(প্রথম অধ্যায়) বজ্রধাতুর তরবারি
(প্রথম অধ্যায়) বজ্রধাতুর তরবারি
সমুদ্রের ওপর সকাল হয়েছে এই কিছুক্ষণ আগেই। জাহাজের বারান্দায় কাঠের থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সকালের তাজা হাওয়ায় বুক ভরে একবার শ্বাস নিল ইরা। তারপর কোমরের কোষ থেকে টেনে বার করল তার তরবারি। লৌহনির্মিত ধারালো ফলা ঝকঝক করে উঠল প্রভাতসূর্যের আলোয়।
যে তিনটে লোক তাকে ঘিরে ধরেছে, তাদের হাতেও তরবারি আছে বটে, কিন্তু তাদের মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, তারা বেশ ভয় পেয়েছে। জোরালো হাওয়ায় মুখের ওপর এসে পড়া চুলগুলো কানের পেছনে সরিয়ে দিয়ে ইরা ব্যঙ্গের সুরে ডাকল, “চলে এস, খোকারা। এই বজ্রধাতুর ধার পরখ করে যাও একবার।”
সে জানত, আক্রমণ ওরা করবেই। জাহাজভরতি লোকের সামনে এই অপমান ওরা সইতে পারবে না। তৈরিই ছিল সে; অবশ্য না থাকলেও বিরাট ক্ষতি হত, এমন নয়।
তার ডানদিকের লোকটার তরবারিতে ছিটকে উঠল হলদে রোদ। আঘাতটা সরাসরি নেমে এল তার বাহুতে। কিন্তু ইরা দাঁড়িয়ে রইল স্থিরভাবে। নিজেকে রক্ষা করার জন্য হাতটুকু তোলাও তার কাছে বাহুল্য মনে হল।
জাহাজসুদ্ধ লোক অবাক হয়ে দেখল, ধারালো তরবারির প্রবল আঘাতেও মেয়েটার হাতে এক ফোঁটাও রক্ত ফুটে উঠল না। ভয়ে শ্বাস টেনে তাড়াতাড়ি কয়েক পা পিছিয়ে গেল আক্রমণকারী। ইরা হেসে উঠল, “তোমাদের দৌড় আমি জানি না?”
নিজের অস্ত্র উদ্যত করে সে এগিয়ে গেল লোক তিনটের দিকে, যদিও ওদের আঘাত করার ইচ্ছা তার নেই। একটু ভয় দেখিয়ে দিলেই হতভাগারা লেজ গুটিয়ে পালাবে।
তরবারি মুখের সামনে তুলে রেখেই ওরা পায়ে পায়ে পিছিয়ে যাচ্ছিল, এমন সময় পেছন থেকে রজনীশের গম্ভীর স্বর শোনা গেল, “হচ্ছেটা কী এখানে, গাধার দল?”
থেমে গেল সৈনিক তিনজন। হাতের লাঠিতে ভর দিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে সামনে এসে দাঁড়ালেন রজনীশদেব। জাহাজটা ঢেউয়ের তালে তালে দুলছে ঠিকই, তবু ভারসাম্য রক্ষা করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে রাজমন্ত্রী রজনীশদেবের বিন্দুমাত্র সমস্যা হচ্ছে না।
এক সৈনিক ভীত সন্ত্রস্ত স্বরে বলল, “এই মেয়েটা একটা ডাইনি, রাজমন্ত্রী মহোদয়।”
অলসভাবে হাতের তরবারি নাচিয়ে ইরা শুধু মুখ বাঁকিয়ে একটু হাসল।
রজনীশদের গলার মধ্যে একটা খুকখুক শব্দ করে কেশে বললেন, “তাই নাকি? তা তুমি সেটা বুঝলে কী করে, বুদ্ধিমান?”
এক সৈনিক ঢোঁক গিলে বলল, “ওর হাতের অস্ত্রটা রাতের বেলা দেখেছেন? অন্ধকারে সাদা হয়ে জ্বলে!”
আর একজন বলল, “ওর হাতে ধারালো অস্ত্রের কোপ মারলেও কিচ্ছু হয় না, সবাই এইমাত্র দেখেছে। এ-মেয়ে মায়াবিনী ডাইনি নয় তো কী?”
