দ্য আল্টিমেট ট্রুথ – ১০
(হলুদ ট্যাক্সিটা)
প্রগতি ময়দান থানা, কলকাতা
রাত ৮টা, ১৭ জুলাই
শৈবাল রায়কে নিয়ে কেসের তদন্তে বাইরে পড়ে আছেন দুর্জয় সেন। এদিকের বাকি কাজগুলো সামলাচ্ছেন অফিসার শৌভিক সেনগুপ্ত। যাওয়ার আগে পইপই করে সবকিছু বুঝিয়ে গেছেন দুর্জয়। কী কী কাজ করতে হবে, তার একটা লিস্ট বানিয়ে দিয়ে গেছেন। কাজগুলো করে ফিডব্যাক দিতেও বলেছেন। দুর্জয়ের কথামতো ইতিমধ্যেই সিসি ফুটেজে দেখা হলুদ রঙের ট্যাক্সির ডিটেলস পাওয়া গেছে। খোঁজ চলছে ট্যাক্সিটার। ইতিমধ্যেই চমকে দেওয়া একটা তথ্য শৌভিকের হাতে এসে পৌঁছেছে। কথাটা যদিও উনি পাঁচকান করেননি। দুর্জয়ের কড়া নির্দেশ আছে। কোনো তথ্য সেটা যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, সবার আগে ওঁকেই বলতে হবে। তারপরে বাকি সুপিরিয়রদের জানাতে হবে। দুর্জয়ের মতে, কেসের প্রধান তদন্তকারী অফিসার হিসেবে এইসব তথ্য সবার আগে ওঁরই জানার কথা। অফিসারস রুমের দেওয়ালে টাঙানো দেওয়ালঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে সময়টা দেখলেন শৌভিক। তারপরে পকেটের মোবাইলটা বের করে দুর্জয়ের নাম্বারটা ডায়াল করলেন।
“হ্যাঁ বলুন শৌভিক। আপনাকে যা যা করতে বলেছিলাম, সেগুলো করেছেন?”
“হ্যাঁ করেছি। হলুদ ট্যাক্সিটার ডিটেলস পেয়েছি।”
“ভেরি গুড! কী পেলেন?”
“স্যার, এনপিআর ক্যামেরার সাহায্যে ট্যাক্সির নাম্বারটা বের করা গেছে। রমেশ পান্ডে বলে কসবার একজন লোকের নামে ট্যাক্সিটা নেওয়া। লোকটির ডিটেলসও পেয়েছি। ইতিমধ্যেই সোর্স লাগিয়ে জানতে পারেছি, লোকটি অনেকদিন আগেই কসবার বাড়ি ছেড়ে কোথাও একটা চলে গেছে। আশেপাশের লোকজন ওর বর্তমান লোকেশনের বিষয়ে বিশেষ কিছুই বলতে পারছে না।”
কথাটা শুনেই চুপ করে গেলেন দুর্জয় সেন। কিছু একটা ভাবলেন। তারপরে বললেন, “রমেশ পান্ডের নামটা খুব শোনা শোনা মনে হচ্ছে। কোনো একটা কেসের ম্যাটারে নামটা শুনেছিলাম। কিন্তু ডিটেলসটা কিছুতেই মনে করতে পারছি না।”
“কোথায় শুনেছেন নামটা?”
