দ্য আল্টিমেট ট্রুথ – ১
(ঝড়ের রাত)
ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস, পাটুলি, কলকাতা
রাত ২টো, ১৭ জুলাই
সকাল থেকেই থেমে থেমে বৃষ্টি পড়ছে। বঙ্গোপসাগরে ঘনীভূত হয়েছে প্রবল নিম্নচাপ। বৃষ্টির পূর্বাভাস মাথায় নিয়েই মেয়েটিকে আজ অফিস দৌড়তে হয়েছে। আর্জেন্ট একটা মিটিং ছিল। বৈষ্ণবঘাটা পাটুলি টাউনশিপের কাছেই ওর অফিস। বিয়ের পরেই এই চাকরিটাতে যোগ দিয়েছে সে। মেয়েটিকে সে অর্থে ‘মিশুকে’ বলা যায় না। ছোটোবেলা থেকেই সে ইন্ট্রোভার্ট। নিজের মধ্যে আলাদা একটা পৃথিবী তৈরি করে নিজেই নিজের প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছে। এই চাকরিটাতে জয়েন করে কাজটা চালিয়ে যেতে যথেষ্ট অসুবিধায় পড়তে হয়েছে ওকে। কারণ, প্রাইভেটে, বিশেষ করে আইটি ফার্মগুলোতে কাজ করতে হলে অনেক বেশি স্মার্ট, মিশুকে, চৌখস হতে হয়। নিজের লিমিটেশনগুলো যতটা সম্ভব লুকিয়ে রেখে নিজেকে অনেক বেশি প্রেজেন্টেবল করে তুলতে হয় বাইরের লোকের সামনে। যদিও বিয়ের পর থেকেই জীবনটা আমূল বদলে গেছে ওর। বিয়েটাও হয়েছে বেশ আচমকাই। মাস্টার্স শেষ করার পরে বাড়ি থেকে বাবা-মা বিয়ের জন্য রীতিমতো চাপ দিচ্ছিল। তাই কতকটা বাধ্য হয়েই শেষমেশ বিয়েটা করতে হয়েছে। যদিও নিজেকে একদমই বিয়ের মেটেরিয়াল বলে মনে করে না সে। কারণ, আজকালকার মেয়েদের মতো স্মার্ট নয় সে। তার ওপরে, ঘরকন্নার কাজকর্মও সেভাবে কিছুই জানে না।
লেট ইভিনিং-এর মিটিংটা সেরে বেরতে বেরতে আজ অনেকটাই রাত হয়ে গেল মেয়েটির। এর মধ্যে, বার পাঁচেক ফোন এসেছে বাড়ি থেকে। বছর ঘুরতে লাগল অথচ স্বামী এখনও বউ বউ করে সারাদিন পাগল করে রাখে। রাতের দিকে, বাড়ি ফেরার জন্য খুব একটা অ্যাপ-ক্যাব পাওয়া যায় না এদিকে। যেদিন বাড়িতে ফিরতে লেট হয় সেদিন অফিসের এক কলিগ ওর জন্য ক্যাব বুক করে দেয়। এই সব কাজে একেবারেই সাবলীল নয় মেয়েটি। অফিসের ওই কলিগ খুব ভালো মনের মানুষ। মেয়েটিকে বোঝে। অফিসে একমাত্র এই কলিগের সঙ্গেই দু-দণ্ড বসে কথা বলতে পারে সে। নিজের সুবিধা-অসুবিধাগুলো প্রাণ খুলে জানাতে পারে। যদিও এই সম্পর্কটা নিজের স্বামীকে কোনো দিনই সেভাবে বলতে পারেনি, কারণ ওর স্বামী যথেষ্ট সন্দেহবাতিক স্বভাবের।