জাহাজের বাকি নাবিকরা গুঞ্জন করে উঠল। তারাও সহমত। এই মেয়েটার চালচলন কিছুতেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া যায় না। কী যেন একটা অন্যরকম আছে এর মধ্যে।
রজনীশদেব তাঁর হাতের লাঠিটা ঠকঠক করে ঠুকলেন কাঠের মেঝেতে, “মন দিয়ে আমার কথা শোনো, মূর্খের দল।” সকালের তীব্র সমুদ্রবায়ুর হু-হু রব ছাপিয়ে শোনা গেল তাঁর তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর, “মহারাজ তাঁর অত্যন্ত জরুরি ও গোপনীয় কার্য সম্পাদন করতে ইরাকে আমাদের সঙ্গে পাঠিয়েছেন। সেই কাজটি ঠিকমতো করতে না পারলে সারা রাজ্য ঘোর বিপদের মুখে পড়বে। বহিঃশত্রুর ভয়ানক আক্রমণ আসতে চলেছে; সেই আক্রমণ আটকাতে না পারলে তোমাদের বউ-বাচ্চারাও প্রাণে বাঁচবে, এমনটা ভুলেও ভেব না। তাই পরস্পরের প্রতি যদি কারও মনে কোনো রাগ, ঘৃণা, বিদ্বেষ ইত্যাদি থাকে, তাহলে সেগুলো আপাতত চেপেচুপে রাখ। মনে রাখবে, যে কাজ আমরা করতে চলেছি, তা আমাদের দেশের জন্য।”
তিন পরাজিত সৈনিক মাথা নীচু করে অস্ত্রের মুখ মেঝের দিকে রেখে নীরবে বাকিদের সঙ্গে মিশে গেল। একটু বিদ্রূপের হাসি হেসে ইরা তার বজ্রধাতুর মায়া তরবারি কোষবদ্ধ করল।
নাবিকদের একজন এসে দাঁড়াল ইরার সামনে, “আপনার প্রতি আমার কোনো রাগ বা ঘৃণা নেই। কিন্তু আমাদের নাবিকদের মধ্যে অনেকেই দেখেছে, গভীর রাতে আপনার তরবারির ফলা জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকে, আর আপনি তার ওপর কীসব যেন পড়েন। এমন বিচিত্র কুহকমায়ার অভিজ্ঞতা আমাদের কারও নেই। সেই কারণেই আমাদের ভয় করে সন্দেহ হয়, কোনো ডাইনির সঙ্গে সমুদ্রযাত্রায় বেরিয়ে পড়েছি কী না।”
ইরা তার তরবারি নিষ্কোষিত করে বাড়িয়ে ধরল জড়ো হওয়া মানুষগুলোর দিকে, “এর ওপরে সত্যিই কিছু লেখা মাঝেমাঝে ফুটে ওঠে। কথাটা সত্যি, কিন্তু আমি ছাড়া সেই লেখা কেউ পড়তে পারবে না।”
“তা কী করে হয়?”
“কারণ বজ্রধাতুর ওপর অক্ষরগুলো লেখা আছে মানুষের রক্ত দিয়ে। এই মায়া সবার জন্য নয়। হয়েছে? এবার যাও সবাই, নিজের নিজের কাজ করো।”
আর কারও কিছু বলার সাহস হল না। ভয়ে ভয়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাতে তাকাতে তারা চুপচাপ সরে পড়ল সামনে থেকে। ইরা তরবারি কোষবদ্ধ করে স্তম্ভে হেলান দিয়ে মুখ ফেরাল সামনের সুনীল সমুদ্রের দিকে।
রজনীশদেব খুড়িয়ে খুঁড়িয়ে এসে দাঁড়ালেন তার পাশে, “কাজটা কিন্তু ভালো করছ না, ইরা।”
“মানে?”
“এই লোকগুলো এমনিতেই ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। এদেরকে আরও ভয় পাইয়ে দিয়ে লাভ কিছু হবে কী? নাবিকরা প্রায়শই আমাকে খবর দিচ্ছে, জাহাজের আনাচে কানাচে এবং সমুদ্রের ওপর তারা নানা ধরনের অলৌকিক এবং অশুভ জিনিস দেখছে। এমন সময় আমি চাই না তুমি তোমার এই বিরাট মায়া তরবারি নিয়ে সবাইকে ভয় দেখিয়ে বেড়াও।”
ইরা বলল, “আমি মোটেই কাউকে যেচে ভয় দেখাইনি। আপনার সৈনিকেরা যদি উপযাচক হয়ে বিবাদ করতে আসে তার দায় আমার নয়।”
রজনীশ বললেন, “যেখানে আগে থেকেই ক্ষত হয়ে আছে, সেখানে বারবার আঘাত করতে নেই। ঘা হয়ে যেতে পারে। সবকিছুরই দুটো দিক থাকে, এটা ভুলে যেয়ো না। এখন এদের বেশি উত্তেজিত করলে এরা বিদ্রোহ করে বসতে পারে, ভেবে দেখেছ?”
ইরা পাথরের মতো মুখে বলল, “তাতে আমার কিছু যায় আসে না। ঐ তিনটে লোক আমাকে মায়াবী ডাইনি বলেছিল। আপনি ভালো করেই জানেন, ডাইনিবিদ্যা জিনিসটাকে আমি কতখানি ঘৃণা করি। সেই মুহূর্তে আপনি এসে না পড়লে আমি ওদেরকে উচিত শিক্ষা দিতাম।”
রজনীশদেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “ভাগ্যিস এসে পড়েছিলাম। নয়তো আজই হয়তো একটা বিদ্রোহ করে বসত ওরা, আর আমাদেরও নীলাশা দ্বীপে পৌঁছোনোর আশা এ-জন্মের মতো ত্যাগ করতে হত। আবার বলছি, মাথা ঠান্ডা রাখো। আমাদের হাতে এখন অনেক বড়ো একটা কাজ আছে। মহারাজের আদেশ কী ভুলে গেছ তুমি?”
ইরা ঠোঁট কামড়াল, “না, ভুলিনি। তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ হবে। ঐ দুষ্ট ডাইনির মাথা কেটে স্বর্ণথলিকায় বসিয়ে আমি উপহার দেব মহারাজকে। কিন্তু তার আগে ওই ডাইনির কাছে আমার কিছু প্রশ্ন আছে।”
রজনীশদের ভ্রূ তুলে তাকালেন তার দিকে, “নীলাশা জীপের ডাইনির কাছে তোমার আবার কীসের প্রশ্ন? কী জানতে চাও ওর কাছে?”
ইরা কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আমার অতীত।”
