দ্য আল্টিমেট ট্রুথ – ২০
(কেঁচো খুঁড়তে কেউটে)
‘সত্য খবর’ নিউজ পোর্টালের অফিস, পাটুলি, কলকাতা বিকেল ৫টা ৩০, ১৮ জুলাই
সন্ধে নামার মুখে ৩০ নং পাটুলি রোডে লোকাল থানার গাড়িটা এসে থামতেই বিল্ডিং এর সামনে থাকা ছোট ভিড়াটা নজরে এল, গাড়িতে বসে থাকা অফিসার দুর্জয় সেনের। রাস্তার ঠিক পাশেই জি প্লাস ফাইভ বিল্ডিংটা সোজা স্তম্ভের মতোন দাঁড়িয়ে আছে। এরই টপ-ফ্লোরে বেশ অনেকটা জায়গা জুড়েই ‘সত্য খবর ‘ নিউজ পোর্টালের অফিস। গাড়ি থেকে নামলেন দুর্জয় এবং শৈবাল। সোজা হেঁটে লিফটের সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। আশপাশটা ভালো করে দেখলেন। তারপরে সোজা লিফটে উঠে পড়লেন ওঁরা। বিল্ডিং-এর টপ-ফ্লোরে এসে লিফটটা থামল। খুলে গেল দরজা। বাইরে এসেই দুর্জয়রা দেখলেন, বিরাট একটা অফিস। সামনে বড়ো করে বাংলায় লেখা, ‘সত্য খবর’। একদম কর্পোরেট ধাঁচের গেট-আপ। একটা বড়ো হলঘর। তার মধ্যেই ছোটোবড়ো বেশ কিছু কিউবিকল। পুরো অফিসটা সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে মোড়া। ক্রাইম রিপোর্টার রত্না সামন্তের চেম্বারটা খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট করতে হল না। চেম্বারে প্রবেশ করেই চেয়ারে বসে থাকা বছর তিরিশের একজন ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে দুর্জয় বললেন, “আসতে পারি? আমরা লোকাল থানা থেকে আসছি। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলব।”
দরজার দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে সামনে রাখা ডেস্কটপে কিছু একটা কাজ করছিলেন ভদ্রমহিলা। দুর্জয়ের কথা শুনেই ঘুরে তাকালেন। সামনে দু-জন পুলিশ অফিসারকে এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেও অবাক হলেন না তিনি। দুর্জয়দের অপেক্ষাতেই বসে ছিলেন হয়তো। বললেন, “কী সৌভাগ্য আমার, পুলিশ এসেছে ক্রাইম রিপোর্টারকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে। আসুন। বসুন।” কথাটা শেষ করেই নিজের সামনে রাখা চেয়ার দুটোকে ঘুরিয়ে দিলেন দুর্জয়দের দিকে। মুখে অমায়িক হাসি। চেহারার মধ্যে দারুণ একটা জৌলুস আছে।
“আপনিই তো দুর্জয় সেন, প্রগতি ময়দান থানার অফিসার?”
“হ্যাঁ। কী করে চিনলেন, আপনার সঙ্গে তো আমার কোথাও দেখা হয়নি বা আলাপও হয়নি?”
“আপনি আমাকে না-ই চিনতে পারেন কিন্তু আমি আপনার তদন্ত করা বেশ কয়েকটা কেস কভার করেছিলাম। পোর্টালের জন্য নিউজ বানিয়েছিলাম। আমি জানতাম আপনারা আমার কাছে আসবেন।”
“কারণটাও নিশ্চয়ই জানেন?”
“হ্যাঁ। আমি আর দেবব্রত, আর ইন আ রিলেশনশিপ। দীপশিখা খুন হয়েছে। পুলিশের ডিরেক্ট সন্দেহ তো দেবব্রতর ওপরেই পড়বে। সুতরাং পুলিশ তো প্রাইম সাস্পেক্টের ফ্রেন্ডের কাছে তো আসবেই। তাই আগের থেকেই প্রিপেয়ারড ছিলাম।”
“আপনার বাড়ি তো ব্যারাকপুরে?”
“হ্যাঁ, বাপ-ঠাকুরদার বাড়ি। বাড়িতে বাবা, মায়ের সঙ্গেই থাকি। কাকা, জ্যাঠারা আর কেউ বেঁচে নেই। তবে রোজ রোজ বাড়ি যেতে পারি না। জানেন তো, আমাদের কাজের ধরণটা অনেকটাই আপনাদেরই মতো। খবরের পেছনে দিনরাত এক করে ছুটে বেড়াতে হয়। পুলিশদের সঙ্গে আমাদের আদায় কাচকলায় সম্পর্ক। আমরা ওঁদের ওপরে নির্ভর করি। পুলিশও কিছুটা হলেও আমাদের ওপরে নির্ভর করে। যদিও ওঁরা সেটার মান্যতা দেয় না।”
“সেটা ঠিক নয়। আমরা আইনের ঘেরাটোপে থেকে তদন্ত করি। আমাদের অনেক রেস্ট্রিকশন আছে। আপনারা ফ্রিলি কাজ করতে পারেন। যেখানে খুশি চলে যেতে পারেন। কারওর সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তবে দিনের শেষে আমাদের দু-জনেরই কাজ সত্যকে খুঁজে বের করা।”
“তাই তো আমাদের পোর্টালের নাম সত্য খবর।” কথাটা বলেই মুচকি হাসলেন রত্নাদেবী।
“কতদিন আছেন এই পোর্টালে?”