বৃষ্টিটা তেড়ে নামল। পনেরো মিনিট ধরে চেষ্টা করেও মেয়েটির জন্য কোনো ক্যাব বুক করতে না পেরে রীতিমতো হতাশ হয়ে পড়ল অফিস কলিগ ছেলেটি। ঠিক তখনই, সামনের মোড়ে, একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে থামল। ট্যাক্সি দেখেই বৃষ্টির মধ্যেই ছাতা হাতে দৌড়ে গেল ওরা দু-জনেই। বেশ কিছুক্ষণ দরাদরি করে অবশেষে ট্যাক্সিতে উঠে বসল মেয়েটি। কলিগ ছেলেটি ইশারা করে কিছু একটা বলতে চাইল। একটা সময় ছিল যখন সামনের মানুষগুলোর এই সব ছোটোখাটো ইশারা একেবারেই ধরতে পারত না সে। তবে এখন ততটা অসুবিধা হয় না। শব্দ করে স্টার্ট নিল হলুদ ট্যাক্সিটা। ছুটে চলল বর্ণসিক্ত শহরের ভেজা পিচের রাস্তা কামড়ে। কবজি উলটে ঘড়ির সময়টা দেখল মেয়েটি। অনেকটাই রাত হয়ে গেছে। মুখ থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ট্যাক্সির মধ্যে একমাত্র ড্রাইভারের ডান হাতের দিকের জানালাটা খোলা। তাই বাইরে থেকে বৃষ্টির জল চলন্ত গাড়ির মধ্যে সেভাবে আসছে না। অজান্তেই মেয়েটির চোখ দুটো ট্যাক্সির মধ্যে ঘুরতে শুরু করল। ড্রাইভারের চেহারা একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না ওর। তার ওপরে গাড়িতে ওঠার পর থেকেই একটা কটু গন্ধ ক্রমাগত বিরক্ত করছে। ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করেও কোনো সদুত্তর পায়নি সে। কিছু করার নেই। বৃষ্টির রাতে বাড়িতে ফেরার আর কোনে। উপায়ও নেই। গাড়িটার ভেতরটা বেশ অগোছালো। ট্যাক্সি অথচ কোনো মিটার নেই। থাকলেও এত রাতে কোনো ট্যাক্সিই মিটারে যেতে রাজি হতো না যদিও। গাড়ির ড্যাস-বোর্ডে একটা ফটো-ফ্রেম। যদিও কোনো ঠাকুরদেবতার ছবি তাতে সাঁটা নেই। ফ্রেমটা একদম খালি পড়ে আছে। সিটগুলো ছেঁড়া, পুরোনো। দেখেই মনে হচ্ছে, নিতান্ত ঠেকায় পড়েই ড্রাইভার, গাড়িটা আজ বের করেছে। দেখতে দেখতে গাড়ির গতিটা বেড়ে গেল অনেকটাই। বাইরের দৃশ্যপট বলদে গেল আচমকাই। সবকিছু কেমন যেন অচেনা লাগতে শুরু করল মেয়েটির কাছে। বিপদের আশঙ্কায় কুঁকড়ে বসল সে।
(রেপ অ্যান্ড মার্ডার)
বিশ্ববাংলা মিলন মেলা গ্রাউন্ডের সাত নাম্বার গেট
সকাল ৭টা, ১৭ জুলাই
প্রগতি ময়দান থানায় কিছুক্ষণ আগেই খবরটা এসেছিল। খবর পেয়েই ছুটে এসেছেন ডিউটি অফিসার দুর্জয় সেন। ২০১০ ব্যাচের সাব-ইন্সপেক্টর। বেশ কয়েক বছর ধরেই এই থানায় পোস্টেড আছেন। খুবই ডেডিকেটেড অফিসার। আর তাই, থানায় জয়েন করার কয়েকদিনের মধ্যেই বড়োবাবুর খুবই প্রিয় পাত্র হয়ে উঠেছেন তিনি।
ভোরের দিকে মিলন মেলা গ্রাউন্ডের গেটের অনতিদূরে একটা ঝোপের মধ্যে মৃতদেহটিকে নগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে থানায় খবর দেয় লোকাল একজন দোকানদার।
“কী বুঝছেন স্যার?” পাশে দাঁড়িয়ে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে নিজের বিস্ময় প্রকাশ করলেন লেডি কনস্টেবল রিতা পাল।
