দ্য আল্টিমেট ট্রুথ – ১৫
(ছোট্ট একটা টিপ)
সেক্টর ফাইভ, কলকাতা
সকাল ১০টা ৩০, ১৮ জুলাই
কলেজ মোড়ের ঠিক পাশেই রাস্তার ধারে ছোট্ট একটা টি-স্টল। নাম ‘অমিয়-র চায়ের দোকান’। সকাল সকাল সেখানেই পৌঁছে গেলেন অফিসার শৌভিক সেনগুপ্ত আর পুলিশ আর্টিস্ট দীপঙ্কর। এর আগেও অনেক কেসে ভিক্টিম এবং অ্যাকিউজড আইডেন্টিফিকেশনে দীপঙ্করের আঁকা ছবি অনেকটাই সাহায্য করেছে। কলকাতা পুলিশ মহলে বেশ নামডাক আছে ওঁর। সাক্ষীর বিবরণ শুনে অপরাধী বা সাস্পেক্টের ছবি এঁকে দেওয়ার রীতি পুলিশে নতুন কিছু নয়। এই পদ্ধতির নাম, পোর্ট্রেট-পার্লে। উনিশ শতকের শেষের দিকে আলফোনসে বার্টিলন বলে একজন এই পদ্ধতির আবিস্কার করেন। যা-ই হোক, চায়ের দোকানে পৌঁছে শৌভিক দেখলেন, বেশ কয়েকজন পথচলতি মানুষ ভিড় জমিয়েছেন দোকানে। দোকান মালিক অমিয় হালদার নিজেই দোকান চালাচ্ছেন। কোনো কর্মচারী নেই। নিজেই বাসন ধুয়ে, স্টোভে তেল ভরে জ্বালিয়ে তার ওপরে জল ভরতি বাটি বসিয়ে চা বানাচ্ছেন। মাঝে মাঝে আবার কাস্টমারদের সঙ্গে টুকটাক কথাও বলছেন। অমিয়কে আগে থেকে না চিনলেও সিসি ফুটেজ থেকে আগেই ওঁর ছবিটা দেখে নিয়ে ছিলেন শৌভিক। তাই, অমিয়কে সামনাসামনি চিনে নিতে একটুও অসুবিধা হল না। এগিয়ে গিয়ে নিজের পরিচয় দিলেন। ছোটো করে বিষয়টা ব্রিফ করতেই অমিয় বললেন, “একটু অপেক্ষা করতে হবে, স্যার। হাতের কাস্টমারগুলোকে ছেড়ে দিই। তারপরে আপনাদের নিয়ে না হয় বসব।” কথাটা শুনে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানিয়ে দোকানের বাইরে রাখা কাঠের বেঞ্চের ওপরে গিয়ে বসলেন শৌভিক আর দীপঙ্কর। দেখতে দেখতে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। একটু পরে হাতের কাজ শেষ করে ওঁদের সামনে এসে দাঁড়ালেন অমিয়। শৌভিককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “বলুন স্যার। ঠিক কী জানতে চাইছেন?” ছোটোখাটো চেহারার অমিয়কে দেখেই ওঁর সারল্যের পেছনে লুকিয়ে থাকা খাঁটি ভালোমানুষের রূপটা বুঝে নিতে একটুও দেরি হল না শৌভিকের।
ছোটো করে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বললেন শৌভিক। তারপরে নিজের মোবাইলে কপি করে আনা ফুটেজের ওই অংশটুকু দেখিয়ে অমিয়র দিকে তাকিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন, “এই ট্যাক্সি ড্রাইভারকে আপনি চেনেন?’
কিছুক্ষণ ভেবে অমিয় বললেন, “লোকটা মাঝে মাঝে এদিকে আসত। এদিকে এলেই আমার দোকানে এসে চা খেত। সেদিন সকালেও এসেছিল। গাড়ি থেকে নামেনি। আমিই তো এগিয়ে গিয়ে চা দিলাম। আমাকে একটা দশ টাকার কয়েন দিল। তারপরে চা খেয়ে চলে গেল।”
“কী নাম ওই লোকটির? কোথায় থাকে?”