“সেটাই তো ভাবছি। কিছুতেই মনে পড়ছে না।”
“পুরোনো কেস! তাহলে তো লালবাজারের ‘ক্রাইম রেকর্ড সেকশন’ আর সিআইডি-র রেকর্ড সেকশনে খোঁজ করলেই সবকিছু জানা যাবে।”
“সেটাই তাহলে করুন। আর একটা কাজ করুন, ট্যাক্সিটার নাম্বার এবং ছবিটা সব থানা এবং ট্র্যাফিক গার্ডগুলোতে সার্কুলেট করে দিন। যদি কোনো খোঁজ পাওয়া যায়।”
“ওকে স্যার। আমি কাজগুলো করে আপনাকে ফিডব্যাক দিচ্ছি।”
কথা শেষ করে দৌড়ে কম্পিউটার রুমের দিকে ছুট দিলেন শৌভিক।
(নাম্বার প্লেট)
ব্যারাকপুর থানা, কলকাতা
রাত ৮টা ৩০, ১৭ জুলাই
ঘরের একটা কোণে নিজের জন্য বরাদ্দ চেয়ারে বসে, ডেস্কে কেস ডায়েরি রেখে, মাথা নামিয়ে একমনে নিজের কাজে ব্যস্ত রয়েছেন দুর্জয় সেন। ওঁর পাশের টেবিলগুলোতে কয়েকজন অফিসার যে যার মতো নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। সময় যেন থমকে গেছে আচমকাই। খুনটা হওয়ার পরে কেটে গেছে বেশ কিছুটা সময়। অথচ কাজের কাজ খুব একটা কিছু হয়নি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই খবরটা চলে এল দুর্জয়ের কাছে। শৌভিক জানালেন, ২০২০ সালে পানিহাটিতে একটা গাড়ির মধ্যে একজন মানুষের ডেডবডি পাওয়া গিয়েছিল। ময়না তদন্তে জানা যায়, ঘটনাটা খুনের। তদন্ত করে আসল অপরাধী ধরাও পড়ে যায়। তারপরে কেস চলে। বিচারে অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। আর ওই ট্যাক্সিটা এখনও সিজ অবস্থায় কোর্টের সম্পত্তি হিসেবে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পড়ে আছে। মজার ব্যাপার হল, ২০২০ সালের ওই কেসের ট্যাক্সির নাম্বারটা আর দীপশিখা মার্ডার কেসের ট্যাক্সি নাম্বারটা একই। ট্যাক্সি চালাকের নাম রমেশ পান্ডে।
খবরটা শোনা মাত্রই মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল দুর্জয়ের। এটা কীভাবে সম্ভব! রমেশ পান্ডে এখন জেলে সাজা খাটছে। ওর ট্যাক্সিটা আগের কেসে বাজেয়াপ্ত করা আছে। তাহলে ওই একই ট্যাক্সি পুনরায় এই কেসে ইউজ হল কীভাবে? সবকিছু যেন গুলিয়ে যাচ্ছে ওঁর। অফিসার শৈবালের সঙ্গে খবরটা শেয়ার করতেই উনিও চঞ্চল হয়ে উঠলেন। কিছুতেই যেন হিসেব মেলান যাচ্ছে না। ট্রেনিং থেকে বেরিয়ে কিছুদিনের জন্য দুর্জয়ের পোস্টিং হয়েছিল লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগে। আর তখনই ওঁর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল ইনস্পেকটর অভিরাজ সেনের। অভিরাজ সেন গোয়েন্দা বিভাগের হোমিসাইড শাখার অফিসার। ওঁকে চেনেন না, এমন কোনো অফিসার কলকাতা পুলিশ তো বটেই, বেঙ্গল পুলিশেও নেই। সবাই ওঁর ব্যবহার এবং কাজে মুগ্ধ। নিজের এত বড়ো মাপের একজন অফিসার হয়েও যেকোনো সমস্যায় জুনিয়র অফিসারদের পাশে এসে দাঁড়ান। তাঁদেরকে অ্যাডভাইস দেন। সঠিক পথ দেখান। তদন্তে সাহায্যও করেন। আর তাই, এই ডিপার্টমেন্টে ওঁর খুব কদর। স্যারের কথাটা মনে পড়তেই মোবাইল থেকে অভিরাজের নাম্বারটা বের করে ওঁকে ফোনে ধরলেন দুর্জয়।
‘নমস্কার স্যার। আমি দুর্জয় সেন বলছি। প্রগতি ময়দান থানার অফিসার।”
“হ্যাঁ, দুর্জয় বলুন? এই সময়ে ফোন করলেন? কোনো সমস্যা?”
“না মানে, একটা প্রবলেমে পড়েছি।”
“আপনার ওই কেসটা নিয়ে কী?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“আমি কেসটার বিষয়ে জয়েন্ট কমিশনার সাহেবের থেকে শুনেছি। খবু ভালো কাজ করছেন তো আপনি। সাহেব আপনার খুব প্রশংসা করছিলেন। এখন কী সমস্যা হয়েছে?”
