দ্য আল্টিমেট ট্রুথ – ২৫
(খুনি তবে কে?)
সন্দেশখালি থানা, কলকাতা
সকাল ১১টা, ১৯ জুলাই
থানার কনফারেন্স রুমটা খুলে দেওয়া হয়েছে। দুর্জয়ের কথামতো সেখানেই একে একে এসে হাজির হয়েছেন এই কেসের সঙ্গে যুক্ত সবাই। দেবব্রত পাল, রাজীব দত্ত, ডঃ শর্বাণী বাসু, রত্না সামন্ত, দীপক খান্না, অমিয় হালদার-সহ আরও অনেকে এসে উপস্থিত হয়েছেন কনফারেন্স রুমে। কিছুক্ষণ পরেই ওসি অভিনন্দন মার্জিত-সহ প্রগতি ময়দান থানার এবং সন্দেশখালি থানার গোটা পুলিশ টিমও সেখানে এসে হাজির হয়ে গেল। পুলিশ বাদে কনফারেন্স রুমে হাজির হওয়া সবাই একে অপরের মুখ চাওয়াচায়ি করছেন। কেনই বা তাঁদেরকে এখানে এভাবে ডেকে আনা হয়েছে, সেটাই যেন কেউ বুঝে উঠতে পারছেন না।
আজ সকালেই, স্থানীয় একটা নিউজ চ্যানেলে খবরটা ফলাও করে বের করেছেন লোকাল একজন রিপোর্টার, ‘ঘটনার বেশ কিছুদিন পরে অবশেষে রেপ এবং খুনের কেসের সমাধান করতে সফল হল কলকাতা পুলিশ। এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অপরাধে সেন্দেশখালি থেকে রাতভর রেড করে গ্রেফতার করা হয়েছে একজন ট্যাক্সির ড্রাইভারকে। জানা গেছে, এই ড্রাইভারকেই দীপশিখাদেবীর মৃতদেহটিকে ঘটনাস্থলে ফেলে রেখে যেতে দেখা গেছে সিসি ফুটেজে।’
কনফারেন্স রুমে বসে আছেন দুর্জয় ও ওঁর টিম। চোখেমুখে অদ্ভুত একটা তৃপ্তি ফুটে উঠেছে ওঁর। এতদিন পরে যেন শাপমুক্তি ঘটল।
“নিজেদের জীবনকে বিপন্ন করে যেভাবে আপনি এবং আপনার গোটা দল এই কেসের অপরাধীকে গ্রেফতার করেছেন তাতে কোনো প্রশংসাই আপনাদের জন্য যথেষ্ট নয়।” উঠে দাঁড়িয়ে দুর্জয়দের অভিনন্দন জানালেন ওসি সাহেব। করতালি দিয়ে উঠলেন রুমে বসে থাকা প্রায় প্রত্যেক পুলিশ কর্মী।
“পুরো কাজ এখনও শেষ হয়নি স্যার।” কথাটা বলেই দেবব্রত পালের দিকে তাকালেন দুর্জয়।
“এখনও কাজ বাকি আছে!” বিস্মিত হলেন প্রগতি ময়দান থানার বড়োবাবু।
মাথা নেড়ে ইশারা করতেই শৈবাল রায়, দুর্জয়ের হাতে কেস ডায়েরিটা তুলে দিলেন। কেস ডায়েরিতে ফ্ল্যাপ করে রাখা অংশটা নিজের সামনে খুলে বসলেন দুর্জয়। তারপর কিছুক্ষণ নিজের মনে কেস ডায়েরির ওই অংশটা পড়ে মুচকি হেসে কনফারেন্স রুমে বসে থাকা বাকিদের মুখের দিকে একবার ভালো করে তাকিয়ে দেখলেন। তারপরে বলতে শুরু করলেন, “সালটা ছিল ২০২০। পানিহাটিতে একটা গাড়ির মধ্যে একজন মানুষের ডেডবডি পাওয়া গেল। ময়না তদন্তে জানা গেল, ঘটনাটা খুনের। তদন্ত করে আসল অপরাধী ধরাও পড়ে গেল। তারপরে কোর্টে উঠল কেসটা। বিচারে অপরাধীর যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। যে ট্যাক্সিটাতে খুনটা হয়েছিল সেটা এখনও সিজ অবস্থায় কোর্টের সম্পত্তি হিসেবে ডাম্পিং গ্রাউন্ডে পড়ে আছে। এই কেসের তদন্তে জানা গেল, এই কেসের ট্যাক্সি নাম্বার এবং ২০২০ সালের ওই কেসের ট্যাক্সির নাম্বারটা একই। আর এটাই আমাকে সবথেকে বেশি চমকে দিয়েছিল। পুরোনো কেসের ডায়েরিটা নিয়ে বসে পড়লাম। বোঝার চেষ্টা করলাম, ওই কেসে ঠিক কী হয়েছিল। কারণ এটা আমার কাছে ক্লিয়ার ছিল যে এই দুটো কেস কোথাও না-কোথাও গিয়ে এক হয়ে গেছে। ওই কেসটা সেই সময়ে খুব মিডিয়া কভারেজ পেয়েছিল। তাই সেই সময়ের কোনো খবরের কাগজ থেকে ট্যাক্সি নাম্বারটা জেনে নেওয়াটা খুব একটা কষ্টকর ছিল না। কিন্তু প্রশ্নটা হল, এত নাম্বার থাকতে অপরাধী আগের কেসের ট্যাক্সি নাম্বারটাই ব্যবহার করতে গেল কেন? তাহলে কী এই দুটো কেস ওতপ্রোতভাবে জড়িত? প্রশ্নটা যতই আমাকে হান্ট করতে থাকল ততই আমি তদন্তের প্রতিটি ধাপ আরও ভালো করে বোঝার চেষ্টা করতে শুরু করলাম। দেখতে দেখতে সব কিছু আমার কাছে ক্লিয়ার হয়ে গেল।”
“২০২০-র ওই কেসটার তদন্তকারী অফিসার কে ছিল?” দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন অভিনন্দনবাবু।
“উত্তরটা কি আমিই দেব, নাকি আপনি কিছু বলবেন?” দেবব্রতবাবুর দিকে তাকিয়ে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন দুর্জয় সেন। দুর্জয়ের কথা শুনে সবাই অবাক হয়ে দেবব্রতবাবুর দিকে তাকালেন।
“হ্যাঁ, আমিই ওই কেসের আইও ছিলাম। এতে কী? কেসে তো অপরাধীর সাজা হয়ে গেছে। তাছাড়া ওই কেসের সঙ্গে দীপশিখার খুনের কী সম্পর্ক আছে?” বললেন দেবব্রত পাল।
মুচকি হাসলেন দুর্জয়। তারপরে বললেন, “নিজের স্ত্রী-কে খুন করার সুযোগ এবং মোটিভ দুটোই আপনার কাছে ছিল। একদিকে আপনি দীপশিখার সঙ্গে রাজীববাবুর সম্পর্কটা মেনে নিতে পারেননি। অন্যদিকে, নিজেও রত্না সামন্তের সঙ্গে একটা অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। চাইছিলেন, দীপশিখা যাতে আপনাকে ছেড়ে চলে যায়। এবং আপনি আর রত্নাদেবী একসঙ্গে থাকতে পারেন। কিন্তু আপনার এই টার্গেটটা কিছুতেই সফল হচ্ছিল না কারণ, দীপশিখাদেবী আপনাকে ছেড়ে যেতে রাজি ছিলেন না। সম্ভবত উনি আপনাকেই ভালোবাসতেন সব থেকে বেশি।”
“কী যা-তা বলছেন? আপনার কাছে কিছু প্রমাণ আছে নাকি শুধুই আন্দাজে কথা বলছেন?” চিৎকার করে উঠলেন দেবব্রত পাল।
