দ্য আল্টিমেট ট্রুথ – ৫
(পুরোনো অভ্যাসগুলো)
ব্যারাকপুর থানা, উত্তর ২৪ পরগণা
সকাল ১১টা, ১৭ই জুলাই
ব্যারাকপুর থানার সামনেটা বেশ সুন্দর। সহজ বাহু তুলে দাঁড়িয়ে আছে শিমুলগাছ। রোদে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়া একটা কাজল পাখি গাছের ছায়ায় কিছুটা জিরিয়ে নিচ্ছে। কিছুটা দূরে ধানের খেত। থানার সামনে রাখা মৃৎ-পাত্র ভরতি ধানক্ষেতের জল। দূরে একটা তমালগাছ দেখা যাচ্ছে। ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে। সকালটা যেন ঝিমিয়ে আছে। কোথাও কোনো হট্টগোল নেই। থানা হলেও কোথায় যেন একটা নিবিড় প্রশান্তি বিরাজ করছে। অনেকদিন পরে থানায় এসে মনটা ভরে গেল লোকটির। থানার আইসি-র ঘরে ঢুকতেই সেই পরিচিত দৃশ্যটা চোখের সামনে ফুটে উঠল। অনেকদিন আগে ফেলে আসা দৃশ্যগুলো ভেসে উঠল আবার। হালকা নীলচে দেওয়ালে গান্ধীজি আর আম্বেদকর সাহেবের ছবিগুলো ফ্রেমে বাঁধাই করে টাঙানো। ঠিক নীচে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বড়ো মনোগ্রামটা সাঁটা। হলদে বর্ডারে অর্ধেক লাল ও অর্ধেক ঘন নেভি ব্লু ব্যাকগ্রাউন্ডে লেখা ‘ডাব্লুবিপি। এ রাজ্যের প্রায় প্রতিটি থানাতেই এই একই ছবি চোখে পড়ে। থানাটা বেশ সুন্দর করে সাজানো। পরপর মালখানা, লকআপ, আইওস রুম, কম্পিউটার রুম, আইসি-র রুম। দেওয়ালে থানার অফিসারদের নাম, র্যাঙ্ক টাঙানো। মানুষের কোলাহল, ল্যান্ডলাইনের রিংটনের সঙ্গে অফিসের কেজো গন্ধ মিশে অদ্ভুত একটা পরিবেশ তৈরি করেছে।
“হ্যাঁ বলুন?” মাথাটা না তুলে সামনে দাঁড়ানো মানুষটিকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বললেন ব্যারাকপুর থানার আইসি রামতনু সান্যাল।
“নমস্কার। আমি দেবব্রত পাল। একটা মিসিং রিপোর্ট করাতে এসেছি।”
নামটা শুনেই মুখ তুলে তাকালেন রামতনুবাবু। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটির দিকে তাকিয়েই মুখটা কেমন যেন পানসে হয়ে গেল ওঁর। তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে একরাশ বিস্ময় মুখে নিয়ে বললেন, “আপনি। এখানে। এই সময়ে কী হয়েছে?”
দেবব্রতবাবু থানার আইসি-র দিকে ভালো করে দেখলেন। কোনো উত্তর দিলেন না। একটা সময় ছিল যখন উনি সামনে দাঁড়ানো মানুষের শারীরিক ভাষা, অভিব্যক্তি বা চোখের দৃষ্টি থেকে বুঝতে পারতেন, মানুষটি সত্যি বলছে নাকি মিথ্যে বলছে। যদিও অনেকদিনের অনভ্যাসে এখন অনেক কিছুই কেমন যেন হারিয়ে গেছে।
(রে অফ হোপ)
কাঁটাপুকুর মর্গ, কলকাতা
দুপুর ৩টে ৩০, ১৭ জুলাই
ময়না তদন্ত শেষ করে মর্গের বাইরে বেরিয়ে এলেন ডঃ সৈকত নিয়োগী। ডঃ নিয়োগীকে দেখেই ওঁর দিকে এগিয়ে গেলেন অফিসার দুর্জয় সেন। কাজের সূত্রে ডঃ সৈকত নিয়োগীর সঙ্গে ভালোই আলাপ আছে দুর্জয়ের।
“কী খবর দুর্জয়? আপনিই কী এই কেসের আইও?”