“যেটা আপনি বুঝেছেন, সেটাই আমার মনে হচ্ছে। ইটস এ ক্লিয়ার কেস অফ রেপ অ্যান্ড মার্ডার!” বললেন দুর্জয়। যথেষ্ট চিন্তিত লাগছে ওঁকে। গতকাল থেকে নাইট ডিউটি চলছিল ওঁর। আজ বিবাহবার্ষিকী। বড়োবাবুকে অনেক ধরেকয়ে নাইট ডিউটিটা নিয়েছিলেন তিনি। সকাল সকাল কাজ সেরে বাড়িতে যাবেন ঠিক করেই রেখেছিলেন। কিন্তু কথায় আছে না, মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক। সামনে পড়ে থাকা মৃতদেহটির দিকে ভালো করে দেখতে থাকলেন দুর্জয়। পূর্ণবয়স্কা মহিলা। বয়স তিরিশের মধ্যেই হবে। মোটের ওপর রোগাপাতলা গড়ন। কপালের বাম দিক বরাবর একটা জরুল আছে। মাথার কালো চুলগুলো বড্ড বেশি এলোমেলো। গায়ে কোনো সুতো নেই। গলার কাছে থোলোথোলো রক্ত শুকিয়ে আছে। আড়াআড়িভাবে গলাটা কাটা। ক্লিন কাট বলেই মনে হচ্ছে যদিও ইঞ্জুরির মার্জিনটা ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে না দেখলে ভালো করে বোঝা যাবে না। ক্ষতটায় মাছি ভনভন করছে। তবে দেহের পচন শুরু হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। হাত দুটো দুইদিকে ছড়ানো, পা দুটো হাঁটু থেকে ভাঁজ হয়ে দুই দিকে খুব বাজেভাবে ছড়িয়ে আছে। মনে হছে, বডিটা এখানে ডাম্প করা হয়েছে। কারণ, ঝোপঝাড়ের আশপাশটা খুব একটা ডিস্টার্ব বলে মনে হচ্ছে না।
“গলার ক্ষতটা বেশ গভীর। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, ধারালো কোনো ছুরি দিয়ে গলাটা স্লিট করা হয়েছে। আপনি কেমন করে বলছেন, খুনটা করার আগে মেয়েটিকে রেপও করা হয়েছিল?” বিস্ময় প্রকাশ করলেন রিতা পাল।
“একটু ভালো করে দেখলেই বুঝতে পারবেন, মেয়েটির ওপরে অত্যাচার করে ওকে এখানে ডাম্প করা হয়েছে। ওর পরনের জামাকাপড়গুলোও আশেপাশে কোথাও নেই। তার মানে, ঘটনাটা অন্যত্র ঘটানো হয়েছে। এবং এখানে নিয়ে এসে ফেলা হয়েছে। মেয়েটি বিবাহিত কারণ, মাথায় সিঁদুরের হালকা দাগ দেখা যাচ্ছে। যদিও হাতে, গলায়, কানে কোনো গহনাগাঁটি নেই। হয়তো খুনের পরে খুনি ওগুলো খুলে নিয়ে গেছে। তাছাড়া, মেয়েটির ব্রেস্টের পাশে অনেকগুলো নেইল-স্ক্র্যাচ মার্ক দেখা যাচ্ছে। লোয়ার অ্যাবডোমেনে অনেকগুলো বাইট মার্কও আছে। তাছাড়া, মেয়েটির ভাজাইনা এরিয়াতেও ইঞ্জুরি আছে বলেও মনে হচ্ছে।”
দুর্জয়ের কথা শুনে রীতিমতো ঘাবড়ে গেলেন রিতা। মনটা খিঁচড়ে গেল। খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন থানার বড়োবাবু অভিনন্দন মার্জিত। যথেষ্ট চিন্তিত লাগছে ওঁকে। সেটা হওয়ারই কথা। রেপ উইথ মার্ডারের ঘটনা যে-কোনো থানার বড়োবাবুর কাছে যথেষ্ট চিন্তার বিষয়। কারণটা সহজেই অনুমেয়। বিরোধী পার্টিগুলো এই ধরণের একটা ঘটনাকে ইস্যু করার জন্য সাধারণত মুখিয়ে থাকে। তাছাড়া, সিঙ্গল ইঞ্জিন সরকারের কাছে ক্রাইম এগেনস্ট ওম্যানের ঘটনাগুলো ট্যাকেল করাটাও যথেষ্ট চ্যালেঞ্জিং। ‘রাজ্যের নারী সুরক্ষা আক্রান্ত’, এই আওয়াজ তুলে বড়ো-ছোটো মিডিয়া হাউজগুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনের ওপরে।