“প্রমাণ ছাড়া আমি কোনো কথা বলি না। আপনার এবং রত্নাদেবীর মোবাইলের কল-লিস্ট এর সবথেকে বড়ো প্রমাণ। তাছাড়া ২০২০ সালের ওই কেসের রেকর্ড অনুসারে, আপনার জন্যই ঘটনার কয়েকদিন পরে আসল অপরাধী কোর্ট থেকে ‘বেল’ পেয়ে যায়। কাস্টডি ট্রায়ালের সম্ভাবনা থাকা সত্বেও অপরাধীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে আপনিই ওকে কোর্ট থেকে ‘বেল’ পেতে সাহায্য করেছিলেন। আর তার জন্য, আপনাকে ডিপার্টমেন্ট সাসপেন্ড করে। পরে অবশ্য আপনি নিজেই পুলিশের চাকরিটা ছেড়ে দেন। যদিও আগাগোড়া বেলে থাকলেও বিচারের শেষে অপরাধীর শাস্তি হয়।” কথাটা বলতে বলতে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে পড়লেন দুর্জয়।
“তার মানে, দেবব্রতই আমার দীপশিখাকে খুন করেছিল?” বলে উঠলেন রাজীব দত্ত।
“খুনটা করার যথেষ্ট মোটিভ আপনার কাছেও সমানভাবে ছিল। আপনি দীপশিখাদেবীকে প্রপোজ করেছিলেন যা দীপশিখা পাল রিজেক্ট করেন। আর এতেই আপনি ক্ষেপে যান। আপনার ইগো হার্ট হয়। তাছাড়া আপনি বাই পোলার ডিসঅর্ডারের পেশেন্ট। মুড সুইং খুব স্বাভাবিক এই ধরনের পেশেন্টদের কাছে। দীপশিখাদেবী আপনাকে একজন বন্ধু হিসেবে পেতে চেয়েছিলেন কিন্তু আপনার ইচ্ছে ছিল ওঁকে পুরোপুরিভাবে পেতে, যেটা আপনি কিছুতেই পারছিলেন না। একটা সময়ে আপনি যখন দেখলেন, দীপশিখাদেবী কিছুতেই নিজের স্বামীকে ছেড়ে যেতে রাজি হচ্ছেন না, আপনি অধৈর্য হয়ে পড়লেন। ক্ষেপে গেলেন। তাছাড়া, সেই দিন ঝড়জলের রাতে আচমকা ট্যাক্সিটা কিন্তু আপনিই প্রথম দেখতে পান। কেমন করে ওই ট্যাক্সিটা অত রাতে ওখানে এসে হাজির হল রাজীববাবু? সবটাই কী কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে গভীর কোনো ষড়যন্ত্র আছে?” কথাগুলো বলেই রাজীব দত্তের দিকে তাকালেন দুর্জয়।
“তাহলে রাজীবই খুনটা করেছে? আমি অনেকদিন আগেই এটা আন্দাজ করেছিলাম।” গলা চড়ালেন ডঃ বাসু।
কোনো কথা না বলে চুপ করে মাথা নামিয়ে বসে রইলেন রাজীব দত্ত। ঘরে উপস্থিত সবাই তখন এক দৃষ্টিতে রাজীববাবুর দিকে তাকিয়ে থাকলেন।
“এত তাড়া কীসের ডঃ বাসু? আপনিও খুব একটা পিছিয়ে ছিলেন না। দীপশিখাকে খুন করার কারণ আপনার কাছেও খুব একটা কম কিছু ছিল না? সেদিন যখন জিজ্ঞাসাবাদ করতে আপনার চেম্বারে যাই, তখন সেখানে টেবিলের ওপরে রাখা পুরোনো একটা ফাইলের ওপরে আমার চোখ গিয়ে পড়ে। দেখি, ফাইলের ওপরে লেখা পানিহাটি থানা কেস নাম্বার ১০/২০২০। আপনিও দেবব্রতবাবুর তদন্ত করা কেসটা নিয়ে ওই সময়ের সব নিউজগুলো জোগাড় করে রেখেছিলেন। সেটা কী শুধু দীপশিখাদেবীর চিকিৎসার জন্য, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল?”