“২০২০ সালে করোনার সময়ে আমাদের এই পোর্টালটা লঞ্চ হয়। প্রথম দিন থেকেই আমি এই পোর্টালের সঙ্গে যুক্ত আছি। আসলে কী জানেন তো, আমাদের লাইনে আকচাআকচি খুব। সবাই সবার সিক্রেট জানে। প্রাইভেসি বলে কিছু নেই। একটা পোর্টাল ছেড়ে অন্য জায়গায় যেতেই পারি, কিন্তু সেক্ষেত্রে আমাকে বসের সঙ্গে সন্ধি করে যেতে হবে। না হলেই আমার উইকনেসগুলো বাইরে বের করে আমাকে কোণঠাসা করে দেওয়া হবে। এটাই নিয়ম। সবাই করে। তাছাড়া, এখানে অনেকটাই সেটেল্ড হয়ে গেছি। সবাই চেনে, মান্যি করে। তাই এখান থেকে আর কোথাও যাইনি।”
“প্রিন্ট এবং ডিজিটাল দুটো জায়গাতেই তো আপনাদের এই পোর্টালটা কাজ করে?”
“হ্যাঁ। অনেকদিন ধরেই। ডেইলি নিউজ পেপারও বের হয়। খুব একটা ছোটো পোর্টাল নয় কিন্তু।”
“জানি। একটা কথা বলুন তো, আপনাদের এই সম্পর্কটা কত দিনের?”
“মাস ছয়েকের হবে।”
“দীপশিখা তো আপনাদের ব্যাপারে সবকিছু জানতেন?”
“প্রথমে জানত না। তবে পরে পুরোটাই জেনেছিল।”
“আপনার সঙ্গে সরাসরি কোনোদিন ঝগড়া হয়নি?”
“না। ঝগড়া করতে এলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারত না। ও নিজের স্বামীকে বেঁধে রাখতে পারেনি, তার দায় কী আমার?”
“তবুও…।”
“ওসব তবু, কিন্তু… আমি বিশ্বাস করি না। আমি নিজের থেকে দেবব্রতর কাছে গিয়ে হাত পেতে ভালোবাসা ভিক্ষা করিনি। একজন পুলিশ অফিসার হয়ে ও-ই এসেছিল আমার মতো একজন ক্রাইম রিপোর্টের কাছে। তাই আমার কোনো দায় নেই।”
“কাজের সূত্রেই কী আপনাদের আলাপ?”
“হ্যাঁ। তখন ও সাস্পেন্ডেড। আসলে, ২০২০র যে কেসে ও ফেঁসে গিয়েছিল, সেটা আমিই প্রথম ব্রেক করি। ধারাবাহিকভাবে কেসটা ফলোআপ করেছিলাম। শুধু ইনভেস্টিগেশন নয়, কেসের ট্রায়ালটাও আমি নিয়মিত ফলো করতাম। তারপরে অনেকদিন ধরে কেসটা চলে। এবং শেষমেশ আসল অপরাধীর সাজা হয়। এর অনেকদিন পরে একদিন দেবব্রত আমাকে ফোন করে। দেখা করতে চায়। আমি ভাবলাম, ওর সঙ্গে কথা বলে নতুন কোনো তথ্য পেতে পারি। রাজি হয়ে যাই। তারপরে একটু একটু করে আমাদের সম্পর্কটা গভীর হয়।”
“যখন জানতে পারলেন, দেবব্রতবাবু বিবাহিত, তখন গিল্টি ফিলিং কিছু হয়নি?”
“আপনাকে তো আগেই বললাম। ওসব নিয়ে আমি ভাবি না।”
“আপনি কী একমাত্র সন্তান?”
কথাটা শুনেই চমকে উঠলেন রত্না সামন্ত। তারপরে বললেন, “না। দাদা ছিল। এখন আর বেঁচে নেই।”
“দেবব্রতবাবু আপনাকে খুবই গুরুত্ব দেন?”
“অফকোর্স।”
“কথা বলার আগে আপনার সম্পর্কে খোজখবর করছিলাম। জানতে পারলাম, আপনি খুব প্রফেশনাল। কাজের জন্য করতে পারেন না, এমন কিছু নেই। আর তাই, অফিস বসের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতা অনেকটাই। আপনার কভার করা নিউজগুলো খুব বেশি কাঁটাছেঁড়া করা হয় না। মানে, এডিটিং হয় না। তাছাড়া আপনাকে যে যে অ্যাসাইনমেন্টগুলো দেওয়া হয় সেগুলো আপনি বেশ ভালো করেই শেষ করেন। ইতিমধ্যেই পর পর দুই বছর আপনি ‘বেস্ট রিপোর্টার অফ দ্য ইয়ার’ হয়েছেন।”
“বাপরে! আপনি তো দেখছি আমার সম্পর্কে অনেকটাই খোঁজখবর নিয়ে এসেছেন।”
“দীপশিখা পাল হত্যাকাণ্ডটা কী আপনিই কভার করছেন?”