কথায় কথায় দুর্জয় সমস্যাটা ভালো করে বুঝিয়ে বললেন অভিরাজ সেনকে। কথাটা শুনেই কিছু একটা ভাবলেন অভিরাজ। তারপরে বললেন, “আরে এটা নিয়ে এত ভাবার কী আছে। একটা কথা মনে রাখবেন, কোনো কেসের তদন্ত করতে নেমে কখনোই প্রি-কনসিভ আইডিয়া নিয়ে কাজ করবেন না। মনটাকে খোলা রাখবেন। এমনটা তো হতেই পারে, দীপশিখার খুনটা যে করেছে সে আগের কেসটার বিষয়ে অনেককিছুই জানে বা খবর রেখেছে। তারপরে এই কেসে ওই ইনফরমেশনটা ইউজ করে পুলিশকে বোকা বানানোর চেষ্টা করছে। দীপশিখা মার্ডার কেসের ট্যাক্সিটা পেলেই ‘দুধ কা দুধ, পানি কা পানি’ হয়ে যাবে। দেখবেন, দুটো ট্যাক্সির নাম্বার প্লেট এক হলেও গাড়ি দুটোর ইঞ্জিন নাম্বার আর চেসিস নাম্বারগুলো আলাদা।”
“তাহলে কী এই কেসে এমন কেউ যুক্ত থাকতে পারে যে আগের কেসটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছে?”
“হতেও পারে। আবার নাও হতে পারে। কারণ, আগের কেসটা যখন হয়েছিল তখন খবরের কাগজে কেসের খবরগুলো ধারাবাহিকভাবে বেরোত। তাই গাড়ির নাম্বারটা জেনে নিয়ে ফেক নাম্বার-প্লেট যে কেউ বের করে নিতে পারে। কিন্তু আমি ভাবছি অন্য একটা কথা?”
“কী কথা স্যার?”
“শুধু শুধু আগের কেসের রেফারেন্সটা টেনে এনে অপরাধীর লাভ কী?”
“আমার মনে হচ্ছে, আগের কেসের সঙ্গে এই কেসের কোনো যোগাযোগ আছে। তাই….”
“হতেই পারে। আবার নাও হতে পারে। কারণ, অপরাধী হয়তো ভেবেছিল, পুরোনো ইউজড নাম্বার-প্লেট ব্যবহার করলে পুলিশকে বোকা বানানো যাবে। সহজেই নাম্বারটা ট্র্যাক করতে পারবে না পুলিশ। তাছাড়া, এমনটাও হতে পারে, অপরাধী কতকটা ইচ্ছে করেই এই কাজটা করেছে যাতে পুলিশি তদন্তটা আগের কেসের দিকে ঠেলে দেওয়া যায় এবং ধরা পড়লে বড়োসড়ো একটা অ্যালিবাই খাড়া করা যায়।”
“তাহলে আমি এখন কী করব স্যার?”