“ডেডবডিটা ইমিডিয়েট ব্রট-ডেথ করিয়ে ময়না তদন্তের জন্য কাঁটাপুকুর মর্গে পাঠিয়ে দিন। ওখানেই সুরতহাল এবং ময়না তদন্ত হবে। তাছাড়া, আমি ফরেনসিকেও খবর দিয়েছি। ওরাও একটু পরেই চলে আসবে। এর মধ্যে সিন অফ ক্রাইমটা ভালো করে সিকিওর করে ক্রাইম সিনের ফটোগ্রাফিটা করিয়ে নিন। আর হ্যাঁ, ওই দোকানদার, যিনি সবার আগে ডেডবডিটা দেখেছিলেন তাঁর বয়ান অনুসারে একটা কেস স্টার্ট করে দিন।” ইন্সট্রাকশনগুলো দিয়েই গাড়িতে উঠে বসলেন অভিনন্দন মার্জিত।
(ক্রুয়ের সন্ধানে)
বিশ্ববাংলা মিলন মেলা প্রাউন্ডের সাত নাম্বার গেটের কাছে
সকাল ৭টা ৩০, ১৭ জুলাই
ফরেন্সিক দল একটু আগেই ঘটনাস্থলে এসে উপস্থিত হয়েছে। খুঁটিয়ে দেখছে ডেডবডি এবং আশেপাশের এলাকাটা। ওদের সার্চিং খুব গোছানো হয়। যদিও দিনের বেলা তাও ওঁদের একজন ফ্ল্যাশলাইট হাতে ইম্প্রেশন খুঁজছেন, একজন নমুনা সংগ্রহ করছেন, একজন চেইন-অব-কাস্টডির জন্য সেসবের ডকুমেন্টিং করছেন। করেনসিক হেড অমিয় মজুমদার খুব মন দিয়ে দেখেশুনে কয়েকটা জায়গার যত্ন সহকারে বিভিন্ন রঙের মার্কার কার্ড ফেলছিলেন। রং ভেদে এই কার্ডগুলো এভিডেন্সের প্রকারভেদকে নিয়ন্ত্রন করে। মজুমদার সাহেব নিজের হাতে থাকা কেমিক্যালটা ডেডবডির আশেপাশের বিভিন্ন জায়গার ছড়িয়ে সেখানে ব্লাডের কোনো ট্রেস আছে কী না, বুজছিলেন। নিজেদের কাজ শেষ করে বিভিন্ন জায়গা থেকে বেশ কিছু এভিডেন্স সংগ্রহ করে একে একে সেগুলো থানার ডিউটি অফিসার দুর্জয় সেনের হাতে তুলে দিল করেন্সিক দল। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়েই দুর্জর ভালো করে খেয়াল করলেন, ফরেন্সিক দল ওই জায়গা থেকে একটা আধ খাওয়া বিড়ির টুকরো, একটা পোড়া দেশলাই কাঠি, মেডিকেটেড গজে নেওয়া রক্তের ট্রেস সংগ্রহ করে সামনে নামিয়ে রেখেছে। গ্লাভস পড়া হাতে ফিজিক্যাল এভিডেন্সগুলো তুলে একবার ভালো করে দেখে নিলেন দুর্জয়। তারপরে মজুমদার সাহেবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী মনে হচ্ছে স্যার?”
“একটা বিষয় আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, অপরাধী ডেডবডির জামাকাপড়গুলো ডেডবডির সঙ্গে এখানে না ফেলে বাকি আইটেমগুলো এখানে ফেলতে গেল কেন? শুধু ডেডবডিটা এখানে ডাম্প করে চলে গেলেই তো হতো।”
“আমিও তো সেটাই ভাবছি স্যার। অপরাধী কী আমাদের বোকা বানাতে চাইছে?”
