ইঁদুরকল – প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
ইঁদুরকল – প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
বড়ো গল্প (সাসপেন্স থ্রিলার)
(এক)
আয়তাকার পিচবোর্ডের ঢাউস বাক্স। স্কুটি থেকে সেটা নামিয়ে ফোন করল বিষুব।
“মেঘনাদ মাইতি বলছেন তো? স্যার, আমি কুইককার্ট থেকে বলছি স্যার। আপনার লোকেশনটা বলবেন? আমি একটা লাল মন্দিরের পাশে দাঁড়িয়ে আছি।”
“হ্যাঁ। মন্দিরের পাশেই যে সরু গলিটা আছে, সেটা দিয়ে ঢুকে প্রথমে ডানদিকের দুটো তারপরে বাঁদিকের একটা গলি ছেড়ে তার পরের বাঁদিকের গলিতে ঢুকে শেষ বাড়িটাই আমার। সবুজ রঙের গ্রিলের গেট।”
বিষুব বুঝল কষ্ট আছে। গলির মুখে দুটো লোহার থাম এমনভাবে পোঁতা যে স্কুটি ঢুকবে না। আগে বেশ কয়েকবার আসার সুবাদে সে জানে যে এই গলির অন্য মাথায় আর একটা বেশ চওড়া মুখ আছে, কিন্তু সেটা আপাতত বন্ধ। সেখানে জলের লাইন বসানোর কাজখিস্তাস্ত্রগুলো তার ওপরেই প্রথম প্রয়োগ করে মাইনেটা চলছে। তাই স্কুটিটাকে রাস্তাতেই দাঁড় করিয়ে রেখে ওই আঠেরো কিলোগ্রাম ওজনের ভারী বাক্সটা কাঁধে নিয়ে এখান দিয়েই ডেলিভারি পয়েন্ট অবধি হেঁটে যেতে হবে। লোকেশন যেমন শুনল তাতে সে বুঝেছে যে মোটামুটি দুশো মিটার তো যেতে হবেই।
গলিটার ডান ধারে খোলা নর্দমা। পা পিছলোলেই হয়ে গেল। আর, নর্দমা যখন আছে, ইঁদুরও রয়েছে নিশ্চয়ই। কপালে যে কী কী দুর্গতি রয়েছে আজ তা ভাবতে ভাবতে বাক্সটা ঘাড়ে তুলে গলির দিকে সাধবানে পা ফেলল বিষুব।
চলার পথে বিড়াল যদি রাস্তা কেটে দেয় তবে ঘোর অযাত্রা। এমনটাই অনেকে মনে করে। তাই বিড়াল যেখান দিয়ে রাস্তা কাটে তার আগে তারা দাঁড়িয়ে পড়ে। অপেক্ষা করে উলটো দিক থেকে অন্য কারও জন্য, সেই বিড়াল-গণ্ডি পেরিয়ে আসার, যাতে এই অযাত্রা সেই লোকের ঘাড়ে গিয়ে পড়ে।
কিন্তু এই কুসংস্কার একেবারেই মানে না বিষুব চট্টরাজ। বিড়ালে রাস্তা কেটে দিলে গণ্ডির ওপারের লোকেদের মুখগুলো দেখে সে মজা পায়। তারপর খুব করে হাসি চেপে তাদের দেখিয়ে দেখিয়ে সেই গণ্ডি পেরিয়ে চলে যায়। তাতে তার যাত্রা কোনোদিনও খারাপ হয়েছে বলে তো মনে পড়ে না।
অবশ্য ইঁদুরের কথা অন্য। ইঁদুরে যদি রাস্তা কেটে দেয় তাহলে চরম সমস্যায় পড়ে যায় বিষুব। সেদিন সেই রাস্তা আর সে মাড়ায় না।
ধেড়ে থেকে নেংটি সব ধরনের ইঁদুরই তার প্রবল ভয়ের কারণ। সে ব্যাপারে তার চোখও আছে বটে। রাস্তা দিয়ে চলার পথে কোথা দিয়ে কোন ইঁদুর উঁকি মারছে তা কোনোভাবেই তার চোখ এড়িয়ে যায় না।
আজই তো সেই জিনিস হয়েছিল।
সকাল সাড়ে ন-টায় বাড়ি থেকে যেই বেরিয়েছে অমনি বজ্জাত একটা ধেড়ে ইঁদুর দু-বার তার দিকে চোখ পিটপিটিয়ে মাত্র এক মিটার আগেই দৌড়ে রাস্তা পেরিয়ে চলে গিয়েছিল।
চমকে উঠেছিল বিষুব। তার স্কুটি উঠেছিল চলকে। আর একটু হলেই পড়ে যাচ্ছিল।
ইঁদুরে রাস্তা কাটা মানেই তার অযাত্রা। কিন্তু আজ তো যাত্রা না-করার কোনো উপায় ছিল না। মাইনের দিনে কামাই করলে ‘মিহিবরাহ’ অচ্যুতস্যার নবাবিষ্কৃত খিস্ত্যাস্ত্রগুলো তার ওপরেই প্রথম প্রয়োগ করে মাইনেটা পিছিয়ে দেবে অন্তত পনেরো দিন। আর, বিষুবদের বাড়ির কানাগলিটা দিয়ে সচরাচর কেউ আসেও না যে অপেক্ষা করত।
অগত্যা আসন্ন দুর্ভাগ্যের চিন্তা মাথায় নিয়ে বুকে ঝোলানো গণেশের লকেটটা দুই চোখে ছুঁইয়ে তাতে একটা চুমু খেয়ে সেই ইঁদুরকাটা রাস্তা দিয়েই স্কুটি চালিয়ে দিয়েছিল বিষুব।
ঘেন্না, ভয় আর রাগ— ইঁদুরের প্রতি তিনটেই আছে বিষুবের। ঘেন্নাটা বোধহয় সে তার পিটপিটে মায়ের থেকে পেয়েছে। ছোটো থেকেই তার মা-কে দেখত ইঁদুর দেখলেই লাফিয়ে উঠতে। কিন্তু ভয়টা জন্মাল তার মা মারা যাওয়ার পর। বাবা তো তার জ্ঞান হওয়ার আগেই গত। বাবার অতি সামান্য পেনশনে আর লোকের বাড়ি-বাড়ি রান্না করে তাকে কোনো মতে বড়ো করেছিলেন মা। কিন্তু তিন বছর আগেই চলে গেলেন ভারী অদ্ভুতভাবে। তারা আগে যে-ভাড়াবাড়িতে থাকত সেই বাড়ির বাথরুমের নর্দমা থেকে একটা ধেড়ে ইঁদুর ঢুকতে দেখে লাফিয়ে উঠে তার মা সাবানজলে পিছলে পড়ে স্টিলের কলে মাথা ঠুকে মারা গিয়েছিলেন।
পড়াশোনায় মন্দ ছিল না বিষুব। ইকোনমিক্সে বিকম পাস। বুদ্ধিও তীক্ষ্ণ। কিন্তু চাকরি জোটেনি। জোটানোর যে খুব ইচ্ছে ছিল তাও নয়। টিউশনের দিকেও ঝোঁকেনি। মন ছিল ব্যবসায়। রান্নার হাতটা তার ভীষণ ভালো। মা মারা যাওয়ার পরে অন্য বাড়ি ভাড়া নিল। ছোটবেলার বান্ধবীকে বিয়ে করে সেই বাড়িতেই খুলেছিল ক্লাউড কিচেন। আলাদা কোনো ঝক্কি নেই। ফোনে অর্ডার নাও আর রান্না করে পাঠিয়ে দাও। বেশ ভালো চলছিলও।
বাধ সাধল ইঁদুরে। বাড়িতে মজুত করা চিনি, চাল, ডাল খেয়ে সর্বনাশ করতে লাগল। তবে আসল নাশকতাটা হয়েছিল যখন এক খদ্দের বিরিয়ানির মধ্যে থেকে ইঁদুরের মরা বাচ্চা বের করেছিল। বহু কষ্টে অনেক টাকা খেসারত দিয়ে সে যাত্রা জেলে ঢোকা আটকেছিল সে। তবে ব্যবসাটা আর চালাতে পারেনি। তখন থেকে ইঁদুরের ওপরে তার প্রবল রাগ।
অগত্যা মাত্র এক বছর হল সে ডেলিভারি বয়ের কাজ ধরেছে। কিছু টাকা জমাতে পারলে আবার ব্যবসার কথা ভাবা যাবে। মাসিক কিস্তিতে একটা স্কুটি কেনাই ছিল। সেটাই এখন ভরসা।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে গোডাউনে গিয়ে হাজির হতেই অচ্যুতস্যার বলেছিলেন, “আজ আর ক্যারেজব্যাগ নিয়ে যেতে হবে না। এই মালটা ডেলিভারি করার আছে। ভারী মাল। এত বড়োটা ক্যারেজব্যাগে ঢুকবেও না। তুই স্কুটির সিটে বসিয়ে বেঁধে নিয়ে যা। ডেলিভারি করে রিটার্ন আসবি। তখন বাকি মাল ক্যারেজব্যাগে করে নিয়ে যাবি।”
গোডাউনের টুকটাক কাজ সেরে এখন ভারী বাক্স কাঁধে নিয়ে গন্তব্যে হাজির বিষুব। একটা সুন্দর ছিমছাম দোতলা বাড়ির সামনেটায় অল্প বাগান। বাড়িটার দরজা-জানলা বন্ধ। বাগান আর বাড়ি ঘিরে যে বাউন্ডারি, তার মুখে একটা সবুজ রঙের লোহার গ্রিল লাগানো। তাতে নেমপ্লেট আছে। মেঘনাদ মাইতি নামটা জ্বলজ্বল করছে। ইনিই এই বাক্সের মালিক। নেমপ্লেটে আরও একজন পুরুষ আর মহিলার নামও রয়েছে।
এই গলিতে বেশ কয়েকবারই এসেছে বিষুব। অন্যান্য বাড়িতে ডেলিভারি করেছে। কিন্তু এই বাড়িটায় আগে আসেনি। দরদর করে ঘামতে ঘামতে সে কাঁধ থেকে বাক্স নামিয়ে আবার ফোন করল।
“স্যার, আপনার বাড়ির সামনে চলে এসেছি। একটু বাইরে বেরোবেন স্যার।”
“কিন্তু আমি তো বাড়িতে নেই।” গম্ভীর নিরুদ্বেগ গলা ভেসে এল ফোনের ওপার থেকে।
বিচলিত হল না বিষুব, “ঠিক আছে স্যার, কাউকে পাঠিয়ে দিন না। আর আট হাজার টাকা।”
“আমার কাঠের দরজার ওপরে কলিংবেল আছে। তুমি গিয়ে বেল টেপো, কেউ এসে খুলে দেবে।”
এবার বিষুব বাড়ির দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখতে পায় গেটের সামনের বাগানঘেরা পথটা দিয়ে দশ পা মতো এগোলেই বাড়ির মূল কাঠের দরজা। দরজায় হ্যাসবোল্ট রয়েছে আর তাতে ঝুলছে বড়োসড়ো একটা তালা।
“স্যার, দরজা তো বাইরে থেকে তালাবদ্ধ।”
“তাই নাকি? তালাবদ্ধ? যা-ই হোক, তাহলে তো বাড়িতে কেউই নেই এখন।”
“কেউ নেই?” তাও দমে যায় না বিষুব। “ঠিক আছে স্যার। আশেপাশের কোন্ বাড়িতে দিয়ে যাব বলে দিন।”
“অন্য কারও বাড়িতে তো দেওয়া যাবে না।”
এইবার চিড়িক করে মাথাটা গরম হয়ে গেল বিষুবের। তবু সে যতটা সম্ভব শান্ত গলা বজায় রাখল, “তাহলে স্যার? ডেলিভারি ক্যানসেল?”