“আপনি যে পথে তদন্তটা করছিলেন, সেই পথেই থাকুন। সেখান থেকে কোনোভাবেই সরবেন না।”
অভিরাজের সঙ্গে কথা শেষ করে ফোনটা রেখেই নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন দুর্জয় সেন।
(সম্পর্কের টানাপড়েন)
৫৩ মানসী রোড, পাটুলি, কলকাতা
রাত ১০টা ৩০, ১৭ জুলাই
সিঁড়ি দিয়ে উঠেই দোতলায় রাজীব দত্তের ফ্ল্যাট। এলাকাটা রীতিমতো পস। বাড়িতে বয়স্ক বাবা, মা ছাড়া আর কেউ নেই। বিয়ে-থা করেননি। বসার ঘরটি বেশ প্রশস্ত। গতানুগতিক সোফার বদলে কাঠের আসবাবপত্র ছড়ানো ছিটোনো আছে গোটা ঘরে। একটি কারুকাজ করা কাঠের প্যানেল আড়াআড়ি রাখা। দেওয়ালে ছোটোবড়ো ছবি দিয়ে একটা কোলাজ বানিয়ে টাঙানো। টেবিলে বিভিন্ন বিষয়ের বই থরে থরে সাজানো। ঘরের কোণে দুটো ইন্ডোর প্ল্যান্ট রাখা। সুরুচি আর স্বচ্ছলার ছাপ সর্বত্র। এত রাতে রাজীববাবুর সঙ্গে কথা বলার জন্য সেই ব্য।।।কপুর থেকে ছুটে এসেছেন দুর্জয় আর শৈবাল। যদিও এ ব্যাপারে কোনো আপত্তি জানাননি রাজীব দত্ত। ফোনে যখন ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে জিজ্ঞাসাবাদের কথাটা ওকে বলেন দুর্জয় তখন হাসি মুখেই রাজি হয়ে গিয়েছিলেন তিনি। এও বলেছিলেন, দীপশিখা ওঁর খুব কাছের একজন বন্ধু ছিল। তাই, উনিও চান যাতে অপরাধী দ্রুত গ্রেফতার হোক। ডিনার শেষ করে বাইরে বসার ঘরে এসে বসেছেন রাজীববাবু। শান্ত মানুষ। চোখমুখ দেখেই ওঁর রুচি, শিক্ষা সম্পর্কে সম্যক ধারণা হচ্ছে দুর্জয়ের। শুরু হল জিজ্ঞসাবাদ পর্ব।
“বলুন কী জানতে চান?”
“কবে থেকে আপনাদের পরিচয়?”
“বিয়ের পরেই দীপশিখা আমাদের কোম্পানিতে জয়েন করে। তারপর থেকেই ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্কটা গভীর হতে শুরু করে। খুবই ভালো মনের মেয়ে ছিল দীপশিখা।”
“কতটা গভীর ছিল আপনাদের এই সম্পর্কটা?”
“দু-জন ভালো বন্ধুর মধ্যে যেমনটা হয়।”
“দীপশিখা, অফিসে আপনি ছাড়া আর কাদের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করতেন।’
“অনেকই আছেন। পিয়া দাস, দর্শনা ঘোষাল, সুপর্ণা বসু, সোমজা সরকার, এঁদের সবার সঙ্গেই দীপশিখার ভালো সম্পর্ক ছিল। যদিও ও খুব একটা মিশুকে স্বভাবের ছিল না। খুব একটা কথাও বলত না।”
“আপনি কোনোদিন দীপশিখাদেবীর বাড়িতে গিয়েছিলেন?”
“না। আমি যেতে চেয়েছিলাম, কিন্তু ও-ই যেতে না করেছিল। ওর স্বামী একটা সময়ে পুলিশে কাজ করত। শুনেছি কোনো একটা কেসে ফেঁসে গিয়ে চাকরিটা গেছে। খুবই সন্দেহপ্রবণ লোক। তাই দীপশিখা চাইত না যে আমি ওর বাড়িতে যাই, ওর স্বামীর সঙ্গে আলাপ করি।”
“দেবব্রত পাল অর্থাৎ দীপশিখাদেবীর স্বামী আপনাদের এই সম্পর্কটার বিষয়ে কিছু জানতেন?”
“হ্যাঁ, জানত। দীপশিখাই ওকে বলেছিল। কিন্তু ও ভাবত আমাদের মধ্যে অন্যরকমের কোনো সম্পর্ক আছে।”
“দেবব্রতবাবুর এই ভাবনাটা কী একেবারেই অমূলক ছিল?”
দুর্জয়ের প্রশ্নের প্যাঁচটা বুঝতে পেরে কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকলেন রাজীব দত্ত। ওঁকে চুপ করে থাকতে দেখে দুর্জয় ফের জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কী কোনোদিনই দীপশিখা পালকে প্রপোজ করেননি?”