“হতে পারে। আবার নাও হতে পারে। আমরা যাতে এই প্রশ্নের উত্তরটা খুঁজতে গিয়ে ওকে বেশি চালাক ভাবি, হয়তো সেটাই ওর উদ্দেশ্য ছিল।”
“মেয়েটার বডি দেখে না জানি কেন আমার অন্য একটা কথা মনে হচ্ছে।”
“কী?”
“ভালো করে দেখুন স্যার। মেয়েটির হাতে কোনো ডিফেন্স ইঞ্জুরি নেই। অর্থাৎ মেয়েটি অত্যাচারের আগে নিজেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। আর এটা হতে পারে, ধর্ষণের আগে মেয়েটিকে কিছু একটা বাইরে অজ্ঞান করে দেওয়া হয়েছিল বলে অথবা আচমকা খুন-টা করে তারপরে ওকে অত্যাচার করা হলে।”
“ইয়েস। দ্যাট মে বি টু।”
“খুনের ওয়েপন এবং মেয়েটির পোশাকগুলো তাহলে কোথায় ফেলল?”
“সেটা আপনাকেই খুঁজে বের করতে হবে। মেয়েটির আইডেন্টিটি হাইড করতেই এই কাজটা করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে….”
“তবে কী স্যার?”
“রাস্তার পাশেই যখন ডেডবডিটা পাওয়া গেছে, আমার মনে হচ্ছে কোনো গাড়িতে করে যাওয়ার সময়ে বডিটা এখানে ফেলে যাওয়া হয়েছে। তাই জামাকাপড়গুলো খুঁজতে আপনাকে খুব একটা খাটতে হবে না।”
“আমারও তাই মনে হচ্ছে। তাছাড়া, এই এলাকায় বেশ কয়েকটা সিসি ক্যামেরা আছে। ওই ফুটেজগুলো থেকে কিছু না কিছু কু ঠিক পেয়ে যাব বলেই মনে হচ্ছে। দেখা যাক, কতটা কী করতে পারি।”
বাকি ফরম্যালিটিজগুলো করে মৃতদেহটিকে দ্রুত মর্গে পাঠানো হল।
(সকালের খবরটা)
প্রগতি ময়দান থানা, কলকাতা
সকাল ৯টা ৩০, ১৭ জুলাই
ইতিমধ্যেই আশেপাশের সিসি ফুটেজগুলো কালেক্ট করে থানায় নিয়ে আসা হয়েছে। যে দোকানদার সবার আগে ডেডবডিটা পড়ে থাকতে দেখেছিলেন তাঁকেও থানায় ডেকে নিয়ে আসা হয়েছে। মৃতদেহটিকে মর্গে পাঠানো হয়েছে। ডিসি সাহেব কেসের তদন্তের জন্য একটা ‘স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম’ বা ‘সিট’ গঠন করে দিয়েছেন। এই টিমে দু-জন মহিলা অফিসার-সহ মোট পাঁচজন পুলিশ অফিসারকে রাখা হয়েছে। যদিও দুর্জয় সেন প্রধান তদন্তকারী অফিসার হিসেবেই কাজটা চালিয়ে যাবেন। তাছাড়া, কমিশনার সাহেবের নির্দেশে সিটকে যথা সম্ভব পাওয়ার দেওয়া হয়েছে যাতে এই টিমের সদস্যরা নির্দ্বিধায় কাজ করতে পারেন। ইতিমধ্যেই মিডিয়া হাউজগুলো কেসটাকে আলাদা করে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে। পিছিয়ে নেই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোও। পুলিশ প্রশাসন আর সরকারের বাপবাপাত্ত শুরু হয়েছে। অবশ্য এটাই স্বাভাবিক। কারণ, এই ধরনের যে-কোনো ঘটনাই অভিপ্রেত নয়।
সকালের ধকল থেকে কিছুটা নিস্তার পাওয়ার জন্য থানার অফিসার’স রুম সংলগ্ন ব্যালকনির রোদে চা নিয়ে বসেছেন দুর্জয় সেন। সামনে কেস ডায়েরিটা খোলা পড়ে আছে। পাশের ঘর থেকে বড়োবাবুর চিৎকার শোনা যাচ্ছে। আসলে এই কেসটা নিয়ে তিনিও যথেষ্ট চাপে আছেন। ওপর মহলের প্রেশারটা সরাসরি ওঁর কাছেই এসে প্রথমে গোঁত্তা খাচ্ছে। তারপরে সেটা ড্রপ খেতে খেতে এদিকে ওদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। পদার্থবিদ্যার সূত্র অনুসারে চাপের পরিমাণটাও কমতে কমতে নীচের দিকে নেমে আসছে। তবুও বড়োবাবুর চিৎকারটা শুনেই মেজাজটা চটকে গেল দুর্জয়ের। মনের ভেতর থেকে একটা ‘ধুস!’ বেরিয়ে আসতে চাইলেও কোনোমতে সেটাকে আটকালেন তিনি। চায়ের কাপটা টেবিলের ওপরে রেখেই নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। দেখলেন, ব্যালকনির রেলিংটায় একটা চড়ুই এসে বসেছে। একটু পরে আরও একটা এল। দুটোতে মিলে শব্দ করে কথা বলতে শুরু করল। মনটা অন্যমনস্ক হয়ে গেল দুর্জয়ের।
“স্যার, বিমল সিকদারকে ডেকে এনেছি। আপনি কথা বলবেন?”