“হ্যাঁ, আজকের মতো ক্যানসেল করে দাও। কাল নিয়ে আসবে।”
আর থাকতে পারল না বিষুব।
“কিছু মনে করবেন না স্যার। আসলে জিনিসটা খুব ভারী তো। এতটা রাস্তা হেঁটে নিয়ে আসতে হয়েছে। দেখুন না কিছু যদি করা যায়। আজ ডেলিভারি ক্যানসেল করে দিলে কাল আবার নিয়ে আসতে হবে। দেখুন না স্যার।”
ওপারের কণ্ঠস্বর একই রকম আবেগহীন, “কীভাবে দেখব বলো, এত দূরে আছি। বললাম তো, আজ ক্যানসেল করে দাও, কাল আবার নিয়ে আসবে।”
“ডোন্ট মাইন্ড স্যার, মানে, আপনি যদি আগেই আমাকে গলির মুখটায় বলে দিতেন যে বাড়িতে কেউ নেই তাহলে অনেকটা সুবিধে হত।”
“কী আর করা যাবে। তখন তো আমার মনে হয়নি বাড়ি ফাঁকা বলে।”
ফোন কেটে দেয় বিষুব। মেজাজ একেবারে খিঁচড়ে গেছে। অবশ্য এমন অসভ্য লোক আগেও যে দেখেনি তা নয়। এরা ডেলিভারি বয়কে অহেতুক খাটিয়ে বেশ মজা পায়। কিন্তু সে এখন কী করবে! এত ভারী জিনিসটা আবার ফেরত নিয়ে যাওয়া, কাল আবার নিয়ে আসা! ঘামের ফুলকোর্স শাওয়ার তো নেওয়া হয়ে গেছে। কালও যদি ক্যানসেল করে দেয়। করতেই পারে, টাকা তো দেওয়া নেই।
আবার ফোন করল বিষুব।
“স্যার, কুইককটি থেকে বলছি স্যার। সরি স্যার, আপনাকে আর একটু বিরক্ত করছি। স্যার, বলছি যে কী আছে জানি না এত ভারী বাক্সটা—”
“তোমার জানার কথাও নয়। কাঠের তৈরি বড়ো তলায়…? স্পিকার আছে।”
“মাত্র আট হাজার টাকা দামের স্পিকার এত ভারী।”
“বললাম তো, ফুল উডেন। ইনডি প্রোডাক্ট। একজনের রেকমেন্ডেশনে নিচ্ছি। কেন বলো তো?”
“ও আচ্ছা স্যার। না, মানে, সে যাই থাকুক…. বলছিলাম যে স্যার, লিঙ্ক পাঠিয়ে দিচ্ছি, পেমেন্টটা করে দিন। তারপর একটু দেখুন না স্যার কোথাও যদি রেখে যাওয়া যায়? প্লিজ, প্লিজ স্যার। মানে জিনিসটা এত বড়ো আর ভারী না হলে বলতাম না।”
“জিনিস না নিয়েই পেমেন্ট করে দেব?”
“না স্যার, না নিয়ে কেন! আচ্ছা, আমি মালটা কোথায় রাখব বলুন। রেখে দেওয়ার পরেই আপনি পেমেন্ট করবেন। প্লিজ স্যার, বুঝতেই তো পারছেন। একটু বলে দিন না কোথায় রাখব।”
“ঠিক আছে, তাহলে দরজার সামনে যে-পাপোশটা দেখছ—”
এইটুকু বলেই চুপ হয়ে গেল ওপারের গলা।
বিষুব বেশ কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করল। কিন্তু খচমচ খচমচ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই। মাঝে মাঝে গাড়ি যাওয়ার আওয়াজ। অথচ ফোনটা কেটেও দেওয়া হয়নি। অগত্যা বিষুব নিজেই কানেকশন কেটে আবারও ফোন করল। তখন রিং বেজেই গেল, কেউ ধরল না। পাঁচ-ছ বার চেষ্টা করে বিষুব হাল ছেড়ে দিল।
বিষুব বুঝল যে আর কোনো উপায় নেই। জিনিসটা আবার ঘাড়ে চাপিয়ে নিয়ে ফিরে যেতেই হবে।
বাক্স ঘাড়ে নিয়ে পেছন দিকে ঘুরল বিষুব।
ঘুরেই দাঁড়িয়ে পড়ল। পাপোশ দেখতে কেন বলল লোকটা?
বিষুব আবার বাড়ির দরজার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। ফটকের সামনে বড়ো একটা মোটা পাপোশ বিছোনো আছে।
বাউন্ডারির গ্রিলের দরজায় কোনো তালা নেই। সেটা খুলে মূল ফটকের দিকে এগিয়ে গেল বিষুব।
ডেলিভারির জিনিসটা কোথায় রাখবে জিজ্ঞাসা করতে পাপোশের কথা বলা হল। পাপোশের ওপরে রেখে চলে যাবে নাকি? কিন্তু সেক্ষেত্রে তো চুরি হয়ে যেতে পারে।
বেরোনোর সময় অনেকেই বাড়িতে তালা লাগিয়ে চাপি এদিকওদিক কোথাও লুকিয়ে রাখে যাতে বাড়ির অন্য সদস্য খুলে ঢুকতে পারে। তাহলে কি পাপোশের তলায়…?
বাক্সটা নামিয়ে রেখে মোটা পাপোশটা কিছুটা তুলে ফেলল বিষুব। সত্যি-সত্যিই মজবুত রিং লাগানো একটা চাবি পড়ে রয়েছে।
চাবিটা হাতে নিয়ে বিষুব ভাবতে লাগল সেটা দিয়ে দরজা খোলা ঠিক হবে কিনা। আরেকবার ফোন করল মেঘনাদ মাইতিকে। কিন্তু ওপারে রিং বেজেই গেল। হয়তো ভদ্রলোক জরুরি মিটিংয়ে ব্যস্ত আছেন। এভাবে বার বার ফোন করায় ভীষণ ক্ষেপে যেতে পারেন। তাছাড়া, উনি যখন পাপোশের কথা তুলেইছিলেন আর পাপোশের নিচে সত্যি সত্যিই চাবিটা পাওয়া গেল তখন সে দরজা খুলে বাক্সটা রেখে দিলে উনি নিশ্চয়ই আপত্তি করবেন না। কিন্তু এতে একটা সমস্যা রয়েছে। মেঘনাদবাবু ফোনটা না তুললে সে পেমেন্টটা পাবে কীভাবে?
বিষুব অবশ্য জানে যে কাস্টমারদের জানানো না-হলেও কুইককার্টের একটা পোস্ট-ডেলিভারি পেমেন্টের লুকোনো অপশন আছে। ডেলিভারি হওয়ার চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে পেমেন্ট করলেও চলে। সেক্ষেত্রে সে জিনিসটা রেখে চলে এলে অসুবিধে নেই। কম্পানি পরে পেমেন্ট আদায় করে নেবে।
চাবিটা হাতে তুলে আশপাশটা ভালো করে নজর করতে-করতে সেটা তালার দিকে এগিয়ে নিয়ে গেল সে। এই জায়গাটা বেশ শাস্ত। চারদিকে দোতলা-তিনতলা-চারতলা এত এত বাড়ি, কিন্তু কোথাও থেকে কারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। মানুষ থেকেও জায়গাটা যেন জনপ্রাণীশূন্য। চোরের পক্ষে আদর্শ জায়গা বটে। নিজে জানে যে সে চুরি করতে ঢুকছে না। কিন্তু গাছের ডালে বসা দাঁড়কাকটা তো তার হয়ে সাক্ষী দেবে না। তবে সাক্ষী থাকল কে?