“মিথ্যে বলব না, স্যার। একবার করেছিলাম। দীপশিখা প্রত্যাখ্যানও করেছিল। বিশ্বাস করুন, তার পরেই আমাদের বন্ধুত্বটা আরও গভীর হয়।”
“আপনাদের মধ্যে এই বিষয়টা নিয়ে একবার ঝামেলাও তো হয়েছিল, সবার সামনে?”
“সেরকম কিছু নয়, স্যার। এরকম ছোটোখাটো ঘটনা তো আকচার ঘটে।”
“ঘটনাটা ছোটোখাটো হলে কী আর সেই কথাটা আমার কান পর্যন্ত এসে পৌঁছোত?”
উত্তর না দিয়ে কেমন যেন থম মেরে গেলেন রাজীব। মাথাটা নামিয়ে কিছু একটা ভাবতে থাকলেন। এদিকে দেখতে দেখতে অনেকটা রাত হয়ে গেল। বাইরের ঘন অন্ধকারটা ছনছনিয়ে উঠল। এলাকাটা শহরের মধ্যে হলে হবে কী, এদিকটা রাতের দিকে বেশ নিরিবিলি।
প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে রাজীববাবুর দিকে তাকিয়ে দুর্জয় জিজ্ঞেস করলেন, “সেদিন রাতে ঠিক কী কী হয়েছিল?”
“সেদিন রাতের দিকে আমাদের একটা আর্জেণ্ট মিটিং ছিল। মিটিংটা শেষ হতে হতে অনেকটাই রাত হয়ে যায়। আমিই দীপশিখাকে একটা ট্যাক্সি ধরে দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, বাড়িতে পৌঁছে আমাকে ফোন করে জানাতে। অনেক রাত হয়ে যাওয়ার পরেও যখন দীপশিখার কোনো কল এল না, তখন আমি নিজেই ওর ফোনে কল করার চেষ্টা করি। কিন্তু ফোনটা সুইচড অফ পাই।”
“দীপশিখাদেবী ঠিক কখন ট্যাক্সিতে উঠেছিলেন আর কখনই-বা আপনি ওঁকে ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন?”
“ওইভাবে সময়টা বলাটা একটু ডিফিকাল্ট। তবে রাত প্রায় দুটো নাগাদ দীপশিখা ট্যাক্সিতে উঠেছিল। আর আমি ওকে ফোন করি প্রায় চারটে নাগাদ।”
“অফিস থেকে আপনার বাড়ি তো কাছেই। তাহলে ভোর চারটে পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপরে দীপশিখাকে ফোনটা করলেন কেন? আপনার তো আরও আগেই ওঁকে ফোন করে খোঁজ নেওয়া উচিত ছিল। তাছাড়া অত রাত পর্যন্ত না ঘুমিয়ে আপনিই বা কী করছিলেন?”
“না মানে, সেদিন রাতে খুব বৃষ্টি পড়ছিল। বাড়িতে এসে ফ্রেশ হয়ে ডিনার করে অফিসের কাজ নিয়ে বসেছিলাম। তারপরে যখন দেখলাম, দীপশিখার কোনো ফোন আসছে না, তখনই ওকে ফোনে ধরার চেষ্টা করি। তাছাড়া এরকম অনেক দিনই হয়েছে যখন অনেক রাত করে দীপশিখা ক্যাব ধরে বাড়ি গেছে।”
“বুঝলাম। আর একটা কথা বলুন তো, রাতের দিকে আপনাদের অফিস সংলগ্ন এলাকায় কী হলুদ ট্যাক্সি পাওয়া যায়?”
“না স্যার। একদমই পাওয়া যায় না। রাতে বাড়িতে ফেরার একমাত্র উপায় হল ক্যাব। কিন্তু না জানি কেন সেদিনই ওই বৃষ্টির মধ্যেও আচমকা একটা হলুদ ট্যাক্সি এসে হাজির হল। আমরাও হাতে একটা চাঁদ পেয়েছি ভেবে এগিয়ে গেলাম। তখন যদি বুঝতাম…।”
কথার ফাঁকে পাশে বসে থাকা শৈবাল রায়, রাজীব দত্তের থেকে ওঁর মোবাইল নাম্বার, অফিসের ডিটেলস, অফিস কলিগদের ডিটেলস নিয়ে নিলেন।
“কালে কালে তো অনেকটাই বেলা হল, তাও বিয়ে করেননি কেন?”