চটকা ভেঙে পেছন ফিরে তাকালেন দুর্জয়। দেখলেন, লেডি অফিসার কমলিনী বড়ুয়া দাঁড়িয়ে আছেন। মুচকি হেসে দুর্জয় উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ। ডাকুন ওঁকে। কথা বলব।”
“কীসের দোকান আপনার?”
“চায়ের দোকান, স্যার।”
“চায়ের দোকান! তাহলে এত বেলা করে দোকান খুললেন কেন?”
“না স্যার। রোজ সকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ দোকান খুলি। কিন্তু কালকে রাত থেকে শরীরটা একদমই ভালো ছিল না। তাই আজকে সকালে দোকান খুলতে দেরি হয়ে যায়।”
“বাড়ি কোথায়?”
“আনন্দপুর এলাকায়।”
“আনন্দপুর তো আপনার দোকান থেকে অনেকটাই দূরে। এত সকালে দোকানে আসেন কী করে?”
“সাইকেল করে।”
কথাটা শুনে মনে মনে কিছুটা একটা ভাবলেন দুর্জয়। তারপরে নিজের সামনে খুলে রাখে ডায়েরিতে খস খস করে কিছু একটা লিখলেন। সামনে বসে থাকা বিমল সিকদারের দিকে তাকিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন, “বাড়িতে কে কে আছে?”
“আমি, আমার স্ত্রী রমলা আর আমাদের বছর দশেকের মেয়ে রক্তিমা।”
“আপনি যা যা দেখেছেন সেগুলো পর পর বলুন। কিছু বাদ দেবেন না।”
কথাটা শুনেই কিছু সময়ের জন্য নীরব হয়ে গেলেন বিমলবাবু। তারপরে বলতে শুরু করলেন, “সকাল পৌনে সাতটা নাগাদ সাইকেল নিয়ে মিলন মেলা গ্রাউন্ডের সাত নাম্বার গেটের সামনে আসি। রাস্তার একটা পাশে সাইকেলটাকে স্ট্যান্ড করিয়ে সামনের ঝোপের দিকে যাই। টয়লেট করতে যাব, ঠিক তখনই মেয়েটির নগ্ন মৃতদেহটা চোখে পড়ে। চমকে উঠি। কিছুটা ঘাবড়েও যাই। কী করব, কাকে খবরটা দেব, প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না। তারপরে মোবাইলে সেভ করে রাখা থানার নাম্বারটায় ফোন করে খবরটা দিই।”
“ভালো করে একটু ভেবে বলুন তো, সেই সময়ে ওই মৃতদেহের পাশে আর কাউকে দেখেছিলেন?”
“পাশে কেন, ওই এলাকায় তখন একমাত্র আমি আর ওই মেয়েটার মৃতদেহ ছাড়া আর কেউ কোথাও ছিল না।”
“যেখানে ডেডবডিটা পড়েছিল, সেখান থেকে আপনার দোকানটা ঠিক কতটা দূরে?”