“হ্যাঁ স্যার। কী বুঝলেন, যদি একটু ব্যাখ্যা করে বলতেন?”
“ভিক্টিম ম্যারেড। সেক্সুয়ালি অ্যাক্টিভ ছিলেন। তাও ওঁর ভ্যাজাইনার বাইরের বেশি কিছু জায়গায় ‘মার্ক অফ ভাইওলেন্স’ খুব বেশি পরিমানে পেয়েছি। কিন্তু…”
“কিন্তু কী, স্যার?”
“আমার মনে হচ্ছে, খুনটা করার আগে মেয়েটিকে অজ্ঞান করা হয়েছিল। তারপরে ওঁর ওপরে অত্যাচার করা হয়। তাই মেয়েটির দুই হাতে বা হাতের আঙুলগুলোতে সেভাবে কোনো ডিফেন্স ইঞ্জুরি পাওয়া যায়নি।”
“মার্ডারটা আগে হয়েছে নাকি মেয়েটিকে অত্যাচার করে তারপরে ওকে খুন করা হয়েছে?’
“গলার আঘাতটা ক্লিন কাট। গলার ইঞ্জুরিগুলো সব অ্যান্টি-মরটেম অর্থাৎ খুনটা আগে করা হয়েছে। প্রাইভেট পার্টসের ইঞ্জুরিগুলো অবশ্য পোস্ট-মরটেম অর্থাৎ মেয়েটি মারা যাওয়ার পরেই ওঁকে অত্যাচার করা হয়।”
“সান অফ বিচ।” চিৎকার করে উঠলেন দুর্জয়। মুখটা রাগে লাল হয়ে উঠল ওঁর।
“ইয়েস। ইউ হ্যাভ টু অ্যারেস্ট দ্যাট বাস্টার্ড।”
“টাইম অফ ডেথটা কী স্পেশিফিক্যালি বলা সম্ভব হবে?”
“রাইগর-মরটিস আর মেয়েটির স্টমাক কন্টেন্ট দেখে মনে হচ্ছে, ময়না তদন্তের ২৪ ঘণ্টা আগে ওঁকে খুন করা হয়েছে। তার মানে, হিসেব করলে যা দাঁড়াচ্ছে সেটা হল, আজকে ভোর সাড়ে তিনটের আগে ওঁকে খুন করা হয়েছে।”
কথাটা শুনেই কিছু একটা ভাবলেন দুর্জয়। তারপরে ডঃ নিয়োগীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা ভোর ৪টের একটা ফুটেজ পেয়েছি। সেখানে দেখা যাচ্ছে, একটা ট্যাক্সি ড্রাইভার মেয়েটিকে গাড়িতে করে নিয়ে এসে বডিটাকে ওই জায়গায় ডাম্প করছে।”
“তার মানে, আমার হিসেবটাই মিলে যাচ্ছে।”
“রেপ করার উদ্দেশ্যেই কী খুন, এটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন?” নিজের মনে মনে বিড়বিড় করে উঠলেন দুর্জয় সেন। ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে মর্গ থেকে বেরিয়ে এসে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়িতে উঠে বসতেই শৈবাল রায়ের কলটা পেলেন।
“একটা আপডেট আছে।”
“কী?”
“কিছুক্ষণ আগেই ব্যারাকপুর থানায় একজন লোক এসে একটা মিসিং ডায়েরি করেছেন। মিসিং লেডির ডিআর অর্থাৎ ‘ডিস্ক্রিপ্টিক রোল’ আমাদের কেসের ভিক্টিমের সঙ্গে একদম মিলে যাচ্ছে।”
কথাটা শুনেই হারিয়ে যাওয়া হাসিটা ফিরে এল দুর্জয়ের মুখে। একটা আশার আলো পাওয়া গেল। এই ধরনের কেসে ভিক্টিম আইডেন্টিফিকেশনটা মাস্ট। না হলে, কেসগুলো সহজে ওপেন হয় না। আসলে খুনের মোটিভটা ক্লিয়ারলি বোঝা না গেলে তদন্তটা খুব বেশি দূর এগোনো যায় না।
“লোকটার ডিটেলস কিছু পেয়েছেন?”