সাক্ষী থাকবে যে, তাকে দোতলার ব্যালকনির দেওয়ালে লাগিয়ে রাখা হয়েছে। একটা সিসিটিভি ক্যামেরা।
ক্যামেরা দেখতে পেয়েই বিষুব থমকে গেল। এভাবে লোকের দরজা খুলে ঢুকলে চোরের অপবাদ জুটবে না তো? যদিও লোকটা দরজা খোলার অনুমতিই একরম দিয়েছে। তাদের কম্পানি ফোনকল রেকর্ডও করে। কিন্তু এও ঠিক যে বেরোনোর সময় ইঁদুরে তার রাস্তা কেটেছে।
চাবি আবার যথাস্থানে রেখে দিল বিষুব। তারপর হাঁটু মুড়ে বসে পাপোশ দিয়ে ভালো করে চাপা দিয়ে উঠতে যাবে এমন সময় একটা ব্যাপার দেখে চমকে গেল সে।
দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে ক্ষীণ একটা আলো দেখা যাচ্ছে।
তবে কি বাড়িতে কেউ আছে? নাকি এমনিই আলো
জ্বালিয়ে চলে গেছে?
কলিংবেলটা একবার বাজালে কেমন হয়?
বিষুব উঠে দাঁড়িয়ে কলিংবেল টিপল। প্রথমে একবার। দু-তিন সেকেন্ড বাদেই বেশ কয়েকবার।
তখন আরও অদ্ভুত ব্যাপার। দরজার নিচের আলোটা ক্রমাগত জ্বলতে আর নিভতে লাগল।
এটা কী? তবে কি বাড়ির বাসিন্দা কোনো বিপদে পড়েছে? হয়তো বাথরুমে ঢুকে পা পিছলে…
কী সব উলটোপালটা ভাবছে বিষুব! মায়ের ঘটনাটা ঘটার পর থেকে তার মনে হয় বাড়ির ভেতরের দুর্ঘটনা মানেই বাথরুমে পা পিছলে যাওয়া।
তবে অন্য কোনো সমস্যা নিশ্চয়ই হয়েছে। সাহায্য করা দরকার। এবার আর চাবি দিয়ে দরজা খোলায় কোনো বাধা রইল না।
তড়িঘড়ি পাপোশের তলা থেকে চাবি তুলে দরজার মাথাটাকে নেড়াই বলা যেত। বৃদ্ধ রীতিমতো হাঁপাচ্ছেন। তালাটা খুলে ফেলল বিষুব।
দরজা খুলে গেল। ঘর আধো অন্ধকার। রোদে ঝলসানো চোখে আরও অনেক বেশি অন্ধকার লাগল। তবে দরজার ডান পাশে একটা সুইচবোর্ড সে দেখতে পেল বটে। তাতে হাত দিয়ে প্রথম সুইচটা অন করতেই ঘরের আলো জ্বলে উঠল।
বড়ো একটা বসার ঘর। সেন্টার টেবিলের তিন দিকে সোফা বসানো। বই, পেন্টিং, মূর্তি, স্পেসের ছবি দিয়ে সুন্দর করে সাজানো ঘরটা। এ-ঘরের মালিক প্রকৃত শৌখিন আর পুরোনো আমলের এবং নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ধনী।
তবে এত কিছু দেখে বিষুবের দরকার নেই। আলোর জ্বলা-নেভা চলছে পাশের ঘর থেকে।
ঘরের বাঁ পাশে আর একটা দরজা। সেই দরজা দিয়ে ঢুকলেই সামনে আর একটা ঘর আর সেই ঘরের আলোই ক্রমাগত জ্বলছে নিভছে। সেই সঙ্গে জ্বলে উঠে নিভে যাচ্ছে বিছানায় শুয়ে থাকা একটা কঙ্কালের মুখ!
সভয়ে পিছিয়ে এল বিষুব। অসাবধানে তার হাত লেগে একটা ফুলদানি পড়তে পড়তেও টলমল করে দাঁড়িয়ে গেল।
ভূত তো আর ইঁদুর নয়। ভূতে ভয় থাকলেও বিশ্বাস বিন্দুমাত্র নেই বিষুবের। ভূতের অস্তিত্ব সত্যিই থাকলে প্রবল ভয়ের ব্যাপার। কিন্তু ভূত জিনিসটাকে সে একেবারেই বিশ্বাস করে না।
তবে কি কোনো লোক মরে পড়ে আছে ওই বিছানায়? কিন্তু আলো হঠাৎ জ্বলতে আর নিভতে লেগেছে কেন?
এই সময় আলো জ্বালিয়ে রেখে কঙ্কালটা বিষুবকে হাতছানি দিয়ে ডাকল।
এগিয়ে গেল বিষুব। ঘরে ঢুকে বুঝল, বিছানায় যে শুয়ে আছে সে কঙ্কাল নয়। সত্তরের কোঠার বৃদ্ধ, যাঁর বাঁ হাতে একটা বেডসুইচ।
চাদরে ঢাকা কঙ্কালসার বৃদ্ধের প্রায় অবসন্ন শরীরটা বিছানার সঙ্গে মিশে আছে। মুখে মাংসের পরত নেই বললেই চলে। হাড়ের ওপরে চামড়া বসানো চোয়াল আর কালচে হয়ে যাওয়া মোটা ফ্রেমের চশমার কাচের পেছনে কোটরগত চোখ দেখলে দূর থেকে কঙ্কালের করোটি ছাড়া আর কিছু মনে হওয়ার জো নেই। কানের দু-পাশ দিয়ে কেশরের মতো লম্বা রুপোলি চুল বেরিয়ে না-থাকলে
এসব দেখে নিতে এক মুহূর্ত মাত্র সময় নিয়েছিল বিষুব। কারণ, তার বেশি সময় বৃদ্ধ তাকে দিলেন না। কোনোমতে হাত তুলে ইশারায় জল খাওয়ার ভঙ্গি করে ঘরের একটা কোণ দেখিয়ে দিলেন।
খাটের থেকে কিছুটা দূরে একটা ছোট টেবিলে কেক-বিস্কিট আর ওষুধপত্রের সঙ্গে জলভরা একটা কাচের জগ রয়েছে। আর রয়েছে ঢাকা দেওয়া একটা স্টিলের খালি গ্লাস। ঢাকা খুলে তাতে জগ থেকে জল ভরল বিষুব। জগের মুখটা এমনভাবে আটকানো যে ঠিকরে গিয়ে গ্লাসের বাইরেও বেশ কিছুটা জল পড়ে গেল। অবশ্য তার আগে থেকেই টেবিলে জল পড়ে ছিল। ছড়ানো ছেটানো কেকের টুকরোর সঙ্গে মিশে কাদা হয়ে ছিল। হয়তো এইভাবেই জল ঢালতে গিয়ে পড়ে গিয়ে থাকবে।
বিষুব জলের গ্লাস নিয়ে বৃদ্ধের দিকে এগিয়ে দিল। বৃদ্ধ বিছানার ধারের দিকে আঙুল দিয়ে ইশারা করলেন। বিষুব দেখল খাটটা সাধারণ নয়। হাসাপাতালে যেমন যন্ত্র লাগানো আধুনিক খাট থাকে, এও অনেকটা সেরকম। ধারের দিকে একটা লাল রঙের লিভার রয়েছে। বিষুব সেটা টিপে ধরতে খাটের মাথার দিকটা খানিকটা উঠে পড়ল। বৃদ্ধের শরীরের উপরাংশ খানিকটা হেলে রইল। এবার তিনি তাঁকে জলটা খাইয়ে দিতে ইশারা করলেন। বিষুব তাঁর গলায় ঢেলে দিল।
বৃদ্ধ আর এক গ্লাস জল খাওয়ার ইশারা করলেন। বিষুব তাও দিল। পাশে একটা তোয়ালে কাপড়ের ন্যাপকিন রাখা ছিল। সেটা দিয়ে বৃদ্ধের মুখটা মুছিয়ে দিল সে।
বিষুবের মনে হল এই বৃদ্ধ বাকশক্তিহীন। সে ইশারায় জিজ্ঞাসা করল এখন তিনি ঠিক আছেন কিনা। তখন বৃদ্ধ ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, বাবা। এখন শরীরে যেন একটু বল পাচ্ছি। আসলে, জলটাই আমি সবচেয়ে বেশি খাই তো, কিন্তু সেটাই না খেয়ে আছি প্রায় চোদ্দো ঘণ্টা হল।”
বিছানার এক পাশে বসে রুমাল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বিষুব বলল, “মি. মেঘনাদ মাইতি?”
“সে আমার ছেলে হয়।”
“ওঁর একটা পার্সেল ডেলিভারি দেওয়ার ছিল। তা, ফোনে বললেন উনি নেই। বাড়িতে কেউ নেই জানালাম। তখন উনি পাপোশ বলেই চুপ করে গেলেন।”
বৃদ্ধের গলায় একটুও জোর নেই। ফিসফিস করেই বলেন, “চাঁপা আজ আসেনি বলে এই দুর্গতি। আমার আয়ার কাজ করে। সকাল ছ’টা সাড়ে ছ’টার মধ্যে চলে আসে। সন্ধেবেলায় চাঁপা চলে গেলে তারপরে ছেলে-বউমাই আমার দেখাশোনা করে। বউমা তো এক হপ্তা আগে থেকেই নেই। ছেলে কোথায় বেরিয়েছে জানি না। ও-ই বোধহয় পাপোশের নিচে চাবি রেখে গেছে, যাতে চাঁপা ঢুকতে পারে। আগেও দু-তিন বার এরকম করেছিল।” বিষুব গলাটা একটু ঝেড়ে নিল। “স্যার, বলছি যে, জিনিসটা তো ডেলিভারি দিয়ে দিয়েছি। পাশের ঘরে রাখা আছে। এখানে আনব? দেখবেন?”