“হ্যাঁ। প্রথম দিন থেকেই।”
“আপনার কী মনে হয়, কে আছে এই খুনের পেছনে?”
“সেটা তো আপনি বলবেন? আমি শুধু বলতে পারি একটা ডিপ, লং কন্সপিরেসি আছে এই পুরো ঘটনাটার পেছনে। আমি নিজেও অনেককে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। অনেক জায়গায় ঘুরেছি। পুলিশের মধ্যেও আমার সোর্স আছে। ওদের থেকেও অনেক খবর পেয়েছি। তাই বলতে পারি, খুব একটা সহজ কাজ হবে না আপনার পক্ষে।”
কথাটা শুনেই মুচকি হাসলেন দুর্জয়। বললেন, “সহজ কাজ করতে আমি আবার পছন্দ করি না। নিউট্রালি জিজ্ঞেস করছি, আপনার মতে দীপশিখাকে খুন করে কার লাভ হতে পারে?”
“অনেকেরই হতে পারে। দেবব্রতর হতে পারে কারণ, আমি যতটুকু জানি, দীপশিখা কিছুতেই ওকে ছেড়ে যেতে চাইছিল না। অন্যদিকে আমিও দেবব্রতকে প্রেসার দিচ্ছিলাম যাতে ও দীপশিখাকে ছেড়ে আমার সঙ্গে পাকাপাকিভাবে থাকে। হি ওয়াজ ইন এ বিট প্রেসার। রাজীব হতে পারে। কারণ, ওর একটা মানসিক সমস্যা আছে। দীপশিখাকে ও ভালোবাসত কিন্তু দীপশিখা কী আদৌ ওকে ভালোবাসত? ওর সঙ্গে থাকতে চাইত। কে বলতে পারে, এর জন্যই কাজটা ওই করেছে বা করিয়েছে। দীপক খান্নাও হতে পারে কারণ, দীপক দীপশিখাকে লুকিয়ে ভালোবাসত, আর এটা রাজীব বা দীপশিখা কেউই খুব একটা ভালোভাবে নেয়নি। ডঃ বাসুও হতে পারে, কারণ উনি দীপশিখাকে অনেকদিন ধরেই দেখছিলেন। সি ইজ অ্যা বিট মেন্টাল অলসো। উনি বিয়ে সিস্টেমটারই ঘোরতর বিরোধী। তাই তিনি বারবার দীপশিখাকে বলতেন ও যেন দেবব্রতকে ছেড়ে বেরিয়ে এসে ওঁদের গ্রুপে জয়েন করে।”
“আপনার তো দেখছি ইমিডিয়েট পুলিশে জয়েন করা উচিত। এত খবর পেলেন কেমন করে?”
“বললাম না, আমিও তদন্ত করছি। তবে ভয় পাবেন না, আমি এগুলো বাইরে প্রকাশ করব না। আমি চাই, আপনি এই কেসটা ক্র্যাক করুন। তখন আমিই খবরটা ব্রেক করব।”
চেম্বার থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে রত্নাদেবীর দিকে ঘুরে তাকিয়ে দুর্জয় বললেন, “আজ উঠি। কথা দিলাম অপরাধীর গ্রেফতারের খবরটা সবার আগে আপনাদের পোর্টালেই ব্রেক হবে। অনেকগুলো প্রশ্ন যেগুলো আমাকে খুবই বদার করছিল। কিছুতেই উত্তর খুঁজে পাচ্ছিলাম না। সেগুলোর উত্তর পেলাম। এবারে হয়তো কেসটা খুলে যাবে। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানালাম। পরে দেখা হবে।”
কথা বলে ‘সত্য খবর’ নিউজ পোর্টালের অফিস থেকে বেরিয়ে এলেন দুর্জয় এবং শৈবাল। বাইরে এসে গাড়িতে উঠে বসে শৈবালকে উদ্দেশ্য করে দুর্জয় বললেন, “একটা বড়োসড়ো ভুল হয়ে গেছে। আমার আরও আগেই ২০২০-র কেসটা নিয়ে বসা উচিত ছিল।”
পুলিশের গাড়িটা ছুটে চলল রাজারহাটের দিকে। শৌভিক ওখানেই আছে। গাড়িতে বসে নিজের মোবাইলে সেভ করে রাখা ২০২০-র কেসটার কেস ডায়েরির পিডিএফ ভারসানটা খুঁটিয়ে পড়তে শুরু করলেন দুর্জয়।
(ধরপাকড় শুরু)
রাজারহাট, কলকাতা
রাত ৭টা ৩০, ১৮ জুলাই
ইতিমধ্যেই কলকাতা এবং বেঙ্গল পুলিশের বেশ কয়েকটা গাড়ি পৌঁছে গেছে টার্গেটের বাড়ির কাছে। শৌভিকরা টার্গেটের বাড়িটা ভিলেজ পুলিশের সাহায্যে আগেই ফিক্স করে রেখেছিলেন। সাহায্য নিয়েছিলেন, সিসি ফুটেজ আর অমিয়র বয়ানের। বড়ো ফোর্স নিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে টার্গেট বিবেক এবং কিংশুকদের বাড়ি আর গ্যারেজ। যে গ্যারেজের দিকেই ওই হলুদ ট্যাক্সিটা এসেছিল বলে খবর। আছে বেশ কিছু সিভিল ড্রেসের পুলিশও। এই এলাকার বাড়িগুলো একদম গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাই, বাড়িতে পুলিশ পড়লে বিবেক ও ওর ছেলের নিজের বাড়ি বা গ্যারেজ থেকে পাঁচিল টপকে পাশের বাড়িতে চলে যাওয়াটা খুব একটা কষ্টকর হবে না। তাই অনেক ভেবেচিন্তে প্ল্যানটা তৈরি করা হয়েছে। ঠিক হয়েছে, পাশাপাশি, গায়ে গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িগুলোতেও একই সঙ্গে রেড করা হবে। সেইমতো বেশ কয়েকটা দলে নিজেদেরকে ভাগ করেনিলেন দুর্জয়। প্রতিটি দলে ৫ জন করে পুলিশ আছে।