“সেটা বলতে পারব না, স্যার। কোনো কাস্টমারের নাম তো জিজ্ঞেস করি না। তাই বলতে পারব না।”
“কিন্তু আপনিই তো বললেন, লোকটি আপনার দোকানে মাঝে মাঝে আসত। কখনও অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কথা হয়নি?”
কিছু একটা ভাবলেন অমিয়। তারপরে বললেন, “না স্যার। তবে…”
“তবে কী? এটা কিন্তু মার্ডার কেস। তাই কিছু লুকাবেন না। যেটুকু জানেন বলে ফেলুন।”
“জানি। গতকাল থেকেই সব নিউজ চ্যানেলেই তো খবরটা দেখাচ্ছে। মোবাইলে দেখছি তো।”
“আপনি সাহায্য না করলে আমরা কেমন করে আসল অপরাধীকে ধরব? পুলিশ তো আর হাত গুণতে পারে না?” অনেকক্ষণ ভাবলেন অমিয়। তারপর মাথা চুলকে অমিয় বললেন, “একটা উপায় আছে। আমি আপনাকে একজনের কথা বলতে পারি, যার থেকে আপনি ওই ড্রাইভারের কথা জানতে পারবেন।”
(মনের রোগ)
ডঃ বাসুর চেম্বার, ধর্মতলা, কলকাতা
দুপুর ১২টা, ১৮ জুলাই
বেশ পরিপাটি করে সাজানো গোছানো চেম্বার। ধর্মতলার মোড়ে দোতলায় অবস্থিত এই চেম্বারটিতে রোজ দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ডঃ বাসু বসেন। যদিও চেম্বারের ভিড় দেখে ওঁর পসার কেমন সেটা বোঝার উপায় নেই। কারণ, মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের চেম্বারের কখনোই খুব বেশি ভিড় হয় না। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ডান দিকে পর পর দুটো ঘর। প্রথম ঘরে রিশেপশন। দ্বিতীয় ঘরে ডঃ বাসু বসেন। দুটো ঘরই শীততাপ নিয়ন্ত্রিত। দুর্জয় সেন, লেডি অফিসার বিজয়া পালকে নিয়ে এসেছেন। দুর্জয় রিসেপশনে বসে থাকা মাঝবয়সী ভদ্রমহিলার দিকে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমরা প্রগতি ময়দান থানার অফিসার। একটা কেসের ব্যাপারে কথা বলতে এখানে এসেছি। ডঃ বাসুর সঙ্গে দেখা করব। একটু ব্যবস্থা করে দিন প্লিজ।”
দুর্জয়দের আপাদমস্তক ভালো করে দেখে কাকে যেন ফোন করে কিছুক্ষণ কথা বললেন ওই ভদ্রমহিলা। তারপরে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ম্যাডাম আসছেন। আমি ওঁকে আপনাদের কথা বলেছি। উনি আপনাদের একটু বসতে বলেছেন।”
কথা শেষ করে ঘরের একটা কোণায় থাকা সোফার ওপরে গিয়ে বসে পড়লেন দুর্জয় এবং বিজয়া। চেম্বারটা ছোটো হলে কী হবে, খুব যত্ন করে সাজানো। ফলস সিলিং, প্যানেল লাইট, দুটো এক টনের এসি মেশিন, ওয়াল পেপার দিয়ে দারুণভাবে সাজানো ঘরটি। রিশেপশনে বসা মহিলার সামনে একটা ল্যাপটপ রয়েছে। মহিলা মাঝবয়সী হলে কী হবে, এক কালে যে উনি বেশ সুন্দরী ছিলেন সেটা ওঁকে দেখলেই বোঝা যাচ্ছে। দেখতে দেখতে বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। রিশেপশনে বসেই নিজের মোবাইলে নিউজ ফিডগুলো দেখছিলেন দুর্জয়। দীপশিখার কেসটা নিয়ে ছোটোবড়ো সব চ্যানেলগুলোই কমবেশি খবর করছে। ‘এখনও অপরাধী অধরা’, এটা নিয়েই