“কী হবে বিয়ে করে? ওইসব বন্ধনে জড়াতে ইচ্ছে করে না।”
“শুনেছি, দীপশিখাদেবী ওঁর মনের কথা আপনার সঙ্গে শেয়ার করতেন?”
“হ্যাঁ। নিজের মনের কথা দীপশিখা আমাকেই বলত। খুব কষ্ট ছিল ওর। বাড়িতে একটুও শাস্তি ছিল না। দিনরাত বরটা খিটখিট করত। দীপুর জীবনটাকে একেবারে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল লোকটা। একটা ক্রিমিনাল।”
“ওঁকে ক্রিমিনাল বলছেন কেন?”
দুর্জয়ের প্রশ্নটা শুনেই রাজীব দত্তের চোখমুখের ভাবটা নিমেষে পালটে গেল। চোয়ালটা শক্ত হয়ে উঠল।
(ট্যাক্সিটা গেল কোথায়? )
প্রগতি ময়দান থানা, কলকাতা
রাত ১১টা ৩০, ১৭ জুলাই
ইতিমধ্যেই আরও কয়েকটি খবর অফিসার শৌভিকের কাছে এসে পৌঁছেছে। ট্যাক্সিটাকে এখনও ট্রেস করা যায়নি। তবে খোঁজখবর নেওয়া চলছে। ঘটনাস্থলের সিসি ক্যামেরা থেকে যে ফুটেজ পাওয়া গেছে তাতে ওই ট্যাক্সি ড্রাইভারের মুখটা ক্লিয়ারলি বোঝা না গেলেও ড্রাইভারের অবয়ব এবং পড়ে থাকা জামাকাপড় থেকে কিছুটা আন্দাজ করা গেছে। শুধু তাই নয়, ‘সিন অফ ক্রাইম’ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরে ওই ট্যাক্সিটার মুভমেন্টগুলো ফিক্সআপ করা গেছে। ট্যাক্সিটা সেদিন কোথায় কোথায় ঘুরেছিল, কোথায় কতক্ষণ থেমেছিল সেগুলো ইতিমধ্যেই বাকি সিসি ক্যামেরাগুলোর ফুটেজ থেকে ক্লিয়ারলি বোঝা গেছে। ট্যাক্সিটা পাটুলি থেকে বাইপাস ধরে সোজা সেক্টর ফাইভে যায়। সেখান থেকে নিউটাউন। তারপরে রাজারহাট। এর পরে ট্যাক্সিটাকে আর ট্রেস করা যায়নি। ‘সিন অফ ক্রাইম’ থেকে লাস্ট ট্রেসড লোকেশন পর্যন্ত ওই ট্যাক্সিটা মোট তিনবার রাস্তায় থেমেছিল। একবার সেক্টর ফাইভে। বাকি দুইবার নিউটাউনে। তবে কোনো বার-ই ড্রাইভারকে ট্যাক্সির বাইরে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়নি। প্রথমবার ট্যাক্সিটা সেক্টর ফাইভে একটা রোড সাইড টি-স্টলে গিয়ে দাঁড়ায়। স্টলের একজন স্টাফ এগিয়ে এসে একটা চায়ের কাপ গাড়ির মধ্যে বসে থাকা ড্রাইভারের সিটের দিকে এগিয়ে দেয়। এরপরে নিউটাউনে গিয়ে আরও দুইবার ট্যাক্সিটা থামে। তবে সেই সময়ে ড্রাইভারের কোনো অ্যাক্টিভিটি সেভাবে সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি। সুতরাং একমাত্র টি-স্টলের ওই স্টাফ ছাড়া আর কেউ ড্রাইভারকে সামনাসামনি দেখেনি বলেই মনে করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরও একটা ডেভলপমেন্ট হয়েছে এই কেসে। ২০২০ সালের সেই কেস ডায়েরি কোর্টের পাবলিক প্রসিকিউটারের অফিস থেকে বের করে আনা হয়েছে। যদিও কোর্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তাও স্পেশাল পারমিশন করিয়ে রাতের বেলা অফিস খুলিয়ে ধুলো ঘেঁটে বের করে আনা হয়েছে কেস ডায়েরি। তাছাড়া, এর পাশাপাশি ভিক্টিমের কল ডিটেলস ঘেঁটে দেখা গেল, দীপশিখা ধর্মতলায় একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চেম্বারে মাঝে মাঝে যেতেন এবং ওঁর সঙ্গে ফোনেও কথা বলতেন। ডঃ শর্বাণী বাসুর চেম্বার ধর্মতলায়, কে সি দাসের দোকানের পাশে। দুর্জয়কে ফোনে ধরলেন শৌভিক।
“হ্যাঁ, শৌভিক বলুন?”