বৃদ্ধ হাত নেড়ে না বললেন। “তুমি বরং ওইটে আমাকে একটু এগিয়ে দিতে পারবে?”
বিষুব দেখল, বিছানাতেই বৃদ্ধের হাতের নাগালের সামান্য বাইরে রাখা আছে একটা ইউরিন পট— প্রস্রাব পাত্র। এগিয়ে দিতে তিনি সেটাকে চাদরের তলায় ঢুকিয়ে নিলেন।
বৃদ্ধ এবার ‘ফ্যানটা’ বলে ফ্যানের সুইচের দিকে ইশারা করলেন।
এখন জানুয়ারির মাঝামাঝি। এবারে শীত তেমন না জমলেও ফ্যান চালানোর মতো নয়।
তবুও ফ্যানটা চালিয়ে একটু কাশল বিষুব। “স্যার, মানে বলছি যে, মেঘনাদবাবু পেমেন্টটা কোথাও রেখে গেছেন জানেন?”
“পেমেন্ট? কত টাকা?”
“আট হাজার।”
দু-দিকে ঘাড় নাড়লেন বৃদ্ধ, “না তো বাবা!”
উঠে দাঁড়াল বিষুব। “স্যার, আপনার যদি আর কিছু দরকার না থাকে তাহলে আমি চলি?”
বৃদ্ধ এক দিকে ঘাড় হেলালেন, “আচ্ছা বাবা, বিছানাটা আবার নামিয়ে দিয়ে যাও। সাবধানে যেয়ো।”
বিছানা নামিয়ে বিষুব ঘর থেকে বেরিয়েই গিরেছিল, হঠাৎ আবার আলোর চমক দেখে থেমে গেল। পিছন ফিরে দেখল বৃদ্ধ আবার তাকে হাত নেড়ে ডাকছেন।
বেড সুইচ থেকে হাত সরিয়ে ইউরিন পটটা একটু দূরে ঠেলে দিয়ে বৃদ্ধ ফিসফিস করে বললেন, “তুমি আজ এক বুড়োর প্রাণ বাঁচিয়েছ। তোমাকে তো খালি হাতে যেতে দিতে পারি না। এই বালিশটার তলায় হাত ঢোকাও।”
বৃদ্ধের মাথার বালিশের নিচে হাত ঢুকিয়ে ঝিনুক ঝোলানো একটা লম্বা চাবি পেল বিষুব।
“ওই আলমারিটা খোলো।” বিছানার ঠিক উলটোদিকে রাখা একটা কাঠের বড়ো আলমারির দিকে নির্দেশ করলেন বৃদ্ধ।
চাবি নিয়ে আলমারিটার দিকে এগিয়ে গেল বিষুব।
বৃদ্ধ ফিসফিসিয়েই বলে চললেন, “সারা জীবন খেটে কোটি-কোটি টাকার সম্পত্তি করলাম, কিন্তু ছেলেটা আমার একেবারেই অকর্মণ্য। দিনরাত নানাভাবে অত্যাচার করে চলেছে। যখন-তখন ধমক, অকথ্য গালাগাল — শুধু গায়ে হাত তুলতে বাকি রেখেছে এই যা। এখন আবার তার পুরোনো গাড়িতে মন ভরছে না, নতুন গাড়ি চাই। আমাকে দিয়ে চেক লিখিয়ে পরশু বারো লাখ টাকা তুলল।”
এই সময় বিষুব চাবিটা দিয়ে আলমারির দরজা খুলে ফেলেছে। খুলেই সঙ্গে সঙ্গে দমাস করে বন্ধ করে দিল।
“কী হল? আলমারিটা বন্ধ করে দিলে যে?” কথার তোড়ে হাঁপাচ্ছেন বৃদ্ধ।
খানিকটা লজ্জা আর অনেকটা ভয় মিশিয়ে বলে বিষুব, “না, মানে, ই-ইঁদুর!”
“বল কী। ইঁদুর। আলমারির ভেতরেও ঢুকেছে?”
ওপরে-নিচে ঘাড় নাড়ায় বিষুব।
সত্যি-সত্যিই আলমারির দরজাটা খোলার সঙ্গে সঙ্গে একটা নেংটি ইঁদুরের দেখা পেয়েছে সে। আলমারির নিচ থেকে দু-নম্বর তাকে পেছন ঘুরে থেবড়ে বসে আছে চুপ করে। তাক থেকে তার লেজটা ঝুলছে। দেখার সঙ্গে সঙ্গেই আলমারির দরজাটা বন্ধ করেছে বিষুব।
“একটা কাজ করতে পারবে বাবা? এসিটা একটু চালিয়ে দিতে পার?”
জানুয়ারি মাসে ফুল স্পিডে ঘরের পাখা ঘুরছে। তবু প্রচণ্ড ঘামতে ঘামতে কথাটা বলেন বৃদ্ধ। এখন হাঁপানিটা তাঁর বেড়ে গেছে। বেশ বোঝা যাচ্ছে যে তাঁর শ্বাসকষ্ট হচ্ছে।
টেবিলেই এসির রিমোট কন্ট্রোলারটা রাখা ছিল। সেটা তুলে এসিটা চালাতে চালাতে বলল বিষুব, “এত সুন্দর বাড়িতেও ইঁদুর!”
“আর বোলো না বাবা। ইঁদুরের উৎপাত এই ঘরেই বেশি। তেমন পরিষ্কার হয় না তো। কিন্তু আলমারিতেও যে ঢুকে যাবে ভাবিনি! কাঠের আলমারি বলেই বোধহয়, কোনো ফাঁকফোকোর দিয়ে…”
এসিটা চালিয়ে দিয়ে বিষুব বলল, “আপনার কষ্ট হচ্ছে, হবে। কিন্তু কোথায় চেক বই? আর কথা বলতে হবে না স্যার।”
বৃদ্ধ থেমে আবার জল চাইলেন। জগ থেকে আরও এক গ্লাস জল ঢেলে বৃদ্ধকে খাওয়াল বিষুব।
বৃদ্ধ তবু হাঁপাচ্ছেন। হাঁপাতে হাঁপাতেই বললেন, “ওই আলমারিতে আমার টাকা আছে। ইঁদুর থাকলে তো সব টাকা….. ছেলেটা অতগুলো টাকা তুলে গাড়ি না কিনে আলমারিতে রেখে দিল কেন? আজকাল কি অতগুলো টাকা কেউ বাড়িতে রাখে! তুমি এক কাজ করো বাবা। টাকাগুলো নিয়ে যাও। একেবারে ওপরের তাকে আছে।”
“কী বলছেন স্যার!” চমকে উঠল বিষুব। বারো লাখ টাকা এভাবে অজানা লোককে কেউ বিলিয়ে দেয়।
“ঠিকই বলছি। এমনিতেই তো আমার সম্পত্তি বৃদ্ধাশ্রমে দান করে দেব ঠিক করেছি। ওই টাকাগুলো তোমারই পাওনা। কতদিন আর মাল বয়ে অন্যের খিদমত খাটবে! টাকাটা দিয়ে নিজের একটা ব্যাবসা শুরু করো। তারপর আমাকে বলে যাবে…
আর কথা বলতে পারলেন না বৃদ্ধ। এখনও ঘেমে যাচ্ছেন। বুকটা যেন জ্বলে যাচ্ছে এমনভাবে ঘষতে লাগলেন।
পাশে বসে তাঁর বুকে হাত বুলিয়ে দিতে লাগল বিষুব। “আপনি আর কথা বলবেন না স্যার। কিন্তু ওই টাকা আমি কীভাবে নেব বলুন। মেঘনাদ স্যার যে আমাকে চোর ভাববেন। ভাববেন জোর করে চাপ দিয়ে টাকা নিয়েছি।”
গলায় হাত দিয়ে বৃদ্ধ কিছু ভাবলেন। তারপর বললেন, “আচ্ছা, তাহলে আলমারিটা খুলে আমার চেকবইটা—”
আবারও কথা আটকে গেল তাঁর।
আলমারি খুললেই ইঁদুরের ভয়। কিন্তু ভয়ের ওপরেও টাকার জয়। বিষুব আবারও আলমারিটা খুলে ফেলল।
ইঁদুরটার এত সাহস যে এখনও একইভাবে লেজ ঝুলিয়ে পেছন ঘুরে থেবড়ে বসে আছে।
সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে আলমারির ওপরের তাকে দৃষ্টি মেলল বিষুব। ডাঁই করে পাঁচশোর নোটের বেশ কয়েকটা বান্ডিল রাখা।
উদগ্র লোভ হল বিষুবের। চোখ বুলিয়েই গুনে ফেলল বান্ডিলগুলো। কুড়িটা আছে। তার মানে, বারো নয়, দশ লাখ। দশ লাখ টাকা! ইচ্ছে হল টাকার বান্ডিলগুলো এক্ষুনি জামার ভেতরে ভরে নেয়। তবু সে লোভ সামলায়। চেকবইয়ে লেখা টাকার অঙ্ক হয়তো এর চেয়েও বেশি
ওপরের তাক দুটোয় ভালো করে চোখ বুলিয়ে একটা চেক বই সে পেল বটে। তারপর সেটা নিয়ে পেছন ঘুরতেই বিছানার দিকে তাকিয়ে তার রক্ত হিম হয়ে গেল। চেকবই মেঝেতে পড়ে গেল।
বৃদ্ধের মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছে। মুখটা লাল, চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। হাত-পা ছুড়ে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করছেন তিনি।
বিষুব দৌড়ে গেল। জগে বেশি জল অবশিষ্ট নেই। তবু সেটুকুই সে গ্লাসে ঢেলে বৃদ্ধকে খাওয়াতে গেল। ঝটকা দিয়ে গ্লাসের জল ফেলে দিলেন বৃদ্ধ। কোনোমতে উচ্চারণ করলেন, “বিষয় বিষ…”
তারপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে জ্ঞান হারালেন।
তাঁকে ঝাকুনি দিয়ে বেশ কয়েকবার ডাকল বিষুব। গায়ে সার নেই। নাকের নিচে হাত দিয়ে দেখল নিঃশ্বাস পড়ছে না। বুকে কান দিয়ে দেখল হৃদস্পন্দন স্তব্ধ।
প্রচণ্ড ভয়ে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল বিষুব। এ কী হল! তবে কি জগের জলে বিষ মেশানো ছিল? সেই বিষ নিজের হাতে খাইয়ে একজন বৃদ্ধকে খুন করল সে!