“বাড়িতে কেউ আছেন?” বিবেকের বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে জোর গলায় চিৎকার করলেন দুর্জয়।
“কে?” ভেতর থেকে পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এল।
“আমরা থানা থেকে আসছি।” কিছুটা জোরের সঙ্গেই বললেন লোকাল থানার অফিসার রঞ্জন সহায়।
“এত রাতে? কী হয়েছে?” পুরুষ কণ্ঠস্বরে উদ্বেগের চিহ্ন ধরা পড়ল স্পষ্টত।
“দরকার আছে বলেই তো এসেছি। তাছাড়া রাত তো খুব বেশি হয়নি। তাড়াতাড়ি দরজাটা খুলুন।” রঞ্জনবাবু বলে উঠলেন।
ভেতর থেকে কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। সবকিছু যেন আচমকাই থমকে গেল। কোথাও কোনো সাড়াশব্দ নেই।
পাশের বাড়ি দুটোর দরজা খোলার শব্দ কানে এল দুর্জয়ের। এতক্ষণে শৌভিক ও শৈবাল-সহ বাকিরা বোধহয় ঢুকে পড়েছেন ওই বাড়িগুলোতে নিজের নিজের টিম নিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকার পরেও দরজা না খোলায় কিছুটা অধৈর্য হয়ে পড়তে শুরু করলেন রঞ্জনবাবু। দুর্জয়ের হাতে আর বেশি সময় নেই। ড্রাইভারটা পালিয়ে গেলে মুস্কিলটা আরও বাড়বে। শেষ বারের মতো গলা চড়িয়ে ডাকতে যাবেন, এমন সময়ে আচমকা বিকট শব্দ করে খুলে গেল বাড়ির বাইরের দরজাটা। নিজের অজান্তেই বাঁ কোমরে গোঁজা পিস্তলের বাঁটে ডান হাতটা চলে গেল দুর্জয়ের। দেখলেন, মধ্যবয়স্ক একজন ভদ্রলোক দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফ্যালফ্যাল করে ওঁর দিকে তাকিয়ে আছেন।
“কী হয়েছে? এই সময়ে এসেছেন?” চোখ কচলাতে কচলাতে কথাগুলো বললেন লোকটি। দুর্জয় এক মুহূর্তও সময় নষ্ট না করে রীতিমতো ওঁকে ধাক্কা দিয়ে সদলবলে বাড়ির মধ্যে ঢুকে গেলেন।
“আরে আরে, কিছু না বলে এইভাবে ঘরে ঢুকে আসছেন যে। কে আপনারা? সত্যিকারের পুলিশ তো?” দুর্জয়ের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে গলা তুলে কথাগুলো বলতে থাকলেন ওই ব্যক্তি।
দোতলা বাড়ি। একতলায় দুটি ঘর। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনেই লম্বা একটা বারান্দা। বারান্দার শেষে একটা রান্নাঘর, একটা বাথরুম। ওপরের তলাতেও দুটো ঘর। ঘর দুটির দরজা বন্ধ। বাড়ির ভেতরের আলোতে এর থেকে বেশি আর কিছু বোঝা যাচ্ছে না। দুর্জয় একটুও সময় নষ্ট না-করে নিজের টিমকে ইশারা করতেই দু-জন একতলার ঘর দুটোর দরজার সামনে চলে গেল। বাকী দু-জন আর দুর্জয় রীতিমতো দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেলেন। একজন বাথরুমের দিকে দৌড়ে গেল। দুর্জয় নিজের পিস্তলটা হাতে নিয়ে বন্ধ হয়ে থাকা একটা ঘরের দরজার ওপরে সজোরে লাথি মারতেই দরজাটা খুলে গেল। ওঁর হাতে তখন উদ্যত পিস্তল। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। নিজের চোখকে ধাতস্থ হওয়ার একটুও সময় না দিয়ে নিজের বাঁ হাতটা বাড়িয়ে, কিছুটা আন্দাজে, ঘরের বাঁ দিকের দেওয়ালে সুইচবোর্ড খোঁজার চেষ্টা করতে না-করতেই একটা সুইচের নাগাল পেয়ে গেলেন তিনি। আলোটা জ্বালালেন। ঘরে একটাই খাট পাতা। আর কোনো আসবাব নেই। সম্পূর্ণ ঘরটি খালি। দেখেই মনে হচ্ছে কেউ এখানে ছিল না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওই ঘর থেকে বেরিয়ে নিজের হাতের পিস্তলটা উঁচিয়ে পাশের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন দুর্জয়। দরজায় দু-বার নক করতেই দরজাটা খুলে গেল। ঘরের আলো জ্বলছে। ভেতরে চোখ ঘুরিয়ে দুর্জয় দেখলেন, একজন ইয়াং ছেলে খাটের ওপরে বসে আছে। ওর চোখেমুখে থাকা আতঙ্কের ছাপটা স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে। পিস্তলটা কোমরে গুঁজে সামনে বসে থাকা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে দুর্জয় জিজ্ঞেস করলেন, “কী নাম তোর?” একটু ঢোঁক গিয়ে ছেলেটি উত্তর দিল, “আমি কিংশুক।” দুর্জয় বুঝলেন, এভাবে হবে না। বাপ-ব্যাটাকে ব্রেক করতে না পারলে ড্রাইভারের খোঁজ মিলবে না। ইশারা করে কিংশুককে গ্রাউন্ড ফ্লোরে যেতে বলে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বারান্দায় আসতেই পকেটে সাইলেন্ট করে রাখা মোবাইলটা গোঁ গোঁ করে বেজে উঠল। দেখলেন, শৈবাল ফোন করেছেন। কলটা ধরতেই শৈবাল বললেন, “হলুদ ট্যাক্সিটা পেয়েছি। গ্যারেজেই আছে। ড্রাইভার নেই। গ্যারেজের দরজার লকটা খুব একটা শক্তপোক্ত ছিল না। তাই ভাঙতে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি।”
“ঠিক আছে আপনারা ওখানেই থাকুন। গাড়িটা ভালো করে চেক করুন। তবে দেখবেন কোনো এভিডেন্স যেন নষ্ট না হয়। পরে গাড়িটাকে ফরেনসিক করাতে হবে, এটা যেন মাথায় থাকে।” বললেন দুর্জয়।
“ঠিক আছে।” কথা শেষ করে কলটা কেটে দিলেন শৈবাল। রাজারহাট থানার অফিসার রঞ্জন সহায়ের দিকে তাকিয়ে দুর্জয় সেন বললেন, “বাপ-ব্যাটাকে গাড়িতে নিয়ে গিয়ে তুলুন। থানার নিয়ে গিয়ে একটু ‘ভালোবাসা” দিলেই বাপ বাপ বলে সব কথা পেটের ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে আসবে।”
বিবেক ও কিংশুককে গাড়িতে তোলা হল। ওদের মুখে আর রা কাটছে না। ঘটনার আকস্মিকতায় ওরাও হকচকিয়ে গেছে। কিছুই যেন মাথায় আসছে না।
(জেরা চলছে)
রাজারহাট থানা, কলকাতা
রাত ৯টা, ১৮ জুলাই
রাজারহাট থানার জেরাকক্ষটা খুব একটা বড়ো নয়। আসবাব বলতে একটা ধুলোমাখা টেবিল আর পাশাপাশি রাখা বেশ কয়েকটা হাতল ভাঙা কাঠের চেয়ার। টেবিলের ঠিক ওপরে একটা কম ওয়াটের বাল্ব ঝুলছে। ঘরের কোণায় একটা ফাঁকা মিনারেল ওয়াটারের জার রাখা। ঘরে কোনো জানালা নেই। একটাই দরজা। দরজাটা বন্ধ করে দিলে কিছুটা সময়ের মধ্যেই বেশ ওমোট হয়ে ওঠে ভেতরের পরিবেশটা। যুগ যুগ ধরে জেরাকক্ষের পরিবেশ এমনই রাখার নিয়ম। এতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি বা অপরাধীর মনের ওপরে আলাদা করে একটা অদৃশ্য চাপ তৈরি করা যায়।
“কথাটা নিজের থেকেই বলবি নাকি ছেলেকে নিয়ে গিয়ে ঝুলিয়ে দেব।” চেয়ারে বসে থাকা বিবেকের দিকে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন দুর্জয় সেন।
“আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না স্যার। কেন আপনারা আমাদেরকে এইভাবে তুলে আনলেন? কার কথা জিজ্ঞেস করছেন?”
“ন্যাকামো করিস না। তোর গ্যারেজে হলুদ রঙের যে ট্যাক্সিটা রাখা আছে ওটা কার? ওই গাড়ির ড্রাইভারটা কোথায়?”
“কত গাড়িই তো কাজ করাতে আসে। সবার খবর কী আমার কাছে থাকে?”
“তোর গ্যারেজে কোনো রেজিস্টার আছে, যেখানে গাড়িগুলোর ডিটেলস লেখা থাকে?”