পুলিশের বাপবাপান্ত করছে সবাই। কেউ আবার পুলিশের সঙ্গে সরকারের যোগসাজশ বের করে পুরো ঘটনাটার পেছনে সরকারের হাত খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ এদিক ওদিকের খবরগুলো স্ক্রল করে মোবাইলটা বন্ধ করে রাখলেন দুর্জয়। “স্যার, ম্যাডাম এসেছেন। আপনাদের ভেতরে ডাকছেন।” সামনে বসে থাকা মহিলার কথায় চটকা ভাঙল দুর্জয়ের। নড়েচড়ে উঠলেন তিনি। তারপরে মোবাইলটা পকেটে রেখে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে পাশের ঘরের দিকে চলে গেলেন। ওঁকে ফলো করে এগিয়ে গেলেন লেডি অফিসার বিজয়া পাল।
“আসতে পারি?” ঘরে প্রবেশ করতে করতে ভেতরে বসে থাকা ডঃ বাসুকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করলেন দুর্জয় সেন।
“হ্যাঁ, আসুন।” শান্ত গলায় উত্তর দিলেন ডঃ শর্বাণী বাসু। ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে পাশাপাশি দুটো চেয়ারে বসলেন দুর্জয় আর বিজয়া। ঘরে খুব একটা আসবাবপত্র নেই। বেশ ছিমছাম করে সাজানো। দেওয়ালের রংটাও লাইট কালারের। ঘরের ঠিক মাঝ বরাবর একটা বড়ো টেবিল। দুর্জয়দের দিকে দুটোই মাত্র চেয়ার। টেবিলের অন্য পাশে আরও একটা চেয়ার, যার ওপরে ডঃ বাসু বসে আছেন। টেবিলের পাশে বেশ কিছু ইংরেজি বই সাজানো। ওদিকে একবার চোখটা বুলিয়ে নিলেন দুর্জয়। ডঃ বাসুর বয়স পঞ্চাশের কোঠায়। চেহারাছবি দেখে ওঁর পারসোনালিটি সম্পর্কে স্বচ্ছ একটা ধারণা তৈরি করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ বলতে ঠিক যা বোঝায়, তেমনটাই ওঁর কমপ্লেক্সশন। বসে থাকার জন্য হাইট ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে শরীরের গড়নের সঙ্গে তা বেশ মানানসই বলেই মনে হল দুর্জয়ের। কাউকে জিজ্ঞাসবাদ করার আগে তাঁর সবকিছু খুঁটিয়ে দেখে, বুঝে নেওয়াটা দুর্জয়ের অনেকদিনের বদ স্বভাব। পরিচয় পর্ব শেষে আর একটুও সময় নষ্ট না করে মূল বিষয়ে প্রবেশ করলেন দুর্জয় সেন।
“দীপশিখা পালের মৃত্যু-সংবাদটা কখন, কীভাবে পেলেন?”
“নিউজ চ্যানেল থেকেই জানতে পেরেছি।”
“দীপশিখাদেবী কতদিন ধরে আপনার পেশেন্ট?”
“তা প্রায় মাস ছয়েক হবে। রাজীব দত্তই ওঁকে আমার কাছে নিয়ে এসেছিলেন।”
“রাজীববাবুকে আপনি আগে থেকেই কি চিনতেন?”
“হ্যাঁ। আগে ও-ই আমার পেশেন্ট ছিল। কাউন্সিলিং আর আমার প্রেস্ক্রাইব করা মেডিসিন খেয়ে রাজীব এখন অনেকটাই ভালো আছে।”
কথাটা শুনেই যেন একটা ধাক্কা খেলেন দুর্জয়। রাজীব দত্ত মানসিক রোগী ছিলেন। বিস্ময় কাটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ধরনের রোগ ছিল ওঁর?”
“রাজীবের বাইপোলার ডিসঅর্ডার ছিল। যদিও এখন উনি রোগটা অনেকটাই কাটিয়ে উঠেছেন। এই ধরনের পেশেন্টদের সারাটা জীবন স্ট্রিক্ট মেডিকেশনের মধ্যে থাকতে হয়।”
“এই রোগের সাধারণ লক্ষ্মণগুলো কী কী?”