“কয়েকটা বড়োসড়ো ডেভলপমেন্ট হয়েছে। তাই আপনাকে সেগুলো জানাতে ফোন করলাম।”
ডিটেলসে সবকিছু জানাতেই উত্তেজিত হয়ে পড়লেন দুর্জয়। তারপরে নিজেকে সামলে নিয়ে গলা নামিয়ে বললেন, “ওয়েল ডান। কেসটা ওপেন করতে হলে একটা এন্ড দিয়ে পেনিট্রেট করলে হবে না। দুটো এন্ড দিয়েই আমাদেরকে এগোতে হবে। আমি ভিক্টিম ধরে এগোচ্ছি। আপনি ট্যাক্সিটা ধরে একটু একটু করে তদন্তটা এগিয়ে নিয়ে যান। আর, টাইম-টু-টাইম ডেভলপমেন্টগুলো আমাকে জানাতে থাকুন। এখন খুব দ্রুত কয়েকটা কাজ করে আমাকে ফিডব্যাক দিন। প্রথমতঃ পুলিশের আর্টিস্টকে দিয়ে ওই টি-স্টল স্টাফের বয়ান অনুসারে ট্যাক্সি ড্রাইভারের একটা ছবি আঁকান, দ্বিতীয়তঃ ২০২০ সালের কেসের ডায়েরিটা ভালো করে খুঁটিয়ে পড়ে আমাকে ডিটেলসে জানান। দেখুন, ওই কেসের সঙ্গে আমাদের এই কেসের কোনো যোগসূত্র আছে কী না। তৃতীয়তঃ ডঃ বাসুর সম্বন্ধে ডিটেলস ইনফরমেশন বের করুন। দরকার হলে ওঁর চেম্বারের আশেপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ জোগাড় করে দেখুন, শেষ কবে দীপশিখাদেবী ওখানে গিয়েছিলেন? একাই কী ওখানে গিয়েছিলেন, নাকি দীপশিখার সঙ্গে আরও কেউ ছিল?”
মন দিয়ে কথাটা শুনে ‘ইয়েস’ বলে ফোনের লাইনটা কেটে দিলেন শৌভিক। মাথায় চিন্তার পাহাড় এসে জমতে শুরু করল। যে কাজগুলো করতে হবে সেগুলো যথেষ্ট কঠিন এবং টাইম-টেকিং। এত অল্প সময়ের মধ্যে কাজগুলো করবেন কীভাবে? খুব পাজেল্ড লাগতে শুরু করল নিজেকে।
(ব্লেম গেম)
৫৩ মানসী রোড, পাটুলি, কলকাতা
রাত ১১টা ৪৫, ১৭ জুলাই
রাজীব দত্তের ফ্ল্যাটে বসে ওঁকে জেরা করে চলেছেন
দুর্জয় সেন। রাজীববাবুর চোখ দিয়ে দেখে নিতে চাইছেন, দীপশিখা এবং ওঁর স্বামী দেবব্রত পালকে। আসলে যে-কোনো মার্ডার কেসের তদন্তে ভিক্টিম প্রোফাইলিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা বিষয়। এটা একদিকে যেমন খুনের মোটিভগুলোকে খুঁজে পেতে একজন তদন্তকারী অফিসারকে সাহায্য করে, ঠিক তেমনই অন্যদিকে সম্ভাব্য সাস্পেক্ট ঠিক কারা কারা হতে পারে, সেটাও বুঝতে অনেকটাই হেল্প করে।
“কেন আপনার বার বার মনে হচ্ছে, দীপশিখা পালের খুনের ঘটনায় ওঁর স্বামী জড়িত থাকতে পারেন?”