এখন বিষুব কী করবে? বৃদ্ধকে যে সে মারেনি তা কেউ বিশ্বাস করবে না। এখন পালানো ছাড়া আর কোনো পথ নেই। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ মানে আত্মহত্যার সমান। পালাতে তাকে হবেই।
খুনের দায় নিয়ে পালাতেই যদি হয় তবে টাকাগুলো রেখে যাবে কেন। এগুলো তো তার হকেরই টাকা। বৃদ্ধ তো তাকে টাকাগুলো দিতেই চেয়েছিলেন। এটা যে কেউ বিশ্বাস করবে না সেটা অন্য ব্যাপার। তাহলে টাকাগুলো নিয়েই পালানো যাক।
.
(দুই)
মোবাইল ফোনে ‘জিন্দাবাদ বাংলা’ চালাতেই সংবাদপাঠিকার চড়া গলা ভেসে এল।
‘এবারে আমরা বৃদ্ধ খুনের ঘটনায় নজর রাখব। দক্ষিণ দমদমের সাতগাছিতে ঘটে যাওয়া বৃদ্ধ খুনের ঘটনার আটচল্লিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই অতি দ্রুত সমাধান করে ফেলল কলকাতা পুলিশ। পরশু বিকেলে সাতগাছির একটি বনেদি বাড়ি থেকে এক বৃদ্ধের মৃতদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। বৃদ্ধের নাম শিবপ্রসাদ মাইতি। পুলিশ জানিয়েছে যে পরশু সকাল সাড়ে এগারোটা নাগাদ এক ডেলিভারি বয় তাঁর বাড়িতে ঢোকে। বৃদ্ধ তখন একাই ছিলেন। বিকেলে তাঁর ছেলে মেঘনাদ মাইতি বাড়িতে ঢুকে বৃদ্ধের মৃতদেহ আবিষ্কার করে। ময়না তদন্তে জানা গেছে যে পুলিশের অনুমানই সঠিক— শরীরে বিষক্রিয়ায় মৃত্যু হয়েছে বৃদ্ধের। বিষাক্ত জল খাইয়ে তাঁকে খুন করে আনুমানিক বারো লক্ষ টাকা চুরি করে চম্পট দিয়েছিল সে। বাড়ির দরজার বাইরেই লাগানো সিসিটিভি ফুটেজ থেকে অভিযুক্তকে সনাক্ত করা গেছে। অভিযুক্তের নাম বিষুব চট্টরাজ। পুলিশ জানিয়েছে যে তার আত্মবিশ্বাস এতটাই বেশি ছিল যে বাড়িতে ঢোকার সময় সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে নিজের মুখ আড়াল করার কোনো চেষ্টাই সে করেনি। টানা ছত্রিশ ঘণ্টা ধরে হন্যে হয়ে খুঁজে গতকাল গভীর রাতে শিলিগুড়ি থেকে বিষুবকে গ্রেফতার করে পুলিশ। সে তার স্ত্রীয়ের সঙ্গে একটি লজে উঠেছিল এবং নেপালে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছিল বলে জানা গেছে। তবে টাকা এখনও উদ্ধার হয়নি। ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য বিষুবকে সাতগাছি নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। ঘটনাস্থলে রয়েছে আমাদের প্রতিনিধি সঞ্জীব খাস্তগির। সঞ্জীব, কী জানতে পারছ? আর কতক্ষণ পরে বিষুবকে নিয়ে আসা হচ্ছে?…”
মোবাইলটা পকেটে রাখলেন ইন্সপেক্টর রক্ষিত। সাতগাছির গলির মুখে প্রিজনভ্যান এসে দাঁড়িয়েছে। এবার আসামিটাকে নামাতে হবে। গলির মুখে রিপোর্টারদের প্রচণ্ড ভিড়। তার মধ্যে কিছু ইউটিউবারও এসে হাজির হয়েছে। এদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া পোবায় না। পেছন দিয়ে হাত বাড়ালে এক টাকাও তো ঠেকায় না এরা, উলটে সময় নষ্ট করে দেয়, কাজের ক্ষতি হয়। প্রিজনভ্যান থেকে নামিয়ে আসামিটাকে নিয়ে গলি দিয়ে ওই বাড়ি অবধি যাওয়াটাই একটা বড়ো চ্যালেঞ্জ।
বাড়ির গ্রিলের গেটের ভেতরে কোনো রিপোর্টারকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কনস্টেবলেরা ইন্সপেক্টর রক্ষিত আর বিষুব চট্টরাজকে কোনোমতে ঢুকিয়ে আবার গেটের সামনে পাহারায় দাঁড়িয়ে পড়ল।
বাড়ির মূল ফটকের সামনে আত্মীয়স্বজন আর কয়েকজন প্রতিবেশীর সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন মেঘনাদ মাইতি।
ভদ্রলোকের বয়স চল্লিশ পেরিয়েছে। মাঝারি উচ্চতায় দোহারা চেহারা। মাথায় বড়োসড়ো টাক। পুরুষ্টু গোঁফ। যথেষ্ট ভেঙে পড়লেও ইন্সপেক্টর রক্ষিতকে অভ্যর্থনা জানালেন তিনি। সঙ্গে তাঁর স্ত্রী আর বারো বছরের মেয়েও রয়েছে।
বিষুব চট্টরাজের কোমরের দড়িটা ধরে রেখেই ইন্সপেক্টর বললেন, এবার হেঁটে গিয়ে দেখা তো কীভাবে চাবিটা কোথা থেকে তুললি।
বিষুব হেঁটে গিয়ে পাপোশ তুলে দেখিয়ে দিল চাবিটা ঠিক কোন্ জায়গায় রাখা ছিল। তারপর ইন্সপেক্টরের দিকে ফিরে বলল, “স্যার, আমি কিন্তু খুন করিনি স্যার।”
“চোপ! খুন করিনি মানে! চারিদিকে এভিডেন্স সব থ্যাইথ্যাই করছে আর নাকি তুমি খুনও ক্যারোনি চুরিও ক্যারোনি। টাকাগুলো কোথায় আছে বললে সাজা কম হবে। কথাটা যেন মাথায় থাকে।”
উত্তরে বিষুব কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু তক্ষুনি মেঘনাদবাবুর প্রতিবেশীদের মধ্যে একজন কম বয়সি লোক বলে উঠল, “এইত্তো! মেঘনাদদা, এর কথাই বলেছিলাম আপনাকে। ডেলিভারি করতে এলে বাই চান্স বাড়িতে কেউ না থাকলেই হল। হাড় জ্বালিয়ে রেখে দেবে! ‘স্যার কোথায় রাখব তাহলে? আপনার সামনের বাড়িতে রেখে যাই না। ওপরের ফ্ল্যাটে রেখে যাই?’ কী নাছোড়বান্দা জানেন না।”
সেই শুনে আরও একজন বলে উঠলেন, “হ্যাঁ, আমাকেও এরকম করেছে। সেই আপনাকে বলেছিলাম না? এই ছোকরাই। হে-বি চালাক-চতুর। শালা, ডেলিভারি দেওয়ার নাম করে চুরি তো করবিই, আবার অসহায় বুড়ো মানুষকে খুন করে দিবি। স্যার, আমাদের হাতে ছেড়ে দিন, পিটিয়েই মেরে দেব হারামজাদাকে। কোর্টকাচারি করে বেকার কেন অত হ্যাঙ্গাম পোয়াবেন।”
ইন্সপেক্টর তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে লাঠি উচিয়ে ধরলেন, “আইন হাতে নেওয়ার কথা একেবারেই ভাববেন না। পুলিশের কাজ পুলিশকে করতে দিন। সরে যান।” বলে তিনি সোজা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লেন।
মেঘনাদবাবুর বাড়ির বসার ঘরে তখন তাঁর আত্মীয়স্বজন কিছু ছিল। তাদের উঠতে বারণ করে ইন্সপেক্টর রক্ষিত মেঘনাদ মাইতি, বিষুব চট্টরাজ, একজন সাব-ইন্সপেক্টর আর একজন ভিডিওগ্রাফারকে নিয়ে তালা খুলিয়ে বৃদ্ধের ঘরে গিয়ে ঢুকলেন।
বিষুব দেখল ঘরটা হুবহু আগের দিনের মতো আছে। এমনকি এসি আর ফ্যানও বন্ধ হয়নি। শুধু বিছানায় বৃদ্ধের শরীরটা নেই আর টেবিলে নেই জগ আর জলের গ্লাস।
ঘরে তিনটে চেয়ার এনে দেওয়া হল। একটায় নিজে বসে অন্য দুটোয় মেঘনাদ মাইতি আর বিষুব চট্টরাজকে বসতে বললেন ইন্সপেক্টর। ভিডিওগ্রাফার ক্যামেরা চালু করল।
“এবার বলুন মেঘনাদবাবু, অসুস্থ বুড়ো বাবাকে একা ফেলে রেখে আপনি আগেরদিন রাতে কোথায় চলে গিয়েছিলেন?”