“বাইপোলার ডিসঅর্ডার বা ম্যানিক ডিপ্রেশন মনের এমন এক অবস্থা যেখানে এই রোগে আক্রান্ত মানুষদের মধ্যে প্রবল ভাবে মুড-সুইং দেখা যায়। যার ফলে পেশেন্টদের মধ্যে একই সঙ্গে হাইপোম্যানিয়া অর্থাৎ ইমোশনাল আউট বার্স্ট এবং ডিপ্রেশন দেখা যায়। তাছাড়া, এই ধরনের রোগীদের এনার্জি লেভেলেও আপ-ডাউন অতিরিক্ত পরিমাণে দেখা যায়।”
“এই রোগে আক্রান্ত কোনো পেশেন্ট নর্মাল লাইফ লিড করতে পারেন?”
“না করার তো কোনো কারণ নেই। তবে কন্সট্যান্ট মেডিকেশনে থাকতে হবে।”
“আর দীপশিখাদেবীর কী প্রবলেম ছিল?”
“এই কথাগুলো যদিও সিক্রেট রাখা উচিত। বাইরের কারওর সঙ্গে কখনোই শেয়ার করা উচিত নয়। তাও আমি কথাগুলো আপনাকে বলছি। কারণ, আমিও চাই আসল অপরাধী ধরা পড়ুক। এই ধরনের জঘন্য অপরাধকে কখনোই বাড়তে দেওয়া যায় না। দীপশিখা ক্রনিক ডিপ্রেশনের পেশেন্ট ছিলেন। রোগটা ওর মধ্যে আগে থেকেই ছিল। কিন্তু ডরম্যান্ট অবস্থায় ছিল। বিয়ের পরে স্বামীর ব্যবহারের কারণে রোগটা আবার অ্যাক্টিভ হয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।”
“আপনি তো সাইকায়াট্রিতে এমডি করেছেন?” ইচ্ছে করেই প্রসঙ্গটা ঘুরিয়ে দিলেন দুর্জয়। ডঃ বাসুকে একবার ভালো করে বাজিয়ে নিতে চাইছেন দুর্জয়।
“হ্যাঁ। কেন বলুন তো? আপনি কী আমার যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন?”
“না না ম্যাডাম। কী যে বলেন! আমি এমনিই জিজ্ঞেস করছি। আসলে এইসব বিষয়ে আমার আবার নলেজটা একটু কম। তাই, সবকিছু জেনে-বুঝে নিচ্ছি।”
কথা বলতে বলতে দুর্জয় অনুভব করলেন পকেটে সাইলেন্ট করে রাখা মোবাইল ফোনটা গোঁ গোঁ করছে। বের করে দেখলেন, শৌভিক কল করেছেন।
(খোঁজ চলছে)
সেক্টর ফাইভ, কলকাতা
দুপুর ১২টা ৩০, ১৮ জুলাই
অমিয়’র সঙ্গে কথোপকথনের নির্যাসটুকু দুর্জয়কে ডিটোল জানিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন শৌভিক। অমিয় এমন একজনের ডিটেলস শৌভিককে জানিয়েছে যার কাছে গেলে ওই ট্যাক্সি ড্রাইভার সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া যাবে। রাজারহাটের দিকে লোকটার একটা গ্যারেজ আছে। আর এটা শুনে অনেকটাই আশাবাদী হয়ে পড়েছেন শৌভিক কারণ, হলুদ ট্যাক্সিটাকে শেষবারের মতো রাজারহাটের কাছেই ট্রেস করা গিয়েছিল। দীপঙ্করের আঁকা ওই ট্যাক্সি ড্রাইভারের ছবিটাও মেসেজ করে দুর্জয়কে পাঠিয়ে দিলেন শৌভিক। ছবিটা দেখে এবং সবকথা শুনে দুর্জয় বললেন, “অমিয়-র কথা বিশ্বাস করা যায় তো?”
“হ্যাঁ, করাই যায়। লোকাল সোর্সও কনফার্ম করেছে, ছেলেটা জেনুইন।”
“তাহলে এখনই রাজারহাটে যান। ওই গ্যারেজটাকে ট্রেস-আউট করুন। এমনটা হতেই পারে, ওখানেই হয়তো আপনি ট্যাক্সি এবং ড্রাইভারকে একসঙ্গেই পেয়ে গেলেন। আর একটা কথা, প্রিপারেশন নিয়েই রেইডটা করবেন। দিনকাল ভালো নয়। কখন কী হয়, কেউ বলতে পারে না। লোকাল থানার সাহায্য নেবেন। রিস্ক একেবারেই নেবেন না।”
“ওদিককার খবর কী? কোনো ডেভলপমেন্ট হল??”