“না, এখনও পাইনি। আসলে ওই থানায় আমার ব্যাচমেট আছে। ওর থেকেই খবরটা পেলাম। আমরা তো সব থানাতেই মেল করে ভিক্টিমের ডিআরটা পাঠিয়ে রেখেছিলাম।”
“একটা কাজ করুন, এখনই একবার ব্যারাকপুর থানায় যান। না থাক। আমিও আপনার সঙ্গে যাব। আমি থানায় ফিরছি। আপনি রেডি হয়ে থাকুন। তারপরে একসঙ্গে ব্যারাকপুরে যাব। একটা রে অফ হোপ পাওয়া গেছে। এই লিডটাকে কিছুতেই হাতছাড়া করা যাবে না।”
লাইনটা কেটে দিয়ে মোবাইল ফোনটা নিজের পকেটে রেখে দিলেন দুর্জয়। কিছু একটা করতেই হবে। এইভাবে চুপ করে বসে থাকা যাবে না।
(চলতে চলতে)
বিটি রোড, কলকাতা বিকেল
৫টা ৩০, ১৭ জুলাই
অজগরের মতো কালো পিচের রাস্তাটা নিজের সিনা টান করে শ্যামবাজার ক্রসিং থেকে সোজা এগিয়ে গেছে ব্যারাকপুরের দিকে। বিটিরোড ধরে ডানলপ মোড়, তারপরে একে একে বেলঘরিয়া, আগরপাড়া, সোদপুর, খড়দা, টিটাগড় পেরিয়ে এসে ব্যারাকপুর পৌঁছোতে হয়। কলকাতার মতো শহুরে কোলাহল না-থাকলেও ব্যারাকপুরকে কোনোভাবেই গ্রাম বলা যাবে না। কলকাতার উপকণ্ঠে গড়ে ওঠা ছোট্ট এই শহর নিজের ঐতিহ্য, ফেলে আসা ইতিহাস, ব্রিটিশ আমলের কিছু স্মৃতি পিঠে নিয়ে আজও হেঁটে চলেছে নিজস্ব ছন্দে।
দিনের আলোর খোলস তখনও পুরোপুরি খোলেনি। রাস্তার যানজট ছাড়াতে ছাড়াতে এগিয়ে চলেছে পুলিশের গাড়ি। গাড়ির মাঝের সিটে দুর্জয় আর শৈবাল বসে আছেন। দু-জনের মুখই বেশ ভার। কোনো কথা নেই। কিছু একটা ভেবে চলেছেন দুর্জয়। আসলে ওপর থেকে ক্রমাগত চাপ আসছে। একে তো সুপিরিয়রদের চাপ, তার ওপরে মিডিয়ার প্রেসার। তাও নিজেকে কোনোমতে সামলে নিয়ে দিনরাত এক করে কেস নিয়ে পড়ে আছেন। চারিদিক থেকে ধোঁয়ার গন্ধ, গাড়ির চিৎকার, পথচলতি মানুষজনের গলার স্বর ছেঁকে ছেঁকে উঠে আসছে ধীর লয়ে। এইসব ছায়াছবির মধ্যেও অদ্ভুত এক রুক্ষ মাদকতা লুকিয়ে থাকে। মিশে থাকে দৈনন্দিন লড়াই মাখা সতেজতা। দুর্জয়দের গাড়ি তির বেগে পিচের রাস্তা কামড়ে ছুটে চলেছে চিড়িয়ামোড়ের দিকে। ড্রাইভার অর্জুন ঝড়ের বেগে এগিয়ে নিয়ে চলছে গাড়িটা। চেষ্টা করছে যতটা দ্রুত সম্ভব গাড়িটাকে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। পরিস্থিতির গুরুত্বটা সে-ও বুঝেছে বোধহয়।
পকেটে থাকা মোবাইলটা বেজে উঠতেই নড়েচড়ে উঠলেন দুর্জয়। দেখলেন, ওসি অভিনন্দন মার্জিত কল করেছেন।
“হ্যাঁ, স্যার বলুন?”
