয়ার্ডেন মিস্টার হারগ্রিভসের কথা মনে পড়ে গেল। ভদ্রলোকের মৃত্যুর পর জানা গেল, তিনি নিজের যাবতীয় সম্পত্তি পাশের শহরের বাসিন্দা অন্য এক মহিলাকে দিয়ে গেছেন, যাঁর সঙ্গে তিনি শুধু থাকতেনই না, যাঁর গর্ভে তাঁর পাঁচটি সন্তানও হয়েছিল। অথচ মিসেস হারগ্রিভস্ ততদিন অবধি কিচ্ছুটি সন্দেহ করেননি। অন্য মহিলাটি একসময় ওই পরিবারেই কাজ করতেন। মিসেস হারগ্রিভস্ তার স্বভাবচরিত্রের প্রশংসাই করতেন, বলতেন মেয়েটি নাকি শুক্রবার বাদে অন্য প্রতিদিন তোশক-বালিশ সব ঝেড়ে দিত। এদিকে বুড়ো তাকে পাশের শহরে একটা বাড়িতে দিব্যি রেখে, আমাদের কাছ থেকে প্রতি রবিবার চাঁদা তুলত।”
“আচ্ছা পিসিমণি,” কিছুটা অধৈর্য হয়েই বলল রেমন্ড, “হারগ্রিভস্ সেই কবে মরে ভূত হয়ে গেছে। তার সঙ্গে এই কেসের কী সম্পর্ক?”
“ঘটনাটা শুনে আমার তাঁর কথাই মনে হয়েছিল।” বললেন মিস মার্পল, “দুটো ঘটনার মধ্যে প্রচুর মিল আছে, তাই না? বেচারি মেয়েটি নিশ্চয় এখন সব স্বীকার করেছে, আর সেজন্যই আপনারা সত্যিটা জানতে পেরেছেন, স্যার হেনরি।”
“বেচারি মেয়ে! তুমি কার কথা বলছ, পিসিমণি?” জিজ্ঞেস করল রেমন্ড।
“ওই বাড়ির কমবয়সী কাজের মেয়ে হতভাগিনী গ্ল্যাডিস লিঞ্চ! ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে যে ভীষণরকম অস্থির হয়ে উঠেছিল। হওয়াই স্বাভাবিক। আশা করি ওই বদমায়েশ জোন্সকে এবার ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হবে। তার জন্যই তো মেয়েটাকে খুনি হতে হল। বোধহয় তাকেও ফাঁসিতেই ঝুলতে হবে। বেচারি।”
“আপনার বোধহয় ঘটনাটা বুঝতে একটু ভুল হচ্ছে, মিস মার্পল।”
পেথরিক কথা বলতে শুরু করলেও গোঁয়ারের মতো মাথা নাড়লেন মিস মার্পল। হেনরির দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “আমি ঠিক বলছি, তাই না? পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে একেবারে স্পষ্ট। শত-সহস্র, তার সঙ্গে ওই ট্রিফল… এরপর তো ভুল হওয়ার কোনো সুযোগই থাকে না।”
“তার মানে? এই শত-সহস্র ব্যাপারটার মানে কী?” একরকম চেঁচিয়েই উঠল রেমন্ড।
“যে-কোনো রাঁধুনি ট্রিফলের ওপর ওই জিনিসগুলো দেয়।” রেমন্ডের দিকে ঘুরে ব্যাখ্যা করলেন মিস মার্পল, “গোলাপি আর সাদা যে চিনির দানাগুলো কেকের ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়, সেগুলোকেই হান্ড্রেডস্ অ্যান্ড থাউজেন্ডস্ অর্থাৎ শত-সহস্র বলা হয়। যে মুহূর্তে শুনেছি যে রাতের খাবারের সঙ্গে ট্রিফল ছিল, তার সঙ্গে জেনেছি যে স্বামীটি চিঠিতে শত-সহস্ৰ কথাটা লিখেছিল, তৎক্ষণাৎ দুইয়ে দুইয়ে চার করে ফেলেছি। ওই সাদা দানাগুলোতেই ছিল আর্সেনিক। ওগুলো গ্ল্যাডিসের কাছেই রেখে গেছিল লোকটা। তারপর চিঠির মাধ্যমে নির্দেশটা এসে পৌঁছেছিল ঠিক সময়ে।”