“মন্দারমণি। টু বি প্রিসাইস তার পাশেই দাদনপাত্রবাড় নামে একটা গ্রামে।”
“আর ফিরলেন পরেরদিন বিকেলে, আপনার বাবা মারা যাওয়ার পর। তাই তো?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“নিজের গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“সঙ্গে কে কে ছিল?”
“কেউ না। আমি একাই।”
“আপনার স্ত্রী আর কন্যা?”
“নিভা তো এক সপ্তাহ আগে থেকেই বর্ধমানে ওর বাপের বাড়িতে ছিল মেয়েকে নিয়ে। ওর মায়ের শরীরটা একটু খারাপ।”
“কী হয়েছে?”
“ভাইরাল ফিভার।”
“আপনার স্ত্রীয়েরা ক-ভাই বোন?”
“তিন ভাই এক বোন। ভায়েরা ওখানেই থাকে।”
“মায়ের সামান্য শরীর খারাপ শুনে আরও ভাই-বোন থাকা সত্ত্বেও আপনার স্ত্রী অতদূরে ছুটলেন অথচ বাপের এক সন্তান হয়েও আপনি অসুস্থ বুড়ো বাবাকে ফেলে একা একা মন্দারমণি ঘুরতে চলে গেলেন। কেন জানতে পারি?”
“এ সবই তো আপনাদের অনেকবার বলে দিয়েছি আগেই।” মেঘনাদবাবুর ভুরু কুঁচকে গেছে। “তাছাড়া, আগের দিন আমি কোথায় কেন গিয়েছিলাম তার সঙ্গে এই কেসের কোনো সম্পর্ক আছে কি?”
“আছে বইকি।” পিঠ সোজা করে গোঁফজোড়ায় আঙুল বোলালেন ইন্সপেক্টর। আপনার দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বাবার মৃত্যুতে এফেক্ট ফেলেছিল কিনা সেটা বোঝা যেতে পারে। তাছাড়া, আপনাকে এর আগে একাধিকবার জানানো হয়েছে যে আজ আপনাকে আর বিষুবকে সামনাসামনি বসিয়ে জেরা করা হবে।”
খানিকটা দমে গেলেন মেঘনাদবাবু। একবার কেশে বললেন, “দেখুন আমি একজন স্কাইওয়াচার। আকাশ দেখা আমার হবি। যেদিন বাড়ি থেকে বেরোলাম সেদিন ছিল মার্স অ্যাট অপোজিশন ডে। ওইদিন পৃথিবী থেকে মঙ্গলগ্রহকে সবচেয়ে উজ্জ্বল আর বড়ো দেখায়। সারা রাত ধরে দেখা যায়। মার্স ফোটোগ্রাফি কম্পিটিশন ছিল তো, আমাকে যেতেই হত। ওখানে আমাদের স্টারগেজার গ্রুপের মিট ছিল। পরেরদিন তো পার্টিও ছিল। কিন্তু পার্টি আমি অ্যাটেন করিনি। বিকেলেই ফিরে এসেছি। দুপুরেই ফিরে আসতাম যদি না…”
“যদি না?”
“যদি না আমার ফোনটা চুরি হত।”
“ও হ্যাঁ, আপনি মেচেদা থানায় একটা রিপোর্ট করেছেন তাই না?”
“হ্যাঁ।”
“ফোন কীভাবে চুরি হল বলবেন?”
মন্দারমণি থেকে ফেরার পথে আমার কাছে এই ছোকরার একটা কল আসে। ড্রাইভ করার সময় ফোন ধরার অভ্যেসটা আমার নেই। রাস্তার ধারে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে একটু মাইনাস করছিলাম তখন এ আমাকে সেকেন্ড টাইম ফোন করল। কথা বলছিলাম আর তখনই বাইকে চড়ে দুটো ছেলে ফোনটা ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়। গাড়িতে করে বাইকটাকে তাড়া করতে গিয়েছিলাম কিন্তু আর খুঁজে পাইনি। বাইকের নাম্বার নোট করেছিলাম, কিন্তু থানা থেকে বলল নাম্বারটা ভুয়ো।”
“এই মোবাইল ছিনিয়ে নেওয়াটা কেউ দেখেছে?”
“না। সেই সময় রাস্তায় কেউ ছিল না।”
“বুঝলাম। কিন্তু মিস্টার মাইতি, আপনি রাত্তিরে বাবাকে একা বাড়িতে রেখে গেলেন কোন্ আক্কেলে?”
মুখ মুছলেন মেঘনাদ মাইতি। “দেখুন বাবার কাছে রাতে আমিই থাকি। বাবা ডাক্তারের প্রেসক্রাইবড ওষুধ খেয়ে রাত ন-টায় ঘুমিয়ে পড়ত আর উঠত সকাল আটটায়। এর মাঝে করার কিছু থাকত না। তবু আমি যাবার দিন রাতের জন্য সেন্টারে অনেকবার ফোন করেছি কিন্তু আয়া পাইনি। তবে দিনেরবেলার জন্য বারো ঘণ্টার আয়া রাখা হয়েছে। সে তো খুবই বিশ্বস্ত। নাম চাঁপা। তার এসে যাওয়ার কথা সকাল সাড়ে ছ-টার মধ্যেই। এসে পাপোশের নিচ থেকে চাবি নিয়ে খোলার কথা। কিন্তু সেদিনই আসেনি। কী বলব বলুন তো?”
“আচ্ছা, আপনি তো জানিয়েছেন যে এই ঘর থেকে টাকাও চুরি হয়েছে?” ইন্সপেক্টর একটা সিগারেট ধরালেন।
“হয়েছে তো। তবে টাকার চেয়ে বাবাই অনেক বেশি—”
“কত টাকা?”
“বারো লাখ। এই আলমারির ওপরের তাকে রাখা ছিল।”
‘শুনলি তো টাকার ব্যাপারটা?” সরাসরি বিষুবের দিকে ঘুরে যায় ইন্সপেক্টরের মুখ। “এবার ফটাকসে বলে ফেল এই ঘরে ঢোকার পর তুই কী কী করলি আর টাকাটা কোথায় রেখেছিস।”
বিষুব এতক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে সব দেখছিল, কিন্তু মনে মনে অনেক কিছু ভাবছিল। এবারে কথা বলার সুযোগ পেল। “সব বলছি স্যার, কিন্তু বিশ্বাস করুন টাকা আমি চুরি করিনি।”
“চুরি করিসনি? এমনি এমনি বুড়ো মানুষটাকে বিষ খাইয়ে চলে গেলি, বল?”
“স্যার, না স্যার। বিষ খাওয়াব কেন। আমি তো জল দিয়েছিলাম। এই টেবিলে জলের জগ রাখা ছিল। গ্লাসে ঢেলে দিয়েছিলাম। অনেকবার জল খেয়েছিলেন উনি। আমি তো জানিই না যে জালে বিষ মেশানো আছে স্যার।”
“একদম আলফাল বকবি না। জলে বিষ মিশিয়েছিস।”
“আমি? বিষ মিশিয়ে আমার কী লাভ বলুন?”
“লাভ টাকা চুরি করা। আবার কী!”
“সে তো স্যার আমি এমনিতেই চুরি করতে পারতাম ওনার তো বিছানা থেকে ওঠারই ক্ষমতা ছিল না। চেঁচামেচি করারও ক্ষমতা ছিল না।”
ইন্সপেক্টর বুঝলেন এটা একটা জোরালো পয়েন্ট বটে। কিন্তু তিনি দমলেন না। “সেগুলো ঠিকই। ক্যামেরার দেখা যাচ্ছে যে তুই ডেলিভারির মাল নিয়ে ঢুকেছিস আর খালি হাতে বেরিয়ে গেছিস। বুড়ো মানুষটা থাকলে একটা সাক্ষী থেকে যেত। তোর টাকা চুরির ব্যাপারটা উনিই ধরিয়ে দিতে পারতেন। টাকার অঙ্কটা তো কম নয়। ওই টাকার জন্য মানুষ খুন আকছার হচ্ছে।”
“কিন্তু আপনি তো স্যার নিজেই বলছেন যে আমি খালি হাতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছি। তাহলে টাকাটা আমি কীভাবে চুরি করলাম স্যার?”