“পেশেন্টের ডিটেলস সংগ্রহ না করলে চিকিৎসা করব কেমন করে?” বললেন ডঃ বাসু।
“দেবব্রত পাল আপনার পেশেন্ট ছিল না কিন্তু। আমি যদি বলি, আপনি নিজেই একজন মানসিক রোগী। আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, আপনি একজন ডিভোর্সি। আপনি বিবাহিত মহিলাদের সহ্য করতে পারেন না। এর আগেও আপনার নামে অনেক অভিযোগ এসেছিল। আপনি বিবাহিত মহিলাদের মানসিক চিকিৎসা করার অছিলায়, ওদের স্বামীদের দুর্বলতাগুলো বের করে সেগুলো এমনভাবে নিজের পেশেন্টদের সামনে রাখতেন, যাতে ওরা নিজেদের স্বামীকে ভুল বোঝেন আর বিয়েটা ভেঙে বেরিয়ে আসে।” মুচকি হেসে কথাগুলো বললেন দুর্জয়।
“আপনি জানেন আপনি কী বলছেন? আমি আপনাকে কিন্তু ছাড়ব না।” আচমকা ভায়োলেন্ট হয়ে উঠলেন ডঃ বাসু।
“শুধু কী তাই, রাজীব দত্তকে দিয়ে দীপশিখাদেবীকে প্রভাবিত করার চেষ্টায় ছিলেন আপনি। চাইছিলেন, কোনোভাবে দীপশিখাদেবী যদি নিজের স্বামীকে ছেড়ে রাজীব দত্তের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে যান, তাহলে আপনি সেই কথাটা দেবব্রতবাবুকে জানিয়ে দিয়ে ওঁর মনটাও বিষিয়ে দেবেন। তাতে সফল না হলে, দেবব্রতবাবুর পুরোনো কেসের প্রসঙ্গ টেনে এনে ওঁকে ব্ল্যাকমেল করার প্ল্যানটাও করে রেখেছিলেন। আর তাই, ২০২০ সালের ঘটনার ডিটেলসগুলো এক জায়গায় জড়ো করেন।” কথাগুলো বলেই নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন দুর্জয়। তারপরে ইশারা করে শৌভিককে বললেন, ট্যাক্সি ড্রাইভারকে কনফারেন্স রুমে নিয়ে আসতে। শৌভিক ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
“দীপশিখা পালকে খুন করার মোটিভ তো সবার কাছেই কমবেশি ছিল। তাহলে, খুনটা করল কে?” অধৈর্য হয়ে পড়লেন ওসি অভিনন্দন মার্জিত।
“সেটা জানার জন্য আমাদের আর একটু অপেক্ষা করতে হবে, স্যার।” কথাটা বলেই ঘরের একটা কোণায় বসে থাকা দীপক খান্নার দিকে তাকালেন দুর্জয়। বললেন, “আপনি কী কিছু বলবেন, নাকি আমিই বলব?”
অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন দীপক খান্না। দুর্জয় বলতে শুরু করলেন, “দীপকবাবুর গল্পটা আবার একটু অন্য রকম। প্রথম দিন থেকেই উনি দীপশিখা পালকে পছন্দ করতেন। ওঁর নিজের করে পেতে চাইতেন। কিন্তু দীপশিখাদেবী নিজের লাইফে এতটাই ঘেঁটে ছিলেন যে দীপকবাবুকে বিশেষ পাত্তা দেওয়ার কোনো ইচ্ছে বা সময় কোনোটাই ওঁর কাছে ছিল না। আর এতেই রেগে যান দীপক খান্না। দীপকবাবু খুবই পজেসিভ মানুষ। দীপশিখার সঙ্গে রাজীব দত্তের সম্পর্কটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারছিলেন না। যেদিন রাতে দীপশিখাদেবী খুন হন, সেদিন রাতে দীপশিখাদেবীর অফিসের কাছেই লুকিয়ে ছিলেন দীপক খান্না। যুক্তি ছিল, লুকিয়ে লুকিয়ে দীপশিখাদেবীকে দেখছিলেন তিনি। কিন্তু কেন? শুধুই কী দীপশিখাদেবীকে ভালোবাসতেন বলে নাকি ওঁকে খুন করে নিজের রাগের বদলা নেওয়ার জন্য?”