“একটা ব্যাড নিউজ আছে।”
“কী স্যার?”
“বিরোধী দলের এক নেতা এই কেসটা নিয়ে জল ঘোলা করতে চায়। ২-১ দিনের মধ্যে কেস সলভ না হলে সিবিআই তদন্ত চেয়ে তারা কলকাতা হাইকোর্টে ‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন’ ফাইল করবে ঠিক করেছে। ও সব বাদ দিন, আপনি এখন কোথায়?”
“কেসে একটা আর্জেন্ট ডেভলপমেন্ট হয়েছে। আপনাকে জানানোর আগেই তড়িঘড়ি বেরিয়ে আসতে হয়েছে। মনে হচ্ছে, ভিক্টিমের আই ডেন্টিফিকেশনটা এবার হয়ে যাবে।”
“এত দারুণ খবর। আপনি ওদিকটা দেখুন। ইনভেস্টিগেশন বন্ধ করা যাবে না। আর কী হল, আমাকে টাইম-টু-টাইম জানাবেন কিন্তু।”
“ইয়েস স্যার।”
ফোনটা রেখেই গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে উদাস হয়ে গেলেন দুর্জয় সেন। ওসির সঙ্গে মোবাইলে কথা বলার সময়ে বেশ কয়েকবার বাড়ি থেকে স্ত্রী-র কল আসছিল। কথা ছিল, আজকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরবেন। কিন্তু এখন যা অবস্থা তাতে সেটা হওয়ার জো নেই। তাই মনটা খিঁচড়ে গেল ওঁর।
(মেয়েটি আসলে কে? )
ব্যারাকপুর থানার আইসি-র চেম্বার
সন্ধ্যে ৬টা ৩০, ১৭ জুলাই
থানার আইসি-র চেম্বারে পিনপতন নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। চেয়ার নিয়ে পর পর বসে আছেন আইসি রামতনু সান্যাল, থানার ডিউটি অফিসার রজত পাল, অফিসার দুর্জয় সেন এবং শৈবাল রায়। ওঁদের সামনে একটা চেয়ারে বসে আছেন বছর চল্লিশের একজন ভদ্রলোক। চেহারার মধ্যে অদ্ভুত একটা জৌলুস লুকিয়ে আছে। লম্বা, চওড়া, গায়ের রং মাঝারি। মুখে কাঁচাপাকা দাঁড়ি। দু-চোখের তলায় কালির পুরু রেখা পড়ে আছে। মনে হচ্ছে, কোনো একটা বিষয় নিয়ে খুবই টেনশনে আছেন। পরনে দুধসাদা ফুল শার্ট, হাতাটা কনুই পর্যন্ত পাট করে গোটানো। কালো রঙের প্যান্ট। জামাটা ইন করা আছে। পায়ে কালো রঙের জুতো। সামনে বসে থাকা মানুষটিকে আপাদমস্তক ভালো করে একবার দেখে নিলেন দুর্জয়। শুরু করলেন জিজ্ঞাসাবাদ।
“নমস্কার। আমি দুর্জয় সেন। কলকাতা পুলিশের অফিসার। প্রগতি ময়দান থানায় পোস্টেড। একটা মার্ডার কেসের বিষয়ে আপনাকে কিছু প্রশ্ন করব। আশা করছি, আপনি প্রশ্নগুলোর ঠিকঠাক জবাব দেবেন। তবে সবার আগে আপনাকে একটা ছবি দেখাই। ভালো করে দেখে বলুন, এই মহিলাকে কী আপনি চেনেন?”