“আমি বলছি না, ক্যামেরা বলছে। আমাকে উরধুর পেয়েছিস? ঠাটিয়ে এমন থাপ্পড় মারব যে বাঁদরামো বেরিয়ে যাবে। টাকা কীভাবে জামার ভেতরে, পকেটে, প্যান্টের ভেতরে পায়ে জড়িয়ে নেওয়া যায় সে সব আমি জানি না ভেবেছিস? আচ্ছা আপনি একটা কথা বলতে পারেন?” এবার মেঘনাদবাবুর দিকে ঘুরলেন ইন্সপেক্টর। “টাকাটা তো আপনার বাবার ছিল বলেছিলেন। বাবা চেকলিখে দিয়েছিলেন আর আপনি তুলে এনেছিলেন। তাই তো?”
“অবশ্যই।” মেঘনাদবাবুর সংক্ষিপ্ত উত্তর।
“কী দরকার ছিল অত টাকার?”
“নতুন গাড়ি কেনার জন্য।”
“বেশ তো। তা, গাড়ি কেনার জন্য কি কাঁড়ি কাঁড়ি ক্যাশ তুলে বাড়িতে রাখতে লাগে? অনলাইন পেমেন্ট, চেক পেমেন্ট এসব কি নেই?”
“কেন? লিগাল মানি বাড়িতে রাখা কি অপরাধ?” ফুঁসে উঠলেন মেঘনাদবাবু।
“অপরাধ কেন হতে যাবে! জাস্ট একটা কৌতূহল আর কী।”
“মাপ করবেন। আপনার কৌতূহল আমি ভিডিও ক্যামেরার সামনে মেটাতে পারব না। শুধু এটুকু বলে দিচ্ছি যে অনেক সময় ক্যাশ দিলে জিনিসের দাম কম পড়ে।”
দীর্ঘনিঃশ্বাস আর চেয়ার ছেড়ে উঠলেন ইন্সপেক্টর। “এই যে বিষুবরেখা, ওঠ এবার। সময় নষ্ট না করে এই ঘরে ঢোকার পরে সেদিন কী কী করেছিস সেগুলো করে দেখা। তবে তার আগে এই গ্লাভস দুটো হাতে পরে নে। কুইক!”
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বসেই রইল বিষুব।
“কী হল?”
“স্যার, এর মধ্যে আপনি আমার ওয়াইফকে টানবেন না প্লিজ। ও এতে জড়িত নয় একেবারেই।”
কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন ইন্সপেক্টর। তারপর বললেন, “কেন? তোর বউয়ের নাম কী?”
“রেখা।”
অন্য সময় হলে প্রচণ্ড হাসিতে ফেটে পড়তেন ইন্সপেক্টর। কিন্তু এখন সাব-ইন্সপেক্টরের সঙ্গে চোখাচোখি করে খুব জোর সামলে নিলেন নিজেকে। দারুণ একটা প্র্যাক্টিকাল জোক জমিয়ে রাখলেন বড়োবাবুকে বলার জন্য।
ওদিকে বিষুব বুঝতে পারছে সমস্ত পরিস্থিতি আর যাবতীয় সাক্ষ্যপ্রমাণ সবই তার বিপক্ষে। রেখার জন্যই তার মনটা সবচেয়ে বেশি কেঁদে উঠছে। মেয়েটা শুধু তার মুখের দিকে তাকিয়ে একটা বেকার ছেলেকে বিয়ে করেছিল। সব সময় সব পরিস্থিতিতে তার পাশে থেকেছে।
বিষুবের কোমরের দড়ি খোলা হল। হাতে গ্লাভস পরে সে কখন কোথায় কী কী করেছে দেখাতে লাগল। ভিডিও ক্যামেরায় সবটা রেকর্ড হতে থাকল।
“…তারপর উনি বললেন, ‘আমার বালিশের তলায় হাত ঢোকাও।’ আমি এইভাবে হাত ঢুকিয়ে একটা চাবি পেলাম। চাবিটায় একটা ঝিনুক লাগানো ছিল। এই তো, পেয়েছি। আমি চাবিটা নিয়ে আলমারির দিকে এগিয়ে গেলাম। তারপর এইভাবে আলমারির দরজা খুললাম। খুলেই—”
“খুলেই কী? কী হল? বন্ধ করলি কেন? খুলেই কী? বল?”
আর কথা বলার অবস্থায় নেই বিষুব। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সে কোমর দুলিয়ে হাত নাড়িয়ে নাড়িয়ে নাচতে শুরু করে দিল। মুখে তার হাসি আর ধরে না।
এত আসামি দেখেছেন কিন্তু এরকম পাগল দেখেননি ইন্সপেক্টর। তিনি আধ মিনিট ধরে হাঁ করে বিষুবের ব্যাপারস্যাপার দেখলেন। তারপর রেগে গিয়ে ঘুষি মারতে উদ্যত হলেন। “অ্যাই। ইয়ার্কি মারছিস। এখানে কি পার্টি হচ্ছে? শালা হারা…”
এক মিনিট।” ইন্সপেক্টরের ঘুষি থামিয়ে দিয়েছে বিষুব, “এক মিনিট স্যার। ঘুষিটা ধরে রাখুন। অন্য কারও মুখে বসাতে হতে পারে।”
কথাটা বিষুব বলেছে মেঘনাদ মাইতির দিকে তাকিয়ে। তারপর ইন্সপেক্টরকে বলল, “আলমারির দরজা খুলেই কী হল জানেন স্যার? এই দেখুন।”
আলমারির দরজাটা হাট করে খোলার সঙ্গে সঙ্গে ইন্সপেক্টর আর মেঘনাদ মাইতির নাকে রুমাল উঠে পড়ল। সাব-ইন্সপেক্টর দু-আঙুল দিয়ে নাকের লতিদুটো তিন-চারবার টিপে নিলেন। ভিডিওগ্রাফার ঠোঁট তুলে নাক ঢাকছে। কিন্তু বিষুব? ইঁদুরের প্রতি চরম ঘেন্না ভয় আর রাগ থাকা বিষুব? সে তখন তার নাক-শরীর-প্রাণ ভরে টেনে নিচ্ছে পচা ইঁদুরের গন্ধ।
‘স্যার।” ইন্সপেক্টরের দিকে ফিরল বিষুব। আমি আপনাকে আগেও বলেছি যে আলমারি খুলে আমি কোনো ক্যাশ দেখতে পাইনি, খুঁজে দেখতে পেয়েছিলাম একটা চেকবই। আমাকে পেমেন্ট করবেন বলে চেকবই চেয়েছিলেন দাদু। ওপরের এই তাক দুটোয় আমার হাতের ছাপ আপনারা পেয়ে যাবেন। কিন্তু আপনাকে আগে যেটা বলিনি সেটা হল, তখন আলমারিতে একটা ইঁদুরও দেখতে পেয়েছিলাম। ওই যে। ওটাকে যত্ন করে তুলে রাখুন স্যার। প্রাইম এভিডেন্স। এসির ঠান্ডায় আছে, খুব বেশি পচেনি। দাদুর পোস্টমর্টেম আপনারা করেছেন, এবারে ওই ইঁদুরটার করবেন। করলেই জানা যাবে যে ইঁদুরটা ওইখানে মরে পড়ে ছিল আমি এ-বাড়িতে ঢোকার অনেক আগেই। সন্দেহটা আমার আগেই হওয়া উচিত ছিল স্যার। কিন্তু তাড়াহুড়োয় খেয়াল করিনি যে মানুষের আগমন দেখলে নেংটি ইঁদুর কখনও চুপ করে বসে থাকতে পারে না। অথচ আমি দু-বার আলমারি খোলা সত্ত্বেও ইঁদুরটা ঠিক এইভাবে পেছন ঘুরে থেবড়ে বসে ছিল। আমার তখনই বোঝা উচিত ছিল যে ইঁদুরটা মরে গেছে। মরে গিয়ে আমাকে বাঁচিয়ে দিয়ে গেল স্যার। ও-ই প্রমাণ করে দেবে যে টেবিলে পড়ে থাকা বিষ মেশানো জল খেয়েই ও মরেছে আর আমি আসার আগেই মরেছে।”
“তার মানে!”, মেঘনাদ তেড়ে এলেন, “ইঁদুরটাকে আগেই মেরে এনে তুই তো নিজেই ওখানে প্লান্ট করে রেখেছিলি।”
“একেবারেই নয় মেঘনাদবাবু।” রাগে এবার ফুঁসে উঠল বিষুব। “প্রথমত আমি আপনাকে আপনি-আপনি করে সম্মান করছি, আপনারও সেটাই কর্তব্য। কাজের লোককেও ‘আপনি’ বলতে শিখুন। আর, আমি তো আপনার কাজের লোকও নই। এখনও যদি শিখতে না পারেন, ফাঁসির আগে যতদিন জেলে থাকবেন, আমিই না-হয় জেলে গিয়ে আপনাকে শিখিয়ে আসব। দ্বিতীয়ত, ফরেন্সিক সাইন্স এখন উন্নত। পরীক্ষা করলেই ওই টেবিলে ইঁদুরের পায়ের ছাপ, লোম ইত্যাদি পাওয়া যাবে। সারা ঘরেই পাওয়া যাবে। আলমারিতে তো বটেই। সুতরাং আমার এভিডেন্স প্লান্ট করার দাবিটা তখনই নাকচ হয়ে যাবে।”
সারা ঘর নিস্তব্ধ। শুধু এসি চলার হালকা আওয়াজ আসছে আর মাঝে মাঝে আসছে ভিডিওগ্রাফারের নাক টানার আওয়াজ।
নিস্তব্ধতা ভাঙলেন মেঘনাদ। জিভ একটু জড়িয়ে যাচ্ছে তাঁর। তবু বললেন, “মাম্-মানে? কী বলতে চাওয়া হচ্ছে?”