প্রশ্নটা শুনেই ঘরের কোণায় বসে থাকা অফিসার শৈবাল রায় বলে উঠলেন, “না, আমি ভালো করে খুঁজে দেখেছি। কোনো রেজিস্টার পাইনি ওই গ্যারেজে।”
শৈবালের কথা শুনেই মুখটা পানসে হয়ে গেল বিবেকের। বললেন, “অনেকদিন আগে একজন এসে ট্যাক্সিটা দিয়ে গিয়েছিল। বলেছিল, বডির কাজ করাতে। দেখলাম, গাড়ির পেছনের দিকে, ডিকির কাছে কিছু জায়গায় রংটা চটে গেছে। আমি সেটাকে ঠিক করে দিই। কিন্তু লোকটা আমাকে যে মোবাইল নাম্বারটা দিয়ে গিয়েছিল, কাজ শেষ করে ওই নাম্বারে যোগাযোগ করেও লোকটাকে পাইনি। কল করলেই বলছে, ফোনটা এখন বন্ধ করা আছে। তাই গাড়িটা আর ফেরত দেওয়া হয়নি। সেদিন থেকেই গাড়িটা আমার গ্যারেজেই পড়ে আছে। বিশ্বাস করুন স্যার, এর বাইরে আর আমি কিছু জানি না।”
“কতদিন আগে তোকে ওই লোকটা এই ট্যাক্সিটা দিয়ে গিয়েছিল?”
“হপ্তা খানেক আগে।”
“তোর কথাগুলো বিশ্বাস করতে খুব ইচ্ছে করছে, কিন্তু কোনো উপায় নেই। কারণ, তুই একটা ফার্স্ট-ক্লাস লায়ার। আমাদের হাতে সময় বেশি নেই। তাড়াতাড়ি সত্যিটা বলে ফেল। একটা রেপ এবং মার্ডার কেসের তদন্ত চলছে। সত্যিটা না বললে কেসে দিয়ে দেব। আর তখন, সারাটা জীবন কোর্টে আর জেলে দৌড়ে মরতে হবে। ছাড়া পাবি না। ফাঁসিও হতে পারে। ভেবে দেখ, কী করবি?”
কথা শেষ করে ঘরের সবাইকে নিয়ে বাইরে চলে গেলেন দুর্জয়। যাওয়ার আগে বাপ-ব্যাটাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, “জীবনগুলো তোদের। সেগুলো নিয়ে তোরা কী করবি, সেটা তোদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। আমি তোদের গায়ে একটিবারের জন্যেও হাত তুলব না। শুধু কলমের একটা খোঁচায় বরবাদ করে দেব তোদেরকে। তোদের পরিবার, মানসম্মান নিয়ে আর বাঁচতে পারবে না এই সমাজে। এমনিতেই এই কেসটা নিয়ে পাবলিক প্রচণ্ড ক্ষেপে আছে। শুধু তোদের নাম, ঠিকানাটা ভাইরাল করে দিতে হবে। ব্যাস, তাতেই কাজ হয়ে যাবে।”
(খোঁজ মিলল, অবশেষে )
রাজারহাট থানা, কলকাতা
রাত ১০টা, ১৮ জুলাই
এত তাড়াতাড়ি জেরাকক্ষের ভেতর থেকে ডাকটা যে আসবে, সেটা আন্দাজ করতে পারেননি দুর্জয়। বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে ঘরের মধ্যে গিয়ে দেখলেন, বিবেক ও কিংশুক দু-জনেই হাপুস নয়নে বাচ্চাদের মতো কেঁদে চলেছে। দুর্জয়কে দেখেই দৌড়ে ওঁর পায়ের ওপরে গিয়ে পড়ল বিবেক। তারপরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “স্যার আমাদের বাঁচান। আমরা রেপ বা খুন কোনোটাই করিনি।”
“বাঁচাব বলেই তো তোদের ডাকে ছুটে এলাম। আমি এটাও জানি তোরা কিছুই করিসনি। শুধু ওই ট্যাক্সিটা রেখেছিস। ওটার আসল নাম্বার প্লেট ফেলে দিয়ে ফলস একটা প্লেট লাগিয়ে দিয়েছিস। কিন্তু ড্রাইভারটা আসলে কে? আর এখন ওকে কোথায় পাব?”
মাথা নামিয়ে গলার স্বর খাদে নামিয়ে বিবেক বলতে শুরু করল, “কিছুদিন আগে একজন লোক আসে আমার গ্যারেজে। বলে, পুরোনো একটা হলুদ ট্যাক্সি জোগাড় করে দিতে হবে, কয়েকদিনের জন্য। আমার গ্যারেজে সেই সময়ে একটা ভাঙা ট্যাক্সি ছিল। কয়েকদিন আগেই সারাই করাতে এসেছিল। ওই ট্যাক্সির আসল মালিক আমার পরিচিত। আমাদের পাশের পাড়ায় বাড়ি। ওই ট্যাক্সিটা দেখে লোকটির সেটা পছন্দ হয়। আমাকে কুড়ি হাজার টাকা দিল আর একটা নাম্বার প্লেট দিল। বলল, গাড়িটা রেডি করে দিতে হবে। ভাড়ায় নেবে। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। তখন যদি জানতাম…” কথাটা শেষ না করেই ফের কান্নায় ভেঙে পড়ল বিবেক।
“তারপরে কী হল, চটপট বল?”