“ধাঁধার উত্তর খুঁজছি। প্রতি মুহূর্তে কিছু না-কিছু নতুন ইনফরমেশন পাচ্ছি আর তদন্তের মুখটা ঘুরে যাচ্ছে। সন্দেহভাজনদের তালিকাটা একটু একটু করে বেড়েই চলেছে। দীপশিখার স্বামী দেবব্রতবাবু, বয়ফ্রেন্ড রাজীববাবুর কাছে ওঁকে খুন করার যথেষ্ট মোটিভ তো ছিলই এখন তো শুনছি, দেবব্রতবাবুর সঙ্গে একজন মহিলার ইল্লিসিট সম্পর্ক ছিল। এদিকটাও একবার খতিয়ে দেখতে হবে।”
(অবৈধ সম্পর্কের লেখাজোখা)
ডঃ বাসুর চেম্বার, ধর্মতলা, কলকাতা
দুপুর ১টা, ১৮ জুলাই
ডঃ বাসুর চেম্বারে বসে ওঁকে অনেকক্ষণ ধরেই জিজ্ঞাসাবাদ করছেন দুর্জয় সেন। উঠে আসছে একের পর এক তথ্য। আসলে, মনের কথা যারা বোঝেন তাঁরা সহজেই মানব মনের অন্ধকারের সরূপ চিনে নিতে পারেন।
“জীবন সম্পর্কে আপনার ধারণাটা ঠিক কী?” প্রশ্নটা ছুড়ে দিয়েই ডঃ বাসুর দিকে তাকালেন দুর্জয়।
“জীবন খুবই ছোটো। তাই আমাদের সবার উচিত আনন্দে বাঁচা। কষ্টগুলোকে দূরে সরিয়ে রাখা। নিজের কথা ভাবা। নিজেকে নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা।”
“তার মানে, আপনি একা বাঁচার কথা বলছেন?”
“ঠিক একা নয়। সমাজে থাকলে সামাজিক হতেই হবে। তবে নিজেকে আরও বেশি করে ভালোবাসা।”
“আপনি কী বিয়ের পরিপন্থী?”
“একে বারেই নয়। তবে…”
“তবে?”
“আমি বিশ্বাস করি, বেশিরভাগ বিয়ে নষ্ট হওয়ার পেছনে স্ত্রী-দের ভূমিকা অনেক বেশি থাকে।”
কথাটা শুনেই চমকে উঠলেন দুর্জয় এবং ওঁর সহযোগী। নিজেকে সামলে নিয়ে ফের জিজ্ঞেস করলেন, “এসব কী বলছেন ম্যাডাম? আপনাকে তো লোকে নারী বিদ্বেষী বলবে?”
“তাতে আমার কিছু করার নেই। আপনার থেকে বিবাহ জীবনের সমস্যা নিয়ে আমি অনেক বেশি কাজ করেছি। তাই আমি জানি আসলে সত্যিটা ঠিক কী। তবে এর মানে এই নয় যে স্বামীর জন্য বিয়ে নষ্ট হয় না। তবে, একটা বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পেছনে নারীরাই বেশি দায়ী। এক্ষেত্রেই দেখুন না, দেবব্রতবাবুর এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ারটা, দীপশিখা আর রাজীবের সম্পর্কের পরেই অনেক বেশি করে ম্যাচিওর করে।”
“কিন্তু সেটা তো দেবব্রতবাবুর বাজে ব্যবহারের জন্য।”
“শুধু কী তাই? রাজীবের এতে কোনো ইন্ধন ছিল না? দেখুন, রাজীব আমার পেশেন্ট ছিল। আমি ওকে ভালো করে চিনি ও জানি। হি ইস নট অ্যা গুড গাই।”
“আপনার মতে দীপশিখাকে কে খুন করতে পারে? বা করাতে পারে?”