“পায়ে হেঁটে মিনিট দশেক।”
“ওই এলাকায় আপনার চায়ের দোকান অথচ আপনি যখন ডেডবডিটা খুঁজে পেলেন তখন আশেপাশে আর কাউকে দেখতে পেলেন না?”
“বিশ্বাস করুন স্যার, আমি তখন ওখানে আর কাউকে দেখিনি। তবে…”
“তবে কী?”
“পুলিশ আসার পরে কিছু সময়ের জন্য আমি নিজের দোকানে গিয়েছিলাম। তখন আমার দোকানের সামনে বেশ কয়েকটা হলুদ ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি।”
কথাটা শুনেই চমকে উঠলেন দুর্জয়। তারপরে বিমলের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার দোকানে সকাল সকাল চা খেতে সাধারণত কারা আসে?”
“ট্যাক্সি ড্রাইভার, সকালে হাঁটতে আসা মানুষজন, আশেপাশের দোকানদার এবং সাধারণ পথ চলতি মানুষ।”
“আজকে নিজের দোকানটা আর খুলে ছিলেন?’
“কী করে খুলব স্যার। আপনারাই তো আমার ব্যবসাটা মাটি করে দিলেন। তুলে নিয়ে চলে এলেন। বললেন, কী সব অভিযোগ করতে হবে।”
মুচকি হেসে পাশে বসে থাকা কমলিনীকে কিছু একটা ইশারা করতেই বিমলবাবুর দিকে তাকিয়ে কমলিনী বললেন, “ঠিক আছে আপনি আমার সঙ্গে সেরেস্তায় চলুন। আমি আপনাকে বাকিটা বুঝিয়ে দিচ্ছি।”
(সিসি ফুটেজ)
ট্রাফিক কন্ট্রোল রুম, লালবাজার, কলকাতা
সকাল ১০টা ৩০, ১৭ জুলাই
“এখানটা পজ করুন। এই জায়গাটা একটু ভালো করে দেখতে হবে। জুম করে ছবিটাকে এমনভাবে এনলার্জ করুন, যাতে ছবিটা ফেটে না যায়।” কন্ট্রোল রুমের মনিটরের সামনে বসে পাশে বসে থাকা কনস্টেবলকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো ছুড়ে দিলেন অফিসার শৌভিক সেনগুপ্ত। ২০১২ ব্যাচের অফিসার। সিটের সদস্য। সকাল থেকেই সিন অফ ক্রাইমে থাকা ট্র্যাফিকের ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ নিয়ে পড়ে আছেন কন্ট্রোল রুমে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ফুটেজগুলো দেখছেন। নোট নিচ্ছেন। মাঝে মাঝে নিজের মোবাইলে ক্লিপিংসগুলো তুলেও রাখছেন আলাদা করে। এর মধ্যে বার পাঁচেক কথাও বলে নিয়েছেন দুর্জয় সেনের সঙ্গে। শৌভিকের কথা মতো ওঁর পাশে বসে থাকা কনস্টেবল পজ করে রাখা ছবিটা জুম করে বড়ো করে দিলেন। ভালো করে ছবিটা দেখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে শৌভিক বলে উঠলেন, “ধুর শালা! এভাবে হবে না। কিছুতেই গাড়ির নাম্বারটা বুঝতে পারছি না।”
নিজের পকেট থেকে মোবাইলটা বের করলেন। দুর্জয়কে আবারও ফোনে ধরলেন।
“হ্যাঁ শৌভিক বলুন? আর কোনো ডেভলপমেন্ট আছে?”
“একটা জায়গায় এসে আটকে গেছি। তাই আপনাকে ফোনটা করলাম। ভোর ৪টে নাগাদ হলুদ রঙের একটা ট্যাক্সি মিলন মেলা গ্রাউন্ডের সাত নাম্বার গেটের কাছে এসে থামল। মিনিট পাঁচেক ওখানে দাঁড়িয়ে থাকল। তারপরে ড্রাইভারের সিটের দিকের দরজাটা খুলে গেল। একজন লোক, যার পরনে কালো রঙের হাফ শার্ট এবং ফুল প্যান্ট, বেরিয়ে এল। পেছনের ডান দিকের দরজাটা খুলে ভেতর থেকে মেয়েটার ডেডবডিটা টেনে হিঁচড়ে, অনেকটা কষ্ট করে বের করে আনল। তারপরে ঝোপের মধ্যে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিল।”
“গ্রেট। কয়েকটা প্রশ্ন করছি। ফুটেজ দেখে চটপট জবাব দিন।”
“হ্যাঁ, স্যার। বলুন?”