“আমি কিছু করিনি স্যার। বিশ্বাস করুন।” হাত জড়ো করে নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন দীপক খান্না। ওঁর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে দুর্জয় বললেন, “এতটা ভেঙে পড়বেন না। আমার কথা এখনও শেষ হয়নি কিন্তু।”
“আরে সবকিছু তো তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। আপনি যা বলছেন তাতে তো এই খুনের পেছনে সবারই হাত থাকতে পারে? একটু ক্লিয়ার করুন। সবকিছু ঘেঁটে আছে মনে হচ্ছে।” কথাগুলো দুর্জয়ের দিকে ছুড়ে দিলেন প্রগতি ময়দান থানার বড়োবাবু।
“আমারও ওই একই দশা হয়েছিল স্যার। সম্পর্কের এই জটগুলো কিছুতেই ছাড়াতে পারছিলাম না। পুরোপুরি ঘেঁটে গিয়েছিলাম। আর ঠিক তখনই ২০২০র কেসটা নাড়াচাড়া করতে করতে বড়োসড়ো একটা সাফল্য পেলাম। আর সবকিছু আমার সামনে ক্লিয়ার হয়ে গেল…।” কথাটা শেষ করতে পারলেন না দুর্জয় সেন। রুমে প্রবেশ করল ট্যাক্সি ড্রাইভার যোগেশ সমাদ্দার। চোখমুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, পুলিশের কাছে বেশ ভালো রকমের খাতির-যত্ন পেয়েছে সে। রুমের ঠিক মাঝখানে এসে মাথা নামিয়ে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকল যোগেশ। ওর দিকে তাকিয়ে দুর্জয় বললেন, “আর সময় নষ্ট না করে যা বলার সেটা চটপট বলে ফেল। পুরো দোষটা নিজের ঘাড়ে নিস না। ভারি কেস, ধসে যাবি একদম। তুই শালা জেলের ঘানি টানবি আর যে তোকে দিয়ে এই কাজটা করাল সে বাইরে বসে মজা লুটবে, সেটা হয় নাকি? বলে ফেল তাড়াতাড়ি।”
কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকার পরে যোগেশ বলতে শুরু করল, “ওই মেয়েটাকে আমিই খুন করেছি। খুনের পরে খারাপ কাজটাও আমিই করেছি। নেশার ঘোরে ছিলাম, কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি। আমাকে আপনারা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিন। আমি আর বাঁচতে চাই না। খুনের পরে বডিটাকে ঝোপে ফেলি। তারপরে জামাকাপড় আর ছুরিটা রাজারহাটের কাছে নিরিবিলি একটা জায়গায় দেখে ফেলে দিই। আমি তো মরবই তবে মরার আগে তোকে শালি মেরেই মরব।” কথাটা বলেই রুমের একটা কোণায় চুপ করে বসে থাকা রত্না সামন্তের দিকে ছুটে গিয়ে ওঁর গলাটা টিপতে গেল যোগেশ। ভাগ্য ভালো যে, এমনটা হতে পারে সেটা আগে থেকেই কিছুটা আন্দাজ করেছিলেন দুর্জয়। আর তাই, তৎক্ষণাৎ ছুটে গিয়ে জাপটে ধরলেন যোগেশকে। কষিয়ে একটা চড় মারলেন যোগেশের বাঁ গালে। কান্নায় ভেঙে পড়ল যোগেশ। আসলে মানুষ যখন ভেতর থেকে একদম ভেঙে যায় তখন তাকে নতুন করে আর ভাঙতে হয় না।
“আপনিই পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলুন।” দুর্জয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন ওসি অভিনন্দন মার্জিত।