ভিক্টিমের ছবিটা নিজের মোবাইল থেকে বের করে লোকটিকে দেখালেন দুর্জয়। ছবিটা দেখে লোকটির মুখের অভিব্যক্তির মধ্যে কোনো পরিবর্তন হল না। মনে হয়, উনি আগে থেকেই এমন কিছু একটা আন্দাজ করেছিলেন। ভালো করে ছবিটা দেখে মাথা তুলে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইনি আমার স্ত্রী, দীপশিখা পাল। ওর জন্যেই আমি এই থানায় মিসিং ডাইরি করতে আসি। গতকাল সকালে অফিসে যাচ্ছি বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছিল। তারপরে সারারাত বাড়িতে ফেরেনি। আমি ওর অফিসে ফোন করেছিলাম। জানতে পারি, একটা আর্জেন্ট মিটিং ছিল গতকাল। তাই অফিস থেকে বেরতে বেরতে দীপশিখার অনেকটাই রাত হয়ে গিয়েছিল। ওর ফোনটা বারবার সুইচড অফ পাচ্ছিলাম।”
“কী যেন নাম আপনার?”
“দেবব্রত পাল। চিড়িয়া মোড়ের কাছেই আমার ফ্ল্যাট।”
“কী করেন?”
“এখন ব্যবসা করি। শাড়ির ব্যবসা। বাড়ি থেকেই করি।”
কথাটা কানে বাজল দুর্জয়ের। কথাটা শুনে রামতনুবাবুর দিকে তাকালেন দুর্জয়। আইসি সাহেব কিছু একটা ইশারা করলেন। ইশারাটা ধরতে পেরে মাথাটা ঝাঁকালেন দুর্জয়।
“আপনার স্ত্রী-র ডিটেলসটা, মানে, ফোন নাম্বার, অফিসের ঠিকানা, বন্ধুদের ডিটেলস আমাকে দিন।”
“একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”
“হ্যাঁ, বলুন।”
“দীপশিখার কী হয়েছে?”
কথাটা শুনে থমকে গেলেন দুর্জয়। পাশে বসে থাকা শৈবাল রায়ের দিকে তাকালেন। তারপরে বললেন, “আজকে ভোরে কলকাতার একটা জায়গা থেকে আপনার স্ত্রী-র মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ময়না তদন্ত অনুসারে কেউ আপনার স্ত্রী-কে মার্ডার করেছে। তারপরে একটা ঝোপের ধারে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। আপনার স্ত্রীর ওপরে শারীরিক অত্যাচারও করা হয়েছিল। অপরাধীকে আমরা খুঁজছি। একটা কেস রেকর্ড করেছি। বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করে তদন্ত করছি আমরা। খুব তাড়াতাড়ি আসল অপরাধীকে ধরে ফেলতে পারব বলে আমাদের বিশ্বাস।”
কথাটা শুনেই চুপ করে গেলেন দেবব্রতবাবু। মাথাটা নামিয়ে নিলেন। পকেট থেকে রুমালটা বের করে চোখ দুটো মুছে নিলেন একবার। তারপরে সামনের টেবিলে রাখা জলের গ্লাসটা হাতে তুলে গলাটা ভিজিয়ে নিয়ে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এমনটা হবে আমি আগেই আন্দাজ করেছিলেম। সাবধানও করেছিলাম ওকে। কিন্তু ও আমার কথা শোনেনি। অফিস অফিস করেই সব শেষ হয়ে গেল। আসলে বরের রোজগারপাতি কম। বেকারই বলতে পারেন। তাই ওর কাছে বরের গুরুত্ব দিন-কে-দিন কমে আসছিল। সারাদিন অফিস আর অফিস কলিগদের নিয়েই মেতে থাকত। বাড়িতে যেটুকু সময়ের জন্য আসত তখনও ফোনেই ব্যস্ত থাকত।”
“আপনার কাউকে সন্দেহ হয়?”
“রাজীব দত্ত। দীপশিখার অফিস কলিগ। আমি রাজীবকেই সন্দেহ করছি।”
“কেন?”