“আমি শিওর, ও-ই খুনটা করেছে বা কাউকে দিয়ে করিয়েছে।”
“দেখুন ধারণা দিয়ে কিছু হয় না। তাই যা বলবেন ভেবে বলবেন।”
“দেখুন স্যার, দেবব্রত এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ারে জড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু দীপশিখা যেহেতু ওকে কিছুতেই ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিল না, তাই ও অনেকটাই ডেসপারেট হয়ে পড়েছিল।”
“হোয়াট! কী বলছেন কী?” বিস্মিত হলেন দুর্জয়।
“যা বলছি একদম সত্যি কথা বলছি স্যার। রত্না সামন্ত বলে একজন মহিলার সঙ্গে দেবব্রতর সম্পর্ক ছিল। বিগত প্রায় ছয় মাস ধরে ওরা মেলামেশা করছিল। এটা নিয়ে দীপশিখার সঙ্গে দেবব্রতর ঝগড়াঝাঁটিও হয়েছিল। এইসব কথা আমি দীপশিখার থেকেই জানতে পারি। আপনি একটু খোঁজখবর করলেই সবকিছু জানতে পারবেন।”
রাজীববাবুর কথাটা শুনেই পাশে বসে থাকা শৈবাল রায়ের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশার করলেন দুর্জয় সেন। মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন শৈবালবাবুও। নিজেদের মধ্যে গলা নামিয়ে কিছুক্ষণ কথাও বলে নিলেন দুর্জয় এবং শৈবাল। তারপরে রাজীব দত্তের সঙ্গে আরও কিছুক্ষণ কথা বলে ওঁর ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এলেন। বাইরে বেরিয়ে এসে শৈবাল, দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী বুঝছেন স্যার? এ তো ব্লেম গেম চলছে মনে হচ্ছে। দেবব্রতবাবু এবং রাজীব দত্ত একে অন্যকে ব্লেম করছেন। আসলে কাজটা কার, সেটাই তো বোঝা যাচ্ছে না। “ মুচকি হেসে দুর্জয় উত্তর দিলেন, “সবে তো খেলা শুরু হয়েছে। ধীরে ধীরে দেখুন না, কী হয়। পুলিশে ‘চাইনিজ হুইস্পার’ বলে একটা কথা আছে, জানেন?”
“না, জানি না। সেটা আবার কী?”
“এটা হল, এক ধরনের গেম যেখানে কোনো একটা পারটিকুলার মেসেজ বা ইনফরমেশন একজনের থেকে চুপিচুপি অন্যজনের কাছে যায়। এইভাবে ওই মেসেজটা এগিয়ে চলে। শেষে গিয়ে দেখা যায় যে, ওই আসল মেসেজটা বা ইনফরমেশনটা ডিসটরটেড হয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রথম মানুষটির কাছে যে মেসেজটা ছিল সেটা অনেকটাই পরিবর্তিত হয়ে শেষ মানুষটার কাছে গিয়ে পৌঁছায়। তাই, মুখের কথায় বিশ্বাস না করে আমাদের তথ্যপ্রমাণ নির্ভর ইনফরমেশনের ওপরেই ভরসা করতে হবে।”
“তাহলে আমরা এখন কী করব?”
“এখন আর কিছু করার নেই। অনেকটাই রাত হয়েছে। এখন আর কারওর বাড়ি গিয়ে লাভ নেই। চলুন, থানায় ফেরা যাক।”
কথাটা বলেই বিল্ডিং-এর সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা গাড়িটায় উঠে বসলেন দুর্জয় সেন। ওঁকে ফলো করে গাড়িতে উঠলেন শৈবাল রায়ও। গাড়িটা ছুটে চলল কলকাতার দিকে।