“আপনি কি কিছু বলবেন?” রত্নার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন দুর্জয়। কোনো উত্তর দিলেন না রত্না। দুর্জয় বলতে শুরু করলেন, “২০২০-র কেসটা পড়তে গিয়ে দেখি, ওই কেসে যে খুন হয়েছিল সে আর কেউ নয়, রত্নার নিজের দাদা দিগ্বিজয় সামন্ত। একদিন অফিস থেকে ট্যাক্সি করে বাড়ি ফেরার পথে ড্রাইভার রমেশ পাণ্ডের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে বচসা হয় দিগ্বিজয়ের। আচমকা ট্যাক্সিতে রাখা ছুরিটা চালিয়ে দেয় রমেশ। তাতেই রক্তাক্ত হয়ে গাড়ির মধ্যেই লুটিয়ে পড়ে দিগ্বিজয়। আশেপাশের লোকজন ড্রাইভারকে ধরে ফেলে পুলিশকে খবর দেয়। তদন্তে নামেন দেবব্রত পাল। গ্রেফতার হয় রমেশ। তারপরে বেল পেয়ে যায় কোর্ট থেকে। আর এটা কিছুতেই মন থেকে মেনে নিতে পারেননি রত্নাদেবী। নিজের প্রাণের থেকেও বেশি ভালোবাসতেন দাদাকে। কারণ, ছোটো থেকে এই দাদাই ওঁকে বড়ো করে তোলেন। মানুষ করেন। নিজের পায়ে দাঁড়তে সাহায্য করেন। দাদার এই মৃত্যু এবং তারপরে অপরাধীর এইভাবে বেল পেয়ে যাওয়াটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি রত্না। নিজের কাজের সূত্র ধরে কেসের গভীরে গিয়ে জানতে পারেন, অনেক কিছুই। আর তখনই ঠিক করেন দেবব্রতবাবুকে একেবারে শেষ করে দেবেন। প্রথমে দেবব্রতবাবুর নামে কাগজে খবর বের করে ওঁকে সাসপেন্ড করালেন। তারপরে ওঁর সঙ্গে প্রেমের নাটক করে ফাঁদে ফেলে নিজের স্ত্রী-র চোখে খারাপ করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু যখন দেখলেন, এত কিছু করার পরেও দীপশিখাদেবী, দেবব্রতবাবুকে কিছুতেই ছেড়ে যেতে চাইছেন না, তখন তিনি একটা প্ল্যান করলেন। প্রথমে নিজের টাকা খরচ করে যোগেশকে একটা কেস থেকে বেল করিয়ে ওঁর বিশ্বাস অর্জন করলেন। তারপরে অনেক টাকার টোপ দিয়ে এই কাজে ওকে রাজি করালেন। দীপশিখাদেবীকে খুন করার পুরো প্ল্যানটাই ছিল রত্না সামন্তের। খুনের পরে মার্ডার ওয়েপন, ভিক্টিমের জামাকাপড়গুলো ফেলে দিলেও যোগেশ কিন্তু দীপশিখাদেবীর গায়ের সোনার গহনাগুলো এনে রত্নাদেবীকেই দিয়েছিল বলে আমার বিশ্বাস। আর আগের কেসের ট্যাক্সি নাম্বারটা ব্যবহার করে রত্নাদেবী ভেবেছিলেন, এটা দেখে পুলিশ কিছুটা কনফিউজড হয়ে যাবে। কিন্তু এতে আমার কাজের অনেকটাই সুবিধা হয়ে গিয়েছিল। ২০২০-র ঘটনাটার পেছনে লুকিয়ে থাকা আল্টিমেট ট্রুথটাই শেষ পর্যন্ত রত্নাদেবী ও যোগেশকে পুলিশের কাছে ধরিয়ে দিল। আসলে কথায় আছে না, পারফেক্ট ক্রাইম বলে কিছু হয় না। কোনো ক্রাইম পারফেক্ট হলে সেটাকে ক্রাইম বলে মনেই হবে না। অপরাধী ক্রাইম করতে গিয়ে কিছু না কিছু ভুল করে যায়, আর তার মাশুলও ওকেই গুণতে হয়।” কথা শেষ করে ধীরে ধীরে কনফারেন্স রুমের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলেন দুর্জয়। আরও অনেক কিছু হয়তো ওঁর বলার ছিল কিন্তু কিছু না বলে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওঁর মুখ থেকে।