“বছর খানেক হল দীপশিখা ওই অফিসে জয়েন করেছে। আমাদের বিয়ের ঠিক পরেই দীপশিখা কাজে যোগ দেয়। প্রথম দিন থেকে ওই ছেলেটি দীপশিখার পেছনে পড়ে ছিল। বেশ কয়েকবার প্রপোজও করেছিল। সেই নিয়ে একটা টেনশন চলছিল। দীপশিখাই আমাকে এই কথাগুলো বলেছিল। রিজেক্টেড হয়ে রাজিবের ইগোতে আঘাত লাগে। যদিও মুখে ও নাকি কিছু বলত না। দীপশিখার সঙ্গে ভালোই ব্যবহার করত। কিন্তু মুখে কিছু না বললেও দিপু বুঝত যে রাজীব ওকে সহ্য করতে পারছে না। তারপরে একদিন একটা বাজে ঘটনা ঘটে।”
কথাটা বলেই কেমন যেন মিইয়ে গেলেন দেবব্রতবাবু। নিজের মোবাইলটা পকেট থেকে বের করে গ্যালারি ঘেঁটে একটা ছবি বের করে দুর্জয়ের দিকে মোবাইলটা তুলে ধরলেন। দুর্জয় দেখলেন, মোবাইলের স্ক্রিন জুড়ে ইয়াং, হ্যান্ডসাম একজন সুপুরুষের ছবি। দুর্জয় জিজ্ঞেস করলেন, “ইনি কে?”
“এই ছেলেটিই রাজীব দত্ত। চেহারা ছবিতেই তো সবাইকে মাত করে দিত। শুনেছি, অফিসের আরও অনেক মহিলার সঙ্গে নাকি ওর মাখামাখি ছিল। মেয়েবাজ টাইপের ছেলে। আমি শিওর কাজটা ওরই। নিজে না করলেও, কাউকে দিয়ে করিয়েছে। আমি ওর নামেই কমপ্লেন করব।”
(দেবব্রত পাল আসলে কে? )
ব্যারাকপুর থানার আইসি-র চেম্বার
রাত ৭টা, ১৭ জুলাই
আইসি ব্যারাকপুর পিএস-এর চেম্বারে বসে দেবব্রতবাবুর সঙ্গে কথা বলছেন দুর্জয় সেন। জেনে বুঝে নিচ্ছেন সবকিছু। মার্ডার কেসের তদন্ত করার আগে ভিক্টিম সম্পর্কে যতটা সম্ভব তথ্য সংগ্রহ করে নিতে হয়। তবেই কেসটা ক্র্যাক করা যায়।
“একটা কথা বলুন তো, রাজীব দত্তকেই বা আপনি সন্দেহ করছেন কেন? উনি ছাড়াও অন্য কেউ তো খুনটা করতে পারে। তাছাড়া, আপনার কথাই যদি সত্যি বলে ধরেও নিই তাহলে উনি তো দীপশিখাদেবীকে পছন্দ করতেন। তাহলে শুধু শুধু ওঁকে খুন করতে যাবেন কেন?” কথাটা বলেই দেবব্রতবাবুর দিকে তাকিয়ে থাকলেন দুর্জয় সেন। ওঁর মুখের এক্সপ্রেশন, বডিল্যাঙ্গুয়েজ বোঝার চেষ্টা করতে থাকলেন।
মুচকি হেসে দেবব্রতবাবু বললেন, “অপরাধবিদ্যায় ‘ভিক্টিন প্রেসিপিটেশন’ বলে একটা টার্ম আছে। অনেক সময় ভিক্টিমদের কাজের জন্যেই বিপদ ঘনিয়ে আসে। অর্থাৎ ভিক্টিম নিজেই নিজের বিপদ ডেকে আনে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। দীপশিখা আর রাজীবের এই মেলামেশার কারণেই দীপশিখাকে খুন হতে হল। আমি অনেকবার দীপুকে বারণ করেছিলাম। কিন্তু ও আমার কোনো কথাই শোনেনি। তাই…”
দেবব্রতবাবুর যুক্তিপূর্ণ কথা শুনে ঘরে বসে থাকা অনেকেই অবাক হলেন। যদিও দুর্জয় কোনোভাবেই অবাক হননি। কারণ, উনি আগে থেকেই দেবব্রতবাবুর ব্যাকগ্রাউন্ডটা জানতেন।