“যে কেউ। তবে আমার মনে হয়, রাজীবকে অঙ্কের বাইরে রাখা ঠিক হবে না। তাছাড়া, একটা সময়ে রাজীব, দীপশিখার ওপরে খুবই অফেন্ডেড ছিল। কারণ, দীপশিখা ওকে রিজেক্ট করে ওর ইগোকে হার্ট করেছিল। আর বাই পোলার ডিসঅর্ডারের কোনো পেশেন্টের ইগোকে একবার কেউ আঘাত করলে কী হতে পারে, সেটা আমার থেকে বেশি কেউ জানে না।”
“কিন্তু তার মানে এটা তো নয় যে সব বাই পোলার ডিসঅর্ডারের পেশেন্টরাই রিভেঞ্জফুল হবে?”
“সেটা অবশ্য ঠিক। আমি শুধু একটা সম্ভাবনার কথা বলছি।”
কথা বলতে বলতে দুর্জয়ের চোখটা আচমকা টেবিলের একটা কোণায় ধুলোয় পড়ে থাকা একটা ফাইলের ওপরে গিয়ে পড়ল। ফাইলের ওপরের লেখাটা দেখেই চমকে উঠলেন দুর্জয় সেন। বিদ্যুৎ চমকের মতো মনে হল একটা সম্ভাবনার কথা। হতেও পারে? হতে পারে কী। খোঁজ নিয়ে দেখতে হবে।
“দেবব্রতবাবুর এক্সট্রা ম্যারিটাল অ্যাফেয়ারের বিষয়ে কী জানেন?”
“খুব বেশি জানি না। তবে যেটুকু শুনেছি, দীপশিখার থেকেই শুনেছি। রত্না সামন্ত বলে কোনো এক ক্রাইম জার্নালিস্টের সঙ্গে দেবব্রতর সম্পর্ক আছে। রত্নাদেবী ব্যারাকপুরেই থাকেন।”
“ক্রাইম জার্নালিস্ট! কলকাতা বিটের? নাকি বেঙ্গল বিটের?”
“সেটা বলতে পারব না। তবে আমি এই বিষয়ে কথা বলার জন্য দেবব্রতর সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু দীপশিখা কিছুতেই রাজি হয়নি।”
“কেন?”
“কারণটা বুঝতে পারছেন না? ও হয়তো নিজের স্বামীকে নিজের সম্বন্ধে বেশি কিছু জানাতে চাইছিল না?”
“কিন্তু এই সমস্যাটা তখনই মিটবে যখন টেবিলের দুই পাশে দেবব্রতবাবু আর দীপশিখাদেবী এসে বসবেন। আলোচনা করবেন।”
“সেটা আপনি বুঝছেন। আমিও বুঝেছিলাম। কিন্তু দীপশিখা বোঝেনি।”
“বোঝেনি নাকি বুঝতে চায়নি?”
“সেটা আপনিই ভেবে বলুন। আমি আর কী বলব?”
“দীপশিখার বিষয়ে আর কিছু বলতে পারেন?”
“সমস্যা ঠিক বলব না, তবে মাসখানেক আগে দীপশিখা একবার আমাকে একটা সেশনে বলেছিল, ওর অফিসের পাশেই একটা ফুলের দোকান আছে। সেখানকার ফ্লরিস্ট দীপক খান্নার সঙ্গে ওর একটা সখ্য গড়ে উঠেছিল। দীপকের দোকান থেকেই দীপশিখা এবং রাজীব একে অন্যের জন্য মাঝে মাঝে ফুল কিনত। দীপক নাকি দীপশিখাকে মাঝে মাঝে ফুলও পাঠাত। বন্ধুর মতো মিশত। দীপশিখার কাছেই শুনেছিলাম, যখন ওর মনটা খারাপ থাকত, ও তখন ওই ফুলের দোকানে চলে যেত। ফুল দেখত। দীপকের সঙ্গে গল্পগুজব করত।”
“আরও একটা নতুন ক্যারেক্টার! দীপক কী দীপশিখাকে ভালোবাসত?”
“দীপশিখার তাই মনে হয়েছিল। যদিও দীপক সে-কথা কোনোদিনই দীপশিখাকে বলেনি। দীপকের স্ত্রী বছরখানেক আগে সুইসাইড করে। কোনো একটা ওমেন সাপোর্ট গ্রুপ নাকি দীপকের স্ত্রী-কে খুবই বুলি করেছিল। সেটা সহ্য করতে না পেরেই শেষমেশ সুইসাইড করে দীপকের স্ত্রী।”
“বুঝলাম। আর কিছু?”