“বলছি স্যার। ১৬ তারিখ সন্ধে বেলায় লোকটা আবার আমার গ্যারেজে এল এবং আরও দশ হাজার টাকা দিয়ে গাড়িটা নিয়ে গেল। আমি লোকটার নাম, ঠিকানা জি করেছিলাম। কিছু বলল না। শুধু একটা মোবাইল নাম্বার দিয়ে বলল, কোনো দরকার হলে এই নাম্বারে যোগাযোগ করতে। তারপরে ১৭ তারিখ এসে গাড়িটা আবার আনার গ্যারেজে রেখে দিয়ে যায়। লোকটা নিজেই ড্রাইভ করছিল।”
কথাটা শুনেই কিছুটা হতদ্যম হয়ে পড়লেন দুর্জয়। বুঝলেন, এতটা কাছে এসেও ব্যর্থ হতে হবে ওঁকে। তাও নিজেকে সামলে নিয়ে বিবেককে ফের জিজ্ঞেস করলেন, “লোকটির বিষয়ে আর কিছু বল? না হলে ওকে আমরা ধরব কেমন করে? আর, ওই ড্রাইভার ধরা না পড়লে তোরাও বাঁচবি না।”
দুর্জয়ের কথা শুনে মিইয়ে গেল বিবেক। কিছু একটা চিন্তা করল। তারপরে বলল, “স্যার লোকটা যখন আমার গ্যারাজে দাঁড়িয়ে ছিল তখন একটা নাম্বার থেকে ওর ফোনে বারবার কল আসছিল। লোকটা কথা বলতে বলতে বারবার লাইনটা কেটে যাচ্ছিল। লোকটা বিরক্ত হয়ে একবার আমার ফোনটা নিয়ে একটা কল করেছিল। বেশ কিছুক্ষণ কথাও বলে। তারপরে তাড়াহুড়ো করে আমার গ্যারেজ থেকে চলে যায়। কথাটা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। আপনি এখন জিজ্ঞেস করায় মনে পড়ে গেল।”
দুর্জয়ের মুখে যেন হাজার ওয়াটের বাতি জ্বলে উঠল। তাড়াতাড়ি বিবেকের মোবাইলটা, যেটা থানাতে জমা করা ছিল, আনিয়ে নিয়ে সেখান থেকে ওই নাম্বারটা বের করে বিবেকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “কথায় আছে না, অপরাধী যতই চালাক হোক না কেন, কোনো না কোনো ক্লু ঠিক ফেলে রেখে যায়। অপরাধীর ওভার কনফিডেন্স-ই শেষ পর্যন্ত ওর কাছে কাল হল।”
(অবশেষে )
সন্দেশখালি, কলকাতা
রাত ২টো, ১৯ জুলাই
অন্ধকারের চাদর মুড়ে সন্দেশখালি রোডের ওপরে দাঁড়িয়ে আছে প্রান্তিক সংঘ ক্লাব। ক্লাবের ঠিক পেছনে বড়ো একটা খেলার মাঠ। জায়গাটা এমনিতেই বেশ অন্ধকার। হালকা হিম পড়তে শুরু করেছে। এত রাতে রাস্তায় খুব বেশি লোকজন থাকে না। মাঠের পাশেই সরু গলিটা। গলির ভেতরে একটাই ল্যাম্পপোস্ট, যার বাল্বটা কে যেন খুলে নিয়ে গেছে। দুর্জয়ের টিমটা বেড়ালের মতো পা টিপে টিপে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে গলির একদম শেষের বাড়িটার দিকে।
বিবেকের মোবাইল থেকে পাওয়া নাম্বারটার কল-লিস্ট আনিয়ে নিয়ে সেখান থেকে একটা নাম্বার বের করা হয়েছে। দেখা গেছে, এই নাম্বারটার সঙ্গে সেই সময়ে আরও একটা নাম্বারের কথা হয়েছে। এই দ্বিতীয় নাম্বারটিই হল ড্রাইভারের নাম্বার। ড্রাইভারের মোবাইল নাম্বারের কল-লিস্ট বের করে সেখান থেকে ওই নাম্বারটির লোকেশন পাওয়া গেছে। এই লোকেশনটিকে ফিক্স করে তারপরে বড়োসড়ো একটা টিম নিয়ে এখানে এসেছেন দুর্জয়। সঙ্গে অবশ্যই আছে বিবেক। কারণ, ড্রাইভারের আইডেন্টিফিকেশনটা বিবেককেই করতে হবে।
দুর্জয়ের টিম ছড়িয়ে আছে পুরো জায়গাটা জুড়ে। প্রয়োজনে একে অন্যের সঙ্গে কথা বলছে ফিশফিশ করে। ইতিমধ্যেই লোকাল থানার ভিলেজ পুলিশকে কাজে লাগিয়ে টার্গেটের বাড়িটাকে ফিক্সাপ করা হয়েছে। খবর পাওয়া গেছে, বাড়িতে টার্গেট একাই থাকে। তবে লোকাল মস্তান সে। ওর নামে পুলিশি কেসও আছে। জেলও খেটেছে কয়েক বছর। ধারাগুলো লঘু ছিল বলে এখন বেল পেয়ে জেলের বাইরে আছে। সবাই ওকে সমঝে চলে।