কথা বলার ফাঁকে দুর্জয়, শৈবাল রায়ের কাছে নিজের মাথাটা ঝুঁকিয়ে ওঁর কানে ফিশফিশ করে বললেন, “একটা কাজ করুন, দেবব্রতবাবুর থেকে ওঁর স্ত্রী এবং ওই রাজীব দত্তের মোবাইল নাম্বারগুলো জোগাড় করে সেগুলোর কল-লিস্ট আনানোর ব্যবস্থা করুন। দেখবেন, ওই নাম্বারগুলোর আইপিডিআরও যেন আনানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম কলগুলো সাধারণ কল-লিস্টে ধরা যায় না। তার জন্য আইপিডিআর ডেটা দেখাটা দরকার।’
“ইয়েস স্যার।” মাথা ঝাঁকিয়ে উত্তর দিলেন শৈবাল রায়।
কথা বলতে বলতে বারংবার দেবব্রতবাবুর দিকে তাকাচ্ছিলেন দুর্জয়। দেখলেন, ওঁর মুখে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠেছে। হাতটা উনি সামনে রাখা টেবিলের ওপরে রেখেছেন, হাতের মুঠো খোলা। হাত-পা নাড়িয়ে কথা বলছেন। যথেষ্ট প্রত্যয় নিয়েই কথা বলছেন দেবব্রতবাবু।
“দীপশিখাদেবীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল?” প্রশ্নের বাঁকটা দেবব্রতবাবুর দিকে ঘুরিয়ে দিলেন দুর্জয়।
প্রশ্নটা শুনেই মুচকি হাসলেন দেবব্রত পাল। বললেন, “আর পাঁচজন স্বামী-স্ত্রীর মতোই আমাদের সম্পর্ক ছিল।”
“সেটা মনে হয় ছিল না। থাকলে, আপনি কিছুতেই নিজের স্ত্রী-কে সন্দেহ করতেন না?”
“সন্দেহ। কী সব আজেবাজে কথা বলছেন? যা সত্যি শুধু সেটুকুই আমি বলেছি। আপনি একটা কাজ করুন, দীপশিখার অফিসে গিয়ে তদন্তটা করুন। তাহলেই দেখবেন আরও অনেক কিছু জানতে পারবেন।”
“আমি কী করব, আর কতটা করব, সেটা আমার ব্যাপার। আপনি শুধু নিজের কথা ভাবুন। আপনার কাছেও কী কোনো মোটিভ ছিল না, দীপশিখাকে খুন করার?”
কথাটা শুনেই দেবব্রতবাবুর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল। চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে এল। বদল এল, ওঁর বডি ল্যাঙ্গুয়েজেও। নিজের মনে ওঠা প্রশ্নগুলো না বলে আর পারলেন না শৈবাল। দুর্জয়ের কাছে ঘনিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “ব্যাপারটা তো আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। দেবব্রতবাবু করেনটা কী? ওঁর মধ্যে এতটা কনফিডেন্স আসছে কোথা থেকে? এইভাবে একের পর এক প্রশ্ন হেলায় উত্তর দিয়ে চলেছেন কেমন করে?”
মুচকি হেসে দুর্জয় উত্তরে বললেন, “আমাদের কাছে ওঁর বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই। আর এটা উনি ভালো করেই জানেন। তাই এতটা বেড়ে খেলছেন। আগে আমরা ওঁর বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহ করি তারপরে না হয় ওঁকে ফের জিজ্ঞাসাবাদ করা যাবে।”
“সেটাই ভালো হবে। একটা কথা অনেকক্ষণ ধরে জিজ্ঞেস করব বলে ভাবছি, কিন্তু কিছুতেই সুযোগ পাচ্ছিলাম না।”
“কী?”
“দেবব্রতবাবুর আসল পরিচয়টা কী?”
‘থানার আইসি-র থেকে জেনেছি, দেবব্রতবাবু নাকি একটা সময়ে পুলিশে চাকরি করতেন। সাব-ইনস্পেকটর থাকাকালীন কোনো একটা কেসে ফেঁসে যান। তারপরে ডিপার্টমেন্ট থেকে ওঁকে সাসপেন্ড করা হয় এবং উনি চাকরিটা ছেড়ে বেরিয়ে যান।” মুচকি হেসে উত্তর দিলেন দুর্জয় সেন।