মেঘনাদের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ছিল বিষুব। এবার ঘৃণা মেশানো গলায় সরাসরি আঙুল তুলে বলল, “বলতে চাইছি, মহা ধুরন্ধর লোক আপনি। সত্তর হাজার শয়তান মরলে আপনার মতো একটা শয়তান পয়দা হয় যে সম্পত্তির লোভে নিজের বাবাকে খুন করে আর সেই দায় অন্য কারও ঘাড়ে চাপিয়ে তাকে ফাঁসিকাঠে ঠেলে দেয়। নিজের বাবাকে মারার যে জটিল ষড়যন্ত্রটা আপনি করলেন, হতেই পারে এমনটা নিশ্চয়ই আগেও করেছেন কিন্তু সুফল পাননি। এবারে খাপে খাপ বসেছে। আপনার বাবাকে জলদি মারাটা দরকার ছিল কারণ ইদানীং আপনার বাবা তাঁর সমস্ত সম্পত্তিটাই বৃদ্ধাশ্রমে দান করে দেবেন বলে জানাচ্ছিলেন। ট্র্যাপে ফেলার জন্য আপনি আমার মতো একজন ডেলিভারি বয়ের সামনে ইঁদুরকল পাতলেন। আগেই খোঁজখবর নিয়ে জেনেছেন কুইককার্টের যে-ছেলেটা এই এলাকায় ডেলিভারি করে তার অভ্যেস আছে ডেলিভারি ফিরিয়ে না-নিয়ে যাওয়ার। আমাদের অ্যাপ দিয়ে অর্ডার করলে পরের দিনেই ডেলিভারি করা হয়। তাই আপনি যেদিন কলকাতার বাইরে বেরোলেন সেদিনই অর্ডার করেছেন। আপনি জানেন আপনার বাবার স্বভাব। উনি ঘন ঘন জল খেতে চাইতেন। তাই জলের জগে বিষ মিশিয়ে রেখে মন্দারমণি গিয়ে আপনি ওঁত পেতে অপেক্ষা করলেন ডেলিভারি বয়ের ফোনের। আপনি জানেন যে ডেলিভারির কল রেকর্ড করা হয়, তাই বিস্তারে না-গিয়ে ‘পাপোশটা দেখছ’ বলে থেমে গেলেন। থামার কারণ হিসেবে ফোন চুরি হওয়ার গল্প অবধি ফেঁদে নিলেন। আপনার বাবা মারা গেলে যে কোটি-কোটির সম্পত্তি আপনার হাতে আসত তার জায়গায় একটা ফোনের আর কতই বা দাম। এমনকি বারো লাখও তার কাছে কিছুই নয় আর সেই কারণেই গাড়ি কেনার নাম করে বাবার থেকে বারো লাখ টাকার চেক লিখিয়ে ক্যাশ তুললেন। ক্যাশটা ঘরের আলমারিতেই রেখে ইঁদুরকলের টোপ মানে খুনের মোটিভ সেট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আলটিমেটলি টাকাটা হাতছাড়া করতে পারেননি। সে টাকা আপনি কী করেছেন তা আপনার ব্যাপার। আপনার লিগাল টাকা নিয়ে আশা করি পুলিশেরও অত মাথাব্যথা থাকার কথা নয় যদি না আপনি টাকা চুরি যাওয়ার গল্পটাও পুলিশকে খাওয়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যান।”
“তুই, মানে আপনি…” সামান্য তুলে গেলেন ইন্সপেক্টর রক্ষিত।
“আমাকে তুমি-তুমি করে বলতে পারেন স্যার।” একপেশে হাসল বিষুব।
“বলছি যে, তুমি যদি কিছুই না করে থাকো, তাহলে শিলিগুড়ি থেকে নেপালে পালাচ্ছিলে কেন?”
“আপনারা যেভাবে আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছিলেন স্যার, তাতে আপনি হলেও কি পালাতেন না, বলুন? নেহাত মরা ইঁদুরটা ছিল…. আর, তাছাড়া শিলিগুড়িতে রেখার বাপের বাড়ি। এমনিই যেতে পারি না? একটা মাত্র ঘর, তাই লজ ভাড়া করে ছিলাম। আর নেপাল ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার জন্য তো রেখা অনেকদিন ধরেই ঘ্যানঘ্যান করছিল। তাই ট্যাভেল এজেন্সির কাছে গেছিলাম।”
যে-দড়ি ঢুকেছিল মাইতিবাড়িতে বিষুবের কোমর জড়িয়ে সেটা বেরোল মেঘনাদ মাইতির কোমরে শক্ত বাঁধন দিয়ে। মেঘনাদ মাইতিকে প্রিজনভ্যানে তুলে চাবিটা পকেটে পুরে ‘বৃদ্ধ খুনের মামলায় নাটকীয় মোড়’ বলে চেঁচিয়ে ওঠা রিপোর্টারদের ভিড়টাকে প্রিজনভ্যানের জানলায় পাঠিয়ে বিষুব চট্টরাজের পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললেন ইন্সপেক্টর রক্ষিত, “ছোটবেলায় হেমেন্দ্রকুমার রায়ের একটা বই পড়েছিলাম— ‘দারোগা কি আসামি?” তোমাকে দেখলে তো এখন উনি লিখতেন ‘আসামি কি দারোগা?’। যা কামাল দেখালে বাবা। তবে তোমায় কিন্তু আমার সঙ্গে এখন জিপে বসতে হবে। ইঁদুরের পোস্ট মর্টেমের আগে তো ছাড়া যাবে না। আর, ছাড়লেও আমি না বলা অবধি আপাতত কলকাতা ছেড়ে কোথায় যাবে না।”
মাথাটা নিচু করে চুলকে হেসে বলল বিষুব, “হেঁহেঁহেঁ, কলকাতা ছেড়ে আর কোথায় যাব বলুন স্যার? এখানেই তো আমার কাজবাজ। তবে দারোগাই যখন বলে দিলেন স্যার, তাহলে মেঘনাদ মাইতির দুটো অ্যাকমপ্লিসের নাম বলে দিই, ভ্যানে তুলে নিন।
“অ্যাকমপ্লিস? মানে সহযোগী কে কে?” আশ্চর্য হলেন ইন্সপেক্টর।
“হ্যাঁ, অ্যাকমপ্লিস। একজন হল দিনের বেলার আয়া চাঁপা। আর একজন মেঘনাদ মাইতির ওয়াইফ নিভা। বাড়িতে কেউ নেই শুনে যেন ভারী অবাক হয়েছিল মেঘনাদ। কিন্তু বিশ্বস্ত আয়া কাজে যেতে না পারলে ফোন করে জানাবে না আর সে এল কিনা বাবুও সেটা সকালে উঠেই ফোন করে জানবে না এ কি হয়! আর, অসহায় অসুস্থ শ্বশুরকে ফেলে দিয়ে পুত্রবধূ এতদিন বাপের বাড়িতে পড়ে রইল মায়ের সামান্য শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে, এ-ও সন্দেহজনক নয় কি স্যার?”
*****
সাতগাছিতে বৃদ্ধখুনের ঘটনার পরে এক বছর কেটে গেছে। আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়েছে মেঘনাদ মাইতি, নিভা মাইতি আর তাদের বাড়ির দিনের বেলার আয়া চাঁপা। আগামী সোমবার সাজা ঘোষণা। মেঘনাদ মাইতির ফাঁসি হয় না যাবজ্জীবন সেই নিয়ে আলোচনা তুঙ্গে। তাদের তেরো বছরের মেয়েটা থাকে বর্ধমানে তার মামার বাড়িতে।
দমদমের সেডেনট্যাঙ্কসে ছোট্ট একটা খাবারের দোকান খোলা হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিষুবরেখা ইটারি’। দোকানে একটা নামি ইউটিউব চ্যানেল থেকে এসেছে ভুগ করতে। ইন্টারভিউ দিয়ে হাসিমুখে তাদের বিদায় জানিয়ে কিচেনে ঢুকে বিষুব দেখল তার বউ গোমড়ামুখে মিক্সার চালাচ্ছে। কী হয়েছে জিজ্ঞাসা করতে রেখা বলল, “কী আবার হবে। নিজেই দ্যাখো না মশলার কৌটোর ওপরে!’
বিষুব তাকিয়ে দেখল কৌটোর ওপর দিয়ে একটা নেংটি ইঁদুর চলেছে। আর ভালো লাগে না তার। সব কিছু মেনে নিলেও টাকার ব্যাপারটা হজম হয়নি ইন্সপেক্টর রক্ষিতের।
চাঁপার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে দু-লাখ মিলেছিল। আবার, বিষুবের বাড়িতে রক্ষিত সাধারণ পোশাকে নিজে এসে তল্লাশি চালিয়ে ঠিক বের করে ফেলেছিলেন দশ লাখ টাকা। সেটা অবশ্য অফিশিয়ালি রেজিস্টার হয়নি। কুড়ি শতাংশ ‘কমিশন’ নিয়ে বাকিটা ফেরত দিয়েছিলেন রক্ষিত। চার্জশিটে লেখা হয়েছিল আলমারিতে কোনো টাকাই ছিল না চুরি হওয়ার মতো, দশ লাখ টাকা মেঘনাদ মাইতি নিজেই কোথাও গায়েব করেছিল।
ফলে বাকি আট লাখ দিয়েই এই ছোট্ট খাবারের দোকান। রেখা বলল, “ইঁদুরের বিষ নিয়ে আসবে।”
বিষুব বলল, “বিষ? একদম না! ইঁদুরকল আনব, পেতে রাখবে। ধরা পড়লে সাতগাছির নালায় ছেড়ে আসব।”