“লোকটির বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে কী মনে হল?”
“মনে হল, কোনো তাড়াহুড়ো নেই। ধীরে সুস্থে কাজটা শেষ করে আবারও ড্রাইভারের সিটের দিকের দরজাটা খুলে ভেতরে গিয়ে বসল। এবং গাড়িটা নিয়ে চলে গেল।”
“ফুটেজে আর কিছু দেখা যাচ্ছে?”
“আর হ্যাঁ স্যার, বডিটা ঝোপের ধারে ফেলে রাস্তায় দাঁড়িয়ে লোকটা দেশলাই বের করে একটা বিড়ি ধরাল। তারপর দুটো টান দিয়েই বিড়িটা শেষ না করে ওই ঝোপের মধ্যে কোথাও একটা ছুড়ে ফেলল। মনে হয় লোকটা একটু টেনশনে ছিল। তাই বিড়িটা পুরো শেষ না করেই নিভিয়ে দিল।”
“তার মানে, ওই বিড়িতে ওই লোকটার স্যালাইভা পাওয়া যেতে পারে যার থেকে আমরা লোকটির ডিএনএ প্রোফাইল জেনারেট করতে পারি। গুড। গাড়ির নাম্বারটা বের করতে পারলেন?”
“না স্যার। ছবিটা অস্পষ্ট। কিছুতেই নাম্বারটা বুঝতে পারছি না। আর সেই কারণেই আপনাকে ফোনটা করছি।”
শৌভিকের কথাটা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন দুর্জয় সেন। কিছু একটা ভাবলেন। তারপরে বললেন, “আপনার পাশে ট্র্যাফিকের যে কনস্টেবল আছে তাঁকে একবার জিজ্ঞেস করে জানার চেষ্টা করুন, সিন অফ ক্রাইমে বা ওর আশেপাশে কোথাও ‘এন পি আর ক্যামেরা’ ইন্সটল করা আছে কি না? ‘এন পি আর হল নাম্বার প্লেট রেকগনিশন ক্যামেরা, যার সাহায্যে কোনো গাড়ির নাম্বার প্লেট সহজেই বোঝা যায়। এই ধরনের ক্যামেরায় ‘অপ্টিকাল ক্যারেক্টার রেকগনিশন’ টেকনিক ব্যবহার করে নাম্বার প্লেটের অস্পষ্ট ছবি থেকে সহজেই টেক্সট তৈরি করা যায় এবং গাড়ির নাম্বারটা আইডেন্টিফাই করা যায়। ডিটেলটা বের করে আমাকে জানাবেন।”
“ঠিক আছে স্যার। কিন্তু…”
“কিন্তু কী, শৌভিক?”
“ডেডবডির আইডেন্টিফিকেশনটা না হলে কেসটা ক্র্যাক করতে কষ্ট হবে, স্যার।”
“আমিও তো সেটাই ভাবছি। তবে খুব তাড়াতাড়ি কিছু একটা ভালো খবর পাব বলে মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যেই শৈবাল রায়কে এই কাজে ইনভল্ভ করে দিয়েছি। আশেপাশের থানাগুলোতে কোথাও কোনো মিসিং হয়েছে কী না, সেই খবর নেওয়া হচ্ছে। বেঙ্গলের থানাগুলোতেও খবর পাঠানো হয়েছে। কিন্তু মুস্কিলটা হল, আমরা কিছুতেই মেয়েটার ছবিটা বাইরে প্রকাশ করতে পারছি না। কারণ, লিগ্যালি আমরা সেটা করতে পারি না। আর তাই, আইডেন্টিফিকেশনে একটু সমচা হচ্ছে। যা-ই হোক, দেখা যাক, কতটা কী করা যায়।”
কথা শেষ করে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন শৌভিক।