“কিন্তু তা তো অসম্ভব।” হুড়মুড়িয়ে বলে উঠল জয়েস, “ট্রিফল তো সবাই খেয়েছিল।”
“প্রশ্নই ওঠে না।” মাথা নাড়লেন মিস মার্পল, “সঙ্গিনী মহিলা ডায়েটিং করছিলেন, তাই না? ওই অবস্থার কেউ ট্রিফল ছুঁয়েও দেখবে না। জোন্স নির্ঘাত ওই সাদা দানাগুলোকে সযত্নে প্লেটের একপাশে ফেলে দিয়েছিল। মারাত্মক চালাকি করেছিল লোকটা- কিন্তু এতে তার শয়তানিটাই বোঝা যায়।”
বাকি সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ হল হেনরির ওপর।
“ভারি অদ্ভুত ব্যাপার।” ধীরে-ধীরে বললেন হেনরি, “কিন্তু মিস মার্পলই সত্যিটার নাগাল পেয়েছেন দেখছি। জোন্স গ্ল্যাডিস লিঞ্চকে … যাকে বলে… অত্যন্ত অবাঞ্ছিত একটা অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল। মেয়েটা তখন মরিয়া হয়ে উঠেছিল। জোন্স প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে স্ত্রী বিদায় হলে সে গ্ল্যাডিসকেই বিয়ে করবে। ওই সাদা দানাগুলোতে সে-ই আর্সেনিক মিশিয়ে দেয়। তারপর সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা গ্ল্যাডিসকে শিখিয়ে দেয়। এক সপ্তাহ আগে গ্ল্যাডিস লিঞ্চ মারা গেছে। তার সন্তান জন্মের সময়েই মারা যায়, জোন্সও তাকে ফেলে অন্য এক মহিলার সঙ্গে থাকতে শুরু করে। মৃত্যুর আগে গ্ল্যাডিস সবটা স্বীকার করে গেছে।”
বেশ কিছুক্ষণ ঘরে কেউ কিছু বলল না। তারপর রেমন্ড বলল, “তাহলে পিসিমণি, এবারের পুরস্কারটা তুমিই জিতলে। কিন্তু কী করে তুমি সত্যিটা ধরে ফেললে, সেটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না। মানে রান্নাঘরের ওই রাঁধুনিটির যে এই হত্যারহস্য কোনো ভূমিকা থাকতে পারে, সেটাই আমি ভাবতে পারিনি।”
“জীবন সম্বন্ধে আমি যতটা জানি, ততটা তোমরা জান না।” নরম গলায় বললেন মিস মার্পল, “জোন্সের মতো লোকদের, যারা এমনিতে হাসিখুশি হলেও চাহিদার দিক দিয়ে আগ্রাসী আর রুক্ষ হয়, আমি খুব ভালো করে চিনি। যে মুহূর্তে আমি শুনেছি যে বাড়িতে একটি অল্পবয়সী মেয়ে রয়েছে, বুঝতে পেরেছিলাম যে জোন্স তাকে কিছুতেই রেহাই দেবে না। এগুলো বাস্তব, তবে শুধু অস্বস্তিকর নয়, অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়কও বটে। এ-সব নিয়ে কথা বলতে ভালোও লাগে না। হারগ্রিভসের মৃত্যুর পর সব জানাজানি হলে গোটা গ্রাম কিছুদিন ধরে শুধু ওই নিয়েই কথা বলেছিল। আর মিসেস হারগ্রিভসের যে কী অবস্থা হয়েছিল, তা আমি তোমাদের বলতেও পারব না!”
***
মূল কাহিনি: ‘দ্য টুইসডে নাইটক্লাব’
রচয়িতা: আগাথা ক্রিস্টি
প্রথম প্রকাশ: ‘দ্য রয়্যাল ম্যাগাজিন’ ৩৫০ নং সংখ্যা, ডিসেম্বর ১৯২৭