“না। আর কিছু না। আমার যেটুকু জানা ছিল, পুরোটাই আমি আপনাকে বললাম। কারণ আমিও চাই, দীপশিখার খুনি শাস্তি পাক।”
“অনেক বিরক্ত করলাম। আজকে উঠি। পরে দরকার হলে আপনাকে থানায় ডাকব অথবা এখানে চলে আসব।”
“নিশ্চয়ই।”
কথা শেষ করে ডঃ বাসুর চেম্বার থেকে বেরিয়ে পড়লেন দুর্জয় এবং ওঁর সহকর্মী।
(ভালোবাসা কারে কয়?)
পাটুলি, কলকাতা
বিকেল ৪টে ৩০, ১৮ জুলাই
“কী ব্যাপার অফিসার, এই অসময়ে আপনারা আমার দোকানে এসেছেন?” সামনে বসে থাকা দুর্জয় সেন এবং শৈবাল রায়ের দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন ফ্লরিস্ট দীপক খান্না। পাটুলি বাজারের ঠিক পাশেই ফুলের দোকান। খুব একটা ছোটো কিছু নয়। অনেকদিনের দোকান। একটা সময়ে দীপকবাবুর বাবা রমেশ খান্না দোকানটা চালাতেন। বাবার মৃত্যুর পরে দীপকবাবুই নিয়মিত দোকানে বসেন। বয়স চল্লিশের কোঠায়। লম্বা, চওড়া, ফর্সা। মোদ্দা কথা হল, চেহারার মধ্যে অদ্ভুত একটা মাদকতা আছে। সঙ্গে কথাবার্তাতেও আছে একটা চটক।
“এদিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম একটু ঘুরে যাই। তাই চলে এলাম।” বললেন শৈবাল রায়।
“কী যা-তা বলছেন? আমাকে কী উজবুক পেয়েছেন? সত্যিটা বলে ফেলুন। আমার কাজ আছে। তাছাড়া পুলিশ বেশিক্ষণ দোকানে থাকলে বিক্রিবাট্টাও কমে যায়।”
“দীপশিখাকে চিনতেন?” জিজ্ঞেস করলেন দুর্জয় সেন।
কথাটা শুনেই যেন একটা ঝটকা লাগল দীপক খান্নার। বললেন, “হ্যাঁ চিনতাম। তো?”
“কবে থেকে চিনতেন?”
“বেশ কয়েকদিন হবে। গুনে বলতে পারব না।”
“দীপশিখাদেবী খুন হয়েছেন জানেন তো?”
“শুনেছি। কিন্তু আপনারা আমার কাছে কেন এসেছেন, সেটা তো বুঝলাম না?”
“একটু ধৈর্য ধরুন। সব বুঝতে পারবেন।”
“বলুন, কী জানতে চান?”
“আপনার বাড়িতে কে কে আছে?”
“কেউ নেই। মা, বাবা অনেকদিন হল মারা গেছেন। একটা বউ ছিল। সে-ও সুইসাইড করেছে। এখন আমি একাই থাকি।”
“কী যেন নাম ছিল আপনার স্ত্রীর?”
“মউলি খান্না।”
“উনি সুইসাইড করলেন কেন?”
“একটা কথা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, আমার বউয়ের মৃত্যুর সঙ্গে দীপশিখার খুনের কী যোগাযোগ আছে?”
“সেটা আপনার না বুঝলেও চলবে। যা জিজ্ঞেস করছি, সেগুলোর ঠিকঠাক উত্তর দিন। না হলে কপালে অনেক দুঃখ আছে।” কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন শৈবাল রায়। দুর্জয় বুঝলেন শৈবালকে এখনই কন্ট্রোল না করতে পারলে, মুস্কিল হবে। তাই তিনি দীপকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “একটা কথা মনে রাখবেন, একটা মার্ডার কেসের তদন্ত চলছে। কোনো কথা গোপন করলে, সমস্যাটা কিন্তু আপনারই হবে।”
“একটা ওমেন সাপোর্ট গ্রুপ ওকে খুব বুলি করেছিল। আর সেটা সহ্য করতে না-পেরেই শেষমেশ সুইসাইড করে মউলি।”
“কী নাম ওই গ্রুপের? ডিটেলস আছে? আপনি কী ওই গ্রুপের নামে থানায় কোনো অভিযোগ করেছিলেন?”