কবজি উলটে ঘড়ি দেখলেন দুর্জয়। রাত দুটো বেজে গেছে অনেকটা আগেই। চারিদিকটা বেশ নিস্তব্ধ। এটাই মোক্ষম সময়। আর দেরি করা ঠিক হবে না। ইশারা করলেন দুর্জয়। সঙ্গে সঙ্গে শৈবাল, শৌভিক-সহ বাকিরা অ্যালার্ট হয়ে গেলেন। ঠিক হল, এবারে আর বাইরে থেকে ডাকাডাকি করা হবে না। সাবধান হয়ে টার্গেট পগার পার হয়ে যেতে পারে। তাই পাঁচিল টপকে বাড়ির ভেতরে যেতে হবে। সেইমতো একটা বড়োসড়ো মই নিয়ে আসা হয়েছে। বাড়িটা একতলা। ছাদ বলে কিছু নেই। তাই ছাদ দিয়ে টার্গেটের পালিয়ে যাওয়ার কোনো জো নেই। তাও বাড়িটাকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলা হয়েছে। দুর্জয়, বিবেক মই বেয়ে বাড়িটার পাঁচিল টপকে ভেতরে চলে গেলেন। তারপরে ভেতর থেকে যতটা সম্ভব কম শব্দ করে দরজার ছিটকিনিটা খুলে দেওয়া হল। বাইরে অপেক্ষমান আরও কিছু পুলিশ বাড়ির ভেতরে ঢুকে এল। ভেতরে একটা ছোটো উঠোন। উঠোন পেরিয়ে সামনে একটা লম্বা বারান্দা। বারান্দার মুখে লোহার গ্রিল গেট। যদিও তাতে কোনো তালা দেওয়া নেই। বারান্দার গায়ে দুটো ঘর। উঠোনে একটা অল্প পাওয়ারের বাল্ব জ্বলছে। বাল্বের নরম আলোয় দেখা যাচ্ছে, দুটো ঘরের মধ্যে একটি ঘরের দরজাটা হাট করে খোলা। কিন্তু পাশের ঘরের দরজাটা বন্ধ। তার মানে, ওই ঘরেই নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে টার্গেট। কোমরে গুঁজে রাখা পিস্তলটা একবার ঠিক করে নিলেন দুর্জয়। তার পরে কী একটা ভেবে পিস্তলটা নিজের ডান হাতে নিয়ে নিলেন তিনি। গ্রিল গেটটা ঠেলে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন দুর্জয়। বন্ধ দরজাটাতে আচমকা সজোরে লাথি মারলেন তিনি। একবাব… দুইবার…. তিনবার। শব্দ করে খুলে গেল দরজাটা। ভেতরে থাকা ছিটকিনিটা ভেঙে পড়ল ঘরের মধ্যে। ঘরে ঢুকেই দেওয়ালে থাকা সুইচ বোর্ডটা নাগালের মধ্যে পেয়ে গেলেন দুর্জয়। ঘরের লাইটটা জালাতেই দেখলেন, একজন লোক হাফ প্যান্ট পড়ে বিছানার ওপরে বসে আছে। ওর গায়ে কোনো জামাকাপড় নেই। ঘরের জানালাগুলো বন্ধ। লোকটার বয়স চল্লিশের কোঠায় হবে। চোখেমুখে একটা রাফ ব্যাপার আছে। অন্ধকার থেকে আচমকা আলোতে এসে চোখ দুটো ধাধিয়ে গেল দুর্জয়ের। তাও নিজের হাতের পিস্তলটাকে শক্ত করে ধরে থাকলেন। দেখলেন, লোকটিও ওদের দিকে একটা কান্ট্রি মেড ওয়ান শটার তাক করে বসে আছে।
একটু একটু করে লোকটির দিকে এগোতে থাকলেন দুর্জয়। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শৈবাল যেন কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। স্যার এটা কী করছেন! এইভাবে কেউ এগিয়ে যায় নাকি? যে-কোনো মুহূর্তে লোকটি গুলি চালিয়ে দিতে পারে। দুর্জয় অপলক দৃষ্টিতে লোকটিকে দেখছেন আর এক পা, দুই পা করে ওর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। চিৎকার করে উঠল লোকটা। বলল, “ওখানেই দাঁড়িয়ে থাক শালা। এক পা-ও এগোবি না। মাথার খুলিটা উড়িয়ে দেব।”
কোনো উত্তর না দিয়ে হাতের পিস্তলটা শক্ত করে ধরে টার্গেটের দিকে এগোতে থাকলেন দুর্জয়। লোকটি আবারও চিৎকার করে উঠলেন, “শেষ বারের মতো বলছি। থেমে যা। না হলে…”
দুর্জয় জানেন যারা গর্জায় তারা বেশি বর্ষায় না। গুলি চালানোর হলে অনেক আগেই চালিয়ে দিত লোকটি। তাই না থেমে একটু একটু করে এগোতে থাকলেন দুর্জয়। যখন দেখলেন সামনে বসে থাকা লোকটি ওঁর নাগালের মধ্যে চলে এসেছে ঠিক তখনই নিজের হাতের পিস্তলটা মাটিতে ফেলেই সবাইকে অবাক করে লোকটির ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন দুর্জয়। লোকটির হাতের বন্দুকটি মাটিতে ছিটকে পড়ল। লোকটির কাঁধের পাশে সজোরে একটা রদ্দা মারলেন দুর্জয়। তারপরে তলপেটে ঘুসি মারতেই ককিয়ে উঠল লোকটি। আর সেই সুযোগে বাকিরা দৌড়ে এসে ধরে ফেলল ওকে।