“কী হবে করে, স্যার। ওদের সঙ্গে থানার ভালো র্যাপো আছে। সবকিছু ধামাচাপা পড়ে যেত। তাই…”
“তাই আপনিও চুপ করে বসে থাকলেন! রাজীববাবু এবং দীপশিখাদেবীর মধ্যে যে একটা সম্পর্ক তৈরি হচ্ছিল সেটা আপনি জানতেন?” ইচ্ছে করে একটু বাজিয়ে দেখার জন্য, হালকা চালে প্রশ্নটা দীপক খান্নার দিকে ছুড়ে দিলেন দুর্জয়।
কথাটা শুনেই চোখমুখ লাল হয়ে উঠল দীপকবাবুর। ক্লিয়ারলি বোঝাই যাচ্ছে, খুব রেগে গেছেন। আর এটাই চাইছিলেন দুর্জয় সেন।
“রাজীব দত্ত একদম ভালো মানুষ নন। ওই অফিসের অনেক মহিলারই সর্বনাশ করেছে। দীপশিখাকে ভালোবাসার জালে ফাঁসিয়ে ছিল। আমার তো মনে হয়, দীপশিখার খুনের পেছনে ওরই হাত ছিল।”
“আর আপনি ধোঁয়া তুলসী পাতা নাকি? আপনার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল দীপশিখার। ওঁকে মাঝে মাঝেই আপনি ফোন করতেন। একজন ফ্লরিস্ট এত ঘন ঘন একজন মহিলা, যিনি আবার বিবাহিত, তাঁকে কল করবে কেন? আপনিও দীপশিখাকে পেতে চেয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ, দীপশিখাকে আমি ভালোবাসতাম। এতে কোনো অন্যায় নেই। ওই রাজীবের জন্য কিছুতেই….” কথাটা গিলে নিলেন দীপক খান্না।
“গতকাল ভোর রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?”
“বাড়িতে। ঘুমোচ্ছিলাম। কেন বলুন তো?”
“আপনি বাড়িতে ছিলেন না। আপনার মোবাইলের লোকেশন বলছে, আপনি আপনার দোকানের আশেপাশেই ছিলেন।”
দুর্জয়ের শেষ কথাটা বল্লমের ফলার মতো যেন দীপকের বুকে গিয়ে বিঁধল। একই সঙ্গে বিস্ময় এবং ভয়ের যুগলবন্দি যেন ওঁর মুখে খেলা করতে শুরু করল।
“কিন্তু আমি কেন দীপশিখাকে খুন করতে যাব? আমি তো ওকে ভালোবাসতাম।”
“সেটা আমি এখনই আপনাকে বলব না। সময় হলে ঠিক জানতে পারবেন। শুধু একটা কথা জেনে রাখুন, আপনিও আজকে থেকে পুলিশের স্ক্যানারের নীচে চলে এলেন। এবারে বলুন, গতকাল ভোর রাতে যখন খুব বৃষ্টি পড়ছিল তখন আপনি দোকানের আশেপাশে কী করছিলেন?”
কোনো উত্তর না-দিয়ে মাথা নামিয়ে চুপচাপ বসে থাকলেন দীপক খান্না। ওঁকে ওইভাবে বসে থাকতে দেখে চিৎকার করে উঠলেন শৈবাল রায়, “চুপ করে থেকে লাভ নেই। বেশি পাঁয়তারা করলে তুলে নিয়ে গিয়ে জেলে পুরে দেব। ঠিক করে বলুন, এত রাতে দোকানের আশেপাশে কী করছিলেন?”
ফেঁসে গেছেন বুঝতে পেরে কতকটা বাধ্য হয়েই দীপক খান্না বললেন, “দূর থেকে দীপশিখাকে দেখার জন্য ওর আশেপাশেই ছিলাম।”
“বাবা! আপনি তো দেখছি ভালোবাসার ব্যাপারে বেশি মাত্রায় পজেসিভ।”
